Skip to content

তুমিও জিতবে

পৃষ্ঠা ১ থেকে ১৫

পৃষ্ঠা:০১

অধ্যায়-১:মনোভাবেরগুরুত্ব IMPORTANCE OF ATTITUDE ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা Building a positive attitude:-একজন লোক মেলায় লাল-নীল-সবুজ-হলুদ ইত্যাদি অনেক রংয়ের বেলুন বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করত। কখনও কখনও তার বিক্রি কমে গেলে সে হিলিয়াম গ্যাসে ভর্তি একটি বেলুন আকাশে উড়িয়ে দিত। বেলুনটিকে আকাশে উঠে যেতে দেখলে উৎসাহী বাচ্চারা বেলুনওয়ালার কাছে ভিড় করে তার বিক্রি বাড়িয়ে দিত। সারাদিন এই পদ্ধতিতে বেলুনওয়ালা বেলুন বিক্রি করত। একদিন পিছন থেকে জামায় টান পড়াতে বেলুনওয়ালা মুখ ফিরিয়ে দেখল একটি বাচ্চা ছেলে। ছেলেটি জিজ্ঞেস করল, “কালো রংয়ের বেলুনও কি আকাশে উড়বে?” বালকটির অত্যধিক আগ্রহ লক্ষ্য করে লোকটি তাকে আশ্বস্ত করে বলল, “ভাই, রংয়ের জন্য বেলুন আকাশে ওড়ে না, ভেতরের গ্যাস বেলুনকে আকাশে ওড়ায়।”মানুষের জীবনেও এ কথা সত্য। আমাদের ভিতরে কি আছে সেইটাই প্রধান। আমাদের ভিতরের যে জিনিসটি আমাদের উপরে উঠতে সাহায্য করে তা হোল আমাদের মানসিকতা।আপনারা কি কখনও চিন্তা করে দেখেছেন, কেন কোনও কোনও ব্যক্তি সংস্থা বা দেশ অন্যদের তুলনায় বেশি সফল?এর মধ্যে কোনও গূঢ় রহস্য নেই। সফল ব্যক্তিরা একটি নির্দিষ্ট ও কাঙ্খিত ফললাভের জন্য চিন্তা ও কাজ করেন। তারা জানেন, ফললাভের লক্ষ্যে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ মানুষ। তারা আরও জানে তাকে কিভাবে গড়ে তুলে কাজে লাগাতে হয়। আমার বিশ্বাস যে কর্মীর গুণমানের উপর যে কোনও ব্যক্তি, সংস্থা বা দেশের সাফল্য নির্ভর করে। আমি বিশ্বেস প্রধান সংস্থাগুলিতে নিযুক্ত উচ্চ আধিকারিকদের সঙ্গে কথাবার্তার সময় সবাইকে একটা প্রশ্ন করেছি: ” যদি আপনাকে একটি যাদুদণ্ড দেওয়া হয় এবং বলা হয় যে ব্যবসায়ে উৎপাদনশীলতা ও লাভ বাড়াবার জন্য আপনি যে জিনিসটির পরিবর্তন চান, সেই জিনিসটি কী?” উত্তরে তারা সবাই একবাক্যে বলেছেন যে, সংস্থায় কর্মরত ব্যক্তিদের মনোভাব যদি উন্নততর হয়, তবে তারা সম্মিলিতভাবে কাজ করতে সক্ষম হবে; ফলে সংস্থায় অপচয় বন্ধ হবে, সংস্থার প্রতি আনুগত্য বাড়বে এবং সাধারণভাবে ঐ সংস্থা কর্মতৎপরতার দৃষ্টান্ত-স্থল হিসাবে পরিগণিত হবে।হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের উইলিয়ম জেমস্ (William James) বলেন, ” আমাদের প্রজন্মের সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কার হোল এই যে মানুষ মনোভাবের পরিবর্তন ঘটিয়ে তার জীবনযাত্রার পরিবর্তন ঘটাতে পারে।”অভিজ্ঞতার নিরিখে আমরা জানি মানব সম্পদই সমস্ত রকমের উদ্যোগে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। মূলধন বা যন্ত্রপাতি ইত্যাদির থেকেও অনেক মূল্যবান। দুর্ভাগ্যক্রমে এই সম্পদের অপচয়ও অনেক বেশি। মানুষ আপনার মহত্তম সম্পদ কিংবা বৃহত্তম দায় হয়ে উঠতে পারে।

পৃষ্ঠা:০২

‘তুমিও জিতবে:পূর্ণ গুণসম্পন্ন মানুষ (TQP-Total quality peòlpe):-আমি একটি বাণিজ্যিক সংস্থার বিভিন্ন বিভাগে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছি, যেমন ক্রেতা সহায়তা, বিক্রনয় দক্ষতা, বাণিজ্য-বৃদ্ধির কৌশল সংক্রান্ত পরিকল্পনা ইত্যাদি। নিঃসন্দেহে এই বিষয়গুলি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আমার মনে হয় কোনও প্রশিক্ষণই সফল হবে না, যদি না শিক্ষার্থীদের মান যথোপযুক্ত হয়। উপযুক্ত গুণমান সম্পন্ন মানুষ তারাই যাদের চরিত্র আছে, সততা আছে, মূল্যবোধ আছে আর সর্বোপরি আছে ইতিবাচক মনোভাব।আমার বক্তব্যের ভুল অর্থ করবেন না। নিঃসন্দেহে সমস্ত বিষয়েই প্রশিক্ষণ দরকার। কিন্তু সমস্ত প্রশিক্ষণ-কার্যক্রমের সাফল্য নির্ভর করবে উপযুক্ত গুণসম্পন্ন শিক্ষার্থীর উপর। ক্রেতা পরিষেবার প্রশিক্ষণে শিক্ষার্থীদের বলা হয় প্রতিটি ক্রেতার সঙ্গে কথাবার্তায় ‘অনুগ্রহ করে’ ‘ধন্যবাদ’ ইত্যাদি কথাগুলি ব্যবহার করবে, মুখে থাকবে মোলায়েম হাসি এবং যথাসময়ে করমর্দন করবে। কিন্তু একজন মানুষ কতক্ষণ এইভাবে মৃদুহাসি হাসতে পারবে যদি তার মধ্যে ক্রেতাকে সাহায্য করার প্রকৃত সদিচ্ছা না থাকে? তাছাড়া ক্রেতারাও শুকনো হাসির অন্তঃসারশূণ্যতা বুঝতে পারবে। হাসি আন্তরিক না হলে তা অত্যন্ত বিরক্তিকর লাগে। আসল কথা হচ্ছে বাইরের অবয়বের থেকে অন্তর্নিহিত বস্তু অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ‘অনুগ্রহ করে’ কিংবা ধন্যবাদ’ ও’ মৃদুহাসি’ ইত্যাদি অবয়বের অঙ্গ হলেও গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এগুলি অনায়াসে ব্যবহারের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায় যদি মনে কাজ করার আন্তরিক ইচ্ছা থাকে। ফরাসী দার্শনিক ব্লেইজ পাস্কালকে (Blaise Pascal) একবার একজন বলেছিলেন, “আপনার মতো আমার মেধা থাকলে আমি আরও ভালো মানুষ হতে পারতাম।” পাঞ্চাল জবাব দেন, ” আগে ভালো মানুষ হোন, তাহলে আপনি আমার মেধা পাবেন।”ক্যালগারী টাওয়ার নামে অট্টালিকাটির উচ্চতা ১৯০.৮ মিটার, ওজন ১০,৮৮৪ টন। এর প্রায় শতকরা ৬০ ভাগ অর্থাৎ ৬,৩৪৯ টন মাটির নীচে আছে। উচ্চতম বাড়িগুলোর ভিত্তিকে এইভাবে সুদৃঢ় করতে হয়েছে। সাফল্যকেও দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। সাফল্যের ভিত্তি হচ্ছে মনোভাব।তোমার দৃষ্টিভঙ্গিই তোমার সাফল্যের অবদান (Your attitude contributes to success) হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে শতকরা ৮৫ টি ক্ষেত্রে প্রার্থীরা চাকরি পায় তাদের মনোভাব বা দৃষ্টিভঙ্গির জন্য, আর শতকরা ১৫টি ক্ষেত্রে পায় অনেক তথ্য ও সংখ্যাতত্ত্ব জানে এবং বেশ চালাক-চতুর বলে। শিক্ষাখাতে যে ব্যয় হয় তা বিপুল, এবং সেই শিক্ষা কেবল তত্ত্ব, তথ্য ও সংখ্যাতত্ত্ব মুখস্থ করায়। এই শিক্ষা জীবিকা অর্জনের সাফল্যের ক্ষেত্রে মাত্র শতকরা ১৫ ভাগ দায়ী। এই বইয়ের আলোচ্য বিষয় হ’ল বাকিশতকরা ৮৫ ভাগ সাফল্য। ইংরেজি ভাষায় ‘attitude’ শব্দটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ। ব্যক্তি জীবনে, জীবিকার ক্ষেত্রে, প্রকৃতপক্ষে জীবনের সবক্ষেত্রেই এই attitude বা মনোভাবের বিশেষ গুরুত্ব আছে। কোনও প্রশাসক কি ভালো প্রশাসক হতে পারেন যদি তার উপযুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি না থাকে? ছাত্রসুলভ মনোভাব না থাকলে একজন ছাত্র কিভালো ছাত্র হতে পারে? পিতামাতা, শিক্ষক, মালিক, কর্মচারী ইত্যাদি প্রত্যেকেরই স্ব স্ব ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনের উপযোগী মনোভাব না থাকলে যথাযথভাবে তাদের কর্তব্য করতে পারেন না।

পৃষ্ঠা:০৩

মনোভাবের গুরুত্ব: তাই যে জীবিকাই আপনি পছন্দ করুন না কেন, সাফল্যের ভিত্তি হচ্ছে আপনার মনোভাব বা দৃষ্টিভঙ্গি। হীরে ছড়ানো ক্ষেত (Acres of diamonds) আফ্রিকায় এক কৃষক সুখী ও পরিতৃপ্ত জীবন নির্বাহ করত। সে সুখী কারণ তার যা ছিল তাতেই ছিল সন্তুষ্ট; আবার সে সন্তুষ্ট ছিল বলেই সুখী ছিল। একদিন একজন বিজ্ঞ ব্যক্তি তার কাছে হীরের মহিমা-কীর্তন করে হীরের ক্ষমতা সম্পর্কে অনেক কথা বললেন। তিনি জানালেন, “তোমার যদি বুড়ো আঙ্গুলের আকারের একটি হীরে থাকে তবে তুমি একটা শহরের মালিক হতে পারবে, আর হাতের মুঠির আকারের একটি হীরে থাকে তবে সম্ভবত একটা দেশের মালিক হতে পারবে।” এই বলে বিজ্ঞ ব্যক্তিটি চলে গেলেন কিন্তু সেই রাত্রে কৃষক আর ঘুমোতে পারল না। তার মনে সুখ ছিল না, কারণ হীরের অভাবে সে অতৃপ্তির বোধে পীড়িত। অতৃপ্ত বলেই সে অসুখী। পরদিন থেকেই কৃষক তার খামারবাড়ি বিক্রি করার জন্য তোড়জোড় শুরু করে দিল। শেষপর্যন্ত সমস্ত বিক্রি করে, তার পরিবারকে একটি নিরাপদ জায়গায় রেখে সে বেরিয়ে পড়ল হীরের খোঁজ করতে। সারা আফ্রিকা সন্ধান করে কোথাও হীরে পেল না। সারা ইউরোপ খুঁজল, কিন্তু সেখানেও কিছু পেল না। যখন স্পেনে পৌঁছল তখন সে শারীরিক, মানসিক এমনকি অর্থনৈতিক দিক থেকে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত। চরম হতাশাল্লান্ত হয়ে অবশেষে বার্সিলোনা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সে আত্মহত্যা করল। এদিকে যে লোকটি খামারবাড়িটি কিনেছিল সে একদিন সকালে ক্ষেতের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট নদীটিতে উটকে জল খাওয়াচ্ছিল। নদীর ওপারে একটি পাথরটুকরোর উপর সকালের রোদ পড়ে রামধনুর মতো বিচিত্র রংয়ে ঝক্সক্ করে উঠল। বসার ঘরের টেবিলের উপর পাথরটি বেশ ভালো দেখাবে মনে করে লোকটি পাথরটি কুড়িয়ে নিয়ে বাড়ি ফিরল। সেদিন বিকেলেই সেই বিজ্ঞ ব্যক্তিটি বাড়িতে এসে টেবিলের উপর ঝক্সকে পাথরটি দেখে জিজ্ঞেস করলেন, “হাফিজ কি ফিরে এসেছে?” হাফিজ ছিল পুরোনো মালিকের নাম। খামারবাড়ির নতুন মালিক বললেন, “না কিন্তু একথা জিজ্ঞেস করছেন কেন? বিজ্ঞ ব্যক্তিটি বললেন, “ঐ পাথরটি একটি হীরে, আমি হীরে চিনি।” মালিক কিন্তু মানতে চাইল না; সে বলল, “না, এটি একটি পাথর, আমি নদীর ধারে কুড়িয়ে পেয়েছি। আমার সঙ্গে আসুন, দেখবেন সেখানে ঐ ধরনের পাথর আরও অনেক আছে। তারা দু’জনে কিছু পাথর কুড়িয়ে পরীক্ষার জন্য জহুরির কাছে পাঠিয়ে দিল। পাথরগুলি হীরেই। দেখা গেল সমস্ত ক্ষেতটিতেই একরের পর একর জুড়ে অজস্র হীরে ছড়ানো আছে। এ গল্পটি কী নীতিশিক্ষা দেয়? এই গল্পটি থেকে পাঁচটি শিক্ষা আমরা পাই।

১. হাতের কাছের সুযোগটিকে যথার্থভাবে সদ্ব্যবহার করাই সঠিক মনোভাব। একরের পর একর বিস্তৃত হীরে ভরা ক্ষেতটি ছিল হাতের কাছের সুযোগ। সোনার হরিণের সন্ধানে না ছুটে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রাপ্ত সুযোগের সদ্ব্যবহার করাই উচিত।

২. নদীর অপরপারের ঘাসকে অনেক বেশি সবুজ মনে হয়। দূরবর্তী সম্ভাবনাকে মানুষ অনেক বেশি উজ্জ্বল মনে করে।

৩.প্রাপ্ত সুযোগকে কাজে না লাগিয়ে যারা সুদূর সম্ভাবনার স্বপ্নে বিভোর থাকে তারা জানে না যে আর একজন ঐ সুযোগটি পাওয়ার আশায় উন্মুখ হয়ে আছে। সে খুশি হবে ঐ সুযোগটি পেলে।

পৃষ্ঠা:০৪

তুমিও জিতবে:৪. সুযোগ-সম্ভাবনা বোঝার ক্ষমতা যাদের নেই, তারা সুযোগ এসে যখন দরজায় কড়া নাড়ে, তখন আওয়াজ হচ্ছে বলে বিরক্ত হয়। ৫. একই রকম সুযোগ দু’বার আসে না। পরবর্তী সুযোগ হয়ত বেশি ভালো হবে কিংবা খুবই কষ্টসাধ্য হবে কিন্তু একইরকম হবে না।ডেভিড ও গোলিয়াথ (David and Goliath) ভেভিড-গোলিয়াখের গল্প অনেকের জানা আছে। গোলিয়াথ নামে দৈত্যটি গ্রামের ছেলেমেয়েদের ভয় দেখিয়ে সন্ত্রস্ত করে রাখত। একদিন, ডেভিড নামে একটি ১৭ বৎসরের রাখাল ছেলে গ্রামে তার ভাইদের কাছে বেড়াতে এসে ওদের জিজ্ঞেস করল, ” তোমরা, দৈত্যটার সঙ্গে লড়াই কর না কেন? ভাইয়েরা ভয়ে ভয়ে বলল, “দেখছ না, কী বিরাট চেহারা, ওকে আঘাত করাই মুস্কিল”। ডেভিড বলল, “তা হবে কেন? বিরাট চেহারা বলেই আঘাত করা সহজ, কোনও তাক ফস্কে যাবে না।” তার পরের কাহিনী সবাই জানে। ডেভিড গুলতির সাহায্যে দৈত্যটিকে হত্যা করে গ্রামের ছেলেমেয়েদের সন্ত্রাসমুক্ত করেছিল। একই দৈত্য সম্পর্কে দু’রকমের দৃষ্টিভঙ্গি, সাহসীর একরকম, আবার ভীতুসের অন্যরকম। জীবনের লক্ষ্যপথে প্রতিহত হলে আমরা সেই অবস্থাকে কিভাবে গ্রহণ করব তা আমাদের মানসিকতার উপরই নির্ভর করে। যারা সমস্ত বিষয়ে ইতিবাচক চিন্তা করেন তারা বাধা-বিপত্তিকে সাফল্যের সোপান হিসাবে গ্রহণ করেন; যারা নেতিবাচক চিন্তা করেন তাদের কাছে যে কোনও বাধাই বিরাট প্রতিবন্ধক। বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলির শ্রেষ্ঠত্বের পরিমাপ সেখানকার কর্মীদের বেত্তনূহার দিয়ে বা কাজকর্মের পদ্ধতি দিয়ে হয় না। শ্রেষ্ঠত্বের বিচার হয় প্রতিষ্টানের সঙ্গে কর্মীদের আবেগও অনুভূতি কতটা জড়িত, কাজের প্রতি তাদের মনোভাব এবং কর্মীদের পারস্পরিক সম্পর্ক দিয়ে। কোনও কর্মী যখন বলেন, “এই কাজটা করতে পারব না,” তখন তার কথার দু’টি সম্ভাব্য অর্থ আছে। হয় তিনি বলতে চান যে কাজটি কিভাবে করতে হয় তা তিনি জানেন না, কিংবা তিনি কাজটি করতে চান না। যদি কাজের পদ্ধতি না জানা থাকে তবে তা প্রশিক্ষণের সমস্যা। আর যদি কাজটি করতে না চান তবে তা হবে মনোভাবের সমস্যা, অর্থাৎ কাজটি করতে তার আগ্রহ নেই, কিংবা মূল্যবোধের সমস্যা, অর্থাৎ তিনি মনে করেন কাজটি করা উচিত নয়। একটি সুসম্পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি (A holistic approach) আমি বিশ্বাস করি মানুষ সম্পর্কে একটি সুসম্পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি নেওয়া উচিত। মানুষ কেবল দু’টো হাত বা দুটো পা নয়। সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, মেধা-হৃদয় মিলিয়ে যে মানুষ সেই কাজে যায়, আবার কাজ থেকে ঘরে ফিরে আসে। আমরা পারিবারিক সমস্যা কাজের জায়গায় নিয়ে যাই, আবার কাজের সমস্যা পরিবারের মধ্যে নিয়ে আসি। পারিবারিক সমস্যা মাথায় নিয়ে কাজের জায়গায় গেলে কী হয়? মানসিক চাপ বেড়ে যায়, ফলে উৎপাদনে ঘাটতি পড়ে। অন্যদিকে কাজের সমস্যাও অন্যান্য সামাজিক সমস্যায় বিব্রত থাকলে জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও তার প্রভাব পড়ে। যে উপাদানগুলি মনোভাব নির্ধারিত করে (Factors that determinc out attitude) আমরা কি আমাদের মনোভাব নিয়ে জন্মাই, কিংবা জীবনে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলি? কী কী উপাদান আমাদের মানসিকতা গঠন করে?

পৃষ্ঠা:০৫

মনোভাবের গুরুত্ব:পারিপার্শ্বিক অবস্থার ফলেই কি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গঠিত হয় এবং সেই দৃষ্টিভঙ্গি কি পরিবর্তন করা যায়? জীবনের গঠনশীল বছরগুলিতেই আমাদের মানসিকতা নির্দিষ্ট আকার নিতে শুরু করে। প্রধানত তিনটি উপাদান আমাদের মনোভাব গঠন করতে সাহায্য করে। সে তিনটি হোল:

১. পরিবেশ

২. অভিজ্ঞতা

৩. শিক্ষা

প্রত্যেকটিকে পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা যাক।

১. পরিবেশ (Environment)

নিম্নলিখিত বিষয়গুলি নিয়ে পরিবেশ তৈরি হয়।

* পরিবার: ইতিবাচক ও নেতিবাচক দু’রকম প্রভাব সৃষ্টি করে।

* শিক্ষাক্ষেত্র: সহপাঠীদের প্রভাব। কর্মক্ষেত্র সহানুভূতিশীল ও সাহায্যকারী উপরওয়ালা, কিংবা অতিরিক্ত সমালোচনাকারী উপরওয়ালা।

* সংবাদমাধ্যম: টেলিভিশন, খবরের কাগঞ্জ, সাময়িকপত্র, বেতার, সিনেমা।

* সাংস্কৃতিক পশ্চাদপট ও পরিমণ্ডল।

* ধর্মীয় উত্তরাধিকার ও পরিমণ্ডল।

* পরস্পরা ও সংস্কার।

* সামাজিক পরিবেশ।

* সমসাময়িক রাজনৈতিক আবর্ত। এই সমস্ত মিলে একটি সাংস্কৃতিক বাতাবরণ সৃষ্টি করে। পরিবার, সংগঠন কিংবা স্বদেশ-প্রত্যেকটিরই একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক বাতাবরণ আছে। নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, কোনও কোনও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিক্রেতা তত্ত্বাবধায়ক, ম্যানেজার, মালিক সকলেই বেশ ভদ্র। আবার কোনও কোনও প্রতিষ্ঠানে দেখা যাবে প্রত্যেকেরই ব্যবহার বেশ ঝড় অভদ্রজনোচিত। একেকটি পরিবারে বাচ্চারা ও তাদের বাবা-মা ভদ্র, বিবেচক ও মার্জিত ব্যবহারে অভ্যন্ত: আবার অন্য পরিবারে একে অন্যের সঙ্গে বিশ্রীভাবে ঝগড়া করে। যে সব দেশে রাজনৈতিক বাতাবরণ পরিচ্ছন্ন এবং সরকার সৎভাবে পরিচালিত হয়, সে সমস্ত দেশে সাধারণত জনসাধারণও সৎ, অপরকে সাহায্য করতে উৎসুক এবং আইন মেনে চলতে অভ্যন্ত। এর উল্টোটাও ঠিক। অর্থাৎ যেখানে সরকার ভ্রষ্টাচারী সেখানে একজন সৎ ব্যক্তি। বিপদের সম্মুখীন হন। আবার যেখানে বাতাবরণ সৎ ও পরিচ্ছন্ন সেখানে একজন ভ্রষ্টাচারী অসুবিধার সম্মুখীন হন। যেখানে একটি ইতিবাচক কাজের আবহাওয়া আছে সেখানে একজন প্রান্তিক উৎপাদনকারী কর্মীরও উৎপাদন ক্ষমতা বেড়ে যায়, আবার নেতিবাচক বাতাবরণে একজন সুদক্ষ কর্মীরও উৎপাদন ক্ষমতা কমে যায়। যে কোন সংস্থার কর্মধারার আদর্শ উপর থেকে নীচে প্রবাহিত হয়, নীচে থেকে উপরে নয়। মাঝে মাঝে সংস্থার কর্মকর্তাদের পিছন ফিরে তাকিয়ে বিচার করার প্রয়োজন যে তারা সহকর্মীদের জন্য কী ধরনের কাজের আবহাওয়া সৃষ্টি করেছেন। একটি নেতিবাচক অবস্থার

পৃষ্ঠা:০৬

তুমিও জিতবে: মধ্যে ইতিবাচক কর্মোদ্যম সৃষ্টি করা দুঃসাধ্য। যেখানে আইন না মেনে চলাই নিয়ম হয়ে গেছে সেখানে সৎ নাগরিক যে ঠগ, জোস্কোর ও চোর হয়ে উঠবে, তাতে আর আশ্চর্য্য কী? যে বাতাবরণের মধ্যে আমরা বাস করি বা যা আমরা অন্যদের জন্য তৈরি করেছি তার ও মূল্যায়ন করার প্রয়োজনীয়তা আছে।

২. অভিজ্ঞতা (Experience) জীবনে নানা ঘটনার অভিঘাতে এবং নানা মানুষের সঙ্গে সংশ্রবের অভিজ্ঞতায় আমাদের ব্যবহারেও পরিবর্তন ঘটে। যদি কোনও ব্যক্তির সংস্পর্শে এসে আমাদের ইতিবাচক অভিজ্ঞতা হয় তবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও হবে ইতিবাচক, আবার অভিজ্ঞতা নেতিবাচক হলে দৃষ্টিতীঙ্গও হবে নেতিবাচক।

৩. শিক্ষা (Education) এখানে আমি প্রথানুযায়ী শিক্ষা এবং স্কুল-কলেজের বাইরে হাতে কলমে শিক্ষার কথা বলছি; কেবলমাত্র ডিগ্রির কথা নয়। জ্ঞানকে পরিকল্পনামাফিকও অভিজ্ঞতার নিরিখে প্রয়োগ করলে তা হয় বিজ্ঞতা। বিজ্ঞতা সাফল্য নিশ্চিত করে। আমি ব্যাপক অর্থে শিক্ষার কথা বলছি। এই শিক্ষায় শিক্ষকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। একজন প্রকৃত শিক্ষকের প্রভার চিরন্তন। বৃহৎ তরঙ্গ থেকে অজস্র ক্ষুদ্র তরঙ্গভঙ্গের মতো, তার প্রভাব সদাবিস্তৃত এবং বস্তুতপক্ষে অপরিমেয়। আমরা তথ্যের ভারে আকণ্ঠ নিমজ্জিত, কিন্তু জ্ঞান ও বিজ্ঞতার অভাবে তৃষ্ণার্ত। শিক্ষা কেবল জীবিকা অর্জনের পথ নির্দেশ করে না, কিভাবে জীবনযাপন করতে হয় তারও শিক্ষা দেয়। ইতিবাচক মনোভাবের মানুষ কিভাবে চেনা যাবে? (How do you recognize people with a positive attitude? একজন মানুষ অসুস্থ না হলেই যেমন তাকে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী বলা যাবে না, তেমনি নেতিবাচক মনোভাব না থাকলেও কাউকে ইতিবাচক মনোভাবসম্পন্ন বলে চিহ্নিত করা যাবে না। ইতিবাচক মনোভাবসম্পন্ন মানুষের কিছু বৈশিষ্ট্য সহজে নজরে পড়ে। তারা দয়ালু, আত্মবিশ্বাসী, ধৈর্যশীল এবং নিরহঙ্কার। তারা নিজেদের সম্পর্কে এবং অন্যের সম্পর্কেও উচ্চ আশা পোষণ করেন এবং সব কাজেই ইতিবাচক ফল প্রত্যাশা করেন। যাদের মনোভাব ইতিবাচক তারা বারমাসি ফলের মতো, সব সময়েই সুস্বাদু ও তাই তারা সবসময় স্বাগত। ইতিবাচক মনোভাবের সুবিধা (The benefits of a positive attitude) এই মনোভাবের সুফল অনেক এবং সহজে তা নজরেও পড়ে। অবশ্য যা সহজে নজরে পড়ে তা সহজে নজর এড়িয়েও যেতে পারে। যাইহোক কয়েকটি সুবিধা উল্লেখ করা যায়।

* উৎপাদনশীলতা বাড়ায়

* সঙ্ঘবদ্ধভাবে কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করে সমস্যার সমাধানে সাহায্য করে কাজের উৎকর্ষ বাড়ায় সৌহার্দ্যপূর্ণ আবহাওয়ায় সৃষ্টি করে আনুগত্যের মনোভাব তৈরি করে মুনাফা বাড়ায় কর্মচারী, মালিক ও ক্রেতাদের মধ্যে সম্পর্কের উন্নতি করে

* মানসিক চাপ কমায়

সমাজের সহায়ক সদস্য হতে সাহায্য করে

* একটি প্রসন্ন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ হিসেবে সমাজে পরিচিত হতে সাহায্য করে।

পৃষ্ঠা:০৭

নেতিবাচক মনোভাবের ফলাফল (The consequences of a negative attitude) জীবনে অনেক বাধাবিপত্তি অতিক্রম কল্পে এগিয়ে যেতে হয়, এবং অনেকসময় আমাদের নেতিবাচক মনোভাবই সবচেয়ে বড় বাধার সৃষ্টি করে। এই মনোভাবের ফলে বন্ধুত্ব ও চাকরি রক্ষা করা, কিংবা স্মমাজিক ও দাম্পত্য সম্পর্ক রক্ষা করাও কঠিন হয়ে ওঠে। এরূপ মনোভাবের ফলে,

*তিক্ততার সৃষ্টি হয়

* ক্ষোভের ও অসহিষ্ণুতার সৃষ্টি হয়

* জীবন উদ্দেশ্যহীন হয়ে পড়ে

* অসুস্থতার শিকার হতে হয়

* নিজের ও ঘনিষ্ঠদের উপর মানসিক চাপ বাড়ে, পরিবারের মধ্যে এবং কর্মস্থলে এমন একটি নেতিবাচক আবহাওয়া সৃষ্টি করে যা কারুর পক্ষে মঙ্গলদায়ক নয়। এরূপ মনোভাব ধীরে ধীরে শুধু ঘনিষ্ঠদের সংক্রামিত করে না, পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়। এরূপ দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে সচেতন হয়েও তা পরিবর্তন করা যায় না কেন? (When we become aware of our negative attitude, why don’t we change?) মানুষের স্বভাব পরিবর্তনের পরিপন্থী। পরিবর্তন অস্বস্তিকর। সদর্থক বা নঞর্থক-যেমনই ফলাফল হোক না কেন, পরিবর্তন সব সময়েই চাপ সৃষ্টি করে। কখনও কখনও নেতিবাচক মনোভাবের সঙ্গে এমন শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করি, যে পরিবর্তন ইতিবাচক হলেও আমরা তা গ্রহণ করতে চাই না। চালর্স ডিকেন্স এক বন্দীর কাহিনী লিখেছেন যে অনেকদিন মাটির নীচে অন্ধকার কুঠুরিতে কাটিয়েছে। তার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর যখন তাকে তার অন্ধকার কুঠুরি থেকে মুক্ত পৃথিবীর উজ্জ্বল আলোয় নিয়ে আসা হোল তখন সে অবাক হয়ে চারিদিকে তাকিয়ে দেখল। কয়েক মুহূর্তপরে সে তার নতুন-পাওয়া স্বাধীনতায় এমন অস্বস্তি বোধ করতে লাগল যে সে তার সেই অন্ধকার কুঠুরিতেই ফিরে যেতে চাইল। সেই কুঠুরি, শেকল, অন্ধকার এ সবের মধ্যেই সে নিশ্চিন্ত ও স্বস্তিবোধ করে, তাই স্বাধীনতা ও বিশাল পৃথিবীর কোনও আকর্ষণ তার কাছে ছিল না। ইতিবাচক মনোভাব গঠনের পদ্ধতি (Steps to bilding a positive attitude) বাল্যকালেই সারাজীবনের জন্য মানস-গঠন সম্পন্ন হয়ে যায়। সবচেয়ে ভালো হয় যদি সেই বছরগুলিতে ইতিবাচক মানসিকতা গড়ে ওঠে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে ঘটনাচক্রে যদি বাল্যকালে নেতিবাচক মনোভাব গড়ে ওঠে তবে তা সারাজীবন বহন করে চলতে হবে। এরূপ মনোভাবের পরিবর্তন করা যায়, কিন্তু তা খুব সহজসাধ্য নয়। কিভাবে ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলতে হয়?

* যে আদর্শগুলি ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলতে সাহায্য করে সে সম্পর্কে অবহিত হওয়া।

* ইতিবাচক মনোভাব অর্জন করার আকারকা।

* আদর্শগুলি সার্থকভাবে অনুসরণের জন্য শৃঙ্খলাবোধ ও নিষ্ঠার অনুশীলন প্রয়োজন। বয়স্ক ব্যক্তিরা নিজেরাই ইতিবাচক মনোভাব গঠন করতে পারেন। এ দায় নিজেদেরই নিতে হবে। অনেক সময় ব্যর্থতার জন্য আমরা অপরকে বা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ঘটনাকে দায়ী

পৃষ্ঠা:০৮

তুমিও জিতবে: করি। কিন্তু এরূপ না করে একটি বিশ্লেষণধর্মী ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা দরকার। প্রত্যেকদিন প্রাতঃকালে আমাদের মনোভাবটি তৈরি করে নেওয়া সম্ভব। বয়স্ক ব্যক্তি হিসাবে আমাদের কাজের ও ব্যবহারের দায়িত্ব আমাদেরই নেওয়া উচিত। নঞর্থক মনোভাবের ব্যক্তিরা তাদের ব্যর্থতার জন্য বিশ্বসুদ্ধ সবাইকে-তাদের মাতাপিতা, স্ত্রী, শিক্ষক, দেশের সরকার, অর্থনীতি-দোষারোপ করেন। মনকে অতীতের বন্ধন থেকে মুক্তি দিতে হবে। পুরোনো ধুলো ঝেড়ে ফেলে জীবনের মূলধারায় প্রত্যাবর্তন দরকার। সব স্বপ্নকে সংহত করে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যেতে হবে। যেগুলি সৎ, সত্য এবং মহৎ, সেই সমস্ত ইতিবাচক বিষয়গুলি সম্পর্কে চিন্তা করতে করতেই মনের ইতিবাচক দিকটি সমৃদ্ধ হবে। যদি আমরা এই ধরনের মানসিকতা গঠন করতে চাই এবং তা স্থায়ী করতে চাই তবে সচেতনভাবে নিম্নলিখিত পদ্ধতিগুলি অনুশীলন করা দরকারঃ প্রথম পদ্ধতি: লক্ষ্যের কেন্দ্রবিন্দু পরিবর্তন করে ইতিবাচক গুণের খোঁজ কর ( Change focus, look for the positive) জীবনের সমস্ত ইতিবাচক বিষয়ের প্রতিই নজর দেওয়া দরকার। কোনও ব্যক্তির জীবন কিংবা কোনও বিশেষ অবস্থায় যে উপাদান ও গুণগুলি কল্যানকর সেগুলির প্রতিই নজর দেওয়া উচিত। নেতিবাচক মানসিকতা কেবলমাত্র ত্রুটিগুলি দেখতেই অভ্যস্ত হয়ে যায়, ফলে দোষগুলিই দেখা হয়, কল্যানকর দিকটি নজরে আসে না। দোষ দেখাই যাদের স্বভাব তারা স্বর্গেরও ত্রুটি বার করতে পারেন। বেশিরভাগ মানুষই যা দেখতে ইচ্ছা করেন তাই বড় করে দেখেন। যদি তারা মানুষের মধ্যে বন্ধুত্ব, আনন্দ এবং অন্যান্য ইতিবাচক গুণাবলীর খোঁজ করেন তবে তাই পাবেন; আর যদি তাদের মধ্যে বিসম্বাদ বা ঔদাসীন্য দেখতে চান তবে তাও পাবেন। মানুষের মধ্যে ভালোমন্দ দুই-ই আছে। তাই স্মরণ রাখা দরকার যে ইতিবাচক গুণগুলির খোঁজ করা বা প্রাধান্য দেওয়ার অর্থ এই নয় যে ত্রুটিগুলিকে অগ্রাহ্য করা। সোনার খোঁজে (Looking for the gold) অ্যান্ড্রু কার্নেগী নামে একজন স্কট বাল্যবয়সে আমেরিকায় এসে নানা ধরনের খুচরো কাজ করতে শুরু করেন। তিনি জীবন শেষ করেন আমেরিকার একজন বৃহত্তম ইস্পাত প্রস্তুতকারী হিসেবে। একসময়ে ৪৩ জন ক্রোড়পতি তার সংস্থায় কাজ করতেন। কয়েক দশক আগে এক কোটি ডলার বিপুল ঐশ্বর্য হিসেবে বিবেচিত হোত, আজও তা কিছু কম ঐশ্বর্য নয়। জনৈক ব্যক্তি একদিন কার্নেগীকে জিজ্ঞেস করলেন তিনি কিভাবে মানুষের সঙ্গে ব্যবহার করেন। অ্যান্ড্রু কানেগী জবাব দিলেন, “মানুষ নিয়ে কারবার করা যেন সোনার জন্য মাটি খোঁড়ার মত। এক আউন্স সোনার জন্য টনের পর টন মাটি কাটতে ও সরাতে হয়। কিন্তু সোনাই খোঁজা হয়, মাটি নয়।” আসল কথা, আমাদের নজর কোনটার উপর। নজরটা সোনার উপর থাকুক মাটির উপর নয়। মানুষের মধ্যেও যদি দোষত্রুটি খোঁজা হয়, তবে মাটির মতো, তা অনেক পাওয়া যাবে। প্রশ্ন হচ্ছে আপনি কী খুঁজছেন? অ্যান্ড্রু কানেগীর জবাবের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। সব অবস্থাতেই প্রত্যেক মানুষের মধ্যে কিন্তু ইতিবাচক দিক আছে। অনেক সময় হয়ত গভীর অনুসন্ধান করে ইতিবাচক গুণাবলীর সন্ধান করতে হয়, কারণ তা সহজে নজরে আসে না। তাছাড়া, আমরা অন্য মানুষের ত্রুটি দেখতে এত অভান্ত যে ভালো দিকটি সাধারণত আমাদের নজরে আসে না। সব মানুষেরই কিছু ইতিবাচক দিক আছে-এই কথার দৃষ্টান্ত হিসাবে একজন বলেছিলেন যে একটা বন্ধ হয়ে যাওয়া ঘড়িও দিনে দু’বার সঠিক সময়

পৃষ্ঠা:০৯

মনোভাবের গুরুত্ব: দেখিয়ে থাকে। স্মরণ রাখা প্রয়োজন, যখন আপনি সোনার খোঁজ করেন তখন এক আউন্স সোনার জন্য আপনাকে টন টন মাটি সরাতে হয়; কিন্তু আপনি খোঁজেন সোনাই, মাটি নয়। নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ সব সময়েই সমালোচনা করবে কিছু লোক আছেন যারা পক্ষ-বিপক্ষ বিচার না করে সব সময়েই সমালোচনা করেন। সমালোচনাই তাদের জীবিকা। সমালোচনা তাদের জীবন। তারা প্রায় বিজয়ীর লক্ষ্য ও একাগ্রতা নিয়ে সমালোচনা করেন। প্রতিটি মানুষের মধ্যে, প্রত্যেক অবস্থায় তারা কিছু ত্রুটি খুঁজে বার করবেনই, এবং বিশ্বসুদ্ধ সবাইকে ত্রুটির জন্য দোষারোপ করবেন। এই ধরনের মানুষকে বলা যায় শক্তিশোষক-তারা সমস্ত শক্তি শোষণ করে নেন। এরা কাফেটোরিয়াতে গিয়ে ক্লান্তি অপসারণের নামে বিশ কাপ চা-কফি গলাধঃকরণ করেন, মনের সুখে ধূমপান করেন এবং অজস্র নিন্দামন্দ করেন। তারা শুধু নিজেদের মধ্যেই নয়, আশেপাশে যারা থাকেন সবার মধ্যেই একটা চাপা উত্তেজনার সৃষ্টি করেন। প্রকৃতপক্ষে, ছোঁয়াচে রোগের ন্যায় তারা একটি নঞর্থক বাণী বহন করেন এবং এমন একটি পরিবেশের সৃষ্টি করেন যেখানে কেবল নেতিবাচক ফলই পাওয়া যায়। রবার্ট ফুলটন (Robert Fulton) বাষ্পীয় পোত আবিষ্কার করেছিলেন। হাডসন নদীতে যখন তিনি তার নতুন আবিষ্কার প্রদর্শনের আয়োজন করছিলেন তখন কিছু নিরাশাবাদী ও সংশয়ী ব্যক্তি জড়ো হয়ে বলাবলি করছিল যে জাহাজ কখনও চলবে না। দেখা গেল জাহাজ চলছে এবং সেটি নদী দিয়ে এগিয়ে গেল। তখন যারা জাহাজ চলবে না বলে মন্তব্য করেছিল তারা চিৎকার করে বলতে লাগল, জাহাজ কখনও থামবে না। সবকিছুর নেতিবাচক দিক দেখার কী আশ্চর্য মানসিকতা। কিছু লোক সব সময় নেতিবাচক দিকটিই দেখে (Some people always look for the negative) এক শিকারীর শিকার-করা পাখী খুঁজে নিয়ে আসার জন্য একটি শিক্ষিত কুকুর ছিল। কুকুরটি জলের উপর দিয়ে হাঁটতে পারত। শিকারী যখন কুকুরটির এই অলৌকিক ক্ষমতার পরিচয় পেল তখন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। বন্ধুদের নিকট কুকুরের এই আশ্চর্যজনক ক্ষমতা দেখাবার অভিপ্রায়ে সে একদিন তার বন্ধুকে হাঁস শিকারের আমন্ত্রণ জানাল। কয়েকটি হাঁস মারার পর সে কুকুরটিকে নির্দেশ দিল হাঁসগুলি জল থেকে তুলে আনতে। কুকুরটি জলের উপর দিয়ে দৌড়ে মৃত হাঁসগুলি নিয়ে এল। সারাদিন ধরে বেশ কয়েকবারই কুকুরটিকে জলের উপর দিয়ে দৌড়াতে হোল। শিকারী তার কুকুরের এই আশ্চর্য ক্ষমতার জন্য বন্ধুর কাছে কিছু মন্তব্য আশা করেছিল; কিন্তু বন্ধু ছিল চুপচাপ। শিকারী বাড়ি ফেরার পথে বন্ধুকে জিজ্ঞেস করল, “কুকুরটির কোনও অসাধারণত্ব লক্ষ্য করেছ কি?” বন্ধ জবাব দিল, “হ্যাঁ তোমার কুকুরটি সাঁতার জানে না।” কোনও কোনও ব্যক্তি সব সময়েই নঞর্থক দিকটিই দেখে। হতাশবাদী কাকে বলে?

* যারা নিজেদের হতাশার কথা বলতে না পারলে অসুখী হন।

যারা নিজের প্রকৃত অবস্থা ভালো হলেও খারাপ বলে ভাবতে অভ্যস্থ।

* যারা জীবনের অনেকটা সময়ই অভিযোগ করে কাটিয়ে দেন।

* যারা আলো নিভিয়ে দিয়ে পরীক্ষা করেন, অন্ধকার কতটা গভীর।

* যারা জীবনের আয়নায় সর্বদাই চিড়ের অনুসন্ধান করেন।

পৃষ্ঠা:১০

তুমিও জিতবে:যারা, বিছানাতে বেশিরভাগ মানুষের মৃত্যু হয়েছে শোনার পর, বিছানায় ঘুমোনো বন্ধকরে দিয়েছেন।

* যারা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার ভয়ে স্বাস্থ্যের আনন্দ উপভোগ করতে পারেন না।

  • যারা সব সময়েই খারাপ অবস্থার আশঙ্কা করেন এবং সমস্ত ঘটনাকেই গুরুতর খারাপ করে তোলেন।

* যারা রসগোল্লার ছিদ্রগুলিই দেখেন অন্য কিছু দেখেন না।

* যারা মনে করেন সূর্য কেবল ছায়ার সৃষ্টি করে।

* যারা শুধুমাত্র দুঃখের হিসেব করেন, সুখের কথা ভুলে যান।

* যারা জানেন যে কঠিন শ্রম কারুর কোনও ক্ষতি করে না, কিন্তু বিশ্বাস করেন। কোনও ঝুঁকি নেওয়া ঠিক নয়।” আশাবাদী কে? কয়েকটি কথায় আশাবাদীর পরিচয় দেওয়া যেতে পারে। মানসিক দিক থেকে এতদূর হবেন যে মনের শান্তি কোনওভাবেই বিঘ্নিত হবে না। প্রত্যেকের স্বাস্থ্য, সুখ ও সমৃদ্ধির কথা বলবেন। কথাবার্তায় বন্ধুদের মনে এই বিশ্বাস জন্মাবেন যে তাদের প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু শক্তি আছে। প্রত্যেক বিষয়ের উজ্জ্বল দিকটাই দেখার চেষ্টা করবেন। কেবল শ্রেষ্ঠদের বিষয়ে চিন্তা করবেন, শ্রেষ্ঠ সংস্থার জন্য কাজ করবেন এবং সবচেয়ে ভালো ফল প্রত্যাশা করবেন। নিজের সাফল্যে যেমন উৎসাহ পান, অপরের সাফল্যেও তেমনি উৎসাহ দেখাবেন। অতীতের বিচ্যুতি ভুলে গিয়ে ভবিষ্যতে সাফল্যের চেষ্টা করবেন। প্রত্যেকের জন্য থাকবে স্মিতহাসি। নিজেকে উন্নত করার জন্য এত সময় ব্যয় করবেন, যেন অপরের সমালোচনা করার জন্য সময় অবশিষ্ট না থাকে। এত বড় হবেন যেন উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা কাবু করতে না পারে, এত মহান হবেন যেন ক্রোধ না বশীভূত করতে পারে। দ্বিতীয় পদ্ধতি: কাজ এখনই শেষ করার অভ্যাস আয়ত্ত করুন (Make a habit of doing it now) জীবনে কোনও না কোনও সময়ে আমরা দীর্ঘসূত্রতার শিকার হয়েছি। এর ফলে পস্তাতে হয়েছে। দীর্ঘসূত্রতা নেতিবাচক মনোভাবের জন্ম দেয়। প্রকৃতপক্ষে পরিশ্রম করে কাজটি শেষ করতে যত না ক্লান্তি আসে, দীর্ঘসূত্রতার অভ্যাস তার থেকে বেশি ক্লান্ত করে। একটি সুনিষ্পন্ন কাজ মনকে দেয় সম্পূর্ণতার তৃপ্তি এবং কর্মোদ্যম; আর অসমাপ্ত কাজ একটি ছিদ্রযুক্ত জলাধারের মতো-সমস্ত কর্মশক্তিকে নিঃশেষিত করে দেয়। একটি ইতিবাচক মানসিকতা গঠন করতে ও বজায় রাখতে বর্তমানের মধ্যে বাঁচার এবং হাতের কাজগুলি এখনই করার অভ্যাস করতে হবে।

           চাঁদের আলোয় মধুর আলস্যে সে দিয়েছে নিদ্রা,

             সূর্যের উত্তাপ সে উপভোগ করেছে সমস্ত দেহ দিয়ে,

        কিছু কাজ করতে হবে-এই ভেবে ভেবে সে বেঁচেছে সারাজীবন,

          মৃত্যু যখন এসে দরজায় দাঁড়াল, তখনও কিছুই করা হয়ে ওঠেনি।

                                 -জেমস এ্যালবেরী

পৃষ্ঠা:১১

মনোভাবের গুরুত্ব যখন আমি বড় হব: ছোট ছেলেটি বাল্যকালে ভাবে যে বড় হলে আমি এইভাবে কাজ করব এবং সুখী হব। যখন বড় হল, তখন ভাবল, কলেজের পাঠ শেষ করে এই এই কাজ করব এবং সুখী হব। কলেজের পাঠ শেষ করে ভাবল এইবার একটা চাকরি পাই, তারপর বেশ কিছু কাজ করব। চাকরি যখন পেল তখন ভাবল এইবার বিয়ে করি, তারপর অন্য ভালো কাজে হাত দেব। কিন্তু বিয়ের পরও যখন কিছু করতে পারল না, তখন ভাবল বাচ্চাদের লেখাপড়া শেখা শেষ হোক, তারপর দেখা যাবে। শেষ পর্যন্ত অবসর নেওয়ার পর দেখল জীবন কখন তার চোখের সামনে দিয়ে বয়ে চলে গেছে। কাজ সে কিছুই করতে পারেনি। খুব বড় বড় কথা বলে অনেকে দীর্ঘসূত্রতাকে আড়াল করার চেষ্টা করেন। কাজ শেষ না হওয়ার অজুহাত হিসাবে বলেন, “আমি বিশ্লেষণ করে দেখছি।” ছয়মাস পরেও দেখা যায় সেই বিশ্লেষণ চলছে, তখনও শেষ হয়নি। এটা এক ধরনের রোগ, যাকে বলা যায়” বিশ্লেষণের পক্ষাঘাত।” এরা কখনই কাজে সফল হবেন না। আর একদল আছেন যারা বলেন, ‘আমি তৈরি হচ্ছি।’ ছয়মাস পরেও সেই একই উত্তর তৈরি হচ্ছি।’ এদের রোগকে বলা যায় অজুহাতম্বর। সব সময়েই কাজ না করার অজুহাত দেখিয়ে কাজ এড়িয়ে যান। জীবনটা অভিনয়ের আগে’ ড্রেস রিহার্সেল’ নয়। যে জীবন দর্শনেই বিশ্বাস থাকুক না কেন, জীবনের খেলায় আমাদের হাতে মাত্র একটি গুলি আছে। এই খেলার বাজি অনেক বেশি-বাজি হচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। কোথায় এবং কখন, এই প্রশ্নের উত্তরে বলা যায় এখানেই এবং এখনই। বর্তমান সময়কে সম্পূর্ণরূপে ব্যবহার করা প্রয়োজন। এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনার প্রয়োজন নেই। সে প্রয়োজন অবশ্যই আছে। যদি বর্তমানকে যথাযথভাবে কাজে লাগান যায়, তবে, স্বাভাবিকভাবে, তাই হবে ভবিষ্যতের জন্য বীজ বপন করা। তৃতীয় পদ্ধতি: কৃতজ্ঞ হওয়ার মানসিকতা তৈরি হওয়া দরকার (Develop an attitude of gratitude) জীবনে যা প্রসাদ লাভ করেছেন তারই হিসেব করুন, কেবল দুঃখ কষ্টের নয়। সময়মত গোলাপের সুবাস গ্রহণ করুন। কেউ কেউ দুর্ঘটনায় বা অসুখে অন্ধ হয়ে গেলে দশ লক্ষ ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। কিন্তু কোনও সুস্থ মানুষ কি দশ লক্ষ ডলার পাওয়ার লোভে অন্ধ হতে চাইবেন? অনেকেই চাইবেন না। আমাদের যা নেই তা নিয়ে আমাদের অভিযোগ এঞ্জে সোচ্চার যে আমাদের যা আছে তার দিকে নজর দিতে পারি না। বস্তুতপক্ষে, আমরা যা পেয়েছি তার জন্যই আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। দুঃখকষ্ট নয়, সুখের হিসেব কর-এই মন্তব্যের অর্থ এই নয় যে যা পেয়েছি তাতেই সন্তুষ্ট হয়ে নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকা উচিত। এই অর্থ করলে বুঝতে হবে যে আমি আমার বক্তব্য ঠিক বোঝাতে পারিনি, কিংবা আমার বক্তব্য অংশত গ্রহণ করা হয়েছে। কিভাবে আপন আপন মানসিকতা অনুযায়ী বক্তব্যকে গ্রহণ করা হয় তার একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। একজন ডাক্তারকে অতিথি বক্তা হিসাবে একদল সুরাসক্ত মানুষের সভায় বক্তৃতা দিতে আহান করা হয়েছিল। সুরাসক্তি মানুষের স্বাস্থ্যের পক্ষে কতখানি ক্ষতিকর তা প্রমাণ করার জন্য তিনি একটি জোরালো পরীক্ষা করে বক্তব্যটি সকলকে

পৃষ্ঠা:১২

তুমিও জিতবে:বোঝাতে চেয়েছিলেন। দুটি পাত্রের একটিতে জল, অপরটিতে নির্ভেজাল মদ নিয়ে প্রথমে জলের পাত্রে একটি কেঁচো ছেড়ে দিলেন। কেঁচোটি বেশ নড়ে চড়ে বেড়াতে লাগল। তারপর সেটি তুলে নিয়ে নির্ভেজাল মদের পাত্রে রাখলেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কেঁচোটি টুকরো টুকরো হয়ে পাত্রের মদের সঙ্গে মিশে গেল। তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন মদ আমাদের শরীরের কতটা ক্ষতি করে। তিনি শ্রোতাদের জিজ্ঞেস করলেন এই পরীক্ষার দ্বারা কী প্রমাণ হোল। পেছন থেকে সুরাসক্তদের একজন বললেন, “মদ খেলে পাকস্থলীতে কেঁচো হবে না।” অবশ্যই এটি ডাক্তারের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল না। কিন্তু শ্রোতাদের মধ্যে কেউ কেউ তাদের নিজের নিজের মানসিক প্রবণতা অনুযায়ী অর্থ করে নিয়েছেন। এইভাবে অনেকে পূর্বনির্ধারিত চিন্তার প্রভাবে প্রকৃত বক্তব্যকে গ্রহণ করতে পারেন না। জীবনে অনেক প্রাপ্তি লুকানো সম্পদের মতো-তাদের প্রকৃত মূল্য আমরা জানি না। এইগুলিকেই বড় করে দেখা উচিত, দুঃখ কষ্টকে নয়। চতুর্থ পদ্ধতি: ক্রমাগত শিক্ষাগ্রহণের মানোভাব তৈরি হোক (Get into a continuous education program) শিক্ষা সম্পর্কে একটি ভুল ধারণার নিরসন দরকার। অনেকে মনে করেন আমরা স্কুল- কলেজে শিক্ষালাভ করে শিক্ষিত হই। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সেমিনারে যোগ দিতে গিয়ে আমি শ্রোতাদের প্রায়ই জিজ্ঞাসা করি, আপনারা কি স্কুল-কলেজে প্রকৃত শিক্ষা লাভ করেছেন?” এ বিষয়ে সবাই একমত যে কেউ কেউ প্রকৃত শিক্ষালাভ করলেও, বেশিরভাগই সে শিক্ষা পায়নি। স্কুল-কলেজে তথ্যপূর্ণ অনেক শিক্ষা পাই; কিন্তু শিক্ষার অনেকটাই বাকি থাকে। শিক্ষায় তথ্য, ঘটনাবলী ইত্যাদি জানার খুবই প্রয়োজন; কিন্তু তাতেই শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় না। আমাদের শিক্ষার সত্য অর্থ জানা দরকার। বুদ্ধিগত শিক্ষা আমাদের মস্তিষ্ককে উর্বর করে, এবং মূল্যবোধের শিক্ষা আমাদের হৃদয়বৃত্তিকে সমৃদ্ধ করে। বস্তুতপক্ষে যে শিক্ষা আমাদের হৃদয়কে সুশিক্ষিত করে না, সে শিক্ষা বিফল। আমাদের পরিবার, সমাজ ও কর্মস্থলের উপযোগী চরিত্র গঠনের জন্য নীতিবোধ ও নীতিশিক্ষার প্রয়োজন। যে শিক্ষা চরিত্রের সততা, সহমর্মিতা, সাহস, একাগ্রতা ও দায়িত্ববোধের মতো মৌলিক গুণাবলী গঠর করে সেই শিক্ষারই একান্ত প্রয়োজন। আমরা কেবল ডিগ্রির মানদন্ডে মাপা শিক্ষা চাই না- আমরা চাই মূল্যবোধের শিক্ষা। জোরের সঙ্গে বলা যায়, যে ব্যক্তি নীতিবোধের শিক্ষায় শিক্ষিত, তার খুভ উচ্চ ডিগ্রিধারী অথচ নীতিবোধ বর্জিত বাক্তির থেকে জীবনে উন্নতি করার সম্ভাবনা অনেক বেশি। চরিত্র গঠন এবং নীতি ও মূল্যবোধের শিক্ষা যে সময় বাচ্চারা বড় হয়ে ওঠে সেই সময়েই দেওয়া ভালো, কারণ তখন বাচ্চাদের মনে কোনও পূর্বনিদিষ্ট ধারণা থাকে না।

মূল্যবোধহীন শিক্ষা: প্রকৃত শিক্ষায় বুদ্ধিবৃত্তি ও হৃদয়বৃত্তি দুইই সমৃদ্ধ হয়। একজন অশিক্ষিত চোর মালগাড়ি থেকে চুরি করে, কিন্তু একজন শিক্ষিত চোর পুরো রেলপথটাই চুরি করে নিতে পারে। জন হপকিন্স বিশ্বাবিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্টী স্টিভেন মুলার বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলি অতীব দক্ষ বর্বর তৈরি করছে, কারণ আমরা তরুণদের কোনও মূল্যবোধের শিক্ষা দিচ্ছি না, যদিও তারা ক্রমাগত সেই মূল্যবোধের অনুসন্ধান করে চলেছে।” ‘গ্রেড’ পাওয়ার জন্য নয়, আমাদের প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত জ্ঞানও বৈদগ্ধ লাভের

পৃষ্ঠা:১৩

মনোভাবের গুরুত্ব জন্য। জ্ঞানী তথ্য আহরণ করে আর বিদগ্ধ ব্যক্তি যে তথ্যগুলিকে সরলীকরণ করে তার থেকে প্রজা লাভ করে। বিশেষ কিছু হৃদয়ঙ্গম না করেও একজন ভালো ‘গ্রেড’ বা ভালো ‘ডিগ্রি’ পেতে পারেন। কিভাবে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হয় সে বিষয়ে অবহিত হওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক বিষয় স্মরণ রাখার ক্ষমতাকেই শিক্ষা বলে না। নীতিবোধ ছাড়া শিক্ষা সমাজের কাছে ক্ষতিকারক হয়ে ওঠে। শিক্ষা সবসময় শুভ বিচার-বুদ্ধিকে জাগ্রত করে না (Education does not mean good judgement) একজন ব্যক্তি রাস্তার ধারে সত্তার খাবার হউগ বিক্রি করত। সে ছিল অশিক্ষিত, তাই খবরের কাগজ পড়ত না; কানে কম শুনত, তাই রেডিও শুনত না; চোখের দৃষ্টি কমজোর, তাই টেলিভিশন দেখত না। কিন্তু উৎসাহের সঙ্গে হটডগ বিক্রি করে বিক্রি ও লাভ অনেক বাড়িয়ে ফেলেছিল। ব্যবসা বেড়ে যাওয়ায় তার কলেজ থেকে পাশকরা গ্র্যাজুয়েট ছেলে তার সঙ্গে যোগ দিল। তারপরই সেই আশ্চর্য ঘটনা ঘটল’ বাবা, তুমি কি জান দেশে এখন অর্থনৈতিক মন্দা চলছে, যার ফলে আমাদের ব্যবসাও মার খাবে? বাবা বলল,” আমি তো জানি না, ব্যাপারটা কি বলতো।”ছেলে বলল,” আন্তর্জাতিক অবস্থা গুরুতর; অভ্যন্তরীণ অবস্থা আরও খারাপ। আগামী দিনের খারাপ সময়ের জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। লোকটি ভাবল, ছেলে কলেজে পড়েছে, খবরের কাগজ পড়ে, রেডিও শোনে; সুতরাং তার এই সমস্ত বিষয় জানার কথা। তার উপদেশ অগ্রাহ্য করা ঠিক হবে না।’ এই ভেবে সে পরের দিন থেকে রুটি- মাংসের অর্ডার কমিয়ে দিল। দোকানের বোর্ড খুলে নিল। ব্যবসায়ে তার আগ্রহ গেল কমে। সঙ্গে সঙ্গে খন্দেরদের মধ্যেও তার চট্টজনের চাহিদা কমে গেল। বাবা তখন ছেলেকে বলল,’ ভূমি ঠিকই বলেছিলে, আমদ। ৩০২ যনৈতিক মন্দার মধ্যে পড়েছি। তুমি যথাসময়ে আমাকে সাবধান করে দিয়েছিলে বলে অনি খুশি।”

এই গল্পের নৈতিক উপদেশটি কী?

১. অনেক সময় আমরা মেধা এবং সুবিবেচনার মধ্যে ভেদাভেদ নির্ধারণ করতে পারি না।

২. কেউ কেউ খুব মেধাবী, কিন্তু বিচার-বিবেচনা করার ক্ষমতার অভাব দেখা যায়।

৩. যত্নের সঙ্গে উপদেষ্টা নির্বাচন করা উচিত, নিজের বিচার বুদ্ধি সবক্ষেত্রেই ব্যবহার করা উচিত।

৪. প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াও মানুষ সফল হতে পারে যদি তার মধ্যে নিম্নলিখিত গুণাবলী থাকে-

চরিত্র

* দায়বদ্ধতা

“দৃঢ়বিশ্বাস

* সৌজন্যবোধ

* সাহস

৫. দুর্ভাগ্যের কথা, অনেকে জ্ঞানের দিক থেকে চলন্ত বিশ্বকোষ, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে চূড়ান্ত ব্যর্থ। মেধা হচ্ছে দ্রুত শেখার ক্ষমতা, শিক্ষাকে দ্রুত কাজে লাগানোর দক্ষতাকে বলে

পৃষ্ঠা:১৪

তুমিও জিতবে: সক্ষমতা। যে বিষয়ে শিক্ষা নেওয়া হয়েছে তাকে কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ করার আকাঙ্ক্ষা ও ক্ষমতা যদি থাকে, তবে তাকেই বলে যোগ্যতা। আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে এমন একটি মানসিক অবস্থা যার সাহায্যে দক্ষ মানুষ যোগ্য মানুষ হয়ে ওঠে। উইনস্টন চার্চিল বলেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম কর্তব্য হচ্ছে ছাত্রদের জ্ঞানার্জনে সহায়তা করা, ব্যবসা-বাণিজ্য শিক্ষা দেওয়া নয়; চরিত্র গঠনে উৎসাহ দেওয়া কলাকৌশলগত শিক্ষায় নয়।” শিক্ষিত তাহলে কাদের আমরা শিক্ষিত বলব?প্রথমত, যারা জীবনে একের পর এক যে সমস্ত অবস্থায় সম্মুখীন হন, সেই সমস্ত অবস্থায় সম্যকভাবে মোকাবিলা করতে পারেন এবং যারা সমস্যাপূর্ণ মুহূর্তগুলিকে যথার্থরূপে বিচার করে সঠিক কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে পারেন। তারপর, যারা বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে সম্মানজনক ব্যবহার করেন, অপরের ব্যবহার অপ্রিয় বা অপমানজনক হলেও তাদের সঙ্গে সহজভাবে ব্যবহার করেন, যারা সহকর্মীদের সঙ্গে সবসময়েই সাধ্যমত ন্যায়সঙ্গত ব্যবহার করেন। তাছাড়াও যারা নিজেদের আনন্দ-উল্লাসকে সব সময়েই নিয়ন্ত্রণে রাখেন এবং কখনও কখনও দুর্ভাগ্যের শিকার হলেও অশোভন ভাবে বিচলিত না হয়ে সেই দুর্ভাগ্যকে মানুষের স্বভাবের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে গ্রহণ করেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হোল যারা সাফল্যের আনন্দে পথভ্রষ্ট হয়ে মানুষের নিজস্ব সত্তাকে বিনষ্ট করেননি, বরং বিজ্ঞ ও স্থিতধী ব্যক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থানে দৃঢ় থাকেন, যারা সহজাত বুদ্ধি ও স্বভাব নিয়ে যেমন উচ্ছ্বসিত হন না, তেমনি দৈবক্রমে যে সাফল্যের অধিকারী হয়েছে সে সম্পর্কে আনন্দে উচ্ছল হন না। যাদের চরিত্র উল্লিখিত গুণাবলীর যে কোনও একটির সঙ্গে নয়, সবগুলির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ তাদেরই শিক্ষিত বলা যায়। তিনি বস্তুতপক্ষ সর্বগুণান্বিত। সক্রেটিস (৪৭০-৩৯৯খ্রী পূঃ)সংক্ষেপে বলা যায়, শিক্ষিত ব্যক্তিরা যে কোনও কঠিন অবস্থায় বিজ্ঞতা ও সাহসের সঙ্গে সঠিক পথ নির্ধারণ করে নিতে পারেন। যদি কেউ প্রজ্ঞা ও মৃঢ়তার মধ্যে, ভালো ও মন্দের মধ্যে, শালীনতা ও অশালীনতার মধ্যে পার্থক্য করতে পারেন, তাহলে তার প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি থাকুক বা না থাকুক তাকে শিক্ষিত ব্যক্তি বলা যায়। সঠিক প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হলে কেউ যদি সমস্ত প্রশ্নের উত্তর জানেন তবে তাকে বিশেষজ্ঞ বলা যায়।বহুমুখী শিক্ষা কি?বনের কতিপয় জন্তু একটি স্কুল খুলতে মনস্থ করল। স্কুলে ছাত্র হিসাবে এল একটি পাখি, একটি কাঠবেড়ালি, একটি কুকুর একটি খরগোস এবং একটি মানসিক প্রতিবন্ধী বানমাছ। স্কুলের পরিচালকবর্গ ঠিক করল যে স্কুলের শিক্ষাসূচী হবে বহুমুখী, এবং সব ছাত্রকেই সব বিষয় নিতে হবে। শিক্ষাসূচীর মধ্যে ছিল আকাশে ওড়া, গাছে চড়া, সাঁতার কাটা মাটি খোঁড়া ইত্যাদি। সব ছাত্রকেই সব বিষয় নিতে হবে। পাখি ভালো উড়তে পারে বলে ওড়াতে সে প্রথম; কিন্তু মাটি খুঁড়তে গিয়ে তার ঠোঁট গেল ভেঙ্গে, ডানা গেল মুচড়ে। ফলে ওড়াতেও তার দক্ষতা কমে গেল। সব মিলিয়ে সে

পৃষ্ঠা:১৫

মনোভাবের গুরুত্ব: পেল তৃতীয় শ্রেণী। কাঠবেড়ালি গাছে চড়াতে সব সময়েই প্রথম, কিন্তু সাঁতারে ফেল। কুকুর স্কুলে ভর্তি হলো না, স্কুলের জন্য চাঁদাও দিল না। উল্টে “ঘেউ ঘেউ করা” কে পাঠ্যতালিকায় স্থান দেওয়ার দাবিতে পরিচালক মণ্ডলীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করল। মাটি খোঁড়াতে খরগোস প্রথম, কিন্তু গাছে চড়া তার কাছে সমস্যা। কয়েকবার চড়ার চেষ্টা করতে গিয়ে গাছ থেকে পড়ে মস্তিতে আঘাত পাওয়ার ফলে সে মাটি খোঁড়াও ভালো করে করতে পারছিল না। ফলে সব মিলে সে পেল তৃতীয় শ্রেণী। এদিকে মানসিক প্রতিবন্ধী বানমাছ সব বিষয়েই মাঝারি। ফলে সব বিষয় মিলিয়ে সেই হোল প্রথম। পরিচালক মণ্ডলী খুশি কারণ একটি বহুমুখী শিক্ষাব্যবস্থায় প্রত্যেক ছাত্র ব্যাপকবিষয়ভিত্তিক শিক্ষা পেয়েছে। কিন্তু বহুমুখী শিক্ষার প্রকৃত অর্থ হোল ছাত্রদের যে যে বিষয়ে দক্ষতা আছে এবং স্বাভাবিকভাবে শিক্ষা গ্রহণ করার প্রবণতা আছে তাকে ক্ষুন্ন না করে সেই বিষয়ের দক্ষতাকে আরও উন্নত করে জীবন সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করা। আমাদের সকলেরই কোনও না কোনও বিষয়ে দক্ষতা আছেহামিংবার্ড খুব ছোট পাখী, এক আউন্সের দশভাগের একভাগ মাত্র ওজন। কিন্তু দেহ এত নমনীয় যে সে খুব জটিল ভাবে প্রতি সেকেন্ডে ৭৫ বার পাখা সঞ্চালন করতে পারে। ফলে হামিংবার্ড ফুলের উপর উড়ে উড়ে মধু পান করতে পারে কিন্তু সোজা আকাশে উড়তে, বাতাসে ভেসে বেড়াতে কিংবা লাফিয়ে লাফিয়ে মাটির উপর বেড়াতে পারে না। ৩০০ পাউন্ড ওজনের উটপাখি পাখিদের মধ্যে বৃহত্তম; কিন্তু উড়তে পারে না। কিন্তু এদের পা এত শক্ত যে ঘন্টায় ৫০ মাইল বেগে দৌড়াতে পারে; এক পদক্ষেপে ১২ থেকে ১৫ ফুট যায়।অজ্ঞতা জ্ঞানের প্রতি মোহ থাকলেই তাকে শিক্ষিত বলা যায় না, বরং বলা যায় সে অজ্ঞ। মুঢ় লোকেদের এক বিশেষ ধরনের আত্মবিশ্বাস থাকে যা অজ্ঞতা থেকে জন্ম নেয়। বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন এই প্রসঙ্গে বলেছিলেন, “কোনও কোনও বিষয়ে অজ্ঞ হওয়ার মধ্যে কোনও লজ্জা নেই, কিন্তু কোনও করণীয় কাজের সঠিক পদ্ধতিটি আয়ত্ত করার অনিচ্ছা প্রকৃতই লজ্জাকর।” কোনও বিষয়ে না জানা দোষের নয়, কিন্তু এই অজ্ঞতাকে সম্বল করে জীবনে উন্নতি করার ইচ্ছাই মূঢ়তা। কিছু মানুষ অজ্ঞতাকে জমিয়ে জমিয়ে তাকেই শিক্ষা বলে চালাতে চায়। অজ্ঞতা মানুষকে সুখী করে না। অজ্ঞতার অর্থ দুঃখ বিপদ, দারিদ্র্য ও অসুস্থতা। অজ্ঞতা যদি সুখদায়কই হোত তবে বেশিরভাগ মানুষ সুখী নয় কেন? অল্পবিদ্যা যদি ভয়ঙ্করী হয় তবে বেশি অজ্ঞতাই তাই; কারণ অজ্ঞতাও ক্ষুদ্রতা, ভয়, গোঁড়ামী আত্মস্তরিতা ও কুসংস্কারের জন্ম দেয়। প্রজ্ঞা অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করে।আমরা যে যুগে বাস করি সে যুগে সংবাদের গুরুত্ব অনেক। হিসাব করে দেখা গেছে যে প্রত্যেক বৎসর আমাদের জ্ঞাতব্য বিষয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। তথ্য ও সংবাদ এত সহজে পাওয়া যায় বলে অজ্ঞতা দূর করাও সহজ। কিন্তু এসব সত্ত্বেও আমাদের শিক্ষায় অতি প্রয়োজনীয় বিষয়গুলিই বাদ পড়ে যায়। আমরা পড়ি, লিখি, অঙ্ক শিখি, কিন্তু এই বুদ্ধির চর্চায় আমাদের কী লাভ হবে যদি আমাদের মানবিক মর্যাদাবোধ ও মানুষের প্রতি সহমর্মিতাবোধ সম্পর্কে কোনও ধারণা না থাকে? আমাদের স্কুলগুলি জ্ঞানের ঝরণা ধারার

পৃষ্ঠা ১৬ থেকে ৩০

পৃষ্ঠা:১৬

মতো- কিছু ছাত্র সেই ধারায় তৃষ্ণা নিবারণ করে, কেউ আবার একটু আধটু চুমুক দিয়ে দেখে, আবার কেউ কেউ মুখ ধুয়ে নেয়। সাধারণ বুদ্ধি সাধারণ বৃদ্ধি ছাড়া শিক্ষা ও জ্ঞানের কোনও মূল্যই নেই। সাধারণ বুদ্ধির অর্থ বাস্তব অবস্থাকে যথাযথভাবে অনুধাবন করা, এবং সেই অনুসারে যেভাবে কাজ করা উচিত, সেইভাবে কাজ করা। আমরা সবাই পাঁচটি ইন্দ্রিয় নিয়ে জন্মেছি-স্পর্শ, স্বাদ, দৃষ্টি ঘ্রান ও শ্রুতি। কিন্তু সকল মানুষদের আর একটি ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় আছে- সেটি হল সাধারণ বুদ্ধি। সাধারণ বুদ্ধি শিক্ষার ফলশ্রুতি নয়। শিক্ষা ব্যতিরেকেও লাভ করা যায়। সাধারণ বুদ্ধি ব্যতিরেকে শ্রেষ্ঠতম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও বিশেষ ফলপ্রসূ হয় না। প্রখর সাধারণ বুদ্ধির নামই প্রজ্ঞা কুঠারে শান দাও (Sharpen your axe) জন নামে এক কাঠুরে একটি সংস্থায় পাঁচ বছর কাজ করার পরও তার মাইনে বাড়েনি। সেই সংস্থা তখন বিল নামে এক কাঠুরেকে কাজে লাগাল এবং এক বছরের মধ্যে তার মাইনে বাড়িয়ে দিল। জন ক্ষুব্ধ হয়ে তার উপরওয়ালার কাছে গিয়ে ব্যাপারটা জানতে চাইল। উপরওয়ালা বলল, ” পাঁচ বছর আগে তুমি যে পরিমাণ কাঠ কাটতে আজও তাই কাট্‌ছ। তুমি যদি তোমার কাঠ কাটার ক্ষমতা বাড়াও তাহলে আমরাও তোমার মাইনে বাড়িয়ে দেব। জন ফিরে গিয়ে কাজ আরম্ভ করল। কিন্তু অনেক বেশি সময় ব্যয় করে, এবং সর্বশক্তি দিয়ে আঘাত করেও সে আগের থেকে বেশি গাছ কাটতে পারল না। তখন সে উপরওয়ালার কাছে গিয়ে তার সমস্যার কথা বলল। উপওেয়ালা পরামর্শ দিল বিলের সঙ্গে কথা বলতে। বিলের হয়ত কিছু কায়দাকানুন জানা আছে- এই ভেবে জন বিলকে জিজ্ঞেস করল সে এত বেশি কাঠ কাটে কি ভাবে? বিল উত্তর দিল, “প্রত্যেকটি গাছ কাটার পর আমি দু’মিনিটের বিরতি নিয়ে আমার কুড়লটিতে শান দিয়ে দিই। তুমি তোমার কুড়লে শেষবার কখন শান দিয়েছ?’ এই প্রশ্নটিই জনের চোখ খুলে দিল এবং সে তার সব প্রশ্নের জবাব পেয়ে গেল।এই প্রশ্নটিই গুরুত্বপূর্ণ।” তুমি শেষবার কখন তোমার অস্ত্রে শান দিয়েছ?”অতীত গৌরবগাথা কিংবা উচ্চশিক্ষার মর্যাদাপূর্ণ তকমা দিয়ে হবে না। সফল হতে হলে সকলকেই সদা সর্বদা কুড়লে শান দিয়ে কাজ করতে হবে।মনের খোরাক যোগাও আমাদের দেহের পুষ্টির জন্য যেমন ভালো খাদ্যবস্তুর প্রয়োজন, তেমনি মানসিক উন্নতির জন্য প্রত্যহ সৎ চিন্তার প্রয়োজন। ভালো খাদ্যোর বদলে খারাপ খাদ্য খেলে যেমন শরীর অসুস্থ হবে, তেমনি সৎ চিন্তা না করলে মনও অসুস্থ হবে। সৎ ও ইতিবাচক চিন্তার দ্বারাই মনকে সঠিক পথে চালনা করতে হয়। বাস্কেট বল খেলায় যেমন, তেমনি ক্রমাগত অনুশীলন এবং অনেকের সঙ্গে সংস্পর্শের মধ্য দিয়েই সাফল্যের মূলমন্ত্রগুলি আয়ত্ত করতে হয়।জ্ঞানই শক্তি আমরা প্রায়ই শুনি জ্ঞানই শক্তি। ঠিক তা নয়। জান শক্তির উৎস। জ্ঞান হচ্ছে তথ্যের সমাহার। এই জ্ঞানকে শক্তিতে রূপান্তরিত করা হয়, যখন তা যথাযথভাবে প্রয়োগ করা

পৃষ্ঠা:১৭

হয়। যে মানুষ পড়তে জানে না আর যে পড়তে জেনেও পড়ে না তাদের মধ্যে বিশেষ কোনও তফাৎ নেই। জ্ঞান অর্জন খাদ্য গ্রহণের মতো কতটা খাওয়া হচ্ছে তার উপর স্বাস্থ্য নির্ভর করে না-কতটা হজম হচ্ছে তার উপর স্বাস্থ্য নির্ভর করে। জ্ঞান শক্তির উৎস, আর প্রজ্ঞা, যা হচ্ছে জ্ঞানের নির্যাস হচ্ছে প্রকৃত শক্তি।শিক্ষা অনেকভাবেই গ্রহণ করা যায়। কেবল স্কুল-কলেজের ‘ডিগ্রি’ বা ‘গ্রেড’ই শিক্ষার মান নির্ধারণ করে না। শিক্ষার অর্থ-* আত্মশক্তি বৃদ্ধি কর স্থিরভাবে শোনার ও বোঝার ক্ষমতা অর্জন কর* আরও জানার ইচ্ছা অর্জন করা মাংসপেশীর সংকোচন ও প্রসারণ যেমন ব্যায়ামের উপর নির্ভর করে, সেই ভাবে আমাদের মনও কতটা সংকুচিত বা প্রসারিত হবে তা নির্ভর করে মানসিক ব্যায়ামের উপর। ডেরেক বক (Derek Bok) বলেছেন, শিক্ষাকে যদি দুর্মূল্য মনে হয় তবে অজ্ঞতাই বাঞ্ছনীয়। শিক্ষা ইতিবাচক হলে চিন্তাধারাও ইতিবাচক হবে।

শিক্ষা যেন একটা ভাণ্ডার বিশেষ:ইতিবাচক চিন্তাশীলরা অ্যালিদের মত, তারা অনুশীলনের দ্বারা তাদের পরিশ্রমের ক্ষমতা এত বাড়িয়ে নিতে পারে যে প্রতিযোগিতার সময় সেই ভাত্তার থেকে খরচ করতে পারে। অনুশীলন না করলে ভাণ্ডারে সঞ্চয়ও বাড়ে না এবং সেই সঞ্চয় থেকে বায়ও করা যায় না।এইভাবে চিন্তাশীলরা নিয়মিতভাবে পরিচ্ছন্ন, দৃঢ় ও ইতিবাচাক চিন্তার দ্বারা তাদের মনের সমৃদ্ধি ঘটান, এবং একটি ইতিবাচাক মনোভাব গড়ে তোলেন। একথা তারা জানেন যে ইতিবাচাক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে নঞর্থক চিন্তার সঙ্গে প্রতিঘাত অবশ্যম্ভাবী এবং ইতিবাচাক দৃষ্টিভঙ্গি যদি দৃঢ়ভাবে ইতিবাচাক চিন্তার উপর প্রতিষ্ঠিত না হয় তবে নঞর্থক চিন্তাকে জয় করা সহজ হবে না। শেষ পর্যন্ত হয়ত নার্থক চিন্তাই প্রবল হয়ে উঠবে। যারা ইতিবাচাক চিন্তা করেন তারা মূর্খ নন, এবং তারা চোখ বুজে পথ চলেন না। তারা বিজয়ীর দলে, এবং সেই জন্যই তারা তাদের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অবহিত। তাই তারা সীমাবদ্ধতাকে জয় করে তাদের ক্ষমতাকেই তুলে ধরার চেষ্টা করেন। কিন্তু যারা পরাজিতের দলে তারা তাদের ক্ষমতা সম্পর্কে একটি অবাস্তব ধারণা পোষণ করেন; কিন্তু যা তুলে ধরেন তা আসলে তাদের দুর্বলতা।পঞ্চম পদ্ধতি’ ইতিবাচাক আত্মমর্যাদাবোধ গড়ে তুলুন (Build a positive self-esteem) আত্মমর্যাদাবোধ কি? নিজের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে নিজের যা মূল্যায়ন তাই আত্মমর্যাদাবোধ আমরা যখন অন্তরে একটা স্বাচ্ছন্দ্য ও তৃপ্তি বোধ করি তখন আমাদের কাজ কর্মের মানও উন্নত হয়, এবং বাড়িতে কিংবা কর্মস্থলে সবার সঙ্গে সম্পর্কেও ভালো থাকে। সারা পৃথিবীই তখন সুন্দর মনে হয়। আমাদের অন্তরের অনুভূতি ও বাইরের কাজকর্মের মধ্যে একটা সরাসরি যোগসূত্র আছে।কিভাবে ইতিবাচাক আত্মমর্যাদাবোধ গড়ে তোলা যায় দ্রুত ইতিবাচাক আত্মমর্যাদাবোধ গড়ে তুলতে হলে মানুষের জন্য এমন কিছু ভালো কাজ করতে হবে যার প্রতিদান কেউ মূল্য বা জিনিসের মাধ্যমে দিতে পারবে না। কয়েক

পৃষ্ঠা:১৮

বছর জেলের বন্দীদের মধ্যে সুস্থ মনোভাব ও আত্মমর্যাদাবোধ শিক্ষা দেওয়ার ভার নিয়েছিলাম। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আমি যা শিখলাম তা আমি কয়েক বৎসরেও শিখতে পারিনি।প্রায় দু’সপ্তাহ ধরে আমার একটি কার্যক্রমে যোগ দেওয়ার পর একজন কয়েদী আমাকে জিজ্ঞেস করল, ” শিব, আমি তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই। আমি দু’সপ্তাহের মধ্যে জেল থেকে ছাড়া পাব।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, “এই যে মনোভাব তৈরি করার কার্যক্রমে তুমি যোগ দিয়েছে, সেখানে তুমি কি শিখেছ?” একটু ভেবে কয়েদীটি বলল, যে নিজের সম্পর্কে তার ধারণা ভালো হয়ে গিয়েছে। আমি বললাম, “ভালো মানে কী? আমাকে নির্দিষ্ট করে বল তোমার কোন ব্যবহার বদলে গিয়েছে?” আমার বিশ্বাস যথার্থ শিক্ষা দিতে না পারলে ব্যবহারের পরিবর্তন ঘটে না। কয়েদীটি আমাকে বলল যে কার্যক্রম শুরু হওয়ার সময় থেকে সে বাইবেল পড়ছে। আমি প্রশ্ন করলাম, বাইবেল পড়ে তার কিলাভ হয়েছে। সে জবাব দিল যে এর ফলে সে নিজের এবং বাইরের জগতের সম্পর্কের মধ্যে শান্তি খুজেঁ পেয়েছে। এটি আগে সে পায়নি। আমি বললাম, “এটি খুব ভালো কথা; কিন্তু শেষ কথা হল তুমি জেল থেকে ছাড়া পেয়ে কী করবে? সে বলল যে সে সমাজের একজন সক্রিয় সহায়ক সদস্য হওয়ার চেষ্টা করবে। আমি আবার একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলাম। সে একই জবাব দিল। তৃতীয়বারও তাকে জিজ্ঞেস করলাম,” জেল থেকে মুক্তি পাবার পর সে কী করবে? আমি একটু অন্যরকম উত্তর আশা করেছিলাম, এবার সে রেগে জবাব দিল, সে সমাজের একজন সক্রিয় সহায়ক সদস্য হবে। তার প্রথম ও শেষ উত্তরের মধ্যে যে পার্থক্য আছে তা তাকে দেখিয়ে দিলাম। প্রথমে সে বলেছিল যে সক্রিয় সদস্য হওয়ার চেষ্টা করবে, শেষে অবশ্য সে বলল যে সক্রিয় সহায়ক সদস্য হবে। হতে চেষ্টা করা ও হওয়ার মধ্যে অনেক তফাৎ আছে। চেষ্টা করার মধ্যে যে দোদুল্যমানতা আছে তা সবসময়েই ব্যর্থতার দরজা খোলা রাখতে সাহায্য করে, এবং সেই সঙ্গে জেলে ফেরার দরজাও।ঐ কয়েদখানার আরেকজন বাসিন্দা যে আমাদের কথপোকথন শুনছিলেন জিজ্ঞাসা করলেন “শিব, তোমার এই কাজের জন্য কি পাও?” উত্তরে বললাম, আমি যা অনুভূতি লাভ করলাম তার মূল্য পৃথিবীর সব অর্থের চেয়ে বেশি। তারপর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কেন এখানে আসেন?” বললাম, ” আমি এখানে আসি নিজের স্বার্থের জন্য এবং তা হল আমি এই পৃথিবীকে আর ভালো বাসযোগ্য করে তুলতে চাই। এই ধরনের স্বার্থপরতা স্বাস্থ্যকর। সংক্ষেপে বলতে গেলে তুমি যা দেবে তা সর্বদাই ফিরে পাবে। তাবলে কিছু ফিরে পাওয়ার ইচ্ছা নিয়ে তুমি কিছু বিনিয়োগ করবে না।আর একজন কয়েদী বলল, “একজন মানুষ যা করে তা তার নিজের ব্যাপার। একজন মাদকাসক্ত যখন মদ খায় তখন তাতে কারুর কিছুই করার নেই, তুমি তার বিসয়ে মাথা ঘামাও কেন?” উত্তরে বললাম, “বন্ধু তোমার কথা কিন্তু সম্পূর্ণ মেনে নেওয়া যায় না। যে কেউ মাদক দ্রব্য গ্রহণ করলে আমরা মাথাব্যাথার কিছু নেই। তুমি কি নিশ্চিত করে বলতে পারবে যে ঐ মাদকাসক্ত ব্যক্তিটি গাড়ি চালিয়ে কেবল গাছের সঙ্গেই ধাক্কা লাগাবে, এবং তোমাকে, আমাকে কিংবা আমাদের ছেলেপুলেদের চাপা দিয়ে মারবে না? আর এই ব্যাপারে যদি নিশ্চিত আশ্বাস দিতে না পার তবে আমার কথা মেনে নাও যে মাদকাসক্তদের মাদক ছাড়ানো আমার কাজ। তাদের গাড়ি চালানো থেকেও বিরত রাখা উচিত।

পৃষ্ঠা:১৯

 “জীবনটা আমার; আমার জীবন নিয়ে আমি যা ইচ্ছে তাই করব।” এই ধারণাটা ক্ষতিকারক। সাধারণত লোকে এর গূঢ় অর্থটি অগ্রাহ্য করে সহজ অর্থটিই গ্রহণ করে। নিতান্ত আত্মকেন্দ্রিক অর্থটি এই বাক্যটির প্রকৃত অর্থ নয়। আত্মকেন্দ্রিক মানুষ ভুলে যায় যে আমরা বিচ্ছিন্নভাবে বাঁচতে পারি না। আমি যা কবি তা যেমন আমার আশেপাশের লোককে এবং অন্যরা যা করে তা আমাকে প্রভাবিত করে। আমরা বিভিন্নভাবে পরস্পরের সঙ্গে সংযোজিত ও নির্ভরশীল। এ কথা অনুধাবন করা দরকার যে আমরা সবাই এই গ্রহের অংশীদার এবং আমাদের কাজকর্মও সেই অনুসারে দায়িত্বশীল হওয়া দরকার।পৃথিবীতে দু’রকমের মানুষ আছে। একরকম, যারা সব কিছু গ্রহণ করে, দুই, যারা সব কিছু দিয়ে দিতে পারে। যারা নিতে জানে তারা খায় ভালো; আর যারা দিতে জানে তারা ঘুমোয় ভালো। যারা দিতে জানে, তাদের আছে প্রখর আত্মমর্যাদাবোধ, একটি ইতিবাচাক মনোভাব এবং তারা সমাজ সেবায় আগ্রহী। অবশ্য সমাজ সেবার অর্থ বর্তমানের নেতা তথা রাজনীতিকদের ছদ্ম সমাজসেবা নয়। এরা প্রকৃতপক্ষে সমাজসেবার নামে নিজেদেরই সেবা করে থাকে।প্রত্যেক মানুষেরই কিছু নেওয়ার প্রয়োজন হয়, এবং নিতেও হয়। কিন্তু একজন সুস্থ মানসিকতার প্রখর আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন ব্যক্তি কেবলমাত্র গ্রহণ করেন না, দেওয়ারও চেষ্টা করেন।এক ব্যক্তি সকালে যখন তার গাড়ি ধোওয়া-মোছা করছিলেন, তখন প্রতিবেশী জিজ্ঞেস করলেন গাড়িটি কখন কিনেছেন। তিনি বললেন, তার ভাই গাড়িটি দিয়েছেন। প্রতিবেশী আক্ষেপ করে বললেন,” আমার যদি এই রকম একটা গাড়ি থাকত। “গাড়ির মালিক মন্তব্য করলেন, ” আপনার যদি আমার ভাইয়ের মতো একটি ভাই থাকত।” প্রতিবেশীর স্ত্রী এই বাক্যালাপ শুনছিলেন। তার মন্তব্য হোল,” আহা আমি যদি ভাই হতাম।” প্রাপ্তির প্রত্যাশায় মানুষের চিন্তা কিরূপ তির্যক পথ নেয়।পদ্ধতি হয়: নেতিবাচক প্রভাব থেকে দূরে থাকুন (Stay away from negative influences)আজকের দিনে অল্পবয়সীরা বয়স্কদের ব্যবহার থেকে এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমগুলি থেকে অনেককিছু শেখে। তারা তাদের সমবয়স্কদের চাপেও পড়ে। কেবল অল্পবয়স্করা নয়, বয়স্করাও এই সহকর্মী ও সমগোত্রীয়দের চাপের শিকার হয়। আত্মমর্যাদার অভাবে এরা তাদের নেতিবাচক প্রভাবকে অস্বীকার করতে পারে না। এই নঞর্থক বা নেতিবাচক প্রভাব কিরকমা১. নেতিবাচক মানুষএক বনমুরগীর বাসাতে একটা ঈগলের ডিম রাখা হয়েছিল। বনমুরগী ডিমে তা দিয়ে যে বাচ্চা হোল, সে বনমুরগী বলেই পালিত হোল। ক্রমে ক্রমে সেই ঈগলের বাচ্চা দেখতে ঈগলের মতো হলেও, বনমুরগীর স্বভাবই পেল। সে খাবারের জন্য আস্তাকুঁড় আঁচড়াত, বনমুরগীর মত ডাক ছাড়ত, এবং কয়েক ফুটের বেশি উড়ত না। বনমুরগী বেশি উড়তে পারে না। একদিন সে একটি ঈগলকে মহিমময়ভঙ্গিতে সাবলীলভাবে আকাশে উড়তে দেখল। সে তখন অন্য সঙ্গীদের জিজ্ঞেস করল ঐ সুন্দর পাখিটি কি পাখি? বনমুরগীরা বলল” ওটি ঈগল, একটি অসাধারণ পাখি। কিন্তু তুমি ওর মত উড়তে পারবে না, কারণ

পৃষ্ঠা:২০

 তুমি এখন বনমুরগী হয়ে গেছ। বনমুরগীদের সঙ্গী ঈগল এরপর এই কথা সত্য মনে করে বনমুরগীদের একজন হয়েই জীবন যাপন করে একদিন বনমুরগী লীলা-সাঙ্গ করল। বেচারা জানলই না যে সে আসলে ঈগল। সে জন্মেছিল ঈগল হয়ে, কিন্তু পারিপার্শ্বিক অবস্থা তাকে ঈগল হয়ে ওঠার সুযোগ দিল না। জন্যেছিল আকাশের উঁচুতে ওড়ার জন্য, কিন্তু ঘটনাচক্রে আস্তাকুঁড়ের পরিবেশকে এড়াতে পারল না।অধিকাংশ মানুষ সম্পর্কেই এই কথা সত্য। জীবন সম্পর্কে দুর্ভাগ্যজনক সত্যটি অলিভার উইন্ডাল হোমসের (Oliver Wendall Holmes) ভাষায় প্রকাশ করা যায়, বেশিরভাগ মানুষই যখন জীবনের অন্তিম লগ্নে পৌঁছায় তখনও তাদের মধ্যে কিছু করার ক্ষমতা অবশিষ্ট থাকে।” আমরা সমস্তটুকুর সদ্ব্যবহার করতে পারি না, তার কারণ আমাদের দূরদৃষ্টির অভাব।ঈগলের মতো উচুতে উঠতে হলে ঈগলের ক্ষমতা আয়ত্ত করতে হবে। সফল ব্যক্তিদের সান্নিধ্যে সফল হওয়ার সম্ভাবনা, চিন্তাশীলদের সান্নিধ্যে ভাবুক হওয়ার সম্ভাবনা দানী ব্যক্তিদের সান্নিধ্যে দানী হওয়ার সম্ভাবনা, আবার ছিদ্রান্বেষীদের সান্নিধ্যে ছিদ্রান্বেষী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।জীবনে সফল হলে ক্ষুদ্রমনা ব্যক্তিরা বিদ্রূপ করার ও সাফল্যকে ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করে। তাদের সঙ্গে লড়াই না করলেই আপনি জয়ী হবেন। সামরিক কৌশলও সেই রকম- যদি কেউ আপনাকে আঘাত করার জন্য লক্ষ্য করে, তবে আঘাত আটকাবার চেষ্টা না করে সরে দাঁড়াবেন। কারণ আঘাত আটকাতে গেলেও শক্তির প্রয়োজন। শক্তির অপচয় না করে অন্য উৎপাদনশীল কাজে শক্তি প্রয়োগই শ্রেয়। ক্ষুদ্রমনা ব্যক্তিদের সঙ্গে লড়তে গেলে তাদের স্তরে নেমে আসতে হয়। তারাও তাই চায়। এই সমস্ত লোকেরা টেনে সবাইকে তাদের স্তরে নামিয়ে আনুক এরকম হতে দেবেন না। স্মরণ রাখা উচিত, কী ধরনের মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করে শুধু তাই দিয়ে নয়, কাদের সঙ্গ এড়িয়ে চলে তাই দিয়েও মানুষের চরিত্র বিচার হয়।মুদপান, মাদক ও মদ২. লেডি অ্যাক্টর (Lady Astor) বলেছেন,” আমার আনন্দময় সময়টি কখন তা জানার জনাই মদ খাই না।” মদ্যপান মানুষের সংযম নষ্ট করে, তার উৎকণ্ঠা প্রদর্শন-প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়।বিভিন্ন দেশ সফরের সময় লক্ষ্য করেছি যে কয়েকটি দেশে মদ্যপান একটি জাতীয় অবসর-বিনোদনের উপায়ে পরিণত হয়েছে। যদি মদ্যপান না করেন তবে তারা সন্দেহ করবেন আপনার কোনও অসুখ-বিসুখ আছে। তাদের নীতি হোল, আপনার ইংরেজি কতটা খারাপ তাতে কিছু যায় আসে না, কিন্তু আপনার চ হুইস্কিটি উৎকৃষ্ট হওয়া প্রয়োজন। স্কচ্ হুইস্কির বোতলকে তারা সম্পদের মধ্যে গণ্য করেমদ্যপান ও ধূমপানকে আজকাল নানাভাবে আকর্ষণীয় করা হয়েছে। নেশাসক্তদের যদি নেশা করার কারণ জিজ্ঞাসা করেন তবে অনেক রকম জবাব পাবেন- কোনও বিশেষ উপলক্ষে মজা করার জন্য, সমস্যা ভোলোর জন্য, ক্লান্তি অপসারণের জন্য, কেবল পরীক্ষা করে দেখার জন্য, কাউকে বিশেষভাবে চমকে দেওয়ার জন্য, চলতি রীতি মেনে চলার জন্য, সমাজে মেলামেশা করার উদ্দেশ্যে, ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ইত্যাদি। কেউ

 পৃষ্ঠা:২১

মনোভাবের গুরুত্ব: কেউ আবারসঙ্গীদের চাপে মদ্যপান শুরু করে। সঙ্গীর উপর চাপ সৃষ্টি করতে তারা বলে, “তুমি কি আমার বন্ধু নও, তাহলে খাবে না কেন?” কিংবা’ আমার স্বাস্থ্যের জন্য এক পেগ নাও,” কিংবা রাস্তারজন্য এক পেগ ইত্যাদি। একজনঅনামা কবির একটি কবিতা এই বিষয়ে প্রাসঙ্গিক। আমি গুঁড়িখানায় তোমার স্বাস্থ্যপান করেছি, আমি আমার বাড়িতে তোমার স্বাস্থ্যপান করেছি, আমি এতবার, চুলোয় যাক, তোমার স্বাস্থ্য পান করেছি যে,আমার নিজের স্বাস্থাকে।প্রায় ধ্বংস করে ফেলেছি। মদ্যপানের পর মোটর চালাতে গিয়ে জীবন নষ্ট হয়। জেরী জনসন” লিখেছেন, ‘আমেরিকার হসপিটাল এ্যাসোসিয়েশন’-এর রিপোট অনুসারে হাসপাতালের প্রায় অর্ধেক রোগী মাদক সম্পর্কিত সমস্যায় ভর্তি হয়। ‘ন্যাশনল সেফটি কাউন্সিল’-এর ১৯৮৯ সালের Accident Facts Edition’ অনুসারে প্রতি ৬০ সেকেন্ডে মদ্যপান জনিত দুর্ঘটনায় একজন আহত হয়।৩. অশ্লীল রচনা অশ্লীল সাহিত্য বিশেষ করে মহিলা ও শিশুদের অমানবিক স্তরে অবনয়ন ঘটায়। অশ্লীলরচনা ও ছবির ব্যবহারের ফলাফল নিম্নরূপ:* মহিলাদের প্রতি এক অমানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে* শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে* বিবাহ নষ্ট হয়ে যায়

যৌন হিংস্রতাকে প্রশ্রয় দেয়: নীতি ও ন্যায়-অন্যায় বোধকে বিদ্রূপ করার প্রবণতা বাড়ে।* ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে নষ্ট করে আমেরিকায় প্রতি ৪৬ সেকেন্ডে একজন মহিলা ধর্ষিতা হন। (National Victim Centre/ Crime Victims Research and Treatment Centre-1992)। ৮৬ শতাংশ ধর্ষণকারী স্বীকার করেছে যে তারা নিয়মিত অশ্লীল-রচনা, চিত্র ইত্যাদি ব্যবহার করে, এবং ৫৭ শতাংশ স্বীকার করেছে তারা ধর্ষণের বা অনুরূপ যৌন অপরাধের সময় অশ্লীল রচনা বা ছবির অনুকরণ করেছে।খুবই দুঃখের বিষয় যে, অশ্লীল রচনা ও ছবির ব্যবসায়ীরা এই নীচ ব্যবসা করে পয়সা উপার্জন করে। কিন্তু যে অসুস্থ মানুষরা এইগুলি কেনেন তারা কঠোর ভাষায় নিন্দার যোগ্য। ৪. না-ধর্মী চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন কার্যক্রম আজকাল সিনেমা ও টেলিভিশন অল্পবয়সীদের মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে দেয়। আমেরিকায় একজন তরুণ হাইস্কুলের পাঠ শেষ করার আগেই অন্তত ২০ হাজার ঘন্টা টেলিভিশন দেখে এবং এক লক্ষ মদ্য ও মদ্যপান সংক্রান্ত বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন দেখে। এই সমস্ত থেকে একটাই শিক্ষা হয় যে মদ্যপান একটা মজার বিষয়, ধূমপান আকর্ষণীয় ব্যাপার এবং ড্রাগ একটা সাধারণ চালু জিনিস। আশ্চর্য কী, এই অবস্থায় অপরাধ বাড়বে।*In his book “It’s Killing Our kids,” World Publishing p.xv

পৃষ্ঠা:২২

তুমিও জিতবে:টেলিভিশনের অবাস্তবতার ফেনায়-ভরা নাটকগুলি বিবাহোত্তর বা বিবাহ বহির্ভুত যৌন মিলনকে স্বাভাবিক ভাবে দেখায়। ফলে পারস্পরিক দায়বদ্ধতা কমে যায় এবং বিবাহ- বিচ্ছেদের সংখ্যা বেড়ে যায়। টেলিভিশন ও সিনেমায় যা দেখে বা সংবাদ মাধ্যমে যা শোনে তার থেকে যে সব দর্শকরা সহজে প্রভাবিত হয় তারা তাদের নৈতিক মানদণ্ড স্থির করে নেয়। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে প্রচার মাধ্যম কিছু কিছু বিষয়ে আমাদের প্রভাবিত করে।৫. অবজ্ঞাপূর্ণ ব্যবহার অবজ্ঞাপূর্ণ প্রমাণিত হয়। ব্যবহারের দ্বারা কেবল নিজের আত্মসংযমের ও শৃঙ্খলাবোধের অভাবই ৬. রক মিউজিকঅনেকগুলি গানের কথা শ্লীল। আমরা অবচেতনভাবে এরূপ গান ও অঙ্গভঙ্গির দ্বারা প্রভাবিত হতে পারি। সপ্তম পদ্ধতি: যে কাজ করতে হবে সেই কাজকে ভালোবাসতে শেখা দরকার (Learn to like the things that need to be done) আমরা পছন্দ করি বা না করি কতকগুলি কাজ আমাদের করতে হয়। যেমন বাচ্চাদের জন্য মায়ের যত্ন। এই কাজগুলি সবসময় মজার বিষয় নাও হতে পারে; কিন্তু এই কাজগুলিকে ভালোবেসে অন্তর দিয়ে করলে তবে তা সার্থক হবে। তখন অসম্ভব কাজ করাও সম্ভব হবে।সেন্ট ফ্রান্সিস অফ আসিসি এই সম্পর্কে সার কথা বলেছেন, যা প্রয়োজনীয় তা করা শুরু কর, তারপর যা সম্ভবপর তা করা শুরু কর; অবশেষে দেখা যাবে যে অসম্ভব কাজও সম্ভব হচ্ছে।”অষ্টম পদ্ধতি: ইতিবাচক ভাবনা দিয়ে দিন শুরু করুন (Start your daywith a positive) সকালেই কিছু পড়া বা শোনা দরকার যা হবে ইতিবাচক। রাত্রে ভালো ঘুম হলে আমাদের ক্লান্তি দূর হয় এবং আমাদের মন গ্রহণ করার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে।এই ইতিবাচক চিন্তা সারাদিনের কাজের সুর বেঁধে দেয় এবং সারাদিন আমাদের মনকে সঠিক অবস্থানে রাখে। আমাদের কাজের প্রণালীতে পরিবর্তন আনতে হলে ইতিবাচক চিন্তা এবং ব্যবহারকে সচেতন প্রয়াসের দ্বারা জীবনের অংশ করে নিতে হবে। প্রতিদিন এরূপ ব্যবহারের অনুশীলন করতে করতে তা অভ্যাসে পরিণত হবে। হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের উইলিয়ম জেমস বলেন, “যদি নিজের জীবনকে বদলাবার মনস্থ করে থাক তা হলে শুরু করা দরকার এখনই এবং খুব সোচ্চার ও জুশনীয়ভাবে”।বিজয়ী বনাম বিজেতা (Winners versus losers) বিজয়ীরা সব সময় প্রশ্নের উত্তর খোঁজেন বজিতরা প্রশ্নের সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত। বিজয়ীদের একটি কার্যক্রম থাকে বিজিতদের থাকে সর্ববিষয়েই অজুহাত।বিজয়ীরা বলেন, “তোমার হয়ে কাজটা করে দিচ্ছি” বিজিতরা বলেন ‘এটা আমার কাজ নয়’। বিজয়ীরা প্রতি সমস্যার একটা সমাধান দেখতে পান

পৃষ্ঠা:২৩

 বিজিতরা প্রতি সমাধানে একটি সমস্যা দেখেন। বিজয়ীরা বলেন, “কাজটি কঠিন, কিন্তু করা সম্ভব'” বিজিতরা বলেন ” কাজটি করা গেলেও এটি খুবই কঠিন”।বিজয়ীরা ভুল করলে স্বীকার করেন” ভুলটা আমারই” বিজিতরা ভুল করলে বলেন “এটা আমার দোষ নয়”।বিজয়ীরা দায়িত্ব গ্রহণ করেন বিজিতরা প্রতিশ্রুতি দেন। বিজয়ীরা বলেন “আমি অবশ্যই কিছু করব”বিজিতরা বলেন, “কিছু করা উচিত”।বিজয়ী ব্যক্তি দলের একজন সদস্যরূপে কাজ করেন বিজিত ব্যক্তি দলের থেকে পৃথক একজন হয়ে কাজ করেন।বিজয়ীরা প্রাপ্তির প্রতি নজর দেন বিজিতরা ক্ষতির দিকে নজর দেন।বিজয়ীরা সম্ভাবনা বিচার করেন।বিজিতরা সমস্যা বিচার করেন।বিজয়ীরা জয়ে বিশ্বাস করেনবিজিতরা ভাবেন জয়ী হলেও অন্য একজনের পরাজয় হবে।বিজয়ীরা ক্ষমতা ও সম্ভাবনা দেখেন বিজিতরা দেখেন অতীত।বিজয়ীরা থার্মোষ্টাট যন্ত্রের ন্যায় উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণ করে বিজিতরা থার্মোমিটারের ন্যায় উষ্ণতা মাপে।বিজয়ীরা বিবেচনা করে কথা বলে।বিজিতরা যা মনে করে তাই বলে।বিজয়ীরা কঠিন তর্কে মোলায়েম বাক্য ব্যবহার করেবিজিতরা সহজ বিতর্কে কঠিন বাক্য ব্যবহার করে।বিজয়ীরা মুল্যবোধের ক্ষেত্রে দৃঢ়, কিন্তু সামান্য ব্যাপারে আপস করেন। বিজিতরা মূল্যবোধের ক্ষেত্রে আপস করেন, কিন্তু সামান্য বিষয়ে দৃঢ় হন।বিজয়ীরা সহমর্মিতার দর্শন অনুসরণ করেন, এবং বলেন, “যা তুমি নিজের ক্ষেত্রে করা পছন্দ কর না, তা অপরের ক্ষেত্রেও করবে না” বিজিতরা এই নীতি অনুসরণ করেন,” তোমার প্রতি কঠোর আচরণ করার আগেই তুমি অপরের প্রতি সেই আচরণ কর।”বিজয়ীরা ঘটনা ঘটিয়ে থাকেনবিজিতরা ঘটনা ঘটতে দেন।বিজয়ীরা জয়ের পরিকল্পনা করেও প্রস্তুতি নেয়, প্রস্তুতিই তাদের নিকট গুরুত্বপূর্ণ। বিজয়ী হওয়ার কার্যকর পদক্ষেপ (Be a winner-action steps) যে আটটি পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে সেগুলি সংক্ষেপে বিবৃত করে পরিচ্ছেদ শেষ করা যাক। ১. একজন ভালো সন্ধানকারী হোন।

 পৃষ্ঠা:২৪ 

তুমিও জিতবে:২. কাজটি এখনই সম্পন্ন করার অভ্যাস তৈরি করুন।৩. কৃতজ্ঞ হওয়ার মানসিকতা তৈরি করুন।৪. নিরবচ্ছিন্ন শিক্ষার কার্যক্রম গ্রহণ করুন।৫. ইতিবাচক আত্মমর্যাদাবোধ তৈরি করুন।৬. নেতিবাচক প্রভাব থেকে দূরে থাকুন।৭. যে কাজ করতে হবে তার প্রতি ভালোবাসার মনোভাব তৈরি করুন।৮. ইতিবাচক চিন্তা ও কাজের মধ্যদিয়ে দিন শুরু করুন।কাজের পরিকল্পনা (Action plan)১. কাজের পরিকল্পনা একটি কাগজে লিখে প্রতিদিন পড়ন। এরূপ ২১ দিন পড়ার পর পরবর্তী ত্রিশ মিনিটে নিচের প্রশ্নগুলির উত্তর দিন ২. প্রতিটি পদক্ষেপ আপনি কিভাবে ব্যবহার করবেন?ক-বাড়িতেখ-কর্মক্ষেত্রেগ- সামাজিক ক্ষেত্রে ৩. যে সব বিষয়ে নিজেকে বদলাতে চান তার একটি তালিকা তৈরি করুন।৪. প্রত্যেক পরিবর্তনের যে সুফল তার তালিকা তৈরি করুন।৫. অবশেষে, একটি সময় সূচী মাফিক পরিবর্তনগুলি কার্যকর করতে বদ্ধপরিকর হোন।

 পৃষ্ঠা:২৫

 অধ্যায়ঃ ২

সাফল্য

 সাফল্যের চাবিকাঠি 

সাফল্য কোনও আকস্মিক ব্যাপার নয়। এটি আমাদের মনোভাব বা দৃষ্টিভঙ্গির ফল এবং সেই মনোভাব আমরা নিজেরাই নির্বাচন করি। সুতরাং সফলতা আমাদের নিজেদের নির্বাচনের উপর নির্ভরশীল কোন আকস্মিকতার উপর নয়।অনেকই জীবনে একটা বড় ধরনের লটারি জেতার আশা করে, কিন্তু লটারি জেতাকেই কি সফলতা বলে? একজন ধর্মযাজক একটি ফসলে পরিপূর্ণ ক্ষেতের পাশ দিয়ে গাড়িতে যাচ্ছিলেন, সুন্দর ফসল দেখে তিনি গাড়ি থামিয়ে ফসলের প্রশংসা করলেন এবং সেই ক্ষেতের মালিক ধর্মযাজককে দেখে তার ট্রাক্টর চালিয়ে তার কাছে এল। ধর্মযাজক যখন জিজ্ঞেস করলেন, ভগবান তোমাকে ক্ষেতভরা ফসল দিয়েছেন তুমি কি তার কাছে কৃতজ্ঞ?” ক্ষেতের মালিক জবাব দিল, “হ্যাঁ, ভগবান আমাকে এই ক্ষেতটি দিয়েছেন তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ, কিন্তু এই ক্ষেতভরা ফসল আমার পরিশ্রমের ফল।”এটা ভাবতে আশ্চর্য লাগে যে কোনও কোনও ব্যক্তি জীবনে একের পর এক সফলতা লাভ করে আবার কেউ কেউ কেবল কাজের জন্য প্রস্তুত হয়। এটাও খুব আশ্চর্যের বিষয় যে একজন মানুষ তার জীবনে একটার পর একটা বিপত্তি কাটিয়ে তার লক্ষ্যে পৌঁছায়, আর একজন একটামাত্র বিপত্তি অতিক্রম করতেই হিমসিম খায় এবং লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না। উপরের দুটি প্রশ্ন যদি স্কুল-কলেজে শিক্ষাসূচীর অন্তর্ভূক্ত হত এবং তার যথার্থ উত্তর যদি ছাত্রদের শেখানো হত তবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা নতুনরূপ নিত। যারা অসাধারণ ব্যক্তি তারা সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন না, আর যারা সাধারণ ব্যক্তি তারা জীবনে নিরাপত্তা খোঁজেন। আমরা জীবনে যে লক্ষ্যে পৌঁছতে চাই তার প্রতি স্থির দৃষ্টি রাখা উচিত। আমরা যা চাই না তার প্রতি নজর না দিলেও চলে।সাফল্য কি? (What is success?)সাফল্য এবং অসাফল্য নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। এ বিষয়ে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। আমরা যখন সফল ব্যক্তিদের জীবনকাহিনী পড়ি তখন দেখতে পাই যে ইতিহাসের যে যুগেই তারা আবির্ভূত হোন না কেন তাদের একই রকমের অনেকগুলি গুণ থাকে। যে গুণাবলী তাদের সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিয়েছিল, সেগুলিকে চিহ্নিত করতে পারলে এবং যথাযথ অনুসরণ করতে পারলে আমরাও সফল হতে পারি। অনুরূপভাবে সমস্ত অসাফল্যের ও কতকগুলি বৈশিষ্ট্য আছে। যদি সেই বৈশিষ্ট্যগুলিকে এড়িয়ে চলি তাহলে আমরা বিফল হব না। সাফল্যের মধ্যে কোন রহস্য নেই। সাফল্য কেবলমাত্র কয়েকটি মূল আদর্শকে নিয়মিতভাবে প্রয়োগ করার ফলশ্রুতি। উল্টোটাও একইরকম ভাবে সত্যি। বিফলতা হচ্ছে কয়েকটি ভুলের ক্রমাগত পুনরাবৃত্তি, এগুলি সরলীকরণ মনে হতে পারে কিন্তু আসল কথা হচ্ছে যে সমস্ত সত্যই খুব সরল একথা বলার উদ্দেশ্য নয় যে মূল আদর্শগুলি খুব অনায়াসে পালন করা যায়, কিন্তু এটা ঠিক যে এগুলি খুব জটিল বা অসাধ্য নয়।

পৃষ্ঠা:২৬

তুমিও জিতবে যারা প্রায়ই হাসতে জানে এবং ভালোবাসতে জানে, যারা জ্ঞানী লোকের কদর পায়, আর পায় বাচ্চাদের আদর, সমঝদার সমালোচকের প্রশংসা পায়, আর যারা মিথ্যা বন্ধুত্বের বেইমানি সহ্য করতে পারে, যারা সৌন্দর্যের পূজারী, যারা মানুষের মধ্যে মহত্ত্ব খুঁজে বেড়ায় যারা প্রতিদানের প্রত্যাশা না করে নিজেদের উজাড় করে দেয় যারা অনাবিল হাসিতে হয়ে উঠতে পারে উচ্ছ্বসিত, গান গেয়ে যারা আত্মহারা হয় যারা পৃথিবীতে জন্মেছে বলে, পৃথিবীর বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়া সহজ হয়েছে; যদি জানে যে অন্তত একটি জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য এনেছে তারই চেষ্টায়, তাহলে তাই হবে জীবনের সার্থকতা, সাফল্য।

অজ্ঞাতা পরিচয় কবি

 সফলতার সংজ্ঞা কী? (How do we define success?) একজন ব্যক্তি কিভাবে সফল হয়? সাফল্যকে আমরা কিভাবে চিনতে পারি? কেউ কেউ মনে করে সাফল্যের অর্থ, ধনবান হওয়া, কারোর নিকট সাফল্যের অর্থ সামাজিক স্বীকৃতি, সুস্বাস্থ্য, সুন্দর পরিবার, সুখ-সন্তুষ্টি এবং সামাজিক শান্তি। এগুলির নিহিতার্থ হচ্ছে সাফল্য প্রকৃতপক্ষে নিজ নিজ ধারণার উপর নির্ভরশীল, বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে এর অর্থ বিভিন্ন। একটি সংজ্ঞা যাতে সফলতাকে সংক্ষেপে প্রকাশ করা যায় তা হলো, একটি যথার্থ উদ্দেশ্য উত্তরোত্তর উপলব্ধির নামই সফলতা,”-আর্ল নাইটিংগেল (Earl Nightingale) এই সংজ্ঞাটিকে সযত্নে বিচার করা যাক, “উত্তরোত্তর” এই কথাটির অর্থ হলো সফলতা একটি গন্তব্যে পৌঁছানো নয়, এটি একটি সফল। আমরা কখনোই গন্তব্যে পৌঁছই না। একটি লক্ষ্যে পৌঁছবার পর আমরা দ্বিতীয়টির দিকে যাত্রা করি সেখান থেকে পরবর্তী লক্ষ্যে, পরে তার পরবর্তী লক্ষ্যে। “উপলব্ধি হল একটি অভিজ্ঞতা। বাইরের কোন শক্তি আমাকে সাফল্যের অনুভূতি দিতে পারবে না, এটা আমাকে নিজের মধ্যে অনুভব করতে হবে। সাফল্যের অনুভূতি আন্তরিক, বাহ্যিক নয়। মূল্যবোধ বোঝাতে আমার অনেকসময় ” যথার্থ শব্দটি ব্যবহার করে থাকি। আমরা কোন দিকে যাচ্ছিঃ ইতিবাচক অথবা নেতিবাচক। যথার্থ” এই কথাটির দ্বারা পদ্ধতির ও লক্ষ্যের গুণমান নির্ধারিত হচ্ছে এবং এর সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট আছে লক্ষ্যের অর্থ এবং আত্মিক পূর্ণতা দান করা। আত্মিক পূর্ণতা ব্যতীত সমস্ত সাফল্যই শূন্য মনে হয়।কেন?” লক্ষ্য” খুবই গুরুত্বপূর্ণ; কারণ স্থির লক্ষ্যস্থলে পৌঁছবার পথ নির্ধারণ সহজনয়।সাফল্যের ফলে যে প্রত্যেকের কাছেই গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে তা নয়। কোন কোন

 পৃষ্ঠা:২৭

 সাফল্য

 গোষ্ঠীর কাছে আমি গ্রহণযোগ্য হতে চাইব না। বুদ্ধিহীনের সমালোচনা সহ্য করা যায় কিন্তু অসৎ চরিত্রসম্পন্ন ব্যক্তির প্রশংসা অনেকের নিকট অসহ্য। আমাকে সাফল্যের সংজ্ঞা দিতে বললে আমি বলব যে সাফল্য হচ্ছে এমন একটি সৌভাগ্য যার মূল্যে ক্রমান্বয়ে আছে অনুপ্রেরণা, উচ্চাশা, তীব্র ইচ্ছা, কঠিন পরিশ্রম।সাফল্য এবং সুখ পরস্পরের হাত ধরাধরি করে চলে। আপনি যা চেয়েছেন তা পাওয়াই সাফল্য, আর সুখ হচ্ছে আপনি যা পেয়েছেন তার মধ্যেই পাওয়ার ইচ্ছাকে সীমাবদ্ধ রাখা।শুধু টিকে থাকাই সাফল্য নয়। এটি তার চেয়েও বেশি। শুধু জীবনধারণের থেকে বেশি কিছু মানুষের মত বাঁচা।স্পর্শের থেকে বেশি কিছু-অনুভব করা।দেখার থেকে বেশি কিছু- নিরীক্ষণ করা।পড়ার থেকে বেশি কিছু -হৃদয়ঙ্গম করা।শোনার থেকে বেশি কিছু-অনুধাবন করা। -John H, Rhoadesসাফল্যের পথে কিছু বাধা (প্রকৃত বা কল্পিত) (Some obstacles to success(Real or Imagined)* আত্মকেন্দ্রিকত* বিফলতার আশঙ্কা / আত্ম-মর্যাদার অভাব* পরিকল্পনার অভাব*নির্দিষ্ট কাঠামোগত লক্ষ্যের অভাব* জীবন পরিবর্তনশীল* দীর্ঘসূত্রতা* পারিবারিক দায়িত্ব* আর্থিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্যা* নির্দিষ্ট লক্ষ্যের উপর দৃষ্টি নিবন্ধ না করে তালগোল পাকিয়ে ফেল আশু আর্থিক লাভের আশায় ভবিষ্যতেরপরিকল্পনা পরিত্যাগ করাএকাই অনেক কাজের ভার নেওয়া* সামর্থ্যের অতিরিক্ত দায় গ্রহণ* দায়বদ্ধতার অভাব* প্রশিক্ষণের অভাব* অধ্যবসায়ের অভাব* অগ্রাধিকারের অভাব বিজয়ীর প্রাধান্য-(The winning edge) বিজয়ীর সুবিধা পেতে হলে আমাদের কাজের উৎকর্ষের জন্য চেষ্টা করা উচিত; কিন্তু সম্পূর্ণরূপে নিখুত হওয়ার জন্য নয়। যারা সম্পূর্ণরূপে নিখুত হওয়ার চেষ্টা করে যায় তারা মানসিক বিকারগ্রস্ত। যারা উৎকর্ষের জন্য চেষ্টা করে তারাই অগ্রগতির পথে যায়। প্রয়োজন হলো সামান্য একটু সুবিধা বা প্রাধান্য পাওয়া। ঘোড়দৌড়ে বিজয়ী ঘোড়া পাঁচ ও একের অনুপাতে বা দশ ও একের অনুপাতে জেতে, তার অর্থ কি এই যে বিজয়ী ঘোড়াটি পরাজিত ঘোড়াটি থেকে পাঁচ বা দর্শগুণ বেশি জোরে ছোটে? নিশ্চয়ই না, ঘোড়াটি হয়ত তমিও জিতবে-৩

পৃষ্ঠা:২৮

 একের ভগ্নাংশের দূরত্বে জিতে পাঁচগুণ বা দশগুণ বেশি পুরস্কার লাভ করে, অন্যগুলি কিছু পায় না।এটা কি সুবিচার? হয়ত নয় কিন্তু কেউ তার তোয়াক্কা করে না। এইটাই এই খেলার নিয়ম এবং সেইজন্যই ঘোড়দৌড়ে ঘোড়া দৌড়ায়। আমাদের জীবনের ক্ষেত্রেও এই কথা সত্য। সফল ব্যক্তিরা অসফলদের থেকে দশগুণ ভালো নয়, তারা হয়ত ভগ্নাংশ মাত্র ভালো কিন্তু তাদের পুরস্কার দশশুণের থেকেও বেশি।তাই আমাদের কোন একটি বিশেষ ক্ষেত্রে শতকরা এক হাজার ভাগ উন্নতি করার দরকার নেই। যা করা দরকার তা হলো এক হাজারটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে এক শতাংশ উন্নতি করা। এটি আরও সহজ। এখানেই হল বিজয়ীর প্রাধান্য।সংগ্রাম (Struggle)জীবন সংগ্রামে জয় অথবা পরাজয় দু’য়েরই সম্ভাবনা আছে। কোন জয় সংগ্রাম ছাড়া আসে না।জীববিজ্ঞানের এক শিক্ষক তার ছাত্রদের শেখাচ্ছিলেন, গুঁয়োপোকা, প্রজাপতিতে কিভাবে রূপান্তরিত হয়। তিনি ছাত্রদের বললেন যে পরবর্তী দু’ঘন্টার মধ্যে গুঁয়োপোকার গুটি থেকে প্রজাপতি বেরিয়ে আসবে কিন্তু কেউ তাড়াহুড়ো করে প্রজাপতিকে গুটি থেকে বের করার চেষ্টা করবে না। এই বলে তিনি ক্লাশ থেকে চলে গেলেন।ছাত্ররা গুটির দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। প্রজাপতি গুটি থেকে বের হওয়ার জন্য নড়েচড়ে চেষ্টা করছিল। একটি ছাত্র দয়াপরবশে শিক্ষকের উপদেশ অমান্য করে গুটি ভেঙে প্রজাপতিকে বাইরে আসতে সাহায্য করল। ফলে প্রজাপতিকে বাইরে আসার জন্য আর বেশি চেষ্টা করতে হল না কিন্তু অল্প পরেই প্রঋাপতিটি মারা গেল।শিক্ষক ফিরে এলে অন্য ছাত্ররা ঘটনাটি তাকে জানাল। তিনি ব্যাখা করে বোঝালেন যে প্রজাপতিকে সাহায্য করতে গিয়ে ওই ছাত্রটি প্রজাপতিকে মেরে ফেলেছে। কারণ প্রাকৃতিক নিয়মে গুটি থেকে বেরনোর সময় তাকে যে সংগ্রাম করতে হয় তার ফলে প্রজাপতির ডানা দুটি বেড়ে ওঠে এবং শক্ত হয়। বালকটি প্রজাপতিকে সংগ্রাম করতে না দিয়ে তাকে বাঁচবার শক্তি সংগ্রহ করতে দেয়নি। ফলে প্রজাপতিটি মারা গেল।এই তত্ত্বটি মানুষের জীবনেও প্রয়োগ করা যেতে পারে। সংগ্রাম ছাড়া মানুষ জীবনে কিছুই লাভ করতে পারে না। পিতামাতা হিসাবে আমরা যখন সব থেকে জেহের সন্তানকে সংগ্রাম, থেকে আড়াল করে রাখি তখন তার শক্তি বৃদ্ধি না হতে দিয়ে তার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করি।বাধা অতিক্রম করা (Overciming obstacles) যারা কোন বাধা বিপত্তির সম্মুখীন হয়নি তাদের থেকে যারা বাধা অতিক্রম করে এসেছে তাদের ক্ষমতা এবং আত্মবিশ্বাস অনেক বেশি। সমস্যার সম্মুখে আমরা কখনো কখনো নিরুৎসাহ বা হতাশ হয়ে পড়ি কিন্তু বিজয়ীদের কখনো মনোবল নষ্ট হয় না। এই মনোবল নষ্ট না হওয়ার জন্য প্রয়োজন অধ্যবসায়।একটি ইংরেজি প্রবাদে বলে, “শান্ত সমুদ্রে কখনো দক্ষ নাবিক হওয়া যায় না।”প্রথমে সমস্ত সমস্যাই কঠিন মনে হয় কালক্রমে তা সহজ হয়ে আসে। আমরা আমাদের সমস্যা থেকে পালিয়ে যেতে পারি না কেবল বিজিতরাই রনে ভঙ্গ দেয়, এই প্রসঙ্গে

পৃষ্ঠা:২৯

Abigail Van Buren-এর একটি বাক্য স্মরণযোগ্য।” আত্মহত্যা একটি সাময়িক সমস্যার চিরস্থায়ী সমাধান।”কিভাবে সাফল্যের পরিমাপ করা যায় (How do we Measure Success?) কোন কাজ সুসম্পন্ন হলে এবং অভীষ্ট সিদ্ধি হলে যে অনুভূতি হয়, সেই অনুভূতিই সাফল্যের মাপকাঠি। জীবনে আমাদের অবস্থান দিয়ে সাফল্য বিচার হয় না। সেই অবস্থায়নে পৌঁছতে গিয়ে যে সমস্ত বাধা অতিক্রম করতে হয় সেই বাধা অতিক্রমের ক্ষমতা দিয়েই সাফল্যের পরিমাপ করা হয়। আমরা অপরের তুলনায় কিভাবে কাজ করছি তাই দিয়ে সাফল্য বিচার করা যায় না। আমরা আমাদের শক্তি ও সামর্থ্যের কতটা ব্যবহার করতে পেরেছি তাই দিয়েই সাফল্য নির্ধারিত হয়। প্রকৃতপক্ষে সফল ব্যক্তিরা নিজের সঙ্গেই প্রতিযোগিতা করে। তারা তাদের নিজেদের কাজের মান ক্রমাগত উন্নততর করার চেষ্টা করে চলে। জীবনে কত উপরে ওঠা গেছে সাফল্য তাই দিয়ে বিচার করা যায় না বরং কতবার বিফলতা সত্ত্বেও হতাশা অতিক্রম করে সাফল্যের পথে এগিয়ে গেছে সেই ক্ষমতা দিয়েই সাফল্য নির্ধারিত হয়। সব বড় সাফল্যের কাহিনীর পিছনে আছে বড় ব্যর্থতার কাহিনী (Every success story is a story of great failure) সব্যর্থতা সাফল্যের শিখরে পৌঁছবার পথ। সিনিয়র টম ওয়াটসনের কথায়, “যদি সফল হতে চাও তবে ব্যর্থতার হার দ্বিগুণ করে দাও।” ইতিহাস পড়লে দেখা যায় যে, সমস্ত সাফল্যের কাহিনীর সঙ্গে আছে ব্যর্থতার কাহিনীও। কিন্তু সফলতা লাভের পর ব্যর্থতা মানুষের নজরে পড়ে না। সবাই ছবির একদিক দেখে গন করে লোকটি ভাগ্যবান: ” ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় ছিল বলেই সফল হয়েছে।” এই প্রসঙ্গে একজনের জীবনকাহিনীর উল্লেখ করি। তিনি ২১ বছর বয়সে ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হন, ২২ বছর বয়সে আইন সভার নির্বাচনে পল্লান্ত হন। ব্যবসায় আকার অসফল হলেন ২৪ বৎসর বয়সে। ২৬ বৎসর বয়সে তার প্রিয়তমা মারা গেলেন। কংগ্রেসের নির্বাচনে পরাস্ত হলেন ৩৪ বৎসর বয়সে। ৪৫ বৎসর বয়সে হারলেন সাধারণ নির্বাচনে। ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়ার চেষ্টায় ব্যর্থ হলেন ৪৭ বৎসর বয়সে। সিনেটের নির্বাচনে আবার হারলেন ৪৯ বৎসর বয়সে। প্রেসিডেন্ট হিসাবে নির্বাচিত হলেন ৫২ বৎসর বয়সে। এই ব্যক্তির নাম আব্রাহাম লিঙ্কন। এঁকে কি ব্যর্থ বলবেন? তিনি রাজনীতির পথ ছেড়ে দিতে পারতেন। কিন্তু লিঙ্কনের নিকট পরাজয় মানেই সমাপ্তি নয়- যাত্রা একটু দীর্ঘ হওয়া মাত্র।১৯১৩সালে ট্রায়োড টিউবের আবিষ্কর্তা, Lee De Forest -কে ডিসট্রিকট অ্যাট্যারনি আদালতে অভিযুক্ত করলেন। অভিযোগ ছিল তিনি জনসাধারণকে ভুল বুঝিয়ে তার কোম্পানীর শেয়ার বিক্রি করেছেন। ভুল বুঝিয়েছিলেন এই বলে যে ভিনি মানুষের কণ্ঠস্বরকে আটল্যানটিক মহাসাগরের অপর পারে পৌঁছে দিতে পারেন। এইজন্য তিনি সর্বসমক্ষে অপমানিত হলেন। আজকে আমরা জানি যে তার দাবি আদৌ মিথ্যা ছিল না। তার আবিষ্কার না থাকলে মানুষের সভ্যতাই কি পিছিয়ে পড়ত না?১৯০৩ সালের ১০ই ডিসেম্বরও নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়তে রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের জ্ঞানবুদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল,, কারন তারা বাতাসের থেকে ভারী একটি যন্ত্র তৈরি

 পৃষ্ঠা:৩০

 করে আকাশে ওড়ার চেষ্টা করছিলেন। এক সপ্তাহ পরে কিটি হক থেকে রাইট ভ্রাতৃদ্বয় তাদের অবিস্মরণীয় আকাশ যাত্রা শুরু করেন।কর্নেল স্যান্ডার্স নামে এক ব্যক্তি ৬৫ বৎসর বয়সে একটি ঝরঝরে গাড়ি এবং সরকারের মাসজিক সুরক্ষা বিভাগ থেকে দেওয়া ১০০ ডলার নিয়ে একটি ব্যবসা শুরু করেন। তার মায়ের কাছে শেখা রন্ধন প্রণালী অনুযায়ী কিছু খাবার তিনি ফিরি করতে বের হলেন। কতগুলি বাড়ি ঘোরার পর তিনি তার প্রথম খদ্দের পেয়েছিলেন? গননা করে দেখ্য গেছে যে প্রায় ১০০০টি বাড়ি ঘোরার পর তিনি তার প্রথম খদ্দের পান। আমাদের মধ্যে কতজন এরকম অধ্যবসায় দেখাবেন। অনেকেই ৩টি বাড়ি, ১০টি বাড়ি কিংবা ১০০টি বাড়ি ঘোরার পর হতাশ হয়ে বলবেন যে আমরা প্রচুর চেষ্টা করেছি।অল্প বয়সে বিখ্যাত ব্যঙ্গচিত্রকর ওয়াল্ট ডিসনে অনেক খবরের কাগজের সম্পাদকের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন। তারা বলেছিলেন যে ডিসনের কোন প্রতিভা নেই। একদিন গির্জার এক পাদ্রী তাকে কিছু ব্যঙ্গচিত্র আঁকার ফরমাশ করেন। ডিসনে গির্জার কাছে একটা ছোট চালাঘরে বাসা বেঁধেছিলেন, যেখানে অনেক ইঁদুর ঘোরাফেরা করত। একটি ছোট ইঁদুর দেখে তার ভালো লাগে এবং সেটি শেষপর্যন্ত তার বিখ্যাত মিকি মাভস’-এ পরিণতি লাভ করে। এইটি অবলম্বন করে ওয়াল্ট ডিম্নেও বিশ্ববিখ্যাত হয়ে ওঠেন। সফল মানুষেরা খুব বিরাট কিছু কাজ করেন না। তারা সামান্য কাজকেই তাদের নিষ্ঠা ও সততা দিয়ে বৃহৎ করে তোলেন। একদিন কানে আংশিকভাবে কালা ৪ বৎসরের একটি বাচ্চা স্কুল থেকে বাড়িতে ফিরল তার মাষ্টারমশাইয়ের একটি ছোট চিঠি নিয়ে। মাষ্টারমশাই তার মাকে লিখেছেন, ” আপনার টমি এত বোকা যে তার পক্ষে লেখাপড়া শেখা সম্ভব নয়। তাকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিন”। বালকটির মা প্রতিজ্ঞা করলেন,” আমার টমি মোটেই বোকা নয় আমি তাকে নিজেই পড়াব” এবং সেই টমি পরবর্তীকালে বিখ্যাত টমাস এডিসন হিসাবে পরিচিত হয়েছিলেন। এডিসন মাত্র ৩. মাস স্কুলের শিক্ষা লাভ করেছিলেন এবং তিনি ছিলেন আংশিকভাবে বধির।হেনরি ফোর্ড যে প্রথম গাড়িটি তৈরি করেছিলেন তাতে তিনি পিছিয়ে যাওয়ার গিয়ার দিতে ভুলে গিয়েছিলেন। এই মানুষগুলি কি জীবনে অসফল। তাদের সমস্যা ছিল না তা নয় কিন্তু তারা সমস্ত সমস্যাকে জয় করে সফল হয়েছিলেন। কিন্তু বাইরের লোকের কাছে মনে হতে পারে যে তারা কেবলমাত্র ভাগ্যবান বলেই সফল হয়েছিলেন।সমস্ত সাফল্যের পিছনেই আছে ব্যর্থতার কাহিনী। একটিই শুধু তফাৎ যে প্রতিটি ব্যর্থতা সাফল্য লাভের জন্য উজ্জীবিত করে। একেই বলে পরান্ত হয়েও সামনে এগিয়ে যাওয়া, পরাস্ত হলেও পিছিয়ে পড়া নয়। ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ক্রমাগত সামনে এগিয়ে যেতে হয়। ১৯১৪ সালে ৬৭ বৎসর বয়সে টমাস এডিসনের কয়েক মিলিয়ন ডলারের কারখানা আগুনে বিনষ্ট হয়। কারখানাটির বিমা করা ছিল না। বয়স্ক এডিসন দেখলেন তার জীবনের সমস্ত প্রচেষ্টার ফলশ্রুতি ভক্ষে পরিণত হল এবং মনে মনে বললেন, “বিপর্যয়ের মধ্যে একটা মহৎ শিক্ষা আছে, আমাদের সমস্ত ত্রুটি বিচ্যুতি পুড়ে ছাই হয়ে গেল। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ আমরা আবার নতুন করে শুরু করব। এই বিপর্যয় সত্ত্বেও ৩ সপ্তাহ পরে তিনি Phonograph’ যন্ত্র আবিষ্কার করেন। কী অসাধারণ গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি!

পৃষ্ঠা ৩১ থেকে ৪৫

পৃষ্ঠা:৩১

সাফল্য: নীচে জীবনে সফল ব্যক্তিদের ব্যর্থতার আরও কিছু উদাহরণ দেওয়া হল-* টমাস এডিসন যখন বৈদ্যুতিক বাল্ব তৈরির জন্য চেষ্টা করছিলেন তখন কমবেশি ১০০০০ বার ব্যর্থ হয়েছিলেন।* হেনরি ফোর্ড ৪০ বৎসর বয়সে দেউলিয়া হন।* লী আইয়াকোক্কাকে ৫৪ বৎসর বয়সে দ্বিতীয় হেনরি ফোর্ড চাকরি থেকে বিতাড়িত করেন।* তরুণ বেটোভেনকে অনেকে বলেছিলেন যে তার কোন প্রতিভা নেই, কিন্তু এই ব্যক্তি কয়েকটি সর্বশ্রেষ্ঠ সুর সৃষ্টি করেছেন।জীবনের পথে চলতে বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হওয়া অবশ্যম্ভাবী। এরূপ বাধা আমাদের এগিয়ে চলার ক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেয় এবং সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বিনম্রতা ও শেখায়। দুঃখের মধ্যে দিয়েই বাধা-বিপত্তিকে জয় করার সাহস এবং আত্মবিশ্বাস পাওয়া যাবে। আমাদের বিজয়ী হওয়ার শিক্ষাই নেওয়া উচিত বিজিত হওয়ার নয়। ভয় এবং সন্দেহ মনকে হতাশার অন্ধকারে ডুবিয়ে দেয়।প্রত্যেকেরই বিপত্তির পর নিজেকে এই প্রশ্ন করা উচিত: এই অভিজ্ঞতা থেকে আমি কী শিখলাম? কেবলমাত্র আত্মবিশ্লেষণের ফলে বাধার অবরোধকে উন্নতির সোপানে পরিণত করা যাবে। যদি মনে কর (If you think)পরাজয়কে মেনে নিলেই তুমি পরাজিত। মনে যদি তোমার সাহস না থাকে, তবে জেতার আশা কোরোনা। যদি মনে দ্বিধা থাকে তুমি পারবে কিনা, তাহলে মনে রেখো তুমি হেরেই গেছ। হারবে ভাবলে, হার তোমার হবেই কারণ, সাফল্য থাকে মনের ইচ্ছাশক্তিতে, মনের কাঠামোতে। যদি ভাব অন্যদের তুলনায় তোমার কাজের মান নিচু, তাহলে তুমি নীচেই থাকবে। যদি তুমি ওপরে উঠতে চাও। তাহলে নিজের মনে সংশয় রেখো না। কারণ সংশয় থাকলে প্রত্যাশা পূরণ হয় না। জীবন যুদ্ধে সব সময় বলবান ও দ্রুতগামীরা জেতে না, যে আত্মবিশ্বাসে অটল, সে আজ হোক, কাল হোক, জিতবেই।  সর্বোত্তম দান (The greatest gift) সমস্ত জীবজন্তুর মধ্যে শারীরিকভাবে মানুষই সবচাইতে অসহায়। মানুষ পাখির মতো

পৃষ্ঠা:৩২

আকাশে উড়তে পারে না, একটি ছোট কীটও তার মৃত্যুর কারণ হতে পারে, নেকড়ের মতো দৌড়াতে পারে না, কুমীরের মতো সাঁতার কাটতে জানে না, বানরের মতো গাছে চড়তে পারে না, বেড়ালের মতো চোখের দৃষ্টি নেই। বুনোবেড়ালের মত থাবা এবং দাঁত নেই। শারীরিক দিক দিয়ে খুবই অসহায় এবং অরক্ষিত, কিন্তু প্রকৃতি যথেষ্ট বিবেচক এবং দয়াশীল বলে মানুষকে দিয়েছেন চিন্তা করার ক্ষমতা। তাই সে নিজেই তার পরিবেশ তৈরি করে নিতে পারে। অন্য জীবজন্তুদের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। দুঃখের বিষয় খুব কম লোকই প্রকৃতির এই মহৎ দান, চিন্তার ক্ষমতা সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে থাকে।আসফল মানুষেরা সাধারণত দু’রকমের: যারা চিন্তা না করে কাজ করে অসফল হয়েছে দ্বিতীয়ত, যারা চিন্তা করে কিন্তু কখনো কোন কাজ করেনি। জীবনের পথে চলতে গিয়ে চিন্তা করার ক্ষমতাকে ব্যবহার না করা, লক্ষ্যস্থির না করে গুলি ছোড়ার মত অর্থহীন।জীবন একটি কাফেটরিয়ার মতো। একটি ট্রে হাতে নিয়ে খাবার পছন্দ করে নিন তারপর দাম মিটিয়ে দিন। যদি আপনি খাবারের দাম দিতে প্রস্তুত থাকেন, আপনি যে কোন খাবারই নিতে পারেন। কাফেটরিয়াতে যদি আপনি অপেক্ষা করেন যে ওয়েটার এসে আপনাকে খাবার দিয়ে যাবে, আপনি অপেক্ষাই করবেন, খাবার পাবেন না। জীবনও এই রকম, আপনি পছন্দ করুন এবং দাম মিটিয়ে আপনার প্রাপ্য জিনিস নিয়ে নিন।জীবনে পছন্দ করতে হয় এবং আপসও করতে হয়। (Life is full of choices and compromises)উপরের কথাটিতে পরস্পর-বিরোধিতা আছে। জীবনে যদি আপনি পছন্দমত পথ বেছে নেওয়ার বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার অবকাশ থাকে তাহলে সমঝোতা করার প্রশ্ন কোথায়? এখানে স্মরণ রাখা দরকার পছন্দ বা নির্বাচন করতেও আপস করতে হয়। বিষয়টি বিশদভাবে আলোচনা করা যাক।জীবন কিভাবে পছন্দ অনুযায়ী বেছে নেওয়া যায়? (Howis life full of choices?)যখন আমরা বেশি খাই, তখন আমরা জানি আমরা মোটা হবই। যখন বেশি মদ খাই তখন নিশ্চিত জানি পরদিন সকালে মাথা ধরবেই। যখন মদ্যপান করে গাড়ি চালাই, তখন আমরা বেছে নিই যে দুর্ঘটনায় হয় নিজে মারা যাব কিংবা কাউকে চাপা দিয়ে মারব। যখন অপরের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করি তখন জানি যে সেও সুযোগ পেলে আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবে। যখন আমরা অন্য মানুষের তোয়াক্কা করি না, তখন আমরা বুঝেই নিই যে তারাও আমাদের তোয়াক্কা করবে না। কোন বিশেষ ধরনের জীবন বেছে বা পছন্দ করে নেওয়ার কিছু ফলাফল আছে। স্বাধীনভাবে বেছে নেওয়া যায়, কিন্তু একবার বেছে নেওয়ার পর যে কারণে বেছে নিয়েছি সেই কারণগুলি আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে। নিজ নিজ জীবনযাত্রা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আমাদের সমান সুযোগ আছে, কিন্তু আমাদের নির্বাচিত জীবনযাত্রা অনুসরণ করতে গিয়ে আমরা একে অন্যের থেকে ভিন্ন হয়ে পড়ি। জীবন কুমোরের কারখানার মতো, মাটি থেকে অনেক আকারের হাঁড়ি, কলসী, পাত্র তৈরি করতে পারা যায়। একইভাবে আমরা যেভাবে চাই সেভাবেই জীবন গড়ে তুলতে পারি। কিন্তু বিভিন্ন পাত্র তৈরির জন্য ভিন্ন ভিন্ন ধরনের কৌশলের প্রয়োজন।

পৃষ্ঠা:৩৩

জীবণে আগন করতে হয় কেন? (How is life full of compromises?)জীবন কেবল আনন্দ আর হৈ হুল্লোড় নয়, জীবনে অনেক যন্ত্রণা ও হতাশা আছে। অনেক অচিন্তনীয় ঘটনা ঘটে। অনেক সময় সববিষয় ওলটপালট হয়ে যায়। ভালো লোকেরাও অত্যন্ত কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়েন। কোন কোন ঘটনা মানুষের ক্ষমতার বাইরে যেমন শারীরিক অক্ষমতা কিংবা জন্মগত ত্রুটি। আমরা আমাদের মাতাপিতা নির্বাচন করতে পারি না কিংবা জন্মের উপর আমাদের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। সেই ক্ষেত্রে যদি কোনও দুর্ভাগ্যের কারণ ঘটে তবে তা দুঃখজনক নিশ্চয়ই। কিন্তু তার জন্য কি আমরা কেবল আক্ষেপ করব, না যা আছে তাই নিয়ে সাধ্যমত চেষ্টা করব? এই সিদ্ধান্তই নিতে হবে।একটি পরিষ্কার দিনে লেকের জলে শত শত নৌকা বিভিন্ন দিকে ঘুরে বেড়ায়। যদিও বাতাস একদিকেই বয় তবুও পালতোলা নৌকাগুলি ভিন্ন ভিন্ন দিকে যাতায়াত করে। কিভাবে করে? এটা নির্ভর করে কিভাবে তাদের পালগুলি লাগানো হয়েছে তার উপর। এবং যিনি নৌকা চালান তিনি পালগুলিকে নির্দিষ্ট দিকে যাবার জন্য সেইভাবে ঘুরিয়ে ধরেন। এই অবস্থা আমাদের জীবনের ক্ষেত্রেও সত্য। আমরা বাতাসের গতিপথ বদলাতে পারি না কিন্তু আমরা জীবনের পালকে কিভাবে লাগাব যাতে বাতানের গতির সুবিধা নিতে পারি, তা আমরা নির্ধারণ করতে পারি।আমরা পছন্দমত পারিপার্শ্বিক অবস্থার সৃষ্টি করতে পারি না, কিন্তু আমাদের মনোভাবকে আমাদের পছন্দমত কাজের উপযোগী করে নিতে পারি। সেই মনোভাব হবে সমস্ত প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও বিজয়ীর মনোভাব, পরাজিতের মনোভাব নয়। আমাদের মনোভাবই আমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করে।মেঘ ও রৌদ্র এই দুইয়ে মিলেই তৈরি হয় রামধনু। আমাদের জীবনও কোন ব্যতিক্রম নয়। সেখানেও আছে সুখ এবং দুঃখ, ভালো এবং মন্দ, অন্ধকার এবং আলো। আমরা যদি প্রতিকূলতাকে ‘উপযুক্ত’ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অতিক্রম করতে পারি তাহলে আমাদের শক্তিবৃদ্ধি ঘটে। জীবনে যেসব ঘটনা ঘটে তাদের সবগুলিকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনা। কিন্তু আমরা কিভাবে ঐ ঘটনার মোকাবিলা করব, সেই পদ্ধতিটি আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। রিচার্ড ব্রেসনীডেন (Richard Blechnyden) ১৯০৪ সালে সেন্টলুই বিশ্ব মেলায় ভারতের চা কে জনপ্রিয় করার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি চা খাওয়াতে গিয়ে দেখলেন যে পরম বলে কেউ বিশেষ চায়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেনা। বরং অন্য ঠান্ডা পানীয়গুলি বেশ জাঁকিয়ে ব্যবসা করছে। তখন তিনি ঠিক করলেন যে ডাকেও ঠান্ডা পানীয়রূপে বিক্রি করা যায়। তিনি ঐভাবে চা বিক্রি শুরু করলেন এবং লোকে তা পছন্দ করল। এইভাবে পৃথিবীতে ঠাপ্প চা পানীয় হিসাবে প্রথম প্রচলিত হল। জীবনে যখন কোন বিপর্যয় ঘটে তখন আমরা হয় দায়িত্বশীলভাবে কিংবা ক্ষোভের সঙ্গে তার মোকাবিলা করতে পারি। এক বৃক্ষের ফলের যেমন কোন বেছে নেওয়ার শক্তি নেই, মানুষ কিন্তু সেরকম নয়। ওক বৃক্ষের বীজ ঠিক করতে পারে না সে দৈত্যাকার ওক গাছ হবে না কাঠবিভূলির খাদ্য হবে। এ সম্পর্কে বীজ কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। মানুষের *Adapted from The Best of … Bits & Pieces, Economic Pres, Fairfield, NJ. 1994, p-98.

পৃষ্ঠা:৩৪

বেছে নেওয়ার ক্ষমতা আছে। প্রকৃতি যদি আমাদের হাতে একটি পাতিলেবু দেয় তাহলে আমরা বেছে নিতে পারি, প্রকৃতির কৃপণতায় হা হুতাশ করব, না পাতিলেবুটিতে লেমোনেড তৈরিতে ব্যবহার করব। যে সব গুণাবলী মানুষকে সফল হতে সাহায্য করে (Qualities that make a person successful) ১. আকাঙক্ষা (Desire) সাফল্যের চালিকাশক্তি আসে সিদ্ধিলাভের জ্বলন্ত আকাঙ্ক্ষা থেকে। নেপোলিয়ন হিল লিখেছেন, “মানুষের মন যা কল্পনা করে এবং বিশ্বাস করে, মানুষ তা অর্জন করতে পারে।” এক তরুণ সক্রেটিসকে জিজ্ঞাসা করেছিল, সাফল্য লাভের রহস্য কি; সক্রেটিস তাকে পরে দিন নদীর ধারে দেখা করতে বললেন। দেখা হবার পর দু’জনে জলের দিকে এগোতে খাকলেন এবং একগলা জলে গিয়ে দাঁড়ালেন। হঠাৎ কিছু না বলে সক্রেটিস ছেলেটির গাড় ধরে জলের মধ্যে ডুবিয়ে দিলেন। ছেলেটি জলের উপরে মাথা তোলবার যতই চেষ্টা করে সক্রেটিস ততই তাকে শক্তহাতে জলের নীচে ডুবিয়ে রাখলেন। বাতাসের অভাবে নীল হয়ে গেল ছেলেটির মুখ। সক্রেটিস তখন তার মাথাটি জলের উপর তুললেন। ছেলেটি হাঁসফাঁস করে বুকভরে নিশ্বাস নিল। সক্রেটিস জিজ্ঞেস করলেন, “যতক্ষণ জলের নীচে ছিলে ততক্ষণ তুমি সবচেয়ে আকুলভাবে কি চাইছিলে?” ছেলেটি জবাব দিল বাতাস। সক্রেটিস বললেন এটিই সাফল্যের রহস্য। তুমি যেভাবে বাতাস চাইছিলে সেইভাবে যখন সাফল। চাইবে তখন তুমি সাফল্য পাবে। সাফল্যের কোন গূঢ় রহস্য নেই। কোন কাজ সুসম্পন্ন করতে হলে শুরু করতে হয় একটি জ্বলন্ত আকাঙক্ষা দিয়ে। অল্প আগুন যেমন অনেক উত্তাপ দিতে পারে না তেমনি দুর্বল ইচ্ছাশক্তি কোন মহৎ সিদ্ধিলাভ করতে পারে না। ২. অঙ্গীকার (Commitment) কোনও কাজ নিষ্পত্তি করার দৃঢ় অঙ্গীকার নির্মাণ করতে হয় দুটি স্তম্ভের উপর। সেদুটি হল সততা এবং বিজ্ঞতা। একজন ম্যানেজার তার কর্মচারীদের এই কথাটি বেশ সুন্দর করে বলেছিলেন, “যদি তোমার আর্থিক ক্ষতিও হয় তবু তোমার অঙ্গীকারে দৃঢ় থাকার নামই সততা এবং বিজ্ঞতা হচ্ছে, যেখানে ক্ষতি হবে সেইরকম বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ না হওয়া।” সাফল্য ও সমৃদ্ধি আমাদের চিন্তা ও সিদ্ধান্তের ফলশ্রুতি। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে কী কী চিন্তা আমাদের জীবনকে প্রভাবিত করবে। সাফল্য কোন আকস্মিক ব্যাপার নয়, এটি আমাদের মনোভাবের ফলশ্রুতি। খেলার জয়লাভের জন্য অঙ্গীকারবদ্ধতা আবশ্যকণ জেতার জন্য খেলা এবং না হারার জন্য খেলা-এই দু’য়ের মধ্যে একটি বিরাট পার্থক্য আছে। যখন আমরা জেতার জন্য খেলি তখন আমরা বিশেষ উৎসাহ এবং অঙ্গীকার নিয়ে খেলি; কিন্তু যখন না হারার জন্য খেলি তখন জেতার উৎসাহ ও অঙ্গীকার থাকে না বলে অপেক্ষাকৃত দুর্বল মনোভাব নিয়ে খেলে থাকি। যখন আমরা না হাবার জন্য খেলি তখন আমরা অসাফল্যকে এড়িয়ে যাবার জন্য খেলি। আমরা সকলেই জিততে চাই, কিন্তু। অনেকেই জেতার জন্য যে মূল্য দিতে হয় তা দিতে প্রস্তুত থাকে না। জয়ীরা জেতার জন্য। অঙ্গীকারবদ্ধ। জেতার জন্য খেলার মধ্যে থাকে অনুপ্রেরণা আর না হারার জন্য খেলার মধ্যে থাকে বেপরোয়াভাব।

পৃষ্ঠা:৩৫

কোন আদর্শ অবস্থা বলে কিছু নেই, কখনো থাকবেও না। কোন জায়গায় পৌঁছতে হলে আমরা কেবল লক্ষ্যহীনভাবে চললেই হবে না আবার নোঙ্গরে বাঁধা থাকলেও চলবে না। কখনো অনুকূল বাতাসে পাল তুলে চলতে হবে। কখনো বাতাসের বিপরীতে চলতে হবে, কিন্তু আমাদের পরিকল্পনামাফিক যাত্রা করতেই হবে। কোন প্রশিক্ষক বা কোন অ্যালিকে যদি জিজ্ঞেস করা যায় খেলাধূলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো এবং সবচেয়ে খারাপ দলের মধ্যে পার্থক্য কতটা তাহলে জানা যাবে যে তাদের শারীরিক গঠন, ক্ষমতা এবং দক্ষতায় খুব বেশি পার্থক্য নেই। সবচেয়ে বেশি তফাৎ দেখা যাবে দুই দলের আবেগের ক্ষেত্রে। বিজয়ী দলের আছে একান্তভাবে নিয়োজিত করার প্রেরণা, যার ফলে তারা অতিরিক্ত প্রয়াসে সক্ষম। বিজয়ীর কাছে-* প্রতিযোগিতা যত কঠিন জয়ের প্রেরণা তত বেশি।* উদ্দীপ্ত মনোভাবও তত বেশি।দক্ষতাও উন্নততর।জয়ও মধুরতর।নতুন সংকট সুপ্ত সম্ভাবনাকে জাগ্রত করে। অনেক অ্যাথলেটই তাদের সবচেয়ে বেশি দক্ষতা দেখিয়েছেন যখন তার প্রতিদ্বন্দ্বির‍্যা ও প্রতিকূলতা ছিল অনেক বেশি। সেই সময়ই তারা তাদের অন্তনির্হিত শক্তিকে সম্পূর্ণরূপে প্রয়োগ করেছেন।“আমি যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ি এবং অনুশীলন থামাতে চাই তখন ভাবি যে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী কি করছে। যখন দেখি সেও অনুশীলনে ব্যস্ত তখন আমিও নিজেকে অনুশীলনে ব্যাপৃত করি। যখন আমি দেখি যে সে অনুশীলন ছেড়ে স্নান করছে তখন আমি আরও বেশি কিছুটা অনুশীলন করে নিই”।Dan Gable, কুস্তিতে অলিম্পিকের স্বর্ণপদক বিজয়ী।কেবলমাত্র লক্ষ্যে পৌঁছানোই সাফল্য নয়। পৌঁছানোর জন্য যে প্রচেষ্টা তাও সাফল্যে অন্তর্ভুক্ত। অনেকে হেরে যাবার ভয়ে কখনো চেষ্টাই করে না। আবার অনেকেই নিজেদে অবস্থানে স্থির থাকতে পারে না, এই ভয়ে যে অন্যেরা এগিয়ে গেলে তারা নীচে নেে যাবে। দু’দিকেই একটা ঝুঁকি আছে। যে জাহাজ মহাসমুদ্রে যাত্রা করে তাদের ঝড়ে পরা ঝুঁকি আছে। কিন্তু যে জাহাজ বন্দরে থাকে সে জাহাজও ধীরে ধীরে মরচে ধরে নষ্ট হে যাবার ঝুঁকি থাকে। এইটিই হচ্ছে জয়ের জন্য খেলা এবং না হারার জন্য খেলা এ দু’য়ের মধ্যে তফাৎ। জয়ী হবার জন্য অঙ্গী কারবদ্ধ হলে তাকে ঝুঁকি নিতেই হবে। যে স মানুষ জয়ের জন্য খেলে তারা সংকট এবং চাপের মুখে নিজেদের প্রকাশিত করতে পাে আর যারা না হারার জন্য খেলে তারা জানে না কিভাবে জিততে হয়।জয়ের জন্য যারা খেলে, তারা জয়ের বাসনাতেই কঠিন প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। যারা হারার জন্য খেলে চাপ তাদের শক্তিক্ষয় করে। তারা কখনোই তাদের সুপ্ত ক্ষমতা। সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করতে পারে না। তারা হেরে যাবার সম্ভাবনায় শক্তি ক্ষয় করে। জেত জন্য তাদের প্রচেষ্টাকে সংহত না করে হেরে যাবার দুর্ভাবনায় তারা শক্তি ক্ষয় করে। বিজিতরা চান নিরাপত্তা, জয়ীরা চান সুযোগ। বিজিতরা মৃত্যুর থেকে জীবনকে যে ভয় করেন। অসফল হওয়া দোষের কিছু নয় কিন্তু চেষ্টার অভাব একটি বড় ধরনের বিচ্যুতি “জীবনের যে কোন ক্ষেত্রেই হোক না কেন, একজন মানুষের জীবনযাত্রার মান ত উৎকর্ষের প্রতি অঙ্গীকারের সঙ্গে”। Vince Lombardi

পৃষ্ঠা:৩৬

দৃঢ় বিশ্বাস থেকেই অঙ্গীকারবদ্ধতা জন্মায় উৎকর্ষ বিচার করে বেছে নেওয়ার ক্ষমতা ও দৃঢ় বিশ্বাস-এই দু’য়ের মধ্যে তফাৎ আছে। উৎকর্ষের ভিত্তিতে বেছে নেওয়া ঘটনাচক্রে পরিবর্তিত হতে পারে; কিন্তু দৃঢ়বিশ্বাস অপরিবর্তিত থাকে। চাপ বা বিপত্তির সম্মুখে অগ্রাধিকার গুল্টপালট হয়ে যায় কিন্তু দৃঢ়বিশ্বাস দৃঢ়তর হয়, এইজন্য আমাদের একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্যবোধের চেতনা খুবই প্রয়োজনীয়। এর ফলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাসগুলি মূল্যবোধের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয় এবং এই বিশ্বাস ধীরে ধীরে আমাদের অঙ্গীকারবদ্ধ করে।৩. দায়িত্ববোধ (Responsibility)“যে কর্তব্য আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয় তা শেষপর্যন্ত আনন্দের উৎস হয়”George Gritter মচরিত্রবান লোকেরা দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তারা সিদ্ধান্ত নেন এবং নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই নির্ধারিত করেন। দায়িত্ব নেওয়ার অর্থ ঝুঁকি নেওয়া এবং জবাবদিহির দায় নেওয়া। এটি অনেক সময় অস্বস্তিকর। বেশির ভাগ লোকই কোন দায়িত্ব না নিয়ে স্বস্তিতে নিরুপদ্রব জীবন যাপন করতে চান। তারা লক্ষ্যহীনভাবে জীবনে এগিয়ে চলেন এবং জীবনে ভালো কিছুর উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা না করে আপনা থেকে ঘটবে এইজন্য অপেক্ষা করেন। দায়িত্ব নিতে হয় বোকার মত নয়, বিচার বিবেচনা করেই। ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব নেবার অর্থ সমস্ত খুঁটিনাটি পরীক্ষা করে যথোপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া বা কার্যক্রম তৈরি করা। দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা মনে করেন না যে তাদের বাঁচার ব্যবস্থা করে দিতে পৃথিবী দায়বদ্ধ।“মিতব্যয়ী না হয়ে আপনি সম্পদশালী হতে পারেন না। শক্তিমানকে দুর্বল করে আপনি বেলকে শক্তিমান করতে পারেন না। ধনীদের দরিদ্র করে, দরিদ্রকে ধনী করতে পারেন না। মণের টাকায় উন্নত আর্থিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেন না। যারা মজুরি দেয়, নাদের অবস্থায় উন্নতি ঘটিয়ে যারা মঞ্জুরি উপাজর্ন করে তাদের সাহায্য করা যাবে না। ানুষের স্বাধীনতা এবং উদ্যোগ নষ্ট করে চরিত্র এবং মনোবল গঠন করা যাবে না, শ্রণীঘৃণা জাগ্রত করে মানুষের ভ্রাতৃত্ববোধের উন্নতি করা যাবে না, আয়ের থেকে ব্যয় াশি করে সংকট এড়ানো যাবে না। মানুষ নিজে যা করতে পারে বা মানুষের করা উচিত তা রে দিলে মানুষকে স্থায়ীভাবে সাহায্য করা যায় না।” -Abraham Lincoln একটি কোম্পানীল প্রেসিডেন্ট যথারীতি বিদায় সম্ভাষণের পর নতুন প্রেসিডেন্টকে দু’টি ক নম্বর ও দুই নম্বর মার্কা খাম দিয়ে বললেন, “যখন কোন পরিচালনা-সংক্রান্ত সমস্যা দেবে, যা তুমি নিজে মোকাবিলা করতে পারবে না, তখন ১ নম্বর খামটি খুলবে। রবর্তী সংকটকালে দ্বিতীয় খামটি খুলবে।” কয়েক বছর পর একটি গুরুতর সংকট গস্থিত হল। প্রেসিডেন্ট তার আলমারি খুলে প্রথম খামটি বার করলেন। এতে লেখা স.” সংকটের জন্য তোমার পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্টের ঘাড়ে দোষ চাপাও”। কয়েক বছর র দ্বিতীয় সংকট দেখা দিলে প্রেসিডেন্ট তখন দ্বিতীয় খামটি খুললেন, এতে লেখা ছিল, পরবর্তী প্রেসিডেন্টের জন্য এরূপ দুটি খাম তৈরি কর” অর্থাৎ তোমার দিন শেষ।”দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা তাদের ভুলত্রুটি স্বীকার করে নেন এবং ত্রুটি থেকে শিক্ষাগ্রহণ রন। কোন কোন লোক কখনোই কিছু শেখেনা।

পৃষ্ঠা:৩৭

ভুল হলে আমরা তিনটি জিনিস করতে পারি।* ভুলগুলিকে অগ্রাহ্য করতে পারি।* ভুল অস্বীকার করতে পারি।* ভুল মেনে নিয়ে তা থেকে শিক্ষা নিতে পারি।তৃতীয বিকল্পটি অনুসরণ করার জন্য সাহস দরকার। এর মধ্যে ঝুঁকে আছে, কিন্তু এটি সুফলপ্রদত্ত। যদি আমরা ভুল স্বীকার না করি তাহলে যে দুর্বলতার জন্য ভুল হয়েছে তবে সেই দুর্বলতাগুলিকেই আমরা সমর্থন করব এবং শেষ পর্যন্ত সেই দুর্বলতাগুলোই বড় হয়ে আমাদের সমস্ত জীবনকে প্রভাবিত করবে। এই দুর্বলতাগুলোকে শোধরাবার আর কোন সুযোগ থাকবে না। ৪. কঠোর পরিশ্রম (Hard work) আকস্মিকভাবে বা দৈবক্রমে কোন সাফল্য পাওয়া যায় না। এরজন্য প্রস্তুতি ও চরিত্রবল দরকার। প্রত্যেকেই বিজয়ী হতে চায় কিন্তু কতজন প্রস্তুতির জন্য সময় দিতে ও পরিশ্রম করতে ইচ্ছুক। এই প্রস্তুতির জন্য শৃঙ্খলাবোধ ও আত্মত্যাগের প্রয়োজন। কঠিন পরিশ্রমের কোন বিকল্প নেই। হেনরী ফোর্ড বলেছিলেন, “যত বেশি পরিশ্রম করবে তত বেশি ভাগ্যবান হবে।” পৃথিবীতে অনেক ইচ্ছুক কর্মী আছেন তাদের মধ্যে কিছু কাজ করতে ইচ্ছুক আর অন্যেরা চায় তাদের দিয়ে কাজ করিয়ে নিক। “আমি অর্ধেক দিন কাজ করতে চাই তা সে প্রথম ১২ ঘণ্টাই হোক বা দ্বিতীয় ১২ ঘণ্টাই হোক।” -Kammons Wilson, CEO of Holiday Inn. অভিধানের উপর বসে থাকলে যেমন বানানা শেখা যায় না তেমনি কঠোর পরিশ্রম ছাড়া কেউ কোন কিছু করার ক্ষমতা অর্জন করে না। পেশাদার ব্যক্তিরা তাদের কাজকর্মের মূল বিষয়গুলি আয়ত্ত করেছে বলে কাজকে সহজে আয়ত্ত করতে পারে। এ প্রসঙ্গে মাইকেল অ্যানজেলো বলেছেন, “লোকে যদি জানতো, আমার কাজে দক্ষতা অর্জনের জন্য আমাকে কি কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে তাহলে আমার কাজ এত বিস্ময়কর মনে হতো না।” কোনও কোম্পানীর এক কর্মকর্তা একজন প্রার্থী সম্পর্কে খোঁজ খবর করছিলেন। তিনি প্রার্থীর উর্ধ্বতম কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কতদিন ওই ব্যক্তি আপনার কাছে কাজ করেছে?” সেই ভদ্রলোক জবাব দিলেন, “তিন দিন, কর্মকর্তা বললেন, ‘কিন্তু প্রার্থী বলল যে আপনার কাছে তিনবার কাজ করেছে!”, অদ্রলোক বললেন, “ঠিক কথা, কিন্তু সে প্রকৃতপক্ষে কাজ করেছে মাত্র তিন দিন।” একজন গড়পড়তা লোক তার উৎসাহ ও ক্ষমতার শতকরা ২৫ ভাগ কাজের জন্য ব্যয় করে। যারা শতকরা ৫০ ভাগ এর বেশি ক্ষমতা ও উৎসাহ ব্যয় করেন তারা বিশ্বসুদ্ধ মাজের অভিনন্দন পান। এবং যারা শতকরা ১০০ ভাগ ব্যয় করেন তাদের জন্য থাকে সারা পৃথিবীর মানুষের উচ্ছ্বসিত কৃতজ্ঞতাবোধ।-Andrew Carnegie যারা সফল হয় তারা জিজ্ঞেস করে কতটা বেশি কাজ করতে হবে। তারা জানতে চায় না কত কম কাজ করতে হবে; তারা জানতে চায় কতঘণ্টা বেশি সময় লাগবে, কত কম সময় নয়। শ্রেষ্ঠ গায়কেরা প্রত্যেকদিন অনুশীলন করেন বিজয়ীদের সবাইকে পরাস্ত করে জয়ী হবার জন্য, কৈফিয়ত দেওয়ার কারণ নেই, কঠোর এবং দীর্ঘ সময় পরিশ্রমের ফলেই সাফল্য এসেছে। আমরা যা কিছু ভোগ করি তো কারোর না কারোর কঠিন পরিশ্রমের

পৃষ্ঠা:৩৮

ফল। কিন্তু কাজ দৃশ্যমান আর কিছু অগোচরেই থেকে যায়। কিন্তু দুইই সমান গুরুত্বপূর্ণ। কিছু কিছু ব্যক্তি নির্দিষ্ট মাইনের পাকা চাকরি পেলেই কাজ করা বন্ধ করে দেয়। বেকারের সংখ্যা যতই বেশি হোক ভালোভাবে কাজ করে এইরকম সচরাচর দেখা যায় না। অনেক মানুষই অলস সময় এবং অবসর সময় এই দু’য়ের মধ্যে পার্থক্য জানে না। অলস সময়ের অর্থ সময়ের অপচয় আর অবসর সময় হল প্রাপ্য সময় না পরিশ্রম করে উপার্জন করতে হয়। দীর্ঘসূত্রতা কাজ না করার সমান। কাজে উৎকর্ষ কোন ভাগ্যের ব্যাপার নয়। এটি কঠিন পরিশ্রম ও অনুশীলনের ফল। যে কাজই হোক না কেন কঠিন পরিশ্রম এবং অনুশীলন কাজে উৎকর্ষ আনে।যারা অপেক্ষা করে তারা হয়ত কিছু পায়, কিন্তু তারা সেইটুকুই পায় যা পরিশ্রমীদের পুরষ্কার দেওয়ার পর উদ্ধৃত্ত থাকে।-Abraham Lincoln কঠোর পরিশ্রমের শুরু ও সমাপ্তি দুই সার্থক।যত কঠিন পরিশ্রম করে ততই ভালো বোধ করে আর যত ভালো বোধ করে ততই কঠিন পরিশ্রমের আগ্রহ হয়। সর্বোক্তম চিন্তাগুলি কার্যে পরিণত না করলে সেগুলি চিন্তাই থেকে যাবে। অনেক মহৎ প্রতিভাও ইচ্ছাশক্তি ও কঠোর পরিশ্রমের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়।প্রকৃতি থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। হাঁস জলের তলায় নিরলস পদচালনা করে চলেছে কিন্তু উপরে সবসময় মসৃণ ও শান্ত-তার পরিশ্রম বোঝা যায় না।একদিন মহান বেহালাবাদক ফ্রিটস ক্রিসলার (Fritz Kreisler) তার বাজনা শেষ করলে একজন স্টেজের উপর এসে বললেন,” আপনার মতো বাজনা শিকতে পারলে আমি জীবন দিয়ে দিতাম”। ক্রিসলার বললেন, “হ্যাঁ, আমি জীবনই দিয়েছি!”সাফল্য লাভের জন্য কোন জাদু দণ্ড নেই। বাস্তব জগতে যারাকাজ করে তাদেরই সাফল্য আসে। যারা শুধু দেখে তাদের নয়। যে ঘোড়া গাড়িটানে, সে লাথি মারতে পারে না। আবার যে ঘোড়া লাথি মারে সে গাড়িটানতে পারে না। গাড়ি টানাটা দরকার, লাথি মারা নয়। কঠিন শ্রম ছাড়া কোনও সাফল্য নেই। প্রকৃতি পাখিদের খাবার সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এগুলি তাদের বাসায় পৌঁছে দেয়নি। খাবার সংগ্রহের জন্য পাখিদের কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। কোন কিছুই সহজে আসে না। মিলটন প্রত্যেকদিন ভোর ৪টেতে উঠতেন,‘প্যারাডাইস লস্ট লেখার জন্য। ওয়েবস্টারের অভিধান সংকলন করার জন্য নোয়া ওয়েবস্টারের ৩৬ বছর লেগেছিল। এমনকি ছোট ছোট কাজেও কঠোর পরিশ্রমের প্রয়োজন হয় এবং ছোট ছোট কাজ বাগাড়ম্বরের থেকে অনেক ভালো।৫. চরিত্র (Character)চরিত্র মানুষের মূল্যবোধ বিশ্বাস ও ব্যক্তিত্বের সমন্বয়। আমাদের কাজেও ব্যবহারে চরিত্র প্রতিফলিত হয়। সবচেয়ে মূল্যবান রত্নের থেকেও সযত্নে চরিত্রকে রক্ষাক্ষরা দরকার। জয়ী হতে হলে চরিত্রের প্রয়োজন। জর্জ ওয়াশিংটন বলেছিলেন,” আশা করি আমার এমন দৃঢ়তা ও সল্গুন আছে যার দ্বারা আমি সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ, সৎ মানুষের চরিত্রকে রক্ষা করতে সমর্থ হব।”নির্বাচন কিংবা জনমত নয়, দেশ নেতার চরিত্রই ইতিহাসের জাতি নির্ধারণ করে। সততার ব্যাপারে কোন অস্পষ্টতা না থাকাই ভালো সাফল্যের পথে অনেক বাধা-বিপত্তি আছে। পদস্খলনের সম্ভাবনা রোধ করার জন্য চরিত্রের শক্তি এবং চেষ্টা প্রয়োজন হয়।

পৃষ্ঠা:৩৯

চরিত্রবল সমালোচকদের আক্রমণে নিরুৎসাহ হওয়া থেকে রক্ষা করে।কেন বেশিরভাগ মানুষ সাফল্য পছন্দ করে কিন্তু সফল মানুষকে ঘৃণা করে?যখনই কোনও ব্যক্তি গড়পড়তা মানুষের উপরে উঠে যাবেন তখনই কিছু লোক তাকে ছিড়ে ফেলতে চেষ্টা করবে। পাহাড়ের চূড়ায় যে ব্যক্তি উঠেছেন তিনি অনায়াসে সেখানে পৌঁছে যাননি-তাকে কষ্ট সহ্য করে উপরে চড়তে হয়েছে। জীবনেও এর ব্যতিক্রম হয়না। যে কোনও পেশায় সফল ব্যক্তিকে অসফল ব্যক্তিরা নিশ্চতভাবে ঈর্ষা করবেন। সমালোচনা যেন লক্ষ্যে পৌঁছাবার অনন্যচিত্ততাকে ক্ষুন্ন না করে। পড়পড়তা মানুষ সমালোচনা এড়িয়ে চলতে চান। কিছু না করলে সমালোচনারও সুযোগ থাকে না। যত বেশি লক্ষ্য সিদ্ধির পথে এগোবেন, ততই সমালোচিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। মনে হয় সাফল্যও সমালোচনার মধ্যে একটা যোগসূত্র আছে। সাফল্য যতবেশি সমালোচনাও ততবেশি।সমালোচকরা সবসময় কাছাকাছিই থাকেন। তারা আংশিক সফল ব্যক্তিদের আরও ভালো করার উপদেশ দেন। স্মরণ রাখা দরকার যে সমালোচকরা জননেতা নয় কিংবা কর্মীও নয়, তাদেরকে বলা উচিত সমালোচকের আসন থেকে কর্মক্ষেত্রে নেমে আসতে।যারা প্রত্যেক বস্তুরই দাম জানেন কিন্তু কোনও বস্তুরই প্রকৃত মূল্য জানেন না তারাই সমালোচক।-Oscar Wilde আর এক জাতের মানুষ আছেন, যারা যতক্ষণ না পর্যন্ত অন্যরা স্বনির্ভর হচ্ছে। ততক্ষণ পর্যন্ত সাহায্য করতে প্রস্তুত। কিন্তু স্বনির্ভর হওয়া মাত্রই সাহায্যকারীরা তাদের জীবন অতিষ্ঠ করে দেন। এটি সংসারের নিয়ম এবং জীবনে সাফল্য লাভ করতে হলে এই সমস্ত ক্ষুদ্রমনা মানুষদের অগ্রাহ্য করতে হবে এরকম ব্যবহার ঈর্ষার ফল।চরিত্র কতকগুলি গুণের সমন্বয়চরিত্র সততা, নিঃস্বার্থপরতা, সংবেদনশীলতা, দৃঢ়বিশ্বাস, সাহস, আনুগত্য এবং শ্রদ্ধার সমন্বয়।মুধুর ব্যক্তিত্ব কিরূপ হয়?এরা একটি বিশেষ শ্রেণীভুক্ত।* আত্ম-নিয়ন্ত্রণে সক্ষম* ব্যক্তিত্বের মধ্যে একটি সমতাবোধ আছে।* ব্যক্তিত্বে আছে দৃঢ়প্রত্যয়ী মনোভাব এবং ানুদ্ধত আত্মবিশ্বাস।* সুবিবেচক।* কখনো অজুহাত দেখাতে অভ্যস্ত নয়। অদ্রতা রক্ষায় এবং সুব্যবহারের খাতিরে এরা অনেক ছোটখাটো ত্যাগস্বীকারে কুষ্ঠিত নয়। * অতীতের ভুল থেকে এরা শিক্ষাগ্রহণ করতে জানে।* এই ধরনের ব্যক্তিত্ব বংশমর্যাদা কিংবা সম্পদের দম্ভ করে না।* অপরকে বিনষ্ট করে এরা নিজেদের উন্নত করে না।* এই ব্যক্তিত্ব কেবল বাইরের আবরণ নয়, অন্তনির্হিত ক্ষমতারও প্রকাশ।* উচ্চশ্রেণীর মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে সংস্পর্শ রক্ষা করেন। এরা মৃদভাষী, সহানুভূতিশীল দৃষ্টি এবং সরলতাপূর্ণ হাসিতে উজ্জ্ব

পৃষ্ঠা:৪০

* এরা অন্তনিহির্ত গর্ববোধের জন্য অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন।* এরা নিজের সঙ্গে এবং অন্যের সঙ্গেও স্বচ্ছন্দ।এদের আভিজাত্য বিজয়ীর প্রাধান্য দেয়।* এরা আশ্চর্যজনকভাবে কার্যসিদ্ধি করতে পারে।* এরা দুঃসাধ্য কাজও সম্পন্ন করতে পারে।* এদের সহজে চেনা যায় কিন্তু ব্যাখা করা সহজ নয়।* এরা সবসময়ই বিনয়ী। জয়ে কিংবা পরাজয়ে সবসময়ই ঔদার্যপূর্ণ।* খ্যাতি কিংবা সম্পদ এরূপ ব্যক্তিত্বের লক্ষণ নয়।* এদের পরিচয় তাদের তকমার দ্বারা হয় না।* এদের ব্যক্তিত্ব চিরন্তন। বংশবদ না হয়েও এরা বিনয়ী ও সুভদ্র। * এরা নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল।* আত্ম-নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ও জ্ঞান এরূপ চরিত্রের বৈশিষ্ট্য।* এরা আত্মনির্ভরশীল।এরা জয়ে ঐদার্যপূর্ণ ব্যবহার করেন পরাজয়েও বোধশক্তিকে বিসর্জন দেয় না।সাফল্য অর্জনের থেকে কিভাবে সফল হওয়ার পর সাফল্যকে ব্যবহার করতে হবে সেটাই অধিকতর কঠিন বিষয়। অনেকেই কিভাবে সফল হতে হয় তা জানেন কিন্তু জানেন না সফল হবার পর তার সাফল্যকে কিভাবে ব্যবহার করবেন। সাফল্য অর্জনের ক্ষমতা এবং সফল ব্যক্তির চরিত্র একে অপরের পরিপূরক। যোগ্যতা সাফল্য এনে দেবে এবং চরিত্র সেই সাফল্য বজায় রাখতে সাহায্য করবে।আমরা নিজেদের প্রকাশ বা আবিষ্কার করি না। আমরা নিজেরা যা হতে চাই সেই ভাবে পরিকল্পনা করি ও গড়ে তুলি।চরিত্রগঠন শৈশব থেকেই শুরু হয়, এবং মৃত্যু পর্যন্ত চলে। সফলতা চরিত্রের উপাদান নয়, বস্তুতপক্ষে চরিত্রই সফলতা। একজন মালি যেমন বাগানকে আগাছামুক্ত রাখতে সর্বদাই বাগানের আগাছা পরিষ্কার করে তেমনি আমাদের চরিত্র গঠন এবং উন্নতি করতে সবসময় আগাছাকে নির্মূল করা প্রয়োজন।প্রতিকূলতা চরিত্রগঠন করে ও চরিত্রের গুণাবলী প্রকাশ করে।প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে কোন কোন ব্যক্তি সর্বোত্তম সাফল্যের সীমা অতিক্রম করে, আবার কেউ কেউ মানসিক দিক থেকে ভেঙে পড়ে। না মার্জনা করলে কোনও বস্তুকে উজ্জ্বল করা যায় না। আগুনে পরিশোধিত না করলে সর্বোত্তম ইস্পাত পাওয়া যায় না। সেইভাবে প্রতিকূলতা মানুষের চরিত্রকে প্রকাশ করে, এবং নিজের কাছে নিজেকে পরিচিত করায়।রাশিয়াতে একটি প্রচলিত কথা আছে, হাতুড়ি কাঁচ ভাঙে, কিন্তু ইস্পাতের পাত তৈরিতে হাতুড়ির দরকার।” এই কথাটির মধ্যে অনেক সত্য আছে। আমরা কাঁচ না ইস্পাত? হাতুড়ি কিন্তু একই থাকে। কার্বন যেমন ইস্পাতের মান নির্ণয় করে তেমন চরিত্র মানুষের মান নির্ধারণ করে।

পৃষ্ঠা:৪১

৬. ইতিবাচক বিশ্বাস (Positive believing) ইতিবাচক চিন্তা ও ইতিবাচক বিশ্বাসের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? আপনার নিজের চিন্তা ভাবনা যদি নিজেই শুনতে পেতেন, তাহলে কি বুঝতে পারতেন তা ইতিবাচক কিংবা নেতিকবাচক চিন্তা? আপনি আপনার মনকে সাফল্যের অথবা অসাফল্যের জন্য প্রস্তুত করেছেন? আপনার চিন্তাই আপনার কাজের উপর প্রগাঢ় প্রভাব বিস্তার করে।প্রত্যেক সকালেই আমরা একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করি কিংবা কর্মপ্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকি। সর্বক্ষেত্রে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে জীবনযাপন করা সহজ হয়। সেইরকম আবার সর্বক্ষেত্রে নেতিবাচক জীবনযাপন সহজ নয়। যদি বেছে নিতে দেওয়া হয় তবে আমি ইতিবাচক জীবনযাপনই গ্রহণ করব।ইতিবাচক চিন্তা নেতিবাচক চিন্তার থেকে ভালো এবং এই চিন্তা আমাদের সামর্থ্যকে পরিপূর্ণভাবে ব্যবহার করতে সাহায্য করে।ইতিবাচক বিশ্বাস ইতিবাচক চিন্তার থেকেও অনেক ব্যাপক। ভাবনাগুলিকে কার্যকর করা সম্ভব। এই বিশ্বাস যখন জন্মায় তকেই বলে ইতিবাচক বিশ্বাস। কাজটি সম্পন্ন করার জন্য আত্মবিশ্বাস দৃঢ় হবে, এইটিই ইতিবাচক বিশ্বাস। প্রস্তুতি না নিয়েই যদি ভাবা যায় যে কার্যসিদ্ধি হবে তবে তা হবে অলীক স্বপ্নের মতো। নীচের কাহিনীটি ইতিবাচক বিশ্বাসের একটি উদাহরণ।Lockheed সংস্থায় ইতিবাচক বিশ্বাসের কারণ আছে কি? কয়েক বছর আগে Lockheedr L-1011 Tristar নামে একটি বিমান তৈরি করেছিল। এই জেট বিমানটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শক্তি পরিমাপের জন্য কোম্পানী ১৮ মাস ধরে কঠোরভাবে পরীক্ষা করন, এই পরীক্ষায় খরচ হলো ১.৫ বিলিয়ন ডলার। বিমানটির হাইড্রোলিক জ্যাক, ইলেকট্রনিক সেনসর এবং কম্পিউটর এটিকে ৩৬০০০ এর বেশি নকল উড়ান করিয়েছিল। এই উড়ানগুলিকে সত্যকারের উড়ান হলে প্রায় ১০০ বছর সময় লাগত। এতগুলি উড়ানে একটিও যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা পড়েনি। অবশেষে আরও অনেক পরীক্ষার পর বিমানটিকে উড়ানোর জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়।”এখন বিশ্বাস করার যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে যে এই বিমানটি নিরাপদে আকাশে উড়তে পারবে। কারণ বিমানটিকে সাফল্যের সঙ্গে উড়ানের জন্য সকল প্রকারের প্রস্তুতি করা হয়েছিল।৭. যা পাওয়া যায় তার থেকে বেশি দিতে হয় (Give more than you get) একবার সফল হওয়া সহজ। যদি জীবনে সবার আগে চলতে চান তাহলে অতিরিক্ত দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। এই অতিরিক্ত পথ চলতে কোন প্রতিযোগিতা নেই। যে কাজের জন্য মাইনে পান তার থেকে অল্প বেশি কাজ করতে কি আপনি তৈরি আছেন? এমন কতজন লোক আছেন যারা মাইনের জন্য যা কাজ করে তার থেকে একটু বেশি কাজAdapted from Daily Motivations for African-American Success by Dennis Kimbro, June 29, 1993, Fawcett Press, New York.

পৃষ্ঠা:৪২

করতে প্রস্তুত? খুব বেশি নয়। অধিকাংশ লোকই যে কাজের জন্য মাইনে পান তার থেকে বেশি কাজ করতে চান না। দ্বিতীয় শ্রেণীর একদল আছেন যারা যতটুকু কাজ না করলে নয় সেইটুকুই করেন। তারা ততটুকুই কাজ করেন যারা দ্বারা চাকরি বজায় রাখা যায়। খুব একটি ক্ষুদ্র অংশ যে কাজের জন্য মাইনে পান তার থেকে কিছু বেশি করতে ইচ্ছুক। তারা বেশি করেন কেন? যদি আপনি এই সর্বশেষ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হন তাহলে প্রতিযোগিতা কোথায়? যে কাজের জন্য মাইনে পাওয়া যায় তার থেকে বেশি কাজ করার সুবিধে এইগুলি-* নিজেকে অন্যদের থেকে বেশি প্রয়োজনীয় এবং অপরিহার্য করে তোলা যায়।* আত্মবিশ্বাসা বেড়ে যায়।পাশাপাশি যারা কাজ করেন তারা কাজের বিষয়ে আপনার নেতৃত্ব স্বীকার করে নেন।* অন্যদের কাছে বিশ্বাস ভারুন হওয় যায়।* উর্ধ্বতন ব্যক্তিরা সম্মান করতে শুরু করেন।* অধস্তন এবং উর্ধ্বতন, দুই তরফেই একটা আনুগত্যের সৃষ্টি হয়।* সহযোগিতা পাওয়া সহজ হয়।‘যদি আপনি কোনও একজন মানুষের জন্য কাজ করেন তাহলে, দোহাই আপনার, তার জন্যই কাজ করুন।-Kim Huvvardবয়স, অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা যাই হোক না কেন, নিম্নবর্ণিত গুণ-সম্পন্ন ব্যক্তিওদের সর্বদাই চাহিদা আছে। যারা কঠোর পরিশ্রমী এবং তদারকি ছাড়াই কাজ করেন; যারা নিয়মানুবর্তী এবং বিবেচক; যারা যত্ন সহকারে শোনেন এবং সঠিকভাবে নির্দেশাবলী পালন করেন; যারা সত্য কথা বলেন; যারা সংকটের মুহূর্তে কাজ করতে ডাকলে নানা অজুহাত দেখান না, যারা কাজের থেকে ফলাফলের দিকে বেশি নজর দেন; যারা সবসময়ই প্রসন্ন এবং আচরণে সুন্দ্র।সবসময়ই চিন্তা করুন, খরিদ্দার, বন্ধু স্ত্রী মাত-পিতা, কিংবা সন্তান-যেই হোক না কেন, যখন কাউকে কিছু দিতে চান তখন যেন প্রকৃত মূল্যের থেকে কিছু বেশি দিতে পারেন। যখন কিছু কাজ করেন তখন চিন্তা করুন, “আমি কিভাবে যে কাজ করছি তাতে কিছু অতিরিক্ত মূলা যোগ করতে পারি? অথবা অন্যকে আমি অতিরিক্ত কিছু কিভাবে দিতে পারি?”সাফল্যের সূত্রটিকে চারটি শব্দে সংক্ষেপে বলা যেতে পারে, “এবং আরও কিছু বেশি……।” সফল ব্যক্তিরা প্রত্যাশিত কাজতো করেই এবং তারপর আরও কিছু বেশি করেন। তারা তাদের কর্তব্য করেন এবং তারপর আরও কিছু বেশি করেন। তারা অদ্র এবং উদার এবং তার চেয়ে কিছু বেশি। তাদের উপর আরও বেশি নির্ভর করা যেতে পারে। তাদের শক্তি সামর্থ্যের সমস্তটাই কাজে নিয়োগ তো করেনই এবং আরও কিছুবেশি করেন। নির্ভরশীলতা, দায়িত্বশীলতা এবং চরিত্রের নমনীয়তা ছাড়া কার্যক্ষমতা বোঝা-স্বরূপ হয়।কেন কোনও কোনও বুদ্ধিমান ব্যক্তি তাদের চমকপ্রদ শিক্ষাগত যোগ্যতা সত্ত্বেও বফলতার জীবন্ত প্রতীক হয়ে থাকেন। অথবা খুব বেশি হলে মামুলীভাবে জীবনযাত্রা নির্বাহ করেন? কারণ তারা সমস্ত বিষয়ের নঞর্থক দিকগুলি সম্পর্কে অনুসন্ধান করে দক্ষ

পৃষ্ঠা:৪৩

হয়েছেন এবং একটি নেতিবাচক শক্তির ভাণ্ডার তৈরি করেছেন। তারা যে কাজের জন্য পারিশ্রমিক পান সে কাজটা করতে চান না অথবা যতটুকু কাজ না করলে নয় ততটুকুই করেন। আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই যে তারা বিফলতার জীবন্ত প্রতীক হয়ে উঠবেন। যখন আমরা যে কাজের জন্য পারিশ্রমিক পাই তার থেকে বেশি কাজ করি তখন আমাদের কোন প্রতিদ্বন্দ্বী থাকে না। প্রকৃতপক্ষে তখন আমাদের প্রতিযোগিতা নিজেদের সঙ্গে। মেধা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির থেকে এই দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্ব অনেক বেশি।৮ অধ্যবসায়ের শক্তি (the power of persistence)অধ্যবসায়ের বিকল্প নেই। যাদের সহজাত দক্ষতা আছে তাদেরও অধ্যবসায়ের প্রয়োজন। প্রকৃতপক্ষে সহজাত দক্ষতা ছিল, অথচ সফল হতে পারেননি। এমন লোকের সংখ্যা কম নয়। প্রতিভাবানদেরও অধ্যবসায়ের প্রয়োজন কথায়। আছে,’ সাফল্যবিহীন প্রতিভা’ অর্থাৎ প্রতিভা থাকলেই সফল হওয়া যায় না। শিক্ষাও অধ্যাবসায়ের বিকল্প নয়।শিক্ষিত, অথচ অসফল মানুষে পৃথিবী ভর্তি। অধ্যবসায় ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ মানুষেরাই সর্বশক্তিমান। -Calvin Coolidgeআপনার ক্ষমতা সর্বোত্তমরূপে প্রকাশ করা সহজ নয়। পথে অনেক বাধা-বিপত্তি। বিজয়ীরা বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে আরও কঠোর প্রতিজ্ঞা নিয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রত্যাবর্তনেরক্ষমতা রাখেন।পলায়ন নয় (Don’t quit)যখন কোনও কিছুই ঠিকমতো হয় না,এবং কোনও না কোনও সময় এরকমহবেই,যখন সামনে চলার পথ কেবল খাড়া চড়াই যখন সম্বলহীন, কিন্তু ঋণের বোঝা ভারী,যখন হাসতে গেলে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে, যখন দুশ্চিন্তার ভার চেপে বসেছে মনে,তখন, যদি একান্তই ইচ্ছা হয়, তবে বিশ্রাম নাও;কিন্তু রণক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যেও না।আমরা জানি জীবনের পথে অনেক মোড়, অজস্র পাকদী, এই সবের জন্যই জীবনের বৈচিত্রা।অনেক সময় পরাজয় এনেছে হতাশা,যদি থাকত অধ্যবসায় তবেঅনেকগুলিই হয়তো সাফল্যে রূপান্তরিত হোত।ভাই, ক্লান্তি যদি চলার গতি মন্থর করে দেয়, তবুও হার মেনে থেমে যেও না।আর একবার প্রাণপণ চেষ্টায় এগিয়ে চল,এবার হয়ত জিতে যাবে।বিফলতার অন্তু পিঠেই সাফল্য।সন্দেহের কালো মেঘ বখন আশার রূপালী রেখাকেআড়াল করে দেবে.,তখন জানতেও পারবে না সাফল্য কত নিকটে।

পৃষ্ঠা:৪৪

যখন দূরে মনে হবে, তখন হয়ত সত্যিই খুব কাছে। তাই যদি কঠিনতম আঘাতও আসে, তবু যুদ্ধ চালিয়ে যাও, অবস্থা সঙ্গীন হয়ে উঠলেও পলায়নের চিন্তা কোরো না।প্রসিদ্ধ বেহালাবাদক ফ্রিটৎস ক্রিসলার (Fritz Kreisler) কে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “তুমি কী করে এত ভালো বাজাও? এটা কি ভাগ্যের জোরে?” ক্রিসলার জবাব দিলেন, “অনুশীলন করি বলেই ভালো বাজাতে পারি। আর কিছু ব্যাপার নেই এর মধ্যে। যদি একমাস অনুশীলন না করি তবে আপনিই তফাৎ বুঝতে পারবেন। এক সপ্তাহ না করলে আমার স্ত্রী বুঝতে পারবেন। আর একদিন অনুশীলন না করলে আমার কাছে তফাৎ ধরা পড়বে।”অধ্যবসায় বা হার স্বীকার না করে ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন দৃঢ় সঙ্কল্প। দীর্ঘদিন ব্যাপী পরিশ্রম করার মধ্যে আনন্দ আছে। অ্যালিরা অনেক বৎসর ধরে শ্রমসাধ্য অনুশীলন করেন কয়েক সেকেন্ড বা মিনিটের প্রতিযোগিতার জন্য। অধ্যবসায়ের জন্য সঙ্কল্প প্রয়োজন। যে কাজ শুরু করা হয়েছে তা শেষ করার অঙ্গীকারই অধ্যবসায়। পরিশ্রমে বিধ্বস্ত হয়ে হয়ত মাঝপথে ছেড়ে দেবার ইচ্ছা হবে। কিন্তু বিজয়ীরা কষ্ট সহ্য করে এগিয়ে চলেন। বিজয়ী অ্যাথলিটদের প্রশ্ন করুন কত কঠোর পরিশ্রমের যন্ত্রণা সহ্য করে জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছতে হয়। অনেক অসফল ব্যক্তিও শুরুতে কঠোর পরিশ্রম করেন, কিন্তু তাদের ক্রমাগত শ্রমসাধ্য অনুশীলনের সহনশীলতা নেই বলে শেষ করতে পারেন না। লক্ষ্য স্থির থাকলে অধ্যবসায়ী হওয়া যায়। লক্ষ্যবিহীন হলে জীবনে ইতঃস্তত ভেসে বেড়ানো ছাড়া গতি নেই, যে মানুষের জীবনে কোন লক্ষ্য নেই, তিনি কখনো অধ্যবসায়ী হতে পারেন না, এবং জীবনে পূর্ণতাও লাভ করেন না। ৯. কাজ সম্পন্ন করার গৌরব (Pride of performance) আজকাল একটি নির্দিষ্ট কাজ সুসম্পন্ন কারার মধ্যে যে আত্মগরিমা আছে তা সাধারণ নজরে পড়ে না। কোন কাজই আপনা থেকে সম্পন্ন হয়না। তাকে অনেক পরিশ্রম ও চেষ্টার দ্বারা সম্পন্ন করতে হয়। অনেকে ফাঁকি দিয়ে কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা করেন। কিন্তু এটি এড়িয়ে চলাই উচিৎ। যথোচিত পরিশ্রম ও দক্ষতার দ্বারা কাজটি সম্পন্ন করলেই আত্মগৌরব জন্মায়, এটি অন্তরের জিনিস এবং সাফল্যের সোপান। এই আত্মগৌরব কিন্তু অহংবোধ নয়। আত্মগৌরবে আছে কাজ সুসম্পন্ন করার আনন্দ এবং বিনয়। কর্মের মান কর্মীর গুণমানের সঙ্গে যুক্ত। অমনোযোগী ও আন্তরিকতাহীন কাজে কোন সাফল্য আসে না।তিনজন শ্রমিক ইট গাঁথছিলেন। একজন পথিক তারা কি করছেন জানতে চাইলেন। প্রথমজন জবাব দিলেন, “দেখছেন না আমি মজুরির জন্য কাজ করছি,” দ্বিতীয়জন বললেন, “দেখছেন না আমি ইট গাঁথছি,” তৃতীয়জন বললেন, আমি এটি সুন্দর সৌধ তৈরী করছি,” তিনজন একই কাজ করছেন, কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন জবাব দিলেন। এটি পরিষ্কার যে কাজের প্রতি তাদের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি এবং এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাদের কাজকে অবশ্যই প্রভাবিত করবে।করণীয় কাজের জন্য গর্ববোধ থাকলে সেই কাজের উৎকর্ষ বৃদ্ধি পায়। প্রত্যেক কাজের এধ্যে কর্মীর দক্ষতা ও মনোভাবের ছায়া থাকে, তা সে গাড়ি ধোয়া, ঘর মোছা কিংবা বাড়ি

পৃষ্ঠা:৪৫

সাফল্য: রং করা ইত্যাদি যে কোন ধরনের কাজই হোক না কেন।শুধু প্রথমবারই নয় প্রত্যেক বারই কাজটি ভালোভাবে করা দরকার। আজকের কাজটি ভলোভাবে করলে কারকের জন্য নিশ্চিন্ত থাকা যায়।মাইকেল এঞ্জেলো বেশ কিছুদিন ধরে একটি মূর্তি তৈরীতে ব্যস্ত ছিলেন। মূর্তিটির ছোট ছোট অংশগুলিও তিনি পুঙ্খানুপুঙ্কভাবে বারবার মার্জনা করছিলেন। একজন দর্শকের এটিকে অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হল। এই বিষয়ে মাইকেল এঞ্জেলাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বললেন, “অকিঞ্চিৎকর বিষয়ে নজর দিয়েই সম্পূর্ণতা আনতে হয়; কিন্তু সম্পূর্ণতা মোটেই অকিঞ্চিতকর নয়।” কত দ্রুত কাজটি নিষ্পন্ন হয়েছিল অনেকেই তা মনে রাখেন না, কিন্তু কাজটি ভালেভাবে সম্পন্ন হয়েছিল কিনা তা সকলেই মনে রাখেন। ভালোভাবে কাজ সুসম্পন্ন করাই বড় কথা।একজন রাস্তার ঝাড়ুদারও তার কাজটি নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন করতে পারেন, যেমন নিষ্ঠার সঙ্গে মাইকেল এঞ্জেলো ছবি একেছেন। কিংবা বেটোভেন সুর সৃষ্টি করেছেন। কিংবা শেক্সপিয়র কবিতা লিখেছেন। তিনি রাস্তা এমনভাবে পরিষ্কার করবেন যে সকলে থমকে দাঁড়িয়ে বলবেন, এখানে এমন একজন ঝাড়ুদার ছিলেন যিনি তার কাজ খুব দক্ষতার সঙ্গেই করেছেন। Martin Luther King, Junior কাজের ও পরিষেবার মান নিয়ে কোনও আপস চলে না, ম্যাকডোনাল্ড নামক বিখ্যাত কোম্পানীর প্রতিষ্ঠাতা রয় ব্রুক একটি দোকান পরিদর্শনকালে খাবারে একটি মাছি দেখেছিলেন, দু’সপ্তাহ পরে ওই দোকানের ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী তার চাকরি হারালেন, রয় রুক তাকে বললেন, ” করণীয় কাজের জন্য গৌরববোধ ও গজটি সুসম্পন্ন করার ইচ্ছা নিয়ে কাজ করবে। আমি কর্ম জীবনের প্রথমোঁং বুঝে নিগেন্ধি য কাজের পুরষ্কার পাওয়া যায় শেষে।”কাজ সুসম্পন্ন করার তৃপ্তিই বড় পুরষ্কার। অনেক বড় কাজ খাপছাড়াভাবে সম্পন্ন করার থেকে ছোট কাজ ভালোভাবে করা অনেক ভালো।১০. শিক্ষার্থী হওয়ার ইচ্ছা থাকা উচিত একজন পথ প্রদর্শকও প্রয়োজন (Be willing to be a student get a mentor) যদি একসঙ্গে ঈশ্বর আর শিক্ষক সঙ্গে দেখা হয়ে যায় তবে কাকে প্রথমে নমস্কার করবেন? ভারতীয় সংস্কার অনুসারে শিক্ষককে, কারণ শিক্ষকের নিদের্শ ও সাহায্য ব্যতিরেকে ছাত্রের ঈশ্বরপ্রাপ্তি ঘটবে না।যিনি তার অভিজ্ঞতার আলোকে ছাত্রের দূরদৃষ্টিকে প্রসারিত করতে পারেন তিনি একজন শিক্ষক বা পতপ্রদশর্ক। এমনই একজন ব্যক্তিকে আপনার শিক্ষক হিসেবে বেছে নিন। একজন ভালো শিক্ষক নিদের্শ দিয়ে আপনাকে পরিচালনা করবেন, একজন খারাপ শিক্ষক আপনাকে ভুল পথে পরিচালনা করবেন। শিক্ষককে শ্রদ্ধা করুন, আগ্রহী ছাত্র হোন। শিক্ষকরা ছাত্রদের কৌতূহল পছন্দ করেন।উত্তম শিক্ষকরা তৃষ্ণা মেটাবার পানীয় সরবরাহ করেন না, তৃষ্ণাকে বাড়িয়ে দেন। তারা প্রশ্নের উত্তর পাবার সঠিক রাস্তা ধরিয়ে দেন। পুরাকালে এক রাজা সম্পর্কে গল্প আছে। সমাজের কল্যানে যার সবচেয়ে বেশি অবদান তাকে তিনি সম্মানিত করতে চেয়েছিলেন। রাজসভায় সবরকমের লোক এসে প্রত্যেকেই সম্মান লাভের আশায় তাদের অবদানের কথা

পৃষ্ঠা ৪৬ থেকে ৬০

পৃষ্ঠা:৪৬

কর্মের বীজ বপন করুন, অভ্যাসের ফসল তুলবেন, অভ্যাসের বিশদভাবে উল্লেখ করল। কিন্তু রাজা খুব সন্তুষ্ট হলেন না। অবশেষে একজন বয়স্ক ব্যক্তি উদ্ভাসিত মুখে রাজসভায় প্রবেশ করলেন। নিজের পারচয় দিলেন শিক্ষক বলে, আর কিছু বলতে হল না। রাজা সিংহাসন থেকে নেমে এসে নত মস্তকে শিক্ষককে অভিবাদন করলেন। সমাজের ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিক্ষকদের অবদান সবচেয়ে বেশী। সাফল্যের জন্য প্রয়োজনীয় সব গুন কি আমাদের আছে (Do we have what it takes to be successful?)অনেক মনে করেন সাফল্যের জন্য উপযুক্ত গুণাবলী তাদের নেই। তারা সকলেই গড়পড়তা লোক এবং অনেক সময়ই কাজে ব্যর্থ হন। কিন্তু এরকম হওয়া উচিত নয়, সাফল্যের জন্য না প্রয়োজন সমস্ত গুনাবলীই আমাদের আছে হয়ত সেই গুনাবলী যেভাবে চর্চা করলে সাফল্যের স্তরে নিয়ে যেতে পারত সেইভাবে চর্চা করা হয়নি, অনেক সময় আমরা হয়ত সচেতন নই যে আমাদেরও ওই গুনাবলী আছে। কিন্তু এই গুণগুলি যে আছে তা জানা থাকলে আমাদের কর্মদক্ষতার অনেক উন্নতি ঘটে।ব্যাপারটা যেন বাড়ির উঠোনে ১০ লাখ ডলার পোঁতা আছে কিন্তু আপনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না, সুতরাং আপনি তা বের করতে পারবেন না। কিন্তু যে মুর্ভুতে আপনি সেই সম্পদের সন্ধান পাবেন আপনার চিন্তা ও ব্যবহার বদলে যাবে। মানুষের সম্পকেও এই কথা সত্যি। আমাদের সকলেরই এইরকম গুপ্তধন আছে। প্রয়োজন হল তাকে প্রকাশ্যে এনে যথাযথরুপে ব্যবহার করা।কী আমাদের পিছনে টেনে রেকেছে? (What is holding us back?)আমরা যদি ব্রেক চেপে ধরে গাড়ি চালাই তবে কি রকম হবে? গাড়ি কখনোই পূর্ণ গতিতে চলবে না কারণ ব্রেক বাধা দেবে। ফলে গাড়ি অতিরিক্ত গরম হবে ও ইঞ্জিন খারাপ হয়ে যাবে। যদি একেবারে বারাপ নাও হয়, ইঞ্জিনের অনেক সমস্যা দেখা দেবে। এখানে দু’টি বিকল্প আছে হয় অ্যাকসেল্যাটের জোরে চেপে দিন এবং গাড়িটি অচল হয়ে যাবার ঝুঁকি নিন অথবা ব্রেকের উপর থেকে চাপ তুলে নিন এবং গাড়িকে দ্রুত ছুটতে দিন। জীবনের ক্ষেত্রেও ঠিক একই রকদ্দামরা ভাবাবেগে ব্রেক দিয়ে জীবনের গতিবেগ মন্থর করতে চাই ফলে। অনেক সময় ভাবাবেগ আমাদের সাফল্য লাভের পক্ষে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, এই ভাবাবেগকে সংযত রাখার জন্য আমাদের উচিত একটি ইতিবাচক মনোভাব, উঁচু পর্যায়ের আত্মসম্মানবোধ তৈরী করা এবং দায়িত্ব গ্রহনের ক্ষমতাকে উন্নত করা।অসাফল্যের কারণ (Reasons for failure-why we don’t achieve excellence) কেন আমরা কাজে উৎকর্ষ লাভ করতে পারিনা,জীবন যেন একটি দশ-গতির বাই-সাইকেল,আমাদের অনেকেই কখনো গিয়ার ব্যবহার করি না। Charles Schultz ১. ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছা-(Unwillingness to take risks)সাফল্যের জন্য বিচার বিবেচনাপূর্বক ঝুঁকি নিতে হয়। ঝুঁকি দেওয়া মানে বোকার মত জুয়ার বাজি ধরা নয় কিংবা দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যবহার নয়। অনেকে কখনও কখনও দায়িত্বজ্ঞানহীন হঠকারিতাকে ঝুঁকি বলে ভুল করেন এর ফলে যখন উল্টো ফল ফলে তখন ভাগ্যকে দোষ দেন। ঝুঁকি নেওয়া একটি আপেক্ষিক ব্যাপার। ঝুঁকির অর্থ ভিন্ন ভিন্ন প্রশিক্ষণের ফলে ঝুঁকি নেওয়ার বিপদকে কমিয়ে দেওয়া যায়। একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত

পৃষ্ঠা:৪৭

পর্বতারোহী এবং একজন অনভিজ্ঞ ব্যক্তি-দুজনের ক্ষেত্রে পর্বতারোহণের দু’রকম ঝুঁকি আছে। কিন্তু যিনি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তার কাছে এই ঝুঁকি বিবেচনাহীন ঝুঁকি নয়। যখন উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, জ্ঞান-অর্জন, নিজের আত্মবিশ্বাস ও যোগ্যতা তৈরি করার পর ঝুঁকি নেওয়া হয়, তখন তাকে দায়িত্বজ্ঞানহীন ঝুঁকি বলা যায় না। যে ব্যক্তি কখনো কোন কাজ করে না তার ভুলও হয় না। তার কাজ না করাটাই সবচেয়ে বড় ভুল। সিদ্ধান্তহীনতার জন্য অনেক সুযোগ নষ্ট হয়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার অক্ষমতা ক্রমে ক্রমে অভ্যাসে পরিণত হয়। সুতরাং ঝুঁকি নেওয়া উচিত কিন্তু জুয়ার বাজির মতন অযৌক্তিক ঝুঁকি নয়। কাজে যারা ঝুঁকি নেয় তারা চোখ কান খোলা রাখে। কিন্তু জুয়াড়িরা অন্ধকারে গুলি ছোড়ে।এক ব্যক্তি এক কৃষককে জিজ্ঞেস করল সে গমের চাষ করেছে কিনা, কৃষক জবাব দিল, “না, কারণ আমার মনে হচ্ছে এ বছর বৃষ্টি হবে না।” লোকটি তখন জিজ্ঞেস করল, “এ বছর কুট্টা লাগিয়েছ?” কৃষক বলল, “না আমার মনে হচ্ছে এ বছর পোকার উৎপাত বেশি হবে”। তখন লোকটি জিজ্ঞেস করল, “তাহলে তুমি কী লাগিয়েছ?” কৃষক জবাব দিল, “কিছুই না, আমি কোন ঝুঁকি নিইনি।”ঝুঁকি (Risks)হাসলে মনে হবে বোক বনবার ঝুঁকি নিচ্ছে কাঁদলে লোকে ভাববে ভাবালু, কারুর সঙ্গে মেলামেশা করলে জড়িয়ে পড়বার ঝুঁকি থাকে, নিজের মনোভাব প্রকাশ করলেও নিজের প্রকৃত চরিত্র প্রকাশের ঝুঁকি থেকে যায়,নিজের স্বপ্ন, নিজের চিন্তা, যদি সবাইকে জানানো যায়, তাহলে ঝুঁকি থেকে যায়-সেগুলি কেউ আত্মসাৎ করবে,তুমি ভালোবাসলে ঝুঁকি থাকে প্রতিদানে ভালোবাসা পাবে কিনা।জীবনটা মৃত্যুর জন্য ঝুঁকি।আশা থাকলেই ঝুঁকি থাকে ব্যর্থ হতাশার, চেষ্টা করতে গেলে ঝুঁকি থাকে ব্যর্থ হওয়ার।কিন্তু ঝুঁকিতো নিতেই হবে, জীবনে সবচেয়ে বড় বিপদ হলো ঝুঁকি না নেওয়া। যে মানুষ কোন ঝুঁকি নেয়না, তার কিছু নেই, এবং তার অস্তিত্বই নেই। তারা হয়ত দুঃখ এবং যন্ত্রণাকে এড়িয়ে যেতে পারে, কিন্তু তারা কিছু শেখে না, অনুভব করে না, পরিবর্তন করে না, উন্নত হয় না, ভালোবাসে না এবং শেষপর্যন্ত বাঁচে না।এই নেতিবাচক মনোভাব তাদের শিকলে বেঁধে রাখে, তারা ধীরে ধীরে ক্রীতদাস হয়ে যায়, তারা তাদের স্বাধীনতা হারায় যারা ঝুঁকি নেষ তারাই যুক্ত। ২. অধ্যবসায়ের অভাব (Lack of persistence) সমস্যা যখন অনতিক্রমণীয় তখন পেছিয়ে আসাই শেষ পন্থা বলে মনে হয়। এটি চাকরি, বিবাহ ও সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সত্য। বিজয়ীরা আঘাত পায় কিন্তু তাদের মনোবল নষ্ট

পৃষ্ঠা:৪৮

হয় না। প্রত্যেক মানুষই তার জীবনের লক্ষ্যের পথে প্রতিহত হয়েছে। কিন্তু একবার প্রতিহত হবার অর্থ এই নয় যে সে সবসময়ের জন্য অসফল হয়েছে। জ্ঞান বা দক্ষতার অভাবের জন্য নয় কেবল অধ্যবসায়ের অভাবে বারবার চেষ্টা করা থেকে বিরত হয় বলে অনেক মানুষ অসফল হয়। সাফল্যের শুঢ় রহস্য দু’টি কথায় প্রকাশ করা যায় অধ্যবসায় এবং প্রতিরোধ। সাফল্যের লক্ষ্যে যা অবশ্যই করতে হবে তারজন্য বারবার চেষ্টা করুন এবং যা করা উচিত নয় তা করার ইচ্ছাকে প্রতিরোধ করুন। কেবল অপরের থেকে সাহসী বলে নয়, অপরের থেকে দশ মিনিট বেশি সাহস দেখিয়েছিল বলেই একজন লোক বীর বলে পরিচিত হয়ে যায়।-Ralph Waldo Emerson ৩. তাৎক্ষণিক পুরস্কার (Instant gratification) আমরা স্বল্পমেয়াদী চিন্তা করি দীর্ঘমেয়াদী’ নয়। এতে অদূরদর্শিতার পরিচয় পাওয়া যায়। আমরা তাৎক্ষণিক ফলাফলে উৎসাহী। সবকিছুর তাৎক্ষণিক ফল পাওয়ার জন্য ঔষধ আছে। তাড়াতাড়ি জাগিয়ে দেওয়ার জন্য, তাড়াতাড়ি ঘুম পাড়িয়ে দেবার জন্য ঔষধ পাওয়া যায়। এই তাড়াতাড়ি করতে গিয়ে সমস্ত সমস্যার দ্রুতসমাধান চায়। যখন মানুষ দ্রুত লক্ষপতি হতে চায় স্বাভাবিকভাবেই তাকে সন্দেহজনক রাস্তা নিতে হয়, এবং সততার সঙ্গে আপস করতে হয়, রাতারাতি লক্ষ টাকার মালিক হবার আশাতেই লটারি ব্যবসা জমজমাট হয়ে উঠেছে। স্মরণ রাখা দরকার যে তাৎক্ষণিক পুরস্কার ফলাফল্যের চিন্তা করে না। কেবল ক্ষণিকের আনন্দের উৎস হয়। আজকের প্রজন্ম যে আহারে ৫ পাউণ্ড ওজন কমবে তাকেই আদর্শ আহার বলে মনে করে, এরাই জন্মদিনের উপহারগুলি চায় কিন্তু জন্মদিনের অতিথি সৎকারের দায় নিতে চায় না। ৪. অগ্রাধিকারের ধারণার অভাব (Lack of priorities) অনেক মানুষ এমন বিকল্প গ্রহণ করেন যা গ্রহণ করা উচিত নয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রাখতে কোন কোন মানুষ অর্থ কিংবা উপহার দিয়ে সময় ও স্নেহের অভাব পূরণ করতে চান। কেউ কেউ আবার স্ত্রী, পুত্র, কন্যার জন্য যথেষ্ট উপহার কিনে দেন, কিন্তু তাদের সঙ্গে যথেষ্ট সময় কাটান না। আমরা অগ্রাধিকারগুলিকে যদি সঠিকভাবে বিন্যস্ত না করি, তাবে সময়ের অপচয় হবে। এবং সময়ের অপচয় মানে জীবনের অপচয়। অগ্রাধিকারের তালিকা করতে গেলে প্রথমেই দরকার করণীয় কাজের মধ্যে একটা শৃঙ্খলা আনা এবং খেয়ালখুশিমতো কাজ না করা। অনেকে আসল কাজ ভালোভাবে সুসম্পন্ন করার থেকে সাফল্য ও ব্যর্থতার চিন্তাতেই অনেক সময় ব্যয় করেন। কিভাবে বিভিন্ন সমস্যা এবং কোন কোন ব্যর্থতার মোকাবিলা করবেন? এই প্রশ্নটির জবাবের মধ্যেই আপনার চরিত্রের বৈশিষ্ট্যগুলি জানা যাবে। সাফল্যের রহস্যের চাবিকাঠি হচ্ছে অনুধাবন ক্ষমতা। কোন কোন ব্যক্তি অর্থ, ক্ষমতা। যশ বা সম্পত্তির উপর তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখেন। এই বিষয়ে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বিষয়গুলি হৃদয়ঙ্গম করা দরকার। যে সব আদর্শ সাফল্যের পথ প্রকাশ করে সেগুলি সম্পর্কে কেবল পড়লে বা মুখস্ত করলেই সাফল্য আসে না; সেগুলি যথাযথভাবে হৃদয়ঙ্গম করলে এবং কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ করলেই সাফল্য আসে। ৫. সহজ পথের সন্ধানে (Looking for shortcuts) বিনামূল্যে দুপুরে খাবার নয়।

পৃষ্ঠা:৪৯

এক রাজার সম্পর্কে গল্প আছে। তিনি একদিন তার উপদেষ্টাদের ডেকে বিভিন্ন যুগের জ্ঞানগর্ভ বাণীগুলিকে সংকলন করতে বললেন যাতে তিনি সেগুলি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে পারেন। অনেক পরিশ্রমের পর উপদেষ্টারা বেশ কয়েকটি খন্ডে জ্ঞানগর্ভ বাণীগুলিকে সংকলন করে রাজার নিকট উপস্থিত করলেন। রাজা উপদেষ্টাদের বললেন যে এগুলি এত বিরাট যে লোকে পড়বে না, তখন তারা এগুলিকে সংক্ষিপ্ত করা শুরু করলেন। পরে উপদেষ্টারা মাত্র একটি খণ্ডে সংক্ষিপ্ত করে রাজার কাছে পেশ করলেন। রাজা আবার একই কথা বললেন। তখন তারা প্রথমে এক অধ্যায় এক পরে এক পৃষ্ঠায় সংক্ষিপ্ত করে দিলেন। কিন্তু রাজা এতেও সন্তুষ্ট হলেন না, শেষপর্যন্ত উপদেষ্টারা একটি বাক্যে সমস্ত জ্ঞানকে সংক্ষেপিত করে রাজার নিকট উপস্থিত হলেন। রাজা সন্তুষ্ট হলেন। তিনি বললেন এই একটি জ্ঞানগর্ড বাক্যই তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে চান। বাক্য হল, ” বিনা পয়সায় দুপুরের খাবার পাওয়া যায় না।” প্রত্যেক সংস্থায় ও সমাজে বিনা পয়সায় পানভোজনের সুবিধাভোগী ব্যক্তি আছে। বস্তুতপক্ষে কোন না কোন সময় আমরা সকলেই বিনা পয়সায় পানভোজনের আশা করেছি। এটা সাধারণত বিভিন্ন সামাত ও সংগঠনেই বেশী দেখা যায়। এরূপ সংস্থার বেশিরভাগ সদস্যরাই অকর্মণ্য। তারা কর্মী সদস্যদের পরিশ্রমের সুফল ভোগ করতে চায়। অনেক সময় ভোগ করেও থাকে। সহজতর পথটি প্রকৃতপক্ষে কঠিনতর পথ হয়ে উঠতে পারে। একদিন বনে একটি ভরত পাখি গান করছিল। একটি কৃষক একটি কেঁচো ভর্তি বাক্স নিয়ে বনের পথ দিয়ে যাবার সময় তরত পাখি তাকে জিজ্ঞেস করল, “তোমার বাক্সে কী আছে এবং তুমি কোথায় যাচ্ছ?” কৃষকটি জবাব দিল যে সে বাজারে এই কেঁচো বিক্রি করে কিছু পালক কিনবে। ভরত পাখি বলল, “আমার অনেক পালক আছে আমি সেগুলির থেকে কয়েকটি তোমাকে দেব, তুমি আমাকে ওই কেঁচোগুলি দিয়ে দাও, তাহলে আমাকে আর খাবার খোঁজ করতে হবে না।” কৃষকটি কেঁচোগুলি ভরত পাখিকে দিয়ে দিল এবং ভরত পাখিটি প্রতিদানে তার ডানা থেকে কয়েকটি পালক দিল, পরের দিন একই রকম লেনদেন হল এবং তার পরের দিনও। তার কিছুদিন পরে দেখা গেল যে ভরত পাখির সমস্ত পালক কৃষকটি নিয়ে নিয়েছে। পালকের অভাবে ভরত পাখিটিকে দেখতে হল কুৎসিত। সে উড়তে পারে না এবং তার কেঁচো খোঁজার সামর্থ্য নেই। এই অবস্থায় পাখিটি গান করতে ভুলে গেল। এবং কিছুদিনের মধ্যে মারা গেল। এই গল্পটির নীতিশিক্ষা কী? নীতিশিক্ষা খুব স্পষ্ট। ভরত পাখিটি খুব সহজে খাবার চেয়েছিল কিন্তু এই সহজ পথটি শেষ পর্যন্ত কঠিন অবস্থার মধ্যে নিয়ে গেল। এই শিক্ষাটি কি আমাদের জীবনেও সত্য নয়? অনেক সময় আমরা সহজ পথের সন্ধান করি, কিন্তু অবশেষে পথটি কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বিজিতরা দ্রুত কার্যকরী পন্থার অনুসন্ধান করে উঠোনে আগাছা মারার দু’টি উপায় আছে -প্রথমটি হল সহজ উপায় এবং দ্বিতীয়টি তত বেশি সহজ নয়। সহজ উপায় হচ্ছে মাসছাঁটা যন্ত্র দিয়ে উঠোনের আগাছাগুলিকে ছোট করে কেটে দেওয়া। এতে উঠোনটি কিছুদিনের জন্য ভালো দেখাবে। এবং আগাছা সমস্যার সাময়িকভাবে সমাধান হবে। কিন্তু আগাছাগুলি আবার বেড়ে উঠবে। আর খুব সহজ নয় যে উপায়টি সেটি হলো হাতে পায়ে কাদা মেখে আগাছাগুলিকে শেকড়সুদ্ধ টেনে

পৃষ্ঠা:৫০

তোলা। এটি সময়সাপেক্ষ এবং কার্যকর পদ্ধতি। এর ফণে অনেকদিন ধরে উঠোনে আগাছা জন্মাবে না। প্রথম পদ্ধতির সমাধান সহজ কিন্তু এর ফলে সমস্যাটির পূর্ণ সমাধান করা যায় না। দ্বিতীয় সমাধানটি খুব সহজ নয় কিন্তু মূলে গিয়ে সমস্যাটিকে উৎপাটন করে। মোদ্দা কথা হচ্ছে সমস্যার মূলে যাওয়া প্রয়োজন। জীবন সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারেও এই কথা সত্য। কোন কোন ব্যক্তি তিক্ততার ও অসহিঞ্চুতার মনোভাব এমনভাবে ছড়িয়ে দেন যে জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিক্রতা ও অসহিষ্ণুতা বিস্তার লাভ করে। অনেকেই সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান চায়। তাৎক্ষণিক কফির মতো তারা চায় তাৎক্ষণিক সুখ। কিন্তু এই সমস্যার কোন তাৎক্ষণিক সমাধান নেই। এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির ফলে হতাশা বেড়ে যায়।৬. স্বার্থপরতা ও লোভ (selfishness and g reed)যে সমস্ত ব্যক্তি ও সংস্থা পরস্পরের প্রতি এবং পৃষ্ঠপোষকদের প্রতি স্বার্থপরের মতো ব্যবহার করে, তাদের উন্নতি আশা করার কোন অধিকার থাকতে পারে না। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে যে অপরের মঙ্গলের প্রতি লক্ষ্য না রেখে দায়িত্বটি অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়া। লোভ সবসময়ে বেশি চায়। প্রয়োজনে মেটানো যেতে পারে কিন্তু লোডকে কখনো তৃপ্ত করা যায় না। এটি আত্মার ক্যান্সার বিশেষ। লোভ মানসিক সম্পর্ককে নষ্ট করে। লোভকে পরিমাপ করার কি কোন পদ্ধতি আছে? তার জন্য আমরা আমাদেরকে তিনটি প্রশ্ন জিজ্ঞেসা করতে পারি।*এই জিনিসটি কি আমর সামর্থ্যের মধ্যে আছে?* এটি কি সত্যি আমার দরকার?* জিনিসটি যদি আমর থাকে তবে এর থেকে কী আমি মানসিক শান্তি পাব? দুর্বল আত্মসম্মানবোধ থেকে ই লোভের জন্য। লোভ মিথ্যা অহংকারের মধ্যে এবং অন্যদের সঙ্গে সমতা রক্ষার চেষ্টায় নিজেকে প্রকাশ করে। লোভের হাত থেকে পরিত্রান পাবার জন্য নিজের সামর্থোর মধ্যে জীবনযাত্রা নির্বাহ করা উচিত এবং নিজের সামর্থ্যে সন্তুষ্ট থাকা উচিত, অবশ্য সন্তুষ্ট থাকার অর্থ এই নয় যে জীবনে কোন উচ্চাঙ্ক্ষা থাকবে না।শেষ কোথায়? (where does it end?) এক ধনী কৃষকের গল্প আছে। একবার তাকে এই প্রস্তাব দেওয়া হল যে, সে একদিন যতদূর পর্যন্ত হেঁটে সূর্যাস্তের আগে শুরুর জায়গায় ফিরে আসতে পারবে ততটা জমি তাকে দিয়ে দেওয়া হবে। পরের দিন খুব ভোরে কৃষকটি দ্রুত হাঁটতে শুরু করল। কারণ যতটা দূরত্ব হাঁটতে পারবে ততটা জমি সে পাবে। ক্লান্তি সত্ত্বে ও সে সমস্ত দুপুর হাঁটল কারণ অনেক জমি পাবার এই সুযোগ সে হারাতে চাইছিল না। একবারে শেষ বেলায় এসে তার খেয়াল হল যে জমি পাবার জন্য তাকে যাত্রা শুরুর জায়গায় সূর্যাস্তের আগে ফিরে আসতে হবে। কিন্তু তার লোভ তাকে অনেকদূর পর্যন্ত তাড়া করে নিয়ে গেছিল। ফেরবার পথে সূর্যের দিকে চোখ রেখে সে শেষপর্যন্ত দৌড়াতে শুরু করল। ক্লান্ত হয়ে সে হাঁপিয়ে উঠেছিল কিন্তু তবুও সে নিজেকে তাড়না করে নিয়ে গেল জমির লোতে। শেষ পর্যন্ত যখন সে শুরুর জায়গায় পৌছল তখন তার দেহও সহ্যের শেষ সীমায় এসে পৌঁছেছে এবং সূর্য ও অস্তাচলম্বীখ। এই স্থানে এসে সে ক্লান্তিতে লুটিয়ে পড়ল এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই সে মারা গেল। অনেকটা জমি সে পেয়েছিল বটে কিন্তু কবরের জন্য জায়গাটুকু ছাড়া বাকি জমে তার

পৃষ্ঠা:৫১

ভোগেই লাগল না।এই গল্পে অনেক সত্য আছে এবং আছে শিক্ষণীয় বিষয়। যে কোনও লোভী লোকের শেষে পরিণাম এমনই হয়। ৭. দৃঢ় বিশ্বাসের অভাব (Lack of conviction) যাদের দৃঢ় বিশ্বাসের অভাব আছে তারা মধ্যপন্থী আর যারা মাঝ রাস্তা দিয়ে চলে তাদের কি হয়? গাড়ি চাপা পড়ে।দৃঢ় বিশ্বাস ছাড়া মানুষ কোনও নীতি ও আদর্শগত অবস্থান নিতে পারে না। বিশ্বাস এবং সাহস নেই বলে তারা গড্ডলিকা প্রবাহে ভেসে যায়। ভুল জেনেও অন্যের হাত দিয়ে নিজেকে গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা করে। প্রকৃতপক্ষে, তারা এমনভাবে ব্যবহার করে যেন তারা শশুর পালের একটি অংশ, কেউ কেউ নিজেদের অপেক্ষাকৃত উন্নত মনে করেন। কারণ তারা অন্যায়কে সমর্থন করেন না। কিন্তু প্রতিবাদ করার মতো আত্মবিশ্বাস তাদের নেই। তারা অবশ্য বুকতে পারেন না যে প্রতিবাদ না করা প্রকৃতপক্ষে সমর্থন করারই সামিল।সাফল্য লাভের একটি গোপন কথা হল, কোনও বিষয়ের বিরোধী হওয়ার থেকে কোনও একটি বিষয়কে সমর্থন করা ভালো। তার ফলে সমস্যাটির অঙ্গ না হয়ে সমাধানের অংশ হওয়া যায়। কোনও অবস্থান নেওয়ার জন্য দৃঢ় বিশ্বাসের প্রয়োজন।দৃঢ় বিশ্বাস যদি বিশ্বাসের সঙ্গে কাজের সংযোগ না ঘটে তবে সে বিশ্বাস একধরনের ভ্রান্তি। বিশ্বাস অলৌকিক ঘটনার ফলশ্রুতি নয়: বিশ্বাস অলৌকিক ফলাফল সৃষ্টি করে।“যদি মনে কর তুমি পারবে, কিংবা মনে কর তুমি পারবে না, দুই ক্ষেত্রেই তোমার বিশ্বাস সঠিক।”-Henry Ford যখন আমরা আঘাত পাই, তখন আসে আমাদের মানসিক অবসাদের মুহূর্ত। আমাদেন। এমন সময় আসে যখন আমরা নিজেদের অবিশ্বাস করি এবং আত্মগ্লানিতে ভেঙে পড়ি। এরূপ ভাবপ্রবণতা জয় করতে হবে এবং আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার করতে হবে।পৃথিবীতে তিন প্রকারের মানুষ আছেন-১. যারা ঘটনা ঘটান।২. যারা ঘটনা ঘটতে দেখেন। ৩. যারা ঘটনা ঘটতে দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন। আপনি কোন দলে পড়েন? ৮. প্রাকৃতিক নিয়মগুলি সম্পর্কে বোধ শক্তির অভাব (lack of understanding of nature’s laws) সাফল্য নিয়ম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় এবং এই নিয়মগুলি প্রাকৃতিক নিয়ম। পরিবর্তন প্রাকৃতিক নিয়মের অন্তর্ভুক্ত। আমরা হয় এগিয়ে যাচ্ছি নতুবা পিছিয়ে পরছি, হয় আমরা সৃষ্টি করছি, নতুবা ধীরে ধীরে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে ক্ষয় প্রাপ্ত হচ্ছি। প্রকৃতিতে স্থিতাবস্থা নেই। নতুন গাছের জন্য যদি একটি বীজকে অনেকদিন মাটিতে পৌভা না হয়, তবে সেই বীজ ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী, আমরা চাই বা না চাই যা ঘটবার তা ঘটবেই। ‘সমস্ত প্রগতিই পরিবর্তন আনে; কিন্তু সমস্ত পরিবর্তন প্রগতিমূলক নয়।’ আমরা

পৃষ্ঠা:৫২

সমস্ত পারবর্তনের মূল্যায়ন করব এবং পরিবর্তন যদি প্রগতিপন্থী না হয় তবে তা আমাদের অনুমোদন লাভ করবে না। মূল্যায়ন ছাড়া গ্রহণ করলে তা হবে সমঝোতামূলক ব্যবহার। এরূপ ব্যবহার বিশ্বাসের ও আত্মবিশ্বাসের অভাব সূচিত করেপরস্পর সম্পর্কে অনেক কিছু বলা যায়। ক্যান্সারের কোষগুলিই কেবল বাড়ার জন্যই বেড়ে যায়। যখন নাস্তিবাচক চিন্তার প্রসার ঘটে তখনও ধবংসই অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠে। ইতিবাচক চিন্তার বৃদ্ধিই অর্থপূর্ণ বৃদ্ধি।সাফল্য ভাগ্যের বিষয় নয়, সাফল্য প্রাকৃতিক নিয়মের অধীন। কার্যকারণ সম্পর্কের নিয়মাবলী সাফল্য লাভের জন্য কার্যকারণ ও সম্পর্ট সংক্রান্ত নিয়মগুলি এবং কার্য ও ফলাফলের মধ্যে যোগসূত্র আমাদের বিশেষভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন। সৰ ফলাফলের কারণ আছে। ফসল রোপণ ও আহরণ যে নিয়মে হয় সেই নিয়মে কারণ ও কার্য ঘটে। ফসল রোপণ ও আহরণের পার্টটি পর্ব আছে।১. রোপণের আকাঙক্ষ্য থাকবে। এই আকাঙক্ষাই শুরু।২. আমরা যে রকম বীজ বুনব সেই রকম ফসলই কাটব। আলু লাগালে আলুই পাওয়া যাবে, টমেটো নয়।৩. কিন্তু ফসল কাটার আগে ফসল বুনতে হবে। পাওয়ার আগে দিতে হবে। ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বলার ইন্ধন না দিয়ে উত্তাপ আশা করতে পারি না। কিছু লোক কিছু দেওয়ার আগেই প্রাপ্তি চান, কিন্তু তা হয় না।৪. জীবনের ক্ষেত্রে আমরা একটি বীজ বপন করে একটি ফল পাইনা-আমরা অনেক ধরনের ফসল তুলতে পারি। যদি আমরা অনেক ইতিবাচক ফসল তুলতে পারব। যদি নেতিবাচকবীজ বপন করি তাহলে অনেক প্রকারের নেতিবাচক ফসলই উঠবে। তবুও লোকে প্রাকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধে যাওয়ার চেষ্টা করে। ৫. চাষী জানে বীজ বুনেই একই দিনে ফসল পাওয়া যায় না। সব সময়েই ফসল জন্মাবার সময় লাগে। পদার্থবিদ্যার নিয়ম হচ্ছে প্রত্যেক ক্রিয়ারই বিপরীত ও সমান প্রতিক্রিয়া আছে অধিকাংশ সময় মানুষ কারণগুলিকে অপরিবর্তিত রেখে কর্মফলগুলিকে পরিবর্তন করতে চায়। যদি আমাদের মনকে ইতিবাচক চিন্তায় সর্বদা ব্যাপৃত না রাখি তাহলে নেতিবাচক চিন্তা মননের শন্যূতা স্বাভাবিকভাবেই পূরণ করবে। জেমস অ্যালেন তার বই’ As a man Thiketh’ এ যা বলেছেন সেরূপ কথা অনেক ঋষিরাও বলেছেন। মানুষের মন বাগানের মতো ভালো গাছের বীজ লাগালে ভালো বাগান হবে যদি কিছুই না লাগাই তবে আগাছা জন্মাবে। এটিই প্রাকৃতিক নিয়ম। এই কথা মানুষের জীবনেও সত্য। আমি আর একটু এগিয়ে বলব, ভালো বীজ লাগলেও আগাছা জন্যাবে। আগাছা নিড়ানোর কাজ সব সময়ই চলতে থাকবে। শূন্যের নীচে তাপমান নেমে গেলে, গ্লাসে জল ঢাললে তা জমে বরফ হবে। আশ্চার্যের কিছু নেই- এটিই প্রাকৃতিক নিয়ম। বস্তুত পক্ষে, এরে কোনও অন্যথা হয়না।আমাদের চিন্তাই সব কিছুর মূল, চিন্তার বীজ বপন করুন, আপনি কর্মের ফসল তুলবেন।

পৃষ্ঠা:৫৩

সাফল্য:বীজ বুনলে পাবেন চরিত্ররূপ ফসল, আর চরিত্ররূপ বীজ বপন করলে সৌভাগ্যের ফসল পাবেন।সবকিছুই চিন্তা থেকে শুরু।আকর্ষণের নিয়ম আমাদের পছন্দমত ব্যক্তিকে আমরা নিকটে আকর্ষণ করতে পারি না -কেবল আমাদের স্বধর্মী ব্যক্তিকেই পারি। পুরানো প্রবচনটিই সভা এক ধরনের পালকের পাখি এক জায়গায় জড়ো হয়। যারা নেতিবাচক চিন্তা করেন তারা বিপজ্জনক। তারা অনেক নেতিবাচক মনোভাবের মানুষকে আকর্ষণ করেন। তাদের প্রতিক্রিয়া নেতিবাচক এবং সমসবয় খারাপটাই প্রত্যাশা করেন।লক্ষ্য করেছেন অনেক সামাজিক অনুষ্ঠানে কিভাবে সফল ব্যক্তিরা সফল ব্যক্তিদের আকর্ষণ করেন। অসফল ব্যক্তিরাও একত্রিত হন এবং তারা একসঙ্গে হা-হুতাশ করেন, এবং অভিযোগ করেন।আমাদের বন্ধুরা আমাদের পছন্দসই ব্যক্তি নন, তারা আমাদেরই স্বধর্মী ব্যক্তি।৯. কাজের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতিতে অনিচ্ছা (Unwillingness to plan and prepare) প্রত্যেক মানুষের জয়ী হবার ইচ্ছা আছে কিন্তু খুব কম লোকের জয়ের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া ইচ্ছে আছে।-Vince Lombardiঅনেকই একটি পাটি দেওয়ার জন্য কিংবা ছুটি কাটাবিার জন্য যত পরিকল্পনা করেন তাদের জীবন সম্পকে তা করেন না।প্রস্তুতিপ্রস্তুতি আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। প্রস্তুতির অর্থ পরিকল্পনা ও অনুশীলন। বিজয়ীরা নিজেদের চাপের মধ্যে রাখেন যে চাপ জয়ের জন্য দুশ্চিন্তা নয়, সে চাপ প্রস্তুতির।যদি অনুশীলন খারাপ হয় খেলাও খারাপ হবে কারণ আমরা যেরূপ অনুশীলন করি সেই মতই খেলি সাফল্য ও ব্যর্থতার মধ্যে তফাৎটি হোল সফল ব্যক্তিরা সঠিক কাজটি করেন আর বিফল ব্যক্তিরা করেন প্রায় সঠিক কাজ।পূর্ণ মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজন আত্মশৃঙ্খলা ও ত্যাগ। গড়পড়তা হওয়া সহজ কিন্তু সর্বোত্তম হওয়া খুব কঠিন। তাই গড়পড়তা লোকেরা সহজ রাস্তাই বেছে নেয়। প্রস্তুতি জীবনে যে কোনও ক্ষেত্রে সাফল্য লাভের পথে অনেকটাই এগিয়ে দেয়।উদ্দেশ্য+আদর্শ + পরিকল্পনা অনুশীলন+অধ্যবসায় ধৈর্য+আত্মগৌরব = প্রস্তুতি।প্রস্তুতি আত্মবিশ্বাস বাড়ায়:প্রস্তুতির অর্থ ব্যর্থতাকে সহ্য করা কিন্তু কখনও মেনে নেওয়া নয়। এর অর্থ পরাজিতের মানসিকতাকে ত্যাগ করে পরাজয়ের মুখোমুখি হওয়ার সাহস, একবার ব্যর্থ মনোরথ হয়েও নিরুৎসাহিত না হওয়া।প্রস্তুতি অর্থ ভুল গুলি থেকে শিক্ষগ্রহণ। আমরা সকলেই ভুল করি ভুল করা কোনও অন্যায় নয়। একজন নিবোধই একই স্কুল দুবার করে। ভুল করে যে সংশোধন করে না দে আরও বড় ভুল করে।ভুল হলে ভুলের মোকাবিলা করার শেষ্ঠ উপায় হোল-দ্রুত ভুল স্বীকার করা।

পৃষ্ঠা:৫৪

ভুলের জন্য অনুতাপ না করা।

  • ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা।
  • ভুলের পুনরাবৃত্তি না করা।ভুলের জন্য কাউকে দোষ না দেওয়া বা কোনও অজুহাত সৃষ্টি না করা। প্রস্তুতি না থাকলে মনের উপর চাপ বাড়ে। বস্তুত পক্ষে প্রস্তুতি, অনুশীলন ও কঠিন শ্রমের কোনও বিকল্প নেই। আকাঙক্ষা ও অল্প চিন্তাতে কোন কাজ হবে না। প্রস্তুতর ফলেহ কেবল প্রতিযোগিতায় প্রাধান্য পাওয়া যায়। প্রস্তুতির না থাকলে মানসিক চাপে বিপর্যস্ত হতে হয়। জল যেমন নীচের দিকে গড়িয়ে চলে, তেমনি সাফল্যও, যারা উপযুক্ত প্রস্তুতি নিয়েছে, তাদের দিকে ধাবিত হয়। যাদের চেষ্টা দুর্বল তাদের ফলাফলও ভালো হয় না।অধ্যবসায় প্রকৃতপক্ষে নীচের গুণগুলির সমাহার।
  • একটি উদ্দেশ্য
  • একটি পরিকল্পনা
  • প্রস্তুতি
  • মূল্য
  • ধৈর্য
  • অনুশীলন
  • আদর্শ
  • আত্মগরিমা
  • ইতিবাচক মনোভাব

নিজেকে প্রশ্ন করুন:

  • একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য কি আছে?
  • কাজের পরিকল্পনা আছে?
  • প্রস্তুতির জন্য কিরুপ পরিশ্রম করা হচ্ছে।
  • কি মূল্য দিতে রাজি আছেন? আপনি সাফল্য অর্জনের জন্য কতদূর যেতে প্রস্তুত?
  • আশা ফলবর্তী হওয়ার জন্য যে সময়ের প্রয়োজন সে সময় অপেক্ষা করার ধৈর্য আপনার আছে?
  • উৎকর্ষ লাভের জন্য অনুশীলনে কি আপনি ইচ্ছুক আছেন?
  • আপনি কি আপনার আদর্শে দৃঢ় থাকতে পারবেন? • আপনার কাজের জন্য আপনি কি গর্ববোধ করেন?
  • কাজটি “আমি করতে পারি”-এই ধরনের মনোভাব কি আপনার আছে? ১০. যুক্তিগ্রাহ্য করে তোলা (Rationalizing) বিজয়ীরা ফলাফলের কার্যকারণ বিশ্লেষণ করেন-কিন্তু সেগুলিকে যুক্তি হিসাবে গ্রহণ করেন না। অসফল ব্যক্তিরা তাই করে থাকেন। তারা সব সময় কেন সফল হতে পারেন নি সেই সম্পর্কে অজুহাতের তালিকা তৈরি রাখেন। আমরা অনেক রকমের অজুহাত শুনি, যেমন-
  • আমার ভাগ্য খারাপ।
  • আমার বয়স কম।
  • আমার বয়স বেড়ে গেছে।
  • আমার অনেক প্রতিবন্ধকতা আছে।
  • আমি খুব চটপটে নই।
  • আমি যথেষ্ট শিক্ষিত নই।

পৃষ্ঠা:৫৫

  • আমি দেখতে ভালো নই।
  • আমার ভালো যোগাযোগ নেই।
  • আমার যথেষ্ট টাকা নেই।
  • আমার অনেক সময় নেই।
  • অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ।
  • যদি আমি সুযোগ পেতাম।
  • যদি পারিবারিক দায়িত্ব না থাকত।
  • যদি আমার ভালো বিয়ে হত।এই তালিকা বেড়েই চলবে।ভারতে কিভাবে বানার ধরে (How they catch monkeys in India) বানর শিকারী একটা গোল ছিদ্র যুক্ত বাক্স ব্যবহার হাত অনায়াসে ঢুকে যায়। ভেতরে কিছু বাদাম রেখে দেয়। বানরের একটা হাত অনায়াসে ঢুকে যায়া। ভেতরে কিছু বাদাম রেখে দেয়। বানর বাদাম নিয়ে হাত বন্ধ করলে, হাতের মুঠিটাই হয়ে যায় বড় এবং যে ফাঁক দিয়ে হাতটা ঢুকিয়েছিল সেই ফাঁক দিয়ে বার করতে পারে না। বানর অবশ্য বাদামগুলি ফেলে দিয়ে হাত বের করে নিতে পারে, কিংবা বাদামগুলি হাতে রেখে ধরা পড়তে পারে। আন্দাজ করুন বানর কী করে? প্রায় সব সময়ই বাদামগুলি ধরে রাখে, ফলে মানুষের হাতে ধরা পড়ে।অনেক সময় বানরের সঙ্গে মানুষেরও তফাৎ থাকে না। আমরাও ওই কয়েকটা বাদাম ছাড়তে চাইনা বলে জীবনের পথে এগিয়ে যেতে পারি নি। এই অক্ষমতাকে যুক্তিসহ করে তুলতে চেষ্টা করি। “আমি কাজটা করতে পারিছি না কারণ।” যুক্তি হচ্ছে ঐ ‘বাদাম,’ ঐ বাদাম আঁকড়ে আছি বলেই আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়া ব্যাহত হচ্ছে। সফল ব্যক্তিরা সব কিছু যুক্তিগ্রাহ্য করে তুলতে চান না। দুটি জিনিস মানুষের সাফল। নির্ধারণ করে। একটি হোল যুক্তি, দ্বিতীয়টি হোল কাজের ফলাফল। যুক্তি গণনা করা যায় না, এই ফলাফল গণনা করা যায়। ব্যর্থ হওয়ার জন্য উপদেশ মেনে চলাই যথেষ্ট। “চিন্তা করবেন না, প্রশ্ন করবেন না, কিছু শুনবেন না, শুধু যা করছেন তার যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা দিন।”

১১. অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা না নেওয়া (Not learning from past mistakes) যারা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেন না তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। যদি সঠিক দৃষ্টি ভঙ্গি নিয়ে বিচার করি তাহলে ব্যর্থতা আমাদের শিক্ষকের কাজ করে। ব্যার্থতা একটু ঘুর-পথ, পথের শেষ নই। এর ফলে সাফল্যে। বিলম্ব ঘটে। কিন্তু পরাজয় ঘটে না। আমাকের ভুলগুলি আমাদের অভিজ্ঞতাকেই সমৃদ্দ করে থাকে কেউ কেউ যতদিন বাঁচেন ততদিনই শিখে থাকেন। কেউ আবার শুধুই বাঁচেন। জ্ঞানি ব্যক্তিরা নিজের ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহন করেন, বিজ্ঞাতর ব্যক্তিরা অপরের ভুল থেকে শিক্ষা নেন। জীবন এত দীর্ঘ নয়, যে কেবলমাত্র নিজের ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহন করলেই চলে, অপরের ভুল থেকেও শিক্ষা নিতে হয়।

১২. সুযোগ চিনে নেওয়ার অক্ষমতা (Inability to ricognize opportunity! সুযোগ অনেক সময় বিপত্তির ছদ্মবেশে আসে, ফলে অনেকেই বুঝতে পারেনা। মনে রাখবেন বাধা যত বেশী, সুযোগও তত বেশী।

পৃষ্ঠা:৫৬

১৩. আশঙ্কা (Fear)আশঙ্কা কখনো প্রকৃত, কখনো কাল্পনিক হতে পারে। এর ফলে অনেকে উদ্ভট কাজ করে বসেন। এর প্রধান হেতু, আশঙ্কার কারনগুলিকে সম্যকভাবে অনুধাবন করতে না পারা, সবসময় ভয়ের মধ্যে থাকলে এক প্রকার ভাবাবেগের জালে জড়িয়ে পড়তে হয়।ভয় থেকে আসে নিরাপত্তার অভাব, আত্মবিশ্বারে অভাব এবং দীর্ঘসূত্রতা, ভয় আমাদের সম্ভাবনাও ক্ষমকাকে নষ্ট করে। আমরা সহজ ভাবে চিন্তা করতে পারি না এবং ভয়ের ফলে আমাদের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ও স্বার্থ নষ্ট হয়,সাধারনভাবে ভয় নিম্নপ্রকারের-

  • ব্যর্থতার ভয়
  • অজানার ভয়
  • প্রস্তুত না থাকার ভয়
  • ভুল সিদ্বান্ত নেওয়ার ভয়
  • প্রত্যাখ্যাত হবার ভয়কতকগুলি ভয়কে ব্যাখ্যা করে বলা যায়, অন্যগুলি মনে মনে অনুভব করা যায়, ভয়ের ফলে উদ্বেগ ও তজ্জনিত অযৌক্তিক চিন্তা মনকে গ্রাস করে। ফলে সংকটের সমাধান ব্যাহত হয়, ভয়ের ফলে সাধারন প্রতিক্রিয়া হল পলায়নী মনোভাব। এই মনোভাবের ফলে হয়তো সাময়কি স্বস্তি পাওয়া যায় এবং সমস্যাজনিত দুশ্চিন্তা কম হয় কিন্তু সমস্যার সমাধান হয় না। কাল্পনিক ভয় সমস্যাকে অনেক বড় করে আমাদের সামনে উপস্থিত করে। এরূপ আশঙ্কা বাড়তে বাড়তে মানসিক শান্তি ও পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট করে।ব্যর্থতার আশংকা ব্যর্থতার থেকেও খারাপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। জীবনে ব্যর্থতাই সবচেয়ে দুঃখজনক অভিজ্ঞতা নয়। যে সমস্ত মানুষ চেষ্টা করেন না, তারা প্রথম থেকেই ব্যর্থ। বাচ্চারা যখন হাঁটতে শেখে তখন তারা মাঝে মাঝেই পড়ে যায়, কিন্তু সেই পড়ে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে তারা হাঁটতে শিখবে না। তারা উঠে দাঁড়ায় এবং চেষ্টা করে। যদি তারা নিরাশ হয়ে চেষ্টাই ছেড়ে দিত তবে তারা কোনদিন হাঁটতে শিখত না। ব্যর্থতার ভয়ে হাটা শেখার চেষ্টা না করে হাঁটমুড়ে চিরজীবন কাটানোর থেকে হাঁটা শেখার চেষ্টা করে নিজের পায়ের উপর দাঁড়িয়ে মরাও ভাল।

১৪. প্রতিভা ব্যবহারের ক্ষমতা (Inability to use talent)এ্যালবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন, আমার মনে হয় আমার মেধার প্রায় শতকরা ২৫ ভাগ আমার জীবনে কাজে লাগাতে পেরেছি। উইলিয়াম জেমস মনে করেন মানুষ তার সম্ভাবনার কেবলমাত্র শতকরা ১০ থেকে ১২ ভাগ ব্যবহার করে। বেশিরভাগ মানুষের জীবনেই সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো যে তাদের জীবনে সম্ভাবনা অবশিষ্ট থাকতেই তারা মৃত্যুমুখে পতিত হন। তারা জীবদ্দশায় যথাযথভাবে বাঁচার চেষ্টা করেননি। তাঁদের ক্ষমতা মরচে ধরে নষ্ট হয়, প্রয়োগের ফলে নষ্ট হয় না। আমি চাইব যে আমার ক্ষমা ক্রমাগত প্রয়োগের ফলে নষ্ট হোক, তাতে যেন অব্যবহারের মরচে না পড়ে। জীবনের সবচেয়ে নিদারুণ আফশোস হল, “আমার করা উচিত ছিল কিন্তু করিনি।”

পৃষ্ঠা:৫৭

আলস্যে নিজের ক্ষমতায় মরচে ধরিয়ে দেওয়া এক জিনিস আর ধৈর্য ধরে সুযোগের অপেক্ষা নিজের ক্ষমতাকে সংহত করে রাখা অন্য জিনিস। মরচে ধরে তখনই যখন আলস্য এবং নিষ্কর্ম অবস্থায় সময় কাটানো যায়। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা মানুষের সচেতন সিদ্ধান্ত; এর ফলে কর্মশক্তি ও অধ্যবসায় বেড়ে যায়।কোন এক ব্যক্তি একজন বয়স্ক লোককে জিজ্ঞাসা করল, “জীবনের সবচেয়ে গুরুভার কিং” বয়স্ক ব্যক্তিটি বিমর্ষভাবে জবাব দিলেন, “যদি বহনের জন্য কোন বোঝাই না থাকে তবে সেইটিই সবচেয়ে গুরুভার।”

১৫. শৃঙ্খলাবোধের অভাব (Lack of discipline)কখনো ভেবে দেখেছেন, কোন কিছু লোক তাদের লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেন না? কেন তারা সবসময় সংকট ও বিপর্যয়ের মুখে নিরাশ হয়ে পড়েন? কেন কোন কোন ব্যক্তি একের পর এক সাফল্যের মুখ দেখেন? আবার কিছু লোক ক্রমাগত ব্যর্থ হন? খেলাধুলা, শরীরচর্চা, শিক্ষাদীক্ষা অথবা ব্যবসা-বাণিজ্য যে কোন ক্ষেত্রে হোক না কেন উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জনকরতে হলে শৃঙ্খলা ব্যতীত কিছুই করা যায় না। শৃঙ্খলাহীন ব্যক্তি অনেক কিছু একসঙ্গে করতে চায়। কিন্তু কিছুই করে উঠতে পারেন না। কোন কোন তথাকথিত উদার চিন্তাবীদ শৃঙ্খলাহীনতাকে স্বাধীনতা বলে ব্যাখ্যা করেন। আমি যখন এরোপ্লেনে ভ্রমণ করি, তখন অবশ্যই আশা করব যে পাইলট, তার যা যা করণীয় সেগুলি নিয়মমাফিক নির্দেশ অনুযায়ী করবেন, তার ইচ্ছামতো কিছু করবেন না। তারা যে এই রকম উদার বিশ্বাস না করে বসেন, “আমি মুক্ত, কন্ট্রোল টাওয়ারের নির্দেশ মানতে আমার ইচ্ছা নেই।” সংগতির অভাব শৃঙ্খলহীনতার লক্ষণ। শৃঙ্খলার অর্থ আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্মত্যাগ, মনসংযোগ এবং প্রলোভনকে এড়িয়ে চলা। শৃঙ্খলার অর্থ নির্দিষ্ট লক্ষ্যে দৃষ্টি নিবন্ধ রাখা। বাষ্পকে যদি সংহত করে নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা না যায় তবে তা ইঞ্জিনকে চালাতে পারে না। নায়াগ্রা জলপ্রপাত থেকে কোন জলবিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে না যদি তার স্রোতের শক্তিকে শৃঙ্খলিত করা না যায়। কচ্ছপ এবং খরগোশের গল্প আমরা সবাই জানি। খরগোশ তার দৌড়াবার ক্ষমতা নিয়ে গর্ব করত এবং কচ্ছপকে দৌড় প্রতিযোগিতার আহ্বান জানিয়েছিল, শেয়াল ছিল প্রতিযোগিতার বিচারক। দৌড় শুরু হওয়ার পর খরগোশ দ্রুত দৌড়ে কচ্ছপকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেল, দৌড়ে জেতার সম্পর্কে এতই নিশ্চিত ছিল যে মাঝপথে তার একটু ঘুমিয়ে নেবার ইচ্ছা হল। যখন জাগল এবং দৌড় প্রতিযোগিতার কথা স্মরণ করে দৌড়তে শুরু করল তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। কচ্ছপ তখন প্রতিযোগিতার সমাপ্তি সীমায় পৌঁছে গেছে এবং প্রতিযোগিতায় বিজয়ী বলে ঘোষিত হয়েছে। কাজের সংগতি রক্ষাই শৃঙ্খলা এবং এই সংগতিপূর্ণ কাজ খেয়াল খুশিমতো চেষ্টা করার থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপনের জন্য স্বাধীনতাকে খর্ব করতে হয়। সেটি যেমন কষ্টদায়ক, তেমনি বিশৃঙ্খল জীবনের যে পরিণাম সেটিও বেদনায়ায়ক। এই দুইয়ের মধ্যে শৃঙ্খলাপরায়ণতাই কম কষ্টদায়ক। সাধারণত যেসব বাচ্চারা অজস্র স্বাধীনতার এবং শৃঙ্খলাহীনতার মধ্যে বড় হয় তারা তাদের পিতামাতা, সমাজ, এমনকি নিজের উপরেও বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। কোনওরূপ দায়িত্বগ্রহণে তাদের বিশেষ কষ্ট হয়।

পৃষ্ঠা:৫৮

১৬. আত্মমর্যাদাবোধের অভাব (Poor self-esteem)আত্মসম্মান এবং নিজের যোগ্যতার অভাববোধ থেকে জন্মায় মর্যাদাবোধের অভাব। এটি ক্রমাগত আত্ম অবমাননার দিকে নিয়ে যায়। যুক্তিহীন অহংবোধ মানুষকে পরিচালনা করে। কোন কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য নয় কেবল অহংবোধকে সন্তুষ্ট করার জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যাদের মর্যাদাবোধ কম তারাই ক্রমাগত অন্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অভিন্নতা খোঁজে। কিন্তু নিজের আত্মস্বাতন্ত্র্যবোধ খোঁজার জিনিস নয়-তাকে তৈরি করতে হয়।আলস্য ও কর্মবিমুখতা নগন্য আত্মমর্যাদাবোধের ফলশ্রুতি। যাদের আত্মমর্যাদাবোধ নেই তারাই কেবল অজুহাত দেখায়। কর্মবিমুখতা মরচের মতো, তা সবচেয়ে উজ্জ্বল ধাতুকেও ক্ষয় করে।

১৭. জানের অভাব (Lack of knowledge)নিজের অজ্ঞানতা সম্পর্কে ধারণা থাকলেই জ্ঞান অর্জন সহজ হয়। একজন মানুষ যতই জ্ঞান অর্জন করেন ততই বুঝতে পারেন যে কোন কোন বিষয় তার জ্ঞানের অভাব আছে। যে ব্যক্তি ভাবে যে সে সব কিছু জানে তার অনেক জিনিসই জানতে বাকি আছে।অজ্ঞ ব্যক্তিরা জানেনা যে তারা অজ্ঞ। তারা যে জানে না সেই তথ্যটিও তাদের অজানা। বস্তুতপক্ষে, অজ্ঞতা নয়, বড় সমস্যা জ্ঞানের মোহ। এই মোহ মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করতে পারে।

১৮. অদৃষ্টবাদী মনোভাব (Fatalistic attitude)অদৃষ্টবাদী মনোভাব থাকলে মানুষ জীবনে দায়িত্বগ্রহণ করতে পারে না। তারা সাফল্য বা ব্যর্থতার জন্য দায় ভাগ্যের উপর চাপিয়ে দেয়। তারা ভাগ্যের কাছে আত্মসমর্পণ করে। তারা কোষ্ঠীতেও গ্রহন ক্ষত্রের বিচারে পূর্বনির্ধারিত ভবিষ্যতে বিশ্বাস করে। বিশ্বাস করে যে তাদের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও যা ঘটবার তা ঘটবেই। সেইজন্য তারা কোন চেষ্টাই করে না এবং সমস্ত বিষয়ে গা এলিয়ে দেয়। তারা ঘটনা ঘটার জন্য অপেক্ষা করে নিজেরা কোন কিছু ঘটাতে চায় না। যে কোন ব্যর্থ ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলে বলবে যে সাফল্য ভাগ্যের ব্যাপার। দুর্বলচিত্ত ব্যক্তিরা ভবিষ্যৎ বক্তা, কোষ্ঠী বিচারককারী এবং স্বাঘোষিত সন্ন্যাসীদের সহজ শিকার হয়। এই ব্যক্তিরা সাধারণত কুসংস্কারাচ্ছন্ন এবং আচার বিচার পালনে উৎসাহী। লঘুচিত্ত ব্যক্তিরাই ভাগ্যে বিশ্বাস করেন। শক্তিমান এবং দৃঢ়চিত্ত ব্যক্তিরা বৈজ্ঞানিক কার্যকারণ সম্পর্কে বিশ্বাস করেন। কেউ কেউ খরগোশের পা সৌভাগ্যদায়ক বলে মনে করেন- কিন্তু এই বিশ্বাস কি খরগোশের পক্ষে সৌভাগ্যদায়ক?কিছু লোক ভাবেন তারাই কেবল ভাগ্যহীন এই ধরনের চিন্তা থেকে অদৃষ্টবাদী দৃষ্টিভঙ্গি জন্মায়। যারা সবচেয়ে দ্বিধাগ্রস্ত চিত্তে কাজ করেন তারা বলেন

  • “আমি একবার চেষ্টা করব”;
  • “আমি দেখব এতে কাজ হয় কিনা”;
  • “আমার তো হারাবার কিছুই নেই”;
  • “যাইহোক আমি এটার জন্য খুব চেষ্টা করিনি”।এই ধরনের লোক নিশ্চিতভাবে ব্যর্থ হয়, কারণ তারা দৃঢ়সংকল্প হয়ে এবং সম্পূর্ণ

পৃষ্ঠা:৫৯

মনোযোগ দিয়ে কাজ করেন না। তাদের সাহস, আত্মবিশ্বাস এবং কার্যসিদ্ধির জন্য কোন দায়বদ্ধতা নেই। তারা উদাসীনভাবে কাজ শুরু করেন। আর ব্যর্থ হলে বলেন তার ভাগ্যহীন। একজন লোক একটি ঘোড়দৌড়ের ঘোড়া কিনেছিল। তাকে ঘোড়াশালে রেখে সে একটা সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিল “পৃথিবীর দ্রুততম ঘোড়া”, মালিক ঘোড়াটাকে কোন ব্যায়াম করাতনা কিংবা কোন ট্রেনিংও দিত না। এই অবস্থায় ঘোড়াটিকে একদিন ঘৌড়দৌড়ে নামিয়ে দিল। ঘোড়াটি এল সবার শেষে। মালিক সাইনবোর্ডটি তাড়াতাড়ি খুলে ফেলল। শুধু অকর্মণ্যতার ফলে কিংবা যা করা উচিত ছিল তা না করার জন্য লোকে ব্যর্থ চেষ্টাই হয় এবং ভাগ্যকে দোষ দেয়।দূরদৃষ্টি, সাহস এবং গভীরতা না থাকলে জীবন লক্ষ্যহীন হয়ে পড়ে। সংকীর্ণচিত্ত, দুর্বল এবং অলসমনা ব্যক্তিরা সবসময় নির্বিরোধিতার পথই বেছে নেয়। অ্যাথলিটরা ১৫ বছর ধরে ট্রেনিং করে কেবল ১৫ সেকেন্ডের প্রতিযোগিতার জন্য। প্রতিযোগিতা সমাপ্তির পর যদি কোনও অ্যাথলিট বলে যে তার সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে তবে বুঝতে হবে যে সে তার সমস্ত শক্তি ও দক্ষতা উজার করে দিয়েছে। যদি তা না হয় তবে তার সম্পূর্ণ দক্ষতা। শক্তি সে ব্যবহার করেনি।যারা পরাজিত হন তাদের কাছে জীবন ন্যায়বিচারহীন কারণ তারা নিজেদের দুর্ভাগ্যের কথাই মনে করেন। তারা বিবেচনা করেন না যে, যে ব্যক্তি ভালো প্রস্তুতি নিয়েছে এবং পারদর্শী তারও খারাপ সময় এসেছিল। কিন্তু সে সেই সময়ে ভেঙে না পড়ে তা পার হয়ে আসতে পেরেছে। দু’জনের মধ্যে এইটির তফাৎ। যে জেতে তার কষ্ট সহ্য করার শক্তি অনেক বেশি এবং সবশেষে ক্রীড়াদক্ষতা অপেক্ষা চরিত্রের শক্তি অনেক বেশি।যারা আত্মনির্ভরশীল ভাগ্য তাদের সাহায্য করে (Luck favors those who help themselves)একটা ছোট শহর যখন বন্যাকবলিত হল এবং প্রত্যেকেই নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে। শুরু করল, তখন একজন লোক কোথাও যেতে রাজি হল না। সে বলল, “ভগবান বাঁচাবেন, আমার ভগবানে বিশ্বাস আছে।” জল আরও বাড়তে একটি জীপ এসে তাকে উদ্ধার করতে চাইল কিন্তু লোকটি যেতে রাজি হল না। সে আবার বলল, “আমি ভগবানে বিশ্বাস করি, আমার ভগবান আছেন।” জল যখন আরও বাড়ল তখন সে বাড়ির দোতলায় উঠল, একটি নৌকা এসে তাকে সাহায্য করতে চাইল কিন্তু তার একই কথা, “ভগবান আমাকে বাঁচাবেন।” জল আরও বাড়তে লোকটি ছাদে উঠে গেল। তখন একটি হেলিকপ্টার এসে তাকে উদ্ধার করতে চাইল। কিন্তু তখনও লোকটি বলল, “আমার ভগবানে বিশ্বাস আছে”। জল আরও বাড়তে সে জলের স্রোতে ডুবে মারা গেল। তার পর ঈশ্বরের কাছে পৌছানোর পর সে কাতর স্বরে ঈশ্বরকে জিজ্ঞেস করল, “তোমার উপর আমি সম্পূর্ণ বিশ্বাস করেছিলাম, কিন্তু তুমি আমার প্রার্থনা অগ্রাহ্য করে আমায় ডুবে মরতে দিলে কেন? ঈশ্বর জবাব দিলেন, “তোমাকে বাঁচানোর জন্য জীপ, নৌকা, হেলিকপ্টার কে পাঠিয়েছিল?” অদৃষ্টবাদী মনোভাবকে জয় করার জন্য কার্যকারণের প্রাকৃতিক নিয়মে বিশ্বাস করা দরকার এবং দায়িত্বগ্রহণের যোগ্যতা থাকা দরকার। জীবনে কোন কাজ সম্পূর্ণ করতে হলে দরকার কর্মকুশলতা, প্রস্তুতি এবং পরিকল্পনা।যোগ্য ব্যক্তির প্রতি ভাগ্য প্রসন্ন হয়।

পৃষ্ঠা:৬০

আংশিকভাবে বধির স্ত্রীর জন্য একটি শ্রুতি সাহায্যকারী যন্ত্র আবিষ্কারে চেষ্টা করছিলেন আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল। তিনি শ্রুতিসাহায্যকারী যন্ত্র উদ্ভাবন করতে পারেন নি কিন্তু তার গবেষনার ফলে টেলিফোন যন্ত্রের মূল সূত্রটি আবিষ্কার হয়েছিল। এই ব্যক্তিকে কি আপনি ভাগ্যবান বলবেন না?যখন প্রস্তুতি ও সুযোগ একত্রে মিলিত হয় তখন ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়। চেষ্টা এবং প্রস্তুতি ছাড়া ভাগ্যের প্রসন্নতা অর্জন করা যায় না।ভাগ্য (Luck)সে দিনের বেলা কাজ করেছে এবং রাতেও বিশ্রাম নেয়নি। খেলাধুলাও ছেড়ে দিয়েছে, এবং তার সঙ্গে মজলিশী আনন্দের ঘটাও বইয়ের শুকনো পাতায় চোখ রেখে নতুন জিনিস শেখার চেষ্টায় আরও আসে এগিয়ে গিয়ে চাইছে অর্জন করতে সাফল্য, সাহস এবং বিশ্বাসকে সঙ্গী করে, সে চলেছে এগিয়ে, এবং যখন সে সফল হোল লোক বললে, ” লোকটির ভাগ্য বটে”।অনামা কবি ১৯. উদ্দেশ্যহীনতা (Lack of purpose) যে সকল ব্যক্তি অনেক গুরুতর অসম্পূর্ণতাকে জয় করেছেন, তাদের জীবনকাহিনীতে দেখি যে সাফল্য লাভের এক জ্বলন্ত আকাঙক্ষা তাদের চালনা করে নিয়ে গেছে। তাদের জীবনের একটিই লক্ষ্য ছিল। সমস্ত বাধা সত্ত্বেও তারা কাজটি সম্পন্ন করতে পারেন-এই কথাই তারা প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন এবং করেও ছিলেন।এই আকাঙক্ষাই পক্ষাঘাতগ্রপ্ত উইলমা রুডলফকে দৌড়ে পৃথিবীর দ্রুততম মহিলা হিসাবে ১৯৬০ সালে অলিম্পিকে তিনটি স্বর্ণপদক জিতিয়েছিল। প্লেন কানিংহামের কথায়, “পুড়ে যাওয়া পা নিয়ে একটি ছেলে একমাইল দৌড়ে বিশ্ব রেকর্ড করেছিল কেবল তীব্র আকাক্কার তাড়নায়।”পাঁচ বছরের পোলিও রোগগ্রস্ত একটি মেয়ে শক্তি ফিরে পাবার জন্য সাঁতার শুরু করে। ক্রমে সাঁতারে সাফল্য অর্জনের জন্য তার এক তীব্র আকারক্ষা জন্মে। শেষ পর্যন্ত সাঁতারের তিনটি বিভাগে মেয়েটি রেকর্ড সৃষ্টি করে এবং ১৯৫৬ সালের অলিম্পিক স্বর্ণপদক পায়। তার নাম শেলী ম্যান।যখন লক্ষ্য হারিয়ে ফেলে তখন মানুষ কোনও সুযোগেরই সন্ধান পায় না। যদি কার্যসিদ্ধির আকাক্ষা থাকে, লক্ষ্য ঠিক থাকে। অভীষ্ট কাজে সাধনা থাকে। কঠোর শ্রমের জন্য যদি প্রয়োজনীয় শৃঙ্খলাবোধ থাকে তাহলে অন্যান্য বাধা সহজ হয়ে যাবে। কিন্তু ঐ সমস্ত গুণাবলী যদি না থাকে, আর যাই থাকুক না কেন তাতে কিছুই লাভ হবে না।

পৃষ্ঠা ৬১ থেকে ৭৫

পৃষ্ঠা:৬১

চরিত্রের ভিত্তির উপরই সব কিছু নির্মাণ করতে হয়। তবেই তা স্থায়ী হয়। ২০. সাহসের অভাব (Lack of courage)সফল ব্যক্তিরা অলৌকিক ঘটনা বা সহজে কার্যসিদ্ধির জন্য অপেক্ষা করেন না। তারা সাহস ও শক্তি দিয়ে বাধা দূর করার প্রয়াস পান। যা পাওয়া যাবে না তার জন্য অপেক্ষা না করে যা আছে তাই দিয়ে কাজ শুরু করেন। অলস ইচ্ছা পূরণ হয় না। কিন্তু সংকল্প, প্রত্যাশা কিংবা দৃঢ় বিশ্বাস যে আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে তা সফল হয়। প্রার্থনার সঙ্গে সাহসী কাজ করলে প্রার্থনা পূরণ হবার সম্ভাবনা থাকে। সাহস ও চরিত্রবলের সম্মিলন ঘটলে সাফল্য নিশ্চিত। এই সম্মিলনই সাধারণ ও অসাধারণের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করে। মনে সাহস থাকলে ভয় ভুলে সংকট অতিক্রম করা সহজ হয়। সাহস মানে ভয়ের অভাব নয়, সাহস মানে ভয়কে জয় করা। চরিত্র, সততা ও ন্যায়বোধের সংমিশ্রণ, এবং চরিত্রের দৃঢ়তা ছাড়া সাহস কার্যকর হয় না। আর চরিত্র বিনা সাহস অত্যাচার বিশেষ। সাফল্যের প্রণালী (A recipe for success) সাফল্য কেক তৈরির মতো। যদি কেক তৈরির প্রণালী যথার্থ না অনুসরণ করা হয়, তাহলে কেক হবে না, উপাদানগুলি ভালো গুণমানের হবে এবং যথার্থ অনুপাতে মেশাতে হবে। ওভেনে বসিয়ে বেশি বা কম সময় অন্না হলে চলবে না। রান্নার পদ্ধতি ঠিক থাকলে, দু একবার খারাপ হতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঠিক জিনিসটি উৎরে যাবে। অধ্যাবসায় ও গোঁয়ারতুমি এক জিনিস নয়। অধ্যবসায়ে আছে দৃঢ় সংকল্প, কিন্তু গোঁয়ারতুমিতে আছে সংকল্পের অভাব। সাফল্য লাভের পদ্ধতি আপনি এখন জানে, সেগুলি প্রয়োগ করবেন কিনা, সে সিদ্ধান্ত আপনার।সাফল্যের জন্য জরুরী শিক্ষাক্রম A crash xouse for success)

  • জেতার জন্য খেলবেন, হাবার ধান্য নয়।
  • অন্যের ভুল থেকে মিক্ষাগ্রহণ করুন।
  • উন্নত নৈতিক চরিত্রের মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করুন।
  • যা অপরের নিকট পান, তার থেকে বেশি দিন।
  • উদ্দেশ্যহীনভাবে কোন জিনিসের সন্ধান করবেন না।
  • দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা করুন।
  • নিজের শক্তি যাচাই করে তার উপর ভরসা রাখুন।
  • সিদ্ধান্ত নেওয়া সময় বড় লক্ষ্যের দিকে দৃষ্টি নিবন্ধ রাখবেন।
  • সততার বিষয়ে কোনওভাবে আপস করবেন না।

পৃষ্ঠা:৬২

কাজের পরিকল্পনা :১. প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কাজে গর্ববোধ তৈরি করুন।২. ভালো কাজ পুরস্কৃত করুন।৩. সুনির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ লক্ষ্য স্থির করুন।৪. উচ্চ আশা রাখুন।৫. মূল্যায়নের জন্য স্বচছ ও পরিমাপ যোগ্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা করুন৬. অপরের প্রয়োজন সঠিকভাবে যাচাই করুন।৭. আপনার বৃহৎ পরিকল্পনায় প্রত্যেকের যথার্থ অংশ নির্দিষ্ট করুন।৮. একটি ইতিবাচক অনুকরণযোগ্য ব্যক্তি হিসাবে অন্যের নিকট দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন।৯. অন্যের আত্মসম্মান বোধ জাগ্রত করুন।৩. শৃঙ্খলার অভাবে জীবনের যে যে ক্ষেত্রে আপনি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন, সে ক্ষেত্রগুলির তালিকা তৈরি করুন। ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করুন।৪. পরবর্তী বিপত্তির মুখোমুখি হবার সময় নিজেকে এই দুটি প্রশ্ন করুন: এই বিপত্তির মোকাবিলা থেকে কী শিক্ষা গ্রহণ করব? এবং সেই শিক্ষা কিভাবে জীবনে উন্নতির জন্য প্রয়োগ করতে পারি?৫. আপনার মতে সাফল্যের সংজ্ঞা কী?৬. আপনার জীবনের লক্ষ্য বর্ণনা করুন?এইগুলি গুরুত্বপূর্ণ কেন?৭. পিছনে ফিরে তাকিয়ে চিন্তা করুন গত দশ বছরে আপনার জীবনের লক্ষ্য কি বদলেছে? যদি বদলে থাকে তবে কেন বদলেছে?

পৃষ্ঠা:৬৩

অধ্যায় : কর্মপ্রেরণা

প্রতিদিন কিবাবে নিজেকে ওঅন্যদের অনুপ্রাণিত করবেন:দু’টি ধারণা পরীক্ষিত সত্য (১) অধিকাংশ লোকই ভালো লোক, তারা আরও ভালো করতে পারেন। (২) অধিকাংশ লোকই জানেন কী করা দরকার; কিন্তু তারা করেন না। যে জিনিসটা কর্মীদের মধ্যে অনুপস্থিত তা হল একটা স্ফুলিঙ্গ অনুপ্রেরণা।কোন কোন স্বশিক্ষার বইয়ে কী করা প্রয়োজন এই বিষয়াটিকে গুরুত্ব দেয়। আমরা একটি ভিন্ন পদ্ধতি নিতে চাই। এই প্রশ্নটি প্রথমেই করি, “কাজটি আপনি করছেন না কেন?” রাস্তার পথচলতি মানুষদের ও কাজের ক্ষেত্রে কী করা অতি প্রয়োজন জিজ্ঞেস করলে তারাও ঠিক ঠিক জবাব দিয়ে দেবেন। কিন্তু যদি জিজ্ঞেস করা যায় তারা সেই মতো কাজ করেছেন কি? তাহলে জবাব হবে না। যে জিনিসটি অনুপস্থিত তা হলো কাজ করার ইচ্ছার অভাব। মানুষের বিশ্বাসের মধ্যেই থাকে কর্মপ্রেরণার উৎস। এর অর্থ, যে কাজ করবে সেই কাজের পদ্ধতি ও ফলাফলের উপর সম্পূর্ণ বিশ্বাস রাখবে এবং কাজের সম্পূর্ণ দায়িত্বগ্রহণ করবে। এই ক্ষেত্রে কর্মপ্রেরণাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মানুষ যখন তার কর্মের ও ব্যবহারের দায়িত্ব গ্রহণ করে তখন জীবনের প্রতি তার দৃষ্টি ভঙ্গি হয় ইতিবাচক। তখনই ব্যক্তিজীবনে এবং কর্মজীবনে তারা গঠনমূলকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি হয়। জীবন অনেক অর্থপূর্ণ হয়ে উঠে এবং জীবনে পূর্ণতার স্বাদ পাওয়া যায়।মানুষের শারীরিক প্রয়োজনীয়তা পূর্ণ হলে ভাবাবেগের প্রয়োজনীয়তাই হয় মানুষের বৃহত্তর চালিকাশক্তি। মানুষের কর্মোদ্যোগ ক্ষতি অথবা লাভ এই দুই উদ্দেশ্যের দ্বারাই নির্ধারিত হয়। যদি প্রাপ্তি ক্ষতির থেকে বেশি হয় তবে সেইটিই হয় চালিকাশক্তি। আর যদি প্রাপ্তির থেকে ক্ষতি বেশি হয় তবে তা কর্মোদ্যোগকে ক্ষুন্ন করে।প্রাপ্তি পার্থিব এবং বাস্তব হতে পারে যেমন আর্থিক পুরস্কার, ছুটি উপহার ইত্যাদি। আবার প্রাপ্তি অপার্থিবও হতে পারে যেমন কাজের স্বীকৃতি ও প্রশংসা উপলব্ধি, অভীষ্ট লাভের আনন্দ, পদোন্নতি, সার্বিক উন্নতি, দায়িত্বশীলতা, চরিতার্থতা, আত্মশক্তি অর্জন, দক্ষতা অর্জন এবং বিশ্বাস।উদ্বুদ্ধ হওয়া ও কাজে প্রেরণা পাওয়ার মধ্যে পার্থক্য কোথায়?(What is the difference between inspiration and motivation)আমি বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সেমিনার সংগঠন করে থাকি, অনেকে প্রায়ই জিজ্ঞেস করেন আমি অপরকে অনুপ্রাণিত করতে পারি কিনা। আমার জবাব, ‘না, আমি পারি না। মানুষ নিজেই নিজেকে অনুপ্রাণিত করে। আমি যা করতে পারি তা হলো, অনুপ্রাণিত হওয়ার জন্য তাদের উদ্বুদ্ধ করতে পারি। আমরা অনুপ্রেরণা হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হলে তাদের প্রয়োজন ও অভাবগুলিকে সঠিকভাবে অনুধাবন করা দরকার। অনুপ্রেরণা এবং উৎপাদনশীলতার মধ্যে একটা প্রত্যক্ষ যোগাযোগ আছে। যারা কেবলমাত্র চাকরি রক্ষার জন্য

পৃষ্ঠা:৬৪

প্রয়োজনীয় কাজটুকুই করেন তারা সংস্থার পক্ষে কখনই অপরিহার্য বলে গণ্য হবেন না। উদ্বুদ্ধ হওয়ার অর্থ চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, আর প্রেরণা হচ্ছে কাজের গতি ও পদ্ধতির পরিবর্তন। অনুপ্রেরণা খানিকটা আগুনের মতো-যদি ইন্ধন জোগানো না যায় তা হলে নিভে যায়। খাদ্য ও ব্যায়ামজাত পুষ্টি যেমন চিরকাল থাকে না। তেমনি কর্মপ্রেরণাও চিরস্থায়ী নয়। তবে মূল্যবোধের গভীরতর বিশ্বাস যদি কর্মপ্রেরণার উৎস হয় তাহলে কর্মপ্রেরণা দীর্ঘস্থায়ী হয়।কী কী বন্ধু সবচেয়ে বেশি কর্মপ্রেরণা জোগায়? অর্থ? স্বীকৃতি?জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন? যাদের পছন্দ করি সেই সমস্ত মানুষের নিকট অধিকতর গ্রহণযোগ্যতা? এর সবগুলিই কর্মপ্রেরণার উৎস হতে পারে। অভিজ্ঞতায় দেখা যায় মানুষ অর্থের জন্য অনেক কিছু করতে পারে, একজন ভালো নেতার জন্য আরো বেশি করতে পারে, আবার নিজের বিশ্বাসের প্রেরণায় অনেক বেশি করতে পারে। পৃথিবীতে এরূপ ঘটনা প্রত্যেকদিন উদ্দেশ্য এই যে যখন আমরা বিশ্বাস করব যে আমরাই আমাদের জীবনযাত্রা ও ব্যবহারের জন্য দায়ী তখন আমাদের জীবনের প্রতি দৃষ্টি ভঙ্গিও উন্নততর হবে।কর্মগ্রেরণার নতুন সংজ্ঞা (Let’s redefine motivation)এরপরের যুক্তি-সম্মত প্রশ্ন হোল, কর্মপ্রেরণা কী? কর্মপ্রেরণা হচ্ছে সেই মনোভাব যা কর্মে ও কর্মচিন্তায় উদ্বুদ্ধ করে। কর্মপ্রেরণার অর্থ কর্মে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা পাওয়া।’ তাছাড়াও প্রেরণা মানুষের কর্মদক্ষতাকে উজ্জীবিত ও কর্মচিন্তাকে প্রজলিত করে। কর্মপ্রেরণা শক্তিদায়ী। মনে বিশ্বাস উৎপাদন করে, দৃঢ় প্রত্যয়ী করে, চালিকাশক্তি হিসাবে কাজ করে। এক কথায় বলতে গেলে, কর্মপ্রেরণার সংজ্ঞাই হচ্ছে কাজের জন্য গভীর আগ্রহের সৃষ্টি। এটি এমনই এক শক্তি যা আক্ষরিক অর্থে জীবনে পরিবর্তন আনতে পারে।আমরা কর্মপ্রেরণা পেতে চাই কেন?কর্মপ্রেরণাই জীবনের চালিকা শক্তি। সাফল্যের অদম্য আকাঙ্ক্ষা থেকেই কর্মপ্রেরণার জন্ম। সাফল্য ছাড়া জীবনে কোনও গৌরব নেই, কাজও উপভোগ্য হয় না, কাজে উত্তেজনা থাকে না আর পরিবারেও থাকে না আনন্দ। জীবনটাকে একটা অসম চাকার গাড়ি বলে মনে হয় যা কেবল ধাক্কা খেতে খেতে চলে। কর্মপ্রেরণার চরম শত্রু হচ্ছে আত্মতুষ্টি। আত্মতুষ্টির ফলে আসে নৈরাশ্য এবং নৈরাশ্য কর্মবিমুখ করে, কারণ কোন কাজটি গুরুত্বপূর্ণ তা নির্ধারণ করার বোধশক্তি নষ্ট হয়ে যায়।কর্মপ্রেরণা কিভাবে কাজ করে? (Motivation-how does it work?)কর্মপ্রেরণার মূল উপাদনাগুলিকে যদি অনুধাবন করা যায় তাহলে লক্ষ্যে পৌছানো সহজ হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে অন্যকেও অনুপ্রাণিত করা যায়।নিজের অন্তরের কর্মপ্রেরণাই চালিকাশক্তি, এবং এই প্রেরণাই দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে। বস্তুতপক্ষে এই মনোভাব এমনভাবে সঞ্চারিত হয় যে অন্যান্য সহকর্মীদেরও একই প্রেরণা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে উদ্বুদ্ধ করে। কিভাবে কোন ব্যক্তি তার কর্মপ্রেরণা বজায় রাখে এবং লক্ষ্যে স্থির থাকে?এই উদ্দেশ্যে অ্যাথলিটরা অনেকদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন- তার নাম অবচেতনা মনের ইঙ্গিত পাওয়ার চেষ্টা বা স্বাভিভাব। এই স্বাভিভাব ইতিবাচক-

পৃষ্ঠা:৬৫

অতীত বা ভবিষ্যতের ইঙ্গিত নয়; বর্তমানে কিভাবে পারদর্শিতা বাড়ানো যাবে তার স্বাঙ্গ ৩। বারবার এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এক কথায় এটি একটি ইতিবাচক আত্মকথন।কর্মপ্রেরণা দুই প্রকারের-বাহ্যিক ও আন্তরিক।বাহ্যিক কর্মপ্রেরণা (External motivation) অর্থ, সামাজিক স্বীকৃতি, খ্যাতি কিংবা ভয় এগুলি হল বাহ্যিক কর্মপ্রেরণা। যেমন বাবা মায়ের হাতে মার খাবার ভয়ে কোন কাজ করা বা কোন কাজ থেকে বিরত থাকা, চাকরি থেকে বিতাড়িত হবার ভয়ে কাজ করা, এগুলি হলো বাহ্যিক কর্মপ্রেরণার উদাহরণ।একটি কোম্পানী কর্মীদের জন্য পেনসন পরিকল্পনা চালু করল। কিন্তু জন নামক এক কর্মী ছাড়া সবাই সেই পরিকল্পনায় যোগ দিল। পরিকল্পনাটি কর্মচারীদের স্বার্থের পক্ষে উত্তম। জন কিন্তু একলাই এই পরিকল্পনায় অংশ নিল না, যদিও তার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং বন্ধুরা অনেক বোঝাল তবুও জন তার সিদ্ধান্ত বদলাল না।একদিন কোম্পানীর মালিক জনকে ডেকে বলল, “তোমার সমানে আছে কাগজ ও কলম, হয় তুমি পেনসন পরিকল্পনায় যোগ দাও নয়, তুমি এই মুহূর্তে ছাটাই।” জন সঙ্গে সঙ্গে সই করল। মালিক যখন জিজ্ঞেস করল, সে এতদিন পরিকল্পনায় সেই করেনি কেন। জন বলল, “পরিকল্পনাটি আপনি যেভাবে ব্যাখ্যা করলেন সেভাবে আর কেউ আমাকে ব্যাখ্যা করেননি।”ভয়ের ফলে কাজের আগ্রহ (Fear mitivation)কর্মস্থলে ভীতি কখনো কখনো কার্যসিদ্ধির পক্ষে সুবিধেজনক।

  • ভয়ে তাড়াতাড়ি কাজ নিষ্পন্ন হয়।
  • ভয়ের ফল তাৎক্ষণিক।
  • কর্মীর মনে ভীতি থাকলে ক্ষতি কম হয় কারণ কাজটি সময়ের মধ্যে নিষ্পন্ন করযায়।
  • সাময়িকভাবে কর্মীর কর্মদক্ষতার উন্নতি হয়।কাজের গতি বৃদ্ধি পায় (Performace goes up)প্রায়ই দেখা যায় যে শিকার শিকারীর থেকে বেশি জোরে দৌড়ায় কারণ শিকারী দৌড়ায় খাদ্যের প্রয়োজনে আর শিকার দৌড়ায় প্রাণ বাঁচাবার তাগিদে।ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, ক্রীতদাসেরা পিরামীড তৈরি করেছে সর্বদাই তাদের উপর নজর রাখতে হতো এবং শাসন করতে হতো। কাজ করবার জন্য কর্মপ্রেরণার উৎস হিসাবে

ভীতির কতকগুলি সীমাবদ্ধতা আছে:

  • ভয় বাহ্যিক ব্যাপার। যতক্ষণ পর্যন্ত মালিক বা উপরওয়ালা উপস্থিত থাকে ততক্ষণ   পর্যন্ত ভয় থাকে। তারা চোখের আড়াল হলে ভয় চলে যায়।
  • ভয় মানসিক চাপের সৃষ্টি করে।
  • কাজের পরিধি নির্দেশটুকু মানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
  • সৃজনশীলতা নষ্ট করে দেয়।
  • ভয় কর্মপ্রেরণার উৎস হলে এই প্রেরণা বজায় রাখতে ভয়কে ক্রমাগত বাড়াতে হয়।এক খদ্দের একজন কর্মচারীকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কবে থেকে এখানে কাজ শুরু করেছ?” কর্মচারীটি বলল “যেদিন থেকে মালিক আমাকে তাড়িয়ে দেবে বলে ভয় দেখিয়েছে”, ভয় এখানে কাজের প্রেরণা।

পৃষ্ঠা:৬৬

আর্থিক অনুদানজনিত কর্মপ্রেরণা (Incentive motivation) বোনাস, লভ্যাংশ, স্বীকৃতি ইত্যাদি উৎসাহ বর্ধন করেও বাহ্যিক অনুপ্রেরণা জোগায়।এই ধরনের উৎসাহবর্ধক অনুপ্রেরণার কতকগুলি সুবিধে আছে। প্রধান সুবিধে হলো, যে যতক্ষণ পর্যন্ত উৎসাহ বর্ধনের কারণটি বর্তমান থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত কর্মপ্রেরণাও অটুট বাকে। গাধার সামনে গাজর ঝুলিয়ে রাখলে সে গাজরে লোভে গাড়ি টেনে চলবে। কিন্তু এই কৌশল সফল হবে তখনই যতক্ষণ পর্যন্ত গাধাটি ক্ষুধার্ত থাকবে, গাজর খাবার উপযোগী হবে এবং গাড়িটির ভার থাকবে গাধার বহন ক্ষমতার মধ্যে। মাঝে মাঝে গাধাকে গাজর খেতেও দিতে হবে, নইলে গাধা উৎসাহ পাবে না। আবার গাধার পেট যদি ভরে যায় তখন পুনরায় ক্ষুধার্ত না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আমাদের ব্যবসার জগতে এই রকমই দেখা যায়। সেলসম্যানরা যখন দেখে যে তাদের বিক্রির জন্য নির্ধারিত মাল বিক্রি হয়ে গেছে তখন তারা আর কাজ করে না। তাদের কাজের প্রেরণা কেবলমাত্র নির্ধারিত জনিসগুলি বিক্রি করা তার বাইরে কিছু করার প্রেরণা তাদের নেই। এটি বাহ্যিক প্রেরণা মান্তরিক নয়।আমাদের সবারই ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক কর্মপ্রেরণা আছে। (We are all motivated-either positively or negatively) টরেন্টোতে আমি দুই ভাইয়ের গল্প শুনেছিলাম, একজন মাদকাসক্ত ও মদ্যপ। স্ত্রী ওপরিবারের অন্যদের প্রায়ই মারধোর করত। অন্যজন সফল ব্যবসায়ী। সমাজে প্রতিষ্ঠিত এবং সুখী পরিবার। কেউ কেউ কৌতূহলী হয়ে উঠত যে একই বাবা-মায়ের দুই ছেলে একই আবহাওয়াতে মানুষ হয়েও তাদের মধ্যে এত তফাৎ হল কেন  প্রথম ভাইকে জিজ্ঞেস করা হল যে সে কেন মাদকাসক্ত ও মদ্যপ। এবং কেন স্ত্রীকে মারধোর করে? লোকটি উত্তর দিল, “আমার বাবা ছিলেন মাদকাসক্ত, মধ্যপ এবং সে তার স্ত্রী ও আমাদেরও মারধোর করত সুতরাং আমি আর অন্য কী হতে পারি?” অন্য ভাইকে একই প্রশ্ন করতে জবাব দিলেন যে তার সাফল্যের কারণও তার বাবা। উনি বললেন, ‘আমি যখন ছোট ছিলাম তখন বাবাকে দেখেছি মদ খেয়ে অনেক খারাপ কাজ করতে। আমি স্থির করলাম যে আমি এরকম হবো না। তাই আমি মাতাল নই, মাদকাসক্তও নই। আমি একজন সফল ব্যবসায়ী।” সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে একই দৃষ্টান্তকে একজন সদর্থকভাবে অনুসরণ করেছে আর একজন নঞর্থক মনোভাব নিয়ে অনুসরণ করেছে। বিভিন্ন মানুষ ভিন্ন ভিন্ন বিষয় থেকে কর্মপ্রেরণা পায় (Different things motivate different people) অভ্যন্তরীণ কর্মপ্রেরণার উৎস অন্তরের মধ্যেই থাকে। যেমন গর্ববোধ, স্বীয় কৃতিত্বের সম্পর্কে ধারণা; দায়িত্ববোধ এবং গভীর বিশ্বাস।একটি তরুণ নিয়মিত অনুশীলন করত কিন্তু সবসময় অতিরিক্ত খেলোয়াড়দের দলেই থাকত। কখনো ১১ জনের ফুটবল দলে সুযোগ পায়নি। যখন অনুশীলন করত, তার বাবা দূরে বসে দেখত।একবার চারদিন ফুটবল প্রকিযোগিতা চলল। কিন্তু একদিনও ছেলেটিকে দেখা গেল না। সে অনুশীলনেও এল না। হঠাৎ ফাইনালের দিন এসে হাজির। কোচের কাছে গিয়ে ছেলেটি বলল, “আপনি সবসময় আমাকে অতিরিক্ত খেলোয়ার হিসাবে রেখেছেন এবং

পৃষ্ঠা:৬৭

কখনো ফাইনাল খেলতে দেননি। আজ আমাকে খেলতে দিন। “কোচ জবাব দিলেন, “ভাই আমি দুঃখিত তোমাকে খেলতে দিতে পারিনা। তোমার থেকেও ভাল খেলোয়ার আছে আর তাছাড়া আজকে ফাইনাল খেলা, স্কুলের সম্মানের ব্যাপার। এখানে আমি কোন ঝুঁকি নিতে চাইনা”। ছেলেটি অনুনয় করে বলল, “আমি কথা দিচ্ছ আমি আপনার মুখ রাখব। দয়া করে আজকে খেলতে দিন।” কোচ ছেলেটির এত অনুনয় বিনয়ে গলে গিয়ে বললেন, “ঠিক আছে, আজ তুমি খেলবে কিন্তু মনে রাখবে সবদিক বিচার করে দেখলে তোমাকে আজ খেলানো উচিত নয়। তাছাড়া স্কুলের সম্মানের বিষয়টিও আছে। দেখ ভাই আমার নাম ডুবিও না।”খেলা শুরু হলে ছেলেটি উদ্দীপ্ত হয়ে খেলল। পায়ে বল পড়লেই গোল লক্ষ্য করে দৌড়াল ও গোল করল। দেখা গেল সেই হলো প্রতিযোগিতার সর্বোত্তম খেলোয়ার। তার দলও দর্শনীয়ভবে জিতল।খেলার শেষে কোচ তাকে বললেন, “ভাই, জীবনে আমি এত ভুল করিনি। তোমাকে এত ভাল খেলতে আমি কখনো দেখিনি। কী ব্যাপার বলতো এতো ভাল খেললে কী করে?” ছেলেটি বলল, “মনে আছে, আমার বাবা যে আমার খেলা দেখতেন”। কোচ মুখ ফিরিয়ে দেখল ছেলেটির বাবা যেখানে বসতেন সেখানে কেউ নেই। তিনি বললেন, “কোথায় তোমার বাবা? যেখানে বসে খেলা দেখতেন সেখানে আজ কেউ নেই। ছেলেটি জবাব দিল,” একথা আপনাকে আগে আমি বলিনি, আমার বাবা ছিলেন অন্ধ। মাত্র চার দিন আগে তিনি মারা গেছেন। আজই প্রথম তিনি উপর থেকে আমার খেলা দেখছেন”, তার বাবা খেলা দেখছেন এই ধারনাতেই ছেলেটি অনুপ্রাণিত হয়েছিল।অভ্যন্তরীণ কর্মপ্রেরণা (Internal motivation)অভ্যন্তরীণ কর্মপ্রেরণা হচ্ছে আমাদের অন্তরের তৃপ্তি। এই সন্তষ্টি কেবলমাত্র সাফল্য থেকেই আসে না, এটা আসে কোন কাজ সুসম্পন্ন করার চরিতার্থতার অনুভূতি থাকে। কেবলমাত্র উদ্দেশ্য সিদ্ধিতে এই অনুভূতি আসে না। কোন অসৎ উদ্দেশ্য সিদ্ধ হলে এই ধরনের সন্তুষ্টি পাওয়া যায় না। অভ্যন্তরীণ কর্মপ্রেরণা যেহেতু অন্তরের জিনিস সেহেতু এটি একটি স্থায়ী চালিকাশক্তি।কর্মপ্রেরণাকে চিহ্নিত করা এবং তাকে ক্রমাগত শক্তিশালী করা সাফল্যের পক্ষে প্রয়োজনীয়। লক্ষ্যকে সামনে রেখে দিবারাত্র সেই চিন্তা করাই উচিত।যে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কর্মপ্রেরণা জোগায় সেই দু’টি হলো, (১) কাজের স্বীকৃতি, (২) উন্নততর দায়িত্ব সম্পাদনের আহবান।সম্পাদিত কাজের যখন মূল্যায়ন হয় তখনই আসে স্বীকৃতি। তখন কর্মী পায় শ্রদ্ধা এবং সম্মান। ফলে সংস্থার সঙ্গে একাত্মবোধ দৃঢ় হয়।দায়িত্ববোধও এই একাত্মবোধের ধারণাকে এবং সংস্থার এক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়। উত্তরোত্তর দায়িত্ববৃদ্ধি না ঘটলে কর্মপ্রেরণা কমে যায়।অনুপ্রেরণা হিসাবে আর্থিক পুরস্কার ক্ষণস্থায়ী। শেষ পর্যন্ত এর ফলে মানসিক সন্তুষ্টি পাওয়া যায় না। বিপরীত দিক থেকে দেখলে কোন ধারণা বা চিন্তাকে যখন কাজে পরিণত করা হয় তখন মানসিক দিক থেকে অনেক পরিতৃপ্তি পাওয়া যায়। তখন গৌরবময় কাজের অংশীদার হিসাবে আনন্দ পাওয়া যায়। সঠিক কাজ করার যে আনন্দ সেই আনন্দই জোগায় কর্মপ্রেরণা।

পৃষ্ঠা:৬৮

কর্মোদ্যম এবং কর্মে অবসাদের মধ্যে চারটি অবস্থা (The four stages from motivation to demotivation) ১. কাজে আগ্রহী কিন্তু সুষ্ঠুভাবে কাজ করতে অক্ষম। (Motivated inffective)সমস্ত চাকরি জীবনে কখন একজন কর্মচারীর বেশি কর্মোদ্যম থাকে? যখন যে সংস্থার প্রথম যোগ দেয় কেন সেইসময় তার কর্মোদ্যম বেশি থাকে? কারণ সে দেখাতে চায় যে তাকে নিয়োগ করে সংস্থা ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু তার এই কর্মোদ্যম থাকলেও নতুন পরিবেশের মধ্যে সে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না যে তাকে ঠিক কী করতে হবে। সেইজন্য সে কাজে খুব দক্ষ হতে পারে না।এই অবস্থাতে কর্মীর মন নতুন ভাবগ্রহণে সমর্থ থাকে। কাজ শেখার আগ্রহ থাকে এবং সহজেই তাকে সংস্থার আদব কায়দার সঙ্গে খাপ খাইয়ে তৈরি করে নেওয়া যায়। এই অবস্থাতেই প্রশিক্ষণ এবং পারিপার্শ্বিকের সঙ্গে পরিচিতি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠে।অপেশাদারী সংস্থাগুলিতে সঠিক মানসিক প্রবণতা তৈরির কোনও কর্মসূচী নেই। কাজে যোগদানের প্রথম দিনেই উপরওয়ালা নতুন কর্মচারীকে তার কাজের জায়গা দেখিয়ে দিয়ে এবং কাজ সম্পর্কে দুই একটি কথা বলে বিদায় নয়। ফলে নতুন কর্মচারী উপরওয়ালার কাজকর্ম দেখেই শেখে। তার ভালোটাও যেমন কিছু কিছু শেখে তেমনি তার ভুলগুলিও কিছু কিছু শিখে যায়। কর্মচারীটিকে কাজের উপযোগী করে গড়ে তোলার যে সুযোগ ছিল সেই সুযোগ নষ্ট হয়।অন্যান্য বিষয় ছাড়াও তারা নিম্নলিখিত বিষয়গুলি বিশদভাবে বুঝিয়ে দেয়-

  • সংস্থার ক্রমোচ্চ কাঠামো
  • বিভিন্ন স্তরের কর্মচারীদের নিকট পারস্পরিক প্রত্যাশা
  • নীতিগত লক্ষ্য এবং নির্দেশাবলী
  • সংস্থার পক্ষে কী কী গ্রহণযোগ্য এবং কী কী নয়
  • সংস্থার সম্পদ ও সংস্থান

সংস্থার দিক থেকে প্রত্যাশা যদি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা না হয় তাহলে কাজের উন্নতি আশা করা যায় না। নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণ যথার্থভাবে হলে অনেক সুপ্ত সমস্যায় মাথা চারা দিয়ে উঠতে পারে না।২. কাজে প্রণীত এবং দক্ষ কর্মী (Motivated effective) এই পর্যায়ে কর্মচারীদের তাদের কাজ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তাছাড়া আল্লাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে কর্তব্য সম্পাদন করতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণের ফলাফল তার কাজের মধ্যে প্রতিফলিত হয়।৩. কাজে প্রেরণাহীন কিন্তু কাজ করার দক্ষতা আছে (Demotivated effective) কিছুদিন পরে কর্মোদ্যম ধীরে ধীরে কমতে থাকে এবং কর্মচারী কাজের কলাকৌশল শিখে যায়। এই প্রর্যায়ে কর্মচারীর কর্মোদ্যম থাকে ঘুম কম। শুধু সেইটুকুই মাত্র কাজ করে যা না করলে সে চাকরি হারাবে। কিন্তু তার কোন স্বকীয় কর্মপ্রেরণা থাকে না।এই অবস্থাটি কাজের উন্নতির পক্ষে বিপজ্জনক। বেশিরভাগ কর্মচারী এই তৃতীয় পর্যায়ে এসে মুখ থুবড়ে পড়ে একজন প্রকৃত কর্মোদ্যোগী পেশাদারী কর্মী কাজটি ভালো দেয়, একজন কর্মোদ্যোগহীন কর্মচারী সংস্থায় অন্তর্ঘাত শুরু করে। তার কাজের মান কেবলমাত্র চাকরি বাচাবার পক্ষেই যথেষ্ট। যারা ভালো কাজ করে তাদের সে বিদ্রুপ করে, নতুন

পৃষ্ঠা:৬৯

ধ্যানধারণাকে সে আমল দেয় না এবং সহকর্মীদের মধ্যে একটি নেতিবাচক মনোভাব গড়ে তোলে।আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে এই ধরনের কর্মচারীদের দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের কর্মপ্রেরণা জাগ্রত করা। কোন কর্মচারীদের দ্বিতীয় পর্যায়ে বেশিদিন থাকলে সে কোন দিনই দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণের উপযোগী হবে না। অথবা অবধারিতভাবে চতুর্থ পর্যায়ের দিকে যাবে।৪. কর্মচারীরা যখন কাজে প্রেরণাহীন ও দক্ষতাহীন (Demotivated ineffective)এই পর্যায়ে কর্মচারীকে ছাঁটাই করা ছাড়া নিয়োগকারীর আর কোন বিকল্প থাকে না। এই অবস্থায় প্রকৃতপক্ষে ছাঁটাই যথাযথ উপায়।স্মরণ রাখা দরকার নিয়োগকারী এবং কর্মচারী দু’জনেরই লক্ষ্য এক, দুজনেই চায় যে ব্যবসায় সাফল্য আসুক এবং ব্যবসা বাড়ক, কর্মচারী যদি এই উদ্দেশ্য সিদ্ধিতে সাহায্য করে তা হলে সংস্থার কাছে তার দাম বেড়ে যায় এবং নিজেও জীবনে সফল হয়।প্রেরণাহীনতার কারণ (Demotivating factors)নিম্নলিখিত কারণে কাজে আগ্রহের অভাব দেখা দেয়-

  • অন্যায় সমালোচনা
  • নেতিবাচক সমালোচনা
  • জনসমক্ষে অবমাননা
  • কাজ না করেও একজন যদি পুরস্কার পায় তবে যারা কাজ করে তাদের কাজে উৎসাহ নষ্ট হয়ে যায়
  • ব্যর্থতা ও ব্যর্থতার আশঙ্কা
  • সাফল্যের ফলে আত্মসন্তুষ্টি এলে, কর্মীকে কর্মবিমুখ করে
  • দিশাহীনতা
  • নির্দিষ্ট লক্ষ্যের অভাব
  • স্বল্প আত্মসম্মানবোধ
  • অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কাজ করার ক্ষমতার অভাব
  • নেতিবাচক আত্মচিন্তাকর্মস্থলের চক্রান্ত
  • অন্যায় ব্যবহার
  • ছল-চাতুরীপূর্ণ ব্যবহার
  • নিম্নমান
  • ঘন ঘন স্থান পরিবর্তন
  • কর্তৃত্ববিহীন দায়িত্বভারকোন কর্মী সন্তুষ্ট হলেই যে তার কাজে প্রেরণা আছে তা মনে করা ঠিক নয়। কেউ কেউ খুব অল্পেই সন্তুষ্ট হন ফলে তারা কাজের ক্ষেত্রেও আত্মসন্তুষ্ট হয়ে পড়েন। কাজের মধ্যে যথেষ্ট উত্তেজনা খুজে পেলেই কাজে প্রেরণা আসে। আর যদি কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা না থাকে তবে কাজে উত্তেজনা পাওয়া যায় না।কাজে অবসাদ আনে যে উপাদানগুলি সেইগুলিকে দূর না করলে কাজে উদ্বুদ্ধ করার উপায়গুলি কার্যকর করা যাবে না। অনেক সময় অবসাদের উপাদানগুলি দূর করলেই কর্মপ্রেরণা উজ্জীবিত হয়ে উঠে।

পৃষ্ঠা:৭০

কর্মপ্রেরণার উপাদান (Motivators)যে প্রেরণা মানুষের অন্তর থেকে আসে, এবং যখন কর্মীরা তাদের নিজেদের যুক্তিতেই কাজ করে, অন্যের প্রয়োজনে নয়, এই অবস্থাই আমাদের লক্ষ্য। এই কর্মপ্রেরণাই দীর্ঘস্থায়ী।স্মরণ রাখা দরকার যে আমাদের বিশ্বাসই সবচেয়ে বেশি প্রেরণা দেয়। আমরা যে আমাদের কাজ ও ব্যবহারের জন্য দায়ী এই বিশ্বাস গভীর হওয়া দরকার। সচেতনভাবে দায়িত্বগ্রহণ করলে কাজের গুণগতমান, উৎপাদনশীলতা, পারস্পরিক সম্পর্ক যৌথ কাজেরমান সমস্তই উন্নত হয়।অপরকে কাজে উদ্বুদ্ধ করার কয়েকটি পদ্ধতি-

  • কর্মীকে উপযুক্ত স্বীকৃতি দিন
  • সম্মান করুন
  • কাজকে আকর্ষণীয় করুন
  • প্রতিযোগিতায় আহ্বান করুন
  • অপরকে সাহায্য করুন, কিন্তু তিনি নিজে যা করতে সক্ষম তাকে তা করতে দিন।মানুষ তার নিজের প্রয়োজন কাজ করে-আপনার প্রয়োজনে নয়। র‍্যালফ ওয়ালডো এমার্সনের সম্পর্কে একটি গল্প এই বিষয়ে প্রাসঙ্গিক। র‍্যালফ ও তার ছেলে একদিন একটি বাছুরকে গোয়ালে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছিলেন। বাবা ও ছেলে মিলে অনেক টানাটানি ধাক্কাধাক্কি করে ক্লান্ত হয়ে পড়লেন, বাছুর অনড়। একটি ছোট্ট মেয়ে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। সে এসে তার ছোট্ট আঙ্গুলগুলি ধীরে ধীরে বাছুরটির মুখে বুলিয়ে দিল এবং বাছুরটিও স্নেহাপ্লুত হয়ে মেয়েটিকে অনুসরণ করে গোয়ালে গিয়ে ঢুকল।কাজের পরিকল্পনা(Action plan)

১. নিজের কাজ অধিকতর দক্ষতার সঙ্গে, দ্রুততার সঙ্গে এবং অধিকতর কার্যকরীভাবে করতে পারেন। তার জন্য তিনটি দিন

২. সাফল্য লাভের মূল মন্ত্রগুলিকে জীবনের প্রত্যেক ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার তিনটি পদ্ধতি লিপিবদ্ধ করুন-

ক.কর্মক্ষেত্রে–

খ. পারিবারিক ক্ষেত্রে

গ. সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে

পৃষ্ঠা:৭১

অধ্যায় 88

আত্মসম্মান-বোধ ইতিবাচক আত্মসম্মান বোধ ও ভাবমূর্তি গঠন:রেল ষ্টেশনে একটি ভিক্ষুক ভিক্ষা করছিল। তার সামনে ভিক্ষার ঝুলিতে ছিল এক বান্ডিল পেন্সিল। এক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ট্রেনে ওঠার আগে তার ঝুলিতে একটি ডলার ফেলে দিয়ে কিছুক্ষণ পরে কী ভেবে কয়েকটি পেন্সিল তুলে নিয়ে বললেন, “এক ডলারে এই কয়টা পেন্সিলই পাওয়া যাবে। তুমিই বা এমনি ডলারটা নেবে কেন, আমি বা দেব কেন?” এই বলে লোকটি ট্রেনে উঠে চলে গেলেন।ছয়মাস পরে সেই কর্মকর্তার সঙ্গে ভিক্ষুকটির আবার দেখা হলো একটি পার্টিতে।এবার ভিক্ষুকটি স্যুট-টাই পরে রীতিমত এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। সেই কর্মকর্তাকে চিনতে পেরে তার কাছে গিয়ে বললেন, “সম্ভবত আপনি আমাকে চিনতে পারছেন না।” তারপর স্টেশনের ঘটনাটি বলতে কর্মকর্তা পূর্বতন ভিক্ষুককে চিনতে পারলেন। জিঙ্গেসা করলেন, “আপনিএখানে কি করছেন?” পূর্বতন বিক্ষুকটি জবাব দিলেন, “আপনি সম্ভবত বুঝতে পারেননি আপনি আমাকে কি শিক্ষা দিয়েছেন। আমার আত্মামর্যাদাবোধ ফিরিয়ে দিয়েছেন। আপনি বলেছিলেন, ‘পেন্সিল গুলোর দাম এক ডলারেই হবে, তাই একডলার দিয়ে পেন্সিল গুলি নিয়েছিলেন’। এই কথাগুলো শুনে আমি ভাবলাম ভিক্ষা করে আত্মসম্মান নষ্ট করে আমি কি লাভ করছি। এর থেকে জীবনের গঠনমূলক কিছু করা ভালো। ভিক্ষার ঝুলি গুটিয়ে নিয়ে আমি কাজ করতে শুরু করলাম। তার ফলে আজ এই অবস্থায় পৌঁছেছি। আপনাকে ধন্যবাদ আপনি আমার আত্মমর্যাদাবোধ ফিরিয়ে দিয়েছেন: ফলে আমার জীবন পরির্বতন এসেছে।” ভিক্ষুকটিকে আত্মমর্যাদা বোধ উদ্দীপ্ত হল বলেই তার চিন্তা, কর্মপন্থা ও কর্মদক্ষতাতেও পরিবর্তন এল। জবিনে আত্মমর্যাদাবোধ ম্যাজিকের ন্যায় কাজ করে।সহজ কথায়, নিজেদের সর্ম্পকে আমরা যা ভাবি সেইটিই হোল আত্মমর্যাদা বোধ। নিজেদের সম্পর্কে আমাদের ধারণা আমাদের সমস্ত কাজকর্মকে, পারস্পরিক সম্পর্ককে, মাতাপিতা হিসাবে আমাদের দায়িত্ববোধকে এমনকি জীবনে চরিতার্থতা লাভ পর্যন্ত সমস্ত কিছুকেই প্রভাবিত করে। উন্নত আত্মসম্মান বোধ সুখী, পরিতৃপ্ত এবং অভীষ্ট লাভে উদ্যোগী জীবন যাপন সম্ভব করে। নিজের যথার্থ গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন না হলে আত্মসম্মানবোধ বাড়ে না। ইতিহাসের মহান বিশ্বনেতা ও আচার্যরাও এই কথাই বলেছেন যে অন্তরের প্রেরণা ব্যতীত সফল হওয়া যায় না।আমরা অজ্ঞাতসারে নিজেদের সম্পর্কে যে সমীক্ষা করি, সেইটিই অন্যের নিকট ব্যক্ত করি এবং তারাও সেইভাবেই আমাদের প্রতি তাদের মনোভাব গড়ে তোলেন।উন্নত আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন মানুষের বিশ্বাস যোগ্যতা ও দায়িত্ব নেয়ার ইচ্ছাও উন্নত হয়। তারা আশাবাদী, সবার সঙ্গেই সুসম্পর্ক রাখেন এবং পরিপূর্ণ জীবন যাপন করেন। তাদের থাকে কর্মপ্রেরণা ও উচ্চাশা এবং তারা সংবেদনশীলও হয় অনেক বেশি। আত্মসম্মান বোধ কাজকর্মের মানকে উন্নত করে এবং ঝুঁকি নেয়ার ক্ষমতাও বাড়িয়ে দেয়। তাদের সামনে নতুন নতুন সুযোগের সম্ভাবনার দরজা যেমন খুলে যায়, তেমনি কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়ার মানসিকতাও তৈরি করে। স্বচ্ছন্দ কুশলতার সঙ্গে তারা সমালোচনা ও

পৃষ্ঠা:৭২

অভিনন্দন দুই-ই মেনে নিতে পারেন। কোন কাজটি কল্যাণকর এই বিষয়ে সচেতনতা এবং সেই কাজ সুসম্পাদন করার পরিতৃপ্তি থেকেই আত্মসম্মান বোধের জন্ম। আত্মসম্মান-বোধ হল আমাদের নিজের সম্পর্কে ধারণা (Self-esteem is our self- concept) গল্পে আছে, একজন কৃষক তার ক্ষেতে কুমড়ো ফলিয়েছিলেন। কুমড়ো যখন খুব ছোট তখন মাচার একটি ছোট কুমড়োকে একটি কাঁচের জারের মধ্যে ভরে জারটি মাচা থেকে ঝুলিয়ে দিলেন। কুমড়ো যখন তোলার মত হল তখন দেখা গেল অন্য কুমড়ো বেশ বড় এবং বিভিন্ন আকৃতির হলেও কাঁচের জারের মধ্যে রাখা কুমড়োটি কাঁচের জারের আকৃতি পেয়েছে; তার বেশি বাড়তে পারে নি। মানুষও তার নিচের ধারণা ও চিন্তার সীমার মধ্যেই বাড়ে। তার বাইরে যেতে পারে না।উন্নত আত্ম-মর্যাদাবোধের কয়েকটি সুফল (Some advantages of high self-esteem) মানুষের ধ্যানধারণা ও তার উৎপাদনশীলতার মধ্যে একটি প্রত্যক্ষ যোগ আছে। যারা নিজের প্রতি ও অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, মাতাপিতা, আইন-কানুন ও ধন-সম্পদকে সমীহ করেন এবং নিজের দেশকে ভালোবাসেন তারাই উন্নত আত্মসম্মান বোধের অধিকারী। এর উল্টোটাও সমান সত্য।

আত্মসম্মানবোধ:

  • বিশ্বাসকে দৃঢ় করে।
  • দায়িত্বগ্রহণে ইচ্ছুক করে।
  • আশাবাদী মনোভাব গড়ে তোলে।
  • মানুষের সঙ্গে উন্নততর সম্পর্কে সৃষ্টিতে এবং পরিপূর্ণ জীবন যাপনে সাহায্য করে।
  • অন্যের প্রয়োজন সহজে অনুধাবন করে, তার প্রতি একটি সযত্ন সাহায্যের মনোভাব প্রদর্শন করে।
  • নিজের মধ্যথেকেই নিরন্তর কর্মপ্রেরণা লাভ করে এবং মানুষকে উচ্চাকাক্ষী করে।
  • নতুন সুযোগ গ্রহণের এবং কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়ার মানসিকতা তৈরি করে।
  • কাজের মানোন্নয়ন ঘটে এবং ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা বেড়ে যায়।
  • মানুষকে কৌশলী স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে সমালোচনার মুখোমুখি হতে এবং অভিনন্দনকরতে সাহায্য করে।গ্রহণ নিম্নমানের আত্মসম্মান বোধ কিভাবে চিহ্নিত করা যায়? এই ধরনের ব্যক্তি কিরূপ ব্যবহার করেন? এরূপ ব্যবহারের একটি তালিকা নীচে দেওয়া হোল। এটি সম্পূর্ণ তালিকা নয়-এতে কয়েকটি চারিত্রিক লক্ষণ নির্দেশ করা হয়েছে মাত্র।
  • এরা সাধারণত ও গুজবপ্রিয়।
  • সমালোচনা করার প্রবৃত্তি প্রখর। এমন তীব্রতার সঙ্গে সমালোচনা করেন যেন তারা কোনও প্রবল প্রতিযোগিতায় বিজয়ীর পুরস্কারের প্রত্যাশা করছেন।
  • তারা মানসিক দিক থেকে সীমাবদ্ধ এবং আত্মকেন্দ্রিক।
  • তারা সব সময়েই অজুহাত দেখিয়ে ব্যর্থতাকে ঢাকবার চেষ্টা করে।
  • কখনো দায়িত্ব নেয় না এবং সবসময় অপরকে দোষ দেন।
  • তাদের অহংবোধ বেশি, তারা উদ্ধত ও সবজান্তা। নিম্নমানের আত্মমর্যাবোধ সম্পন্ন ব্যক্তিদের সঙ্গে কাজ করা মুস্কিল। তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব দেখাবার জন্য অপরকে ছিন্নভিন্ন করেন।

পৃষ্ঠা:৭৩

  • তারা ভাগ্যবাদী-এই বিশ্বাস করেন যে উদ্যোগ ছাড়াই সব কিছু আপনা থেকে ঘটবে।
  • তাদের প্রকৃতিই বিদ্বেষপূর্ণ।
  • কোনও সদর্থক সমালোচনা গ্রহণ তারা অক্ষম। সমসময়েই আত্মরক্ষায় ব্যাপৃত।
  • একাকী থাকলে তারা একঘেয়েমি- জনিত বিরক্তি ও অস্বস্তি বোধ করেন।
  • আত্মসম্মান বোধ না থাকলে শালীনতাবোধ ও নষ্ট হয়। এরা শালীন ব্যবহার ও স্লমার্জিত ব্যবহারের মধ্যে পার্থক্য জানেন না। প্রায়ই দেখা যায় সামাজিক মেলামেশার আসরে কোনও কোনও ব্যক্তি যত বেশি মদ্যপান করেন ততই তাদের কথাবার্তা, হাসিঠাট্টা গুলি বেশি নোংরা ও অশ্লীল হয়ে ওঠে।তারা নিজেরা ব্যবহারে অকৃত্রিম নন বলে তাদের কোনও অকৃত্রিম বন্ধু থাকে না।
  • তারা রাখতে পারবেন না জেনেও প্রতিশ্রুতি দেন। বিক্রি বাড়াবার জন্য অনেক বিক্রেতা প্রায় হাতে চাঁদ এনে দেওয়ার মতো প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু প্রতিশ্রুতি রক্ষা না কররে বিশ্বাস-যোগ্যতা নষ্ট হয়। উন্নত আত্মমর্যাদা বোধসম্পন্ন ব্যক্তি ব্যবসায়ে ক্ষতি স্বীকার করেও বিশ্বাস যোগ্যতা রক্ষা করেন, কারণ বিশ্বাস যোগ্যতা অমূল্য।
  • তাদের ব্যবহার যুক্তিহীন ও খামখেয়ালি। তাদের মতিগতি ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তের মধ্যে দোদুল্যমান। আজ যদি মধুর ব্যবহার করেন, কালই প্রায় গলা কাটতে উদ্যত হন। তাদের কোনও মানসিক ভারসাম্য নেই।
  • তারা সবাইকে বিদ্রূপ করেন, তাই এককিত্বই তাদের সঙ্গী।
  • তারা স্বভাবে অতি-অভিমানী-অর্থাৎ তাদের থাকে ভঙ্গুর অহংবোধ। সামন্য কথাতেই তাদের অহংবোধ আহত হয়, ফলে তারা সমস্ত বিষয়েই বিতৃষ্ণ হয়ে ওঠেন।অতিঅভিমানী ও স্পর্শকাতর হওয়ার মধ্যে তফাৎ কী? অভিমান ক্যাকটাসের মতোকাটায় ভর্তি। স্পর্শ করলেই কাঁটার আঘাত খেতে হবে। স্পর্শকাতরতা একটি ইতিবাচকমনোভাব, যা সহমর্মী করে। কিন্তু অনেক বলেন, “ওর সঙ্গে কথা বলার সময় সাবধান, ও বড় স্পর্শকাতর।” কিন্তু তিনি যা বলতে চান তা হোল, লোকটি অতিঅভিমানী। এই অতিঅভিমানী ব্যক্তিরা-
  • নিজেদের ও অন্যের সর্ম্পকে নঞর্থক আশা পোষণ করেন, তাদের আশা কখনওপূরণ হয় না।
  • তাদের আত্মবিশ্বাস নেই।”

১. সবসময়েই তারা অপরের অনুমোদন ও স্বীকৃতির মুখাপেক্ষী। অনেক সময় কোনও ব্যক্তি কোনও বিষয়ে অন্যমতামত নেওয়ার জন্যও আলোচনা করেন। আত্মবিশ্বাসহীন ব্যক্তিরা অন্য মতামত নেওয়ার চেষ্টাই করেন না।

২. নিজের কাজকর্ম সম্পর্কে অহংকার করেন, এবং এর অর্থ হোল আত্মবিশ্বাসের

অভাব।

৩. এরা তীরু স্বভাবের। সব সময়েই ক্ষমাপ্রার্থীর মনোভাব নিয়ে চলেন। এরূপ বিনতির ফলে তারা নিজেদের এত নীচে নামিয়ে আনেন যে সেই অবস্থাকে কখনও বিনয় বলা চলে না। বিনয় আসে আত্মবিশ্বাস থেকে, কিন্তু আত্মঅবনমন হচ্ছে আত্মবিশ্বাসের অভাব।

৪. নিজেকে দৃঢ়ভাবে প্রকাশ করার ক্ষমতার অভাব।স্বল্প আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ নিজের বিশ্বাসকে প্রকাশ্যে সমর্থন করতেও দ্বিধা করেন। আবার যখন সামান্য কারণে মাত্রাঅতিরিক্ত আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন তখন তা আত্মমর্যাদাবোধের অভাব বলেই চিহ্নিত হয়। যেখানে সহমর্মিতার প্রয়োজন, সেখানে আক্রমণাত্মক হলে তাকে বিশ্বাসের দৃঢ়তা বলে মনে করা যায় না।

পৃষ্ঠা:৭৪

৫. আত্মবিশ্বাসের অভাবের ফলে সমযোতা করে চলার প্রবণতা দেখা দেয়। মনকে এই বলে শান্ত করেন, “সবাই যখন করছে আমিই বা করব না কেন।” প্রায়ই দেখা যায়, অনেকেই উপরওয়ালার চাপের কাছে নতি স্বীকার করেন, যদিও জানেন যে এর ফলাফল ভালো হবে না। তা সত্ত্বেও করে, কারণতাহলে উপরওয়ালার সুনজরে থাকবে। এই ভাবে মানিয়ে চলেন খুব স্বল্প আত্মসম্মান সম্পন্ন ব্যক্তিরা। নিজের উপর বিশ্বাস নেই বলেই তারা বাইরের সমর্থন পায়।

৬. সমাজের উচ্চকোটির মানুষের সঙ্গে এক গোষ্ঠীভুক্ত এরূপ ভান করাও আত্মর্যাদাবোধের অভাবের লক্ষণ। তখন তারা যে অর্থ খরচ করে তা হয়ত নিজের উপার্জিত নয়, যে জিনিসের প্রয়োজন নেই খরিদ করে এমন কী যে মানুষকে পছন্দ করেন না তাকে ও প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন।দৃষ্টি আকর্ষণকারী উদ্ভট ব্যবহার। নজরে পড়ার জন্য আত্মমর্যাদা বোধহীন ব্যক্তিরা অর্থহীন কাজ করতে পারেন। এরূপ বিকৃতিতে তারা আনন্দ পান এবং নিজেদের কেউকেটা মনে করেন। অনেকে অন্যের সঙ্গে তফাৎ বোঝাবার জন্য এবং নজরে কাজের মাত্রাতিরিক্ত বড়াই করেন, কিংবা সকলের সামনে ভাঁড়ামি করেন।

  • তারা দ্বিধাগ্রস্ত চিত্তের মানুষ এবং দায়িত্ব গ্রহণে অনিচ্ছুক। সাহসের অভাব এবং সমালোচনা ভায়ে তারা সবসময়েই দোলাচল চিত্ত।
  • তারা হয়ত কখনও কখনও কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহও করেন: কিন্তু নিজের দৃঢ়বিশ্বাস অবিচল থাকার ফলশ্রুতি হিসাবে যে বিদ্রোহ এবং নিজের আত্মমর্যাদাবোধের অভাবের ফলে যে বিদ্রোহ এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য করার প্রয়োজন। মহাত্মা গান্ধী, মার্টিন লুথার কিং ও আব্রাহাম লিঙ্কনের মতো বিশ্ব নেতারাও বিদ্রোহ করেছিলেন। তাঁদের বিশ্বাসের দৃঢ়তা ও সাহস ছিল বলেই তারা কর্তৃপক্ষের নীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে পেরেছিলেন। কিন্তু স্বল্প আত্মমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিরা কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। কর্তৃপক্ষ সঠিক কাজকরলেও তা এদের নিকট বিবেচ্য নয়।
  • তারা সমাজবিরোধী এবং সব সময়েই নিজেদের গুটিয়ে রাখে।
  • তাদের জীবনে লক্ষ্যের কোনও “স্পষ্ট ধারণা নেইঞ্জ এবং তারা ব্যবহার“আমি গ্রাহ্য করিনা” এরূপ ভাব প্রকাশ করে থাকে।
  • অন্যের প্রতি প্রশংসা বাক্য ব্যবহারে তারা কৃপণ আবার অপরের নিকট প্রশংসা প্রাপ্তিতে তারা অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তারা মনে করেন, অন্যের প্রশংসা করলে তার ভুল ব্যাখ্যা করা হবে, আবার কেউ তাদের প্রশংসা করলে সেটা তাদের প্রাপ্য নয় বলে মনে করেন। একে বিনয় বলা যায় না। দুর্বল চিত্ততা বলে মনে করলেই ঠিক হবে।
  • সাধারণ পার্থিব বিষয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত গুরত্ব আরোপ করেন। তারা গুনাবলী দিয়ে নয়, কী কী বিষয় সম্পত্তি আছে তাই দিয়ে মানুষের বিচার করেন। কি গাড়ি চড়েন, কি রকম বাড়িতে বাস করেন, কি ধরনের পোশাক পরিচ্ছদ, মনিমুক্তা পরিধান করেন তার উপরই সব সময় দৃষ্টি দেন। ভুলে যান যে মানুষই সম্পদ ও ঐশ্বর্যে সৃষ্টি করে, উল্টোটা নয়। এরা মানুষের অন্তরের ঐশ্বর্যের থেকে বাইরের বস্তুর ঐশ্বর্যের উপর বেশী জোড় দেন। এদের জীবন তাই বিজ্ঞাপিত পণ্যের চাকচিক্য ও নিজেদের খেয়ালখুশিকে দিয়েই আবর্তিত হয়। এরা এদের পোশাক-আসাক, জিনিসপত্রের গায়ে সাঁটা বিখ্যাত ডিজাইনারদের পরিচয় লিপিকেই সামাজিক প্রতিষ্ঠার ছাড়পত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। এসব জিনিসপত্র হস্তচ্যুত

পৃষ্ঠা:৭৫

হলে তারা লজ্জায় মরে যান। এই ইঁদুর দৌড়ে তারা অংশগ্রহণকারী। “ইদুর দৌড়ের সমস্য।! হচ্ছে, জিতলেও ইঁদুর থেকে যেতে হয়।

  • নিজেদের সম্পর্কে তাদের কোনও গর্ববোধ নেই। সাধারণত তারা পোশাক পরিচ্ছেদে অবিন্যস্ত বলে উপস্থিতিও অশোভন বলে মনে হয়।
  • তারা নিতেই জানেন, দিতে জানেন না।স্বল্প আত্মমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিরা ভারসাম্য হারিয়ে শেষ সীমারেখা পর্যন্ত চলে যেতে পারেন। একজন আত্মমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তি নির্জনতা পছন্দ করেন বলেই একাকী থাকতে চান। আর অপর দিকে যার আত্মসম্মান বোধ কম তিনি মানুষের সান্নিধ্যে অস্বস্তি বোধ করেন বলেই একাকী থাকতে চান।এই দুই শ্রেণীর মানুষের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য নীচে উল্লেখ করা হল।উন্নত আত্মসম্মান বোধ সম্পন্ন পরিকল্পনা বিষয়ে আলোচনা করেনসহানুভুতিশীল দৃষ্টি বিনয়ীকর্তৃত্বকে মান্য করেনবিশ্বাসে অবিচল থাকার সাহস আছেআত্মবিশ্বাসে আছেনিজেদের চারিত্রিক উন্নতির বিষয়েচিন্তা করেনস্বল্প আত্মসম্মান বোধ সম্পন্নমানুষের সম্পর্কে আলোচনা করেনসমালোচকের দৃষ্টিভঙ্গি কর্তৃত্বকে অস্বীকার করেন সমঝোতা করে চলেউদ্ধত স্বভাবচিন্তায় বিশৃঙ্খলা আছেনিজেদের সম্পর্কে মানুষের ধারনায় উদ্বিগ্নআক্রমণাত্বকভাবে নিজের মতামতব্যক্ত করেন নিজেদের মতামত দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেন স্বয়ং দায়িত্ব গ্রহণ করেন নিজের প্রয়োজন সম্পর্কে সচেতন আশাবাদী বোধশক্তি সম্পন্ন জানতে আগ্রহী স্পর্শকাতর সারা বিশ্বকে দায়ী করেন স্বার্থপর ভাগ্যবাদী লোভী সবজান্তা নির্জনতা বিলাসী আলোচনা করেন নিজের মূল্য সম্পর্কে সচেতন সঠিক পথে পরিচালিত শৃঙ্খলার গুরত্ব জানেন অন্তরের প্রেরণায় কাজ করেন। অপরকে সম্মান করেন শালীনতা উপভোগ করেনসীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন অপরকে দিতে প্রস্তুত অতি-অভিমানী নিঃসঙ্গতার ভারে ভারাক্রান্ততর্ক করেন কেবল মাত্র পূর্ণ আর্থিক মূল্যে বিশ্বাসী ভুল পথে পরিচালিত। স্বাধীনতার সংজ্ঞা বিকৃত করেছেন বাইরের প্রলোভনে কাজ করেন অপরকে অবজ্ঞা করেন কদর্যতা উপভোগ করেনসব কিছু করার চেষ্টা করেনঅপরের থেকে নিতে প্রস্তুত।অপরাধবোধ জাগ্রত করা এই তালিকার উদ্দেশ্য নয়, আত্মমূল্যায়নের ক্ষেত্র প্রস্তুত

পৃষ্ঠা ৭৬ থেকে ৯০

পৃষ্ঠা:৭৬

করাই এর লক্ষ্য। মানুষের সবগুণাবলী থাকার প্রয়োজন নেই। কিছু কিছু বৈশিষ্ট্যি বেশী বা কম মাত্রায় মানুষের চরিত্রে থাকতে পারে। যদি আমরা সেই গুণ গুলিকে চিহ্নিত করতে পারি তা হলে আমরা নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা করতে পারি।মুখুশের আড়ালে (The put on a mask)মুখোশের আড়ালে আত্মমর্যাদাবোধহীন একজন তরুন কর্মকর্তা উঁচুপদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন বটে কিন্তু তার নতুন পদের মর্যাদার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। একদিন দরজায় আওয়াজ শুনে ভাবলেন যে তিনি কত ব্যস্ত ও গরুত্বপূর্ণ তা আগন্তুকতে বুঝিয়ে দেওয়া দরকার। তিনি আগন্তুককে ভিতরে আসতে বলে ফোনটা তুলে নিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন। আগন্তুক অপেক্ষা করছেন, কিন্তু তিনি ফোনে কথা বলেই চললেন। ফোনে তিনি শুনিয়ে শুনিয়ে বললেন, “না না ওসব কোনও সমস্যাই হবে না: আমি ঐ বিষয়টা নিজেই দেখব।” কয়েক মিনিট পরে তিনি ফোন নামিয়ে রেখে আগন্তুকের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন তিনি তার জন্য কি করতে পারেন। আগন্তুক বললেন, ‘আমি আপনার টেলিফোনটি চালু করে দিতে এসেছি।’এরূপ ব্যবহারের অর্থ কী?এরূপ চাতুরী কেন? এর দ্বারা কী প্রমাণ হয়। এতে লাভই বা কী হয়। মিথ্যা বলার দরকার কী? মিথ্যা গর্বের জন্য এত আকাঙ্খা কেন? এগুলি আসে নিরাপত্তা ও আত্মমর্যাদা বোধের অভাব থেকে হল-ছাতুরীর প্রয়োজন কী?আমরা যা করি বা করিনা, আমরা যা কিছু পছন্দ করি বা করিনা তাই দিয়েই আমাদের চরিত্রের বিচার হয়। যেমন,* যে ধরনের সিনেমা আমরা পছন্দ করি* যে ধরনের গান আমরা শুনি* যে সঙ্গ আমরা পছন্দ করি বা এড়িয়ে চলি* যে ধরনের ঠাট্টা আমরা করে থাকি বা যে ধরনের ঠট্রোয় আমরা হাসি* যে ধরনের বই আমরা পড়ি।আমাদের প্রত্যেকটি কাজেই আমাদের চরিত্র প্রকাশিত, সুতরাং ভান করার কোনও প্রয়োজন নাই। আমি বিশ্বাস করি যদি কারুর দৃঢ় বিশ্বাস থাকে স্পর্শকাতরতা থাকে এবং সবার সহযোগীতা নিয়ে কাজ করার ক্ষমতা থাকে, তবে তিনি অন্যের উপর নিজের প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। সেই মানুষের আত্মসম্মানবোধ প্রগাঢ়।ইতিবাচক আত্মমর্যাদাবোধ

১. আত্মসম্মান বোধ২. আত্ম-বিশ্বাস ৩. নিজের যোগ্যতায় বিশ্বাস ৪. আছ-স্বীকৃতি ৫. নিজেকে ভালোবাসা ৬. নিজেকে অনুধাবন করা ৭. আত্ম-শৃঙ্খলা নেতিবাচক আত্মমর্যাদাবোধ

১. নিজেকে আড়ালে রাখো। তটা ২. আত্ম-সন্দেহ ৩. আত্ম অবমাননা ৪. নিজেকে অপব্যবহার ৫. অত্মকেন্দ্রিকতা ৬. আত্ম প্রতারণা ৭. প্রশ্নয় বেশি অহংবোধ থাকার অর্থ আত্মসর্যাদা বোধ নয়। কেউ যদি নিজের সঙ্গে শাস্তিতে থাকতে না পারে তবে অন্যের সঙ্গেও শান্তিতে থাকতে পারবেনা। আমাদের যা নেই তা

পৃষ্ঠা:৭৭

নিয়ে আমরা অন্যদের দিতে পারিনা। যদি আত্ম সম্মানবোধের উপাদান আমাদের না থাকে তবে আমরা তা অপরের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারবনা। এর জন্য আমাদের আত্মানুসন্ধান করে বিচ্যুতি গুলি দুর করতে হবে। এরোপ্লেনেও নিরাপত্তার নির্দেশনাবলীতে ও আছে আগে নিজে অক্সিজেনের মাস্ক পরে পরে সঙ্গের বাচ্চাকে পরাবে। এটি বাচ্চার নিরাপত্তার জন্যই, নিজেকে আগে বাঁচাবার স্বার্থে নয়।আমরা নিজেদের সম্পর্কে যে মূল্যায়ন করি সেটিই হোল আত্মমর্যাদবোধ। নিজেদেরকে যে ভাবে আমরা দেখি সেই দেখার মধ্যে দিয়েই আমাদের আত্ম-প্রতিচ্ছবি তৈরি হয় এবং সেগুলি অন্যের সংস্পর্শে এসে দৃঢ় হয়। নিম্নমানের আত্মমর্যাদাবোধের উৎস (Causes of low self esteem)জন্মের দিন থেকেই আমাদের মধ্যে আত্মমর্যাদবোধের সুজনা হয় তা সে ইতিবাজক আত্মমর্যাদাবোধই হোক কিংবা নেতিবাচক। নিজের সম্পর্কে অনুভূতি গুলি ধীরে ধীরে তৈরিহয় এবং সেগুলি অন্যের সংস্পর্শে এসে দৃঢ় হয়।নেতিবাচক আত্ম-কথন (Nagative self-talk)কখনও কখনও জ্ঞাতে- অজ্ঞাতে এই রকম কথা বলে থাকি,আমার স্মৃতি শক্তি দুর্বল আমি অঙ্কে কাঁচা আমি ভাল খেলোয়াড় নই

  • আমি ক্লান্ত

এরূপ বক্তব্যে নেতিবাচক মানসিকতা এবং আত্ম-অবমাননা প্রকাশ পায়। বারবার এইরকম কথা বললে মনও তাই বিশ্বাস করে ২৭সে এতে আমাদের ব্যবহার ও সেই সঙ্গে পালটে যায়। এই বক্তব্যগুলি নিজেদের সম্পর্কে ং খবরাণী হয়ে ওঠে।পরিবেশ (Environment)পারিবারিক পরিবেশবাবা-মা সন্তানকে একটি পারিবারিক মূল্যবোধ ও আচরণ বিধির মধ্যে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে দেন। পারিবারিক বৃক্ষের শাকা প্রশাখা সেই মূল থেকেই জীবনরস আহরন করে। একটি বাচ্চা মেয়ের ভদ্র ও বিনয় ব্যবহার লক্ষ্য করে তার শিক্ষক তাকে জিজ্ঞেস করলেন,” কে তোমাকে এরূপ আচরণ শেখিয়েছেন। মেয়েটি জবাব দিল, “কেউ নয়। আমাদের পরিবারের সবাই এরূপ আচরণই করেন। সন্তানের লালন-পালন (Unbringing) সক্রেটিস তার স্বদেশীবাসীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, “ভাই সব, তোমরা সম্পদ আহরণের জন্য এত কঠোর পরিশ্রম করে প্রত্যেকটি পাথর উলটিয়ে আঁচড়ে দেখছ; কিন্তু যাঁদের জন্য তোমরা সমস্ত জীবনের কঠোর শ্রমের ফল রেখে যাবে, সেই সন্তানদের যথার্থ ভাবে মানুষ করার জন্য কতটুকু সময় ব্যয় করছ?”সন্তানদের যথার্থভাবে মানুষ করার জন্য আমাদের দ্বিগুণ সময় ব্যয় করা উচিত; অর্থব্যয় অর্ধেক করে দিলেও চলবে। তরুন বয়সে শিক্ষালাভ করা কষ্টসাধ্য নয়, কিন্তু পরিনত বয়সে মুর্খ থাকা বেদানাদায়ক।আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন পিতামাতা সন্তানের মধ্যেও বিশ্বাস ও আত্মমর্যাদাবোধ জাগিয়ে।

পৃষ্ঠা:৭৮

তোলেন। তাদের বিশ্বাস, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ থেকে সন্তানেরা শিক্ষা নেয়। এর উল্টোটিও সত্য।সৎ পিতামাতা, একটি মহৎ প্রাপ্তি। যে পিতামাতার ব্যবসায়িক লেনদেনে শঠতার আশ্রয় গ্রহণ করেন দুর্ভাগ্যক্রমে তারা ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য রেখে যান একটি অনৈতিক ও মন্দ দৃষ্টান্ত।পিতামাতা, কোন আত্মীয় কিংবা শিক্ষক যার প্রতি প্রভুত শ্রদ্ধা আছে তিনিই অনুকরণীয় ব্যক্তি বা উপযুক্ত পরামর্শদাতা হিসাবে উপযুক্ত। বেড়ে ওঠার বছর গুলিতে ছেলেমেয়েরা প্রভাবশালী বয়স্ক ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তস্থল হিসাবে গ্রহণ করে। এমনকি বয়স্করা তাদের ম্যানেজার বা উচ্চপদস্থ অধিকারিকদের অনুকরণীয় ব্যক্তি হিসাবে গ্রহণ করে।অনেক চোখ তোমাকে দেখছে (Little eyes upon you)দিন রাত্রি নিরবচ্ছিন্ন ভাবে অনেক চোখ তোমাকে দেখছে অনেক ছোট ছোট কৌতুহলী চোখ। তুমি যা বলছ তার প্রতিটি শব্দ দ্রুত শোষণ করে নিচ্ছে অনেক ছোট ছোট উৎসুক কান তুমি যা করছতাই করার জন্য উন্মুক হয়ে আছে অনেক ছোট ছোট হাত;এবং ঐ ছোট ছেলেটি স্বপ্ন দেখে সে একদিন তোমার মত হবে। তুমি ঐ ছোট ছেলেটির উপাস্য, তার কাছে তুমিই বিজ্ঞতম, তার অনভিজ্ঞ মনে তোমার সম্পর্কে সন্দেহের কোনও ছায়াপাত ঘটেনি।গভীর বিশ্বাস আছে তোমার প্রতি, তোমার প্রতিটি বাক্য ও কর্মকে সে গ্রহণ করে;যখন সে বড় হবে, তখন তোমার মতই কথা বলবে আর কাজ করবে। এই বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে থাকা সরল বালকটি বিশ্বাস করে, তুমি সব সময়েই সঠিক। তাই সে দিন রাত্রি তোমাকে লক্ষ্য করে। প্রতিদিন তোমার কাজে এই ছোট ছেলেটির জন্য তুমি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছ। অপেক্ষা করে আছে, কবে বড় হয়ে সে তোমার মতো হবে।

পৃষ্ঠা:৭৯

আত্মবিশ্বাস নির্মাণ (Building confidence). এক তরুণ দম্পতি তাদের বাচ্চা মেয়েকে একটি বাচ্চাদের দেখাশোনা করার জায়গা রেখে দিয়ে নিজের নিজের কাজে যেত। বাচ্চাটিকে ছেড়ে যাওয়ার সময় বাবা-মা বাখার হাতে চুমু খেত এবং বাচ্চাটিও বাবা-মাকে চুমু দিত। তার পর তারা হাত পকেটে ঢুকিয়ে যেন চুমুকে পকেটে রেকে দিচ্ছে এরূপ ভাব করত। বাবা-মাকে ছেড়ে বাচ্চাটি যখন নিঃস্বঙ্গ বোধ করত তখন পকেট থেকে হাত বের করে গালের উপরা চেপে ধরত এবং তাতেই সে বাবা-মায়ের স্পর্শ পেত। এই ভাবে তারা পরস্পরের সান্নিধ্য ভোগ করত, যদিও সারাদিন তার কাছাকাছি থাকার সুযোগ পেতনা। কী সান্তনাদায়ী চিন্তা। বাচ্চাদের অপরাধের প্রতি ঝোঁক দেখা দেয় কেন?

  • যদি বাচ্চাকে শেখানো। হয পৃথিবীতে সব কিছই মূল্য দিয়ে কেনা যায়, তবে তারা মনে করবে যে সততা ও মুল্যদিয় কেনা যায়, ফলে তাদের নিকট সততার কোনও মূলাই থাকেনা।
  • নির্দিষ্ট অবস্থান নেওয়ার অভ্যাস না শেখালে, কোনও বিষয়েই দৃঢ় অবস্থান নেওয়াথেকে বিরত থাকবে।অল্প বয়সেই শেখানো উচিত যে জয়লাভ করাটাই সবথেকে বড় কথা নয়। এই টিকেই একমাত্র লক্ষ্য করে সে যেনতেন প্রকারে জয়লাভের চেষ্ঠা করবে।
  • শৈশব থেকেই বাচ্চারা যদি প্রয়োজন মত সব পেয়ে যায় তবে ধারনা জন্মাবে যে সব জিনিস সে সহজেই পেয়ে যাবে। এই ধারনা তার আত্ম বিশ্বাস বাড়তে সাহায্য করবেনা।
  • যখন খারাপ ভাষায় কথা বলবে তখন যদি মজা পেয়ে থাকেন তবে বাচ্চার ধারণা জন্মাবে যে সে যেন চালাক চতুর হয়ে উঠেছে।
  • তার নৈতিক মূল্যবোধ জন্মাবার চেষ্টা করিবেন না। ২১ বৎসর বয়স হলে তাকে তার নিজস্ব মুল্যবোধ নির্ধারন করতে দিন।
  • সঠিকভাবে পথ নির্দেশ না করে তার সমানে কতকগুলি পছন্দের তালিকা তুলে ধরুন। একথা কখনও তাকে বলবেন না যে প্রত্যেকটি পছন্দের কতকগুলি নির্দিষ্ট ফলাফল আছে।
  • ভুল ধরিয়ে দিলে তার মানসিক বিকার ঘটতে পারে এই আশঙ্খায় ভুল শোধরাবার চেষ্ঠা করবেন না। ফলে ভুল করার জন্য যখন সে পুলিশের হাতে ঢোফভার হবে তখন সে মনে করবে যে সমস্ত সমাজই যেন তার বিরুদ্ধাচরণ করছে।
  • জিনিসপত্র যেমন বই, জুতো, কাপড় চোপড় ইত্যাদি যখন এখানে ওখানে ফেলে রাখে সেগুলিকে যথাস্থানে তুলে রাখুন। ফলে তার মনে এই ধারনা গড়ে উঠবে যে সমস্ত দায়িত্বই যে অপরের উপর চাপিয়ে দিতে পারে।

+ • সে যা পড়তে, শুনতে বা দেখতে চায় তাই করতে দিন। খাওয়ার দিকে নজর দিন কিন্তু সে নিজের ইচ্ছামত আবর্জনা দিয়ে মন ভরে ফেলুক।

  • সমবয়সী বন্ধুদের মধ্যে জনপ্রিয় হওয়ার জন্য যা করা দরকার তাই করতে দিন।
  • তার উপস্থিতিতেই নিজেরা ঝগড়া করুন। ফলে পরিবারে যখন ভাঙ্গন ধরবে তখন সে আর আশ্চর্য হবে না।
  • যত টাকা প্রয়োজন তত টাকাই দিন। অর্থের মূল্য সম্পর্কে সচেতন করবেন না

পৃষ্ঠা:৮০

আপনাকে যে কষ্টের মধ্যদিয়ে যেতে হয়েছে, ওকে যেন সেই কষ্ট পেতে না হয়।

  • ইন্দ্রিয় তৃপ্তির উপাদান যেমন খাদ্য, পানীয়, স্বাচ্চন্দ্য সব সময় বলা মাত্র যোগান দিন। এই সব না পেলে হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়তে পারে।
  • তার বিরুদ্ধে প্রতিবেশী, শিক্ষক ইত্যাদি কিছু অভিযোগ করলে তারই পক্ষ সমর্থন করুন; কারণ তারা সবাই তার বিরুদ্ধে প্রতিকূল ধারণা পোষণ করবে।
  • যখন সত্যিকারে বিপদে পড়বে তখন এই অজুহাত খাড়া করুন যে আপনি সাধ্যমত চেষ্ঠা করেছিলেন কিন্তু বিশেষ কিছুই করতে পারেন নাই। • শৃংখলা মেনে চরলে স্বাধীনতা খর্ব হয় এই যুক্তিতে কখনও শৃঙ্খলা মানতে বাধ্য করবেন না।
  • স্বাধীনতা দেওয়ার উদ্দেশ্যে দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করুন; পিতার অধিকারে নিজের কাছে রেখে নিয়ন্ত্রণ করবেন না।
  • বাচ্চারা অল্প বয়সে যা পায়, বড় হয়ে তাই’ সমাজকে প্রতিদান দেওয়ার চেষ্ঠা করে।

(বাচ্চারা দৈনন্দিন জীবনযাত্রা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে)(Children learn what they live) শিশু যদি কেবল নিন্দা শুনতে শুনতে বড় হয়, তবে নে নিন্দা- মন্দ করতেই শিখবে। আবার যদি প্রশংসা শুনে বড় হয়, তবে প্রকৃত মুল্য উপলব্দি করতে শিখবে। যদি সে বেড়ে হয়ে উঠে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে তবে সে লড়াই করার শক্তি যাবে বেড়ে। আর যদি তার পরিবার হয় সহনশীল, সেও হয়ে উঠবে ধৈয্যশীল। শৈশব থেকে যদি কেবল উপহাসই পায় তবে সে হবে লাজুক। আর যদি পেয়ে থাকে ক্রমাগত উৎসাহ তবে তার আত্মবিশ্বাস যাবে বেড়ে। যদি বড় হয়ে উঠে লজ্জাজনক আবহাওয়ায় তাহলে সে নিজেকে ভাববে দোষী, আর যদি পায় সকলের সমর্থন, তবে সে নিজের উপরেই আস্থা রাখতে পাররবে। শৈশবে যদি সুবচার পায়, তবে সে ন্যায় বিচার করতে শিখবে। নিরাপত্তার মধ্যে বাস করলে, সে শিখবে বিশ্বাস করতে। শিশু যদি পায় বন্ধুত্ব ও স্বীকৃতি, তবে সে পৃথিবীতে বালবাসার সন্ধান করবে।

পৃষ্ঠা:৮১

শিক্ষা (Education):অজ্ঞতার থেকে শিখার অনিচ্ছাই লজ্জাজনক। অনুকরনীয় ব্যক্তিরা দৃষ্টান্তের সাহয্যে শিক্ষা দেন। বাড়ন্ত বয়সে শিশুদের সততার মূল্য সম্পর্কে যে শিক্ষা দেওয়া হয় সে শিক্ষা কখনও নষ্ট হয়না। এটি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায়। সব পেশাতেই, তা সে ঠিকাদারী, আইন ব্যবসায়ী, হিসাব রক্ষক, রাজনীতিবিদ, পুলিশ অফিসার, অথবা বিচারক যাই হোক না কেন সততার গুরুত্ব রক্ষিত হোক হা সকলেই চাই। নৈতিক শক্তি সততার থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী। বস্তুতপক্ষে নৈতিক বিশুদ্ধতা হচ্ছে সততার ভিত্তি কৃমি।তরুনদের মনকে সহজে প্রভাবিত করা যায়। যখন তারা দেখে যে তাদের শিক্ষাগুরুরাই যেমন পিতা মাতা, শিক্ষক কিংবা রাজনৈতিক নেতারা লোককে ঠকিয়ে আত্মশ্লাঘা অনুভব করছেন, কিংবা হোটেল থেকে তোয়ালে চুরি করে কিংবা রেস্তোরা থেকে কাটা চামচ চুরি করে একটা খুব গৌরবজনক কাজ করেছেন বলে ভাব দেখাচ্ছেন তখন কিন্তু বাচ্চাদের মনে নিম্ন লিখিত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়:

  • তারা হতাশ হয়।
  • তারা তাদের শিক্ষাগুরুর প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলে।
  • অনেককে এরূপ করতে দেখলে, তারা এই অসৎ ব্যবহারকেই স্বীকৃতি দিতে শুরু করে, অর্থাৎ এই ব্যবহারকেই স্বাভাবিক মনে করে তাই অনুসরণ করে। নিম্নমানের আদর্শ (Poor role models)

একদিন স্কুলে এক শিক্ষক একজন অল্পবয়সী ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন তার বাবা কিভাবে জীবিকা নির্বাহ করে। বালকটি জবাব দিল,” আমি ঠিক জানিনা, তবে অনুমান করি যে তিনি কলম, পেন্সিল, ছোট বাল্ব, টয়লেট পেপার ইত্যাদি তৈরি করেন; কারণ প্রতিদিনই বাড়ি ফিরে এলে তার টিফিনের বাক্স থেকে এ জিনিসগুলি রেরোয়।” ধরে নেওয়া হয় ঐ ফিনিস গুলি লোকটা চুরি করে।অসম তুলনা করার প্রবণতা (Making unfair comparison)ন্যায্য তুলনা করলে তা ঠিক আছে, কিন্তু যদি অসম ব্যক্তির মধ্যে অন্যায্য তুলনা করা হয় তবে তুলনীয় ব্যক্তির হীনম্মন্যতার শিকার হয়। নিরপেক্ষ তুলনার ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মনোভাব জন্মায়, এবং একজন অন্যজনের থেকে সবসময়ে ভাল করার চেষ্টা করে। উচ্চ আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন ব্যক্তিরা অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেন না- তারা নিজেদের কাজকে উন্নত করার চেষ্ঠা করেন। তাদের প্রতিযোগিতা নিজেদের সঙ্গেই। তারা তুলনা করেন তাদের সামর্থ্য এবং সেই সামর্থ্য কতটা কাজ করতে পেরেছেন তার সঙ্গে।ব্যর্থতা ও সাফল্য (Failure or success A ripple effect)“সাফল্য আরও সাফল্যের জন্ম দেয়, ব্যর্থতা জন্ম দেয় আরও ব্যর্থতার”- এই কথাটির মধ্যে অনেকটাই সত্য। খেলাধুলার ক্ষেত্রে দেখা যায় যথন চ্যাম্পিয়ন খেলোয়াড়ের মনোবল খুবই দুর্বল থাকে- কোন ও না কোনও সময় এরকম হতেই পারে, তখন তার শিক্ষক কখনই তাকে কোন লড়াকু প্রতিযোগীতার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে দেবেন না। কারণ যদি খেলোয়াড়টি আবার পরাস্থ হয় তবে তার আত্মবিশ্বাস আরও কমে যাবে। আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার জন্য তার শিক্ষক তাকে অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী করতে বলেন। এতে জিতলে তার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। পরের প্রতিদ্বন্দ্বী আরও একটু বেশী শক্তিশালী;

পৃষ্ঠা:৮২

এবং এতে সাফল্য লাভ করলে আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে যায়। এই ভাবে ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তাকে শেষ প্রতিদ্বন্দ্বীতার জন্য প্রস্তুত করা হয়।প্রত্যেকবারের সাফল্যের ফলে আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় এবং পরবর্তী প্রতিদ্বন্দ্বীতায় জয়লাভ সহজ হয়। এই কারণে, যে কোনও ভালো প্রশিক্ষক তা তিনি পিতা মাতাই হোন, শিক্ষক বা পরিদর্শক যেই হোন না কেন প্রথমে শিক্ষার্থীকে সহজ কাজ দিয়ে তাকে তৈরি করা শুরু করান। প্রতিবার সাফল্যের সঙ্গে তার আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা বোধ উন্নতা হয়। এর সঙ্গে যদি উৎসাহ দেওয়া যায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটা ইতিবাচক আত্মমর্যাদাবোদ দৃঢ় হয়ে উঠবে। আমাদের দ্বায়িত্ব হচ্ছে ক্রমাগত ব্যর্থতার শৃঙ্খল ছিন্ন করে আমদের সন্তানদের সাফল্যের পথ ধরিয়ে দেওয়া।একটি বিষয়ে ব্যর্থতার সঙ্গে সার্বিক ব্যর্থতাকে মিশিয়ে ফেলা একটি বিষয়ে ব্যর্থ হলেই বেশিরভাগ ব্যক্তি নিজেদেরকে সব বিষয়েই ব্যর্থ বলে ভাবতে শুরু করেন। তারা ঠিক বুঝতে পারেন না যে একটি বিষয়ে ব্যর্থতা সার্বিক ব্যর্থতা নয়। আমাকে বোকা বানানো হতে পারে, কিন্তু আমি তো বোকা নই। পিতামাতা, শিক্ষক ও তত্ত্বাবধায়করা সম্পূর্ণরুপে নিখুঁত কাজের অবাস্তব প্রত্যাশা করেন (Unrealistic expectations of perfection by parents, teachers and supervisors) ধরুন, একটি ছেলে তার পরীক্ষার ফলাফলে পাঁচটি ‘এ’ পেয়েছে ও একটি ‘বি’। তার বাবা মা তাকে প্রথমেই জিজ্ঞাসা করবেন সে ‘বি’ পাওয়ার জন্য তৈরি হয়নি। কিংবা তার বাবা মা কি ‘বি’ পাওয়ার জন্য অভিনন্দন জানাবে? মোটেই না।ছেলেটি শুধু চায়, সে যে পাঁচটা ‘এ’ পেয়েছে সেটা যেন স্বীকৃতি ও প্রশংসা পায়। বাবা মা ছেলের পাঁচটা ‘এ’ পাওয়ার জন্য প্রশংসা ও স্বীকৃতি দেওযার পর অবশ্য তাদের প্রত্যাশার কথা বলতে পারেন। বলতে পারেন যে ছয়টি ‘এ’ পাওয়া তারা অস্ত্রা করেন এবং তার জন্য কোনও সাহায্যের প্রয়োজন হরে তারা তা দিতে প্রস্তুত। যদি প্রত্যাশা কম থাকে তবে ছেলের কৃতিত্বও বাবা-মায়ের প্রত্যাশার সঙ্গে তত্র রেখে কমে আসবে।সেই রকম কর্মক্ষেত্রেও একজন কর্মী ১০০টি কাজ ঠিকঠাক করে, একটিতে ভুল করে। উর্ধবতন ব্যক্তি যদি ভুলটিকে বাড়িয়ে দেখেন তবে কর্মচারীর মনোবল ঠিক থাকবে না। কৃতিত্বের জন্য প্রাপ্য প্রশংসা দেওয়া হোক, কিন্তু বিচ্যুতিকে অগ্রাহ্য করে প্রশংসা করলে কাজের মান কমে যাবে। তা ঠিক হবে না।শৃঙ্খলাবোধের অভাব (Lack of discipine)শৃঙ্খলাবোধ কী?কোনও ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটলে বা কোনও সমস্যা দেখা দিরে যে সংশোধনী পদক্ষেপ নেওয়া হয় তাকেই কি শৃঙ্খলা বলে? কিংবা একজন মানুষের ইচ্ছামত কাজ করার স্বাধীনতা কি শৃঙ্খলা বোধ? এরূপ স্বাধীনতা কি ফলাফল নিরপেক্ষ? শৃঙ্খলা কি উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়? ‘শৃঙ্খলা’ নামে কি অন্যায় ব্যবহার হয়? শৃঙ্খলা কি স্বাধীনতা খর্ব করে?এর কোনওটিটই ঠিক নয়। শৃঙ্খলার অর্থ এই নয় যে, একজন বাচ্চাদের মারধর করুক। এ রকম করার অর্থ পাগলামি। শৃঙ্খলা হচ্ছে স্নেহসিক্ত দৃঢ়তা। এটি কোনও সমস্যা দেখা দেওয়ার আগেই তাকে বাধা দেওয়ার উপায়।শৃঙ্খলার দ্বারা কর্মোদ্যমকে সংহত করেও নির্দিষ্ট পথে পরিচালনা করে মহৎ কাজ সম্পাদন করা যায়। শুধু শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য আপনি কাজ করেন না। আপনি কাজ করেন যাদের ভালোবাসেন তাদের জন্য।

পৃষ্ঠা:৮৩

শৃঙ্খলা আসলে ভালোবাসার কাজ। কখনও কখনও দয়ালু হওয়ার জন্য নির্দয় হতে হয়। সব ঔষধ সুস্বাদু হয় না, অস্ত্রোপচার যন্ত্রণাবিহীন হয় না। কিন্তু আমাদের এগুলি সহ। করতেই হয়। প্রকৃতি থেকে আমাদের শিক্ষাগ্রহণ করা উচিত। জিরাফ বৃহৎ আকারের জন্তু। মা জিরাফ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাচ্চা প্রসব করে। হঠাৎ বাচ্চাটি মাতৃগর্ভের আরাম থেকে শব্ মাটির উপর পড়ে যায়। মাটিতে পড়েই থাকে উঠতে চায় না। মা জিরাফ তখন বাচ্চাটির পিছনে গিয়ে জোড়ে লাথি মারে। বাচ্চাটি উঠে দাঁড়ায়, কিন্তু তার পা তখনও দুর্বল, টলমল করে, ফলে বাচ্চাটি পড়ে যায়। মা জিরাফ কিন্তু আবার কাছে গিয়ে জোরে লাথি মারে। বাচ্চাটি উঠে দাঁড়ায় কিন্তু আবার পড়ে যায়। মা আবার লাথি মারে। এইভাবে যতক্ষণ পর্যন্ত বাচ্চাটি চলতে না পারছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার মা তাকে লাখি মেরে চলে। কেন? কারণ মা জিরাফ জানে যে পায়ের উপর দাঁড়িয়েই বাচ্চাটিকে বেঁচে থাকতে হবে তা না হলে জঙ্গলের শ্বাপদরা তাকে খেয়ে ফেলবে: অচিরেই সে হবে মাংসাশী জানোয়ারদের খাদ্য।এখন প্রশ্ন মা জিরাফ কি ভালোবেসে লাথি মেরেছে? অবশ্যই তাই। যে বাচ্চারা স্নেহশীল এবং শৃঙ্খলাপরায়ণ পরিবেশে মানুষ হয়, তারা বাবা-মায়ের প্রতি বেশি শ্রদ্ধাশীল হয়, এবং আইনমান্যকারী নাগরিক হয়। উল্টোটাও সমান সত্য। J. Edger Hoover বলেছেন, “যদি প্রত্যেক পরিবারে শৃঙ্খলা মেনে চলা হয় তবে অপ্রাপ্ত বয়স্কদের অপরাধ প্রবণতা শতকরা ৯৫ ভাগ কমে যাবে।”সুবিবেচক পিতামাতা শৃঙ্খলারক্ষার জন্য ছেলেমেয়ের সাময়িক অসন্তোষকে ভয় করেন না।শৃঙ্খলাবোধই স্বাধীনতার আনন্দ দেয়।কোনও বাচ্চাকে তার ইচ্ছামত পুরো এক বাক্স চকোলেট খেতে দিলে সে অসুস্থ হয়ে পড়বে। কিন্তু যদি দৈনিক একটি দুটি করে চকোলেট উপভোগ করতে পারবে এবং বেশ কিছুদিন ধরে আর অসুস্থও হবে না। ফলাফলের প্রতি নজর না দিয়ে খুশিমত কাজ করতে আমাদের প্রবৃত্তি আমাদের প্ররোচিত করে।“আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সম্পূর্ণ ভোগের মধ্যে স্বাধীনতা নেই, স্বাধীনতা আছে আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে।”-Epictetus নিজের মত করে নিজের নিজের কাজ করাকেই স্বাধীনতা বলে, এরূপ ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। মানুষ যা চায় সব সময়ে তা পায় না। অনেক সময় উচ্চমূল্যবোধ ও শৃঙ্খলাবোধের সুবিধাগুলি উপলব্ধি করা সহজ হয় না। মনে হতে পারে যে উল্টোটা করাই বোধহয় বেশী লাভজনক, সুবিধাজনক ও উপভোগ্য। কিন্তু অসংখ্য উদাহরণ আছে যখন মানুষ শৃঙ্খলার অভাবে সাফল্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে।শৃঙ্খলা মেনে চলতে গিয়ে মনে হতে পারে যে এটি যেন আমাদের টেনে নামাচ্ছে। যখন প্রকৃতপক্ষে এটি আমাদের উপরে উঠিয়ে দিচ্ছে। শৃঙ্খলার কাজই তাই।একটি ছেলে তার বাবার সঙ্গে ঘুড়ি ওড়াচ্ছিল। ছেলেটি বাবাকে জিজ্ঞেস করল, মুড়িটি কিসের জোড়ে উপরে উঠেছে। বাবা জবাব দিলেন, “সুতোর জোরে”। ছেলেটি বলল, “কিন্তু বাবা, সুতো তো ঘুড়িটিকে নীচের দিকে টেনে রেখেছে?” বাবা তখন ছেলেকে ভালো করে লক্ষ্য করতে বলে, সুতোটি ছিড়ে দিলেন।ঘুড়িটির কী হল? অবশ্যই মাটিতে নেমে এল। জীবনের ক্ষেত্রেও একথা সত্য। কখনও

পৃষ্ঠা:৮৪

কখনও যা আমাদের নীচের দিকে টেনে নামাচ্ছে বলে মনে হয়, সেইটিই কিন্তু আমাদের উড়তে সাহায্য করছে। শৃঙ্খলাবোধও একই কাজ করে। মুক্তি চাই সব সময়েই এই আক্ষেপ শোনা যায়, “মুক্ত হতে চাই।” রেল লাইনের গেলেই ট্রেন মুক্ত: কিন্তু তারপর যাবে কোথায়? যদি প্রত্যেকেই নিজের সুবিধা মত গাড়ি চালায়, ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা না করে তবে তাকে কি স্বাধীনতা বলা যাবে, না বলা হবে বিশৃঙ্খলা। আইন মেনে আমরা আসলে স্বাধীনতা ভোগ করছি।আলোচনা সভায় অংশগ্রহণকারী অনেককেই আমি এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছি: “আপনার ছেলের ১০৫ ডিগ্রী জ্বর, কিন্তু সে ডাক্তারের কাছে যেতে চাইছেনা। আপনি কী করবেন?” সবাই এক উত্তর দিয়েছেন, অবশ্যই ডাক্তার ডাকতে হবে, তা ছেলে যাই বলুক না কেন। কারণ ছেলের ভালোর জন্যই ডাক্তার দেখানো প্রয়োজন। বাবা-মা’র কর্তব্য ছেলে-মেয়েদের নিকট জনপ্রিয় হওয়া নয়।রাহাজানির জন্য এক আসামিকে জেলবাসের আদেশ দেওয়ার পর জজ জিজ্ঞেস করলেন, আসামির কিছু বলার আছে কিনা। আসামি বলল, “আমার অনুরোধ আমার বাবা- মাকেও জেলে পাঠিয়ে দিন।” জজের প্রশ্নের উত্তরে আসামি জবাব দিল, “আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন স্কুলে একজনের একটি পেন্সিল চুরি করেছিলাম। আমার বাবা-মা এ বিষয়ে আমাকে কিছু বলেন নি। পরে একটা পেন চুরি করলাম, তখনও তারা চুপ করে থাকলেন। তারপর আমি স্কুল থেকে এবং প্রতিবেশীদের বাড়ি থেকে অনেক জিনিস চুরি করতে থাকলাম। শেষ পর্যন্ত এটি একটি অভ্যাসে পরিনত হল। বাবা-মা সবই জানতেন, কিন্তু এ বিষয়ে তারা কখনো কিছু বলেননি। আমার সঙ্গে যদি কারুর জেলে যাওয়া উচিত বলে মনে হয় তবে তাদেরই যাওয়া উচিত।”ছেলেটি ঠিক কথাই বলছে। বাবা-মা তাদের কর্তব্য পালন না করার জন্য ছেলের কৃত কর্মের জন্য তারাও সমান ভাবে দায়ী, যদিও ছেলেটির দায় কম নয়।ছেলেমেয়েদের পছন্দমত বেছে নেওয়ার দায়িত্ব দিতে হবে কিন্তু সেই সঙ্গে তারা যেন সঠিক পথে চলার নির্দেশও পায়। তা নাহলে বিপদে পড়বে। সম্পূর্ণ মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতি আন্তশৃংখলা ও আত্মত্যাগের উপর নির্ভর করে। আমেরিকান ফ্যামেলি এ্যাশোসিয়েশনের জার্নালেখা হয়েছিল, “বাবা-মা সপ্তাহে গড়পড়তা ১৫ মিনিটের মত সময় ছেলেমেয়েদের সঙ্গে অর্থপূর্ণ কথাবার্তায় ব্যয় করে তারপর ছেলেমেয়েরা তাদের বন্ধু-বান্ধব ও টি. ভি থেকেই মূল্যবোধের শিক্ষা পায়।”নিজেকে প্রশ্ন করুন: শৃঙ্খলা ব্যতীত

  • একজন জাহাজের ক্যাপ্টেন দক্ষভাবে জাহাজ চালনা করতে পারেন?
  • একজন এ্যাথলিট কি প্রতিযোগিতায় জিততে পারেন?
  • একজন বেহালাবাদক কি কোনও কনসার্টে ভালোভাবে বাজাতে পারেন।উত্তর হবে, কখনই নয়। তাহলে আর আমরা শৃঙ্খলার প্রয়োজন আছে কিনা এই প্রশ্ন করি কেন। শৃংখলা ব্যক্তিগত ব্যবহারের ক্ষেত্রে, কাজে কৃতিত্ব দেখানোর জন্য অপরিহার্য ভাবে প্রয়োজন।

পৃষ্ঠা:৮৫

আজকে এক ধরনের মনোভাব দেখা যাচ্ছে, “যা ভালো মনে কর, তাই কর।” অনেক সময় বাবা-মায়েরা নিরীহভাবে বলে, “আমার বাচ্চারা কী করছে তাতে আমার আগ্রহ নেই, তারা সুখে থাকুক এই-ই আমরা চাই। সেইটিই বড় কথা।” আমার প্রশ্ন, “আপনি কি জানতে চাইবেন না, তারা কিসে সুখী হবে?” রাস্তায় লোকজনকে মেরে তাদের জিনিস পত্র কেড়ে নেওয়ার মধ্যেও এক ধরনের বিকৃত সুখ উপভোগ করে থাকে কোনও কোনও ব্যক্তি। সুতরাং কিসে সুখ পাওয়া যায় সেই বিষয়টিও গুরত্বপূর্ণ। মূল্যবোধ, শৃঙ্খলাবোধ ও দায়িত্ববোধের উপর সুখ ও সুখ পাওয়ার উপায়গুলি নির্ভর করে। যা ইচ্ছা তাই কর-এই রকম কথা প্রায়ই শোনা যায়। উল্টো করে বললে বলা যায় যে কাজ করছ সেই কাজ পছন্দ কর। অনেক সময়েই আমরা পছন্দ করি বা না করি আমাদের যা করা উচিত তাই করতে হয়।যে মা বাইরে কাজ করেন, তিনি সারাদিন কাজ করে বাড়ি ফিরে এসেও ঘরকন্নার কাজ, বাচ্চার দেখাশুনার কাজ করে ক্লান্ত হয়ে শুতে যান। মাঝ রাত্রে বাচ্চা কাঁদলে ওঠার ইচ্ছ্য হয়না ঠিকই, কিন্তু তবুও উঠতে হয়। কেন ওঠেন। তিনটি কারণে তাকে উঠতে হয়:* বাচ্চার জন্য ভালবাসা* কর্তব্যবোধ* দায়িত্ব বোধআমরা কেবল ভাবাবেগ সম্বল করে বাঁচতে পারি না। বয়স যাই হোক না কেন, আমাদের শৃঙ্খলা বোধ আনতেই হয়। জীবনে সফল হতে গেলে আমাদের যে কাজ করতে ইচ্ছা হয় সে কাজ না করে যে কাজ করা উচিত সেই কাজ করাই বাঞ্চনীয়। এইভাবে ইদ্দ্যকে নির্দিষ্ট পথে চালিত করতে শৃঙ্খলার প্রয়োজন।বাবা-মা, শিক্ষক এবং তদারককারীরা বাচ্চাদের লেবেল দিয়ে দেন কিংবা তাদের সম্ভাবনাকে খর্ব করেন। (Lebelling and put-downs by parents, teachers and supervisors)বাবা-মা কখনও কখনও বাচ্চাদের সম্পর্কে লঘুভাবে অথবা স্নেহের সঙ্গে, অপদার্থ, বোকা ইত্যাদি অভিধা প্রয়োগ করে থাকেন। এই ধরনের অভিধা বা লেবেল জীবনের মতো ছেলেটির গায়ে সেঁটে যায়। আর এই ভাবে মার্কামারা হয়ে গেলে অবচেতন মনে তারা বাবা- মায়ের কথাকেই সত্য বলে মেনে নিয়ে জীবনে তাই প্রমাণ করে। ভারতে বর্ণ বিভাগ এই রূপ অভিধা দিয়েই উঁচু-নীচু মানসিকতার সৃষ্টি করেছে এবং উচ্চ ও নীচ বর্ণ এইভাবেই ভাগ হয়ে গেছে। বাবা-মা বাচ্চাদের সম্পর্কে কিছু কিছু মন্তব্য করে তাদের অবনমিত করে রাখেন। মন্তব্য গুলি হল:*তুমি বোধশক্তি হীন।* তুমি কোনও কাজই ঠিকমত বরতে পার না।* তোমার মধ্যে কোনও সার পদার্থ নেই।যথার্থ মূল্যবোধে শিক্ষিত করা (Teaching the right values)অনেক সময় আমরা আমাদের পরিবারে কিংবা সংস্থায় নিতান্ত নির্দোষভাবে কিংবা বেখেয়ালে সঠিক মূল্যবোধ শেখাতে গিয়ে ভুল শিখিয়ে ফেলি।

পৃষ্ঠা:৮৬

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আমরা বাড়িতে ছেলেমেয়েদের কিংবা অফিসে ব্যক্তিগত কর্মচারীদের মিথ্যে বলতে বলে থাকি।* বলে দাও, আমি এখানে এখন নেই।* ডাকে চেক্ পাঠিয়ে দিয়েছি।আমরা আমাদের বাবা-মা, শিক্ষক এবং কর্মক্ষেত্রে তত্তাবধায়কদের নিকট চারিত্রিক ও ব্যবহারিক সততা শিখতে চাই। কিন্তু অনেক সময়েই হতাশ হতে হয়। এরূপ ছোটখাট মিথ্যা বলতে বলতেই লোকে পেশাদার মিথ্যাবাদী হয়ে যায়। অন্যকে মিথ্যা বলতে শেখানোর সময় আমাদের খেয়াল থাকে না. যে একদিন ওরা আমাদের কাছেই মিথ্যা বলবে। যেমন, একজন সেক্রেটারী তার উপরওয়ালাকে অসুস্থ বলে ছুটি নিয়ে বাজার করতে গেলেন। হতেই পারে যে উপরওয়ালার নির্দেশে মিথ্যে বলা অভ্যাস করে সে এখন মিথ্যা বলায় পারদর্শী হয়ে উঠেছে। একটি ইতিবাচক আত্মসম্মান বোধ গড়ে তোলার পদ্ধতি (Steps to building a positive self-esteem) দুর্ভাগ্যকে সৌভাগ্যে পরিণত করা (Turm scars into stars) যারা জীবনের নেতিবাচক অবস্থাকে ইতিবাচক করেছেন প্রতিকূল অবস্থাকে অনুকূল অবস্থায় রূপান্তরিত করেছেন, পথের অবরোধকে উন্নতির সোপানে পরিবর্তিত করেছেন তাদের জীবনকাহিনী পাঠ করা প্রয়োজন। হতাশা এবং ব্যর্থতা তাদের নীচে নামিয়ে দিতে পারে নি। বেঠোতেন কিছু শ্রেষ্ঠ সুর সৃষ্টি করেছেন। তার অসুবিধা কী ছিল? তিনি ছিলেন বধির। প্রকৃতিকে নিয়ে কিছু শ্রেষ্ঠ কবিতা লিখেছেন মিলটন। তার বাধ্য কী ছিল? তিনি ছিলেন অন্ধ। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট ছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নেতাদের একজন। তার অসুবিধা ছিল, তিনি চাকাওয়ালা চেয়ারে বসেই ঘোরাফেরা করতেন। তিনি ছিলেন খঞ্জ। উইলমা কডলফের কাহিনী (The Wilma Rudolph story) টেনেসীর এক গরীব পরিবারের মেয়ে উইলমা। চার বৎসর বয়সে স্কারলেট ফিভারের সঙ্গে ডবল নিউমোনিয়া এবং শেষে পোলিওর আক্রমনে তার পা দু’টি হয়ে গেল অকেজো। পায়ে লোহার জুতো পরে থাকতে হত। ডাক্তার বলল জীবনে আর মাটিতে রাখতে পারবে না উইলমা। কিন্তু উইলমার মা তাকে উৎসাহিত করতেন। বলতেন, ভগবান প্রদত্ত ক্ষমতা, অধ্যবসায় ও বিশ্বাস থাকলে সে যা চায় তাই করতে পারবে। উইলমা বলল, “আমি দৌড়ে পৃথিবীর দ্রুততম মেয়ে হতে চাই।” নয় বছর বয়সে ডাক্তারের উপদেশ অগ্রাহ্য করে পায়ের লোহার জুতো খুলে সে মাটিতে পা রাখল। ১৩ বছর বয়সে প্রথম দৌড় প্রতিযোগীতায় নামল এবং এল সবার শেষে। তারপর তার দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ দৌড় প্রতিযোগীতা- সবগুলিতেই সে খুন পেল শেষের দিকেই। শেষ পর্যন্ত একদিন এল যখন সে হল প্রথম। ১৫ বছর বয়সে টেনেসী সেন্ট ইউনিভারসিটিতে এড টেম্পল নামে কোচের দেখা

পৃষ্ঠা:৮৭

পেল। উইলমা তাকে বলল, “আমি দৌড়ে পৃথিবীর দ্রুততম মেয়ে হতে চাই।” টেম্পল বলল, “তোমার এই উদ্দীপনা, তোমাকে কেউ থামাতে পারবে না। তাছাড়া আমি তোমাকে সাহায্য করব।”তারপর একদিন উইলমা অলিম্পিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য এল। যারা সব থেকে ভালো তারাই অলিম্পিকে সুযোগ পায়। উইলমার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি ছিল জুট্টা হাইবেনামে একজন মহিলা যে কখনও কারুর কাছে পরাস্ত হয়নি। প্রথমে ছিল ১০০ মিটার দৌড়। উইলমা জুট্টাকে হারিয়ে প্রথম স্বর্ণপদকটি জিতে নিল। দ্বিতীয় প্রতিযোগীতা ছিল ২০০ মিটার দৌড়: এটিতেও উইলমা জুট্টা হাইনকে হারিয়ে দ্বিতীয় স্বর্ণপদক জিতে নিল। তৃতীয় প্রতিযোগীতা ৪০০ মিটার রিলে দৌড়। এখানেও তার প্রতিদ্বন্দ্বি জুট্টা হাইনে। রিলে দৌড়ে সবচেয়ে দ্রুত যে দৌড়ায় সে শেষের ৪০০ মিটার দৌড়ে খাকে এবং তাদের উপরেই তাদের দলের ভাগ্য নির্ভর করে। প্রথম তিনজন ঠিকমত দৌড়াল এবং ব্যাটন হস্তান্তরও সহজভাবে হল। কিন্তু উইলমার সময় যখন এল, তখন ব্যাটন নিতে গিয়ে সেটি তার হাত থেকে পড়ে গেল। উইলমা দেখল জুট্টা তীরের মত বেরিয়ে গেল। উইলমা ব্যাটনটি কুড়িয়ে নিয়ে যন্ত্রচালিতের ন্যায় দৌড়াল এবং জুট্টাকে তৃতীয় বার পরান্ত করে তৃতীয় স্বর্ণপদক জয় করল। উইলমার কৃতিত্ব ইতিহাস হয়ে গেল। ১৯৬০ সালের অলিম্পিকে একটি পক্ষাঘাতগ্রস্ত মেয়ে পৃথিবীর দ্রুততম মহিলা রূপে স্বীকৃত হল।উইলমার কাহিনী থেকে আমরা এই শিক্ষা পাই যে, সফল ব্যক্তিরা বাধা-বিপত্তি নেই বলে সাফল্য অর্জন করেন না, তারা বাধা-বিপত্তি সত্তেও সফল হন।যারা প্রতিকূলতাকে সুযোগে রূপান্তরিত করতে পারেন তাদের কাহিনী শুনে বা পড়ে আমরা কি অনুপ্রাণিত হইনা? নিয়মিতভাবে যদি আমরা এই ধরনের জীবনী বা আত্মজীবনী পড়ি তাহলে কি আমরা অনুপ্রেরণা পাব না।বুদ্ধিমানের অজ্ঞতা (Learn intelligent ignorance)আমরা কী করতে পারি এবং কী করতে পারি না সে বিষয়ে আমাদের শিক্ষা আমাদের অবহিত করে। হেনরী ফোর্ড এক প্রসঙ্গে বলেছিলেন, “আমি, সেই রকম লোক খুঁজছি যাদের কাজ সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার অফুরন্ত ক্ষমতা আছে।”হেনরী ফোর্ডই প্রথম ৬৪ ইঞ্জিন তৈরি করেছিলেন। তার বিশেষ আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না, এবং ১৪ বছর বয়সের পরে আর স্কুলে যান নি। তিনি বুদ্ধি দিয়ে বুঝতে পারছিলেন যে ৬৪ ইঞ্জিনের যথেষ্ট প্রয়োজন, কিন্তু তিনি জানতেন না কিভাবে ইঞ্জিন তৈরি করতে হবে। তিনি তার উচ্চ যোগ্যতা-সম্পন্ন এবং শিক্ষিত কর্মীদের ডেকে ঐ ইঞ্জিন তৈরি করার কথা বললেন। কিন্তু তারা বললেন ৬৪ ইঞ্জিন তৈরি করা সম্ভব না। কিন্তু হেনরী ফোর্ড জোর দিয়ে বললেন যে তার ১৪ ইঞ্জিন চাই। কয়েকমাস পরে হেনরী ফোর্ড আবার তার লোকদের জিজ্ঞাসা করলেন যে ৬৪ ইঞ্জিন তৈরি হয়েছে কিনা। তারা জবাব দিলন, “আমরা জানি কী করা যেতে পারে, এবং কি করা যাবে না। ৬৪ তৈরি করা অসম্ভব।” এইভাবে কয়েকমাস চলল কিন্তু তা সত্ত্বেও হেনরী ফোর্ড জিদ ধরে রইলেন, আমার v৪ ইঞ্জিন চাই। এর কিছুদিন পরেই সেই লোকেরাই v৪ ইঞ্জিন তৈরি করে দিল। কী করে সম্বর হোল। পুথিগত শিক্ষা কতদুর করা যায় তা জানিয়ে দেয়, কিন্তু কখনও কখনও এই সীমারেখা ঠিক হয় না।

পৃষ্ঠা:৮৮

অমর (The bumblebee)প্রকৃতি থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। বিজ্ঞানীরা বলেন ভ্রমরের শরীর বেশ ভারী এবং তুলনায় ডানার বিস্তার অনেক ছোট। বায়ুগতিশাস্ত্র অনুসারে ভ্রমর উড়তে পারার কথা নয়। কিন্তু ভ্রমর এই তত্ত্ব জানে না এবং দিব্যি উড়ে বেড়ায়। নিজের সীমাবদ্ধতা না জেনে কাজ করতে গিয়ে আশ্চর্য হয়ে যাবেন নিজের কৃতিত্বে। পিছনে ফিরে তাকিয়ে বিশ্বাসই করতে চাইবেন না যে আপনার কোনও সীমাবদ্ধতা ছিল। মানুষ সীমাবদ্ধতার ধারনা নিজেই তৈরি করে। শিক্ষা যেন সীমাবদ্ধতা আরোপ না করে।যারা টাকা বা জিনিসপত্র দিয়ে প্রতিদান দিতে পারবে না তাদের জন্য কিছু করুন (Do something for others who cannot repay you in cash or kind) ডাঃ কার্ল মেনিনজার (Dr karl Menninger) নামে একজন বিশ্ববিখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “স্নায়বিক বৈকল্য হতে যাচ্ছে এই রকম একজন ব্যক্তিকে আপনি কী উপদেশ দিবেন?” শ্রোতারা আশা করেছিলেন যে ডাঃ মেনিনজার একজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়ার কথা বলবেন। কিন্তু তিনি তা বললেন না। তিনি বললেন, “আমি পরামর্শ দেব যে ভদ্রলোক যেন বাড়িতে তালা দিয়ে শহরের অন্য প্রান্তে গিয়ে যাদের সাহায্যের প্রয়োজন এরকম মানুষদের সাহায্য করেন। এই ভাবেই আমরা নিঃস্বার্থভাবে কাজ করতে পারব।” কিন্তু দুঃখের বিষয় আমরা অধিকাংশ সময় নিজেরই নিজেদের অসুবিধা সৃষ্টি করি।প্রত্যেকেরই সেচ্ছাসেবী হওয়া উচিত। এর দ্বারা নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে বিশ্বাস তৈরি হয়। অপরের নিকট যেমন আমরা সাহায্য প্রত্যাশা করি তেমনি অন্যকে সাহায্য করলে আত্মতৃপ্তি পাওয়া যায়। এই বোধ থেকেই আত্মসম্মান বোধ জন্মায়। প্রতিধানে কিছু প্রত্যাশা না করে অপরকে দেওয়ার মধ্য দিয়ে আত্মসম্মান বোধ উন্নত হয়।শুধু পাওয়া নয়, দেওয়ার মধ্যেও আছে বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের লক্ষন।প্রশংসা করার ও গ্রহণ করার শিক্ষা দরকার (Learn to give and receivecompliments)আন্তরিকভাবে প্রশংসাসূচক কথা বলার কোনও সুযোগ হারাবেন না। স্মরন রাখবেন, এখানে মূল কথা হ’ল আন্তরিকতা। অন্যে যখন আপনাকে প্রশংসাসূচক কিছু বলেন তখন সৌষ্ঠবপূর্ণ মাধুর্য ও ঔদার্যের সঙ্গে বলুন “ধন্যবাদ”। এটিই বিনয়ের লক্ষন।দায়ভার গ্রহণ করুন (Accept responsibility)আমাদের ব্যবহার ও কাজের সমস্ত দায়িত্বই গ্রহণ করা দরকার এবং কোনও অজুহাত দেখানো থেকে বিরত থাকাই উচিত। বিষয়টি ভাল লাগেনা বলে যে ছেলে পরীক্ষায় ফেল করেছিল, তার মত যেন না হতে হয়। এই অজুহাত দিয়ে ছেলেটি কার বেশী ক্ষতি করছে? আমাদের কাজের দায়ভার নিতেই হবে এবং অপরের উপর দোষারোপ করা বন্ধ করতে হবে। তা হলেই আমাদের উৎপাদনশীলতা এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে।জন, এফ, কেনেডি (Jhon F Kennedy) বলেছেন, “আমাদের অধিকার দায়বদ্ধতার থেকে বেশি হতে পারেনা। নাগরিকের দায়িত্ব পালিত না হলে অধিকারের রক্ষাও মুস্কিল হয়েপরে।”অঞ্জুহাত বাড়া করলে সমস্যাটি জটিল হয়ে ওঠে। আমাদের দায়িত্ব আছে:

পৃষ্ঠা:৮৯

নিজের প্রতি পরিবারের প্রতি কাজের প্রতি সমাজের প্রতি

  • পরিবেশ সম্পর্কে

আমরা সবুজায়নে সাহায্য করতে পারি, ভূমিক্ষয় রোধে সাহায্য করতে পারি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষা করতে পারি।আমরা এমন বেপরোয়া ভাবে বাস করতে পারিনা যেন মনে হয় যে আমদের জন্য আর একটা পৃথিবী আছে, যেখানে চলে যেতে পারি। আমাদের প্রতিদিনই কিছু করা উচিত যা পৃথিবীকে ভালোভাবে বাসোপযোগি করে তুলতে পারে। আমরা ভবিষ্যত প্রজন্যের তত্ত্বাবধায়ক। আমরা যদি দায়িত্বশীল না হই তবে কেমন করে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে?যদি মানুষের গড়পড়তা আয়ু হয় ৭৫ বৎসর এবং আপনার বয়স এখন হয় ৪০ বৎসর তবে বাকি ৩৫ বৎসরের প্রত্যেকটি দিন আপনি কী করবেন? অবশ্যই দায়িত্বশীল মানুষের মত কাজ করে নিজেদের উপযোগিতা প্রমাণ করা প্রয়োজন।শৃঙ্খলার মধ্যে জীবন যাপন করলে আনন্দ নষ্ট হয়না বরং আরও আনন্দের ভিত্তি তৈরি হয়। প্রতিভা এবং সামর্থ থাকা সত্ত্বেও অনেককে ব্যর্থ হতে দেখা যায়। তাদের নৈরাশ্য ব্যবসা, স্বাস্থ্য এবং অপরের সঙ্গে সম্পর্ককেও ব্যাহত করে। তারা তাদের অবস্থার জন্য ভাগ্যকে দোষ দেয়, কিন্তু বোঝে না যে শৃঙ্খলার অভাবের ফলেই অনেকগুলি সমস্যার সৃষ্টিহয়েছে।লক্ষ্য স্থির করুন (Ses goals)সুনিদিষ্ট লক্ষ্য থাকলে পথের নিশানা করা সহজ হয়, এবং লক্ষ্যে পৌঁছালে একটি কাজ সুসম্পাদনের আনন্দ পাওয়া যায়। কিন্তু লক্ষ্যের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে উদ্দেশ্য সাধনে দৃঢ়তা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কল্পনাশক্তি। এগুলিই জীবনকে আর্থপূর্ণ করে এবং পরিপূর্ণতার আনন্দদান করে। নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌছিয়ে আমরা কি লাভ করলাম, তার থেকে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ হলো আমরা কতটা পারদর্শী হলাম। এই শোবনতার সঙ্গে উপযুক্ত হয়ে উঠা একটি সুন্দর অনুভুতির সৃষ্টি করে। এই অনুভুতি আমাদের আত্মমর্যাদা বোধ। লক্ষ্যস্থির করার জন্য বাস্তববাদী হওয়া প্রয়োজন। অবাস্তব লক্ষ্য অপূর্ণ থেকে যায়, ফলে আমাদের আত্মসম্মান ক্ষুণ্ণ হয়। বাস্তবানুগ লক্ষ্য উৎসাহ বর্ধন করে এবং আত্মসম্মানের ভিত্তি নির্মান করে।দৃঢ় নৈতিক চরিত্রের মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করুন (Associate with people of high moral character)জর্জ ওয়াশিংটন (George washington) বলেছেন, “সদ্‌গুন সম্পন্ন বাক্তিদের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করলে সুনাম বাড়বে। কুসংসর্গের থেকে একলা থাকা অনেক ভালো।”বন্ধুত্বের পরীক্ষাবন্ধুত্বের চাপে অনেক সময় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। “অনেক সময় আপনি আমার বন্ধু নন?” ইত্যাদি কথা আমাদের দুর্বল করে দেয়। কিন্তু সত্যি যারা বন্ধু তারা কখনো চাননা যে বন্ধুর ক্ষতি হোক। আমি যদি কোন বন্ধুকে বেশী মদ্যপান করতে দেখি তা হলে তাকে সেই

পৃষ্ঠা:৯০

সময় কিছুতেই গাড়ি চালাতে দেবনা। আমি বন্ধুত্ব হারাতে রাজি আছি, কিন্তু বন্ধু হারাতে নয়।আমরা প্রায় দেখি নিজের মতো অন্যদের নিকট প্রায্য হবে এই আশায় অনেকে তুল জিনিসকেও সমর্থন করে। এতে আত্ব-মর্যাদাবোধের অভাবই সূচিত হয়।বন্ধুত্বের চাপ অনেক সময় বন্ধুত্বের পরীক্ষায় পরিণত হয়। যে বন্ধুরা চাপ সৃষ্টি করে, বিপদের সময় তাদের পাওয়া যায় তো? আপনাকে সাহায্য করার জন্য তারা কতদূর যেতে পারে? তার থেকেও বড় প্রশ্ন, চাপ দেওয়ার সময় যদি তাদের চরিত্রে বন্ধুর প্রতি দাযিত্ববোধ না থাকে আপনি বিপদে পড়লে সেই দায়িত্ববোধ জাগবে একথা কি বলা যায়। তাই দৃঢ় নৈতিক চরিত্রের মানুষের সংস্পর্শে থাকলে নিজের আত্মমর্যাদা বোধও তৈরি হয়।বন্ধুত্বের চাপদলের মধ্যে থাকলে অন্যের চাপে সৎ ও ন্যায়ের পক্ষে দাড়ানোর ইচ্ছা কমে যায়। কারণ স্পষ্টতাই তখন সাহস ও চরিত্র থাকেনা অনেকের ইচ্ছার সঙ্গে আপস করে নিতে হয়। এই রকম আপস করে নিলে ঝামেলাও কম। সবার ইচ্ছার সঙ্গে সহমত হতে পারলে বন্ধুত্বেরও খুশি রাখা যায়, আর উপহাসাম্পদ হওয়ার ঝুঁকিও থাকে না। এখানেই আত্মমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিরা নিজেদের পৃথক করে একটি গঞ্জ টেনে দেন। সবার সঙ্গে একসাথে চলার প্রবনতাই বালক ও বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে।উদাহরন:

  • স্কুলের বাচ্চারা একসঙ্গে একরকম কাজ করে কারন একজন আলাদা হলে সে উপহাসাম্পদ হবে।
  • অনেক সময় জানা থাকলেও জবাব দেয় না, কারন অন্যেরা তাকে নিয়ে মজা করবে। • সহকর্মীদের খুশি রাখতে কারখানার ভালো কর্মীরাও তাদের উৎপাদন কম রাখে।আধিক্যহীনতাঅনেকে বলেন, “বেশি না হলে, ঠিক আছে। একটু পরীক্ষা করে দেখি, তারপর না হয় ছেড়ে দেব।” কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, “কম পরিমাণে হলে কি সেটা ভাল?”উদাহরন দেওয়া যায়,
  • অনধিক মাত্রায় ঠকানো ভাল?
  • মিথ্যা বলা?
  • চুরি করা?
  • মাধক গ্রহণ করা?
  • কেলেঙ্কারিতে জড়িত হওয়া?অনেকে আবার প্রায়ই দাবি করেন, “যখনই মনে করব তখনই ছেড়ে দিতেপারি।” কিন্তু তারা বোঝেন না যে এই ছেড়ে দিতে পারি কিন্তু দিচ্ছি না একটি নেতিবাচক মনোভাব, এটি ইচ্ছাশক্তির থেকে ক্ষমতাশালী।বাইরের শক্তি নয়, অন্তরের শক্তির দ্বারা পরিচালিত হোন (Become internally driven, not extemally driven) একদিন সকালে কোনও এক ব্যক্তি প্রসন্নচিত্তে ঘুম থেকে উঠে ফোন করে আমাকেবললেন, “আরে, আপনি পৃথিবীর মহান ব্যক্তিদের একজন। আপনি খুব ভালো কাজ করছেন, এবং আপনাকে আমার বন্ধু বলে পরিচয় দিতে পারলে আমি খুব সম্মানিত বোধ করব।” এই কথা শুনে আমার কী মনে হবে? খুব ভালো। কিন্তু যদি পরের দিন ভদ্রলোকের

পৃষ্ঠা ৯১ থেকে ১০৫

পৃষ্ঠা:৯১

ফর্মশ্রেয়ণা:অপ্রসন্নচিত্তে ঘুম ভাঙ্গে এবং টেলিফোন করে বলে, “তুমি একটা দূর্বত্ত, একটা জোচ্চোর, একটা বদমাশ। তুমি শহরের সবথেকে বড় ধাপ্পাবাজ।” তাহলে আমি কিরকম বোধ করব? ভীষণ খারাপ।ব্যাপারটা এই রকম দাঁড়াচ্ছে যে যখন ভদ্রলোক বললেন আপনি অতি উত্তম ব্যক্তি তখন আমি খুব ভালো বোধ করলাম, আর যখন বললেন আমি একজন বদমাশ তখন আমার ভীষণ খারাপ লাগল। আমার মানসিক অবস্থা তাহলে নিয়ন্ত্রণ করছে কে? অবশ্যই ঐ ব্যক্তি। এইভাবে অপরের কথায় কি আমার জীবন নিয়ন্ত্রিত হবে? তা হওয়া উচিত নয়। একেই বলে বাইরের শক্তির দ্বারা পরিচালিত।আমি অন্তরের শক্তির দ্বারা পরিচালিত হতে চাই। ভদ্রলোক টেলিফোনে যখন বললেন যে আমি অতি উত্তম ব্যক্তি, তখন ঐ কথা শুনতে অবশ্যই ভালো লাগে। কিন্তু ঐ ব্যক্তি ঐ সমস্ত কথা যদি নাও বলেন তবুও আমার নিজস্ব বিচারেও আমি একজন ভালো মানুষ। পরের দিন ঐ ব্যক্তিই যখন টেলিফোনে প্রায় ছিন্নভিন্ন করেন, তখনও তার কথা মেনে নেওয়ার কোনও কারণ নেই; কারণ আমার নিজের বিচারে আমি একজন সজ্জন ব্যক্তি। লোকে যখন বলে, “আপনি আমাকে রাগিয়ে দিচ্ছেন” তখন রাগের উৎস হচেচ্ছ বাইরের কিন্তু যদি আমি বলি, আমি রেগে গেছি তখন কিন্তু রাগের উৎস আমার অন্তরের মধ্যেই।এই প্রসঙ্গেই এলিনর রুজভেল্ট (Eleanor Roosevelt) বলেছেন “হীনম্মন্যতাবোধের দায়িত্ব মানুষের নিজের।”এক প্রাচীন ভারতীয় ঋধির গল্প আছে। তাকে একজন পথচারী অনেক কুংসিত অভিধায় ভূষিত করছিল। ইষ অবিচলিত ভাবে তা শুনলেন। অবশেষে লোকটির সমস্ত খারাপ কথা শেষ হয়ে গেল। তখন কষি লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন, “দেবতার নিকট যে অর্ঘ্য দেওয়া হয় তা গৃহীত না হলে কার প্রাপ্য হয়?” লোকটি উত্তর দিল, “যে অর্ঘ্য দিয়েছে তারই প্রাপ্য।” ঋষি উত্তর দিরেন, আমি তোমার অর্থা গ্রহণ করছি না,” এবং এই বলে লোকটিকে হতভম্ব করে দিয়ে ঋষি চলে গেলেন। ঋষির শক্তি তার অন্তরের শক্তি।যে পর্যন্ত অমেরা বাইরের শক্তির দ্বারা পরিচালিত হব, সে পর্যন্ত আমাদের দুঃখের অবসান হবে না, এবং আমরা অসহায় বোধ করব। আমাদের অনুভূতি ও ব্যবহারের জন্য দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত আমাদের কোনও পরিবর্তন হবে না। প্রথমেইনিজেকে এই প্রশ্ন করা প্রয়োজন,

  • আমি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম কেন?
  • রেগে গিয়েছিলাম কেন?
  • নানসিক অবসাদ এসেছিল কেন?

প্রশ্নের জবাব থেকেই এই অবস্থাকে জয় করার সূত্র পেয়ে যাব। সুখ ইতিবাচক আত্মমর্যাদার ফলশ্রণতি। কিসে সুখী হবেন, এই প্রশ্নের অনেক রকমের জবাব পাওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজন বস্তুগত; কিন্তু তাতে প্রকৃত সুখ পাওয়া যায় না। সুখ মানুষের অন্তরের ব্যাপার, সুখ বস্তুর মালিকানার বিষয় নয়। জীবনযাত্রার প্রয়োজনের প্রত্যেকটি জিনিস থাকলেও সুখী নাও হতে পারে। এর উল্টেটাও সত্য অর্থাৎ অনেক জিনিসপত্র না থাকলেও সুখী হতে পারে।সুখ অন্তরের জিনিস, সুখ প্রজাপতির মতো ধরতে যান, উড়ে বেড়াবে; স্থির হয়ে তুমিও জিতবে-৭

পৃষ্ঠা:৯২

দাঁড়ান, প্রজাপতি উড়ে এসে আপনার উপর বসবে।মনে এমন একটি বিশ্বাস তৈরি করুন যাতে আপনি সুখী হন।আমাদের স্বাভাবিক আবেগ ব্যাহত হলে তিক্ততার সৃষ্টি হয়। ফলে অন্যের ভালো করার ইচ্ছা ও অসাড় হয়ে যায়। সেই জন্য নিজের সম্পর্কে একটি একটি মানদন্ড স্থির করা উচিত। নিজের কাছে সৎ থাকুন এবং নিজের নেতিবাচক প্রবণতা গুলিকে জয় করার চেষ্টা করুন। নিম্নলিখিত কাজগুলি করুন।

  • প্রত্যেক মানুষের ও প্রত্যেক ঘটনার ইতিবাচক দিকেই দৃষ্টি দিন।
  • সুখী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিন।

সুবিবেচনার সঙ্গে নিজের মানদন্ড নিজে নির্ধারণ করুন।নেতিবাচক সামালোচনায় আবিচলিত থাকুন।প্রত্যেক ছোটখাট বিষয়েও আনন্দ পাওয়ার শিক্ষা নিন।স্বরণ রাখবেন, সময় সমান যায় না। ভালো, খারাপ জীবনের সঙ্গ।

  • প্রত্যেক অবস্থাকে পুরোপুরি সদ্ব্যবহার ককরুন। নিজেকে গঠনমূলক কাজে ব্যস্ত রাখুন।
  • আপনার থেকে যারা কম সৌভাগ্যবান তাদের সাহায্য করুন।
  • প্রতিকূল অবস্থা কাটিয়ে ওটার শিক্ষা নিন। দুশ্চিন্তা করবেন না।
  • নিজেকে এবং অপরকেও ক্ষমা করুন। মানুষের ত্রুটি-বিচ্যুতি গুলিকে তারবিরুদ্ধে ব্যবহার করবেন না, কিংবা কারুর বিরদ্ধে বিদ্বেষ পোষণ করবেন না। অবচেতন মনে কিছু ইতিবাচক সঙ্কেত তৈরি করুন (Give yourself positive auto-suggesions)নিজের সঙ্গে ইতিবাচক কথাবার্তা বলার অভ্যাস আয়ত্ত করুন। এর ফলে আমাদের ধারণা ও বিশ্বাস পরিবর্তিত হবে। আমাদের ব্যবহার আমাদের বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ মাত্র।সেই জন্য অবচেতন মনের ইতিবাচক সঙ্কেত আমাদের ব্যবহারকেও প্রভাবিত করে। এইবিশ্বাসই শেষ পর্যন্ত সকল ভবিষ্যবাণী হয়ে যায়।উদাহরণঃ
  • আমি কাজটি করতে পারি।আমি যথাযথ পরিচালনা করতে পার।
  • আমি অঙ্কে ভালো।
  • আমার স্মৃতিশক্তি তীক্ষ্ণ।আমাদের শক্তিই আমাদের দুর্বলতা হতে পারে (Our greatest strengthcan become our greatest weakness) কোনও শক্তিকেই বেশি প্রয়োগ করলে তা দুর্বলতাতে পর্যবসিত হয়।যেমন, ব্যবসাতে বিক্রয়ের ব্যাপারে ভালো করে কথা বলার ক্ষমতাএকটি গুণ।অনেকে সময় দেখা যায় যে সেলসম্যানরা ভালো কথাবলার শুনে বিক্রি বাড়িয়ে ফেলে।তারপর কথা বলতে বলতে জিনিসপত্র বিক্রির বাইরেও অনেক কথা বলে ফেলে। সুবিন্যস্ত বাচনভঙ্গি তাদের যে শক্তি দিয়েছিল, বেশি ব্যবহারের ফলে তার ফল হল বিপরীত-বিক্রি কমে গেল।

পৃষ্ঠা:৯৩

মনোযোগ দিয়ে বক্তব্য শোনা একটি ক্ষমতা। কিন্তু যখন কোনও ব্যক্তি কেবল শুনেই যান, কোনও প্রতিক্রিয়া জানান না তখন এটি একটি দুর্বলতা।আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা আমাদের শুক্তি হয়ে যেতে পারে (Our greatest weakness can become our greatest strength) ক্রোধ একটি দুর্বলতা। একে কিভাবে শক্তিতে রূপান্তরিত করা যেতে পারে?মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালানোর বিরুদ্ধে এক মহিলা, অনেক মায়েদের একত্র করে বিক্ষোভ দেখিয়ে ছিলেন এবং “মাতাল গাড়িচালকদের বিরুদ্ধে মায়েদের সংগঠন” (Mothers against Drunk Driving) নামে একটি সংস্থা গঠন করেছিলেন। তার কারণ তার সন্তান মাতাল গাড়িচালকের গাড়িতে চাপা পড়েছিল। তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে সমাজের এই অভিশাপকে দূর করার জন্যে আমেরিকার জনমত সংগঠিত করতে উদ্যোগ নিলেন। আজ তার সংগঠন আমেরিকার একটি উল্লেখযোগ্য আন্দোলন যার লক্ষ্য হল আইনের পরিবর্তন করে মদ্যপায়ীদের গাড়ি চালানো বন্ধ করা। এইভাবে ক্রোধ নামে একটি নেতিবাচক ভাবাবেগ একটি ইতিবাচক শক্তিতে রূপান্তরিত হোল।ধৈর্য ধরুন (Have patience)অনেকে বলেন একবার কোনও ইতিবাচক বা নেতিবাচক বস্তুর সংস্পর্শে এলে তার কোনও প্রভাব পড়ে না। একথা সত্য নয়। পার্থক্যটা হয়ত দৃশ্যমান নয়; কিন্তু কিছু ঘটেই।চীনে একধরনের বাঁশ আছে যাদের লাগানোর পর প্রথম চার বৎসর জল, সার দিতে হয়। কিন্তু বাঁশ গাঙটি বাড়ে না। কিন্তু পঞ্চম বছরে পাঁশ গাছটি হঠাৎ ছয় সপ্তাহে ৯০ ফুট লম্বা হয়ে যায়। তাহলে কি বলা যাবে যে, বাঁশগাছ ট ২’ চতে পাঁচ বছরই লেগেছে। বাইরে অবশ্য কোনও দৃশ্যমান পরিবর্তন ছিল না। কং৭। কড় চালিয়ে শক্তি সংগ্রহ করেছে তা দেখা যায়নি, আবার জর এবং সার না দিলেও গাছটি বাঁচত না। প্রকৃতি থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। ধৈর্য ধরুন, বিশ্বাস রাখুন এবং সঠিক কাজ করে যান। ফণাবলদৃশ্যমান না হলেও, কিছু ঘটবেই। আপনার ক্ষমতা ও দুর্বলতার তালিকা তৈরি করুন (Take inventory: make a list of all your strengths and weaknesses)সফল ব্যক্তিরা তাদের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারেন, কিন্তু তারা তাদের ক্ষমতার উপর নির্ভর করেন। যদি আমরা দুর্বলতা ও ক্ষমতা গুলি সঠিক ভাবে নির্ণয় করতে না পারি এবে কিসের ওপর নির্ভর করে আমরা ভবিষ্যৎ গড়ে তুলব? আপনি কী করতে চান বা তী হতে চান তার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করুন।ক্ষমতা

দুর্বলতা

পৃষ্ঠা:৯৪

আত্মসম্মানবোধের মূলকথা অব্রাহাম লিঙ্কণের নিম্নউদ্ধৃত লেখাটিতে যে ভাবে প্রকাশ পেয়েছে তার থেকে ভালো করে প্রকাশ করা যায় না।পৃথিবী, আজ আমায় ছেলে প্রথম স্কুলে যাচ্ছে (World, my son starts school today!)”হে পৃথিবী, আমার সন্তানের হাতধর, সে আজ তার স্কুলের পাঠ শুরু করল। কিছুদিন তার কাছে সবই নতুন ও বিশ্বয়কর মনে হবে, এবং আমার আশা তুমি তার সঙ্গে সদয় ব্যবহার করবে। দেখ, এ পর্যন্ত সে কাটিয়েছে এই বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যেই, মুরগীর ঘর গুলিতে ছিল তার আধিপত্য, বাড়ির পিছনের বাগানের সে ছিল মালিক। তার ক্ষতে ওষুধ লাগাতে আমি সব সময়েই কাছাকাছি ছিলাম, এবং যখন সে মনে আঘাত পেয়েছে, আমি তাকে সান্ত্বনা দিয়েছি।কিন্তু এখন অবস্থা অন্য রকম হবে। আজ সকালেই বাড়ির সামনের সিঁড়ি দিয়ে নেমে গিয়ে পিছন ফিরে আমাদের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়বে, তারপর শুরু হবে সেই মহৎ অভিযান, যা তাকে নিয়ে যাবে অনেক যুদ্ধ, বিচ্ছেদ এবং দুঃখের মধ্য দিয়ে।পৃথিবীতে বাঁচতে হলে বিশ্বাস, ভালোবাসা ও সাহসের প্রয়োজন। সুতরাং হে পৃথিবী, আমার বাসনা তুমি তার তরুণ হাতে ধরে, এগিয়ে নিয়ে চল, এবং জীবনে যা শেখার প্রয়োজন তা তাকে শিখিয়ে দাও-কিন্তু যদি পার সহৃদয়তার সঙ্গে শিখিয়ে দিও।আমি জানি, ওকে জানতে হবে যে সব মানুষই ন্যায়পরায়ণ নয়, সব নারী পুরুষই সৎ নয়, তাকে শিখিয়ে দিও যে সংসারে দুর্বৃত্ত যেমন আছে তেমনি বিরচিত গুণাবলীর মানুষও আছে; শত্রু যেমন আছে, তেমনি মিত্রও আছে। প্রথমদিকেই তাকে শিখিয়ে দিও যে উৎপীড়নকারীরা সহজেই পদানত হয়।বইয়ের পাতায় যে অত্যাশ্বর্য ভাগ্নর আছে তা ওকে চিনিয়ে দিও। ওকে কিছু নির্জনতা দিও, যখন ও আকাশে পাখির গুড়া, সূর্যের আলোয় মৌমাছিদের ঘোরাফেরা কিংবা সবুজ পাহাড়ে ফুলের সমারোহ দেখে ভাবতে পারবে। ওকে শিখিয়ো, অসৎ উপায় অবলম্বন করার থেকে অসফল হওয়া অনেক সম্মান জনক। ওকে শিক্ষা দিও, যদি অন্য সকলে বলে যে ওর ধারণাগুলি ভুল তবুও যেন ও নিজের বিশ্বাসে অটল থাকে। আমার ছেলেকে শক্তি দিও, অন্য সকলে যখন ঠেলাঠেলি করে কোনও প্রত্যাশায় গাড়িতে ওঠে, তখন ও যেন জনতাকে অনুসরণ না করে। শিক্ষা দিও যেন অন্যের কথা শোনে, কিন্তু যা শোনে তা যেন সত্যের ছাঁকুনিতে ছেকে নিয়ে যে সার টুকু থাকে তাই গ্রহণ করে।শিক্ষা দিও, যেন কখনও নিজের হৃদয় ও আত্মাকে বিক্রয় যোগ্য না করে। শিক্ষা দিও যেন উচ্ছৃঙ্খল জনতার চিৎকারে কান না দিয়ে নিজে যা সঠিক মনে করে তার জন্য লড়াই করতে পারে।সহৃদয়ভাবে শিক্ষা দিও, পৃথিবী, কিন্তু অধিক প্রশ্রয় দিওনা, কারণ আগুনের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে গেলেই উত্তম ইস্পাত তৈরি হয়।এটি খুবই দীর্ঘ প্রত্যাশা, কিন্তু দেখো কতটা করা যায়। আব্রাহাম লিঙ্কন ও এত ভালো ছেলে।

পৃষ্ঠা:৯৫

কাজের পরিকল্পনা :১. যারা নেতিবাচক অবস্থাকে ইতিবাচক অবস্থায় রূপান্তরিত করেছেন তাদের জীবন কাহিনী পাঠ করুন। ভালো বই পড়া কিংবা অনুপ্রেরণা দায়ী বাণী অডিও টেপে শোনা আপনার দৈনন্দিন কর্মসূচীর অন্তর্ভূক্ত করুন।২. আর্থিক বা বৈষয়িক কোনও রূপ প্রতিদানের প্রত্যাশা না রেখে, নিয়মিত ও বিধি অনুযায়ী আপনার সময় এবং / অথবা অর্থের একাটি অংশ কোনও দাতব্য কর্মে দান করার জন্য দায়বদ্ধ হোন।৩. নেতিবাচক প্রভাব থেকে দূরে থাকুন। সহকর্মী বন্ধুদের চাপের কাছে নতি স্বীকার করবেন না।৪. আন্তরিক প্রসংসাসূচক বাক্য ঔদার্যপূর্ণ ভাবে গ্রহণ করা ও বিতরন করা অভ্যাস করুন।৫. নিজের ব্যবহার ও কাজের জন্য দায়িত্ব গ্রহণে বিমুখ হবেন না।৬. স্বস্তি বোধ না করলেও, আত্মশৃঙ্খলা পালন করুন।৭. নীতি-শিল্প উন্নত চরিত্রবান ব্যক্তির সঙ্গে মেলামেশা করুন।৮. সৃজনশীল হওয়ার চেষ্টা করুন এবং দুর্বলতাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করুন।৯. ধৈর্য অভ্যাস করুন; ফলাফল দৃশ্যমান না হলেও অধ্যবসায়ী হবেন।

পৃষ্ঠা:৯৬

অধ্যায় ৪৫

ব্যক্তি বিষয়ে দক্ষতাএকটি আনন্দময় ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলার উপায় :” পৃথিবীতে অন্য কোনও যোগ্যতার চেয়ে মানুষ নিয়ে কাজ করার যোগ্যতার ন্যআমি বেশি মাইনে দিতে পারি।” একথা বলেছিলেন জন রকফেলার। ব্যবসাতে আর কোনও সমস্যা নেই; প্রধান সমস্যা হোল কর্মীদের সমস্যা। কর্মীদের সমস্যার সমাধান হলেই ব্যবসায়ের অন্য সমস্যার অনেকটাই সমাধান হয়ে যায়। কর্মীদের সম্পর্কে জ্ঞান সংস্থায় উৎপাদন সম্পর্কিত কোনও বিষয়ে জ্ঞানের থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।সফলব্যক্তিরা মধুর ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী এবং এই জন্যই তারা মানুষকে অনেক বেশি প্রভাবিত ও উদ্বুদ্ধ করার শক্তি লাভ করেন। মধুর ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষকে সহজে চেনা যায়, কিন্তু তাদের ব্যক্তিত্বকে ব্যাখ্যা করা কঠিন। তাদের হাঁটাচলা, কথাবার্তা, গলারস্বর, ব্যবহারের উষ্ণতা এবং নিশ্চিত আত্মবিশ্বাস তাদের ব্যক্তিত্বকে অনন্যতা দিয়েছে। বয়স যাইহোক না কেন, কোনও বাক্তি তাদের মুখমণ্ডলের ও হৃদয়ের আকর্ষণীয়তা হারান না। একজন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ব্যবহার এবং প্রকাশভঙ্গি মিলিতভাবে একটি মধুর ব্যক্তিত্বের সৃষ্টি করে। চোখ-মুখের প্রসন্নতা ভালো পোশাক পরিচ্ছদের থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আকর্ষণীয় আদব কায়দার দ্বারা দুর্বল চরিত্রকে আড়াল করে রাখা যায় কিন্তু সে কেবল অল্পদিনের জন্য-শীঘ্রই সত্য প্রকাশ হয়ে পড়ে। চরিত্র বিহীন দক্ষতা ও ব্যক্তিত্বের উপর যে সম্পর্ক তৈরি হয়, তা জীবনকে দুঃখময় করে তোলে। যে ব্যক্তির সহকর্মীকে উদ্বুদ্ধু করার ক্ষমতা আছে তার যদি চরিত্র না থাকে তবে তা হয় নির্গুণ সুদর্শন মানুষের মতো। এ বিষয়ে শেষ কথা হল, জীবনে সাফল্যের জন্য প্রয়োজন চরিত্র এবং সহকর্মীদের উদ্বুদ্ধ ও প্রভাবিত করার শক্তি-এই দুইয়ের সংমিশ্রন। জর্জ-ওয়াশিংটনের একটি উপদেশ এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক। “সবার প্রতি অদ্র তাচরণ কর, কিন্তু মাত্র কয়েক জনের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হবে, এবং তার আগে তারা তোমার বিশ্বাসভাজন হওয়ার যোগ্য কিনা তা বিশেষভাবে পরীক্ষা করে নেবে। সত্যিকারের বন্ধুত্ব একটি ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা চারা গাছের মত। বেড়ে উঠতে গিয়ে চারা গাছটিকে সমস্ত প্রতিকূলতার ধাক্কা সামলাতে হবে, তবেই সেটি হবে একটি বৃক্ষ।” -George Washington, January 15, 1783জীবন একটি প্রতিধ্বনির মত (Life is an echo)একটি বালক তার মায়ের উপর রাগ করে চেঁচিয়ে বলল, “আমি তোমাকে ঘৃণা করি। আমি তোমাকে ঘৃণা করি।” মায়ের বকুনির ভয়ে সে বাড়ি থেকে দৌড়ে পালিয়ে গেল। একটু দূরে একটি পাহাড় উপত্যকায় গিয়ে সে আবার চেঁচিয়ে বলর, “আমি তোমাকে ঘৃণা করি, আমি তোমাকে ঘৃণা করি।” পাহাড় থেকে প্রতিধ্বনি ফিরে এল “আমি তোমাকে ঘৃণা করি, আমি তোমাকে ঘৃণা করি।” ছেলেটি জীবনে এই প্রথম প্রতিধ্বনি শুনল। ভয় পেয়ে সে দৌড়ে মায়ের কাছে ফিরে গিয়ে মাকে বলল, ‘মা, পাহাড়ে একটা খারাপ ছেলে

পৃষ্ঠা:৯৭

ব্যক্তি বিষয়ে দক্ষতা:চেঁচিয়ে বলছে, ” তোমাকে ঘৃণ্য করি। মা ব্যাপারটা বুঝতে পেরে ছেলেকে উপত্যকায় ফিরে গিয়ে চিৎকার করে বলতে বললেন, “আমি তোমাকে ভালোবাসি, আমি তোমাকে ভালোবাসি,” ছোট ছেলেটি ফিরে গিয়ে উচ্চস্বরে বলল, আমি তোমাকে ভালোবাসি, আমি তোমাকে ভালোবাসি।” প্রতিধ্বনি ফিরে এল। বাচ্চা ছেলেটির শিক্ষা হোল, আমাদের জীবন প্রতিক্ষানির মতঃ যা দিই তাই ফিরে পাই।বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন বলেছেন, “আমরা যখন অপরের নিকট ভালো হই, তখন আমরা নিজেদের কাছে সর্বোত্তম।”জীবন যেন একটি ব্যুমেরাং (life is a boomerang)আমাদের চিন্তা, কাজকর্ম, ব্যবহার যাই হোক না কেন সেগুলি আজ হোক, কাল হোক আমাদের কাছে নির্ভুল লক্ষ্যে ফিরে আসবে। জীবনে উন্নতির পথে পথে যাদের সঙ্গে হবে তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করুন, কারণ যখন নীচে নামবেন তখন আবার তাদের সঙ্গেই দেখা হবে। নীচের গল্পটি The best …of bits and pieces থেকে নেওয়া।অনেক বছর আগে দুটি ছেলে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কষ্ট করে পড়াশুনা করত। তাদের টাকা পয়সা যখন খুব বিপজ্জনক ভাবে কমে এল তখন তাদের মাখায় এক ফন্দি এল। তারা ঠিক করল ইগন্যাসি প্যাডারেউস্কিকে (Ignacy Paderewski) দিয়ে একটি পিয়ানো বাজানোর আসর বসিয়ে কিছু টাকা-পয়সা তুলে তাদের থাকার খরচ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাপ্য টাকা মিটিয়ে দেবে।বিখ্যাত পিয়ানোবাদকের ম্যানেজার দু’হাজার জলারের গ্যারান্টি চাইলেন। দু’হাজার ডলার সেই সময় অনেক টাকা; কিন্তু তবুও ছেলেদুটি রাজি হয়ে গেল। এবং পিয়ানো বাজানোর আসরের উদ্যোগ আয়োজন করতে শুরু করল। অনেক চেষ্টা করেও কিন্তু তারা ১৬০০ ডলারের বেশি তুলতে পারল না।আসর শেষ হলে ছেলে দু’টি সেই মহান শিল্পীকে খারাপ খবরটি শোনাল। শিল্পীকে তারা ১৬০০ ডলার এবং ৪০০ ডলারের একটি প্রতিজ্ঞাপত্র লিখে দিয়ে বলল যে তারা যখ তাড়াতাড়ি সম্ভব বাকি ৪০০ ডলার যোগাড় করে দেবে। তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশুনা শেষ হয়ে গেল বরেই মনে হল।প্যাডারেউস্কি তাতে রাজি হলেন না। তিনি সেই প্রতিজ্ঞাপত্র ছিড়ে ফেলে দিয়ে টাকাটাও তাদের হাতে দিলেন এবং বললেন, “এই টাকা থেকে তোমাদের খরচখরচা মেটাও। যা বাকি থাকবে তার থেকে তোমরা দু’জনে ১০ শতাংশ হারে তোমাদের জন্য রাখ। বাকি টাকাটা আমার।তারপর অনেক বছর কেটে গেল। প্রথম মহাযুদ্ধও শেষ হোল। প্যাডারেউস্কি তখন পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তার দেশের হাজার হাজার ক্ষুধার্ত মানুষের আনুসংস্থানে ব্যস্ত। হার্বাট হুভার তখন আমেরিকার খাদ্য ও সাহায্য বিভাগের প্রধান। তিনি প্যাডারেউত্তির আহ্বানে সাড়া দিয়ে কয়েক হাজার টন খাদ্য পোল্যান্ডে পাঠিয়ে দিলেন।খাদ্যাভাব প্রশমিত হলে প্যাডারেউভি নিজেই প্যারিসে এলেন হুভারকে ধন্যবাদ জানানোর জন্য। হুভার বললেন, “ঠিক আছে, মিঃ প্যাডারেউচ্চি, আপনার হয়ত মনে নেই, আমি যখন ছাত্র ছিলাম এবং বিপদে পড়েছিলাম, আপনি আমাকে সাহায্য করেছিলেন।”

পৃষ্ঠা:৯৮

র‍্যালফ ওয়ালডো এমারসন (Ralph waldo emerson) বলেছেন, “জীবনের সুন্দরতম প্রাপ্তি হচ্ছে, আন্তরিকভাবে অপরকে সাহায্য করা। ফলে প্রকৃতপক্ষে নিজেদেরই সাহায্য করি।”যা কিছু সুন্দর ও ভালো তা নিজস্ব নিয়মে ফিরে আসে। প্রতিদান পাওয়ার বাসনায় ভালো করার প্রয়োজন হয় না-প্রতিদান আপনিই পাওয়া যায়। আমরা নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে দেখি, প্রকৃত অবস্থা দেখিনা (We see things not the way they are but the way we are)গল্প আছে, এক জ্ঞানী ব্যক্তি যখন গ্রামের বাইরে বসেছিলেন তখন একজন পথিক তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আমি আমার গ্রাম ছেড়ে চলে আসতে চাই, এখন আপনি বলুন, এই গ্রামে কী ধরনের লোক বাস করেন?” জ্ঞানী ব্যক্তিটি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, “আপনার গ্রামে কী ধরনের মানুষ বাস করেন?” পথিক জবাব দিলেন, “তারা সকলেই নীচ, নিষ্ঠুর এবং দুর্ব্যবহারী, জ্ঞানী ব্যক্তিটি তখন বললেন, “এই গ্রামে একই ধরনের লোক বাস করেন।” কিছুক্ষণ পরে আর একজন পথিক এসে জ্ঞানী ব্যক্তিকে একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করল। উত্তরে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, “আপনি যে গ্রাম থেকে চলে আসতে চান সেখানে কী ধরনের লোক বাস করেন।” পথিক জবাব দিলেন,” সেখানে মানুষ খুব দয়ালু, বিনয়ী, ভদ্র এবং সৎ।” জালী ব্যক্তিটি বললেন, “এই গ্রামেও আপনি ঐ ধরনের লোক দেখবেন।” এই গল্পটির নীতিশিক্ষা কী। অনেক সময়েই আমরা সংসারকে আমাদের মত করে। দেখি। অনেক সময় অন্যের ব্যবহার আমাদের ব্যবহারের প্রতিক্রিয়া মাত্রআস্থা (Trust)আমার বিশ্বাস, সমস্ত সম্পর্কই পারস্পরিক আস্থার উপর নির্ভরশীল, যেমন মালিক- কর্মচারী, মাতাপিতা ও সন্তান, স্বামী ও স্ত্রী, ছাত্র ও শিক্ষক, ক্রেতা ও বিক্রেতা, খরিদ্দার ও বিক্রয়কারী। সার্বিক সততা ব্যতীত আস্থা জন্মায় না। আস্থার সংকট মানেই সত্যের সংকট। অন্যের উপর আস্থা স্থাপন করলে নিজের বিশ্বাসযোগ্যতাও বাড়ে।কী কী উপাদান বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ায়।

  • বিশ্বস্ততা-এর ফরে কোনও ব্যক্তির ব্যবহার সম্পর্কে আগেই ধারণা করা যায়। কাজ দৃঢ় অঙ্গীকারবদ্ধ হলেই বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করা যায়। •সঙ্গতিপূর্ণ ব্যবহার ও কাজকর্মের দ্বারা বিশ্বাস অর্জন করা যায়।
  • শ্রদ্ধা-নিজেকে এবং অন্যকে শ্রদ্ধা করলে মর্যাদাবোধ তৈরি হয় এবং একটিসহানুভূতিশীল মনোভাবও তৈরি।
  • নিরপেক্ষতা-সততা ও ন্যায়বিচারের উপর নির্ভর করে সামঞ্জস্য-কাজ ও কথার মধ্যে একটি সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। আপনি কি সেই ব্যক্তিকে বিশ্বাস করতে পারেন যে মুখে এক রকম কথা বলে, কিন্তু কাজে অন্য রকম করে?
  • কর্মদক্ষতা-সামর্থ্য ও ইচ্ছা, এই দুইয়ে মিলে তৈরি হয় কর্মদক্ষতা।
  • সততা-বিশ্বাসযোগ্য হওয়ার মূল উপাদান।
  • গ্রহণ যোগ্যতা- যদিও আমাদের সব সময়ে কর্মক্ষমতাকে উন্নত করার চেষ্টা করাম  উচিত, তবুও পরস্পরকে ভালো মন্দ সহ গ্রহণ করা উচিত। • চরিত্র-সমস্ত যোগ্যতা সত্ত্বেও চরিত্রহীন ব্যক্তিকে কেউ গ্রহণ করতে পারে না।ভালোবাসার থেকে বিশ্বাসযোগ্যতা অনেক বেশি মহৎ গুণ। অনেকেই ভালোবাসতে

পৃষ্ঠা:৯৯

পারে, কিন্তু আমরা তাদের উপর আস্থা রাখতে পারিনা। মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ব্যাঙ্কের হিসাবের মতো টাকা জমা পড়লে তা বেড়ে যায় এবং আমরাও সেখান থেকে টাকা তুলতে পারি। কিন্তু যদি কিছু জমা না দিয়ে শুধু তুলে নিতে থাকি তাহলে শেষ পর্যন্ত হতাশ হতে হয়। অনেক সময় মনে হতে পারে যে, হয়ত বেশি তুলে নিয়েছি, কিন্তু প্রকৃত পক্ষে বেশি জমাই পড়েনি। পারস্পরিক খারাপ সম্পর্ক ও বিশ্বাসযোগ্যতার অভাবের কয়েকটি ফলাফল নীচে উল্লেখ করা হোল।

  • মানসিক চাপ
  • স্বাস্থাভঙ্গ
  • পারস্পরিক যোগাযোগের অভাব অবিশ্বাসবিরক্তি মানসিক সীমাবদ্ধতাসংস্কার ইচ্ছার অভাব আত্মবিশ্বাস ভেঙ্গে পড়া বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব অসহযোগিতা

আত্মসম্মানবোধের অভাব সংঘাতসন্দেহ

  • হতাশা
  • উৎপাদনশীলতা নষ্ট
  • অসুখী হওয়া
  • নিঃসঙ্গতাকী কারণে ইতিবাচক সম্পর্ক তৈরি করা ও রক্ষা করা যায় না? (What aresome factors that prevent building and maintaining positiverelationhips?)অনেক গুলি কারণ সহ বোধ্য, আর কয়েকটি এই অধ্যায়ের শেষে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
  • স্বার্থপরতাভদ্রতাবোধের অভাবঅবিবেচক ব্যবহারঅঙ্গীকার রক্ষা না করা কড় ব্যবহার
  • সততা ও ঋজু নৈতিকতার অভাব
  • আত্মকেন্দ্রিকতা-নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকলে মানুষ একটি ছোট মোড়কের মধ্যে নিজেকে মুড়ে ফেলে।
  • ঔদ্ধত্য-উদ্ধত ব্যক্তি তার নিজের শিক্ষা ও মতামতেই সীমাবদ্ধ। ফলে তার অজ্ঞতা চিরস্থায়ী।
  • আত্মগর্ব-প্রকৃতিতে শুন্যতা থাকে না বলে শূন্য মস্তিষ্ক আত্মগর্বে পূর্ণ হয়। জন অহংকার করে বলল, “আমার ছেলে দেখছি আমার বুদ্ধিটা পেয়েছে।” তার স্ত্রী জবাব দিল, “আমারও তাই বিশ্বাস, কারণ আমার বুদ্ধি দেখছি আমারই রয়ে গেছে।”
  • নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিবন্ধ মানসিকতাঅপরের বক্তব্য শোনায় অনিচ্ছা
  • সন্দেহ প্রবণতা

পৃষ্ঠা:১০০

মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধার অভাব (নীতিবোধ হীন)শৃঙ্খলার অভাবসহমর্মিতার অভাব (নিষ্ঠুরতা দুর্বলতার চিহ্ন)দৈর্যহীনতা

  • ক্রোধ-উগ্রমেজাজ মানুষকে বিপদে ফেলে, এবং অহংবোধের ফলে বিপদ থেকে উদ্ধার পায় না।
  • কূট কৌশলী ব্যবহার
  • পলায়নী মনোভাব ও ব্যবহার
  • অতি অভিমানী প্রকৃতি
  • অসংগতিসত্য স্বীকারে অনীহাঅতীতের খারাপ অভিজ্ঞতা
  • উদাসীন মনোভাব-উপেক্ষিত হলে মন প্রসন্ন হয় না। এর দ্বারা সংযুক্ত না হওয়ার মনোভাবই প্রকট হয়।
  • লোভ-সমূদ্রের নোনা জলের মত। যতই পান করা যায় ততই তৃষ্ণা বেড়ে যায়।

এটি সম্ভবত সম্পূর্ণ তালিকা নয়। আমাদের অনেকের মধ্যে উপরি-উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যের কয়েকটি পরিলক্ষিত হবে। অনেকের মধ্যে আবার একটি অন্যটির চেয়ে বেশি থাকতে পারে। বৈশিষ্ট্যগুলির মূল্যায়ন করে তাদের মধ্যে একটি সঙ্গতি আনাই তালিকার উদ্দেশ্য।অহংবোধ ও গর্ববোধের মধ্যে পার্থক্য (The difference between ego and pride)পরস্পরের মধ্যে একটি ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তোলার পথে সব চেয়ে বড় বাধা হোল অহংবোধ। অহংবোধ আত্মউত্তেজক। এই নেতিবাচক গর্ববোধের ফলশ্রুতি হোল ঔদ্ধত্য। সার্থক ভাবে কোনও কাজ সম্পাদন কররে যে আনন্দ পাওয়া যায় সেই আনন্দের সবিনয় প্রকাশই স্বাস্থ্যকর গর্ববোধ। অহংবোধ মানুষকে আত্মম্ভরি করে কিন্তু গর্ববোধ মানুষের হৃদয়কে দরাজ করে। আত্মম্ভরিতা অনেক সমস্যার সৃষ্টি করে, কিন্তু দরাজ হৃদয় মানুষকে দেয় নম্রতা।কাজে যত বড় সাফল্যই অর্জন করুন না কেন, আত্মস্তরি হওয়ার কোনও কারণই থাকতে পারে না। গর্ববোধ থাকতে পারে, আত্মঞ্জরিতা নয়। অহংবোধ-সবজান্তা মনোভাব (Ego-The “I know It all’ attitude) যে সমস্ত মানুষের অহংবোধ বেশি তাদের পৃথিবীটা নিজেদের মধ্যেই আবর্তিত হয়। একজন অহংবোধী মানুষ তাদের সীমাবদ্ধতা হেতু মাঝে মাঝে মজার অবস্থার সৃষ্টি করে। এক উপরওয়ালা একদিন তার এক কর্মচারীকে জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি সত্যিই কোনও পদোন্নতি চান কিনা। কর্মচারীটি উত্তর দিলেন, “সত্যিই আমি পদোন্নতি চাই আমি তার জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছি।” উপর-ওয়ালা জবাব দিলেন, “তুমি প্রমোশন পাবে না, কারণ তুমি আমাকে পাশ কাটিয়ে আর একজনের নিকট প্রমোশনের জন্য তদ্বির করছ।” এই প্রসঙ্গে ন্যুট রোকটি (Knutc Rockne) এর কথাটি স্বরণ যোগ্য, “অহংবোন অনুভূতি নাশক ওষুধের মতো, বোকামির যন্ত্রণাকেও অসাড় করে দেয়।”

পৃষ্ঠা:১০১

স্বার্থপরতা ও আত্মপ্রয়োজনের মধ্যে পার্থক্য কী? (What is the difference between selfidhness and self-interest)এই দু’টি শব্দের মধ্যে পার্থক্যটি অনুধাবন করা দরকার।স্বার্থপরতা নেতিবাচক ও ক্ষতিকারক। নেতিবাচক মূল্যবোধের উপর প্রতিষ্ঠিত বলে এর ফলে পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট হয়। সব সময়েই স্বার্থপর ব্যক্তিরা জয় কিংবা পরাজয়ের আশা করে থাকে। কিন্তু নিজের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যে প্রয়াস তা যেমন নিজের জয় প্রত্যাশা করে, তেমনি অপরের জয়েও ক্ষুণ্ণ হয় না। এটি একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি।ভেষ/ ঈর্ষা-কাঁকড়ার মনোবৃত্তি (Envy? Jealousy -Crab mentality) কাঁকড়ার মনোবৃত্তি কী? কেমন করে কাঁকড়া ধরা হয় জানেন? যার ঢাকনা নেই, এমন একটা বাক্সের একটা দিক খুলে কাঁকড়া আছে, এমন জায়গায় রেখে দেওয়া হয়। কাঁকড়া ঢুকে গেলে বাক্সের সেই দিকটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু বাক্সের কোনও ঢাকনা দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। কাঁকড়ারা বাক্সের গা বেয়ে উপরে উঠে পালিয়ে যেতে পারে, কিন্তু কেউ পালাতে পারে না। কারণ একটা কাঁকড়া যখন গা বেয়ে উপরে উঠতে যা তখন আর একটা তার পা ধরে টেনে নামায়। ফলে সবগুলোই বাক্সে থেকে যায় এবং শেখপর্যন্ত রান্নাঘরে তাদের রান্না করা হয়। ঈর্ষাপরায়ণ লোকেদেরও একই অবস্থা। তারা নিজেরাও জীবনে বেশিদূর যেতে পারে না এবং অন্যদেরও যেতে দেয় না। ঈর্ষাপরায়ণতা আত্মসম্মান হীনতার লক্ষণ। শুধু মানুষ নয়, দেশের ও জাতির মধ্যেও এই ঈর্ষাপরায়ণতা দেখা যায়। ঈর্ষাপরায়ণতার ফলে অবনমন শুরু হয়, এবং শেষ পর্যন্ত ফলাফল খারাপ হয়, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের পক্ষে। ঈর্ষা মানুষকে নষ্ট করে। খালিমন নয়, খোলা মন থাকা উচিত (One should have an open mind rather than an empty mind) খোলামন ও খালিমনের মধ্যে তফাৎ কী? খোলা মনের মানুষ নমনীয় চরিত্রের হয়, কোনও মতামত বা ধারণার প্রকৃত মূল্য বিচার করে তা গ্রহণ করা বা বর্জন করার মত ক্ষমতা ভাদের আছে। খারি মন যাদের তারা মূল্যায়ন না করেই গ্রহণ করেন, ফলে, তাদের মন ভালো খারাপ সমস্ত কিছুরই জমায়েতের জায়গা হয়ে ওঠে। ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব গঠনের পদ্ধতি (Steps to building a positive personality)প্রথম পদ্ধতিঃ দাযিত্ব গ্রহণ করুন(Step! Accept responsibility)এলবার্ট হুবার্ড (Elbert Hubburd) বলেছেন, “দায়িত্ব তাদের উপরেই ন্যস্ত হয়, যাদের দায়িত্ব বহনের ক্ষমতা আছে।” যখন কেউ অতিরিক্ত দাযিত্বভার গ্রহণ করেন, তখন প্রকৃতপক্ষে তাদের পদোন্নতি হয়।দায়বদ্ধতা স্বীকার করে নিলেই দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা প্রকাশ পায়। এবং এর দ্বারাই মানুষের মানসিক পূর্ণতার প্রকাশ ঘণ্ট। ভালো কাজের জন্য কৃতিত্ব দাবী করার লোকের অভাব হয় না; কিন্তু ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটরে তার দায়িত্ব নেওয়ার লোক পাওয়া যায় না। দায়িত্ব না নিলে দায়িত্বশীল ব্যক্তি হওয়া যায় না। সুতরাং দায়িত্ব গ্রহণের অনুশীলন করা উচিত। বাল্যকাল থেকেই দায়িত্বপূর্ণ ব্যবহারের শিক্ষা দেওয়া উচিত, কিন্তু অবাধা

পৃষ্ঠা:১০২

হলে এই শিক্ষা দেওয়া যায় না। দোষ নেওয়ার অভ্যাস বর্জন করুন নিম্নরূপ বাক্যাংশ ব্যবহার করবেন না, যেমন

  • প্রত্যেকেই আপনার মত কাজ করে থাকে
  • অথবা কেই তো আপনার মতো করে না, অথব্য
  • এ সমস্তই তোমার দোষেযারা দায়িত্ব নেয় না, তারা সব সময়েই বাবা-মা, শিক্ষক-শিক্ষিকা, বংশ ঈশ্বর, ভাগ্য, কপাল অথবা গ্রহ নক্ষত্রকে দোষারোপ করে। জনি বলল, “মা, জিমি জানালার কাঁচ ভেঙ্গেছে।” মা জিজ্ঞেস করলেন,” কেমন করে ভাঙ্গল।” জনি উত্তর দিল, “আমি ওর দিকে একটা পাথর ছুড়েছিলাম। ও সরে যেতেই জানালাম লাগল।”যে সমস্ত ব্যাক্তিরা দায়িত্ব না নিয়ে সমস্ত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন, তারা শেষ পর্যন্ত ঐ সমস্ত সুযোগ সুবিধা হারান। দায়িত্ব নেওয়ার অর্থ সুচিন্তিত কার্যক্রম গ্রহণ করা। ক্ষুদ্রতা আমাদের দায়িত্ব সম্পর্কে উদাসীন করেএই মন্তব্যটি নিয়ে চিন্তা করুন। ক্ষুদ্রমনের ব্যক্তিরা সব সময়েই নিজের দায়িত্ব অপরের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের কর্তব্য এড়িয়ে যেতে চানসামাজিক দায়িত্বপ্রাচীন ভারতের শিক্ষা হচ্ছে যে আমাদের প্রথম দায়িত্ব আমাদের সমাজের প্রতি, দ্বিতীয়ত আমাদের পারিবারের প্রতি, এবং তৃতীয়ত আমাদের নিজের প্রতি। কিন্তু যদি এই ক্রম বিপরীত হয়ে যায় তবে আমাদের সমাজের অবক্ষয় শুরু হয়। সামাজিক দায়িত্ব প্রত্যেক নাগরিকের নৈতিক কর্তব্য হওয়া উচিত। দাযিত্ব ও স্বাধীনতা পরস্পর হাত ধরে চলে। একজন সৎনাগরিকের লক্ষণ হচ্ছে যে তিনি নাগহরিক হিসাবে তার দায়িত্ব পালন করতে সব সময়েই ইচ্ছুক থাকবেন।উইনস্টন চার্চিলের (Winston Churchill) এর মন্তব্য, “দায়িত্ব গ্রহণ ও পালনের মধ্যদিয়েই মহত্বের মূল্য দিতে হয়।” দুষ্ট প্রকৃতির মানুষের দুষ্কর্মের জন। সমাজ ধ্বংস হয় না; সৎ মানুষের অকর্মণ্যতার জন্য সমাজের ক্ষতি হয় বেশি। কথাটিকে পরস্পর বিরোধী মনে হতে পারে। যদি অকর্মণ্য থেকে সমাজকে নষ্ট করে তারে তারা সৎ হলেন কিভাবে? তারা কি তাদের সমাজিক দায়িত্ব পালন করেছেন?এই প্রসঙ্গেই এডমান্ড বার্ক (Edmund Burke) বলেছেন “যদি সৎব্যক্তির’ কিছুই না করেন তা হলে সমাজে দুষ্কৃতীরাই প্রাধান্য লাভ করবে।”দ্বিতীয় পদ্ধতিঃ সুবিবেচনা(Step 2: Consideration)একটি দশ বছরের বালক আইসক্রীমের পরিচারিকাকে একটি আইসক্রীম কোনের দাম জিজ্ঞেস করল, পরিচারিকা জবাব দিলে, “৭৫ সেন্ট।” ছেলেটি তার কাছে যে পয়সা ছিল তা গুণতে আরম্ভ করল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “একটা ছোট আইসক্রীম কাপের কত দাম।” পরিচারিকা একটু অসহিষ্ণুভাবে জবাব দিল, “৬৫ সেন্ট”, ছেলেটি একটি ছোট আইসক্রীম কাপ নিল। আইসক্রীমটি শেষ করে দাম চুকিয়ে দিয়ে চলে গেল। পরিচারিকা যখন প্লেটটি তুলতে এল, তখন দেখন প্লেটের নীচে দশ সেন্ট রাখা আছে তার বকশিশ

পৃষ্ঠা:১০৩

হিসেবে। বাচ্চা ছেলেটি নিজে আইসক্রীম খাওয়ার আগে পরিচারিকার কথাও ভেবেছে। নিজের কথা ভাবার সঙ্গে সঙ্গে অপরের কথা চিন্তা করে সে দেখিয়েছে তার সহমর্মিতা ও সংবেদনশীলতা। এই ছেলেটির মত যদি সকলেই চিন্তা করেন তবে পৃথিবীটা বাস করার উত্তম জায়গাহয়ে উঠবে। অপরের প্রতি সুবিবেচনা সৌজন্য ও বিনম্রতা প্রদর্শন করুন। সুচিন্তিত ব্যবহারের মধ্যেই সহমর্মিতা প্রকাশ পাবে।তৃতীয় পদ্দতি। সকলের লাভ হোক এই চিন্তা করুন (Step 3: Think win / win)মৃত্যুর পর এক ব্যক্তি সেন্ট পিটারের নিকট গোল, তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন স্বর্গ ও নরকের মধ্যে কোথায় তিনি যেতে চান। সেই ব্যক্তি বেছে নেওয়ার আগে জায়গা দু’টি দেখে নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। সেন্ট পিটার তাকে প্রথমে নরকে নিয়ে গেলেন। সেখানে একটি বড় টেবিল ঘিরে সারি সাবি লোক, টেবিলের উপর অজস্র খাদ্যসম্ভার, গান বাজছে, কিন্তু লোকগুলির শুকনো মলিন মুখ, দুঃখীদুঃখী ভাব। তাদের মুখে কোনও হাসি নেই, এবং সকলেই ক্ষুধার্ত। তাদের হাত দু’টি ৪ ফুট লম্বা কাঁটা ও ছুরির সঙ্গে বাঁধা। তাবা টেবিলের মাঝখান থেকে খাবার নিয়ে মুখে দেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না।তারপর সেন্ট পিটার সেই ব্যক্তিকে স্বর্গে নিয়ে গেলেন। সেখানেও বড় হলঘরের মাঝখানে টেবিল এবং টেবিলের মাঝখানে অনেক খাবার। গান বাজছে, টেবিলের দুই দিকে অনেক লোক, এবং তাদেরও হাতে ছুরি-কাঁটা বাঁধা। কিন্তু সেখানে দেখা গেল লোকগুলির মুখে হাসি। তারা স্বাস্থ্যবান এবং ক্ষুধার্ত নয়। দেখা গেল, তারা ছুরি-কাঁটা দিয়ে খাবার তুলে টেবিলের অন্যদিকে যারা আছে তাদের মুখে দিচ্ছে। ফলে প্রত্যেকেই খেতে পারছে। ফলে তারা তৃপ্ত স্বাস্থ্যসমৃদ্ধ খুশি ও সন্তুষ্ট। কারণ তারা শুধু নিজেদের কথা ভাবছে না; তারা শুধু নিজেরাই খেতে চাইছেনা, অন্যেরাও থেতে পারুক, তাও চাইছে। এটি আমাদের জীবনের ক্ষেত্রেও সত্য। আমরা যখন খরিদ্দারদের, পরিবারের, নিয়োগকর্তার এবং কর্মচারীদের প্রয়োজন মেটাই, তখন আমরা লাভই করি।চতুর্থ পদ্ধতিঃ সতর্কতার সঙ্গে শব্দ চয়ন করুন(Step 4: choose your words carefully) যে ব্যক্তি মনে যা আসে তাই বলেন, শেষ পর্যন্ত তাকে তাই চনতে হয় যা তিনি পছন্দকরেনা। বাক্য ব্যবহারে সুতরাং কৌশলী হওয়া দরকার। কৌশলের অর্থ ব্যবহারের আগে শব্দ সতর্ক ভাবে চয়ন করা প্রয়োজন, এবং কতটা বলা প্রয়োজন তাও নির্ধারণ করা দরকার। যাঁ বলা দরকার তা আগেই অনুধাবন করা প্রয়োজন, কী না বলা ভালো তাও। যাদের সহজাত কর্মদক্ষতা আছে তাদের পক্ষেও কৌশলী হওয়া বাঞ্ছনীয়। কথাবার্তাতে মনোভাব প্রকাশ পায়। কথাতেই মানুষ আঘাত পায়, এবং পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট হয়। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে যত মানুষ আহত হয়েছে তার বেশি লোক অশোভন ভাষা ব্যবহারের ফলে আঘাত পেয়েছে। যা বলতে ছন্দ করেন সেই কথা বলার থেকে বিবেচনা করে ভাষা প্রয়োগ করুন। প্রজ্ঞা ও মূর্খতার মধ্যে তফাৎ এইখানেই। বেশি কথা বললেই ভাবের প্রকাশ ঘটে না। কম কথা বলেও বেশি প্রকাশ করুন। মুর্খ না ভেবে কথা বলে, বিজ্ঞ ব্যক্তি চিন্তা না করে কিছু বলেন না।

পৃষ্ঠা:১০৪

তিক্ত মনোভাব নিয়ে কথা বললে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। বাবা-মা সন্তানদের সঙ্গে যেভাবে কথা বলেন, তার দ্বারাই অনেক সময় তাদের ভবিষ্যৎ বির্ধারিত হয়ে যায়। কথা একবার বললে তা আর ফিরিয়ে নেওয়া যায় না (Spoken words can’t be retrieved) এক কৃষক তার প্রতিবেশী সম্পর্কে নিন্দামন্দ করেছিল। ভুল বুঝতে পেরে সে গেল এক ধর্মউপদেষ্টার কাছে ক্ষমা চাইবার জন্য। ধর্ম উপদেষ্টা তাকে একবস্তা পালক নিয়ে গিয়ে শহরের মাঝখানে ঢেলে দিয়ে আসতে বললেন। কৃষক কথামত কাজ করল। তারপর ধর্ম উপদেষ্টা কৃষককে শহরের মাঝখানে গিয়ে পালকগুলি পুনরায় বস্তায় ভরে আনতে বললেন। কৃষক চেষ্টা করল-কিন্তু দেখা গেল সব পালকই হাওয়ায় উড়ে চারিদিকে ছড়িয়ে গেছে। খালি বস্তা নিয়ে যখন কৃষক ফিরে এল, তখন ধর্ম উপদেষ্টা তাকে বললেন, “তোমার কথাগুলিও ঐ পালকের মতো। তুমি সহজেই বলে ফেলেছ, কিন্তু তারপরে, আর ফিরিয়ে নিতে পারবে না। সুতরাং সতর্কতার সঙ্গে বাক্য ব্যবহার করবে।”পঞ্চম পদ্ধতি: সমালোচনা এবং অভিযোগ করবেন না(Step 5: Don’t criticize and complain)এখানে নৈতিবাচক সমালোচনার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু সমালোচনা কেন করা হবে না? কাউকে সমালোচনা করলেই সে আত্মরক্ষায় উদ্যোগী হয়। তার অর্থ কী এই যে আমরা কখনও কারুর সমালোচনা করব না। অথবা ইতিবাচক সমালোচনা করতে পারব না? সমালোচক যেমন কালকের পিছনে বনে গাড়ি চালাচ্ছে-নান সমালোচনায় গাড়ির চালককে পাগল করে দিচ্ছে।ইতিবাচক সমালোচনা-গঠনমূলক সমালোচনা কী? কাউকে নিরস্ত করার জন্য নয়, তাকে সাহায্য করার জন্য সমালোচনা করুন। সমালোচনায় সমস্যা সামাধানের পথ বাতলে দিন। ব্যবহারের সমালোচনা করুন, ব্যক্তির নয়। ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমালোচনায় আত্মসম্মানে আঘাত লাগে। সাহায্য করার আগ্রহ থেকেই সমালোচনা করার অধিকার জন্মে। সমালোচনা করে সমালোচক যদি আনন্দ না পান, তবে সেই মানসিকতাই সঠিক। আর যখন সমালোচনা করার আনন্দেই সমালোচনা করা হয় তখন সব রকমের সমালোচনাই বন্ধ করে করদেওয়া উচিত।আনুপ্রাণিত করতে পারে এমন সমালোচনা কিভাবে করতে হয় সে বিষয়ে কয়েকটি সূত্র নির্দেশঃ

  • প্রশিক্ষকের মতো সাহায্য করার দৃষ্টি ভঙ্গি নিয়ে সমালোচনা করুন। ক্রীড়াপ্রশিক্ষকরা খেলার উন্নতি করার জন্যই খেলোয়াড়ের ভুল-ত্রুটি নির্দেশ করেন। • যার সমালোচনা করা হয় তার অবস্থা সম্যকরূপে অনুধাবন করলেও তার প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করলে তাকে অনুপ্রাণিত করা হয়।
  • সমালোচকের দৃষ্টিভঙ্গি হবে সংশোধন করার, শাস্তি দাতার নয়।

পৃষ্ঠা:১০৫

  • সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে সমালোচনা না করে, “সবসময়” বা “কখনও” ইত্যাদি কথা ব্যবহার করলে শুধু ক্ষোত সৃষ্টি হয়।
  • নির্ভুল তথ্য উপেক্ষা করে কোনও সিদ্ধান্তে আসা উচিত নয়। আমাদের সকলেরই নিজস্ব মতামত থাকার অধিকার আছে: কিন্তু ভুল তথ্যের উপর নির্ভর করার অধিকার নেই। তাই চটজলদি সমালোচনা করা উচিত নয়।
  • মাথা ঠাণ্ডা রাখুন, কিন্তু নিজের বক্তব্যে অনড় থাকুন।
  • বোঝাবার জন্য সমালোচনা করুন, ভয় দেখাবার জন্য নয়।
  • যথার্থ সমালোচনা হলে, পুনরুল্লেখের প্রয়োজন কম হয়।
  • জনসমক্ষে নয়, নিজেদের মধ্যে সমালোচনা করুন; কারণ তাতে পারস্পরিক সম্পর্ক খারাপ হবে না। জনসমক্ষে সমালোচনা অপমানজনক।
  • সমালোচিত ব্যক্তিকে তার বক্তব্য রাখার সুযো দিন।
  • ভুল সংশোধন কররে তারা কিভাবে উপকৃত হবে তা দেখিয়ে দিন।
  • কাজকর্মের সমালোচনা করুন, ব্যক্তির নয়।
  • ব্যক্তিগত ক্ষোভ প্রকাশ করবেন না।
  • ভুল কাজের ফলে যে ক্ষতি হয়েছে তা দেখিয়ে দিন, এবং সংশোধন না করলে কী কুফল হবে না উল্লেখ করুন।
  • উন্নত কর্মপন্থার জন্য কী সূত্রনির্দেশ করতে পারেন তা জানতে চান।
  • বিশেষ প্রেক্ষিতেই সমালোচনা সীমাবদ্ধ রাখুন। সমালোচনার মাত্রা ছাড়াবেন না। • সমালোচনা ওষুধের মতো-সঠিক সংমিশ্রণ ও ঠিক মাত্রায় হওয়া দরকার। মাত্রাবেশিহলে খারাপ প্রতিক্রিয়াহবে; আবার কম হলে কোনও কাজ হবে না। সেই রকম সময়ে সঠিক মাত্রায় সমালোচনা হলে আশ্চর্য ফল পাওয়া যায়।
  • সমালোচতি ব্যক্তিরা যদি ভুল বুঝে ইতিবাচক মনোভাব দেখান তবে তাদের অভিনন্দন জানান।
  • ভালো কাজের প্রশংসা করে একটি ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে বক্তব্য শেষ করুন।সমালোচনা গ্রহণ করার রীতিকখনও কখনও ন্যায় সঙ্গতভাবে, কখনও বা অন্যায় ভাবে আমরা সমালোচিত হই। পৃথিবীর মহত্তম ব্যক্তিরাও সমালোচিত হয়েছেন। ন্যায়সঙ্গত সমালোচনা অনেক সাহায্য করে, তাই এরূপ সমালোচনাকে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া হিসাবে গ্রহণ করা উচিত। অন্যায্য সমালোচনা প্রকৃত পক্ষে প্রশংসা হিসাবেই গণ্য করা যায়। গড়পড়তা মানুষ সফলতাম ব্যক্তিদের ঘৃণা করে তাই অন্যায্য সমালোচনার শিকার হতে হয়। যারা সফল হতে হতে পারেন না, সমালোচকদের তাদের সম্পর্কে কিছুই বলার থাকে না।যদি আপনি কিছু না করেন, কিংবা কিছু না বলেন কিংবা আপনার কিছু না থাকে তা হলে আপনার কেউ সমালোচনাও করবে না। আপনার জীবনও শেষ হবে কিছু না করেই।

 

পৃষ্ঠা ১০৬ থেকে ১২০

পৃষ্ঠা:১০৬

অন্যায্য সমালোচনার উৎস দুটিঃ ১. অজ্ঞতাঃ যখন অজ্ঞতা হেতু সমালোচনা করে তখন সেই অজ্ঞতা দূর করতে পারলে অন্যায্য সমালোচনাও বন্ধ করা যায়। ২. ঈর্ষা : ঈর্যাজাত সমালোচনাকে ছদ্মবেশে প্রশংসা বলেই গ্রহণ করা উচিত। সমালোচক আসলে আপনি যেখানে উঠেছেন সেখানে পৌছাতে চান; পারেন নি বলেই সমালোচনা। যে গাছে বেশি ফল ফলে সেই গাছকেই পাথরের আঘাত সহ্য করতে হয় বেশি।গঠন মূলক সমালোচনা গ্রহণ করার অক্ষমতা আত্মমর্যাদা বোধের অভাবই সূচীত করে। কিভাবে এই সমালোচনা গ্রহণ করা উচিত সে সম্পর্কে কিছু সূত্র নির্দেশ করা যেতে পারে:

  • যথার্থ মানসিকতা নিয়ে সমালোচনা গ্রহণ করুন। ঔদার্যের সঙ্গে গ্রহণ করুন, ক্ষোভের সঙ্গে নয়।
  • সমালোচনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুন।
  • খোলা মনে সমালোচনাকে গ্রহণ করুন, সমালোচনার মূল্যায়ন করুন এবং সারবত্তা থাকলে সেই অনুসারে সংশোধন করুন।
  • গঠনমূলক সমালোচককে ধন্যবাদ জানান কারণ তিনি ভালো উদ্দেশ্য নিয়েই সাহায্য করতে চেয়েছেন।
  • উচ্চ আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন ব্যক্তি ইতিবাচক সমালোচনা গ্রহণ করে নিজেকে উন্নতর করা চেষ্টা করেন, কখনও তিক্ত মনোভাব পোষণ করেন না। অধিকাংশ মানুষই অবশ্য মনে করেন যে লোকে তাদের প্রশংসা করুক, তাতে শেষপর্যন্ত তাদের ক্ষতি হলেও যায় আসে না। অভিযোগ কিছু লোক আছেন যাদের স্বভাবই হোল অভিযোগ করার। যদি গরম পড়ে তবে খুব গরম, যদি ঠান্ডা হয় তবে খুব ঠান্ডা। প্রত্যেক দিনই খারাপ দিন। যদি সমস্ত ঠিক ঠাক চলে তবুও তারা অভিযোগ করেন। কিন্তু অভিযোগ করা ভালো পদ্ধতি নয় কেন? কারণ শতকরা ৫০ ভাগ লোক আপনার সমস্যা সম্পর্কে মোটেই চিন্তিত নয়, আর বাকি ৫০ ভাগ খুশি কারণ আপনি সমস্যায় পড়েছেন। সুতরাং অভিযোগ করে লাভ কী? শেষে তো কোনও সুরাহা হয় না। শেষে অভিযোগ করাটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায় তার মানে অবশ্য এই নয় যে কখনও অভিযোগ জানাবেন না, বা কারুব অভিযোগ আছে কিনা তা জানতে চাইবেন না। সমালোচনার মতই, যদি অভিযোগও আছে কিনা তা জানতে চাইবেন না। সমালোচনার মতই, যদি অভিযোগও ইতিবাচক হয় তাহলে অভিযোগে সুফল পাওয়া যেতে পারে। গঠনমূলক অভিযোগ হোলঃ(ক) যখন অভিযোগকারী যথেষ্ট দায়িত্বশীলভাবে অভিযোগ করেন।(খ) অভিযুক্তকে সংশোধান করার জন্য দ্বিতীয় সুযোগ দেওয়া হয়।

পৃষ্ঠা:১০৭

যষ্ঠ পদ্দতিঃ প্রসন্ন এবং সদয় হোন (Step 6: Smile and be kind)হাসি (Smile)”একটু মৃদু হাসির কোনও দাম লাগে না, কিন্তু এই হাসি হেসে কেউ দরিদ্র হয়ে যায় না, লাভবান হয় এক পলকের এক টুকরো হাসির স্মৃতি হয়ত অমলিন থাকবে চিরকাল। পৃথিবীর কেউই এত ধনী নয় যে ক্ষণেকের হাসি ছাড়াই দারিদ্রের কিছুটা অবসান হবে। হাসি পরিবারে আনে সুখ। ব্যবসাই তৈরি করে সদিচ্ছার সুস্থ বাতাবরণ। হাসি বন্ধুত্বের নিশ্চিত স্বাক্ষর, শ্রান্তর বিশ্রাম, হতাশের আশা, ব্যথিদের ব্যথার প্রলেপ এবং বিপত্তির শ্রেষ্ঠ প্রতিষেধক। এই ধন কিন্তু ভিক্ষা করে, ধার করে, কিনে বা চুরী করে পাওয়া যায়না। কারণ এই অমুল্যধন কেউ সদিচ্ছায় না দিলে তার কোন মূল্যই নেই। সারাদিনের কাজের ক্লান্তিতে তোমার পরিচিতেরা হয়ত হাসতে ভুলে যাবে। তুমি ভুলো না। যাদের সহানুভুতি দেখাবার কেউ নেই তাদেরই হাসিমুখে সম্ভাষণ করা প্রয়োজন বেশি। প্রসন্নতা আসে মানুষের শুভবোধ থেকে। হাসি নকল হতে পারে আবার আন্তরিকও হতে পারে। আন্তরিক হাসির প্রসন্নতাই বিবেচ্য। বস্তুতপক্ষে একটি করার থেকে হাসি শরীরের পেশীর প্রক্রিয়া হিসেবে সহজতর। হাসিমুখ সবসময়েই আকাঙ্কিত। কেই বা গোমড়া মুখের সান্নিধা চায়? আরও বেশি গোমড়া মুখ-ওয়ালার উষ্ণ আন্তরিক হাসি যেমন হৃদয়কে প্রকাশ করে তেমনি কপট হাসিও মনকে চিনিয়ে দেয়।সপ্তম পদ্ধতি: অপরের ব্যবহারের ইতিবাচক ব্যাখ্যা করুন (Step 7: Put positive interpretation on other people’s behaviour)অনেক সময় উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়াই লোকে অন্যের কাজকর্মের নেতিবাচক ব্যাখ্যা করে থাকে। অনেকে আত্মসর্বস্ব চিন্তায় ভোগেন, এবং মনে মনে ভাবেন যে সারা পৃথিবী তাদেরকেই লক্ষ্য বস্তু করে রেখেছে। এটা সত্য নয়। ইতিবাচক মনোভাব থাকলে একটি আনন্দময় ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে এবং তার ফলস্বরূপ ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়।উদাহারণ স্বরূপ বলা যায়, আমরা কাউকে ফোন করে না পেরে, আশা করি যে উদ্দিষ্ট ব্যক্তি সুযোগ মত ফোনে যোগাযোগ করবে। দিন দুই ফোন না পাওয়া গেলে আমরা ধরে নিই যে, ভদ্রলোক ফোন করার কোনও আগ্রহ দেখান নি, কিংবা তিনি উপেক্ষা করেছেন। এগুলি নেতিবাচক চিন্তা। এমন হতে পারে যেঃ তুমিও জিতবে-৮ ১১০ From The Best of Bits & Pieces, Economics Press, Fairfield, NJ. 1994, p.170

পৃষ্ঠা:১০৮

  • চেষ্টা করেছিলেন, লাইন পান নি।
  • কোনও বার্তা রেখেছিলেন, কিন্তু তা পাওয়া যায়নি।
  • কোনও জরুরী কাজে জড়িয়ে পড়েছেন।
  • কোনও টেলিফোনের কথাই জানেন না। এরূপ অনেক কারণ থাকতে পারে। সুতরাং তাকে সন্দেহের সুবিধা দিয়ে একটি ইতিবাচক অবস্থান থেকেই অগ্রসর হওয়া উচিত। অষ্টম পদ্ধতি: ভালো শ্রোতা হোন (Step 8: Be a good listener) নিজেকে এই প্রশ্নগুলি করুন। আপনার নিজের কি মনে হবে যখন আপনি কাউকে কিছু বলতে চান, এবং
  • তিনিই বেশি কথা বললেন, আপনার কথা বিশেষ কিছুই শুনলেন না।আপনার প্রথম বক্তব্যের সঙ্গেই একমত হতে পারলেন না।প্রতিপদেআপনাকে বাধা দিলেন।
  • অধৈধর্যভাবে আপনার প্রতিবারে তিনিই পাদপূরণ করলেন।
  • মন দিয়ে শুনলেন না।
  • কানে শুনলেন, কিন্তু অন্তরের গ্রহণ করার মতো একাগ্রচিত্তে শোনেন নি। তাই একই বিষয় তিনবার করে পুনরাবৃত্তি করতে হয়েছে।
  • তথ্যের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সিদ্ধান্তে এসেছেন।
  • চপলমতি এবং অন্যদিকে মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন।
  • স্বাভাবিক ভাবেই শোনেননি ও মানোযোগ দেননি। এরূপ ব্যবহার বিষয়টিতে বা বক্তার সম্পর্কে আগ্রহহীনতা প্রকাশ করে, সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রকাবোধের অভাব প্রকাশ পায়।যে ব্যক্তিব্য বক্তব্য শোনা হল না, তার মনোভাব কি নীচের শব্দগুলি প্রকাশ করতে পারে?
  • উপেক্ষিত
  • মর্যাদাহানি
  • বাতিল হয়ে যাওয়া
  • বিরক্ত
  • অবসাদগ্রন্থ
  • মূর্খতা
  • কথার খেলাপ করা
  • অপদার্থতা
  • গুরুত্বহীনতা
  • লজ্জাজনক অবস্থা
  • ছোট হয়ে যাওয়াপ্রেরণাহীনতা
  • অবহেলিত
  • নৈরাশ্য অবস্থাটিকে উল্টো করে দেখা যাক। আপনি কি রকম মনে করবেন যখন আপনার বক্তব্য যাদের মনোযোগ সহকারে শোনার কথা, তারা
  • আপনাকে স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে বক্তব্য রাখতে দেয়।
  • তাদের অখন্ড মনোযোগ দিয়ে শোনে।
  • যথাযথ ও প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করে।
  • আপনার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে। নীচের কথাগুলি কি বক্তা হিসেবে আপনার মনোভাব বর্ণনা করবে?

পৃষ্ঠা:১০৯

  • গুরুত্বপূর্ণ
  • খুশি
  • প্রশংসিত
  • সন্তুষ্ট
  • উৎসাহিত
  • সময়োপযোগী
  • অনুপ্রাণিত
  • পছন্দসই ওার্যকর ভাবে বক্তব্য শোনার পথে কী কী বাধা? বাইরের বাধা অন্তরের বাধা বাহ্যিক কারণে মনঃসংযোগ ক্ষুণ্ণ মনে অন্যচিন্তা কিংবা অন্যমনস্কতা। মহওয়া।গোলমাল কুসংস্কার এবং মানুষ সম্পর্কে আগেই ধারণা করা। ক্লান্তি বক্তা কিংবা বিষয় বস্তুকে কোনও আগ্রহ নেই। এছাড়া কিছু বুদ্ধি বা বোধ শক্তিগত বাধা থাকতে পারে যেমন ভাষা, অনুধাবন ক্ষমতা ইত্যাদি। অপরকে বক্তব্যে অনুপ্রাণিত করতে হলে, একজন ভালো শ্রোতা হওয়া দরকার।শোনা মানেই পছন্দ হওয়া। যখন কোনও ব্যক্তির প্রতি বিশেষ পছন্দের মনোভাব দেখান তখন সেই ব্যক্তি নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। ফলে তিনি বেশি অনুপ্রেরণা লাভ করেন এবং নতুন নতুন ভাবধারা গ্রহণে সক্ষম হয়ে ওঠেন।”খোলা কান উন্মুক্ত হৃদয়ের একমাত্র বিশ্বাসযোগ্য লক্ষণ।”-ডেভিড অগসবার্গারভালো শ্রোতা হওয়ার জন্য,
  • বক্তাকে কথা বলতে উৎসাহিত এরুন
  • প্রশ্ন করুন। এতে উৎসুক্য বোধা যায়।
  • মাঝপথে বাধা দেবেন না।
  • বিষয়বস্তু বদলাবেন না।
  • সম্মান দেখান ও সমঝদারীর পরিচয় রাখুন।
  • মনোযোগ দিন, মনঃসংযোগ করুন।
  • বিক্ষিপ্ত চিত্ততা পরিত্যাগ করুন।
  • সহমর্মিতা দেখান।
  • খোলা মন নিয়ে চলুন। পূর্বতন ধারাণা বা সংস্কার যেন শোনা থেকে বিরত না করে।
  • বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থে মনঃসংযোগ করুন-উপস্থাপনের পদ্ধতিতে নয়।
  • বাচনিক যোগাযোগের বাইরে, যেমন মুখের অভিব্যক্তি, দৃষ্টির সঙ্গে সংযোগ ইত্যাদি লক্ষ্য করুন। এই গুলির দ্বারা বাচনিক বক্তব্যের অতীত অন্য একটি বক্তব্য হয়ত ইপস্থাপন করা হয়।
  • ৰক্তার অনুভূতিগুলিও অনুধাবন করার চেষ্টা করুন, কেবল কথাগুলি নয়।

পৃষ্ঠা:১১০

নবম পদ্ধতিঃ উদ্যমী হোন (Step 9: Be enthusiastic)উদ্যম ব্যতীত কোনও মহৎ কাজ সিদ্ধ হয় না। Ralph Waldo Emerson উদ্যম ও সাফল্য হাত ধরাধরি করে চলে। কিন্তু প্রথমে প্রয়োজন উদ্যমের। উদ্যম আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, মনোবল উন্নত করে, আনুগত্য তৈরি করে এবং বলা যায় এটি একটি অমূল্য সম্পদ। উদ্যম ছোঁয়াচে-একজন থেকে অপরজনে সঞ্চারিত হয়। একজন মানুদের কথাবার্তা, চলাফেরা এমনকি তার সঙ্গে করমদন থেকে তার উদ্যম অনুভব করা যায়। উদ্যম একটি অভ্যাসের মতো-এটি আহরণ করা ও অনুশীলন করা যায়। অনেক দশক আগে চার্লস সোয়াব (Charles Schwab) বছরে এক মিলয়ন ডলার বেতন পাচ্ছিলেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, ইস্পাত তৈরিতে বিরল দক্ষতার জন্যই কি তাকে এত মাইনে দেওয়া হয়? চার্লস সোয়াব জবাব দিলেন, “আমার মনে হয় আমার শ্রেষ্ঠ সম্পদ হোল মানুষকে উদ্যমী করে তোলার ক্ষমতা এবং মানুষের মধ্যে যে শ্রেষ্ঠ শক্তি আছে তাকে প্রশংসা ও উৎসাহের দ্বারা জাত করে তোলা।”জীবনে বাঁচার মত করে বাঁচতে হয়। মরার আগে মরে বেঁচে থাকা বাঞ্চনীয় নয়।উদ্যম এবং আকাঙ্খা মানুষকে উৎকর্ষে পৌঁছে দেয়। এক ডিগ্রি উত্তাপের তফাতেই জল বাষ্প হয় এবং সেই বাষ্প পৃথিবীর বৃহত্তম ইঞ্জিন চালাতে পারে। উদ্যমত্ত আমাদের জীবনেএই কাজ করতে পারে।দশম পদ্ধতিঃ সৎ ও আন্তরিকভাবে কাজের মূলা উপলব্ধি করে প্রশংসা করুন (Step 10 Give honest and sincere appreciation)মনোবিদ উইলিয়াম জেমস বলেন, “মানুষের মনের গভীরতম আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে তার কাজের যথার্থ রূপে মূল্যায়ন এবং সেই অনুসারে প্রশংসা পাওয়া। নিজেকে অবাঞ্চিত মনে হলে মনে গভীর আঘাত পায়।”বহুমূল্য জহরত প্রকৃত উপহার নয়, তারা আসলে ত্রুটি বিচ্যুতি আড়াল করার অজুহাত মাত্র। অনেকসময় প্রিয়জনদের সান্নিধ্যের অভাব ভোলাবার জন্য উপহার দিয়ে থাকি কিন্তু সান্নিধ্যের অভাব মেটে না।আন্তরিকভাবে কোন ব্যক্তির কাজের প্রশংসা করলে, সেইটিই তার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান পুরস্কার। এতে তার গুরুত্ব বেড়ে যায় এবং কাজেও প্রেরণা পায়।মাদার টেরেসা এই প্রসঙ্গে বলেছেন, “আজকের দিনে কুষ্ঠ বা যক্ষারোগই সর্বাপেক্ষা জঘন্য রোগ নয়; সমাজে অবাঞ্চিত এই ধারণাটাই সর্বাপেক্ষা জঘন্য অসুখ।” কাজের মূল্য অনুধাবন কার্যকর ভাবে করতে হলে কয়েকটি নীতি মেনে চলা উচিত:১. নির্দিষ্ট কারণে প্রশংসা করুন। যদি কাউকে বলা যায়, আপনি ভালো কাজ করেছেন, তা হলে সে প্রথমটা একটু বিভ্রান্ত হয়ে পড়বে, কারণ কী ধরনের ভালো কাজ সে সম্পর্কে ধারণা স্পষ্ট নয়। কিন্তু যখন বলা হবে যে আপনি খুব দক্ষতার সঙ্গে খুঁতখুঁতে খদ্দের সামলেছেন, তখন আর কোনও অস্পষ্টতা থাকছে না। কেন প্রশংসা করা হচ্ছে তা তার কাছে পরিষ্কার।২. প্রশংসা কাজের সঙ্গে সঙ্গেই করা উচিত। প্রশংসা যোগ্য কিছু করার ছয়মাস পরে প্রশংসা করলে তাতে প্রশংসার মূল্য অনেক কমে যায়।৩. প্রশংসা আন্তরিক হওয়া উচিত। এটি অন্তর থেকে আসা উচিত এবং প্রতিটি বাক্যই সচেতন ভাবে ব্যবহার করা হবে। কাজের প্রশংসা ও স্তাবকতার মধ্যে তফাৎ কী? তফাৎ

পৃষ্ঠা:১১১

হচ্ছে আন্তরিকতা। একটি অন্তর থেকে উৎসারিত, অপরটি মুখের বাক্যে সীমাবদ্ধ। একটি আন্তরিক, আর অন্যটির গুপ্ত উদ্দেশ্য আছে। স্তাবকতা করা যেমন উচিত নয়, তেমনি স্তাবকতার শিকার হওয়াও উচিত নয়।স্কুলে একটি পুরাতন নীতি কথা চালু আছে। বোকাদের খাদ্য হচ্ছে স্তাবকতা; কিন্তু মাঝে মাঝে যারা বুদ্ধিমান তারাও ঐ খাদ্যের অংশ বিশেষ খেয়ে থাকেন।-Jonathan Swift ৪. প্রশংসা বাক্যকে ‘কিন্তু’ ইত্যাদি কথার দ্বারা সীমিত করবেন না। বরং ‘এবং’, ‘এ ছাড়াও’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে দু’টি বাক্যকে যোগ করুন। যেমন ধরুন, “আমি আপনার প্রয়াসের প্রশংসা করি, এবং আপনি যদি ইত্যাদি বললে, যার প্রশংসা করা হোর তার মনে আঘাত লাগবে না। কিন্তু যদি বলা হয়, “আপনার কাজের প্রশংসা করি, কিন্তু “তবে প্রশংসার ফল নষ্ট হয়ে যায়।৫. প্রশংসা করার পর তার জন্য প্রশংসা প্রাপকের নিকট থেকে কোনও স্বীকৃতি পত্র নেওয়ার প্রয়োজন নেই। কেউ কেউ আবার প্রতিদানে প্রশংসা আশা করেন। কাজের গুণাগুণা উপলব্ধি করার জন্য এই সবের প্রয়োজন নেই।সৌজন্য পূর্ণ ” ধন্যবাদ” এই কথার সঙ্গে প্রশংসাসূচক বাক্য গ্রহণ করুন। আন্তরিকতাবিহীন প্রশংসার থেকে সৎ প্রত্যাখ্যানও ভালো। তারফলে নিজের অবস্থানসম্পর্কে সন্দেহ থাকে না। আন্তরিকতাবিহীন প্রশংসা বাক্যে শুধু ভুলধারণার সৃষ্টি হয়। একাদশ পদ্ধতি: ভুল করলে সঙ্গে সঙ্গে স্বেচ্ছায় ভুল স্বীকার করে নেওয়া উচিত (Step 11: When we make a mistake, we should accept itimmediately and willingly) যখন আমি ভুল করি তখন আমাকে সহজে সংশোধন করতে দিন; আর ঠিক করলে সঠিক কাজের সুফল ভোগ করতে দিন। এটিই সহজ জীবন দর্শন।কিছু লোক জীবন থেকে শিক্ষা নেন, কিছু লোক কোনও শিক্ষাই নিতে পারেন না। ভুর থেকেই শিক্ষা নেওয়া যায়। টুলের পুনরাবৃত্তিই হচ্ছে সব থেকে বড় ভুল। ভুলের জন্য কোনও অজুহাত দেখাবেন না বা অন্য কাউকে দোষ দেবেন না। এই ভুল নিয়ে বেশি চিন্তাও করবেন না। ভুল বুঝতে পারলে, স্বীকার করে নিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিন। কারণ ত্রুটি স্বীকার করলে অপর পক্ষের আর বলার থাকে না। দ্বাদশ পদ্ধতিঃ যখন কেউ ভুল স্বীকার করে তখন তা মেনে নিন, এবং তারমুখরক্ষার সুযোগ দিন। (Step 12: When the other person realizes and admits that he has made a mistake, congratulate him and give him a way out to save face) ভুল যে স্বীকার করেছে তাকে মুখ রক্ষার সুযোগ না দিলে তার আত্মসম্মান বোধ আঘাতপাবে। ত্রয়োদশ পদ্ধতি: আলোচনা করুন, তর্ক করবেন না (Step 13: Discuss but don’t argi e)কিছু কিছু ব্যক্তিত্বকে বলা যায় তর্কবাগীশ; তাদের ব্যবহারে ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এই তর্কপ্রবণতাই প্রকাশ পায়।একটু সতর্ক হলে তর্ক এড়িয়ে যাওয়া যায়, ফলে অনেক মানসিক যন্ত্রণা এড়ানো যায়।

পৃষ্ঠা:১১২

তর্কে জিততে হলে তর্ক এড়ানোই ভালো। তর্কে কখনও জেতা যায় না। জিতলেও আপনি হারবেন, আবার হারলেও হারবেন। তর্কে জিতলেন, কিন্তু হারালেন ভালো চাকরি, খরিদ্দার, বন্ধু, বিবাহের সম্পর্ক, তাহলে কি রকম জয় হোল? শূন্য বিজয়। স্ফীত অহংবোধ তর্ককে উদ্দীপ্ত করে।তর্ক করার অর্থ হোল হেরে যাওয়া যুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়া। জিতলেও জয়ের কোনও মূল্য পাওয়া যায় না। তর্ক যখন ভাবাবেগের যুদ্ধ হয়ে দাঁড়ায় তখন তর্কটা মিটলেও মনের মধ্যে একটা অপ্রীতিকর ঘটনার রেশ থেকেই যায়। তর্কে দু’পক্ষই শেষ কথাটি বলতে চায়; কিন্তু কেউ কাউকে জায়গা ছাড়তে রাজি নয়। শো. পর্যন্ত বাগযুদ্ধ হয়ে দাঁড়ায় অহংবোধের যুদ্ধ এবং চিৎকার চেঁচামেচিতে শেষ হয়। যত তর্কে জিতবেন বন্ধুর সংখ্যা তত কমবে। যদি বক্তব্য ঠিক হয় তবু কি তর্কের কোনও প্রয়োজন আছে? উত্তর হচ্ছে বড় আকারের ‘মা’। তার মানে কি যথার্থ বক্তব্যকে কেউ প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করবে না? নিশ্চয় করবে, তবে শান্তভাবে এবং কৌশলের সঙ্গে। কথাটা এমন ভাবে প্রকাশ করবেন যেন নিরপেক্ষ মত প্রকাশের মত শোনায়। যেমন, “আমি যে সমস্ত সূত্র পেয়েছি, সেই অনুসারে….. ।” কিন্তু দ্বিতীয় ব্যক্তি যদি তর্কবাজ হয় তবে সে তর্ক করেই চলবে। কারণ মন বন্ধ, এবং যে বক্তব্যের সত্য প্রতিষ্ঠা করতে চায় না-তার নিজের মত প্রতিষ্ঠা করতে চায়।উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, কোনও সামাজিক সম্মেলনে কয়েক পাত্র মদ্যপানের পর, কেউ হঠাৎ বলতে পারেন, “এই বৎসরের রপ্তানি বাণিজ্যের পরিমান ৫০ বিলিয়ন ডলার।” আপনি জানেন এই সংখ্যাটি ঠিক নয়-এটি ৪৫ বিলিয়ন ডলার। আপনি হয়ত সকালবেলার খবরের কাগজে পড়েছেন, অথবা রেডিয়োতে শুনেছেন, অথবা কোনও বুলেটিনে দেখেছেন। আপনি তার মন্তব্যের জবাবে বললেন,” আমার জানা মতে রপ্তানির পরিমাণ ৪৫ বিলিয়ন ডলার।” অন্য ব্যক্তিটি হয়ত প্রতিক্রিয়া জানাল, “আপনি কি বলছেন কিছুই জানেন না, আমি ঠিক জানি এটি ৫০ বিলিয়ন ডলার।” এই ক্ষেত্রে আপনার কয়েকটি বিকল্প আছেঃ১. আপনার বক্তব্য পুনরায় দৃঢ়ভাবে বলে একটি তর্ক শুরু করতে পারেন।২. গাড়ি থেকে বুলেটিন এনে ভদ্রলোককে দেখিয়ে ভুল প্রমাণ করে দিতে পারেন।৩. কথা না বাড়িয়ে চুপ থাকুন।৪. আলোচনা করুন, তর্ক করবেন না।তিন নম্বরই হবে সঠিক বিকল্প।যদি জীবনে কোনও মহৎ কাজ সম্পন্ন করতে চান তবে জীবনে পরিপক্কতা অর্জন করতে হবে। পরিপক্কতা হচ্ছে জীবনের ছোটখাট গুরুত্বহীন বিষয়ে এবং তুচ্ছ বিতর্কে জাড়িয়ে না পড়া। বিতর্ক ও আলোচনার মধ্যে তফাৎ কী?বিতর্ক উত্তাপের সৃষ্টি করে, আলোচনা বিষয়ের উপর আলো ফেলে।থাকে উন্মুক্ত।বিতর্ক তৈরি হয় অহংবোধ থেকে এবং বন্ধ মানসিকতা থেকে: আলোচনায় মন

পৃষ্ঠা:১১৩

  • বিতর্কে অজ্ঞতার আদান-প্রদান হয়, আলোচনায় জ্ঞানের আদান প্রদান হয়।
  • বিতর্কে মেজাজ প্রকাশ পায়, আলোচনায় যুক্তিনিষ্ঠা প্রকাশ পায়।
  • বিতর্কে কে সঠিত এই বিচার বড় হয়: আলোচনায় বিষয়টি সঠিক কিনা তাই নির্ণং করা হয়।সংস্কার-দুষ্ট মনের সঙ্গে যুক্তিপূর্ণ কথা বলে তর্ক করা নিষ্প্রযোজন। সংকীর্ণ মনোভাবসম্পন্ন ব্যক্তির সঙ্গে তর্ক অর্থহীন।আলোচনা করার সময় অপর পক্ষকে তার বিষয়টি বিনাবাধায় বলতে দিন-তার অবরুদ্ধ বাষ্প বেরিয়ে যাক। প্রতিটি বিষয়ে তাকে ভুলে প্রমাণের চেষ্টা করবেন না। প্রতিপক্ষকেসম্মান দেখান, সৌজন্যমূলক ব্যবহার করুন। এর ফলে তারা বিভ্রান্ত হবে। ‘ আলোচনার তিক্ততা কমিয়ে আনার জন্য এই পদক্ষেপ নেওয়া দরকার:১. বৈর্ষে সঙ্গে বক্তব্য শুনুন।২. লড়াই করার মনোভাব ত্যাগ করুন, প্রত্যাখাত করবেন না। ফরে প্রতিপক্ষ বিভ্রান্ত হবে। ৩. আশা করবেন না যে অপর পক্ষ ক্ষমা চাইবে। ভুল করলেও কিছু লোক ক্ষমা চাইতে অভ্যস্ত নন।৪. ছোট বিষয়ে বৃহৎ তর্কের অবতারণা করবেন না।আলোচনার সময় সঠিক বক্তব্য সঠিক সময়ে বলা প্রয়োজন, কিন্তু যা বলার প্রয়োজন নেই তা অনুক্ত রাখাই ভালো। বাচ্চাদেরও কথা বলার কলাকৌশল শেখানো উচিত, কিন্তু মুখের উপর জবাব দেওয়ার অভ্যাস শেখানো উচিত নয়। বয়স্কব্যক্তি হিসেবে কোনও অস্বস্তিকর অবস্থার সৃষ্টি না করে মতের বিরুদ্ধাচরণ করার কৌশল আমাদের আয়ত্ত করা উচিত। বিতর্ককে যে ভাবে পরিচালনা করেন তার দ্বারা একজন মানুষের বড় হয়ে ওঠার পরিপ্রেক্ষিতটি অনুধাবন করা যায়। সাইরাস চিং (Cyrus Ching) বলেছিলেন, “অনেকদিন আগেই আমি বুঝেছি যে শুয়োরের সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধ করতে নেই। শরীর নোংরা হয়ে যাবে এবং শুয়োরটি এইটিই পছন্দ করবে।” আলোচনা শুরু করার পদ্ধতিঃ ১. খোলা মন নিয়ে শুরু করুন। ২. তর্কে যোগ দিতে প্রলুব্ধ হবেন না। ৩. মাঝপথে বাধা দেবেন না। ৪. নিজের মতামত দেওয়ার আগে অপরের মতামত শুনুন। ৫. বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য প্রশ্ন জিজ্ঞেস করুন-অন্য পক্ষকেও চিন্তা করতে সাহায্য করবে।৬. অতিশয়োক্তি করবেন না।৭. অপরকে বোঝাবার জন্য উদ্যমী হোন, কিন্তু বল প্রয়োগ নয়।৮. হার স্বীকার করতে রাজি থাকুন।

পৃষ্ঠা:১১৪

৯. সামান্য বিষয়ে নমনীয় হোন, কিন্তু মতাদর্শের ক্ষেত্রে নয়।

১০. তর্ক আত্মমর্যাদা হানিকর মনে করবেন না।

১১. প্রতিপক্ষকে সৌহার্দ্যপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে তার বক্তব্য প্রত্যাহারের সুযোগ দিন। এতে তার গর্ব আঘাত পাবে না। প্রত্যাখ্যান তাকে আঘাত দেবে।

১২. মোলায়েম কথা কিন্তু কঠোর যুক্তি ব্যবহার করুন।অজ্ঞ ব্যক্তিকে তর্কে হারানো মুভিল। তার কঠিন ও তিক্ত বাক্য বিষয়ের দুর্বলতা প্রকাশ করে। আলোচনার সময় নিম্নলিখিত বাক্যাংশের ব্যবহার ভালো ধারণার সৃষ্টি করেঃআমার মনে হয়..আমার ভুলও হতে পারে………

বিতর্কের তীব্রতা কমিয়ে আনার জন্য অনেক সময় অজ্ঞতার ভান করা কিংবানিম্নলিখিত প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা দরকার:

  • আপনি এরকম মনে করছেন কেন?
  • বিষয়টা কি একটু ব্যাখ্যা করতে পারেন?
  • আর একটু নির্দিষ্ট ভাবে বলতে পারেন?যদি কিছুতেই কাজ না হয় তবে সৌজন্যপূর্ণভাবে, নম্রভাবে এবং ভদ্রতার সঙ্গে প্রতিপক্ষের সঙ্গে দ্বিমত হতে সম্মত হওয়াই উচিত।চতুর্দশ পদ্ধতিঃ খোশ গল্প করবেন না (Step 14: Donj gossip)স্বরণ রাখবেন, যারা আপনার নিকট খোশগল্প করে বা গুজব রটায়, তারা আপনার অনুপস্থিতিতে আপনার সম্পর্কেও খোশগল্প করবে।খোশগল্পে কুৎসা রটানো হয়, চরিত্র হনন করা হয়। যারা খোশগল্প শোনে, খোশ গল্প করে গুজব রটানোর মতই তারা দোষী। খোশগল্প ও মিথ্যা র পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। খোশগল্প তাড়াতাড়িতে শোনা হয়, কিন্তু পরে ধীরেসুস্থে পুনরাবৃত্তি করা হয়। আসলে যা শোনা হয় তা নয়, যা আড়ি পেতে শোনা হয় তাকেই বাড়িয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। কোনও কথাই স্পষ্ট করে বলা হয় না, আবার এমন ইঙ্গিত করা হয় যাতে কোনও কথা না বলা থাকে না। খোশগল্পে কোনও ন্যায় নীতি বোধ নেই। এই সমস্ত গল্প মানুষের অন্তঃকরণে গভীর আঘাত দেয়, জীবন বিনষ্ট করে, ক্রুরতা ও বিদ্বেষ প্রসূত এই গল্পগুলি সেহায় ব্যক্তিকে অনেক সময় লক্ষ্যবস্তু করে। অনেক সময় এর উৎস খুঁজে বের করা খুব মুস্কিল, কারণ কোনও এক ব্যক্তি এর শ্রষ্ঠা নয়। এ খ্যাতিনষ্ঠ করে, সরকারের পতন ঘটায়, বিবাহ ধ্বংস করে, কর্মজীবনকে নষ্ট করে, নিরীহ মানুষকে কাঁদায়, মানসিক যন্ত্রণার সৃষ্টি করে এবং নিদ্রাহীন রজনী যাপন করতে বাধ্য করে। যখন এই ধরনের খোশগল্পে আনন্দ পাবেন তখননিজেকে জিজ্ঞেস করুনঃ
  • এই গল্প কি সত্য?
  • এই গল্প কি মানুষের নম্রতা ও দয়ার্দ্র হৃদয়ের সৃষ্টি।
  • এই গল্প কি কোনও কারণে প্রয়োজনীয়?
  • আমি কি গুজব ছড়াতে সাহায্য করছি।

পৃষ্ঠা:১১৫

  • আমি কি অপরের সম্পর্কে ইতিবাচক বক্তব্য বলেছি?
  • আমি কি অন্যকে গুজব ছড়াতে উৎসাহিত করি এবং তা উপভোগ করি?“কাউকে বলবেন না”-এই বলে কি আমি বাক্যালাপ শুরু করি?
  • আমি কি গোপনীয়তা রক্ষা করতে পারি? খোশগল্প শোনা ও প্রচার করা থেকে বিরত থাকুন। যারা বেশি কথা বলে তারাই নিন্দামন্দ করতে সিদ্ধ হস্ত। পঞ্চদশ পদ্ধতি: প্রতিজ্ঞাকে অঙ্গীকারে পরিণত করুন (Step 15: Turn your promises into commitments) প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারের মন্ত্রে তফাৎ কী? প্রতিশ্রুতি হচ্ছে ইচ্ছা, বর্ণনা, আর অঙ্গীকার হোল যে কোনও মূল্যে প্রতিশ্রুতি রক্ষার চেষ্টা। যে কোনও মূল্যের অর্থ অবশ্য বেআইনী বা অনৈতিক কাজ নয়। চরিত্রবান ব্যক্তিই অঙ্গীকারবদ্ধ হয় এবং অঙ্গীকারই দৃঢ় বিশ্বাস সৃষ্টি করে। যদি কেউ কারুর প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ না থাকে তবে সংসারের অবস্থা কী হবে কল্পনা করতে পারেন? কী হবে এই সমস্ত সম্পর্কের
  • স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক?
  • নিয়োগকর্তা ও কর্মচারীর?
  • মাতাপিতা ও সন্তানদের?
  • ছাত্র ও শিক্ষকের?
  • ক্রেতা-বিক্রেতাদের। অঙ্গীকারহীন সম্পর্ক খুবই ফাঁপা ও অগভীর। সেই সম্পর্কে পারস্পরিক সুবিধার জন্য তৈরি এবং স্বল্প কালের অঙ্গীকার ব্যতিরেকে কোনও চিরস্থায়ী সম্পর্ক তৈরি হয় না। অর্গীকারবদ্ধতা ভবিষ্যতকে অনেক স্বচ্ছ ও নিশ্চিত করে। অনেকে মনে করেন অঙ্গীকারবদ্ধতা মানে প্রতিশ্রুতির জালে জড়িয়ে পড়ে জর স্বাধীনতা বিসর্জন দেওয়া। প্রকৃত পক্সে অঙ্গীকারবদ্ধতায় স্বাধীনতা খর্ব হয় না, বরং নিরাপত্তার আশ্বাস থাকে বলে বেশি স্বাধীনতা পাওয়া যায়। আমাদের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকারবদ্ধতা মূল্যবোধের প্রতি। সেই জন্য উপযুক্ত মূল্যবোধের সুসংবদ্ধ রীতি তৈরি করে নেওয়া দরকার। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, যদি একজন নেতার প্রতি বিশ্বস্ত থাকি এবং পরে যদি দেখা যায় সেই নেতা মাদক দ্রব্যের ব্যবসায়ে লিপ্ত, তা হলে তার প্রতি বিশ্বস্ততার অঙ্গীকার থাকতে পারে কি? কিছুতেই না। অঙ্গীকার থেকেই স্থায়ী সম্পর্কের সৃষ্টি, যা জীবনের সুখ-দুঃখের মধ্যেও টিকে থাকে। মানুষের ব্যক্তিত্ব ও সম্পর্কের গভীরতা নির্ভর করে অঙ্গীকার-বদ্ধতার উপর। ষোড়শ পদ্ধতিঃ কৃতজ্ঞাত প্রকাশ করুন, অন্যের নিকট কৃতজ্ঞতা আশা করবেন ম(Step 16 Be grateful but do not expect gratitude) না। কৃতজ্ঞতা একটি সুন্দর শব্দ। এটি একটি অনুভূতি যা আমাদের ব্যক্তিত্বের সমৃদ্ধি ঘটায় ও চরিত্র গঠন করে। আমাদের বিনয়ী করে-অপরের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপক মনোভাবের সৃষ্টি

পৃষ্ঠা:১১৬

তুমিও জিতবে

করে। আমাদের ব্যবহারেই এই মনোভাব প্রকাশ পায়। কৃতজ্ঞতা দান-প্রতিদানের বিষয় নয় কিংবা ভালো ‘কাজের বিনিময়ে কিছু ভালো কাজ করা নয়। দয়া, সহমর্মিতা, ধৈর্য ইত্যাদির ঋণশোধ করা যায় না। কৃতজ্ঞতা আমাদের কী শিক্ষা দেয়? পারস্পরিক বোঝাপড়াও সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। কৃতজ্ঞতা আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন। সামান্য “ধন্যবাদ” কথাটিও মাধূর্যপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু অনেকসময় আমাদের নিকটের লোকদের এই সামান্য কথাটি বলতেও ভুলে যাই-যেমন স্ত্রী বা স্বামীকে, আত্মীয়স্বজনদের, বন্ধুদের। চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব গঠন করে এমন গুণাবলীর মধ্যে কৃতজ্ঞতাবোধ প্রধান। অহংবোধ কৃতজ্ঞতাবোধকে নষ্ট কর। সহজ সৌজন্যের মনোভাব আমাদের জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলে দেয়। কৃতজ্ঞতাবোধ ও বিনয় থাকলে বিভিন্ন সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হয়। কৃতজ্ঞতাবোধ আমাদের জীবনযাত্রার অঙ্গ স্বরূপ হওয়া উচিত। জীবনে যে সমস্ত মানুষ ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছেন তাদের কথা চিন্তা করুন।আপনার মাতাপিতা, শিক্ষক কিংবা অন্য কেউ যারা আপনাকে সাহায্য করার জন্য অতিরিক্ত সময় ব্যয় করেছেন। তারা সম্ভবত তাদের কর্তব্য করেছেন-কিন্তু আসলে তারা তার থেকেও বেশি কিছু করেছেন। তারা তাদের সময়, অর্থ, প্রয়াস এবং আরও অনেক কিছু আপনার জন্য স্বেচ্ছায় ব্যয় করেছেন। তারা তা করেছেন আপনাকে ভালোবেসে, আপনার ধন্যবাদের জন্য বা কৃতজ্ঞতাবোধের জন্য নয়। কোনও এক সময় একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে যে তার ভবিষ্যৎ গঠনের জন্য কতখানি সাহায্যের প্রয়োজন হয়েছিল। সেই কারণে কৃতজ্ঞতা প্রকাশে কখনও বেশি দেরি হয় না। ভালোবাসার জন্য ত্যাগ স্বীকারের প্রয়োজন হয়।

খ্রীষ্টের গল্প:খ্রীষ্ট এক সময় দশজন কুষ্ঠরোগীকে রোগমুক্ত করলেন, এবং তিনি পিছন ফিরতেই দেখলেন একজন ছাড়া সকলেই চলে গেছে। সেই একজন খ্রীষ্টকে ধন্যবাদ জানাল। খ্রীষ্ট বললেন, “আমি তো কিছু করিনি।” এই গল্পটির নীতি শিক্ষা কী?১. মানুষ অকৃতজ্ঞ।২. কৃতজ্ঞ ব্যক্তি অসাধারণ য.ক্তি।৩. খ্রীষ্ট তাদের নবজীবন দান করলেন, এবং বললেন, “আমি কিছুই করিনি।”৪. খ্রীষ্টের মত আমাদেরও কৃতজ্ঞতা আশা করা উচিত নয়।মানুষ উপকার করলে কিভাবে তা ব্যক্তিত্ত্বে ও চরিত্রে প্রভাব ফেলে? একজনকে কয়েকদিনের জন্য আশ্রয় ও আহার দেওয়া হোল। তারপর তিনি বলবেন, “দেখুন এই লোকটির জন্য আমি কত করলাম।” আমরা মাত্রা ছাড়িয়ে আমাদের নিজেদের ঢাক নিজেরাই পেটাই। এই রকম প্রায়ই শোনা যায়, “আমি না থাকলে লোকটা রাস্তায় ঘুরে বেড়াত।” কী অহংবোধ!প্রসঙ্গতঅপরের নিকট কোনও কাজ করিয়ে নিতে হলে, সাধারণত বলা হয়, “প্রসঙ্গত, এই কাজটা আপনি আমার জন্য করতে পারেন? এই কথা বলে বস্তুত পক্ষে কাজের গুরুত্বটা লাঙ্গন করার চেষ্টা করেন। প্রকৃতপক্ষে কারুর জন্য কিছু করতে হলে তা প্রসঙ্গত নয়, তা

পৃষ্ঠা:১১৭

ব্যক্তি বিষয়ে দক্ষতানির্দিষ্ট সূচীর বাইরে গিয়েই করতে হয়।এভাবে যিনি উপকার করেন তাকে আনুকূল্য দেখানো হয় না। যদি অপরকে সাহায্য করার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু না করেন তবে তা দুঃখের বিষয়। এটা ঠিক যে অপরের জন্য কিছু করতে হলে তা প্রসঙ্গত নয় তা প্রচলিত অবস্থার বাইরে গিয়েই করতে হয়, এবং তা করা যথার্থ।সপ্তদশ পদ্ধতি: নির্ভরযোগ্য হোন এবং আনুগত্য অনুশীলন করুন (Step 17: Be dependable and practice loyalty) পুরাতন আপ্তবাক্যটি, “এক আউন্স আনুগত্য এক পাউন্ড চাতুর্যের থেকে বেশি মূল্যবান ,” সার্বজনীন ও চিরন্তন। কার্যক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু নির্ভরযোগ্যতা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যদি কোনও ব্যক্তি তার অনেক কর্মক্ষমতা স্বত্ত্বেও নির্ভরযোগ্য না হন তবে কি আপনি তাকে আপনার দলের অন্তর্ভুক্ত করতে চাইবেন? না, কখনও নয়। আমি জানতাম, তুমি আসবে (I Knew you would come) ছেলেবেলার দুই বন্ধু এক সঙ্গে স্কুল-কলেজের পড়া শেষ করার পর এক সঙ্গে সৈন্যদলে যোগ দিল। যুদ্ধ শুরু হোল, ওরা দু’জনে একই সঙ্গে লড়াই করছিল। একদিন তাদের ইউনিট অতর্কিত আক্রমণের মুখে পড়ল। অন্ধকারে চারিদিকে বুলেট বৃষ্টি। এমন সময় অন্ধকার ভেদ করে একটি স্বর শোনা গেল, “হ্যারি, আমাকে সাহায্য কর।” এটি হ্যারির ছেলেবেলার বন্ধু বিলের গলা। হ্যারি বিলকে সাহায্য করার জন্য ক্যাপ্টেনের অনুমতি চাইল, কিন্তু ক্যাপ্টেন অনুমতি দিল না। ক্যাপ্টেন বলল, “না আমি তোমাকে যেতে দিতে পারি না, কারণ আমার লোক কমে গেছে। তা ছাড়া বিলের গলা শুনে মনে হচ্ছে বাঁচবে না।” অঙ্গকারে আবার শোনা গেল, হ্যারি, আমাকে বাঁচাও।” শেষ পর্যন্ত থাকতে না পেরে হ্যারি ক্যাপ্টেনকে বলল, “ক্যাপ্টেন, ও আমার ছেলেবেলার বন্ধু, আমাকে ওকে সাহায্য করতেই হবে।” ” ক্যাপ্টেন অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনুমতি দিতে হ্যারি বুকে হেঁটে অন্ধকারে বিলের কাছে পৌঁছাল, এবং টেনে তাকে ট্রেঞ্চে নিয়ে এল। বিল কিন্তু মারা গেল। ক্যাপ্টেন রাগ করে বলল, বলেছিলাম না, বিল মারা যাবে, তুমিও মারা যেতে পারতে এবং আমার একজন লোক কমে যেত। কাজটা ঠিক হয়নি।” হ্যারি বলল, “ক্যাপ্টেন, আমি ঠিকই কা ‘ছি। আমি যখন ওর কাছে পৌঁছালাম, বিল বেঁচে ছিল, এবং ওর শেষ কথা ছিল, হ্যারি, আমি জানতাম তুমি আসবে।” পারস্পরিক সুসম্পর্ক সহজে পাওয়া যায় না, একবার যদি তা তৈরি হয় তবে তা লালন করা উচিত। প্রায়ই বলা হয়, তোমার স্বপ্ন সফল করার জন্য সচেষ্ট হও। কিন্তু অপরের ক্ষতি করে তুমি তোমার স্বপ্ন সফল করতে পারবে না। যারা বিবেকবোধ শূন্য তারাই তা করতে পারে। আমাদের পরিবার, বন্ধু এবং যারা অমাদের ভালোবাসে ও আমাদের উপর নির্ভর করে তাদের জন্য আমাদের ত্যাগ স্বীকার করতে হয়।

পৃষ্ঠা:১১৮

অষ্টাদশ পদ্ধতি: বিষেষ পোষণ করবেন না, ক্ষমা করুন এবং ভুলে যান।(Step 18: Avoid bearing grudges, Forgive and forget) জঞ্জাল সংগ্রহকারী হবেন না। অনেকে বলেন, আমি ক্ষমা করছি, কিন্তু আমি কুলব না। ফলে মনে অনেক জঞ্জাল জমে ওঠে। যখন কেউ ক্ষমা করতে চায় না, সে তখন মনের দরজা বন্ধ করে দেয় যে দরজা একদিন হয়ত খুলতে হতে পারে। যখন আমরা বিদ্বেষ পোষণ করি, ক্ষোভ পথে রাখি তখন আমরা কাকে আঘাত করি? আমাদের নিজেদেরকেই। জিম এবং জেরী ছেলেবেলার বন্ধু; কিন্তু কোনও কারণে তাদের সম্পর্কে খারাপ হয়ে যায় এবং তারা ২৫ বছর ধরে কেউ কারুর সঙ্গে কথা বলেনি। জেরী যখন মৃত্যুশয্যায় তখন ভাবল যে এরূপ গভীর দুঃখ নিয়ে স্বর্গে যাব না। জিমকে ডেকে সে মাপ চে েনিয়ে বলল, “এস আমরা পরস্পরকে ক্ষমা করি, এবং অতীতকে ভুলে যাই।” জিম তাবল মন্দ প্রস্তাব নয়, এবং সে জেরীকে হাসপাতাল দেখতে যেতে মনস্থ করল।তারা ২৫ বৎসরের অদর্শনের পর নিজেদের মনোমালিন্য মিটিয়ে নিল এবং ঘণ্টা দুই এক সঙ্গে কাটাল। জিম যখন চলে আসছিল তখন জেরী পিছন থেকে বলল, ‘জিম, যদি আমি মারা না যাই তাহলে এই ক্ষমার কোনও মুল্য থাকবে না” জীবণ বিদ্ধেষ পোষণ করার মতো দীর্ঘ নয়। বিদ্ধেষ পোষন অর্থহীন।উনবিংশ পদ্ধতিঃ সততা, সার্বিক ন্যায় পরায়নতা ও আন্তরিকতা অনুশীলন করুন (Step 19 Practice honesty, intigrity and sincerity)অনেক সময় সত্যের। উজ্জ্বল্য আলো দেয় না, অশুভশক্তিকে অন্ধ করে দেয়। সততার অর্থ প্রকৃত ও আসলের সঙ্গে নকল ও ভেজালের সংঘাত। বিশ্বাসযোগ্য হিসাবে খ্যাতি তৈরি করুন। সার্বিক সততা পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে, সামাজিক জীবনে সম্পর্ক তৈরি করতে সাহায্য করে। অঙ্গীকারে বিচ্যুত হলেই তাকেই বলে অসৎ ব্যবহার।সততা খোলা মদ, নির্ভর যোগ্যতা ও মুক্ত চিত্তকে সমৃদ্ধ করে। নিজের প্রতি ও অপরের প্রতি শ্রদ্ধার মনোভাব সৃষ্টি করে। সততা বাহ্যিক প্রদর্শনের বস্তু নয় সততা নিজের চরিত্রের গুণ। মিথ্যা হয়ত দ্রুত প্রসারিত হয়, কিন্তু সত্য চিরস্থায়ী, সার্বিক সততা কোম্পানির প্রচার প্রত্রে দেখা যায় না, এটি দেখা যায় মানুষের চরিত্রে।সহজ রাস্তায় জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য নিজের সার্বিক সত তাকে ক্ষুন্ন করা উচিত কী। সত্যকে বিসর্জন দিয়ে জয়লাভ সুখের হয় না। জয়লাভ করার থেকে সৎ মানুষ হওয়াঅনেক গুরুত্বপূর্ণ।এই পাউন্ড মাখন (A pound of butter)এক কৃষক এক কটি ওয়ালাকে এক পাউন্ড মাখন বিক্রি করেছিল। একদিন রুটিওয়ালা মাখন ওজন করে দেখল যে সেটি এক পাউন্ডের কম।রেগে গিয়ে সে চাষীর নামে কোটে নালিশ করল। জজ কৃষককে জিজ্ঞেস করল সে কোনও দাঁড়িপাল্লা ব্যবহার করেছে কিনা। কৃষক জবাদ দিল, “হুজুর, আমি পুরোনো দিনের লোক, আমার দাড়িপাল্লা নেই, কিন্তু আমার একটা ওজন যন্ত্র আছে।” জজ জিজ্ঞেস করল, “তা হলে তুমি মাখন “পলে কী করে?” কৃষক জবাব দিল, “হুজুর, আমার কাছ থেকে মাখন নেওয়ার অনেক আগে থেকেই আমি রুটিওয়াল্লার কাছ থেকে এক পাউন্ড রুটি

পৃষ্ঠা:১১৯

নিই। রুটিওয়ালা রুটি আনলে আমি দাঁড়িপাল্লার একদিকে রুটি চাপিয়ে অন্যদিকে মাখন চাপাই এবং রুটির পরিমান মত মাখন দিই। যদি কম ওজনের জন্য কেউ দায়ী হয় তবে রুটিওয়ালাই দায়ী।” এই গল্পটির নীতি বাক্য কী? অপরকে যা দিই আমরা জীবনে তাই ফিরে পাই। যখনই কোনও বাবস্থা নেওয়া হয় তখনই এই প্রশ্ন করা উচিত, আমি যা প্রত্যাশা করি তার যথার্থ মূল্য দিচ্ছি কি না। সততা ও অসততা কালক্রমে অভ্যাসে পরিণত হয়। কোনও কোনও ব্যক্তি অসততা অভ্যাস করে এবং মুখ বিকৃতি না করে মিথ্যা কথা বলে। আবার অনেকে এত মিথ্যা কথা বলে যে সত্য-মিথ্যার ভেদ রেখা মুছে যায়। কিন্তু তারা কাকে ছলনা করে? নিজেদেরকেই-অন্যদের নয়।সততা খুব শান্তভাবে তুলে ধরা দরকার। কোনও কোনও ব্যক্তি গর্বের সঙ্গে বেশ নির্মম ভাবে সৎ। মনে হয় তারা সততা অপেক্ষা নির্মমতার জন্যই বেশি আনন্দ পেয়ে থাকে। সততা প্রকাশের জন্য শব্দ চয়ন ও কুশলী হওয়া প্রয়োজন। যা শুনতে চান সত্য সব সময় তা নাও হতে পারে?নিষ্ঠুর না হয়েও সত্যবাদী হওয়া যায়, কিন্তু সব সময় তা হয়ত সম্ভব হয় না। একজন সৎ, বন্ধুর সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হোল সত্যবাদী হওয়া। কিছু ব্যক্তি বেদনাদায়ক সত্য এড়িয়ে যাওয়ার জন্য এমন বন্ধু নির্বাচন করেন যারা তারা যা শুনতে চান তাই বলবেন। তারা শুধু নিজেদের ছলনা করেন, কারণ তারা মনে মনে জানেন যে তারা সত্য কথা বলছেন না। সৎ সমালোচনা কষ্টদায়ক হতে পারে। যদি অনেক পরিচিত এবং খুব স্বল্প সংখ্যক বন্ধু থাকে তাহলে স্থির চিত্তে সম্পর্ক পুনর্বিচার করা প্রয়োজন।অনেক সময় সততার অভাবকে কৌশল, জনসংযোগ বা রাজনীতি বলে চালানোর চেষ্টা হয়। কিন্তু তাতে কি কিছু সিদ্ধ হয়? মিথ্যা বলার সমস্যা হচ্ছে, যে বক্তা কখনও ভুলে যায় না যে সে মিথ্যা বলেছে।সততার জন্য প্রয়োজন দৃঢ়তা এবং অঙ্গীকারবদ্ধতা।কতবার আমরাই দোষী হয়েছিছোট্টখাট মিথ্যা বলার জন্য?স্তাবকতার জন্য?

  • ঘটনা গোপন করে অর্ধসত্য পরিবেশন করার জন?
  • চুপচাপ থেকে সব চেয়ে বড় মিথ্যা বলার জন্য?মিথ্যার ব্যাপক প্রভাব সম্পর্কেই থমাস কার্লইল (Thomas Carlyle) বলেছিলেন, “নিজেকে সৎমানুষ হিসেবে তৈরি করুন, আপনি নিশ্চিত হতে পারবেন যে সংসারে অন্তত একটা দুর্বৃত্ত কম আছে।”বিশ্বাসযোগ্যতাআমরা সেই মেষ পালকের গল্প জানি যে ‘নেকড়ে’ বলে চিৎকার করে গ্রামের লোককে ডেকেছিল। সে আসলে গ্রামবাসীদের নিয়ে মজা করতে চেয়েছিণ। তার ডাক শুনে গ্রামবাসীরা তার সাহায্যের জন্য এসে দেখল, নেকড়ে নেই, এবং ছেলেটি তাদের দেখে উপহাস করল। গ্রামবাসীরা ফিরে গেল। পরদিনও ছেলেটি একই মজা করল।

পৃষ্ঠা:১২০

তারপর একদিন যখন সত্যিই নেকড়ে বাঘ দেখল তখন সাহায্যের জন্য চিৎকার করল। গ্রামের মানুষ গুনল কিন্তু কেউ সাহায্যে জন্য এগিয়ে এল না। তারা এটি ছেলেটির একটি কৌশল বলে মনে করল, এবং ছেলেটিকে আর কেউ বিশ্বাস করল না। ছেলেটি জেগে বসে রইল, ঘুমোতে পারল না। এই গল্পটির নীতি শিক্ষা কী?নীতিশিক্ষা এইঃমিথ্যা বললে বিশ্বাস যোগ্যতা নষ্ট হয়।

  • একবার বিশ্বাস যোগ্যতা নষ্ট হলে, সত্য বললেও কেউ বিশ্বাস করে না।সততা সচ্চরিত্রের গুণসত্যকে দু’ভাবে বিকৃত করা যেতে পারে

১. অসম্পূর্ণ ঘটনা অথবা তথ্যের মাধমে।

২. অতিরঞ্জিত করার মাধ্যমে।

অর্ধসত্য অথবা ভুলভাবে বর্ণিত সত্য থেকে সাবধান(Beware of half truths or misrepresentation of truths) একজন নাবিক যে তিনবছর ধরে একই জাহাজে কাজ করত, একদিন রাত্রে হঠাৎমদ খেয়ে মাতাল হল। কর্মজীবনে তার প্রথম এরূপ ঘটনা ঘটল। ক্যাপ্টেন এটি লক্ষ্য করে খাতায় নথিভুক্ত করলেন যে, “নাবিক আজ রাত্রে মাতাল হয়ে পড়েছিল।” নাবিক এই মন্তব্য জানতে পারল, পাছে এই মন্তব্য তার কর্মজীবনের উন্নতিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়- এই ভেবে সে ক্যাপ্টেনের কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইল। এবং তাকে অনুরোধ করল তিনি যেন ঐ মন্তব্যের সঙ্গে নাবিক যে তিনবছরের কর্মজীবনের মধ্যে মাত্র একবার মদ্যপান করেছে তা যুক্ত করেন। ক্যাপ্টেন নাবিকের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলেন এবং বললেন” আমি খাতায় যা লিখেছি তাই সত্য”। এর পরের দিন ঐ নাবিকের পালা ছিল খাতায় দৈনন্দিন দিনের ঘটনা নথিভুক্ত করার। সে লিখল, “ক্যাপ্টেন আজ রাত্রে মিতপায়ী ছিলেন।” ক্যাপ্টেন এটি পড়ে নাবিককে মন্তব্যটি পরিবর্তন” করতে বা এটির সঙ্গে আরো কিছু মন্তব্য যোগ করতে বললেন। কারণ এই মন্তব্যটি এই অর্থপ্রকাশ করে যে ক্যাপ্টেন রোজই মাতাল হয়, ব্যতিক্রম আজ রাত্রি। কিন্তু নাবিকও ক্যাপ্টেনের এই অনুরোধ প্রত্যাখান করল।উক্ত দু’টি মন্তব্যই সঠিক কিন্তু তা ঘটনাকে ভুল পথে নির্দেশিত করেছে।অতিরঞ্জন অতিরঞ্জন দু’ভাবে কাজ করে-১) এটি কোন ব্যক্তির অবস্থানকে দুর্বল করে তোলে এবং তার বিশ্বাসযোগ্যতাকে হ্রাসকরে।২) এটি নেশার মত যা ক্রমে অভ্যাসে পরিণত হয়। কিছু ব্যক্তি অতিরঞ্জিত ব্যতীত সত্য বলতে পারে না।আন্তরিক হোনআন্তরিকতা ইচ্ছার ব্যাপার, এবং প্রমাণ করা মুশিকল। অপরকে সাহায্য করার আন্তরিক ইচ্ছ। থাকলে আমরা আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছতে পারি। ভান করা থেকে দুরে থাকুন

পৃষ্ঠা ১২১ থেকে ১৩৫

পৃষ্ঠা:১২১

বন্ধু বিপদে পড়লে তাকে যদি বলেন, “আমি তোমার জন্য কি কিছু করতে পারি,” তবে তা বিরক্তিকর শোনাবে। এটা এক ধরনের ভান করা বা কথার প্যাচ। যদি আপনি আন্তরিকত ভাবে সাহায্য করতে চান তবে অবস্থা অনুসারে ব্যবস্থা নিন। অনেকে আন্তরিকতার একটা হয় আবরণে তাদের স্বার্থপরতা আড়াল করে রাখে। আশা রাখে এই ছয় আবরণে তাদের পরবর্তী কালে সাহায্য পাওয়ার অধিকার জন্মাবে। অর্থহীন বাক্যবিন্যাস করবেন না। আন্তরিকতা দিয়ে সৎবিচার বুদ্ধিকে মাপা চলে না।আন্তরিক হলেও অনেক সময় অবস্থা বিচারে ভুল হয়ে যেতে পারে। কথার থেকে কাজ অনেক বেশি প্রকাশ করে (Actions speak louder than words)সে বেশি ভালোবাসে? (Which loved best)“আমি তোমাকে ভালোবাসি, মা,” ছোট্টজন বলল। তারপর কাজ ভুলে বাগানের দোলনায় দোল খেতে লাগল।এদিকে মা আনল জলতুলে আর কাঠ কেটে। “আমি তোমাকে ভালোবাসি, মা বলল গোলাপী রংয়ের মেয়ে, নেল “আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না, তোমাকে কত ভালোবাসি” তারপর সে অর্ধেক দিন কেবল অজস্র বক্ বক্ করে মাকে বিরক্ত করল; শেষ পর্যন্ত মা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলযখন সে খেলতে চলে গেল।ছোট্ট ফ্যান বলল, “মা, আমি তোমাকে ভালোবাসি, আজ তোমাকে আমি যা পারি তাই করে সাহায্য করব,আজ আমার স্কুল নেই।”সে দোলনা ঠেলে ছোট্ট বাচ্চাকে ঘুম পাড়িয়ে দিল, তারপর হালকা পায়ে কাঁটা নিয়ে পরিষ্কার করল মেঝে গুছিয়ে রাখল ঘর। এইভাবে সে ব্যস্ত রইল সারাদিন, মনের আনন্দে করল ঘরের কাজ। “আমি তোমাকে ভালোবাসি, মা,” আবার তিন জনেই বলল,শুতে যাওয়ার আগে।মা তো জানেন, তিনজনের কোনজন তাকে সত্যিই ভালোবাসে।সার্বিক ন্যায়পরায়ণতা পালন করুন-Joy Allison প্রাচীন প্রজ্ঞা বলে, “কোনও বস্তু ক্রীত বা বিক্রিত হলেই তা মূল্যবান হয় না তাতে সেই গোপন, অমূল্য উপাদানটি থাকার দরকার, যা দিয়ে ব্যবসা করা যায় না। সেই উপাদানটি কী? সেই গোপন, অমূল্য উপাদানটি হোল, বিশ্বস্ততা, যিনি তৈরি করেন তার সম্মান ও সার্বিক সততা। এটি গোপনীয় নয় কিন্তু এটি অমূল্য।

পৃষ্ঠা:১২২

বিংশতিতম পদ্ধতি: বিনম্রতা অনুশীলন করুন (Step 20 Practice humility)বিনম্রতা ছাড়া আত্মবিশ্বাস আত্মম্ভরিতার নামান্তর। বিনম্রতা বা বিনয় সমস্ত গুণের আধার। এটি মহত্ত্বের লক্ষণ। আন্তরিক বিনয় আকর্ষণ করে, কপট বিনয় বিকর্ষণ করে।অনেক বছর আগে একজন অশ্বারোহী দেখল কয়েকজন সৈন্য একটি ভারী কাঠের গুঁড়ি সরাবার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। কর্পোরাল পাশেই দাঁড়িয়ে সৈন্যদের কাজ কর্ম লক্ষ্য করছেন। অশ্বারোহী কর্পোরালকে জিজ্ঞেস করলেন তিনি সৈন্যদের সাহায্য করছেন না কেন। কর্পোরাল জবাব দিলেন, “আমি কপোরাল, আমি হুকুম করি।” অশ্বারোহী তখন ঘোড়া থেকে নেমে সৈন্যদের কাছে গিয়ে কাঠের গুঁড়িটি তুলতে সৈন্যদের সাহায্য করলেন। তার সাহায্যে সৈন্যরা গুড়িটি সরাতে সক্ষম হোল। অশ্বারোহী তখন ঘোড়ায় উঠে কর্পোরালের নিকট গিয়ে বললেন, “পরে যখন আবার তোমার সৈন্যদের সাহায্যের প্রয়োজন হবে, তখন প্রধান সেনা পতিকে খবর পাঠিয়ে।” অশ্বারোহী চলে যাওয়ার পর কর্পোরাল ও তার সৈন্যগন বুঝতে পারলেন যে লোকটি ছিলেন স্বয়ং র্জ ওয়াশিংটন।গল্পটির বার্তা খুব পরিষ্কার। সাফল্য ও বিনয় হাত ধরে চলে। অপরে যখন আপনার প্রশংসা করে তখন অনেক লোক তা শোনে। সারল্য ও বিনয় মহত্ত্বের লক্ষণ। বিনয়ের অর্থ আত্ম-অবমাননাকর ব্যবহার নয়। এতে নিজেকে ছোট করা হয়। একবিংশতিতম পদ্ধতি: অপরকে বোঝবার চেষ্টা করুন এবং তার সম্পর্কে মনোযোগ দিন। (Step 21 Be understanding and caring) পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্র আমরা অনেকসময় ভুল করি, আবার কখনও কখনও যারা আমাদের ঘনিষ্ঠ তাদের প্রয়োজন সম্পর্কে অমনোযোগী হয়ে উঠি। এতে হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। হতাশাকে দূর করতে হলে অপরকে বোঝবার চেষ্টা করা উচিত। মানুষের মধ্যে যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার কারণ হোল মানুষ পরস্পরকে বুঝতেচায়। পারস্পরিক সহানুভূতিই সমস্ত সম্পর্কের ভিত্তি।অপরের প্রতি বিশেষ আগ্রহশীল হলে এবং তার প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে যে পরিতৃপ্তি পাওয়া যায় সেটা কেবল একজন ভালোমানুষ হলে পাওয়া যায় না। অপরের প্রতি আগহী ও যত্নশীর ব্যক্তি এমন একটা সুনাম সুষ্টি করেন যে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। এবং এতে তার কিছু খরচ হয় না।কিছু কিছু ব্যক্তি মনে করেন অর্থ মানুষের সঙ্গে বোঝাপড়ার এবং যত্ন ও আগ্রহের সম্পর্কের প্রতিকল্প। কিন্তু মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক অর্থের থেকে অনেক বেশিগুরুত্ব পূর্ণ। অপরকে যথার্থরূপে বুঝতে পারলেই নিজেকে অপরের নিকট বোঝানো যায় এবং এই বোধ পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।ঔদার্য অনুশীলন করুনঔধার্য ভাবগত পরিপক্কতার লক্ষণ। চিন্তাশীল ও বিবেচক ব্যক্তিরাই উদার হতে পারেন। উদার ব্যক্তিরা জীবনের ঐশ্বর্য উপভোগ করতে পারেন, যা একজন স্বার্থপর ব্যক্তির কল্পনার বাইরে।

পৃষ্ঠা:১২৩

বিবেচক হোন, স্বার্থপরতা প্রতিহিংসা আহবান করে। অপরের অনুভূতির প্রতি সংবেদশীল হোন।কৌশলী হোন।যেকোনও সম্পর্কের ক্ষেত্রেই কৌশল প্রয়োজন। ‘কৌশল’ এর অণু-হচ্ছে অন্যদের সহানুভূতি না হারিয়ে নিজের বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করা।দয়া টাকা দিয়ে একটি ভালো কুকুর কিনতে পাবেন কিন্তু তার প্রতি দয়া না দেখালে সে লেজ নাড়বে না। অপরের প্রতি করুণা প্রদর্শনে দেরি করা উচিত নয়। করুণা এমন একটি ভাষা যা বধিরও শুনতে পায়, অন্ধও দেখতে পায়। জীবতাবস্থায়। একজন বন্ধুকে করুণা দেখানো প্রয়োজন, মৃত্যুর পর তার সম্মানে ফুল দিয়ে করুণা দেখানো অর্থহীন। কোনও দয়ার কাজ গ্রহণকারীকে প্রফুল্ল করে। সহৃদয় কথাবার্তায় জিহবা আহত হয় ना। দ্বাবিংশতিতম পদ্ধতিঃ প্রতিদিনের ব্যবহারে সৌজন্যমূলক আচরণ অনুশীলন করুন। (Step 22: Practice courtesy on a daily basis)ভদ্রতার অর্থ হোল অপরের জন্য বিবেচনা বোধ। ভদ্রতা এমন সব দরজা খুলে দেয় যা হয়ত অন্যভাবে খোলা যেত না। একজন ভদ্রব্যক্তি, যিদি খুব তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সম্পন্ন নন, জীবনে অনেক উন্নতি করবেন, যা হয়ত একজন তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সম্পন্ন কিন্তু অভদ্র ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। ছোট খাট ব্যাপারেই অনেক তফাৎ ঘটে যায়। হাতি কি কখনও আপনাকে কামড়েছে? স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর হচ্ছে না। মশা আপনাকে কামড়েছে? অনেককেই কামড়েছে। এই ছোটখাট উপদ্রবই আমাদের ধৈর্য পরীক্ষা করে। ভদ্রতা ছোট ছোট আত্মত্যাগের সমাহার। ছোট ছোট ভদ্র ব্যবহার চতুরতার থেকে জীবনে অনেক বেশি সাহায্য করে। ভদ্রব্যবহার আমাদের নৈতিক চরিত্রের প্রকাশ। এতে কোনও ব্যয় হয় না, কিন্তু ভালো প্রতদান পাওয়া যায়। যত বড় মানুষই বা যত ব্যস্ত মানুষই হোন না কেন, ভদ্র ব্যবহার সবার পক্ষেই সম্ভব। ভদ্রতা মানে একজন বয়স্ক ব্যক্তিকে আপনার জায়গা ছেড়ে দেওয়া, অথবা একটু আন্তরিক হাসি, কিংবা ধন্যবাদ। খুবই সামান্য বিনিয়োগ, কিন্তু প্রতিদান অনেক বেশি। ভদ্র ব্যবহার যে পায় তারও আত্মমর্যাদা বেড়ে যায়। ভদ্রতার জন্য বিনয়ের প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যের বিষয় অনেক সময় মানুষ ইচ্ছাকৃত ভাবে বিরক্তি উৎপাদক ব্যবহার করে। আমি দু-একজনকে বলতে শুনেছি, আমি খুবই বিরক্তিকর ব্যবহার করতে পারি।”ভদ্রতার বীজ ছড়িয়ে দিন, কিছু নিশ্চয়ই চারা হয়ে শিকড় চালিয়ে দেবে, এবং অপরের চোখে আপনাকে উন্নত মানুষ রূপে প্রতিভাত করবে।আদব কায়দাসৌজন্যবোধ ও আদবকায়দা হাত ধরাধরি করে চলে। বাড়িতেও আদবকায়দা অনুশীলন করা দরকার, কেবল বাইরের মানুষদের ক্ষেত্রেই নয়। ভালো আদবকায়দা ও সুবিবেচনার দ্বারা হৃদয়ের উষ্ণতা টেনে আনা যায়। ভালো আদবকায়দার অনুশীলনই সৌজন্যবোধ। আত্মতৃপ্তি ছাড়াও অদ্রতা সৌজন্যবোধের অনেক সুবিধা আছে, যা কঠোর ব্যবহারেসম্ভব নয়। এই সমস্ত দেখে মনে হয় লোকে কেন সৌজন্যবোধ অনুশীলন করে না। কড় ও অভদ্র লোকেরা হয়ত প্রাথমিক কিছু সুবিধা পেতে পারে; কিন্তু বেশিরভাগ লোকই এদেরতুমিও জিতবে-৯

পৃষ্ঠা:১২৪

এড়িয়ে চলে, এবং অবেশেষে রূঢ় ব্যক্তিদের সকলেই অপছন্দ করে। বাচ্চাদেরও অল্পবয়সে সৌজন্যবোধ শিক্ষা দেওয়া উচিত, একবার শিখলে তা সারা জীবন থাকবে। স্বরণ রাখা দরকার, অদ্র ব্যবহার অনাকেও অদ্রব্যবহারে অনুপ্রাণিত করে। সেইজন্য ভদ্রব্যবহার অনুশীলন করা দরকার। সৌজন্য বিনয়ের লক্ষণ।সৌজন্যবোধ ভালো লালন পালনের লক্ষণ অনেক উজ্জ্বল এবং প্রতিভাবান ব্যক্তি তাদের সাফল্য নষ্ট করে ফেলেছেন কারণ তাদের সৌজন্যবোধ ও আদবকায়দার অভাব ছিল। অদ্রতা বোধ এবং সৌজন্যবোধ মার্জিত ও পরিশীলিত ব্যক্তিত্বের লক্ষণ। রূঢ়তা ও অভদ্রতা এর অভাব সূচীত করে। মানুষের সম্মান ও মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রেখে ব্যবহার করুন।‘রূঢ়তা দুর্বল মানুষের সকলকে অনুকরণ করার চেষ্টা।” এরিক হফার (Eric Hoffer).ত্রিবিংশতি পদ্ধতিঃ হাস্যরস বোধকে উন্নত করুন(Step 23: Develop a sense of humor)হাস্যরসবোধ থাকলে নিজেকে নিয়ে কৌতুক করার ক্ষমতা আয়ত্তে আসবে। হাস্যরসবোধ মানুষকে আকর্ষণীয় এবং পছন্দসই করে। অনেক মানুষ হাস্যরসের মোটেই ধার ধারে না।নিজেকে নিয়েই কৌতুক করতে শিখুন, কারণ সেটাই সব থেকে নিরাপদ কৌতুক। তাছাড়া নিজেকে নিয়ে হাসতে জানলে সমস্ত বিমর্ষতাকে কাটিয়ে ওঠার শক্তি পাওয়া যাবে। হাসি মানুষকে শান্তি দেয়। হাস্যরস হয়ত সমস্ত অবস্থার পরিবর্তন করতে পারে না; কিন্তু অবস্থার যন্ত্রণাকে অনেকটা লাঘব করার চেষ্টা করে।হাস্যরসের আরোগ্যকর ক্ষমতা (The healing power of humor) ডাঃ নরম্যান ক্যুজিনস (Dr Norman Cousins) যিনি “Anatomy of an Illnessনামক একটি বইয়ের গ্রন্থকার, নিজেই কিভাবে নিজেকে একটি মারাত্মক অসুখ থেকে সারিয়ে তুলতে পারেন তার উদাহরণ হয়ে আছেন। তার ৫০০ ভাগে একভাগ বাঁচার সম্ভাবনা ছিল; কিন্তু ক্যুইজিনস প্রমান করতে চাইলেন যে মন বস্তুর উপর আধিপত্য করে এবং তিনি তা প্রমাণ করলেন। যদি নেতিবাচক ভাবাবেগ আমাদের শরীরে নেতিবাচক রাসায়নিক ক্রিয়া তৈরি করে, তবে উল্টোটাও সত্য। ইতিবাচক ভাবাবেগ, যেমন সুখ, হাসি ইত্যাদি, শরীরে ইতিবাচক রাসায়নিক ক্রিয়ার সৃষ্টি করবে। তিনি হাসপাতাল থেকে হোটেলে উঠে, অনেক কৌতুকতর ছায়াছবি দেখার ব্যবস্থা করলেন, এবং আক্ষরিক অর্থে হাসির সাহায্য নিজেকে সুস্থ করে তুললেন। অবশ্য ওষুধ খাওয়া বন্ধ করেন নি, কিন্তু রোগীর পক্ষে বাঁচার ইচ্ছাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কৌতুক জীবনের পণ্যে অপরিহার্য, জীবনের বিপর্যয়কে সহজে গ্রহণ করতে সাহায্য করে।চতুর্বিংশতি পদ্ধতিঃ বিদ্রূপাত্মক বাক্য পরিহার করুন এবং অন্যকে দমন করবেন না (Step 24: Don’t be sarcastic and put others down)নোতিবাচক ব্যক্তি অপরকে বিদ্রূপ করে কৌতুক করে। তাদের দমন করে রাখতে চায় কিংবা তাদের আঘাত করে মন্তব্য করে। যে কোনও কৌতুক যা বিদ্রূপাত্মক, এবং অপরকে নিয়ে মজা করে খুবই নিম্ন রুচির পরিচায়ক। শারীরিক আঘাত মানুষ ভুলে যায়,

পৃষ্ঠা:১২৫

কিন্তু অপমান কখনও ভোলে না।“যখন কেউ লজ্জা পায়, যখন কোনও ব্যক্তি মনের মধ্যে একটি বেদনা বহন করে, যখন কোনও কিছু পবিত্রকে সাধারণ বস্তুতে রূপান্তরিত করা হয়, যখন কারুর দুর্বলতা হাসির খোরাক হয়, যখন পবিত্রতাকে অবজ্ঞা করে মজা করা হয়, যখন কোনও শিশুর চোখে জল এসে যায়, কিংবা যখন সকলে হাসিতে যোগ দিতে পারে না, এরূপ কৌতুককেই বলে নিম্নশ্রেণীর কৌতুক।” ক্লিফ থমাস (Cliff Thomas) একজন মর্ষকামীর নিকট যা তাকে আঘাত করে না কিন্তু অন্যকে আঘাত করে, তা কৌতুককর। প্রায়ই দেখা যায় ছেলেরা ব্যাঙয়ের উপর ইট চুঁড়ছে মজা করার জন্য। ছেলেদের মজা মানে ব্যাঙগুলির মৃত্যু। ব্যান্ডয়েদের পক্ষে তা মজা নয়।কৌতুক ভালোও হতে পারে আবার বিপজ্জনকও হতে পারে। এটি নির্ভর করে আপনি কারোর সঙ্গে হাসছেন কিংবা কারুকে উপলক্ষ্য করে হাসছেন তার উপর। হাস্যরস যখন কাউকে বিদ্রূপ করার জন্য তখন তা নিম্ন রুচির পরিচয় দেয়। এটি তখন নিতান্ত নিরীহ বলেও বলা চলে না। অপরের অনুভূতিকে আঘাত করা নিষ্ঠুরতার কাজ। অপরকে অবদমিত করে অনেকে মজা করেন। বিদ্রূপ বা এই ধরনের মজা মানুষকে বিদ্বিষ্ট করে তোলে। কৌতুক বা হাস্যরসের ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকি না নেওয়াই বাঞ্ছনীয়।পঞ্চবিংশতি পদ্ধতি: বন্ধু লাভের জন্য বন্ধু হোন্ (Step 25: to have a friend, be a friend)আমরা সব সময়েই সঠিক নিয়োগকর্তা, সঠিক কর্মী স্ত্রী, মাতাপিতা, সন্তান ইত্যাদি চাই; কিন্তু ভুলে যাই যে আমাদের সঠিও ব্যক্তি হওরা প্রয়োজন। অভিজ্ঞতায় জানি যে সর্বসম্পূর্ণ মানুষ নেই, সর্বাঙ্গ সুন্দর চাকার, স্ত্রী কিন্তু সব নয়। সর্ববিষয়ে সার্থক কোনও কিছুই পাওয়া যায় না। কিছু না কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘেঃ এই যায়। ২০ বৎসর পশ্চিম দেশে বাস করে জানি যে এদেশে বিবাহ-বিচ্ছেদ অনেক বেশি। প্রথম বিবাহ বিচ্ছেদের পর দ্বিতীয় বিবাহে আগের ত্রুটি গুলি থাকে না বটে কিন্তু কিছু নতুন ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। সেইভাবে লোকে চাকরি বদলায় কিংবা নতুন কর্মচারী নিয়োগ করে। কিন্তু দেখা যায় তাতে সমস্যার সমাধান হয় না। একধরনের সমস্যার বদলে অন্য ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। এই সমস্যা গুলির মোকাবিলা করা দরকার-চাকরি বা কর্মচারী বদলানো একেবারে শেষ বিকল্প হিসাবে নেওয়া উচিত।আত্মত্যাগ বন্ধুত্বের জন্য আত্মত্যাগ করতে হয়। শুধু বন্ধুত্ব নয় মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্কের জন্যও আত্মত্যাগ করতে হয়। আত্মত্যাগ মানে প্রাসঙ্গিক ভাবে কিছু করা নয়, নিজের স্বাভাবিক কাজের বাইরে গিয়ে কিছু করা, স্বার্থপরতা বন্ধুত্ব ধ্বংস করে। সত্যিকারের বন্ধুত্ব তৈরি হতে সময় লাগে, এবং সচেতন চেষ্টায় বন্ধুত্ব রাখতে হয়। পরীক্ষার মধ্যদিয়ে গেলেই বন্ধুত্ব সুদুঢ় হয়। সত্যকারের বন্ধুত্ব বন্ধুকে আঘাত দেয় না, যা পায় তার থেকে বেশি দেয়, এবং বিপদে বন্ধুর পাশে দাঁড়ায়। সুদিনের বন্ধু সুদিনের বন্ধু সে লোকটির মতো যে রোদ উঠলে ছাতা ধার দেয় আর বৃষ্টি শুরু হলেই

পৃষ্ঠা:১২৬

ছাতা নিয়ে নেয়। দুই ব্যক্তি জঙ্গলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ একটি ভালুক আক্রমণ করতে, একজন অন্যজনকে সাহায্য করার চেষ্টা না করে তাড়াতাড়ি একটি গাছে উঠে পড়ল। অন্যজনকে উপায় না দেখে মাটির উপর মরার মত শুয়ে পড়ল। ভালুকটি এসে লোকটির মুখ চোখ শুঁকে চলে গেল। গাছের উপরের লোকটি নীচে নেমে এসে জিজ্ঞেস করল, “ভালুকটি কী বলল?” লোকটি জবাব দিল, যে বন্ধু বিপদে ফেলে পালায় তাকে কখনও বিশ্বাস কোরো না।” এই গল্পটির নীতিবাক্য দিনের আলোর মত পরিষ্কার।পারস্পরিক বিশ্বাস ও আস্থা সমস্ত বন্ধুত্বের ভিত্তিভূমি। বিভিন্ন উদ্দেশ্যে লোকে বন্ধুত্ব করে বন্ধুত্বকে এইভাবে ভাগ করা যেতে পারে:

১. সুদিনের-বন্ধু দু’জনের সম্পর্ক যখন পরস্পরের নিকট মজাদার মনে হয় ততদিনই বন্ধু, অর্থাৎ সুদিনের বন্ধু।

২. সুবিধা পাওয়ার বন্ধুত্ব আনুকূল্য লাভের জন্য বন্ধুত্ব করা হয়। অন্য ব্যক্তির প্রয়োজনীয়তা যতদিন থাকে ততদিনই বন্ধুত্ব থাকে। এই বন্ধুত্ব চিরস্থায়ী নয়।

৩. সত্য বন্ধুত্ব: এই বন্ধুত্ব পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও পরস্পরর সম্পর্কে উচ্চ ভাবনার উপর নির্ভরশীল। তারা কাজেও পরস্পরের প্রতি সৎ। ভালো কাজ করলে ভালো বন্ধু লাভ হয়। দু’পক্ষেই আছে সৎ মনোভাব। চরিত্র ও অঙ্গীকারের উপর নির্ভরশীল এই বন্ধুত্ব। ঐশ্বর্য বন্ধু আকর্ষন করে, কিন্তু বিপদে সেই বন্ধুত্বের পরীক্ষা হয়। নীচের কবিতাটিতে সুদিনের বন্ধুত্ব বর্ণনা করা হয়েছে। যখন তোমার আনন্দের দিন, তখন অনেকে তোমার কাছে আসবে আর দুঃখের দিনে তারা তোমাকে ত্যাগ করবে তারা তোমার আনন্দের পূর্ণ অংশীদার হতে চায়, কিন্তু তোমার দুঃখে তারা তোমার কেউ নয়। যখন তুমি সুখী তখন তোমার বন্ধু অনেক, যখন তুমি দুঃখী, তখন কেউ নেই পাশে- কেউ তোমার অমৃতময় পানীয় প্রত্যাখ্যান করবে না, কিন্তু জীবনের গরল তোমাকে একাকেই পান করতে হবে। -এলা দুইলার উলকক্স সত্যকারের বন্ধু যারা তারা পরস্পরকে সাহায্য করে। কিন্তু সে সাহায্য অনুগ্রহ দেখানো নয়। সে সাহায্য বন্ধুত্বের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যদি এই রকম সাহায্য না পাওয়া যায় তা হলে বন্ধুত্বের সম্পর্ক থাকে না। সম্পর্ক তৈরি হতে সময় লাগে। সম্পর্ক তৈরি হয় সহমর্মিতা, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং আত্মত্যাগের উপর-দ্বেষ, স্বার্থপরতা, অহংবোধ বা রূঢ় ব্যবহারের উপর নয়। একবার বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপিত হলে তাকে ক্রমাগত লালন পালন করতে হয়। বন্ধুত্বের বিষয়ে একটি কথা স্বরণ রাখা দরকার যে কোনও মানুষই সবদিক থেকে সুসম্পূর্ণ নয়। এই মত আশা করতে গেলে হতাশ হতে হয়। বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা অন্যের বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা ব্যতীত সাফল্য অর্জন করা মুস্কিল। আনন্দময় ব্যক্তিত্ব সবসময়েই নমনীয়, এবং নিজের স্থৈর্য না হারিয়ে অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিতে সক্ষম। নমনীয়তার অর্থ এই নয় যে বাবহারে চাপলা থাকবে। এর অর্থ অবস্থা বুঝে সেই

পৃষ্ঠা:১২৭

অবস্থানুসারে যথাযথ ব্যবহারের নামই নমনীয়তা। নমনীয়তা কখনই আদর্শ বা মূল্যবোধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।  ছাব্বিশতম পদ্ধতি: সহমর্মিতা দেখান (Step 26: Show empathy) অপরের প্রতি আমরা যা অন্যায় করি এবং নিজেরা যে অন্যায় সহ্য করি তা আমাদের মনে ভিন্ন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। সহমর্মিতা ইতিবাচক ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ঠ্য। সহমর্মী ব্যক্তিরা নিজেদের এই প্রশ্ন করে, “কেউ আমার সঙ্গে অন্যায় ব্যবহার করলে আমি কি রকম বোধ করতাম? কুকুরছানা (A puppy) এক বালক একটি কুকুর ছানা কিনতে দোকানে গেল। চারটি ছানার প্রত্যেকটির দাম ৫০ ডলার। এক কোনে আর একটি কুকুর ছানা একা বসেছিল। ছেলেটি জিজ্ঞেস করল ঐ বাচ্চাটিও এক মায়ের বাচ্চা কিনা, এবং ঐ বাচ্চাটিও বিক্রির জন্য আছে কিনা। দোকানের মালিক বলল ঐ বাচ্চাটিও অন্যগুলির সঙ্গে একই মায়ের বাচ্চা; কিন্তু ঐ বাচ্চাটির অঙ্গহানি আছে বলে ঐটি বিক্রির জন্য নয়। ছেলেটি জিজ্ঞেস করল বাচ্চাটির কি ধরনের অঙ্গ হানি আছে। দোকানদার বলল যে বাচ্চাটির কোমরের কাছে চামড়া নেই এবং একটি পা নেই। ছেলেটি জিজ্ঞেস করল,” এটিকে নিয়ে আপনি কী করবেন?” জবাব এল একে চিরতরে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া হবে। ছেলেটি বাচ্চাকুকুরটির সঙ্গে একটু খেলতে চাইলে দোকানদার মত দিল। ছেলেটি তখন কুকুরটিকে কোলে নিতেই, কুকুরটি তার কান চেটে দিল। সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটি ঠিক করল যে সে কুকুর বাচ্চাটি কিনবে। দোকানদার বলল, এটা বিক্রির জন্য নয়।” কিন্তু ছেলেটি জেদ ধরল সে ওটি কিনবেই। শেষ পর্যন্ত দোকানদার রাজি হল। ছেলেটি দু’ডলার পকেট থেকে বার করে দোকানদারকে দিয়ে আরও ৪৮ ডলার মায়ের কাছ থেকে আনবার জন্য দৌড়াল। দরজার কাছে যখন পৌঁছেছে তখন দোকানদার চিৎকার করে বলল,” তুমি এই বিকলাঙ্গ কুকুর ছানাটির জন্য একটি ভালো কুকুর ছানার দাম দেবে কেন? ছেলেটি কিছু না বলে তার ট্রাউজারের কিছুটা তুলে দেখাল-সে একটি নকল পা পরে আছে। দোকানদার বলল, ” আমি বুঝেছি। তুমি এই বাচ্চাটি নাও।” একেই বলে সমমর্মিতা। সহানুভূতিশীল হও যখন তুমি কারুর সঙ্গে দুঃখ ভাগ করে নাও তখন দুজনের দুঃখই কম হয়; যখন সুখ ভাগ করে নাও তখন সুখ বেড়ে যায়। সহানুভূতি ও সহমর্মিতার ধো তফাৎ কোথায়? সহানুভূতি হচ্ছে, “আমি বুঝতে পারছি তুমি কী অনুভব করছ” আর সহমর্মিতা হচ্ছে, “তুমি কী অনুভব করছ তা আমিও অনুভব করতে পারছি।” সহানুভূতি ও সহমর্মিতা দুইই গুরুত্বপূর্ণ; এই দুইয়ের মধ্যে সহমর্মিতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যখন আমরা আমাদের খরিদ্দার, নিয়োগকর্তা, কর্মচারী এবং পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা দেখাই তখন আমাদের সম্পকে কিরূপ হয়? অবশ্যই সম্পর্ক ভালো হয়। ফলে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ে, আনুগত্য শান্তি এবং উৎপাদনশীলতা ও বৃদ্ধিপায়। একজন ব্যক্তি মানুষের, কিংবা একটি সম্প্রদায়ের বা একটি জাতির চরিত্রে কিভাবে বিচার করবে?

পৃষ্ঠা:১২৮

১৩৪ তুমিও জিতবে খুব সহজ। কেবল লক্ষ্য কর, সেই সম্প্রদায় বা জাতি কিভাবে এই তিন প্রকারের মানুষের সঙ্গে ব্যবহার করে।

১. বিকলাঙ্গদের প্রতি

২. বয়স্কদের প্রতি

৩. অধিনস্থ ব্যক্তিদের প্রতি এই তিন শ্রেনীর মানুষ তাদের অধিকার রক্ষার সমানতালে লড়াই করতে পারে না। ভালো মানুষ হোন (Be a better person)সংকল্প করুন যে আপনি তরুণদের প্রতি নরম হবেন, রয়স্কদের প্রতি করুণাপূর্ণ ব্যবহার করবেন, সংগ্রামীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হবেন এবং যারা দুর্বল ও ভুল করেছে তাদের প্রতি হবেন সহনশীল। কারণ আমাদের জীবনে কোনও না কোনও সময়ে আমরাও ঐ অবস্থায় মধ্য দিয়ে গিয়েছি।-Lloyd Shcarer, 1986 কাজের পরিকল্পনা (Action plan) ১, নিজের কাজের ফলাফলের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য বন্ধ-পরিকর হোন।২. প্রত্যেক বিভাগের একটি ক্ষেত্র নির্দিষ্ট করুন, যেখানে আপনি আরও বেশি দায়িত্ব’ নেবেন।(ক) পরিবার,(খ) কর্মস্থল(গ) সামাজিক ক্ষেত্র,৩. এই অধ্যায়টি পড়ার পর আপনি কোন তিনটি বিষয় অনুশীলন করার জন্য বদ্ধপরিকর।(১)(৩).আপনার মন্তব্য লিখুন এবং পরবর্তী ২১ দিন প্রতিদিন একত্রার করে পড়ুন।

পৃষ্ঠা:১২৯

অধ্যায় ৪৬ অবচেতন মন এবং অভ্যাস ইতিবাচক অভ্যাস ও চরিত্রগঠন: আমরা সবাই জীবনে সাফা লাভের বাসনা করি। কিন্তু আমাদের পারিপার্শ্বিক অসাফল্যের দিকে নিয়ে যায়। আমরা জয়ের জন্য জন্মাই। কিন্তু এমন অবস্থার সৃষ্টি ২য় গে জীবনে অসফল হতে হয়। মাঝে মাঝে আমরা এ রকম কথা শুনি যে, লোকটি খুর ভাগ্যবান, ধুলোমুঠি করলে সোনামুঠি হয়ে যায়; অথবা লোকটি খুব দুর্ভাগা, যে কাজই করতে যায় সেই কাজই মাটি হয়ে যায়; এরকম ভাগ্য নির্ভরতা ঠিক নয়। যদি বিশ্লেষণ করে দেখেন, তাহলে দেখবেন যে, সফল ব্যক্তিরা প্রত্যেক কাজেই বেশ কিছু সঠিক পদক্ষেপ নিচ্ছেন, আর অসফল ব্যক্তিরা প্রত্যেক বারই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করছেন। স্মরণ রাখবেন অনুশীলনের দ্বারাই মানুষ ত্রুটিহীন হয় না, কেবল ত্রুটিহহীন অনুশীলনের দ্বারাই ত্রুটিহীন হতে পারে। কিছুলোক ত্রুটি বিচ্যুতি গুলোকে অনুশীলন করে পাকাপাকি ভাবে সেইগুলিকে এমন ভাবে আত্মস্থ করে যে তারা আপনা থেকেই সেই ত্রুটিগুলিকে পুনরাবৃত্তি করে। পেশাদাররা তাদের কাজের মূল বিষয়গুলি এমনভাবে আয়ত্ত করে যে কাজটি তাদের কাছে সহজ হয়ে যায়। অনেকেই কাজে পদোন্নতির দিকে লক্ষ রেখে ভালো কাজ করে; কিন্তু যারা অভ্যাসের বশেই ভালো কাজ করে তারা আরও বেশি যোগ্য। একটি অভ্যাস তৈরি করা জমি চাষ করার মতো এতে সময় লাগে এবং এর জন্য অন্তরের প্রেরণা দরকার। এক অভ্যাস থেকে আর এক অভ্যাস তৈরি হয়। মানুষ অনুপ্রেরণা পেলে কাজ শুরু করে, কর্মোদ্যমের ফলে সে কাজ করে যায় এবং অভ্যাস তৈরি হয়ে গেলে কাজ আপনার থেকেই হয়। বাধা-বিপত্তির মুখে সাহস দেখানোর ক্ষমতা, প্রলোভনের মুখে আত্ম-সংযম, আঘাত পেয়েও সুখী থাকার চেষ্টা, হতাশার সম্মুখে চরিত্রের শক্তি দেখানো, বাধার মধ্যে দিয়েও সুযোগ খুঁজে নেওয়া-মানুষের এই গুণগুলি কাকতালীয় ব্যাপার নয়। এগুলি শারীরিক ও মানসিক প্রশিক্ষণের ফল। বাধার সম্মুখে আমাদের ব্যবহার আমাদের অনুশীলন করে থাকি, যেমন ছোটখাট বিষয়ে অসততা বা কাপুরষতা দেখিয়ে থাকি, তাহলে আমাদের পক্ষে জীবনের বড় বিষয়গুলির ইতিবাচক ভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না। কারণ সেই ভাবে আমাদের অভ্যাস গড়ে তুলিনি। যখন আমরা কোন বিষয়ে একটা মিথ্যা কথা বলি, দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার মিথ্যা বলা সহজ হয়ে যায় ও পরে অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায়। সাফল্যের জন্য কিছু বিষয় মেনে চলা দরকার এবং কিছু বিষয় থেকে বিরত থাকার দরকার। সেইগুলি মেনে চলা দরকার যেগুলি ইতিবাচক এবং সুফলদায়ী আর যেগুলি নেতিবাচক সেগুলির থেকে বিরত থাকা দরকার। এইভাব দু’টি অভ্যাসই তৈরি করা প্রয়োজন। মানুষ যতটা না যুক্তিবাদী তা থেকেও বেশি ভাবালু। সততা এবং সর্বাঙ্গীণ

পৃষ্ঠা:১৩০

ন্যায়পরায়ণতা, আমাদের বিশ্বাস এবং অনুশীলনের ফলশ্রুতি। অনেকদিন ধরে যা আমরা অনুশীলন করি, তা আমাদের প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়, এবং সেটি হয় আমাদের অভ্যাস। যে মানুষ সব সময় সত্য কথা বলে, সে প্রথম মিথ্যা বললে ধরা পড়ে যায়। আর যে মানুষ সব সময়েই অসৎ এবং মিথ্যা বলে, সে প্রথমবার সত্য বললে ধরা পড়ে যায়। সুতরাং সততা এবং অ-সততা দু’টোই আমাদের অভ্যাস হয়ে দাঁড়াতে পারে। আমাদের চিন্তার ধারাও আমাদের অভ্যাসের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। আমরা যেমন আমাদের অভ্যাস তৈরি করি, তেমনি অভ্যাস আমাদের চরিত্র গঠন করে। প্রকৃতপক্ষে আপনি বোঝবার আগেই অভ্যাস তৈরি হয়ে যায়। সেইজন্য সঠিক চিন্তা করে ইতিবাচক অভ্যাস তৈরি করা দরকার।জনৈক ব্যক্তি বলেছিলেন-“আমরা আমাদের চিন্তা করি, এবং কাজ অনুযায়ী আমাদের অভ্যাস তৈরি হয় এবং অভ্যাস আমাদের চরিত্র গঠন করে; আর চরিত্র আমাদের ভাগ্য গঠন করে।”সু-অভ্যাস তৈরি করা (Form good habits)আমাদের ব্যবহার আমাদের অভ্যাসের ফলশ্রুতি। অভ্যাসের ফলে আমাদের কিছু কিছু ব্যবহার আপনা-আপনিই হয়ে যায়। চরিত্র আমাদের অভ্যাসের যোগফল। যদি কোন ব্যক্তির ইতিবাচক অভ্যাস থাকে, তার চরিত্রও ইতিবাচ হয়। আবার নেতিবাচক অভ্যাসের ফলে নেতিবাচক চরিত্রের মানুষ হয়। যুক্তি এবং বিচারের থেকে অভ্যাস আরও শক্তিশালী। প্রথমে অভ্যাস এত দুর্বল থাকে তা বোঝা যায় না, কিন্তু ধীরে ধীরে এত দৃঢ় হয়ে যায় যে সে অভ্যাস ত্যাগ করা কঠিন হয়। সু-অভ্যাস তৈরির জন্য দৃঢ় সংকল্প প্রয়োজন।বাল্যকালে আমার বাবা, মা আমাকে বলতেন-“তোমার সু-অভ্যাস তৈরি করা প্রয়োজন, কারণ অভ্যাস চরিত্র গঠন করে।”কিভাবে অভ্যাস তৈরি হয়? (How do we form habits)আমরা যা পুনঃ পুনঃ করি, তা অভ্যাসে পরিণত হয়। কাজ করেই আমরা শিক্ষা লাভ করি সহসিকতার সঙ্গে কাজ করলে আমরা সাহসী হই। আমরা যদি সততা ন্যায় পরায়ণতা অভ্যাস করি তাহলে এই গুণগুলি আমাদের চরিত্রে অধিগত হয়। সেই ভাবে যদি আমরা নেতিবাচক গুণ-যেমন অ-সততা, অন্যায় ব্যবহার অথবা শৃঙ্খলা বোধের অভাব অভ্যাস করি, তাহলে সেগুলিই আমাদের চরিত্রে প্রকট হয়।আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও অভ্যাসের দ্বারা তৈরি হয়। অভ্যাসই আমাদের মানসিক অবস্থার এবং বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।অবস্থার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত (Conditoning)আমাদের অনেক ব্যবহারই আপেক্ষিক অর্থাৎ অন্য কিছুর ওপর নির্ভরশীল।বিশেষ করে এই অভ্যাসের ওপর নির্ভরশীল আমরা যদি কোন কাজ ভালো করে করতে চাই, তবে তা স্বয়ংক্রয় ভাবেই হওয়া উচিত। যদি আমরা সচেতনভাবে চিন্তা করে সঠিক জিনিসটি করতে চাই তাহলে অনেক সময়ে ভালোভাবে করা যায় না। অর্থাৎ ভালোভাবে কাজ করার একটা অভ্যাস তৈরি করা দরকার।আমরা সবসময়েই এবং সকলেই ক্রমাগত পরিবেশ এবং সংবাদ মাধ্যমের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হই এবং অনেক সময় আমরা ‘রোবটের’ মত ব্যবহার করি। কিন্তু আমাদের ইতিবাচক অবস্থায় দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়া উচিত

পৃষ্ঠা:১৩১

অবচেতন মন এবং অভ্যাস:আমি যখন সামরিক বিদ্যার ছাত্রছিলাম, তখন আমি লক্ষ্য করেছি যে, যারা সর্বোচ্চ দক্ষতা দেখিয়ে ‘ব্ল‍্যাক বেল্ট’ পেয়েছেন, তারাও ঘুঁসি মারার অথবা প্রতিপক্ষের ‘খুঁসি’ থেকে বাঁচার ন্যায় প্রাথমিক বিষয়গুলিও অনুশীলন করেছেন। কারণ এরূপ অনুশীলনের ফলে তাদের দক্ষতা বাড়ে। স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মত এগুলি ব্যবহার করতে পারেন। সু-অভ্যাস তৈরি করা মুসকিল। কিন্তু একবার তৈরি হলে, জীবন যাত্রা সহজ হয়ে যায়। বদ-অভ্যাস খুব সহজেই তৈরি হয়। কিন্তু তারা জীবনকে দুর্বিষহ করে।আমরা কিভাবে পরিবেশের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হই? (How do we get conditioned?)হাতির শক্তির কথা ভাবুন। শুড়ের দ্বারাই ১টনের বেশি ওজন তুলে ফেলতে পারে। তাহলে কিভাবে এই হাতিকে একটি সামান্য দড়ির সাহায্যে একটি খুঁটিতে বেঁধে রাখে। বাচ্চা অবস্থায় হাতিকে শক্ত শিকল ও মোটা গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। বাচ্চা তখন দুর্বল কিন্তু শিকল ও গাছ তখন খুব শক্ত। বাচ্চা আবার বাঁধা থাকাতে অভ্যস্ত নয় সুতরাং তখন শিকল টানা-টানি করে। কিন্তু সব সময়েই বিফল হয়। পরে একদিন বুঝতে পারে যে ঐ ভাবে টানাটানি করে কিছু হবেনা, তখন চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে, কারণ ততদিনে তার অভ্যাস তাকে নিয়ন্ত্রিত করে ফেলেছে।বাচ্চা হাতি যখন বিরাট শক্তিশালী হাতিতে পরিণত হয় এবং তাকে যখন অশক্ত দড়ি এবং ছোট্ট কুঁটিতে বেঁধে রাখা হয়, তখন কিন্তু এক ঝটকাতেই হাতি নিজেকে মুক্ত করে নিতে পারে। কিন্তু তা করে না। কারণ ততদিনে অবস্থা তাকে নিয়ন্ত্রিত করে ফেলেছে।মানুষ ও ক্রমাগত সচেতন কিম্বা অচেতন ভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এই নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয় তখন যখন সকল মানুষ নিম্নলিখিত উপায়ে প্রভাবিত হয়ঃ-

  • কোনও বিশেষ ধরনের চলচিত্র বা টেলিভিশনের অনুষ্ঠান।
  • বিশেষ ধরনের গান শোনা।
  • বিশেষ ধরনের সংসর্গ। গাড়িতে কর্মস্থলে যাওয়ার সময় যদি কয়েকদিন ধরে প্রত্যেকদিনই একই ধরনের গান শুনি, তবে যেদিন গাড়িতে টেপরেকর্ডার বাজবেনা, অনুমান করুন সেদিন কী গানের সুর গাড়িতে যাওয়ার সময় আমরা ভাঁজবো? অবশ্যই যে সুর প্রত্যেক দিন শুনেছি সেই সুরই। বলা হয়ে থাকে যে একই কাজ বার বার করা এবং প্রত্যেক বারই পৃথক ফল আশা করার নামই ‘পাগলামি’। যে কাজ বার বার করছেন, বার বার একই ফল লাভ করবেন।অভ্যাস পরিবর্তন করা খুবই কষ্টকর কারণ যা শেখা হয়েছে তা ভুলে যাওয়াও কষ্টকর।GIGO পদ্ধতি (The GIGO principle)কম্পিউটারের ভাষা GIGO (Garbage in garbage out) খুব একটা ভালো নীতি।আমরা যা যোগান দিই। উৎপাদনও তার সমান হয়। আমাদের অবচেতন মন যোগান বা উৎপাদনের গুণ নিয়ে ভেদাভেদ করে না।আমাদের অবচেতন মনে যা আসে, আমাদের ব্যবহারের ওপর তার প্রভাব পড়বে। টেলিভিশন আমাদের নীতিবোধ ও চিন্তা এবং সৎ সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করে। অনেক

পৃষ্ঠা:১৩২

সময়ে ভালো প্রভাবও বিস্তার করে আবার অনেক সময় খারাপ প্রভাবও। টেলিভিশণ অনেক প্রয়োজনীয় খবর আমাদের দেয় কিন্তু এই সঙ্গে আমাদের রুচিকে অবনমিত করে। আমাদের নীতিবোধকে বিকৃত করে এবং অল্প বয়স থেকে অপরাধ প্রবণ করে। বাক স্বাধীনতা অথবা টেলিভিশনের -এর স্বাধীনতার জন্য আমাদের যথেষ্ট কঠিন মূল্য দিতে হয়। একটি তরুণ ১৮ বৎসর বয়সের মধ্যে টেলিভিশনে অন্তত ২ লক্ষ হিংসাত্মক ঘটনা চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করে থাকে।বিজ্ঞাপন দাতারা তাদের দর্শকদের বিভিন্ন ভাবে নিয়ন্ত্রিত করে। বিজ্ঞাপন উৎপন্ন দ্রব্যের বিক্রি বাড়িয়ে দেয়, তা না হলে কোম্পানী গুলি বিজ্ঞাপন দেবে কেন? যখন আমরা টিভিতে কিংবা রেডিওতে বিজ্ঞাপন দেখি বা শুনি, আমরা সচেতন ভাবে না দেখলে অথবা না শুনলেও আমাদের অবচেতন মনে যা দেখানো হচ্ছে অথবা যা শুনছি তা সঞ্চিত হয়ে যায়। আমরা তো আর টিভি/ রেডিওর সঙ্গে তর্ক করতে পারি না।আমরা যখন সিনেমা দেখি আমরা হাসি কিম্বা কাঁদি, তার কারণ চলচ্চিত্র থেকে আমরা যে ভাবাবেগের যোগান পাই, তা তাৎক্ষণিকভাবে এক অন্যধরনের ভাবাবেগ উৎপন্ন করে। যোগানের পরিবর্তন করুন, উৎপাদিত বস্তুরও পরিবর্তন ঘটবে।সচেতন এবং অবচেতন মন (The conscious and subconscious mind) স্মরণ রাখবেন আমাদের সচেতন মনের চিন্তা করার ক্ষমতা আছে। সচেতন মন গ্রহণ বা বর্জন করতে পারে। কিন্তু অবচেতন মন কেবলমাত্র গ্রহণ করে। এবং যা গ্রহণ করে তার ভালো মন্দ নিয়ে বাছ-বিচার করে না। যদি আমরা মনকে সন্দেহ ও ঘৃণা দিয়ে ভরে দিই, তাহলে স্বাভিভাবের ফলে ঐ চিন্তাগুলি বাস্তব বলে মনের মধ্যে গৃহীত হবে। অবচেতন মন কম্পিউটারের ‘ডেট’-এর মতো। কিন্তু আরও বেশি শক্তিশালী। অবচেতন মন মটর গাড়ির এর মতো, সচেতন মন চালকের মতো। চালিকা শক্তি মটরের এর মতই আছে, কিন্তু তার নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা চালকের। অবচেতন মন, আমাদের পক্ষে কিম্বা বিপক্ষে কাজ করে। এই মন যুক্তিবাদী নয়। যখন আমরা অসফল হই, তখন অবচেতন মনে নতুন ভাবে নতুন জিনিস যোগানের প্রয়োজন হয়। অবচেতন মন একটি বাগানের মতো, কী গাছ লাগাচ্ছেন তাতে কিছু যায় আসে না। এই বিষয়ে বাগান’ নিরপেক্ষ, তবে কোন পছন্দ অপছন্দ নেই। যদি ভালো বীজ লাগান, তাহলে ভালো বাগান পাবেন আর তা না হলে বাগান জংলা গাছে ভরে উঠবে। আমি এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বলব যে ভালো বীজ পুঁতলেও আগাছা জন্মাবে। সুতরাং আগাছা উপরে ফেলার চেষ্টা ক্রমাগত করে যেতে হবে। এর সঙ্গে মানুষের মনের কোন তফাৎ নেই। স্বরণ রাখবেন ইতিবাচক ও নেতিবাচক চিন্তা একই সময়ে এবং একই সঙ্গে মনকে অধিকার করতে পারে। বাণিজ্যিক সংস্থাগুলি টেলিভিশনে কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দেখানোর সময় যে বিজ্ঞাপন দেয় সেই সব ৩০ সেকন্ডের বিজ্ঞাপনের জন্য ২০ লক্ষ ডলার পর্যন্ত খরচ করে। আমরা Source As in selling powe” “National Times, March 1996, p.40.

পৃষ্ঠা:১৩৩

অবচেতন মন এবং অভ্যাস:অনেক সময়ে বিজ্ঞপন দেখে ঠান্ডা পানীয় কিম্বা দাঁতের মাজন কিনি। আমরা আসলে দাঁতের মাজন চাই না। বিজ্ঞাপনে যে সংস্থার মাজনের কথা বলেছে তাই চাই। ঐ বিজ্ঞাপন আমাদের অবচেতন মনে যে কাজ করেছে তাতে প্রভাবিত হই। সফল হওয়ার জন্য আমাদের ইতিবাচক ভাবে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।কিভাবে মনকে পূর্বপরিকল্পনায় অত্যন্ত করতে হয়? (How do we get programmed?)স্মরণ করুন কিভাবে আমরা সাইকেল চড়া শিখেছি। এই শেখার বিরাট ধাপ আছে। প্রথম ধাপে সাইকেল চড়ার যোগ্যতা এই বিষয়টিও জানা নেই। অর্থাৎ অজ্ঞতা সম্পর্কেও অসচেতন। বালক যেমন জানে না সাইকেল চড়া জিনিসটা কী, এবং সে চড়তেও পারে না। এই সমস্যারই নাম অজ্ঞতা বিষয়ে অসচেতন।দ্বিতীয় অবস্থাকে বলে সচেতন ভাবে অজ্ঞ। বালকটি একটু বড় হয়ে বুঝতে পারে সাইকেল চড়া বলতে কী বোঝায় কিন্তু এটাও জেনে যায় যে, সে সাইকেল চড়ার পদ্ধতি জানে না। তার অজ্ঞতা সম্পর্কে সচেতন। শিখতে শুরু করার পর তৃতীয় অবস্থা- যাকে বলে সচেতন ভাবে সাইকেল চালনায় সময় তার বিদ্যাকে এতবার প্রয়োগ করেছে যে সাইকেল চালানোর সময় আর তাকে পদ্ধতি সম্পর্কে ভাবতে হবে না। তার কাছে এটা স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির মতো। সাইকেল চালাতে চালাতে সে অন্যের সঙ্গে কথা বলতে পারে কিংবা অন্যের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়তে পারে। এর মানে এই যে সাইকেল চড়ার সে অবচেতন দক্ষতা লাভ করেছে। এই অবস্থায় চিন্তা করে অর্জিত দক্ষতাকে কাজে লাগাবার প্রয়োজন হয় না। এই দক্ষতা স্বয়ংক্রিয় অভ্যাসের মতো হয়ে গিয়েছে। আমাদের সমস্ত ইতিবাচক অবস্থাকে এই পর্যায়ে উন্নীত করতে চাই। কিন্তু দূর্ভাগ্যের বিষয় আমরা কয়েকটি নেতিবাচক অভ্যাসও অবচেতন ভাবে আয়ত্ত করে ফেলি এবং সেগুলিই আমাদের আত্মোন্নতির অন্তরায় হয়। সমীক্ষায় দেখা গেছে যে প্রায় শতকরা ৯০ ভাগ ধুমপায়ী ২১ বৎসর বয়সে ধূমপায়ী হয়ে যায়। যদি কেউ ২১ বৎসর বয়সে ধূমপায়ী না হয় তবে বাকি জীবন ধূমপানে অভ্যন্ত হওয়া কঠিন হবে। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে অবচেতন ভাবে আমরা ধূমপানের অভ্যাস আয়ত্ত করি এবং অল্প বয়সেই অবচেতন ভাবে অভ্যস্ত হওয়া যায়। প্রকৃত শূন্যতা বরদাস্ত করে না (Nature abhors a vacuum) আমার টেনিস পাগল ১২ এবং ১৪ বৎসর বয়সের দুই ভাইপো আছে। একদিন তাদের বাবা অনুযোগ করছিলেন এই বলে যে, ছেলে দু’টির টেনিস খেলার ব্যয় বেশি হচ্ছে। র‍্যাকেট বল, টেনিসকোর্টের ফী ছাড়া ইদানীং একটি কোচ রেখেছে। সব মিলিয়ে বেশ খরচার ব্যাপার। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কিসের সঙ্গে তুলনা করে ব্যয়বহুল বলে মনে হচ্ছে। ছেলে দুটির টেনিস খেলা নিশ্চয়ই বন্ধ করে দেওয়া যায় এবং তাতে কিছু টাকার সাশ্রয়ও হতে পারে। কিন্তু ছেলে দু’টি স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে সারা বিকেলটা তাদের অফুরন্ত প্রাণশক্তি নিয়ে কি করবে?” দাদা কিছুক্ষণ ভাবলেন তারপর বললেন, “আমার মনে হয় ওরা টেনিস খেলা চালিয়ে যাক, এতে বরং আখেরে কম খরচই হবে। “ছেলে দু’টিকে কোনও ইতিবাচক কাজে নিযুক্ত করাই তিনি সঠিক বলে মনে করেছিলেন। তা না হলে ওরা কিছু নেতিবাচক কাজ কর্মের দিকে আকৃষ্ট হোত, কারণ মানুষের প্রকৃতি তাকে নিষ্কর্মা থাকতে

পৃষ্ঠা:১৩৪

দেয় না। হয় কিছু ইতিবাচক করতে হবে কিংবা নেতিবাচক-মাঝামাঝি আর কোনও জায়গা নেই।অভ্যাসের থেকেই চরিত্র গঠন হয়। যদি আমরা একটি মনোরম ব্যাক্তিত্ব গঠন করতে চাই, তাহলে আমাদের অভ্যাসগুলিকে খুব খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করা দরকার। কোনও একটি অভ্যাস সাময়িক বিচ্যুতি হিসাবে শুরু হলেও ধীরে ধীরে তা স্থায়ী বিচ্যুতিতে পরিণত হয়।নিজেকে এই প্রশ্নগুলি করুন-

১. নিজের কাজের মান নিম্নগামী হতে দিচ্ছেন?

২. খোশগল্পে সময় কাটাবার অভ্যাস আছে?

৩. ঈর্ষা ও আত্মম্ভরিতা কি আপনার সর্বক্ষণের সঙ্গী?

৪. আপনার সহমর্মিতা কি কম?এই ভাবে আরও অনেক বলা যেতে পারে। আমরা অভ্যাসের দাস। এটি একদিকে ভালো এই জন্য যে যদি কোনও কাজ করার আগে সর্বদাই চিন্তা করতে থাকি, তাহলে কোনও কাজই করতে পারব না, আমাদের এত সময় নেই। আমরা আমাদের চিন্তাকে সু-শৃঙ্খল করে আমাদের অভ্যাসকে নিয়ন্ত্রণ করি। এই জন্য আমাদের অবচেতন মনের ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রিত করতে হয়। শৈশবে আমাদের অভ্যাসগুলিকে তৈরি করতে হয়, ফলে পূর্ণ বয়সে চরিত্র গঠন সহজ হয়। এই জন্যই প্রথম জীবনে সঠিক অভ্যাস তৈরি করা দরকার, কিন্তু দেরি হলেও সবসময় শুরু করা যায়। ইতিবাচক এবং নেতিবাচক অভ্যাস তৈরির মধ্যে অনেক তফাৎ আছে। নতুন অভ্যাস তৈরি করতে সময় লাগে, কিন্তু ইতিবাচক অভ্যাস তৈরি করলে জীবনে এক নতুন অর্থ বহন করে। আশাবাদী হওয়া কিংবা নিরাশাবাদী হওয়া এক ধরনের অভ্যাস। আমাদের অভ্যাসগুলি কষ্ট এবং আনন্দের ভিত্তিতে তৈরি হয়। আমরা যে কাজ করি তা কষ্ট এড়াবার জন্য এবং আনন্দ পাবার জন্য। যতক্ষণ পর্যন্ত কষ্টের থেকে আনন্দ বেশি, আমরা ঐ কাজের অভ্যাস বহাল রাখি।কিন্তু যদি আমাদের আনন্দের থেকে কষ্ট বেশি হয়, তাহলে তা পরিত্যাগ করি। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, যখন ডাক্তার ধুমপায়ীকে ধুমপান বন্ধ করার কথা বলেন, সে বলে, “আমার অভ্যাস হয়ে গেছে, আমি পারব না। ধূমপান আমার ভালোলাগে” এবং সে ধূমপান চালিয়ে যায় এখানে ধূমপানের আনন্দ কষ্টের থেকে বেশি। তারপর যখন একদিন জটিল সমস্যা দেখা দেয় তখন ডাক্তার বলেন, আপনি যদি বাঁচতে চান তাহলে এখনই ধূমপান বন্ধ করুন।” তখন সে ধুমপান বন্ধ করে। কারণ ধূমপানের ফল, আনন্দ পাওয়ার থেকেও অনেক বেশি গুরুতর। পরিবর্তন প্রতিরোধ করার ইচ্ছা (Resistance to change)মানুষ যখন নেতিবাচক অভ্যাস সম্পর্কে সচেতন হয় তখন সে পরিবর্তনের অভ্যাস করে না কেন? কারণ পরিবর্তনের দায়িত্ব গ্রহণ করতে চায় না।তা ছাড়া ঐ অভ্যাস চালিয়ে যাওয়ার যে আনন্দ সেই অভ্যাস পরিবর্তনের কষ্টের থেকে বেশি। কারণ অভ্যাস না পরিবর্তন করার কারণ হোল-

  • পরিবর্তন করার ইচ্ছা নেই।
  • পরিবর্তনের জন্য যে শঙ্খলার দরকার তা নেই।
  • অভ্যাস পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে সচেতনতার অভাব।

পৃষ্ঠা:১৩৫

অবচেতন মন এবং অভ্যাস:এই সব কারণে অনেক সময় আমরা আমাদের নেতিবাচক অভ্যাস ছাড়তে পারি না। এ বিয়য়ে আমাদের একটি পথ বেছে নিতে হবে। হয় এই নেতিবাচক ব্যবহারকে আমরা অগ্রাহ্য করব এবং আশা করব যে একদিন ফ্রুট আপনা আপনি শুধরে যাবে অথবা সচেতন চেষ্টার দ্বারা এই নেতিবাচক অভ্যাসকে জয় করবে। ব্যবহারের পরিবর্তন অযৌক্তিক ভয়কে জয় করতে পারলেই এবং গতানুগতিকতার স্বাচ্ছন্দ্যকে ত্যাগ করলে ব্যবহারের পরিবর্তন আসে। স্মরণ রাখা দরকার আমরা বুঝে শুনেই ভয় পাই। সুতরাং ভয়কে বুঝে শুনেই ত্যাগ করা যায় এবং বোধ শক্তিকে বাড়িয়ে ভয়কে জয় করা যায়।নেতিবাচক অভ্যাস পরিবর্তন না করার পক্ষে নিম্নলিখিত অজুহাতগুলি হয়ে থাকে।

(১) আমরা সব সময়েই এই ভাবে কাজ করে থাকি।

(২) আমরা কখনও অন্যভাবে করিনা।

(৩) এটি আমার কাজ নয়।

(৪) আমার মনে হয় না ব্যবহার পরিবর্তন করলে কোন তফাৎ হবে।

(৫) এই ভাবে ব্যবহার পরিবর্তনের জন্য আমার সময় নেই। ইতিবাচক অভ্যাস তৈরি করা (Forming positive habits)পরিবর্তনের কোনও সময় সীমা নেই। আমাদের বয়স যাই হোক না কেন এবং যতদিনের অভ্যাস হোক না কেন, আমরা সচেতন ভাবে ব্যবহার পরিবর্তনের পদ্ধতি প্রয়োগ করে তা বদলাতে পারি।অনেক সময়েই শোনা যায়, একটি বয়স্ক কুকুরকেও নতুন কলা-কৌশল শিক্ষা দেওয়া যায়। আমরা তো মানুষ, কুকুর নই। তাছাড়া আমরা কলা-কৌশল দেখাচ্ছি না-আমরা শুধুমাত্র নিজের ক্ষতিকারক ব্যবহারকে পরিবর্তন করে ইতিবাচক ব্যবহার শিখতে চাই।জীবনে সফল ব্যক্তিদের গোপন রহস্য এই যে তারা এমন অভ্যাস তৈরি করে, যাতে অ-সাফল্যের কোন স্থান থাকে না। যারা অ-সফল হয়, তারা অনেক জিনিস করতে চায় না। অনেক সময় সফল ব্যক্তিরাও করতে চায় না; কিন্তু অনেক সময় অভ্যাসের বশে করতে থাকে। যেমন অ-সফল ব্যক্তিরা কঠোর শ্রম, শৃঙ্খলাবোধ, দায়বদ্ধতা পছন্দ করে না। সফল ব্যক্তিরাও পছন্দ করে না। কিন্তু যেহেতু তাদের অভ্যাস তৈরি হয়েছে, সেগুলি তারা স্বাভাবিক ভাবেই করে থাকে। অভ্যাস তৈরি খুব সামান্য ভাবে শুরু হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই অভ্যাস ত্যাগ কর। মুশকিল হয়।আমদের দৃষ্টিভঙ্গিও এক ধরনের অভ্যাস এবং তারও পরিবর্তন করা যায়। এখানে বিষয়টি হচ্ছে যে পুরাতন নেতিবাচক অভ্যাসকে নতুন ইতিবাচক অভ্যাসের দ্বারা পরিবর্তিত করা যায়।বদ অভ্যাসকে জয় করার থেকে বদঅভ্যাস তৈরি করা আপেক্ষাকৃত সহজ। প্রলোভন জয় করার থেকে সৎ অভ্যাস শুরু হয়। সুখী হওয়া এবং অসুখী হওয়া এগুলিও মানসিক অভ্যাস।কাজের উৎকর্ষ হচ্ছে ক্রমাগত সচেতন প্রচেষ্টার ফল এবং শেস পর্যন্ত এটি অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায়। এটিকে অভ্যাসে পরিণত করতে হলে যথেষ্ট অনুশীলনের প্রয়োজন। আামাদের প্রত্যেকেরই কিছু নেতিবাচক অভ্যাস আছে, যা আমাদের অধঃপাতের দিকে নিয়ে যায়।

পৃষ্ঠা ১৩৬ থেকে ১৫০

পৃষ্ঠা:১৩৬

১৫ মিনিট সময় নিয়ে-একা একা শান্তচিত্তে, যে সমস্ত নেতিবাচক অভ্যাস আপনাকে অধঃপাতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তার একটি তালিকা তৈরি করুন।

পৃষ্ঠা:১৩৭

আরও ১৫ মিনিট সময় নিয়ে একা শান্তচিত্তে আপনি যে সমস্ত ইতিবাচক অভ্যাস তৈরি করতে চান, তারও একটি তালিকা তৈরি করুন।

পৃষ্ঠা:১৩৮

ভূমিও জিতবে:২১ দিনের মধ্যে ইতিবাচক অভ্যাস তৈরি (21-Day formula to form positive habits) স্বাভিভাব (Auto suggestion) স্বাভিভাব কী? অর্থ কী? অর্থ আপনি যা হতে চান তার একটি রূপরেখা। স্বাক্তিভাবের অর্থ আপনার নিজের সম্পর্কে একটি বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের মত, যা কেবল আপনিই দেখবেন। এটি আপনার সচেতন ও অবচেতন মনকে প্রভাবিত করবে, ফলে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি ও ব্যবহারের ওপরেও প্রভাব পড়বে। স্বাভিভাব আপনার অবচেতন মনে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরির একটি পদ্ধতি। এই পরিকল্পনা কখনও নেতিবাচক অথবা ইতিবাচক হতে পারে। নেতিবাচকের স্বাভিভাবেরকয়েকটি উদাহারণ-

  • আমি ক্লান্ত।
  • আমি খেলোয়াড় নই।
  • আমার স্মৃতি শক্তি দুর্বল।
  • আমি অঙ্কে কাঁচা। যখন আমরা এই রকম নেতিবাচক স্বাভিভাব গুলিকে নাড়া-চাড়া করি, তখন অবচেতন মনে এই বিশ্বাস তৈরি হয়ে যায়। এটি ভবিষ্যৎবাণীর মত আমাদের ব্যবহারকে প্রভাবিত করে। যেমন-কারো সঙ্গে কথা বলার সময়, তাকে যে কথা বলার ছিল, তা ভুলে গিয়ে আমি অন্য লোককে বলি, “দেখুন আমি যা করতে চেয়েছি, তা ভুলে গিয়েছি, আমার স্মৃতি শক্তি দুর্বল।”। মানুষ যখন প্রথম অপরাধ ঘটতে দেখে তখন তার মনে একটা ঘৃণার উদ্রেক হয়। যদি ক্রমাগত এই রকম অপরাধ দেখতে থাকে তাহলে ঘৃণ্য ধীরে ধীরে অপসারিত হয়ে এই অপরাধে অভ্যাস হয়ে যায় এবং শেষপর্যন্ত হয়তো অপরাধীও হয়ে যায়। এইভাবে নিজের দুর্ভাগ্য নিজেই তৈরি করে। যখন কোন ব্যক্তি অনেকদিন ধরে একটি বিশ্বাস মনের মধ্যে লালন পালন করে, সেই বিশ্বাস ধীরে ধীরে তার কাছে সত্য বলে প্রতিভাত হয়। একটি মিথ্যার ক্রমাগত পুনরাবৃত্তি অনেকদিন ধরে করলে তা সত্য বলে গৃহীত হয়। ইতিবাচক স্বাভিভাব ক্রীড়াএবং চিকিৎসার ক্ষেত্রে বহু ব্যবহৃিত। এই দুই ক্ষেত্রে ইতিবাচক আশ্বাস দেওয়া হয় কেন? কারণ আমরা আমাদের মনে এমন একটি বিশ্বাস তৈরি করতে চাই, যা আমাদের আসার সঙ্গে সঙ্গতি রাখে। আমরা সব সময়েই আশা করি য়ে এই বিশ্বাসটি সত্যে পরিণত হবে। স্বাভিভাব এক ধরনের পুনরাবৃত্তিও বটে। কোন ব্যক্তি যদি নিজের সম্পর্কে বার বার পুনরাবৃত্তি করে, তবে তা অবচেতন মনে গেথে যায়। স্বাভিভার কখনো নেতিবাচক ভাবে অভ্যাস করা উচিত নয়। আমি উত্তেজিত নই, কিংবা আমি ক্রুদ্ধ নই। এরকম মনোভাবে বিশেষ লাভ হয় না। ইতিবাচক ধারনাই অবচেতন মনে প্রভাব ফেলে, কারন ইতিবাচক ধারনা একটি বিশেষ ছবি তৈরি করে। যখন বলি নীল হাতির সম্পর্কে চিন্তা করতে তখন মনে যে চিন্তা আসে নীল হাতির। মায়ের কথা যখন মনে করি তখন মনে মা-এর ছবি ফুটে ওঠে। সেই সময় কেউ অন্য চিন্তা করে না। স্বাভিভাবের মধ্যে। যদি একটি নেতিবাচক শব্দে আসে তাহলে মনের মধ্যে একটি

পৃষ্ঠা:১৩৯

অবচেতন মন এবং অভ্যাস:নেতিবাচক চিত্র তৈরি হয়, আমরা তা এড়িয়ে যেতে চাই।আমরা বর্তমানের পরিপ্রেক্ষিতে চিন্তা করি কেন? তার কারণ আমাদের মন একটি প্রকৃত অভিজ্ঞতা এবং কল্পিত অবস্থার মধ্যে তফাৎ সহজে বুঝতে পারে না। যেমন ধরুন ১ টার সময় ছেলে ফিরবে বলে বাবা-মা অপেক্ষা করছে, রাত ১ টা বেজে গেল কিন্তু ছেলে ফিরলো না তখন তাদের মনের অবস্থা কিরূপ হবে? তারা স্বভাবতই আশা করবেন সব ঠিক আছে, কিন্তু ছেলে কোনও দুর্ঘটনায় পড়েনি। এদিকে কিন্তু উৎকণ্ঠায় তাদের রক্ত-চাপ বেড়ে যাচ্ছে। এটি তাদের অভিজ্ঞতা, কারণ- বাস্তব তারা জানেন না। বাস্তবে হয়তো দেখা যাবে যে ছেলেটি একটি পার্টিতে মজা করছে এবং দায়িত্ব-জ্ঞানহীন ভাবে বাড়ি আসার সময় ভুলে গেছে।অবস্থাটিকে উল্টে দিন, ধরুন ছেলেটি বাড়ি ফিরছিল এবং এক দুর্ঘটনায় পড়ে ১টা পর্যন্ত বাড়ি এলো না। এতেও উৎকণ্ঠায় বাবা-মায়ের রক্ত চাপ বেড়ে যাবে।প্রথম অবস্থায় ছিল একটি কল্পিত অভিজ্ঞতা। দ্বিতীয়টি সত্য।দুই ক্ষেত্রেইবাবা-মায়ের শারীরিক প্রতিক্রিয়া একই রকম। আমাদের মন একটি প্রকৃত এবং কল্পিত অভিজ্ঞতার তফাৎ বুঝতে পারে না।অবেচেতন মনকে তৈরি করুন (Prepare the subsconcious)কিভাবে ইতিবাচক অভ্যাস তৈরি করার জন্য এবং নেতিবাচক অভ্যাস ত্যাগ করার জন্য স্বাভাবিক ব্যবহার করা যায়। আমরা সকলেই অচেতন ভাবে স্বাভিভাবকে ব্যবহার করি। উদাহরণ দিয়ে বলা যায়-যখন খুব ভোরের এরোপ্লেন ধরতে হয়, তখন নিজেই বলি যে খুব ভোরে উঠতে হবে এবং সব সময়েই এমনকি অ্যালাম্ ঘড়ি ছাড়াই ভোরে উঠে পড়ি। আমাদের অবচেতন মনের প্রস্তুতি এইভাবে আমাদের তৈরি করে দেয়। স্বাভিভাব মনকে পরিকল্পনা মাফিক তৈরি করে এবং সেই পরিকল্পনাকে কাজে পরিণত করার জন্য নিজেকে তৈরি করে। একটি ইতিবাচক বক্তব্যকে বার বার পুনরাবৃত্তি করে আমাদের অবচেতন মনকে প্রস্তুত করার এবং তাকে বাস্তবে রুপায়িত করার নামই স্বাভিভাব।পুনারাবৃত্তি -একটি বক্তব্য বা চিন্তাকে কেবল পুনরাবৃত্তি করলে চলবে না, সেটিকে আবেগও অনুভূতির সঙ্গে চিন্তা করতে হবে, তবেই সম্ভব হবে বাস্তবে রুপায়ণ। দুরদৃষ্টি ছাড়া স্বাভাবিক ফলপ্রসূ হবে না। প্রথম যখন আমাদের মনে স্বাভিভাবের উদয় হয়, তখন আমরা এটিকে পরিত্যাগ করি। কারণ এটি তখন আমাদের বিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।সাফল্য নির্ভর করবে আমাদের মনঃসংযোগ ক্ষমতা এবং পরিকল্পনার পুনরাবৃত্তির উপর। স্বাভিভাব অনুসরণ করার পদ্ধতিঃ

(১) এমন একটি জায়গায় যান যেখানে কেউ বিরক্ত করবে না।

(২) নিজের পরিকল্পনা লিখে ফেলুন।

(৩) যা শুরু করেছেন, তা শেষ করার জন্য আত্ম-শৃঙ্খলার প্রয়োজন। স্বাভিভাব চরিত্র গঠনে একটি ক্ষমতাশীল যন্ত্র।স্বাভিভাবকে বাস্তবে রূপায়ণ (Translating auto-suggestion into reality)

১. বর্তমানের জন্য আপনার স্বাভিভাবের একটি তালিকা তৈরী করুন।

২. দিনে অন্তত ২ বার স্বাভিভাব গুলিকে উচ্চারণ করুন। প্রথমে সকালবেলায় তারপর দিনের শেষে। সকালে মন থাকে সজীব এবং গ্রহণ তুমিও জিতবে-১০ উন্মুখ। রাত্রে আপনার ইতিবাচক চিত্রটিকে অবচেতন মনের গভীরে জমা করে দিন।

পৃষ্ঠা:১৪০

৩. ২১ দিন এই ভাবে পুনরুচ্চারণ করুন যতক্ষণ পর্যন্ত তা অভ্যাসে পরিণত না হয়।

৪. শুধু স্বাভিভাবে কাজ হবে না দরকার দূরদৃষ্টির।দূরদৃষ্টি (Visualization)এর অর্থ আপনি যা পেতে চান। যা করতে চান এবং যে রকম মানুষ হতে চান, তার একটি মানসিক চিত্র তৈরি করা। দূরদৃষ্টি স্বাভিভাবের সঙ্গে হাত ধরে চলে। দূরদৃষ্টি ব্যতিত স্বাভিভাব একটি যান্ত্রিক পুনরাবৃত্তি মাত্র। তা কখনও কার্যকরী হবে না।ফলপেতে হলে সব-সময়েই আবেগ ও অনুভূতিকে স্বাক্তিভাবের সঙ্গে একাত্ব করে রাখতে হয়।একটি সর্তক বাণীঃস্বাভিভাব হয়ত মনের কাছে গ্রহণযোগ্য হবেনা-এবং প্রথমে এটিকে অন্য ধরনের চিন্তা বলে মনে হবে।উদাহরণ দিয়ে বলি, বিগত কয়েক দশক ধরে আমি বিশ্বাস করেছি যে আমার স্মৃতি শক্তি দুর্বল। কিন্তু এখন হঠাৎ আমি নিজেকে বললাম, “আমার স্মৃতিশক্তি খুব ভালো”। আমার মন এটি গ্রহণ করল না- বললো “তুমি মিত্যুক, তোমার স্মৃতি-শক্তি খারাপ” কারণ এতদিন ধরে মন বিশ্বাস করেছে যে, আমার স্মৃতি-শক্তি দুর্বল। এই ধারণা দূর করতে ২১ দিন সময় লাগবে। ২১দিন কেন? কারণ অন্ততপক্ষে ২১ দিন সচেতন এবং বার বার অনুশীলনে একটি অভ্যাস তৈরী হয়।সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ২১ দিনের সচেতন চেষ্টার কি এমনই গুরুত্বপূর্ণ অবদান, যা দিয়ে জীবনকে সুপথে পরিচালিত করা যায়? ব্যাপারটি খুব সরল মনে হলেও সহজ নয়। আমি খুব আশ্চার্য হব না, যদি কেবল মুষ্টিমেয় কিছু লোক এই কর্মসূচী মেনে চলে।

কাজের পরিকল্পনা:১. স্বাভিভাবের একটি তালিকা তৈরি করুন। ২. ২১ দিনের কার্যক্রম-দূরদৃষ্টির সঙ্গে পুনরাবৃত্তি করুন।

পৃষ্ঠা:১৪১

অধ্যায় :৭

লক্ষ্য নির্ধারণ করা:লক্ষ্য নির্ধারণ করে লক্ষ্যে পৌঁছানো কি?জ্ঞান আপনার লক্ষ্যে পৌঁছতে সাহায্য করে, সেই জন্যই আপনার জানা দরকার; লক্ষ্য প্রাচীন কালে একজন ভারতীয় ঋষি তার শিষ্যদের ধনুর্বিদ্যা শেখাচ্ছিলেন: একটি কাঠের পাখি গাছে রেখে ছাত্রদের বললেন-“পাখিটির চোখে লক্ষ্য স্থির করো”। তারপর প্রথম শিষ্যকে সে কী দেখছে তা বর্ণনা করতে বললেন। শিষ্য বলল, “আমি দেখছি গাছ, গাছের ডাল-পালা, আকাশ পাখি এবং তার চোখ”। ঋষি তাকে অপেক্ষা করতে বললেন। তারপর দ্বিতীয় শিষ্যকে একই প্রশ্ন করতে সে বলল, “আমি কেবল পাখির চোখ দেখছি”। ঋষি বললেন, “খুব ভালো, তাহলে চক্ষু বিদ্ধ করো।” তীর সোজা গিয়ে পাখিটির চোখ বিদ্ধ করলো। এই গল্পটির নীতি শিক্ষা কী? আমরা যথাযথ ভাবে লক্ষ্য স্থির করে-দৃষ্টি নিবন্ধ না করলে সিদ্ধি লাভ করতে পারি না। লক্ষ্য স্থির করে মনঃসংযোগ করা কঠিন; কিন্তু এই দক্ষতা আমরা অনুশীলনের দ্বারা অর্জন করতে পারি। জীবনের পথে অগ্রসর হতে হলে লক্ষ্যে দৃষ্টি নিবন্ধ রাখুন। সু-অভ্যাসের ওপর লক্ষ্য রাখুন, বদ-অভ্যাসর ওপর নয়। লক্ষ্যের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করুন (Krep von eyes upon the goal) ১৯৫২ সালে ৪ঠা জুলাই ফ্লোরেন্স ন্যাডউইকথা মহিলা সাঁতারু হিসাবে ক্যাটেলিনা প্রণালী পার হতে যাচ্ছিলেন। তার আগে তিনি ইংলিশ চ্যানেল জয় করে ছিলেন। সারা বিশ্বের দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল তার দিকে। চ্যাডউইক ঘর কুয়াশা, হাড় কাঁপানো ঠান্ডা এবং অনেক সময় হাওরের উৎপাতের সঙ্গে লড়াই করলেন। তীরে পৌছাবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করলেন। কিন্তু চোখের জলচশমার মধ্য দিয়ে যখনই দেখছেন, তখনই সামনে দেখছিলেন ঘন কুয়াশা। তীর দেখতে না পেয়ে, তিনি তার চেষ্টায় নিবৃত্ত হন। চ্যাডউইক খুবই হতাশাগ্রস্ত হলেন, যখন দেখলেন তিনি তীর থেকে মাত্র আধমাইল দূরত্বে ছিলেন। তার লক্ষ্য দৃশ্যমান ছিলনা বলে তাকে নিবৃত্ত হতে হয়েছিল। অন্য বাধা বিপত্তি তাকে নিবৃত্ত করতে পারেনি। তিনি বললেন, “আমি কোন অজুহাত দেখাচ্ছি না। যদি আমি তীর দেখতে পেতাম, ডাঙা দেখতে পেতাম, আমি নিশ্চয় সাফল্য পেতাম।” দু’মাস পরে তিনি ক্যাটেলিনা চ্যানেল সাঁতরে পার হলেন। খারাপ আবহাওয়া সত্ত্বেও তার লক্ষ্যে তিনি অবিচলিত ছিলেন। এবারে তিনি শুধু সফলই হলেন না, পুরুষ সাঁতারুদের সময়ের যে রেকর্ড ছিল, তার থেকে ২ ঘন্টা কম সময়ে তার সাঁতার শেষ করলেন। লক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ কেন? (Why are goals important?) অত্যন্ত সূর্যকরোজ্জ্বল দিনেও খুব শক্তিশালী আতস কাঁচ কাগজে আগুন জ্বালাতে পারবে , যদি কাঁচটি সব সময়ে নাড়ানো হয়। না কিন্তু যদি লক্ষ্যস্থির করে আতস কাঁচটিকে এক জায়গায় ধরে রাখা হয়, তাহলে কাগজে

পৃষ্ঠা:১৪২

আগুন জ্বলে উঠবে। মনঃসংযোগের এই রকম ক্ষমতা।একজন লোক পথে যেতে যেতে রাস্তার একটি সংযোগ স্থলে দাঁড়িয়ে পড়ল, একজন বয়স্ক ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করল, “এই রাস্তা কোন দিকে গেছে?” ভদ্রলোক জানতে চাইলেন, “আপনি কোন দিকে যেতে চান?’ লোকটি বলল, “আমি জানি না।”বয়স্ক ভদ্রলোক বললেন, “তাহলে যে কোন রাস্তাতেই যান, কারণ তাতে কিছু কি তফাৎ হবে? খুব সত্যি কথা। যখন আমরা জানি না কোনদিকে যাচ্ছি, তখন যে কোন রাস্তাতেই যাওয়া যায়।ধরুন ১১ জনের এক ফুটবল দল উৎসাহে উদ্বগ করে ফুটতে ফুটতে উত্তেজনায় টান- টান হয়ে খেলতে নেমে দেখলো যে কেউ গোল-পোষ্ট তুলে নিয়ে গেছে। এখন খেলা হবে কী করে? কিভাবে গোল করা হবে? হারা-জেতা কিভাবে নির্ধারণ করা যাবে? নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে পরিচিালিত না হলে উৎসাহ, বনে আগুন লাগার মত ইতস্তত ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত মানুষকে হতাশাগ্রস্ত কের। লক্ষ্য জীবনকে নির্দিষ্ট পথের নিশানা দেয়।আপনি কি কোনও রেলগাড়িতে বা এরোপ্লেনে কোথায় যাচ্ছেন না জেনে উঠে পড়বেন। নিশ্চিত উত্তর হচ্ছে “না”। তাহলে লোকে নিদিষ্ট সক্ষ্য ছাড়াই, কেন জীবনের পথে অগ্যসর হয়?(Dreams)লোকে আকাঙ্ক্ষা এবং স্বপ্নকে লক্ষ্যের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে। স্বপ্ন এবং আকারুকা ইচ্ছার থেকে কিছু বেশি নয়। ইচ্ছা দুর্বল। ইচ্ছাকে দৃঢ় করতে হলে প্রয়োজন হচ্ছে-

  • ১-নির্দিষ্ট পথ
  • ২-আত্মনিয়োগ
  • ৪-শৃঙ্খলা বোধ ৫-মরণপণ।এইগুলির দ্বারাই আকাঙ্ক্ষা এবং লক্ষ্য এই দুই এর তফাৎ বোঝা যায়। লক্ষ্য হচ্ছে স্বপ্নকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এবং একটি কর্ম পরিকল্পনার মাধ্যমে বাস্তবায়িত করা।লক্ষ্য কখনও সার্থক কখনও অ-সার্থক হতে পারে। লক্ষ্য অস্পষ্ট ইচ্ছা মাত্র নয়, এটি গভীর আকাঙ্ক্ষা যা স্বপ্নকে সত্যে রূপায়িত করে।স্বপ্ন কে বাস্তবে রূপায়িত কারার পথঃএকটি সুস্পষ্ট লিখিত লক্ষ্য থাকবে। এই লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার জন্য একটি পরিকল্পনা থাকবে। দিনে ২ বার এই দু’টি জিনিস পাঠ করবেন।বেশি সংখ্যায় মানুষ লক্ষ্যস্থির করে না কেন? (Why don’t more peopleset goals?)এর অনেক কারণ আছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হোলঃ-

(১) একটি নিরাশাবাদী মনোভাব; অনেকে সাফল্যের সম্ভাবনার থেকে বাধা-বিপত্তির আশঙ্কা বেশি করেন।

(২) ব্যর্থতার ভয়ঃ যদি সফল না হই, তাহলে কিহবে? অবচেতন মনে এই চিন্তা সর্বদা পোষণ করনে যে, তাদের নির্দিষ্ট লক্ষ্য না থাকলে কিংবা উদ্দেশ্য সাধিত না হলে কেউ তাদের অসফল বলবে না। কিন্তু এই চিন্তার ফলেই তারা প্রথম থেকেই তো অসফল হয়ে থাকে।

পৃষ্ঠা:১৪৩

লক্ষ্য নির্ধারণ করা:(৩) উচ্চাকাক্কার অভাবঃ এটা আমাদের মূল্যবোধের পরিণতি এবং পরিপূর্ণ জীবন যাপনের ইচ্ছার অভাব।আমাদের সীমাবদ্ধ চিন্তা আমাদের অগ্রগতিকে ব্যাহত করে। একজন জেলে বড় মাছ ধরলেই নদীতে ছেড়ে দিত। ছোট মাছগুলি রাখত। এই রকম অস্বাভাবিক ব্যবহার লক্ষ্য করে এক ব্যক্তি জেলেকে কারণ জিজ্ঞসা করল। জেলে জবাব দিল-“আমার মাছ ভাজার কড়াইটি ছোট।” অনেক মানুষই তাদের জীবনে ছোট মাছ ধরার কড়াই নিয়ে মাছ ধরতে। বেরিয়েছে। একেই বলে চিন্তার সীমাবদ্ধতা।(৪) প্রত্যাখ্যানের ক্রয়: যদি আমি সফল না হই, তাহলে অন্য লোকে কী বলবে?(৫) দীর্ঘসূত্রতাঃ “একদিন আমি আমার লক্ষ্য স্থির করবো”-এই রকম চিন্তা উচ্চাশার অভাই সূচিত করে।(৬) নিম্ন মানের আত্মবিশ্বাসঃ কোনও ব্যক্তি অন্তর থেকে চালিত না হলে এবং অনুপ্রেরণা না পেলে তার নিজের প্রতি বিশ্বাস এবং শ্রদ্ধা জন্মায় না।(৭) লক্ষ্যের গুরুত্ব অনুধাবন করার অক্ষমতাঃ কেউ তাদের হাতে ধরে শিখিয়ে দেয়নি, এবং তারাও লক্ষ্য স্থির করা সম্পর্কে শিক্ষা গ্রহণ করেনি। (৮) লক্ষ্য স্থির করার বিষয়ে জ্ঞানের অভাব: অনেকেই অনেকেই লক্ষ্য স্থির করার পদ্ধতি সম্পর্কে জানে না। তাদের জন্য ধাপে ধাপে একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করতে সাহায্য করবে এই রকম এক নির্দেশকের প্রয়োজন।লক্ষ্য স্থির করা হচ্ছে, একের পর এক, কয়েকটি পদ্ধতির সমষ্টি। এরোপ্লেনের-এর টিকিট কিনলে তাতে কী নিদের্শ দেওয়া থাকে?

  • যাত্রা শুরুর স্থান
  • গন্তব্য স্থান
  • ভ্রমণের শ্রেণী বিভাগ
  • টিকিটের মূল্য
  • যাত্রার দিন
  • মেয়াদ ফুরাবার তারিখ যদি আপনি জিজ্ঞাসা করেন যে জীবনের প্রধান লক্ষ্য কী? তাহলে অনেক ব্যক্তি সম্ভবত অস্পষ্ট জবাব দেবে; যেমন, “আমি সফল হতে চাই, সুখী হতে চাই এবং সচ্ছল জীবন যাত্রা চাই” এবং এই রকম কিছু।এগুলি ইচ্ছা মাত্র, কোনটিই নির্দিষ্ট লক্ষ্য নয়। লক্ষ্যের নিম্নলিখিত গুণগুলি থাকবেঃ-

(১) সুনির্দিষ্ট: যেমন ধরুন, আমার লক্ষ্য হচ্ছে, আমি ওজন কমাবো, কিন্তু এটি একটি ইচ্ছা মাত্র। এটি লক্ষ্য হয়ে উঠবে যখন আমি সুনির্দিষ্ট ভাবে ঠিক করবো যে আমি ১০ দিনে ১০ পাউন্ড কমাবো, না পারলে খাওয়া ছেড়ে দেবো।

(২) লক্ষ্য হবে পরিমাপযোগ্যঃ যদি আমরা পরিমাপ করতে না পারি, তাহলে সেই লক্ষ্য সাধন করতেও পারব না। পরিমাপ করার অর্থ হচ্ছে, লক্ষ্যের পথে অগ্রগতিকে বিচার করে দেখা।

(৩) লক্ষ্য অবশ্যই সাধনযোগ্য হবেঃ এর অর্থ এই যে লক্ষ্য এমন হবে যে, তা লাভ করার জন্য কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হতে হলেও সমস্ত বিপত্তি অতিক্রম করেও তা লাভ করা সম্ভব। লক্ষ্য সামর্থ্যের বাইরে হলে তা হবে নিরাশাব্যঞ্চক। (৪) বাস্তবানুগঃ যে ব্যক্তি ৩০ দিনে ৫০ পাউন্ড ক্ষতি স্বীকার করতে চায়, তাকে বলা

পৃষ্ঠা:১৪৪

হয় অবাস্তববাদী।

(৫) সময়সীমাঃ- প্রত্যেক লক্ষ্যেরই একটি শুরুর তারিখ থাকবে এবং একটি সমাপ্তির তারিখ থাকবে। লক্ষ্য হবে:

১। স্বল্প মেয়াদী-১ বৎসরের মধ্যে লক্ষ্য সিদ্ধ হবে।

২। মধ্য মেয়াদী-৩ বৎসরের মধ্যে সিদ্ধ হবে।

৩। দীর্ঘ মেয়াদী-৫ বৎসরের মধ্যে সিদ্ধ হবে।

৫ বৎসরের থেকেও বেশি সময় লাগতে পারে লক্ষ্য লাভের জন্য। কিন্তু তা হয়ে দাঁড়ায় জীবনের উদ্দেশ্য। জীবনের উদ্দেশ্য খুব গুরুত্বপূর্ণ কারণ তা না থাকলে আমরা দূরদৃষ্টি সম্পন্ন হতে পারি না; কেবল মাত্র লক্ষ্য সিদ্ধির জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ি। যদি আমাদের লক্ষ্যগুলি খন্ড খন্ড করে ফেলি তবে সহজেই সেইগুলি সিদ্ধ করা যায়। জীবন দীর্ঘ হলে দুঃসাধ্য হয়, কিন্তু যদি জীবন যাপনকে ছোট ছোট প্রয়াসের মধ্যে ভাগ করে নিই তবেই তো সহজ হয়ে ওঠে। লক্ষ্যের ভারসাম্য থাকা উচিত (Goals must be balanced)আমাদের জীবন ৬টি তার বিশিষ্ট একটি চাকার মতন। এই তারগুলি জীবনের ভারসাম্য রক্ষা করে।

১। পারিবার: আমাদের ভালো লাগার মানুষগুলির জন্যই আমরা জীবন জীবনযাপন ও জীবিকা অর্জন করি।

২। অর্থিকঃ আমাদের জীবন ধারণের জন্য যে অর্থের প্রয়োজন হয়, জীবিকা তা সরবরাহ করে।

৩। শারীরিকঃ স্বাস্থ্য ব্যতীত অন্য সমস্ত অর্থহীন হয়ে যায়।

৪। মানসিক: জ্ঞানও প্রজ্ঞা মানসিক দিক থেকে বাঁচার উপাদান জোগায়।

৫। সামাজিক। প্রত্যেক মানুষ এবং সংস্থার সামাজিক দায়িত্ব আছে। সেই দায়িত্ব পালন না করলে সমাজ মুমূর্ষ হয়ে ওঠে।

৬। আত্মিক: আমাদের মূল্যবোধের চেতনার ওপর নির্ভর করে আমাদের নীতিবোধ ও চরিত্র।এই তারগুলির যদি একটিও যথাস্থানে না থাকে, তাহলে জীবনের ভারসাম্য নষ্ট হয়। কয়েক মিনিট সময় নিয়ে চিন্তা করে দেখুন, এই ৬টির মধ্যে ১টি না থাকে, তাহলেজীবন কিরকম হবে?

ভারসাম্য :১৯২৩ সালে পৃথিবীর সমচেয়ে সম্পদশালী এমন ৮ জন ব্যক্তি মিলিত হয়েছিলেন, যাদের সম্মিলিত সম্পদ ছিল সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের সম্পদের থেকে বেশি। এই ব্যক্তিরা কী করে সম্পদ সংগ্রহ করতে হয় এবং জীবনযাপন করতে হয়, সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত ছিলেন। ২৫ বৎসর পরে তাদের কী অবস্থা হোল সেটি একবার দেখা যাক-

১. চার্লয় স্ক্যায়াব (Charles Schwab) ছিলেন বৃহত্তম ইস্পাত কারখানার সভাপতি। তিনি জীবনের শেষ ৫ বৎসর ঋণ করে ব্যবসা চালিয়েছিলেন, তারপর দেউলিয়া হয়ে মারা যান।

২. হাওয়ার্ড হাবসন্ (Howard Hubson) ছিলেন সবচেয়ে বড় গ্যাস কোম্পানীর সভাপতি। তিনি পাগল হয়ে গিয়েছিলেন।

পৃষ্ঠা:১৪৫

লক্ষ্য নিবারণ করা:৩. আর্থার কাট্রন (Arthur Cutton) সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ীদের একজন ছিলেন, ইনিওদেউলিয়া হয়ে মারা যান। ৪. রিচার্ড দুইটনী (Rechard Whitney) ছিলেন নিউইয়র্ক ষ্টক এক্সচেঞ্চের সভাপতি, তাকে জেলে পাঠানো হয়েছিল।৫. প্রেসিডেন্টের মন্ত্রীসভার একজন সদস্য, এ্যালবার্ট ফল (Albert Fall) জেলে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাকে ক্ষমা করার পর, নিজের বাড়িতে গিয়ে শাস্তি পেয়ে মৃত্যু বরণ করেন। ৬. জেসি, লিভার মোর (Jessi Livermore) ছিলেন ওয়াল স্ত্রীটের সবচেয়ে বড় ফাটকাবাজ, যিনি আশ্চর্যরকম কমদামে কেনা অনেক শেয়ার বাজারে বিক্রি করতেন। তিনি আত্মহত্যা করেন। ৭. পৃথিবীর সবচেয়ে বড় একচেটিয়া ব্যবসার সভাপতি আইভার ক্রুপার(Ivar Krueger) আত্মহত্যা করে।

৮. ইন্টারন্যাশনেল সেটলমেন্ট ব্যাঙ্কের (International Settlement Bankyএর প্রেসিডেন্ট লিয় ফ্রেজার ও (Lcon Fraser) আত্মহত্যা করেছিলেন। এরা সবাই ধনবান, কিন্তু এরা ভুলে গিয়েছিলেন কিভাবে জীবন যাপন করতে হয়। এই উদাহরণগুলি থেকে পাঠকদের ভুল ধারণা জন্মাবে যে অর্থই অনর্থের মূল। এই ধারণা সত্য নয়। অর্থ ক্ষুধার্তকে অন্ন জোগায়, অসুস্থকে ওষুধ জোগায়, দুঃস্থকে বস্ত্র জোগায়। অর্থের দ্বারাই এই সবকিছু ক্রয় করা যায়। আমাদের দু’রকমের শিক্ষার প্রয়োজন। আমাদের শিখতে হবে কী করে জীবিকা অর্জন করতে হয় এবং সেইসঙ্গে কিভাবে জীবনযাপন করতে হয়। অনেকেই তাদের জীবিকাতে এমনভাবে মশগুল হয়ে যায় যে তাদের পরিবারের প্রতি মনোযোগ দেয় না। নিজের স্বাস্থ্য ও সামাজিক দায় দায়িত্বের প্রতিও উদাসীন হয়ে পড়ে। জিজ্ঞাসা করলে তারা বলেন যে তার পরিবারের অন্নসংস্থানের জন্যই অন্যান্য বিষয়ে উদাসীন হয়েছেন। কিন্তু এই উদাসীনতা জীবনের পক্ষে ক্ষতিকর। শ্রীবিকার তাড়নায় আমরা যখন বাড়ি থেকে কাজের জায়গায় যাই, বাচ্চারা তখন ঘুমায়, আবার যখন আমরা বাড়ি ফিরি তখনও ওরা শুয়ে পড়ে। ২০ বৎসর এই রকম চলার পর, যখন আমরা ফিরে তাকাই তখন আর আমাদের পরিবারকে খুঁজে পাই না-এই অবস্থা মর্মান্তিক। পরিমাণ নয়, গুণগত মান (Qyality not quantitY)অনেকে বলেন পরিবারের সঙ্গে কতটা পরিমাণ সময় কাটাচ্ছি, তার থেকে অল্প সময়ের মধ্যেই কিভাবে পরিবারকে সাহায্য করছি, সেটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভালো করে ভেবেদেখুন এই ধারণা প্রকৃত সত্য কিনা।ধরুন আপনি শহরের সবচেয়ে ভালো একটি রেস্তরাঁতে গিয়েছেন। সেখানে ইংল্যান্ড থেকে আনা কাঁটা-চামচ, ফ্রান্স থেকে আনা কাপ-ডিস্ সুইজারল্যান্ড থেকে আনা চকোলেট দিয়ে টেবিল সাজিয়ে আপনাকে আপ্যায়ন করলো। আপনি সোনার পাতের ওপর খোদাই করা খাদ্যতালিকা নিয়ে ১ প্লেট বারবিকিউ চিকেন দেওয়ার আদেশ দিলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরিচারক খুব সুদ্ধাদুভাবে তৈরি মুরগীর একটি ছোট অংশ আপনার জন্য নিয়ে এলো। সেটি খাওয়ার পর আপনি জিজ্ঞাসা করলেন, “এইটুকু মাত্র, আর কিছু। নেই?” পরিচারক জবাব দিল, “পরিমান নয়, গুণগত মানই এখানে বিবেচ্য।” আপনাকে বলতেই হল যে,

পৃষ্ঠা:১৪৬

আপনার তখনও ক্ষুধা মেটেনি, কিন্তু পরিচারক আপনাকে একই জবাব দিল।আশা করি ব্যক্তব্যটি পরিষ্কার করে বোঝানো গিয়েছে অর্থাৎ গুণগত মানেই সব চাহিদা মিটে যায় না। গুণগত মানও যেমন প্রয়োজন, তেমনি পরিমানও প্রয়োজন। আমাদের পরিবারের জন্য দুইয়েরই প্রয়োজন আছে।স্বাস্থ্য (Health)অর্থ উপার্জন করতে গিয়ে আমরা স্বাস্থ্য নষ্ট করি এবং পরে স্বাস্থ্য উদ্ধার করতে গিয়ে অর্থ নষ্ট করি।সামাজিক দায়িত্ব (Social responsibility)অর্থ উপার্জন করতে গিয়ে আমরা সামাজিক দায়িত্ব কে অগ্রাহ্য করি। অবস্থা এমনই সঙ্গিন হয়ে ওঠে যে অন্যেরা আমাদের সামাজিক ভাবে অগ্রাহ্য করতে শুরু করে।আপনার লক্ষ্য পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপে পরীক্ষা করুন (Scrutinize your goals)যার কোনও লক্ষ্য নেই সে কখনও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না। লক্ষ্য উঁচু না রাখা একটি বড় ভুল। যারা সফল হতে চান, তারা লক্ষ্যের দিকে নজর রাখেন-আর যারা হেরে যান, তারা সব সময় লক্ষ্যসাধনের বাধাকেই বড় করে দেখেন।আমাদের লক্ষ্যকে এমন উঁচুতে নিবন্ধ করা উচিত, যাতে আমরা লক্ষ্য সাধনে উদ্বুদ্ধ হই, অথচ অবাস্তব বলে হতাশার সৃষ্টি না করে। আমরা যা করি তা হয় আমাদের লক্ষ্যের কাছাকাছি নিয়ে যায়, অথবা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে অন্য পথে চালিত হই।প্রত্যেকটি লক্ষ্যকেই নিম্নলিখিত মানদন্ডের নিরিখে মূল্যায়ন করা উচিতঃ(১) এই লক্ষ্যের মধ্যে কতটা সত্য আছে?২) এটি কি সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তির প্রতি সুবিচার করবে? ((৩) এর ফলে কি আমি আস্থা অর্জন করবো।(৪) এই লক্ষ্য কি আমাকে স্বাস্থ্য, সম্পদ ও মানসিক শান্তি দিতে সক্ষম হবে?(৫) এই লক্ষ্য কি আমার অন্যান্য লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?(৬) আমি কি লক্ষ্য সাধনে নিজেকে উৎসর্গ করতে পারি?নিম্নলিখিত উদাহরণগুলি এই মানদন্ডের পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হয়েছেঃ-(ক) যদি লক্ষ্য হয় যে আমার অর্থিক অবস্থা যাই হোক না কেন, আমি সুস্বাস্থের দৃষ্টান্তস্থল হব। তাহলে খুব স্বাভাবিক দেখা যাবে যে, কিছুদিন পরে স্বাস্থ্যরক্ষা করা কঠিন হচ্ছে। এর অর্থ, আমার লক্ষ্য অন্যান্য লক্ষ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।(খ) একজন মানুষ অনেক অর্থ উপার্জন করতে পারে কিন্তু যদি তার ফলে তার পরিবার ও স্বাস্থ্য নষ্ট, হয়, তাহলে তার কোন মূল্য থাকে না। তাই নয় কি? (গ) এক ব্যক্তি মাদক দ্রব্য বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা রোজগার করতে পারে।কিন্তু তারপর তাকে জীবনের অবশিষ্টাংশ আইনের হাত থেকে বাঁচার জন্য পালিয়ে বেড়াতে হবে। ফলে তার মানসিক শান্তি থাকবে না। এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও বিব্রত হবে, তার উপর আস্থাও থাকবে না। সেই জন্য প্রত্যেকটি লক্ষ্য এই মানদন্ডে মূল্যায়ন করা উচিত এবং জীবনের সব লক্ষ্যগুলি পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত।(ঘ) লক্ষ্য লাভের জন্য কর্মপ্রচেষ্টা না থাকলে সমস্ত লক্ষ্যই শূন্য স্বপ্নের মতো হয়ে যায়। কাজের দ্বারা স্বপ্নকে নিদিষ্ট লক্ষ্যে পরিণত করতে হয়। যদি আমরা লক্ষ্যভ্রষ্ট হই, তবুও আমরা সব বিষয়ে ব্যর্থ হবো না। লক্ষ্য লাভে বিলম্বের অর্থ ব্যর্থতা নয়। কেবল লক্ষ্য

পৃষ্ঠা:১৪৭

লক্ষ্য নির্ধারণ করা:লাভের জন্য পুনরায় অন্যতর পরিকল্পনা রচনার প্রয়োজন হয়।ভালো ছবি নেওয়ার জন্য যেমন ক্যামেরার ফোকাস পড়ার প্রয়োজন, হয়, তেমনি সৃজনশীল জীবন যাপনের জন্য লক্ষ্যের দরকার।লক্ষ্য আমাদের মূল্যবোধের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়া উচিত (goals should be consistent with our values?)লক্ষ্য জীবনের উদ্দেশ্যসাধনের দিকে নিয়ে যায়। এটি সাফল্যের সোপান। চাঁদের জন্য লক্ষ্য স্থির করুন যদি আপনি লক্ষ্যভ্রষ্টও হন, আপনি অন্তত একটি তারকা হতে পারবেন। “যখন আপনি লক্ষ্য থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেন, তথন বাধাগুলি ভয়াবহরূপ ধারণ করে”-হেনরি ফোর্ড (Henry ford)। আমাদের প্রত্যেকেরই জীবনের একটা উদ্দেশ্য আছে এবং প্রত্যেক মানুষের উদ্দেশ্য পৃথক। একটি অর্কেস্ট্রার সব বাদকরা যদি একই যন্ত্র বাজার তবে তাতে ঐক্যতান সৃষ্টি হবে না, অকৃেষ্ট্রা হবে অর্থহীন।ক্ষুদ্র পরিকল্পনা কোরোনা, কারণ তাতে মানুষের রক্তে তরঙ্গ ভোলার ইন্দ্রজাল নেই। বড় পরিকল্পনা করো, লক্ষ্য উঁচু রেখে আশা এবং কর্মোদ্যম নিয়ে লক্ষ্য লাভের চেষ্টা কর।-Daniel H. Burnhamবর্তমানে আমাদের অবস্থান কোথায়-এই প্রসঙ্গ অর্থহীন। আমরা কোন লক্ষ্যে যাত্রা করছি সেই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। উদ্দেশ্য ব্যতীত মানুষের চেষ্টা এবং সাহস নষ্ট হয়। উদ্বেগের ফলে লক্ষ্য নেতিবাচক হয়ে যায়। সে সমস্ত ঘটনা ঘটলে লক্ষ্যের পথে বিঘ্ন সৃষ্টি হবে সেই সমস্ত ঘটনার সম্ভবনায় আশঙ্কিত হয়ে থাকার নামই উদ্বেগ।ব্যর্থ প্রচেষ্টার অর্থ কর্ম সম্পাদন নয়। (Activity is not the same as accomplishment)কাজ করা এবং সফলভাবে কাজ শেষ করার মধ্যে অনেক তফাৎ আছে।ফেরি নামে এক ফরাসী বৈজ্ঞানিক একদল শুঁয়োপোকা পরীক্ষা করে দেখিয়েছিলেন সামনে যে থাকে, গুঁয়াপোকা তাকে অন্ধভাবে অনুসরণ করে।ফেত্রি একটি বৃত্তাকার ফুলদানীতে গুঁয়োপোকাদের এমন ভাবে চালনা করলেন যে,সামনের শুয়োপোকাটি প্রকৃতপক্ষে দলের পিছনে এসে গেল। খাবার হিসাবে পাইন গাছেরকিছু ফুল মাঝখানে রেখে দেওয়া হল। শুঁয়োপোকাগুলি বৃত্তাকারে, সেই ফুলদানির মধ্যে ঘুরে বেড়াতে থাকলো, অবশেষে এক সপ্তাহ এই ভাবে ঘোরার পরে ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত হয়ে মারা গেল, যদিও সামনেই তাদের খাদ্য পাইনের ফুল রাখা ছিল। এই গুঁয়োপোকা গুলির ব্যবহার থেকে একটি শিক্ষনীয় বিষয় আছে।কিছু করলেই যে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া হচ্ছে এরূপ মনে করা ঠিক নয়। লক্ষ্যের পথে কতদূর অগ্রসর হওয়া গেল তা জানার জন্য কাজের মূল্যায়ন প্রয়োজন।এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে গাড়ি করে নিয়ে বেরিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ পরে স্ত্রী বললেন, আমরা বোধহয় ভুল পথে যাচ্ছি”। স্বামী জবাব দিলেন, “তাতে কিছু যায় আসে না, আমরা দারুণভাবে নিজেদের উপভোগ করছি।”আমরা যদি কেবল কাজকরা এবং কার্যসিদ্ধির নিদিষ্ট লক্ষ্যে কাজ করার মধ্যে গুলিয়ে ফেলি, তাহলে আমরা মজা উপভোগ করব বটে, কিন্তু লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হতে পারব না।অর্থহীন লক্ষ্য (meaningless goals)এক চাষীর এক কুকুর ছিল, সে রাস্তার ধারে গাড়িআসার জন্য অপেক্ষা করতো। গাড়ি

পৃষ্ঠা:১৪৮

এলেই চিৎকার করতে করতে গাড়ির সঙ্গে দৌড়ে গাড়িকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতো। একদিন এক প্রতিবেশী চাষীকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার কি মনে হয় কুকুরটি গাড়ির সঙ্গে দৌড়ে পাল্লা দিয়ে পারবে?” চাষী জবাব দিল, “পারবে কি পারবে না, তার জন্য আমার চিন্তা নেই, আমার ভাবনা যদি একদিন গাড়িকে টেক্কা দিয়ে যায়, তাহলে কী অবস্থা হবে?” অনেক মানুষই কুকুরটির মতো অর্থহীন লক্ষ্যের দিকে দৌড়ায়।কাজের পরিকল্পনা (Action plan)১. নিদিষ্ট লক্ষ্য স্থির করুন।২. সেই লক্ষ্যগুলি নিখে ফেলুন।৩. দিনে ২বার সেই লক্ষ্যগুলি পড়ুন, সকালে একবার ও রাত্রে একবার।৪. লক্ষ্যগুলিকে নাগালেরর সামান্য বাইরে রাখুন কিন্তু যেন দৃষ্টি বাইরে না যায়।৫. কাজের অগ্রগতি মাঝে মাঝে পরীক্ষা করুন।

পৃষ্ঠা:১৪৯

অধ্যায় ৮

মূল্যবোধ ও কল্পনা প্রসূত পরিকল্পনাসঠিক উদ্দেশ্যে সঠিক কাজ করা:মহাত্মা গান্ধীর মতে ৭টি মারাত্মক পাপ হল-সম্পদশালীর কর্মহীনতা, বিবেকহীন আনন্দ উপভোগ, চরিত্রহীন জান, নীতিবোধহীন ব্যবসা, মানবিক চিন্তা বিহীন বিজ্ঞান, আত্মত্যাগ বিহীন ধর্ম এবং নীতিহীন রাজনীতি।একটি শিশুর জন্ম হলে কারা আনন্দ করেন? বাপ-মা, আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধব। কিন্তু শিশুটি কাঁদে। আমরা যখন মারা যাই ঠিক উল্টোটাই হওয়া উচিত। আমাদের আনন্দ হবে এই ভেবে যে, আমরা পৃথিবীতে কিছু অবদান রেখে যাচ্ছি; এবং যে অবস্থায় পৃথিবীকে দেখেছিলাম, তার থেকে ভালো অবস্থায় রেখে যাচ্ছি। সবাই এর জন্য দুঃখ প্রকাশ করুক যে, পৃথিবী একটি সৎ ব্যক্তিকে হারিয়ে দরিদ্রতর হয়ে গিয়েছে।আমরা কেবল নিইনি, কিছু দিয়েওছি।শেষবার যখন প্রশংসাত্মক উক্তি শুনেছেন, সেই সময়ের কথা ভাবুন। মানুষ শ্রদ্ধা জানানোর সময় জীবদ্দশায় যে সব ছোট ছোট দাক্ষিণ্য দেখিয়েছেন সেই ঘটনাগুলির উল্লেখ করে। দয়া ও সহানুভূতি মাথা ছোট্ট ঘটনাগুলি কখনও দৃষ্টি এড়িয়ে যায় না।বস্তুত পক্ষে কোনও ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর সেগুলি বেশি করে স্মরণে আসে। সেই সময়েই মানুষ বুঝতে পারে যে ছোটখাট দয়া ও দাক্ষিণ্যের গুরুত্ব তাদের কাছে কত বেশি।মানুষ যা পেয়েছে, তার জন্য তাকে সম্মান জানানো হয় না, মানুষ পৃথিবীকে যা দিয়েছে তার জন্যই তার সম্মান।-Calvin Coolidge মূল্যবোধ কিভাবে বিচার করবেন? (How do we judge our value system?)আমাদের মূল্যবোধের ব্যবস্থাটিকে কিভাবে পরীক্ষা করবেন? আমার বিশ্বাস দু’ভাবে পরীক্ষা করা যায়। চূড়ান্ত যে পরীক্ষা তার নাম। ‘MAMA TEST’ আপনি যখন যে কাজ করেন বাড়িতে কিংবা কর্মস্থলে, একা কিংবা অন্য কারো সঙ্গে সেই কাজ সম্পর্কে যদি মূল্যবোধের প্রশ্ন ওঠে- তাহলে নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন, “আমার মা যদি আমি এখন যা করছি তাই দেখতেন, তাহলে কি তিনি আমার সম্পর্কে গর্বিত হতেন অথবা লজ্জায় তার মাথা হেঁট হোতো”। এতে আপনার মূল্যবোধ তাড়াতাড়ি পরিষ্কার হয়ে যাবে। যদি এই ‘MAMA পরীক্ষায় পাশ করেন এবং অন্য পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন, তাহলে আপনার মূল্যবোধের পরীক্ষায় কৃতকার্য হয়েছেন বলে মনে করতে পারেন।কিন্তু যদি আপনি ‘মাতৃ-পরীক্ষায়’ অকৃতকার্য হন কিন্তু অন্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন, তাহলেও আপনার মূল্যবোধ বিপর্যস্ত বলে ধরে নিতে হবে।এই পরীক্ষাটির পুনরাবৃত্তি করা প্রয়োজন। এ সম্পর্কে চিন্তা করুন। যখনই মূল্যবোধের ওপর কোন নির্দিষ্ট ধারণা পাওয়ার দরকার হবে, তখন নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন,” আমি যা করছি তা যদি মা দেখতেন তাহলে তিনি গর্বিত হতেন, না লজ্জায় মাথা নত করতেন। আপনার দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মেঘ দ্রুত কেটে যাবে এবং আপনার জবাব পেয়ে যাবেন।যদি মাতৃ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হন তাহলে আর একটি পরীক্ষার কথা বলব, তার নাম “BABA TEST” অথবা পিতৃ-পরীক্ষা। যখন যেখানে যা কিছু করছেন সেই সময় নিজেকে

পৃষ্ঠা:১৫০

প্রশ্ন করুন, “যদি আমার ছেলেরা আমাকে এই কাজ করতে দেখত, তাহলে কি, তাদের এই কাজ দেখাতে পারতাম, অথবা লজ্জিত বোধ করতাম?” পুনরায় সন্দেহের মেঘ, আপনার মন থেকে দ্রুত সরে যাবে এবং আপনি প্রশ্নের জবাব পেয়ে যাবেন। যদি এই দু’টি পরীক্ষা মানুষের মূল্যবোধের সমস্যাটিকে পরিষ্কার করতে না পারে, তাহলে সেই ব্যক্তি মনুষ্য পদবাচ্য হওয়ার অনুপযুক্ত, তার বিবেক বলে কিছু অবশিষ্ট নেই। কিভাবে আমাদের মূল্য বোধের কাঠামোটি পরিবর্তিত হয়? How does our value system Change?) ( ক্রমাগত বাইরের জগতের সংস্পর্শ এলে যা অস্বচ্ছ তাও গ্রহণীয় বলে মনে হয় এবং ধীরে ধীরে অসহ্য অবস্থাও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠে। যখন ধীরে ধীরে এই ভাবে পরিবর্তনের পথ দিয়ে যায়, তখন যথার্থতা গড়ে ওঠে।সময়ের পরিবর্তন হচ্ছে (Times are changing)আমরা নতুন প্রজম্মের কথা বলি, তাদের পরিণতি কী? তাদের মূল্যবোধ কিরূপ? তাদের দোষ দেওয়ার পূর্বে আমরা কি বিচার করে দেখি দোষটা প্রকৃত পক্ষে কার?আমাদের স্বরণ করা উচিত যে, মূল্যবোধ এবং সব গুনাবলী বংশানুক্রমিক নয়। সেগুলি শিখতে হয়।আমাদের অগ্রাধিকার গুলিকে যথাযথ ভাবে বিন্যাস করা দরকার।আমরা জীবিকার জন্য কী করি? আমরা জীবিকার বিষয়টি কি ভাবে দেখি? (What we do for a living versus what we do with a living)সমস্তরকম কাজের অর্থমূল্য নির্ধারণ করা যায় না। মাতা-পিতা যখন শিশুদের বড় করেন তখন তারা অর্থ-মূল্যের প্রত্যাশা করেন না। অনেক অর্থবান ব্যক্তি কিন্তু মনের দিক থেকে দরিদ্র। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত, আমাদের অর্থ সম্পদ থাকবে কিন্তু মানসিক দিক থেকেও ধনী হবো।অর্থের প্রভাব যখন প্রবল হয়, তখন সত্যের কন্ঠস্বর শোনা যায় না। জীবনে সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে, উপার্জন না করে লোকে অর্থ পেতে চায় অর্থ উপার্জন করা অপেক্ষাকৃত সহজ কিন্তু অর্থ রাখা খুব কঠিন।পৃথিবীর সুন্দরতম ও শ্রেষ্ঠতম সব কিছুই স্পর্শ ও দৃষ্টির অতীত। সেগুলি হৃদয় দিয়ে অনুভব করা উচিত।-Helen Keller কঠোর শ্রম মানুষকে অর্থের মূল্য সম্পর্কে সচেতন করে। এই কারণেই অল্পবয়সীদের পিতা-মাতার পক্ষে তাদের সন্তানদের এই শিক্ষা দেওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। নতুন প্রজন্মের যারা আমাদের উত্তরাধিকারী হয়েছে অথচ সম্পদের অর্থ বোঝেনি, তাদের জন্য দুঃখ হয়। শিক্ষা না পাওয়ার ফলে নতুন প্রজন্মের তরুণ সমস্ত কিছু অর্থমূল্যে নির্ধারণ করে। তারা ভাবে যে সব জিনিসই কেনা যায় বা বিক্রয় করা যায়-অবশ্যই এটা সত্য নয়। মূল্যবোধে বিশ্বাসী ব্যক্তিদের কোন অর্থমূল্যে কেনা যায় না, এবং তারাও তাদের ওপর কোনও মূল্য আরোপ করেন না।চরিত্র অমূল্য (It is priceless-character)Indecent Proposal’ নামে একটি চলচ্চিত্র এই ব্যাপারটিকে পরিষ্কার ভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।একটি ব্যভিচারের ঘটনার জন্য ১০ লক্ষ ডলার অর্থ মূল্যদিতে হয়।

পৃষ্ঠা ১৫১ থেকে ১৬৮

পৃষ্ঠা:১৫১

মূল্যবোধ ও কল্পনা প্রসুত পরিকল্পনা: লোকে বিবেককে বিসর্জন দিয়ে রাতারাতি সাফল্য লাভ চায়, কিন্তু শেষ রক্ষা হয় না। সত্যিকারের মূল্যবোধ অমূল্য। যখন অর্থের বিনিবয়ে মূল্যবোধকে নষ্ট করা যায় বা কেনা যায় তখন মূল্যবোধ অর্থহীন হয়ে যায়। কোনও আর্থিক লাভের দ্বারা এই ক্ষতিপুরণ করা যায় না। অর্থসঙ্গতি অবশ্যই ভালো কারণ অর্থের ক্রয়ক্ষমতা আছে। কিন্তু অর্থ উপার্জনের জন্য আমরা এমন জিনিস নষ্ট করতে চাই না যা অর্থের দ্বারা ক্রয় করা যায় না। অর্থের ক্রয় ক্ষমতা নির্দিষ্ট বস্তুতেই সীমাবদ্ধ। বস্তুতপক্ষে সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসই অর্থের দ্বারা কেনা যায় না। অর্থের দ্বারা কী কেনা যায় না? (What money won’t buy?) জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান বস্তুগুলি অর্থের দ্বারা কেনা যায় না। সচরাচর শোনা যায় যে, প্রত্যেক মানুষেরই একটি মূল্য আছে। যে সব মানুষ এই ভাষায় কথা বলেন, তারা নিজেদেরকে বিক্রয়যোগ্য বলে মনে করেন।চরিত্রবান, সৎ এবং যথার্থমূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষকে অর্থের দ্বারা কেনা যায় না।অর্থের দ্বারা কেনা যাবেঃ-

  • আমোদ প্রমোদ কিন্তু সুখ নয়।
  • বিছানা কিন্তু নিদ্রা নয়।
  • পুস্তক কিন্তু প্রজ্ঞা নয়।
  • ঘড়ি কিন্তু বেশি সময় নয়।
  • সহচর কিন্তু বন্ধু নয়।
  • মূল্যবান জিনিস কিন্তু সৌন্দর্য নয়।খাদ্য কিন্তু ক্ষুধা নয়।
  • বাড়ি কিন্তু গৃহ নয়।
  • ওষুধ কিন্তু স্বাস্থ্য নয়।
  • আংটি কিন্তু বিবাহ নয়।জীবনে দু’ধরনের হতাশাজনিত দুঃখ আছে (There are two kinds of tragedies in life) ১। আমরা যা চাই তা না পাওয়ার দুঃখ (Not getting what we want) যারা দুঃখ ভোগ করেছে, তাদের প্রার্থনা(A creed for those who have suffered)আমি ঈশ্বরকে বললাম শক্তি দাও, আমি যেন সাফল্য লাভ করতে পারি কিন্তু তিনি আমাকে করলেন দুর্বল ফলে আমি বিনম্রচিত্তে আদেশ পালন করতে শিখলাম আমি চাইলাম সুস্বাস্থ্য,যেন আমি কঠিন কাজের উপযুক্ত হতে পারি। কিন্তু আমি পেলাম অশক্ত শরীর ফলে উন্নততর কাজে নিজেকে নিয়োগ করতে পারলাম না।আমি সম্পদ চাইলাম যাতে আমি সুখী হতে পারি, আমি পেলাম দারিদ্র, যা আমাকে দিল গভীর জ্ঞান,আমি চাইলাম ক্ষমতা, যাতে অনেক মানুষের সপ্রশংস দৃষ্টি আমার ওপর নিবদ্ধ হয়

পৃষ্ঠা:১৫২

আমি পেলাম দুর্বলতা, যার ফলে আমি সর্বদাই ঈশ্বরের প্রয়োজন অনুভব করি।জীবনকে উপভোগের জন্য আমি সমস্ত কিছুই চাইলাম আমি পেলাম জীবন, যার ফলে আমি সব জিনিস উপভোগ করি। আমি যা চেয়েছিলাম, তা কিছুই পাইনি, কিন্তু আমি যা পেলাম তার প্রত্যেকটি আমি আশা করেছিলাম। আমার অনুচ্চারিত প্রার্থনা ঈশ্বর পূর্ণ করেছেন, সব মানুষের মধ্যে আমি সবথেকে উত্তম আশীর্বাদ ধন্য।আনামা কবি।২. আকাঙিক্ষত প্রাপ্তি ঘটার দুঃখ (Getting what we want)যখন আমাদের মূল্য-বোধের ধারণা খুব স্পষ্ট নয়, তখন আমরা যা চাই তা পাওয়া গেলেও সেটি বড় রকমের হত্যাশার দুঃখে পর্যবসিত হতে পারে। রাজা মিডাসের গল্প এই অবস্থার উদাহরণ।মিডাসের স্পর্শ (The Midas touch)লোভী রাজা মিডাসের অনেক ধন-দৌলত ছিল, কিন্তু যা ছিল, তার থেকেও বেশি পাওয়ার আশঙ্কা ছিল। তার ধনাগারে অনেক সোনা জমিয়ে রেখেছিল এবং প্রত্যেকদিন ধনগারে বসে সঞ্চিত সোনার হিসাব করত। একদিন ধনাগারে বসে হিসাব করছিল, তখন হঠাৎ একজন অপরিচিত ব্যক্তি আবির্ভূত হয়ে বললেন, “তিনি একটি বর দিতে চান।” রাজা খুশি হয়ে বললেন, “তহালে এই বরদিন, আমি যা স্পর্শ করব তা সোনা হয়ে যাবে।” আগন্তুক জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি সত্যই এই বর চাও?” রাজা বললেন, “হ্যা”। তখন আগন্তুক বললেন যে, “কাল সকালে সূর্যের আলোতে তুমি স্পর্শের দ্বারা সোনা করার ক্ষমতা লাভ করবে।”রাজা ভাবলেন তিনি স্বপ্ন দেখছেন, এ সত্য হতে পারে না। কিন্তু পরদিনই যখন তিনি শয্যা, বস্ত্র, এবং আরও অন্যন্য জিনিস স্পর্শ করলেন তখনই তা সোনা হয়ে গেল। জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখলেন তার মেয়ে বাগানে খেলা করছে। ভাবলেন মেয়েকে তার ক্ষমতা দেখিয়ে আশ্চর্য করে দেবেন। কিন্তু বাগানে যাওয়ার আগে তিনি একটি বই পড়তে গুরু করলেন, কিন্তু স্পর্শ করা মাত্র বইটি সোনা হয়ে গেল। তিনি বইটি পড়তে পারলেন না। তারপর তিনি প্রাতরাশের জন্য বললেন কিন্তু যখনই জল বা জলের পাত্র স্পর্শ করলেন তখনই তা সোনা হয়ে গেল।ক্ষুধার্ত রাজা মনে মনে ভাবলেন, আমি তো আর সোনা খেতে বা পান করতে পারি না, ঠিক সেইসময়ে তার মেয়ে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরল এবং সঙ্গে সঙ্গে বালিকাটি একটি সোনার মূর্তিতে পরিণত হোল। তারপর রাজার মুখে আর কোন হাসি রইল না। রাজা মাথা নিচু করে কাঁদতে শুরু করলেন।সেই অপরিচিত ব্যক্তি পুনরায় আবির্ভূত হয়ে রাজাকে জিজ্ঞাসা করলেন, স্পর্শে সোনা হয়ে যাওয়ার ক্ষমতা পেয়ে রাজা খুশি হয়েছেন কিনা? রাজা বললেন যে পৃথিবীতে তার থেকে দুঃখী লোক আর কেউ নেই। আগন্তুক জিজ্ঞাসা করলেন, “এখন আপনি কী চান? আপনার খাদ্য, প্রিয় কন্যা অথবা সোনার তাল ও কন্যার স্বর্ণমূর্তি?” রাজা আকুল হয়ে, কাঁদতে কাঁদতে ক্ষমা চাইলেন, তিনি বললেন, “আমি আমার সব সোনা বিলিয়ে দেব, কারণ মেয়েকে হারালে, আমার জীবনের কোনও অর্থ থাকবে না।” আগন্তুক রাজাকে বললেন, “আগের থেকে তুমি জ্ঞানবান হয়েছে।” এই বলে তিনি সেই যাদুশক্তি প্রত্যাহার করে নিলেন। রাজা তার মেয়েকে ফিরে পেলেন এবং এমন একটি

পৃষ্ঠা:১৫৩

মূল্যবোধ ও কল্পনা প্রসুত পরিকল্পনাশিক্ষা পেলেন যা জীবনে কোনও দিন ভুলবেন না।:এই গল্পটির নীতিশিক্ষা কী?(১) বিকৃত মূল্যবোধ গভীর দুঃখের পথে নিয়ে যায়।(২) কখনও কখনও আকাঙ্ক্ষিত বস্তুর প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির থেকে বেশি দুঃখের কারণ হয়।(৩) ফুটবল খেলায় খেলোয়াড়দের পরিবর্তন করা যায়, কিন্তু জীবনের খেলার কোন পরিবর্তন বা পুনরাবৃত্তি চলে না। আমরা জীবনে দ্বিতীয় সুযোগ নাও পেতে পারি যাতে আমাদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে পারে, যেমন রাজার ক্ষেত্রে হয়েছিল।আপনি কিভাবে স্মরণীয় হতে চান? (How would you like to be remembered?)একশত বছর আগে এক ব্যক্তি সকালবেলার খবরের কাগজে শোক-সংবাদে নিজের নাম দেখে বিস্মিত ও সন্ত্রস্ত হয়ে উঠলেন। খবরের কাগজ ভুলক্রমে ভুল লোকের মৃত্যুর খবর ছাপিয়েছে। তিনি কিন্তু প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় বিহুল হয়ে পড়লেন। নিজেকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আমি বেঁচে আছি না মরে গেছি?” আত্মসংবরণ করার পর তার দ্বিতীয় চিন্তা হোল তার মৃত্যুসংবাদ পাঠ করে তার সম্পর্কে লোকে কী ভাবছে?খবরের কাগজে প্রকাশিত তার মৃত্যুসংবাদটির শিরোনাম ছিল, “ডাইনামাইটের রাজা মারা গেছেন”। তার সম্পর্কে আরও ছিল। তিনি ছিলেন ‘মৃত্যুব্যবসায়ী’। এই অদ্রলোকই ডাইনামাইটের আবিষ্কর্তা এবং যখন তিনি দেখলেন যে তাকে ‘মৃত্যুব্যবসায়ী’ হিসাবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। তখন তিনি নিজেকে জিজ্ঞেসা করলেন, “এই ভাবেই কি আমি মানুষের কাছে স্বরণীয় হয়ে থাকব?”এই চিন্তা তাকে বিব্রত করে তুললো এবং তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে এই ভাবে তিনি মানুষের মধ্যে স্বরণীয় হবেন না। সেই দিন থেকেই তিনি পৃথিবীতে শান্তির জন্য চেষ্টা শুরু করলেন। তার নাম ছিল” এ্যালফ্রেড নোবেল’ বর্তমানে তিনি’ নোবেল’ পুরস্কারের জন্য স্বরণীয় হয়ে আছেন। যে ভাবে এ্যালফ্রেড নোবেল তার অন্তরের ইচ্ছাকে ব্যক্ত করতে গিয়ে মূল্যবোধকে নূতন ভাবে বিন্যস্ত করলেন আমাদেরও সেই ভাবে শান্ত চিত্তে চিন্তা করে ঐরকম করা উচিত ।পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আপনি কী রেখে যাচ্ছেন?আপনি কিভাবে স্মরণীয় হতে চান? লোকে কি আপনাকে ভালো বলবে? তারা কি আপনাকে ভালোবাসা এবং সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করবে? আপনার অভাব কি তার অনুভব করবে? ছোট ছোট জিনিসই বৃহৎ পার্থক্য তৈরি করে (It is the little things that make a big difference)সমুদ্রের তীরে এক ব্যক্তি প্রাতঃভ্রমণ কালে দেখলেন যে সকালের ঢেউ এর সঙ্গে শতশত তারামাছ বেলাভূমিতে চলে আসে এবং ঢেউ চলে গেলে বেলাভূমিতে গড়াগড়ি দেয়। তারপর রোদের তাপে ভারা মরে যায়। লোকটি যখন এই দৃশ্য দেখেন; তখন তারা নাহগুলি জীবিত ছিল। তিনি একটি তুলে নিয়ে জলে ছুঁড়ে দিলেন।এই ভাবে বেশ কয়েকটিকে ‘জলে ছুঁড়ে বাঁচিয়ে দিলেন। তার পিছনেই ছিল আরও এক ব্যক্তি, যিনি লোকটির কান্ড বুঝতে পারছিলেন না। তিনি এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি কী করছেন? বেলাভূমিতে শত শত তারা-মাছ পড়ে আছে, আপনি কয়টিকে এইভাবে সাহায্য করতে পারেন? এতে কি ক্ষতিবৃদ্ধি পাবে?” সেই ব্যক্তি কোনও জবাব দিলেন না, এগিয়ে গিয়ে আরও ১টি তারা-মাছ তুলে নিয়ে জলে ছুঁড়ে দিলেন এবং বললেন,

পৃষ্ঠা:১৫৪

“অন্তত ১টির ক্ষেত্রে তফাৎ তো হল”। আমরা কী তফাৎ করছি।:ছোট হোক বড় হোক যদি প্রত্যেকেই কিছু ভালো কাজ করার চেষ্টা করে তাহলে সম্মিলিত ভাবেই একটি বড় ভালো কাজ হয়ে যায়। সেই চেষ্টা করা কি আমাদের উচিত আপনার জীবন কি রক্ষা করার উপযুক্ত? (Is your life worth saving?) নদীতে ডুবে ডুবে যেতে একটি বালক চিৎকার করে সাহায্য চাইল। এক ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন, তিনি নদীতে ঝাঁপিয়ে বালকটির প্রাণ বাঁচালেন। তারপর যখন ভদ্রলোক চলে যাচ্ছিলেন, তখন বালকটি বলল, “ধন্যবাদ”। ভদ্রলোক বললেন, “কিসের জন্য?” বালকটি বললো, “আমার জীবন রক্ষা করার জন্য”।ভদ্রলোক বালকটির চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বাছা! তুমি যখন বড় হবে, তখন তোমার জীবন এমনভাবে গড়ে তুলবে, যেন মনে হয় তোমার জীবন বাঁচাবার উপযুক্ত ছিল।” এখন চিন্তা করার সময় এটি কেবল জাগিয়ে দেওয়ার আহান। পরিপূর্ণতা ছাড়া সাফল্য অর্থহীন। অর্থ এবং উদ্দেশ্য যদি না থাকে, জীবন শূন্য এবং অসুখী হয়, তা যতই সম্মান, অর্থ এবং উচ্চ শিক্ষার ডিগ্রি থাকুক না কেন? যখন আপনি আপনার ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সম্পদ সমাজ, পরিবার এবং সাফল্যের দর্শন তৈরি করেন তখন থেকেই আপনার সাফল্যের সূচনা। একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য এবং দর্শন আপনাকে পরিচালিত করবে। সেইটি ছাড়া জীবন অবশ্যই চিন্তা দিয়ে পরিচালিত হয়। মানুষ যদি সাফল্যের দর্শনের সুনিদিষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে না পরে তাহলে সাফল্যের দর্শনের অভাবই হবে অসাফল্যের সূচনা।অনেক সময় আমরা কোন কোন জিনিস অগ্রাহ্য করি যা অগ্রাহ্য করা উচিত নয় আবার যা অগ্রাহ্য করা উচিত তাকে অগ্রাহ্য করি না। একটি উন্নত মূল্যবোধের ধারণার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হচ্ছে জীবনের মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া। অঙ্গীকারবদ্ধতা (Commitment)যখন আমাদের মূল্যবোধ খুব পরিষ্কার তখন আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া সোজা হয়ে যায়-উদাহরণঃশত্রুর কাছে দেশের গোপন তথ্য পাচার করে দেওয়ার পর আপনি দেশের কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে পারেন না। আপনার বন্ধু বিশ্বাস করে যে কথা বলেছে, তা অপরের কাছে বলে দেওয়ার পর বন্ধুত্ব রাখতে পারেন না।কোনও কাজে স্বল্প সময় ব্যয় করে আপনি কাজের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধতা দেখাতে পারেন না।যদি অঙ্গীকার ঠিকমত রাখা না হয়, তাহলে তাকে বলা যায়-অসাধু ব্যবহার। ব্যক্তিগত কিংবা পেশাগত কোনও সম্পর্কই যথাযথভাবে ফলপ্রসূ হবে না যদি লোকে বলে-

  • আমি চেষ্টা করব, কিন্তু আমি কথা দিতে পারছি না।
  • আমি কাজটি করব কিন্তু আমার ওপর নির্ভর করবেন না।
  • আমি ওখানে যাওয়ার চেষ্টা করব কিন্তু আমার ওপর বেশি আশা রাখবেন না।
  • যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি ভালো করছ, ততক্ষণ আমি তোমার সঙ্গে আছি। • অপেক্ষাকৃত ভালো কিছু না পাওয়া পর্যন্ত আমি তোমার সঙ্গেই থাকবো। যদি নিম্নলিখিত পারস্পরিক সম্পর্কগুলি নির্ভরযোগ্য না হয় তাহলে পৃথিবীতে কোন কিছু

পৃষ্ঠা:১৫৫

মূল্যবোধ ও কল্পনা প্রসুত পরিকল্পনা‘ম্পর্কই কাজে লাগবে না:

  • পিতা-মাতা / সন্তান খরিদ্দার/ বিক্রেতা ছাত্র/শিক্ষক বন্ধু/বন্ধু
  • নিয়োগকর্তা / কর্মচারী স্বামী/স্ত্রীসম্পর্কের অনিশ্চয়তা উম্মাদ করে দিতেপারে।আমাদের সম্পর্কের দৃঢ়তা অঙ্গীকারবদ্ধতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। আজকাল পাওজ্ঞাভঙ্গ করাকে একটা বৃহৎ বিচ্যুতি বলে মনে করা হয় না। অঙ্গীকারবদ্ধতা না থাকলে সমস্ত সম্পর্কের মধ্যেই তিক্ততা জন্মায়।অঙ্গীকারবদ্ধতার অভাবে কোনও সম্পর্কই সুস্থির হয় না এবং পারস্পরিক নিরাপত্তার অভাববোধ সৃষ্টি করে। কেউই বুঝতে পারে না পরস্পরের ওপর নির্ভর করা যায় কিনা।অঙ্গীকারবদ্ধতার অর্থ১) নির্ভরশীলতা (২) বিশ্বাস যোগ্যতা (৩) অনুমান সাধ্য (৪) সঙ্গতি (৫) যত্নশীলতা( (৬) সহমর্মিতা (৭) কর্তব্যবোধ (৮) আন্তরিকতা (৯) চরিত্র (১০) নৈতিক বিশুদ্ধতা (১১) আনুগত্য।এর মধ্যে যে কোনও একটি উপাদান না থাকলে অঙ্গীকারবদ্ধতার শক্তি নষ্ট হয়। যখন কোন ব্যক্তি অঙ্গীকারবদ্ধ হয়, তখন সে মনে মনে এই কথাই বলে, “যাই ঘটুকনা কেন তুমি আমার ওপর নির্ভর করতে পারো এবং তোমার যখনই প্রয়োজন হবে, আমি ৩খনই উপস্থিত হবো।” নিঃস্বার্থভাবে যে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়, সে মনে মনে বলে, “অনিশ্চিত ভবিষ্যতে তোমার প্রতি আমার ব্যবহার অনিশ্চিত নয়।”ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না কেন?
  • আপনার জীবনে ও পারিপার্শ্বিক অবস্থায় পরিবর্তন আসে।
  • আমার জীবনে ও পারিপার্শ্বিক অবস্থায় পরিবর্তন আসে।বাহ্যিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটে।
  • অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও যিনি অঙ্গীকারবদ্ধ হন, তিনি মনে মনে বলেন, “আপনি আমার সাহায্যে ভরসা করতে পারেন।”যিনি অঙ্গীকারবদ্ধ হন, তিনি অনেক কিছু ত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকেন। কিসের জন্য? উত্তর খুব সহজ: এই ত্যাগের পুরস্কার খুবই মূল্যবান হতে পারে। অঙ্গীকারবদ্ধ মানুষ১।আমি ত্যাগ করতে প্রস্তুত কারণ আপনার প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ দিই।২। আমি একজন নীতিনিষ্ঠ ব্যক্তি, আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন।৩। আমি আপনাকে বিপন্ন করব না।৪। কষ্ট হলেও আপনার পাশে থাকব।৫। সুসময়ে কিংবা দুঃসময়ে আমি আপনাকে বিপন্ন করবো না।অঙ্গীকার ‘আইনী’ চুক্তির মত নয়, একে বিধি অনুযায়ী কার্যকর করা যায় না। স্বাক্ষরিত কোন চুক্তি এর ‘ভিত্তি’ নয়। এর ‘ভিত্তি’ চরিত্র, নীতিবোধ এবং সহমর্মিতা।অঙ্গীকারের অর্থ অনন্যোপায় হয়ে কাউকে সাহায্য করা নয়। অঙ্গীকারের অর্থ বিশেষঅবস্থার থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ থাকলেও সেই সুযোগ না নিয়ে প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে গিয়ে বিপন্নকে সাহায্য করা।কি কারণে অঙ্গীকার রক্ষা করা উচিত?এপরোক্ত উপাদানগুলি ছাড়া, অপরের প্রতি কোন দীর্ঘমেয়াদী অঙ্গীকার করা উচিত নয়।অঙ্গীকার রক্ষা করলে:
  • ব্যবহার অনুমান করার ক্ষমতা বাড়ে।

পৃষ্ঠা:১৫৬

  • নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
  • ব্যক্তিগত উন্নতি ঘটে।ব্যক্তি এবং সমাজের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক স্থাপিত হয়।স্থায়ী পেশাগত ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি হয়।এমনকি গুন্ডা দলের সর্দার কিংবা জুয়াচোররাও অঙ্গীকারবদ্ধ সহচরের সন্ধান করে বেড়ায়।অঙ্গীকার একটি জঙ্গলের মধ্যে একখন্ড সবুজ ঘাসের জমির মত একটি নিরাপত্তার আশ্রয় সৃষ্টি করে। অঙ্গীকারের অর্থ আমাদের ব্যক্তিগত অভাববোধকে দূরে সরিয়ে রেখে অন্য একজন মানুষের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা।স্মরণ রাখবেন প্রয়োজন অভাবের থেকেও শক্তিশালী। অঙ্গীকারবদ্ধতা মানুষের সম্পর্ককে দৃঢ় নিবন্ধ করে। অঙ্গীকারের অর্থ স্বেচ্ছায় নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে দুঃখ বরণ করা।উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়-১। বন্ধুত্বের প্রতি অঙ্গীকারের অন্তর্নিহিত অর্থ বিশ্বাস রক্ষা করা।২ । খরিদ্দারের প্রতি অঙ্গীকারের অর্থ, ভালো পরিসেবার ব্যবহার করা।৩। বিবাহের প্রতি অঙ্গীকারের অর্থ পারস্পরিক বিশ্বস্ততা রক্ষা করা।৪। বার্জিত রুচির প্রতি অঙ্গীকারের অর্থ অমার্জিত ব্যবহার থেকে দূরে থাকা।৫। দেশ প্রেমের প্রতি অঙ্গীকারের অর্থ আত্মত্যাগ।৬। নিজের কাজের প্রতি অঙ্গীকারের অর্থ সততা।৭। সমাজের প্রতি অঙ্গীকারের অর্থ দায়বদ্ধতা।অঙ্গীকার মানুষ হিসাবে পূর্ণতা প্রাপ্তির লক্ষণ।অঙ্গীকারবদ্ধ ব্যক্তি সমস্যার সূচনাতেই পালিয়ে যায় না, যার দৃঢ় অঙ্গীকারবদ্ধতাআছে তারাই সবল সমাজ গড়তে পারে।বিভিন্ন মানবিক সম্পর্ক কেবলমাত্র নৈকট্য ও সৌহার্দ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনা, অঙ্গীকারের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। পরস্পরের প্রতি ঘনিষ্ঠ হলেই কিন্তু পরস্পরের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধতা জন্মায় না। মূল্যবোধ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেকে অঙ্গীকারহীন সম্পর্