Skip to content

রবিন শর্মা দ্বারা তার ফেরারি বিক্রি করা সন্ন্যাসী

পৃষ্ঠা  ১ থেকে  ১০

পৃষ্ঠা:০১

অধ্যায় ১

জাগরণী

আচমকাই সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলো কোর্টরুমের ভেতর ভিড়ে ঠাসা মানুষজনের ঠিক মাঝখানে। দেশের সবচেয়ে সুপরিচিত, লব্ধপ্রতিষ্ঠিত ও জাঁদরেল আইনজীবী সে। গায়ে জড়িয়ে থাকা তিন হাজার ডলারের ইটালিয়ান স্যুটটির জন্য যতোখানি না বিখ্যাত, তারচেয়েও অনেক, অনেক বেশি বিখ্যাত দেশের মাটিতে বহু রোমহর্ষক আইনি যুদ্ধে প্রতিপক্ষকে ধরাশায়ী করে, জয় নিজের হাতের মুঠোয় ছিনিয়ে আনার জন্য। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। চোখের সামনে যা ঘটে চললো তা যেন কিছুতেই বিশ্বাসই হচ্ছিল না আমার। জুলিয়ন ম্যান্টেলের মতো প্রতিথযশা এক আইনজীবী এই মুহূর্তে পরিস্থিতিরি অসহায় শিকারই বলা যায়। ছোট্ট শিশুর মতো মেঝেতে শুয়ে কাতরাচ্ছে মানুষটি। দুমড়ে মুচড়ে অত বড় শরীরটা হিস্টিরিয়া রোগীর মতো কাঁপতে কাঁপতে আস্তে আস্তে ছোট হয়ে যাচ্ছে। কোর্টরুমের ভেতর সব কিছুই চলছে যেন শ্লো-মোশনে। ‘ও ভগবান! জুলিয়নের কি হলো’, বলে চেঁচিয়ে উঠলো তার অ্যাসিসট্যান্ট। কোর্টের মাঝে আসনে বসা বিচারক প্রচণ্ড আতঙ্কিত হয়ে উঠলেন! জরুরি প্রয়োজনের জন্য তিনি যে ব্যক্তিগত ফোনটি রেখেছিলেন, তাতে ফিসফিস করে ও প্রান্তের কাউকে কিছু একটা বললেন মনে হলো। আমি চলচ্ছক্তিহীনের মতো স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে মনে মনে শুধু জুলিয়নের উদ্দেশ্যে একই কথা বলে যেতে লাগলাম, ‘প্লিজ দয়া করে এখন যেন মরে যেও না।। বোকা বুড়ো, এইভাবে পৃথিবী থেকে ‘চেক আউট’ করার এখনও হয়নি তোমার, এরকম মৃত্যু কিছুতেই তোমার প্রাপ্য হতে পারে। অদ্বিলিত কর্মচারীটি এতোক্ষণ এমনভাবে দাঁড়িয়ে ছিলো যেন সে যুগযুগ্মর ধরে ওইভাবেই দাঁড়িয়ে আছে। তাকে যেন ওই জায়গায় কেউ দিয়েছে বলে মনে হলো। কিন্তু জুলিয়ানের এই অবস্থা দেখে সেও ছুটে এলো। তার পরিচর্যায় জুলিয়নের সহকারী তার পাশে এসে বর্ষালা তার সোনালী, লম্বা লম্বা চুল, দুশ্চিন্তায় এলিয়ে পড়লো জুলিয়নের রক্তাভ মুখের উপর। খুব আন্তে আস্তে সে জুলিয়নের উদ্দেশ্যে আশ্বাসবাণী শুনিয়ে যেতে লাগলো, যা নিশ্চিতভাবে জুলিয়নের কানে পৌঁছালো না।

পৃষ্ঠা:০২

জুলিয়নকে চিনি আমি গত সতেরা বছর ধরে। জুলিয়নের এক পার্টনারই আমাকে এই ফার্মে নিয়ে এসেছিলো, ‘সামার রিসার্চ ইন্টার্ন’ হিসেবে। সেই সময় জুলিয়ন ছিল এই ফার্মের উজ্জ্বল নক্ষত্র। উঠতি এক অনন্য ও অসাধারণ প্রতিভা। দারুণ সুপুরুষ এবং বিখ্যাত এ্যটর্নি হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। মনে আছে, একদিন অনেক রাত অবধি কাজ করছিলাম ফার্মের অফিসে। অফিসের এক কোনে রাজকীয় চেম্বারটি ছিল এই জুলিয়নের। তার অনুপস্থিতিতে লুকিয়ে তার চেম্বারের বিশাল টেবিলের উপর রাখা, ফ্রেমে বাঁধানো, একটি ‘কোটেশন’ দেখছিলাম। উক্তিটি উইনস্টন চার্চিলের। তবে মনে হয়েছিলো জুলিয়নের জীবনের সঙ্গে, জীবনধারার সঙ্গে, সেটির অদ্ভুত এক মিল রয়েছে। যেন জুলিয়নের মনের কথাই সেদিন উঠে এসেছিলো উইনস্টন চার্চিলের কণ্ঠে- ‘নিশ্চিতভাবেই আজ আমরাই আমাদের ভাগ্যের নিয়ন্তা যে কাজ আমাদের হাতে অর্পণ করা হয়েছে, তা আমাদের সাধ্যের বা ক্ষমতার বাইরে নয় এবং এ কাজ সম্পূর্ণ করতে গেলে যে ধরনের কষ্ট ও যন্ত্রণার সম্মুখীন হতে হবে তা আমাদের সহাশক্তির বাইরেও নয় আমাদের নিজেদের আমাদের বিশ্বাস আছে, এবং মনে জেতার অদম্য আমরা বঞ্চিত হব না।’ যতক্ষণ অবধি আছে, জয় থেকে নিজের চিন্তা ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই তেরি হচ্ছিলো জুলিয়ন। সে মানতো যে জীবনে চরম সফলতাই পৌঁছানোর জন্য আঠারো-উনিশ ঘণ্টা দিনে একমাত্র লক্ষ্য এবং সেখানে বিটা খাটতেও এতোটুকু দ্বিধা ছিলো না তার। লোকমুখে শুনেছি ওর ঠাকুরদা অত্যন্ত নাম করা সিনেটর ছিলেন। বাবা ছিলেন দেশের সর্বোচ্চো আদালত, ফেডারেল কোর্টের এক প্রথিতযশা জজ। বলা চলে অনেকটা অর্থ প্রাচুর্যের মধ্যেই বড় হয়ে উঠেছিল জুলিয়ন। ‘আর্মাসিনি’ পরিহিত মানুষটির পরিবারের তরফ থেকেও তার থেকে কম প্রত্যাশা ছিলো না। তবে একথা আমি হলফ করে বলতে পারি, জুলিয়ন ছিলো ঠিক নিজের মতো। অন্য আট দশজন থেকে একেবারেই আলাধা। পরিবারের অন্যদের মতো নয়। যাকে একেবারে নিজের পায়ে দাঁড়ানো মানুষ বলা চলে। নিজে যা চেয়েছে তাই করেছে। আর যা করেছে তাতে ছাপ রেখেছে একান্ত নিজস্বতার। জুলিয়নের কোর্টরুম বাদানুবাদ, তার নিজস্ব কায়দার জেরা, আরো নানা কীর্তি প্রায়ই সংবাদপত্রে প্রথম পাতায় জায়গা করে নিতো। ধনী এবং বিখ্যাত ব্যক্তিরা কোনোরকম আইনি সমস্যায় পড়লেই ভিড় জমাতো

পৃষ্ঠা:০৩

জুলিয়নের অফিসে। তারা বিশ্বাস করতেন তীক্ষ্ণ বৃদ্ধিসম্পন্ন এবং আক্রমাণাত্যক এমন একজন আইনজীবীই তাদের সমস্যার সমাধান করতে পারে। জুলিয়নের কাজের বাইরের (কর্ম বহির্ভূত) জীবনটাও ছিল মিডিয়ার জন্য দারুণ রসালো উপাদান। কাজ সেরে প্রায় মাঝরাতে, তন্বী, শিখরদেশনা ফ্যাশন মডেলদের নিয়ে শহরের নামি রেস্তোরায় পাণিয়’র ফোয়ারা ছোটানো হোক; বা তথাকথিত রকের দালাল বন্ধু-বান্ধব, যাদের সে ডাকতো ‘শেষের গুরু’র দল বলে; তাদের সাথে বেহেড মাতাল হয়ে, কোথাও হারিয়ে যাওয়া হোক; মিডিয়ার কাছে ওর রঙিন জীবন ছিলো একেবারে ‘খবরে’ ঠাসা। আমি আজও বলতে পারি না, সেই গ্রীষ্মে শোরগোল ফেলে দেওয়া, রোমহর্ষক এক খুনের মামলা নিয়ে কাজ করার সময় ও আমাকেই কেন বেছে নিয়েছিল। যদিও আমি ওরই মতো হার্ভাড ল’ কলেজ থেকে স্নাতক হয়েছিলাম; কিন্তু, ওর ফার্মের কোনো বিশেষ জাজ্বল্যমান নক্ষত্র আমি কখনোই ছিলাম না । আমার ধমনীতেও বইতো না কোনো নীল রক্ত নীলু যুক্ত আমার বাবা কিছুদিন জাহাজে কাজ করার পর সারাটা জীবন একটি ব্যাঙ্কে সুরক্ষাকর্মী হয়েই কাটিয়ে দিলেন। মা ও ছিলেন খুবই সাদামাটা পরিবারের মেয়ে। তবু কিভাবে যেন ওর নজরে এসে গেলাম। পৃথিবীর অন্যতম খুনের মামলা’ বলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পত্র-পত্রিকা যাকে আখ্যা দিয়েছিল, এবং যে মামলায় কাজ করার জন্য আমার চেয়ে অনেক দক্ষ, এবং ফার্মের অনেক সিনিয়র অ্যাডভোকেটরা ব্যগ্র হয়েছিলেন, সেখানে জুলিয়নকে সাহায্য করার দায়িত্ব পেলাম আমি। পরে জুলিয়ন আমায় জানিয়েছিল যে সেদিন আমাকে বেছে নেওয়ার কারণ ছিল, আমার মধ্যে ভালো কাজ করার ‘খিদে’ দেখতে পেয়েছিল ও। কেসটিতে বলাই বাহুল্য জয় হলো আমাদের। যে বিজনেস একসিকিউটিভটি তার স্ত্রীকে নৃশংসভাবে হত্যা কারার জন্য অভিযুক্ত হয়েছিল, সে নির্দোষ প্রমাণিত হলো। মুক্তি পেল সে। মানে, একজন মানুষ নিজের বিবেক দংশন এড়িয়ে যতখানি মুক্ত থাকতে পারে আর কি। সেই গ্রীষ্মের কোর্টরুমে সেদিন আমি অনেক কিছুই শিখলাম। শিখলাম যে, যেখানে আদৌ কোনো রকম সন্দেহের অবকাশই নেই, সেখানে কি করে কেসের স্বার্থে সন্দেহের বীজ পুঁতে দিতে হয়। এবং যে অ্যাডভোকেট যত বড় হতে চায়, এই কাজে তাকে ততটাই দক্ষ হয়ে উঠতে হয়। মনোস্তত্ত্বের খেলায় কি করে বিপক্ষের চালকে মাৎ দিতে হয়, তা সত্যি শেখার মতো

পৃষ্ঠা:০৪

জিনিস। আর সেবার, এই কাজে অন্যতম দক্ষ এক মানুষকে তার সেরা খেলায় মেতে উঠতে দেখলাম আমি। তার সবকটি চাল শুষে নিয়েছিলাম স্পঞ্জের মতো। জুলিয়নের আগ্রহেই বলা যায়, ওর ফর্মে সহযোগী হয়ে রয়ে গেলাম। বন্ধুত্ব তৈরি হলো। সময়ের সাথে সাথে তা গাঢ় থেকে গাঢ়তর হলো। তবে একথা বলতে দ্বিধা নেই যে, সহকর্মী এবং অ্যাডভোকেট হিসেবে ওর সাথে কাজ করা মোটেই সহজ ছিলো না। জুনিয়র হিসেবে ওর সাথে থাকার অর্থ, সময়ে সময়ে চূড়ান্ত নৈরাশ্য, অবসাদ, ঘন ঘন রাতভর ব্রিফিং চিৎকার-চেঁচামেচি। হয় জুলিয়নের মতো মেনে নাও, নয়তো বেড়িয়ে যাওয়ার দরজা খোলাই আছে। জুলিয়নের কখনো ভুল হয় না। জুলিয়ন কখনো ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। যে তার মতে একমত নয়, তার কোনো স্থান নেই জুলিয়নের ফার্মে। তবে এহেন স্বৈরাচারী একটি মানুষের অন্তরটা ছিল অত্যন্ত নরম। মানুষের জন্য অবশ্যই ভাবনা ছিল তার। যাই কাজ থাকুক না কেন, রোজ জেনির কথা জিজ্ঞেস করতে ভুলতো না। জেনি মানে আমার বেশ কয়েক বছরের ‘নববিবাহিতা’ স্ত্রী আর কি! আমার কিছু আর্থিক সমস্যার কথা অন্য এক শিক্ষানবীশ উকিলের কাছ থেকে শুনে জুলিয়ন বেশ বড়সড় একটি স্কালারশিপের ব্যবস্থা করে দেয়। হ্যাঁ, একথা সত্যি যে টাকা-পয়সা উড়িয়ে ফুর্তি করতে ভালোবাসতো জুলিয়ন। ভালোবাসতো চূড়ান্ত ফুর্তি করতে, কিন্তু বন্ধু যাকে একবার মনে জায়গা দিতো, তাদের জন্য সর্বদাই কিছু করার চেষ্টা করতো। কখনো তাদের অবজ্ঞা করতো না। ওর মূল সমস্যাটা হলো, আদতে জুলিয়ন ছিল একজন কাজ পাগল লোক। প্রথম কয়েক বছর জুলিয়ন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করে যেত, তার ফার্মটাকে ‘দাঁড় করানোর জন্য’। ভাবতো ‘সামনের বছর নিশ্চয়ই’, কেমান্সে ছুটি কাটাতে যাবে। যত সময় গেল, তত তার উপর মানুষের ভরসা বাড়তে শুরু করল, আর সেই সঙ্গে বাড়তে লাগলো তার মাথার উপর প্রচণ্ড কাজের চাপ। ভালো থেকে আরও ভালো ও চ্যালেঞ্জিং মামলা আসতে শুরু করলো হাতে। আর জুলিয়ন নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যেতে শুরু করল, আগে আরও আগে। কোনো কোনো অলস মুহূর্তে, জুলিয়ন আমার কাছে স্বীকার করতো, যে সারা রাত সে দুঘণ্টার বেশি ঘুমোতে পারতো না। একটু বেশি ঘুমোলেই, এক প্রবল অপরাধবোধে তার ঘুম ভেঙে যেত। মনে হতো মামলার ফাইল না দেখে এভাবে ঘুমিয়ে সে অন্যায় করছে, আমার কাছে ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠল যে, প্রতিষ্ঠিত হওয়ার এক প্রবল ক্ষুধায় জর্জরিত হয়ে রয়েছে সে।

পৃষ্ঠা:০৫

আরও সম্মান, আরও যশ, আরও প্রতিপত্তি, আরও টাকার প্রত্যাশায় উন্মাদের মতো ছুটে চলেছে জুলিয়ন। প্রত্যাশিতভাবেই, জুলিয়ন লব্ধ প্রতিষ্ঠিত হয়ে উঠল। বহু লোকে যা পাওয়ার শুধু, স্বপ্নই দেখে যায় সারাজীবন, জুলিয়নের জীবনে তাই সত্য হয়ে উঠলো। সাত সংখ্যার মাসিক আয়, বিখ্যাত ব্যক্তিদের পাড়ায় চোখ ধাঁধানো বিশাল বাড়ি একটি প্রাণভটে জেট প্লেন, একটি ট্রপিকল দ্বীপপুঞ্জে নিজস্ব বসন্তকুঞ্জ এবং তার সবচেয়ে প্রিয়, ড্রাইভওয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা লাল টুকটুকে একটি ফেরারি গাড়ি। শুনতে যত অসাধারণ ও ঈর্ষণীয় মনে হোক না কেন, জীবনটা কিন্তু সত্যিই অত সুন্দর কাটছিল না জুলিয়নের। কোথায় যেন ঘনিয়ে আসা এক বিপদের সূচনা অনুভব করতে পারছিলাম আমি। আমি যে ফার্মের অন্য সকলের চেয়ে বেশি অনুভূতিপ্রবণ ছিলাম তা নয়, আসলে এই মানুষটার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সময় কাটাতাম আমি। কাজের সূত্রে আমরা দুজনে সবসময় একসঙ্গে থাকতাম। কাজ যেন আর কম হতো না। একের পর এক, দুর্দান্ত কেস যেন আমাদের অপেক্ষায় বর্ষে থাকতো। সাড়াজাগানো মামলা শেষ হতে না হতেই, তারচেয়েও বেশি চ্যালেঞ্জিং মামলা গুটিপায়ে আমাদের ফার্মের আর কোনো প্রস্তুতিই জুলিয়নের জন্য পর্যাপ্ত রিজায় আসে হাজির হতো। এরকম প্রশ্ন বা নিদেনপক্ষে ওরকম প্রশ্ন ও ‘ভগবান না করুন, যদি বেবিচারপতি করে ফেলেন, তখন কি জবাব দেবে জুলিয়ন? যা মনে ভাবছে, যেভাবে তৈরি হচ্ছে, শুনানীর সময় যদি তা নিখুঁত না হয়ার সকলের সামনে যদি প্রতিপক্ষের মঅ্যাডভোকেট তাকে এমন কিছু প্রশ্ন করে, যার উত্তর তার কাছে নেই, মএকঘর লোকের সামনে, মিডিয়ার দৃষ্টির সামনে, অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে মথাকবে সে? তা কখনোই হতে পারে না।’ তাই প্রস্তুতি চলতেই থাকতো। মধীরে ধীরে আমিও ঢুকে যেতে থাকি কর্মকেন্দ্রিক এই জটিল পৃথিবীতে। মদিনের পর দিন, সময়ের চাকরের মতো, ঘড়ির কাটার টিকটিকির সঙ্গে শুরু হতো আমাদের। কাঁচের ঘরে, স্টিলের মনোলিথ করা, পয়ষট্টি তলার একটি অফিসে দুটি কাজপাগল লোক যখন অক্লান্ত খেটে যেত, তখন সারা পৃথিবীর যত সুস্থ লোক তাদের ঘরের ভিতর, পরিবার নিয়ে বসে দিনের শেষে আরাম করতো আর ভাবতো এ দুটি লোক বুঝি সফলতার চূড়ায় বসে সমগ্র ভুবনকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোড়াবার ক্ষমতা রাখে। যত জুলিয়নের সঙ্গে সময় কাটাতে লাগলাম, দেখলাম ও যেন কাজের মধ্যে আরও ডুবে যেতে লাগলো। মাঝে মধ্যে মনে হলো ওর বুঝি মনে কোনো মৃত্যুকামনা আছে। নাহলে এভাবে কেউ নিজেকে নিঃশেষ করতে পারে?

পৃষ্ঠা:০৬

কোনো কিছুতেই ও সন্তুষ্ট হতো না। ঠিক এই সময়েই ওর বিয়েটা ভেঙে গেল। বাবার সঙ্গে ওর কথাবার্তা প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। কোনো এক মরীচিকার পিছনে অদম্য এক দৌড় শুরু করেছিল জুলিয়ন। তবে কি যে সে চাইতো, তা সে নিজেও বুঝতে পারতো না। আর তা ধরা পড়তো ওর শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থা থেকে। তিপ্পান্ন বছর বয়সে জুলিয়নকে দেখে মনে হতো যেন সত্তরে পা দিয়েছে। মুখ ছেয়ে গিয়েছিল বলিরেখায়। প্রচণ্ড মানসিক চাপ, এবং সামঞ্জস্যহীন জীবনযাত্রা তাদের প্রতিশোধ তুলতে শুরু করেছিল জুলিয়নের চেহারায়। ফরাসি রেস্টুরেন্টে মধ্যরাতে ডিনার, মোটা কিউবান সিগার আর কনিয়াকের পর কনিয়াক পান, ওকে অস্বস্তিকর রকমের স্থূলকায় বানিয়ে দিয়েছিল। ও সবসময় অসুস্থতা ও অসীম ক্লান্তির কথা বলতো আমায়, আর বারবার এও বলতো যে এরকম ক্লান্তি ওর অসহ্য হয়ে উঠছে। ওর মধ্যে যে রসবোধ লক্ষ করেছিলাম আমি তাও ধীরে ধীরে কোথায় হারিয়ে গেল। মুখের হাসি প্রায় বিরল হয়ে উঠল। উদ্দীপনাময়, ঝকঝকে জুলিয়ন কেমন করে গম্ভীর হয়ে গেল। আমার ধারণা, এ সময় থেকেই জুলিয়নের হারিয়ে গেল। জীবনের সব উদ্দেশে সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা হলো, সময়ের কার্যকলাপেও ওর সমস্ত আগ্রহ নষ্ট হয়ে খেল সাথে কোর্টরুমের যে কোর্টরুমে একদিন জুলিয়নের কেস দেখার জন্য মানুষ ভিড় জমাতো, প্রতিপক্ষ সিটিয়ে থাকতো মিডিয়া আগ্রহ নিয়ে বসে থাকতো, এমন কি জজ সাহেবও ওর জ্বলন্ত, তীক্ষ্ণ, চুলচেড়া বাদানুবাদ শানার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন, সেই বাগ্মিতা কোথায় যেন হারিয়ে গেল। কোর্টরুমে থাকলেও মানসিকভাবে তার থেকে শত যোজন দূরে অবস্থান করতে লাগলো দেশের সবচেয়ে নামজাদা, অসম্ভব চতুর, এবং বাগ্মী এই অ্যাডভোকেটটি। একসময় শান্ত, গম্ভীর এবং হাসিমুখে, প্রতিপক্ষের ‘অবজেকশন’কে ফুৎকারে উড়িয়ে দেওয়া জুলিয়ন, দিনে দিনে রুক্ষ, তির্যক এবং অধৈর্য হয়ে উঠলো। যে জজরা একসময় তাকে ‘আইনের জিনিয়াস’ বলে জানতেন, তাদের কাছেও এসময় জুলিয়নের ব্যবহার মাঝেমধ্যেই অসহনীয় হয়ে উঠতে শুরু করলো। সোজা কথায়, জুলিয়নের সেই বিদ্যুতের ন্যায় ঝলক হারিয়ে গেল। ওর সমগ্র জীবনের উপরেই নেমে আসতে শুরু করল নিকষ কালো অন্ধকার। জীবনের অত্যন্ত দ্রুতগতির জন্যই যে জুলিয়নের জীবন এদিকে মোড় নিল তা কিন্তু নয়। আমার মনে হতে শুরু করল যে এর ঝড় আর গভীরে কোথাও আছে। মনে হলো, এ এক আত্মিক শূন্যতা। প্রায় প্রতিদিনই জুলিয়ন

পৃষ্ঠা:০৭

বলতো, যে কোনো কাজেই আর আগ্রহ খুঁজে পাচ্ছে না সে। এক গভীর, অন্ধকারময় শূন্যতা চারপাশ থেকে ঘিরে ধরছে তাকে। গুলিয়ন বলতেন আইনের দুনিয়ায়, যদিও বা পারিবারিক চাপের কারণেই তার আসা, তবু প্রথম প্রথম প্রতিদিনের নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের হাতখানি ওকে খুব উজ্জীবিত করে রাখতো। সমাজকে পাল্টে দেওয়ার আইনি যে ক্ষমতা, সেটাই প্রেরণা দিতো ওকে। প্রথম প্রথম ‘কানেকটিকাট’ শহর থেকে আসা এক ধনী পরিবারের সন্তান ছাড়া আর কিছুই ছিল না সে। দুষ্টের দমন করে, সমাজের ভালো করার স্বপ্নে বিভোর হয়েছিল সে সময়ের জুলিয়ন। সে জানতো, একদিন সে অপরের কাজে আসতে পারবে, সমাজের মঙ্গলসাধন করতে। সক্ষম হবে। সেই বোধ, সেই স্বপ্ন তাকে তার জীবনে এক নতুন অর্থ বহন করে এনে দিয়েছিল। জীবনে এক নতুন উদ্দেশ্য এনে দিয়েছিল। উস্কে দিয়েছিল স্বপ্ন দেখার বাসনা। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সব কোথায় হারিয়ে গেল। জুলিয়নের জীবনে কোথাও যেন লুকিয়ে ছিল আরো অজানা কিছু অপ্রিয় সত্য। আমি এই ফার্মে যোগ দেওয়ার আগেই ওর জীবনে ভয়ঙ্কর কোনো ঘটনা ঘটেছিল। অফিসের সিনিয়রদের মতে অবর্ণনীয় কিছু দুঃখজনক ঘটনা ওর জীবনে ঘটেছিল, যা বহু চেষ্টা করেও আমি ভারাও আমি আরও কাছ থেকে বের করতে পারিনি। এমনকি, ঠোঁটপাতলা বুড়ো স্থানেজিং পার্টনার হার্ডিং, যে নিজের বিশাল অফিসের চেয়ে রিৎজ-কুলিটন এর পানশালাতেই সময় কাটাতো বেশি, সেই বৃদ্ধও এই একটি বিষয়ে একেবারে ঠোঁট সেলাই করে রেখেছিল। সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন অতীতের ঘটনাটি যাই হোক না কেন, আমার ধারণা তার সঙ্গে কোনো না কোনো যোগ ছিল জুলিয়নের জীবনের অধোগতির। ঘটনাটা সম্পর্কে কৌতূহল আমার যথেষ্ট ছিল ঠিকই, তবে তার চেয়েও বেশি ছিল ওকে সাহায্য করার ইচ্ছা। ও তো শুধু আমার গুরু ছিল না, আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু ছিল জুলিয়ন। আর তারপরই ঘটল এই ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা। একটা ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক অসামান্য জুলিয়ন ম্যান্টেলকে আবার ফিরিয়ে আনলো মাটির কাছে, মৃত্যুর শীতলতার খুব কাছাকাছি। সাত নম্বর কোর্টরুমে, যেখানে সে কিছুদিন আগেই জিতেছিল সেরা খুনের মামলাটি, সেখানেই লুটিয়ে পড়ল জুলিয়ন ম্যান্টেলের দেহ।

পৃষ্ঠা:০৮

অধ্যায় ২

এক রহস্যময় সাক্ষাৎপ্রার্থী

আমাদের ফার্মের সকলকে ডাকা হয়েছিল জরুরি মিটিংয়ে। মূল বোর্ডরুমে ঢুকতে ঢুকতেই বুঝতে পারলাম গুরুতর কিছু একটা ঘটেছে। সমবেত সকলের সামনে মুখ খুললেন বৃদ্ধ হার্ডিং। ‘আমি অত্যন্ত দুঃখিত যে, আজ একটি দুঃসংবাদ দেব বলে আপনাদের সকলকে এখানে ডেকে পাঠানো হয়েছে। গতকাল এয়ার অ্যাটলান্টিক মামলার শুনানি চলাকালীন জুলিয়ন ম্যান্টেল এক মারাত্মক হৃদরোগে (স্ট্রোকে) আক্রান্ত হন। যদিও তিনি ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটে চিকিৎসাধীন, তবে তার চিকিৎসকেরা আমাকে জানিয়েছেন যে, তিনি এখন বিপদমুক্ত এবং খুব তাড়াতাড়িই সেরে উঠবেন। তবে জুলিয়ন এরই মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং আমি মনে রুমি সেই সিদ্ধান্ত আপনাদের সকলেরও জানা প্রয়োজন। জুলিয়ন এই ফোর্ম, আমাদের এই পরিবার এবং সেই সঙ্গে আইন পেশা, এ সবই ছেঁড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সে কোনোদিনই আর আমাদের এই ফার্মে ফিরে আসবে না। খবরটা শুনে প্রচণ্ড ধাক্কা খেলাম আমি। আমি জানতাম ওর জীবনে বেশকিছু সমস্যা আছে, কিন্তু তা বলেও ময়দান ছেড়ে চলে যাবে একথা ভাবতেই পারিনি আমি। আর এরকম একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল আর আমি একবারও জানতে পারলাম না। আমাদের দুজনের যা সম্পর্ক, তাতে আমাকে একবারও কি একথা নিজে জানানোর কথা মনে হল না ওর? হাসপাতালেও আমাকে ওর সাথে দেখা করতে দেওয়া হয় নি। যখনই আমি গিয়ে ওকে খবর পাঠিয়েছি, নার্সরা জানিয়েছে যে ওদের বলে রাখা হয়েছে, যে উনি ঘুমোচ্ছে এবং ওকে যেন বিরক্ত করা না হয়। যে ক’দিন ফোন করেছি, একদিনও ফোন ধরেনি। হয়তো, আমায় দেখলে ওর সেই জীবনটার কথা মনে পড়ে যেত যা ও ভুলে যেতে চেয়েছিল। কে জানে! তবে একথা না বলে পারছি না যে এরকম ব্যবহারে বেশ খারাপ লেগেছিলো আমার। এতোসব ঘটনা ঘটে গেছে প্রায় বছর তিনেক হলো। শেষ অবধি শুনেছি, জুলিয়ন ভারতবর্ষের দিকে রওনা দিয়েছে, কোনো একটা অভিযানে। এক পার্টনারকে যাওয়ার আগে সে বলেছিল যে তার জীবনটা বড় জটিল হয়ে

পৃষ্ঠা:০৯

গেছে। এটাকে সে সহজ, সরল বানাতে চায়। অনেক প্রশ্ন জমে গেছে মনে। তার উত্তর চাই। আর তারই খোঁজে সে রওনা দিচ্ছে রহস্যে ভরা, কিংবদন্তির দেশ ভারতবর্ষে। সে তার প্রাসাদোপম ভিলা বিক্রি করে দিয়েছে, নিজের বিমান এবং দ্বীপটিও বিক্রি করে দিয়েছে। বিক্রি করেছে নিজের প্রাণের চেয়ে প্রিয় ফেরারি গাড়িটিও। মনে মনে ভাবার চেষ্টা করলাম, ‘জুলিয়ন ম্যান্টেল-এক ভারতীয় যোগীপুরুষ। আসলে, প্রকৃতির নিয়ম চলে এক রহস্যময় নিয়মে। ওই তিনবছর কোথা দিয়ে কেটে গেল জানি না। একজন সদাব্যস্ত অ্যাডভোকেট থেকে কখন যে বয়স্ক এবং কিছুটা রূঢ় অ্যাডভোকেট হয়ে উঠলাম কে জানে। আমার স্ত্রী জেনি আর আমি পরিবারের সদস্য বাড়াবার চিন্তায় রত হলাম। জীবনটাকে একটু অন্যরকম, একটু বেশি অর্থপূর্ণ করে গড়ে তুলতে ইচ্ছে করছিল। বোধহয় সন্তানই আমার জীবনে সেই পরিবর্তন নিয়ে আসতে সাহায্য করলো। এ পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি এবং সেখানে আমার ভূমিকায় আমূল পরিবর্তন ঘটলো। আমার বাবা বলতেন, ‘জন, মৃত্যুশয্যায় তোমার কখনো মনে হবে না, আরও কিছুটা বেশি সময় অফিসে কাটালে না কেন।’ তাই আমি পরিবারেই একটু রেশি সময় দিতে শুরু করলাম। হয়তো কিছুটা ছাপোষা, তবে একটা সুস্থ জীবনধারা বেছে নিলাম আমি। রোটারি ক্লাবে যোগ দিলাম। প্রতি শনিবার নিয়ম করে গল্ফ খেলতে শুরু করলাম। আমার পরিবার এবং আমার অক্কেল, কারও আমাকে নিয়ে কোনো অভিযোগ রইল না। তবে একরা বলতেই হবে, যে এ সবের মধ্যে যখন একা হয়ে পড়তাম, তখনই জুলিয়নের কথা মনে পড়তো। জানতে ইচ্ছে করতো, এক বছরে সে কতোখানি বদলেছে, আর এভাবে অপ্রত্যাশিত বিচ্ছেদ ঘটিয়ে কেনই বা চলে গেল। হয়তো ও ভারতেই রয়ে গেছে। ভারতবর্ষ এতো বিচিত্র যে, ওর মতো অস্থির চিত্ত মানুষ দেশটাকে হয়তো নিজের ঘর বানিয়ে নিয়েছে। হয়তো নেপালের পাহাড়ে, পর্বতে ট্রেকিং করে বেড়াচ্ছে, বা স্কুবা ডাইভিং কিন্তু একটা ব্যাপার নিশ্চিত যে ও আইন পেশাতে আর ফিরে আসেনি। বানপ্রন্থে যাওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত চেনা পরিচিত কারও কাছে একটা পোস্টকার্ডও পাঠায়নি সে। তবে মাস দু’য়েক আগে, আমার দরজায় কড়াঘাতে, আমার বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেল। সবেমাত্র তখন সারাদিনের ভয়ঙ্কর খাটনির পর আমার শেষ মক্কেলটি বেরিয়েছেন। আমার সহকারী জেনেভিভ আমার সাজানো, গোছানো ছোট অফিসটাতে উঁকি মারলেন।

পৃষ্ঠা:১০

‘জন, তোমার সঙ্গে একজন লোক দেখা করতে এসেছেন। বলছেন দেখা করা অত্যন্ত জরুরি, এবং তোমার সাথে কথা না বলে তিনি কিছুতেই যাবেন ना।’ ‘আমি সবে একটু বেডে যাচ্ছিলাম জেনেভিভ। সারাদিন পর একটু হালকা হয়েছি। রেস্ট সেরে মুখে কিছু দিয়ে হ্যামিলটনের ব্রিফটা নিয়ে বসতে হবে আমায়। এই মুহূর্তে কোনো লোকের সঙ্গে দেখা করতে চাই না আমি। ওকে বলো, সবাই যে ভাবে দেখা করে, অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে কালকে এসে আমার সঙ্গে দেখা করতে। আর যদি বাড়াবাড়ি করে, সিকিউরিটিকে ডাকো।’ ‘কিন্তু উনি বলছেন আপনার সাথে দেখা করার খুব প্রয়োজন ওর। কিছুতেই ‘না’ শুনতে চাইছেন না।’ একবার ভাবলাম নিজেই ডাকি সিকিউরিটিকে। তারপর ভাবলাম, হয়তো সত্যিই এই মুহূর্তে আমাকে প্রয়োজন ওই মানুষটারে। আমি মনে মনে পিছু হটলাম। ভাবলাম ‘কোনো না কোনোভাবে আমার ব্যবসা হয়েই যাবে।’ ঠিক আছে পাঠিয়ে দাও।’ আন্তে আন্তে দরজাটা খুলে গেল। সম্পূর্ণ খুলে যাওয়া দিয়জার উপারে স্মিত হাস্যমুখে মধ্য তিরিশের এক মুনা দাঁড়িয়ে আস্থাবান, মেদহীন, চাবুকের মতো চেহারা, প্রাণপ্রাচুর্য আর জীপেক্তিতে যেন ভরপুর। ওকে দেখে আমার আইন স্কুলের সেই বিরাট ধরিয়ার থেকে আসা, বিশাল বাড়ি, গাড়ি, নিখুঁত ত্বকসম্পন্ন সেই নিখুঁত ছেলেমেয়েগুলোর কথা মনে পড়ে গেল। তবে আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির মধ্যে যৌবন ভরপুর রূপ ছাড়াও ছিল আরেকটি জিনিস। অন্তরের এক অনাবিল প্রশান্তি, যা চেহারা ও মুখমণ্ডলকে এক অপার্থিব সৌন্দর্যে ভরিয়ে তুলেছিল। আর অসাধারণ যা লাগলো, তা হলো ওর চোখ। শানানো রেজারের ফল্য যেমন করে সদ্য জন্মানো দাড়ি সমূলে উৎপাটন করতে নরম মাংসপিন্ডের উপর দিয়ে ছুঁয়ে চলে যায়, ঠিক তেমন করে ওর নীল চোখের তীব্র অথচ শান্ত দৃষ্টি যেন আমাকে ছুঁয়ে বেড়িয়ে গেল। মনে মনে ভাবতে লাগলাম এ কি উঠতি কোনো অ্যাডভোকেট, ইদানীংকালে নাম টাম করে এখন আমার চাকরি ধরে টানাটানি করতে চায়? কিন্তু এভাবে তাকিয়ে আছে কেন আমার দিকে? আচ্ছা, এই সেই লোক নয়তো, যার ডিভোর্স কেস, তার স্ত্রীর হয়ে লড়ে গত সপ্তাহেই বেশ ভালোরকমভাবে জিতেছি? তাহলে তো দেখছি সিকিউরিটি ডাকার আইডিয়াটা নেহাৎ ভুল ছিল না।

পৃষ্ঠা ১১ থেকে  ২০

পৃষ্ঠা:১১

যুবা পুরুষটি আমার দিকে চেয়েই রইলেন, ঠিক যেমন করে কোনো এক প্রিয় শিষ্যের দিকে স্মিতহাস্যমুখে চেয়েই থাকতেন ভগবান বুদ্ধ। বেশ কিছুক্ষণ অস্বস্তিকর নীরবতার পর, হঠাৎ কথা বলে উঠল সে, এবং বেশ মন্দ্র কন্ঠে জন, তুমি কি সব দর্শনপ্রার্থীর সঙ্গে এরকম ব্যবহারই করে থাকো? এমনকি যে তোমার কোর্টরুমের সাফল্যের বিজ্ঞান পাঠ করিয়েছে, তার সাথেও? এখন তো মনে হচ্ছে, আমার ট্রেড সিক্রেটগুলো আমার নিজের কাছেই রাখা উচিত ছিল’ ঠোঁটের কোণে হাসি ছড়িয়ে বলে উঠলেন তিনি। আমার শরীরের ভেতর কেমন একটা শিহরণ খেলে গেল। আমি চিনতে পারলাম সেই শান্ত, স্নিগ্ধ, মন্দ্র কণ্ঠস্বর। আমার হার্ট জোরে জোরে লাফাতে লাগলো। ‘জুলিয়ন, তুমি? এ কি সত্যই তুমি? উফ্! আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।’ দর্শনার্থীর অট্টহাস্য আমার সন্দেহকে সত্যের চেহারা দিল। আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষটি আর কেউ নন, হারিয়ে যাওয়া সেই যোগী-জুলিয়ন ম্যান্টল। ওর এই অবর্ণনীয় পরিবর্তন দেখে আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। ভূতের মতো সেই চেহারা প্রাণহীন সেই চোখ, অসুস্থ কাশি-কোথায় গেল সেই মানুষটা, আমার সেই বয়সের আগেই বুড়িয়ে যাওয়া সহকর্মীটি? বয়স্ক চেহারা আর বিয়ী অভিব্যক্তি, এগুলো তো জুলিয়নের ট্রেডমার্ক হয়ে গিয়েছিল অস্ট্রিট আমার সামনে সেই মুহূর্তে যে লোকটা দাঁড়িয়ে ছিল সে স্বাস্থ্য আর সৌন্দর্যের চূড়ায় অবস্থান করছিল। তার বলিরেখাহীন, টানটান মুখ ঝকঝক করছিল। জাজ্বল্যমান চোখ দুটোর মধ্যে দিয়ে ভিতরের অসামান্য শান্ত স্নিগ্ধ ভাব। ওর দিকে তাকিয়ে, ওর পাশে বসেই আমার কেমন যেন এক প্রগাঢ় প্রশান্তির অনুভূতি হতে লাগলো। জুলিয়ন আর সেই পুরনো বিখ্যাত ল’ফার্মের দুশ্চিন্তামগ্ন, ‘টাইপ-এ’ মার্কা সিনিয়র পার্টনার নেই। তার বদলে সদাহাস্যময়, তরুণ, প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর এক অত্যাশ্চর্য মানুষ হয়ে ফিরে এসেছে। পরিবর্তনের যেন এক মূর্ত প্রতীক।

পৃষ্ঠা:১২

অধ্যায় ৩

জুলিয়ন ম্যান্টেলের হঠাৎ অত্যাশ্চর্য পরিবর্তন!

নতুন এই জুলিয়নকে দেখে আমি হতবাক হয়ে গেলাম! যেটুকু সময় পেলাম, শুধু মনে হতে লাগলো, কিছুদিন আগেও যে মানুষটাকে বয়সের তুলনায় অতি বয়স্ক এবং ক্লান্ত, শান্ত লাগতো, সেই মানুষটা মাত্র এই তিনটে বছরের মধ্যে এমন ঝকঝকে, প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর এক যুবা হয়ে উঠলো কি প্রকারে? তবে কি কোনো ঔষধের মাধ্যমে ‘যৌবনের মদিরা’ পানের সুযোগ পেলো? সময়ের কাঁটা তার জীবনে পিছনে ফিরে গেল কিভাবে? এ ব্যাপারে জুলিয়নই প্রথম মুখ খুললো। জানালো প্রচণ্ড প্রতিযোগিতাপূর্ণ এই আইনের দুনিয়া তার শরীরের উপর থাবা বসিয়েছিল। শুধু শারীরিক নয়, মানসিক এবং আত্মিক বোধেও ঘটেছিল বিচ্যুতি। জীবনে অতি দ্রুতগতি এবং বিরামহীন চাহিদা তাকে নিঃশেষ করে দিচ্ছিল। ধে-স্বীকার করলো, শারীরিকভাবে অসুস্থতাই শুধু নয়, মানসিক তীস্থতাও হারিয়ে গিয়েছিল তার। ভিতরের বহুরকম সমস্যার মাত্র একটিই বহিপ্রকাশ ঘটেছিল- সাংঘাতিক হার্ট অ্যাটাক। পৃথিবীর একজন শ্রেষ্ঠ ক্রিমিনাল ‘ল-ইয়ারে’র জীবনে, প্রচণ্ড চাপ, টেনশন এবং ক্লান্তিকর রুটিন, তার সবচেয়ে প্রয়োজনীয় এবং সবচেয়ে মানবিক যে দিকটি একেবারে নষ্ট করে দিয়েছিল তা হলো তার সত্তা বা স্পিরিট, ডাক্তার তাকে শেষবারের মতো জানিয়ে দিলেন হয় তিনি আইনি প্রাকটিস ছাড়ুন নয় তো খুব শিগগিরি তাকে এ পৃথিবীর মায়া ছাড়তে হতে পারে। এ সময় জুলিয়ন নিজের ভেতরের সেই হারিয়ে যাওয়া স্ফুলিঙ্গকে বাতাস দিয়ে জাগিয়ে তোলার সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে গেল, যা তার জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছিল বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে। ল’ প্র্যাকটিস যত প্রাণের আনন্দ থেকে, টাকা রোজগারের পথ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, নিজের ভিতরে জ্বলতে থাকা সে আগুনের স্ফুলিঙ্গ ততই নিভে এসেছিল। ডাক্তারের এই পরামর্শে, জুলিয়ন যেন নতুন করে বেঁচে ওঠার তাগিদ খুঁজে পেল। নিজের সমস্ত স্থাবর, অবস্থাবর সম্পত্তি জলের দরে বিক্রি করে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা দিল একথা বলতে গিয়ে দৃশ্যতই উত্তেজিত হয়ে উঠল তার মুখ, চোখ। সেই ভারতবর্ষ, যার আদি সভ্যতা ও সংস্কৃতি ও অতীন্দ্রিয়বাদ;

পৃষ্ঠা:১৩

অর্থাৎ ধ্যান ও সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের মাধ্যমে ঈশ্বরকে পাওয়া যায়, এই বিশ্বাস বহু বছর ধরে আকষণ করতো তাকে।ভারতে পৌঁছে ছোট থেকে ছোট, একেবারে প্রত্যন্ত এলাকার গ্রামে ঘুরে বেড়াতে লাগলো জুলিয়ন। কখনো ট্রেনে, কখনো বা পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়াতে লাগলো ভারতের শহর থেকে গ্রামে, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। পথ চলতে চলতে শিখে নিতে লাগলো নতুন নতুন প্রথা, চোখ মেলে দেখতে লাগলো যুগ যুগ ধরে দাঁড়িয়ে থাকা হাজারো দ্রষ্টব্য স্থান, আর হৃদয় ভরে আহরণ করে নিতে লাগলো এক আশ্চর্য সদর্থক জীবনদর্শন। এমনকি যারা পশ্চিমের এই বিদেশির জন্য নিজেদের বাড়ি ও হৃদয়ের দরজা খুব অল্পই ফাঁক করেছিল, তাদের জীবনদর্শনও ছুঁয়ে গিয়েছিল জুলিয়নকে। ওই অসাধারণ পরিবেশে, অনাবিল আনন্দে কোথা দিয়ে যেন কেটে যায় দিন, দিন থেকে সপ্তাহ, সপ্তাহ থেকে মাস। জুলিয়ন যেন নতুন করে বেঁচে উঠল। নিজেকে আবার সম্পূর্ণভাবে খুঁজে পেল সে। শৈশবের পর এতো আনন্দে সে কখনো থাকেনি। নিজের সহজাত উদ্দীপনা, উৎসাহ, সৃজনশীলতা সব যেন ফিরে আসতে শুরু করলো তার জীবনে। আবার যেন বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা জেগে উঠলো মনের মধ্যে, যা বেশ কয়েকবছর প্রায় হারিয়েই গিয়েছিল। মনটা সব সময় খুশি খুশি থাকতে লাগলো। বহু বছর পর জুলিয়নের জীবনে ফিরে এলো সেই হারিয়ে যাওয়া মানিক অন্যদিল হাসি।যদিও এই অপরূপ ভূমিতে প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত কাটছিল প্রাণোচ্ছল খুশিতে, তবে জুলিয়ন কিন্তু সেখানে মনে মনে কিছুদিনের ছুটি কাটাতেই গিয়েছিল। ভারাক্রান্ত মনটাকে হাকো করতে ভারতবর্ষের মতো এক রহস্যময় দেশই ছিল তার পছন্দের তালিকায় শীর্ষে। তবে ওই সুদূর দেশে দিনগুলো যত কাটতে লাগলো ততই নিজের ভিতর থেকে কে যেন আর্তনাদ শুরু করলো। বলতে লাগলো, ‘খোঁজো জুলিয়ন, খোঁজো। নিজেকে, নিজের জীবনের প্রকৃত অর্থ খুঁজে বের করো। এ পৃথিবীতে কেনইবা এসেছো? জীবনের উদ্দেশ্যে কী, তার উত্তর খোঁজো। আজই শুরু করো জুলিয়ন, নয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে।’ তবে এসব জানতে গেলে তো সেই সংস্কৃতির সমুদ্রে অবগাহন করে তুলে আনতে হবে জ্ঞানের মহামূল্যবান মণি- মানিক্য, যা প্রকৃত শিক্ষা দেবে, জানাবে অর্থপূর্ণ এবং আলোকদীপ্ত জীবনের রহস্য কী? ‘আমি খুব বড় বড় কথা বলছি বলে ভেবোনা, জন। আসলে আমার অন্তরের অমোঘ নির্দেশই আমি শুরু করলাম আমার আধ্যাত্মপথে যাত্রা। আমার আমিত্ব, আমার বুদ্ধিমত্তার সেই স্ফুলিঙ্গকে খুঁজে পাওয়ার আশায়। জন,

পৃষ্ঠা:১৪

আমার জীবনের সব চেয়ে আনন্দের, সবচেয়ে বেশি মুক্তির অনুভূতি আমি উপভোগ করেছি এই সময়ে। যত জুলিয়ন খুঁজতে লাগলো, তত শুনতে লাগলো ভারতীয় সাধু ও যোগীপুরুষদের কথা, যারা শতাধিক বছর বেঁচে থাকেন অনায়াসে। বার্ধক্য, জ্বরাকে জয় করে বৃদ্ধ বয়সেও প্রাণশক্তি ও যৌবন ধরে রাখতে সমর্থ হন। যত সে ভ্রমণ করতে লাগলো ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে, তত শুনতে পেল সেই সব সন্ন্যাসী ও যোগীদের সম্পর্কে যারা মনকে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখেন এবং আত্মার সর্বাধিক বিকাশ ঘটাতে সাহায্য করেন। আর যত জুলিয়ন জানতে লাগলো, শুনতে লাগলো, ততই এ বিষয়ে তার আগ্রহ বাড়তে লাগলো। প্রকৃতির বিরুদ্ধে মানুষের যাত্রার এ বিস্ময়কর ঘটনার রহস্য জানার জন্য তার চিত্ত অস্থির হয়ে উঠলো। তার যাত্রার প্রথম দিকে জুলিয়ন বহু ধর্মগুরু এবং শ্রদ্ধেয় আধ্যাত্মিক শিক্ষকদের সান্নিধ্যে আসে। প্রত্যেকেই তাকে উন্মুক্ত হৃদয়ে গ্রহণ করেন। হৃদয় উজাড় করে তাদের শিক্ষা দেন সে সব জিনিসের যা তারা বছরের পর বছর ধরে সাধনার মঞ্চেয়ে আয়ত্ত করেছেন। ভারতবর্ষের পথে প্রান্তরে দাঁড়িয়ে থাকা সম্প্রদায়ের মন্দিরগুলোও জুলিয়নকে অভিভূত করে। তার মনে হয় যুগ যুগ, শতাব্দীরপর শতাব্দী ধরে আহরণ করে আনা জ্ঞান ভাণ্ডারকে রক্ষা করার জন্য যেন এইসব মন্দির লৌহকপাটের মতো মাথা চারিদিকের এই পবিত্রতা তাকে ছুঁয়ে যেত, করে দাঁড়িয়ে আছে। ‘জন আমার জীবনের সবচেয়ে স্বপ্নময় সময় কাটিয়েছি আমি এই সময়ে। জীবনের পথ চলতে চলতে ক্লান্ত, মা পথিক আমি, আমার নিজের বলতে যা কিছু ছিল রেসহর্স থেকে রোলেক্স অবধি সব বিক্রি করে, সর্বসাকুল্যে যা কিছু ছিল তা রুকসকে নিয়ে পাড়ি দিয়েছিলাম অনিশ্চিতের উদ্দেশ্যে এক আশ্চর্য ঐতিহ্যময় দেশে।’ ‘জুলিয়ন, সব কিছু এভাবে ত্যাগ করে চলে যাওয়া, নিশ্চয়ই খুব কষ্টকর ছিল?’ ‘আদতে, এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে সহজ কাজ ছিল জন। আমার এতো বছরের প্র্যাকটিস, এতোসব সম্পত্তি এক নিমেষে ছেড়ে দিতে আমার এতোটুকুও কষ্ট হলো না। যেন ওটাই স্বাভাবিক ছিল। অ্যালব্যায়ার কামু একবার বলেছিলেন ‘বর্তমানের খাতে নিজের সবটুকু উজাড় করে দিলে, তবেই ভবিষ্যতের পথ প্রশস্ত হয়’-আমি তাই করেছি। আমি বুঝেছিলাম আমাকে বদলাতে হবে-তাই খুব নাটকীয়ভাবেই নিজের হৃদয়ের আকুতি শুনে এ সিদ্ধান্ত নিলাম আমি। তুমি ভাবতে পারবে না জন, আমার অতীতের

পৃষ্ঠা:১৫

বোঝা পিঠ থেকে ছুঁড়ে ফেলে হাঁটা শুরু করা মাত্র অনুভব করতে লাগলাম, কত সহজ, সরল, সুন্দর এ জীবন। বড় বড় চাহিদা, লোভ, আয়েস, আরামের কথা ভুলে, তাদের পিছনে সময় ব্যয় করা বন্ধ করতেই, আমার জীবন নতুন নতুন, ছোট ছোট আনন্দে ভরে গেল। রাতের মোহময় আকাশে নীল তারাদের ঝিকমিক, ভোরের সূর্যের আলো সারা শরীর জুড়ে মেখে নেওয়ার মধ্যে যে কতো আনন্দ লুকিয়ে আছে, তা উপলব্ধি করতে শুরু করলাম আমি। আর ভারতবর্ষ এতো জ্ঞানালোকদীপ্ত দেশ, যে যেখানে গিয়ে ঐসব তুচ্ছ, ছেড়ে আসা সুখের কথা তোমার মনেও পড়বে না।’ তবে, এতো বিদ্বান, এতো জ্ঞানী-গুণী ও ঋষীতুল্য মানুষের সংস্পর্শে এসে, তাদের বাণী, তাদের জ্ঞান কিছু ভাগ আহরণ করেও জুলিয়নের মনের খিদে মিটলো না। যে প্রাত্যহিক কাজ কর্মের মাধ্যমে তার জীবনে শান্তি আসতে পারে, যার সাহায্য তার এই ন্যুজ জীবনকে সে শিরদাড়া খাড়া করে পুনরায় দাঁড় করাতে পারে; সেই বোধের উপলব্ধি, সেই জ্ঞান সে কোথাও পেল না। প্রায় সাত মাস কেটে গেল সেই উপলব্ধির নিরন্তর খোঁজে। এর পরই এলো সেই প্রাপ্তিক্ষণ। হিমালয়ের কোলে কাশ্মীরের অববাহিকায় ঘুরে বেড়ানোর সময় সৌভাগ্যক্রমে জুলিয়নের সাক্ষাৎ হয় যোগী কৃষণ-এর সঙ্গে। মুজিত মস্তক এই মানুষটিও তার সন্ন্যাসপূর্ব সময়ে, তার ভাষায় ‘পূর্বাশ্রমে একজন নামি অ্যাডভোকেট ছিলেন। নতুন দিল্লির টেনশনময়, দ্রুত জীনে হাঁপিয়ে উঠে, সমস্ত স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়ে একদিন তিনিওস্টলে এসেছিলেন এই সরল, সুন্দর জীবনে। গ্রামের একমাত্র মন্দিরের দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা কৃষণ, জুলিয়নকে জানিয়েছিলেন যে, এই জীবনে তিনি পাড়ি জমিয়েছেন নিজেকে খুঁজে পাওয়ার আশায়, জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়ার আশায়। জুলিয়নকে নিজের কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘জীবনের যাঁতাকলে পেষাই হতে হতে ভাবলাম, আমার জীবনের উদ্দেশ্য তো এভাবে বেঁচে থাকা হতে পারে না। আমাকে এমন অর্থপূর্ণ কিছু করে যেতে হবে মানুষের জন্য, যাতে পৃথিবীটা আরও কিছুটা সুন্দর হয়ে ওঠে। এই মন্দিরে দিন রাতগুলো কোথা দিয়ে যে কেটে যাচ্ছে জানি না, তবে একটা সম্পূর্ণ এবং আনন্দময় জীবন কাটাচ্ছি, এ কথা হলফ করে বলতে পারি। এখানে আরও যারা প্রার্থনা করতে আসেন, তাদের সাথে আমার ভালোলাগার এই উপলব্ধি আমি ভাগ করে নিই। যারা খুব অভাবি বা কোনো রকম সাহায্যপ্রার্থী হয়ে এখানে আসেন, তাদের জন্য যতটা সম্ভব ততটা

পৃষ্ঠা:১৬

করি। আমি কোনো ধর্মগুরু নই। আমি একজন সাধারণ মানুষ, যে নিজের আত্মাকে সর্বোতভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছে।জুলিয়ন এই মানুষটিকে তার নিজের কাহিনী জানায়। জানায় নিজের দেশে, উচ্চশিক্ষিত সমাজে কি পরিচিতি ছিল তার, কতোখানি ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির অন্দরমহলে বিচরণ করতেন সে। জানায় যে, টাকা বিলাস ব্যসনের পিছন ছুটতে ছুটতে কিভাবে একদিন জীবন তাকে পিছনে ফেলে রেখে বেড়িয়ে গেল।টালমাটাল খেতে খেতে একদিন কোর্টরুমের মধ্যে কিভাবে মুখ থুবড়ে পড়লো তার জীবন প্রদীপ। ‘এরকম পথে আমারও আনাগোনা ছিল বন্ধু। এ যন্ত্রণা আমি বুঝতে পারছি কারণ এ রকম কষ্ট আমাকেও ভোগ করতে হয়েছে। তবে শেষে আমি বুঝেছি যে ঈশ্বর যা করেন বা জীবনে যা ঘটে, তার পিছনে একটা গূঢ় কারণ থাকে। আর জীবনে প্রতিটা আঘাত আমাদের একটু একটু করে জীবন সম্পর্কে শিক্ষিত করে তোলে। আমি দেখেছি, জীবনে পরাজয়ৎসে ব্যক্তিগত হোক, কর্মজগতের হোক বা আধ্যাত্মিক যাই হোক না কেন, আসলে মানুষকে বিস্তৃত করে। জীবনে দুঃখ গ্লানি, যন্ত্রণা ‘আসলে মানুষের আত্মোপলব্ধি হয় না, সে নিজেকে চিনতে শেখে না, জানতে শেখে না। এমনকি তার আশপাশের মানুষগুলোকেও চিনতে নিয়ে কখনো আক্ষেপ করো না। বরং (জানবে অতীতের ওইসব অধ্যায় কথাগুলো শুনে জুলিয়নের হৃদয় যেন ঠাণ্ডা হয়ে গেল। মনের কতো বোঝা যেন নেমে গেল। যে প্রবল অপরাধবোধে সে ভুগছিল, সেটার গ্লানি মুছে গেল মুহূর্তেই। মনে হলো, এই সেই মানুষ, যাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল সে এতোদিন। একজন মানুষ যিনি নিজের জীবনেও ওকালতি করেছেন এবং জুলিয়নের মতো একই পরিস্থিতি এবং আবেগের মধ্যে পার হয়েছেন, তার চেয়ে ভালো শিক্ষক ভালো গুরু আর কেই-বা হতে পারেন। একমাত্র তিনিই তো সম্পূর্ণরূপে বুঝতে সক্ষম হবেন জুলিয়নদের জীবনের শূন্যতা। ‘আমি আপনার সাহায্য চাই, কৃষণ। জানতে চাই কিভাবে এক পরিপূর্ণ জীবন তৈরি করা যায়।’ ‘তোমাকে কোনোভাবে সাহায্য করতে পারলে আমি খুব খুশি হব। কিন্তু তার আগে তোমাকে একটা পরামর্শ দেবো, শুনবে?’ ‘নিশ্চয়ই।’

পৃষ্ঠা:১৭

‘এই ছোট্ট গ্রামের মন্দিরের দেখাশোনার দায়িত্বে যতদিন ধরে রয়েছি, তখন থেকে কানাঘুষোয় শুনে আসছি হিমালয়ের আরও উচ্চতায় বাস করে এক দল সন্ন্যাসী। নানা কিংবদন্তি ছড়িয়ে আছে তাদের সম্পর্কে। লোকে বলে তারা নাকি এমন কিছু সিস্টেম আবিষ্কার করেছেন যা মেনে চললে যে কোনো মানুষের জীবন উচ্চমানে পৌঁছতে বাধ্য। এবং সেটা শুধু শারীরিকভাবে নয় বরং সর্বোতভাবে। যুগ যুগ ধরে চলে আসা, মুণি, ঋষিদের লিপিবদ্ধ করে রাখা বহু সূত্রের সমন্বয় ঘটিয়ে তারা এমন কিছু পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন যা মানুষের শরীর, মন, আত্মাকে মুক্তি দিতে সক্ষম।’ জুলিয়ন অবাক হয়ে যায়। মনে হয় এই তো চেয়েছিল সে। ‘কোথায় থাকেন এই সাধুর দল?’ ‘কেউ জানে না, আর আমার আক্ষেপ যে আমার এখন যা বয়স হয়েছে তাতে নতুন উদ্যমে এদের খুঁজতে বেরোনোর সাধ্য নেই আমার। তবে, বহু লোক তাদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু সফল হয়নি। হিমালয় বড় ভয়ঙ্কর জায়গা। হিমালয় পর্বতের আরও উচ্চতার প্রকৃতি বড় ভয়ানক, সেখানে পদে পদে মৃত্যুর হাতছানি। সবচেয়ে দক্ষ পূর্বতারোহীও সেখানে প্রকৃতির খামখেয়ালিপনার শিকার। সেখানে প্রকৃতির তাণ্ডবলীলার সামনে মানুষ বড়ই অসহায়। তবে আমি জানি, যে জীবনের খোঁজে, যে জীবনধারার খোঁজে তুমি নিজের দেশ থেকে এতোদূর এসে সেই জ্বরা, বার্ধক্য জয়, অন্তরের অনন্ত শান্তিও পরম আনন্দের আনন্দের চাবিকাঠি রয়েছে তাদের। আমার জানা নেই। সেই জুলিয়ন জীবনে কোনো কিছু এতো সহজে ছেড়ে দেওয়ার মানুষ নয়, সে বললো, ‘আপনার কি কোনো ধারণাই নেই ওদের কোথায় পাওয়া যেতে পারে?’ ‘আমি শুধু জানি, স্থানীয় বাসিন্দারা ওদের বলে ‘সিভানার সাধু’। ওদের পুরান অনুযায়ী, ‘সিভানার অর্থ-জ্ঞানালোক এর মরুদ্যান’। ঈশ্বর প্রেরিত দূত জ্ঞানে ওদের শ্রদ্ধাভক্তি করে গ্রামের মানুষ। শোনা যায় ওদের দেহেও নাকি আছে এক ঐশ্বরিক দ্যুতি। যদি আমি জানতাম তারা কোথায় থাকেন, তবে তা জানানো আমার অবশ্য কর্তব্য ছিল। কিন্তু আমি তা সত্যিই জানি না, বস্তুত কেউই তা জানে না। পরদিন ভোরবেলা, দিগন্তে সূর্যের রক্তাভা ফুটে উঠামাত্রই রওনা দিল জুলিয়ন, সিভানা নামের সেই আশ্চর্য স্থানের উদ্দেশ্যে। প্রথমে ভাবলো একজন শেরপাকে সঙ্গে নিয়ে নেবে। কিন্তু অনেক ভেবে দেখলো এই যাত্রাটা

পৃষ্ঠা:১৮

একেবারেই তার নিজস্ব। এবং এখানে সে আসলে নিজের খোঁজে, প্রকৃত ‘আমি কে চিনতে ও জানতে রওনা দিয়েছে। তাই এই অভিযানে সঙ্গে আর অন্য কেউ নয়। শুধু একা তারই সেই মহর্ষিদের খোঁজে যাওয়া উচিত। হয়তো এই প্রথমবার যুক্তিবাদী জুলিয়ন হেরে গেলো আবেগপূর্ণ জুলিয়নের কাছে। এই প্রথমবার মস্তিষ্ক হেরে গেল হৃদয়ের কাছে। কেমন যেন অনুভূতি হল, হিমালয়ের ওই ভয়ঙ্কর উচ্চতা সে একাই লঙ্ঘন করতে পারবে, আর কিছু হবে না। যার খোঁজে সে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তা সে নিশ্চয়ই পাবে। আর সেই প্রত্যয়ে বলিয়ান হয়েই সে তার যাত্রা পথে পাড়ি দিল। প্রথম কিছুদিনের বড়াই কিছুমাত্র কঠিন ছিল না। হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের এমন অনেকের সঙ্গে দেখা হয়ে যেত, যারা জ্বালানী কাঠের খোঁজে, বা খোদাই এর কাজের উপযোগী কাঠের খোঁজে বা অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় হিমালয়ের পথে ঘুরে বেড়াতো। অন্যসময় একাই তার লক্ষ্যের খোঁজে হিমালয়ের পাহাড়, পর্বত পেরিয়ে চলতো জুলিয়ন। খুব অল্পদিনেই ছেড়ে আসা গ্রাম, চোখের আড়ালে চলে গেল। নিচের গ্রাম, পথ ঘাট প্রস্তুতি ছোট থেকে ছোট হতে হতে, একেবারে দৃষ্টি পথের বাইরে চলে গেল। চোখের সামনে সাদা বরফে ঢাকা পর্বতের চূড়ার উপর দৃশ্য, জুলিয়নের হৃদস্পন্দন আরও বাড়িয়ে দিল রাশি ছড়িয়ে থাকার এতো অসাধারণ পরিবেশ, ঘন নীল আকাশের গায়ে শ্বেতশুভ্র পোস্টকার্ডের মতো পর্বতসারির পিকচার জুলিয়নের মধ্যেংয়েন এক। অদ্ভুত শিহরণ ছড়িয়ে দিয়ে গেল। প্রকৃতি যেন দু বাহু বাড়িয়ে এই দিনের এক বন্ধুকে কাছে টেনে নিল। জুলিয়নের মনে হলো এ প্রকৃতি যেন তার কতোদিনের চেনা। তাজা বাতাসে, তার মন, তার আত্মা হালকা হয়ে একেবারে ভারমুক্ত হয়ে গেল। মনে হলো যেন বহু দিনের পুরোনো বন্ধু, যার সাথে একসময় নিজের অন্তরের সমস্ত অনুভূতি ভাগ করে নিয়েছে, রসিকতা করেছে, আনন্দ করেছে; আজ বহু দিন বাদে, বহু বছরের বিচ্ছেদের পর যেন ফের দেখা হয়েছে তাদের। সৌন্দর্যের এমন অন্তরঙ্গ রূপ জুলিয়ন আকণ্ঠ পান করে নিল। প্রাণচঞ্চল তাজা, তরুণের মতো অনুভূতি ছেয়ে ফেলল তাকে। অসীম আনন্দ, অনাবিল খুশি, মুক্তির আস্বাদ সব এসে ঘিরে ধরল তাকে। মনুষ্যজগতের থেকে হাজার হাজার ফুট উপরে, প্রভৃতির এই অসাধারণ সাম্রাজ্যে গুটিপোকার মতো লুকিয়ে থাকা এই জুলিয়ন, প্রজাপতির মতো ডানা মেলে বেড়িয়ে এলো। ‘জানো, আজও মনে আছে, ঠিক সেই সময় আমার কি মনে হচ্ছিলো। মনে হচ্ছিল, মানুষের জীবন আসলে নির্ভর করে সিদ্ধান্ত বা চয়েস এর উপর। যে

পৃষ্ঠা:১৯

মানুষ, জীবনে আসা যে সুযোগটিকে গ্রহণ করে, তার উপর নির্ভর করেই, পরবর্তী জীবন সেই খাতে বয়ে যায়। আমার মনে হতে লাগলো, আমি এবার শ্রীবনে ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি। মনে কেমন একটা পুলক জাগলো। মন বললো, জীবনটা আর আগের মতো থাকবে না। আমার জীবনে অসাধারণ কিছু, আশ্চর্য কিছু ঘটতে চলেছে। আর যত মনে হতে লাগলো, ততই এক অজানা আনন্দে ভরে যেতে লাগলো আমার মন।’ যত হিমালয়ের বেশি উচ্চতায় পৌঁছতে লাগলো জুলিয়ন, তত এক চাপা উত্তেজনার চোরাস্রোতে বয়ে যেতে লাগলো তার শরীর জুড়ে। এই একটা রোমহর্ষক কেসের আগের রাত্রে, মিডিয়ার ছুটোছুটির মাকে যে প্রবল টেনশনে ও মানসিক চাপে দিন কাটতো, এই প্রকৃতির কোলেও অনেকটা সে ধরনেরই অনুভূতি হতে শুরু করলো তার। জুলিয়নের কথায়, ‘যদিও আমার কাছে পথের কোনোও ম্যাপ ছিলো না, তবু পথ যেন আমার সামনে নিজেকে মেলে ধরেছিলো। খুব কম মানষের ব্যবহৃত, পায়ে চলা পথ আমায় নিয়ে চললো গভীর থেকে আরও গভীরে। জঙ্গল, গাছপালা, নদী, জর্নী পেরিয়ে এক নতুন দেশের খোঁজে। মনে হতে লাগলো আমার ভেতরে যেন একটা কম্পাস রয়েছে, যে আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চড়েরে। আমি চাইলেও বোধহয় সেসময় পথ চলা বন্ধ করতে পারতাম না- এক যেন ভিতর থেকে আমাকে চালিত করে নিয়ে চলেছে সেই শান্তির, স্বপ্নের, অপার আনন্দের দেশে।’ বলতে বলতে দৃশ্যতই উত্তেজিত এতে উঠল জুলিয়ন, ঝকঝক করে উঠল চোখ দুটো। বৃষ্টি শেষে, পাহাড়ি কেন্দ্রী যেমন নেমে আসে পাহাড়ের গা বেয়ে, ঠিক তেমনই আনন্দ, আবেগেঞ্জ বন্যায় ভেসে, তার কথা যেন তোড়ে ভেসে আসতে লাগলো। পরের দুদিন পথ চলতে চলতে শুধু ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে চললো জুলিয়ন, আর্জি জানাল, যে পথে সে চলেছে, এই পথই যেন তাকে সিভানায় পৌঁছে দেয়। এর পাশাপাশি তার দ্বিতীয় মন তাকে কোনো ফেলে আসা সুদূরে তার দেশে, তার অতীতে নিয়ে গেল। সরাসরি প্রশ্ন করল, ‘জুলিয়ন তুমি কি সত্যিই থাকতে পারবে জনমনুষ্যহীন, পর্বতের এই সাম্রাজ্যে? যেখানে তোমার বুদ্ধিমত্তা, তোমার চিন্তায় তীক্ষ্ণতা কোনো কাজে লাগবে না? জীবনে কোনো চ্যালেঞ্জ থাকবে না? হাভার্ড ল কলেজ থেকে পাশ করে বেরুনোর পর কোনোদিন কি এতো নির্লিপ্ত, অকর্মন্য থেকেছে তোমার মস্তিষ্ক?’ চিন্তা-ভাবনা, অবসাদ থেকে বহু যোজন দূরে, মুক্তির আহ্বানে আহ্লাদিত জুলিয়নের মনে তার দ্বিতীয় সভা কাঁটা বিধিয়ে দিতে লাগলো।

পৃষ্ঠা:২০

জুলিয়নের চোখের সামনে ভেসে উঠল আকাশচুম্বী বিল্ডিং-এ ওক কাঠের প্যানেল করা ঝাঝালো চকচকে পিটপাঠ তার অফিসের ছবি, আর বিলাসবহুল বসন্ত কুঞ্জ যা জলের দামে বিক্রি করে চলে এসেছে সে। মনে পড়লো সেইসব বন্ধুদের মুখ যাদের সঙ্গে অন্যতম দামি রেস্তোরায় দিনের পর দিন ফুর্তিতে দিন কাটিয়েছেন। মনে পড়ে গেল তার সবচেয়ে প্রিয় ফেরারি গাড়িটির কথা, যার ইঞ্জিনে স্টার্ট দিলেই সেটি এমন বাচ্চার মতো গর্জন করে উঠতো যে জুলিয়নের শরীরে অ্যাড্রিনালিন নিঃসরণ বেড়ে যেতো কয়েক গুণ। এই অসাধারণ, অদ্ভুত, মায়াবী পরিবেশে, যত প্রকৃতির গভীর থেকে গভীরে হাঁটতে শুরু করল জুলিয়ন, ততই তার অতীতের চিন্তাসূত্রগুলো কেমন এলোমেলো হয়ে ছিঁড়ে যেতে লাগলো। প্রকৃতির সৌন্দর্য আকণ্ঠ নিমগ্ন হয়ে চলতে চলতেই ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা। চোখের কোন দিয়ে দূরে, যেন মনে হল আবছা কোনো মানুষের ছায়া দেখতে পেল সে। ভালো করে সেদিকে তাকিয়ে দেখল নীল্ল রেঙের হুড দেওয়া, লাল রঙের গলা থেকে পা পর্যন্ত এক অদ্ভুত লম্বাটে প্রোশাক পরা এক মানুষকে। হিমালয়ের এহেন উচ্চতায়, ভয়ঙ্কর সৌন্দর্যের মাঝে, এরকম একটি মানুষকে দেখে জুলিয়ন অবাক হয়ে গেল। নাগরিক সভ্যতা থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে, একা, শ্রান্ত, কোনো অচিন দেশ সিভানার পথ খুঁজে বেড়ানো জুলিয়ন, অনেকদিন পর তারই মতো এক রক্তমাংসের মানুষের দেখা পেয়ে উত্তেজনায় কেঁপে উঠলো, জোরে চিৎকার করে ডাকলো তাকে। কিন্তু সেই মানুষটি তার চলার গতি আচমকা বাড়িয়ে দিল। খুব তাড়াতাড়ি পাহাড়ি চড়াই ভেঙে এগিয়ে যেতে লাগলো। ভদ্রতার খাতিরে একবার পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখলো না, কোন মানুষটি তাকে ডেকেছে। লোকটির হাঁটা ক্রমশ দ্রুত হতে হতে দৌড়ে পরিণত হলো। ছুটতে লাগলো সেই অচেনা লাল আলখাল্লা পরিহিত মানুষটি, আর তার লম্বা পোশাকটি তার পিছন পিছন বাতাসের গায়ে লুটোপুটি খেতে খেতে চললো। ‘বন্ধু, দাঁড়াও প্লিজ, আমি সিভানার উদ্দেশ্যে চলেছি, প্লিজ আমায় সাহায্য করো’-চেঁচিয়ে ওঠে জুলিয়ন। ‘গত সাত দিন ধরে, হিমালয়ের এই বন্ধুর পথে চলেছি আমি। সামান্য খাবার আর ঝরনার জল, এই খেয়ে আছি। মনে হচ্ছে আমি পথ হারিয়ে ফেলেছি। প্লিজ আমায় সাহায্য করো,’ কাতর আর্তনাদ বেড়িয়ে আসে জুলিয়নের কণ্ঠ থেকে।

পৃষ্ঠা ২১ থেকে  ৩০

পৃষ্ঠা:২১

হঠাৎই থেমে যায় অচিন পথিক। শান্ত, স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। জুলিয়ন ধীর পায়ে এগিয়ে যায় তার দিকে। অচেনা মানুষটি ঘাড় ঘোরালো না, মাথা নাড়ালো না, এক পা নড়লো না, স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। পিছন থেকে তার আচ্ছাদনে ঢাকা মুখের কোনো আভাস পেল না জুলিয়ন, শুধু অচেনা মানুষটির হাতে ধরে থাকা ডালির দিকে নজর গেল। ডালি বোঝাই রঙ বেরঙের এমন অসাধারণ সুন্দর ফুলের সমাহার জুলিয়ন জীবনেও দেখেনি। জুলিয়ন কাছে এগোতেই, মানুষটি হাতের ডালিটি জোরে আঁকড়ে ধরলো। বেছে বেছে যত্নে তুলে আনা এইসব ফুলের প্রতি ভালোবাসা এবং এই লম্বা, সাদা চামড়ার পশ্চিম দেশের মানুষটির প্রতি অবিশ্বাস, এই দুই আবেগের বশেই বা হবে হয়তো। আসলে হিমালয়ের এই উচ্চতায়, জঙ্গলের পথে জুলিয়নের মতো মানুষ তো অনেকটা মরুভূমিতে শিশির বিন্দুর মতো। এক অদ্ভুত উত্তেজনা ও আগ্রহে পথিকের মুখের দিকে চেয়ে রইল জুলিয়ন। হুডের ফাঁক দিয়ে, সূর্যের একঝলক রশ্মিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো মানুষটির মুখ। বয়স হয়তো জুলিয়নের মতোই হবে, কিন্তু কি যেন এক শান্ত, স্নিগ্ধ, পবিত্রতা ছেয়েছিল সারা মুখ মণ্ডলে, জুলিয়ন পলক ফেলতেও যেন ভুলে গেল। তবে চোখের সরাসরি চোখ পড়তেই মনে হলো, সে দৃষ্টি যেন জুলিয়নের একেবারে অন্দর ভেদ করে চলে গেলো। চোখ সরিয়ে নিল জুলিয়ন। জলপাই রঙা গায়ের রঙ, টানটান, চোমড়া, সুন্দর, সুঠাম দেহ। মানুষটির হাত দুটি দেখে যদিও বোঝা যাচ্ছিলো যে তিনি নেহাৎ অল্পবয়সী নন, তবে তার সামগ্রিক চেহারা থেকে যৌবনের এমন এক দ্যুতি বিচ্ছুরিত হচ্ছিল যে জুলিয়ন বিভোর হয়ে রইবে, ঠিক যেমন করে ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা ম্যাজিশিয়ানের যাদু মন্ত্রবলে বশ হয়ে থাকে। ‘ইনি নিশ্চয়ই সিভানার সন্ন্যাসীদের মধ্যে একজন’, মনে মনে ভাবলো জুলিয়ন, কিন্তু ঘোর থেকে তখনও বেরিয়ে আসতে পারলো না। কোনো রকমে নিজেকে সামলে বললো-‘আমি জুলিয়ন ম্যান্টেল। আমি সিভানার সন্ন্যাসীদের খোঁজে, হিমালয়ের পথে পথে গত কয়েকদিন যাবৎ ঘুরে বেড়াচ্ছি। পথ জানি না, গন্তব্যও জানি না। ওরা কোথায় কোন অঞ্চলে থাকেন তাও জানি না। দুর্গম এই পথে অন্ধের মতো ঘুরছি। আপনি কি বলতে পারেন ওদের কোথায় পেতে পারি?’ সাদা চামড়ার এই ভিনদেশি মানুষটির দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো সেই পাহাড়ের অচিন মানুষটি। তার মুখের অদ্ভুত অভিব্যক্তি, শান্ত, গভীর, স্থিরদৃষ্টি, উপস্থিতির পবিত্র অনুভূতি, প্রকৃতিকে যেন আরও মায়াময় করে তুললো। মনে হলো সামনে যেন কোনো দেবতার দূত দাঁড়িয়ে আছে।

পৃষ্ঠা:২২

‘তুমি তাদের কেনো খুঁজে চলেছো, বন্ধু?’ যেন বাতাসের কানে ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো মানুষটি। জুলিয়নের মন বললো, সে ঠিকই বুঝেছে। নিশ্চয়ই ইনি সেই সন্ন্যাসীদের মধ্যে একজন। জুলিয়ন হৃদয় উন্মুক্ত করে তার জীবনের কাহিনী ব্যক্ত করল সেই মানুষটির কাছে। পুরনো জীবনের কথা, তার অস্তিত্বের সংকটের কথা, তার স্বাস্থ্যের ভেঙে পড়ার কারণ, তার কর্মক্ষমতা ক্রমশ হ্রাস হয়ে যাওয়ার বিবরণ, সব জানালো সে এই মানুষটিকে। আত্মার শান্তিকে বিনষ্ট করে ‘দ্রুত জীবন’ বেছে নেওয়ার কি পরিণতি হতে পারে তা জুলিয়ন, অস্থি, মজ্জায়, প্রতিটি রন্ধ্রে কোষে অণুকোষে অনুভব করতে পেরেছিলো। সেই অনুভূতির কথাও সে জানাতে ভুললো না। জানালো কেন সে এই অদ্ভুত, অলৌকিক দেশে এসেছে। যোগী কৃষণের কথাও জানালো সে। তারই মতো একসময় জাঁদরেল অ্যাডভোকেট হিসেবে কাজ করা যোগী কৃষণ প্রকৃতির কোলে, সরল জীবনে কতো শান্তিতে, সুখে জীবনযাপন করছেন। এতো কথার মাঝে কোনো কথা বললেন না পথিকবর। শান্ত তিস্থির হয়ে শুনলেন সবটুকু। জুলিয়নের কথায় যখন প্রাচীন ভারতের। তের, সুই, সুন্দর এবং উচ্চমানের জীবনযাপনের মূল সূত্রগুলো খুঁজে পাওয়ার জাহরণ করার আর্তি ফুটে উঠে, তখন সেই ঐশ্বরিক মানুষটি আবার বার কথা মলে ওঠেন। কাঁধে হাত রেখে সস্নেহে জুলিয়নকে বলেন, ‘যদি দি সত্যিন্ত অন্তর সেই পরম আনন্দের জীবন পেতে চাও, এবং তার জন্মায়তো কষ্ট করে এখানে এসে থাকো, তবে আমার কর্তব্য তোমাকে সেই পথের দিশা দেখানো। হ্যাঁ, যাদের খোঁজে তুমি এসেছো তাদেরই একজন আমি। বহু বছর পরে তুমিই প্রথম ব্যক্তি, যে এই পর্বতের প্রান্তরে, এই কঠিন দুর্গম পথ পেরিয়ে আমাদের খোঁজ পেলে, তোমাকে অভিনন্দন। তোমার ধৈর্য, স্থৈর্য, এবং অধ্যবসায় আমাকে মুগ্ধ করেছে। বোঝা যাচ্ছে তুমি সত্যিই একজন কর্মঠ এবং অ্যাডভোকেট ছিলে।’ এবার তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন, যেন বুঝতে পারছেন না ঠিক কি করা উচিত। তারপরই বললেন, ‘তুমি যদি নাও, আমার সাথে আসতে পারো, আমার অতিথি হয়ে আমাদের মন্দিরে। এই পবর্তমালারই এক কোণে আছে সে মন্দির। যদিও এখান থেকে পৌঁছতে বেশ কয়েক ঘণ্টা লেগে যাবে। আমার আশ্রমিক ভাই, বোনেরা তোমাকে উন্মুক্তচিত্তে গ্রহণ করবে। আমরা সকলে মিলে তোমায় শেখাবো, ভারতবর্ষের প্রাচীন পুঁথিতে বর্ণিত সেই সব তত্ত্ব, জানাবো নানারকম তথ্য, যা যুগ-যুগান্ত ধরে, পারস্পরিক রীতি অনুযায়ী এক প্রজন্ম থেকে তার পরবর্তী প্রজন্মে হস্তান্তরিত হয়েছে। তবে তোমাকে

পৃষ্ঠা:২৩

আমাদের একান্ত নিজস্ব স্থানে নিয়ে যাওয়ার এবং আমাদের কষ্টার্জিত সমস্ত বিদ্যা যা তোমাকে সুখী, সুস্থ, এবং তোমার জীবনকে উদ্দেশ্যমূলক করে তুলবে, তা জানানোর আগে, আমি তোমার কাছ থেকে একটি প্রতিজ্ঞা চেয়ে নেব। এই অমূল্য জ্ঞানভাণ্ডার যা তোমার জীবনকে সুন্দরতর করে তুলবে, তা তুমি শুধু নিজের জন্যেই গোপনে, নিজের কাছে রেখে দিতে পারবে না, সেই জ্ঞান তোমাকে ওই সভ্য জগতের, নিদারুণ কষ্টে থাকা সকলের সঙ্গে ভাগ করে নিতে হবে। তাদের মধ্যে বিতরণ করতে হবে। তোমার পশ্চিমী দেশে অত প্রাচুর্যের মধ্যেও যে মানুষ কত অসহায়, কতো যন্ত্রণার সাক্ষী, তা এই হিমালয়ের গভীর গিরিখাদের পাশে বসেও আমরা জানি। জানি ওই মনুষ্য জগৎ কতো হিংস্র। জানি যে ওখানে সৎ মানুষ তার পথ হারিয়ে ফেলেছে। অসততায় ভরে গেছে এই পৃথিবী। সৎ মানুষদের তারা গ্রাস করে ফেলেছে। তাই তোমাকে কথা দিতে হবে যে তুমি, আমাদের কাছ থেকে সুন্দর জীবন যাপন করার, সুস্থ, সবল বেঁচে থাকার যে জ্ঞান আহরণ করবে, তা ওই অসহায় মনুষ্য জাতির সেবায়, তাদের বিশ্বাস, ভরসা হৃততাকে পুণুরুজ্জীবিত করার কাজে লাগাবে। তাদের স্বপ্নকে সুফল করার কাজে, আত্মমর্যাদাকে গড়ে তোলার কাজে ব্রতী হবে। এইটুকুই আমার চাহিদা।’ জুলিয়ন সঙ্গে সঙ্গে সম্মত হলো। দুজনে যখন হিমালয়ের আরও উঁচু শিখরের দিকে রওনা দিল। তখন দিগন্তে লাল টুকটুকে সূর্যদেব পাটে বসেছেন, সারাদিনের ক্লান্তি শেষে এবার তার বিশ্রাম নেওয়ার পালা। জুলিয়ন আমায় বললো যে, সেই মুহূর্তের অভিজ্ঞতা সে কোনোদিনও ভুলতে পারবে না। সে এক অনাবিল আনন্দ ও উত্তেজনার অনুভূতি। যে জিনিসের খোঁজে সে হাজার হাজার মাইল দূর থেকে এসেছে; যে জায়গা, যে ঋষিগণের খোঁজে সে হিমালয়ের দুর্গম গিরিপথে দিনের পরদিন হন্যে হয়ে ফিরেছে, সেই ঋষিদেরই একজন তাকে ভ্রাতৃস্নেহে সেই অলৌকিক স্থানে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছেন, চলতে চলতেও যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না সে। ‘আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত, বলেছিল জুলিয়ন। জুলিয়নের মতে, ‘জীবন মানে বেশ কয়েকটি স্মরণীয় মুহূর্তের সমাহার।’ সেই মুহূর্তটি তার জীবনের একটি বিশেষ অংশ হয়ে রইল। আত্মার অস্তিত্বের অন্দরমহলে, হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে সেই মুহূর্তে সে অনুভব করতে পেরেছিল যে, ওই মুহূর্ত থেকেই শুরু হলো এক আনন্দমুখর, সুখময় জীবনের সূত্রপাত। এমনি এক অসাধারণ পরিপূর্ণ জীবন, যা এর আগে কখনো সে দেখেনি, জানেনি, অনুভব করেনি।

পৃষ্ঠা:২৪

অধ্যায় ৪

সিভানার সন্ন্যাসীদের সঙ্গে জুলিয়নের সাক্ষাৎ

বহু ঘণ্টা ও দিনের পর পর্বতের দুরূহ পথে চড়াই, উত্তাই পেরিয়ে ওরা দুজন অপূর্ব উপত্যকায় এসে পৌঁছলেন, যেখানে সবুজের সমারোহে পৃথিবী মায়াবী রূপ ধারণ করেছে।একপাশে শ্বেত শুভ্র বরফে ঢাকা পবর্তমালা যেন বহির্জগতের’ প্রকৃতির ভয়ঙ্কর আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। অন্যদিকে, বাতাসের তালে রিমঝিম সুরে দোল খাচ্ছে পাইন গাছের সারি। ঈশ্বর যেন বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড তৈরির সময়, এই জায়গাটিকে মনের মতো করে, তিল তিল করে তৈরি করেছিলেন হয়তো বা বিশ্রাম নিয়েছিলেন এখানে। সঙ্গের ঋষিবর স্মিত হেসে, জুলিয়নকে বললেন, ‘সিভানার স্বাগতম হে যুবা অতিথি।’ নির্বাণে তোমাকে একটি ছোট্ট পায়ে চলা পথ বেয়ে উপত্যকায় ঘন বর্নের দিকে নামতে শুরু করল তারা। দূষণহীন, মুক্ত, পাহাড় পাইন আর্থ চন্দন কাঠের এক অদ্ভুত সুগন্ধ ভেসে এলো। পায়ে যন্ত্রণা হচ্ছিল, তাই জুলিয়ন জুতোটা খুলে নিল। পায়ের তলায় নরম তুলতুলে ঘাস (শ্যালয়) কার্পেটের মতো আরাম দিল। পাহাড়ের অসামান্য সুন্দর অর্কিডের মেলা। গাছের ফাঁকে ফাঁকে রঙ-বেরঙের ফুলের সমাহার যেন তুলি দিয়ে আঁকা এক অসাধারণ ছবি; যেন এক টুকরো স্বর্গ। একটু দূরে কারা যেন খুব নিচু স্বরে কথা বলছিল। নিঃশব্দে সন্ন্যাসীর পথ অনুসরণ করে চললো জুলিয়ন। প্রায় পনেরা মিনিট চলার পর, দুজনে একটা ফাঁকা জায়গায় এসে পৌঁছালো। বিচক্ষণ, বুদ্ধিমান জুলিয়ন ম্যান্টেল যা স্বপ্নেও আশা করেনি, চোখের সামনে দেখতে পেল তেমনই এক অত্যাশ্চর্য দৃশ্য। সামনেই এক ছোট্ট গ্রাম, যা খালি চোখে দেখে মনে হলো সম্পূর্ণ গোলাপ দিয়ে বানানো। আর সেই গ্রামের ঠিক মাঝখানে রয়েছে থাইল্যান্ড বা নেপালে দেখা প্যাগোডা আকারের মন্দির যা লাল, সাদা আর গোলাপী ফুল, লম্বা লম্বা সুতোয় গেঁথে তৈরি করা হয়েছে। বাকি জায়গায় রয়েছে গোলাপ ফুলে বানানো ছোট ছোট কুঁড়েঘর (কুটির) যা সম্ভবত সন্ন্যাসীদের বাসস্থান। নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না জুলিয়ন। বাকরুদ্ধ হয়ে গেল সে।

পৃষ্ঠা:২৫

অন্যান্য সাধুগণ মাদের দেখা গেল, তার প্রত্যেকেই জুলিয়নের সঙ্গী সন্ন্যাসীটির মতোই পোশাক পরিহিত। এবার অবশ্য মানুষটি তার নাম জানাল জুলিয়নকে যোগী রমন। তিনি বললেন যে, এই সিভানার সন্ন্যাসীদের মধ্যে তিনি জ্যেষ্ঠ এবং এই গোষ্ঠীর সকলের নেতা। জুলিয়ন হতবাক হয়ে দেখতে লাগলো যে এই বসতির সকলেই এক অদ্ভুত যৌবনের অধিকারী। এদের চলাফেরার মধ্যে কি যেন এক ছন্দ আছে। কোনো কথা নেই, কোনো শব্দ নেই, চারিদিকে শুধু নিস্তব্ধতা। নৈঃশব্দকে যেন এখানকার মানুষ বড়ই শ্রদ্ধা করে নিজেদের সকল কাজ বড় চুপিসারে সারে। পাছে কোনো শব্দে প্রাকৃতিক শান্তি বিঘ্নিত হয়। গ্রামে ঢোকামাত্র যে জনা দশেক পুরুষ এগিয়ে এলেন স্মিত হাসি মাখা মুখে, তারা সকলেই যোগী রমনের মতো রক্তবর্ণ পোশাক পরিহিত। শান্ত, স্নিগ্ধ, সুঠাম ও পবিত্র চেহারা তাদের প্রত্যেকেরই। তাদের মুখে এক পরম তৃপ্তির হাপ। ওদের সকলকে দেখে মনে হলো যেন সত্য সমাজের অতি বিশিষ্ট ও অতি পরিচিত, টেনশন নামক বস্তুটি পৃথিবীর অন্যতম এই উচ্চ স্থান বা শিখরে মোটেও আকাঙ্ক্ষিত বা আমন্ত্রিত নয়। এই পরম শান্তির বাইদশে সে নিতান্তই দুয়োরানি। আর সেটা বুঝতে পেরে, সেও পাড়ি জমিয়েছে এমন জায়গায়, যেখানে তার খুব কদর। যদিও, বোঝাই যায় এরা বহু বছর নিজেদের ছাড়া বাইরের কোনো লোকের মুখ দেখেনি, তবুও এদের অভ্যর্থনা হলো খুব উষ্ণ, আন্তরিক অথচ সংক্ষিপ্ত। একটি ছোটি লাউসন্তকে তারা স্বাগত জানালো সেই মানুষটিকে, যে শুধু তাদের খোঁজেক্ট হাজার হাজার মাইল পথ পেরিয়ে এসেছে। সংঘের মহিলারা ততটাই আকর্ষণীয়। গোলাপী রঙের শাড়ি, পিঠ অবধি ছড়ানো এক ঢাল কালো চুলে পদ্মের শোভা, আর প্রচুর প্রাণশক্তিতে ভরপুর তাদের চলাফেরা। চঞ্চল হরিণীর মতো ছুটে বেড়াচ্ছে এরা গ্রামের এদিক থেকে ওদিক, তবে এ চঞ্চলতা আমাদের শহুরে সদাব্যস্ততা নয়। বরং এ চঞ্চলতায় আছে এক সহজ, সরল, স্বাচ্ছন্দ্য। এক মনে কেউ সাজিয়ে চলেছে তাদের উপাসনাস্থলে, একেবারে উৎসবের দিনের মতো করে। কেউ বা বয়ে আনছে জ্বালানী কাঠ, কারুকার্যময় পর্দাবিশেষ। সকলেই কর্মব্যস্ত, সকলেইআনন্দিত। শেষ পর্যন্ত সিভানার সাধুদের এই অসামান্য কর্মকুশলতার গোপন রহস্য উদঘাটিত হতে লাগলো। যদিও এরা প্রত্যেকেই প্রাপ্তবয়স্ক নারী বা পুরুষ, কিন্তু এদের চোখে, মুখে, চেহারায় বয়সের কোনো ছাপ নেই; ক্লান্তি নেই,

পৃষ্ঠা:২৬

সকলের মুখে শিশুর সারল্য, চোখে নতুন কিছু জানার, খোঁজার এক আগ্রহ, শরীরে প্রবল তারুণ্য। কারও মুখে কোনো বলিরেখা নেই। কারও চুলে পাক ধরেনি। কারও চেহারায় বয়স থাবা ফেলতে পারেনি।  জুলিয়ন ভাবতেই পারছিল না, তাকে টাটকা ফল আর সব্জি দেওয়া হতে পারে ডিনার হিসেবে। পরে অবশ্য সে জানতে পারে, যে যৌবন ও সুস্বাস্থ্য ধরে রাখতে যুগ যুগ ধরে সাধু, সন্ন্যাসীরা এই ফল ও সব্জির উপরেই ভরসা করে থাকেন। তারুণ্য বজায় রাখতে এই ডায়েটের কোনো জুড়ি নেই। খাওয়া দাওয়ার পর যোগী রমন জুলিয়নকে তার বাসস্থানের দিকে নিয়ে গেলেন। ফুলে ফুলে ঢাকা একটি ছোট্ট কুটির। ভিতরে এক অনাড়ম্বর বিছানা আর তার ওপর একটি লেখার খাতা। এই হলো জুলিয়ন; বিখ্যাত প্রথিতযশা অ্যাডভোকেট, যার একটি বাক্যের উচ্চারণে একটি মানুষের ভাগ্য বদল হয়ে যেতে পারে; সেই জুলিয়ন ম্যান্টেলের বাসস্থান। অন্তত অদূর ভবিষৎ অবধি। সিভানার মতো এতো সুন্দর, এতো শান্তির জায়গা কখনো দেখেনি জুলিয়ন। তবু অন্তরের কোনো গভীর থেকে যেন এক অনুভূতি ভেসে মোসতে লাগলো তার সচেতনতায়। মনে হলো এ যেন ঘরে ফেরা। মনে হলো বহু বহু বছর পূর্বে এ জায়গাটির সঙ্গে তার আলাপ। বহুদিন ধরে এই স্বর্গরাজ্যের সঙ্গে তার সখ্যতা। এতোদিন কিভাবে যেন এখানকার পথ হারিয়ে ফেলেছিল সে। এবার খুঁজে পেয়ে ফিরে এসেছে নিজের চোট মাটির কাছে। এ যেন অচিন দেশ নয়। এ দেশেই কত দিন আগে স্ট্রেইতো বা হাজার বছর আগে, তার বসবাস ছিল। কে যেন বলতে লাগলো ভিতর থেকে, ‘এ তো তোমার জায়গা।’ মনে হতে লাগলো আইনের জটিল গলি খুঁজিতে হারিয়ে যাওয়ার আগে, মনেতে যে পরম আনন্দ ছিল তাকে ফিরিয়ে আনতে পারে একমাত্র এই জায়গা। তার ভগ্ন মনের সব জ্বালা-যন্ত্রণা জুড়োতে পারে একমাত্র এই জায়গা। শুরু হলো জুলিয়নের নতুন জীবন, সিভানার সন্ন্যাসীদের মাঝে। সহজ, সরল, শান্তিপূর্ণ এক আশ্চর্য জীবন। যদিও। সেরা চমকটা আসতে তখনও কিছুটা সময় বাকি ছিল।

পৃষ্ঠা:২৭

অধ্যায় ৫

সন্ন্যাসীদের কাছ থেকে আধ্যাত্মবাদের শিক্ষা

‘কাল্পনিক ও স্বপ্নের জগতের বাসিন্দাদের স্বপ্ন কখনো পূরণ হয় না, তা শ্রেষ্ঠ থেকে শ্রেষ্ঠতর হওয়ার প েকেবলি এগিয়ে যায়’ -অ্যালফ্রেড লয়েড হোয়াইট হেড সন্ধে রাত, প্রায় আটটা বাজে। পরের দিন কোর্টের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। তবে মন পড়ে ছিল জুলিয়নের জীবনের ঘটনাবলিতে। পশ্চিম গোলার্ধের এক প্রখ্যাত, জাঁদরেল উকিলের জীবনটাই বদলে গেল, কোনো সুদূর ভারতের হিমালয় বসবাসকারী কিছু অসামান্য সন্ন্যাসীদের সংস্পর্শে এসে। কি অদ্ভুত! কি রোমাঞ্চকর। যেন কোনো রূপকথার গল্প। কোন জাদু জাহির স্পর্শে জুলিয়নের জীবনটাই কতো সুন্দর হয়ে গেল। মনে মনে ভাবতে লাগলাম, জুলিয়ন ভালো থাকার, জীবনে আনন্দে থাকার যে শিক্ষা ওই সুন্দর হিমালয় থেকে জেনে এসেছে, সেগুলো দিয়ে কি আমার মতো মানুষের জীবনটাকে একটু বদলে নেওয়া যায় না? যত শুনতে লাগলাম জুলিয়নের অভিজ্ঞতা, তত অন্তরে উপলব্ধি করলাম যে আমার জীবনাচারে কোথায় যেন জং ধরেছে। কোথায় গেল আমার সে ফ্যাশন, অল্পবয়সে, যার ছাপ থাকতো আমার প্রতিটি কাজে? ছোট থেকে ছোট কাজেও আমার যে তৃপ্তি, যে আনন্দ খুঁজে পেতাম আমি, কোথায় গেল আমার সেই বোধ, সেই চেতনা? হয়তো আমারও সময় হয়েছে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার, খুঁজে বের করার। তাই জীবনের এই আশ্চর্য গাঁথার প্রতি আমার পরম আগ্রহ লক্ষ করে, এবং এক অর্থপূর্ণ, সুন্দর জীবনের প্রতি, জীবনদর্শনের প্রতি আগ্রহ অনুভব করে জুলিয়ন তার কাহিনীর গতি কিছুটা বাড়িয়ে দিল। এতোদিনের কোর্টরুমের ঝড় ঝাপটা সামলানো তীক্ষ্ম মেধা ও জ্ঞানের প্রতি জুলিয়নের তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাকে সিভানার মানুষগুলো প্রিয়জন করে তুলেছিল। সন্ন্যাসীরা জুলিয়নকে তাদেরই একজন বলে গণ্য করতে শুরু করে দিয়েছিলেন। শরীর, মন, আত্মার এই অসাধারণ সমন্বয় সাধন কেমন করে সম্ভব তা জানতে, জুলিয়ন বলতে গেলে প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি পল কাটাতে লাগলো যোগী রমনের শিক্ষানবিশীতে। মানুষটি শিক্ষকের চেয়েও তার জীবনে যেন বাবার স্থানটি অর্জন করে নিলেন। যদিও তাদের বয়সের

পৃষ্ঠা:২৮

তফাৎ ছিল মাত্রই কয়েক বছরের। যোগী এই মানুষটি জন্ম জন্মান্তর ধরে যে জ্ঞান লব্ধ করেছিলেন, তা তিনি খুব আনন্দিত মনেই জুলিয়নকে দিতে আগ্রহী হয়েছিলেন। ভোরের আলো ফোটার আগেই যোগী রমন তার অত্যুৎসাহী ছাত্রটিকে নিয়ে বসতেন। তাকে বোঝাতেন বেঁচে থাকার প্রকৃত অর্থ কি, এবং বেঁচে থাকতে যে সৃজনশীলতা, যে প্রসারতা, যে মানসিক ও শারীরিক শক্তির প্রয়োজন তা কোথা থেকে, কিভাবে পাওয়া যাবে জুলিয়নকে তিনি শেখালেন প্রাচীনকালে ভারতবর্ষে আবিষ্কৃত এমন কিছু সূত্র, যা মেনে চললে যে কোনো মানুষ তার শরীরে যৌবন ধরে রাখতে সক্ষম হবে। সক্ষম হবে এক উন্নত জীবনশৈলী গড়ে তুলতে। জুলিয়ন বুঝতে পারলো, যোগী তাকে নিজের শরীর ও মনের উপর কর্তৃত্ব করার ও সেই সঙ্গে এই বাসযোগ্য পৃথিবীর প্রতি কর্তব্যপরায়ণ হওয়ার যে শিক্ষা দিয়েছেন তা তাকে তার পশ্চিম গোলার্ধে, অশান্ত ও অসম্ভব দ্রুত হৃদয়হীন জীবনে আর ফিরে যেতে দেবে না। দিন যায়, সপ্তাহ যায়, মাসও চলে যেতে লাগলো। ধীরে ধীরে জুলিয়ন বুঝতে পারলো যে এই জীবন মহামূল্যবান। মানুষের নিজের ভিতরেই আছে সেই মহার্ঘ জ্ঞানকাণ্ডার আর শক্তির অপার উৎস। প্রয়োজন শুধু তাকে জাগিয়ে তোলার, কোনো মহান কাজে তাকে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগাবার। কখনো এই যোগী তার শিষ্যটিকে নিয়ে পাহাড়ের উচ্চতায় নীরবে বসে দূরে সবুজের সমারোহের মাঝখান থেকে ভারতীয় সূর্যের উদয় চেয়ে চেয়ে দেখতেন, কখনো বা দুচোখ বন্ধ করে দুজনে পাশাপাশি গভীর ধ্যানে মগ্ন হতেন তারা, নিস্তব্ধতার অসামান্য অনুভূতি উপভোগ করতেন প্রতিটি ইন্দ্রিয় দিয়ে। কখনো বা শুধুই হেঁটে বেড়াতেন সবুজ পাইন বনের ছায়ামাখা পথে, দর্শনের তত্ত্ব আলোচনা আর একে অপরের সান্নিধ্য উপভোগ করতে করতে। জুলিয়ন জানাল, সিভানায় থাকার তিন সপ্তাহের মধ্যেই নিজের মধ্যে এক অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ করল সে। মানসিকভাবে যেন এক সাগর সমান ব্যাপ্তি ও প্রসারতা অনুভূত হতে লাগলো। সামান্য, সামান্য জিনিসেও যে কতো সৌন্দর্য আছে, তা যেন অতি সহজেই ধরা দিতে লাগলো জুলিয়নের কাছে। স্বচ্ছ রাতের আকাশে লক্ষ কোটি ঝকঝকে তারার সমাবেশ, বৃষ্টিধোয়া সকালে মাকড়সার জালের গায়ে লেগে থাকা বিন্দু বিন্দু জল, এরকম ছোট ছোট সব কিছুতেই দারুণ এক সৌন্দর্য খুঁজে পেতে শুরু করলো জুলিয়ন। নতুন এই জীবনধারা, নতুন অভ্যেস যেন এক নতুন জুলিয়নের জন্ম দিল।

পৃষ্ঠা:২৯

সাধুদের দেখানো পথে, তাদের শেখানো তত্ত্বে মাত্র মাসখানেকের মধ্যেই নিজের মধ্যে এক অদ্ভুত, মানসিক শান্তি যা তার জীবন থেকে কবে যে নিঃশব্দে চলে গিয়েছিল, তা সে নিজেই জানে না। দিন দিন জুলিয়ন যেন হাসিখুশি, প্রাণবন্ত, ঝকঝকে এবং সৃজনশীল মানুষ হয়ে উঠতে লাগলো। শারীরিক স্ফূর্তি ও মানসিক শান্তি জুলিয়নের জীবনে, জুরিয়নের আচরণে, আচারে এক বিশাল পরিবর্তন নিয়ে এলো। শরীরের অতিরিক্ত মেদ ঝরে গিয়ে শরীর সুঠাম হয়ে উঠতে লাগলো। মুখে যে শারীরিক যন্ত্রণা ও ভিতরে ভিতরে ক্ষয়ে যাওয়ার কষ্টের ছাপ সর্বদা লেগে থাকতো, তা দূর হয়ে গেল। এক অসাধারণ আভায় ভরে গেল তার মুখ। প্রাণ প্রাচুর্যের ছাট তার চোখে মুখে জ্বলজ্বল করতে লাগলো। তার মনে হতে লাগলো যে, সে যা চায় তাই করার ক্ষমতা রাখে, এবং এই ক্ষমতা সে অন্য সবার মধ্যে আনতে সর্বপ্রকার সাহায্য করতে প্রস্তুত। জীবনকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করতে শুরু করল জুলিয়ন। প্রত্যেকটি ইন্দ্রিয় সহযোগে, জীবনের রূপ, রস, বর্ণ, গন্ধকে নিংড়ে নেওয়া কাকে বলে জুলিয়ন অনুভব করতে পারে এতোদিনে। এই অদ্ভুত সন্ন্যাসীদের পৌরাণিক সূত্র ধরে জীবনযাত্রার যদি ধীরে ধীরে জুলিয়নের শরীরে, মনে তার আশ্চর্য পরিণাম দেখাতে ভূক্ত করলো। জুলিয়ন বলতে বলতে এখানে একটু থামলো। সম নিজের জীবনের এইআশ্চর্য কাহিনী তার নিজের কানেই বিশ্বাস হচ্ছে না। একটু থেমে আবার শুরু করল জুলিয়ন। দার্শনিকের মতো বলষ্টো তা বলবো জীবনে এক অন্যতম জিনিস আমি অনুভব করতে পেরেছি জন। এই জগৎ, সেই সঙ্গে আমার অন্তর্জগতও এক বিশিষ্ট স্থান। এতোদিনে বুঝেছি, জীবনে বহির্জগতে যতই সাফল্য আসুক না কেন, তোমার ভিতর অবধি যদি সফলতা না পৌঁছায়, তুমি অন্তরে  যদি সফল না হও, তাহলে সেই সাফল্য মূল্যহীন। প্রকৃত অর্থে ভালো থাকা আর আর্থিক দিক থেকে ভালো থাকার মধ্যে আকাশ-পাতালের তফাৎ।আমি যখন একজন লব্ধ-প্রতিষ্ঠ অ্যাডভোকেট ছিলাম, তখন অন্যদের জীবনে ‘ভেতরে’ ও ‘বাইরে’ ব্যালেন্স করতে দেখলে খানিকটা বিরক্তি, খানিকটা হাস্যকর বোধ হতো। তখন মনে হতো, ‘আর। জীবন তো একটাই স্ফূর্তি কর, আনন্দ করো। একটা জীবনের মতো জীবন বানাও। কিন্তু আজ বুঝেছি, শরীর, মন ও আত্মার ওপর মানুষের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ না থাকলে, উচ্চমানের জীবনযাপন করা যায় না। স্বপ্নে দেখা আনন্দে ভরপুর জীবন, তা মন, নিজের আত্মার উপর মানুষের কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকে। তুমি অপরের ভালো কেমন করে করবে, যদি না জানো কেমন করে নিজের ভালো করতে হয়? নিজের অন্তরে ভালো বোধ না করলে,

পৃষ্ঠা:৩০

আনন্দ বোধ না হলে, অন্যকে আনন্দ দেবে, অন্যের ভালো করবে কিভাবে? আমি যদি নিজেকে ভালোবাসতে না পারি, তাহলে তোমাকে ভালোবাসবো কেমন করে?’ হঠাৎ কেমন যেন চঞ্চল হয়ে উঠলো জুলিয়ন। দৃশ্যত অস্বস্তিতে ছটফট করে উঠলো। বললো, ‘এভাবে নিজের অন্তরের কথা আমি কখনো কাউকে বলিনি জন। আমি ক্ষমা চাইছি। কিন্তু এই শ্বেতশুভ্র পর্বতের শিখরে, যে শক্তি আমি সঞ্চয় করেছি, ভিতরের অনুভূতিকে যেভাবে উদ্‌দ্গীরণ করে বাইরে এনে ফেলেছি; তাতে প্রতি মুহূর্তে আমার মনে হতে থাকে আমি যা জেনেছি, তা আর সকলের জানা অত্যন্ত প্রয়োজন।’ আমার কাজে যেতে দেরি হয়ে যাচ্ছে বুঝতে পেরে জুলিয়ন সেদিনের মতো উঠে পড়লো। আমি বললাম, ‘তুমি এভাবে গল্পের মাঝপথ থেকে উঠে যেতে পারো না জুলিয়ন। হিমালয়ের থেকে প্রকৃতির মাঝে সেই সন্ন্যাসীদের কাছ থেকে তুমি কি জ্ঞান অর্জন করলে, যা তোমার গুরু তোমায় প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিলো, তুমি পশ্চিম দেশে, নিজ ভূমে অবশ্যই প্রচার করবে বলে, আমাকে তা সম্পূর্ণ না জানিয়ে তুমি কিছুতেই এখান থেকে উঠতে পারবে না। আমাকে এভাবে সাসপেন্সে রেখে তুমি যেতে পারবে ‘আমি ফিরে আসবো জন, তুমি চিন্তা করো না তুমি তা জানো ভালো কোনো গল্প বলতে শুরু করলে তা না আমি থাকতে পারি না। শেষ করি তবে এখন তোমার কাজ আছে, আর আমরিও ব্যক্তিগত। কিছু কাজ আছে।’ ‘তুমি শুধু এটুকু বলো, সিভানায় তুমি যা শিখেছো তা কি আমার ক্ষেত্রেও কাজ করবে?’ ‘ছাত্র যখন প্রস্তুত থাকে, শিক্ষক ঠিক উপস্থিত হয়ে যায়। আমাদের এই সমাজের আরও বহু লোকের সঙ্গে তুমিও এখন এরকম একটি শিক্ষার জন্য প্রস্তুত, তা আমি জানি। জানি যে বিদ্যা যে জ্ঞান আমি সিভানায় গিয়ে অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি, তা তোমাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আমাদের প্রত্যেকের জীবনের পথে চলতে, এই মহামূল্যবান সূত্রগুলো জানা দরকার। আনন্দে থাকতে গেলে, সুখী হতে গেলে, এই সুত্রগুলোর কোনো বিকল্প নেই। প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক পারফেক্ট বা নিখুত মানুষ। কিন্তু আমরা নিজেই তা জানি না। পার্ফেকশন আমরা খুঁজে ফিরি বাইরের জগতে। আমি কথা দিলাম, সবকিছু জানাবো তোমায়। সব কিছু যা আমি জেনেছি। ধৈর্য ধরো। কথা দিচ্ছি, কাল রাতে আবার আসবো আমি, এখানেই। আর তোমাকে সেসব কিছু জানাবো যা তোমার বাঁচার মতো করে বাঁচতে শেখাবে। কি, তাহলে চলবে তো?’

পৃষ্ঠা ৩১ থেকে  ৪০

পৃষ্ঠা:৩১

‘হ্যাঁ, এতোদিন যখন সেসব না জেনে কাটাতে পেরেছি, ৩০হলে আরও চব্বিশ ঘণ্টা নিশ্চয়ই কাটিয়ে দিতে পারবো এভাবেই।’ বেশ একটু হতাশার সঙ্গেই বললাম আমি। লব্ধ প্রতিষ্ঠ, জাঁদরেল অ্যাডভোকেট থেকে পূর্বদেশের জ্ঞানালোকে স্নাত সেই যোগী পুরুষটি আমাকে হাজারো প্রশ্ন আর সহস্র না জানা উত্তরের মধ্যে। অন্ধকারে বসিয়ে রেখে হন হন করে বেড়িয়ে গেলো। বলাই বাহুল্য নানারকম চিন্তা ঘিরে ধরলো আমায়। অফিসে বসে, আমার মনে হতে লাগলো, সত্যিই আমরা কতো ছোট, কতো ক্ষুদ্র! আমাদের পৃথিবীতে কতো কিছু দেখার আছে, কতো কিছু জানার আছে। এমন কতো কি আছে, যা আমি আজ পর্যন্ত জানার চেষ্টাও করে দেখিনি। মনে হতে লাগলো, আচ্ছা ছেলেবেলার সেই উৎসাহ, নতুন জিনিস সম্পর্কে জানার অসীম আগ্রহ, বেঁচে থাকার, নতুনকে দুচোখ ভরে দেখার সেই অদম্য অনুভূতি আমার এই জীবনে যদি আবার ফিরে ক্লাসে তাহলে কেমন হয়? ছেলেবেলার সেই প্রাণশক্তি, নতুন কিছু করছি প্রচণ্ড প্রচেষ্টা যদি আবার ফিরে আসে, আমার এই মধ্যবয়স্ক জীবনে, তাহলে আবার হয়তো আমি নতুন করে বেঁচে উঠবো। হয়তো আমি সানিও ওকালতি ছেড়ে দেবো জুলিয়নের মতো। হয়তো ওর মতো আমার জীবনেও ঈশ্বর কোনো বড় প্রাপ্তি রেখেছেন। আমারও হয়তো বড় কিছু করে দেখানোর আছে। এতোসব কথা ভাবতে ভাবতে, বড় বড় স্বপ্ন দেখর্জে দেখতেই আমার অফিসের সব আলো নিভিয়ে দরজা লক্ করা, গ্রীষ্মের আরেকটি রাতের পথে বেরিয়ে এলাম।

পৃষ্ঠা:৩২

অধ্যায় ৬

নিজেকে ভেঙে একেবারে বদলে ফেলার জ্ঞান আমি, এক শিল্পী-আমার জীবনই আমার শিল্প -সুজুকি

নিজের কথা মতোই পরদিন সন্ধে সোয়া সাতটার মধ্যেই হাজির হয়ে গেলো জুলিয়ন। ছোট ছোট চারটি নক্ শুনতে পেলাম আমার বাইরের ভয়ঙ্কর গোলাপী রঙের শার্টার দেওয়া দরজায়, যেটি আমার স্ত্রীর মতে আমাদের বাড়িটিকে সকলের চেয়ে স্বতন্ত্র করে রেখেছে। যাই হোক, জুলিয়নকেও গত দিনের চেয়ে একটু অন্যরকম দেখতে লাগছিল। শরীর থেকে যেন অদ্ভুত এক দ্যুতি বের হচ্ছিল। সমস্ত সত্তাটা ঘিরে রেখেছিল এক অদ্ভুত শার্লি মুনুভূতি। শুধু পরণের কাপড়টা আমার মধ্যে একটু অস্বস্তি জাগিয়ে তুলছিল। সুঠাম দেহ ঢাকা ছিল লাল রঙের একটি আলখাল্লা ধরবের পোষাকে, আর মাথায় ছিল নীল রঙের, কাজ করা একটি রাতেও মাথার পাগড়িটা কিন্তু নামলো না। ‘গুড ইভিনিং জন,’ যা কয়েক বছর আগেও শরমে ওই ভ্যাপসা আনন্দ দিতো। ‘গুড ইভিনিং।’ ‘ওই রকম অদ্ভুত চোখে চেয়ো না তুমি কি আশা করেছিলে? আমি আর্মানির স্যুট পরে আসব?’ দুজনেই জোরে হেসে উঠলাম। প্রথমে আন্তে, তারপর অট্টহাসিতে ফেটে পড়লাম দুজনেই। যাক, জুলিয়নের সেই রসবোধটা তাহলে হারিয়ে যায়নি। আমার জিনিসে ঠাসা কিন্তু আরামদায়ক বসার ঘরটিতেই বসলাম আমরা। ওর গলায় রুদ্রাক্ষের মালাটা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করছিলো। ‘ওটা কি?’ ‘এর ব্যাপারে পরে বলবো।’ রুদ্রাক্ষের মালাটিকে বুড়ো আঙুল আর তর্জনী দিয়ে ঘষতে ঘষতে বললো জুলিয়ন। ‘আজ আমাদের অনেক কথা বলার আছে।’ ‘তাহলে শুরু করো। আজ তো উত্তেজনায়, সারাদিনে তেমন কোনো কাজই করতে পারিনি।’ কোনখানে শেষ করেছিল আগের দিন তা ধরিয়ে দিতেই বলতে শুরু করলো সে। বলতে লাগলো, কতো সুন্দরভাবে ও ওকালতি, থানা, পুলিশ, ক্রাইম

পৃষ্ঠা:৩৩

থেকে সরে এই নতুন জাগতে প্রবেশ করেছিল। জানালো কেমনভাবে ও শিখলো, আমাদের আজকের অশান্তিময় জীবনে মনকে নিয়ন্ত্রণ করে দুশ্চিন্তা থেকে দূরে থাকার, টেনশন মুক্ত থাকার উপায়। জীবনটাকে আরও সুস্থ, সুন্দরভাবে কাটাতে যোগী রমন ও অন্যান্য সন্ন্যাসীরা যে জ্ঞান অর্জন করেছিলেন তা তারা কেমনভাবে জুলিয়নের সাথে ভাগ করে নিলেন, তার দীর্ঘ বৃত্তান্ত আমাকে শোনালো জুলিয়ন। আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে সুপ্ত যে যৌবন আছে, যে প্রাণশক্তি আছে তাকে বের করে আনার, জাগিয়ে তোলার পদ্ধতি সেদিন আমায় জানালো সে। যদিও তার প্রত্যেকটি বক্তব্যের মধ্যে দৃঢ়তা ছিল, তবু আমার মনে সংশয় দেখা দিল। মনে প্রশ্ন জাগলো, আমার সাথে জুলিয়ন ঠাট্টা করছে না তো? কারণ হার্ভার্ড শিক্ষিত এই দক্ষ অ্যাডভোকেটটি এক সময় ফার্মে ‘প্রাকটিকাল জোকস্ করে বেশ ‘না’ করেছিলেন। ওর কাহিনীটা কেমন যেন একটু বেশিই চমৎকার মনে হচ্ছে না? ভাবুন, দেশবিখ্যাত অ্যাডভোকেট, তার বাড়ি ঘর, সম্পত্তিময় আত্মার প্রকৃত পরিচয় খুঁজতে খুঁজতে পৌঁছে গেল কোনো অরণ্যের তমশা ছায়ায়। তারপর হঠাৎ এক প্রভাতে হিমালয়ের গহন কেন থেকে সে এসে উপস্থিত হলো জ্ঞানী যোগী হিসেবে। না, এ সত্যি হতে পারে না। ‘জুলিয়ন, প্লিজ, আমাকে বোকা বানি তোমার এই পুরো কাহিনীটাই একেবারে তোমার মস্তিষ্ক প্রসূত বলে মনে হচ্ছে। আর ওই পোষাকটাও নিশ্চয়ই ভাড়া করে এনেছ আমার অফিসের উল্টো দিকের কস্ট্যুমের দোকানটা থেকে। সত্যি করে বল, তাই না?’ জুলিয়ন যেন তৈরিই ছিল আমার এই প্রতিক্রিয়ার জন্য। প্রশ্ন করলো, ‘কোর্টে, তোমার কেস কিভাবে প্রমাণ করো তুমি?’ ‘আমি অকাট্য যুক্তি ও প্রমাণ দাখিল করি।”ঠিক, তাহলে আমি যে প্রমাণ দাখিল করেছি, তা ভালো করে চেয়ে দেখো, আমার বলিরেখাহীন, মুখের দিকে তাকাও। আমার এই চেহারার দিকে তাকিয়েও বুঝতে পারছো না। আমার শরীরে এনার্জি ভরপুর। আমার শান্ত মুখ দেখে তোমার মনে হচ্ছে না, আগের থেকে কতো আলাদা আমি? কতো বদলে গেছি আমি তা তোমার চোখে পড়ছে না?’ হ্যাঁ, ওর কথায় যুক্তি আছে বটে। এইতো সেই লোক, যাকে কিছুদিন আগেও মনে হতো বয়সের ভারে ন্যুজ।

পৃষ্ঠা:৩৪

‘তুমি কোনো প্লাস্টিক সার্জেনের কাছে যাওনি তো?’ ‘না, হেসে বললো জুলিয়ন। বাইরে চেহারায় ছুড়ি কাঁচি চালালে কিছু হয় না জন। পরিবর্তন আসতে হয় ভেতর থেকে। বাইরে থেকে সারাই নয়, অসুখ সারাতে হয় ভেতর থেকে। আমার সামঞ্জস্যহীন, উচ্ছৃঙ্খল, অশান্ত জীবন আমাকে জীবনে অনেক দুঃখ-কষ্ট দিয়েছে। আমার হার্ট অ্যাটাকের চেয়েও তার যন্ত্রণাটা বেশি। ওটা আমায় ভেতর থেকে একেবারে ঝাঁঝরা করেদিয়েছিল।’কিন্তু তোমার গল্পটা যেন রূপকথার মতো।’ আমার এই মানসিক বাধার সামনে বসেও শান্ত ও অবিচল রইল জুলিয়ন। ওর পাশে রাখা টেবিলের ওপরে  টি পট থেকে আমার কাপে চা ঢালতে লাগলো সে। কাপের একেবারে কানা অবধি চা ঢালল, তারপরেও ঢেলে চললো। কাফ উপচে ডিশে পড়তে লাগলো চা, তারপর সেটা উপচে আমার বউ এর প্রিয় পার্শিয়ান কার্পেটের উপর। প্রথমে চুপ করে দেখছিলাম। তারপর আর চুপ করে থাকতে পারলাম না।’কি করছ তুমি? কাপ তো উপচে পড়ছে। তুমি ধরার ততটাই ধরবে ওই কাপে। তার চেয়ে বেশি যতটা নয়।’ আমি এক্স ফোটাও যতই চেষ্টা করো, বিরক্ত হয়েই চেঁচিয়ে উঠলাম। অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল জুলিয়ন প্লিজ, এটাকে খারাপভাবে নিও না জন। তোমাকে আমি খুবই পছন্দ করি, শ্রদ্ধা করি। কিন্তু একথা আমি না বলে পারছি না যে এই রাস্তাটার মতোই তোমার চিন্তাধারা ধ্যান ধারণাও, তোমার মস্তিষ্কে, একেবারে কানায় কানায় ভরে গেছে। তাতে নতুন কিছুই ঢুকবে না, যদি না তুমি আবার এটাকে খালি না করো।’ আচমকা ওর সত্যি কথাটা যেন আমার হৃদয়ে শূলের মতো বিধলো। ও সত্যিই বলেছে। প্রতিদিন, বছরের পর বছর একই পেশায় প্রায় একই ধরনের কেস লড়তে লড়তে, একই রকম মানুষ, একই বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মীদের মাঝে থাকতে থাকতে, এবং একই রকম চিন্তা করতে করতে আমি যেন কেমন একঘেয়ে হয়ে গেছি। কানায় কানায় ভরে গেছি। আমার স্ত্রী আমায় প্রায়ই বলে, আমাদের নতুন নতুন লোকের সঙ্গে মেলামেশা করা উচিত, নতুন জিনিস সম্পর্কে জানা উচিত জীবনটাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করা উচিত। ‘আমার খুব মনে হয় তুমি যদি আরেকটু অ্যাডভেঞ্চারাস হতে জন প্রায়ই সে একই কথা বলে আমায়। আমার নিজেরই মনে পড়ে শেষ কবে আমি আইনের বই ছাড়া, অন্য বই পড়েছি। পেশাটাই আমার জীবন হয়ে গেছে।

পৃষ্ঠা:৩৫

আমি বুঝতে পারি যে এই একঘেয়ে জীবনটাই আমার ভিতরের সব সৃজনশীলতা নষ্ট করে দিয়েছে, জীবন সম্পর্কে আমার দৃষ্টিকে খর্ব করে দিয়েছে। ‘হ্যাঁ, আমি তোমার বক্তব্য বুঝতে পেরেছি, মেনে নিই আমি। এতো বছর ধরে আইন ঘাঁটতে, ঘাঁটতে আমি বোধ হয় বেশিই অবিশ্বাসী হয়ে উঠেছি। কালকে যখন থেকে তোমাকে আমার অফিসে দেখেছি, তখন থেকেই আমার মনে হচ্ছে তোমার এই পরিবর্তন একেবারে জেনুইন। এবং এর থেকে আমারও কিছু শেখার আছে। তবে, হয়তো আমি তা বুঝেও বুঝতে চাইছিলাম না।’ ‘জন, মনে করো আজ তোমার নতুন জীবনের প্রথম রাত। আমার শুধু অনুরোধ আমি তোমায় যা যা শেখাবো, তা তুমি অন্তত একমাস মন দিয়ে মেনে চলবে।’ প্রতিটি পদ্ধতির উপর মন থেকে বিশ্বাস রেখে তাকে পালন করতে হবে। এই পদ্ধতিগুলো হাজার, হাজার বছর ধরে লোকে মেনে আসছে। কারণ তাতে কাজ হয়।’ ‘এক মাস তো অনেক সময়।’ ‘একটা সম্পূর্ণ জীবনকে একেবারে পরিপূর্ণ করে তুলতে মাত্র ছশো বাহাত্তর ঘণ্টা মানসিক কিছু ব্যায়াম, তোমার কি খুব বেশি মনে হচ্ছে? নিজের উপর ইনভেস্টমেন্টের চেয়ে ভালো ইনভেস্টমেন্ট তোমার জীবন বদলে যাবে তা নয়, তোমা প্রিয়জনের জীবনও।’ সঙ্গে . নেই জন। এতে শুধু সঙ্গে বদলাবে তোমার’কিভাবে?’ ‘মনে রেখো জন, নিজেকে ভালোবাসতে শিখলে তবেই মানুষ অপরকে ভালোবাসতে শেখে। নিজের হৃদয় অপরের কাছে মেলে ধরলে তবেই মানুষ অপরের হৃদয়কে ছুঁতে পারে। নিজে প্রাণবন্ত, উজ্জীবিত থাকলে, তবেই আরও ভালো একজন মানুষ হয়ে উঠতে পারবে।’ ‘এই এক মাসের ছশো বাহাত্তর ঘণ্টায় আমি কি সত্যিই বদলে যাবো?’ মন থেকে প্রশ্ন করলাম? ‘শরীর, মন, এমনকি তোমার অন্তরাত্মার ও তোমার ভাবনা, চিন্তার মধ্যে এমন পরিবর্তন আসবে যে তুমি নিজেও অবাক হয়ে যাবে। তোমার সারা জীবনে তুমি যে এনার্জি, কর্মক্ষমতা, উদ্দীপনা, ভালো লাগার অনুভূতি কখনো অনুভব করোনি, তাই করবে তুমি এই এক মাস পর থেকে। দেখবে লোকে তোমাকে বলতে শুরু করবে যে তোমায় দেখতে অনেক কমবয়সী ও

পৃষ্ঠা:৩৬

হাশিখুশি লাগছে। তোমার নিজের ভেতরেই একটা খুশি ও ভালো লাগার অনুভূতি ফিরে আসবে। শৃঙ্খলা ফিরতে শুরু করবে জীবনে এবং তার জন্য তোমার নিজেকে জোর করেও কিছু করাতে হবে না। এই হলো সিভানার সন্ন্যাসীদের সূত্র মেনে চলার কিছু ভালো লক্ষণ।’ ‘সত্যি!’ ‘আজ রাতে তুমি যা শুনতে চলেছ তা তোমার জীবনকে সুন্দর করে তুলবেই। এবং ব্যক্তিগত জীবন না, তোমার পেশাগত জীবনই শুধু নয়, সুন্দর হয়ে উঠবে তোমার আধ্যত্মিক জীবনও। এই সন্ন্যাসীদের শেখানো পথ হাজার বছর আগেও যেমন সমসাময়িক ছিলো আজও আশ্চর্যজনকভাবে তাই আছে। শুধু অন্তরই নয়, এগুলো তোমার বহির্জগৎকেও এমন সমৃদ্ধ করে তুলবে যে তুমি যা-ই করবে, তাতেই সুফল পাবে। আমার জীবনে এইগুলোর মতো এতো ক্ষমতাসম্পন্ন আমি কখনো কিছু দেখিনি। এর নির্দেশ একেবারে অমোঘ, যুক্তিসম্পন্ন, বাস্তববোধসম্পন্ন এবং জীবনের রসায়নাগারে হাজার বছর ধরে সঠিক বলে পরীক্ষিত, এবং সবচেয়ে সকলের জন্য উপযোগী। কিন্তু এসব কথা তোমায় টুকথা এটি তার আগে তোমায় একটা কথা দিতে হবে।’ আমি জানতাম এরকম কিছু একটা বলবে। পয়সায় কোনো লাঞ্চ হয় না।’  মা বলতেন, ‘বিনা’সিভানার সন্ন্যাসীদের শেখানোর সকল কিছু শেখার পর কথা দাও, তুমি তা আরও সকলের মধ্যে তা ছড়িয়ে দেওয়ার ব্রত নেবে। তাদের এই জ্ঞান দিয়ে সাহায্য করবে। যাদের জীবনে এই মূল্য অপরিসীম। এটুকুই চাই আমি তোমার কাছে। তুমি আমার এ ব্যাপারে সাহায্য করলে যোগী রমনকে আমি যে কথা দিয়েছি তা রাখতে আমারও কিছুটা সাহায্য হবে।’ আমি একবাক্যে রাজি হয়ে গেলাম। জুলিয়ন তার শিক্ষা শুরু করলো। সিভানার এই সিস্টেমে যদিও বহু রকমের শিক্ষণীয় সূত্র ছিল, কিন্তু মূলত তার ভিত্তি ছিল সাতটি মৌলিক গুণাবলি, সাতটি আদর্শ, যা মূলত তার ভিত্তি ছিল সাতটি মৌলিক গুণাবলি, সাতটি মৌলিক আদর্শ, যা স্বনির্ভরতা, নেতৃত্ব, দায়িত্ববোধ ও উন্নত আত্মিকবোধের চাবিকাঠি ছিল। জুলিয়ন বললো, সিভানায় থাকতে শুরু করার প্রায় কয়েকমাস পর যোগী রমন তাকে। এই সাতটি গুণাবলি শেখান। এক মেঘমুক্ত, তারায় ভরা রাত্রে ঘুমিয়ে পড়ার পর জুলিয়নের কুঁড়েঘরের দরজায় যোগী রমন টোকা দেন। খুব শান্ত ও অনুচ্চস্বরে বলেন, ‘আমি তোমায় বেশ কিছু দিন যাবৎ খুব কাছ থেকে দেখছি জুলিয়ন। আমার বিশ্বাস তুমি একজন সৎ মানুষ যে নিজের ভিতরে সব কিছু

পৃষ্ঠা:৩৭

‘ভালো’র সমাহার ঘটাতে চাও। এখানে আসার পর থেকে তুমি উদার হৃদয়ে আমাদের সকল নিয়ম-কানুন, ঐতিহ্য পরস্পরকে নিজের বলে কাছে টেনে নিয়েছো। আমাদের রোজের বহু নিয়মাবলিকে তুমি মেনে চলতে শুরু করেছ, এবং তার গুণাগুণ নিজেও উপলব্ধি করেছো। আমাদের চলার পথের উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছ। এই সহজ, সরল জীবন আমরা যুগ যুগ ধরে পালন করে আসছি যা সাধারণ মানুষ প্রায় জানে না বললেই চলে। কিন্তু এই সুন্দর বেঁচে থাকার পথ আমরা তাদের জানাতে চাই। আর সিভানায় তোমার তৃতীয় মাস কেটে যাওয়ার পর আমি তোমায় এমন কিছু শিক্ষা দিতে চাই যা শুধু তোমার নয়, সমগ্র বিশ্ববাসীর উপকারে আসবে। প্রতিদিন আমি তোমার সাথে বসবো, যেমন আমি আমার ছেলের সাথে বসতাম। দুর্ভাগ্যক্রমে কয়েক বছর আগে তার মৃত্যু হয়। তার যাওয়ার সময় হয়েছিল। তাই তার চলে যাওয়া নিয়ে আমি প্রশ্ন করি না। একসঙ্গে আমরা আনন্দমুখর সময় কাটিয়েছি, আর আজও সেই সব স্মৃতি বড়ই সুখদায়ক। আমি তোমাকে আমার ছেলের মতোই দেখি। আর আজ এটা ভেবে আনন্দ হচ্ছে য়ে আমার যুগ-যুগ সাধনায় শেখা বেঁচে থাকার, সুখে থাকার তোমার মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকবে।’ দেখাকার এই মন্ত্র তাকিয়ে দেখলাম, চোখ বুজে বিভোর হয়ে যেন ওই স্বপ্নের রাজ্যের অনুভূতি নিজের মধ্যে খুঁজে পেতে চাইছিল জুলিয়ন। তারপর আবার শুরু করল। ‘যোগী রমন বললেন, অন্তরের অনাবিল শান্তি, আনন্দ, আত্মিক সুখের খোঁজ রয়েছে একটি ছোট্ট গল্পের মধ্যে। উল্কি জামায় চোখ বন্ধ করতে বললেন। আর বললেন নিজের মনশ্চক্ষে দেখছে থাকো এই কাহিনীকে।’ তুমি বসে আছো সবুজের সমারোহের মাঝে। তোমার জানা সবচেয়ে সুন্দর ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে অপূর্ব বাগানটি। চারিদিকে শান্ত। এক অসীম নিস্তব্ধতা। এই সৌন্দর্যকে প্রাণ ভরে উপলব্ধি করো। মনে করো এই অপার সৌন্দর্য দুচোখ ভরে উপভোগ করো। চারিদিকে চেয়ে দেখো, দেখবে, বাগানের ঠিক মাঝখানে একটা লাল রঙের, ছ’তলা সমান উঁচু লাইটহাউস আছে। হঠাৎই চারিদিকের নিস্তব্ধতা ভেঙে, লাইটহাউসের দরজাটা বেশ আওয়াজ করে খুলে যায়। বেড়িয়ে আসে ন ফুট লম্বা, নশো পাউন্ড ওজনের একজন জাপানি সুমো কুস্তিগির। বাগানের মাঝখানে এসে সে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াতে থাকে। আর সবচেয়ে ভালো কথা হলো, সুমো কুস্তিগিরটি সম্পূর্ণ নগ্ন, হাসতে হাসতে বলে জুলিয়ন। না ঠিক পুরো নগ্ন নয়। তার ব্যক্তিগত স্থানটি গোলাপী তার দিয়ে জড়ানো।

পৃষ্ঠা:৩৮

এই বাগানে ঘুরতে ঘুরতে কুস্তিগীরের হাতে পড়ে যায় চকচকে সোনার একটি স্টপ ওয়াচ, যা বহু বছর আগে কেউ ওখানে ফেলে রেখে গিয়েছিল। কুস্তিগির ওটা দেখতে গিয়ে হঠাৎই পিছলে পড়ে যায় দারুণ শব্দে, আর অজ্ঞান হয়ে সেখানেই পড়ে থাকে নিথর শরীরে। যখন তোমার মনে হবে ওর শেষ নিশ্বাস বুঝি বেড়িয়ে গেছে, ঠিক তখনই, হয়তো বা কাছেই ফুটে থাকা হলুদ গোলাপের সুবাসে ধীরে ধীরে জেগে ওঠে সে। তারপর লাফ দিয়ে উঠে কি ভেবে যেন বাঁ দিকে তাকায়। চমকে যায়। দেখে বাগানের সীমানায় ছোট ছোট ঝাড়ের ফাঁক দিয়ে চলে গেছে সে পথ, তা ঢেকে আছে লাখো লাখো হীরের টুকরায়। কে যেন ভেতর থেকে বলে উঠে, ওই পথ ধরে এগোতে। সে এগোতে শুরু করে হীরে বিছানো পথ ধরে। এই পথ তাকে নিয়ে যায় চিরন্তন আনন্দ ও সীমাহীন শান্তির দিকে।’ হিমালয়ের ওই উচ্চতায় বসে, অতো রাতে এক সন্ন্যাসী, যিনি ধ্যান ও কিছু পদ্ধতির জোরে নিজের মধ্যে জ্ঞানের আলো সঞ্চারিত করেছেন, তার মুখ থেকে এ গল্পটা শুনে জুলিয়ন বেশ কিছুটা হতাশ হলো। সে ভেবেছিল এমন কিছু গল্প সে শুনবে, যা তার এতোদিনের ধ্যান ধারণাকে আমূল বদলে দিয়ে যাবে, ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়ে যাবে। হয়তো বা অথচ যা সে শুনল, তা হলো এক সুমো ও লাইটহাউমের বোকা কাহিনী। তার হতাশা ধরতে পেরে যোগী রমন বললেন দেখো না, এর ক্ষমতা অপরিসীম।’ ‘এই ছোট গল্পটি হয়তো সেরকম জয়ে জল এনে দেবে। সরলতাকে ছোট্ট করে তুমি আশা করছিলে। কিন্তু এর অন্তর্নিহিত অর্থের মধ্যে বহু কিছু লুকিয়ে আছে। যখন থেকে তুমি এসেছো, তখন থেকে আমি অনেক ভেবেছি যে, কিভাবে তোমার সাথে আমি এই জ্ঞানটুকু ভাগ করে নেবো। প্রথমে ভেবেছিলাম কয়েকমাস ধরে তোমাকে এই বিষয়টির উপর বেশ কিছু লেকচার সেশন’-এ বসাবো। তারপর দেখলাম চিরন্তন এই প্রথায়, তুমি এর আশ্চর্যজনক ফলটি অনুভব করতে পারবে না। তারপর ভাবলাম, এখানে উপস্থিত আমার সকল ভাই-বোনদের বলব, তারা যেন প্রত্যেকে প্রতিদিন তোমার সঙ্গে কিছুটা সময় কাটায়, ও আমাদের দর্শন সম্পর্কে তোমাকে অবহিত করে। পরে মনে হলো, এটাও ঠিক কার্যকরী পন্থা হবে না। অনেক ভেবে দেখলাম যে এই পুরো দর্শনটি তোমাকে এমন কোনো গল্পের মাধ্যমে বলতে হবে, যাতে তোমার তা বুঝতে জলের মতো সহজ লাগে। অনেক ভেবে, (সিভানার সিস্টেম এবং সাতটি চিরন্তন আদর্শ যা আমরা সকলেই এখানে পালন করে থাকি তা জানানোর জন্য) এমন এক সৃজনশীল পদ্ধতি বের করলাম, যা আমার কাছে অত্যন্ত কার্যকরী মনে হলো।

পৃষ্ঠা:৩৯

আজ তোমাকে এখন সেই নীতিকাহিনীই শোনাবো। বৃদ্ধ সন্ন্যাসী শুরু করলেন, ‘প্রথমে গল্পটি শুনতে খুব বোকা এবং ছেলে মানুষী লাগলেও এর মধ্যে উদ্ধৃত প্রত্যেকটি বাক্যের অত্যন্ত পূঢ় অর্থ আছে, যা উন্নত জীবনযাপনের সহায়ক। বাগান, লাইট হাউস, সুমো কুস্তিগির, গোলাপী তার, স্টপ ওয়াচ্ গোলাপ, আঁকা বাঁকা পথ আর হীরে এগুলো হলো এক উচ্চমানের জীবনধারণ করার সাতটি অমূল্য ও চিরন্তন আদর্শ। আমি তোমায় কথা দিতে পারি, যে এই ছোট্ট গল্পটুকু তুমি যদি মনে রাখো আর এর মধ্যে লুকিয়ে থাকলো অর্থগুলোকে যদি আত্মস্থ করে নিতে পারো তাহলে নিজের জীবনটাকে আনন্দের শিখরে তো নিয়ে যেতে পারবেই, আর ছুঁতে পারবে তাদের জীবনকেও, যারা তোমার হৃদয়ের খুব কাছের। আর প্রতিদিনের কাজের ছোট ছোট সূত্রগুলোকে যদি কাজে লাগাও, তাহলে নিজেই দেখবে তুমি পাল্টাতে শুরু করেছো, মানসিক, শারীরীক, আত্মিক ও বৌধিক সবদিক থেকেই। একে মস্তিষ্কে এঁকে নাও, আর হৃদয়ে নিয়ে ঘোরো। কোনোরকম অবিশ্বাস ছাড়া একে যদি গ্রহণ করতে বা, এটি তোমার জীবনে এক নাটকীয় পরিবর্তন এনে দেবে।’যোগী রমনের কথা শেষ করে জুলিয়ন বললো, আমি একে মন সৌপ্তিক্রমে থেকে মেনে নিতে পেরেছিলাম। কার্ল ইয়্যুৎ রইলেন, ‘হৃদয়ের ভিতরে উকি মেরে যদি দেখতে পারো তবেই তোমার দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন হবে। যে বাইরেরটা দেখে, সে শুধু মধু দেখে। যে ভিতরটা দেখো, সে জেগে ওঠে।’ সেই বিশেষ রাতটিছে আমার জাগরণ ঘটলো। যুগ যুগান্তর ব্যাপী বিস্তৃত, সাধু, মহাপুরুষদের তৈরি করা সেই প্রথা, সেই জ্ঞান, আমাকে আমার অন্তর্লোকে উঁকি দিতে শেখালো। শেখালো শরীর ও মনকে একই সূত্রে গেঁথে, এক উচ্চমার্গের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিতে। এবার আমার পালা সেই আহরিত জ্ঞান তোমার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার।’

পৃষ্ঠা:৪০

অধ্যায় ৭

এক অত্যাশ্চার্য সুন্দর উদ্দ্যান

‘সব মানুষ বাঁচে-শারীরিক, মানসিক, নৈতিকতায় স্বকৃত এক ঘেরাটোপের মধ্যে অথচ আমাদের সকলের মধ্যেই এমন জীবনী শক্তির ভাণ্ডার আছে যার কথা আমরা স্বপ্নেও ভাবতে পারি না’ -উইলিয়াম জেমস ‘এই গল্পে বাগানটি হলো মানুষের ‘মনের রূপক’ জুলিয়ন শুরু করল। ‘তুমি যদি মনকে যত্ন কর, লালন পালন কর, ঠিক এক উর্বর, সবুজ বাগানের মতো করে, তবে এটি প্রস্ফুটিত হয়ে উঠবে তোমার প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর হয়ে। কিন্তু, হারিয়ে যেতে থাকবে অচিরেই। জানি তোমায় একটা প্রশ্ন করি। তোমার বাড়ির পিছনের যে বাগানটার কথা তুমি প্রায়ই আমার বলতে, সেখানে গিয়ে যদি পিটনিয়া ফুলগুলোর উপর আমি বিষাক্ত পদার্থ ছুঁড়ে ফেলতে থাকি, তুমি নিশ্চয়ই খুব ‘না, অবশ্যই নয়।’ আনন্দিত ইবে না, হবে কি? ‘বেশিরভাগ মানুষই, তার নিজের বাগানটিকে প্রাণপণে আগলে রাখে, সুন্দর রাখে। সেখানে কোনো নোংরা, আবর্জনা ফেলতে দেয় না। অথচ দেখো তারা কতো সহজেই তাদের বাগানের মতো সুন্দর মনটাকে প্রতিদিন নোংরা, আবর্জনাময় করে তুলছে। অর্থাৎ উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, অতীত নিয়ে অসন্তোষ, ভবিষৎ নিয়ে দুর্ভাবনা আর স্বতঃকৃত মনগড়া দুশ্চিন্তা যা তাদের মনের শান্তিকে নিমেষে তছনছ করে দেয়। তাই দিয়ে ভরে তুলছে জীবন। শুনলে অবাক হবে, হাজার বছর ধরে চলে আসা সিভানার সন্ন্যাসীদের ব্যবহৃত ভাষায় ‘চিন্তা’ শব্দটির আশ্চর্য মিল রয়েছে ‘চিতা’ শব্দের সঙ্গে। যোগী রমন বলেন, এটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। দুশ্চিন্তা মানসিক ক্ষমতার অধিকাংশই নষ্ট করে দেয়। এবং আজ হোক বা কাল, তা এক সময় আত্মাকে বিনষ্ট করে।জীবনটাকে পরিপূর্ণরূপে উপভোগ করতে হলে মনরূপী বাগানের দরজায় একেবারে শাস্ত্রী সেজে পাহারা দিতে হবে। ভিতরে আসতে দেবে শুধু সুস্থ, স্বাভাবিক সত্য এবং সেরা তথ্যটুকুকেই। নেতিবাচক কোনোপ্রকার তথ্য তা সে একটিই হোক না কেন, তাকে ঢুকতে দেওয়ার বিলাসিতা করা যাবে না

পৃষ্ঠা ৪১ থেকে  ৫০

পৃষ্ঠা:৪১

কখনোই। পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী, পরিতৃপ্ত, গতিশীল, ঝকঝকে মানুষগুলো থেকে তুমি আর আমি কিন্তু আলাদা নই। সকলেই আমরা রক্তমাংসের মানুষ। একই উৎস থেকে আমাদের উৎপত্তি। তবুও, বেশির ভাগ মানুষই সাদামাটা জীবনযাপন করে যান। কেউ কেউ যারা শুধু বেঁচে থাকার জন্যই বাঁচেন না, জীবনের আস্বাদটিকে পরিপূর্ণ রূপে গ্রহণ করে নিতে জানেন, তারা তথাকথিত দিন অতিবাহিত করে যাওয়া মানুষগুলোর থেকে একটু আলাদা, এক রোমাঞ্চকর জীবন যাপন করতে পারেন।’জুলিয়ন বলে চলে, ‘সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই মানুষগুলো জীবনের সব কিছুর মধ্য থেকে সদর্থক এবং সত্যটুকুকে ছেকে তুলে এনে, তার মধ্যেই নিজেদের পৃথিবী গড়ে তোলেন। সন্ন্যাসীরা আমায় বলেছিলেন যে গড়ে প্রতিদিনে, প্রতিটি মানুষের মনে ষাট হাজার চিন্তার সমাহার ঘটে। এবং মজার কথা হলো, তার পঁচানব্বই শতাংশই হলো আগের দিনের পুরনো চিন্তা।’ ‘সত্যি বলছো?’ ‘সত্যিই। বিশৃঙ্খল চিন্তাধারার প্রতিফল হলো এটা। যে সব মানুষ প্রতিদিন একই কথা ভেবে চলে, এবং যেগুলোর বেশিরভাগই নেগেটিভ বা নেতিবাচক, তাদের এই ধরনের মানসিকতাস অভ্যাস গড়ে উঠে। জীবনটাকে কি করে সুন্দর করে গড়ে তোলা যায় যা আছে তার চেয়ে আরও ভালো কি করে করা যায়, তা না ভেবে এরা অতীতেই পড়ে থাকে সর্বদা। কেউ চিন্তা করে যায় ভেবে যাওয়া সম্পর্করা অর্থনৈতিক সমস্যা নিয়ে। কেউ ভেবে যায় সমস্যাসঙ্কুল ছেলেবেলা নিয়ে।। । আর কেউ কেউ তো সামান্য থেকে সামান্য বিষয় নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চিন্তা করে যেতে পারে। যেমন, কোনো দোকানের কর্মচারী কেন তার সঙ্গে ভালো করে কথা বললো না, বা সহকর্মীর কোনো কথায় তার উদ্দেশ্যে কি খোঁচা ছিল ইত্যাদি। যারা এইভাবে ভেবে যেতে পছন্দ করে তারা আসলে তাদের জীবন শিক্ষার রস প্রতিমুহূর্তে নিংড়ে নিঃশেষ করে চলে। এদের মন কিন্তু আদতে এদের সকল রকম আনন্দ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এমন অনেক অসাধ্য সাধনের ক্ষমতা রাখে যা তারা নিজেরাও জানে না। কিন্তু মুশকিল হলো, মনের বিপুল ক্ষমতার উৎসকে তারা নিজের হাতে বন্ধ করে রেখেছে। এরা জানেও না যে মনের সঠিক পরিচালনাই আসলে জীবনের পরিচালনার মূল মন্ত্র।’ তোমার চিন্তা করার ক্ষমতা বা শৈলী সম্পূর্ণ অভ্যাসনির্ভর। বেশিরভাগ মানুষই তার মনের অসামান্য দক্ষতার কথা জানে না। আমি দেখেছি যে আদর্শ চিন্তাবিদরাও তাদের মানসিক চিন্তা ভাণ্ডারের ১০০ ভাগের ১ ভাগ মাত্র

পৃষ্ঠা:৪২

ব্যবহার করে থাকেন। সিভানায় সাধকগণ তাদের অব্যবহৃত মস্তিষ্কের ভাঙারকে নিয়মিত হারে ব্যবহার করার সাহস দেখিয়েছেন। এবং তার ফল আশ্চর্যজনক হয়েছে। নিয়মিত ও সুশৃঙ্খল অনুশীলনের মাধ্যমে যোগ রমন তার মনকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন যে, তিনি স্বেচ্ছায় তার হৃদয়স্পন্দনের হার কমাতে, বাড়াতে সক্ষম। তিনি চাইলে টানা কয়েক সপ্তাহ না ঘুমিয়ে, বিশ্রামহীন অবস্থায় থাকতে পারেন। যদিও আমি তোমায় কখনোই বলবো না যে তোমার জীবনের লক্ষ্যও এই হওয়া উচিত, তবে অবশ্যই বলবো, নিজের মনকে প্রকৃতির সর্বোৎকৃষ্ট উপহার বলে অবশ্যই ভাবতে শুরু করো।’ ‘মনের এই শক্তিকে বের করে আনার কোনো ব্যায়াম বা উপায় আছে কি?হৃদয়স্পন্দনকে কমাতে বাড়াতে পারলে ককটেল পার্টি মহলে আমি নিশ্চয়ই জনপ্রিয় হয়ে উঠবো, ঠাট্টা করে জানতে চাই। ‘কিছু ভেবো না জন, আমি তোমাকে কিছু বাস্তবসম্মত কলাকৌশল শিখিয়ে দেবো, যা পরে যাচাই করে দেখতে পাবে প্রাচীন এই প্রস্তুজি কেমন ম্যাজিকের ক্ষমতা রাখে। আপাতত যেটা জরুরি তা হলো, (ক্লোময়ি বুঝতে হবে যে মনকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই মানসিক ক্ষমতা আইনি করা সম্ভব-কিছু নয়, কমও নয়। আমরা যখন পৃথিবীতে আসি তখন আমাদের সকলের মধ্যেই কম বেশি একই উপকরণ থাকে। কিন্তু যারা অন্যদের থেকে বেশি সফল বা বেশি খুশি হয়, তারা এই উপকরণগুলোকে সঠিক মাত্রায়, সঠিক পরিমাণে ব্যবহার করতে জানে বলেই তাড়ারে। নিজের অন্তরাগৎকে নিয়ন্ত্রণ ও রূপান্তর করতে সক্ষম হলে, তোমার জীবনযাপনের মানও সাধারণ থেকে অসাধারণ জ্বরে পৌঁছতে পারবে।’ মনের জাদুকরী ক্ষমতা এবং তা মনের সকল শুভ উপলব্ধিকে কতো নিশ্চিতভাবে উপস্থাপন করতে পারে, তা আমাকে বোঝাবার সময় আমার শিক্ষক উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন। তার চোখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল। ‘জানো জন, সব কথা বলা হয়ে গেলে, সব কাজ সারা হয়ে গেলে একটা জিনিস কিন্তু রয়ে যায়, যার উপর আমাদের সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব, নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ রয়ে যায়। ‘আমাদের সন্ধান?’ হেসে, ভালো মনে বললাম। ‘না, বন্ধু, আমাদের মন। আমরা রাস্তার ট্রাফিক, আবহাওয়া বা আমাদের আশেপাশে থাকা মানুষগুলো মনোভাবের উপর কোনোরকম হস্তক্ষেপ করতে পারি না। কিন্তু এসকল কিছুতে আমাদের মনের প্রতিক্রিয়াকে অবশ্যই

পৃষ্ঠা:৪৩

নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। কোনো একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে কি কথ্য ভাববো, তাও ঠিক করার ক্ষমতা আমাদের আছে। এবং এই নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাই তো আমাদের মানুষ করে তৈরি করেছে। জানোয়ার বানায়নি। প্রাচ্যে বেড়াতে গিয়ে পার্থিব জ্ঞানভান্ডারের যে সকল মণি-মানিক্য আমি আহরণ করেছি তার শ্রেষ্ঠ রত্নটিই অত্যন্ত সহজলভ্য।’ জুলিয়ন একটু থামলো, যেন ওই অমূল্য উপহারটির কথা একটু ভেবে নেওয়ার জন্য ‘সেটা কি হতে পারে?”ব্যক্তি নিরপেক্ষ বাস্তবতা’ বা ‘বাস্তব পৃথিবী’ বলে কিছু নেই। চরম সত্য বলে কিছু হয় না। তোমার চরম শত্রুর মুখ আর তোমার পরম মিত্রের মুখ একই হতে পারে। যে ঘটনা একজনের জীবনে সর্বনাশ ডেকে আনে, অন্য কারও জীবনে সেই ঘটনাটিই হয়তো প্রচুর সম্ভাবনা বয়ে আনে। সর্বদা হাসিখুশি ও আশাবাদী মানুষ এবং অখুশি ও দুর্দশাগ্রড মানুষের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো জীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতিকে এরা কিভাবে ব্যাখ্যা করে ও তার বাবঞ্জ নেয়? ‘তালিয়ন, একটা বেদনাদায়ক ঘটনা আরেকজনের ক্ষেত্রে কিভাবে আনন্দের হতে পারে?’একটা চটজলদি উদাহরণ দিই। আমি অঞ্চল কলকাতায় বেড়াতে গিয়েছিলাম, তখন সেখানে আমার মল্লিকা উচ্চে নামে এক শিক্ষিকার সঙ্গে আলাপ হয়। শিক্ষকতা করতে তিনি ভাল্ডেরারতেন, এবং ছাত্রদের সন্তানসমস্নেহ করতেন। তার শিক্ষার মূলমন্ত্র ছিল, তোমার ‘আমি পারবো’, বা ‘আত্মবিশ্বাস’, তোমার ‘আই কিউ’র উড়কে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সমাজের সকলে তাকে একজন এমন মানুষ হিসেবে জানতেন যিনি সমাজের বহু উপকার করেছেন। অথচ একদিন তারই ভালোবাসার স্কুলটিতে এক দুর্বৃত্ত আগুন ধরিয়ে দিল। পুড়ে ছাই হয়ে গেল সব। এলাকার মানুষ বুঝল তাদের বিরাট ক্ষতি হয়ে গেল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, মানুষের ক্ষোভ, ঔদাসীন্যে পরিণত হলো। সন্তানকে আর স্কুলে পাঠাতে পারবে না, এটাকেই নিয়তি বলে মেনে তারা হাত গুটিয়ে বসে রইলো। ‘মল্লিকা কি করলো? তিনি একটু অন্য রকমের ছিলেন। চিরন্তন আশাবাদী বলতে যা বোঝায়, ঠিক তাই। এই চূড়ান্ত হতাশ পরিবেশের মধ্যে তিনি আশার আলো দেখতে পেলেন। অভিভাবকদের ডেকে তিনি বললেন, সব খারাপের মধ্যেও কিছু ভালো লুকিয়ে থাকে। তবে তাকে খুঁজে নিতে জানতে হয়। আগুনে পুড়ে একদিকে শাপে বর হয়েছে। বাড়িটা এমনিতেও ভগ্নদশা প্রাপ্ত হয়েছিল। ছাদ

পৃষ্ঠা:৪৪

ফুটো হয়ে জল পড়তো। হাজার হাজার ছোট পায়ের চাপে মেঝের অবস্থাও খারাপ হয়ে এসেছিল। এই সময় সকলে একসঙ্গে হাত মিলিয়ে এবার একটা নতুন স্কুল গড়ে তুলতে হবে। এমন সুন্দর স্কুল যেখানে আরও বেশি ছাত্রছাত্রী পড়াশুনা করে ভবিষৎ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। আর যা ভাবা, সেই কাজ। চৌষট্টি বছরের এক ডায়নামোর প্রেরণায়, যার যা সম্বল তা এক জায়গায় জড়ো করা হলো। দৃষ্টিভঙ্গির এক চরম দৃষ্টান্ত।”এটা তো সেই পুরনো প্রবচনের মতো, কাপের অর্ধেক অংশ খালি মনে না করে, অর্ধেক অংশকে ভর্তি মনে করা।”সেটাই তো সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি। তোমার জীবনে যাই ঘটুক না কেন, তুমি কিভাবে তার প্রতিক্রিয়া জানাবে তা রয়েছে তোমারই হাতে। প্রকৃতির অন্যতম সূত্রগুলোর শ্রেষ্ঠ হলো, প্রতিটি ঘটনার ইতিবাচক দিক খুঁজে বের করা। এবং এটা যদি তুমি অভ্যেস করে নাও, তোমার জীবন উন্নততর হতে বাধ্য। ‘মনকে কার্যকরীভাবে ব্যবহার করা থেকেই কি এর সূত্রপাত হয় ঠিক তাই জন। পার্থিব সাফল্য হোক বা আধ্যাত্মিক, সরেরই সূত্রপাত ঘটে দু-কাঁধের মাঝে অবস্থিত বারো পাউন্ডের ওই মাংসপিড়া থেকে। বা আরও পরিষ্কার করে বলতে গেলে প্রতি মুহূর্তে, প্রতি খলে যে ধরনের চিন্তাভাবনা মনের মধ্যে ঢোকাচ্ছে, তার থেকে। তোমার অন্তর্জগতের অবস্থা প্রতিফলিত হয়, তোমার বহির্জগতের আচরণের মাধ্যমে যে চিন্তা ভাবনা তুমি করো, এবং তার যা প্রতিক্রিয়া বাইরে প্রতিফলিত হয়, তার উপরে সঠিক নিয়ন্ত্রণ তোমাকে তোমার ভাগ্যনিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে।’ ‘সত্যিই, এর মধ্যে অনেক বোঝার মতো জিনিস আছে, জুলিয়ন। কিন্তু আমার কাজ, ওকালতি নিয়ে আমি এমন ব্যস্ত হয়ে পড়েছি যে জীবনটাকে নিয়ে ভাবার সময় পর্যন্ত আমার নেই। আমি যখন আইনের স্কুলে পড়তাম, আমার বন্ধু অ্যালেক্স খুব প্রেরণামূলক বই পড়তে পছন্দ করতো, সে বলতো, কাজের প্রচণ্ড চাপে এই বইগুলোই তাকে প্রাণশক্তি জুগিয়ে যায়। আমার মনে আছে একবার ও আমায় বলেছিলো যে, চিনা ভাষায় ‘সংকট’ শব্দের দুটো উপলিপি আছে, যার একটার মানে ‘বিপদ’, আরেকটি ‘সুযোগ’। আমার ধারণা, সে প্রাচীন চীন দেশের মানুষও জানতেন যে, খুঁজে নেওয়ার সাহস থাকলে সবচেয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশেও আলোর দেখা। পাওয়া যায়।’ ‘যোগী রমন বলেন, ‘জীবনে কোনো ভুল বলে কিছু নেই, আছে শুধু শিক্ষাগ্রহণ’। নেতিবাচক অভিজ্ঞতা বলে কিছু নেই। আছে শুধু

পৃষ্ঠা:৪৫

আত্মনিয়ন্ত্রণের পথ ধবে বেড়ে ওঠা, শিক্ষা নেওয়া, আর এগিয়ে চলা। সংগ্রাম থেকেই শক্তির উদয় হয়। এমনকি যন্ত্রণাও এক দারুণ শিক্ষক হয়ে। উঠতে পারে। ‘হ্যাঁ। যন্ত্রণাকে তাড়াতে হলে আগে তো যন্ত্রণাকে অনুভব করতে হয়। বা অন্যভাবে বলতে গেলে,পাহাড়ের শিখরে ওঠার আনন্দ তুমি পাবে কি করে, যদি না তুমি সেই পাহাড়ের পাদদেশে, সর্বনিম্ন জায়গাটিতে এসে থাকো? কি বললাম বুঝতে পেরেছো?’ ‘হ্যাঁ, ভালো কিছুর আস্বাদ নিতে গেলে, জীবনে খারাপটুকুর অনুভূতি থাকাটাও জরুরি। খারাপ না দেখলে, ভালোর দাম মানুষ দেবে কি করে?’ ‘ঠিক তাই। কিন্তু আমি তোমায় বলি, যে কোনো ঘটনাকে ভালো, ইতিবাচক বা নেতিবাচক বলে ভাবাটা বন্ধ করো। বরং সেটাকে উপলব্ধি করো, তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করো। প্রতিটি ঘটনাই কোনো না কোনো শিক্ষা দেয়। এই ছোট ছোট শিক্ষা বা অভিজ্ঞতাই তোমার সম্পূর্ণ সভাটিকে গড়ে তোলে। এদের ছাড়া তুমি তো মালভূমিতে থেমে যাবে। একবার তোমার জীবনের পরিপ্রেক্ষিতে এটা ভেবে দেখো। অধিকাংশ মানুষই অধিকাইশ চ্যালেঞ্জিং অভিজ্ঞতার থেকে শিক্ষা নিয়ে বড় হয়ে ওঠে। আর সুদ্দি যদি এমন কোনো ফল পাও যা তুমি আশা করনি, এবং তাতে যদি মুড়ির পাও বা হতাশ হও, তবে তোমাকে বলি, প্রকৃতির নিয়মে আছে একদিন একটি দরজা বন্ধ হয়ে যায়, তখন কোথাও না কোথাও আরেকটি দরজা খুলে যায়। কথা বলার উত্তেজনায়, জুলিয়নের আঙুর উঠতে লাগলো। অনেকটা সাদার্ন মিনিস্টারের মতো। ‘একবার তুমি যদি এই নীতিটাকে তোমার রোজকারের জীবনে ঢুকিয়ে দিতে পারো এবং মনকে বোঝাতে পারো যে, কোনো ঘটনাই ইতিবাচক বা নেতিবাচক নয়, সব ঘটনাই কিছু না কিছু শেখায়, তাহলে তোমার জীবন থেকে দুশ্চিন্তা সর্বদার জন্য দূরে পালাতে পথ পাবে না। নিজের অতীতের কারাগারে বন্দী হয়ে না থেকে, ভবিষ্যতের কারিগর হয়ে উঠতে পারবে তুমি।’ ‘হ্যাঁ, ব্যাপারটা এবার বুঝেছি, তুমি বলতে চাইছ যে অভিজ্ঞতা তা সে যত খারাপই থাক না কেনো, কোনো কোনো শিক্ষা অবশ্যই দেয়। তাই আমার মনের দরজা আমার সর্বদা উন্মুক্ত করে রাখা উচিত। এভাবেই জীবনে আমি সুখী ও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারবো। একজন সাধারণ মধ্যবিত্ত, আইনজীবী, তার অবস্থার উন্নতি ঘটাতে আর কি করতে পারে?”প্রথমত তোমার কল্পনার গৌরবকে সঙ্গী করে বাঁচার চেষ্টা করো-স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে নয়।’

পৃষ্ঠা:৪৬

‘একটু পরিষ্কার করে বলো।”আমি বলতে চাইছি, তোমার দেহ, মন ও আত্মত্মার শক্তিকে মুক্ত করতে হলে, তোমার কল্পনাশক্তিকে প্রসারিত করতে হবে। ভেবে দেখ যে কোন বস্তু দুবার সৃষ্টি হয়। প্রথমবার মনের কারখানায় এবং শুধুমাত্র তারপরই, বাস্তবে যে কোনো বস্তু যা তুমি বহির্জগতে সৃষ্টি করছো, তার প্রস্তুতি শুরু হয় তোমার মনের মধ্যে অত্যন্ত সহজ সরল একটি খসড়া তৈরির মাধ্যমে। মনের পর্দায় ভেসে উঠে তার ছবি। যখন তুমি তোমার চিন্তাধারাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখবে এবং বিস্তারিতভাবে এই পার্থিব জগতের থেকে তোমার মধ্যে যে সুপ্ত শক্তিগুলো সঞ্চিত আছে, তা জাগ্রত হয়ে উঠবে। আর তখনই তুমি তোমার মনের প্রকৃত ক্ষমতাকে বুঝতে শিখবে। তোমার আশেপাশে নিজেই তৈরি করতে সক্ষম হবে এমন এক সুন্দর পৃথিবী যা তোমার প্রাপ্য। আজ রাত থেকেই শুরু হবে তোমার এই যাত্রা। অতীতকে ভুলে, ভবিষ্যতের পথ প্রশস্ত করার যাত্রা। আজ থেকেই বর্তমানকে ভুলে, তোমার যা চাহিদা, যা নিয়ে স্বপ্ন দেখার সাহস দেখাও। সেরা বস্তুটি আকাদক্ষা করো। তুমি অবাক হয়ে যাবে এর ফলাফলে।’জানো জন, ওকালতির ওই বছরগুলোতে, আমি ভানুভমি আমি কতো কি না জানি। পৃথিবীর সেরা স্কুলে পড়াশোনা করেছি। আইনের যে বই আমার হাতে পড়েছে, তাই প্রতিটি পড়ে ফেলেছি জমি। দেশের সেরা রোল মডেলদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ ছেয়েছি। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে আমি আইনের বেলায় জিতেও গিয়েছিলামু। কিন্তু আজ বুঝি জীবনের খেলায় আমি একেবারে গো-হারা হেরে গিয়েছিলাম। বড় বড়, বিলাসব্যসন, সুখের পিছনে এতো বেশি দৌড়েছি যে, জীবনের ছোট ছোট সুখ সব হারিয়ে ফেলেছি অচিরেই। বাবা যে সব বিখ্যাত বই পড়তে বলতেন, কখনো পড়িনি সে সব। কোনো দামি বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে পারিনি। কখনো কোনো ভালো সঙ্গীতের সমঝদার হতে পারিনি। কিন্তু, আজ বসে ভাবি, একটা বিষয়ে আমি সত্যি ভাগ্যবান। ঠিক সময়ে আমার হার্ট অ্যাটাকটা আমার ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়ে গেল। বিশ্বাস করবে কি না জানি না। ওটাই আমাকে দ্বিতীয়বার বাঁচার সুযোগ করে দিয়ে গেল। একটা প্রাকৃত অর্থে বাঁচার মতো করে বাঁচার সুযোগ করে দিয়ে গেল। মল্লিকার মতো, আমিও ওই যন্ত্রণাময় মুহূর্তেও সুযোগের বীজ লক্ষ করেছিলাম। সবচেয়ে বড় কথা, সেই সুযোগের বাজিটিকে লালন- পালন করে তোলার সাহসটুকু দেখিয়েছি আমি।’ আমি দেখতে পাচ্ছিলাম, জুলিয়ন বাইরে যতখানি নবীন হয়েছে, অন্তরে হয়েছে ঠিক ততখানিই বিচক্ষণ। বুঝলাম এই সন্ধ্যাটি শুধু দুই পুরনো বন্ধুর

পৃষ্ঠা:৪৭

মধ্যে নিছক আতভা নয়, তারচেয়ে অনেক বেশি কিছু। অনুভব করলাম, আমার জীবনের মোড় ঘুরে যাওয়ার মুহূর্ত আজ রাতেই আসতে পারে। আসতে পারে জীবনে নতুন করে সব শুরু করার সুবর্ণ সুযোগও। জীবনে যা বা ভুল করেছি, তা যেন কোথা থেকে ভুসভুস করে মনগঙ্গার মাঝ থেকে ভেসে উঠতে লাগলো। এটা ঠিক যে আমার একটি অসাধারণ পরিবার রয়েছে, একটা স্থায়ী চাকরি রয়েছে, ওকালতি করে যথেষ্ট নামও হয়েছে। তবু নির্জন কোনো মুহূর্তে আমার মধ্যে আর কিছু না পাওয়ার এক শূন্যতা তৈরি হয়। যে শূন্যতা আমায় ছেয়ে ফেলতে শুরু করেছে, তা আমাকে ভরিয়ে তুলতেই হবে। যখন ছোট ছিলাম, তখন অনেক বড় বড় স্বপ্ন দেখতাম। কখনো নিজেকে খেলার নায়ক হিসেবে দেখতাম, কখনো বা নামজাদা ব্যবসায়ী হিসেবে। আমি বিশ্বাস করতাম যে আমি ওরকম সত্যিই একদিন হতে পারবো। যা হতে চাই, তাই হতে পারবো। মনে পড়ে যাচ্ছিল পশ্চিম উপকূলে আমার শৈশবের দিনগুলোর কথা। কত ছোট ছোট জিনিসে আনন্দ পেতাম তখন। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সাইকেল চালিয়ে যাওস্থাৰু অধ্যেও কত আনন্দ ছিল। একজন প্রকৃত অ্যাডভেঞ্চারার ছিলাম আমি। জীবনের প্রতিটি জিনিসের প্রতি ছিল দারুণ আগ্রহ। ভবিষ্যতের স্বপ্নে ক্রিীনো বাধা মানতাম না। মনে মনে কতো কিই যে করে ফেলতাম। সত্যিই এই গত পনেরো বছরে, অতো আনন্দ তো কখনো পাইনি। কিংবলো আমার? বোধহয় বড় হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে আমার স্বপ্ন দেখার চোখটা হারিয়ে গিয়েছিল। বড়দের যা করণীয় তাই লিজিবাদে করে গিয়েছি আমি। হয়তো ল’ কলেজে গিয়ে আমার সব স্বপ্নগুলো আরও দ্রুত হারিয়ে গিয়েছিল জীবন থেকে। তখন অ্যাডভোকেটরা যেভাবে কথা বলে, যেভাবে বলা উচিত তাদের, সেসব শিখতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন যে। সেই সন্ধ্যায় এক কাপ ঠাণ্ডা চা এর মাঝে, জুলিয়ন যখন তার হৃদয়ের সব কথা আমার কাছে উজাড় করে দিলো, তখন কে যেন ভিতর থেকে আমায় বলে দিলো, ‘মা আর শুধু বেঁচে থাকার জন্য, পেটের জন্য এতো সময় দেওয়া যাবে না। কিছু সৃজনশীল কাজ করে যেতে হবে এ জীবনে। কিছু সময় সেই কাজে দিতেই হবে আমায়। ‘মনে হচ্ছে, তোমাকে জীবন নিয়ে আমি একটু ভাবাতে পেরেছি জন।’ জুলিয়নের চোখ এড়ায়নি কিছুই। ‘সেই ছেলেবেলার মতো স্বপ্ন দেখো জন। জোনাস সাঙ্ক বলেছিলেন, ‘আমি অনেক স্বপ্ন দেখেছি, আমি অনেক দুঃস্বপ্ন দেখেছি। আমি আমার স্বপ্নের সাহায্যে দুঃস্বপ্ন কাটিয়ে উঠেছি।’ ধুলো কেড়ে স্বপ্নগুলোকে তুলে আনো জন। জীবনটাকে নতুন করে সাজিয়ে তোলো।

পৃষ্ঠা:৪৮

নিজের অন্তরের শক্তি দিয়ে নিজেকে জাগিয়ে তোলো, আর তুমি যা চাও, সেই শক্তি দিয়েই তা ঘটাও। একবার তুমি শুরু করলে, সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড তোমাকে সফল করার লক্ষ্যে একজোট হয়ে তোমার পাশে দাঁড়াবে। একদিন, যোগী রমন আর আমি হিমালয়ের পাহাড়ি পথে হাঁটতে হাঁটতে যাচ্ছিলাম। প্রশ্ন করলাম, ‘আচ্ছা কোনো দার্শনিক আপনার সবচেয়ে পছন্দের?’ উনি বললেন, বহুজনেরই প্রভাব রয়েছে তার জীবনে। কোনো একজনকে বেছে নেওয়া কঠিন। অবশ্য মনের গভীরে একটি উদ্ধৃতিকে সযত্নে রেখে দিয়েছিলেন যোগী রমন। নির্জনতার মাঝে ধ্যান করে জীবন কাটাবার জন্য যে মূল্যবোধগুলো তিনি গ্রহণ করেছিলেন, তার সার রয়েছে এটিতে। হিমালয়ের দুর্গম, নির্জন, বন্ধুর পথে প্রাচ্যের মহাজ্ঞানী সেই সাধক আমার কাছে ব্যক্ত করেছিলেন, সেই বানী। সেটির প্রতিটি শব্দ আমি আমার মনে গেঁথে নিয়েছি। প্রতিদিন ওই বাণীটি আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় আমরা কি-আমরা কি হতে পারি। বানীটি ভারতবর্ষের বিখ্যাত দার্শনিক পতঞ্জলীর। প্রতিদিন ভোরবেলা ধ্যানে বসার আগে, উচ্চেস্বরে উদ্ধৃতিটি উচ্ছেল্লো করলে তা আমার সারাদিনের চিন্তাভাবনা, কাজের উপর এক আশ্চর্ক প্রভাব ফেলে। রূপ হল শব্দ।’ এবার জুলিয়ন সেই উদ্ধৃতি লেখা কার্ডটা আমায় দেখালো ‘কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে, কোনো অসামান্য প্রকল্প যযখন তোমায় অনুপ্রাণিত করে, তোমার সকল চিন্তাধারা তখন বাঁধন খুলে বেড়িয়ে আসে। তোমার মন তার সীমা অতিক্রম করে, তোমার সেইন্টী চতুর্দিকে ব্যাপ্ত হয়, এবং তুমি নিজেকে এক নতুন, অসাধারণ, বিশ্বয়কর জগতে খুঁজে পাও। তোমার যত সুপ্ত শক্তি, মানসিক ক্ষমতা ও প্রতিভা সক্রিয় হয়ে ওঠে, আর নিজেকে তুমি স্বপ্নেও যা কখনো ভাবোনি, তার চেয়েও মহৎ রূপে তোমার প্রকাশ ঘটে।’ ঠিক এই মুহূর্তেই আমি শারীরিক ক্ষমতা আর মানসিক দৃঢ়তার মধ্যে যোগসূত্রটা খুঁজে পেলাম। জুলিয়ন শারীরিকভাবে একেবারে নিখুঁত অবস্থায় ফিরে এসেছে। তার প্রকৃত বয়সের তুলনায়, অনেক বছর কম দেখতে লাগছে তাকে। প্রাণশক্তি যেন তার শরীর থেকে উপচে পড়ছে, আর মনে হচ্ছে উদ্যম, উৎসাহ আর আশাবাদ যেন আর বাঁধ মানছে না। আমি দেখতে পাচ্ছিলাম ও পূর্ববর্তী জীবনের বহু কু-অভ্যাসই ত্যাগ করেছে। কিন্তু ওর মধ্যে এই অসামান্য পরিবর্তনের শুরুটা হয়েছে মানসিক ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে। বাইরের সফলতা আসে, অন্তরে সফল হওয়ার সাথে সাথে আর জুলিয়ন ম্যান্টেল তার জীবনকে আমূল বদলে ফেলেছে, নিজের চিন্তাভাবনার জগতে আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে।

পৃষ্ঠা:৪৯

কিভাবে আমি এই পজিটিভ, শান্ত, উজ্জীবিত মনোভাব গড়ে তুলতে পারি, জুলিয়ন। এতো বছর ধরে একই চেনা, বাঁধা ছকে কাজ করতে করতে, আমার মস্তিষ্কের পেশিতে বোধ হয় চর্বি জমে গেছে। মনের বাগানে যে সব চিন্তা ভেসে বেড়াচ্ছে, তার ওপর খুব সামান্যই নিয়ন্ত্রণ আছে আমার’ মন। থেকে বললাম আমি। ‘আমাদের মন ভৃত্য হিসেবে চমৎকার, কিন্তু প্রভু হিসেবে ভয়ঙ্কর। তুমি যদি নেতিবাচক চিন্তা কর তাহলে বুঝতে হবে, নিজের মনকে শুভ চিন্তা করতে। কখনোই শেখাওনি তুমি। তাকে ভালো রাখতে যত্নবানও হওনি কখনো। উইনস্টন চার্চিল বলেছিলেন, ‘তোমার প্রতিটি চিন্তার প্রতি দায়িত্বশীল হওয়াই মহত্ত্বের প্রকাশ।’ তাহলেই যে প্রাণোচ্ছল মন তুমি চাইছ, তা তোমার পক্ষে পাওয়া সম্ভব হবে। মনে রেখো, মন হলো অন্যান্য পেশির মতো। হয় তাকে ব্যবহার করে চালু অবস্থায় রাখো, নয়তো তা অব্যবহারে ফেলে রেখে নষ্ট করো।’ ‘তুমি কি বলতে চাইছো, মনের ব্যবহার ঠিকমতো না হলে অন দুর্বল হয়ে ‘হ্যাঁ, ঠিক তাই। ভেবে দেখো, তুমি যদি আছে শক্তিলাভের বান্য তোমার হাতের মাংসপেশীতে জোর আনতে চাও, তাইলে তোমায় হাতের ব্যায়াম করতে হবে। পায়ের মাংস পেশী শক্ত করতে পায়ের ব্যয়াম করতে হবে। ঠিক তেমনই মনকে সঠিক পদ্ধতিতে। শ্রীজে লাগাতে, দৃঢ়সংকল্প করতে, তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে জানতে হবে। তবেই তোমার মন আশ্চর্যজনক কাল করবে। মনকে সঠিক পরিচালনা করতে পারলে তুমি যা চাও, মন তোমায় তাই এনে দেবে। মনের যত্ন নিলে, মন তোমার শরীরের যত্ন নিয়ে, তাকে সুন্দর করে গড়ে তুলবে। যদি সঠিকভাবে চাওয়ার দূরদৃষ্টি থাকে তবে মন শান্ত, নিরুদ্বিগ্ন হবে। সিভানার সাধকরা বলেন, ‘জীবনের কোনো সীমানা নেই। যেটুকু আমরা বুঝি বা উপলব্ধি করি তা নিছকই আমাদের নিজেদের কথাটা বুঝলাম না, জুলিয়ন।’ ‘ ‘মননশীল মানুষেরা জানেন চিন্তার মাধ্যমেই তাদের নিজেদের জগৎ গড়ে ওঠে। এবং ব্যক্তির জীবন কেমন হবে, কতোটা উচ্চমানের হবে তা নির্ভর করে তার চিন্তাধারার উপর। শান্তিময় জীবনযাপন করতে চাইলে, নিজের চিন্তাধারাকে প্রশান্ত ও তাৎপর্যপূর্ণ করে গড়ে তুলতে হবে।’ ‘স্থালিয়ন। একটা চটজলদি উপায় বাতলে দাও।’

পৃষ্ঠা:৫০

নিজের আলখাল্লার উপর সূর্যস্নাত আঙুলগুলো বোলাতে বোলাতে সে প্রশ্ন করল, ঠিক কি বলতে চাইছো’? তুমি যে জীবনের কথা আমাকে শোনাচ্ছো তাতে আমি সত্যিই খুব উত্তেজিত তবে আমি অধৈর্য প্রকৃতির লোক। আমার এই বসার ঘরে বসেই, মনকে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো ব্যায়াম বা চটজলদি উপায় শিখ নেওয়া যায় না?’ ‘জন, চটজলদি ব্যবস্থায় কোনো কাজ হয় না, তা সম্ভবও না। স্থায়ী পরিবর্তনের জন্য চাই দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টা। একমাত্র অধ্যবসায় দিয়ে, চেষ্টা দিয়ে ব্যক্তিসত্তার পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব। আমি বলছি না, তোমার জীবনে গভীর পরিবর্তনের জন্য বছরের পর বছর লাগবে, তবে যে সব কলাকৌশলের কথা আমি তোমাকে জানাবো, তা অন্তত একমাত্র যদি তুমি নিষ্ঠার সঙ্গে মানো, তবে তাতে যা পরিবর্তন লক্ষ করবে নিজের মধ্যে, তাতে তুমি নিজেই অবাক হয়ে যাবে। তোমার সামর্থ্যের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌছতে পারতে তুমি আর অলৌকিক সেই সঙ্গে নানা ঘটনাবলির সম্মুখীন হতে থাকবে। কিন্তু এখানে পৌঁছতে গেলে অধৈর্য হলে চলবেই। পথের শেষে কি পাবে তা না ভেবে বরং তোমার পথের চারিধার উপভোগ করতে করতে পৌছতে হবে। মন্না হলো, যত ফলের আল্লা কম করবে, ফল লাভের কথা কম ভাববে, তত তাড়াতাড়ি ফললাড় করিবে।’এটা কেমন করে সম্ভব?’ এ প্রসঙ্গে তোমায় একটা গল্প পুরনো একটি কিংবদন্তি কাহিনী আছে। একটি ছেলে মহান গুরুর অধীনে শিক্ষা লাভ করবে বলে বাড়ি ঘর ছেড়ে বহু দূরে পাড়ি দেয়। গুরুর দেখা পাওয়ার পর প্রশ্ন করে, ‘আচ্ছা, আপনার মতো জ্ঞানী পুরুষ হতে গেলে, আমার কতদিন সময় লাগবে’ গুরু বললেন, ‘পাঁচ বছর’। ‘বাবা, এতো অনেক সময়। আচ্ছা, আমি যদি দ্বিগুণ পরিশ্রম করি?’ গুরু বললেন, ‘তাহলে, দশ বছর লাগবে।’ ‘সে কি। সে তো আরো বেশি সময়। যদি সারাদিন, আর গভীর রাত অবধি পড়াশুনা করি, তাহলে? ‘প্রাজ্ঞ সঠিক বললেন, পনেরো বছর।’ কিছুই তো বুঝতে পারছি না। আমার লক্ষ্যের প্রতি যত বেশি মনকে নিয়োজিত করছি, তত বারই সময় বেড়ে যাচ্ছে কেন?’ ‘উত্তরটা খুবই সহজ। একটা চোখ যদি গন্তব্যের শেষে নিবন্ধ থাকে, তবে পথে তো রইল মাত্র একটা চোখ, এক চোখে কি আর বেশি দেখা যায়?’

পৃষ্ঠা ৫১ থেকে  ৬০

পৃষ্ঠা:৫১

আমি বললাম, ‘বুঝেছি, মনে হচ্ছে ওর অবস্থা আমারই মতে।।’ ধৈর্য ধরো, মনে বিশ্বাস রাখো, যা খুঁজছো তা তুমি নিশ্চয়ই পাবে। শুধু প্রত্যাশা বজায় রেখে, কাজ করে যেতে হবে।’ ‘কিন্তু জুলিয়ন, আমি ভাগ্যবান নই। ভাগ্য আমায় জীবনে কোনো কিছুই হাতে তুলে দেয়নি। সবই আমাকে খেটে অর্জন করতে হয়েছে।’ ‘ভাগ্য বলতে তুমি কি বোঝ? সুযোগ আর তার সদ্ব্যবহার ছাড়া ভাগ্য আর কিছুই নয়। সিভানার সাধকদের দেওয়া পাঠ তোমাকে দেওয়ার আগে, দুটো নীতির কথা বলতে চাই। প্রথম, সব সময় জানবে মানসিক নিয়ন্ত্রণের মূলে আছে একাগ্রতা। আচ্ছ্য ‘আমি বুঝতে পারছি তোমার অনুভূতির কথা, একথা শুনে একসময় আমিও অবাক হয়েছিলাম। কিন্তু এটাই সত্যি। মন অসাধ্যসাধন করতে পারে। তোমার মনে কোনো আকাঙ্ক্ষা না যত্ন আছে মানে জানবে, প্রেরণ করার সামর্থ্যও অবশ্যই তোমার মধ্যে আছে। সিভানার যোগীরা এন্ট্রিকে পরম সত্য বলে মানেন। আর তর জন্য, মনকে একাগ্র করে তুলতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট একটি কাজে যখনই তুমি একাগ্রচিত্তে নির্বস্তু হবে, তখনই তোমার মনের শক্তি ভাণ্ডারের, কর্মের ভাণ্ডারের দরজা খুলে যাবে।’ ‘একাগ্রচিত্ত হওয়াটা এতো গুরুত্বপূর্ণ কেনা ‘ধরো, শীতকালের মাঝামাঝি একটা সান্তা তুমি বনের মাঝে পথ হারিয়ে ফেলেছো। তোমার কাছে তোমার বস্তুর পাঠানো একটা চিঠি, এক কৌটো পাহাড়ি নাসপাতি, একটা আতস কাচ রয়েছে। বরাতজোরে তুমি পথে কিছু শুকনো কাঠও পেয়ে গেলে, কিন্তু আগুন জ্বালিয়ে উষ্ণ হবার মতো পরিস্থিতির জন্য চাই আগুন বা দেশলাই, যা তোমার কাছে নেই। তুমি কি করবে?” ‘এই রে। সত্যিই আমার কোনো ধারণা নেই। আমি বলতে পারছি না।’ ‘খুব সোজা। শুকনো কাঠের মধ্যে চিঠিটা ধরে, আতস কাচটার মধ্যে দিয়ে সূর্যরশ্মি কেন্দ্রীভূত কর। এক মুহূর্তে আগুন ধরে যাবে।’ ‘আর নাসপাতির ক্যানটা কি হবে?’ ‘ওর কোনো কাজই নেই।’ হাসতে হাসতে বললো জুলিয়ন। শুকনো কাঠে চিঠিটা রাখলে কোনো ফল হবে না। কিন্তু সূর্যরশ্মিকে ওই কাচের মধ্যে দিয়ে পাঠালে, মুহূর্তেই আগুন জ্বলে উঠবে। এই একই জিনিস মনের ক্ষেত্রেও ঘটে। তোমার সকল শক্তিকে কেন্দ্রীভূত করে কোনো কাজে নিবন্ধ করলে তোমার সামর্থ্যের আগুনটি জ্বলে উঠতে বাধ্য। তার ফলও চমকপ্রদ।’

পৃষ্ঠা:৫২

‘তা তো তুমি জানো। তুমি কি চাও তা তোমার চেয়ে ভালো আর কে জানে? আরও ভালো বাবা হতে চাও, নাকি আরও ব্যালান্সঃ জীবনযাপন করতে চাও? আধ্যাত্মিক হতে চাও? বা রোমাঞ্চকর তুমি কি চাও তা তো তুমি জানো?’ ‘চিরন্তন সুখ পাওয়া যায় কী করে?’ ‘আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাজ শুরু করো। প্রথমে ছোটখাটো কিছু আশা করে কাজ শুরু করো।’ ‘কিভাবে?’ ‘সিভানার সাধকরা পাঁচ হাজার বছরের প্রচেষ্টায় সুখের চাবিকাঠি খুঁজে পেয়েছিলেন। আমার সৌভাগ্য, আমাকে তা জানাতে আগ্রহী হয়েছিলেন তারা। তুমি কি এখনই, এই এক মুহূর্তেই ওই সব কথা জেনে নিতে চাও? ‘না, ভাবছিলাম একটা ব্রেক নেবো। একটু গান শুনবো।’ ‘সে কি?’ ‘সবাই তো চিরন্তন সুখই আশা করে। তাই না?’  ‘হ্যাঁ, ঠিক কথা….. আচ্ছা এক কাপ চা পাওয়া যাবে?’ চায়ের কাপ হাতে ধরিয়ে বললাম। ‘নাও। আর থেমো না প্লিজ।’ “ঠিক আছে। জন, সুখের গোপন কথাটি খুবই সহজ সয়ল। তুমি কি করতে ভালোবাসো তা খুঁজে বের করো। তারপর যেটা করার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করো। খেয়াল করে দেখবে, পৃথিবীর সয়াচেয়ে সুখী, সবচেয়ে সফল, স্বাস্থ্যবান, পরিতৃপ্ত মানুষেরা তাদের জীরদ্রের সবচেয়ে আগ্রহের বিষয়টি খুঁজে পেয়েছিলেন। এবং সেটা করায়ত্ত করার জন্য দিনের পর দিন চেষ্টা করে গেছেন। তোমার ভালোবাসার বিষয়টিতে তোমার মনকে যদি একাগ্র করে তোলো, তোমার জীবনে তখন মানসিক সামর্থ্যের স্ফুরণ ঘটবে। আর তার ফলে তোমার চাওয়া-পাওয়ার সবকিছুই অত্যন্ত সুন্দরভাবে পূর্ণ হবে।’ ‘তার মানে কাতে চাইছ্যে, আমার মনের প্রবল টান যে বিষয়ে তা খুঁজে বের করবো। তারপর কাজে লেগে যাবো।’ জুলিয়ন বললো, ‘যদি সেটা অনুসরণযোগ্য বা উপযুক্ত হয়।’ ‘উপযুক্ত কথার সংজ্ঞা কী?’ ‘তোমার অভীষ্ট লক্ষ্য যেন অন্য মানুষের জীবনকে আরও উন্নত করে। ভিকটার ফ্রাঙ্কেল বলেছেন, সুখের মতো সফলভাকে লাভ করার চেষ্টা বৃথা। মহান কোনো কিছুর প্রতি কারও ব্যক্তিগত নিষ্ঠার কারণেই এর উন্মেষ ঘটে। তোমার জীবনের লক্ষ্য কী, এটা একবার বুঝে নিতে পারলে, তোমার পৃথিবী রঙিন, সুন্দর হয়ে উঠবে। তেমার প্রতিটা সকাল আরও সজীব হয়ে উঠবে।

পৃষ্ঠা:৫৩

অপচয় করার মতো সময় থাকবে না তোমার হাতে। তোমার মনে হবে তোমার লক্ষ্যের দিকে কেউ যেন তোমাকে হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছে। দুশ্চিন্তার অভ্যাস মুছে যাবে চিরতরে।’ ‘দারুণ। সকালে ঝরঝরে হয়ে ঘুম থেকে ওঠা তো স্বপ্ন। জানো জুলিয়ন সকালে ঘুম থেকে উঠে মনে হয় কেন উঠলাম। রাস্তার প্রচণ্ড ধকল, রাগী, ক্রুদ্ধ মক্কেল, প্রতিপক্ষের আক্রমণ, এই সব নেতিবাচক প্রভাবের হাত থেকে বাঁচতে, শুয়ে থাকাই ভালো। খুব ক্লান্ত লাগে।’ ‘বেশির ভাগ লোক এতো ঘুমোয় কেন জানো?’ ‘কেন?’ ‘কারণ তাদের করার মতো কিছু নেই। সূর্যের সাথে সাথে ঘুম থেকে ওঠে যারা, তাদের একটা ব্যাপারে মিল আছে।’ ‘কিসে? পাগলামিতে।’ ‘না না’, হেসে বললো জুলিয়ন। ‘ওদের একটা লক্ষ্য আছে। ওই লক্ষ্যই ওদের শক্তি জোগায়। বদ্ধমূল সংস্কার ওদের মনকে আচ্ছন্ন করে দে। জীবনে তাদের করা সব কাজেই থাকে আলাদা আগ্রহ, মনোযোগ। তাই শক্তি এদের শরীর থেকে চুঁইয়ে পড়ে নষ্ট হয় না। এরা হচ্ছে এমন প্রস্যোচ্ছল মানুষ যারা এ পৃথিবীতে বিরল। ‘শক্তির চুইয়ে পড়ে নষ্ট হওয়া মানে কি? এবার যে তুমি হার্ভার্ড ল স্কুলে শেখোনি, একথা হলফ করে বলতে পারি। ‘ঠিক বলেছো। সিভানার সাধুরা এই মতাদর্শের পথ প্রদর্শক। যুগ যুগ ধরে এই মতবাদ প্রাসঙ্গিক। আমরা উলার্কিণ দুশ্চিন্তায়, উদ্বেগে, উৎকণ্ঠায় আমাদের জীবনীশক্তি তিলে তিলে নষ্ট করে দিই। সাইকেলের টায়ারের মধ্যে টিউব থাকে দেখেছ নিশ্চই।’ ‘হ্যা, দেখেছি।’ ‘সম্পূর্ণ ফোলানো টিউব, যা টায়ারকে সজীব রাখে, আর তুমিও সহজেই তোমার গন্তব্যে পৌঁছে যেতে পারো। কিন্তু এর মধ্যে ফুটো বা ছেদ হলে, হাওয়া বেরিয়ে যায়। তোমারও আর গন্তব্যে পৌছানো হয় না। মনও তাই। দুশ্চিন্ত, উৎকণ্ঠা তোমার মনকে ফুটো করে ঝাঁঝরা করে দেয়। আর সেখান দিয়ে বেড়িয়ে যায় সকল জীবনশক্তি, উদ্যম নিঃশেষ হয়। মনের যাবতীয় সৃজনশীলতা, আশা, উদ্দীপনা, আকাঙ্ক্ষা সব বেরিয়ে গেলে, কিই বা পড়ে থাকে? এক অবসাদগ্রস্ত মানুষ।’ ‘হ্যাঁ, এরকম আমার জীবনে প্রায়ই ঘটে। সব জায়গায় ছুটে বেড়াই। না নিজে শান্তি পাই। না কাউকে খুশি করতে পারি। দিনের শেষে, হয়তো

পৃষ্ঠা:৫৪

কায়িক পরিশ্রম কিছুই করলাম না, তবুও ক্লান্ত, অবসন্ন হয়ে পড়ি। রাতের বেলা, কোনো রকমে গলায় স্কচ ঢেলে, টিভির রিমোটটা হাতে নিয়ে শরীর ছেড়ে দিই।’ ‘অতিরিক্ত মানসিক চাপের ফলেই তোমার এই হাল হয়। তবে একবার লক্ষ্য স্থির করে নিতে পারলে, তোমার জীবন অনেক অর্থপূর্ণ হয়ে উঠবে। যেদিন বুঝে যাবে কিসের উদ্দেশ্যে তোমার এই জীবন কি তার ভবিতব্য, সেদিন থেকে তোমার আর কাজ করার প্রয়োজন পড়বে না।’ ‘সময় হওয়ার আগেই অবসর?’ আইনজীবি থাকার সময়, প্রতিপক্ষের প্রতি ‘একদম বাজে কথা নরা’ জাতীয় যে কণ্ঠস্বর জুলিয়ন আয়ত্ত করেছিল, সেইগলায় বললো, ‘না, তোমার কাজ আর তখন কাজ মনে হবে না। খেলা হয়ে যাবে।’ ‘কোনো লক্ষ্যে পৌঁছতে বা আমার জীবনের মূল উদ্দেশ্য খুঁজে পেতে আমাকে কাজ ছেড়ে দিতে হবে? সেটা বড় ঝুঁকির কাজ হয়ে যাবে না? আমার একটা পরিবার আছে। আমার ওপর নির্ভরশীল কিছু মানুষ আছে।’ ‘আমি তো সেকথা বলিনি যে আগামী কালই তোমাকে আইনের পেশা ছাড়তে হবে। তবে হ্যাঁ, ঝুঁকি নিতে হবে। জীবনের গাছটা ধরে একটু ঝাঁকুনি দাও। মাকড়সার জাল ছিড়ে ফেল। যে পথে বেশি লোক এলেনি, এমন একটা পথ বাছো। সবাই তো সংসারের আরামদায়ক গন্ধির মধ্যে থাকে। যোগী রমন আমায় বলেছিলেন, এই গন্ডির বাইরেই রিন্তু আসলে রয়েছে এক অন্য পৃথিবী। সুখের পৃথিবী। সেটাই আমাদের পক্ষে উত্তম। মানসিক নিয়ন্ত্রণ ও ঈশ্বরের সর্বোত্তম সৃষ্টি বলে নিজেকে উপলব্ধি করার একমাত্র পথ। মানুষের প্রকৃত সম্পদকে উপলব্ধি করার পথ।’ ‘কি সেই সম্পদ?’ ‘তোমার দেহ, মন ও আত্মা।’ ‘আমাকে কেমন ঝুঁকি নিতে হবে?’ ‘অত ভাবার কোনো কারণ নেই। সমস্ত জীবন ধরে যে কাজটা করতে চেয়েছো, অথচ পারোনি, এবার তাই করা শুরু করো। এমন অনেক আইনজীবীদের আমি চিনি যারা অভিনেতা হওয়ার জন্য তাদের কাজ ছেড়েছেন। এমন অনেক অ্যাকাউন্টট্যান্ট আছেন যারা সংগীতকার হয়ে গেছে। যে অম্লান আনন্দ, সৃজনশীলতার যে তৃপ্তি কাজের প্রবল চাপে তাদের জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছিল, তা আবার ফিরে পেয়েছেন তারা। এবার যদি দুবার বিদেশে ছুটি কাটানোর অবকাশ নাও হয়, কুছ পরোয়া নেহি। হিসেব করে জীবনে যদি ঝুঁকি নেওয়া যায়, তবে অনেক বড় লাভের সুযোগ থেকে

পৃষ্ঠা:৫৫

গায়। কিন্তু দু’নৌকায় পা দিয়ে চলা যায় কি? দোতলায় পা রেখে তিনতলায় উঠবে কেমন করে? বুঝেছি, তুমি কি বলতে চাও?’ ‘তাই ভাবার সময় বের করো। পৃথিবীতে জন্য নেওয়ার পিছনে তোমার আত্মার কি উদ্দেশ্য আছে, তা খুঁজে বের করো।’ ‘তোমার কথায় সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা জানিয়েই বলছি, আমি তো সব সময় কেবল ভাবনাতেই ডুবে থাকি। আমার জীবনের অন্যতম সমস্যা হলো, আমি খুব বেশিই চিন্তা করি। আমার মন চিন্তা করা থামাতেই চায় না। মনের মধ্যে হাজারো চিন্তার রেষারেষি আর বকবক চলতেই থাকে সর্বদা।’ ‘আমি তোমাকে অন্যরকম চিন্তার কথা বলছি। সিভানার সাধকেরা, প্রতিদিন সময় বের করে। নিঃস্তব্ধ জায়গায় বসে ভাবতেন তারা কোথায় আছেন, আর তাদের গরব্য বা লক্ষ্য কী। খুঁজে চলতেন তাদের জীবনের উদ্দেশ্য। প্রতিদিনের বেঁচে থাকার হিসেব দিতেন নিজেকে। পরের দিনটা কি করে আরও সুন্দর হয়ে উঠবে, তার জন্য ভাবনা চিন্তা করতেন। প্রতিদিনের অল্প অল্প চেষ্টা, পরিবর্তন, শেষে গিয়ে এক ইতিবাচক ফল নিয়ো ‘আমারও উচিত প্রতিদিনের কাজের হিসেব দেওয়া, লিলের কাছ থেকেই?’ ‘হ্যাঁ, দশ মিনিটের জন্য হলেও, নিজের মুখোমুশি হও। জীবনের মান এতে উন্নত হতে বাধ্য।’ ‘আমি সবই বুঝতে পারছি জন। কিন্তু মুশকিল হলো, আমি একবার কাজের মধ্যে ঢুকে পড়লে, কাজ আমায় একেয়ারে পাগল করে দেয়। তখন দুপুরে খাওয়ার সময়ও বের করতে পারি নাই ‘কিন্তু বন্ধু জীবনধারাকে উন্নত করার মতো সময় নেই বলা, আর পাড়ি চালাবার ব্যস্ততায় পেট্রল কেনার সময় নেই বলার মধ্যে বিশেষ পার্থক্য নেই। শেষ পর্যন্ত এটাই তোমার শেষের কারণ হবে।’ ‘হ্যাঁ, আমি জানি, তবে জুলিয়ন তুমি কিছু কলাকৌশল শেখাবে আমাকে? মুখে এতোক্ষণ যা শুনছি, তাকে বাস্তবায়িত করার আগ্রহে আমি অধীর হয়ে উঠছি।’ মনকে নিয়ন্ত্রণ করার সময় এক পদ্ধতি আছে যা বাদবাকি কলাকৌশলের চেয়ে অনেক উঁচুদরের। যে যোগীরা আমাকে এটা শিখিয়েছিলেন, এ পন্থা তাদের খুব পছন্দের। মাত্র একুশ দিন অভ্যাসেই আমি এতো শক্তি, উদ্যম, উদ্দীপনা ও সজীবতা অনুভব করেছিলাম যা আমি বহু বছরেও অনুভব করিনি। এ পদ্ধতি চার হাজার বছরেরও পুরনো। এর নাম ‘গোলাপের হৃদয়।

পৃষ্ঠা:৫৬

‘একটু খুলে বলো’। ‘এই ব্যায়ামটি করতে গেলে তোমার যা প্রয়োজন, তা হচ্ছে, একটি টাটকা গোলাপ, শান্ত নিভৃত জায়গা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্যে করতে পারলে আরও ভালো। তবে নির্জন ঘরেও চলবে। গোলাপের হৃদয় যা কেন্দ্রের দিকে একদৃষ্টে তাকাও। যোগী রমন আমাকে বলেছিলেন জীবনও অনেকটা গোলাপের মতো। ফুলের চারপাশে কাঁটা আছে। কিন্তু যার স্বপ্নে আস্থা আছে সে কাঁটা না দেখে, শুধু ফুলের মাধুরীকে আমাণ করতে পারে। ‘যাই হোক, এক মনে ফুলাটির হৃদয়টিকে দেখে ফুলের গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে, সামনের অসাধারণ বস্তুটির কথাই শুধু মন দিয়ে চিন্তা করো। তার কারুকাজ, তার বিন্যাস, বর্ণ সবকিছু মন দিয়ে লক্ষ করো। তোমার মন বিক্ষিপ্ত হবে। গোলাপের থেকে ক্ষণে ক্ষণে অন্য চিন্তায় সরে যাবে। তবে, অভ্যাস করতে করতে মনস্থির হতে থাকবে। তোমার লক্ষ্যের দিকে চঞ্চল মনকে বারে বারে ফিরিয়ে আনবে। মনও সময়ের সাথে সাথে শক্তিশালী ও শৃঙ্খলায় আবদ্ধ হয়ে উঠবে।’ ‘শুনে তো মনে হচ্ছে বেশ সহজ ব্যাপার।’। ‘এটাই তো এই অনুশীলনের ভালো দিক। তবে এতে রুল হতে গেলে প্রতিদিন এই অভ্যাসে বসতে হবে। প্রথম কিছুদিন কয়েক মিনিট সময় দেওয়া বা মনকে বেঁধে রাখা সত্যিই কষ্টকর হবে। আসলে আমাদের মধ্যে অধিকাংশ জনই প্রচণ্ড গতিময়, দ্রুত জীবনযাপন করি। তাই স্থিরতা, নীরবতা, আমাদের কাছে অবন্ধিকর। অনেকেই এ কথা শুনে বলবে, কাজকর্ম ফেলে ফুলের দিকে তাক্রিয়াধিাঁকার মতো সময় তাদের নেই। এরাই আবার বলবে, শিশুর হাসি বা বর্ষাভেজ ঘাসে, বৃষ্টির মধ্যে খালি পায়ে হাঁটারও সময় তাদের নেই। এমনকি সময় নেই কারও সাথে বন্ধুত্ব করারও। কারণ এ সবেতেই কিছু সময় তো দিতে হবে। অথচ কাজের আর টাকা রোজগারের মাঝে অন্য কথা ভাবার বা ছোট ছোট আনন্দকে আপন করে নেওয়ার মতো সময় কোথায় তাদের জীবনে?’ ‘এদের সম্পর্কে তুমি অনেক জানো দেখছি।’ ‘কারণ আমিও তো এদেরই একজন ছিলাম। গৃহপ্রবেশের উপহার হিসেবে আমাকে ও জেনিকে দেওয়া আমার ঠাকুমার উপহার, ‘গ্রান্ড ফাদার ক্লকটির’ দিকে তাকিয়ে জুলিয়ন বললো, ‘এভাবে যারা জীবন কাটায় তাদের উদ্দেশ্যে আমার বাবার প্রিয় ব্রিটিশ ঔপন্যাসিকের লেখা একটি উক্তিই আমার বলতে ইচ্ছে হয় যে, ‘ঘড়ি আর ক্যালেন্ডারে সময়ের কাঁটার দ্রুত পরিবর্তন ও দিনলিপির লাফিয়ে চলা যেন মানুষকে বেঁচে থাকার প্রতিটি মুহূর্তে এটা ভুলিয়ে না দেয় যে, জীবনের মধ্যে আছে বহু রহস্য আর অলৌকিকত্ব।’

পৃষ্ঠা:৫৭

ভরাট গলায় জুলিয়ন বলে চললো, ‘এই পদ্ধতিটি আরো বেশি সময় ধরে চালানোর চেষ্টা করো। মিনিট কুড়ি ধরে এর অনুশীলন, এক বা দুই সপ্তাহ চালিয়ে যাও। তাহলে দেখবে, ধীরে ধীরে তোমার মনের দুর্গের উপর তোমার অধিকার ফিরে আসছে। তুমি যে দিকে মনোযোগী হতে চাইবে, মন সে দিকেই একাগ্র হবে। মন এক কথায় তোমার ভূত্যে পরিণত হবে।তোমার হয়ে সে নানা বিস্ময়কর কাজকর্মও করে দেবে। মনে রেখো জন, হয় তুমি নিয়ন্ত্রণ করবে মনকে নয়তো মন কোমায় নিয়ন্ত্রণ করবে। নিজের মধ্যে এক অপার শান্তির অনুভূতি উপলব্ধি করতে শুরু করবে তুমি। যে দুশ্চিন্তা করার অভ্যাস মানুষকে তিলে তিলে নিঃশেষ করে দেয় তা ধীরে ধীরে মুছে যাবে তোমার জীবন থেকে। আনন্দ, এক অসীম আনন্দ যে তোমার জীবনে প্রবেশ করছে তা অনুভব করবে তুমি। এর ফলে আরও উদ্যমী ও আশাবাদী হয়ে উঠবে তুমি। জীবনের চারিপাশে ছোট ছোট জিনিসেও যে কতো আনন্দ লুকিয়ে আছে তা অনুধাবন করবে তুমি। যত ব্যস্তই থাকো না কেন প্রতিদিন ‘গোলাপের হৃদয়ে’ ফিরে আসতে ভুলো না। এটাই তোমাই। শুকনো বালুকাময়, জবাক্লিষ্ট জীবনে একমাত্র মরুদ্যান। এটা তোমাকজনের আরাম, তোমার শান্তির আশ্রয়। নীরবতার মধ্যে যে শক্তি আছে তা ভুলো না। সমগ্র বিশ্বময় যে মানসিক শক্তি স্পন্দিত হচ্ছে তার আগ্রার হলো নীরবতা।’ শুনে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। এতো সহজ, সরল একটি পদ্ধতির সাহায্যেই আমার জীবন উন্নত হয়ে উঠতে পারে? আমি অবাই কণ্ঠে বললাম? ‘কিন্তু, তোমার মধ্যে যে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছেলে কি শুধু ‘গোলাপের হৃদয়ের’ মাধ্যমেই, এর মধ্যে আর কিছু নেই’হ্যাঁ, আছে। বেশ কয়েকটা পদ্ধতির একযোগে প্রয়োগের মাধ্যমেই আমার মধ্যে এই পরিবর্তন ঘটেছে। তবে যে পদ্ধতিটি তোমাকে বললাম, অন্যগুলোও এরই মতো সহজ, সরল ও ক্ষমতাসম্পন্ন।’ এক এক করে তার বিপুল জ্ঞানভাণ্ডার যা সে সিভানায় লব্ধ করেছে তা আমার সামনে উজাড় করে দিতে লাগলো জুলিয়ান।’মনকে নেতিবাচক চিন্তা ও দুশ্চিন্দ্র থেকে রক্ষা করার আরেকটি খুব কার্যকরী পদ্ধতি আমাকে শিখিয়েছিলেন যোগী রমন। এর নাম ‘বিরুদ্ধ চিন্তন।’ আমি শিখেছিলাম প্রকৃতির নিয়মানুযায়ী একটি নির্দিষ্ট সময়ে মন শুধুমাত্র একটি বিষয়েই চিন্তা করতে পারে।’ তুমি নিজে পরখ করে দেখলেই বুঝতে পারবে। মনটাকে একটা স্লাইড প্রোজেকটর ভেবে নাও। ইতিবাচক, নেতিবাচক সব রকমের স্লাইডই তাতে প্রতিফলিত হতে থাকবে। নেতিবাচক কোনো চিজ্ঞা বা স্লাইড যেই ধরা দেবে প্রোজেক্‌টরে, সঙ্গে সঙ্গে তাকে সরিয়ে

পৃষ্ঠা:৫৮

কোনো ইতিবাচক চিন্তা বা স্লাইড দিয়ে তাকে সেই জায়গা থেকে হটিয়ে সাও। এই যে দেখছ আমার গলায় যে রুদ্রাক্ষের জপমালা রয়েছে, যখনই আমার মনে কোনো নেগেটিভ (নেতিবাচক) চিন্তা উঁকি মারে, আমি গলা থেকে মালাটা খুলে, এর থেকে একটা রুদ্রাক্ষ সরিয়ে দিই। সেই গুটিগুলো একটা থলিতে জমিয়ে রাখি। আর যখনই ওই থলিটি বের করে এই গুটিগুলো দেখি, তখনই মনে হয় মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে এখনও অনেকটা পথ চলা বাকি। ‘তোমার বাস্তব জীবন থেকে একটা উদাহরণ দিই। ধরো একদিন আদালতে। তোমার খুব ধকল গেছে। তোমার সওয়ালের সঙ্গে বিচারক একমত হননি। প্রতিপক্ষ তোমাকে চেপে ধরেছে। তোমার মক্কেল তোমার উপর বেশ বিরক্ত। দিনশেষে বাড়ি ফিরে নিজের চেয়ারে বসে পড়লে। ক্লান্ত, অবসন্ন মনে যে নেতিবাচক চিন্তা শুরু করলে সেটা সম্পর্কে অবগত হওয়াই হলো ‘বিরুদ্ধ চিন্তান’ এর প্রথম ধাপ। সহজেই তোমার মনে যেমন হতাশাবুন্ত্রিক চিন্তারা ঢুকে পড়েছে, তেমনই তাকে বের করে দাও কোনো আনন্দমুখী অশাব্যঞ্জক চিন্তা সেখানে এনে হাজির করে। মনে মনে ভাবো তুমি সুকী। যা হয়েছে, তা হয়ে গেছ। এবার নতুন উদ্যমে শুরু করতে হবে এটী একাগ্রচিত্তে ভাবতে শুরু করো। সোজা হয়ে বসো, গভীর শ্বাস নাও। আর ভাবো নতুন করে শুরু করতে হবে। কয়েক মিনিটের মধ্যে তোমার অনুভূতির জগতে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করবে তুমি। যুদ্ধই তোমার মনে কোনো নেগেটিভ চিন্তা আসবে, তখনই এই পদ্ধতির প্রয়োগ করা যদি চালিয়ে যাও, তবে দেখবে, ওই সব চিন্তা তোমার মন থেক সবসময়ের জন্য দূর হয়ে যাবে। চিন্তাধারা আমাদের জীবনে একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে। চিত্তর গুণমানই জীবনের গুণমানের নির্ধারক। মন দুর্বল হলে কাজও দুর্বল হয়। রোজকার অভ্যাস ও অনুশীলনের মাধ্যমে মন শক্তিশালী হয়ে উঠে। তোমার বাড়ির দামি সম্পদের যেভাবে যত্ন নাও তুমি, সেভাবে মনের যত্ন নিতে শেখো। ক্ষোভ দূর করার চেষ্টা করো। এর ফল নিশ্চয়ই পাবে।”জুলিয়ন, চিন্তাপ্রবাহে যে জীবনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িত তা আমি কখনো ভাবিনি। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি যে, আমার নিজস্ব চিল্লধারা কিভাবে জীবনের প্রত্যেকটি উপাদানকে প্রভাবিত করে।’ ‘সিভানার সাধকেরা বিশ্বাস করতেন যে, বিশুদ্ধ ও সাত্ত্বিক চিন্তায় আমাদের আভ্যন্ত হতে হবে। যেসব পদ্ধতির কথা তোমায় বললাম এগুলিও আরও কিছু নিয়ম বা পদ্ধতি যেমন মন্ত্রোচ্চারণ, প্রাকৃতিক খাদ্য গ্রহণ ও গ্রন্থপাঠ এসবের মাধ্যমে তারা ওই রকম

পৃষ্ঠা:৫৯

উচ্চ পর্যায়ে উন্নিত হয়েছিলেন। তাদের মনে যদি একটিও খারাপ চিন্তা আসতো, তবে বহু দূর পাহাড়-পবর্ত পেরিয়ে কোনো ঝরনার নিচে, কনকনে ঠান্ডা জলে, সহ্যের সীমা অতিক্রম করেও তারা দাঁড়িয়ে থাকতেন নিজেদের শান্তি দেওয়ার জন্য।’ ‘আমি ভেবেছিলাম এরা জ্ঞানের উপাসক। কিন্তু একটা খারাপ বা নেতিবাচক চিন্তা মনে আসার জন্য এমন চরম শান্তি দেওয়াটা আমার কেমন চরম বাজে বলে মনে হচ্ছে।’ আন্তর্জাতিক মানের আইনজ্ঞ হওয়ার সুবাদেই বিদ্যুৎগতিতে উত্তর দিল জুলিয়ন, ‘সোজা একটা কথা বলি জন। এরকম ধরনের একটা নেগেটিভ চিন্তা এখন তোমার সাঙ্গে না। ‘তাই!’ ‘হ্যাঁ, ঠিক তাই। এই নেগেটিভ চিন্তা প্রথমে খুব ছোট অবস্থায় থাকে। তবে অচিরেই তা বাড়তে বাড়তে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে।’ জুলিয়ন একটুকু থামলো। তারপর হেসে বললো, ‘এই কথাগুলুেদিয়ার সময় আমাকে একটু প্রচারধর্মী মনে হতে পারে। তার জন্য আমি স্যুখিত। মনে হতে পারে অসুখী মানুষের জীবনকে উন্নত করার উদ্দেশ্যে আমি যেন হাতিয়ার আবিষ্কার করেছি। আসলে তাদের জানাতে ভাই গোলাপের হৃদয় বা বিরুদ্ধ চিন্তন জাতীয় কয়েকটি নিয়মের মাধ্যমে শ্রার্থী তাদের চিন্তার জগৎকে বদলে ফেলতে পারবে। জীবনটাও অনেক, যোগ্যতা তাদের আছে।’ হবে। এবং এগুলো জানবার। পরবর্তী বিষয়ে যাওয়ার আগে একটা নীতির কথা জানাই তোমায়। আর এই সূত্রটি বলে ‘প্রতিটি জিনিসই দুবার দৃষ্টি হয়। প্রথমে মনে, তারপর বাস্তবে।’ আগেই বলেছি চিন্তাই হলো কন্তু, বা বস্তুগত বার্তা যা আমাদের বাস্তবের জীবনকে প্রভাবিত করে। বহির্ভাগতে যদি আমূল পরিবর্তন আনতে চাও, তবে তোমার চিত্রজগৎকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলতে হবে। সিভানার সাধকদের চিন্তাধারা পরিশুদ্ধ রাখার প্রয়াসে তারা একটি উপায় বের করেছিলেন। যত সামান্যই হোক না কেন কোনো আকাঙ্ক্ষা, এর দ্বারা পরিপূর্ণ হতে বাধ্য। যে কোনো মানুষের জন্য এটা কার্যকরী, তার সে নবীন কোনো অ্যাডভোকেটই হোক যার অগাধ উপার্জন চাই, বা কোনো মা, যার সংসারে চাই ভর ভরঞ্জ বা কোনো সেলসম্যান যার লক্ষ্য টার্গেটে খুব সহজেই পৌঁছে যাওয়া। এই পদ্ধতিটির নাম ‘সরোবরের সূত্র।’ এই অনুশীলনের জন্য। সন্ন্যাসীরা ভোর চারটেয় ঘুম থেকে উঠতেন। তারা মনে করতেন ভোরের আলোমাখা পরিবেশের এক অত্যাশ্চর্য গুণ আছে। তারপর সরু, খাড়াই

পৃষ্ঠা:৬০

গিরিপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে পৌছে যেতেন অপেক্ষাকৃত নীচু উপত্যকা অংশটিকে, যেখানে তারা থাকতেন। সবুজ পাইন গাছে ঢাকা, ফুলে ফুলে ছেয়ে থাকা সে পথ তাদের নিয়ে যেত শান্ত, স্লিম্বা নীল জলের সরোবরের কাছে। যাতে ফুটে থাকতো হাজার হাজার শ্বেতপদ্ম। এই সরোবর বহু যুগ ধরে সাধকদের বড় কাছের বন্ধু ছিল।’ আমি অধৈর্য হয়ে প্রশ্ন করলাম, ‘সরোবরের সূত্রটা কি ছিল?’ জুলিয়ন বললো, ‘ওই শান্ত, স্নিগ্ধ নীল জলের দিক তাকিয়ে তারা তাদের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত হয়ে উঠতে দেখতেন। যদি শৃঙ্খলপরায়ণ হওয়ার কথা ভাবতেন তাহলে জলের দিকে তাকিয়ে চিন্তা করতেন, ভোরে ঘুম থেকে উঠছেন, কঠোর শারীরিক ব্যায়াম করেছেন, ইচ্ছাশক্তি বাড়াবার জন্য মৌনব্রত পালন করেছেন। আরো আনন্দ পেতে চাইলে, মনে মনে ভাবতেন তাদের ভাই, বোনের সঙ্গে দেখা হলে খুব হাসছেন, বা সাহসী হতে চাইলে ভাবতেন সংকটের মুহূর্তে সাহসিীকতার পরিচয় দিচ্ছেন।”যোগী রমন একবার বলেছিলেন, অন্য বন্ধুদের তুলনায় বেঁটে ইয়ার জন্য তার আত্মবিশ্বাসের অভাব ছিল। অন্যান্য ছেলেরা তার প্রতি ভদ্র আচরণ করলেও এই সরোবরের জলে তিনি যা হতে চাইতেন, তা কল্পনা করতেন। কখনো বা বৃদ্ধ এক প্রাজ্ঞ সন্ন্যাসী হিসেবে দেখত্রেই নিজেকে। মনোশ্চক্ষে নিজেকে যে রকমভাবে দেখতেন নিজেকে, কৃষ্ণের মাসের মধ্যেই সেরকমই একজন হয়ে উঠতেন তিনি। তাহলে বুঝতেই পারছো মন ছবির মাধ্যমে কাজ করে। ছবি আবার আত্ম-প্রতিকৃতির জ্ঞাধ্যমে কাজ করে। তুমি যা বোধ করো, কাজ করো যা অর্জন করো তাঁর উপর প্রভাব ফেলে আত্মপ্রতিকৃতি। তোমার আত্মপ্রতিকৃতি যদি তোমাকে বলে যে এতো কম বয়সে তোমার পক্ষে সফল আইনজীবি হওয়া সম্ভব না বা বেশি বয়সের কারণে তোমার পক্ষে তোমার অভ্যেসগুলো বদলানো সম্বব নয়, তবে সত্যিই তোমার পক্ষেতা অসাধ্য হয়ে উঠবে। যদি আত্মপ্রতিকৃতি তোমায় বলে সুখী, সমৃদ্ধ, স্বাস্থ্যপূর্ণ জীবন তোমার মতো লোকেদের জন্য নয়, তবে সেই বাণী তোমার জীবনে বান্ধব হয়ে যাবে। কিন্তু তোমার মনের পর্দায় যদি উদ্দীপনামূলক বা কল্পনাপ্রসূত কোনো ইতিবাচক চিন্তাশৈলী ফুটে ওঠে, জীবনে আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটতে শুনবে। আইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘জ্ঞানের চেয়েও বেশি প্রয়োজন হলো কল্পনাশক্তি।’ দিনে অন্তত কয়েক মিনিট হলেও, তোমার স্বপ্নকে কল্পনার চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টা করো জন। যা হতে চাও, যেমন হতে চাও, বড় বিচারক হতে চাও, বা শ্রেষ্ঠ বাবা হতে চাও বা সমাজের একজন বিশিষ্ট মানুষ, যাই হতে চাও, তাই মনশ্চক্ষে দেখো।’

পৃষ্ঠা ৬১ থেকে  ৭০

পৃষ্ঠা:৬১

‘এর জন্য কি আমায় কোনো সরোবরের কাছে যেতে হবে?’ ‘না, না। সে তো বহু বছরের পুরনো কৌশলকে কাজে লাগাতে এই নাম দিয়েছিলেন যোগীরা। নিজের ঘর বা অফিসে বসেও তুমি এই কাজটা করতে। পারো। দরজা বন্ধ করে, ফোন সাইলেন্ট করে, চোখ বন্ধ করো। তারপর গভীর শ্বাস নাও। দু-তিন মিনিটের মধ্যে তুমি অনেক বিল্যাক্সড বোধ করবে। এরপর তোমার স্বপ্নগুলোকে চোখের সামনে পূরণ হতে দেখতে শুরু করো। ভালো বাবা হতে চাইলে দেখো তুমি ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মন খুলে হাসছো, খেলছো, তাদের সব প্রশ্নের নিরলসভাবে জবাব দিচ্ছ, যে কোনো পরিস্থিতিতে শান্ত থাকছো। বাড়বে যখন ওই একই পরিস্থিতি আসতো তখন। যা যা করতে চাও, মনে মনে তার মহড়া দাও।’ ‘বহু রকম পরিস্থিতিতে এই কল্পনাশক্তির ব্যবহার করা যায়। যাতে আরও কার্যকরী হয়ে উঠতে সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করে তুলতে, আত্মিক উন্নতি ঘটাতে এর ব্যবহার অপরিহার্য। এর নিয়মিত অনুশীলনে তোমার জীবনে আর্থিক ও বৈষয়িক উন্নতি যদি তুমি তা চেয়ে থাকো, তাও অগ্রব। এটা ভালো করে বুঝে নাও যে, যদি তোমার জীবনে কোনো আকাঙ্ক্ষা বা থাকে, তবে তা পুরণ করা না তাকে আকর্ষণ করার মতো চৌম্বক শক্তি ও তোমার মনের নিশ্চয়ই আছে। যদি জীবনে কোলে অভাব থেকে থাকে, তো জানবো তোমার চিন্তাধারায় কোনো ঘাটতি হয়ে গেছে। মনশ্চক্ষে অসামান্য সব ছবি দেখতে থাকো। একটা নেতিবাচক, ছবিও তোমার পক্ষে বিষের মতো হতে পারে। এই প্রাচীন কলার মধ্যে যে আনন্দ আে বা এটা য বা যা বয়ে আনবে তাকে যদি মন দিয়ে উপভৌহ্ করতে পারো, তবে নিজের মধ্যেকার অসীম ক্ষমতা উপলব্ধি করবে আর তখনই তোমার ক্ষমতা ও উদ্যমের ভাজার উন্মুক্ত হবে।’ す অপ্ন মনে হচ্ছিল জুলিয়ন বুঝি বা কোনো ভিনদেশের ভাষায় কথা বলছে। বিষয়- আশায় পাওয়ার জন্য বা আত্মিক বিকাশের জন্য মনের চৌম্বক শক্তিকে কাজে লাগারার কথা আগে শুনিনি। প্রতিচ্ছবি তৈরি ও আধ্য প্রতিচ্ছবি জীবনের আশা আকাঙ্ক্ষার উপর প্রভাব ফেলে এ কথা কখনো শুনিনি। এই মানুষটার বিচার বুদ্ধি ও মানসিক ক্ষমতা ছিল প্রশ্নাতীত। আইন সংক্রান্ত পারদর্শী মানুষটি দেশে-বিদেশে সম্মানিত ছিলেন। আমি যে পথে আজ হাঁটছি, একদিন সেই পথেই হেঁটেছিল এই মানুষটি। তাই তার কথা কোনোটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে বলে মনে হলো। প্রাচ্যে ভ্রমণ করতে গিয়ে এই মানুষটা কিছু খুঁজে পেয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। প্রাণশক্তি, মনের প্রশান্তি, দেহের রূপান্তর সবই তার অকাট্য প্রমাণ।

পৃষ্ঠা:৬২

যত শুনতে লাগলাম, তত মনে হতে লাগলো এ কথাগুলো সত্যিই যুক্তিপূর্ণ। মনের যতটা শক্তি আমরা ব্যবহার করি, মন তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তি ধরে। তা না হলে, গাড়ির তলায় পড়ে যাওয়া শিশুকে বাঁচাতে, মা কি করে তুলে ধরতে পারে সে সব গাড়ি, যা পালোয়ানের পক্ষেও নড়ানো দুষ্কর।। মার্শাল আর্টের খেলোয়াড়রা কিভাবে পরপর সাজানো ইট এক ঘায়ে ভেঙে টুকরো করতে পারে? প্রাচ্যের সাধুরা কেমন করে তাদের হৃদয়ের গতি কমিয়ে বা বাড়িয়ে নিতে সক্ষম হয় নিজের ইচ্ছেমতো? চোখের পলক না ফেলে কেমন করে চেয়ে থাকতে পারে একদৃষ্টে? এবার বুঝেছি, সমস্যাটা আসলে আমার ভিতরেই থাকে। প্রত্যেক সত্তার মধ্যেই যে বিশেষ ক্ষমতা আছে, সে বিষয়ে বিশ্বাসের অভাবই এই সমস্যার মূলে আছে। কোটিপতি আইনজীবী থেকে সাধকে রূপান্তরিত হওয়া এই মানুষটিই আজ সন্ধ্যায় আমার মধ্যে সেই জাগরণের ডাক দিল। কিন্তু জুলিয়ন অফিসে বসে এগুলো অনুশীলন করবো? আমার পার্টনার এমনিতেই আমাকে একটু অদ্ভুত রকমের ভাবে।’ ‘যোগী রমন ও অন্যান্য সাধক যাদের সঙ্গে আমি বসবায় করছিলাম তারা একটা কথা বলতেন। বলতেন, অন্যের চেয়ে মহৎ বা শ্রেষ্ঠ হওয়ার মধ্যে কোনো মহত্ত নেই। মহত্ত্ব আছে নিজের প্রাক্তন কৃষ্ণার চেয়ে আরও মহৎ, আরও উঁচু হওয়ার মধ্যে। যদি সত্যিই জীবনটাকে উন্নততর করতে চাও, তবে নিজের সাথে লড়ো, যা আছো তুই থেকে আরও ভালো হওযার লড়াই। লোকে কি বললো তাতে কিছু ব্লাক আসে না। নিজে কি চাইছো বা ভাবছো সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। তোমার বিবেকের কাছে তুমি যতক্ষণ পরিষ্কার, ততক্ষণ অবধি যা প্রাণ চাইছে তাই কর। যাকে ঠিক মনে করছো, যা ভালো মনে করছো তাই করো। তবে দোহাই অনোর যোগ্যতার সঙ্গে নিজের যোগ্যতা যাচাই করার তুচ্ছ চেষ্টা কখনো করো না। যোগী রমন বলতেন, ‘অন্যের স্বপ্ন সম্পর্কে ভেবে যদি এক সেকেন্ডও নষ্ট করো, তা তোমার স্বপ্ন দেখার সময় থেকে চলে যাবে।’ বারোটা বেজে সাত মিনিট, একটুও ক্লান্ত হইনি। এ কথা জানাতেই মৃদু হাসলো জুলিয়ন। বললো ‘আরেকটি নীতি শিখে নিয়েছো তুমি জীবনধারণে। ক্লান্তি মনের সৃষ্টি। বিনাশহীন, স্বপ্নহীন জীবনে ক্লান্তির আধিপত্য। একটা উদাহরণ দিই। অফিসে কোনো এক দুপুরে শুষ্ক কোনো কেস রিপোর্ট পড়তে গেলে দেখবে, মন ছটফট করতে থাকে, ঘুম পায়।’ অনিচ্ছাসত্ত্বেও স্বীকার করলাম, ‘হ্যাঁ সময়ে সময়ে প্রায়ই অফিসে ক্লष, ঘুমঘুম বোধ করি।’

পৃষ্ঠা:৬৩

‘আর সেই সময় কোনো বন্ধু যদি ফোনে কোনো নাচের পার্টি বা গল্প খেলা সম্পর্কে পরামর্শ চায়, তুমি চনমন করে ওঠো এ কথা হলফ করে বলতে পারি। কি ঠিক বললাম?’ ‘একেবারে ঠিক।’ জুলিয়ন জানতো ও ঠিক বলবে। ‘তাহলে ক্লান্তি তোমার মনেরই সৃষ্টি যার সাথে দেহের সম্পর্ক নেই। এ হলো এক ধরনের খারাপ অভ্যাস যা অভ্যন্ত বিরক্তিকর বা প্রচণ্ড খাটুনির কাজের যা যা ঘটেছে তা জানার জন্য। তোমার আগ্রহ তোমায় মানসিক শক্তি ও এনার্জি লুগিয়েছে। তোমার মন আজ সন্ধ্যায় না ছিল অতীতে, না ভবিষ্যতে। ছিল শুধু বর্তমানে, আমাদের কথোপকথনে। যখনই তুমি মনকে বর্তমানে বাঁচতে শেখাবে, দেখবে দেহে মনে, শরীরে আসবে বাঁধভাঙা প্রাণশক্তি, তা সে ঘড়ির কাঁটা যাই বলুক না কেন।’ আমি সম্মত হলাম। বুঝলাম সাধারণ বোধ অত সাধারণ জিনিস নয়। জুলিয়নের বহু অনেক কথাই আসেনি। বাবা বলতেন, ‘যারা স্ট্রোজে তারাই শুধু পায়।’ মনে হলো, আজ যদি বাবা পাশে থাকতেন। সপ্তম অধ্যায়ের সংক্ষিপ্তসার প্রতীক চিত্র চিন্তাধারার মান জীবনের মানকে শেরি অধিক বিকাশ ঘটবে। করে। গুণ মনকে নিয়ন্ত্রণ করো। জাম মানসিক অনুশীলন কর- ভুল বলে কিছু হয় না-শুধুই শিক্ষাগ্রহণ। ও প্রসারণের সুযোগ বলে ভাবো। ভুল যা বিপর্যয়কে আত্মিক বিকাশ কলাকৌশল গোলাপের হৃদয়বিরুদ্ধ চিত্তন সরোবরের সূত্র উদ্ধৃতি সুখের গোপন রহস্য বড়ই সহজ সরল। খুঁজে দেখো কি করতে সবচেয়ে ভালোবাসো, সমস্ত কর্মক্ষমতা ও প্রাণশক্তিকে সেইদিকে ধাবিত করো। এটা করতে পারলে জীবন আসে প্রাচুর্যে, এবং সব আশা আকাঙ্ক্ষা পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

পৃষ্ঠা:৬৪

অধ্যায় ৮

জ্বালো আপন প্রাণের আলো

‘নিজেকে বিশ্বাস করো যে, জীবন পেলে তুমি খুশি হবে, তার কথা ভাবো ছোট ছোট স্ফুলিঙ্গকে বাতাস করে সাফল্যের জ্যোতি জ্বালিয়ে দাও’ -ফস্টার সি. ম্যাকক্লেশান ‘যেদিন যোগী রমন তার পৌরাণিক কাহিনীটি আমাকে বলেছিলেন সেদিনের সঙ্গে আজকের দিনটির খুবই মিল। ‘তাই? ‘সন্ধেবেলা থেকে শুরু করে গভীর রাত অবধি কথা চলেছিল। সুজনের মধ্যে এমন একটা রসায়ন কাজ করছিল যে আকাশে বাতাসে যেন বিদ্যুৎ খেলে যাচ্ছিল। তোমাকে বলেছি, রমনকে প্রথম দেখেই মনে হয়েছিল সে যেন আমার ভাই। আজ তোমার সাথে এখানে বসে আমার ঘুমই একই অনভূতি হচ্ছে। তোমাকে বলি, তোমার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপনের সময় থেকেই তোমায় ছোট ভাই এর মতো দেখি। আমার অনেক কিছুর সঙ্গেই তোমার মিল পাই? ‘তুমি একজন অসাধারণ আইনজীবী। একথা আমি ভুলতে পারি না।’ কিন্তু এ কথাতেও জুলিয়ন, তার অতীত সম্পর্কে ভূঁটাঘাটির কোনো আগ্রহই দেখালো না। ‘জন, যোগী রমনের বল্য সরুদা ফিাহিনী ও জ্ঞানভাণ্ডার আজ আমি উজাড় করে দিতে চাই। বেশ কিছু নীতি তুমি শিখেছো, আরও শিখবে। এর অনুশীলন শুধু তোমার নয় সকলের জীবনকেই সমৃদ্ধশালী সুন্দর করে তুলবে। আমার কর্তবা তোমাকে সব জানানো তবে ভোমারও জানতে হবে এগুলো তোমার ও জগতের আরও সকলের জানাটা অত্যন্ত জরুরি। খুব অশান্ত পৃথিবীতে আমাদের বাস। অরাজকতা ও অশান্তির মধ্যে অসহায় মানুষ ব‍্যাডারহীন জাহাজের মতো দিশা খুঁজে বেড়াচ্ছে। পাথরের আঘাত থেকে বাঁচতে লাইট হাউসের আলোর ফৌজ করে চলেছে। তোমাকে হাল ধরতে হবে। সিতানা সাধকদের বাণী দিকে দিকে ছড়িয়ে দিতে তোমার ওপর ভরসা করছি আমি।।’ কাজটা গ্রহণ করলাম। কথা দিলাম ওকে। এবার ও আবার শুরু করলো, এই বাণীর অনুশীলনের মাধ্যমে ‘যত অন্যের জীবন উন্নত হবে, তত জানবে তোমার জীবন উচ্চ থেকে আরও উচ্চ কোটিতে পৌঁছবে। অসামান্য জীবনধারণের এক পৌরাণিক নীতি এটি।’

পৃষ্ঠা:৬৫

‘আমি শুনছি।’ ‘হিমালয়ের সন্ন্যাসীরা খুব সরল একটি নীতি মেনে চলেন। ‘যে যত বেশি সেবা করে, সে তত বেশি উপকৃত হয়।’ এটাই অন্তর্জগতে শান্তি আনে আর বহির্জগতে সাফল্য।’ আমি পড়েছিলাম যে মানুষ অন্যের পর্যালোচনা করে, সে জ্ঞানী। আর যে নিজের পর্যালোচনা করে, সে আলোকদীপ্ত। এই প্রথম এমন এক মানুষকে দেখলাম যে নিজের সর্বোচ্চ সত্তাকে জানে। তার পরণে কৃচ্ছসাধনের সামান্য পোশাক, মুখে বুদ্ধের কোমল হাসি। মনে হলো স্বাস্থ্য, সুখ, শান্তি কী নেই জুলিয়ন ম্যান্টেলের কাছে, সব আছে। অথচ তার নিজস্ব কোনো সম্পদ নেই। ‘এবার বাতিঘর প্রসঙ্গে আসি।’ ‘ভার সঙ্গে যোগী রমনের সম্পর্ক কি।’ ‘আমি বুঝিয়ে বলছি।’ যেন বিখ্যাত কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যাপক কথা বলছে। ‘এটা তুমি জেনেছো যে, মন হলো এক উর্বর বাগান স্কার তাকে সুন্দর করার জন্য প্রতিদিন তার যত্ন করতে হবে। মনের রায়ণে আগাছা জন্মাতে দিও না। প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে থাকো। মনকে সুস্থ ও সবল রাখো। মনকে সুযোগ দিলে সে তোমার জীবনে দারুণ কিছু ঘটিয়ে দিতে সক্ষম। বাগানের মাঝখানে একটি বাতিঘর আছে। মনে জরে দেখো, এটিই সুপ্রাচীন আরও একটি নীতির কথা তোমার মনে পড়ে’উদ্দেশ্যপূর্ণ জীবনই জীবনের উদ্দেশ্যে। ২খায়ী আলোকদীপ্ত, তারা জানেন জীবনের কাছ থেকে তারা কি চানঃ অন্তর সমুদ্রে দিক নির্দেশ করার ক্ষেত্রে বাতিঘরের যে ভূমিকা, তেমনই জীবনের বাতিঘর হলো লক্ষ্য বা অগ্রাধিকার। জন, যে কেউ তার জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। যদি তার জীবনে দিশা নির্ধারণে সে আমূল পরিবর্তন আনে। কিন্তু কোথায় যাচ্ছে তা যদি না জানো, তাহলে কখন সেখানে পৌঁছবে তা জানবে কি করে? যোগী রমন বলেছিলেন ‘জীবন খুব মজার। লোকে ভাবে যত কম কাজ করবে, তত সুখ ভোগের সুযোগ পাবে। অথচ প্রকৃত সুখ তো লুকিয়ে আছে একটি শব্দে, ‘সাফল্য’, জীবনের লক্ষ্য পূরণের জন্য একাগ্রচিত্তে কাজ করা এবং উদ্দেশ্য সফলের দিকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে চলা, এই তো স্থায়ী সুখের চাবিকাঠি। সাফল্যে যে সমাজ সুখী, তার বাসিন্দা হয়ে সেখান থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে গিয়ে হিমালয়ের পথে পথে ঘুরে, কিছু অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন সাধুদের কাছে শিখে এলাম যে, সফলতাই সুখের চাবিকাঠি। একথা শুনলে লোকে হাসবে জানি। ঠাট্টা করে বললাম।

পৃষ্ঠা:৬৬

“ঠিক উল্টোটা। সাধকরা সৃজনশীল মানুষ হলেও তাদের সৃষ্টির মধ্যে কোনো উন্মত্ততা নেই। আছে শান্তি, একাগ্রতা ও ধ্যানমগ্নতা।’ কি ভাবে?’ ‘তারা যা করেছিলেন তার মধ্যে সুস্পষ্ট উদ্দেশ্যে ছিল। তথাকথিত বান্ত, আধুনিক জীবন এবং সংসার থেকে সরে গিয়ে উচ্চ মানের আধ্যাত্মিক জীবন কাটালেও তারা ছিলেন কর্মতৎপর। কেউ দর্শনের তত্ত্বগুলোকে ঘষামাজা করে নতুন তত্ত্ব খুঁজে বের করেছেন, তো কেউ অসাধারণ সাহিত্য সৃষ্টি করে বারে বারে নিজেই নিজের কাছে ছুঁড়ে দিয়েছেন চ্যালেঞ্জ। কেউ কেউ আবার নীরব ধ্যানমগ্নতায় সময় কাটাতেন দেখে মনে হতো যেন পদ্মের আসনে বসে থাকা সুপ্রাচীন মর্মর মূর্তি। সিভানার সাধকেরা সময় নষ্ট করতেন না। তারা জানতেন তাদের জীবনের একটা উদ্দেশ্য আছে, আছে কিছু কর্তব্য। যোগী রমন আমায় বলেছিলেন, ‘এই সিভানায় যেখানে সময় যেন থমকে গেছে, তুমি হয়তো ভাবতে পারো একদল সহজ, সরল, নিঃসম্বল সন্ন্যাসীর সেখানে এসে কিই বা চাহিদা থাকতে পারে, কিই বা অর্জন করে দেখানোর থাকতে পারে। তবে বন্ধু, সফলতা তো বৈষয়িক ধরনেরই হজু খুক। আমাদের লক্ষ্য মনের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ, অপার শান্তি আর ধরমার্জন। আবার জীবদ্দশায় তা যদি অর্জন করতে না পারি তবে ব্যক্তিগতভাবে বলতে পারি আমায় অতৃপ্তি ও অপূর্ণতা নিয়ে মরতে হবে।’ এই প্রথম জুলিয়ন সিভানার কারও মুখে মৃতুইই এইসঙ্গ তুলতে শুনল। যোগী রমন তার ভাবভঙ্গিতে সেটা বুঝতে পেরেছিলেন। বলেছিলেন, ‘যাবরে যেও না বন্ধু। ইতিমধ্যেই আমি একক্সো রইব পার করেছি। খুব তাড়াতাড়ি যাওয়ার কোনো পরিকল্পনাও নেই। তবে তোমাকে বলতে চাই জীবনে কি চাও তা যদি জানো, তা সে বিষয়, আবেগ, শরীর, আধ্যাত্মাবাদ, সংসার যে সংক্রান্তই হোক না কেন, তার লক্ষ্যে প্রতিদিন যদি এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করো, তবে শাশ্বত আনন্দের খোঁজ তুমি নিশ্চয়ই পাবে। পরিচয় ঘটবে অসাধারণ সুন্দর এক বাস্তবের সঙ্গে। আমার জীবনের মতোই আনন্দময় হয়ে উঠবে তোমার জীবন। তবে তার আগে জানতেই হবে জীবনের লক্ষ্য এবং কাজের মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হবে তাকে সফল করার উদ্দেশ্যে। আমরা সাধুরা একে সংস্কৃতে বলি ‘ধর্ম’ যার অর্থ ‘জীবনের উদ্দেশ্যে।’ ‘ধর্ম পালনের মাধ্যমেই কি সারাজীবনের আনন্দ লাভ করা সম্ভব?’ আমি প্রশ্ন করি। ‘নিশ্চয়ই। ধর্ম পালনের মাধ্যমেই উদ্ধৃত হয় অন্তরের সহাবস্থান আর চিরস্থায়ী সুখ। ধর্ম এমন এক সুপ্রাচীন নীতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা আমাদের

পৃষ্ঠা:৬৭

বলে যে, এই পৃথিবীতে আমরা জন্ম নিয়েছি কিছু বিশেষ উদ্দেশ্যে। আমাদের প্রত্যেকের ভিতরেই কিছু বিশেষ ক্ষমতা ও কর্মকুশলতা দেওয়া আছে। যার মাধ্যমে আমরা পৌঁছবো আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্যে, স্বপ্নের বাস্তবতায়। শুধু আমাদের যা করতে হবে তা হলো, নিজের ভিতরের বিশেষ ক্ষমতাগুলোকে খুঁজে বের করা। তাহলেই জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছতে আমাদের আর কোনো বাধা থাকবে না।’ জুলিয়নকে বাধা দিয়ে কলাম, ‘তুমি যে সেই ঝুঁকি নেওয়ার কথা বলেছিলে এ তো তাই।’ ‘হ্যাঁ-ও আবার না-ও। ‘বুঝলাম না।’ ‘হ্যাঁ, মনে হতে পারে, নিজেকে খুঁজে পাওয়া বা জীবনের মূল উদ্দেশ্য কি তা খুঁজে পাওয়ার মধ্যে এক রকমের ঝুঁকি থেকেই যায়। কারণ তারপর অনেকেই স্থায়ী চাকরি, রোজগার সব ছেড়েছুঁড়ে শুধু আত্মার শান্তি ও সুখ যাতে আসে সেই পথে ধাবিত হয়। তবে এতে ভয়ের কিছু নেই। আত্মজ্ঞান হলো আত্ম উপলব্ধি ও আত্ম উন্মোচনের ডি.এন.এ। এটি একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিষয়।’  হালকা চালে প্রশ্ন করলাম, ‘তোমার ধর্ম কি জুলিয়ান?’ ‘আমার ধর্ম খুব সহজ, নিঃস্বার্থভাবে অন্যের সের করে যাওয়া। মনে রেখো জন আরাম করা, ঘুমানো ক আলসেমি করার মধ্যে প্রকৃত আনন্দ খুঁজে পাওয়া যায় না। বেঞ্জামিন ডিসরেলি বুদ্ধেছিলেন, উদ্দেশ্যে অটল থাকাই সাফল্যের চাবিকাঠি।’ যেসব লক্ষ্য অর্জন করবে বলে তুমি নিশ্চিত হয়েছো, সে সম্পর্কে গভীর চিন্তা করা, এবং তারপর সেগুলোকে সফল করার উদ্দেশ্যে এগিয়ে যেতে উদ্যোগ নেওয়ার মধ্যেই রয়েছে সেই সুখ যা তুমি চাইছো। সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য, সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজকে কখনোই ফেলে রাখা উচিত নয়। যোগী রমনের কাহিনীর বাতিঘর তোমায় মনে করাবে, জীবনে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থাপন ও সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে সেগুলিকে সফল করার কথা।’ পরবর্তী কয়েক ঘণ্টায় শিখলাম, প্রত্যেক কর্মযোগী ও উচ্চ পর্যায়ের বিকশিত মানুষ তাদের নিজেদের ক্ষমতা ও কুশলতাকে খুঁজে বের করে নিজেদের ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যকে উন্মোচিত করে। এবং লক্ষ্য পূরণের উদ্দেশ্যে তার সমস্ত মন-প্রাণ উজাড় করে দেয়। কিন্তু মানুষ চিকিৎসক হিসেবে সমাজের মঙ্গলসাধন করেন, এদের মধ্যে কেউ বা শিল্পী হিসেবে। কেউ কেউ কথার মাধ্যমে সেবা করেন সমাজের, যেমন উদ্ভাবন করার ক্ষমতা রাখেন। আসল

পৃষ্ঠা:৬৮

ব্যাপার হলো তোমার জীবনের ব্রত কি তা বুঝতে পারা এবং তা বাস্তবায়িত করে সমাজের মঙ্গল সাধন করা।’ ‘এটা কি লক্ষ্য স্থির করার একটা ধরন?” ‘এতো সূচনা মাত্র। উদ্দেশ্যে খুঁজে পাওয়ার পর সৃজনী শক্তির উৎসমুখ খুলে যায়। এবং সেটাই তোমাকে লক্ষ্য পূরণে চালিত করে। বিশ্বাস করবে কিনা জানি না, সিভানার সাধকেরা তাদের লক্ষ্য পূরণের বিষয়ে প্রচণ্ড আবেগপ্রবণ।’ ‘মজা করছো? হিমালয় পর্বতের গভীর অঞ্চলে বাস করা অতান্ত কর্মতৎপর। সাধুরা সারারাত ধ্যান করেন আর সারা দিন লক্ষ্য স্থির করেন। অসাধারণ।’ ‘জন, ফল দেখে বিচার করবে সবসময়, আমাকে দেখো। মাঝে মাঝে আয়নায় দেখে নিজেকে নিজেই চিনতে পারি না। আমার একসময়ের অশান্তিপূর্ণ অস্তিত্ব আজ আনন্দ, উদ্দীপনায় ভরে আছে। জীবনে ফিরে এসেছে যৌবন, পেয়েছি সুঠাম সৌষ্ঠব। আমি আজ সত্যিকারের সুখী মানুষ। যা নিয়ে আমি আজ তোমার সাথে আলোচনায় বসেছি, যার মধ্যে নিহিত আছে অফুরাণ শক্তি, আছে প্রাণদায়ী ক্ষমতা তা জানতে তোলার মনকে যে উদার, উন্মুক্ত রাখতেই হবে, তাই।’ ‘বিশ্বাস করো, আমার মন উন্মুক্তই আছে। তোমার সব কথাই বুঝতে পেরেছি আমি। তবে কিছু কলাকৌশল একটু অদ্ভুত লেগেছে। তবে সেগুলোকে চেষ্টা করে দেখার প্রতিজ্ঞা কুরেছি, যখন, তখন তা করবোই। আমি স্বীকার করছি এর মধ্যে সত্যি প্রবরক্তিমতা আছে।’ ‘আমি যদি অন্যদের তুলনায় একটু বেশি দূরদর্শী হয়ে থাকি, তবে তার কারণ আমি মহান গুরুদেবের সান্নিধ্য পেয়েছি। একটা উদাহরণ দিই। যোগী রমন একজন দক্ষ তীরন্দাজ ছিলেন। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে লক্ষ্য নির্ধারণ করা ও তা পালন করার গুরুত্ব বোঝাতে তিনি এমন কিছু ডেমনস্ট্রেশনের ব্যবস্থা করতেন, যা আমি ভুলতে পারি না। আমরা যেখানে বসেছিলাম তার সামনে ছিল একটি ‘এক’ গাছ। যোগী তার সর্বদা পরণের মাল্যা থেকে একটি গোলাপ টেনে খুললেন। সেটা এবার গাছের গুঁড়ির ঠিক মাঝখানে রাখলেন। নিজের সবসময়ের সঙ্গী বড় ঝোলার ভেতর থেকে বের করলেন, দারুণ সুগন্ধী চন্দন কাঠের বানানো মজবুত একটি ধনুক, তীর ও শ্বেতলিপির মতো শুভ্র একটি রুমাল, যে রকম একসময় জুরি ও বিচারককে মুগ্ধ করার জন্য আমি আমার দামি স্যুটের সঙ্গে ব্যবহার করতাম। এবার যোগী সেই রুমালটি দিয়ে তার চোখ দুটি বেঁধে দিতে বললেন। প্রশ্ন করলেন ‘গোলাপের থেকে আমি কতো দূরে?’

পৃষ্ঠা:৬৯

‘একশো ফিট’ আমি আন্দাজে বললাম। ‘তুমি কি আমায় তীরন্দাজির নিয়মিত অনুশীলনে দেখেছো?’ উত্তরটা অবশ্য তার জানাই ছিল। ‘আমি আপনাকে তিনশো ফিট দূরত্ব থেকে নিশানা ভেদ করতে দেখেছি। আপনি লক্ষ্য ভেদ করতে পারেননি এমন কোনো দিনের কথা আমার মনে পড়ে না। রুমালে ঢাকা চোখ, পা দুটি মাটিতে দৃঢ়ভাবে নিবন্ধ, শুরু এবার তার সমন্ত্র শক্তি দিয়ে গাছের গুঁড়িতে লাগিয়ে রাখা গোলাপ টিকে তাক করে তার তীর ছুঁড়লেন। তীরটি গাছে লাগলো সজোরে, তবে লক্ষ্যবস্তুর থেকে বহু দূরে। ‘কি হলো যোগী? আমি তো ভেবেছিলাম আপনি আপনার বিস্ময়কর ক্ষমতার নতুন কোনো নিদর্শন দেখাবেন আমায়।” ‘এতো নিস্তব্ধ, নির্জন স্থানে শুধু একটি কারণেই এসেছি আমরা। আমি আমার পার্থিব যত জ্ঞান তোমায় অর্পণ করতে রাজি। আজকের এই প্রদর্শন জীবনের লক্ষ্য পূরণে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি শেখালো তোমায়। যার মূল বক্তব্য হলো, ‘যে লক্ষ্যবস্তু তুমি দেখতে পাচ্ছো না, তা তুমি কৃখুনেই ভেদ করতে পারবে না।’ মানুষ সারাজীবন অপার আনন্দে, অনুরাগে, রচুির্যে বেঁচে থাকার স্বপ্ন নিয়ে কাটিয়ে দেয়। কিন্তু সারা মাসে অন্তত দৃশ্যটন মিনিট সময় বের করে নিজের জীবনের লক্ষ্যগুলো লিখে, এবং জীবনের অর্থ সম্পর্কে গভীর ভাবনা চিন্তা করার সময় তারা পায়নি।’ তিনি আরো বললেন, ‘জুলিয়ন, মানসিক, শারীরিক ও আত্মিক জগতে যা চাই, কে পাওয়ার জন্য লক্ষ্য স্থির করা ও সেই উদ্দেশ্যে কর্ম করার পদ্ধতিটি আমাদের পূর্বপুরুষরা শিখিয়ে গেছেন। পৃথিবীর যে অংশ থেকে তুমি এসেছো সেখানে আর্থিক ও বৈষয়িক সমৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়। তুমি যদি সেটাকে মূল্যবান মনে কর তাতে দোষের কিছু নেই। তবে আত্মিক জ্ঞান অর্জন ও মনকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যও তোমাকে লক্ষ্য স্থির করতে হবে। যে মানসিক শান্তি আমি কামনা করি, যে উদ্যমে উৎসাহে রোজ আমি কাজ করি তার জন্য আমার নিজস্ব লক্ষ্য নির্দিষ্ট করা আছে-শুনে অবাক হচ্ছে? বিষয়ে আবদ্ধ তোমার মতো আইনজীবী শুধু নয়, যে কোনো মানুষ, যে তার অন্তরের ও বহির্জগতের মান উন্নত করতে চায়, তাদেরই এক টুকরো সাদা কাগজে তাদের জীবনের লক্ষ্য কি তা লিখে ফেলা প্রয়োজন। সেই মুহূর্ত থেকেই প্রাকৃতিক শক্তিগুলো সক্রিয় হয়ে উঠবে যার পরিণামে স্বপ্ন বাস্তবে রূপায়িত হবে।’ যা শুনছিলাম তাতে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। ছাত্রাবস্থায় আমি ফুটবল খেলতাম। প্রতিটি খেলা থেকে আমাদের কি চাই তা জানার গুরুত্বের কথা বারবার

পৃষ্ঠা:৭০

বলতেন কোচ। বলতেন, ‘পরিণতি কি তা জানো।’ আর নির্দিষ্ট একটা গেম প্ল্যান ছাড়া মাঠে নামার কথা ভাবতেও পারতাম না আমরা। অবাক হয়ে ভাবলাম, সত্যিই তো এতোদিনের জীবনের খেলায় একটি নির্দিষ্ট গেম প্ল্যানের কথা মাথাতেও কেন আসেনি একবার। হয়তো জুলিয়ন ও যোগী রমন এখানেই আমাদের চেয়ে এগিয়ে। ‘একটা সাদা কাগজে, জীবনের লক্ষ্য কি তা লিখে ফেলার মধ্যে কি এমন বড় ব্যাপার আছে? এতো সামান্য জিনিস এতো বড় পরিবর্তন কি করে ঘটাতে সক্ষম?’ প্রশ্ন করি আমি। ‘জন, তোমার জানার ব্যাকুলতা আমায় অনুপ্রাণিত করছে। সফল জীবনের মূলমন্ত্র হল্যে উৎসাহ। তোমার মধ্যে তা আজও পূর্ণমাত্রায় বজায় আছে দেখে ভালো লাগছে। আগেই তোমায় বলেছিলাম, প্রতিদিন গড়ে একটা মানুষ ৬০,০০০ চিন্তু মনে আনে। এক টুকরো কাগজে যেই মুহূর্তে তোমার লক্ষ্য তুমি লিখে ফেলছো, সেই মুহূর্তে আসলে তোমার নিজের মস্তিষ্ককে তুমি বার্তা পাঠাচ্ছে সেই চিন্তটা অন্য ৫৯,৯৯৯ টির চেয়ে আলাদা ঋৎগুরুত্বপূর্ণ। তোমার মন তখন ক্ষেপনাস্ত্রের মতো নিজের লক্ষ্যে ধাবিষ্ট হয়ে তোমার নির্দিষ্ট লক্ষ্যে তোমাকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সব রকমের সুযোগের সন্ধান করে তার সদ্ব্যবহার করবে। এটি একটি বৈজ্ঞানিক রাত্রিয়া, যদিও অধিকাংশ মানুষই এ সম্পর্কে কিছুই জানে না।’পার্টনারদের অনেকেই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধায়ণে অত্যন্ত পটু। আর্থিক দিক দিয়ে তারা সর্বাধিক সফল হলেও তারা এই সবচেয়ে বেশি ভারসাম্য যুক্ত তা আমি মনে করি না।’ আমি মন্তব্য দুউদ্যমে।’ সম্ভবত তারা তাদের জীবনের সঠিক লক্ষ্য স্থির করেনি। মনে রেখো জীবনের কাছে যা চাইবে, তার চেয়ে কিঞ্চিৎ বেশিই পাবে। বেশিরভাগ মানুষই ভালো থাকতে চায়। আরও উদ্যম, আরও তৃপ্তি আরও ভালো লাগার উপলব্ধি নিয়ে বাঁচতে চায়। কিন্তু ওদের প্রশ্ন করো, যে ওরা আসলে কি চায়, পরা উত্তর দিতে পারবে না। তোমার জীবন বদলে যাবে যেই মুহূর্তে তুমি তোমার লক্ষ্য স্থির করে, তোমার ধর্মের পথে পদার্পণ করবে।’ তার উচ্চারিত সত্যের আলোতে তার চোখদুটি ঝাকঝক করে উঠলো। ‘এমন কারও সঙ্গে তোমার কখনো দেখা হয়েছে যার একটা অদ্ভুত নাম আছে? আর তারপর পেপারে, টিভিতে, অফিসে হঠাৎই সেই অদ্ভুত নামটা বারে বারে তোমার নজরে আসতে শুরু করে? বা কখনো তোমার এমন কোনো নতুন শখ হয়েছে, যেমন ‘ফ্লাই ফিশিং’ এবং তারপর থেকে শুধু এই শথ সম্পর্কিত নানা খবর তোমার কানে আসতে শুরু করেছে। এ হলো

পৃষ্ঠা ৭১ থেকে  ৮০

পৃষ্ঠা:৭১

সুপ্রাচীন নীতিগুলোর আরেকটি নিদর্শন। যোগী রমন বলতেন ‘জোরিকি’। আমি বুঝেছি, ‘মনঃসংযোগ’। আত্ম-উন্মোচন বা নিজেকে জানার জন্য তোমার শরীরের প্রতিটি বিন্দু ইচ্ছাশক্তিকে ব্যয় করে। ধরো তুমি একজন আইনজীবী, কিন্তু তোমার একজন শিক্ষক হওয়া উচিত ছিল, কারণ তোমার মধ্যে রয়েছে ধৈর্য আর শিক্ষা দানের ইচ্ছা। বা হয়তো একজন ব্যর্থ চিত্রকর বা হতাশাগ্রস্ত ভাস্কর। যাই হওনা কেন নিজের ভালোবাসার দিকটি খুঁজে বের করে তাকে অনুসরণ করো।’ ‘এখন যখন আমি সত্যিই এই বিষয়টা বুঝতে পারছি যে, আমার মধ্যেও কিছু বিশেষ প্রতিভা আছে, যার দ্বারা আমি নিজে তো সুখী হতেই পারি, অন্যকেও হয়তো কিছুটা আনন্দ দিতে পারি। তখন জীবনেরও এই প্রান্তে এসে কিছুই না করে পৃথিবী থেকে চলে যাওয়াটা খুব দুঃখের হবে।’ ‘হ্যাঁ জন, ঠিক তাই। তাই এই মুহূর্ত থেকে তোমার লক্ষ্য সম্পর্কে সবিশেষ সচেতন হও। তোমর চারিপাশে কত শত সম্ভাবনার বীজ রয়ে গেছে, তাকে জাগিয়ে তোল। নতুন করে বাঁচো জন। মানুষের মন হলো যুবচেয়ে উন্নত ফিলটারিং’ বা পরিশ্রবণ পদ্ধতি। সঠিক ব্যবহার করতে পারলেই, তোমার মন ঠিক ততটুকুই ছেঁকে নেবে যতটুকু তোমার প্রয়োজন। জপ্রয়োজনীয় তথ্য বাদ চলে যাবে। এ যে আমাদের কথোপকথনের সময় চারিপাশে কতো কি ঘটে যাচ্ছে প্রেমিকেরা চাপাস্বরে কথা বলতে বুলাতে চলে যাচ্ছে রাস্তা ধরে, এসির আওয়াজ, আমাদের হৃদয়ের স্পন্দন্ধু কোনোকিছুই আমাদের কানে আসছে না, মনে পৌছছে না। আবার যে স্বীসূর্তে আমার হৃদস্পন্দন শুনতে চাইবো, তখন শুধু তাই শুনতে স্বরবটি মনকে এইভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণেরাখতে হবে জন।’ ‘সত্যি কথা বলতে কি, আমার মনে হয় এবার সময় এসেছে কিছু একটা করার। আমার জীবনে অনেক কিছু ঘটেছে। কিন্তু সে সব আমাকে ততটা সমৃদ্ধ করেনি যতটা করতে পারত বলে আমার মনে হয়। আজ যদি আমি পৃথিবী ছেড়ে চলে যাই আমার পিছনে এমন কোনো কীর্তি থাকবে না যা দিয়ে মানুষ আমায় মনে রাখবে।’ ‘তোমার কেমন লাগে এ কথা ভেবে?’ ‘অত্যন্ত হতাশ।’ মন থেকে বললাম। আসলে আমি সত্যিই দারুণ এক চিত্রশিল্পী ছিলাম। কিন্তু আইনের পেশা অনেক বেশি স্থিতিশীল জীবনের হাতছানি দেওয়ায় সব ছেড়ে চলে আসি।’ ‘ছবি আঁকাকে পেশা করার কথা ভেবেছিলে? ‘আমি ওটা নিয়ে সত্যিই অত গভীরভাবে চিন্তা করিনি। তবে একথা সত্যি, যখন ছবি আঁকতাম, মনে হতো যেন স্বর্গে বিরাজ করছি।’

পৃষ্ঠা:৭২

‘ওটাই তোমার মধ্যে ভালোলাগার দাবানল ছড়িয়ে দিত।”ঠিক। স্টুডিওতে কোথা দিয়ে সে সময় পার হয়ে যেত টেরই পেতাম না। ছবির নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতাম আমি।’ ‘বা ভালোবাসো তাতে মনঃসংযোগ করলে এই শক্তি আসে। গ্যেটে বলতেন, ‘আমাদের ভালোবাসার জিনিসই আমাদের আকৃতি-প্রকৃতি ঠিক করে দেয়। হয়তো তোমার ধর্ম বিম্বে নতুন নতুন সুন্দর দৃশ্যে উজ্জ্বল করে তোলা। দিনে কিছুটা সময় অদ্ভুত ছবি আঁকায় ব্যয় করো।’ একটু হেসে বললাম, ‘আচ্ছা, জীবন বদলে ফেলার মতো গুরুতর বিষয়ে না গিয়ে ছোট খাটো বিষয়ে এই জীবনদর্শন কাজে লাগালে কেমন হয়?’ ‘খুবই ভালো, কিন্তু কি ধরনের বিষয়?’ প্রশ্ন করল জুলিয়ন। ‘যেমন কোমড়ের চারপাশে বাড়তি মেদ ঝরাতে, আমাকে কোথা থেকে শুরু করতে হবে?’ ‘এতে বিব্রত হওয়ার কিছু নেই। তুমি শুধু লক্ষ্যের পর লক্ষ্য স্থির করে যেতো থাকো। ছোট দিয়েই শুরুটা হোক না।’ ‘একটা পদক্ষেপের মাধ্যমেই হাজার মাইল পথ চলার শুরু অ তাই না’, বহুদিনের শেখা কথাটা প্রয়োগ করলাম। একদম ঠিক। ছোট ছোট লক্ষ্য ভেদ করার আনন্দ তৃত্তি তোমাকে। লক্ষ্য পরিকল্পনা করতে উদ্বুদ্ধ করে তুলবে।’ বড় বড় জুলিয়ন বললো, সিভানার যোগীরা তাদের শুক্ষ্যে পৌছানোর জন্য পাঁচটি পদক্ষেপের একটি সমাহার তৈরি করছেন। প্রথম পদক্ষেপ হলো-মনের। আয়নায় যা চাই তার একটি স্বইে ইবি এঁকে ফেলা। জুলিয়ন বললো, প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে একজন নির্মেদ, কর্মক্ষম, ঝকঝকে মানুষ রূপে নিজের মনের আয়নার নিজেকে কল্পনা করতে হবে। মনই হলো শক্তির আসল পীঠ। তাই মনশ্চক্ষের এই ছবিই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত করার দ্বার খুলে দেবে। ‘কোনো সংকল্প নিয়ে তা না অনুসরণ করার মূল কারণ কি জানো, জন? কারণ, পিছু পুরনো অভ্যেসে ফিরে যাওয়া খুব সহজ। সবসময় মনে একটা মানসিক চাপ রাখতে হয়। চাপ সবসময় খারাপ নয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় প্রকৃত চাপ বা দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে তবেই মানুষ তার নিজের ভিতরের সেরাটা বের করে আনতে পারে।’ কিন্তু নিজে থেকে নিজের উপর এই চাপ দেবো কি করে?’ ‘সবছেয়ে সহজ পন্থা হলো সকলের সামনে শপথ নেওয়া। যেমন তুমি তোমার চেনা জানা, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন সবাইকে বলে রাখো যে তুমি তোমার

পৃষ্ঠা:৭৩

বাড়তি মেদ ঝরানোর প্রচেষ্টায় আছো। সবার কাছে তোমার লক্ষ্যটা বলে দিলে তুমি নিজেই নিজের ভেতরে তা সম্পূর্ণ করার চাপ অনুভব করবে। কারণ অক্ষম মানুষকে কেউ শ্রদ্ধা করে না। সিভানার যোগীরা অবশ্য আরও নাটকীয় পন্থা ব্যবহার করে থাকেন। যেমন তারা তাদের লক্ষ্য একে অন্যকে বলে দেন, যেমন আগামী এক সপ্তাহ উপবাসী থাকবেন বা প্রতিদিন ভোর চারটেয় উঠে ধ্যান করবেন ইত্যাদি। এবার তারা যদি তাতে বিফল হন, তবে শান্তি বরফ ঠাণ্ডা ঝরনার জলে ততক্ষণ বসে থাকবেন যতক্ষণ না হাত, পা অবশ হয়ে আসে।’ ‘চরম বললেও একে কিছু কম বলা হয় জুলিয়ন। কি অদ্ভুত পদ্ধতি!’ ‘কিন্তু খুব কার্যকরী। মনকে যদি সুঅভ্যাসের সঙ্গে আরাম আর কুঅভ্যাসের সঙ্গে যন্ত্রণার যে যোগসূত্র তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দাও, তাহলে মনের সব দুর্বলতা নিমেষেই পালাবে।’ ‘পাঁচটি পদক্ষেপের বাকিগুলো কি, জুলিয়ন?’ ‘তিন নম্বরটি হলো, প্রতিটি লক্ষ্যের সঙ্গে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া থাকবে। আর হ্যাঁ, মনে রাখবে, যে লক্ষ্য কাগজে লেখা হয়নি, ষৈটা কোনো লক্ষ্যই নয়। যাও এবার একটা সম্ভার নোটপ্যাড কিনে আলো আর। আর তাতে তোমার মনের যত বাসনা, আশা, আকাঙ্ক্ষা সব লিখে দেহলো। নিজেকে সম্পূর্ণরূপে চেনো।’ ‘আমি কি নিজেকে চিনি না?’ ‘অধিকাংশ লোকই জানে না। স্বপ্ন কিছুই জানে না তারা। চি৯ ত শক্তি, নিজেদের দুর্বলতা, আশা, দেশের মানুষেরা প্রতিচ্ছবির যে সংজ্ঞা দিয়েছে, তা এরকম। তিনটি আয়নায় একটি মানুষের ছবি প্রতিফলিত হয়। প্রথমটিতে সে নিজেকে যেমন দেখে তেমন ভাবে, দ্বিতীয়টিতে অন্যেরা তাতে যেভাবে দেখে তেমন ভাবে, আর শেষেরটিতে প্রকৃত সত্যটা কি তার প্রতিফলন ঘটে। নিজেকে চেনো জন, নিজেকে জানো।’ তোমার স্বপ্ন লেখার খাতায় তোমার বিভিন্ন লক্ষ্য, যেমন আর্থিক, শারীরিক, ব্যক্তিগত ক্ষমতা বৃদ্ধি, সম্পর্ক, সামাজিক এবং সবচেয়ে জরুরি আত্মিক লক্ষ্যগুলো সব লিখে ফেলো।’ ‘বাহ! এটা তো বেশ মজার।’ বললাম আমি।’ ‘তুমি আরেকটা কাজ করতে পারো। তোমার জীবনে তুমি যা যা চাও যেমনটি চাও, তার ছবি কেটে তোমার এই খাতার পাতায় লাগিয়ে দিতে পারো। যেমন শারীরিক লক্ষ্যের পাতায় কোনো সুঠাম চেহারার অ্যাথলিটের

পৃষ্ঠা:৭৪

ছবি, সম্পর্কের পাতায় তুমি যাকে শ্রেষ্ঠ বাবা বা স্বামী হিসেবে মানো তার ছবি, আর্থিক লক্ষ্যের পাতায় গ্রীসের দ্বীপে কোনো ভিলার ছবি ইত্যাদি। প্রতিদিন এই পাতাগুলি খুলবে, আর মন ভরে দেখবে। এর ফলাফলে তুমি। অবাক হয়ে যাবে।’এ তো বেশ বৈপ্লবিক ব্যাপার জুলিয়ন। মানে এ সব আইডিয়াগুলো যুগ যুগান্ত ধরে আমাদের আশেপাশেই ছিল। তবে আজ সেগুলোর ব্যবহারে মানুষের দৈনন্দিন জীবন হয়ে উঠবে রঙিন। আমার স্ত্রীর তো এই আইডিয়াটা দারুণ লাগবে। ও তো ওর স্বপ্নের খাতা আমার ছবি দিয়ে ভরে ফেলবে, অবশ্যই এমন ছবি যাতে আমার কুখ্যাত ভুঁড়িটি নেই।’ জুলিয়ন সান্ত্বনা বাক্য শোনোলো- ‘তোমার ভুঁড়িটা অতো বড় কিছু নয়।’ ‘তবে জেনি কেন আমাকে মি. হিপো বলে ডাকে, চওড়া হেসে বললাম। হো হো করে অট্টহাস্যে ফেটে পড়ল জুলিয়ন। বেশ কিছুক্ষণ দুজর্নে গ্রাণ খুলে হাসলাম। বললাম, ‘নিজেকে নিয়ে যদি হাসতে না পারো তরে কাকে নিয়েই বা হাসবে, কি বলো?’ ‘খুব সত্যি কথা। যখন সংসারের বন্ধনে আবদ্ধ ছিলাম তখন জীবনটাকে খুবগুরুগম্ভীরভাবে দেখতাম। এখন আমি ছেলেমানুষের মতো হাসি জীবনের ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর উপহারও উপভোগ করি মন থেকে। ‘কিন্তু আমি কেমন বদলে গেছি। কতো করা যে বলার আছে তোমায়। সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে।’ ‘ফিরে যাই নেই পাঁচটি ধাপের কথায়। মনশ্চক্ষে নিজের লক্ষ্যের প্রতিচ্ছবি দেখে, নিজেকে নিজে একটু চাপ দিয়ে, সময়সীমা বেঁধে আর কাগজে তা লিখে এবার যেটা করতে হবে তার নাম একুশের ম্যাজিক নিয়ম।’ সভা জগতের মানুষ বিশ্বাস করে, যে কোনো নতুন ব্যবহারকে অভ্যেসে পরিণত করতে গেলে, তাকে কমপক্ষে ২১ দিন পর পর অনুশীলন করতে হয়।’ ‘একুশ দিনের বিশেষত্ব কি?’ ‘সাধু মহাপুরুষরা নতুন নতুন ফলপ্রসু অভ্যেস গড়ে তোলায় একেবারে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। যোগী রমন একবার বলেছিলেন যে ‘বদভ্যাস একবার রপ্ত হয়ে গেলে সারা জীবনেও আর পিছু ছাড়ে না।’ ‘এতোক্ষণ যা যা কড়া কথা তুমি বললে, তাতে তো তুমি আমাকে বদভ্যাস। বদলে ফেলার শিক্ষাই দিলে, যদি বদভ্যাস কখনো বদলাতে নাই পারি, তাহলে কেমনভাবে নিজেকে পাল্টাবো?

পৃষ্ঠা:৭৫

‘আমি বলেছি কুঅভ্যাস বা বদভ্যাস মুছে ফেলা যায় না। নেতিবাচক অভ্যেস পাল্টানো যায় না বলেছি কি? জুলিয়ন নিখুঁতভাবে বক্তব্য পেশ করল। একেবারে ওকালতি কায়দায়। ‘ওহ, জুলিয়ন, কথার মারপ্যাচে তোমাকে হারানো সম্ভব নয়।’ ‘সদা সর্বদার জন্য নেতিবাচক অভ্যাসকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য মনের সমস্ত প্রাণশক্তি দিয়ে নতুন কোনো ইতিবাচক অভ্যাসকে তার জায়গায় এনে বসানো উচিত। আর এটা সফলভাবে মস্তিষ্কে, মনে বসিয়ে নিতে মোটামুটি একুশ দিন সময় লাগে।’ ‘ধরো দুশ্চিন্তা করার অভ্যাসকে সরিয়ে সেখানে ‘গোলাপের হৃদয়’ এর অভ্যাসকে বসাতে চাই। রোজ কি আমার একই সময় এর অনুশীলন করতে হবে?’ভালো প্রশ্ন। প্রথমত তুমি কোনোকিছুই করতে হবে বলে মা কোরো না। তোমাকে ভালোবাসি, তোমার ভালো চাই বলে হয়তো তোমায় বুলতে ইচ্ছে হচ্ছে, যে আজ রাতে তোমায় যা যা শিখিয়েছি তা সবই খরীঞ্জিত এবং সফলতার সঙ্গে প্রমাণিত। তবে আমি সব জ্ঞানটুকু তোমধ্য দিয়ে, তা অনুশীলন করা না করার দায়িত্বটাও তোমাকেই দিচ্ছি। বাধ্যতামূলক ভেবে নয়, মন থেকে চাইলে তবেই এগুলোর অনুশীলন কোরো। এবং যা ঠিক মনে হবে, তাই করো। ‘কথাটায় যুক্তি আছে। ভেবোনা, এক মুহূর্তির জন্যেও আমার মনে হয়নি আমাকে কিছু গলাধঃকরণ কনরানো অচ্ছে। ইদানীং জোর করে একটা জিনিসই আমায় গলাধঃকরণ করানো জয়, তা হলো ভুনাটস।’ চটপট জবাব দিলাম। জুলিয়ন নীরবে হাসলো। ‘ধন্যবাদ। এবার আমার উত্তর হলো ‘গোলাপের হৃদয় পদ্ধতিটি তুমি একই জায়গায়, একই সময় রোজ অনুশীলন করো। নিয়মের একটা অসামান্য ক্ষমতা আছে। খেলোয়াড়রা একই সময় রোজ খেয়ে দেয়ে, একইভাবে জুতোর ফিতে বেঁধে যখন খেলতে নামে, তখন তারা নিয়মেরই ক্ষমতার ব্যবহার করে। মন্দিরের পূজারী বা ব্যবসাদারেরা একই নিয়ম পালন করে, যা একই কথা বারে বারে বলে, সেই কথাকথিত নিয়মের প্রচণ্ড শক্তিরই ব্যবহার করে থাকে। একই সময়, প্রতিদিন কোনো কাজ একইভাবে করে যেতে যেতে সেটা অভ্যাসে পরিণত হয়।’ ‘উদাহরণস্বরূপ প্রতিদিন সকালে অধিকাংশ লোক একই কাজ করে যায় কোনো কিছু না ভেবেই। সকালে ঘুম থেকে ওঠে, দাঁত মাজে, বাথরুমে যায়।

পৃষ্ঠা:৭৬

একুশ দিন ধরে নতুন কোনো কাজ একই সময়ে করে যেতে থাকলে, সেটাও দাঁতমাজা, মুখ ধোয়ার মতোই সহজ অভ্যাস হয়ে দাঁড়াবে।’ ‘শেষ ধাপটি কি, জুলিয়ন?’ ‘যোগীদের জীবনে যেমন তোমার জীবনেও শেষ ধাপটি সেই একইভাবে। প্রযোজ্য।’আমার পাত্র এখনও শূন্য।’ ‘পুরো প্রক্রিয়াটা উপভোগ করো। সিভানার সাবকেরা বলেন, হাসি হাড়া একটি দিন, বা ভালোবাসাহীন একটি দিন মানে জীবনীশক্তিবিহীন একটি দিন।’ ঠিক বুঝলাম না।’ ‘এই অনুশীলন চালিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে হাস্যে, ঘূর্তি করো, আনন্দ উপভোগ করো। তোমার আশেপাশের ছোটখাটো সব কিছুর মধ্যে যে সৌন্দর্য আছে তাকে দেখার চেষ্টা করো। জীবন একটা উপহার পেয়েছি, যা আজ তোমার সাথে ভাগ করে নিচ্ছি। নিজের কাজে অবিচল মোকো আর সকলের জন্য নিঃস্বার্থভাবে সেবা করে যাও। বাকি কাজটা। প্রকৃতি নিজেই করে দেবে। প্রকৃতির অমোঘ সত্য এটি। ‘আর অতীতে যা ঘটেছে তার জন্য দুঃখ করবো না, তাই তো?’ ঠিক তাই। পৃথিবীতে কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। প্রেমেয়র জীবনে যা যা ঘটেছে আর যা যা ঘটতে চলেছে তার সবেরই কোনো না কোনো উদ্দেশ্য ছিল বা আছে। প্রতিটি অভিজ্ঞতাই এক একটি শিক্ষা তাই ছোটখাটো জিনিস নিয়ে দুশ্চিন্তা করা বন্ধ করে দাও। অরিনকে পুরোমাত্রায় উপভোগ করো। ‘এই কি সব?’ একটুও না। বরং বেশ চনমনে লাগছে। তুমি কিন্তু দারুণ মোটিভেটর জুলিয়ন। আচ্ছা ইনফামার্শিয়াল বা তথ্য আদান-প্রদানের পদ্ধতি বা ব্যবসা সম্পর্কে কিছু ভেবেছো?’একটু ঠাট্টা করছিলাম আর কি?’ ‘ঘাই হোক, যোগীর কাহিনীতে ফিরে যাওয়ার আগে শেষ একটা কথাতোমাকে জানাতে চাই।”বলো।”একটি শব্দ যোগীরা খুব শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করে থাকেন ফ্যাশন, অর্থাৎ কোনো কিছুকে সার্থক রূপ দেওয়ার জ্বলন্ত বা দীপ্ত উদ্দীপনা ও আবেগ, কোনো কিছুকে সার্থক রূপ দেওয়ার। তোমার স্বপ্নকে সফল করবার একমাত্র

পৃষ্ঠা:৭৭

জ্বালানী হলো এই প্রচণ্ড প্যাশন। আমাদের সমাজে আজ আর আমরা ভালোবেসে কিছু করি না। করতে হয় বলে করি। এটা এক দুর্দশাময় সময়ের সূচনা। আমি এখানে রোমান্টিক প্যাশনের কথা বলছি না। যদিও উদ্দীপনাময় অস্তিত্বের জন্য এই ভাবাবেগ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আমি বলছি জীবনের জন্য প্যাশন। প্রতিদিন সকালে পূর্ণ উদ্যম ও আনন্দ উচ্ছ্বাস নিয়ে আগো, যা যা করবে তার মধ্যে ঢেলে দাও প্যাশনের নির্যাস। জীবন নতুন রূপে তোমার কাছে ধরা দেবে। বৈষয়িক ও আধ্যাত্মিক সমৃদ্ধি তোমার জীবনে দুই-এরই সমাহার ঘটবে।’ ‘শুনে মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা কতো সহজ।”সহজই তো। আজ রাত থেকেই জীবনের রশিটা নিজের হাতে তুলে নাও। নিজে নিজের ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রণ কর। নিজের উন্নতির জন্য উদ্যোগী হও। দেখবে জীবন কতো সুন্দর। ভেতরে যা আছে তার তুলনায় তোমার সামনে বা পিছনে যা পড়ে আছে তা কিছু নয়।’ ‘ধন্যবাদ জুলিয়ন। এ কথাগুলো জানার সত্যিই প্রয়োজন ছিল আমাতে। জীবন যে কতো কিছুর অভাব তা আজ রাতের আগে অনুভরই করিনি কখনো। দিশাহীন, উদ্দেশীহীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। তবে বদলে যাবে জীবন, তোমায় কথা দিলাম আজ। কৃতজ্ঞ থাকব্যে সারাজীবন তোমার কাছে।’ ‘বন্ধু আমি আমার কর্তব্য পালন করছি শুধু।’ও অষ্টম অধ্যায়ের সংক্ষিপ্তসার প্রতীক গুণ চিত্র তোমার উদ্দেশ্য অনুসরণ কর জ্ঞান শ্রীবনের উদ্দেশ্যে হলো উদ্দেশ্যপূর্ণ জীবন। জীবনের লক্ষ্য খুঁজে বের করা ও তা বাস্তবে পরিণত করা হলো চিরস্থায়ী সুখের/তৃপ্তির মূলমন্ত্র সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিগত, পেশাগত আধ্যাত্মিক লক্ষ্য স্থির করো এবং তা পূরণে উদ্যোগী হও। কলাকৌশল আত্ম পরীক্ষণের ক্ষমতা। লক্ষ্য পূরণের জন্য পাঁচটি পদক্ষেপ। উদ্ধৃতি অপার আনন্দে বেঁচে থাকার গুরুত্ব ভুলে যেও না। তোমার চারিপাশে সমস্ত কিছুর মধ্যে যে সৌন্দর্য আছে তা দেখো, তা উপভোগ কর। নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকো। বাকিটা প্রকৃতিই করে দেবে।

পৃষ্ঠা:৭৮

অধ্যায় ৯

আত্মপরিচালনার অতি প্রাচীন এক কৌশল

‘ভালো লোকেরা বিরামহীনভাবে নিজেদের শক্তিশালী করে গড়ে তোলে।’ তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছে, নিজের কাপে চা ঢালতে ঢালতে বলে জুলিয়ন। কিছুক্ষণের মধ্যেই সকাল হবে, তুমি কি আরো শুনতে চাও, নাকি আজ রাতের মত যথেষ্ট হয়েছে? এ মানুষটিকে ছেড়ে দেওয়ার কোনো প্রশ্নই নেই। যার কাছে জ্ঞানের এতো মণি মুক্তা আছে তাকে ছাড়ি কি করে? প্রথমে গল্পগুলো শুনতে বেশ লাগছিল। তবে শুনতে শুনতে কালোত্তীর্ণ সব নিয়ম নীতির কণ্ঠয়িত্ব শুনতে লাগলাম তত যেন বিশ্বাস আরো গভীর হলো। ওর কথায় অপড়ি বিশ্বাস তৈরি হলো। ‘প্লিজ জুলিয়ন বলো, আমার এখন সময়ের অভাব নেই। বাচ্চারা এখন দাদুর বাড়ি ঘুমোচ্ছে। জেনি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেও উঠবে না। আমার আন্তরিকতা দেখে জুলিয়ন শুরু করলো তার কাহিনী। ‘তোমার মনে আছে, আমি বলেছি কাহিনীতে বাগান হলো তোমার মনের উর্বরতার প্রতীক যা ধনসম্পদে ভরা, আর বাতিঘর হলো লক্ষ্য আর উদ্দেশ্যের শক্তির প্রতীক। গল্পে মনে আছে দরজা খুলে বেড়িয়ে আসে এক ন’ফুট লম্বা সুমো কুস্তিগির?’ ‘মনে হচ্ছে যেন পঁচা গডজিলার সিনেমা।’ ‘ছোটবেলায় আমার কিন্তু এসব শুনতে খুব ভালো লাগতো।’ ‘আমারও। যাই হোক তোমার গল্পে ফিরে এসো।’ ‘এই সুমো পালোয়ান সিভানার সাধুদের জীবন পরিবর্তনের এই সিস্টেমের একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বস্তুকে প্রতিনিধিত্ব করে। যোগী বলেছিলেন বহু শতাব্দী আগে প্রাচ্যদেশে এক উন্নত দর্শনের আবিষ্কার হয়েছিল। তার নাম ‘কাইজেন।’ জাপানি ভাষায় এর অর্থ হলো বিরামহীন ও নিরন্তণ উন্নতি। যেসব মানুষ উচ্চমানের, আলোকদীপ্ত, প্রজ্ঞাপূর্ণ জীবনযাপন করেন, তাদের ব্যক্তিগত ট্রেডমার্ক এটি।

পৃষ্ঠা:৭৯

‘সাধুদের জীবনকে ‘কাইজেন’ কিভাবে প্রভাবিত করেছিল?”আগেই বলেছি, বহির্জগতে যদি সফল হতে চাও, অর্থাৎ সেটা শারীরিক হোক বা বৈষয়িক; তবে অন্তরের অন্দর সফল হতে হবে আগে। আর তা করার মূলমন্ত্র হল্যে নিরঞ্জন আত্ম-উন্নতি করে যাওয়া। আত্ম নিয়ন্ত্রণই হলো জীবন-নিয়ন্ত্রণের ডি.এন. এ.।”জুলিয়ন, কিছু মনে কেরো না। আমি এক মধ্যবিত্ত অ্যাডভোকেট। গাছপালা ঘেরা শহরতলি থেকে উঠে আসা। আমার ড্রাইভারওয়েতে একটা মিনিজ্যান। আর গ্যারেজে একজন লন-বয় ছাড়া আর কিছু নেই। তোমার প্রতিটি কথায় এই যে ‘অন্তর্জগতের’ কথা আসছে, তা যেন আমার মাথায় ঠিকমতো ঢুকছে না। তুমি আমাকে এ পর্যন্ত যা বলেছ তা সবই অর্থপূর্ণ। যা আলোচনা করেছ তা সাধারণ বোধের মধ্যেই পড়ে। তবে এই ‘কাইজেন’-এর ধারণাটা আমার কাছে কিছুতেই পরিষ্কার হচ্ছে না।”আমাদের সমাজে আমরা প্রায়শই অজ্ঞদের দুর্বল বলে ভাবি। যারা তাদের জানের অভাবের কথা জানিয়ে নির্দেশ চায়, তারা সকলের আগে জ্ঞানালোকের পথ খুঁজে পায়। তুমি খুব স্পষ্ট এবং সৎভাবে প্রশ্ন করেছো। তাতে আমি বুঝেছি যে তুমি তোমার হৃদয় খুলে রেখেছে নতুন নতুন আইডিয়ার জন্য। পরিবর্তনই হলো সমাজের চালিকাশক্তি। বেশির ভাগ লোক একে ভয় পায়, কিন্তু জ্ঞানীরা একে গ্রহণা জলেরন। ‘জেন’ বা ‘মহাযানী’ বৌদ্ধ ঐতিহ্য নতুন শিক্ষার্থী সম্পর্কে বলা হয়েছে। যারা নতুন কিছু ধ্যান- ধারণার জন্য নিজেকে উন্মুক্ত রাখে, যাদের জ্ঞানের পেয়ালা সর্বদাই খালি, তারাই সাফল্য ও পরিপূর্ণতার শিখরে পৌঁছায়। কোনো সামান্য প্রশ্ন করতেও পিছপা হবে না। জিজ্ঞাসাই হলো জ্ঞান আহরণের একমাত্র পথ।’ ‘ধন্যবাদ, কিন্তু ‘কাইজেন’ এখনও আমার মাথায় ঢুকলো না।’ ‘আমি যখন অন্তরের উন্নতির কথা বলছি, আমি তখন তোমার আত্ম-উন্নতি না ব্যক্তিগত প্রসারণের কথা বলছি। এটাই হল শ্রেষ্ঠ জিনিস যা তুমি করতে পারো। তুমি ভাবতে পারো নিজের জন্য তো অনেক সময় দিই। ভুল, একেবারে ভুল। নিজেকে শৃঙ্খলা, শক্তি, আশাবাদ ও প্রাণশক্তিতে ভরপুর একজন চরিত্র বলে তৈরি করতে যখন সময় বের করেছো, তখন বহির্জগতে কিন্তু তুমি যা ইচ্ছা তাই পেতে পারো। নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে গভীর বিশ্বাসবোধ ও মনোবল থাকলে কোনো কিছুই তোমাকে তোমার পথ থেকে সরাতে পারবে না। নিজের মনকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে যদি সময় দিতে পারো; নিজের শরীরের যত্ন ও অন্তরাত্মাকে বিকশিত করতে যদি সময় বের করতে পারো, তবে দেখবে তোমার জীবন স্ফুর্তি ও প্রাচুর্যে ভরে উঠেছে।

পৃষ্ঠা:৮০

এপিকেসটাস বলেছিলেন, ‘নিজের উপর প্রভুত্ব না করতে পারলে, কোনো মানুষই প্রকৃত অর্থে স্বাধীন হতে পারে না।”তাহলে ‘কাইজেন’ একটি বাস্তবসম্মত মতবাদ?” খুবই বাস্তবসম্মত। কোনো মানুষ নিজেকে চালনা করতে না পারলে, তিনি একটি কর্পোরেশন পরিচালনা করবেন কিভাবে? সংসারের যত্ন তিনি কেমন করে নেবেন যিনি নিজের যত্নই করতে শেখেননি?” আমি সম্মত হলাম। এই প্রথম মনে হলো নিজের উন্নতির জন্য সত্যিই কিছু করা দরকার। এতো দিন পথে, ঘাটে, সাবওয়ের সিঁড়িতে কারও হাতে ‘মেগ্য লিভিং’ বা ‘দ্য পাওয়ার অব পজিটিভ থিংকিং’ বা ‘দ্য পাওয়ার অব ইওর সাবকনশাস মাইন্ড’ দেখলে তাদের জন্য করুণা হতো। আহারে। না জানি কি অসুখ আছে মনে, যার ওষুধ খুঁজে বেড়াচ্ছে পাগলের মতো। আজ বুঝলাম ওরাই আসলে বুদ্ধিমান, কারণ ওরা আগেই বুঝেছে নিজের ভালো না করলে অপরের ভালো করা যায় না। ভাবতে বসলাম কেমন করে নিজেকে এখনও শুধরে নিতে পারবো। এবং আমি ব্রিশ্চিত যে নিজেকে শুধরে নেওয়ার এই প্রচেষ্টা আমার মধ্যে অতির্বিজ্ঞ স্ফুর্তি, প্রাণ প্রাচুর্যে ও স্বাস্থ্যের ক্ষুরণ ঘটাবে। মনে হলো, অন্যকে কথার মাঝে আটকানো বা বিশ্রী রাগ করার যে প্রবণতা আছে প্রমিার তাকে যদি সংযত করা যায়, তবে স্ত্রী সন্তানের সঙ্গে সম্পর্কটা জোরও অনেক সহজ হবে। মুশ্চিন্তা করার অভ্যেসটা ছাড়তে পারলে জীবনে অনেকটা শান্তি পাবো। মানসশ্চক্ষে ইতিবাচক ছবিগুলো যত যুদ্ধে উঠতে লাগলো, তত উত্তেজিত হয়ে উঠলাম। বোজের ব্যায়াম, হাইয়টি বা সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনধারা নয়,জুলিয়ন হিমালয়ের গভীর থেকে শিখে এসেছে চরিত্র ও মনকে দৃঢ়তার সঙ্গে গড়ে তোলার এক গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব সাহসের সঙ্গে বেঁচে থাকার উপায়। সে আমায় বললো যে এই তিনটি গুণের সমষ্টি আমাকে শুধুমাত্র একটি VIRUOUS জীবন নয়, সাফল্য, সন্তুষ্টি ও অন্তরে প্রকৃত শান্তি পরিপূর্ণ এক জীবনের পথে চালিত করতে পারে। সে জানায় যে সাহস হলো এমন গুণ, যা সকলের উচিত নিজের মধ্যে লালন-পালন ও চর্চা করা এবং এটি মানুষকে ভবিষ্যতে জীবনে বিপুল অঙ্কের ডিভিডেন্ড দেয়। আমি প্রশ্ন করলাম, ‘আত্মত্মপরিচালনা বা ব্যক্তিসত্তার বিকাশের সঙ্গে সাহসিকতার সম্পর্ক কিং’ ‘সাহস থাকলে তুমি নিজেই নিজের পথ করে নিতে পারবে। সাহস থাকলে তুমি যা চাও তাই করতে পারো, কারণ তুমি জানো যে তা সঠিক। অন্যেরা যেখানে হেরে যায়, সেখানে টিকে থাকার লড়াই একমাত্র করতে পারে সাহসীরাই। কতোটা সাহস নিয়ে জীবনযাপন করছো তার ছাপ পড়ে তোমার

পৃষ্ঠা ৮১ থেকে  ৯০

পৃষ্ঠা:৮১

জীবনের সাফল্যের উপরেও। সাহস থাকলে তবেই তো জীবন নামক মহাকাব্যের সবকটি উপাদান প্রাণ ভরে উপভোগ করতে পারবে।’ ‘কোথা থেকে শুরু করবো নিজেকে উন্নত করে তোলার কাজ?’ জুলিয়ন ফিরে গেল হিমালয়ের গহীন বনে, অন্ধকার, তারকাখচিত রাত্রিতে, তার আর যোগীরা সেই গল্পে। ‘প্রথম প্রথম আমারও আত্মান্নতির এই ধারণার বেশ অসুবিধে হতো। আমি হাভার্ডে পড়া, নামজাদাঅ্যাডভোকেট। নতুন যুগের এই সব ধ্যানধারনায় আমার বিশ্বাস ছিল না। মনে হতো এসব ওই বিশ্রী চুলের স্টাইল করা উদ্ভট মানুষগুলোর জন্য, যারা এয়ারপোর্টে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায়। আমি তুল ছিলাম। এই সংকীর্ণ ও বদ্ধ জলাশয়ের মতো মনের কারণেই আমি এত্যে পিছিয়ে পড়েছিলাম। যত যোগীর কথা শুনছিলাম, ততই অতীতের যন্ত্রণা কষ্টগুলোকে যেন অনুভব করতে পারছিলাম। আর ততই খোলা মনে ‘কাইজেন’কে বরণ করে নিতে পারছিলাম-কাইজেন দেহ, মন ও আত্মার নিরন্তর ও বিরামহীন প্রগতি।’ ‘আজকাল তা সবার মুখে মুখে শুনি দেহ, মন, আত্মার উঠল্লগ। কেন বল তো?’ ‘এই হলো মানুষের ক্ষমতার ট্রিলেন্ডি। শরীরকে সক্ষম না করে মানসিক উন্নতি ঘটালে তা নেহাতই শূন্যগর্ভ হবে। জ্যান্তার উন্নতিসাধন না করে শরীর মনকে উচ্চত্তরে নিতে চাইলে পূর্ণতা ভূঁইয়াফল্যের স্বাধ পাবে না। কিন্তু এই ত্রয়ীকে যদি একসাথে উন্নত করতে পারো, তবেই জীবনে ঐশ্বরিক আনন্দের স্বাদ পাবে। তুমি জানতে চাইছো, কোথা থেকে শুরু করবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তোমাকে কিছু প্রাচীন কলাকৌশল শেখাবো। তবে আগে একটা বাস্তব নিদর্শন দিই। তান দেওয়ার ভঙ্গিতে এসো।’ ‘হায় ঈশ্বর? জুলিয়ন কি ড্রিল সার্জেন্ট হয়ে গেল?’ মনে মনে ভাবলাম। কিন্তু মনের পেয়ালা খালি রেখে তৈরি হয়ে গেলাম। জুলিয়ন বললো, ‘নাও শুরু করো, ডান-বৈঠক’। ‘মানে?’ ‘হ্যাঁ, যতক্ষণ না মনে হবে আর কিছুতেই পারবে না, ততক্ষণ থামবে না।’ আমার এই দুশো পনেরো পাউন্ডের সুবিশাল চেহারা। বাড়ির কাছে ‘ম্যাকডোনাল্ডস’ এ কখনো সখনো হেঁটে যাই পরিবার নিয়ে, আর কখনো পক্ষ মাঠে, ল’ পার্টনারদের সঙ্গে। প্রথম পনেরোটা ডান, যেন জীবন বের করে দিলো। গ্রীষ্মের ওই ভ্যাপসা রাতে কুলকুল করে ঘামতে লাগলাম আমি। কিন্তু নিজের দুর্বলতা কিছুতেই দেখাতে চাইছিলাম না। তেইশটার পর আর পারলাম না।

পৃষ্ঠা:৮২

‘আর না জুলিয়ন। মরে যাচ্ছি মনে হচ্ছে। কি করতে চাইছো তুমি? ‘তুমি ঠিক জানো, আর একটাও পারবে না?’ ‘না, প্লিজ। এর মাধ্যমে আমি একটা পদ্ধতিই শিখলাম, তা হলো কি করে হার্ট অ্যাটাক করাতে হয়।’ ‘আর দশটা করো। তবে তোমার ছুটি।’ ‘ইয়ার্কি করছো।’ তবু করলাম এক-দুই-তিন-ওই দশ। ‘সেই রাতে যোগী রমনও আমাকে দিয়ে এই একই কাজ করিয়েছিলেন, বলেছিলেন ‘যন্ত্রণা কষ্ট হলো এক দুর্দান্ত শিক্ষা।”এর থেকে কি-ই বা শেখার আছে?’ ‘অচেনার গলিতে ঢুকলে তবেই মানুষের অধিক বুদ্ধি হয়।’ ‘সাথে তার সম্পর্ক কি?’ ‘তেইশের পর বললে, আর একটাও পারবে না। অথচ তার পরেও বাধ্য হয়ে করলেও আরো দশটা। তোমার মধ্যে তার মানে ক্ষমতা তথনো বাকি ছিল। তুমি তা জানতে না। ‘মানুষই আসলে তার নিজের সীমাবদ্ধতা নিজে তৈরি করে।’ ‘ওহ! দারুণ।’ মনে মনে ভাবলাম। বললাম, ক’দিন আগে একটা বইতে পড়ছিলাম। গড়ে মানুষ তার মস্তিষ্কের মাত্র মিনিট প্রমান ক্ষমতা ব্যবহার করে। তাহলে বাকি ক্ষমতা বা শক্তি যদি তারা কাবহার করতো, তাহলে কি হতো।’ জুলিয়ন বুঝলো, এবার তার বলার সময় এইসছে। ‘তুমি ‘কাইজেন’ অনুশীলন করো। শরীর ও মনকে তাজা রাখছে চেষ্টা করো। মনকে চাঙ্গা রাখো। যা করতে ভয় পাও তা বেশি করে করো। সূর্যোদয় দেখ। বৃষ্টির জলে ভেজো। স্বপ্নে তুমি যা করতে চাও, যা হতে চাও, তাই করো। এতোদিন মনে মনে যা যা করতে চেয়েছ, অথচ ভেবেছো তুমি সেটা করার পক্ষে কম বয়সী, বেশি বয়সী, বেশি ধনী বা দরিদ্র, সেগুলোর সব করো। অকঝকে, প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর জীবনযাপন করো। প্রাচ্যে বলে, যারা মানসিকভাবে প্রস্তুত, ভাগ্য তাদের প্রতি সুপ্রসন্ন। আমি বলি যারা মানসিকভাবে প্রস্তুত জীবন তাদের প্রতি সুপ্রসন্ন।’ জুলিয়ন বলে চলে, ‘খুঁজে দেখো কি তোমায় পিছে টেনে রাখছে। তুমি কি কথা বলতে ভয় পাও, না কি তোমার ব্যক্তিগত সম্পর্কে সমস্যা আছে? তোমার কি আরো প্রাণশক্তির প্রয়োজন না কি ইতিবাচক চিন্তাধারার? তোমরা দুর্বলতাগুলো সব খাতায় লিখে ফেলো। তৃপ্ত, সন্তুষ্ট মানুষেরা অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি চিন্তাশীল হয়। সময় নিয়ে ভাবো কি এমন আছে

পৃষ্ঠা:৮৩

তোমাকে একটা স্বপ্ন সুন্দর জীবন থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে, যা তুমি তোমার প্রাপ্য বলে মানো। একবার তোমার দুর্বলতা জেনে নেওয়ার পর তার মুখোমুখি হও, ভয়কে জয় করো। সকলের সামনে কথা বলতে সঙ্কোচ হলে, বিশটা বক্তৃতা দেবার জন্য চুক্তিবদ্ধ হও। নতুন ব্যবসা শুরু করতে ভ্যা পেলে, বা দুঃসহ সম্পর্ক থেকে বেরোতে জয় পেলে, এবার তাই করো। বহু বছর পর সত্যিকারের লাগাম ছেঁড়া স্বাধীনতার আস্বাদ ভরে নাও মনে-প্রাণে। ভয় হলো তোমার মস্তিষ্কপ্রসূত এক ভয়ঙ্কর দৈত্য থাকে তুমি নিজে তৈরি করেছো। এ হলো এক নেতিবাচক ‘স্ট্রিম অফ কনশাসনেস’। ‘তুমি বলতে চাও ভয় হলো বহু বছর ধরে আমার মনে চুপিচুপি এসে গেড়ে বসা কিছু কাল্পনিক চরিত্র?’ ‘ঠিক তাই, যতবার ওরা তোমায় কোনো কাজ করতে বাধা দিতে সক্ষম হয়েছে, ততবার ওদের পালে হাওয়া দিয়েছো তুমি। কিন্তু যখন ওদের বাধা তুমি মানবে না, তখন জানবে জীবনটাকে জয় করেছো তুমি।’ ‘একটা উদাহরণ।’ ‘যেন লোকের সামনে ভাষণ দেওয়া। ওকালতি করার সময় দেখেছি বহু অ্যাডভোকেট, বহুভালো ও পোটেনশিয়াল কেস, কোর্টরুমের বাইরে মিটিয়ে দিচ্ছে, শুধুমাত্র নিজের প্রতিপক্ষের সওয়ালের সামনে যোগ্য জবাব দেওয়ার ক্ষমতা নেই বলে।’ ‘হ্যাঁ, এরকম আমিও দেখেছি।’ ‘তোমার কি মনে হয় এই ভয় নিয়েই জরে তারা? ‘হয়তো নয়।’ ‘একটি শিশুকে দেখো। তার মন সম্ভাবনায় ভরপুর। ইতিবাচক চর্চা তাকে মহান করে গড়ে তুলবে। নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তাকে খুব ভালো হলে একটি মধ্যমানের জীবনযাপনে আটকে রাখবে। কোনো অভিজ্ঞতাই; তা সে মাইনে বাড়াতে বলা হোক, সূর্যস্নাত লেকের ধারে হেঁটে বেড়ানো হোক, বা চাঁদের আলোয় ভেসে যাওয়া বিচে বসে থাকা হোক, কোনোটাই আনন্দমুখর বা যন্ত্রণাদায়ক নয়। কিভাবে সেই অভিজ্ঞতাকে তুমি দিচ্ছে, তাই সব। একটা বাচ্চাকে শেখানো হতে পারে আলোকোজ্জ্বল দিন আদতে খুব বিষাদময়। বলা হতে পারে কুকুর ছানা আসলে অত্যন্ত ভয়ঙ্কর এক জন্তু। কোনো প্রাপ্তবয়স্ককে শেখানো যেতে পারে যে ওষুধ হলো আসলে সকল যন্ত্রণা উপশমের একমাত্র পথ। ভয়ের ক্ষেত্রেও তা সত্যি। ভয় হলো জীবনীশক্তি শুষে নেওয়ার, তোমার সৃজনীশক্তি ও মনোবলকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার এক অসাধারণ অস্ত্র। ভয় তার

পৃষ্ঠা:৮৪

নোংরা মাখাটি নিয়ে উকি দিলেই তাকে উড়িয়ে দাও। তা করার সবচেয়ে সহজ পন্থা হলো, যা করতে ভয় হয়, তাই করা। ভয়ের অ্যানাটমিটা বোঝো। এটা তোমারই সৃষ্টি। একে গড়ে তোলা যত সহজ, ভেঙে ফেলা তার চেয়েও সহজ। এতে তোমারা মনে ফিরে পাবে শান্তি, আনন্দ আর প্রবল। আত্মত্মবিশ্বাস।’ ‘কারও জীবন কি সম্পূর্ণ ভরামুক্ত হতে পারে?’ ‘দারুণ প্রশ্ন। উত্তর হলো একটি জোরালো ‘হ্যাঁ,। সিভানার প্রত্যেক যোগীই ছিল নির্ভয়। তাঁদের হাঁটা চলা, তাদের কথা বলা, তাদের চোখের দৃষ্টি, সবেতেই উদ্ভাসিত হয়ে উঠতো সেই নির্ভীকতা। আর আরেকটা কথা তোমায় বলি জন।’ বলো।’ ‘ ‘আজ আমিও ভয়হীন। আজ আমি নিজেকে জেনেছি। আমার স্বাভাবিক অবস্থাতেই যে আমি প্রচুর সম্ভাবনাময় এবং অপরাজেয় শক্তিধর তা আমি জানি। শুধু গত বেশ য়েক বছরের সামঞ্জস্যহীন চিন্তাভাবনা আর আত্ম- অবহেলা আমাকে আটকে রেখেছিলো পিছনে। আরো একটি কথা বলি। তোমার মন থেকে যদি তুমি ভয়কে ঝেড়ে ফেলতে পারে, তবে স্বাস্থ্য সুঠাম হয়ে উঠবে, যৌবনের দীপ্তিতে ভরে যাবে তোমার দেয়া মন।’ ‘সেই শরীর ও মনের পুরনো তত্ত্ব।’ নিজের অজ্ঞতাকে ঢাকার চেষ্টায় বললাম। ‘হ্যাঁ, প্রাচ্যের সাধুরা প্রায় পাঁচ হাজার বছর ধরে এ। তত্ত্ব জানেন ও মানেন। ‘মাত্রই কিছুদিন’ কি বলো? হেসে বললো জুলিয়ন। ‘আরে একটি সূত্র আমার সাথে সেই সাধকেরা ভাগ করে নিয়েছিলেন। মনে হয় তোমার আত্ম নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে তা কাজে আসতে পারে। যখনই আমি সব কাজকে হালকা চালে নিয়েছি, তখনই এই নীতি আমায় প্রেরণা দিয়েছে। সংক্ষিপ্ত করলে যার অর্থ দাঁড়ায় নিষ্ঠা সহকারে যারা নিজেদের। মধ্যে পরিবর্তন এনেছেন তাদের সঙ্গে, যারা কখনোই জ্ঞান আলোকদীপ্ত উজ্জ্বল জীবনযাপন করেনি তাদের মূল প্রার্থক্য হলো, শেষে উল্লেখ্য মানুষেরা যা করতে পছন্দ করেন না, অপর ধরনের লোকেরা তা অবশ্যই করে থাকেন, তা সে যতই অপছন্দের হোক না কেনো। সত্যিকারের জ্ঞানী দীর্ঘস্থায়ী সুখের ও আনন্দের জন্য ক্ষণস্থায়ী আনন্দে বলিদান দিতে পিছপা হন না। তাই তারা তাদের সকল দুর্বলতা ও কয়ের মুখোমুখি হয়ে তা শক্ত হাতে মোকাবিলা করেন। ‘কাইজেন’ এর নীতিতে বেঁচে ওঠার সংকল্প করে তারা নিজের জীবনের প্রতিটা দিককে নিয়ত উন্নত করার প্রচেষ্টায়। সময়ের সাথে, সাথে সব কঠিন কাজ সহজ হয়ে আসে। ভয় দূর হয়ে যায়।’

পৃষ্ঠা:৮৫

‘তাহলে তুমি বলছো, জীবন বদলাবার আগে আমার নিজেকে বদলে ফেলা উচিত?’ ‘হ্যাঁ, আমার ল’কলেজের প্রফেসর আমাকে একটা গল্প বলেছিলেন। সারাদিন অফিসে খাটুনির পর এক বাবা বাড়িতে ফিরে কাগজ পড়ছিলেন। তার ছেলে, বাবার সাথে খেলা করার জন্য খুব বিরক্ত করছিল। অসহ্য হয়ে, পেপারে দেওয়া পৃথিবীর মানচিত্রাটি প্রায় একশো টুকরো করে ফেললেন তিনি। বললেন, ‘এবার সব টুকরোগুলো জোড়া লাগিয়ে যেমন ছিল, ছবিটা তেমন করে দাও’-এই আশায় যে ছেলেটি ওতেই ব্যস্ত হয়ে পড়বে। আর এই ফাঁকে পেপারটা পড়া হয়ে যাবে। কিন্তু আশ্চর্য, ছেলেটি মাত্রা এক মিনিট পরেই ফিরে এলো পুরো মানচিত্রটি সঠিক জায়গায় করে। বিস্মিত বাবা প্রশ্ন করলেন এতো তাড়াতাড়ি সে কিভাবে করলো এই কাজটা। ছেলেটি হেসে উত্তর দিল, মানচিত্রের পিছনে একটি লোকের ছবি ছিল। সেই ছবিটি সঠিকভাবে গুছিয়ে নিতেই, মানচিত্রটি আপনা থেকেই আবার তৈরি হয়ে ‘গল্পটা দারুণ।’ ‘জানো জন। সিভানার সাধক থেকে আমার ল স্কুলের প্রফেসর অবধি যত জ্ঞানী মানুষ দেখেছি, তারা সকলেই আনন্দে থাকার স্কুল ফর্মুলটা জানেন। তোমায় বলেছিলাম, একটা লক্ষ্য নির্ধারণ করে তাকে বাস্তবে পরিণত করার মাধ্যমেই সুখ আসে। যা করতে তুমি সত্যিই তা করার মধ্যে ভালোবাসো, গভীর পরিতৃপ্তি খুঁজে পাবে।’ ‘নিজের পছন্দমতো কাজ করলেই, সারা পৃথিবী জুড়ে অসুখী কেন?’ নুিষ সুখী হয়, তবে এতো মানুষ ‘সঙ্গত পয়েন্ট। ভালোবাসার কাজটি করা, তা সে কাজ কর্ম, রোজগার ছেড়ে অভিনেতা হওয়াই হোক, বা কম প্রয়োজণীয় কাজে সময়ে ব্যয় না করে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজে একাগ্র হয়ে থাকাই হোক, এসব করতে সাহস লাগে। নিজের আরামের, সুখের ক্ষেত্রটি ছেড়ে বেড়িয়ে আসতে হয়। আর পরিবর্তন প্রথম প্রথম সদাই অস্বস্তির। বেশ কিছুটা ঝুঁকির বটে।’ ‘সাহস তৈরি করতে কি লাগে?’ ‘সেই পুরনো গল্প, শরীর মন, চারিত্রিক পঠনের উপর নিয়ন্ত্রণ আনতে পারলেই আনন্দ, আর প্রাচুর্য ম্যাজিকের মতো ছেয়ে ফেলে জীবন। তবে । প্রতিদিন অন্তত দশটা মিনিট নিজের পেছনে, নিজের করে সময় ব্যয় করতে হয়। ‘আর সেই ন’শো পাউন্ড ওজনের, ন’ফুট লম্বা সুমো কুস্তিগির, যোগীর গল্পে কি রূপকে ব্যবহৃত হয়?’

পৃষ্ঠা:৮৬

আমাদের এই বিশালাকার বস্তুটি সতত আত্মপরিবর্ধন ও প্রগতির প্রতীক।’ এই কয়েক ঘণ্টায় জুলিয়ন আমার সবচেয়ে বিশ্বয়কর আর ক্ষমতাশালী এমন সব তথ্যের সাথে পরিচয় ঘটালো যা আমি সারাজীবনেও শুনিনি। আমি নিজের মনের ক্ষমতা ও সম্পদের কথা জানতে পারলাম। জানলাম কোনো বাস্তবসম্মত কলাকৌশলের দ্বারা মনকে শান্ত করতে হয় এবং লক্ষ্যে অটল থাকতে হয়। জানতে পারলাম আত্মিক, ব্যক্তিগত, পেশাগত ও আত্মিক জীবনের সবক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ও লক্ষ্য থাকা কতোটা জরুরি। এবার জানলাম কালোত্তীর্ণ নীতি ‘কাইজেন’, যা নিজের উপর প্রভুত্ব করতে শেখায় সর্বময়। ‘কাইজেন কিভাবে অনুশীলন করতে শেখায়। ‘দশটি অত্যন্ত কার্যকরী নিয়মাবলি জানাবো তোমায় যা আত্মনিয়ন্ত্রণে প্রভৃত সাহায্য করবে। মনে বিশ্বাস রেখে, প্রতিদিন এর ব্যবহারে এক মাসের মধ্যে জীবনে অসাধারণ ফল পাবে। যদি প্রতিদিনের রুটিনে একে সামিল করে নিতে পারো, এমনভাবে যে এটা তোমার অভ্যাস হয়ে যায় তেই জানতে নিখুঁত স্বাস্থ্য, সীমাহীন প্রাণশক্তি, চিরস্থায়ী আনন্দ ও মদের অপার শান্তি ও সবের প্রাপ্তি থেকে তোমাকে কেউ আটকাতে পারবে ব্লাডি তুমি তোমার লক্ষ্যে পৌছবেই। কারণ সেটা তোমার জন্মগত অধিকার BO যোগী রমন অনেক ভরসায়, বিশ্বাসে আমাকে সেই দশটি নিয়ম শিখিয়েছিলেন, যেগুলিকে তিনি বলতেন ‘QUISITNESS’। এবং সেই শক্তির জ্বলন্ত, জীবন্ত উদাহরণ আমি চুকিধু বলবো, যা বলছি মন দিয়ে শোনো, তারপর নিজেই পরখ করে নওি তার গুণ। ‘মাত্র ত্রিশ দিনে জীবন বদলে দেওয়া ফল?’ আমি অবিশ্বাসে প্রশ্ন করি। ‘হ্যাঁ দিনে অন্তত এক ফণ্টা এই তিরিশ দিন তোমাকে এর অনুশীলন করতে হবে। নিজের উপর এটুকু বিনিয়োগ ছাড়া আর কোনো খরচ নেই তোমার। আর দয়া করে বোলো না তোমার হাতে সময় নেই।’ কিন্তু সত্যিই আমার সময় নেই। আমার ওকালতির প্রাকটিস এখন এমন জায়গায় যে দম ফেলার ফুরসৎ নেই। এক ঘণ্টা তো দূর অন্ত।’ ‘সেই যে আমি বলেছিলাম, গাড়ি চালাতে তুমি এতো ব্যস্ত যে গাড়িতে তেল ভরার সময় নেই। এর ফল কিন্তু তোমাকেই ভোগ করতে হবে।’ ‘হ্যাঁ, সত্যি।’ ‘সত্যি?’ ‘ধরো, তুমি একটা প্রায় কোটি টাকা দামের রেসিং কারের মতো। ভালো অয়েলিং করা, দুর্দান্ত মেশিনসম্পন্ন। তোমার মন, এই পৃথিবীতে এক অপার

পৃষ্ঠা:৮৭

বিস্ময় আর শরীর এমন শক্তিধর যে মাঝে মাঝে তা তোমাকেই অবাক করে দেয়।”বেশ।’এই উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন কোটি টাকার মেশিনটিকে প্রতিদিন, প্রতিবার তার চূড়ান্ত ক্ষমতা অবধি নিয়ে যাওয়ার, এবং তার মেশিনটিকে ঠান্ডা হতে না দিয়ে আবার চালানোর কি কোনো যুক্তি আছে?”না, মোটেই নেই।’ ‘তাহলে নিজের জীবন থেকে প্রতিদিন অল্প একটু করে ছুটি নিয়ে, নিজের মনের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কলকব্জা, মোটর মেশিনটাকে সুস্থ রাখছো না কেন? নিজেকে নতুন করে সাজিয়ে তোলার জন্য সময় বের করা আজ তোমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তোমার এই সমছুট রুটিনের মাঝখান থেকে আত্মত্ম-উন্নতি ENRICHMENT, নাটকীয়ভাবে তোমাকে সেই রুটিনমাফিক কাজগুলোই আরও নিখুঁত, আরও কার্যকারীভাবে করতে সাহায্য করবে।’ ‘তিরিশ দিন, দিনে এক ঘণ্টা, এই তো?’ ‘হ্যাঁ, ম্যাজিক ফর্মুলা। আমার অতীতের সেই দিনগুলোত্মোহদি জানতাম এর কথা, তবে বেশ কয়েকলক্ষ ডলার খরচ করে শিখে মেদিরতাম সে সব। তবে তখন ও কি জানতাম, এ জ্ঞানের কোনো মূল্টু ইল্লা না। যেমন পৃথিবীর কোনো শ্রেষ্ঠ জ্ঞানই মূল্য দিয়ে কিনতে হয় না। শুধু মনে বিশ্বাস রেখে, প্রতিদিন নিয়ম করে এর পালন করতে হবে এটা কোনো সাময়িক ডিল নয় যে আজ করলাম, কালই ফল পেস্তাদ্ধ ভিটজলদি কিছু নয় এটা। একবার এসে এসে পড়লে, দীর্ঘস্থায়ী এর মেয়ার্স। ‘তার মানে?’ ‘তিরিশ দিন লেগে যায় একটা কোনো নতুন অভ্যাস গড়ে তুলতে। তিরিশ দিন, এক ঘণ্টা করে, সঠিক পদ্ধতিতে নিয়মের পালন করো। তারপর এটা তোমার রুটিনে এমনভাবে চলে আসবে যে এটা করার কথা আলাদা করে ভাবতে হবে না। তখন রোজই কিছুটা সময় এটায় ব্যয় করো। আর ফল মিলবে হাতে নাতে।’ ‘ভালোই।’ আমি সম্মত হলাম। জুলিয়নের অকালবৃদ্ধ আইনজ্ঞের চেহারায় এই নিয়মের ব্যবহারে যেভাবে যৌবনের দীপ্তি ফিরে এসেছে তা কোনো ম্যাজিকের থেকে কম নয়। মনে মনে ঠিক করলাম এর সব নিয়ম পালন করবো। অন্যকে বদলানোর আগে, নিজের মধ্যে পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে। নিজেকে উন্নত করে তুলতে হবে। হয়তো আমার মধ্যেও আসবে জুলিয়নের মতো বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সেই রাতে, আমার আসবাবে ঠাসা

পৃষ্ঠা:৮৮

বসার ঘরে বসেই শিখলাম সেই দশটি অতি প্রাচীন নিয়ম নীতি ও কৌশল। এর মধ্যে কিছু আমার পক্ষে একটু আয়াসসাধ্য, অন্যগুলো অনায়াসেই করা। যায়। ‘প্রথম নিয়মটি সাধকদের কাছে, ‘নির্জনতা নিঃসঙ্গতার নিয়ম’ নামে পরিচিত। এর অর্থ, প্রতিদিন বাধ্যতামূলকভাবে তোমাকে কিছুটা সময় শুধুমাত্র নিজের সঙ্গে একা কাটাতে হবে, পরম শান্তিতে।’ ‘এই শান্তির ব্যাপারটা কি?’ ‘পনেরো মিনিট হোক বা পঞ্চাশ, প্রতিদিন একা বসে, নিস্তব্ধতার যে ক্ষমতা, তাকে অনুভব করো। জানার চেষ্টা করো, তুমি আসলে কে?’ ‘শরীরের ইঞ্জিনকে একটু বিশ্রাম দেওয়া আর কি।’ ‘বলতে পারো। তুমি কখনো পরিবার নিয়ে দূরে বেড়াতে যাও?’ ‘হ্যাঁ যাই। গরমের সময় সমুদ্রের দিকে জেনির বাবা মা-র কাছে যাই।’ ‘রাজয় কোথাও থামো নিশ্চয়ই।’ ‘হ্যাঁ। যখন গাড়ি চালাতে চালাতে চোখ জুড়িয়ে আসে তখন কোথাও থেমে একটা ছোট ঘুম দিয়ে নিই।’ ‘ধরে নাও, নিঃসঙ্গতার এই নিয়মও তোমার অন্তরাত্মাকে একটু বিশ্রাম দেওয়ার জন্য। নৈঃশব্দের চাদরে কিছুক্ষণের রেখে দেওয়া।”নৈঃশব্দের গুরুত্বটা কি?”ভালো প্রশ্ন। দেখ জন, মন হলো স্বচ্ছ। কটা সরোবরের মতো। আমাদের এই অনন্ত পৃথিবীতে অধিকাংশ মানুষের মনই শান্ত, নিস্তরঙ্গ নয়। সর্বদা মদের মধ্যে চলতে থাকে দ্বন্দ্ব আর উথাল পাথাল করা অশান্তি। এই কিছুটা সময় সব কিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে, নৈঃশব্দ তার নিজের সঙ্গে যদি নিম্নাঙ্গ, শান্তির সময় কাটানো যায়, তবে মন নামক সরোবরের জল শান্ত, স্বাচ্ছ, কাচের মতো হয়ে যায়। অন্তরের এই শাড়ি, নিজের দেহ, মনে, শরীরে এক ভালো থাকার, শান্তিতে থাকার আনন্দে থাকার, প্রাণপ্রাচুর্যে করে থাকার উপলব্ধি এনে দেয়। জীবনের প্রত্যেক কাজে আসে ভারসাম্য। এমনকি ঘুমটাও হয় বড় আরামের ও শান্তির।”এই তোমার শোওয়ার ঘর বা অফিসেও এই কাজটা সারতে পারো। তবে ভালো হয় যদি একটা সুন্দর ও নিস্তব্ধ শান্ত জায়গা খুঁজে বের করতে পারো।’ সুন্দর জায়গা কেন? ‘সুন্দর ছবি, সুন্দর দৃশ্য মনকে আরাম দেয়। এক গুচ্ছ গোলাপ বা একটা ড্যাফোডিল অনেক সময় বিধ্বস্ত মনের ওপর ঠান্ডা একটা প্রলেপ দেয়।

পৃষ্ঠা:৮৯’

শরীর, মন বিল্ডাকসত হয়ে যায়। এমন জায়গাতে বসেই এগুলো করো যেখানে তোমার মন যেতে পছন্দ করবে।’ ‘যেমন তোমর বাড়ির কোনো ফাঁকা ঘর, বা তোমার ফ্ল্যাটের কোনো নির্জন। কোণে, যেখানে তোমার মনের আর আত্মার প্রসার ঘটতে পারে। এমন একটি স্থান, যে তোমার আসার অপেক্ষায় প্রহর গুণবে।”বাহ। শুনতে বেশ ভালো লাগলো। সারাদিনের খাটুনির পর কোনো শান্ত, স্নিগ্ধ জায়গায় বসলে, মনে তার প্রভাব অবশ্যই পড়বে। এখনকার থেকে নিশ্চয়ই অনেক সুন্দর, সুস্থ, স্বাভাবিক মানুষ হয়ে উঠতে পারবো এই আমি। ‘হ্যাঁ এখানে একটা কথা বলি। এই প্রক্রিয়া সেরা ফল পাবে, যদি রোজ একই সময় এই অনুশীলনটা করো। ‘কেন?’কারণ তাতে এটা তোমার রোজের রুটিনে ঢুকে পড়বে আর রোজের একটু একাকিত্বের ডোজ তুমি না নিয়ে পারবে না। ‘আর কিছু?’ ‘যদি আদৌ সম্ভব হয় তাহলে প্রতিদিন অন্তত একবার প্রকৃতির কাছে যেও। একটুখানি গাছপালার মধ্য দিয়ে হাঁটা বা বাড়ির কিচেন গার্ডেনের বা টবের গাছগুলোর কাছে যাওয়া, তাদের যত্ন করায় অন্তর মিনিট কয়েক সময় ব্যয় করলেও তা তোমাকে শান্তি দেবে। এই প্রশান্তির দরজা হয়তো তোমার মধ্যে আছে, কিন্তু লুকানো অবস্থায়। প্রকৃতির সাহচর্যে তোমার সর্বোচ্চ সপ্তার অসীম জ্ঞানভান্ডারের সঙ্গে তোমার মিলন ঘটবে। তোমার মধ্যে থাকা অপরিসীম শক্তির দিকে এই জ্ঞান তোমাকে চালিত করবে।’ ‘তোমার ক্ষেত্রে এ নিয়ম কাজ করেছে, জুলিয়ন?’ ‘সম্পূর্ণভাবে। আমি সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে বিহানা ছাড়ি। চলে যাই আমার প্রশান্তির গোপন স্থানে। সেখানে ‘গোলাপের হৃদয়’ যতক্ষণ ইচ্ছা হয় অনুশীলন করি। কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কখনো কয়েক মিনিট। ফলাফল একই হয়। শরীরে যেন স্ফুর্তির বন্যা বয়ে যায়। মনে আসে গভীরতা ও শান্তির বোধ। এরপর আসি দ্বিতীয় নিয়ম পালনে।’ ‘বেশ ভালো লাগছে। দ্বিতীয়টা কি রকম?’ ‘খুব সহজ। শারীরিক ক্রিয়াকলাপের নিয়ম যে নীতির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, তাকে বলে, তুমি শরীরের যত্ন নাও মানেই তুমি মনের যত্ন নাও। তুমি শরীরকে প্রস্তুত করো মানেই তুমি মনকে প্রস্তুত করো। প্রতিদিন তোমার শরীর নামক মন্দিরটির পুষ্টি বর্ধনের জন্য বেশ কিছুক্ষণ ব্যায়াম করো।

পৃষ্ঠা:৯০

শরীরে রক্ত সঞ্চালনকে নিয়মিত সুস্থ ও সুন্দর রাখো আর শরীরকে রাখো সবল, সতেজ আর সচল। তুমি জানো এক সপ্তাহে ১৬৮ ঘণ্টা আছে?’ ‘হ্যাঁ, মানে এক অর্থে ঠিক সেভাবে নয়।’ ‘ই, অন্তত তার মধ্য থেকে পাঁচটা ঘণ্টা শারীরিক ব্যায়ামে সময় ব্যয় করো। সিভানার সাধকেরা পৌরানিক নীতি মেনে যোগ ব্যায়ামের মাধ্যমে শরীরের প্রবল ক্ষমতাকে জাগিয়ে তুলতেন। আর বেঁচে থাকতেন এক গতিময়, সমর্থ, সুস্থ জীবন যাপনে। এইসব যোগীরা যখন গ্রামের মাঝে মাথায় উপর ভর দিয়ে পুরো শরীরটাকে হাওয়ায় ভাসিয়ে রেখে শীর্ষাসন করে বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখান, তখন সে এক অবর্ণনীয় দৃশ্য। ‘তুমি যোগাসন করার কখনো চেষ্টা করেছো, জুলিয়ন? জেনি গত গ্রীষ্ম থেকে যোগাসন শুরু করেছে। আমায় বলছিল যে একদিনই ওর মনে হচ্ছে যেন শরীরের বয়স পাঁচ বছর কমে গেছে।’ ‘তোমাকে প্রথমেই একটা কথা বলি জন। কোনো একটা জিনিসের মাধ্যমে তুমি কিছুতেই তোমার প্রার্থিত লক্ষ্যে পৌছতে পারবে না। এইসবুক’টি, যা আমি তোমায় শেখাচ্ছি, তার সমন্বয় ঘটলে তবেই তোমার উদ্দেশ্য সফল হবে। তবে যোগাসন তোমার শরীরের সমস্ত প্রাণশক্তির ভাণ্ডারকে উন্মুক্ত করবে। রোজ সকালে আমি যোগাভ্যাস করি। নিজের জন্য যা যা করে থাকি তার মধ্যে এটি সেরা। এ শুধু আমার শরীরে পূর্ণ যৌবনই এনে দেয় না, আমার মনকে কোনো বিষয়ে মনোনিবেশ প্রস্তুতে সাহায্যও করে। আমার সৃজনীশক্তির উন্মেষ ঘটায়। এ এক অস্তপ্তরিণ বিদ্যা।’ ‘এছাড়া কি যোগীরা তাদের শরীরের সূত্র নেওয়ার জন্য আর কিছু করতেন।’ ‘যোগী রমন ও তার গুরুভাই ও বোনেরা বিশ্বাস করতেন যে পাহাড়ের সবুজ বনানীর মধ্যে দিয়ে অথবা চড়াই-উৎরাই দিয়ে দ্রুত হাঁটা শরীরের ক্লান্তি ফিরিয়ে আনে। আবহাওয়া কখনো হাঁটার পক্ষে প্রতিকূল হলে তাঁরা তাদের কুটিরে যোগাভ্যাস করতেন। খাওয়া দাওয়া কখনো সখনো বাদ দিলেও তারা শরীরচর্চা কখনো বাদ দিতেন না।’ ‘কুটিরে কি থাকতো তাদের? নর্ডিক ট্র্যাক মেশিন?’ জানতে চাইলাম। ‘একেবারেই না। কখনো দেখতাম তারা যোগাসন করছেন। কখনো বা হালকা ব্যায়াম বা ডন-বৈঠক করতেন। আমার মনে হয় কি করছেন সেটা তাদের কাছে আদৌ বড় ব্যাপার ছিল না। আসল ছিল, দেহটাকে নানাভাবে চালনা করা এবং চারপাশের তাজা বাতাস ফুসফুসে ভরে নেওয়া।’ ‘ফুসফুসে তাজা বাতাস ভরার প্রয়োজন কি?’ ‘যোগী রমন বলেন, ‘সঠিক প্রশ্বাস গ্রহণ মানে সঠিক জীবনযাপন।’

পৃষ্ঠা ৯১ থেকে  ১০০

পৃষ্ঠা:৯১

‘এটা কি এতো গুরুত্বপূর্ণ?’ অবাক হলাম।’সিভানায় সাধকরা আমাকে সর্বপ্রথম যে পাঠ দিয়েছিলেন তার অন্যতম ছিল, নিজের প্রাণশক্তির পরিমাণ দ্বিগুণ বা ত্রিগুণ করতে গেলে সবচেয়ে জরুরি হলো সঠিক প্রশ্বাস গ্রহণ।”সেটা তো একজন সদ্যজাত শিশুও জানে।’ ‘না, সে অর্থে জানে না। আমরা যেভাবে প্রশ্বাস নিই, তাতে বেঁচে থাকা যায়। কিন্তু তাতে শরীর ও মনের বৃদ্ধি ঘটে না। আমরা বেশিরভাগ মানুষই অগভীরভাবে শ্বাস নিই, আর তার ফলে শরীরকে একেবারে উৎকৃষ্ট পর্যায়ে চালনা করার মতো অক্সিজেন আমাদের শরীরে ঢোকে না। ‘শ্বাস গ্রহণ মনে হচ্ছে বিজ্ঞানের একটা অংশ।’ “হ্যাঁ, তাই। যোগীরা সেভাবেই দেখেন। তারা বলেন, যে যত কার্যকরীভাবে গভীর শ্বাসগ্রহণ করে শরীরে বেশি অক্সিজেন ঢোকাবে, সে তত তার প্রাণশক্তির ভান্ডারকে উন্মুক্ত করতে পারবে। ‘কি করে শুরু করবো?’ ‘দিনে দু-তিন মিনিট গভীর শ্বাস গ্রহণের বিষয়ে একটু ভাবনা ছিঞ্জ করো।’ ‘কি করে বুঝবো। ঠিক প্রশ্বাস গ্রহণ করছি কিনা?’ ‘যদি শ্বাস নিতে গিয়ে পেট ভেতরে ঢুকে যায়, যে, কুষ্ণবে ঠিকমতো হচ্ছে। যোগীগণ বলতেন, পেটের ওপর হাত রেখে যরি রোঝো পেট ভেতর দিকে ঢুকছে শ্বাস নেওয়ার সময়, তাহলে বুঝবে। Banc থেকে শ্বাস গ্রহণ করা হচ্ছে, যা খুব ভালো।’ ‘দারুণ ব্যাপার তো?’  ‘এটা যদি ভালো লেগে থাকে, তবে তৃতীয় সূত্রটা তোমার নিশ্চয়ই আরো ভালো লাগবে।’ ‘সেটা কি?’ ‘উদ্ভাসিত জীবনযাপনের সূত্র, বা সতেজ পুষ্টি প্রদানের নীতি। বিখ্যাত আইনজীবী থাকাকালীন আমি প্যাক করা মাংস, ভাজাবুড়ি আর নানা ধরনের অতিরিক্ত তেল মশলাযুক্ত খাবার খেয়েই থাকতাম। দেশের সেরা রেস্তোরা গুলোতে খাওয়া দাওয়া করতাম ঠিকই, তবে তাতে কোনো পুষ্টিগুণই ছিল না। আমার অতৃপ্তির মূল কারণ যে এটাই, তা তখন বুঝিনি।’ ‘সত্যি তাই।’ ‘হ্যাঁ, নিম্নমানের খাবারের একটা কুপ্রভাব পড়ে আমাদের জীবনে। এ ধরনের খাবার মানসিক ও দৈহিক শক্তি ও উদ্যমকে নিল্লশেষ করে দেয়। মনের স্বচ্ছতা নষ্ট করে আর মন-মেজাজ খারাপ করে দেয়। যোগী রমন বলতেন, ‘দেহকে পুষ্টি জোগালে, মনও পুষ্ট হয়।’

পৃষ্ঠা:৯২

‘তুমি তোমার খাদ্যাভ্যাস নিশ্চয়ই পাল্টে ফেলেছো?”আমূল বদলে ফেলেছি। আর তাতেই আমার চেহারা আর অনুভূতিতেএসেছে বিস্ময়কর পরিবর্তন। আমি সব সময় ভাবতাম আমি বোধহয় কাজের আমার ভাঁজ পড়ে যাওয়া আঙুল দেখে ভাবতাম জরাআমার গ্রাস করছে শুধু অতিরিক্ত কাজের চাপে। সিভানায় গিয়ে জানলাম,আমাকে ক্লান্তির মূল কারণ ছিল, শরীরে লো-অবেক্টনসম্পন্ন জ্বালানী খাদ্য রূপে প্রবেশ করানো।’যৌবন ও উজ্জ্বলতা ধরে রাখতে সিভানায় সাধুরা কি খেতেন?”সজীব খাবার।”মানে?”সজীব, অর্থৎ সেই খাবার যা মৃত নয়।”জুলিয়ন, সজীব খাবারটা কি?”যে খাদ্য মূলত প্রকৃতির রোদ, পানি, বাতাস ও মাটির পারস্পারিক বিক্রিনয়ায় তৈরি-বা নিরামিষ খাবার। তোমার খাবার থালায় যদি টাটক উক্তি, ফল, আর শস্যদানায় ভরপুর থাকে তবে তুমি চিরকাল বেঁচে থাকুকে পাবো।’ ‘সেও কি সম্ভব?’ ‘বেশিরভাগ সাধুরাই কিন্তু সেখানে একশো বছর অতিক্রান্ত করেছেন। এবং তাদেনা চেহারায় খুব দ্রুত চলে যাওয়ার কোনো চিহ্নও নেই। এই তো গত সপ্তাহেই পেপারে পূর্ব চায়নার একটা দ্বীপের কথা পড়ছিলাম। সেখানে সব গবেষকরা ভিড় জমিয়েছেন, কারণ পৃদ্ধিরীর সবচেয়ে বেশি শতবর্ষ পার করা লোকেদের জমায়েত সেখানেই।’ ‘কি জানতে পেরেছে তারা?’ ‘দীর্ঘায়ুর অন্যতম গোপন রহস্য হলো নিরামিষ খাবার খাওয়া।’ ‘কিন্তু এ ধরনের খাবার কি স্বাস্থ্যসম্মত? এর থেকে কি আদৌ প্রয়োজনীয় শক্তী পাওয়া যায়? মনে রেখো জুলিয়ন, আমি এখনও একজন ব্যস্ত আইনজীবী।’ ‘এই খাবারই প্রকৃতির দান। এটি সজীব, প্রাণদায়ী আর দারুণ স্বাস্থ্যকর খাদ্য। এই খাবার খেয়েই মহাযোগী, ঋষিরা হাজার হাজার বছর ধরে বেঁচে থেকেছেন, বেঁচে আছেন। ওরা একে বলেন, ‘সাত্ত্বিক আহার’; অর্থাৎ খাঁটি টাটকা, তাজা আহার। শক্তিদায়ী কি না, সে প্রসঙ্গে বলি, পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী, শক্তিমান প্রাণীরা কিন্তু এই খাবার খেয়েই বেঁচে থাকে। যেমন হাতি, গরিলা ইত্যাদি। পরিলা যে মানুষের চেয়ে ত্রিশগুণ বেশি শক্তিশালী তা কি তুমি জানো?’

পৃষ্ঠা:৯৩

‘এই তথ্যটার জন্য আবারো তোমায় ধন্যবাদ’।’মহাজ্ঞানী সাধুরা মেনে এসেছেন, চরম কিছু নয়, মধ্যপন্থা অবলম্বন করে বেঁচে থাকতে হবে। তুমি যদি মাংস খাওয়া না ছাড়তে পারো, তবে তা খেতেই পারো। কিন্তু মনে রেখো তুমি মাংস বলতে সবসময় মৃত খাবার খাচ্ছো। পারলে তার পরিমাণটাও কমিয়ে দিও। মাংস হজম হওয়া সত্যিই কঠিন। শরীরের বেশিরভাগ শক্তি খরচ হয় আমাদের হজম বা পাচন ক্রিয়ায়। মাংস পাচনে শরীর মূল্যবান শক্তি সঞ্জয় অকারণেই নষ্ট হয়, সালাদ খাওয়ার পর তোমার প্রাণশক্তির মাত্রা আর মাংস খাওয়ার পর তার মাত্রা আলাদাভাবে পরীক্ষা করে দেখো। দুটোর তারতম্য আলাদা। পুরোপুরি নিরামিশাষী হতে না চাইলেও, খাবারের সঙ্গে সালাদ আর তার পর ফল খাওয়া শুরু করো। এতেই তোমার জীবনযাত্রার ধরনের অনেক পরিবর্তন আসবে দেখো।”এটা খুব কঠিন বলে তা মনে হচ্ছে না।’ গত সপ্তাহে জেনি বলছিল, ফিনল্যান্ডে একটা সমীক্ষায় দেখা গেছে যে যারা নতুন নিরামিশায়ী হয়েছেন, তাদের মধ্যে ৩৮ শতাংশ মানুষের মধ্যে স্ফুর্তি, উদ্যম-এর মাত্রা মাত্র সাত মাসেই অনেক বেড়ে গেছে। ওরা অন্যদের থেকে অনেক বেশি সচেতন ও ক্লান্তিহীন বোধ করছেন। খাবারের সঙ্গে সালাদ জামি এবার নিশ্চয়ই নেওয়া শুরু করবো। অবশ্য তোমাকে দেখে ভাবছি, লদিটাকেই দুপুরের খাবার বানিয়ে নিলে কেমন হয়?’ ‘এক মাস করে দেখো, ফল নিজেই টের পাবে।’ ‘সাবুদের জন্য ভালো হলে, আমার জন্যও হবে। আমি কথা দিচ্ছি, এটা নিশ্চয়ই শুরু করবো। আর খুব কঠিনও তো কিছু নয়। রোজ রাতে এই ‘বার-বি-কিউ’ এমনিতেও আর ভালো লাগছে না ইদানীং।’ ‘এই নীতিটা যখন তোমায় পছন্দ করাতে পেরেছি, তখন চতুর্থটা তোমার পছন্দ হবেই।’ ‘তোমার হাত্রের পেয়ালা এখনও খালি।’ ‘চতুর্থ হল ‘বিপুল জ্ঞানের’ নীতি। ‘এটি সেই জ্ঞান যা শক্তি জাতীয় ব্যাপার।? ‘তারচেয়ে অনেক বেশি, জ্ঞান হলো একমাত্র সম্ভাবনাময় ক্ষমতা। ক্ষমতা প্রকাশের জন্য ক্ষমতার প্রয়োগ করতে হয়। অনেকেই জানে কোনো একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বা জীবনে কি করতে হবে। কিন্তু সমস্যা হলো তারা রোজ, নিয়মিতভাবে সেই জ্ঞানের কোনো ব্যবহার করে না। তার স্বপ্নটাকে বাস্তবায়িত করার জন্য, বিপুল জ্ঞানের নীতি, সমগ্র জীবনভর ছাত্র হয়ে থাকতে শেখায়।

পৃষ্ঠা:৯৪

তারচেয়েও বড় কথা, যা শিখলে নিজের জীবনে তার নিয়মিত ব্যবহার করতে শেখায় এই নীভিটি।’এটি কার্যকর করতে সিভানার সাধুরা কি করতেন?’ ‘এটি মান্য করার জন্য তারা বেশ কিছু নিয়ম পালন করতেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণটি ছিলো সবচেয়ে সহজ। তুমি আজ থেকেই শুরু করতে পারো।’ ‘খুব কঠিন নয় নিশ্চয়ই?’ ‘যা তোমায় শেখাচ্ছি, তা তোমার জীবনকে এমন স্তরে নিয়ে যাবে, যা তুমি কখনো ভাবতেও পারোনি। কৃপণতা করো না জন।’ ‘বলো।”তাদের কথা ভাবো, যারা কম্পিউটারে কাজ করে যান অভিরত অথচ তার সার্ভিসিং এর কথা ভাবেন না একবারের জন্যও, কারণ তাদের সময় নেই। কিন্তু মেশিনটি যখন একেবারে ক্রাশ করে যায়, আর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ সার্ভিসিংয়ে থাকে, তখন বসে ভাবেন আগে কেন সময় বের করে একে ‘অর্থাৎ কাজের অগ্রাধিকার?’ ঠিক তাই। সময়ের গণ্ডিতে বাঁধা জীবনযাপন কোরো নয় বরং তোমার হৃদয় আর তোমার বিবেক যা করতে বলে তাই করো মিল, শরীর ও চরিত্রের গঠনে যখন বিনিয়োগ করবে তখন উপলব্ধি করবে তোমার ভেতর থেকে কেউ একজন তোমায় বলে দিচ্ছে কি করলে তুমি সবচেয়ে ভালো ফলপাবে। ঘড়ি ধরে চলা ভুলে গিয়ে, নতুন ীরে নতুন করে বাঁচো, জন।’বুঝলাম, তো সেই নিয়ম কানুনগুলোংকি কি?’ ‘রোজ পড়ো। দিনে অদ্ভুত তিরিশ মিনিট বই পড়ার অভ্যাস গঠন করো। তবে সাবধান, হাতের কাছে যা পাবে তাই পড়বে না। মনের সবুজ বাগানে কি ঢোকাবে আর কি ঢোকাবে না তা বেছে নাও। যা গ্রহণ করছো তা যেন তোমার ও তোমার জীবনের মান উন্নত করবে, সুতরাং মনের বাগানে ভালো কিছু অবশ্যই ঠাঁই দিবে।’ ‘সাধুরা কি পড়তেন?’ ‘দিনের বেশিরভাগ সময়টা ওরা বই পড়েই কাটাতেন। ওরা ওদের পূর্ব যোগী, মহাপুরুষদের লিখে যাওয়া বাণী পাঠ করতেন। দর্শনশাস্ত্রের বই বেশি বেশি পড়তেন। আজও চোখে ভাসে, বাশের চেয়ারে বসে ওরা যে যার মতো অদ্ভুত দেখতে বই হাতে, স্মিত হাসি মাখা ঠোঁটে, বসে বসে পড়ে যাচ্ছেন, সিভানাতে গিয়েই প্রথম জানলাম বই এর কি অসামান্য ক্ষমতা, এবং বিদগ্ধ, জজ্ঞানী মানুষের বই-ই হলো শ্রেষ্ঠ বন্ধু, শ্রেষ্ঠ কলম ও হাতিয়ার।’

পৃষ্ঠা:৯৫

‘হাতে যা ভালো বই পাবো, তা পড়া শুরু করতে হবে, তাই তো?”হ্যাঁ ও আবার না-ও। যত বই পাবে সব পড়ে ফেলতে হবে একথা আমি কখনোই বলবো না, তবে মনে রাখবে কিছু বই আছে অদ গ্রহণের জন্য, কিছু বই চিবিয়ে খাওয়ার জন্য, আর কোনো কোনো বইকে একেবারে গলাধঃকরণ করে নিতে হয়। এতে আরেকটা কথা মনে পড়ে গেল।”তোমার খিদে পেয়েছে।”না, তা নয়, হেসে ফেললো জুলিয়ন। ভালো বই শুধু পড়বে না জন, তার আদ্যোপ্রাপ্ত নিরীক্ষা করবে। ঠিক যেমনভাবে তোমার কোনো বড় মঞ্চেলের কোনো চুক্তিপত্র নিরীক্ষণ করে থাকো। পড়বে, দেখবে, ওর ওপর কাজ করবে, সমীক্ষা করবে, ওরাই একজন হয়ে যাবে। সিজানার যোগীরা বইগুলো বহুবার করে পড়েন, ও সেগুলোকে ঐশ্বরিক শক্তির আঁধার বলে মানেন।”বই পড়া এতো গুরুত্বপূর্ণ?”দিনে মাত্র তিরিশ মিনিট, তোমার জীবনটাকে আমূল পাল্টে দিতে পারে। তোমার মনের যত প্রশ্ন, তার সবের উত্তর রয়েছে ওই ছাপ্পু ঝুঁক্ষরে। তুমি ভাল্যে আইনজীবী হতে চাও বা ভালো বাব্য হতে চাওলা ভালো বন্ধু বা ভালো প্রেমিক, বই-ই তোমাকে নিয়ে যেতে পারে, সবরীতার চূড়ায়। জীবনে যা যা ভুল তুমি করেছ, বই ই তোমাকে জানায়ক তা তোমার আগে এই পৃথিবীর পথে যারা হেঁটেছে, তারাও করে গেছে। লেছে। তোমার তোমার কি মনে হয়, যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি তোমায় হতে হচ্ছে তা শুধু একা তোমার ক্ষেত্রেই ঘটেছে?”তোমার কথা বুঝতে পারছি। তবে এভাবে আগে কখনো ভাবিনি। জানি তুমি ঠিক বলছো।”যা যা সমস্যায় চিরকাল মানুষকে পড়তে হয়েছে বা হবে, তা বহুদিন আগেই তৈরি হয়ে গেছে। সবের উত্তর, সবের সমাধান রয়েছে বই এর পাতায় পাতায়। সঠিক বই পড়ো। জানো তোমার আগে যারা তোমার মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন তারা তার সমাধান কিভাবে করেছিলেন। তাদের পদ্ধতি অনুসরণকরো। দেখবে জীবনে কতো তাড়াতাড়ি সফলকাম হও।’সঠিক বই বলতে কী বই বোঝাতে চাইছো?”সেটা তোমার শুভবুদ্ধির উপরেই ছাড়তে চাইবো। তবে প্রাচ্য থেকে ফেরার পর থেকে আমি আমার শ্রদ্ধার মানুষগুলোর জীবনী পড়েই কাটাচ্ছি।’ ‘কোনো বই এর নাম বলতে পারে?’

পৃষ্ঠা:৯৬

‘নিশ্চয়ই। বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের জীবনী তোমার দারুণ লাগবে। মহাত্মা গান্ধীর আত্মত্মজীবনী ‘দি স্টোরি অফ মাই একসপেরিমেন্টেস উইথ ট্রুথ’ তোমায় উদ্বুদ্ধ করবে। হারমেন হেস রচিত ‘সিদ্ধার্থ’, বা মার্কাস অরেলিয়াসের বাস্তবমুখী দর্শন, আর সেনেকার কিছু লেখা, এগুলো ভালো লাগবে। নেপোলিয়ন হিল এর ‘থিঙ্ক অ্যান্ড গ্রো রিচ’ ও পড়তে পারো। গত সপ্তাহেই পড়লাম। বেশ জোরালো এবং ভালো বই। বিশ্বসেরা বই ‘থিঙ্ক অ্যান্ড গ্রো রিচ!’ ও ‘নেপোলিয়ন হিল’-এর আরেকটি বিশ্বখ্যাত আত্মউন্নয়ণ গ্রন্থ হলো, ‘থার্টিন কি টু সাকসেস’। এই বইটিও তোমার জীবনকে আমূল পাল্টে দেয়ার মতো একটি বই।  অনেক দূরে চলে এসেছো। আমি কিন্তু সত্যিই ‘সম্ভার ওই সব চটজলদি টাকা বানানোর পদ্ধতি সম্বলিত বইগুলোর ব্যাপারে ‘সিক অ্যান্ড টায়ার্ড’। দুর্বল মানুষের ওপর ওই সাপের তেল বেচা সেলসম্যানদের এসব জ্ঞান বিতরণ দেখলে আমার অসহ্য লাগে। ‘শান্ত হও জন, শান্ত হও। আমি কিন্তু এ ব্যাপারে একমত হতে পারছি না।’ জুলিয়ান ধীর, স্থির ঠাকুর্দার মতো বলে উঠলো। ‘যে রইচার কথা আমি বলছি তাতে প্রচুর টাকা তৈরির গল্প বলা নেই, তবে স্বীরন তৈরির গল্প অবশ্যই আছে। আমিই বোধহয় প্রথম যে তোমাকে বলছি, যে ভালো থাকা আর ভালো টাকা থাকার মধ্যে বিস্তর ফারাক জাছের ওই জীবন আমি কাটিয়েছি, আর টাকা চালিত জীবন যে কতো যুগার তাও আমি জানি। ‘থিঙ্ক অ্যান্ড গ্রো রিচ’ এর প্রাচুর্যের আলোচনা করা হয়েছে। এমনকি আধ্যাত্মিক প্রাচুর্যের আলোচনাও সেখানে আছে। বইটা পড়লে তুমি উপকৃত হবে। তবে এ বিষয়ে তোমার জোরাজুরি করবো না।’ ‘দুঃখিত জুলিয়ন। তবে আমি ঠিক একজন আক্রমনাত্মক আইনজীবীর মতো কথা বলতে চাইনি। আজকাল মাঝে-মধ্যেই মেজাজ হারাচ্ছি। এই একটা দিকেও আমাকে উন্নতি করতে হবে। তোমাকে এই প্রশিক্ষণ এর জন্য আমি কৃতজ্ঞ জুলিয়ন।”চিন্তা করো না। সব ঠিক আছে। আমার মূল বক্তব্য হলো পড়ো আর পড়ে যাও। আরেকটা দারুণ ব্যাপার জানতে চাও কি?’ ‘কী?”কথাটা এটা নয় যে বই এর থেকে কী এমন পাবে যা তোমাকে সমৃদ্ধ করবে -কথাটা হলো বই তোমার থেকে এমন কিছু পাবে যা তোমার জীবনকে বদলে দেবে। আসলে কি জানো, বই আমাদের নতুন কিছু শেখায় না।’

পৃষ্ঠা:৯৭

‘তাই নাকি?’ ‘তোমার ভেতরে, সত্তার অন্দরে যা আগে থেকেই আছে, বই শুধু তাকে দেখতে তোমায় সাহায্য করে। সেটাই জ্ঞানের আলো। এতো অভিযান আর অনুসন্ধানের পর দেখলাম যে আমি আসলে আমার বৃত্তটাকেই সম্পূর্ণ করলাম, যা আমি সেই কোনো ছেলেবেলায় শুরু করেছিলাম। তবে হ্যাঁ, আজ আমি ঝ্যানি আমি কী বা আমি কী হতে পারি।’ ‘তাহলে ‘জানের প্রাচুর্য’ এই নীতির মূল কথা হলো পড়া, আর তথ্যভান্ডারকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে অনুসন্ধান করা।’ ‘কিছুটা ভাই। আপাতত তিরিশ মিনিট করে দিনে পড়তে থাকো। বাকিটা আপনা থেকেই হয়ে যাবে।’ ‘সেটি হলো, ব্যক্তিগত চিন্তনের প্রতিফলনের নীতি। যোগীরা আত্মচিন্তনের ক্ষমতায় গভীরভাবে বিশ্বাসী। নিজেকে জানতে গেলে তোমার ভিতরের এমন একটি দিক তোমার সামনে বেড়িয়ে আসবে, যার অস্তিত্ব তুমি, এর আগে টেকও পাওনি।’ ‘খুব গভীর তত্ত্ব।’ ‘খুব বাস্তবসম্মত বারণা। আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে রয়েছে বহু সুপ্ত প্রতিভা। সেটা সম্পর্কে জানতে চাওয়া, আসলে তাকে প্রজ্জ্বলিত করা। তবে নীরব চিত্তনে এর চেয়ে অনেক বেশিই পাওয়া হয়। এর মাধ্যমে তুমি আরো শক্তিশালী, জ্ঞানী ও নিজের প্রতি আয়ো জাগরণ বিশেষ ফল দেয়।’ ‘ধোঁয়াশা এখনও কাটালো না। জ হয়ে উঠবে। মনের এই ‘হতেই পারে। প্রথম শুনে আমারও খুব অদ্ভুত লেগেছিল। মোদ্দা কথা হলো, ব্যক্তিগত চিন্তনের প্রতিফলন আসলে চিন্তা করার অভ্যাস তৈরি করাকেই বলে।’ ‘আমরা তো সকলেই চিন্তা করি। মানুষ মাত্রেই চিন্তাশীল।’ ‘তা বটে। চিন্ন সকলেই করি। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ ততটুকুই চিন্তু করে যতটা বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন। আমি যে নীতির কথা বলছি তা আসলে বেড়ে ওঠার জন্য চিন্তা করা। বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের জীবনী পড়ার সময় এ কথার অর্থ বুঝবে। সারাদিনের কাজ কর্ম সেরে উনি নিজের বাড়ির এক নির্জন কোনে বসে বসে সারাদিন কি করেছেন তা ভাবতেন। ভালো কি করেছেন, খারাপ কি করেছেন, আর খারাপটাকে কিভাবে শোধরানো যায় ভাবতেন সেসব কিন্তু। ভুল যা করেছেন তা যেহেতু জানতে বা বুঝতে পারতেন তাই নিজের উপর তৈরি হতো প্রভুত্ব। যোগীরাও তাই করে

পৃষ্ঠা:৯৮

থাকেন। সিভানার যোগীরা দিনের শেষে সুগন্ধী গোলাপের পাপড়ি বিছানা ঘরে বসে সারাদিনের কাজের হিসেব দিতেন নিজেকে। যোগী রমনের তো সারাদিনের কাজ লিখে রাখার খাতা ছিল একটা।’ কি লিখতেন তাতে? ‘সারাদিনে কি করলেন, নিজের জন্য কি করলেন, অন্য যোগীদের সঙ্গে কি কথা বললেন, কখন জঙ্গলে গেলেন কাঠ আর খাবারের খোঁজে, এমন কি কোনোসময় মনে কি কি চিন্তা এসেছিল লিখে রাখতেন তাও।’ ‘সেসব মনে রাখতেন কি করে? আমি তো পাঁচ মিনিট আগে কি ভেবেছি তাই মনে থাকে না, বারো ঘণ্টা আগের চিন্তার তো প্রশ্নই নেই।’ নিয়মিত অভ্যাস একবার শুরু করলে সব পারবে। আমি যা ফল পেয়েছি। জন, তা যে কেউ পেতে পারে, যে কেউ। তবে মুশকিল হলো বেশিরভাগ। মানুষই একটা ভয়ঙ্কর রোগে আক্রান্ত, অজুহাত। ‘এই রোগে আমিও আক্রান্ত হয়েছি অতীতে।’ জেনে বুঝেই উত্তর দিলাম। “এবার সেটা ছাড়ো আর কাজ করো।’ অত্যন্ত জোরালো হয়ে উ বললো জুলিয়ান। ‘কি কাজ?’ চিজ করার সময় বের করো। নিজেকে পরীক্ষা করার, অিনুসন্ধান করার কাজ নিয়মিত করে যাও। যোগী রমন যা যা করেছেন। আর যা করবেন বলে ভেবেছিলেন তা একটি কলামে লিখতেন, ধীরপর তার মূল্যায়ন লিখতেন। আরেকটি কলামে। চিন্ত আর কাজ যেহেতু লেখা থাকতো চোখের সামনে, তাই তা নিয়ে বসে ভাবতেন কাজটা এক্টিভাটা ইতিবাচক কি না? যদি তাই হয়, তবে তার পিছনে মূল্যবান সময় ব্যয় করতেন। কারণ তা ভবিষ্যতে অনেক লভ্যাংশ দেবে।”আর নেতিবাচক হলে?’ ‘তাহলে যত শীঘ্রসম্ভব তা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতেন।’ ‘একটা উদাহরণ।’ ‘ব্যক্তিগত চলবে?’ ‘অবশ্যই, আমিও সেইটাই চাইছিলাম।’ দু’জনেই হেসে উঠলাম। চিরকাল তো তোমার মতই প্রাধান্য পেয়েছে। ‘ঠিক আছে। একটা কাগজ নাও। আজ সারাদিনে যা করেছো, সব লিখে ফেলো।’ বহু বছরে এই প্রথমবার আমি কি করেছি আর কি ভেবেছি তা নিয়ে চিন্তা করার সময় বের করলাম। খুব অদ্ভুত, কিন্তু বুদ্ধিসম্পন্ন। নিজেকে বদলাতে ‘কোথা থেকে শুরু করবো?’ প্রশ্ন করলাম।

পৃষ্ঠা:৯৯

‘কাল থেকে সারা দিনের দিকে এগোও। শুধু মূল পয়েন্টগুলো লেখো। এখন যোগী রমনের গল্পের অনেক কথা বলা বাকি।’ ‘ঠিক আছে। সাড়ে ছটায় উঠেছি, যান্ত্রিক মোরগের ডাকে।’ মজা করে বললাম। ‘সিরিয়াস হও আর এগোও।’ বকুনি খেলাম। ‘তারপর দাড়ি কাটলাম, স্নান করলাম। নাকে-মুখে কিছু খাবার গুঁজে, কাজে দৌড়ালাম। ‘আর তোমার পরিবার? ‘তারা তখন ঘুমে অচেতন। অফিস গিয়ে দেখলাম আমার সাড়ে সাতটার অ্যাপয়েন্টমেন্ট সাতটা থেকে আমার জন্য অপেক্ষমান মন্ডেলরা। প্রচণ্ড রেগে ছিল সে।’ ‘তুমি কি করলে।’ ‘আমিও রাগ দেখালাম। চুপ করে সহ্য করবো না কি?’ “হুকুম। তারপর?’ ‘খারাপ থেকে আরও খারাপের দিকে গেল ঘটনাপ্রবাহ। কৌটা হাউস থেকে খবর এলো বিচারপতি ওয়াইন্ডাবেস্ট দশ মিনিটের (মন্টে আমাকে যেতে বলেছেন। মনে আছে তো তার কথা। যাকে তুমি ওয়াইল্ড বিস্ট’ নাম দিয়েছিলে। সেই যে তোমাকে আদালত অবমাননার দায়ে ফেলেছিল, তুমি তার গাড়ি রাখার জায়গায় ভুল করে তোমার জেরারি গাড়ি রেখেছিলে বলে।’ হাসিতে ফেটে পড়লাম আমি। ‘এই কথাটা তোমায় তো তুলতেই হবে ভাই না? ঈষৎ দুষ্টুমি খেলে গেলো জুলিয়নের চোখে। ‘দৌড়ালাম কোর্ট হাউসে। সেখানে এক কেরাণীর সঙ্গে আরও একচোট আমেলা হলো। কাজ সেরে যখন ফিরলাম, তখন আমার ফোনে সাত্যশটা ম্যাসেজ। সবই ‘অত্যন্ত জরুরি’। আরো বলবো?” ‘মাঝে গাড়িতে জেনির ফোন এলো, ওর মার বাড়ি থেকে তার হাতে তৈরি বিখ্যাত কুকিজ (পাই) তুলে নেওয়ার জন্য। কিন্তু তখন আমি ভয়ানক এক ট্রাফিক জ্যামের মধ্যে আটকে আছি। এমন জ্যাম আমি কখনো দেখিনি। বাইরে ৯৫ ডিগ্রি গরম, আর আমি টেনশনে হট হয়ে আছি, কারণ সবসময় মনে হচ্ছে হাত থেকে সময় বেড়িয়ে যাচ্ছে অবারিত।’ ‘কি করলে তখন তুমি?’ ট্রাফিককে শাপ-শাপান্ত করলাম। গাড়িতে বসে বসে আসলে চেচাচ্ছিলাম। কি বলছিলাম তা বলবো?’

পৃষ্ঠা:১০০

‘না, ওগুলো আমার মনের সবুজ বাগানটাকে কোনোভাবে পুষ্টি দেবে বলে মনে হয় না, সুতরাং থাক।।’ ‘না, কিন্তু, সারের কাজে আসতে পারে।’ ‘না, ধন্যবাদ। এখানেই বোধ হয় থাম্য উচিত। এবার পিছন ফিরে ভাবো এর মধ্যে কিছু জিনিস তুমি অন্যভাবেও করতে পারতে সুযোগ পেলে।’ ‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।’ ‘যেমন?’ ‘প্রথমত। আরও সকালে উঠতে পারতাম। ঘুম থেকে উঠেই অতো তাড়াহুড়ো না করে, সকালটা উপভোগ করতে করতে কাজ করা অনেক ভালো। তারপর তুমি যেমন শেখালে ‘গোলাপের হৃদয়’। সেটা অনুশীলন করতে পারতাম। সকালের জল খাবারটা পরিবারের সঙ্গে বসে খেতে পারতাম। ওদের তো একদম সময়ই দিতে পারি না।’ ‘কিন্তু এতো নিখুঁত পৃথিবী তোমার, একটা খুব সুন্দর জীবন আছে। দিনগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা আছে তোমার। ভালো কিছু ব্লিচ্ছন্ন করার ক্ষমতা আছে। স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা আছে।’ গলাটা উচুতে উঠল জুলিয়নের। ‘আমি বুঝতে পারছি, সত্যিই অনুভব করতে পারছি।’ ‘দারুণ। চালিয়ে যাও, তোমার চিন্তু ‘আমি আমার মক্কেলের উপর না চেঁচালেও পারতাম। বা সেই কেরাণীর ওপর। ট্রাফিকের উপরেও চিৎকার করারও দরকার ছিল না।’ ট্রাফিতের তাতে কিছু যায় আসে না, তাইনা?’ ট্রাফিক তো তার মতোই চলছিল। ‘এবার বুঝতে শুরু করবে এই আত্মত্মচিন্তনের নীতির গুণ। সারাদিনে কি করেছো, কী ভেবেছো এসব ফিরে দেখা মানে উন্নতি করার একটা মাপকাঠি তৈরি করা। আগামী কালকে সুন্দর করার একমাত্র পথ হলো আজকের ভুলগুলো জেনে শুধরে নেওয়া।’ ‘আর এমন ভুল যাতে আর না হয় তা খেয়াল রাখা।’ ‘ঠিক তাই, ভুল করার মধ্যে কোনো ভুল নেই। জীবনের বেড়ে ওঠার একটি অঙ্গ হলো ভুল। এটা অনেকটা সেই প্রবাদের মতো, যা বলে ‘সুখ আসে উত্তম বিচারের মাধ্যমে, উত্তম বিচার আসে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আর অভিজ্ঞতা আসে খারাপ বা অধম বিচারের মাধ্যমে।’ তবে একই স্কুল বারবার কবে যাওয়া মারাত্মক অন্যায়। এটা প্রমান করে আত্ম উপলব্ধির অভাব, যা পশুর চেয়ে মানুষকে আলাদা করে রেখেছে। একটা কুকুর, পাখি, বা একটা বাঁদর এটা করতে পারে না। কিন্তু মানুষ পারে, তুমিও পারো। এই হলো

পৃষ্ঠা ১০১ থেকে  ১১০

পৃষ্ঠা:১০১

আত্মচিন্তন ও প্রতিফলনের নীতি। সারাদিনের ভুলগুলোকে জানে আর তার সঙ্গে সঙ্গে শুধরে ফেলো নিজেকে।’ এই প্রবাদটা আগে কখনো শুনিনি। আসলে, অনেক বিষয়েই ভাবার আছে, অনেক অনেক বিষয়ে ‘ ‘তাহলে চলো ঘষ্ঠ নীতি, অর্থাৎ ‘উদ্ভাসিত জীবন বা ভোরে লাগার নীতি’ সম্পর্কে জানি। ‘আহ! হা। আমি কিছুটা আন্দাজ করতে পারছি।’ ‘জীবনের সেরা উপদেশ পেয়েছিলাম আমি সেই সুদূর প্রাচ্যের মরূদ্যান, সিভানা অঞ্চলে। জেনেছিলাম, সূর্যের সাথে সাথে উঠতে হয় আর সুন্দর করে দিন শুরু করতে হয়। বেশিরভাগ মানুষই প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ঘুমোয়। ছ’ঘণ্টা ঘুমানো স্বাস্থ্যের পক্ষে যথেষ্ট। ঘুমানো আসলে একটা অভ্যাস, অন্যান্য অভ্যাসের মতো একেও বদলে ফেলা যায়। অর্থাৎ কম ঘুমিয়ে সেই একই ফল পাওয়া সম্ভব।’ ‘তবে খুব ভোরে উঠলে, আমার খুব ক্লান্ত লাগে।’ ‘প্রথম কিছুদিন ক্লান্ত লাগেই, এটা মেনে নিচ্ছি আমি। প্রায়ন কি পুরো সপ্তাহটাও লাগতে পারে। তবে দীর্ঘস্থায়ী আনন্দ পেতে ঘনে করো এ হলো স্বল্পমেয়াদি ছোট একটু কষ্ট। নতুন অভ্যাস গড়ে তুলতে প্রথম প্রথম কষ্ট হবেই। অস্বপ্তি হবেই। এ হলো অনেকটা নতুন বারতা পরার মতো। প্রথম প্রথম বেশ শক্ত লাগে, পরে ঠিক হয়ে যায় তোমায় আগেই বলেছি যন্ত্রণা হলো আত্মবৃদ্ধির দিকে একটি গুরুত্বপুর্ণ পদক্ষেপ। ভয় পেও না। বরং আলিঙ্গন করে নাও ভয়কে, ভয়কে জয় করে নিতে শিখবে যেদিন সেদিনই আসবে চূড়ান্ত সাফল্য।’ ‘তাড়াতাড়ি ওঠার ব্যাপার নিজেকে প্রতিক্ষণ দেওয়ার ব্যাপারটা তো বুঝলাম। কিন্তু ‘তাড়াতাড়ি’ মানে কি?’ ‘আরেকটি খুব ভালো প্রশ্ন, কোনো বাধাধরা সময় নেই। এতোক্ষণ তোমাকে যেমন বলে এসেছি, তোমার কাজ, তোমার জীবন, তুমি যেভাবে চাইবে যা ভালো বুঝবে, তাই করবে। তবে যোগী রমনের কথা মনে রেখো। কোনো চরম কিছু নয়, মধ্যপন্থায় চলতে হবে।’ ‘কিন্তু সূর্যের সঙ্গে ওঠাটা বেশ চরমপনি ব্যাপার।’ ‘আদপেও তা নয়। প্রথম সূর্যরশ্মিকে গায়ে মেখে ঘুম থেকে উঠার মতো স্বাভাবিক জিনিস কমই আছে। যোগীরা বিশ্বাস করেন সূর্যরশ্মি ঈশ্বরের উপহার। সূর্যালোকে বেশিক্ষণ থাকার ব্যাপারে সতর্ক হলেও, ভোরের আলো গায়ে মেখে আমি তাদের খেলাচ্ছলে নৃত্য করতেও দেখেছি। তাদের অসামান্য দীর্ঘায়ুর এটি আরো একটি চাবিকাঠি বলে আমার দৃঢ় ধারণা।’

পৃষ্ঠা:১০২

‘তুমি সূর্যস্নান করো?’ জিজ্ঞেস করলাম। ‘অবশ্যই। সূর্যরশ্যি আমাকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে। মন খারাপ থাকলে, ক্লান্ত থাকলে, আমাকে তরতাজা করে তোলে। প্রাচ্যে সূর্যের সঙ্গে আত্মার যোগ আছে বলে মনে করা হতো। মানুষ তার পূজা করতো, কারণ তারা মানতো যে সূর্যালোক তাদের মনের উৎসাহ ও ফসলের শ্রীবৃদ্ধি করে। উপযুক্ত মাত্রায় ভোরের আলো গ্রহণ করলে তা তোমার চিকিৎসকের কাজ করবে। যাই হোক, আমি আমার বক্তব্য থেকে সরে এসেছিলাম। বক্তব্য ছিল রোজ ভোরবেলা ঘুম থকে উঠা।’ ‘হুমম। কিন্তু এ অভ্যেস গড়ে তুলবো কি করে?’ ‘কয়েকটি চটজলদি সহজ উপায় বলি তোমায়। প্রথমত-জানবে ঘুমের পরিমাণ নয়, গুণগত মানই গুরুত্বপূর্ণ। দশঘণ্টা একটা বিঘ্নিত ঘুমের চেয়ে, ছয়ঘণ্টা নির্বিঘ্ন, নিশ্চিন্ত ঘুম অনেক বেশি কার্যকরী। প্রতিদিন মানসিক ও শারীরিক কাজের চাপে স্বাস্থ্যের যে স্বাভাবিক অবস্থা ক্ষতিগ্রন্ত হয়, তাকে পুনরুদ্ধার করার জন্য ঘুমের প্রয়োজন হয়। তাই ঘুমের পরিমাসের থেকে ঘুমের মানই যে বেশি অরুরি তার ওপর ভিত্তি করে যোগীরা তাদের অভ্যাস গড়ে তুলেছিলেন। যেমন, রাত আটটার পর যোগী রতুল আর কিছু খেতেন না। কারণ বেশি রাতে খেলে তার পাচনক্রিজ বিব্রত করে। আরেকটি অভ্যাস হলো ঘুমের ঠিক আগে তারা তাদের এরে বসে বীণার সুমিষ্ট ফানি শুনে তারপর শুতে যেতেন।”এর পিছনে কি কারণ?’ ‘তুমি শুতে যাওয়ার আগে কি ‘আমার চেনাজানা বেশিরভাগ লোকই যা করে, জেনির সঙ্গে বসে খবর দেখি, টিভিতে।’ ‘আমি ঠিক এটাই ভাবছিলাম।’ রহস্যময় চোখে বললো জুলিয়ন। ‘ঘুমের আগে খবর শুনো কি এমন কয়ঙ্কর খারাপ কাজ?’ ‘ঘুমের আগের ও ঘুম থেকে ওঠার পরের দশ মিনিট তোমার অবচেতনে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই এ সময় দুটিতে মনে প্রেরণা দেয়, বা মন প্রশান্ত করে এমন কিছু ভাবনা প্রোগ্রাম করে নেবে।’ ‘তুমি তো কম্পিউটারের ভাষায় কথা বলছো।’ ‘সেটাই এক্ষেত্রে সঠিক। অর্থাৎ মনে তুমি যা ইনপুট করবে না ঢোকাবে, তাই আউটপুট পাবে বা ফেরৎ পাবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এখানে একমাত্র তুমিই প্রোগ্রামার। ভেতরে কি পাঠাচ্ছো তা নির্ধারণ করার সাথেই।

পৃষ্ঠা:১০৩

কি পেতে পারো তাও তুমি জেনে যাচ্ছ। তাই ঘুমোতে যাওয়ার আগে খবর। কারও সাথে ঝগড়া করো না, বা সারাদিনে কি করলে মনে মনে তাও ভেবো ना। হাত-পা টানটান করে, রিল্যাক্সড করো। পারলে এক কাপ ভেষজ চাও খাও। হালকা কিছু শাস্ত্রীয় সঙ্গীত আর গভীর ও সুন্দর একটা ঘুমের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করো।’ ‘এটা মেনে নিলাম। যত ভালো ঘুম, তত কম তার প্রয়োজন।’ ‘আর প্রাচীন একুশ নিয়মের কথা মনে আছে তো? একুশদিন একনাগাড়ে অনুশীলন করে গেলে, তা অভ্যাসে পরিণত হবে। তাই একুশ দিনের আগে, অস্বস্তি হলেও, কষ্ট হলেও ভোরে ওঠা ত্যাগ করো না। দেখবে সাড়ে পাঁচটা বা পাঁচটায় ওঠাও তোমার সহজেই রপ্ত হয়ে যাবে। ‘ঠিক আছে, উঠলাম না হয় সাড়ে পাঁচটায়। তারপর কি করবো?’ ‘তোমার প্রশ্ন বলে দিচ্ছে, তুমি ভাবনা চিন্তা শুরু করেছো। খুব ভালো। একবার ঘুম থেকে উঠে পড়লে প্রচুর কাজ আছে করার। মুল কথা মাথায় রাখবে যে দিনের শুরুটা সুন্দর করতে হবে। প্রথম দশ মিনিটের কাজের যে প্রভাব তা তো আগেই বলেছি। ইতিবাচক চিন্তা করো জীবনে যা পেয়েছ, যা পাচ্ছো তার জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করো। কাকে ধন্যবাদ দেবে, তার একটা তালিকা তৈরি করো। সুন্দর কিছু সঙ্গীচ্ছ শোনো বা প্রকৃতির মাঝে কিছুক্ষণ হেঁটে এসো। যোগীরা তো ভোরে উঠে, নিজেদের জোরে জোরে হাসাতেন। হাসতে ইচ্ছে হোক বা না হোক, ভোরের ‘আনন্দ রস’ আহরণ করার জন্যে করতেন সেটা।’ 00’আপ্রাণ চেষ্টা করছি আমার পেয়ালা খালি রাখার। ছাত্র হিসেবে আমি যে ভালোই তা নিশ্চয়ই মানবে। তবে এই জোর করে হাস্য ব্যাপারটা বড় অদ্ভুত মনে হচ্ছে।’ ‘আসলে কিন্তু অদ্ভুত নয়। ভাবো তো একটা চার বছরের বাচ্চা দিনে ক’বার হাসে?’ ‘কে জানে?’ ‘আমি জানি। তিনশো বার। আর একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ গড়ে কতোবার হাসে?’ ‘পঞ্চাশ?’ একটা চেষ্টা করলাম। ‘পনেরো। এবার বুঝেছো? আত্মার ওষুধ হলো এই হাসি। ইচ্ছে না করলেও আয়নায় নিজেকে দেখো, দুবার জোরে হাসো। ভালো না লেগে যাবে না। উইলিয়াম জোন্স বলতেন, ‘আমরা আনন্দিত বলে আমরা হাসি না, আমরা

পৃষ্ঠা:১০৪

হাসি বলে আমরা আনন্দিত।’ তাহলে শুরু করে দাও। হাসো, খেলো আর যা পেয়েছো তার জন্য ধন্যবাদ জানাও। প্রতিদিন সুন্দর হয়ে উঠবে।’ ‘তুমি দিন কিভাবে শুরু করো?’ ‘আসলে আমি বেশ একটা সুন্দর রুটিন করে ফেলেছি। সকালে ‘গোলাপের হৃদয়’ অনুশীলন করি, তারপর টাটকা ফলের রস খাই এক গ্লাস। তবে একটা বিশেষ জিনিস তোমার সাথে ভাগ করে নিতে চাই।’ ‘মনে হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ।’ ‘ঘুম থেকে উঠে কোনো শান্ত, নির্জন জায়গায় যাও। নিজেকে প্রশ্ন করো, আজই যদি আমার জীবনের শেষ দিন হয়, তবে কি কি কাজ করা উচিত?’ মনে, মনে তালিকা বানিয়ে ফেল, কি কাজ সেরে ফেলতে চাও তার। তালিকা বানাও কাদের সঙ্গে কথা বলে নিতে চাও, আর কোন মুহূর্তগুলোকে উপভোগ করে নিতে চাও শেষবারের মতো। সেই কাজগুলো মন-প্রাণ দিয়ে করে যাচ্ছ, এমন দৃশ্য দেখ মনে মনে ভাবো, মনশ্চক্ষে দেখে, তোমার বন্ধুবান্ধব, পরিবার তাদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করছো তুমি। এমন কি অচেনাদের সঙ্গেও বা কেমন ব্যবহার করতে, তাও মনের চোখে দেখে নাও। আগেই বলেছিলাম, প্রতিটা দিনকে যদি জীবনের বাঁচো, দেখবে জীবনে কতো যাদু আছে!’ বলে ভেবে নিয়ে ‘এবার সপ্তম উদ্ভাসিত জীবনের নীতি। ‘সঙ্গীতের ব্যবহার’।’ ‘এটা নিশ্চয়ই আমার ভালো লাগবে।’ বলা বললাম আমি। ‘নিশ্চয়ই লাগবে। যোগীরা সঙ্গীতের গুজারী। সঙ্গীত তাদের আত্মিক প্রেরণা জোগাতো। সঙ্গীতের সঙ্গে তারা হাসতেন, গাইতেন, নৃত্য করতেন। সঙ্গীত তোমার জন্যও তাই করবে। সঙ্গীতের ক্ষমতা অপরিসীম। প্রতিদিন ওর সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাও। অন্তত কাজে যাবার সময় গাড়িতে একটা ক্যাসেট প্লেয়ার চালিয়ে দিয়েই হোক। মন খারাপ হলে, সঙ্গীত চালাও। আমার জানা শ্রেষ্ঠ প্রেরণাদায়ী হলো এই সঙ্গীত।’ সত্যিই জুলিয়ন তোমার কথা শুনে অসাধারণ লাগছে। কতো বদলে গেছো জুলিয়ন। কোথায় তোমার সেই পুরনো নিন্দার অভ্যেস, কোথায় সেই নেতিবাচক অভ্যাস, আক্রমণাত্মক স্বভাব। এতো শুধু বাইরের নয় ভিতর থেকেও অনেকটাই বদলে গেছো তুমি।’ বিস্ময়ে আবিষ্ট হয়ে বললাম, হাত মুঠো করে বাতাসে ছুড়ে দিয়ে চিৎকার করে জুলিয়ন বললো, ‘ওরে আরো আছে, আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।’ ‘আমিও তাই চাই।’

পৃষ্ঠা:১০৫

‘আচ্ছা, তাহলে এবার অষ্টম নীতি-‘উচ্চারিত বা ব্যক্ত শব্দের নীতি।’ মহাজ্ঞানী যোগীরা কতোগুলি মন্ত্র উচ্চারণ করতেন, নিয়মিত সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যায়। তারা বলতেন জীবনে একাগ্র, শক্তিশালী ও আনন্দমুখর থাকতে এর অনুশীলনের জুড়ি নেই।’ ‘মন্ত্র কি?’ ‘মন্ত্র হলো বহু শব্দের সমষ্টি। এমন সূত্রে গাঁথা যে তার উচ্চারণে একটা ইতিবাচক ধ্বনির সৃষ্টি হয়। সংস্কৃতে ‘মন’ মানে হলো অন্তর, আর ‘ত্র’ মানে হলো ‘মুক্তি’ তার মানে ‘মন্ত্র’ হলো মনকে মুক্তি দেওয়ার জন্য রচিত শব্দগুচ্ছ। আর বিশ্বাস করো জন, ‘মন্ত্রে’ র মধ্যে সত্যিই আছে সেই শক্তিশালী ক্ষমতা।’ ‘তোমার রোজের রুটিনে মন্ত্র রেখেছো?’ ‘অবশ্যই। আমি যেখানেই যাই, তারা আমার সঙ্গেই থাকে। বাসে যাই, লাইব্রেরিতে বসি, যেখানেই থাকি, মন্ত্রের দ্বারা বিশ্বের যা কিছু ভালো তার উপস্থিতির ঘোষণা করি আমি মনে মনে।’ ‘মন্ত্র কি উচ্চারণ করতে হয়? ‘তা করতেই হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা লিখিতভাবেও মন্ত্রোচ্চারণ করা যায়। কিন্তু উচ্চৈস্বরে মন্ত্রোচ্চারণের একটা বিস্ময়কর প্রভাব আছে। নিজের মধ্যে চরম আত্ম বিশ্বাসের অনুভূতি আনতে আমি বারে বারে ‘আমি ন্তিতধী, আমি সক্ষম, আমি শক্তিশালী এই মন্ত্রটি উচ্চারণ করি। যখন নিজের মধ্যে প্রেরণার অভাব বোধ করি, তখন- আমি মনে মনে মন্ত্র উচ্চারণ করে, আমি ভীষণ অনুপ্রাণিত, আমি শৃঙ্খলাপরায়ণ, আমি প্রাণশক্তিতে ভরপুর আমি স্থির সিদ্ধান্তে অটল। এমনকি আমার যৌবন, আমার প্রাণচঞ্চলতা বজায় রাখতেও আমি মন্ত্রের ব্যবহার করে থাকি।’ মন্ত্র কি করে কেমনে যৌবন ধরে রাখতে পারে?’ ‘উচ্চারিত শব্দ মানুষকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে। শব্দ, সে উচ্চারিত হোক বা লিখিত হোক, শব্দের শক্তি অপরিসীম। অন্যের কাছে কি বলছো তার চেয়েও বেশি জরুরি হলো তুমি নিজের কাছে কি বলছো। ‘নিজে মনে মনে কথা বলা? ‘হ্যাঁ তাই। তুমি সারাদিন যা ভাবো, তুমি নিজেকে সারাদিন যা বলো, যা বোঝাও তুমি আসলে তাই। তুমি যদি নিজেকে বলো যে তুমি বৃদ্ধ, তুমি ক্লান্ত, তুমি অক্ষম, তুমি নিরুৎসাহ তাহলে তুমি কিন্তু তাই হয়ে যাবে। কিন্তু যদি মনে মনে বলো যে তুমি শক্তিশালী, তুমি স্বাস্থ্যবান, তুমি সজীব, সতেজ

পৃষ্ঠা:১০৬

এবং গতিময়, তবে তোমার জীবনও সজীব হয়ে উঠবে। যে কথা বলবে, যে চিন্তা করনে, যে কাজ করবে তার দ্বারাই প্রভাবিত হবে তোমার জীবন, তোমার ভাবমূর্তি। তোমার ভাবমূর্তি যদি তোমার কাছেই একজন দুর্বল মানুষের হয়, তবে তোমার কাজের মধ্যেও তারা ছায়া পড়বে। আর যদি ভাবমূর্তি হয় অপরাজেয়, নির্ভীক ব্যভিনা, তবে তোমার ব্যক্তিত্ব পড়বে তার প্রতিফলন। তোমার তৈরি করা ভাবমূর্তি বলে দেবে ভবিষ্যতে কতটা সফল হবে তুমি।’ ‘তুমি যদি ভাবো যে তুমি তোমার জীবনের সেরা সঙ্গী খুঁজে পেতে পারবে না বা শান্তিপূর্ণ, দুশ্চিন্তাহীন জীবনযাপন করতে পারবে না, তবে তা তোমার ভাবমূর্তিতে প্রতিফলিত হবে। সে তোমাকে শ্রেষ্ঠ সঙ্গী খুঁজে পেতে বা দুশ্চিন্তাযুক্ত জীবন পেতে যা যা করতে হয় তা কখনোই করতে দেবে না। বরং তোমার সকল প্রচেষ্টাকে ফেল করে দেবে।’ ‘কেন এমন হয়?’ ‘খুব সহজ। তোমার ভাবমূর্তি তোমাকে পরিচালনা করেঞ্জের সঙ্গে মানানসই নয় এমন কোনো কাজই সে তোমাকে করতে হবে না। তবে ভালো কথা হলো তুমি নিজের ভাবমূর্তি বদলে ফেলতে পারো, ঠিক যেমন অন্য যে কোনো কিছু বদলানো যায়, আর মন্ত্র এই কাজেই কাজেই। সাহায্য করে তোমায়।’ ‘আর অন্তর্জগত বদলে গেলে, বহির্জগত আপরীং থেকেই বদলে যায়।’ ‘বাহ। খুব তাড়াতাড়ি বলছো তুমি।’ কামাকে বুড়ো আঙুল ‘থাম্বস আপ’ দেখিয়ে বললো জুলিয়ন। যা সে বর্ষ্যিাত আইনজীবী থাকাকালীন প্রায়ই করতো। ‘এবার নবম নীতি। এটি হলো ‘সঙ্গীত’। সঙ্গীত হলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের নীতি। যোগী রমন বুঝিয়েছিলেন, ‘তুমি একটা ‘কর্মের’ বীজ রোপণ করো, ফসল হিসেবে তুমি একটি ‘অভ্যাস’ পাবে তাতে। অভ্যাসের বীজ রোপণ করে য ফসল হিসেবে পাবে ‘চরিত্র’। চরিত্রের বীজ রোপণ করো, পাবে ‘নিয়তির’ ফসল। আসলে এই নীতিতে বলছে, প্রতিদিন এমন কিছু। কাজ কর যা তোমার চরিত্র গঠন করে তুলবে। চরিত্র মজবুত হলে নিজেকে দেখার নজর বদলে যাবে তোমার। বদলাবে তোমার কাজের ধরন। কাজের ধরনের সাথে বদলাবে তোমার অভ্যাস, আর তার সাথে তোমার নিয়তি।’ ‘চরিত্র গঠনে কি কি করতে হবে আমায়? ‘যে কোনো কিছু যা তোমার সৎগুণ বৃদ্ধির পক্ষে সহায়ক। ‘সদগুণ বলতে আমি কি বোঝাতে চাইছি তা জিজ্ঞেস করার আগে বলে নিই, হিমালয়ের

পৃষ্ঠা:১০৭

প্রজ্ঞাবান মানুষেরা বিশ্বাস করেন, ‘সদগুণপূর্ণ প্রজীবন মানে অর্থপূর্ণ জীবন। তাই তারা তাদের জীবনটাকে প্রাচীন, কালোত্তীর্ণ নীতির মাধ্যমে পরিচালনা করে।’ ‘কিন্তু, তুমি বলেছিলে তারা জীবনটাকে তাদের উদ্দেশ্যের মাধ্যমে চালনা করে।’ ‘তা তো বটেই। তবে তাদের জীবনটা। এই সকল সঙ্গতিপূর্ণ নীতির সঙ্গে মিশেমিশে কাজ করে, যা তাদের পূর্বপুরুষরা বুক দিয়ে আগলে রেখেছিল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে।’ ‘সেগুলো কি, জুলিয়ন?’ ‘সেগুলো খুব সহজ, সরল কিছু আদর্শ পরিশ্রম, সহমর্মিতা, বিনয়, সহিষ্ণতা, সততা ও সাহস। তোমার সব কাজ যখন এই সকল নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হবে, তখন তোমার জীবনে আসবে প্রকৃত শান্তি, প্রকৃত আনন্দ। এই জীবনই তোমাকে আত্মিক সফলতার পথে নিয়ে যাবে। কারণ তুমি তখন তাই করবে যা সঠিক। ব্রহ্মাণ্ড ও প্রকৃতির নিয়মের বাইরে কোনো কাজ তখন করবে না তুমি। অন্য এক মাত্রার থেকে শক্তি আহরণ করবে তুমি, এইতো সেটা কোনো উচ্চতর শক্তি। এই সময়ই তোমার জীবন সাধ্যাত্বর থেকে অসাধারণ হতে শুরু করবে। নিজের মধ্যে অনুভব করবে এক অন্তর্ণ পবিত্রতা, আলোকদীপ্ত জীবনের পথে এ হলো প্রথম পদক্ষেপ।’ ‘এ অভিজ্ঞতা তোমার হয়েছে?’ জানতে চাইলাম। ‘হয়েছে। আর আমার বিশ্বাস তোমৗচ্ছিত হবে। সঠিক কাজ করো। তোমার সঠিক চরিত্রের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কাজ করো। হৃদয়ের কথা শোনো। বাকি কাজটা নিজে থেকেই হয়ে যাবে। কারণ তুমি তো কখনো এক নয়, তা জানো তো। ‘তার মানে?’ ‘সে কথা অন্য কোনো সময়ে বলব্যে। এমার্সন বলেছেন, ‘চরিত্র বুদ্ধির চেয়ে অনেক মহৎ। মহান চরিত্ররা চিন্তাও করেন আবার সমর্থ জীবনও যাপন করেন। যাই হোক প্রতিদিন চরিত্র গঠনের জন্য কিছু ছোট ছোট কাজ করো। তা না পারলে, সত্যিকারের আনন্দ তোমার জীবনে ধরা দেবে না।’ ‘আর সর্বশেষ নীতি?’ ‘এটি শেখায় তোমাকে খুব সহজ, সরল জীবনযাপন করতে হবে। যোগস্ট রমন বলতেন, ‘সামান্য জিনিস নিয়ে মাথা ঘামিয়ে জীবন কাটিও না। প্রকৃত তাৎপর্য আছে, অর্থ আছে, এমন কাজে মন দাও। তোমার জীবন হবে

পৃষ্ঠা:১০৮

পরিচ্ছন্ন, ফলদায়ী ও অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ। এটা আমি তোমায় শপথ করে বলতে পারি। ঠিকই বলেছিলেন তিনি। যে মুহূর্তে আটা থেকে ভুষি আলাদা করলাম, জীবন আমার তৃপ্তিতে ভরে গেল। সারা জীবন যে প্রচণ্ড গতিময় জীবন কাটিয়ে এসেছি, তা ধীরে ধীরে শাস্ত্র হয়ে এলো। ঝড়ের সাথে বেঁধে রাখা জীবন থেকে সরে এলাম। চারিদিকে যেন ভরে গেল প্রবাদের সেই গোলাপের সুগন্ধে।’ ‘সরল জীবনযাপনের জন্য কি করতে হয়েছে তোমাকে জুলিয়ন।’ ‘দামি পোশাক পরা ত্যাগ করলাম, দিনে হটা খবরের কাগজ পড়ার পুরনো অভ্যাস ছেড়ে দিলাম। সকলের প্রয়োজনে, সবসময় দৌড়ানো ছেড়ে দিলাম, নিরামিশাষী আর স্বল্পাহারি হয়ে উঠলাম। আসলে আমার সব চাহিদাগুলো একবারে কমিয়ে আনলাম। চাহিদা না কমালে, তুমি কখনো সন্তুষ্ট হবে না। লাস ভেগাসের জুয়া ঘরে জুয়া খেলার মতো সারা জীবন রুলেট হুইল এর সামনে দাঁড়িয়ে ভাববে, ‘আরেকটা দান, এবার নিশ্চয়ই তোমার স্থাকি নাম্বার আসবে।’ যা আছে তাতে কখনোই খুশি হবে না তুমি। সুখীই কহিবে কি প্রকারে? ‘আগে বলেছিলে জীবনে সুখ আসে সাফল্যের মাধ্যমে এখন বলছো নিজের চাহিদা কমিয়ে, অল্পে খুশি থাকতে। এই দুটি কথা বিপরীতধর্মী নয়?’ ‘অসাধারণ, জন, ব্রিলিয়ান্ট পয়েন্ট। এটা শুনতে বিপরীঘধর্মী, কিন্তু আসলে তা নয়। স্বপ্ন পূরণের মাধ্যমেই জীবনে আনন্দ আসে। তুমি যখন গতিশীল থাকো, তখনই তুমি তোমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় কাটাতে থাকো। কিন্তু স্বপ্ন পূরণ মানে আকাশকুসুম কল্পনা করে তোর পিছনে ছোটা নয়। যেমন, যখন আমার ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে তিনশো মিলিয়ন ডলার থাকবে। আর এর থেকেই সর্বনাশের শুরু।’ ‘তিনশো মিলিয়ন ডলার।’ অবিশ্বাসে প্রশ্ন করে ফেললাম। ‘তিনশো মিলিয়ন ডলার। তাই যতই আয় করি না কেন, কিছুতেই সন্তুষ্টি নেই আজ মন খুলে বলতে পারি। সেই রাজা মিডাসের গল্পটা মনে আছে তো? ‘হ্যাঁ, সেই রাজা যার সোনার প্রতি ছিল অগাধ লোভ। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছিল, যা স্পর্শ করবে তাই যেন সোনা হয়ে যায়। শেষে যখন খাবার স্কুলেও সোনা হয়ে যেতে লাগলো, আর চারিদিকে সোনার মাঝে সে অদ্ভুক্ত হয়ে বসে রইলো। তখন বুঝতে পারলো কি ভুল সে করেছে।’ ‘ঠিক সেইরকম, আমিও কোনো কিছুতেই সন্তুষ্ট ছিলাম না। এমন একটা সময় এলো যখন সারাদিনে আমি শুধু জল আর রুটিটুকু ছাড়া আর কিছু খাওয়ার সময় পেতাম না।’ খুব চুপচাপ আর বিমর্ষ হয়ে গেল জুলিয়ন।

পৃষ্ঠা:১০৯

‘তুমি খুব সিরিয়াস হয়ে গেলে? আমি তো জানতাম তুমি তোমার বিখ্যাত বন্ধুদের সঙ্গে বিখ্যাত বেঁস্তোরায় খেয়ে বেড়াও সবসময়।’ সেটা প্রথম দিকে। তারপর আমার এই সামঞ্জস্যহীন জীবনধারা আমাকে একটি ‘আলসার’ উপহার দিলো। একটি ‘হট ডগ’ যেয়েও আমি সুস্থ থাকতে পারতাম না। কি জীবন। অতো টাকা রোজগার আমার। অথচ রুটি আর জল আমার খাদ্য তখন। কি দুঃসহ। তবে অতীতে বেঁচে থাকার মানুষ আমি নই। জীবনের সেরা শিক্ষা ছিল ওটা। বলেছিলাম না, যন্ত্রণা খুব বড় শিক্ষক। যন্ত্রণা জয় করতে গেলে, আগে তা ভোগ করতে হয়। হয়তো ওটা না ঘটলে আজ আমি যা তা হতে পারতাম না।’ ‘বলতে পারো আমার কি করণীয়?’ ‘অনেক কিছু। ছোট ছোট জিনিসও অনেক বড় পরিবর্তন আনতে পারে।’ ‘যেমন?’ ‘ফোন বাজা মাত্রই তা ধরা বন্ধ করে দাও। উল্টো পাল্টা ‘জঙ্ক মেল’ পড়ে সময় নষ্ট করো না। বাইরে সপ্তাহে তিনদিন করে খাওয়া বন্ধ করো, গদ ক্লাবের মেম্বারশিপ ছেড়ে দিয়ে, বাচ্চাদের সঙ্গে সময় কাড়াও খড়ি না পড়ে সপ্তাহে অন্তত একদিন থাকো, মাঝে মাঝেই সূর্যোদয় দেখো। পারলে তোমার মোবাইল ফোনটা বিক্রি করে দাও। আরো বলবো?’ ‘সব বুঝেছি। কিন্তু মোবাইল ফোন বিক্রি করে দেবো?’ উদ্বিগ্ন হয়ে প্রশ্ন করলাম, যেন ডাক্তারকে কোনো সদ্যজার শিট জিজ্ঞেস করছে তার নাড়ি কাটা হবে না তো?” ‘আমি আগেই বলেছি, আমি যা রে ফল পেয়েছি তোমাকে সেগুলো জানাচ্ছি। এর থেকে তুমি বেছে নাও কতোটুকু মানবে, কতোটুকু নয়। কি মানবে আর কি মানবে না। যেটা তোমার ঠিক মনে হবে, তাই করো।’জানি। কোনো চরম কিছু নয়। সবই মধ্যপন্থার।’ ‘ঠিক তাই।’ ‘তবে একথা বলতেই হবে, তোমার বলা সবকটি পদ্ধতিই শুনতে অসামান্য। কিন্তু সত্যিই কি এগুলো তিরিশ দিনে কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে।’ ‘দুষ্টুমির চোখে জুলিয়ন বললো, ‘কমও লাগতে পারে, আবার বেশিও।’ ‘বুঝিয়ে বলো, হে জ্ঞানী পুরুষ।’=’জুলিয়নই ঠিক আছি বাছা। তবে আমার পুরনো লেটারহেডে এই নামটা মানাত ভালো।’ মজা করলো জুলিয়ন। ‘বলছি তিরিশ দিনের কমও লাগতে পারে। জীবনের পরিবর্তন তো আসলে খুব স্বতঃস্ফূর্ত।’ ‘স্বতঃস্ফূর্ত?’

পৃষ্ঠা:১১০

‘হ্যাঁ। যে মুহূর্তে তুমি ভাববে তোমার জীবনকে তুমি সর্বোচ্চ শিখরে নিয়ে যাবে, চোখের পলক না ফেলতেই তা হয়ে যেতে পারে।’ ‘আর বেশি লাগতে পারে কেন?’ ‘এই মুহূর্ত থেকে এক মাসের বেশি তোমার লাগবে না জন, যদি তুমি ঠিকমতো পদ্ধতি আর নীতিগুলো মেনে চলো। আমি হলফ করে বলছি। তোমায়। তোমার জীবনে আসবে অনেক বেশি প্রাণশক্তি, সৃজনশক্তি, আর অনেক কম দুশ্চিন্তা আর দুর্ভাবনা। তবে যোগীদের এই নিয়ম চটজলদি কিছু হয়ে যাওয়ার নিয়ম নয়। একে প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত অনুসরণ করতে হবে, সারা জীবন। যেদিন বন্ধ করে দেবে, দেখবে আবার ফিরে যাচ্ছো তোমার যন্ত্রণাদায়ক অতীতে।’ দশটি নীতিকথা শেষ করে জুলিয়ন থামলো। বললো, ‘তুমি আরো গুনতে চাচ্ছো, তাই আমি আরো বলবো। আমার বক্তব্য আমার এক বিশ্বাস, যে তোমাকে সারা রাত জাগিয়ে রাখতেও আমার কোনো দ্বিধা নেই। এবং উত্তটু গভীর কিছু আলোচনা করবো।’ ‘এতোক্ষণ আমরা আলোচনা করলাম তা কি যথেষ্ট না?’ অবাক পরীর ছিল হয়ে প্রশ্ন করি। ‘এতোক্ষণ যে নীতির কথা বলেছি। তা তোমার এবং তোমার সংস্পর্শে যারা আসবে, তাদের স্বপ্নের জীবনকে বাস্তবায়িত ঐরবে। তবে যা বলেছি, যা শুনেছো তা সবই তো বাস্তবের গল্প। শ্রীখার কিছু আধ্যাত্মিক কথাও যে জানতে হবে। যদি কখনো এবার আমার কথা বুঝতে না পারো, তবে তা নিয়ে কিছু সময় চর্বন করো, দেখবে ঠিক হজম হয়ে যাবে।’ ‘আর ছাত্র তৈরি হলেই তো শিক্ষক হাজির হয়ে যাবে।’ ‘একদম ঠিক, তুমি কি ভালো ছাত্র, জন।’ ‘শুরু করো।’ প্রচণ্ড প্রাণশক্তিতে ভরপুর হয়ে আবেদন রাখলাম, যদিও জানি ঘড়িতে তখন রাত আড়াইটে। ‘তোমার মধ্যে সূর্য, চন্দ্র, আকাশ এবং সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের অধিবাস। যে শক্তি এ সব তৈরি করেছে, সেই শক্তিই তোমাকে তৈরি করেছে। তোমার আশেপাশে যা কিছু, তা সব একই মূল থেকে জাত। আমরা সকলেই এক।’ ‘মনে হয় না কিছু বুঝলাম বলে।’ ‘পৃথিবীর প্রতিটি বস্তুর একটা আত্মা আছে। সে সব আত্মা এক পরমাত্মায় মিলিত হয়। জন, যখন তুমি তোমার মন আত্মার পুষ্টিসাধন কনা, তুমি আসলে সেই পরমাত্মার পুষ্টিসাধন কনা। আর যখন তুমি আত্মত্মবিশ্বাসের সঙ্গে,

পৃষ্ঠা ১১১ থেকে  ১২০

পৃষ্ঠা:১১১

সাহসের সঙ্গে তোমার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার দিকে এগোও, সেই ব্রহ্মান্ডের সমস্ত শক্তি তোমার মধ্যে সঞ্চারিত হতে থাকে। আগেই বলেছি, জীবনের থেকে যা চাইবে, জীবন তাই দেবে। সে সব শুনতে পায়’ ‘তার মানে, আত্মত্মনিয়ন্ত্রণ ও কাইজেন আমাকে নিজেকে সাহায্য করার মাধ্যমে, অফুরন্তকে সাহায্য করতে সাহায্য করবে।”অনেকটা সেরকমই। যখন তুমি তোমার শরীর, মন ও আত্মাকে পরিপুষ্ট করবে, তখন আমার কথা বুঝতে পারবে।’ ‘জুলিয়ন আমি সবই বুঝতে পারছি। কিন্তু একজন ২১৫ পাউন্ড ওজনের পারিবারিক মানুষ, যে নিজের উন্নতির চেয়ে, মক্কেলের উন্নতিতেই বেশি সময় কাটিয়েছে, তার দ্বারা আত্মনিয়ন্ত্রণ কতোটা সম্ভব?’ ‘স্বপ্ন আর অধিকাংশ মানুষের মধ্যে ব্যবধানের মূল কারণ হলো, হেরে যাওয়া বা ব্যর্থ হওয়ার ভয়। তবে সফল হতে গেলে বিফলতার স্বাদ পাওয়া দরকার। ব্যর্থতা আমাদের পরীক্ষা নেয়। আমাদের গড়ে উঠতে সাহায্য করে। প্রাচ্যের সাধুরা বলেন, ‘একটি ভীর, যেটা পাখির চোখা বিদ্ধ করতে পেরেছে, তার পিছনে রয়েছে একশোটির মতো মাধ্যমে লাভ হলো প্রকৃতির মৌলিক সূত্র। ব্যর্থতাকে ও ক্ষতির ঈন করে নাও, সে তোমার পরম বন্ধু।’ ‘কি বলছো তুমি?’ ‘বীর ভোগ্যা বসুন্ধরা। যে বীর, প্রকৃতি আর উন্ন। একবার যদি স্থির করে নাও যে জীবনকে সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে শ্রীবেই, তোমার আত্মার মহাশক্তি তোমাকে সে পথে পথ দেখিয়ে নিচ্ছে যাবে। যোগী রমন আমাকে প্রাচ্যের একটা গল্প বলেছিলেন, তোমাকে বলি। বহুদিন আগে উত্তর ভারতের এক জায়গায় এক বিশাল দৈত্য বাস করতো। পাহাড়ের ওপর বিশাল প্রাসাদ ছিল তার। যদিও বেশিরভাগ সময়ই তাকে বাইরে, বিভিন্ন জায়গায় যুদ্ধ করেই। কাটাতে হতো। এরকমই একবার বহুদিন পরে সে প্রাসাদে ফিরে দেখে, নিচের গ্রামের ছোট ছোট বাচ্চার্য তার প্রাসাদের বাগানে ছুটোছুটি কনাছে, খেলা করছে, হৈ চৈ করছে। দেখেই তো তার বাগ হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে সে সকলকে দূর করে তাড়িয়ে দিলো। বাগানের চারিদিকে তুলে দিল এক মজ পাথরের দেওয়াল। দিন যায়। দেখতে দেখতে শীত এসে গেল। সমস্ত এলাকা ঢেকে গেল বরফের চাদরে। দৈত্য শুধু ভাবতে থাকে কবে শীত যাবে, আসবে বসন্ত, ধীরে ধীরে পাহাড়ের নীচের গ্রামে বসন্ত এসে গেল। চারিদিকে ফুলে ফুলে ভরে গেল। কিন্তু উঁচু পাঁচিল দেওয়া দৈত্যের বাগান থেকে শীত কিছুতেই গেল না। গাছ পালার উপর শীত কামড়ে পড়ে রইলো।

পৃষ্ঠা:১১২

একদিন হঠাৎ তার মনে হলো তার প্রাসাদেও বসন্ত এসেছে। দৌড়ে জানলা দিয়ে বাগানে তাকিয়ে দেখে ছোট ছোট সেই বাচ্চাগুলো অনেক কষ্টে দেওয়াল টপকে ফিরে এসেছে তার বাগানে। আর তাতেই এসেছে বসন্ত, ফুটেছে ড্যাফোডিল, গোলাপ, অর্কিড। তবে দূরে দাঁড়িয়ে আছে একটা ছোট্ট বাচ্চা, যে মন খারাপ করছে, কারণ সে দেওয়াল টপকে অন্যদের মতো বাগানে যেতে পারছে না। দৈত্যের খুব মায়া হলো তাকে দেখে। সে এগিয়ে এলো বাচ্চাটির দিকে। অন্য বাচ্চারা ভয়ে দূরে পালিয়ে গেল। শুধু দাঁড়িয়ে রইল এই শিশুটি, বললো, ‘আমি দৈত্যকে মারবো, কিছুতেই আমাদের খেলার জায়গা ছাড়বো না।’ দৈত্য হেসে, ওকে কোলে করে বাগানে নিয়ে গেল। সব বাচ্চারাও আবার হৈ হৈ করে ফিরে এলো। সবার মাঝে নায়ক হয়ে যাওয়া ছোট্ট শিশুটি নিজের গলা থেকে একটি সোনার হার খুলে দৈত্যের গলায় পরিয়ে বললো, ‘এটা আমার পয়মন্ত হার। আজ থেকে এটা তোমার।’ সেদিন থেকে দৈত্যের প্রাসাদে বাচ্চাদের অবাধ প্রবেশ। রোষ্ট্র তারা আসে,আর দৈত্য তাদের সঙ্গে প্রাণভরে খেলা করে। কিন্তু স্নেই ছোট্ট শিশুটি আর আসে না সেদিনের পর থেকে, কোনোদিন এরেক্স চটি সে। দৈত্য খেলতে খেলতে, মাঝেমাঝেই ভাবে তার কথা। অনেক রাষ্ট্রর পার হয়ে গেল। দৈত্য আর বাগানে গিয়ে বাচ্চাদের সাথে খেলায় মেতে উঠতে পারে না। সে অসুস্থ দুর্বল। এই সময় ছোট সেই শিশুটির কৃষ্ণা খুব মনে পড়তো দৈত্যের। শীত এসেছে, একদিন অতিকষ্টে জানালার সামনে বাগানের দিকে চেয়ে দৈতা অবাক হয়ে গেল। বরফের আস্তরণে ঢাকা বাগানের একটি কোণে একটি গোলাপ গাছ ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে। আর তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেইছোট শিশুটি। ছুটে বেড়িয়ে এলো দৈত্য, প্রশ্ন করলো, ‘বন্ধু, এতোদিনকোথায় ছিলে? শিশুটি বললো, ‘একদিন তুমি আমাকে তোমার বাগানে নিয়ে এসেছিলে। আজ আমি তোমাকে আমার সঙ্গে, আমার দেশে নিয়ে যেতে এসেছি। চলো আমার সাখে।’ পরদিন সকালে বাচ্চারা বাগানে খেলতে এসে দেখে, দৈত্যের নিঃস্পন্দ দেহটা বাগানে পড়ে আছে। আর তার সারা শরীর ঢেকে আছে গোলাপে, গোলাপে ‘সাহসী হও জন, ওই শিশুটির মতো সাহসী। সকলের মাঝে মুখ লুকিয়ে না থেকে, একা দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করার মতো সাহসী। নিজের পয়মন্ত্র হার অন্যকে দিয়ে, হৃদয়ের কথা শোনানোর মতো সাহসী। নিজের বক্তব্যের পিছনের জোরালো যুক্তি খাড়া করো। নিজের স্বপ্নকে অনুসরণ করো। সেটাও

পৃষ্ঠা:১১৩

তোমাকে তোমার নিয়ামতের দিকে নিয়ে যাবে, ব্রহ্মান্ডের বিস্ময়কর পথে নিয়ে যাবে। আর সেই বিস্ময় তোমাকে নিয়ে যাবে গোলাপে গোলাপে ঢাকা এক বাগানে।’ ‘জুলিয়নের দিকে ফিরে তাকালাম। কাহিনীটা ছুঁয়ে গেছে আমায়। তাকিয়ে দেখি, আইনের অন্যতম ধীর যোদ্ধার চোখের জলে ভেসে যাচ্ছে তার চিবুক ও গাল।নবম অধ্যায়ের সংক্ষিপ্তসার প্রতীক চিত্র গুণ ‘কাইজেন’ অনুশীলন। জ্ঞান আত্মনিয়ন্ত্রণ জীবন নিয়ন্ত্রণের ডি.এন.এ। বহিরঙ্গের সাফল্য আসলে শুরু হয় ভিতর থেকে। শরীর, মন ও আত্মার ক্রমাগত চর্চায় জ্বলে উঠে জ্ঞানের। কলাকৌশল যা করতে ভয় পাও, তাই করো। উদ্ভাসিত জীবনের দশটি নীতি। উদ্ধৃতি: ধরনী বীরের প্রতি প্রসন্না। যদি একরার ঠিক করে নাও তোমার জীবনকে সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে যাবে, তুর্বে তোমার আত্মার পরম শক্তি তোমাকে সেই অলৌকিক সম্পদের দ্রেপ্রোটিনয়ে যাবে।

পৃষ্ঠা:১১৪

অধ্যায় ১০

সুশিক্ষা আর সুশৃঙ্খলার শক্তি

‘আমরাই আমাদের ভাগ্যের নিয়ন্তা, যে কাজ আমাদের করতে দেওয়া হয়েছে তা আমাদের ক্ষমতার বাইরে নয় যে যন্ত্রণা আমরা পাচ্ছি, তা আমাদের সহ্যের বাইরে নয় যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের উপর ভরসা আছে আর আছে অজেয় ইচ্ছাশক্তি’ জয় থেকে আমরা বঞ্চিত হবো না। -উইনস্টন চার্চিল যোগী রমনের কাহিনী চলতে লাগলো। এতোক্ষণ পর্যন্ত মনের বাগান, ক্ষমতা ও শক্তির কেন্দ্রস্থল বলে জেনেছি। লাইটহাউস এর মাধ্যমে জীবনের উদ্দেশ্যে ও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের কথা শিখেছি। ন’ফুট লম্বা, নশো পাউহ্ ওজনের সুমো পালোয়ানের প্রতীকের মাধ্যমে জেনেছি ‘কাইজেনের কীলোত্তীর্ণ মতবাদ। তখনও জানতাম না, শ্রেষ্ঠ শিক্ষা পাওয়া আমার রাকি আছে। ‘সুমো কুদ্ধিগির যে সম্পূর্ণ নগ্ন ছিল তা মনে আছে তোঃ ‘শুধুমাত্র তার একান্ত (পোপন অঙ্গটি) গোলাপী তার দিয়ে বাঁধা ছিল। ‘ঠিক, প্রশংসা করলো জুলিয়ন। ওই গোলাপী ভরি হলো সমৃদ্ধ, আনন্দমুখর ও জ্ঞান-আলোকদীপ্ত জীবন তৈরি করতে গোন্ধাযে আত্ম-নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার প্রয়োজন হয়, তারই প্রতীক। সিভানার যোগীরা, নিঃসন্দেহে আমার দেখা সবচেয়ে স্বাস্থ্যবান, পরিতৃপ্ত ও প্রশান্ত মানুষ এবং তার সাথে সাথে ওরা সবচেয়ে সুশৃঙ্খলও। এরা আমায় শিখিয়েছিলেন যে ওই গোলাপী তারের সমষ্টি আসলে আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রতীক। একটা ওয়্যার কেবল কখনো নিরীক্ষণ করেছ জন?’ ‘এটা কোনোদিই আমার পছন্দের কাজ ছিল না।’ ‘পারলে কখনো দেখো। দেখবে সরু সরু একের পর এক তারের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে ওই কেবল। একটা তারের কোনো জোড়া নেই। একেবারেই পলকা। কিন্তু একসাথে করার পর তা লোহার চেয়েও আরো শক্ত। আতানিয়ন্ত্রণ ও ইচ্ছাশক্তিও ঠিক তাই। ছোট ছোট সুশৃঙ্খল কাজই, এক কঠিন ইচ্ছাশক্তির জন্য দেয়। নিয়মিত সুশৃঙ্খল কাজ করলে, তা একের পর এক জমতে জমতে এক বজ্রকঠিন মানসিক শক্তি রূপে প্রকাশ পায়। প্রাচীন আফ্রিকান প্রবাদ আছে একটা মাকড়সার জাল যদি একত্রিত হয়, তবে তা একটা শক্তিশালী সিংহকেও বেঁধে ফেলতে পারে।’ তোমার

পৃষ্ঠা:১১৫

ইচ্ছোশক্তিকে যদি মুক্ত করে দাও, তুমি কোনো বাধাই তোমার পক্ষে অনতিক্রমযোগ্য হবে না, কোনো চ্যালেঞ্জই আর তোমার পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়াবে না, কোনো সঙ্কটই আর সমাধান করতে না পারার মতো কঠিন হয়ে দাঁড়াবে না। জীবনের নানা ওঠাপড়ায়, বোঝাপড়ায় এই আত্ম নিয়ন্ত্রণজাত মানসিক শক্তি তোমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে।’‘তোমাকে একটা বিষয়ে সতর্ক করে দিই জন, ইচ্ছাশক্তির অভাব কিন্তু একটা ভয়ঙ্কর অসুখ। তোমার মধ্যে তা যদি বাসা বেঁধে থাকে তবে এই মুহূর্তে তাকে দূর করো। শ্রেষ্ঠ জীবন এবং দৃঢ় চরিত্রের মূল হলো ইচ্ছাশক্তি। যে কাজ, যখন করবে বলে তুমি ভেবেছো, সেই কাজ তখন করার ক্ষমতা জোগায় ইচ্ছাশক্তি। ইচ্ছাশক্তিই হলো সেই যে তোমাকে ভোর পাঁচটায় উঠে ধ্যান করতে সাহায্য করে। শীতের কনকনে এক সকালে বিছানা ছেড়ে গাছপালার মাঝখান দিয়ে হেঁটে মনকে প্রফুল্ল করতে সাহায্য করে। ইচ্ছোশক্তিই তোমাকে বাক্যসংযম করতে শেখায়, যখন বাস্তবজ্ঞানহীন কোনো মানুষ তোমাকে অপমান করে বা এমন কোনো কাজ করে, যার সাথে তুমি একমত নও। যখন স্বপ্নপূরণের পথে দুর্লঙ্ঘ বাধ্য এসে প্রর্থ আটকায়, এই ইচ্ছাশক্তিই তোমাকে বাধা, বিপত্তি পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা জোগায়। ইচ্ছাশক্তিই তোমাকে জোগায় সে অন্তরের শক্তি দ্বা অন্যের প্রতি এবং সর্বোপরি নিজের প্রতি তোমার প্রতিশ্রুতি পূরণ করার শক্তির জোগান দেয়।’ ‘সত্যিই, এটা এতো গুরুত্বপূর্ণা’ ‘অবশ্যই বন্ধু। সম্ভাবনাময় শান্তিপূর্ণ কাছে ওঠবে হাচ্ছাপূর্ণ জীবন যারা তৈরি করেছে, তাদের কাছে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জুলিয়ন নিজের পোশাকটি নিয়ে এসে তার থেকে চকচকে রূপোর একটি প্রাচীন মিশরীয় স্টাইলের লকেট বের করলো।’ ‘তোমার কাছে এ জিনিস থাকার কথা নয়।’ রসিকতা করে বললাম। শেষ সন্ধায়। ওদের সঙ্গে সেদিনের সময়টা খুব আনন্দ করে কাটাচ্ছিলাম। সিভানার শান্তির নীড় ছেড়ে আসতে চাইছিলাম না। ওখানকার সকলে আমার গুরু ভাই, গুরু বোন হয়ে গিয়েছিল। আমি আমার হৃদয়ের একটা বড় অংশ হিমালয়ের ওই উচ্চতায় কাটানো সেই সন্ধ্যার কাছে রেখে এসেছি।’ ভিজে এলো জুলিয়নের কন্ঠস্বর। ‘লকেটে খোদাই করা লেখাগুলো কি?’ আমি পড়ে শোনাচ্ছি। এগুলো কখনো ভুলো না, জন। আমার খুব কঠিন সময়ে এই কথাগুলো আমায় খুব সাহায্য করেছে। আমি প্রার্থনা করি তোমার দুঃসময়েও এই কথাগুলো তোমার জীবনে সান্ত্বনার বারি হয়ে ঝরে পড়ুক।

পৃষ্ঠা:১১৬

এখানে বলছে- ‘লৌহ কঠিন শৃঙ্খলার মাধ্যমে তুমি সাহস ও শান্তিতে সমৃদ্ধ এক জীবন গঠন করতে পারবে। ইচ্ছাশক্তির দ্বারা তুমি তোমার জীবনের সর্বোচ্চ আদর্শে পৌঁছতে পারবে। পারবে যা কিছু ভালো, আনন্দময় ও প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর, তাতে পরিপূর্ণ এক প্রাসাদে বসবাস করতে। এই গুণগুলি না থাকলে তুমি কম্পাসহীন জাহাজের নাবিকের মতো জীবনসমুদ্রে তলিয়ে যাবে।’ ‘আমি যদিও অনেকবার ভেবেছি আরেকটু সুশৃঙ্খল হওয়া উচিত আমার, তবুও এতো গভীরে কখনো ভাবিনি। তবে তুমি কি বলছ্যে যে আমার কিশোর ছেলের যেমন সুশৃঙ্খলভাবে শরীরচর্চা করে তার বাইসেপ গড়ে তুলছে, তেমনভাবে আমিও পারি শৃঙ্খলপরায়ণ হয়ে উঠতে?’ ‘তুলনাটা চমৎকার। তোমার ছেলে শরীরটাকে যেভাবে গড়ে তুলছে, তুমিও সেভাবে তোমার ইচ্ছাশক্তিকে কড়া অনুশীলনের মাধ্যমে গড়ে তুলতে পারো। এ ব্যাপারে মহাত্মা গান্ধীর জীবন একটা ভালো উদাহরণ হতে পারে। সবাই যদিও ওকে আধুনিক সময়ের এক যোগীপুরুষ হিসেরে জানে, যিনি দিনের পর দিন সত্যাগ্রহ আর অনশনের মাধ্যমে অশিই দুঃখ যন্ত্রণা ভোগ করেছেন, নিজের লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য। কিন্তু এর জীবনী পড়লে জানতে পারবে, সর্বদাই কিন্তু জীবনে তিনি আত্মনিয়ন্ত্রণের পরাকাষ্ঠা হয়ে থাকতে পারেননি।’ “তুমি নিশ্চয়ই বলবে না যে তিনি একজন মানুষ চকোলেটে নেশাগ্রস্ত ছিলেন?’ ‘তা দয়। তবে দক্ষিণ আফ্রিকায় আইনজীবী হিসেবে থাকাকালীন তার চালচলনে তীব্র আবেগ বা প্যাশনের বহিপ্রকাশ ঘটতো। অনশন, ধ্যান ও পরবর্তী জীবনে ওর ট্রেডমার্ক। সেই পরনে মাত্র একটুকরো সাদা কাপড়; এর কোনোটার সঙ্গেই তখন ওর সম্পর্ক ছিলো না।’ ‘তুমি বলতে চাইছো যে সঠিক মাপে প্রস্তুতি ও ইচ্ছাশক্তির সংমিশ্রণ ঘটালে, আমি মহাত্মা গান্ধীর মতো ইচ্ছাশক্তির শিখরে পৌঁছতে পারবো?’ ‘সকলেই সকলের চেয়ে আলাদা। যোগী রমন বলতেন, যারা সত্যিকারের জ্ঞানী মানুষ, তারা অন্যের মতো হতে চান না। তারা নিজের পূর্বাবস্থা থেকে আরো ভালো হতে চান। অন্যের সঙ্গে ইদুর দৌড়ে নেমো না। প্রতিযোগিতা করো নিজের সঙ্গে।’ জুলিয়ন উত্তর দিল। ‘আত্মা নিয়ন্ত্রণ থাকলে, যা করতে চেষ্টা করেছ, তাতে নিশ্চয়ই সফল হবে। ওয়াটার র‍্যাফিন্টং হোক, না ম্যারাথন দৌড়, বা আইন ছেড়ে সৃজনশিল্প, যাই মকরো না কেন, বৈষয়িক হোক বা আধ্যাত্মিক, যেটাতেই সমৃদ্ধ হতে চাও না কেন, সবই সম্ভব হবে যদি তোমার ভিতরের ইচ্ছাশক্তির সুপ্ত ভাণ্ডারটিকে সঠিক চর্চা ও পরিচর্যার।

পৃষ্ঠা:১১৭

মাধ্যমে আগিয়ে তোলো। যাতে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলপরায়ণত্য জীবনে আসলে এক মুক্তির আস্বাদ বয়ে আনে। এর মাধ্যমেই পরিবর্তন সম্ভব।’ “তার মানে?”বেশিরভাগ লোকেরই স্বাধীনতা আছে যেখানে খুশি যাওয়ার, যা ইচ্ছে তাই করার। কিন্তু তারচেয়েও বেশিসংখ্যক মানুষ কিন্তু প্রবৃত্তির দাস। তারা সক্রিয় থাকার চেয়েও বেশি মাত্রায় নিষ্ক্রিয় থাকে। সমুদ্রের ঢেউ-এর ফেনার মতো। যেদিকে ডেউ নিয়ে যায়, সেদিকেই যায়। পরিবারের সবার সঙ্গে বসে আনন্দের সময় কাটাবার সময় হঠাৎ কাজের ফোন এসে গেলো, বা সেখানে কোনো সঙ্কট উপস্থিত হলে তারা ঝড়ের বেগে সেখানে পৌঁছে যায়। পিছনে কারা পড়ে রইলো। কোন কাজটাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত ছিল? এসব নিয়ে তারা ভাবেই না। না পুবে, না পশ্চিমে কোনো গোলার্ধেই নয়। সত্যিকারের পরিপূর্ণ জীবনের একটি মূল উপাদানই নেই তাদের জীবনে দু’দণ্ড জিরিয়ে গাছের ফাঁক দিয়ে জঙ্গলটাকে দেখা অর্থাৎ সঠিকটাকে দূর থেকে চিনে নেওয়ার, বুঝে নেওয়ার মুক্ত অন্তদৃষ্টিে আমি ওর সাথে একমত না হয়ে পারলাম না। সত্যিই আমার জীবনে কোনো স্বাধীনতা নেই। আমার ডান হাতটার মতোই অতি শ্ররিশ্যক অঙ্গ আমার পেশা। এতো সুন্দর পরিবার আমার, এতো আরামদায়ক একটা বাড়ি, অথচ আমার সময় নেই স্ত্রীর সাথে দু’দত্ত কথা বন্থর সূতো। নিজের সাথে কথা, সে তো বণ্টন ম্যারাথন জেতার মতো সামির যত ভাবি, তত মনে হয়, কোনোদিনই আমি সে অর্থে স্বাধীন ছিবায়দা। চিরকালই অন্যের কথামতো কাজ করে এসেছি এবং আজো করে যাচ্ছি। নিজের দিকে ফিরে তাকানোর সময় নেই আমার। ‘ইচ্ছেশক্তি আমায় নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা দেবে?’ ‘স্বাধীনতা একটা বাড়ির মতো। তিল তিল করে গড়তে হয়। প্রথম ইটটাই হওয়া উচিত ইচ্ছাশক্তির। কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্তে কোনটা সঠিক তা বিচার করে দেয় মহাশক্তি। সাহসিকতার সঙ্গে কাজ করা, স্বপ্নের জীবনযাপন করার মনের জোর জোগান দেয় এই ইচ্ছাশক্তি। সত্যি কথা বলতে কি ইচ্ছো হলো মানসিক শক্তির সম্রাট। যত মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে, তত জীবন তোমার নিয়ন্ত্রণে আসবে। মন থেকে সকল দুর্বল, নেতিবাচক চিন্তা সরিয়ে, যা কিছু ভালো, সুস্থ, সুন্দর তা নিয়ে আসলে দেখবে তোমার কর্মও ইতিবাচক হয়ে উঠবে। জীবন শুধু সৌন্দর্যে করে যাবে। উদাহরণ দিই একটা। ধরো ঠিক করলে ভোর ছ’টায় উঠে হাঁটতে যাবে। অ্যালার্ম দিয়ে শুলে। শীতের সকালে যখন ছটায় অ্যালার্ম বাজলো,

পৃষ্ঠা:১১৮

তখন প্রথমেই মনে হবে ‘সূইস’ বোতামটা টিপে অ্যালার্ম বন্ধ করে শুয়ে পড়ি। কালকে যাবো, এভাবেই চলতে থাকবে ক’দিন। তারপর বেশ ক’দিন বাদে মনে হবে, অনেক বয়েস হয়ে গেছে, এখন আর পুরনো অভ্যাস বদলে নতুন করে শরীরচর্চায় ব্রতী হওয়া সম্ভব নয়।’ তুমি আমাকে ভালো করেই জানো।’ আন্তরিকভাবে বললাম। ‘ ‘এবার এর উল্টোটা ভাবো তো। অ্যালার্ম বাজলো, তোমার উঠতে ইচ্ছে করছে না। শুয়ে শুয়েই মনে মনে ভাবতে থাকলে, যখন তোমার নির্মেদ, ঝকঝকে চেহারা হবে, তখন কেমন লাগবে তোমায় দেখতে। অফিসের সহকর্মীরা কি ভাষায় অভিনন্দন জানাবে, মনের কানে শুনলে তাও। তুমি শরীরচর্চায় ব্রতী হলে, রাত জেগে টিভি আর ভালো লাগলো না কারণ সারাদিন তুমি প্রচুর কাজ করেছ, করতে পেরেছো বলা উচিত।’ ‘কিন্তু এতো কিন্তু ভেবেও যদি আমার ঘুমোতেই ইচ্ছে করে?’ ‘প্রথম প্রথম তা হবেই। তবে যোগী বলতেন সদচিত্ত সদাই বদচিন্তাকে হারিয়ে জয়লাভ করে। তাই বহু বছর ধরে মনের মধ্যে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে পড়া নেতিবাচকতাকে যদি গুরুত্ব না দাও, তবে দেখবে, ওরওি এই অবাঞ্ছিত মনে আর বাসা বেঁধে থাকবে না।’ ‘ওরা কি সঞ্জীব নাকি যে সব বুঝবে? ‘হ্যাঁ, সজীব এবং সম্পূর্ণ তোমার নিয়ন্ত্রণে। বা ষ্টা করা, বদচিন্তা করার মতোই সহজ।’ ‘তাহলে নেতিবাচক তথ্য নিয়ে সারা পৃথিবীত। এতো মাতামাতি কেন?’ ‘কারণ তারা সুশৃঙ্খল চিন্দ্র ও আত্মত্মন্তিদ্রণের পদ্ধতি জানে না। বহু লোকের সঙ্গেই আমার আলাপ হয়েছে, যারা জানেই না যে তাদের মধ্যে প্রত্যেকটি চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা আছে। তারা ভাবে, চিন্তা তো মস্তিষ্কে আপনা থেকেই আসে। কখনো ভাবেও না যে, চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ না করলে চিন্তাই তাকে নিয়ন্ত্রণ করবে। ‘আমি যদি ভোরে উঠতে চাই, দুশ্চিন্তা কমাতে চাই, ধৈর্যশীল হতে চাই, বা সকলকে ভালোবাসতে চাই, তবে আমার মস্তিষ্কের যত নেতিবাচক চিন্তা সরিয়ে আমাকে ইতিবাচক চিন্তা করতে হবে, তাই তো?’ ‘তুমি যদি চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারো, মন তোমার নিয়ন্ত্রণে আসবে। মন নিয়ন্ত্রণে আসলে, জীবন নিয়ন্ত্রেণে আসবে। আর জীবন তোমার বশে এসে গেলে, তুমিই হবে তোমার ভাগ্য নিয়ন্তা।’ আমি এটাই শুনতে চাইছিলাম। আমি চাইছিলাম জেনি আর সন্তানেরাও শুনুক এই কথাগুলো। জানি আমার ক্ষেত্রে যেভাবে কাজ দিয়েছে, ওদেরও তাই

পৃষ্ঠা:১১৯

হতো। চিরকাল আমি সংসারী হতে চেয়েছি, কিন্তু আমাকে কাজ আমার আটকে রেখেছে। হয়তো এর কারণ, আমার নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারার অভাব। মনে হয় এই তো সেদিন, আমি আইন পড়াতাম। মনে মনে ভাবতাম, রাজনৈতিক নেতা হবো, বা শীর্ষ আদালতের বিচারপতি হবো। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বাধাধরা গণ্ডিতে আটকা পড়ে গেলাম। এমনকি জুলিয়ন সেই সময় আমাকে বলেছে, আত্মত্মতৃপ্তি কিন্তু মানুষের সব শেষ করে দেয়।’ আসলে আমি খিদেটা হারিয়ে ফেলেছিলাম। গাড়ি, বাড়ির খিদে নয়, জীবনে আরও বেশি করে বাঁচার, উৎসবে বাঁচার, তৃপ্তিভরে বাঁচার খিদে। জুলিয়ন বলে যাচ্ছিলো, একটা কথাও আমার কানে ঢুকছিল না। আমি দিবাস্বপ্ন দেখে যাচ্ছিলাম। আমার পঞ্চাশ বছর বয়স, ষাট বছর বয়স, আচ্ছা তখন কি একই কাজ করে যাবো? কিন্তু আমার যে জীবনে অনেক কিছু করার ইচ্ছে ছিল। হঠাৎ জেগে উঠলাম। সেই জাপানিদের ‘সাতোরি’র মতো। হঠাৎ জেগে ওঠা। মনে মনে শপথ নিলাম জীবনকে এভাবে আমি কিছুতেই বয়ে যেতে দেবো না। এই প্রথম আমার জীবনে কোনো স্বাধীনতার স্বাদ পেলাম। নিজের অন্তর্জগত থেকে আসা স্বাধীনতা, যা জীবনের প্রতিটি উপাদানের উপর নিজস্ব সীলমোহর লাগিয়ে তা আয়ত্তাধীন করে নেয়। ‘আমি তোমাকে ইচ্ছাশক্তি বৃদ্ধি করার একটি ফর্মুক্ত দেবো।’ জুলিয়ন জানলোও না ঠিক এই মুহূর্তে অতার ভিতরে কি রূপিক্টর ঘটলো। ‘জ্ঞানকে যথার্থ কাজে লাগানো না গেলে তা কোনো, আমিই নয়।’ প্রতিদিন কাজে যাওয়ার সময় তুমি মনে মনে কিছু কথা উচ্চরিই করবে। ‘এই কি সেই মন্ত্র, যার কথা আগে বলেছিলে? ‘হ্যাঁ গত পাঁচ হাজার বছর ধরে এই প্রথিবীতে রয়েছে এটি। কিন্তু সিভানার যোগীরা ছাড়া আর কেউ এর অস্তিত্ব সম্পর্কে জানে না। যোগী রমন বলতেন, এর বারবার উচ্চারণে আমার মধ্যে ইচ্ছাশক্তির বিকাশ ঘটবে, খুব কম সময়ের মধ্যেই। মনে রেখো শব্দের শক্তি অপরিসীম। শব্দ, শক্তির দৈহিক রূপ। আশার কথা মন ভরে দিলে তুমি আশাবাদী হয়ে উঠবে। দয়া, মায়ার কথায় মন ভরে গেলে, তুমি দয়ালু হয়ে উঠবে। সাহসিকতার কথা মনে আনবে সাহস। শব্দের অদ্ভুত ক্ষমতা।’ ‘বলো, আমি মন দিয়েই শুনছি।’ ‘দিনে অন্তত তিরিশ বার এই মন্ত্র উচ্চারণ করবে-‘যা দেখা যাচ্ছে, তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু আছে আমার মধ্যে। সমগ্র বিশ্বের শক্তি কেন্দ্রীভূত হয়েছে আমার মধ্যে।’ দেখবে জীবন বদলে যাবে তোমার। দ্রুত ফলের জন্য এই মন্ত্র আর তোমার লক্ষ্যকে মনশ্চক্ষে দেখার যে নীতি শিখিয়েছিলাম দুটির সমন্বয় করে অনুশীলন করবে। একটা নির্জন জায়গায় চোখ বন্ধ করে বসো।

পৃষ্ঠা:১২০

মনকে হটফট করতে দিও না। শরীর সোজা রেখে বোসো। শরীর চঞ্চল মানেই দুর্বল মনের পরিচায়ক। জোরে জোরে মন্ত্র উচ্চারণ করো। বারে, বারে উচ্চারণ করো। নিজেকে, মহাত্মা গান্ধী বা মাদার টেরেসা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলে যা করতেন, তেমন পরিস্থিতিতে ভাকে, ভাবে তোমার শরীর, মন, আত্মা সব তোমার বশে আছে। ফল খুব দ্রুত আসতে শুরু করবে।’ জুলিয়ন কথা দিল। ‘ব্যস, শেষ।’ এতো সহজ ফর্মুলা শিখে বললাম। ‘এই ফর্মুলা প্রাচ্যের ঋষিগণ যুগ যুগ ধরে শিখিয়ে এসেছেন তাদের শিষ্যদের। তার প্রধান কারণ এটি কার্যকরী। চাইলে আরো দুটি উপায় বলতে পারি আমি।’ ‘দয়া করে বলো ‘প্রথমত-যা করতে ইচ্ছে করে না, তাই করা শুরু করো। যেমন রাতে বিছানা করা বা বিছানা তোলা। সকালে গাড়িতে অফিস না দিয়ে হেঁটে যাওয়া। নিজের অভ্যাসকে জোর করে পরিবর্তন করলে, নিজের দুর্বল ইচ্ছাগুলোর দাস হয়ে আর থাকতে হবে না।’ “মানে, হয় ব্যবহার করো, নয়তো নষ্ট করে ফেল ‘ঠিক তাই। ইচছাশক্তি আর মনের শক্তিকে গড়ে তুলতে, তার ব্যবহার করতে হবে। যত তুমি আত্ম-শৃঙ্খলার বীজকে লালন পালন করবে তত তাড়াতাড়ি সে ফল দেবে তোমায়। আর দ্বিতীয়টি যোগী রমনের সবচেয়ে প্রিয়। সারাদিন কোনো কথা না। বলা, যদি না কোনো সরাসরি প্রশ্ন করা হয় ‘মৌনব্রত অবলম্বন?’ ‘আসলে ব্যাপারটা তাই ছিল। তিব্বতের লামারা এটিকে জনপ্রিয় করেছিলেন। তারা বিশ্বাস করতেন, দীর্ঘসময় ধরে বাক সংযম করলে বা মৌন থাকলে, তা তোমার সুশৃঙ্খল জীবন তৈরিতে সহায়ক হয়।’ ‘কিভাবে?’ ‘একদিন মৌন থাকার মাধ্যমে তুমি তোমার ইচ্ছাকে তোমার আদেশ মতো কাজ করাতে বাধ্য করো। যতবারই তুমি মনে করছো এবার কিছু বলতে হবে, বা বলার ইচ্ছা আগছে, ততবারই তুমি জোর করে নির্বাক থাকছো। ইচ্ছার কিন্তু কোনো মন নেই। সে কোনো কাজ করার জন্য তোমার আদেশের অপেক্ষায় থাকে। বারে বারে, যত বেশি এর উপর নিয়ন্ত্রণ চাপাবে, এটি তত শক্তিশালী হয়ে উঠবে। সমস্যা হলো অধিকাংশ মানুষই ইচ্ছাশক্তির ব্যবহার করে না বা জানে না তার ব্যবহার পদ্ধতি।’

পৃষ্ঠা ১২১ থেকে  ১৩০

পৃষ্ঠা:১২১

‘কিন্তু কেন?’ ‘কারণ তারা তাদের মধ্যে এই শক্তি আছে বলে জানেই না। নিজেকে ছাড়া এরা বাকি সকলকে, সবকিছুকে দায়ী করে। অসম্ভব বদরাগী মানুষ বলবে, ‘আমি কি করবো? আমার বাবারও এরকম রাগ ছিল। প্রচণ্ড দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মানুষ বলে, ‘আমি কি করবো, আমার কাজটাই টেনশনের। যে খুব বেশি ঘুমোয় সে বলবে, ‘আমি কি করবো, আমার শরীরের অন্তত দশঘন্টা ঘুম প্রয়োজন।’ কিন্তু কেউ নিজের দুর্বলভাটা প্রকাশ করবে না। এদের কারও মধ্যে সে দায়িত্ববোধটা নেই, যা একমাত্র জানা সম্ভব যদি কেউ নিজে প্রকৃত সম্ভাবনা এবং কাজ করার ক্ষমতা সম্পর্কে অবহিত হয়। এই সম্ভাবনাকে যদি অনুপ্রেরণা দেওয়া যায়, তবে তা কাজে পরিণত হয়। যদি তুমি প্রকৃতির যুগ যুগ ধরে চলে আস্য নিয়মগুলোকে জানো যা বিশ্ব ব্রহ্মান্ডকে ও তার মধ্যে বাস করা প্রাণীদের পরিচালনা করছে, তবে তুমি বুঝবে যে তুমি যা হতে চাও, তা হওয়া তোমার অনুসিদ্ধ অধিকার। এবং নিজের অতীতের অন্ধকার কুঠুরিতে আটকে থাকার থেকে অনেক বড় কাজ করার সময় আছে তোমার। আর তার জন্য নিজের ইচ্ছাশক্তি বিকাশ ঘটানো প্রয়োজন।’ ‘খুব গুরুগম্ভীর তত্ত্ব।’ ‘আদতে তা নয় একেবারেই। ভীষণ বাস্তব খাস্তগীর ভাবো তো তোমার ইচ্ছাশক্তি যদি দ্বিগুণ বা ত্রিগুণ হয়ে যায়, করে শরীরচর্চা শুরু করার স্বপ্ন দুশ্চিন্তা না করার প্রচেষ্টা বা ভালো স্বামী হওয়ার প্রচেষ্টা সবই সফল হবে। বেঁচে থাকার যে আকাঙ্ক্ষা তুমি হারিয়ে ট্রেইলছিলে, ফিরে আসবে তাও।’ ‘তাহলে মোটকথা হলো, ইচ্ছাশক্তির নিয়মিত ব্যবহার?’ ‘হ্যাঁ। রকেট যেমন পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ ছাড়িয়ে মহাশূন্য পাড়ি দেয়, ঠিক তেমনই নিজের বদভ্যাসের আর দুর্বল ইচ্ছার মাধ্যাকর্ষণ ছাড়িয়ে এগিয়ে হয়।’ যাও। তারপর দেখো, কয়েক সপ্তাহ পর কি তবে একদিনে সব বদলে ফেলতে চেষ্টা করো না। ছোট দিয়ে শুরু করো। আমরা তিল তিল করে বড় হই। ঘুম থেকে ওঠার সময়টাকে এক ঘণ্টাও যদি এগিয়ে আনতে পারো আর তাতেই যদি লেগে থাকো, তবে আত্মত্মবিশ্বাস অনেকটা বেড়ে যাবে।’ ‘এদের মধ্যে যোগসূত্রটা বুঝলাম না।’ ‘ছোট ছোট জয়, বড় বিজয়ের পথে নিয়ে যায়। সকালে ঘুম থেকে ওঠার মতো একটা ছোট বিষয়ও, সফলতার অনুভূতি নিয়ে আসবে তোমার মধ্যে। একটা লক্ষ্য স্থির করেছিলে আর তা পূরণে সক্ষম হয়েছ। একটা ভালো

পৃষ্ঠা:১২২

লাগার উপলব্ধি হয়। একটু একটু করে তোমার লক্ষ্যটাকে উঁচু করলে, মানদণ্ড ক্রমেই ওপরে উঠবে। তুমি কি করতে ভালোবাসে?’ হঠাৎ প্রশ্ন করে জুলিয়ন। ‘ভীষণ। জেনির আর আমি সময় পেলেই বাচ্চাদের পাহাড়ে নিয়ে যাই। যা অবশ্য খুব কমই হয়ে থাকে।’ ঠিক আছে। তাহলে ভাবো, প্রথম যখন পাহাড়ের ওপর থেকে নীচে নামার জন্য গুরুটা করো, প্রথমে ধীরে এগোও, তারপর প্রায় উড়তে উড়তে। পাহাড়ের গা বেয়ে নামো, যেন কাল বলে আর কিছু নেই।”আমাকে নিনজা স্কায়ার বলতে পারো। আমি দ্রুতগতিতে স্কি করতে দারুণ পছন্দ করি।’ ‘অত দ্রুত তুমি যাও কি করে?’ ‘আমার বাতাসে চলার পক্ষে জুৎসই, চাবুকের মতো সুন্দর চেহারার সাহায্যে। রসিকতা করে বলি। ‘দারুণ প্রচেষ্টা। জুলিয়ন হাসে। ‘তবে মোমেন্টার কথাটা শুনতে চাইছিলামআমি। সুশৃঙ্খল জীবন গড়ে তোলার মূল উপাদান হলো MOMENTUM বা গতি। যেমন বলেছিলাম ছোট ছোট কাজ যেমন ভোর ওঠা, হাঁটা, টিভি দেখতে দেখতে নিজেকে ‘অনেক হয়েছে’ হচ্ছে তা বন্ধ করে দেওয়া, এর থেকেই আসে নিজের সর্বোচ্চ সত্তায় পৌছুলোর সুযোগ। দেখবে এমন কাজ তুমি করছো, যা তুমি করতে পারো বলোতোমার জানা ছিলো না।’ এই তত্ত্ব শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেখলাম সূর্যের প্রথম রশ্মি আমার বসার ঘরে উকি মারছে। অন্ধকারের চাদর সরিয়ে ঠিক যেমন করে একটি শিশু ময়লা চাদর সরিয়ে ফেলে দেয়, তেমনিভাবে আজ সূর্যকে দেখলাম নতুন করে। আজ খুব সুন্দর হবে দিনটা। আমার দশম অধ্যায়ের সংক্ষিপ্তসার প্রতীক চিত্র সুশৃঙ্খলভাবে বাঁচো। ছোট ছোট সাহসিকতার কাজ করে শৃঙ্খলতা আনতে হয় আন জীবনে।

পৃষ্ঠা:১২৩

আত্মশৃঙ্খলার ভ্রণকে যত লালন-পালন করবে, তত বেশি সে ম্যাচিওর হয়ে উঠবে। সার্থক জীবনের অন্যতম আবশ্যক গুণ হলো ইচ্ছাশক্তি কলাকৌশল মন্ত্র সৃজনশীল অর্ন্তদৃষ্টি মৌনব্রত উদ্ধৃতি মনের প্রাসাদে ঢুকে পড়া দুর্বল চিন্তার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করো। তারা বুঝবে যে এখানে তারা অনাহুত এবং এই ব্যক্তির মন ছেড়ে তারা নিজেরাই পালিয়ে যাবে।

পৃষ্ঠা:১২৪

অধ্যায় ১১

জীবনের এক অত্যধিক মূল্যবান বস্তু

‘সুবিন্যস্ত সময় সুবিন্যস্ত মনের পরিচায়ক।’ -স্যার আইজাক পিটম্যান ‘জীবনে সবচেয়ে মজার ঘটনা কি জানো? জুলিয়ন প্রশ্ন করলো। ‘কি?’ ‘মানুষ যতদিনে বুঝতে পারে জীবনে সে কি চায়, কিভাবে তা পেতে পারে ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যায়। কথায় বলে না, ‘যৌবনে যদি জানতে পারতাম, পরিণত বয়সে যদি কাজটা করতে পারতাম (ইফ ঈরুখ ওনলি নিউ, ইফ এজ ওনলি কুড)’। ‘যোগী রমনের গল্পস্টপওয়াচ কি এরই কথা বলে?’ ‘হ্যাঁ, নগ্ন ন ফুট লম্বা, নশো পাউন্ড ওজনের সুমো কৃত্তিধির যার গোলাপী তারজাল বাঁধা, একটা চকচকে, সোনার স্টলওয়াচের ওপর পড়ে যায়, যেটা কেউ ওই সুন্দর বাগানে ফেলে গেছে’- আনে আ আছে তো গল্পটা? ‘ভুলি কি করে।’ তবে এবার বুঝেছি যোগী রমনের খয়ের চরিত্রগুলো সবই প্রতীকী, জুলিয়নকে জ্ঞানালোকে পাড়ি দেখার প্রাচীন সূত্রগুলো শেখানো ও মনে রাখার সুবিধার জন্য। আবিষ্কারের কথাটা জানালাম ওকে। ‘ই, আইনজ্ঞের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ঠিকই কাজ করছে। আমার গুরুর শিক্ষাপদ্ধতি প্রথমে খুব অদ্ভুত লেগেছিল আমারও, যেমন তোমার লেগেছে। তবে একথা বলতে পারি জন, বাগান থেকে নগ্ন সুমো কুস্তিগির, হলুদ, গোলাপ, হীরে বিছানো পথ। এই গল্পের সাতটি উপাদানই যা সিভানায় শিখেছি, তা এভাবে মনে রাখতে খুব সুবিধা হয়েছে আমার। এমন একটা দিনও যায় না যেদিন এই প্রতীকের মাধ্যমে সেই অবিনশ্বর সূত্রগুলোর কথা, এই গল্পগুলোর কথা একবারও আমি মনে করি না।’ ‘এবার বল এই চকচকে ঘড়িটা কিসের প্রতীক?’ ‘সেটা আমাদের জীবনের সবচেয়ে দামি এবং গুরুত্বপূর্ণ বস্তুর প্রতীক সময়। ‘ইতিবাচক চিন্তা, লক্ষ্য-নির্ধারণ আর আত্মনিয়ন্ত্রণ, এগুলো তবে কি?’ ‘সময়কে বাদ দিলে এগুলো কিছুই নয়। সিভানায় থাকার প্রায় ছ’মাসের মাথায়, একদিন হঠাৎ আমার ফুলে ছাওয়া কুটিরে বসে যখন পড়াশুনা

পৃষ্ঠা:১২৫

করছিলাম, তখন হঠাৎই এক যোগী আমার ঘরে এলেন। তার নাম দিব্যা (দিভিয়া)। অসাধারণ সুন্দরী, সারা পিঠ জুড়ে ছড়ানো দিঘল কালো চুল। সুমিষ্ট হরে তিনি বললেন যে, এই সিভানায় তিনি সবচেয়ে কম বয়েসী সাধক, এবং তিনি জুলিয়নের কুটিরে এসেছেন যোগী রমনের নির্দেশে, জুলিয়নকে জানাতে যে, সে হলো যোগী রমনের সর্বশ্রেষ্ঠ শিষ্য।’তিনি বললেন, ‘হয়তো অতীতের জীবনে আপনি এতো যন্ত্রণা ভোগ করেছেন বলেই, আমাদের জ্ঞানভাণ্ডারকে এতো উদার মনে গ্রহণ করতে পেরেছেন। তাই এই সিভানা সম্প্রদায়ের সকলের তরফ থেকে সর্বকনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে আমাকে পাঠানো হয়েছে আপনাকে এই উপহারটি দেওয়ার জন্য। আমাদের সকলের ভালোবাসা আর শ্রদ্ধাস্বরূপ সামান্য উপহার এটি। এতোদূর দেশ থেকে এসেছেন আপনি, শুধু এই প্রাচীন সূত্রগুলো জানতে। কখনো আমাদের নীতিগুলোকে বিদ্রুপ করেননি। যদিও আর কিছুদিনের মধ্যেই ফিরে যাবেন আপনি, তবু আমরা আপনাকে আমাদেরই একজন বলে মনে করেছি এতোদিন। কোনো বহিরাগত কখনো এমন কোনো জিনিস এখান থেকে পায়নি যা আমি আপনাকে দিতে চলেছি। আমাদের আমাদের এখানকারপ্রত্যেক সাধকই অল্পবয়সে এটি উপহার পেয়েছেন।’ ‘কি সেটা?’ অধৈর্য হয়ে জানতে চাইলাম। দিব্য তার হাতে বোনা কাপড়ের থলি থেকে গন্ধী কাগজে মোড়া (যেমনটা এর আগে কখনো দেখিনি ওখানে থাকাকালীন সময়ে) একটু ক্ষুদ্র বালি-ঘড়ি বের করলো। গলানো কাঁচে ও চন্দড়াঠেই তৈরি ঐ ঘড়িটি। আমার সুখের ভাব লক্ষ্য করে দিব্যা বলবেন, ‘আমাদের নিজস্ব কোনো সম্পত্তি নেই। আমরা অত্যন্ত সহজ, সরল, শুদ্ধ জীবনযাপন করি এখানে। কিন্তু আমরা সময়কে খুবই সমীহ করে চলি। এই ছোট বালিঘড়িটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সময় বহমান, আর আমরা কেউ-ই জীবনে অমর নই। তাই প্রতিমুহূর্ত লক্ষ্যে অবিচল থেকে আরও বেশি সম্পূর্ণতা ও সৃজনশীলতার সঙ্গে বাঁচার অভ্যাস গড়ে তুলি। ‘হিমালয়ের ওই উচ্চতায়, যোগীরা সময়ের হিসেব রাখেন?’ ‘এরা প্রত্যেক সময়ের গুরুত্ব খুব ভালো বোঝেন। এরা প্রত্যেকেই সময় এর বহমানতা সম্পর্কে অত্যান্ত সজাগ। এদের কাছেই আমি শিখেছি, হাতের মুঠো থেকে বালি যেমন আঙুলের ফাঁক দিয়ে করে পড়ে, ঠিক তেমনই সময়ও আমাদের মুঠো করা জীবন থেকে প্রতিমুহূর্তে হারিয়ে যায়, আর কথনো ফেরে না। খুব অল্প বয়েস থেকে যারা সময়ের সদ্ব্যবহার করতে

পৃষ্ঠা:১২৬

শেখে, তারা সমৃদ্ধ, ফলদায়ী এবং পরিতৃপ্ত জীবন কাটায়। ‘সময়ের উপর কর্তৃত্ব যে আসলে জীবনের উপর কর্তৃত্ব’ এর কথা যারা জানে না, তারা তাদের নিজেদের ভিতরে যে প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে, তা সম্পর্কে ওয়াকিবহালসময় কিন্তু বিরাট সমতা নিয়ে আসে। ট্রেক্সাস হোক বা টোকিও, কোলকাতা হোক বা কুয়ালালামপুর, সময় সবার জীবনেই বাধা। দিনে সময় মাত্র সেই চব্বিশ ঘণ্টাই। সফল মানুষেরা অন্যদের চেয়ে আলাদা হয় ওই একটা জায়গায়ই। সময়ের ব্যবহারটা করে তারা খুবই নিপুণভাবে।’ কথনো অবহেলার পাত্র ভাবে না।’আমি একসময় বাবাকে বলতে শুনেছিলাম, সবচেয়ে ব্যস্ত মানুষদের হাতেই তবু কিছু সময় থাকে। কেন বলতেন তা তখন না আনলেও আজ তার মানেটা কিছু বুঝি।”কারণ ব্যস্ত, সৃজনশীল মানুষেরা সময়ের সঠিক বিন্যাস ও সঠিক বিভাজনে দক্ষ হয়। আর তাই শত ব্যস্ততার মাঝেও তার সঠিক সময় বের করে সঠিক কাজটাকে করে ফেলে। সময় পরিচালনা করতে জানলেই যেইে কাজ পাগল হয়ে যাবে, তার কোনো মানে নেই। তবে সময়ের উপর কর্তৃত্ব করতে পারলে এমন অনেক কিছু করা যায়, যা তুমি করিতে পছন্দ করো। যা তোমার কাছে অর্থপূর্ণ। সময়কে ভালো করে গেলে রেখো জন। একবার হাত থেকে বেড়িয়ে গেলে এ আর ফিরে আসছে না কখনো। তোমাকে একটা উদাহরণ দিই। ধরো সোমবার তোমার প্রচুর কাজ আছে। প্রচুর অ্যাপয়েন্টমেন্ট, মিটিং, কোর্টে ছুটতে হবে। সকাল ৬.৩০ টায় উঠে এক কাপ চা, কোনোরকমে গলাধঃকরণ করে কাজে না ছুটে, বরং আগের দিন রাতে নোট বইতে, কোন কাজটা কখন করবে তার একটা ছক কষে রাখো। বা পারলে রবিবার সকালে বসে, সাবা সপ্তাহেরই একটা প্ল্যান, যেমন, কখন মক্কেলদের সঙ্গে কথা বলবে, কখন আইনি সমীক্ষা সারবে, কখন মক্কেলদের ফোন করবে, এবং শুধু পেশাগত নয় তার একটা ছক করে রাখো। ব্যক্তিগত এবং আধ্যাত্মিক কাজেরও হিসেব থাকলে তা লিখে রাখো। এ ছোট নোটবই দেখবে তোমার জীবনে কেমন ভারসাম্য এনে দেয়। তোমার জীবনের সবকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের সমাহার, তোমার প্রতিদিনের জীবনে ঘটাতে পারলে, দেখবে সপ্তাহটা তো বটেই, পুরো জীবনটাই কতো শান্তিতে আর অর্থপূর্ণভাবে কাটে। ‘তুমি নিশ্চয়ই কাজের ফাঁকে উঠে আমায় ধ্যান করতে যা পার্কে হেঁটে আসতে বলছো না।’

পৃষ্ঠা:১২৭

‘আমি তাই বলছি। তুমি চিরাচরিত ধ্যান ধারাতেই এতো আবদ্ধ কেন, জন?’ অন্য সবাই যা করে তোমাকেও যে তাই করতে হবে তার কি মানে আছে? নিজের রেসে দৌড়াও। নিজের ছন্দে। দিনের কাজটা তো একঘন্টা আগে শুরু করলেই হয়, যাতে মাঝামাঝি কোনো একটা সময় অন্তত ঘণ্টাখানেক অফিসের পাশের পার্কে একটু হেঁটে আসা যায়। সপ্তাহের কাজটাকে এমনভাবে সাজাও যাতে অন্তত শুক্রবার বাচ্চাদের নিয়ে একটু চিড়িয়াখানায় ঘুরে আসা যায়। বা সপ্তাহে দুটো দিন বাড়ি থেকেই তোমার কাজগুলো সারো। তাতে বাড়ির লোকের সঙ্গেও একটু বেশি সময় কাটানো যাবে। আমি বলছি তোমার সময়টাকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করো।’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ যেন কখনোই, কম জরুরি কাজের চাপে চাপা না পড়ে থাকে। আর মনে রেখো পরিকল্পনা করতে ব্যর্থ হওয়ার অর্থ ব্যর্থ হওয়ার পরিকল্পনা করা। মক্কেলদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় শুধু নয়, নিজের সাথে সাক্ষাতের সময়, বিশ্রামের সময় বা স্ত্রীকে প্রেমপত্র লেখার সময়টাও যদি অজুগে থেকেই ছক করে নাও, দেখবে সময় সৃজনশীল হয়ে উঠবে তোমার জীথৰো। কখনো ভুলো না তথাকথিত অকাজ করে কাটানো সময় যদি তোমাকে সমৃদ্ধ করে তোলে, তাহলে তা কখনোই বিফলে যাওয়া সময় নেয়। ওটাই তোমায় কালের সময়কে আরও দক্ষ, আরও তরতাজা করে তোলে। ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে বাঁচা বন্ধ করো। আসলে যেখানে যাই কর, পুরোটা মিলিয়েই আসল তুমি। বাড়িতে লোকের সঙ্গে যেমন শ্রীরহার করো, তার প্রভাব পড়ে তোমার কাজে, আবার অফিসে যেমনভারে লোকের সাথে ব্যবহার কর বা মিশো, তার প্রভাব পড়ে তোমার পারিবারিক জীবনে।’ ‘আমি তোমার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত। তবে সত্যিই আমার পক্ষে কাজের ফাঁকে সময় বের করা সন্ধ্যেবেলা সময় বের করা একেবারেই অসম্বব। আজকাল কাজের চাপে আমি নুয়ে পড়েছি।’ কথাটা বলামাত্র আমার পাহাড় প্রমাণ কাজের কথা ভেবে শরীরটা কেমন করে উঠলো। ‘ব্যস্ততার দোহাই দিও না। আসল প্রশ্ন হলো, তুমি কিসে এতো ব্যস্ত? ওই প্রবীণ সন্ন্যাসীদের কাছে আমি শিখেছি, যেসব কাজ তোমার জীবনের মাত্র কুড়ি শতাংশ সময় দখল করে রাখে তা আসলে আশি শতাংশ ফল দেয়। অর্থাৎ বাকি আশি শতাংশ কাজ একেবারেই নিম্বল। যোগী রমন একে বলতেন ‘কুড়ির প্রাচীন নিয়ম।’ ‘বুঝলাম না।’ ‘আচ্ছা, চলো আবার তোমার বাস্তু সোমবার ফিরে যাই। সকাল থেকে রাত অবধি তুমি ফোনে কথা বলে, আইনি কাগজ তৈরি করে, ছোট ছেলেকে গল্প শুনিয়ে, বউ এর সাথে গল্প করে কাটিয়ে দাও, ঠিক?

পৃষ্ঠা:১২৮

‘হ্যাঁ, ঠিক।’কিন্তু এই একশো কাজের মধ্যে তোমার কি মনে হয় ফোনে গল্প করা, রেস্টুরেন্টে বসে কাটানোর সময়, চুলার পাশে গল্প করে কাটানো সময়, টিভি দেখে কাটানো সময় আজ থেকে কুড়ি বছর বাদে কোনো কাজে আসবে তোমার? বরং হয়তো সেই দিনে এমন কয়েকটা কাজ করেছ, যা মাত্রই কুড়ি শতাংশ সময় নিয়েছে তোমার চব্বিশ ঘণ্টার, তা তোমাকে কুড়ি বছর বাদেও ফল দেবে। একেই বলে ‘উচ্চ প্রভাবশালী কাজ।’ ‘তুমি বলছো যেমন আইনি পড়াশুনা করা, মক্কেলদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা, কোনো বড় অ্যাডভোকেটদের সঙ্গে সময় কাটানো ইত্যাদি?”হ্যাঁ, এবং স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের সঙ্গে সম্পর্ক সুন্দর করে গড়ে তোলা, প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানোর, নিজের মনকে তরতাজা করে তোলা, এ সবই ওই ‘উচ্চ প্রভাবশালী কাজের আওতায় পড়ে। জানবে জ্ঞানী লোকেরা সর্বদাই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করে থাকেন। এটাই তাদের সময় নিয়ন্ত্রণের গোপন কথা। ‘দারুণ! এ সবই তোমায় শিখিয়েছে যোগী রমন?’ ‘আমি জীবনের ছাত্র হয়ে গিয়েছি জন। যোগী আমাকে বহু কিছু  শিখিয়েছেন। সারা জীবন কৃতজ্ঞ থাকবো তার কছে। কিন্তু আমার নিজের অভিজ্ঞতা আমাকে যে শিক্ষা দিয়েছে, তা দিয়ে আমার সব ধাঁধা কাটিয়ে, সকল ‘জিগস’ পাজল’ গুলো গুছিয়ে, সাজিয়ে ফেলতে পেরেছি। তুমি নিশ্চয়ই আমার জীবন থেকে, আমার ভুল থেকে শিক্ষা নেবে। জন, জীবনে কেউ দেখে শেখে, তারা বুদ্ধিমান। আর কেউ ঠেকে শেখে, তারা অনেক কষ্ট ও যন্ত্রণা পায় জীবনে।’ জীবনে ‘টাইম ম্যানেজমেন্টের’ বহু সেমিনারে গিয়েছি আমি আইনজীবী হিসেবে। কিন্তু জুলিয়ন আজ যা শেখালো তেমন কখনা শুনিনি। টাইম ম্যানেজমেন্ট শুধু পেশাগত কাজকে বিন্যস্ত করতে শেখায় না। বরং এটি এমন একটা সামগ্রিক ব্যবস্থা যা আমার সম্পূর্ণ জীবনে ভারসাম্য ও পরিপূর্ণতা এনে দিতে পারে। এবং এর জোরেই আমি আরো বেশি সৃজনশীল ও সুখী হতে পারবো। ‘তাহলে তো বলতে হয় জীবন হলো বেকনের একটি মোটা স্ট্রিপ। যার মাংসটি থেকে চর্বিটাকে আলাদা করে দিতে পারলেই, সময়ের উপর প্রভুত্ব করা যাবে।’ ‘খুব ভালো। দারুণ বুঝতে পারছো তুমি। যদিও আমার নিরামিষভোগী মন তোমার উদাহরটা ঠিক নিতে পারল না, তবে তুমি একদম ঠিক জায়গাটা

পৃষ্ঠা:১২৯

ধরতে পেরেছো। যদি তুমি মাংসের দিকে বেশি নজর নাও, তবে চর্বির দিকে তোমার আর নজর পড়বে না। আর এই সময় তুমি সাধারণ থেকে অসাধারণত্বের দিকে এগিয়ে যাবে। জ্ঞান মন্দিরের ঘণ্টা বেজে উঠবে, নতুন দ্বার যাবে খুলে। তোমাকে একটা কথা বলি। সময়-চোরদের কাছ থেকে সাবধান থেকো। বাচ্চাদের গল্প পড়ে ঘুম পাড়িয়ে যেই রোমাঞ্চকর উপন্যাসটা নিয়ে আরাম কেদারায় গা এলিয়েহ, অমনি এরা হানা দেবে তোমার টেলিফোনে। হয়তো অফিসের কাজের মাঝে নিঃশ্বাস ফেলার একটু সময় পেয়েছ, অমনি এরা হাজির হবে তোমার কাছে। এ রকম কি হয় না?’ ‘যথারীতি, তুমি তো জানো জুলিয়ন। আমি এদের চলে যেতে বলতেও পারি না, আবার নিজে দরজাও বন্ধ রাখতে পারি না।’ ‘এবার সময়ের ব্যাপারে তোমার নিষ্ঠুর হতেই হবে। না বলতে শেখো। ছোট খাটো ব্যাপারে ‘না’ বলতে শিখলে তবেই বড়সড় ব্যাপারে হ্যাঁ বলতে পারবে। বড় কোনো ‘কেস’ নিয়ে ভাবতে বসলে, অফিসের দরজা বন্ধ করে রাখবে। ফোন বাজলেই তা ধরতে যাবে না। ফোনটা তোমার সুবিধের জন্য রয়েছে, অন্যদের সুবিধের জন্য নয়। মজার কথা হলো, কন্যরা যখন দেখবে তুমি সময়কে প্রচণ্ড মূল্য দিচ্ছে, তখন তারা তোমাকে শ্রদ্ধা করতে শুরু করবে। তারা বুঝবে তোমার সময়ের দাম আছে। আর তারাও সেই দাম দেবে।’ ‘দীর্ঘসূত্রিতা সম্পর্কে কিছু বলতে পাজ্যে এমন অনেক সময়ই হয় যখন যে কাজটা করছি তা করতে আর ইচ্ছা করে না, আর সঙ্গে সঙ্গে সেটাকে বন্ধ। করে আমি জাঙ্ক মেল খুলে বসি, এ কি শুধু সময় নষ্ট করা?” ‘সময় নষ্ট করা কথাটা ঠিক হলো না। এটা মানুষের প্রকৃতি। যে কাজটা ভালো লাগে তাই করে, যা করতে ভালো লাগে না তা ক্রমাগত এড়িয়ে যায়। তবে আগেই বলেছি সৃজনশীল মানুষ ভালো না লাগলেও এমন কাজ করে, যা অনারা করতেই চায় না।’ চুপ করে গেলাম। ভাবলাম দীর্ঘসূত্রিতা আমার সমস্যা নয়। আমার জীবন অকারণেই বড় জটিল হয়ে গেছে। জুলিয়ন বুঝলো আমি কি ভাবছি। ‘যোগী রমন বলতেন, যারা সময়ের উপর প্রভুত্ব করেন, তারা খুব সহজ, সবল জীবনযাপন করেন। দ্রুতলয়ের জীবন প্রকৃতির নিয়মের পরিপন্থী। উনি বিশ্বাস করতেন দীর্ঘস্থায়ী আনন্দ তারাই উপভোগ করেন যারা জীবনটাকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌছানোর মাধ্যমে কার্যকরীভাবে অতিবাহিত করতে পেরেছে। তাতে নিজের শান্তি জলাঞ্জলি দিতে হয় না।’

পৃষ্ঠা:১৩০

আমি ধীরে ধীরে মনের কথা খুলে বললাম জুলিয়নের সঙ্গে। আমি তোমাকে সত্যি করে বলছি জুলিয়ন, পরিতৃপ্ত, সুখী জীবনের আশায় আমি আমার প্রাকটিস, আমার বাড়ি, আমার গাড়ি এসব ত্যাগ করতে চাই না। আমার যত বিষয় আশায় আছে তা ছাড়তে চাই না। ওই সবই আমার কষ্ট করে বড় হয়ে ওঠার পরিচায়ক। কিন্তু তবু মাঝে মাঝে বড় ফাঁকা লাগে। জীবনে কতো কি করার আছে। কতো স্বপ্ন আছে। দেখ প্রায় চল্লিশ বছর বয়স হলো। তবু আজও ‘গ্রান্ড ক্যানিয়ন’ আ আইফেল টাওয়ার’ দেখা হলো না কোনোদিন। আজ পর্যন্ত মরুভূমির বালিতে হাঁটতে পারলাম না, পারলাম না কোনো গ্রীষ্মের বিকেল, শান্ত কোনো লেকের জলে ডিঙি নিয়ে ভেসে যেতে। জুতো, মোজা খুলে রেখে, পার্কের ঘাসে হেঁটে বেড়ানো হলো না আজও। শেষ কবে যে তুষারপাতের শব্দ শোনার জন্য একা একা হাঁটতে বেড়িয়েছ, তা মনেও পড়ে না।’তাহলে জীবনটাক সরল করে ফেলো, সহানুভূতির সঙ্গে বলল্যে জুলিয়ন। প্রাচীন সরল জীবনের নীতি অনুসরণ করলে, জীবনটাকে উথগে করতে। পারবে। সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা হলো, অধিকাংশ মানুষ অপেক্ষা করে থাকে কবে তাদের জীবনে অলৌকিক গোলাপ বাগানের আবির্ভাব হবে। অথচ নিজের বাড়ির পিছনে যে ছোট বাখ্যানটা আছে ভিন্ন দিকে। চেয়েও দেখেনা।”কোনো পরামর্শ?'” ‘সেটা তোমার চিন্তাশক্তির উপরেই হাড়বাড়ি। আমি যা যা। আজ রাতে তোমায় বলেছি, তার ঠিক ঠিক প্রয়োগ করলে, তোমার জীবন অন্য সাজে সেজে উঠবে। ওহ, এ সূত্রে অন্য একটু কথা মনে পড়ল যা তোমার জীবনকে সরল তরতাজা, প্রাণচঞ্চল আর যৌবনদীপ্ত করে তোলে। বলতে পারো একটা ‘বিউটি স্লিপ’ আমার খুব প্রয়োজন হয়।’ ‘সৌন্দর্য সম্পর্কে এতো সচেতন তো তুমি কখনো ছিলে না।’ ‘তুমি কিন্তু রসবোধ বা সেন্স অফ হিউমার নিয়ে সর্বদাই সচতন ছিলে আর তার জন্য তোমায় আমি তারিফ করি। হাসির একটা বড় প্রভাব পড়ে জীবনে। জীবনের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা কাটাতে সঙ্গীতের যা ভূমিকা, হাসিরও তাই। যোগী রমন আমাকে বলতেন, ‘হাসি হৃদয়ের দ্বার খুলে দেয়, আত্মাকে আরাম দেয়। জীবনটাকে এতো গুরুগম্ভীর করে তোলা উচিত নয় যে মানুষ

পৃষ্ঠা ১৩১ থেকে  ১৪০

পৃষ্ঠা:১৩১

নিজেকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করতে ভুলে যায়। পরিশেষে জন, আরও পাঁচশো বছর বাঁচবে ভেবে, জীবনটাকে পরিচালনা করো না। দিব্যা যেদিন আমার কাছে ওই বালিঘড়িটা নিয়ে এলো, সেদিন কতোগুল্যে কথা বলেছিল আমায়। যা আজও ভুলিনি। বলেছিল, গাছটি পোঁতার সেরা সময় আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে। আর দ্বিতীয় সেরা সময়টি হলো আজ। এক সেকেন্ড। সময়ও আরা নষ্ট করো না। মৃত্যুশয্যার মানসিকতা গড়ে তোলো।’ ‘কি বললে? মৃত্যুশয্যার মানসিকতা?”আসলে এটা একটা জীবনদর্শন। এমনভাবে জীবনযাপন করো, যেন আজই তোমার শেষ দিন। আর সেই ভেবেই পুরোপুরি উপভোগ করো জীবনটাকে। ‘শুনতে কেমন অদ্ভুত।’ ‘সকালে উঠে নিজেকে প্রশ্ন করো,’আজ যদি শেষ দিন হয় জীবনের তাহলে কি কি করে যেতে চাইবো আমি? পরিবার, পরিজন, বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী সবার সঙ্গে কেমন ব্যবহার করতে চাইবে? দেখবে প্রতিটি সেকেন্ড কেমন করে পুরোপুরি উপভোগ করো তুমি। প্রতিটি কাজে কেমন উৎসাহ অনুভব করো। দেখবে শুধুমাত্র অর্থপূর্ণ কাজেই তুমি সময় দিচ্ছ আর যেসব তুচ্ছ কাজ তোমাকে সংকট আর বিশৃঙ্খলার পঁচা পাড়ক টেনে নিয়ে যাবে, তা থেকে দূরে থাকছ।’ জুলিয়ন বলে চললো, ‘আরো অভিজ্ঞতা অনেক্ট করো। সমস্ত প্রাণশক্তিকে কাজে লাগিয়ে তোমার স্বপ্নের দিগন্তকে প্রসারিত কর। তোমার মধ্যে অসীম সম্ভাবনা আছে, তা জানা সত্বেও মধ্যমাদের জীবনযাপন করো না। তোমার মহত্তকে প্রকাশ করার সাহস দেখাও এটা তোমার জন্মগত অধিকার।”জোরালো বক্তব্য।’ ‘যে হতাশা এতো মানুষকে যন্ত্রণা দিচ্ছে তারও সহজ সমাধান আছে।’ ‘আমার আরও অনেক কিছু আনার বাকি আছে।’ মৃদু স্বরে বললাম। ‘এমনভাবে কাজ করো, যেন মনে হয় সাফল্য নিশ্চিত, ব্যর্থতা অসম্ভব। বৈষয়িক হোক বা আধ্যাত্মিক, যে উদ্দেশ্যই তোমার থাকুক না কেন, তা ব্যর্থ হওয়ার চিন্তা মাথাতেই এনো না। অতীতের কারাগারে বন্দি হয়ে থেকো না। তোমার কল্পনার আকাশে কোনো সীমারেখা টেনো না। ভবিষ্যতের স্থপতি হও। দেখবে জীবনটা আর একই রকম থাকবে না।’ সারারাত একজন উদ্‌গ্রীব ছাত্রের সঙ্গে নিজের জ্ঞানভান্ডার ভাগ করে দেওয়ার। পর সকালের আলো ফুটতেই ক্লান্ত দেখালো আমার বন্ধুটিকে। জুলিয়নের উদ্যম আর অদম্য উৎসাহ দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম। আর তার কথায়, শুধু নয়, তার ব্যক্তিত্ব, তার চালচলনেও প্রকাশ পাচ্ছিলো সেটি।

পৃষ্ঠা:১৩২

‘যোগী রমনের গল্পের প্রায় শেষে চলে এসেছি আমরা। এরপর আমায় যেতে হবে। অনেক কাজ বাকি আছে, অনেকের সাথে দেখা করার আছে।’ ‘তুমি কি পার্টনারদের সঙ্গে দেখা করে বলতে চাও যে তুমি ফিরে এসেছো?’ কৌরূহল বশে জিজ্ঞেস করলাম। ‘সম্ভবত নয়। তারা যাকে চিনতো আমি সেই জুলিয়ন নই। সেই রকম পোশাক পরি না, সেই রকম চিন্তা করি না, সেই রকম কাজও করি না। আমি একেবারেই বদলে যাওয়া এক মানুষ। ওরা আমায় চিনতে পারবে না।’ ‘তুমি সত্যিই এক নতুন মানুষ। মনে মনে হঠাৎই হাসি পেলো যখন এই সাধকের চিরাচরিত পোশাকে জুলিয়ন তার চকচকে লাল ফেরারি গাড়ি থেকে নামছে এই দৃশ্যটা ভাবার চেষ্টা করলাম।”একটা নতুন সত্তাই বলতে পারো। প্রাচীন ভারতে একটা কথা আছে, আমরা আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সত্তা নই। আমরা মানসিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন সত্তা নই। আমরা মানবিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন অধ্যাত্মিক সত্তা। আমি এই ব্রহ্মাণ্ডে আমার ভূমিকা কি তা বুঝে গিয়েছি। আমি জেনে গেছি আমি কে? এই পৃথিবীতে আমি নেই। এই পৃথিবী আমার মধ্যে আছে। ‘এটা আমাকে একটু চর্বিত চর্বন করতে হবে, জুলিয়নের কথার অর্থ বুঝতে না পেরে বললাম। ‘নিশ্চয়ই, আমি বুঝছি বন্ধু। এমন একটা সমৃদ্ধ জাসবে, যখন তুমি নিজেই নিজেকে পরিচালনা করতে পারবে। যদি তুমি আমি যা যা বলেছি তা মেনে চলো, জীবনটাকে স্বচ্ছভাবে দেখতে পারবে বহমান কালের ক্যানভাসে একটি ছোট বিন্দুর মতো। তুমি কৌকি উদ্দেশ্যে তোমার এই জীবন, তাও জানতে পারবে তুমি।’ ‘কি উদ্দেশ্যে?’ ‘অবশ্যই, কাজ করে যাওয়া। যত বাড়ি বা যত দামি গাড়িই তোমার থাকুক না কেন, মৃত্যুর পর একটা জিনিসই তোমার সঙ্গে যাবে তোমার বিবেক। বিবেকের কথা শোনো। ওর পথ অনুসরণ করো। বিবেক জানে সত্যিটা কি। সেই তোমায় বলে দেবে কোনো কাজ আদতে তুমি নিঃস্বার্থভাবে করছো। আমার ব্যক্তিগত অভিযান, আমাকে এই জ্ঞানই দিয়েছে। এমন আমার আরো কতজনকে সেবা করার আছে, সারিয়ে তোলার আছে। সিভানার জ্ঞান, আমায় ছড়িয়ে দিতে হবে তাদের জীবনে, যাদের এটা খুব প্রয়োজন। জ্ঞানের শিখা যে জুলিয়নের প্রাণে জ্বলে উঠেছে, তা আমার মতো জ্ঞানহীন লোকেও বুঝতে পারলো। ওর কাজ সম্পর্কে এতোই আবেগপ্রবণ, দায়বন্ধ ও

পৃষ্ঠা:১৩৩

ব্যাকুল ছিল ও, যে তা ওর শরীরী ভাষায়ও ধরা পড়লো। বুঝলাম শুধুমাত্র খাদ্যাভ্যাস বদলে বা দু দণ্ড শারীরিক কসরৎ করেই প্রৌঢ় জুলিয়ানের শরীরে যৌবনের দীপ্তি আসেনি। অ্যাডোনিস হয়ে ওঠার পিছনে রয়েছে গভীর কোনো বিধি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে খুঁজে যাওয়া মানুষ যা পেয়েছে, তা আজও শুর নখদর্পনে। যৌবন, তৃপ্তি বা সুখের গোপন কথা নয়, জুলিয়ন খুঁজে পেয়েছে আত্যার গোপন সত্তাকে। একাদশ অধ্যায়ের সংক্ষিপ্তসার প্রতীক চিত্রা গুণ জ্ঞান সময়কে সমীহ করে চল। সময় তোমার সবচেয়ে মূল্যবান বস্তু, এবং তা একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না। অগ্রাধিকারে নজর দাও ও ভারসাম্য বজায় রাখো। জীবন সরল করো। প্রাচীন কুড়ির নিয়ম। কলাকৌশল ‘না’ বলতে পারার সাহস। মৃত্যুশয্যার মানসিকতা। সময় হাতের ফাঁক দিয়ে বালির মে ।। অল্প বয়স থেকে যারা সময়ের সদ্ব্যবহার করে, তারা সমৃদ্ধ, সৃজনশীল ও তৃপ্তিকর জীবন পায়। দলে যায়, আর ফিরে

পৃষ্ঠা:১৩৪

অধ্যায় ১২

জীবনের অতি চরম উদ্দেশ্য

‘পৃথিবীতে যা কিছু বেঁচে থাকে, তা একা বাঁচে না, নিজের জন্য বাঁচে না’-উইলিয়াম ব্রেক জুলিয়ন বলে চললো, ‘সিভানার সাধুরা শুধু যে আমার দেখা সবচেয়ে যৌবনদীপ্ত মানুষ ছিলেন তা নয়, তারা সবচেয়ে দয়ালুও ছিলেন।’ যোগী রমন বলেছিলেন, তিনি যখন ছোট ছিলেন, ঘুমের জন্য অপেক্ষা করার সময় বাবা ধীরপায়ে ফুলে ফুলে ঢাকা কুটিরে ঢুকে তাকে প্রশ্ন করতেন, সারা দিনে তিনি কি ভালো কাজ করেছেন। যদি তিনি বলতেন যে, তেমন বলার মতো ভালো কোনো কাজ সেদিন তিনি করেননি, তখন গুরুং বাবা ওকে বলতেন, বিছানা থেকে উঠে কিছু একটা ভালো কাজ করে জাদের জন্য, না হলে তিনি ঘুমোতে পারবেন না।’ জুলিয়ন বলে চললো, ‘আলোকদীপ্ত জীবনের, সৰুয়েরো প্রয়োজনীয় গুণ আমি তোমার সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই। তুমি বড়ই সফলতা পাও তোমার জীবনে, যত গাড়িই থাকুক তোমার বাড়ির ড্রাইভওয়েতে আর যতগুলো হীষ্মবাসই তোমার থাকুক না কেন, তোমার জীবনের মান নির্ধারিত হবে, তুমি কতোটুকু অবদান রেখেছো, অরি মানের উপর। ‘যোগীর গল্পের হলুদ গোলাপের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক আছে কি?’ ‘হ্যাঁ, আছে। ওই গোলাপ তোমায় মনে করাবে চিনা সেই প্রবচন। ‘যে কতো গোলাপ দেয়, তাতে বঞ্চিত হলেও গোলাপের সুবাস থেকে যায়।’ অর্থটা সহজ-অন্যদের জীবন উন্নত করার কিছু করলে, তা তোমার জীবনকে পরোক্ষভাবে উন্নত করে তোলে। রোজ দয়ামায়ার বশবর্তী হয়ে কোনো কাজ করলে, জীবন তোমার অনেক বেশি অর্থপূর্ণ ও সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে। প্রতিটি দিনের পবিত্রতা ও ধর্মের চর্চার মাধ্যমে, অন্যের সেবা করো।’ ‘কোনো স্বেচ্ছাসেবকের কাজে জড়িত হতে বলছো? ‘শুরু করার পক্ষে তা ঠিক আছে। কিন্তু আমি যা বলছি তার দার্শনিক তাৎপর্য রয়েছে। এই পৃথিবীতে তুমি তোমার ভূমিকার একটা প্যারাডাইম তৈরি করো।’

পৃষ্ঠা:১৩৫

‘আবার আমি হারিয়ে যাচ্ছি। প্যারাডাইম শব্দটার অর্থ বুঝতে পারছি না।’ ‘প্যারাডাইম হলো কোনো একটি পরিস্থিতিকে মূল্যায়ন করার দৃষ্টিভঙ্গি। কেউ দেখে প্লাসটা অর্ধেক ফাঁকা। আশাবাদীরা বলেন গ্লাসটি অর্ধেক ভর্তি। দুজনই দুভাবে পরিস্থিতির পর্যালোচনা করে। প্যারাডাইম হলো, একটা চশমা যা দিয়ে বহির্জগত, অন্তর্জগৎ দুইই দেখা যায়। তাহলে আমরা দৃষ্টিভঙ্গি বদলের কথা বলছো, তুমি?’ ‘কনতে পারো। জীবনের মান নাটকীয়ভাবে উন্নত করতে, তোমার জন্মের উদ্দেশ্য খুঁজে বের করো। জানো যে কেন এসেছ এই পৃথিবীতে। এসেছো কিছু না নিয়ে, যাবেও কিছু না নিয়েই। যদি তাই হয় তবে তোমার জন্যের একটা যথার্থ কারণ বের করা যেতে পারে।’ ‘সেটা কি?’ ‘অর্থপূর্ণ কাজে নিজেকে অন্যের জন্য বিলিয়ে দেওয়া। আমি বলছি না তুমি তার জন্য তোমার প্রাকটিস বন্ধ করে দাও যা যা কিছু আছে তোমার, সব ছেড়ে দিয়ে দুর্দশান্ত মানুষের জন্য কাজ করো। যদিও একরকম কিছু মানুষকে দেখে এসেছি আমি, যারা অত্যন্ত পরিতৃপ্তির সঙ্গে সেটাই করে চলেছে। আমাদের পৃথিবীতে একটা বিরাট পরিবর্তন মধুটছে। আগে যেসব আইনজীবী শুধু পকেটের মাপ দেখে মানুষের ভালো-মন্দ বিচার করতো, তারাই এখন তাদের হৃদয়ের মাপ ও তাদের বস্তিরদ্ধতার মাপ দেখে তাদের। বিচার করছে। মানুষ টাকার বদলে জীবনের অর্থ খুঁজছে। শিক্ষকরা নিরাপদ চাকরি ছেড়ে, শহরের নিম্নবিত্ত এলাকায় মেধাবী ছাত্র তৈরির চেষ্টায় জুটে গেছেন। পরিবর্তনের দুর্তিনাদ মানুছের কানে পৌছেছে। মানুষ বুঝেছে যে তারা কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে এই পৃথিবীতে এসেছে, এবং সে কাজ সমাধা করার বিশেষ ক্ষমতা উপহার নিয়েই এসেছে তারা।’ ‘কি বিশেষ উপহার?’ ‘মা সারা সন্ধ্যে ও রাত ধরে আমি তোমাকে বললাম। মানসিক দক্ষতা, সীমাহীন উদ্যম, অসীম সৃজনীশক্তি, নিয়মানুবর্তিতার ভাণ্ডার আর শাস্তির ঝর্নাধারা। এসব ক্ষমতার উৎস মুখটা খুলে দেওয়া এবং মানুষের কাজে তা প্রয়োগ করা, এই করতে হবে। আমি শুধু বলছি পৃথিবীতে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি তোমাকে শীঘ্রই বদলে ফেলতে হবে। নিজেকে একা একটা মানুষ হিসেবে না দেখে, সকলের একজন বলে দেখতে শেখো।’ ‘আমাকে আরও দয়ালু আর নম্র হতে হবে?’ ‘তুমি তোমার জীবনে সবচেয়ে মহৎ কাজ যেটি করতে পারো, তা হলো অন্যকে কিছু দেওয়া। প্রাচ্যের সাধকরা একে বলেন ‘আমিত্বের শৃঙ্খল

পৃষ্ঠা:১৩৬

মোচন।’ আত্মসচেতন থেকে সরে এসে উচ্চতর কোনো লক্ষ্যের পথে এগিয়ে চলো। তোমার আশেপাশের মানুষগুলোকে আরও বেশি করে দেওয়ার মাধ্যমে এটা করা সম্ভব। তোমার মূল্যবান সময় বা উদ্যম, যে কোনো একটি দিতে পারো তুমি। তা সে একবছর ধরে দরিদ্র মানুষের সেবা করাই হোক বা ট্যাফিক জ্যামে পথে তোমরা আগে কিছু গাড়িকে চলে যেতে দেওয়াই হোক। যত তুচ্ছ কাজই হোক না কেন, তোমার পৃথিবীটাকে আরও সুন্দর জায়গ হিসেবে গড়ে তুলতে তুমি যত এগোবে, তোমার জীবনে আসতে থাকবে অলৌকিক সব পরিবর্তন। যোগী রমন বলতেন, ‘আমরা যখন জন্মাই, তখন আমরা কাঁদি আর অন্যরা হাসে। জীবনে এমন কিছু করে যাও, যাতে মৃত্যুর সময় তুমি হাসবে, আর অন্যরা কাঁদবে।’ জুলিয়ন এখানে একটা বিষয় তুলে আনতে চাইছিলো, বুঝতে পারলাম। একটা বিষয় আমাকে খুব বিব্রত করে তুলছিল কিছুদিন যাবৎ। তা হলো, আমি যতটা অবদান রাখতে পারি বলে আমার ধারণা, ততটা আয়ি রাখতে পারছিলাম না। যদিও এমন অনেক মামলা আমি লড়ছি না পরবর্তী সময়ে অনেকগুলো কাজে সহায়ক হয়েছে। তবু, আইন (জ্যার আমার কাছে ভালোবাসার কাজ নয় বরং ব্যবসা হয়ে গেছে। হারাবস্থায় আমি আদর্শবান ছিলাম। হোস্টেলের ডর্মিটরিতে বাসি পিৎজা মোর ঠাণ্ডা কফির কাপে তুফান তুলে, পৃথিবী বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখুলছি আমরা। কুড়ি বছর বাদে, পরিবর্তন আনার জ্বলন্ত আগ্রহ আজ বাড়ির ঋণ শোধ আর অবসরের পর অর্থের সংস্থান করার প্রবল আগ্রহে পর্যবসিত আমাকে বিশাল হিংস্র পৃথিবীটা থেকে বাঁচিয়েছে, আর আমি তাতেই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। ‘একটা পুরনো গল্প বলি তোমায়, যা তোমার খুব কাছের মনে হবে,’ -একজন বৃদ্ধ মহিলা ছিলেন, যার স্বামী মারা গিয়েছিলেন। ছেলে, ছেলের বউ আর নাতনি নিয়ে ছিল তার সংসার। দিনদিন ওর দৃষ্টিভঙ্গি আর শ্রবণশক্তি খারাপ হতে লাগলো। খেতে গেলে হাত এতো কাঁপতো যে খাবার বাইরে পড়ে যেত, মাটিতে গড়িয়ে যেত। একদিন তার ছেলে ও বউ ভাবলো, অনেক হয়েছে, আর নয়। আবর্জনার কুঠুরির পাশে একটা টেবিল পেতে বৃদ্ধাকে একা খেতে বসিয়ে দেওয়া হলো। বৃদ্ধা ছেলে, বউ, নাতনির দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকতেন আর চোখের জল ফেলতেন, মাঝে মধ্যে চামচ পড়ে যাওয়ার জন্য ধকা ছাড়া তার দিকে কেউ চেয়েও দেখতো না।

পৃষ্ঠা:১৩৭

একদিন ছেলে ও বউয়ের একমাত্র সন্তানটি ‘বিল্ডিং ব্লকস’ নিয়ে বেলছিল। তার বাবা তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘কি বানাচ্ছো সোনা।’ সে উত্তর দিলো, ‘তোমার আর মায়ের জন্য একটা টেবিল, যাতে তোমরা যখন বুড়ো হয়ে যাবে, আর আমি বড় হব্যে, তখন তোমাদের ঘরের কোনায় ওই টেবিলে আলাদাভাবে খেতে দেবো তোমাদের।’ মেয়ের এমন কাণ্ডকারখানা ও ভাবনায় বাবা আর মা একবারে চুপ হয়ে গেলেন, চোখে জল এসে গেল। নিজেদের ভুল বুঝে সেদিনই তারা বুড়ো মাকে ফিরিয়ে আনলো আবার নিজেদের খাবার টেবিলে। এই গল্পে, ছেলে আর বউ কিন্তু খারাপ মানুষ ছিলো না। তবে, তাদের মধ্যে সহমর্মিতার আগুনটা উস্কে দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। সহমর্মিতা, প্রতিদিন একটু দয়ালু হওয়া, জীবনকে সমৃদ্ধ করে তোলে। প্রতিদিন, তুমি কিছুটা সময় চুপ করে বসে ভাবো, সারাদিনে তুমি মানুষের ভালোর জন্য কি কি করবে। যে একেবারেই আশা করে না তাকে একটা ছোট্ট প্রশংসা, বন্ধুদের প্রতি একটু উচ্চতা জ্ঞাপন, পরিবারের সকলের জন্য মাঝে মধ্যে একটু কিছু উপহার, এসব জীবনটাকে বদলে দেয়। বন্ধুত্বের কথায়, বুলি, খৈয়াল রেখো সম্পর্কটার মধ্যে কোথাও যেন ছেদ না হয়। যে মানুষের তিনটে খাঁটি বন্ধু আছে, সে তো অত্যন্ত ধনী। বন্ধুরা জীবনে সৌন্দর্য, আকর্ষণ ও রস যোগ করে। বন্ধুর সঙ্গে বসে পেট ফাটা হাসির মতো কোনো কিছুই আর মনকে তরতাজা করে না। নিজেকে যখন গুরু গম্ভীর করে তোলে, বন্ধুরা রেয়মায় হাসিয়ে দেয়। যখন খারাপ সময় আসে বন্ধুরা পাশে এসে দাঁড়াচ্ছি যখন ব্যস্ত আইনজীবী ছিলাম, তখন কোনো বন্ধুকে সময় দিইনি। আজ আমার পাশে কেউ নেই, তুমি ছাড়া। কেউ নেই যার সাথে জঙ্গলটার মধ্য দিয়ে একটু হেঁটে আসা যায়, কেউ নেই যার সাথে একটা ভালো বই পড়ে আবেগটা ভাগ করে নেওয়া যায়, কেউ নেই যাকে মন খুলে বলতে পারি, শরতের ঝকঝকে দিনটায় মনের ভিতরে কি হচ্ছে।’ তবে খুব দ্রুত নিজেকে গুছিয়ে নিল জুলিয়ন, ‘আক্ষেপ করে সময় কাটানো আমার কাজ নয়। সিভানায় গুরুদেবের কাছে শিখেছি, ‘যারা আলোকদীপ্ত, প্রতিটি প্রভাত একটি নতুন দিন নিয়ে আসে তাদের জীবনে।’ চিরকালই জুলিয়নকে এক যোদ্ধা বলে মনে হয়েছে। প্রতিপক্ষকে এক বীর সেনানীর মতো উড়িয়ে দিতে পারে, যে কোনো সময়। তবে এ মুহূর্তে যাকে দেখছি, সে শান্ত, ধীর, নম্র, দয়ালু। জীবনের নাটকে ও যে ভূমিকা পেয়েছে তাতেই সন্তুষ্ট। অতীতের যন্ত্রণাকে শিক্ষারূপে দেখে এই মানুষটি। আর বলে জীবনে যা ঘটেছে, তার চেয়েও জীবনটাও আরও মহৎ কিছু।

পৃষ্ঠা:১৩৮

জুলিয়নের চোখ ঝকঝক করে ওঠে আনন্দে, আগামীর কথা ভেবে। তার আনন্দের বানে ভেসে যাচ্ছিলাম আমিও। বেপরোয়া জুলিয়ন ম্যান্টেন, প্রখ্যাত আইনজীবী, যে কাউকে তোয়াক্কা করে না, তার থেকে জুলিয়ন হয়ে উঠেছে এক সাচ্চা মানুষ, যে শুধুই অন্যদের কথা ভাবে। এ পথেই হয়তো একদিন হাটতে পারবো আমিও।’ দ্বাদশ অধ্যায়ের সংক্ষিপ্তসার প্রতীক গুণ চিত্র নিঃস্বার্থভাবে অন্যের সেবা। তোমার অবদানের মানের ওপরেই নির্ভর করে তোমার জীবনের মান। জীবনে পবিত্রতা চর্চা করার জন্য, কিছু দেওয়ার জন্য বাঁচো। অন্যের জীবন সুন্দর করলে নিজের জীবন সর্বোচ্চ পায়। কলাকৌশল প্রতিদিন কিছু দয়াধর্ম করো। যারা প্রার্থী, তাদের কিছু দাও। সমৃদ্ধ সম্পর্কের চর্চা করো। উল্লেখযোগ্য উদ্ধৃতি। উচ্চতর আদর্শে প্রাণিত হও। সবচেয়ে মহৎ কাজ যা করতে পার, তা হলো দান।

পৃষ্ঠা:১৩৯

অধ্যায় ১৩।

চিরন্তন আনন্দের ও সুখের কালোত্তীর্ণ নীতিসমূহ

‘আমি যখন সূর্যাস্তের শোভা আর চাঁদের সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে যাই, আমার আত্মা তখন স্রষ্টার আরাধনায় প্রসারিত হয়’ -মহাত্যা গান্ধী বারো ঘণ্টা হয়ে গেছে, জুলিয়ন আমার বাড়ি এসেছে, সিভানায় লব্ধ জ্ঞান আমার সাথে ভাগ করে নিতে। এই বারো ঘণ্টা নিঃসন্দেহে আমার জীবন বদলে দিয়ে গেল। অনেক উল্লসিত, উজ্জীবিত, আর অবশ্যই মুক্ত লাগছিল। আমি বুঝতে পারলাম জীবনের সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগাবার কোনো চেষ্টাই শুরু করিনি আমি। জীবন আমাকে যে প্রতিভা উপহার হিসেবে দিয়েছে তা অপচয় করে চলেছিমাত্র। যে ক্ষতগুলো আমায় গ্রীণ খুলে হাসতে, উদ্দীপনায় ও উচ্ছ্বাসের সময় কাটাতে ভুলিয়ে দিয়েছিল, জুলিয়নের প্রজ্ঞা, তার পথ খুলে দিয়ে গেল আবার। এ তো আমার প্রাপ্য ছিল। আমি আবেগে ভেসে গেলাম। ‘আমাকে এবার যেতে হবে। তোমার অনেক দায়বদ্ধতা আছে, আমার বহু কাজ বাকি আছে।’ জুলিয়ন ক্ষমা চাওয়ার সুখে গললো। আমার কাজ পরে হবে।’ ‘ ‘কিন্তু আমার কাজ যে পরে করলে হাই না।’ মুচকি হাসল জুলিয়ন। ‘তবে যাওয়ার আগে যোগীর গল্পের শেষ উপাদানটির কথা বলে যাই তোমায়, গল্পটা মনে কর। সুমো কুস্তিগির গোলাপের সুবাসে জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর, উঠে দেখলো, হিরা বিছানো একটি শখ। সেই পথ ধরে চলে গিয়েছিলো সুমো কুস্তিগির, আর তারপর অনন্ত সুখ।’ ‘সেটাই তো হওয়া উচিত,’ রসিকতা করে বলি।’সেই হিরে বিছানো পথ হলো জ্ঞানালোকদীপ্ত জীবনের প্রতীক। এই নীতি, তোমার কাজের জগতে যদি বয়ে নিয়ে যেতে পারো, তবে যা উপকৃত হবে, তা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তুতে তুমি আনন্দ খুঁজে পাবে। যে অপার সুখে তোমার অধিকার রয়েছে, তাও পাবে। আর আমাকে যে কথা দিয়েছো, যে আমার এই শিক্ষা তুমি ভাগ করে নেবে সকলের সঙ্গে, তার মাধ্যমে অন্যদের জীবনটাকেও সাধারণ থেকে নিয়ে যেতে পারবে অসাধারণের আভিনায়।’

পৃষ্ঠা:১৪০

‘এটা শিখতে কি আমার কিছু সময় লাগবে?”সপ্তাহ দুয়েক অনুশীলন কন্যলেই এর সঠিক প্রয়োগ বুঝে যাবে তুমি। নীতিগুলো এমনিতেই খুব সহজ, সরল।’ ‘ঠিক আছে, এবার বলো।’ ‘চূড়ান্ত গুণটির সবটুকুই জীবনযাপনকে কেন্দ্র করে। সিভানার যোগীরা বিশ্বাস করতেন যে, সত্যিকারের আনন্দময় জীবন পাওয়া যায়, শুধুমাত্র ‘এই মুহূর্তে বাঁচো, নীতি মানলে পরে। ওরা মানতেন, অতীতের পানি, সেতুর তলা দিয়ে বয়ে গেছে, আর ভবিষ্যতের সূর্য এখনও দিগন্তে উদ্ভাসিত হয়নি। তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হলো, ‘এখন।’ এই মুহূর্তে বাঁচতে শেখো আর পূর্ণ আয়াদ নাও।’ ‘আমি বুঝতে পারছি জুলিয়ন, সারাদিনে অনেকটা সময় আমার অতীতের ঘটনার কথ্য ভেবে কেটে যায়। আর নয়তো ভবিষ্যতে কি হবে, এই ভেবে দুশ্চিন্ন করতে থাকি। অথচ এর কোনোটার ওপরেই আমার হাত নেই। দিন রাত লক্ষ লক্ষ, ছোট ছোট চিন্তা আমাকে ছিঁড়ে খায়। আমার অহী ‘কিন্তু কেন?’ লাগে।’ ‘আমার ক্লান্তি লাগে। মনে একটুও শান্তি পাই না। কুখ কখনো এমন হয়। হাতেই কাজেই মন পড়ে থাকে। যেমন যখন জোনো মামলার ব্রিফ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দাখিল করার জন্য চাপে থাকি তখন অন্য কিছু ভাবার সময় থাকে না। ফুটবল খেলার সময়েও ঠিক এই রকমই হতো। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেত কোথা দিয়ে টেরও পেজুড়ে যা’। দুশ্চিন্তা, প্রাকটিস, টাকা পয়সার চিন্তা কিছুই মাথায় থাকতো না। এই সময়টাই সবচেয়ে আনন্দের ছিল।’ ‘যে কাজ তোমায় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়, তাই তোমাকে সবচেয়ে তৃপ্তি দেয় মনে রাখবে, ‘সুখ বা আনন্দ হলো একটা যাত্রা পথ, একটা অভিযান, কোনো গন্তব্য নয়।’ আজকের জন্য বাঁচো। আজকের মতো আরেকটা দিন আর কখনো আসবে না তোমার জীবনে, এটা ভেবে বাঁচো।’ বলতে বলতে মসৃণ হাত দুটো প্রার্থনার ভঙ্গিতে জড়ো করলো এমনভাবে, যেন এই কথা বলতে পারার জন্য সে কৃতজ্ঞ। এই কি হিরকখচিত পথের প্রকৃত রূপদর্শন?”হ্যাঁ, সুমো পালোয়ান যে আনন্দ পেয়েছিল এ পথে চলতে চলতে, জ্ঞানের এই হিরে, মণি, মানিক্য খচিত পথে পা বাড়ালেই, সে পরম আনন্দ পেতে পারবে তুমি। একটু ধীর পায়ে চলো বন্ধু। আশে পাশের সব সৌন্দর্যের রূপ, রস, বর্ণ, গন্ধ গায়ে মেখে নিয়ে পথ চলো। বড় কোনো সুখের খোঁজে, ছোট ছোট আনন্দকে পায়ে মাড়িয়ে যেও না।’

পৃষ্ঠা ১৪১ থেকে  ১৫১

পৃষ্ঠা:১৪১

‘তার মানে জীবনের বড় কোনো লক্ষ্য না রেখে, শুধু বর্তমানেই বাঁচবো?’ ‘না, লক্ষ্যই তো সফল জীবনের মূল উপাদান। সেটাই তো সকালে ঘুম থেকে তোমায় উঠায়, সারা দিন চনমনে রাখে, জীবনে প্রাণশক্তি আনে। আমি বলছি, সাফল্যের নেশায়, আনন্দটাকে ভুলে যেও না। আজকের দিনটাতে আনন্দ করে বাঁচো। যখন লটারি পাবে, বা অবসর নেবে তখনকার জন্য আনন্দটাকে জমিয়ে রেখো না।’ জুলিয়ন উঠে দাঁড়িয়ে, পোড় খাওয়া আইনজীবীর মতো পায়চারি করে, তার সওয়ালের শেষ অঙ্কে পৌছতে চেষ্টা করলো। ‘যবে তোমার অফিসে তোমাকে সাহায্য করতে, কয়েকজন সহকারী রাখবে তখন তুমি দায়িত্বশীল স্বামী হয়ে উঠবে, বা ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে টাকা ফুলে ফেঁপে উঠলে তখন নিজের দিকে নজনা দেবে, এসব ভেবে নিজেকে বোকা বানিও না। জীবনটাকে আজই উপভোগ করো। তোমার প্রচেষ্টার ফল ভোগ করার সময় আজই। কল্পনা থেকে স্বপ্ন পূরণের পথে পৌঁছানোর দিন আজই। ‘বুঝতে পারলাম বলে মনে হচ্ছে না।’ ‘তোমার শিশুর শৈশবে বাঁচো।’ ‘মানে?’ মনে মনে আরও ঘাবড়ে গেলাম। ‘জীবনের কিছু জিনিস আছে যা তোমার শিশুর পৈদিলে, তার পাশে পাশে থাকার মতোই জরুরি। জীবনের উঁচু সিঁড়ি দিয়ে কি হবে, যদি সন্তানের প্রথম পা ফেলাটাই না দেখতে পাও? বিশ্বল প্রাসাদ বানিয়ে কি লাভ যদি সেটা কোনোদিন তোমার ঘর না হয়ে উঠতে পারে? সারা পৃথিবীতে বিখ্যাত হয়ে কি হবে, যদি তোমার সন্তানের কাছেই অচেনা হয়ে থাকো? আমি জানি আমি কি বলছি।’ আবেগ রুদ্ধ হয়ে গেল জুলিয়নের কণ্ঠ। শেষ কথাটা আমাকে ছুঁয়ে গেল। যে জুলিয়নকে আমি চিনতাম, সে তার বিখ্যাত বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে বেড়াতো। তার কোর্টরুমের যতটা দক্ষতা ছিল ঠিক ততটাই দক্ষতার কথা শোনা যেত, মডেলদের সঙ্গে প্রেমে। প্রাক্তন এই কোটিপতি ‘বাবা’র আবেগ সম্পর্কে কি জানে? বোঝে কি সে, কতোটা কষ্ট করে আমাকে সবদিক সামলে চলতে হয়? ভালো বাবা, ভালো অ্যাডভোকেট, সব দিক? আমার মনের কথা জুলিয়নের বুঝি কানে গেল। ‘পৃথিবীতে ঈশ্বরের সর্বশ্রেষ্ঠ আশির্বাদ সন্তান সম্পর্কে আমিও কিছু জানি।’ খুব ধীরে বললো সে। ‘প্রাকটিস ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে অবধি আমি তো জানতাম, তুমি এই শহরের সবচেয়ে যোগ্য ব্যাচেলর।’

পৃষ্ঠা:১৪২

‘আমার উন্মুক্ত জীবনযাপন শুরু হওয়ার আগে অবধি আমি যে বিবাহিত ছিলাম, তা তুমি জানতে নিশ্চয়ই।’ হ্যাঁ।’ খুব গোপন কথা বলার আগে, শিশুরা যেমন স্বর নিচু করে, ঠিক তেমনই নিচু কন্ঠস্বরে বলতে শুরু করল সে, ‘তুমি যা জানো তা হলো আমার একটা মেয়েও ছিল। আমার জীবনে দেখা, সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে মিষ্টি প্রাণী। সে সময় আমিও তোমায় প্রথম যেমন দেখেছিলাম, উচ্চাভিলাষী, আশাবাদী, তেমনই ছিলাম। মানুষ যা চাইতে পারে, তার সবই ছিল আমার। লোকে বলতো, আমার একটা সুন্দর ভবিষ্যতে, এক অসামান্য রূপসী স্ত্রী ও অসাধারণ এক সন্তান আছে। যখন সবকিছু নিখুঁত চলছিল, তখন সব আমার থেকে কেড়ে নেওয়া হলো এক লহমায়।’ এই প্রথম, জুলিয়নের মুখে নেমে এলো বিষাদের ছায়া। চোখ থেকে গড়িয়ে পড়লো এক বিন্দু জল। আমি হতবাক হয়ে বসে রইলাম। ‘তোমাকে আর বলতে হবে না, জুলিয়ন।’ কাঁধে হাত রাখলাম এই ‘বলতে হবেই আমাকে। আমার আগের জীবনে যাদের চিনতাম, তাদের মধ্যে তুমিই ছিলে সবচেয়ে সম্রাবনাময়। আমি বলি না তোমার অনেক কিছুই আমাকে নিজের কথা মনে করায়। এখনো তোমার অনেক পথ চলা বাকি। তবে যেভাবে চলছো, তেমনভাবে চলালে তোমাকেও বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হবে। আমি এখানে এসেছি তোমাকে এ কথাই মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য যে আজও তোমার জীবনি অনেক আনন্দ পাওয়ার বাকি আছে। যে মদ্যপ গাড়িচালক আমার মেয়েটাকে মেরে ফেললো, সে শুধু একটা প্রাণই নেয়নি ওই অক্টোবরের দুপুরে একটা প্রাণ নেয়নি, নিয়েছিল দুটো। মেয়েটা চলে যাওয়ার পর আমার জীবনটা তছনছ হয়ে গেল। আমি অফিসে বেশি করে সময় কাটাতে লাগলাম। বোকার মতো ভাবতাম, কাজই বুঝি আমার যন্ত্রণার মলম লাগাবে। কোনোদিন অফিসের সোফাতেই শুয়ে পড়তাম, বাড়িতে চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা মেয়েটার স্মৃতির মুখোমুখি হওয়ার জীবন সফল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনটা নরক হয়ে গেলো। আমার স্ত্রী, যে আমার ল’স্কুলের সময় থেকে আমার সবসময়ের সঙ্গী ছিলো, আমায় ছেড়ে চলে গেল। কথায় আছে খড়ের চাপে উটের পিঠ ভেঙেছিলো, তেমনই কাজের চাপে ভাঙলো আমার সংসার। আমার শরীর ভেঙে পড়লো আর ধীরে ধীরে আমি সেই কুখ্যাত জীবনযাত্রায় ঢুকে পড়লাম। অর্থে যা কেনা যায় সবই ছিল আমার। কিন্তু আমি যে আমার আত্মাকেও বেঁচে দিলাম। সত্যিই বেঁচে দিলাম।’ গলা বুজে এলো জুলিয়নের।

পৃষ্ঠা:১৪৩

“তুমি শিশুর শৈশবে বাঁচা মানে বলতে চাইছিলে, তাদের বড় হওয়া দেখতে। দেখতে বাঁচা, তাই? ‘সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুর জন্মদিনে যাওয়ার পথে মেয়েটা চলে গেল। আজ সাতাশ বছর পরও ওর খিলখিল হাসির শব্দ শোনার জন্য, বা ওর সাথে আরেকবার লুকোচুরি খেলার জন্য আমি যে কোনো মূল্য দিতে রাজি আছি। সিভানার আলোকদীপ্ত প্রজ্ঞার দ্বীপ আমার জীবন জ্বাল্যর পরও এমন একটা দিন যায় না যেদিন ওর টলটলে সুন্দর ফুলের মতো মুখটা আমার মনে ভেসে ওঠে না। ওর সোনালি চুলে আদর করতে ইচ্ছে করে আজও। ও চলে যাওয়ার সময় আমর হৃদয়ের একটা অংশ সঙ্গে করে নিয়ে গেল। এতো সুন্দর বাচ্চা আছে তোমার, জন। গাছ দেখতে গিয়ে বনভূমিটাকে উপেক্ষা করো না। তোমার সন্তানকে যে সেরা উপহারটা তুমি দিতে পারো, তা হলো ভালোবাসা। ওদের নতুন করে চেনো। তোমার পেশাগত জীবনের পুরস্কারের চেয়েও ওরা যে অনেক দামি তা বোঝাও ওদের। নয়তো একদিন দেখবে নিজেদের কাজ, সংসার নিয়ে । ব্যস্ত হয়ে ওরা অনেক দূরে সরে প্রতিষ্ঠ।’ কোথায় যেন আমাদের হৃদয়, কোনো তারে বাংকার তুলে দিল জুলিয়নের কথাগুলো। আমি বুঝতে পারছিলাম, আমার সঙ্গে আমার পরিবারের বন্ধন হালকা হয়ে আসছে। আমি জানি আমাকে কাছি ঐপতে চায় ওরা, যদিও বলে না মুখে। আমি বুঝতাম, কিন্তু জুলিয়াছিনের কাছ থেকে এটা শোনার প্রয়োজন ছিল। সেই শেষ কবে আমার ছেলে অ্যান্ডির সঙ্গে শনিবারের সকালে, ওর ঠাকুরদাদার প্রিয় মাছ ধরক্তি ছোট্ট পুকুরে মাছ ধরতে গিয়েছি, তা আর মনেও পড়ে না। আমার কাজের চাপে বন্ধ হয়ে গেছে পিয়ানো বাজানোর আসর, ত্রিশমাস খেলা বা লিগ চ্যাম্পিয়নশীপ, হারিয়ে গেছে সব। কি করছি আমি? জুলিয়নের কলা সেই ভয়ঙ্কর, জীবনের দিকেই তো এগিয়ে চলেছি। এক্ষুনি বদলাতে হবে আমায়। ‘আনন্দ একটা যাত্রাপথে পাশে পড়ে থাকা মনি-মানিক্য কুড়িয়ে নেবে, না কি পথের শেষে থাকা সোনার ঘটের অপেক্ষা করবে, যা হয়তো শেষে দেখবে একেবারেই ফাঁকা; এটা একেবারেই তোমার পছন্দের ব্যাপার। পারলে শুধু আজকে বাঁচেন। আজ ছাড়া আর কিছু নেই তোমার।’ ‘কেউ কি এভাবে শুধু আজকে বাঁচতে পারে?’ ‘নিশ্চয়ই। এখন তোমার অবস্থা যাই হোক, প্রতিদিনের মনি-মানিক্য নিয়ে বেঁচে থাকার প্রশিক্ষণ দাও নিজেকে।’ ‘এটা একটু বেশি আশাবাদী শোনাচ্ছে না? ধরো কেউ একজন আর্থিক এবং মানসিকভাবে দেউলিয়া হয়ে গেছে। সে কিভাবে বাঁচবে?’

পৃষ্ঠা:১৪৪

‘তোমার ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স বা তোমার বাড়ির মাপের সঙ্গে তোমার আনন্দের মাপের কোনো মিল নেই। তাহলে পৃথিবীতে আর এতো অসুখী কোটিপতি থাকতো না। তোমার কি মনে হয় সিভানার সন্ন্যাসীরা দক্ষিণ ফ্রান্সে একটা ভিলা আর ব্যাঙ্কে মোটা টাকা রাখার ব্যাপারে চিন্তিত ছিলো?’ দুষ্টুমি ভরা হাসি হাসলো জুলিয়ন। ‘আচ্ছা, তোমার কথা বুঝলাম।’ টাকা বানানো আর জীবন বানানোর মধ্যে বিস্তর পার্থক্য। দিনের মধ্যে পাঁচ মিনিট কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে দেখো। যে মানুষটার কথা তুমি উদাহরণ দিলে, দেখবে দেউলিয়া হয়ে গেলেও, তারও বহু বিষয়ে কৃতজ্ঞতা জানানোর আছে। তাকে প্রশ্ন করো, তার স্বাস্থ্য, তার পরিবার, সমাজে তার সুনাম অক্ষুণ্ণ আছে কি না, প্রশ্ন করো এই দেশের নাগরিক হিসেবে সে সুখী কি না, মাথার উপর তার ছাদ আছে কি না। হয়তো কোনো বিষয় আশয়ই আজ আর তার নেই। শুধু আছে কাজ করার ক্ষমতা আর বড় স্বপ্ন দেখার সাহস। বাড়ির বাগানে পাখির কলকাকলিও জ্ঞানী মানুষের কাছে এক ঊধার। মনে রেখো জন, জীবনে তুমি যা চাইবে, তাই পাবে, তা নয়; শুলে যা তোমার প্রয়োজন তা অবশ্যই পাবে।’ আর এই কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনই তোমায় ‘এই মুহূর্তের’ জীবন সুখী করে তুলবে। তোমার নিয়তি গড়ে তুলবে।’ ‘নিয়তি গড়ে তুলবে?’ ‘হ্যাঁ। আগেই বলেছি, এই গ্রহের সবার মধ্যে কিছু না কিছু প্রতিভা আছে।’ ‘আমার কর্মজগতের কয়েকজন অইনরীাবীকে তুমি চেনো না।’ মজা করে বললাম। ‘প্রত্যেকে আমাদের প্রত্যেকের জন্য এমন কিছু দায়িত্ব দেওয়া আছে, সেগুলো আমাদের করতেই হবে। যে মুহূর্তে তোমার জীবনের লক্ষ্য তোমার কাছে পরিস্কার হয়ে যাবে, তোমার সমস্ত প্রাণশক্তি তুমি সেদিকে চালিত করবে: তোমার প্রতিভার দীপ্তি উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে আর জীবন হয়ে উঠবে। আনন্দময়। একবার এই ব্রতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেলে, তোমার সব আকাঙ্ক্ষাই পূর্ণ হবে। তোমাকে চেষ্টাও করতে হবে না। যত বেশি জোর দেবে সফল হওয়ার জন্য, তত পিছিয়ে পড়বে তুমি। বরং তার চেয়ে স্বপ্নের অভিমুখে যাত্রা শুরু করো। যে যাবে ঐশি গড়ব্যের দিকে, আর এর নামই নিয়তি গড়ে তোলা। আমি যখন ছোট ছিলাম আমার বাধ্য আমাকে পিটার আর তার ম্যাজিক সুতোর গল্প বলতেন। ছোট্ট ছেলে পিটারকে সবাই ভালোবাসতো। শুধু তার মধ্যে একটাই দুর্বলতা ছিল।’

পৃষ্ঠা:১৪৫

কি? পিটার কথনো মুহূর্তের জীবনযাপন করতে পারতো না। স্কুলে থাকার সময় সে বাইরে খেলার কথা ভাবতো, বাইরে খেলার সময় সে গরমের ছুটির স্বপ্ন দেখতো। সারাক্ষণ সে দিবাস্বপ্ন দেখতো। কোনো মুহূর্তকেই উপভোগ করতে পারত না। একদিন বাড়ির কাছের জঙ্গলে হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে সে ঘাসের উপর ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুম ভাঙল, ‘পিটার পিটার, এক তীক্ষ্ণ কন্ঠস্বরে। তাকিয়ে দেখে শনের মতো সাদা চুলের এক বুড়ি দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। হাতে একটা বল। তার একদিকে সুতো বাঁধা। বুড়ি বললো, পিটার তুমি যদি এই সুতোটাকে একটু টানো, তবে এক ঘণ্টা এক সেকেন্ডেই কেটে যাবে। যদি আরেকটু জোরে টানো, তবে একটা দিন কেটে যাবে, এক সেকেন্ড। আর খুব জোরে টানলে মাস, বছর কেটে যাবে একমুহূর্তে’ খুব খুশি হলো পিটার। ‘আমি এটা নিতে পারি’ বলে ওটা নিয়ে ছুট লাগালো। পরদিন ক্লাসে, যথারীতি পড়তে ভালো লাগছিল না পিটারের। হঠাৎ মনে পড়লো বলটার কথা। তক্ষুনি সেটা বের করে ছোট্ট একটা টান দিল। ব্যাস, ক্লাস থেকে সে পৌছে গেল একেবারে বাড়ির বাগানে। সুতোর শক্তি বুঝতে পেরে, পিটার এবার ছাত্র থেকে একেবারে বড় হাড় ইচ্ছা পোষণ করলো। দিল আরো এক টান। মাস, বছর পেরিয়ে উঠাৎই বড় একজন মানুষে পরিণত হলো পিটার। কিশোর পিটার দেখলো তার একজন বান্ধবীও হয়েছে, যার নাম এলিস। কিন্তু ছটফুটে পিটারের এ জীবনও ভালো লাগলো না। সে প্রাপ্তবয়স্ক হতে চাইলো। সুতোয় আরেক টানে কতো বছর পার হয়ে গেল একবারেই। পিটার মধ্যবয়স্ক এক পুরুষে রূপান্তরিত হলো। দেখলো এলিস তখন তার ঘরনী, ঘর ভর্তি ছেলে মেয়ে তার। তবে তার কুচকুচে কালো চুলে লেগেছে সাদার হাপ। আর তার সেই অল্পবয়সী মা একেবারে বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। তবু পিটার এই মুহূর্তে বাঁচতে পারলো না। সুতোয় আবার টান দিল সে। এবার কিন্তু সে এক নব্বই বছরের বৃদ্ধ ব্যাসী একজন পৌঁড়ে পরিণত হলো। দেখলো তার সুন্দরী এলিস, তাকে ছেড়ে আগেই স্বর্ণে গেছে। ছেলে-মেয়েরা যে যার জীবন নিয়ে ব্যস্ততায় বাড়ি ছেড়ে যে যার যার মতো চলে গেছে। এই প্রথম পিটারের খুব অনুশোচনা হলো। সে ভাবলো জীবনটাকে সে তো উপভোগই করতে পারলো না। না পারলো এলিসের সঙ্গে চাঁদের আলোয় গল্প করতে, না পারলো বাচ্চাদের সঙ্গে খেলায়, গানে, মজায় সময়টা কাটাতে। না পারলো মায়ের বলা গল্পগুলি মন দিয়ে শুনতে না কোনোদিন নিজের হাতে পারলো একটা গাছ লাগাতে, বাগান করতে।

পৃষ্ঠা:১৪৬

খুব বিষন্ন হয়ে পড়লো পিটায়। ঠিক করলো যে জঙ্গলে সে একা একা হাঁটতো, সেখানেই আবার হাঁটতে যাবে সে। সেখানে গিয়ে সে দেখলো যে ছোটবেলার চারাগাছগুলো মহিরুহে পরিণত হয়েছে। ছোট্ট গাসের উপর ক্লান্ত, বৃদ্ধ পিটার ঘুমিয়ে পড়লো এক সময়। ঘুম ভাঙল চেনা এক কন্ঠস্বর ‘পিটার, পিটার ডাক শুনে। চোখ খুলে দেখে সেই বুড়ি, যে তাকে ‘সেই ম্যাজিক সুতোর’ বলটা দিয়েছিলো।বুড়ি প্রশ্ন করলো, ‘কি পিটার, কেমন লাগলো আমার উপহার?’ পিটার বলল্যে প্রথম ভালোই লাগছিল কিন্তু এখন ওটাকে আমি ঘেন্না করি। বুড়ি বললো, ‘তুমি বড় অকৃতজ্ঞ। তবু তোমাকে আমি আরেকটু সুযোগ দিচ্ছি। বলো তোমার শেষ কথা ও শেষ ইচ্ছা কী?’ একটু ভেবে উত্তর দিলো,’ আমি জীবনটাকে সেই স্কুল জীবন থেকে আবার ফিরে পেতে চাই।’ আবার সেই যাসের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লো পিটার। ‘তাড়াতাড়ি ওঠো পিটার। তুমি এতো ঘুমোও কেন? তোমার স্বপ্ন তোমায় ভুল যেতে দেরি করিয়ে দেবে, যদি না এক্ষুনি ঘুম থেকে উঠো।’ মায়ের গলা শুনতে পেল লিটার। বলাই বাহুল্য যা চেয়েছিল, তাই পেয়েছে সে। এবার দারুণ উপভোগ করলো সে। তার আনন্দ, বিষাদ, ভালো, মন্দ সবটুকু নিয়েই এই জীবন তা উপলব্ধি করতে পারলো সে। ভবিষ্যতের আশায় না হয়, তা অন্তত বুঝতে পারলো। দের যে এখনই ভোগ করতে ‘মারুণ গল্প।’ ‘দুর্ভাগ্যবশত পিটারের মতো আমরা জীবনে দু’রার সুযোগ পাবো না। খুব দেরি হয়ে যাওয়ার আগে তাই জীবনটার শেষ বিন্দু অবধি উপভোগ করো। আজই হোক সেইদিন, যেদিন তুমি নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করো যে, আজ থেকে তুমি শুধুমাত্র গুরুত্বপূর্ণ কাজে মন দেবে, অর্থপূর্ণ কাজে সময় দেবে। যা করতে চেয়েছো, এতোদিন, এবার থেকে তাই করবে। সাফল্যের জন্য নিজেরা ছোট ছোট আনন্দগুলো বলি দেবে না। নিজের আত্মত্মাকে আনন্দ দেবে। মনকে সর্বদা খুশি ভরে রাখবে। একেই বলে ‘নির্বাণ’।”সিভানার সাধকেরা বিশ্বাস করেন তাদের প্রকৃত গন্তব্য হলো ‘নির্বাণ’। নির্বাণ কোনো জায়গা নয়। নির্বাণ হলো একটি অবস্থা। যে অবস্থায় পুরনো যা কিছু সব মুছে যায়। যে অবস্থায় যে কোনো কিছুই সম্ভব। যে অবস্থায় পৌছলে মনে হয় পৃথিবীর বুকে স্বর্ণ নেমে এসেছে। যে জীবন একেবারে নিখুঁত। এই বলে তাদের জীবনের চরম লক্ষ্য।’ জুলিয়নের চোখে মুখে এক অলৌকিক বিভা ফুটে উঠলো।

পৃষ্ঠা:১৪৭

‘আমরা সকলেই এই পৃথিবীতে এসেছি কোনো না কোনো বিশেষ কাজের দায়িত্ব নিয়ে। ধ্যানমগ্ন হয়ে জানো, তোমার কাজটা কী। নিজের মধ্যে বাঁধা পড়ে থেকো না। নিজের ভিতরে জীবনবোধের আগুন জ্বলাও। আমি যে পথের কথা বলে গেলাম তা মেনে চলো। দেখবে একদিন তুমিও ‘নির্বাণ’ নামক সেই স্থানের ফল উপহার পাবে।’ কি করে বুঝবো যে আমার আত্মা নির্বাণপ্রাপ্ত হয়েছে?”তোমার প্রবেশকালে, তুমি অনেক ছোট ছোট ইঙ্গিত পাবে। তোমার চারপাশে সব কিছুর মধ্যে তুমি পবিত্রতা খুঁজে পেতে শুরু করবে। যেমন চাঁদের আলোর ঐশী মহিমা, গ্রীষ্মের দুপুরে নীল আকাশের হাতছানি, ডেইজি ফুলের সুব্যস, বা কোনো শিশুর হাসি।’ ‘জুলিয়ন, যে সময় তোমার সঙ্গে কাটালাম, তা বৃথা যাবে না দেখ। সিভানার যোগীদের যে জ্ঞান আমায় তুমি দিয়ে গেলে, প্রতিশ্রুতি মতো তা আমি সবার। মাঝে ছড়িয়ে দেবো। আমি মন থেকে বলছি, তোমায় কথা দিচ্ছি,’ আন্তরিকভাবে কথাগুলো জানালাম। ভিতরে ভিতরে শত বস্ত্র আবেগে কেঁপে চলেছিলাম আমি।’তোমার চারপাশের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দাও এই সমৃদ্ধ প্রভা। তুমি যেমন জীবনে উপকৃত হতে চলেছো, তাদের জীবনটাকেতু তিক্রমন সুন্দর করে গড়ে তুলতে সাহায্য করো। মনে রেখো গন্তব্যের মতো পথ চলাও সমান আনন্দ দেয়। যোগী দারুণ গল্প বলতেন। তবে তার জের গল্পের মধ্যে সেরা গল্পটি বলতে চাই তোমায়।’ ‘বহু বছর আগে, ভারতের এক মহারাজ্য, তার ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ। তার মৃত স্ত্রীর উদ্দেশ্যে একটি সৌধ নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন, যার তুলনা সারা পৃথিবীতে থাকবে না। চাঁদের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে বা নীল আকাশের বুকে দাঁড়িয়ে সেই ভবনটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যেন মানুষকে মুগ্ধ করে রাখে, তাই চেয়েছিলেন তিনি। তাই বাইশ বছর ধরে, নিরলস পরিশ্রম করে, প্রখর রোদে, জলে পুড়ে, ভিজে শ্রমিকরা গড়ে তুললো সেই ঐতিহাসিক ভবন কিসের কথা বলছি বলো তো?’ ‘বুঝতে পারছি না।’ ‘তাজমহল। বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের একটি। আমার বক্তব্য খুব সহজ, সরল। আমরা প্রতিটি প্রাণী এই পৃথিবীর বুকে এক একটি বিস্ময়। প্রত্যেকেই আমরা কোনো না কোনোভাবে এক একজন নায়ক। অসাধারণ সাফল্য, পরম আনন্দ বা দীর্ঘস্থায়ী পরিতৃপ্তি, এ সবই পাওয়ার সম্ভাবনা আছে আামাদের

পৃষ্ঠা:১৪৮

সকলের মধ্যে। যা চাই তা হলো, স্বপ্ন পূরণের পথে ছোট একটি পদক্ষেপ। প্রতিদিন, তিল তিল করে গড়ে উঠে এক একটি জীবন, এক একটি তাজমহলের মতো। ছোট ছোট পরিবর্তন জীবনে ইতিবাচক অভ্যাস গড়ে তুলবে। ইতিবাচক অভ্যাস ফল দেবে, আর সেটির ফল জীবনের পথে আরো একটু এগিয়ে যেতে উদ্বৃত্ব করবে। আজ থেকেই শুরু করো আরও বেশি করে শিখতে, আরে বেশি করে হাসতে, আর যা করতে ভালোবাসো, তা করতে। ভাগ্য তোমাকে বিমুখ করবে না। কারণ তোমার পিছনে যা আছে, আর তোমার সামনে যাছে, তা তোমার মধ্যে এই মুহূর্তে যা আছে তা একেবারেই নগণ্য।’ আর একটাও কথা না বলে, জ্ঞানদানকারী সন্ন্যাসীতে রূপান্তরিত হওয়া কোটিপতি আইনবিদ, জুলিয়ন ম্যান্টলে উঠলেন, কখনোই তাঁর না থাকা ভাইয়ের মতো আমাকে আলিঙ্গন করলেন এবং দুঃসহ তপ্ত গ্রীষ্মের আরো। এক অত্যন্ত গরম দিনে আমার সদর ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমি একাকী বসে, আমার চিন্তাভাবনা রোমন্ত্রন করতে করতে লক্ষ কালিয়ে যে এই পরম জ্ঞানী বার্তাবাহীর অসাধারণ আবির্ভাবের একমাত্র প্রমাণ আমি উন্মোচন করতে পারবো যে নীরবভাবে আমার সামনে কফি ট্রে আর সেটা হলো কপির খালি পেয়ালা। ল বসে আছেন জ্ঞান

ত্রয়োদশ অধ্যায়ের সংক্ষিপ্তসার

প্রতীক চিত্র বর্তমানে বরণ করে নাও। গুণ বর্তমানকে বাঁচো, বর্তমানের উপহার উপভোগ করো। সাফল্যের কথা ভেবে আনন্দকে জলাঞ্জলি দিও না। প্রতিটি দিনকে শেষদিন ভেবে, জীবনের যাত্রা পথকে কলাকৌশল উপভোগ করো। কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা অভ্যাস করো। নিয়তি গড়ে তোলো। আছি। উল্লেখযোগ্য উদ্ধৃতি আমরা প্রত্যেকেই কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে এখানে অতীতের কারাগারে বন্দি হয়ে থেকো না। নিজের ভবিষ্যতের স্থপতি হয়ে ওঠো।

পৃষ্ঠা:১৪৯

জ্ঞানালোকদীপ্ত জীবনধারণের সাতটি কালাতীত গুণাবলিপ্রতীকঅসাধারন বাগান চিত্র বাতিঘরতোমার উদ্দেশ্যকে অনুসরণ করে সময়কে সমীহ করে চলোচিত্রকাইছেন অনুশীলন করে সুশৃঙ্খল জীবনযাপন করোচিনা নিঃস্বার্থভাবে সকলের সেরা করো চিত্র সুমো কুদ্ধিগির গোলাপী কার সুগন্ধী গোলাপ হিরে-বিছানা শথ তোমার মনকে নিয়ন্ত্রণ করো বর্তমানকে বরণ করে নাও।  KEYNOTES AND SEMINARS WITH ROBIN S SHARMA রবিন এস শর্মা তার লিডারশীপ, সর্বোৎকৃষ্ট কাজ সম্পাদনা করার ক্ষমতা আত্মোপলব্ধি এবং পরিবর্তিত সময়কে কি করে অতি সহজেই নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে হয়, এই বিষয়গুলো নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে নিমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে ভ্রমণ করে থাকেন। এই বিষয়গুলির উপর তার অসাধারুদজ্ঞান এবং নতুন দিক উন্মোচন করার ক্ষমতা তাকে পৃথিবীর বড় বড় প্রতিস্থানগুলোর কাছে করে তুলেছে এমন এক সপ্রতিভ বক্তা, যার কথা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত মানুষগুলোর জীবন বদলে দিতে পারে। এই অনিশ্চিত সময়ে, নিচিক করতে পারে স্পষ্ট ফলাফল, উৎপাদনশীলতা ও প্রতিষ্ঠানকে শিখরে নিয়ে যাওয়ার দায়বন্ধতা। রবিনের প্রতিটি উপস্থাপনা সেই নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বিশেষ গবেষণার মাধ্যমে তৈরি ও বান্ধব ঘটনা সম্বলিত। স্বভাবতই সেই প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা সেই বক্তব্যের সঙ্গে খুব সহজভাবেই একাত্মতা অনুভব করে। প্রতিটি বাতময় উপস্থাপনা, প্রতিষ্ঠানের একেকজন প্রতিনিধিকে সৃজনশীলতা, প্যাশন, কার্য সম্পাদন ও ব্যক্তিগত পরিপূর্ণতার শিখরে পৌঁছতে সাহায্য করে। আপনার পরবর্তী সম্মেলন বা ইন-হাউস সেমিনারে যদি রবিন এস শর্মাকে পেতে চান তাহলে robinsharma.com দেখুন বা লিখুন এই ঠিকানায়-

রবিন এস শর্মার ব্যক্তিগত শিক্ষণ পরিষেবা

১. দি মান্থলি কোচ ‘দি মাধুলি কোচ’ রবিন এস শর্মার অতি বিখ্যাত এক বই ও সিডি। প্রতিমাসে, আপনি পাচ্ছেন নেতৃত্ব, সম্পর্ক, ব্যবসায়িক সাফল্য ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের উপর এক একটি অনন্য সংকলন সম্বলিত সিডিতে থাকছে, বইটির

পৃষ্ঠা:১৫০

প্রতিটি অধ্যায়ের বিশেষ্য বিশেষ পয়েন্টসমূহ এবং নিজের জীবনে আপনি সেগুলিকে কিভাবে কাজে লাগিয়ে সফল ও সমৃদ্ধ হতে পারেন তার খোঁজ। রেজিস্টার করতে চাইলে, ইন্টারনেটে robinsharma, com-এ আজইআসুন।২. অ্যাও কেনিং বেস্ট সেফ উইক এন্ডসপ্তাহান্তে, মাত্র আড়াই দিনের এই কোর্স, একজন অতি ব্যস্ত মানুষকে আমূল বদলে দিতে পারে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ এই বইটির দ্বারা উপকৃত। এই বইটি তাদর জীবনের সকল আনন্দ, ভালোবাসা, প্রাচুর্য ও সব আশায় ভরিয়ে দিতে সাহায্য করেছে। ‘এ.বি.এস’ মানুষের ভিতর থেকে ভয়, দুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনা, নেতিবাচক চিন্তা দূর করে তাদের প্রকৃত ক্ষমতার সঙ্গে তাদের পরিচয় করিয়ে দিতে সক্ষম। যে জীবন শুধু তারা স্বপ্নেই কল্পনা করত, সেই জীবন খুঁজে পেতেও সাহায্য করেছে ‘এ.বি.এস’। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত, যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সকিকো, ব্রিটেন, ইউরোপ ও কানাডা, এই সকল স্থান থেকে এই প্রোগ্রামে যোগ দিয়েছেন প্রচুর মানুষ। পরবর্তী ‘এ. বি. এস’-এ যোগ দিতে বা নতুন খবরাখবর পেতে আসুন, robinsharma, com-এ, অথবা ই-মেল করুন, Coaching@robinsharma, com-4 ৩. দি এলিট পারফোররার সিরিজ (ই. পি. এ.সা এটি হলো রবিন এস শর্মা’র কর্পোরেট লিডারশিপ প্রোগ্রামগুলোর অন্যতম,বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থার কর্মীদের গড় কর্মী ক্ষমতাকে বাড়িয়ে এক উচ্চ শিখরে পৌঁছে দেওয়াই এর লক্ষ্য যোগদানকারী শিক্ষার্থী এই প্রোগ্রামটি শেষ হওয়ার পর তার উৎপাদনশীলতা, সৃজনশীলতা, প্যাশন, দায়বদ্ধতা এবং তার পেশাদারী এবং ব্যক্তিগত জীবনকে অতি উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হবেন। ই.পি.এস এর কার্যক্ষমতা কতখানি তা আপনি robinsharma, com ওয়েবসাইট এ ঢুকলেই বুঝতে পারবেন। পরবর্তী প্রোগ্রামের দিন জানতে বা বাড়িতে বসেই ‘দি এলিট পারফোরমেন্স ‘সিরিজ’ এর শিক্ষা উপভোগ করতে, robinsharma, com এ আসুন বা ইমেল করুন coaching@robinsharma, com-4 ৪. দি মাস্টার্স সিরিজ™প্রতিবছর, যদি অবশ্য তার কাজের দিনলিপি অনুমতি দেয়, তবে রবিন এস শর্মা পাঁচ জন অবধি ক্লায়েন্ট নিয়ে থাকেন, তার এই বিশ্বমানের সাপ্তাহিক কোচিং প্রোগ্রামে। সারা বছর ধরে চলতে থাকে এই কোচিং। এ সময়, রবিন

পৃষ্ঠা:১৫১

শর্মা আপনার ব্যক্তিগত সচিব বা জীবনের এক প্রকৃত শিক্ষকের মতো পাশে পাশে থেকে আপনাকে ব্যবসায়িক, ব্যক্তিগত, শারীরিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে নিয়ে যাবে, অতীতে বহু ক্লায়েন্ট অসামান্য ফল পেয়েছেন, যা তাদের জীবনকে আকূল বদলে দিয়েছে।এই একান্ত নিজস্ব কোচিং প্রোগ্রামটি সম্পর্কে জানতে robinsharma, com-এ আসুন অথব্য যোগাযোগ করুন আল মোসার্ভেলী ভাইস প্রেসিডেন্ট অফ কোচিং সার্ভিসেস শর্মা লিডারশিপ ইন্টারন্যাশনাল। ফোন1.888, RSHARMA (7774.2762) ইমেল: coaching @robinsharma.com’দ্য মঙ্ক হু সোল্ড হিজ ফেরারী’ প্রশংসাজ্ঞাপক ম্যাসেজ-লিডারশিপ উইজডম ফ্রম ‘দ্য মস্ক হ সোল্ড হিজ ফেরারী’ বছরের সেরা ব্যবদা সংক্রান্ত বহা।-প্রফিট ম্যাগাজিন ‘দ্য মস্ক হু সোল্ড হিজ ফেরাই’ দারুণ তথ্যপূর্ণ, সহজবোধ্য ও অত্যন্ত উপকারী আমাদের নিজস্ব ম্যানেজমেন্ট টিম এবং স্টোর অপারেটরদের মধ্যে আমরা এই বই বিলি করেছি। দারুণ ইতিবাচক সাড়া পেয়েছি’-ভেডিল্ড ব্লুম, শপার্স ড্রামগার্ট’ব্যবসায়ী মানুষেরা যখন দারুণ কঠিন এবং নিত্য নতুন শব্দবানে জর্জরিত, তখন রবিন এস শর্মা প্রকাশ করলেন আজকের যুগে সুস্থতার কাজ পরিচালনা করার পরিচ্ছন্ন, সহজ, সরল ভাষায় লেখা এক শক্তিশালী উপায়।’ -ইয়ান টার্নার, ম্যানেজার, সোলাতিজাকুন্ডনিং সেন্টার ‘এক অসামান্য বই, যা যে কোনো ব্যবসায়ীকে এগিয়ে যেতে এর এক সুন্দর জীবন লম ‘দ্য মন্ত্র হু সোল্ড হিজ ফেরারি’ দেখিয়ে দিল ব্যাল সত্যিই কাজের…” -দি টরন্টো স্টার ‘লিডারশিপ উইজডম ফ্রম ‘দ্য মন্ত্র হু। স্থানের পথে।’ ও গোস্ত মিষ্ট ফেরারি’ বেস্টসেলার লিস্ট এ শীর্ষ ইনভেস্টমেন্টন্ট একজিকিউটর ‘পাঠকের ব্যবসাকে এই অপান্ত এবং পরিবর্তনের সময় সময়োপযোগী এবং অন্যতম করে গড়ে তোলার শিক্ষা দেয় এই বই।’ সেলস প্রোমোশন ম্যাগাজিন যাপন করতে সাহয্য করবে-

হোম
ই-শো
লাইভ টিভি
নামাজ শিক্ষা
গেইমস
চাকুরি