Skip to content

শেষ চিঠি - আয়েশা ফয়েজ (2)

পৃ্ষ্ঠা ১ থেকে ১৫

পৃষ্ঠা:০১

দুটি কথা:হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি লেখক। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে লেখক হিসেবে যাত্রা শুরু। তরুণ সমাজকে সঙ্গে নিয়েই তাঁর বিকাশ এবং তরুণদের করেছেন বিকশিত। বলেছেন দেশ, মুক্তিযুদ্ধ, সমাজ ও পরিবারের গল্প। তাঁর লেখার প্রভাব মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মতো, দেখা যায় না, অনুভূত হয়। কলমের এ জাদুকর কী এক মোহনীয় শক্তির বলে এক বিশাল পাঠক সমাজ সৃষ্টি করে তাদেরকে নিজস্ব বলয়ে আটকে রেখেছেন। বইটি লেখা শুরু করেছিলাম নিজ দায়ে। হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর কী যে হলো, সর্বক্ষণ মাথার ভেতর পাকাচ্ছে সুদীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছরের স্মৃতি। স্বস্তি নাই, ভুলে থাকার চেষ্টা করলেও বারবার ফিরে আসে। মানসিক চাপের ভার নিতে পারছিলাম না।একসময়ে টুকরো টুকরো কাগজে যখন যেটা মনে আসে আনমনে দু’চারটা লাইন লিখে ফেলি। বিরতি দিয়ে এভাবেই লেখা শুরু। ভাবনাগুলো যেভাবে এসেছে কলমের রেখায় তার রূপ দিতে চেষ্টা করেছি। সমসাময়িক কিছু বিষয় ও ঘটনা অবধারিতভাবে এসে গেছে। লিখতে গিয়েও বিপত্তি, হাজারো স্মৃতি। কোনোটি পারিপার্শ্বিক জগতের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে সমষ্টিগত, কোনোটি দুজনের ব্যক্তিগত আলাপচারিতা, আবার কোনোটি হুমায়ূন পরিবারের একান্তই ব্যক্তিগত। সবটা তো আর ছাপার অক্ষরে আনা যায় না। থাক না ওগুলো অপ্রকাশিত। লেখায় কাটছাঁট করতে হয়েছে ব্যাপক। ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে লেখায় কিছু সীমাবদ্ধতা এসে যায়। এখানে দুটি পক্ষ উপস্থিত। একপক্ষ, যার সম্পর্কে বলা হচ্ছে। অন্যপক্ষ, যে বলছে। হুমায়ূন আহমেদকে পাঠক জানতে চায়। দ্বিতীয়পক্ষের আমিত্ব এখানে অতি গৌণ, পরগাছার মতো মহীরুহের ডালপালায় জড়িয়ে তার ওপর ভর করে নিজেকে জাহির করা, যা পাঠক গ্রহণ করে না। এ বিষয়ে সদা সচেতন থেকেও ঘটনার আবর্তে নিজেই আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা থাকার কারণে আমিত্বের মুদ্রাদোষ বর্জনে সফল হই নি। এ জন্য পাঠকের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। স্মৃতিধর্মী এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো, যারা ইহজগতে নেই, তাদের নিয়ে লিখিত বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এটি মাথায় রেখে এবং বিবেকের তাড়নায় যথাসম্ভব বস্তুনিষ্ঠ থাকার চেষ্টা করেছি। তবে জীবিতদের কেউ যদি লেখায় কোনো অসংগতি দেখতে পান, তা জানালে সানন্দে গ্রহণ করব।

পৃষ্ঠা:০২

হুমায়ূন আহমেদের ৬৪তম জন্যদিন উপলক্ষে অন্যপ্রকাশ কর্তৃক প্রকাশিত হুমায়ুন আহমেদ স্মারকগ্রন্থে পাণ্ডুলিপির নির্বাচিত অংশ প্রকাশের পর থেকে অনুজপ্রতিম মাজহারুল ইসলামের ভাগাদা না পেলে বইটির লেখা এ পর্যায়ে শেষ হতো না। বানানের ভুলভ্রান্তি ঠিক করার সকল দায়-দায়িত্ব আবদুল্লাহ্ নাসের নিজ কাঁধে নিয়ে আমাকে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছে। হুমায়ূন-অনুজ আহসান হাবীব প্রথম থেকেই বলে আসছে, দাদা ভাইকে নিয়ে কিছু একটা লিখতে। আমার বিশ্বাস, শুধু বনাবাদ পাওয়ার জন্য তারা এটা করে নি।নন্দিত নরকে উপন্যাসের প্রচ্ছদটি হুমায়ূন আহমেদের হাতে তুলে দিয়ে বরেণ্য শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী বলেছিলেন, আপনার হবে। তারপর একটু থেমে বলেছিলেন, আমার বলা উচিত ছিল, আপনার হয়েছে। ড. আহমদ শরীফ এবং কাইয়ুম চৌধুরী দু’জনই হুমায়ুন আহমেদের সৃষ্টিশীল জীবনের স্বপ্নদ্রষ্টা হয়েই থাকবেন। হুমায়ূন আহমেদ ও সমসাময়িক বিষয়ে লেখা এই বইটির প্রচ্ছদ করে দিয়ে শিল্পী প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদকেই আর একবার স্বরণ করলেন।

পৃষ্ঠা:০৩

হালকা-পাতলা গড়ন, গায়ে হাওয়াই শার্ট, পায়ে স্যান্ডেল, চোখে পুরু চশমা। তরুণটিকে সঙ্গে নিয়ে এক বন্ধু আমার হলের রুমে এল। সঙ্গের তরুণটির পরিচয় দিতে গিয়ে বলল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ছাত্র। দুর্দান্ত ম্যাজিশিয়ান, হাতের তালুতে নিমিষে পয়সা চালাচালিতে ওস্তাদ। তার নাম হুমায়ূন আহমেদ। যাকে উদ্দেশ করে বলা সে মিটিমিটি হাসছে। চালচলনে সপ্রতিভ, বুদ্ধিদীপ্ত। জাফর আলম একই বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞানের ছাত্র, চট্টগ্রাম কলেজে আমার সহপাঠী। আমি থাকি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান তিতুমীর হলে। সময়টা ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দ। তিনজন একসঙ্গে হলের ক্যান্টিনে গেলাম। হুমায়ূন আহমেদ চায়ের জন্য একচামচ চিনি বেশি চেয়ে নিল। হাতে সিগারেট। পরে আরও দেখা হলো। একবার তাদের দুজনকে হলের মাসিক ফিপ্টে খেতে বললাম। তখনকার সময়ে এটি ছিল এক আকর্ষণীয় কর্মকাণ্ড। প্রতিদিনের বাজার থেকে টাকা বাঁচিয়ে মাসের শেষে এ আয়োজন। আলোকসজ্জা, টেবিল সাঝিয়ে সবাই একসঙ্গে খাওয়া, আস্ত রোস্ট। জাতির দৈখা হলে হুমায়ূন রসিকতা করে বলত, কী ভাই, হলের ইমপ্রভড ডায়েটু অন্তরার কবে হবে। প্রথম পরিচয়ের দিন থেকেই সদা ভগী হুমায়ূন আহমেদ আমাকে। ‘ভাই’ ডাকত, আমি ডাকতাম ‘ঘুমায়ূন’। তৃপিীরস্পরিক আপনি সম্পর্কটি থেকেই যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে যে যার ‘অবস্থান ও ব্যস্ততার ফাঁকেও যোগাযোগ সূত্র ছিল নিরবচ্ছিন্ন। ঊনসত্তরের আগে-পরে সময়ে গভর্নর মোনায়েম খানের সরকারি মদদপুষ্ট ছাত্রসংগঠন এনএসএফের ছাত্রনামধারী পেশিশক্তি বাহিনী বিশ্ববিদ্যালয় ও হল ক্যাম্পাসে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। ছাত্রদের মিছিলে হামলা চালাত। পাচপান্ডুর, খোকা এরা ছিল সন্ত্রাসের প্রতিমূর্তি। খোকা কাঁধে ও গলায় একটি জীবন্ত সাপ জড়িয়ে রাখত। পকেটে পিস্তল। একদিন সন্ধ্যায় খোকাকে দেখলাম কয়েকজন সাঙ্গপাঙ্গসহ বুয়েটের হল ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের ধমকিতে নিরীহ ছাত্ররা থাকত শঙ্কিত, আর প্রশাসন ও শিক্ষকদের একাংশ থাকত নতজানু। আইয়ুব খানের উন্নয়ন দশক, ডিকেড অব রিফর্মস-এর জোর প্রোপাগান্ডা চলছে বাষ্ট্রীয় পর্যায়ে। এর মধ্যে আইয়ুব খান প্রস্তাব দিল Lingua Franca-এর আদলে বাংলা-উর্দু মিলিয়ে এক নতুন ভাষা তৈরি হবে। পাকিস্তানি ভাষা। যার সাথে মূল মাতৃভাষা বাংলার কোনো মিল নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের করিৎকর্মা একাডেমিক কাউন্সিল বাংলা বর্ণমালা উর্দু

পৃষ্ঠা:০৪

ধাঁচে লিখনরীতি তৈরি করতে নেমে পড়ল। চল্লিশজনেরও বেশি বুদ্ধিজীবী বাংলা ভাষাকে বিকৃত করার এ অপচেষ্টার বিরুদ্ধে বিবৃতি দিলেন। মুহসীন হলে এনএসএফের ছাত্রদের উৎপাত্র। হুমায়ূন নিজেই ভুক্তভোগী। এনএসএফের ছাত্ররা এক রাতে তার রুমের বইপত্র ও বিছানা বিনা কারণে তছনছ করে দিয়েছে। নতুন হলে তারা আগেই জায়গা করে নিয়েছে। এমনকি সহকারী হাউস টিউটরের বাসাটায়ও। হুমায়ুন ঠাট্টার সুরে বলত, শিগগিরই বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন কিছু ডিপার্টমেন্ট খুলবে। সিলেবাসে থাকবে হকিস্টিক, চাকু, পিস্তল চালানোর ব্যবহারিক ক্লাস, লাঠিপেটা করে আর সাইকেলের চেন দিয়ে মিছিল ছত্রভঙ্গ করা, পতিতাদের ধরে এনে হলের রুমে পুনর্বাসন করার মতো কর্মকাণ্ড। সলিমুল্লাহ হলে এক সন্ধ্যায় ডাইনিং হলে উত্তেজনা। হলে ফিন্ট চলছে। এনএসএফ বাহিনী নিজেরাই নিজেদের দাওয়াত দিয়ে মেহমান হয়ে হলের ডাইনিংরুমে ফিস্ট খেতে চলে আসত। পাচপান্ডুর একটু আগে খাওয়াদাওয়া সেরে হলের দোতলায় এক রুমে গিয়েছে। কারা যেন ওর পেটে ছুরি বসিয়ে দিয়েছে। কানাঘুষা চলছিল, দুজন ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী অতি প্রকার গিয়েছে। পাচপান্ডুর পেটে হাত চেপে একাই প্রাণে ভর করে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালের দিকে দৌড়ে গেল। তাকে সাহাবা কনার জন্য কেউ ছিল না। কিছুক্ষণ আগে একসঙ্গে ফিস্ট খাওয়া সাঙ্গপাঙ্গরা জানালা দিয়ে নিচে লাফ দিয়েছে। যায়। নারায়ণগঞ্জের এক পালিয়ে গেছে। কেউ কেউ দোতলার পাত্রপান্ডুর হাসপাতালে থেকে আরও কয়েক মাস পর এমিশ্র মিমির মৃতদেহ পাওয়া যায় রেসকোর্স ময়দানে।এঁকে কারা যেন সেখানে রেখে গেছে। এ দুটি ঘটনা উনসত্তরে ছাত্র আন্দোলনকে বেগবান করে। ছাত্ররাই ছিল অগ্রণী ভূমিকায়।ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঘোষিত এগার দফা আন্দোলন সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। ১৪৪ ধারা ভেঙে মিটিং-মিছিল। ছাত্রসমাজ বরাবরের মতো অগ্রণী ভূমিকায়। আগরতলা মামলার বিরুদ্ধে জনরোষ বাড়ছে। পুলিশের গুলিতে ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান শহীদ হয়। তার রক্তমাখা শার্ট নিয়ে মিছিলের পর মিছিল। তিন দিন পর মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত হয় দশম শ্রেণীর ছাত্র মতিউর রহমান। ঊনসত্তরের ফেব্রুয়ারি মাসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহাকে পাক আর্মি বুলেট ও বেরনেট দিয়ে হত্যা করে। আন্খেলনে শিক্ষকসমাজও নেমে পড়ে।জাফর আলম ইকবাল হলের ছাত্র সংগঠনের কাজে জড়িত। ডাকসু ছাত্রনেতাদের এই হলে আনাগোনা বেশি। তার কাছে গুনতাম বিচিত্র সব মজার গল্পকাহিনি। ছাত্রনেতাদের বক্তৃতার ধরন অনুকরণ করত ক্যারিকেচার করে দেখাত, কে কত বছর ধরে ছাত্র তার হিসাব রাখত। হুমায়ূন বলত, এরা এক ডিপার্টমেন্ট

পৃষ্ঠা:০৫

থেকে পাস করে অথবা পাস না করেই অন্য ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হয়। রাজনীতিবিদ হওয়ার তালিমটা এখান থেকেই নিয়ে নিচ্ছে। হলে থাকলে সবদিক দিয়েই সুবিধা। ঊনসত্তরের পনেরই ফেব্রুয়ারি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি সার্কেন্টি জহুরুল হককে কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টে বন্দিদশায় গুলি করে হত্যার পর ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ প্রতিবাদ ও মিছিল করে তাঁর লাশ নিয়ে আসে ইকবাল হলের। গাড়ি-বারান্দায়। একাত্তরের পঁচিশে মার্চের কালোরাত্রিতে ইকবাল হলেরই ৩০৩ নম্বর কক্ষে জাফর আলমকে গুলি করে হত্যা করে হানাদার পাকিস্তানি সেনারা। রাত পোহালে হলের সব লাশ জড়ো করে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। দক্ষিণ পাশে গর্ত করে মাটিচাপা দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রায় একই সময়ে আরও একটি গণহত্যার দৃশ্য ভিডিও রেকর্ড করেছিলেন বুয়েটের ইলেট্রিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক ড. নূর-উল-উলা। বুয়েট ক্যাম্পাসে তাঁর বাসাটি ছিল রাস্তার অপর পাশে জগন্নাথ হল এলাকার সামনাসামনি। ভিডিও ক্যামেরা কাপড়ে ঢেকে জানালার ফাঁক দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এ নারকীয় দৃশ্য তিনি ধারণ করেছিলেন।জাফর আলমের স্টেজে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, চট্টগ্রাম কলেজের সহপাঠী, বুয়েটের কবি নজরুল ইসলাম হলের সালাহউদ্দিন চৌধুরী ২৬ মার্চ। মার্চ প্রভীনেই একটি সাইবেন নিয়ে কারফিউ উপেক্ষা করে ইকবাল হলের দিকে বেরিজে টি। সে আর কখনো ছেরে নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য চত্বরে পঁচিশে মার্চের কালোরাত্রিতে স্বাধীনতা দিবসে স্মারক প্রবেশ গেইটের ডানদিকে সবুজ করা হয়েছে। শহীদদের নামফলকে খোদিত পাথরে বোত অক্ষয় অম্লান থাকুক।ছাত্রজীবনের একটু পেছনে যাওয়া যাক। বুয়েটের ছাত্রাবাস জীবনের প্রথম বর্ষ। ফেনী পাইলট হাই স্কুলের সহপাঠী বন্ধু মোস্তাফিজুর রহমান হলের একই ফ্লোরের বাসিন্দা। একদিন রুমে এসে বলল, হলে ছাত্র সংসদ নির্বাচন। একটি পদে পদপ্রার্থী হওয়ার জন্য আমাকে ঠিক করে রেখেছে। যেন আকাশ থেকে পড়লাম, এমনিতেই আমি পড়ুয়া টাইপের ছাত্র। রাজনীতির ধারে কাছেও নাই। কলেজে থাকতে পড়াশোনা নিয়েই থাকতাম।চট্টগ্রাম কলেজ হোস্টেলে এক রাতে নেতাগোছের কয়েকজন ছাত্র রুমে রুমে গিয়ে সবাইকে ডেকে নিচ্ছে। রেলওয়ে স্টেশনে সবাইকে যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছে। রাতের ট্রেনে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে একজন বড় নেতা আসছে। হোস্টেলের সামনে বাসে আরও অনেকে অপেক্ষা করছে। রেলস্টেশনের গেটের বাইরে দুই লাইনে অনেক লোকজন দাঁড়িয়ে আছে। রাতের ট্রেন স্টেশনে এল। জোরে জোরে স্নোগান হচ্ছে মাদারে মিল্লাত মোহতারেমা মিস ফাতেমা জিন্নাহ। জিন্দাবাদঃ জিন্দাবাদ। সম্মিলিত বিরোধীদলের প্রার্থী হিসেবে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে নির্বাচনে

পৃষ্ঠা:০৬

প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মাথায় স্কার্ফ ধরনের ওড়না জড়ানো, মুখের আদল অনেকটা সহোদর জিল্লাহ সাহেবের মতো। এবার হোস্টেলে ফেরার পালা। আরও কয়েকজনসহ বাসের খোঁজ নিতে গিয়ে দেখি, বাস উধাও। বাসে চড়িয়ে তোয়াজ করে যারা সেদিন নিয়ে এসেছিল তারা অপেক্ষা করার প্রয়োজন মনে করে নি। এর আগে যথাসম্ভব উনিশ শ’ ঊনষাট সাল। ফেনী রেলওয়ে স্টেশনের প্লাটফরমে স্কুল ছাত্রদের লাইনে এক দুপুরবেলা দাঁড়িয়ে আছি। ‘শাক জমহুরিয়াত’ ট্রেনে চেপে জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খান ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে স্টেশনে থেমে থেমে দেশের জনগণকে দর্শন দেবে। প্রতি স্টেশনে ছাত্ররাও লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। পাঞ্জাবি সেনারা বন্দুক তাক করে টহল দিচ্ছে। স্টেশনে ট্রেনের গতি কমিয়ে আনা হলো। ধীরে চলন্ত ট্রেনের জানালা থেকে সামান্য মুখ বাড়িয়ে, একজন জানালার সীমানা বরাবর হাতের কব্জি পর্যন্ত কোনোরকমে তুলে নিরাপদ দূরত্ব থেকে হাত নাড়ছে। প্লাটফর্মের লোকজন না দেখেই একজন আরেকজনকে বলছে, ওই যে আইয়ুব খান!বুয়েটের হলের নির্বাচনে ফিরে আসি। মোস্তাফিউর হাত ‘হাত থেকে রেহাই পাওয়া গেল না। একদিন প্রার্থী হিসেবে নোমিনেশন দূতনিসহ করিয়ে নিল। আশ্বস্ত করে গেল, আমাকে কিছুই করতে হবে না। কথা কথা রের্থছিল। আমাকে কিছুই করতে হয় নি। আমি রুমের টেবিলে পড়ছি আর সোাফিজ রাতে রুমে রুমে গিয়ে আমার পক্ষে ভোট চাইছে। মোস্তাফিজের ভাষায় ‘নিউথিত ‘ভালো ছাত্র’টিকে একটি ভোট দিতে হবে। তখনকার দিনে বুয়েটে বাচভত্তিক রাজনীতি তেমন পাকাপোক্ত ছিল। রেজাল্ট ভালো এমন প্রার্থীলেও জোশির ভাগ ছাত্র ভোট দিত। ইন্টারমিডিয়েটে বোর্ডে আমার পঞ্চম স্থান। এটাকে পুঁজি করে এবং নিজের রাজনীতির প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে আমার পক্ষে মোস্তাফিজ নির্বাচনী মাঠে নেমে পড়ল। পরবর্তীকালে মোস্তাফিজ বুয়েটের প্রথম কাতারের ছাত্রনেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। একরাতে পড়ার টেবিলে মুখ বুজে পড়াশোনা করছি। পরদিন ইমান আলী স্যারের ক্যালকুলাসের ওপর পরীক্ষা। তাঁর ক্লাসে ভালোভাবে নোট নিলে এবং শুধু ক্লাস নোট পড়ে অঙ্কে একশতে একশ নম্বর পাওয়া যায়। এ খবরটা জানা ছিল না। আগের পরীক্ষার ক্লাসের নোট ছাড়াও মূল বই থেকে অনেক অংক কষেছি। পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেল আমি পেয়েছি মাত্র বিরাশি নম্বর। আর হলের একই ফ্লোরের সহপাঠী সাদুল্লাহ যে কি না শুধু আমার ক্লাস নোটের খাতাটা নিয়ে পড়েছে, সে পেয়েছে একশতে একশ। মনমেজাজ এমনিতেই খারাপ। মোস্তাফিজ আমার রুমে এল। আমার রুমমেটদের কাছে আমার জন্য ভোট চাচ্ছে। চোখাচোখি হতেই সহাস্যে বলল, আরে বেটা, তোর রুমেই চলে এসেছি খেয়াল করি নি। না।

পৃষ্ঠা:০৭

এরমধ্যে একদিন হুমায়ূন এল। আসার পথে হলের করিডরে পোস্টারের প্যানেলে আমার নাম দেখেছে। সব শুনে বলল, আরে ভাই আপনাকে ভোট দেবে কে? আপনি তো ডাইনিংরুম আর কমনরুম ছাড়া কোথাও যান না। চলেন, বাইরে যাই। পাইনু-পালোয়ানের মোরগ পোলাও খেয়ে আসি। হলের নির্বাচিত ছাত্র পরিষদের অভিষেক অনুষ্ঠান। সংস্কৃতি-বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে আমার ওপর দায়িত্ব, অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্ব। ঘাবড়ে গেলাম। কোথেকে কী জোগাড় করব কিছুই জানি না। অনুষ্ঠানের দিন দেখলাম কীভাবে কারা যেন সব ব্যবস্থা করে ফেলেছে। আমি অভিষেক-পর্বে ডায়াসে বসে বসে দর্শকের ভূমিকায় আছি। অভিষেক অনুষ্ঠানের রাতে হলের কমনরুম ভর্তি। গানবাজনা, জাজ সংগীত, বেঞ্জো, একর্ডিয়ান, পিয়ানো। আশপাশে হলের ছেলেরাও উকিঝুঁকি মারছে। প্রশংসা মুখে মুখে। আমার গায়েও অযাচিতভাবে কিছু কিছু ছিটেফোঁটা পড়ল।হল সংসদের পরবর্তী নির্বাচন। এবার তেমন কোনো ওজর আপত্তি ছাড়াই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বনে গেলাম সাধারণ সম্পাদক। পরবর্তী টার্মে হল সংসদের ভিপি পদে নির্বাচনের সময় বেঁকে বসলাম। পড়াশোনায় আগের ভালো ছাত্রত্ব অনেকটুকু খুইয়ে ফেলেছি। রাজনৈতিক আবহাওয়া নিশ্চিত। শেষবর্ষে পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হবে।এক সিনিয়র শুভাকাঙ্ক্ষী ছাত্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে হাতে লেখা দরখাস্ত গেল। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধবিধস উত্তর আমেরিকার কয়েকটি স্টি গ্রাজুয়েটে ভর্তির নিশ্চয়তাও পাওয়া চাসহ সাদা কাগজে ঝকঝকে টাইপ করা গতানুগতিক ভাষার চিঠি পেজে বিউলাহত হতাম। মনে হতো যেন অনেক উচ্চতায় পৌঁছে গেছি। কিন্তু ভর্তির দুয়োপ্তে আর্থিক সহায়তার কথা উল্লেখ করতে হয় সে পরামর্শ কেউ তখন দেয় নি নিজের মাথায়ও আসে নি। কোনো অনুরোধ বা চাপ এড়ানোর চেষ্টায় নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে নমিনেশনের কাগজ জমা দেওয়ার কয়েকদিন আগ থেকে লাইব্রেরিতে পড়াশোনা ও অন্যান্য কাজে বেশিরভাগ সময় রুমের বাইরে কাটাতাম।ফরম জমা দেওয়ার শেষ তারিখের আগের দিন গভীর রাতে রুমের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। দরজা খুলে দেখলাম সহপাঠী শরীফ নূরুল আম্বিয়া দাঁড়িয়ে আছে। একা। বুয়েটের প্রথম কাতারের ছাত্রনেতাদের একজন। রুমমেটরা ঘুমাচ্ছে। বাতি জ্বালালাম না। অন্ধকার রুমে আম্বিয়া আর আমি দুজন বিছানায় বসলাম। মিতভাষী আছিয়া যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করছে। ছাত্র সংগঠনের স্বার্থে আমাকে আরেকবার নির্বাচনে দাঁড়াতেই হবে। অবস্থান ব্যাখ্যা করে নিজের সিদ্ধান্তে আমি অনড়। দুজনই চুপচাপ। হঠাৎ করে আম্বিয়া এমন এক কাণ্ড করে বসল। এ কী। ছাত্রসংগঠনের জন্য কেউ এত নিবেদিত হতে পারে। নিজেকে অনেক ছোট মনে হলো। কথা দিলাম নির্বাচন করব।

পৃষ্ঠা:০৮

এত বছর পর শরীফ নুরুল আম্বিয়াকে বলতে ইচ্ছে করে, তোমার লালিত আদর্শ যা-ই হোক না কেন, যারা রাজনীতিতে বারবার আদর্শচ্যুত হয়েছে, তাদের তুলনায় তোমার স্থান অনেক উপরে। তোমার জন্য রইল আজীবনের শুভেচ্ছা। একাত্তরের মার্চের প্রথম দিকের এক বিকেলে জিমনেসিয়াম থেকে ফেরার পথে আমিয়ার সঙ্গে দেখা হলো। হালকা পাতলা শরীরে ঘর্মাক্ত হাতকাটা গেঞ্জি। বলল, শরীর-স্বাস্থ্য ঠিক করছে। সামনে সংগ্রাম, এখন থেকেই প্রস্তুতি।স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী সবে কুচকাওয়াজ শুরু করেছে। পল্টন ময়দানে মহড়া দেবে। ডাকসু নেতৃত্বাধীন ছাত্রসমাজের একটি অংশ স্বাধিকার আন্দোলনকে দ্রুত স্বাধীনতা আন্দোলনের দিকে এগিয়ে নিচ্ছিল।একাত্তরের পহেলা মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণার পরদিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় সংগ্রামী ছাত্রসমাজ প্রথমবারের মতো স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা উত্তোলন করে। চেনা-পরিচিত অনেকের মধ্যে বটতলায় সেদিন হুমায়ূনও ছিল। হুমায়ূন মিটিং-মিছিলে খুব একটা যেত না। পতাকা নিয়ে স্লোগান মুখরিত বিরাট মিছিল কার্জনহল, কাকরাইল, মালিবাগ ও বাংলামটর হয়ে ঘুরে এল। এই বটতলায় পরের বার যাওয়া হয়েছিল।বাংলাদেশের পক্ষে সোচ্চার কণ্ঠের বছর পরে। মুক্তিযুদ্ধের সময় শাদের সেই বটগাছটির ভাগ্যে কাঁতার প্রিদিরানি সৈন্যরা মুক্তিযুদ্ধের প্রথমদিকে রোপণ করলেন। গাছটি গোড়াসহ কেটে ফেলেছিল সডি একই জায়গায় বটগাছের একটি চারা রাজনৈতিক তাত্ত্বিক আলম খানের নাম তখন মুখে মুখে। ছাত্ররাজনীতির এক রহস্যময় পুরুষ। প্রকাশে দেখা যেত না । চেনা-পরিচিত কয়েকজনের সঙ্গে একদিন সলিমুল্লাহ হলে গেলাম। নিচতলার এক রুমে চাদর গায়ে শশ্রুমণ্ডিত সিরাজুল আলম খান বসা। চোখের দৃষ্টি গভীর এবং তীক্ষ্ণ। ছাত্রনেতাদের একাংশের উপর তার প্রভাব তখন অপরিসীম। স্বাধিকার নয়, স্বাধীনতার জন্যই লড়তে হবে।স্বাধীনতার পর রাজনীতির নেপথ্যে থেকে সিরাজুল আলম খান ‘জাসদ’ গঠন করল। অনেক বছর পরে প্রায়ই শেরাটন হোটেল লবিতে একা চুপচাপ বসে থাকতে দেখা যেত। তিয়াত্তর বছর বয়স্ক অকৃতদার রাজনীতির এই রহস্য পুরুষের অনেক কিছুই এখনো রহস্য হয়ে আছে। কুয়েটের জিমনেসিয়াম থেকে ফেরার পথে শরীফ নূরুল আম্বিয়া কথায় কথায় বলল, চল্লিশ বছর কাজ করব, তারপর অবসর নেব। এরমধ্যে আগামীদিনের নতুন দেশ অনেক দূর এগিয়ে যাবে।আজ বেয়াল্লিশ বছর পরে আম্বিয়ার কাছে জানতে ইচ্ছা করে, তার স্বপ্নপূরণ হয়েছে কি না। কবে সে অবসর নেবে?

পৃষ্ঠা:০৯

হল সংসদের নির্বাচনে ফিরে আসা যাক। দুই প্যানেলের প্রতিযোগিতায় ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নজরুল আলম। সহপাঠী। একই ফ্লোরের কয়েক রুম পরের রুমে থাকে। নজরুল এমনিতেই মিশুক, বন্ধুবৎসল। হলের রুমে রুমে যায়, রাতের ডাইনিং হলের দরজায় অথবা নিচের ফ্লোরের সিঁড়ির গোড়ায় অনেক রাত পর্যন্ত দাঁড়িয়ে সবার সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করে। আমার সঙ্গে দেখা হলে দরাজ গলায় রসিকতার সুরে বলে, দোস্ত তোর ভোটটা আমাকে দিস। সেবার নজরুল জয়ী হলো। আন্তরিক এই বন্ধুটির সাথে বরাবরই যোগাযোগ ছিল। ২০১১ সালে নজরুল ক্যানসারে মারা যায়। চাঁদে মানুষ অবতরণ করেছে। ১৯৬৯ সালের বিশ জুলাই’র ঘটনা। হলে উত্তেজনা, কোলাহলমুখর, বারান্দায় জটলা। অনেকেরই ভাবভঙ্গি এমন যেন দুজন নভোচারীর সঙ্গে তারা এইমাত্র চাঁদে নেমেছে। তিনজন নভোচারী নামসহ ঈগল, সী অব ট্রানকুইলিটি, কলম্বিয়া, এপোলো-১১, এ নামগুলো যেন নতুন ভাষা। ঈগল চাঁদের বুকে একুশ ঘণ্টার বেশি সময় অবস্থান করেছে। নভোচারী দুজন। আড়াই ঘণ্টার কিছু বেশি সময় চাঁদের মাটিতে হেঁটেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাইশ কেজির মতো চন্দ্রশীলা সংগ্রহ করেছে লেগেছে। এসব তথ্য সবার মুখে মুখে। উড়িয়েছে, ছবি তুলেছে, থেকে চাঁদে যেতে চার দিন মানব জাতির ইতিহাসে এর আগে। বিশ্বের মানুষ একসঙ্গে একই মুহূর্তে তিনজন কয়েকঘন্টার জন্য ঢাকুন তাদের এক নজর দেখার। কোনো মুহূর্ত আসে নি যখন তাবৎ হয়েছে। এর কিছুদিন পর নভোচারী ছল। হাজার হাজার মানুষ উন্মুখ হয়ে ছিল যেন তারা ভিনগ্রহের মানুষ।চাঁদে অবতরণের খুঁটিনাটি নিয়ে একদিকে যেমন আগ্রহের শেষ নেই, অন্যদিকে নানা জল্পনাকল্পনা, গুজবেরও কমতি নেই। বিদেশি এক পত্রিকায় যুক্তিতর্কসহ প্রমাণের চেষ্টা চলছিল যে, পুরো ঘটনাটাই সুনিপুণভাবে বানোয়াট। রাশিয়াকে টেকা দেওয়ার জন্য এটা দুই পরাশক্তির মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। রাশিয়ার মন-মেজাজ এমনিতেই খারাপ। তাদের ইউরি গ্যাগারিন প্রথম মহাকাশ ঘুরে এসেছে। আর আমেরিকার নভোচারীরা চাঁদের মাটিতে হেঁটে এসেছে। ছবি এবং ছবির রঙ বিশ্লেষণ করে পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি হচ্ছে, চাঁদের অবতরণ জায়গা হিসেবে দেখানো স্থানটি আসলে দক্ষিণ আমেরিকার একটি মরু অঞ্চল।কোনো কোনো মহল চাঁদের পবিত্র মাটিতে পা রাখার অবিশ্বাস্য ঘটনাকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হিসেবে বিবেচনা করল। তাদের যুক্তি, পৃথিবীর তুলনায় কম মাধ্যাকর্ষণ শক্তিতে চাঁদের পিঠে স্পেসসাট পরে নভোচারীদের হালকা ভেসে ভেসে হাঁটার দৃশ্য নাসার গবেষণাগারেই সিমুলেট করে ধারণ করা সম্ভব। এসব গল্পগুজব বিভিন্ন মেলামেশার আসরে হাসির খোরাক যোগাত।

পৃষ্ঠা:১০

হুমায়ুন বলত, এরা সব গাধার গাধা। আদিম যুগের গুহা থেকে এখনো বেরিয়ে আসতে পারে নি। পদার্থবিদ্যা, নিউটনের গতিসূত্র, মহাকর্ষ বল, বলবিদ্যা, আইনস্টাইনের আপেক্ষিক গতিসূত্রের খবর এদের কাছে এখনো পৌঁছায় নি।পৃথিবী ও চাঁদে যাওয়া-আসায় এ্যাপোলো-১১ নভোসানের গতিপথে রকেটের ট্রেজেকটরির একটি সচিত্র প্রতিবেদন তখনকার টাইমস ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়, যা অনেকেই আগ্রহ নিয়ে পড়েছে।সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিস পরীক্ষা দিয়ে জাফর আলম সিএসপি কর্মকর্তা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সাধারণ আন ও বিভিন্ন বিষয়ের ওপর বই জোগাড় করে পড়ত। হুমায়ূন ঢাকা কলেজের ছাত্র ছিল। নীলক্ষেতের ফুটপাতে স্বল্পদামে পুরাতন বই- ম্যাগাজিনের বৌজখবর রাখত। কেনা হতো, হাতবদল হতো।হুমায়ুন একবার হস্তরেখার ওপর পুরাতন একটি বই খুঁজে পেল। মহাউৎসাহে বই পড়ে একে অপরের হাতের রেখা দেখে নানান ধরনের ব্যাখ্যা চলত। হুমায়ূন বইয়ের বর্ণনা ও রেখার সঙ্গে নিজের হাতের রেখা নিজেই মিলিয়ে দেখত। আর দাবি করত বড় ম্যাজিশিয়ান হবে। হস্তরেখার এই অঞ্জরিনটি রীরে আরও কিছুদিন আমিও অন্যের ওপর চালিয়েছি। ডর্টমুন্ডে জার্মান ভাষা। একবার ধরা খেয়েছি। থাক সে কথা। ফাঁকে হস্তরেখা দেখতে গিয়েপুরাতন বইয়ের দোকান থেকে আজগুবি স্বপ্নের আজগুবি সব ব্যান্ডে MARBOI.CO একটি খোয়াবনামার খোয়াবনামার বই নিয়ে এল।একসময় হুমায়ূন এসব মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং যুক্তি রূপনা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা, স্ট্রোর মাধ্যমে ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়ে তার লেখালেখিকে সমৃদ্ধ করেছে। তার মনোজগতের মিসির আলি সবকিছুর একটা যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে চেষ্টা করত।এক সন্ধ্যায় মুহসীন হলের মাঠে বসে আছি। হুমায়ূন বলল, যার যার পকেটে যত টাকা আছে সন বের করে শুনতে। টাকা, আনা, আধুলি মিলিয়ে মোট ছাব্বিশ টাকার মতো। হেঁটে আসা-যাওয়া করলে গুলিস্তানের চৌ-চিন চৌতে চাইনিজ খাবার খাওয়া যাবে। হুমায়ূনের মহাউৎসাহে জাফর আলম ও তার আরেক সহপাঠীসহ সবাই রওনা দিল।একাত্তরের একুশে ফেব্রুয়ারির আবহ ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। নির্বাচনোত্তর অনিশ্চয়তা, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা ও ষড়যন্ত্র চলছে। সারা দেশে প্রতিবাদ মিছিল ও আন্দোলন। পত্রিকার পাতায় পুলিশের গুলিতে সারা দেশে নিহতদের খবর। জনরোষ ফুলে ফেঁপে উঠেছে।শহীদ দিবসকে কেন্দ্র করে গণমানুষের চিন্তাচেতনা বৃহত্তর সংগ্রামের দিকে ধাবিত হচ্ছিল। ঊনসত্তর-সত্তরের একুশে ফেব্রুয়ারির ধারাবাহিকতায় শোককে

পৃষ্ঠা:১১

প্রতিবাদের ভাষায় পরিণত করে স্বাধিকারের বজ্রমুষ্টি প্রত্যয় স্বাধীনতা শপথের রূপ নিচ্ছে। চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছাত্রছাত্রীদের রাজপথে আঁকা আলপনা, ভিন্নমাত্রার পোস্টার, দেয়ালের লিখন, বুলবুল ললিতকলা একাডেমী ও ছায়ানটের তরুণ- তরুণীদের পরিবেশিত সঙ্গীতের মূর্ছনা যেন চরম আত্মত্যাগের ডাক দিয়ে যাচ্ছে।  একাত্তরের একুশে ফেব্রুয়ারির আগের দিন সন্ধ্যায় হল থেকে সবাই রাস্তায় নেমে এল। বাইরে মর্মভেদী সুরের মূর্ছনা মাইকে ভেসে আসছে। ‘বুলবুল ললিতকলা একাডেমি’ ও ‘ছায়ানটে’র শিল্পীরা খোলা ট্রাকে, বসে গান পরিবেশন করছে। এক বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ক্যাম্পাস থেকে আরেক বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ক্যাম্পাসে যাচ্ছে। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি…’, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি…’, ‘কারার ঐ লৌহ কপাট…’ গানগুলো এত অর্থবহ হয়ে আগে আর কখনো ধরা দেয় নাই। অস্ট্রিয়ার রাজা হাঙ্গেরির ভাষা নিখন করতে চেয়েছিলেন। বুদাপেন্ডের হাঙ্গেরিয় স্টেজ পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই বোধ হয় রাজা আপন পায়ে কুড়োল মারলেন। অভিনেতা- অভিনেত্রীরা বেরিয়ে পড়ল জিপসি ক্যারাবন্তী শহরে শহরে, গাঁয়ে গাঁয়ে তারা এমন ভাষার বান সৃষ্টিয়ে তুলল যে, সমস্ত দেশ মনেপ্রাণে অনুভব করল হাজাদা মানুষের জীবনে কতখানি জায়গা জুড়ে আছে, জু শো-আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করার জন্য ওই তার একমাত্র রিও সে সভাতা-সংস্কৃতি সে তার পিতা-পিতামহের কাছা সভ্যজন বলে মাতৃভাষা। রকে পেয়েছে, যার কল্যাণে সে পরিপুষ্ট করে থেকে ঋণমুক্ত হতে চায়-সে তার এই তার সময়। ভাষাআন্দোলনের বিক্ষোভ-উচ্ছ্বাসের দুর্দিনে গড়ার কাজ করা যায় না। সে যেন আতসবাজি। সেটা শেষ হলে যে অন্ধকার সেই অন্ধকার। তার পূর্বেই ওর ক্ষুদ্র শিক্ষা দিয়ে গ্রামে গ্রামে সহস্র প্রদীপ জ্বালিয়ে নিতে হয়।’ শোয়েব নামে এক সহপাঠী হলে কিছুদিন আমার রুমমেট ছিল। পাকিস্তানের শিয়ালকোটে বাড়ি। একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে গেল। সব দেখে- শুনে অভিভূত। মন ছোঁয়ানো গান শুনল। একদিন বলল, ছায়ানটে ভর্তি হবে। রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখবে। পানের গলা এমনিতেই ভালো। অল্পদিনেই কয়েকটি গান গাইতে শুরু করল-‘কেন চোখের জলে ভাসিয়ে দিলেম না শুকনো খুলো যত…’

পৃষ্ঠা:১২

গানটি অনেক দরদ দিয়ে গাইত। আর একদিন বলল, আমি এখন বুঝতে পারি কেন তোমরা বাংলা ভাষার জন্য এত পাগল। যে ভাষায় এমন সুন্দর গান হয় তাকে না ভালোবেসে পারা যায় না।পরবর্তী একুশে ফেব্রুয়ারি পালিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে। এই মাহেন্দ্রক্ষণ মাত্র একটি প্রজন্মের জন্যই আসে।আরও তিন দশক পরে ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করেছে। এ দিবসের ইতিহাস জানতে গিয়ে তাবৎবিশ্বের শত কোটি মানুষ জেনেছে পৃথিবীর এককোণে ছোট এক ভূখণ্ডের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী মায়ের ভাষায় কথা বলার জন্য বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ করে একটি স্বাধীন দেশ বানিয়েছে। ক্রিকেট বিশ্বের দশটি দেশের একটি দেশ বাংলাদেশ। শান্তিতে এক বাংলাদেশি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। অর্থনীতিতে এশিয়ার প্রথম নোবেল পুরস্কার বিজয়ী একজন বাঙালি। এক বাঙালি কবি বিশ্বকবি শিরোপা নিয়ে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়ে বাংলাভাষাকে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠা করেছেন সেই এক শতাব্দী আগে। অপার সম্ভাবনাময় দেশগুলির একটি বাংলাদেশ।বৈশ্বিক অর্থনীতির এক সাম্প্রতিক সমীক্ষায় বন্ধ উয়েছে, আগামী দশ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যআয়ের দেশে উত্তরণ অর্থনীতির দেশ হবে চীন ও ভারত। এক ধাপ এগিয়ে যাবে এবং চল্লিশ দেশগুলিকে ছাড়িয়ে যাবে। এই করলেও কাছাকাছি সময়ে বিশ্বের বড় বইয়ের মধ্যে বাংলাদেশ প্রবৃদ্ধিতে আরও ঔর মধ্যে প্রবৃদ্ধির দিক থেকে পশ্চিমা এঁকে কাজে লাগানোর জন্য দরকার শুধু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাত্রজনতার দুর্বার আনুষ্ঠ আলোভনের চাপে ঊনসত্তরের একুশে ফেব্রুয়ারির পরদিন আগরতলা মামলা প্রত্যার্জারি করে রাজবন্দিদের মুক্তি দেওয়া হয়। মার্চে রাওয়ালপিণ্ডিতে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর সামরিক শাসন জারি করে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়।সত্তরের জলোচ্ছাসে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে অগণিত মানুষের করুণ মৃত্যু, ব্যাপক ধ্বংসলীলার পরেও কেন্দ্রীয় সরকারের নিষ্ক্রিয়তায় জনমনে ক্ষোভের দানা বেঁধে ওঠে। এসময় মাওলানা ভাসানীর প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ছিল পুঞ্জিভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরেও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের ষড়যন্ত্র ও টালবাহানা চলতে থাকে।আজ বুয়েটের শেষবর্ষের শিক্ষার্থীদের ফাইনাল পরীক্ষার শেষ বিষয়ের পরীক্ষা শুরু হবে দুপুর দেড়টায়। পহেলা মার্চ ১৯৭১। আনন্দ ও বেদনামিশ্রিত এক অনুভূতি। ছাত্রজীবনের সমাপ্তি। অনেকের পকেটে বলাকাহলের সিনেমার টিকিট। পরীক্ষার হল থেকে সরাসরি সিনেমাহলে যাবে।

পৃষ্ঠা:১৩

রেডিওতে ঘোষণা এল, দুপুর একটা পাঁচ মিনিটে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেবে। রেডিওতে ভাষণ দিল। অযৌক্তিক কতকগুলি কারণ আর মনগড়া অভিযোগ ভুলে জাতীয় সংসদের পূর্বনির্ধারিত ডাকা অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করে দিল। সবকিছু ওলট-পালট হয়ে গেল। কাগজ-কলম ফেলে ছাত্ররা রাস্তায় নেমে পড়ল। বুয়েট থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের বটতলার দিকের রাস্তায় দলে দলে আশপাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের খণ্ড খণ্ড মিছিল। কারও হাতে লাঠি, কারও হাতে গাছের ডাল ভেঙে নেওয়া শাখাদণ্ড। কেউ গা থেকে শার্ট খুলে কোমরে পেঁচিয়ে নিয়েছে। খালি হাত দুটি ক্ষোতে দুদিকে ছুড়ছে। কিছু-একটা করতে হবে। কিন্তু কী করবে বুঝতে পারছে না। প্রতিবাদ বিক্ষোভমুখর বটতলা। স্বতঃস্ফূর্তভাবে সবাই এখানে এসেছে। মাঝে মধ্যে স্লোগান হচ্ছে- একদফা, একদফা। একসময় দ্বোধণা এল, আগামীকাল সকাল এগারটায় বটতলায় সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের মহাসমাবেশ।এর ঘণ্টা কয়েক আগে খবর ছড়িয়ে পড়ল, ঢাকে স্টেডিয়ামে চলা পাকিস্তান। নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট ম্যাচের দর্শকজনতা স্নোগুন সময়ে, মিছিল করে মাঠ থেকে বেরিয়ে এসেছে। খেলা পণ্ড হয়ে গিয়েছে। মেট্টেল পূর্বাণীতে পার্লামেন্টারি কমিটির মিটিং থেকে বেরিয়ে এসে সেখানে জড়ো জলে তিয়ী জনতার সামনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তীব্র ভাষায় জাতীয় সহ ইগিতের প্রতিবাদ জানালেন। শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলন গড়ে তোলার ডাকু। সাভ তারিবে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণার কথা বললেন। সমগ্র পূর্ব বাংলার মানুষের আশা-আ বিজনমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা তাঁকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। তাঁর প্রতিটি দিক-নির্দেশনা স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হচ্ছে।হলে ফিরতে ইচ্ছে হলো না। সন্ধ্যার দিকে জাফর আলমের সাথে ইকবাল হলে এলাম। এখানে ডাকসুর ছাত্রনেতারাও জড়ো হয়েছে। রাতের দিকে শোনা গেল, পরদিন বটতলার ছাত্র সমাবেশে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হবে। বড় একটি পতাকা সেলাই করে আনার জন্য কয়েকজন বলাকা সিনেমাহলের দিকে দর্জির দোকানে চলে গেছে। পতাকা হবে-সবুজের জমিনে লাল সূর্য, তার ওপর হলুদ রঙের পূর্ববঙ্গের মানচিত্র।দুপুর থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টা। মানুষের চিন্তা-চেতনার এত পরিবর্তন। এই চিন্তা-চেতনা দানা বাঁধা শুরু করেছিল বছরের পর বছর ধরে। চলমান দাবদাহে আজকের ঘটনা একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। ছড়িয়ে পড়বে সবখানে।সঠিক দিন-তারিখ মনে নাই। একাত্তরের মার্চের চার-পাঁচ তারিখে হলের ছাত্ররা এক বড়সড় লালসালু কাপড়ের ওপর বড় বড় সাদা অক্ষরে ‘শহীদ তিতুমীর হল’ লিখে ব্যানারটি দিয়ে হলের সামনে খোদাই করা ‘কায়েদে আযম হল’ নামটি ঢেকে দিল।

পৃষ্ঠা:১৪

রাজনৈতিক আলোচনার আড়ালে শক্তি বৃদ্ধি করে পাকসেনারা পঁচিশে মার্চের কালোরাত্রিতে ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা চালাল। সর্বস্তরের জনগণ রুথে দাঁড়াল। যুদ্ধ করে দখলদার পাকবাহিনীর কবল থেকে স্বাধীন বাংলাদেশকে মুক্ত করতে হবে। তিতুমীর হলের দোতলার থাকত সহপাঠী আনোয়ার। প্রথম বর্ষের পর আর্মিতে চলে যায়। চৌকস অ্যাথলেট। আমার দুই রুমমেট ছিল ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ থেকে আসা আনোয়ারের সহপাঠী। সর্বক্ষণ আসা-যাওয়া। মাঝেমধ্যে আমার ক্লাসের নোটখাতা চেয়ে নিত। ওগুলো নাকি তার কাজে লাগত। বন্ধুরা ডাকত ‘কেপি- কেসি’। কেন ডাকত জানতাম না।ক্যাডেট কলেজ থেকে আসা সহপাঠীরা একে অপরকে বিচিত্রসব সংক্ষিপ্ত নামে ডাকাডাকি করত। বাল্যকাল থেকে কলেজের নিবিড় পরিবেশে একসঙ্গে বেড়ে ওঠার কারণে বন্ধুত্বের বন্ধন পরমাত্মীয়ের মতো আজীবনের হয়ে গিয়েছে। কাটছাটে নাম হয়ে গিয়েছে সংক্ষিপ্ততম । আমার এক রুমমেট মোহাম্মদ মোহাম্মন আলীকে। ডাকত মলি ঘ। আর এক রুমমেট জাকারিয়াকে ডাকত জগা। দুজনই পাটিক্টেটর আর্মিতে চলে যায়। ঢাকায় এলেই আনোয়ার হলে আসত। লঙ্ঘ? হালকা-পাতলা গড়ন। চলন-বলনে দারুণ স্মার্ট। একাত্তরের পঁচিশে মার্চ রাষ্ট্রদ্ধ যশোর ক্যান্টনমেন্টে লেফটেন্যান্ট আনোয়ারের নেতৃত্বে বীর বাঙালি সেন্টারটি সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। মার্চের শেষের দিকে স্বাধীন বাংলাদেশের মহীযুক্ত দখলদার পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে শহীদ হয় বীরমুক্তিযোদ্ধা বানেগার। সশস্ত্র প্রতিরোধের একেবারে প্রথমদিকের শহীদ, আনোয়ার। ঢাকা এক্টিনমেন্টে শহীদ বীর উত্তম লে. আনোয়ার গার্লস কলেজটি তার আলোকবর্তিকী বহন করছে।নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হয়েছে। বাহাত্তরের জানুয়ারিতে বুয়েটে ফাইনাল পরীক্ষা শেষ। এর আগেই একদিন মুহসীন হলে খোঁজ নিতে গিয়ে হুমায়ূনের সঙ্গে দেখা। শুনলাম, বাবা ফয়জুর রহমান আহমেদের শহীদ হওয়ার মর্মস্পর্শী বিবরণ। পাকিস্তানি মিলিটারি মুক্তিযুদ্ধের সময় একরাত্রে হলের কিছু ছাত্রের সঙ্গে হুমায়ূনকেও উঠিয়ে নিয়ে যায়।আমরা স্মরণ করতে চেষ্টা করলাম আমাদের হারানো বন্ধুদের। তাদের জীবনের স্বপ্ন নিয়ে কথা বললাম। জাফর আলমের প্রসঙ্গ ঘুরেফিরে আসে। বললাম, জহুরুল হক হলে একা গিয়েছিলাম। চলেন, আবার যাই। হুমায়ূন বলল, ওদিকে যেতে মন চায় না। একদিন গিয়ে খুবই খারাপ লেগেছে। পরে একদিন যাব।হুমায়ূনকে জানালাম আহসানুল হাবীবের কথা। তিতুমীর হলের দক্ষিণ ব্লকের ৪০৫ নম্বর কক্ষে আমার দীর্ঘদিনের রুমমেট। একেবারে নির্বিবাদী ও শান্ত প্রকৃতির।

পৃষ্ঠা:১৫

মোটা ফ্রেমের চশমা পরত, চুপচাপ থাকত, পড়াশোনার ফাঁকে বারান্দার পিলারের গায়ে হেলান দিয়ে সিগারেট টানত আর উদাসীনভাবে আকাশের দিকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছাড়ত। রাজনীতি প্রসঙ্গে তাকে কখনো আলোচনা করতে দেখি নি। মিটিং-মিছিলে ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাবনা-সিরাজগঞ্জ এলাকায় কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধ করে। ডিসেম্বরে চূড়ান্ত বিজয়ের লগ্নে দখলদার পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হয়।হুমায়ূন বলল, একদিন আমাকে তিনি সিগারেট অফার করেছিলেন।একই হলের ছাত্র তুখোড় সাবা খেলোয়াড় মুফতি কাসেন। হুমায়ুন একদিন আত্মাহ নিয়ে তার সঙ্গে দাবা খেলায় বসল। কয়েক চালের মাথায় হারল।মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে এক অসতর্ক মুহূর্তে বাঙ্কার থেকে মাথা তুলে চারদিক দেখে নিচ্ছিল মুফতি। দখলদার শত্রুসেনার রাইফেলের গুলি সরাসরি মাথায় এসে লাগল।হুমায়ুনের মুখমণ্ডলে নির্বাক বেদনার ছাপ। বলল, আমরা কজনকেই বা চিনি। এ তালিকা তো অনেক দীর্ঘ। তাদের রক্তঋণে আমরা বেঁচে আছি।তিতুমীর হলের একই ফ্লোরের বাসিন্দা সহপাঠী জালালুদ্দিন আহমেদকে পাবনার গ্রামের বাড়িতে পাকিস্তানি বাহিনী হত্যা করে। জালাল ছিল হাসিখুশি ও আমুদে। তার রুমটি ছিল রাস্তার দিকে গোসলবুদ্ধির পাশে। একদিন পরীক্ষা শিক্ষানোর দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘট চলছে পর দুটি কঠিন বিষয়ে পরীক্ষা, সে কারণে ওইদিন পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষার হলে ভাইব। হবে না। পলাশীর রেললাইনের পাশে বাঁশ ফেলা হয়েছে। নজরুল পায়ে ছিটিয়ে দিল। সবার তুমুল গ্রক কয়েকজন ছাত্র বইখাতা নিয়ে 1তিতুমীর হলের সহপাঠী জীবনবাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল । দখলদার পাকিস্তানি সেনাদের মূলঘাঁটি ঢাকায় তখন খোকা গ্রুপ ও মায়া গ্রুপের দুর্ধর্ষ গেরিলাদের কর্মকাণ্ড সবার মুখে মুখে।খোকা গ্রুপের গেরিলা সদস্যরা পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর প্রহরাধীন মালিবাগ বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন আক্রমণ করে অকেজো করে দেয়। মফিদুল বাশার গেরিলাদের এ অভিযানে সরাসরি অংশগ্রহণ করে।শান্তিনগরে চলচ্চিত্র তথ্য ও প্রকাশনা কেন্দ্র ‘চিত্রে পাকিস্তানি খবর’ ঢাকায় সবকিছু স্বাভাবিক চলছে বলে প্রচার করত। দোকানপাটে সববয়সের নারী-পুরুষকে জড়ো করে কেনাকাটার ছবি তুলত। সাদেক হোসেন খোকার নেতৃত্বে মুস্তফা লস্করসহ তিনজন গেরিলা যোদ্ধা রমজান মাসের ইফতারের সময় বিস্ফোরক দিয়ে ডিএফপি উড়িয়ে দেয়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, আকাশবাণী, বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকাসহ পৃথিবীর বহু প্রচারমাধ্যম বারবার গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করে সে খবর। একই মাসে খোকা গ্রুপ আরেকটি অপারেশন চালিয়েছিল রাজারবাগ পুলিশ লাইনের উল্টোদিকে মোমেনবাগ নির্বাচন কমিশন অফিসে। মুক্তিযুদ্ধকালে মুক্তাঞ্চলে চলে

পৃ্ষ্ঠা ১৬ থেকে ৩০

পৃষ্ঠা:১৬

যাওয়া এমপি-এমএনএদের নির্বাচনী এলাকায় উপনির্বাচনের আয়োজন চলছিল নির্বাচন কমিশনে। এক বৃষ্টির দিনে ছয়জন গেরিলা যোদ্ধা তিনজন করে দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে দুই ভবনে বিস্ফোরক স্থাপন করে। মফিদুল বাসার ও মুস্তফা লক্ষরও ছিল এই দুটি গ্রুপে। একসময় বাশার ও লঙ্কর চলে যায় মেলাঘরে। দুই নম্বর সেক্টরের ট্রেনিং ক্যাম্প। সাথে নিয়ে যায় সহপাঠী মাসুদ হাসানকে। মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিবে।এ সহপাঠী বন্ধুদের দীর্ঘদিন যাবৎ খুব কাছে থেকে দেখে আসছি। এ বীর মুক্তিযোদ্ধারা পরবর্তীতে কোনো সুযোগ-সুবিধা নেওয়া দূরে থাক, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজেদের নাম জাতীয় তালিকায়ও অন্তর্ভুক্তির কোনো প্রয়োজন মনে করে নি। দেশমাতৃকার জন্য যখন যা করার প্রয়োজন ছিল তা করেছে, এটাই যথেষ্ট। সাদেক হোসেন খোকা এবং মোফাজ্জাল হোসেন চৌধুরী মায়া দুজনই পরবর্তীকালে রাজনীতিবিদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।ঢাকা শহরে পনের-ষোলটি গেরিলাক্ষপ আলাদাভাবে সক্রিয় ছিল। নিরাপত্তার স্বার্থে একদল আরেকদলের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা থেকে বিরত থাকত। কোনো দলের একজন ধরা পড়লে অমানুষিক অত্যাচারের মুখে অন্য দলের নাম যেন বেরিয়ে না আসে। গেরিলারা সবাই দুই নম্বর সেক্টরের। কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ কসবার। হায়দারের উপর দায়িত্ব পড়ে। ডিআইটি ভবনের টেলিভিশন সম্পর ট্রেনিং ক্যাম্প। সেক্টর আহত হওয়ার পর মেজর রোমকন্দ্রে এবং হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে পাক-আর্মির নাকের ডগায় গেরিলারছ রোমা আন্তর্জাতিক খবরে শিরোনাম পাওয়ার স্টেশনে দুই নম্বর। বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। যা জাতীয় এবং উইে। ধানমণ্ডির বিদুৎ সাবস্টেশন ও সিদ্ধিরগঞ্জ গেরিলারা বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। ফার্মগেটে মিলিটারি চেকপোস্টে চোরাউঙ্গাপ্তা হামলা চালিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যদের খতম করেছে। এক সন্ধ্যায় ধানমণ্ডি এলাকায় অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে আট-নয়জন মিলিটারি পুলিশকে ঘায়েল করার পরপরই মিরপুর গ্রীনরোডের মাঝে সৈন্যসহ একটি জিপ ধ্বংস করার কয়েকদিনের মধ্যে আরও কয়েকজন গেরিলা সহযোদ্ধাসহ ধরা পড়ে দুর্ধর্ষ গেরিলা যোদ্ধা বদি ও রুমী। পেরিলা যুদ্ধ থেমে থাকে নি। নিত্যনতুন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গেরিলারা শহরের বাইরে জড়ো হতে থাকে। ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে শহরে ঢুকে পড়ত।একাত্তরের পঁচিশে মার্চের আগের দিনগুলোর কথা। রাজনৈতিক আলোচনার সময়ক্ষেপণের আড়ালে প্রতিদিন পিআইএ’র রাতের ফ্লাইটভর্তি পাকিস্তানি সেনারা বেসামরিক ড্রেসে এসে কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টে জড়ো হচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তাদের আনা-নেওয়ার অজুহাতে সৈন্যদের আনতে পিআইএর কয়েকটি আন্তর্জাতিক রুটও স্থগিত করা হয়েছে। ‘বুচার অব বেলুচিস্তান’ টিক্কা খানের চাহিদা-পূর্বাঞ্চলে আরও সৈন্য পাঠাও।

পৃষ্ঠা:১৭

বিমানে হালকা অস্ত্র আসছে। ভারী অস্ত্র আসছে চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে বড় বড় জাহাজে। অন্ত খালাশ হয়ে চলে যাচ্ছে বিভিন্ন সেনা ছাউনিতে। এসব খবরাখবর মফিদুল বাশারের অগ্রজ, পাকিস্তান এয়ারফোর্সের তরুণ বাঙালি অফিসার খাদেমুল বাশার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিজে পৌঁছিয়ে দিচ্ছে ধানমণ্ডির বত্রিশ নম্বর রোডে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। তাঁর কাছে চাইছে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা।পঁচিশে মার্চের রাতে চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙ্গর করা অগ্রভর্তি ‘এমভি সোয়াত’ জাহাজ থেকে অন্ত্র খালাসের জন্য ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর জিয়াউর রহমানকে নির্দেশ দিয়ে পাঠানো হলো। যে অস্ত্র দিয়ে নিরস্ত্র বাঙালির রক্ত ঝরানো হবে তা খালাস করা যাবে না। বন্দরের পথেই বেঙ্গল রেজিমেন্টের দলবলসহ বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন এ বীর মুক্তিযোদ্ধা। পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।সভেরই ডিসেম্বর ১৯৭১। ভোরবেলা ঢাকার অদূরে বৈদ্যের বাজার এলাকায় একটি বাড়ির বাইরের মাঠে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প। ফজরের নামাজের পর বাড়ির এবং আশপাশের বাড়ির সব বয়সী পনের-বিশজন মানুষ এবং মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে খোলা জায়গায় সমবেত হলো। সূর্য ওঠার সাথে সাথে বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত লাল-সবুজের পতাকা উত্তোলন করা হবে। সারিবদ্ধ মুষ্টিযোদ্ধারা অস্ত্র হাতে টানটান বুকে দাঁড়িয়েছে। অন্যেরাও মুষ্ঠিবদ্ধ হাত বুলিয়ে দীড়ানো। পতাকা উত্তোলন করা হচ্ছে। প্রাণ খুলে সবাই একসাথে গাইছে এজমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি…।’ দখলদার পাকিস্তানি সেন্দ্রাও বাংলাদেশের প্রথম ভোরের সূর্য উঠল। পুব আকাশে গোলাকার সূর্যের বঈমা সিমা ভোরের কনকনে শীতের কুয়াশা ভেদ। করে পতাকাটিকে সোনালি রঙে চিনিয়ে দিল। বাড়ির বয়স্ক একজনের পরিচালনায় মুনাজাতে স্বাধীন বাংলাদেীেন ও সমৃদ্ধি কামনা করা হলো। বৈদ্যের বাজারের গ্রামের বাড়িটি সহপাঠী শহিদুল হকদের। তিতুমীর হলের একই ফ্লোরে থাকত। একই হলের বাসিন্দারা, কেমন করে যেন, বারবার বিভিন্ন প্রসঙ্গে লেখনীতে চলে আসছে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে কিছুদিন ঢাকা অবস্থানকালে বুয়েটের হলের দিকে যাওয়া হতো না। সহপাঠী অনেক বন্ধু ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় এখানে-সেখানে থাকত। মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যোগাযোগ রাখত। গোপন খবরা- খবর আদান-প্রদান হতো। ডিসেম্বর মাসের প্রথমদিকে সহপাঠী মোস্তাফিজ খবর পাঠাল শহিদের সাথে সে বৈদ্যের বাজার যাচ্ছে। আমিও যেন তাদের সাথে যোগ দেই। প্রধান সড়ক বাদ দিয়ে খাল-বিল ও বনজঙ্গলের মধ্যে পায়ে হেঁটে রাতের দিকে আমরা সেদিন শহিদুল হকের বাড়ি পৌঁছলাম।অনেক পরে নব্বই দশকে মুক্তিযুদ্ধের দুর্ধর্ষ পেরিলাযোদ্ধা বদিউল আলমকে নিয়ে হুমায়ূন ‘আগুনের পরশমণি’ উপন্যাস লিখেছে। মুক্তিযুদ্ধের ওপর চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছে। শুটিংয়ের সময় স্পটে দেখেছি, গোরিলাদের অপারেশনের প্রতিটি খুঁটিনাটি

পৃষ্ঠা:১৮

দৃশ্য ফুটিয়ে তুলতে হুমায়ূনকে নিরলস পরিশ্রম করতে। এক একটি দৃশ্য বারবার ‘বি- টেক’ করছে। পছন্দ না হলে পুরো সেট নতুন করে সাজাচ্ছে। পরম মমতায় নিজের লেখা স্ক্রিপ্টের চরিত্রের সঙ্গে নিজেই একাত্ম হয়ে গিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকে তুলে ধরার জন্য এ যেন আরেক যোদ্ধার আপ্রাণ সংগ্রাম। এর অনেক বছর আগে রাজনৈতিক প্রতিকূল অবস্থায়ও নাটকের টিয়া পাখির মুখে ছড়িয়ে দিয়েছিল-তুই রাজাকার’।গেরিলা যুদ্ধের অপারেশনে গুলিতে আহত মুমূর্ষু বদিউল আলম চরিত্রে আসাদুজ্জামান নূরের অভিনয় ছিল অনবদ্য। মুমূর্ষু গেরিলা যোদ্ধার মুখমণ্ডলে ভোরের সূর্যের আলোর ছটা পড়ছে। কিন্তু দু’চোখে নেমে আসছে চিরদিনের জন্য রাজ্যের আঁধার।লন্ডনের মিউজিয়ামে কোনো এক শিল্পীর আঁকা একটি তৈলচিত্র দেখেছিলাম। ট্রাফালগার নৌযুদ্ধের শেষ মুহূর্তে শত্রুর কামানের গোলার আঘাতে গুরুতর আহত নেলসন, ফ্লাগ-শিপ ভিক্টরির ডেকে অন্তিম শয়ানে শায়িত। নিজেই বুঝতে পারছে। মৃত্যু অতি সন্নিকটে। ভিক্টরির ক্যাপ্টেন খবর নিয়ে এল। অ্যাডমিরাল, যুদ্ধে আমরা জয়ী হয়েছি। বাকরুদ্ধ মুমূর্ষু নেলসনের ঠোঁটে এবং চোখে আনন্দ-বেদনামিশ্রিত বিজয়ের হাসির অভিব্যক্তি শিল্পী তার তুলিতে ফুটিয়ে তুলেছে। মুক্তিযুদ্ধে অগণিত জানা-অজানা মানুষের অর্থাতয়াল, নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার সঠিক তথ্যাদি কখনো পাওয়া যাবে না। একাত্তরের বিজয় দিবসের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বিভিন্ন স্থানে বৃদ্ধিরণকবর, বধ্যভূমি, বেছে বেছে সেরা বাঙালি মিরপুর-রায়েরবাজারের থেকে তুলে নিয়ে হত্যা, সারা নরকঙ্কাল ইতিহাসে জঘন্যতম গণহত্যার দেশে অসংখ্য গণকবর থেকে উদ্ধার নজির হয়ে থাকবে। সদ্যস্বাধীন বাংলালেন্দে জহির রায়হান নিখোঁজ হয়ে গেল। মুক্তিযুদ্ধের সময় যে মানুষটি ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ প্রামাণ্য চলচ্চিত্র তৈরি করে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল, মুক্তিসংগ্রামে ছিল আলোর দিশারী, সেই জহির রায়হান স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখার কয়েকদিনের মধ্যে সহোদর শহীদুল্লাহ কায়সারের সন্ধানে রাজাকার অধ্যুষিত মিরপুরে গিয়ে চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেল।শহীদ ফয়েজুর রহমান আহমেদের সদ্যবিধবা আয়েশা ফয়েজ এতিম সন্তানদের নিয়ে কপর্দকহীন অবস্থায় অপরিচিত নৌকার মাঝির দয়ার ওপর ভরসা করে এক অনিশ্চয়তার নদীপথে যাত্রা করেছিলেন। যে-কোনো মূল্যে সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে। শশীনার মাদ্রাসার আশ্রয় থেকেও বড় দুই ছেলেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। পালিয়ে পালিয়ে জান বাঁচাতে হয়েছে। হানাদার পাক আর্মিকে তুষ্ট রাখার কী এক অমানবিক দৃষ্টান্ত। ইসলাম ধর্মের প্রচারক মহানবী (দ.)-এর দেশে আশ্রয়প্রার্থীকে আশ্রয়দান করলে তার জানের হেফাজতকারী আশ্রয়দাতা, এ আচার অতি প্রাচীনকাল থেকেই।

পৃষ্ঠা:১৯

ঢাকায় হুমায়ুনের মা ও ভাইবোনেরা শান্তিনগরের একটি ভাড়া বাসায় থাকে। যাওয়ার আগ্রহ দেখালে হুমায়ূন বলে, শহীদ পরিবার হিসেবে বাবর রোডে আম্মা একটি বাসা বরাদ্দ পেতে যাচ্ছেন। ছেড়াবেড়া অবস্থা। একদিন নিয়ে যাব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে হুমায়ূনের আরেকটি গণ্ডি ছিল। আহমদ ছফা ও আনিস সাবেতকে ঘিরে। একদিন বলল, ছফা ভাইয়ের কাছে যাচ্ছে। একটি উপন্যাস লিখেছে, মাসিক মুখপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। বই হিসেবে ছাপাতে চায়। কোনো প্রকাশক নিচ্ছে না। লেখক আহমদ ছফা এক প্রকাশককে বলে দিয়েছে, দেখি কতদূর।লেখালেখিতে হুমায়ুনের হাত আছে জানতাম। গল্পচ্ছলে মাঝেমধ্যে কয়েকটি কাল্পনিক চরিত্রের নাম নিয়ে নাড়াচাড়া করত। কিন্তু একটা উপন্যাস লিখে ফেলেছে, এ প্রথম জানলাম। নন্দিত নরকে প্রকাশিত হলো। হুমায়ুন উপন্যাসের একটি কপি দিল। নাম এবং প্রচ্ছদ দুটোই এক নানন্দিক অনুভূতি জাগিয়ে দেয়। চরিত্রগুলো এবং তাদের নাম যেন চেনা পরিচিত। হুমায়ূনের কাছে জানলাম, প্রকাশের অপেক্ষায় আরেকটি উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি আছে। শঙ্খনীল কারাগার। এটা আগেই লেখা। শহীদল্লিতা ফয়জুর রহমান ছেলের লেখা প্রথম উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি পড়েছেন। বিশ্ব ভ্যার্পর ছুটির ফাঁকে পিরোজপুর থাকতে হুমায়ুন ভিন রাতে শঙ্খনীল কারাযায় লেখা শেষ করেছে। পাণ্ডুলিপিটি বাসায় অফিস রুমে পিতার অফিস ফাইব্রেরি মধ্যে মধ্যে রেখে দিয়েছিল। ফাইল দেখতে গিয়ে পান্ডুলিপিটি বাবার চোখে পড়রে এই আশায়।হুমায়ূনের সূত্রে আনিস সাবেজের সাথে পরিচয়। অল্পদিনেই সম্পর্ক সহজ হয়ে গেল। চিন্তাচেতনায় তরুণটি কক্ষে যুগ এগিয়ে ছিল। সময়ের আগেই জন্মল্লাহণ করা প্রজন্ম তারকাদের একজন কলিস সাবেত। পদার্থবিজ্ঞানের মেধাবী ছাত্র। মেট্রিকে বোর্ডে প্রথম হয়েছিল। হুমায়ুনের পাশের রুমে থাকত। এই খেয়ালী তরুণটি রাতের বেলায় ঢাকা শহরে হেঁটে বেড়াত। একসময় হুমায়ূনকেও সঙ্গে জুটিয়ে নিয়েছিল। হয়তোবা ভবিষ্যৎ হিমু চরিত্রটি হুমায়ূনের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিল। গভীর রাতে হুমায়ূনকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ত। সকালে হলে ফিরে নাস্তা খেয়ে ক্লাসে চলে যেত।আনিস সাবেত বলত, সৃষ্টির সকল রহস্যের দেখা মিলে রাতে। দিন সাধারণ মানুষের কাজকর্মের জন্য।আহমদ ছফা, আনিস সাবেত এবং হুমায়ূন একবার প্রতিজ্ঞা করল, জীবনে কখনো বিয়ে করবে না। জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাধনায় নিজেদের নিবেদিত রাখবে। আহমদ ছফা কথা রেখেছিল।আশির দশকের প্রথমদিকে আনিস সাবেত কানাডার হাসপাতাল থেকে একদিন শহীদুল্লাহ হলে টেলিফোন করে। প্রায় শোনা যায় না স্বরে বলল, হুমায়ুন, আমার গলায় ক্যানসার। শিগগিরই মারা যাচ্ছি।

পৃষ্ঠা:২০

জীবনসায়াহ্নে আনিস সাবেত তার প্রিয় বন্ধুকে প্রায়ই মাঝরাতে ফোন করত। টেলিফোনের দূরপ্রান্তে অনেক কষ্টে উচ্চারিত কথাগুলো হুমায়ুন নিতে পারছিল না। যে রাতে ফোন আসত, বাকি সময় নির্ঘুম রাত কাটাত। একসময় ফোন আসা বন্ধ হয়ে গেল। আরও পরে হাসপাতাল থেকে একদিন ফোন করে হুমায়ূনকে জানানো হলো, আনিস সাবেত আর নেই। আনিস সাবেতের শেষ কথাগুলো ব্যথিত হুমায়ূন বারবার বিভিন্ন প্রসঙ্গে নিয়ে আসত।ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে হুমায়ূন শিক্ষকতার চাকরি নিয়ে চলে গেল। টেকনিকেল টিচার্স ট্রেনিং কলেজে ইলেকট্রনিক্সের শিক্ষক হিসেবে আমিও চাকরিতে যোগ দিলাম। কলেজের অদূরে শিক্ষক ডরমেটরিতে থাকার জন্য একটি রুম বরাদ্দ হলো। মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফেরার পর চট্টগ্রাম কলেজের সহপাঠী ও হোস্টেল রুমমেট মহিউদ্দিন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে শিক্ষক পদে যোগদান করে। থাকার জায়গা নেই। শিক্ষক ডরমেটরিতে চলে এল। রুমে আরেকটি চৌকি ফেলা হলো। তার কাছে একদিন জানলাম, হুমায়ূন যে বিভাগে যোগদান করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একই আবার দেখা-সাক্ষাতের পালা। হুমায়ুন। বিকেলে বেশিরভাগ সময় একত্র হতাম চা-শিঙ্গাড়া ছিল প্রিয় খাবার মহিউদ্দিনসহ আমরা তিনজন রাশিবশ্ববিদ্যালয়ের নীলক্ষেত এলাকার শিক্ষক ক্লাবে। ঘটনাবহুল স্বাভাবিকভাবে বুয়েট এবং ঢাকা।জীবন কেটেছে ওই এলাকায়। উদ্যালয় এলাকা সবসময়ই কাছে টানে। ক্লাবের রসায়ন বিভাগের অন্তিম দুজন শিক্ষক এ দলে প্রায়ই শামিল হতো। রাজা চৌধুরী ও নূরুল আমীন। নূরুল আমীনের একটি হোন্ডা ছিল কিটি হক। যখন- তখন চড়া যেত। একদিন প্রায় ফাঁকা ক্লাবঘরে টেবিলের ওপর দাবার বোর্ড বিছিয়ে সেই বিখ্যাত রাজ্জাক স্যার ডাকাডাকি করছেন, তাঁর সঙ্গে দাবা খেলার জন্য। হুমায়ূন দাবার বোর্ডের অন্য পাশে বসে গেল।রাজ্জাক স্যার প্রথম থেকেই উল্টাপাল্টা চাল দিচ্ছিলেন। হেরে গেলেন। হুমায়ূন বিব্রত। আরেকবার খেলতে চাইলে হুমায়ুন কাজের অজুহাতে অপারগতা প্রকাশ করল। অন্য একজনকে নিয়ে তিনি বসে গেলেন। হুমায়ূন বলল, জানেন, উনি দিনদুপুরেও বাসায় ঘরের মাঝখানে মশারি খাটিয়ে বই পড়েন। ছফা ভাই নিজে দেখে এসেছেন।মনে হলো রসিকতা, কিন্তু আসলে সত্যি। প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক ছিলেন এক বিচিত্র এবং আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের মানুষ।

পৃষ্ঠা:২১

স্বাধীনতার আগে থেকেই তাঁকে ছয়দফার প্রণেতা বলে মনে করা হতো। বিলেতে পিএইচডি করতে গিয়ে থিসিসের সুপারভাইজর মারা যাওয়াতে মিসিস জমা না দিয়েই দেশে চলে আসেন। তাঁর প্রিয় প্রফেসর হ্যারও লাঙ্কি ছাড়া আর কেউ তাঁর থিসিসের মর্মার্থ বুঝবে না। সুতরাং থিসিস জমা দিলেন না। বয়স ও পদবিতে অনেক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও একসময় হুমায়ূন তাঁর অতি কাছের মানুষ হয়ে যায়। অকৃতদার, জ্ঞানতাপস এই শিক্ষকটির বাসায় প্রায়ই হুমায়ূনের ডাক পড়ত। তিনি ক্লাব রুমে ঢুকলে সবাই নড়েচড়ে বসত। চলমান রাজনীতি সম্পর্কে অনেক কথা বলতেন। সিনিয়র শিক্ষকদের কোনো কোনো নেতিবাচক বক্তব্যে বলতেন, আরে মিয়া, দেশে হাজারো সমস্যা, সময় দেন, সময় দেন। দেশি-বিদেশি চক্রান্তের শিকার স্বাধীন বাংলাদেশে পরাশক্তির রাজনৈতিক মারপ্যাচের খেলায় সমস্যার অন্ত নাই। আন্তর্জাতিক চক্রান্তে রিলিফের গমের জাহাজ ফেরত চলে যাওয়া একটি খারাপ দৃষ্টান্তের সৃষ্টি করল। যুদ্ধবিধান্ত বাংলাদেশে ১৯৭৪-এর বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হলো। দেশে দুর্ভিক্ষের ছায়া নেমে আসে। উঠটুচুরি, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র, গণবাহিনী, সর্বহারা পার্টি, রক্ষীবাহিনী, লুটপাস্ট প্রাপ্ত একশ্রেণীর কলকারখানার প্রশাসক, বাকশাল, দ্রব্যমূল্য সবই যেন চেপে ধরেছে।একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের বাস্তবন্ধ বিস্তর ফারাক। ১৯৭২ সালের শেষের স্বাধীন বাংলাদেশকে একসঙ্গে টুটি আর সাধারণ মানুষের আশা-আকারক্ষায় চাকরি ছেড়ে সরকারি চাকরিতে যোগদানের দিতে কেকতার কয়েক মাস পর তেজগাঁয়ে টেলিসেন্টার হোস্টেলে চলে আসি। নতুন টিনের ঘরে গব্দা ধরনের কাঠের চৌকি ফেলে প্রশিক্ষণে আগত কর্মকর্তাদের থাকার জায়গা।গ্রীষ্মের এক বিকেলে ঘর্মাক্ত হুমায়ূন হোস্টেলে এসে হাজির। রসায়ন বিভাগে দিনের শেষ ক্লাস নিয়ে কার্জন হল থেকে মগবাজার চৌরাস্তা হয়ে তেজগাঁও লিংক রোডের কাঁচা রাস্তা ধরে রোদের মধ্যে হেঁটে এসেছে। উদ্দেশ্য, একজনের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলা। তখন সম্পর্কের আদান-প্রদান মাত্র শুরু। টেলিফোনটা বড় জরুরি। মেয়েটির নাম গুলতেকিন। ক্লাস টেনে পড়ে। উদীয়মান তরুণ লেখকের একজন ভক্ত হিসেবে প্রথম পরিচয়। ওই বয়সের একটি মেয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক পর্যন্ত সরাসরি পৌঁছে যাওয়া কম সাহসের কথা নয়। হুমায়ূনকে জিজ্ঞেস করলাম, প্রথম যোগাযোগ কীভাবে? বলল, চিঠির মাধ্যমে। তারপর সরাসরি ডিপার্টমেন্টে হাজির।

পৃষ্ঠা:২২

নিজেকে বড়সড় করে দেখানোর জন্য গুলতেকিন একদিন গায়ে শাড়ি প্যাচিয়ে আঁচলভর্তি গোলাপ নিয়ে কার্জন হলের বাগানে এল। আঁচল পেতে ফুলগুলি হুমায়ূনের হাতে দিতে গিয়ে শাড়ির প্যাঁচ খুলে ফেলে। ফুল ধরবে নাকি অপ্রস্তুত তরুণটির শাড়ি গুছিয়ে দিবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হুমায়ূনের বেহাল দশা। হুমায়ূন টেলিফোন নম্বর ডায়াল করে। ওপারের হ্যালো শব্দ শুনে খুট করে কেটে দেয়। বাবা নয়তো বয়স্ক কেউ হবে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা। আবার ডায়াল। একসময় ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়। ভাগ্য ভালো হলে প্রথমবারেই পেয়ে যায়। হোস্টেল থেকে বেরিয়ে ফার্মগেটের দিকে গেলে আনজুম কাবাবমর। হুমায়ূন ওখান থেকে বিদায় নিয়ে মোহাম্মদপুরের বাসায় চলে যেত।বাসে চড়ার চেয়ে হুমায়ূন হাঁটাই পছন্দ করত। বেতনের প্রায় পুরোটাই মা আয়েশা ফয়েজের হাতে তুলে দিত। ভাইবোন মিলিয়ে বড় সংসার। শহীদ পিতার চাকরির পেনশন যৎসামান্য। একদিন মহিউদ্দিন ও আমাকে হুমায়ুন বাসায় দাওয়াত করল। দুপুরের খাওয়ার টেবিলে কাঁচামরিচ আর সর্ষেবাটা দিয়ে ইলিশ মাছ রান্না। রান্না করেছেন খালাস্থা–আয়েশা ফয়েজ। মজাদার ভিন্ন স্বাদ। এ রান্নার জন্য পরে কতবার আবদার করেছি।সেদিন দেখা হলো হুমায়ুনের ভাইবোনদের। মনি। জাফর ইকবাল তখন বাইরে। এরই মধ্যে একদিন হুমায়ূন ঘো শেফু, শিশু, আহসান হাবীব, সুবিল, গুলতেকিনের সঙ্গে তার বিয়ে। দিনক্ষণ নির্ধারণ হয়ে গিয়েছে। বরযাত্রী হিসেবে সামিল হলাম, ক্লেরের ভাইবোন স্বজনদের সঙ্গে আমরাও কনের বাড়ি অণমণ্ডির হাওয়া’য়। দাদা প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁর বাড়ি। বরের আসনে হুমায়ূন হাদিছুশি। মাঝে মধ্যে রসিকতাও করছিল।এই প্রথম কনেকে দেখলাম। সুন্দরী, তার ওপর সাজ তো আছে। অনুষ্ঠান হয়ে গেল। নববধূর জন্য অনেক চমক, অবাক হওয়ার মতো ঘটনা অপেক্ষা করছিল।হুমায়ুন নতুন বউ নিয়ে বাসায় এল। পরদিন সকালে বাবর রোডে বাসার সামনে পুলিশের গাড়ি। শহীদ পরিবার হিসেবে পাওয়া বাসা থেকে পুলিশ পুরো পরিবারটাকেই আজ বের করে দেবে। পনের দিনের নোটিশ আগেই দিয়ে গেছিল। বর-বধূকে বিব্রত হওয়ার অবস্থা থেকে রেহাই দেওয়ার জন্য রিকশায় চড়িয়ে বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। পুলিশ ঘরের সব জিনিসপত্র বাইরে ফেলে দিল। খোলা আকাশের নিচে পরিবারটি রাত কাটাল। একসময় হুমায়ূন চলে গেল আমেরিকায় পড়াশোনার জন্য। মহিউদ্দিন চলে গেল যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিছুদিন পর আমি যাই জার্মানি, বছরখানিক বিরতিতে বেলজিয়ামে। পরস্পরের দেখা-সাক্ষাতে দীর্ঘ বিরতি।

পৃষ্ঠা:২৩

আশি দশকের প্রথমদিকে এক ছুটির দিনের সকালবেলা। ঢাকা নিউমার্কেটের বইয়ের দোকানগুলোতে ঘুরে সময় কাটাচ্ছি। কাঁধে লম্বা ঝোলানো ব্যাগ, গায়ে পাঞ্জাবি, পায়ে স্যান্ডেল পরা হুমায়ুন একেবারে সামনাসামনি। চোখাচোখি হতেই বাজ্যের বিশ্বয় ও আনন্দ। কিছুদিন আগে দেশে ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে যোগদান করেছে। মোহাম্মদপুরের বাসায় থাকে। বলল, দীর্ঘদিন পরে দেশে ফিরেছি। যোগাযোগের সূত্র কম। আপনার খোঁজে শ্যালককে লাগিয়েছি। তাকে চাইনিজ খাবারের লোভও দেখিয়েছি।নিউমার্কেটের এক নম্বর গেটের বিপরীতে টিএন্ডটির বাসায় থাকি। ঠিকানা দিলাম। রমজান মাসের একদিন রসায়ন বিভাগে টেলিফোন করে হুমায়ূনকে সপরিবারে বাসায় ইফতারে যোগ দিতে বললাম। সানন্দে রাজি হলো। ইফতারের সময় পার হয়ে যাচ্ছে। তাদের দেখা নেই। এল অনেক রাতে। কন্যারাসহ গুলতেকিন ভাবিও এসেছে। প্রাণোচ্ছল, রুচিশীল তরুণী। আমার স্ত্রী রুবার সঙ্গে পরিচয় হলো। হুমায়ূন-পরিবার সম্বন্ধে আগেই অনেক কিছু না অল্পদিনের মধ্যেই দুজনের মধ্যে আন্তরিক সম্পর ‘বলে আগ্রহ ছিল প্রচুর। উঠল, যা স্থায়ী হয়ে গেল।অনেক পরে হুমায়ুনের সংসারে টানাপ্রোর র টানাপোড়েন ভাল্লাগড়ার সকল পর্যায়ে সবসময় গুলতেকিন ভাবির পাশেই থেকেছে রুদ্র উল্লয়ার এই লেখা তৈরির সময় আশি দশক পরবর্তী অনেক স্মৃতির। খেই ধরিয়ে ি ছে। কোনটা রেখে কোনটা লিখব।নতুনভাবে রান্না করা খান্ত্রা রাতে সবাই তৃপ্তিসহকারে খেল। ঠান্ডা খাবার হুমায়ুন কখনো পছন্দ করতলে ছোটরা আগ্রহ নিয়ে রঙিন টেলিভিশনে অনুষ্ঠান দেখল। জার্মানি থেকে আসার সময় আনা টিভি। হুমায়ূন তখনো রঙিন টিভি কেনে নাই। পরবর্তী সময়ে টিভি কেনার জন্য তাকে একটি নাটকের সিরিয়াল লিখতে হয়েছে। রঙিন টিভি কেনা হলো। অমনি টুনি চরিত্রের মৃত্যু দিয়ে নাটকের সমাপ্তি।টুনিকে বাঁচাতে হবে, এ নিয়ে পত্র-পত্রিকায় আগে থেকেই লেখালেখি হচ্ছিল। একটি নামকরা পত্রিকায় সম্পাদকীয় কলামও লেখা হলো। নাটকে টুনিকে মারা হলো কেন, এক সাক্ষাৎকারে প্রশ্নের জবাবে স্পষ্টভাষী হুমায়ূন বলে বসল, রঙিন টিভি কেনা হয়ে গেছে। তাই টুনির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে নাটকেরও সমাপ্তি। নটিকের অভিনেতা- অভিনেত্রীরা নাখোশ। এত ভালোবাসা, এত মমতা দিয়ে অভিনয় সেটা কি নাট্যকারের রঙিন টিভির জন্য?হুমায়ূন আজিমপুরের পুরানা পল্টন লাইনে বাসা ভাড়া নিয়েছে। বাসায় বসেই আজিমপুরের কবরস্থান দেখার আমন্ত্রণ জানাল স্বভাবসুলভ বসিকতায়। একদিন বলল, বাসায় একটি টেলিফোন দরকার। দেশে-বিদেশে যোগাযোগের প্রয়োজন।

পৃষ্ঠা:২৪

আম্মা আমেরিকায় জাফর ইকবালের সঙ্গে কথা বলতে চান। রসায়ন বিভাগ এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। বললাম, দরখাস্তের ফরম নিয়ে আসব। বাসায় বসে পূরণ করে দিতে হবে। কয়েকদিন পার হয়ে গেল। নিজেই দরখাস্তের ফরম নিয়ে হুমায়ূনের বাসায় গেলাম। সত্যিই তো, জানালা দিয়ে আজিমপুর কবরস্থানের পুরোটাই দেখা যায়। একেবারে সুনসান নীরবতা। কত আনা-অজানা মানুষ ওখানে! মনে পড়ল বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কথা। শহীদ দিবসে প্রভাতফেরীতে এসে ভাষাশহীদদের কবরে কতবার ফুল দেওয়ার স্মৃতি।মাসখানেক পর হুমায়ূন ফোন করে বলল, বাসায় টেলিফোন লেগেছে। পরক্ষণেই বলল, সবাই এরকম দরখাস্ত জমা দেওয়ার একমাসের মধ্যে টেলিফোন পায় না কেন?একটু বিচলিত হলাম, কী জবাব দেব বুঝতে পারছিলাম না। অনেকটা কৈফিয়তের সুরে বললাম, হুমায়ুন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে আপনি অগ্রাধিকার পেয়েছেন, আর আমিও খোঁজখবর নিয়েছিলাম।হুমায়ূন বলল, আমেরিকাতে একদিনে টেলিফোন টাওয়া যায়। এবার আমি বিরক্তি প্রকাশ করে বললাম (প্রতিদিন বিদেশে থেকে এসেছেন। আপনি কি বলতে পারবেন, ওদের মতো উধুক আমরা কবে হতে পারব। অনেক প্রবাসী বন্ধু ও আত্মীয়স্বজন দেশে এসুেড়িয় সঙ্গেই টেলিফোন চায়। যে দেশের প্রবাসী সেদেশের উদাহরণ দেয়। বৃদ্ধিীয় ও অব্যবস্থাপনা যে নাই ও ও প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার সমাধান ওইসব দেশের এক টেলিফোন নেই।  যত টেলিফোন আছে, সারা বাংলাদেশেও একতা নয়। সম্পদ আমি বলেই গেলাম, আমরা তো এখনো অ্যানালগ প্রযুক্তিতে আছি। কিন্তু উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় বা উচ্চশিক্ষার কারণেই হোক এক যুগ আগে দেশ ছাড়ার সময়। কী অবস্থায় দেশটা ছিল তারা মনে রাখতে চায় না। উন্নত দেশের জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে। সবকিছু ঠিকঠাক চললেও এক থেকে দেড় দশক আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।কথাগুলো প্রায় একনাগাড়ে শেষ করলাম। ও পাশ থেকে নীরবতার পর প্রসঙ্গান্তরে চলে এল। একসময়ে হাউস টিউটর হিসেবে শহীদুল্লাহ হলে হুমায়ূন বাসা স্থানান্তর করে। খোলামেলা জায়গা। লেখালেখি, অধ্যাপনা, আওড়া আর বেড়ানো সমানতালে চলছে। মা আয়েশা ফয়েজ এবং ভাইবোনদের নিয়মিত যাতায়াত। যে-কোনো উপলক্ষে ডাক পড়ত, সপরিবারে হাজির হতাম। না গেলে অনুযোগ করত। উপলক্ষের অভাব হতো না। এক উপলক্ষে এলে আরেক উপলক্ষের ডাক পড়ে।

পৃষ্ঠা:২৫

নাটকের স্ক্রিপ্ট পড়া হবে। নতুন উপন্যাসের প্রথম কয়েক পৃষ্ঠা পড়া হবে। প্রকাশক নতুন বই প্রকাশ উপলক্ষে মস্তবড় মাছ দিয়ে গেছে, একসঙ্গে খেতে হবে। হলের ছাত্র সেলিম চৌধুরী গান গাইবে, হাছন রাজার গান। ম্যাজিকের আয়োজন, হুমায়ূন নিজে ম্যাজিশিয়ান। ম্যাজিশিয়ান জুয়েল আইচ উপস্থিত থাকলে ম্যাজিকের আসর আরও জমজমাট। দেশ-বিদেশ থেকে সল্লাহ করা ভূতের মুখোশ, আরও কত কী।চীনের ফরবিডেন সিটি দেখতে গিয়ে সেখানকার স্যুভেনিরের দোকান থেকে সিল্কের আলখেল্লাজাতীয় কালো রঙের হাতকাটা কলারবিহীন জামা এনে হুমায়ূনকে দিয়ে বললাম, প্রাচীন চীন সম্রাটদের রাজদরবারি লেখকেরা এ ধরনের পোশাক পরে লেখালেখি করত। হুমায়ুন পোশাকটি পরতে পরতে বলল, ওসব লেখালেখি ছিল জল্লাদের বড়গ ঘাড়ে নিয়ে ফরমায়েসি লেখা। তবে ম্যাজিকের জন্য এটি ভালো পোশাক।রাতের কোনো-এক অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে তিন কন্যাসহ হুমায়ূন আজিমপুরে টিএন্ডটি বাসায় এল। কন্যারা আগে, আরন্বিন্তর রঙের লম্বা কোঁকড়ানো পরচুলা এবং ভয় লাগানো কঙ্কালের মুখোশ পরা প্রথম ধাক্কা সামলিয়ে নেওয়ার পর হাসির রুেল ঐপিছে পিছে। চমকিত সবাই লেখালেখি, অভিনয়, প্রকাশনার সংশ্লিষ্টজনদের শহিদুল্লাহ হলে নিত্য আসা-যাওয়া আছেই। গুলতেকিন। বিভা, শিলা আর বিপাশাকেন্দ্রিক হুমায়ূনের পারিবারিক জীবন।হুমায়ূন লিখছে, গুলতেি সভাবি রাত জেগে বসে সঙ্গ দিচ্ছে আর বেশি বেশি চিনি দিয়ে দুধ-চা বানিয়ে দিচ্ছে। হুমায়ুনের আবদার, তাকেও পাশে বসে থাকতে হবে। তারপরও সংসার সামলিয়ে ইংরেজির ছাত্রী হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে যাচ্ছে। বড় দুই মেয়ে স্কুলে আসা-যাওয়া করছে।এক সন্ধ্যায় গিয়ে দেখি হুমায়ূন একাকী বান্নাঘরে। ধোঁয়ায় নাকে চোখে পানি। ছোট মাছ দিয়ে একটি সবজি তরকারির ভাজি তৈরি করেছে। বিদেশে থাকার সময় দু’এক পদের রান্না ঠেকায় পড়ে শিখেছে। শখের রান্না। টেবিলে খেতে বসে রান্নার গুণাবলি নিয়ে একেকজনের একেক মত। বান্নাটা অবশ্য ভালোই হয়েছিল।হুমায়ুন একা খেতে পারত না। খাওয়ার সময় সবাই টেবিলে বসবে। একসময়ে হুমায়ূনের বইয়ের র‍্যাকে বই খুঁজতে গিয়ে দেখি, ফাঁকা ফাঁকা। হুমায়ূনের লেখা একটি বইও নেই। হুমায়ূনকে জিজ্ঞেস করলাম। ও চুপচাপ।গুলতেকিন ভাবি মুচকি হেসে বলল, থাকবে কী করে। একনাগাড়ে একরাত একদিনে নিজের লেখা সমস্ত বই পাতায় পাতায় ছিড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে। এতে করে নাকি গুলতেকিন ভাবির উপর তার রাগ কমেছে।

পৃষ্ঠা:২৬

ময়মনসিংহ থেকে ফিরে একদিন গেরুয়া রঙের কাপড় পরে হুমায়ূন ঘোষণা ভরল, এখন থেকে খাবার হিসেবে ফলাহার ছাড়া আর কিছু খাবে না। মৌনব্রত পালন করবে। কন্যারা খুব মজা পেয়েছে। গেরুয়া বসন আগে বোধহয় দেখে নি। গুলতেকিন ভাবি আরেক কাঠি এগিয়ে। বাজারে গিয়ে দেশি-বিদেশি সব ফল কিনে টেবিল ভর্তি করে ফেলল। কলা-ই কত রকমের সাগর কলা, চম্পা কলা, আঁটি কলা। আমলকি, তেতুল, গাব, ডেফল, জাম্বুরা, কামরাঙা, আমড়া-হরেক রকমের ফল। আমাদেরও ডাক পড়ল, গেরুয়া বসন পরা নব্য সন্ন্যাসীকে দেখতে। বলল, নিউমার্কেট থেকে ফল-উল নিয়ে আসতে।বাড়িতে উৎসব উৎসব ভাব। উঁচু গলায় কথা বলা মানা। হুমায়ূন গেরুয়া বসনে অন্ধকার রুমে মৌনব্রত পালন করছে। মাঝে মধ্যে সবাই উকি মেরে দেখছে। খাবার টেবিলে হুমায়ুন মিষ্টি-টক-বিস্বাদের ফলাহার চেখে চেখে দেখছে, সতর্কভাবে চোখমুখের বিচিত্র ভঙ্গি ও বিরক্তি চেপে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। আর আড়চোখে টেবিলে রাখা তাঁর প্রিয় খাসির গোস্তের রেজালার বাটির দিকে তাকাচ্ছে। দ্বিতীয় দিন খাবার টেবিলেই রণেভঙ্গ দিল।হুমায়ূন চমক সৃষ্টি করতে যেমন সিদ্ধহস্ত, তেয়ন্ত্র চমক সৃষ্টি করতে। উনেকেই চেষ্টা করত তার জন্য কাকলী প্রকাশনীর নাসির আহমেদু। তার গ্রামের বাড়িতে, ভোলায়। হয়েছ নিলাম একবার চুমায়ূনকে দাওয়াত দিল বন্ধুবান্ধবসহ আমরা লঞ্চে চড়ে ভোলায় পৌছালাম। পুকুরে জানা নেই দিয়ে মাছ ধরা হবে। হুমায়ূনও পুকুরপাড়ে। জাদের প্রথম টানে এক বিকুই ভাই মাছ উঠে এল। সবার চোখ ছানাবড়া। এত ছোট পুকুরে এত বড় মাছ। দ্বিতীষ্ঠবার তেমন কিছু উঠল না।নাসির আহমেদ সেলিম হতাশায় চিৎকার দিয়ে জেলেদের বলল, আরেকটা মাছ কই। প্রবল হাসির রোলে পুকুরপাড় মুখরিত। আবার জাল ফেলা হলো। দ্বিতীয় মাছটা জালে উঠে এল।আয়েশা ফয়েজ আমেরিকায় যাবেন, জাফর ইকবালের ওখানে বেড়াতে। প্রথম বিদেশযাত্রা। হুমায়ুনের মস্তবড় আয়োজন। মানপত্র, চাইনিজ রেস্টুরেন্টে পারিবারিক সংবর্ধনা, বক্তৃতা, কেনাকাটা, আরও কত কী। হুমায়ূন-কন্যারা বিভিন্ন দায়িত্বে। বড়রাও বসে নেই। যাওয়ার সময় এয়ারপোর্ট লাউঞ্জে কারও কারও চোখে পানি। চিঠি এলে, বাকেই লিখুক, সবাইকে একসঙ্গে বসে পড়তে হবে। চিঠি যাচ্ছে এর হাত থেকে ওর হাতে। চিঠি পড়ে প্রথম টের পেলাম লেখনীতে আয়েশা ফয়েজের হাত আছে। অনেক পরে প্রকাশিত তাঁর বইটি মূলত আমেরিকায় থাকতে লেখা। জাফর ইকবালের বাসায় বসে কম্পিউটারে বাংলা টাইপ করাও শিখে ফেলেছিলেন।

পৃষ্ঠা:২৭

অয়োময় নাটকের শুটিং চলছে ময়মনসিংহ জমিদার বাড়িতে। শুটিং টিম আগেই চলে গেছে। এক ছুটির দিনের সকালে হুমায়ূন ও গুলতেকিন ভাবি মেয়েদের নিয়ে আজিমপুর টিএন্ডটি বাসায় এল। একসঙ্গে ময়মনসিংহ রওনা দেব। মাংসের পাতলা কোল আর সাদা রুটি দিয়ে টেবিলে নাস্তার ব্যবস্থা। হুমায়ূন খুব পছন্দ করে খেল। গুলতেকিন ভাবিকে বলল, আমাদের বাসায় এরকম মাংস রান্না হয় না কেন?গুলতেকিন ভাবি বলল, আমরাও এভাবেই বান্না করতে পছন্দ করি। তুমি তো চর্বি হাডিচ মেশানো ঘন ঝোলের মাংস ছাড়া খেতে চাও না। খাসির ঝাল মাংস হুমায়ূনের পছন্দের খাবার।ময়মনসিংহ পৌঁছে প্রথমে বন্ধু মনিরুজ্জামানের বাসায় গেল হুমায়ুন। শহীদ আসাদুজ্জামানের ছোটভাই, আনন্দমোহন কলেজের শিক্ষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একই হলে থাকত। অতিথিপরায়ণ মনিরুজ্জামান-ভাবি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে কঠোর এবং আপসহীন। ঘরে একটি ধূলিকণাও থাকতে পারবে না।বিকেলে সবাই এসে জড়ো হলো শুটিংস্পটে। ঘরোয়াভারেるনাটকের অভিনেতা-অভিনেত্রীরা মানুষ। কিন্তু যখন চরিত্র অনুযায়ী পোশাক ও মেকআপে ক্যামেরার সূর্যেতে দাঁড়ায় তখন তারা অন্যজগতের মানুষ। এত অল্প সময়ে নিজের বাস্তব অনুপ্রান্ত থেকে সরে এসে চরিত্রটির সঙ্গে সম্পূর্ণ একাত্ম হয়ে যাওয়া কেবল শক্তিমান দূর্বতীয়শিল্পীর পক্ষেই সম্ভব।শুটিং স্পটে হুমায়ুনের মনুমেনটেজ সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে যায়। সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছে। একটুকু অনিয়ম কুপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা সহ্য করত না। খুঁটিনাটি বিষয়েও পর্যবেক্ষণশক্তি অধ্যধারণ। একই দৃশ্য বারবার কাট করছে, রি-টেক করার নির্দেশ দিচ্ছে। প্রযোজক, পরিচালক, অভিনেতা, কলাকুশলী সবাইকে একই ছন্দে গেঁথে ফেলেছে। পরে একফাঁকে হুমায়ূনকে জিজ্ঞেস করলাম, নাটক পর্বের ওই অংশগুলো বারবার রি-টেক করলেন কেন।হুমায়ূন বলল, খেয়াল করেন নাই? এলাচি বেগমের শাড়ির আঁচল একটু সরে গিয়েছিল। ঘামে জমিদারের লাঠিয়াল হানিফের কানের নিচের মেকআপ একটু হালকা হয়ে গিয়েছিল। জমিদার ক্যামেরার যে অ্যাঙ্গেলে থাকার কথা সে অ্যাঙ্গেলে দাঁড়ায় নি। ওই দৃশ্যে দুদিকের লাইট মিলে সেটে আলোহায়ার সৃষ্টি করেছে, যা হওয়ার কথা নয়। হুমায়ুন একের পর এক বলেই যাচ্ছে। তাজ্জব বনে গেলাম। আমি আবার এসব কি খেয়াল করব। আমার কাছে তো সবই ঠিক মনে হয়েছে। আর হুমায়ূনের কাছে এসব ছোটখাটো বিষয়ই ছিল অনেক বড়। সবকিছু হতে হবে নিখুঁত। হুমায়ূনের চোখ ছিল তিনটি তৃতীয়টি মানসচক্ষু।

পৃষ্ঠা:২৮

নিজের বাসায় লেখালেখির সময়ও হুমায়ূন থাকত আত্মনিমগ্ন। বিশেষ করে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত। আড্ডা জমত সন্ধ্যার পরে। আসা-যাওয়ার পথে কোনোদিন হয়তো সকালে বা বিকেলে হুমায়ূনের বাসায় গেলাম। বেশির ভাগ সময় দেখা যেত হয় লিখছে, ছবি আঁকছে অথবা পায়চারি করছে। অনেক সময় চুপচাপ বসে থাকলেও বোঝা যেও আলাপের মুডে নাই। মাথার কেতর লেখালেখির কোনো বিষয় হয়তো জট পাকাচ্ছে। নিজেও বুঝতে পারতাম, চটজলদি চলে আসতাম। কোনো কোনো সময় সদ্য কেনা একটি বই হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলত, বইটি এখনো পড়া হয় নি। নিয়ে যান, পড়তে ভালো লাগবে, মতামত দেবেন।বুঝতাম চলে যাওয়ার নোটিশ। এখন লেখালেখি করবে।অয়োময় নাটকের সেদিনের শুটিং পর্ব শেষে রাতে রেস্ট হাউজে আওড়া ও গল্পের একফাঁকে হুমায়ূন বলল, ব্রহ্মপুত্র নদীতে নৌকায় চড়ে বেড়াব। আগে থেকেই ঘাটে নৌকার ব্যবস্থা করা আছে।দীর্ঘ শুটিংয়ের ক্লান্তি। অনেকে ঘুমাতে যাবে। আকাশের বাঁকা চাঁদ মাঝে মধ্যে মেঘে ঢেকে যাচ্ছে। অন্ধকার অন্ধকার ভাব। হুমায়ুন কয়েকজনকে নিয়ে নদীর ঘাটের দিকে রওনা দিল। নৌকা ছেড়ে দিবে। দেখা গেল দ্বেষে একটি দল দ্রুত এগিয়ে আসছে। সবার আগে আগে লাঠি হাতে জমিদারি লাঠিয়াল হানিফ। মোজাম্মেল হোসেন। হুমায়ুন নদীতে নৌকায় চড়ে মজা কুনাল আর সবাই ঘরে বসে থাকবে, তা হবে না। এটা হুমায়ূনের পক্ষেই সম্ভব। মুদ্রিসশনের বংশীবাদকের মতো হুমায়ূনের ডাকে সঙ্গীরা সাড়া না দিয়ে থাকতে হইতে না।শান্ত নদীতে হালকা ধীরপূর্বে লৌকা চলছে। ঝিরঝিরে বাতাস। আকাশে চাঁদ ও মেঘের আলো-আঁধারি এটি যারা এতক্ষণ ক্লান্ত হয়ে ঘরে থাকতে চেয়েছিল তারাও নড়েচড়ে বসল। শন্থীর ও মনের ক্লান্তি বাতাসে উড়ে গেল। এদিক-ওদিকে ছোট ছোট নৌকায় হ্যারিকেনের আলো মিটমিট করছে। পানির উপর ভেসে আসছে মানুষের অস্পষ্ট কণ্ঠস্বর। জেলেরা নদীতে জাল ফেলেছে। নদীর কূলের বাড়িগুলোতে রাতের নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। একসময় নৌকার মানুষগুলোও যেন নীরবতাকে বেছে নিল। উদাসিনী হাওয়া বোধহয় সবাইকে ছুঁয়ে। গেছে। বৈঠার ছফছফ হব্দে নদীর বুক চিরে নৌকা এগিয়ে যাচ্ছে। হালকা ঢেউ নৌকাকে দোলাচ্ছে। শেষ রাতের দিকে ঘাটে নৌকা ভিড়ল। আত্মার সম্পর্ক যে কত গভীর ও নিঃশর্ত হতে পারে তার জ্বলন্ত উদাহরণ হুমায়ূন ও মা আয়েশা ফয়েজ। সকল প্রতিকূলতায়ও আয়েশা ফয়েজ ছেলে হুমায়ূনের কাছ থেকে কখনো দূরে সরে আসেন নি। সর্বাবস্থায় তার পাশে ছিলেন। পরিবারের সবাই শেষপর্যন্ত এ অবস্থা মেনে নিয়েছিল। শিখু বলত, দাদা ভাইয়ের জন্য আম্মার ৯৫ নম্বর, আর সব ছেলেমেয়ের জন্য পাঁচ।

পৃষ্ঠা:২৯

হুমায়ূনের শেষ ভরসা ছিল মা। তাঁর চিকিৎসা ও ভালোমন্দের বিষয়ে হুমায়ুন ছিল ঈর্ষণীয় তৎপর। সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে মা-ছেলের একই দিনে হার্টের বাইপাস অপারেশন হয়। প্রথমে হুমায়ুনের, পরে তাঁর মা আয়েশা ফয়েজের। অপারেশনের পর একই কেবিনে পাশাপাশি বিছানায় মা ও ছেলে। ছেলের হার্টব্লক ছিল নয়টি আর মায়ের সাতটি। হুমায়ূন রসিকতা করে বলত, অন্তত এদিক দিয়ে আমি আম্মার থেকে এগিয়ে আছি।ঢাকায় মা’র শরীর খারাপ। সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে। বাসায় ডাক্তার ও নার্স। কোনো কার্পণ্য নেই। যে-কোনো সমস্যা হলে হুমায়ূন তাঁকে বাসায় আনিয়ে নিত। তিনি বাসায় এসে শুয়ে বসে থাকলেও তা যথেষ্ট। মা আয়েশা ফয়েজ কোনো কোনো বিষয়ে যে ক্ষোভ প্রকাশ করতেন না, তা নয়। হুমায়ূনের ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে তাদের মধ্যে দীর্ঘ আলাপ হতো। হুমায়ূন চেষ্টা করত তথ্য, যুক্তি ও উদাহরণ দিয়ে অভিযোগ-অনুযোগগুলি খণ্ডন করতে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সফল হতো। হুমায়ূনকে মাঝে মধ্যে বলতাম, আপনার যুক্তিতর্ক উীয় উপর চাপাচ্ছেন কেন? বাস্তবতা দেখবেন না । তিনি তো উভয়সংকটে পারিবারিক এটা ওটা নিয়ে হুমায়ুনের চিন্তা-ভাবনা কী খালাস্থা জানতে চাইতেন। তখন বলতাম, আপনি কি হন না। কেন?খালাম্বার কথা, বাবা, আমার ছিট কোনো ক্ষমতা আছে। অসুখবিসুখ বঁধিয়ে হাসপাতালে ছুটি ইয় হুমায়ূন প্রায়ই হয়। তখন না গিয়ে উপায় কী? আবার এটাও ঠিক, দেয়েউট্রান্ট সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে সদা উন্মুখ হুমায়ূন। কারণ যাই হোক না কেন, তাদের কাছ থেকে তেমন কোনো সাড়া পেত না। যা তার মতো সংবেদনশীল শিভাকে বারবার মর্মাহত করেছে। উদাহরণ টেনে হুমায়ুন এসব কথা যখন বলত খালাম্মার কোনো জবাব থাকত না। মুখে বলতেন, হুমায়ুন তো এমন কিছু। চায় নি। মেয়েরা বাপের একটু বৌজ-খবর রাখলেই তো পারে।হুমায়ুন একদিন বলল, গুনেছেন আমি আবার নানা হয়েছি। ঢাকায় থেকেও নানার নাতি দেখার অনুমতি নাই। হুমায়ূনের বলার ঢংয়ে রসিকতা থাকলেও চুপ করে থাকা ছাড়া খালাম্বার উপায়ন্তর ছিল না। ধানমণ্ডির বাড়িতে থাকতে শীলা ছিল হুমায়ূনের কোষাধ্যক্ষ। প্রকাশকদের দেওয়া টাকার বান্ডিল হুমায়ূন শীলার হাতে তুলে দিত, প্রয়োজনমতো নিয়ে নিত। হুমায়ূনের ইচ্ছাতেই মেজো মেয়ে শীলা নাটকে এসেছিল।হুমায়ুনের চল্লিশ দশক লেখালেখির প্রথম তিন দশকের প্রকাশিত প্রায় প্রতিটি বইয়ের ফ্ল্যাপে থাকত স্ত্রী ও তিন কন্যার নাম। পরে নুহাশও যোগ হয়েছে। শেষ

পৃষ্ঠা:৩০

দশকের বইগুলিতে থাকত দুইপুত্র এবং তাদের মায়ের নাম। হুমায়ূনের জীবনটা ছিল এমনই পরিবারকেন্দ্রিক। শহীদ পিতাকে হুমায়ুন আজীবন লালন করেছে তার লেখালেখির মাধ্যমে। সংসারে বাজারখরচের যোগান নাই, অথচ গিটার কেনা, ঘোড়া কিনে নিয়ে, আসা, নিজের ক্যামেরায় তোলা ছবি ডেভেলপ করা পিভার এসব খেয়ালিপনা, বাউলা মন, বৃষ্টি, জোছনা সবই যেন পুত্র হুমায়ূন ধারণ করে নিয়েছে। হুমায়ূন বিরাট এক মাছ কিনেছে। ধানমণ্ডির বাড়ি থেকে সপরিবারে সবাই যাবে পল্লবীতে। সেখানে মা আয়েশা ফয়েজ মাছ রান্না করবেন। সবাই একসঙ্গে খাবে। একটা খোলা পিকআপ জোগাড় হলো। বড়রা ঠাসাঠাসি করে ভেতরে বসল। ছোটরা মহাউৎসাহে পিকআপের পেছনে টপাটপ উঠে পড়ল। মাছ ঘিরে সবাই বসা।চলন্ত খোলা পিকআপে ছোটরা হইচই করছে, আনন্দে হাততালি দিচ্ছে। কেউ কেউ দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। ভেতর থেকে হুমায়ূন বারবার পেছনে তাকাচ্ছে। গাড়ি থামাতে বলে নিজেই পেছনে উঠে পড়ল। সবার সঙ্গে যোগ দিল এবং সারা রাস্তা চিয়ারলিডারের মতো সবাইকে মাতিয়ে রাখল। সামনের সামনে স্তিটে বড়রা যারা সেজেগুজে এতক্ষণ বসে ছিল তারাও উশখুশ করতে লাগল, পিপ্তাপের পেছনে উঠা যায় নি হুমায়ূনের নির্মল আনন্দের ধরনটাই। করত, আর সবাই ভাবত এটাই স্বাভাবিক কি না! সে নিজে যা ইচ্ছা করত, চমক সৃষ্টি অন্যকে প্রভাবিত করতে তার ক্ষমতা ছিল সহজাত। হুমাহনের বর্ধিত পরিবারটি। শহীদ পরিবারের জন্য পল্লবীর বাসায় আয়েশা ফয়েজ কেন্দ্রিক। কাঠার ওপর বাড়িটি একেবারে জীর্ণশীর্ণ। দেয়ালের আন্তর খুলে পড়ছে মেঝের সিমেন্টের আস্তর ফেটে গেছে, ছাদ ভূঁইয়ে পানি পড়ছে, আস্তর ভেঙে খাবলা খাবলা ছাদ। মামলা মোকদ্দমার জটে পড়ে সরকার থেকে বরাদ্দপত্র পাওয়া যাচ্ছে না। প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজেও হাত দেওয়া যাচ্ছে না। বছরের পর বছর চলেছে এ অবস্থা। কিছুদিন আগে বাড়িটি সংস্কার করে মোটামুটি বসবাসযোগ্য করা হয়েছে।ঈদ এবং বিভিন্ন উপলক্ষে সবাই এ বাড়িতে একত্র হয়। সারা বছর ছেলেমেয়ে এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের আসা-যাওয়া আছেই। জাফর ইকবাল সিলেট থেকে ঢাকা এলে এ বাসায় একবার আসবেই। আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নাই। নাই কোনো বাহুল্য। একসময় শত প্রতিকূলতায়ও অভাব-অভিযোগ ছিল নির্বাসিত। বৈষয়িক চাকচিক্যের প্রতি পল্লবীর এই বাসার বাসিন্দারা যেন চিরউদাসীন।রুচিবোধটাই আসল। হুমায়ূনের লেখা বই কেনার সুযোগ আমার খুব কমই হয়েছে। প্রতিটি বইয়ের প্রথম মুদ্রণের একটি কপি পেতাম, হুমায়ুন নিজ হাতে দিত অথবা রেখে দিত।

পৃ্ষ্ঠা ৩১ থেকে ৪৫

পৃষ্ঠা:৩১

মাঝেমধ্যে বইয়ের নাম উল্লেখ করে জানতে চাইত ওই বইটা আমি পড়েছি কি না। অনেক সময় সামনের পাতায় দু’কলম লিখে স্বাক্ষর করে দিত। নিজের লেখা বই নিয়ে খুব বেশি আলোচনায় যেত না, আবার কোনো ধরনের সমালোচনাও সহজভাবে নিত না। নিজের সৃষ্ট যে-কোনো চরিত্রের প্রতি তার ছিল ঈর্ষণীয় পক্ষপাতিত্ব, দৃঢ় আস্থা আর মমতা। উপুড় হয়ে লিখছে, চোখ তেজা। নিজের সৃষ্টির আনন্দে এ যেন আনন্দাশ্রু। নিজের সৃষ্টিতে নিজেই মগ্ন। কাছে থাকলে সদ্যলেখা কয়েকটি পাতা পড়তাম। পড়াশেষে চুপচাপ রেখে দিতাম। মাত্র লেখা শেষ হয়েছে এমন একটি পাতা হাতে তুলে দিয়ে এটা দেখেন বলেই আরেকটা নতুন পাতা লিখতে শুরু করত। আশপাশের কথাবার্তায় তার লেখায় তেমন কোনো ব্যাঘাত ঘটত না।একটা বইয়ের লেখা শেষ। দলবেঁধে বেড়াতে বেরিয়ে পড়ত। প্রচুর পড়াশোনা করত আর বই কিনত। বিদেশ থেকে এলে বাক্সভর্তি থাকত বই। প্রথম দেখাতেই বলত, কী কী বই এনেছে। আমার নজর থাকত স্টিফেন হকিন্সের ধাঁচে লেখা বিজ্ঞানভিত্তিক বই, মহাকাশ বিজ্ঞান এবং বিভিন্ন ধর্মের বিশ্লেষণমূলক বইগুলোর দিকে হুমায়ূনের সম্রাহের দুই তিনটি বই সবসময় আমার কাছে থাকত, ওগুলো ফেরত দিয়ে নতুন বই আনতাম। আমার নতুন সপ্তাহের দু’একটি বইও হুমাঞ্জলিত। নিত। এ ধারা চলেছে বছরের পর হেবের একটি বই দিয়ে বলল, গরম বই, বেইগুলি, তা যে-কোনো বিষয়ে হোক না কেন, বছর। একবার সুফিবাদের। প্রকাশ্যে পড়া যাবে না।উপর বড়পীর হুমায়ূন সব নামকরা লেয় প্রথম সুযোগেই পড়ে উইর্জর সংগ্রহে রাখতো। ভালো চলচ্চিত্রের প্রতিও তার ছিল আকর্ষণ। আশি দশকের দিকে টেলিভিশনে এত বিদেশি চ্যানেল ছিল না। ইস্টার্ন প্লাজা থেকে নামকরা সব ছবির ক্যাসেট জোগাড় করে রাতের খাবারের পর পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের নিয়ে ছবি দেখার আসরে বসত। বিদেশ থেকে কিছু কিছু বই এনে উপহার হিসেবেও দিত। এরকম একটি বই দিয়েছে আমার হার্টে কিছু সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর। কী খেতে হবে, কী খেতে হবে না, এ সম্পর্কীয় একটি বইতে হুমায়ূন লিখেছে, মুনীর ভাই, নষ্ট হৃদয় ঠিক করুন। হুমায়ূন আহমেদ ২০. ৬. ২০০২কয়েকবছর পরে হুমায়ূনের হার্ট বাইপাস অপারেশন হয়েছে। খাবার টেবিলে উল্টাপাল্টা খাবার খেতে দেখলে, আমি এই বইয়ের বিভিন্ন অংশের উদ্ধৃতি দিয়ে

পৃষ্ঠা:৩২

বলতাম, এ খাবার নিষিদ্ধ। উল্টো বলে বসত, ওই বইটা আপনাকে দিয়েছি, উপদেশও আপনার জন্য। সোজা জবাব।বারডেম-এর করোনারি কেয়ার ইউনিট। মশিউজিংসহ নিচিত্র সখ যন্ত্রপাতি লাগিয়ে হাসপাতালের বেডে আমাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। কলেজের সহপাঠী বন্ধু প্রফেসর ওমর ফারুক, আইসিইউ প্রধান, জরুরি ভিত্তিতে ভর্তি করে নিয়েছে। মা আয়েশা ফয়েজকে নিয়ে হুমায়ূন আমার বেডের পাশে কিছুক্ষণ থেকে গেছে। টের পাই নি।হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার পর বইটি আমার হাতে দিয়ে বলল, এটা ভালো বই, কাজে লাগবে। হাসপাতালে যাওয়া আমার একদম অপছন্দ। আম্মাকে নিয়ে দেখতে গিয়েছিলাম। টের পান নি। সেরে উঠবেন, ধারণা করি নি। কপালে চুমু দিয়ে বিদায় নিয়েছিল।বিদায় দেওয়া-নেওয়ার প্রায় একই ধরনের আরেকটি প্রসঙ্গ হুমায়ূন অনেক বছর পর আবার তুলেছিল। ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। সেটা নিজেকে নিয়ে। ক্যানসারে অসুস্থ হুমায়ূনের সঙ্গে শেষ দেখার দিন। সে প্রসঙ্গ পরে আমকি।খালাম্মা আয়েশা ফয়েজ বললেন, বাবা, তেল্লির অসুখের খবর শুনে আমার থেকেও হুমায়ূন বেশি অস্থির হয়ে গিয়েছিল। প্রসাকে ফোন করে বলল, যেভাবে পারেন এখনই ধানমন্ডির বাসায় চলে আসেত্য) পিএনজি টেক্সিতে পল্লবী থেকে বাসায় এসে দেখি হুমায়ূন ঘরের ভেতর অস্থিরভাবে এদিক থেকে ওদিকে হাঁটছে। বলল, সঙ্গে নিয়েছিল।আর দেরি নয়। । এখনই হাসপাতাল মেতে ও হতে হবে। সেদিন হুমায়ুন সাথে মাজহারকেও AMA স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সাথে সম্পৃক্ত প্রজন্যটিকে নিয়ে লেখক হুমায়ূন আহমেদের অগ্রযাত্রা শুরু হয়। পরিবার, মুক্তিযুদ্ধ, দেশ নিয়ে হুমায়ূনের লেখালেখি, নাটক, সিনেমা একদিকে যেমন বইয়ের জন্য ওপার বাংলামুখী পাঠক সমাজকে দেশমুখী করেছে, অন্যদিকে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে করেছে বইমুখী, করেছে আলোকিত। হুমায়ূনের এই কীর্তি চিরঞ্জীব বাংলাদেশে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।হুমায়ূনের লেখা বই সারা দেশের অগণিত পাঠকের মতো আমাদের গোটা পরিবারটাকেই বইমুখী করেছে এটা অস্বীকার করার জো নাই। সন্তানেরা একদম ছোটবেলা থেকে পড়ত তাদের পছন্দের বই। একটু বড় হয়ে অন্যান্য বইয়ের সঙ্গে হুমায়ুন আহমেদের বই। প্রতিদিন বাসার খাবার টেবিলে দুজনে দুটি বই নিয়ে বসে। এখনো এ ধারা চলছে। ছেলে বসে প্লেটের বাঁ পাশে খোলা বই টেবিলে বিছিয়ে। আর মেয়ে খোলা বই খাড়া করে টেবিলে এমনভাবে বেষ্টনী তৈরি করে, যাতে করে উল্টোদিকে বসা কেউ তার খাবার প্লেট ও মুখ দেখতে না পায়।

পৃষ্ঠা:৩৩

ছেলের দৃষ্টি থাকে সবসময় বইয়ের দিকে নিবন্ধ। একেবারে ছোটবেলায় হাতে একটি বই ধরিয়ে দিয়ে তার মা তাকে খাওয়াত। নানারকম ডাল, চাল, শাকসবজি, মাছ, গোশত ব্লেন্ডারে খুঁটিয়ে ‘ফিসফাস’ নামের খাদ্যজাতীয় কিছু তার বাটিতে চালান করে দিত আর বইয়ের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে সে তা অবলীলায় গলাধঃকরণ করত। স্কুলে পড়ার সময় একবার খাবার টেবিলে বই পড়তে পড়তে প্লেট থেকে খাবার তুলে মুখে দিচ্ছে। একসময় প্লেটে কোনো খাবার নাই, তবু প্লেটে হাত রাখছে আর মুখে পাঁচ আঙুলের মাথা ঢুকিয়ে আবার প্লেটে হাত রাখছে। একফাঁকে প্লেটটা সরিয়ে নেওয়া হলো। এখন সে টেবিলে হাত ধোঁয়াচ্ছে আর মুখে হাতের আঙুল ছোঁয়াচ্ছে। হাসির রোল পড়াতে প্লেট রাখার জায়গার দিকে তাকাল। বড় হয়েছে। এখন শাকসবজিবর্জিত খাবারই তার কাছে বেশি পছন্দের।মেয়ে আবার কীভাবে যেন এসব বাজে খাবারের যাতনা থেকে ফসকে বেরিয়ে যেত। তার কাছে উপাদেয় ছিল স্কুলের শিঙ্গাড়া আর স্কুলের পাশে ফখরুদ্দিনের কাচ্চি বিরিয়ানি।বাসায় অনেক ধরনের বইয়ের সঙ্গে হুমায়ূনের প্রায়ু-সবগুলো বই সংগ্রহে আছে। বেশির ভাগ বই হুমায়ুনের দেওয়া। কোনো কোনো টি শব্দ লিখে দিত। আশির দশকের মাঝামাঝি একটি বইতে শুইেচ্ছা কথামালা কাঠপেন্সিলে লিখে নিয়েছিল। অনেক সময় দেখা গেছে, অর্থান্ত লেখা বইয়ের পুনর্মুদ্রণ প্রয়োজন। বইয়ের কপি কোথাও পাওয়া যাচ্ছে নানুষ এন বইটি চেয়ে নিত।ছেলেমেয়েরা পড়তে নিয়ে চুরি অত্রতত্র বই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখে। এ নিয়ে তাদের মার সঙ্গে খুনসুটি লে বই গুছিয়ে রাখে হকে। যক্ষের খনের মতো তাদের মা বাসার সবঘুমাছন ছোটদের জনীত জনীও অনেক বই লিখেছে। বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে। বলত, একেবারে ছোটবেলা থেকেই বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। নিজের ছোটবেলার বই পড়ারও উদাহরণ দিত। শিশুদের উপযুক্ত বই জোগাড় করে দেওয়া মা-বাবার দায়িত্ব। তাদের শিখবার ক্ষমতা অপরিসীম। মুখে হয়তো বলতে পারে না, কিন্তু স্মৃতিতে সব গেঁথে যায়। ভিন্ন ভাষাভাষী মা-বাবা হলেও দেখা যায় তাদের শিশু দুটো ভাষা-ই শিখে ফেলেছে। শব্দ ও বাক্য, যা চোখে দেখে, কানে শুনে শিখবে, সেগুলি একসময় না-একসময় মনের ভাব প্রকাশে বিভিন্নভাবে কাজে লাগাবে। স্কুলে গিয়ে একেবারে প্রাথমিক শিক্ষায়ও এগিয়ে যাবে। শব্দের ভাণ্ডার যত বেশি হবে প্রকাশের ধরনও তত সাবলীল হবে।ছোটবেলায় একবার পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠলে তা সারা জীবনের হয়ে যায়। টিভি, ভিডিও গেমস, নেট ব্রাউজিং, ইউটিউব, ফেসবুক, টুইটারের মতো আধুনিক বিনোদন ও যোগাযোগের সুযোগ-সুবিধা সত্ত্বেও তারা বই বিমুখী হবে না। বইয়ের গন্ধ এবং স্পর্শই আলাদা।

পৃষ্ঠা:৩৪

খোদ আমেরিকাতেই যেখানে আধুনিক প্রযুক্তির ছড়াছড়ি সেখানে ঘোল থেকে চব্বিশ বছর বয়সের প্রতি এক শ’ জনের আশিজন ছেলেমেয়ে বছরে একটি হলেও কোনো না কোনো বই পড়ে, এটি তাদের ভুলপাঠ্য বইয়ের বাইরে। ইউরোপীয় দেশে একই বয়সীদের ত্রিশ থেকে পঞ্চাশজন অবসর সময়ে বই পড়ে। কোরিয়াতে প্রতি বিশ হাজার জনসংখ্যার জন্য একটি লাইব্রেরি আছে।জাপান, ইউরোপীয় দেশসহ আরও কয়েকটি দেশের বই পড়ুয়ারা ট্রেন, সাবওয়েতে ভ্রমণের সময়কেও বইপড়ার জন্য অবসর সময় মনে করে। একটু চোখ মেলে তাকালেই দেখা যায় সববয়সীর হাতেই বই।উপন্যাসের এক চরিত্র রূপায়ণে নিম্নআদালতের বিচারককে নিয়ে বিরূপ মন্তব্যের ফলশ্রুতিতে হুমায়ুন একবার মামলায় জড়িয়ে পড়ল। বলল, নির্ঘাত জেলে যেতে হবে। খোদ বিচারকেরা যাদি। মাঝেমধ্যে কাগজ-কলম নিয়ে দেখা করতে যাবেন। জেলে তো লেখালেখি করতে বাধা নেই। এক বৃষ্টিঝরা সন্ধ্যায় মলাট বাঁধানো ইংরেজিতে উরখা মোটা একটি বই নিয়ে দুজন মৌচাক-রামপুরার দিকে গেলাম, আইনজীবীর চেম্বারে। ভাষাসৈনিক গাজিউল হক। হুমায়ূনের আইনজীবী। তাঁকে বইটির কয়েকটি কয়েকটি অনুচ্ছেদ দেখিয়ে দেওয়া হলো। আগ্রহ নিয়ে পড়লেন।বইটা নিয়েও আরেক কাহিনিও প্ররিক কাজে এক ভদ্রলোক সাক্ষাৎপ্রার্থী। একটু যেন আলাদা, সদালাপী একি রেকটি বিষয়ের ওপর তার প্রচুর পড়াশোনা। খবরের কাগজের চাদি প্রতিবেদন উল্লেখ করে বলল, হুমায়ূন আহমেদ বিচারব্যবস্থা নিয়ে উপন্যাস্টে কিছু-একটা লিখেছে। আরও অমনিই। তার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেওয়া হলো। এ-কী কাণ্ডা বললাম, উপন্যাসে ওই বক্তব্যটাও ঢালাওভাবে রাখা হয়েছে। ভদ্রলোক বলল, তার কাছে ব্রিটিশ ভারতে বিচারব্যবস্থার ওপর খোদ এক ইংরেজ বিচারকের লেখা একটি বই আছে। সেখানে আরও কঠোর ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। তাছাড়া এ লেখায় লেখকও কোনো সরাসরি বক্তব্য রাখে নি। চরিত্রের ভাষায় এসেছে।বললাম, একই কথা।আমার আগ্রহে একদিন বইটি হাতে এল। অনেক চেষ্টা করেও আইনজীবীর চেম্বার থেকে পরে বইটি উদ্ধার করা সম্ভব হয় নি। চেম্বারে অনেক বইয়ের সঙ্গে বোধহয় মিশে গেছে। ভদ্রলোককে বইটি ফেরত দেওয়া সম্ভব হয় নি। আমি দুঃখিত যে ভদ্রলোকের নাম এবং বইটির নাম কোনোটাই মনে পড়ছে না। তার সঙ্গে যোগাযোগহারা হয়ে যাই।

পৃষ্ঠা:৩৫

দিন-তারিখ মনে নেই। একাত্তরের মার্চের যথাসম্ভব প্রথমদিকে এক সন্ধ্যায় জাফর আলম তার বারো-তেরো বছর বয়সী ছোটভাইকে নিয়ে হলে আমার রুমে হাজির। সঙ্গে মহিউদ্দিন আহমেদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগের মেধাবী ছাত্র মহিউদ্দিন, বৃত্তি নিয়ে লাহোরে চার বছর পড়াশোনা করার সময়ে তার চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন এসেছে। পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে বৈষম্যের তথ্য ও পরিসংখ্যান তুলে খরত। আপাতত জাফর আলমের সঙ্গে থাকছে। ইকবাল হলে তার সিঙ্গেল রুম। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার গুমোটভাব। জফর আলম বলল, ক্যাডেট কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য ছোটভাই ঢাকা এসেছে। এ অবস্থায় তাকে আর সঙ্গে রাখা নিরাপদ নয়। মানিঅর্ডার বন্ধ। টাকাপয়সার টানাটানি। যাওয়ার ভাড়াও জোগাড় করতে হবে।যাওয়ার ব্যবস্থা হলো। ঠিক হলো, তাকে রাতের ট্রেনেই দেশের বাড়ি পাঠিয়ে দিতে হবে। ট্রেনে চড়ে চট্টগ্রাম। সেখান থেকে বাসে চড়ে গ্রামের বাড়িতে একাই চলে যেতে পারবে।ছোটভাইকে জাফর আলম কমলাপুর স্টেশনে ট্রেকে উঠিয়ে দিল। ট্রেন প্লাটফর্ম ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ছোটভাইয়ের মুখ জানালার বাইলেন জফির আলম সামনের দিকে হাঁটিছে আর হাত নাড়াচ্ছে। দুই সহোদরের শেষ দেখাদেখি। উনিশ শ সাতষট্টি সালে ওরা আলম ছিল পরিবারের বড় ছেলে। নিজের কত স্বপ্ন। সরকারি। নির্কর্তা হবে। পরিবারের কত আশা। গত শতকের নব্বই দশকের এইঝামাঝি সময়। স্বল্প শশ্রুমন্বিত এক তরুণ সরকারি কর্মকর্তা সরকারি দপ্তরে স্পর্শনার্থী হিসেবে আমার সঙ্গে দেখা করতে এল। বলল, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে ফেনীতে কর্মরত। ঢাকার বাসায় একটি টেলিফোন সংযোগ অনেক চেষ্টায়ও হচ্ছে না। আলাপচারিতার একপর্যায়ে জানলাম, তার দেশের বাড়ি কক্সবাজার জেলার উখিয়ায়। জায়গার নাম শুনে কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, রত্না পালংয়ের রুমখা পালং গ্রাম চেনেন। একাত্তরের পঁচিশে মার্চ কালোরাতে ইকবাল হলে পাক আর্মি আমার বন্ধু জাফর আলমকে হত্যা করেছে। ওটা তার গ্রামের বাড়ি। তরুণ কর্মকর্তা বলল, উনি আমার ভাই। চোখাচোখি হলো। মরিয়া হয়ে আবার জিজ্ঞেস করলাম, শহীদ হওয়ার কিছুদিন আগে এক সন্ধ্যায় আরেক বন্ধু মহিউদ্দিনকে নিয়ে জাফর আলম আমার হলে এসেছিল। সঙ্গে ছিল অল্পবয়স্ক ছোটভাই। সে এখন কোথায়?তরুণটি বলল, আমিই সেই ছোটভাই। আমার সব মনে আছে। আপনাকে আমি চিনেছি।

পৃষ্ঠা:৩৬

কিছুদিন আগে আবার দেখা হলো। অন্য এক উপলক্ষে। একাত্তরের সেই ছোটিভাইটি তখন বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ের সচিব। মোহাম্মদ শফিউল আলম। হুমায়ুন তার জনম জনম উপন্যাসটির উৎসর্গ পাতায় ছাপিয়েছে আমার ও আমার স্ত্রীর নাম। লিখেছিল ‘প্রিয়ভাজনেষু’। শহিদুল্লাহ হলে থাকতে লেখা এ উপন্যাসটি নব্বইয়ের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়। বইটির উপর এক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে। বছর তিনেক আগে ‘বলপয়েন্ট’ উপন্যাসের একটি কপি আমার হাতে তুলে দেয়। ভেতরের পাতায় হাতে লেখা: ‘একসময়ের প্রিয় দুজন’। এ যেন একটু সৃগ্ধ বোঁচা। ২০১০ সালে ‘মাতাল হাওয়া’য় লিখে পাঠিয়ে দেয়-মুনীর ভাই প্রিয়জনেষু’। মাঝে মধ্যে এ ধরনের বই পেলে ছুটে না গিয়ে পারতাম না। হুমায়ুন যেন বলতে চাচ্ছে আসেন না কেন। এ যেন জনম জনমের আরেক বন্ধন।হুমায়ূনের জীবনের শেষ পাঁচ-ছয় বছরে সংসার ভাঙাগড়ার আবর্তে বিভিন্ন কারণ ও অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তার সঙ্গে দেখা হতো দীর্ঘ বিরতিতে, যা হুমায়ুন ভালোভাবে নেয় নি। অভিমান করত এবং পরোক্ষভাবে রকাশও করত। একবার বলেই বসল, ভুলে যাবেন না ।। কয়দিন্তোষী আমাদের জীবন। তবে যখনই দেখা হতো আন্তরিকতায় কোছের ছেদ পড়ে নি। নিজ হাতে খুঁজে বের করত পছন্দের বই। খুঁটে খুঁটে অনেক চীধু জানতে চাইত, বলত নিজের অনেক ব্যক্তিগত না-বলা কথা। হুমায়ূন বিডিীভাবে ছেলেমেয়েদের ব্যাপারে নিয়মিত খোঁজখবর পেত। নুহাশের আনা। মশা তো ছিলই। তবু আমার সঙ্গে দেখা হলে তাদের প্রসঙ্গ টেনে আনত। কেচিউর্ণ আর এক হুমাচুন।হুমায়ূনের পারিবারিক জীবনে তার বড় মেয়ে নোভার বিয়ের উপলক্ষ ছিল একটি আনন্দঘন সময়। জাফর ইকবাল ও ইয়াসমীন হকের উদ্যোগে বর-কনের পরিচয়। গায়েহলুদ অনুষ্ঠান ধানমণ্ডির গুলতেকিন হাউজে। জমি কিনে বাড়ি বানিয়ে হুমায়ূন পরিবার কয়েক বছর ধরে এখানে বসবাস করছে। গায়েহলুদ অনুষ্ঠান হয় সাধারণত হালকা মেজাজে। কিন্তু সেদিন যেন কী হলো, আনন্দধারার বদলে সবার চোখে অশ্রুর ধারা। হলুদের চৌকিতে বসে কনে কাঁদছে, কনের মা-বোনেরা কাঁদছে, যারা হলুদ দিচ্ছে তারাও কাঁদছে। নীরবে বসা হুমায়ূনের দুচোখ থেকে অশ্রুধারা ঝরেই যাচ্ছে।লাইব্রেরি ঘরের কাঠের পাটাতনকে স্টেজ বানিয়ে অনেক রাতে নোভার ভাইবোন ও কাজিনরা একটি হাস্যরসাত্মক নাটক উপস্থাপন করল। কেউ বর, কেউ কনে, কেউ ঘটক, বিভিন্নজন বিভিন্ন চরিত্রের সাজ নিয়েছে। দেশে ফেরার পথে দুবাই এয়ারপোর্টে বিয়ের বাজারভর্তি স্যুটকেস হারিয়ে বরের আহাজারির দৃশ্যের হাসিঠাট্টা কিছুক্ষণ আগে গায়েহলুদের কান্নাকাটিকে ভুলিয়ে দিয়েছে।

পৃষ্ঠা:৩৭

পরেরদিন নোভার প্রিয় ঔপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে সবার অগোচরে দাওয়াত দিয়ে কলকাতা থেকে বিয়েবাড়িতে নোভার সামনে হাজির করে হুমায়ূন মেয়েকে চমকিয়ে দিল। কন্যার বিয়েতে এটা ছিল পিতার চমকলাগানো উপহার।একই শহরে থেকেও শীলা ও বিপাশার বিয়েতে হুমায়ূনের যোগ দেওয়া সম্ভব হয় নি। পারিবারিক পরিবেশ ও পরিস্থিতি অনুকূল ছিল না। সংবেদনশীল হুমায়ূনের মর্মপীড়া এ সময় কাছে থাকা জনদের নজর এড়ায় নি। সন্তানদের ব্যাপারে হুমায়ূন একদিকে যেমন ছিল স্পর্শকাতর, অন্যদিকে তাদের প্রতি ভালোবাসা ছিল অকৃত্রিম। নিজের বয়স এবং ছোট দুই ছেলে, নিষাদ ও নিনিতের ভবিষ্যৎ নিয়েও আশঙ্কা প্রকাশ করত। শেষের দিকে লেখা উপন্যাসের উৎসর্গ পাতায়ও এ ভাবনা এসে গেছে। বড় সন্তানদের প্রসঙ্গে আক্ষেপ ও অনুযোগের জবাবে মাঝেমধ্যে বলতাম,বেশির ভাগ দায় তো আপনারই, এখন অভিমান কেন? সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা যুক্তি খাড়া করত। অতীতের বিভিন্ন ঘটনার উদাহরণ টানত। কলত, আপনি কি সব ভুলে গেছেন? আর হুমাভূনের যুক্তিতর্ক খণ্ডানো কঠিন। এটা বুম হতে চাইত না যে, বাস্তব ঘটনাপ্রবাহে তাদেরও অভিমান হতে পারে। সন্তানদের নিয়ে হুমায়ূনের প্রচ্ছন্ন গর্ব তার নুহাশের আমেরিকায় পড়াশোনার জন্য টাকাংগ্রীও ছিল না। কীভাবে টাকা যোগাড় হয়েছে দেখিতেই প্রতিফলিত হয়েছে। ওটা যোগানে তার আন্তরিকতার অভাব ২। সাময়িক ধারকর্জও করতে হয়েছে।নবজাতক রাশেদকে বাঁচানো হয় নি। সন্তানের জন্য হুমায়ূন-দম্পতির আকুল মর্মবেদনা তখন আশপাশের সবার মন ছুঁয়ে যায়। ক্লিনিক থেকে গাড়ি চারটে শহীদুল্লাহ হলে এলাম। পেছনের সিটে নবজাতকের লাশসহ হুমায়ূন পরিবার সামনের সিটে বসা নাট্যাভিনেত্রী দিলারা জামান। শুভ্রবসনা এই শিক্ষিকা ঘোমটা মাথায় অনুচ্চ কণ্ঠে দোয়াকালাম পাঠ করছিল। ওই সময়ের দিনগুলোতে নাট্যাভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর, আবুল হায়াত, প্রয়াত মোজাম্মেল হোসেনসহ অনেকেই শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল।বহুবছর পর ২০০৯ সালে, নুহাশপল্লীতে ওষধি গাছের বাগানে গেলে একটি শ্বেতপাথরের দিকে হুমায়ূন দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ‘রাশেদ হুমায়ুন ঔষুধি উদ্যান। আমার ছোট বাবাকে মনে করছি’। মুহম্মদ জাফর ইকবাল ‘আমার বন্ধু রাশেদ’ নামে একটি বই লিখেছে। নুহাশের সবে জন্ম হয়েছে। হুমায়ূন কী যেন এক উপলক্ষে আজিমপুরের টিএন্ডটি বাসায় এল। বারান্দার টেবিলে নবজাতকের নামের একটি পুস্তিকা দেখে হাতে তুলে নিল। পুস্তিকাটি নিউমার্কেটের গেইটের পত্রিকার দোকান থেকে কেনা হয়েছিল আরেক নবজাতকের নাম রাখার জন্য। হুমায়ূন গভীর মনোযোগে অনেকক্ষণ সময় নিয়ে নামগুলি পড়ল। একসময়ে বলল, আমার ছেলের নাম হবে নুহাশ।

পৃষ্ঠা:৩৮

হুমায়ূন নামের ব্যাখ্যা করে বলল, এ নামের একটা ভালো অর্থ আছে। নাম নুহাশই হবে। যাওয়ার সময় নামের বইটিও সঙ্গে নিয়ে গেল। হুমায়ূন কোনো এক পত্রিকার ঈদসংখ্যায় লিখেছিল, ছোট ছেলের হাত ধরে বাবা ঈদের নামাজে যাচ্ছে, এর থেকে আনন্দের আর কী আছে। তখন হুমায়ূন থাকত এলিফ্যান্ট রোডে। ঈদের দিন নামাজের আগে আগে আজিমপুরে আমাদের বাসায় আসত। একসঙ্গে নিউমার্কেটের মসজিদে ঈদের নামাজ পড়া হতো। সঙ্গে হাত ধরে যেত আমার ছেলে। হুমায়ূন মুগ্ধদৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখত। ঈদের সাজে শিশুদের দেখিয়ে বলত, সত্যিকার আনন্দ ওরাই উপভোগ করছে। এ দৃশ্য হুমায়ুনের মনে কোনো আকৃতি সৃষ্টি করেছিল কি না জানার কোনো উপায় নেই। আরও পরে হুমায়ুন যখন ধানমণ্ডির বাসা থেকে মসজিদে ঈদের নামাজ পড়তে যেত প্রতিবারই শিশুপুত্র নুহাশকে ঈদের নামাজে হাত ধরে নিয়ে যেত। যা কিছু সুন্দর, যা কিছু আনন্দময়, তার প্রতি ছিল হুমায়ূনের সহজাত আকর্ষণ।নব্বই দশকের আগে পরের দিনগুলোতে হুমায়ূনের আশপাশে ছিল নাট্যজগতের নামজাদা অভিনেতা-অভিনেত্রী, টেলিভিশনের নামজাদা প্রযোজক, নির্মাতা এবং গুণীজনেরা। নাটক, সিনেমা এবং হতো একদল বন্ধু, যাদের মধ্যে কয়েকজন স্বনাম কিছু নতুন মুখ যোগ হতো। আরও সমবেত লেখক ও কবি। প্রতিনিয়ত হুমায়ূনের পছন্দের ব্যক্তিদের মধ্যে নক্ বশি আলী খান একজন। তার প্রেরণা এবং পীড়াপীড়িতেই বাংলাদেশ। চলিনিশ্চিনের জন্য হুমায়ূন নাটক লেখা শুরু করেছে এবং পরবর্তী সময়ে সাড়া জাগান্দে, বাটিটকার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তার দৃষ্টিতে হুমায়ুন নাটকের যে সংলাপই ‘তা হতো ‘অসাধারণ’।হুমায়ূনের ‘নানাজী’ শৈষ্টিক বাংলার সহকারী সম্পাদক সালেহ চৌধুরী লেখালেখি জীবনের শুরু থেকেই হুমায়ুনের পাশে থেকেছেন। তাঁর উদ্যোগে হুমায়ূনের প্রথমদিককার কিছু লেখা সাপ্তাহিক বিচিত্রায় ছাপা হতো। বিচিত্রায় লেখার জন্য প্রথম সম্মানীর টাকা পকেটে নিয়ে হুমায়ূন সোজা কক্সবাজার চলে গেল।‘অয়োময়’ নাটকে জমিদারের লাঠিয়াল হানিফ খ্যাত অভিনেতা প্রয়াত্র মোজাম্মেল হোসেন ছিল এক ব্যতিক্রমধর্মী চরিত্রের মানুষ। পারিবারিক বন্ধু হিসেবে একসময় হুমায়ূনের পাশে থেকেছে। দিলখোলা হাসিখুশি ‘মোজাম্মেল চাঙা সব ছোটদের প্রিয়। বিভিন্ন উপলক্ষে তাদের জন্য উপহার হিসেবে নিয়ে আসত রঙ- বেরঙের কাচের চুড়ি, ফিতা, লেস, খেলনা।লেখালেখির জগতের আরেক তারকা ইমদাদুল হক মিলন। আসরপ্রিয় এ মানুষটি সময়ে পেলেই হুমায়ূন সান্নিধ্যে চলে আসত। স্বভাবসুলভ রসিকতায় হুমায়ূন বলত, আমি মারা গেলে সে একাই মাঠে থাকবে।সেদিনের জন্য রসিকতা হলেও হুমায়ূন ভক্ত মিলনের জন্য আজ তা কষ্টের স্মৃতি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

পৃষ্ঠা:৩৯

আরেকদিন হুমায়ূনকে বলতে শুনেছি, নূরজাহান উপন্যাসটি মিলন এত দীর্ঘ না করলেও পারত।বন্ধুদের আসরে হুমায়ূন থাকত মধ্যমণি। সমমনা অথবা সমসাময়িক হওয়ার কারণে হুমায়ূন তাদের উপস্থিতি উপভোগ করত এবং গল্পের আসরে নিজেকে মেলে ধরত।এক সন্ধ্যায় ‘দখিন হাওয়া’র বাসায় জমজমাট আসরের একফাঁকে রাজনীতি ঢুকে পড়ল। উপলক্ষটা ছিল টেলিভিশনের খবর। টিভির টেলপে আসছে অমুক ছাত্র সংগঠনকে দীর্ঘদিন পর সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পুনর্গঠন করে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়েছে। বড় মাপের এক রাজনীতিবিদ বিবৃতি দিয়েছে, গণতন্ত্রের জন্য এটি একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।পর্দায় ছাত্রনেতাদের নাম ভেসে আসছে। নতুন বোতলে পুরাবন মদ। হুমায়ুন হাস্যরসে বলল, এদিক দিয়ে অনেক উন্নতি হয়েছে। এখনকার ছাত্রনেতারা বয়সেও কয়েক ধাপ এগিয়ে আছে। তারা বিয়ে করেছে। সন্তানেরা স্কুল-কলেজে পড়ছে। যাদের নেতৃত্ব দেবে তাদের কাছে ভ্রাতৃতুল্য না হয়ে পিতৃতুল্য হয়ে যাচ্ছে। মান্যতা গণ্যতা বেড়ে গেছে। একজন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, যেভাবে চলছে, একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রনেতার নেই যখন বাপ-বেটা দখল করবে। বাংলাদেশের রাজনীতির মতো এখানেও পরিবারতন্ত্র চালু হুমায়ূনের জীবনের শেষ দশকের। আরও কিছু নবীন-প্রবীণের। আরি পুরাতন বন্ধুবান্ধব থিতু হয়ে বৃন্ত্র ARE যাবে। ‘তাকে ঘিরে এ আসরে সমাবেশ ঘটে বেশির ভাগ নতুন মুখের। । জনা কয়েক আতীয় পর্যায়ের কবিস্টৌহত্যিক, শিল্পী, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন ব্যক্তি এবং গুণীজনের সঙ্গে ধুমায়ূনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক সবসময়ই ছিল। তবে নিজ নিজ ক্ষেত্রের কর্মব্যস্তভা এবং অবস্থানের কারণে মেলামেশার সুযোগ ছিল সীমিত। আর হুমায়ূন এমনিতেই অন্তর্মুখী ও প্রচারবিমুখ। তার জীবন ছিল মূলত লেখালেখি ও নুহাশপল্লীকেন্দ্রিক। নিভৃতচারী হুমায়ূন নিজের সৃষ্ট জগতেই বসবাস করত।একুশে বইমেলা হুমায়ূনের নিয়মিত উপস্থিতিতে থাকত রমরমা। শেষের দিকে বইমেলায় যাওয়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছিল। কিন্তু প্রতিটি বইমেলায় পাঠক তাকিয়ে থাকত হুমায়ূন আহমেদের নতুন বইয়ের দিকে। একুশে বইমেলায় হুমায়ূন আহমেদের নতুন বই থাকবে না, এটা কল্পনাই করা যায় না।নব্বই দশকের মাঝামাঝি বই প্রকাশনার সূত্রে হুমায়ূনের সঙ্গে অন্যপ্রকাশ ও মাজহারুল ইসলামের পরিচয়। শুরুটা লেখক-প্রকাশক সম্পর্ক হলেও পরে সেটা পারিবারিক সম্পর্কের চেয়েও বেশি হয়ে যায়। হুমায়ূনের ‘দখিন হাওয়া’ বাড়িকেন্দ্রিক জীবনে সুখে-দুঃখে, আপদে-বিপদে মাজহার দম্পতির সহমর্মিতার হাত ছিল নিত্য প্রসারিত।

পৃষ্ঠা:৪০

হার্টের বাইপাস অপারেশন, সংসার ভাঙা-গড়ার টানাপোড়েন হুমায়ূনের মতো সংবেদনশীল ব্যক্তির ওপর কেমন প্রভাব ফেলেছিল, তা পাঠকের মূল্যায়নের বিষয়। তবে লেখক হুমায়ূন আহমেদ ছিল লেখালেখির ব্যাপারে বরাবর কঠোর পরিশ্রমী। নিউইয়র্কের মেমোরিয়াল স্নোন ক্যাটারিং ক্যানসার সেন্টারে কেমোর পর কেমো নেওয়ার যাতনার অস্থির হয়েছে। কিন্তু লেখালেখিতে ছেদ পড়ে নি। লেখালেখিই ছিল তার জীবনীশক্তির মূল উৎস।মা আয়েশা ফয়েজও এটা ভালোভাবে জানতেন। হুমায়ূন প্রথমবার নিউইয়র্ক গেল কেমোথেরাপির জন্য। তিনি অস্থির। যতবারই, ফোন আসে, জিজ্ঞেস করেন হুমায়ুন লেখালেখি করছে কি না। একদিন যখন জানলেন হুমায়ুন লেখালেখি করছে, আশ্বস্ত হলেন।হুমায়ূনের জীবনের শেষের দিকে কালের বৃহত্তর পটভূমিকায় লেখা কয়েকটি উপন্যাস সবার দৃষ্টি কেড়েছে। পাঠক আবিষ্কার করতে শুরু করেছিল এক পরিণত নতুন হুমায়ুন আহমেদকে, যার শৈল্পিক কলমের আঁচড়ে ফুটে উঠছিল ভিন্নমাত্রার জীবনদর্শন, অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎকে একই সুত্রে। নান্দনিক সৃষ্টি পাঠকের কাছে উপস্থাপন। গ্রথিত করে এক-একটি M

  • লেখক হিসেবে আরও পরিণত এবং জল ধুমায়ূন আহমেদ, তার পুনর্জন্ম লগ্নেই চলে গেল। চার দশক ধরে পাঠকুমরয়ে পরম মমতায় দালিত হুমায়ূন আহমেদের আরও অনেক কিছু দেওয়ার প্রতিশ্রতি ছিল।। জীবনের শেষ দিনগুলোতে নিজেও সেই প্রত্যয় লালন করত। বৃন্ধু সুস্থ হয়ে ফিরে আসবে। অনেক কিছু করায় ও লেখার আছে। একটু পেছনে ফেরা শহীদুল্লাহ হল ছেড়ে দিয়ে হুমায়ূন এলিফ্যান্ট রোডে নিজের ফ্ল্যাটে উঠে এল। এ সময় লেখালেখি ও নাটক নিয়ে হুমায়ূনের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। হুমায়ুন সিদ্ধান্ত নিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে দেবে। শহীদুল্লাহ হলে থাকতেই প্রফেসর পদে পদোন্নীত হয়।বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ছাড়তে চাচ্ছিল না। হুমায়ুনের যুক্তি, নিজের ব্যস্ততার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা সম্ভব হচ্ছে না। পদ আঁকড়ে থাকছে তার বিবেকে লাগছে।এলিফ্যান্ট রোডের বাসায় বেডরুমের দরজার বাইরে একদিন হুমায়ূন একপাতা হাতে দেখা কাগজ নিজ হাতে সেঁটে দিচ্ছে। বড় বড় অক্ষরে লেখা, পরদিন সকাল সাড়ে আটটায় রসায়নের ক্লাশ। কয়েকদিন পর কথায় কথায় বলল, ক্লাসটি নেওয়া সম্ভব হয় নি। অনেক রাত পর্যন্ত নাটকের একটি পর্ব লিখে শেষ করেছে। কোথাও কেউ নেই’ ধারাবাহিক নাটক টেলিভিশনে প্রচারিত হচ্ছে। হুমায়ূন নাটকের প্রতিটি পর্বের সংলাপ থেকে শুটিং পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে খুঁটিনাটি বিষয়ের

পৃষ্ঠা:৪১

দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছে। যত দিন যাচ্ছে, পত্রপত্রিকায় লেখালেখি ও দর্শকের আগ্রহ বাড়ছে। প্রচার সময়ের আগেভাগেই রাস্তাঘাট খালি। সবাই টেলিভিশনমুখী। বাকের ভাইয়ের ছবিসহ দেয়ালে পোস্টার লাগছে-বাকের ভাইয়ের ফাঁসি দেওয়া চলবে না। বাসায় উড়ো চিঠি আসছে। টেলিফোনে হুমকি। হুমায়ূন অনড়। সন্ধ্যাটি নাটকের শেষপর্ব সম্প্রচারের দিন। সম্প্রচারের আগে আগে হুমায়ুন পরিবার আজিমপুরে টিএন্ডটি বাসায় হাজির। বাসা তালা বন্ধ করে এসেছে। পুলিশ পাহারা বসানো হয়েছে। তাতে কী? ছেলেমেয়েরা ভয় পাচ্ছে।সবাই একসঙ্গে টেলিভিশনে নাটকের শেষ পর্ব দেখতে বসেছে। কোনো কথা নয়-টেলিভিশনের পর্দায় হুমায়ূনের দৃষ্টি নিবদ্ধ। সামান্য নড়াচড়ার শব্দেও বিচলিত। শেষ পর্বটা দেখল। চোখের পানি বারবার হাতের তালুতে মুছল। অন্যদের চোখও ভেজা। শেষ দৃশ্যে জেলখানার ওপর দিয়ে কয়েকটি কাক উড়ে গেল। মসজিদ থেকে ফজরের নামাজের আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। ভোর রাত থেকে জেল খেটে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লাশ নেওয়ার জন্য অপেক্ষা। জেলার জিজ্ঞেস করল, আপনি মৃতের কে? মুনা শান্ত গলায় বলল, কেউ না। হ্যামি ওর কেউ না। রাত বারোটার পর হুমায়ূনদের এলিফ্যান্ট গেলাম। একটু দূরে অন্য সবাইকে গাড়িতে। খোঁজখবর নিতে হবে। বাসায় পৌঁছিয়ে দিতে হুমায়ুনসহ এগিয়ে গেলাম।কে ফুটপাতের পাশে প্রায় ঝাঁপি বন্ধ সমুদ্র বিলাস’ বানান্ধে হুমায়ুন সেন্টমার্টিন দ্বীপে। । এখনো ওই দ্বীপে যাওয়া হয়। নি। ঠিক হলো, সপরিবারে সবাই। দের লোকটি বলল, হ্যাঁ, রাত এগারটার মেরেছে। দেি দিকে একটি মিছিল এসেছিল। বাসাও চুস  হি যাবে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে আরও কয়েকজন বন্ধুবান্ধবও যাবে। রাতের ট্রেনে চড়ে চট্টগ্রাম, সেখান থেকে সরাসরি টেকনাফ। টেকনাফে রাত যাপন। সকালে দুটি বড় বড় নৌকায় সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে রওনা। অন্যান্যদের সাথে আছে ছোটদের ‘ব্যানানা আঙ্কেল’ এবং মোহিত কামাল। সময় প্রকাশনের ফরিদ আহমেদ আস্ত এক কাঁদি কলা সাবাড় করে ফেলেছে। ছোটরা এ নামে ডাকা শুরু করল। মোহিত কামাল ডাক্তারির পাশাপাশি লেখালেখিও করে। নৌকায় ছোটদের সবাইকে লাইফ জ্যাকেট পরিয়ে দেওয়া হলো। বড়রাও পরল। টানটান উত্তেজনা। মাঝসমুদ্রের ঢেউ, কূলকিনারা দেখা যাচ্ছে না। ঢেউয়ের তালে তালে নৌকা এগিয়ে । যাচ্ছে। পানি কাকচক্ষুর মতো পরিষ্কার। দ্বীপের তটরেখা দেখা যাচ্ছে। আরও কিছুদূর এগিয়ে গেলে পানির নিচে ঝকঝকে বালুরাশি। জেলেরা মাছ খরে চরের বালিতে স্তূপ করে রেখেছে।সমুদ্র সৈকতের অদূরে ‘সমুদ্রবিলাস’। নির্মাণ কাজ পুরোপুরি শেষ হয় নি। কোনোমতে দুটি রুমের মতো করে ব্যবস্থা করা হলো। মাটিতে পাটি বিছিয়ে রাত।

পৃষ্ঠা:৪২

কাটাতে হবে। তাতে কী। এ ব্যাপারে কারও মাথাব্যথা নেই। হাতছানি দিচ্ছে নীল সমুদ্র। কখন সমুদ্রের পানিতে পা ভেজাবে। ছোটদের আটকানো যাচ্ছে না। জোয়ারভাটার টানে প্রবালশিলার ফাঁকে ফাঁকে স্রোতের ধারা। স্টার ফিসসহ হরেকরকম এবং রঙের মাছ। নীল সমুদ্র, স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ জলরাশি, ঝকঝকে বালিকণা, সবুজ বনানী আর আদিগন্ত নীলাকাশ। এই সেন্টমার্টিন দ্বীপ। ঝিনুকের বুকে যেন এক নীলাভ মুক্তা।ছোটরা আধ্য ডোবানো প্রবাল শিলার ওপর টপকিয়ে উপকিয়ে এদিক থেকে ওদিক যাচ্ছে। দুই হাতের তালু পানিতে ডুবিয়ে ছোট ছোট রঙ-বেরঙের মাছ তুলে এনে বড়দের দেখানোর প্রতিযোগিতায় কে কাকে হারাবে। দিনের শেষে সূর্যের লাল গোলকটি সমুদ্রে তলিয়ে গেল। নানা রঙের পাখি নীড়ে। ফিরছে, বিচিত্র কলকাকলি। নেমে এল অন্ধকার। গাঢ় নীল আকাশে তারা উকি মারছে। কূলে ঢেউয়ের আছড়িয়ে পড়ার শব্দ। দূর থেকে ভেসে আসছে সমুদ্রের চাপা গর্জন, যেন এক বুকভরা কান্না। সমুদ্র কেন সবাইকে এত কাছে টানে?রাতের খাওয়ার শেষে সবাই বাইরে। চারদিক রুপতি আলোতে ঝলমল। কাছে যারা ছিল তাদের উদ্দেশে হুমায়ূন বলল, জানো আজ কী রাত ?কে একজন বলে উঠল, আজ না পূর্ণিমাণ ভর্তি। ভরা পূর্ণিমান্নাত জোছনা রাতে। করেছে। কেউ এটা খেয়ালই করে। সৃষ্টি করতে হুমায়ূনের জুড়ি নেই। সেন্টমা দ্বীপে রাত যাপনের ব্যাবস্থা শুধাই মোহিত, আনন্দ আবেগে আপ্লুত।’ । চমক রাত বাড়ছে। তারা বড়মিকখ্যাকাশে পূর্ণিমার চাঁদ।  সৈকতের বালুরাশি থেকে চাঁদের আলো ঠিকরিয়ে বের হচ্ছে। জোয়ারের ঢেউয়ের মাথায় মাথায় রুপালি আলো হেঁটে বেড়াচ্ছে। নিস্তব্ধ বনরাজি আলোর পরশে যেন জেগে উঠেছে। মাঝে মধ্যে রাতজাগা পাখির ডাক, দূরে কোথাও শিয়ালের হাঁক। হুমায়ূন একটু দূরে ভেজা বালুরাশিতে একা পায়চারি করছে। সবার কাছ থেকে নিজেকে আলাদা করে নিয়ে তার প্রিয় জোছনায় অবগাহনে মন্ত্র।সেবার হুমায়ূন সেন্টমার্টিন থেকে বিদেশি জাতের একটি কুকুরছানা নিয়ে এসেছিল। কুকুরটি আদরযত্নে বড় হয়। দীর্ঘদিন ধানমণ্ডির বাড়ির ঘরের দরজায় শুয়ে বসে থাকত। নিজ গ্রাম, নেত্রকোনার কুতুবপুরে হুমায়ূন ‘শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠ’ প্রতিষ্ঠিত করেছে। স্কুল দেখার জন্য সবাইকে যেতে হবে। বাস ভাড়া করা হলো। বৃহত্তর হুমায়ূন পরিবারের সবাই। পরিবার পরিজনসহ বন্ধুবান্ধবরাও আছে। হুমায়ূন একা কোথাও যেতে পছন্দ করত না।

পৃষ্ঠা:৪৩ 

স্কুল দেখে সবাই মুগ্ধ। ইউনিফরম পরিহিত ছাত্রছাত্রীদের কলকাকলি। সবুজ ধানক্ষেত বেষ্টিত জায়গার ওপর আধুনিক স্থাপত্যের ডিজাইনে নির্মিত সাদা রঙের স্কুল ভবন। অনেক দূর থেকে দেখা যায়। সবুজের মাঝে এক অনন্যসাধারণ বিদ্যাপীঠ। হুমায়ূন পরম আগ্রহে স্কুলের প্রতিটি রুম, খুঁটিনাটি বিষয় ঘুরে ঘুরে সবাইকে দেখাল। বলল, ভবিষ্যতে আর কী কী হবে। কণ্ঠে আবেগ। নিজের স্বপ্ন অন্যকে দেখাচ্ছে। স্বগতোক্তি করল, একদিন থাকব না, কে দেখবে এই স্কুল। গতানুগতিক ধারায় নিজের নামে নায়। শহীদ পিতা ফয়জুর রহমান আহমেদের নামে নয়। সকল শহীদের জন্য উৎসর্গকৃত শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠ।দূরদূরান্ত থেকে নানা বয়সী মানুষজন দলবেঁধে আসছে। তাদের গ্রামের মাটির প্রিয় মানুষটিকে একনজর দেখবে। ধন্য এই গ্রামের মাটি।নিজবাড়ির দরজায় একটি ডাকঘর স্থাপন করেছে। গ্রামে চিঠি আসছে, বিলি হচ্ছে। খাওয়ার আয়োজনেও ত্রুটি নেই। বাড়ির খোলা উঠানে সঙ্গে আসা সঙ্গীদের জন্য টেবিল পাতা হয়েছে। কয়েকজন বয়োবৃদ্ধের সঙ্গে পরিচয় হলো। টেবিলে খাবার সাজানো হচ্ছে। বুমামুনের দৃষ্টি টেবিলের নিচে। বিভিন্ন পদের সাধারণ খাবার, আয়োজন। মোট ত্রিশটি পদ নিজেই তৈরি করে দিয়েছে। আপ্যায়নে কোনে রুটি থাকবে না। খাবার টেবিলে একে একে সবার খোঁজখবর নিচ্ছে। নব্বই দশকের প্রথম দিকে ঢাকার একেবারে ভিন্ন প্রকৃতির। গাজীপুরে একটি বাগানবাড়ি গড়ে উঠেছে। সিরিবেশে দেয়ালঘেরা বিস্তীর্ণ জায়গার দনিয়ার দেশ থেকে আনা বনজ, ফা ফটিন, ভেষজ গাছগাছালির সমাবেশ।বড় চারাগাছ। নানান জাতের ফুল, রঙ-বেরঙের বড় বড় গোলাপ ফুল। একপাশে পুকুর। শানবাঁধানো ঘাট। অদূরে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ বিশ্রামঘর। একসঙ্গে বিচিত্র ধরনের সব গাছপালা, এত বড় বড় রঙ-বেরঙের গোলাপ ফুলের সমাবেশ এদেশে আগে কখনো চোখে পড়ে নি।উদ্যোক্তা একজন ব্যবসায়ী শিল্পপতি। টাকা এবং স্বপ্ন দুটোই আছে।জার্মানির এক গোলাপ বাগানে প্রায় আট শ’ প্রজাতির গোলাপ ফুল দেখে অভিভূত হয়েছিলাম।নেপোলিয়নের প্রেষসী সম্রাজ্ঞী জোসেফাইন প্যারিসে সর্বপ্রথম তার নিজস্ব গোলাপ বাগান মলমাইসোঁ গড়ে তোলে। ইংল্যান্ডের এক বাগানে এক হাজার প্রজাতির গোলাপ ফুল আছে। মিশরের পিরামিডের গায়ে গোলাপ ফুলের পেইন্টিং দেখা গেছে। খ্রিষ্টপূর্ব পাঁচ হাজার বছর আগে চীন দেশে এবং গ্রীসের আগে ব্যাবিলনে গোলাপফুলের বাগান ছিল।

পৃষ্ঠা:৪৪

আশির দশকের প্রথম দিকে হল্যান্ডের কিওকেনহফে টিউলিপ ফুলের বাগানে সদলবলে গিয়েছিলাম। কিওকেনহফের ইংরেজি অর্থ কিচেন গার্ডেন। হয়তোবা রান্নার সবজির চাষ দিয়ে এর গোড়াপত্তন। মাইলের পর মাইল জুড়ে টিউলিপ ফুল এমনভাবে মাঠে সাজিয়ে চাষ করা হয়েছে, দেখে যেন মনে হয় বড় বড় ডোরাকাটা নানা রঙের টিউলিপ ফুলের চাদর দিয়ে সারা মাঠ ঢেকে দেওয়া হয়েছে। এ বাগান দেখতেই দেশ-বিদেশ থেকে আসে বাসভর্তি ট্যুরিস্ট। নানা দিক থেকে ছবি ক্যামেরাবন্দি হয়। চলচ্চিত্রের শুটিং হয়। হিন্দি ছবি ‘সিলসিলা’র একটি গানের দৃশ্য এখানে ধারণ করা হয়েছিল। তরতাজা টিউলিপ ফুল বাগান থেকে বাক্সবন্দি হয়ে বিমানে, বড় বড় লরীতে চলে যাচ্ছে দেশ থেকে দেশান্তরে। ফুল বাণিজ্যে পেটের ক্ষুধা এবং হৃদয়ের ক্ষুধা দুটোই নাশে।বিগত আশির দশকের মাঝামাঝি রজনীগন্ধা ফুল দিয়ে বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক ফুলের চাষ প্রচলন হয়ে এখন সবরকমের ফুলের আবাদ এবং বাজারজাতকরণ একটি ভালো অবস্থায় দাঁড়িয়ে গিয়েছে। বিদেশি ফুলের কদরও বেড়েছে। ফুল সংস্কৃতির অংশ হয়ে গিয়েছে।সুনামগঞ্জের ভারত সীমান্তের পতিত টিলায় রেভূত্রকৃচমের এক বৃক্ষপ্রেমিক এবং তরুণ উদ্যোক্তা প্রায় চৌদ্দ বছর ধরে সাঁইত্রিশ আহতরা বা প্রায় এক লাখ ওমুখি, ফলজ- বনজ গাছ লাগিয়েছে। বাগানটির নাম দিয়েছে অসুখ’। এসো সুখে থাকি। দেশের তিনটি বড় ওষুধ কোম্পানি এ বাগান থেস্তে ভেষজ কাঁচামাল নেবে। ওষুধ তৈরির জন্য প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ভেষন্ত পাকামাল আমদানির বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। পর্দার অন্তরালের এ মানুষটির টি স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথ অনেক কঠিন ও দীর্ঘ। তার সুখে থাকে সবার জন্য সুখ বয়ে আনুক।গাছগাছালি ও ফুল ফুল্লষ্ট নিয়ে এত কড়চা কেন। এর সঙ্গে নুহাশপল্লীর অঙ্কুরোদগমের একটি যোগসূত্র আছে। তাই ইনিয়ে-বিনিয়ে এসব কথা বলা। আশা করি পাঠকের ধৈর্য্যচ্যুতির কারণ হবে না।গাজীপুরে বাগানবাড়িটির উদ্যোক্তা, ফেনী পাইলট হাইস্কুলের সহপাঠী বন্ধু আবদুল আওয়াল মিন্টুর কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজ ছিল। যখন যে দেশের বন্দরে জাহাজ নোঙ্গর ফেলে সে দেশ থেকে আগে থেকেই সংগ্রহ করা উদ্ভিদ ও ফুলের চারাগাছ জাহাজে উঠিয়ে নেয়। চলে আসে গাজীপুরে নিজের বাগানবাড়িতে। তার সব কাজ পরিকল্পনামাফিক হয়।হুমায়ূনকে একদিন এ বাগানবাড়ির কথা বললাম। প্রকৃতি ও গাছপালার প্রতি তার আকর্ষণ বরাবরের। বলল, যাওয়া যায় না।মিন্টু এমনিতেই দিলখোলা, বন্ধুবৎসল। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্কুলবন্ধুদের সপরিবারে ভাক পড়ে। মিন্টুর বাসায় কিছু কিছু অনুষ্ঠানকে নাম দেওয়া যায় ‘সর্বদলীয় মহাসভা’। দলমত নির্বিশেষে দেশের বড় বড় রাজনীতিবিদরা এখানে সাবলীলভাবে মেলামেশা করে। একই টেবিলে বসে একের পাতে অন্যে খাবার তুলে দেয়।

পৃষ্ঠা:৪৫

দেশের বৃহত্তর আঙিনায় রাজনৈতিক ইস্যুতে তারা যদি এমন হতে পারত!মিন্টুকে বললাম, বাগান বাড়িতে যাব। বলল, পরের ছুটির দিনে তারাও যাচ্ছে।সপরিবারে হুমায়ূনসহ আমাদেরও আমন্ত্রণ জানাল। ছিপ দিয়ে মাছ ধরা হবে। সকালে গুলশানের বাসায় চলে আসতে বলল। চা-টা খেয়ে একসঙ্গে গাজীপুর রওনা হবে।শহিদুল্লাহ হল থেকে হুমায়ুনদের উঠিয়ে নিয়ে মিন্টুর বাসায় এলাম। দোতলা বাড়ির নিচতলায় প্রায় পুরোটাই ড্রইংরুম। বাড়িটা কেন্দ্রিয়ভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। বাইরে সুইমিংপুল, খোলামেলা আঙিনা, সাজানো বাগান।হুমায়ূন ঘুরেফিরে দেখল, অবাক হওয়াটা লুকাতে পারল না। জিজ্ঞেস করল, দেশে এত বড় লোক আছে নাকি?একসময় সবাই গাজীপুরে মিন্টুর বাগানবাড়ির উদ্দেশে রওনা দিল। পথে কিন্তু কবুতরের বাচ্চা কেনা হলো। বাচ্চাগুলো পালা হবে।নিখুঁত প্ল্যান করা বাগানবাড়ির জায়গায় আয়গায় নানান রঙের গন্ধের ফুল। বিভিন্ন প্রজাতির গাছ এলাকা চিহ্নিত করে লাইন ধরে লাগানো। পাছের নাম, কোন দেশের, সবকিছু লেখা আছে। শীতের পূর্বাহ্ন। নরম রোদ, রঙিন প্রজাপতি এ ফুল থেকে ও ফুলে যাচ্ছে। ছোট ছেলেমেয়েরা প্রজাপতির পিছে পিছে কৃষ্টী? পুকুর পাড়ের মাচান মাঝ পুকুর পর্যন্ত চলে গেছে। সেখানে হিপ ফেলে মাছ ধরার বাবস্থা করেছে। গাছের সারির ফাঁকে ফাঁকে এ প্রান্ত থেকে ও প্রায়ে হাঁটতে কারও প্রাপ্ত নেই।হুমায়ূন কখনো দলেবলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মুগ্ধ দৃষ্টিতে চারদিক ফ্রির জন্য এটা খুব ভালো জায়গা।দুপুরের খাবারদাবার এক আনায়োজনে কোনো ত্রুটি নেই।পড়ন্ত বিকেলে হুমায়ূন সীগানে পায়চারি করছে।মিন্টুর বিরাট ব্যবসা। হাজার রকমের ঝামেলা সবসময় লেগেই আছে। কী এক জরুরি কাজে তড়িঘড়ি করে সেদিন ওদের আগেভাগেই চলে যেতে হয়েছিল। চলে যাওয়ার আগে মিন্টু ও তার পরিবার তাদের অতিথি হুমায়ূনের কাছ থেকে ঠিকমতো বিদায় নিয়ে গেল না। এটি হুমায়ূনের নজর এড়াল না। তাদের চলে যাওয়াটা পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখল। হুমায়ূন এমনিতেই স্পর্শকাতর, কিছুটা অহঙ্কারীও বটে।একটু পরেই রওনা হয়ে গেলাম। কোনো কারণ ছাড়াই মনটা ভারী হয়ে গেল। মিন্টু পরিবার পরে কয়েকবার হুমায়ূনকে বাসায় দাওয়াত দিতে চেয়েছিল। হুমায়নের আর কখনো সে দিকে যাওয়া হয় নি।অনেক দিন পর শহীদুল্লাহ হলে বসে হুমায়ুন দুজন লোকের সঙ্গে কথা বলছে। তারা গাজীপুরের জঙ্গলে জমির খোঁজ নিয়ে এসেছে।হুমায়ূন জমি কিনবে, বাগান করবে, সেখানে লেখালেখি করবে।

পৃ্ষ্ঠা ৪৬ থেকে ৬০   

পৃষ্ঠা:৪৬

গুলতেকিন ভাবি বলল, তোমার হাতে তো কোনো টাকাপয়সা নাই। আমাদের নিজের বাড়িঘর নাই। থাকি হাউজ টিউটরের বাসাতে। জমি কিনবে কীভাবে? পরে একদিন গুলতেকিন ভাবি বলল, আপনার বন্ধুর বাগানবাড়ি দেখার পর থেকে তার নিজেরও একটি বাগানবাড়ির শখ মাথায় ঢুকে গেছে। হুমায়ূন চুপচাপ। স্বপ্ন দেখছে, তার একটি বাগানবাড়ি হবে। সেখানে লেখালেখি করবে। স্বপ্ন দেখতে দোষ কী? একজন লেখক নিজে স্বপ্ন দেখে। অন্যকে স্বপ্ন দেখায়। কিছু স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়। কিছু স্বপ্ন মনের মুকুরে ফুল ফোটায়। মহাকালের প্রবাহে বৃদধূদের মতো ক্ষণস্থায়ী একটা জীবনে অনেক স্বপ্নই অপূরণীয় থেকে যায়। You know, how little while We have to stay. And, once departed, may retum no more. মির খৈয়াম। বছর পাঁচেক পর হুমায়ূন। এক জমি কিনল। পুকুর বানাল। বন্ধুরাসহ পুকুরপাড়ে কলাগাছের বৃষ্টি লাগাল। নতুন পুকুরের ঘোলা পানিতে দলবেঁধে গোসল করল। পুকুরের উর্কেবারে মাঝখানে মাটি রেখে দেওয়া হয়েছে। সেই উঁচু জায়গায় সুন্দর একটি কুঁড়েঘর, কাঠের সাঁকো দিয়ে যুক্ত। শানবাঁধানো পুকুরঘাট। বর্ষাকালে নৌকায় চড়ে পাড়ে পৌঁছালেই কাঠের মাচানের উপর গাছের ছায়া ঢাকা বসার জয়গা। আরও কিছুদিন পর শালগাছে পিলার দিয়ে মাচানের উপর ভিত্ত বানিয়ে একটি সুন্দর ঘর বানিয়ে সাজিয়ে নিয়েছিল। কাঠের ফ্লোরে শুয়ে বসে বইপড়া আর এককোণে লেখালেখির জায়গা। হুমায়ূন জায়গাটার নাম দিল ‘নুহাশপল্লী’। হুমায়ূন একবারই এসেছিল আমাদের নিকুঞ্জের বাসায়। ২০০৯ সালের এপ্রিলের শেষদিকে। নিজের আঁকা একটি ছবি নিয়ে হাজির। কয়েক মাস হলো এ বাড়িতে উঠেছি। পরে একদিন ছবিটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে অনেক প্রশ্ন জাগল। আমি কোনো শিল্পবোদ্ধা নই।সত্তর দশকের শেষদিকে মিউনিখ থাকতে একবার তোড়জোড় করে প্যারিসের ল্যুভ মিউজিয়ামে গিয়েছিলাম ‘মোনালিসা’কে দেখতে। নিরাপত্তা প্রহরীবেষ্টিত,

পৃষ্ঠা:৪৭

কাচে-ঢাকা লিওনার্দো-দ্য-ভিঞ্চির আঁকা চিত্রকর্মটির দিকে অনেকক্ষণ ডাকিয়ে থাকলাম। কোনো কাজ হলো না। মোনালিসার হাসি অধরাই থেকে গেল। তবুও হুমায়ুনের আঁকা ছবিটির দিকে তাকিয়ে দেখলাম। নদীর কূলে বনানী, একটু যেন রুক্ষতা। পাড় থেকে বনে চলে যাওয়া একটি পায়ে চলা পথের মুখে দুটি শিশু পথের দিকে চেয়ে আছে। ওরা কি কারও অপেক্ষায় আছে? পথের শেষ কোথায়? কূলের অদূরে পানিতে ভাদা ছইবিহীন আধাভাঙা দেশি নৌকায় বসা এক রমণী। কী এক শঙ্কা নিয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে কাকে যেন খুঁজছে। দূরে-কাছে কেউ নেই। শিশু দুটিকে কে কূলে নামিয়ে দিয়েছে? কেন ওরা ওখাদে। নৌকার বৈঠাজাতীয় কিছু নেই। লাল শাড়ি পরা রমণীটি কীভাবে কূলে পৌছাবে? ছবিটি আঁকার সময় হুমায়ূনের মানসপটে কী ছিল? হুমায়ূনের দুটি শিশুসন্তান জন্মলগ্রেই মারা গেছে। ভাবছিলাম, হুমায়ূনকে একদিন জিজ্ঞেস করব।হুমায়ুনের আঁকা একটি জলরঙের ছবি আগে থেকেই বাসার দেয়ালে আছে। হুমায়ূনের জলরঙের ছবিটি নিয়েও একটি পটভূমিকা গ্রহন। বছর কয়েক আগে হুমায়ূন একদিন সকালবেলা কানে ‘দখিন হাওয়া’র বাসায় যেতে বলল। সকালবেলায় বাসায় যওয়ার জন্য জারণত বলে না। ছুটির দিন ছিল। আমার একটু ইতস্তত ভাব টের পেয়ে রামায়ন বলল, চলে আসেন, জরুরি। গিয়ে দেখি অবাক করার মতো সূচি বাসার ঘর। জুড়ে সারি সারি কাঠের সরুন্দও লম্বালম্বি টানিয়ে তার উপর ফ্রেদে সরানো চিত্রকর্ম বুলানো। তিন দিকের দেয়ালে গ্যালারিতে ছবি প্রদর্শনীর ম্যে করে স্পট লাইটের নিচে ছবি টানানো। হুমায়ূনের আঁকা ছবি। তাকে খুব উৎক্তি-দৈখাচ্ছিল। ঘরের এক কোণে রঙ, তুলি, অসমাপ্ত সব ছবি। লেখকের বাসা নয়, যেন এক চিত্রশিল্পীর বাসা। জনাকয়েক পরিচিত জন, বন্ধুবান্ধবের জন্য এ চিত্রপ্রদর্শনী। শখের প্রদর্শনী। হুমায়ূন নিজের আনন্দের জন্য লেখে, ছবি আঁকে, ছবির প্রদর্শনী করে। হুমায়ূনকে বললাম, ছবিগুলির একটি প্রদর্শনী করলে হয় না? বেঙ্গল আর্ট গ্যালারি, শিল্পকলা একাডেমী, অলিয়স ফ্রাঁসেজে ছবির প্রদর্শনী হয়। অনেক আগে ‘উন্মাদ’ ম্যাগাজিনের আহসান হাবীব তার আঁকা কার্টুন ছবির একটি প্রদর্শনী করেছিল। বাংলাদেশের মানচিত্রের আদলে আঁকা এক বৃক্ষের কাওকে কার্টুনে আঁকা দৈত্য করাত দিয়ে দুভাগ করে ফেলেছে। গাছ কেটে সবুজ বাংলাকে বিরানভূমিতে পরিণত করার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদের ভাষা।হুমায়ূন বলল, এত অল্প ছবিতে প্রদর্শনী হবে না। আরও কিছু ভালো ছবি আঁকার ইচ্ছে আছে। জলরঙের ছবিটি ওইদিন হাতে তুলে দিয়েছিল।

পৃষ্ঠা:৪৮

নিকুঞ্জের বাসায় দেয়ালে টাঙানো তার ওই ছবিটির দিকে একপলক তাকিয়ে হুমায়ুন জিজ্ঞেস করল, সঙ্গে আনা ছবিটি কোথায় টাঙানো হবে?নিকুঞ্জের বাসা থেকে হুমায়ুন গাজীপুরে এক আধুনিক ওষুধ তৈরির কারখানা দেখতে যাবে। আমাদের সঙ্গে যেতে হবে। হুমায়ূনকে ‘না’ বলা কঠিন।হুমায়ুনের সঙ্গে ছিল বগুড়া জিলা স্কুলের সহপাঠী, মেহেদি রঙে রঞ্জিত দীর্ঘশ্রুমণ্ডিত সেহেরি। আগে থেকেই পরিচিত। শ্রীলঙ্কা ভ্রমণের বইতে সেহেরি দম্পতিকে নিয়ে কত গল্পগাথা, কত রসিকতা। কিছুদিন আগে জানতে পারলাম সেহরি আমাদের ছেড়ে চিরদিনের জন্য চলে গেছে।বন্ধুদের নিয়ে হুমায়ুনের রসিকতার অন্ত নেই।অবসর প্রকাশনীর মালিক আলমগীর রহমানের অনেক রকমের শখ। দেশ- বিদেশ থেকে আনা কাঠের উপর খোদাই মুখোশ দিয়ে ঘরের দেয়াল সাজিয়েছে। নিজের রান্নার শখ। নানান পদের ইলিশ মাছ রান্নার এক বই ছাপিয়েছে।হুমায়ুন বলত, রেসিপি আলমগীরের গবেষণাগারে উদ্ভাবিত। প্যাটেন্ট করে নিয়েছে। তবে এখনো ফিন্ড ট্রায়ালে যায় নি। হুমায়ূনের খোঁচা খেয়ে অনেক যত্নে ইলিন্ ইলিশ, করে একদিন জনাকয়েক বন্ধুকে খেতে ডাকল আলমগীর। দু’একজন। মুক্তেরা উপস্থিত হাজির হয়ে গেল। আর্কিটেক্ট করিমকে নিয়ে হুমায়ুপূর্বেলত, He is a man of today, তার কাছে অতীত বলতে কিছু নেই। বুর্বমাক্ত নিয়ে তার ভাবান্তর নেই। আর ভবিষ্যৎ ধরাছোঁয়ার বাইরে। হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তার সূত্র যেমন, তেমনি করিমের অবস্থান ও জীবনের গতি একসঙ্গে নির্ধারণ করা যায় না। নব্বই দশকের প্রথমদিকে শখের বশে সিলভা মেথডে মন নিয়ন্ত্রণের ওপর একটি কোর্সে অংশ নিচ্ছিলাম। আলফা লেভেলে গিয়ে মেডিটেশানের মাধ্যমে শরীর- মন রিলাক্স করার একটি পদ্ধতি। সিলভা মেখন্ডের উদ্ভাবক আমেরিকান প্যারাসাইকোলজিস্ট হোজে সিলভার লেখা কয়েকটি বইও বাজারে আছে। ঢাকায় একবার তার বক্তৃতা শোনার সুযোগ হয়েছিল।একদিন টেলিফোন আলাপে হুমায়ূন বলল, প্রচণ্ড মাথাব্যথায় কাতর হয়ে আছি। ওষুধে কাজ হচ্ছে না।বললাম, মেডিটেশান করে এসব অবস্থায় উপকার পাওয়া যায়। মেডিটেশান কোর্সে অংশগ্রহণ করেন। একটা নতুন অভিজ্ঞতা হবে।মেডিটেশন কীভাবে টেনশন কমাতে সহায়তা করে তা ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করলাম। কিছুক্ষণ শুনে হুমায়ূন বলল, ভাই রাখেন তো ওসব। যদি কিছু মনে না করেন দু’টা প্যারাসিটামল খেয়ে ঘর অন্ধকার করে শুয়ে থাকব

পৃষ্ঠা:৪৯

এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। ভুলেই গিয়েছিলাম।‘আমার আপন আঁধার’ ১৯৯৩ সালে লেখা উপন্যাসে এবং ‘আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়াই’ ১৯৯৪ সালে আত্মজৈবনিক গ্রন্থে নামধাম পরিচয় দিয়ে নিজের মতো করে সাজিয়ে হুমায়ূন এক গল্প বানিয়ে বসল। বিজ্ঞানের ছাত্র হয়েও আমি নাকি টেলিফোনে হুমায়ূনের মাথাব্যথা সারাতে চেয়েছিলাম। কিছু নমুনা দেওয়া যাক;”আমার বড়ভাই স্থানীয় বন্ধু টিএন্ডটির মুনীর আহমেদ সাহেব… তার মতো আধুনিক মানুষ যদি বিশ্বাস। করেন-টেলিফোনে মাথাব্যথা সারানো যায় তা হলে আমাদের অশিক্ষিত মানুষজন মন্ত্র-তন্ত্রে কেন বিশ্বাস করবে না?” চেনাশোনা লোকজন, যারা বই দুটি পড়েছে, আমাকে নানান প্রশ্নে বিব্রত করে।হুমায়ূনের কাছে অনুযোগ করা বৃথা। জিজ্ঞেস করলে হাসে। বন্ধুদের বেকায়দায় ফেলে মজা করার সুযোগ হুমায়ূন ছাড়ত না। নিজে বেকায়দায় পড়লে চোখ পিট পিট করে শিশুসুলভ মুচকি হেসে অন্য প্রসঙ্গে চলে যেত। হেন কিছুই। হয় নি। পূর্ব প্রসঙ্গে আসি। ওষুধ কারখানায় এসে পৌছ ছিল। হুমায়ূনকে সাদরে গ্রহণ করল। কর্মকর্তারা আগেই তৈরি এরশাদ সাহেব অনেকগুলি ভালো হস্টেরে গেছেন। তাঁর সময়ে প্রণীত ওষুধশিল্পনীতি বাংলাদেশকে মানসম্মত। । আধুনিক মানের কারখানা বানা উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত খুব ভালো লাগল। করেছে কারখানায় দুপুরের খাবার সেরিব্দে সবাই জড়ো হয়েছে। এক তরুণী হুমায়ূনকে বলল, স্যার শুনেছি আপনি হেনোটাইজ করেন। তার খুব আগ্রহ।চুমায়ূন তরুণীটিকে উরি সামনাসামনি টেবিলের উল্টোদিকে বসে চোখ বন্ধ করতে বলল। হুমায়ুন সাজেশান দিচ্ছে, আর তরুণীটি সাজেশানের সাথে একই ছন্দে গেঁথে গেছে। সবাই অবাক।গুরুধ কারখানা থেকে হুমায়ূন সেহরিসহ আমাদের নিয়ে গেল নুহাশপল্লীতে। চার- পাঁচটি বছর পর এলাম। অনেক পরিবর্তন। গাছ-গাছালিতে সবুজের সমারোহ।ওষুধি গাছের একটি অপূর্ব বাগান। এখানে ওখানে ভাস্কর্য। হুমায়ুন পরম আগ্রহে একজন উদ্ভিদবিজ্ঞানীর মতো প্রতিটি গাছের খুঁটিনাটি বর্ণনা দিতে থাকল। কোথেকে কোন গাছ সংগ্রহ করেছে, গাছের মূল নাম কী, কোন দেশের। পরম মমতায় গাছের ভাল স্পর্শ করছে, পাতায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। তার সহজাত গল্পের ধাঁচে প্রাণবন্ত বর্ণনায় প্রতিটি গাছ যেন নিজেই কথা বলছে। গাছেরও যে প্রাণ আছে।হুমায়ুন নুহাশপল্লীর কর্মীদের কাছে গাছের যত্নের খোঁজখবর নিচ্ছে, প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে।

পৃষ্ঠা:৫০

ছোট এক গাছের পাশে শ্বেতপাথরে খোদাই করা একটি নাম। হুমায়ুন সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। শিশু রাশেদের নাম। যার নামে বাগানটি উৎসর্গকৃত। বাইরের আপাতদৃষ্টিতে কঠিন আবরণের নিচে এ মমতা লুকানো। এ যেন এক বর্ণচোরা হুমায়ূন।কিছু লতাগুল্ড থেকে পাতা ছিঁড়ে সবার হাতে হাতে দিল। গরম পানিতে চুবিয়ে চায়ের মতো পান করতে হবে। হার্বাল টি।জাল ফেলে পুকুর থেকে মাছ ধরা হলো। বড় বড় সরপুঁটি।চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম। আশপাশের গাছগুলোর মাথা আরও উঁচু। ওই যে লিচুবাগান। অনেক স্মৃতির আধার।নুহাশপল্লী পত্তনের একেবারে প্রথমদিকে একদিন দেখি, সামনের খোলা সবুজ চত্বরের পূর্বপাশে লাইন ধরে গর্তে গাছের চারা লাগানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। কে কোন গর্তে কী চারাগাছ রোপণ করবে, তার নাম লেখা।হুমায়ূন পরিবারের সবাই এবং উপস্থিত বন্ধুরা গাছ রোপণ করল, গোড়ায় পানি ঢালল। ছবি তোলা হলো। এরপর থেকে নুহাশপল্লীতেঔপ্রলেই যে যার রোপণ করা গাছের খোঁজ নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ত। ফেরার সমুর আঁড়ালে ডেকে কর্মীদের কাছে অনুরোধ করত, তার গাছটির যেন যত্নআত্তি নদী হয়।নুহাশপল্লীর দিকে রাস্তাঘাট তখন্যে। নো-তিনি। হুমায়ূনের একটি বড় নৌকা ছিল। নাম ‘জলবিলাস’। অনেকটা বজতৃত্রেই ট্রিটতা। গাড়ি থেকে নেমে নৌকায় চড়ে নুহাশপল্লীর পুকুরঘাট। কেতাবুনি পোশাকে ব্যান্ডপার্টি বাজনার তালে তালে সবাইকে নুহাশপল্লীতে স্বার্থে জানাত। সন্ধ্যায় সীমানা দেয়ালের খোপে খোপে জ্বালানো হতো হাজারো মোমবাতি। এক স্বপ্নিল পরিবেশ। তখনকার সময় গল্প ও আভজ্ঞা ছিল পুকুরঘাট এবং বড় লিচুগাছকেন্দ্রিক।পুকুরের মাঝখানে দ্বীপের মতো জায়গায় মাচানের ওপর বাঁশ কাঠের ঘর। সাঁকো ধরে আসা-যাওয়া।দিনের বেলায় ছোট্ট ছেলেমেয়েদের নিয়ে পুকুরে দলবেঁধে সাঁতার কাটতে নেমে যেত। হুমায়ূন সারা শরীরে এবং নাকেমুখে কাদামাটি লেপে পুকুরের একপাশ থেকে হঠাৎ উদয় হতো। আর হুমায়ূনকে অনুকরণ করার লোকের অভাব হতো না।লিচুবাগানটি ছিল মূলত একটি বড় লিচুগাছকেন্দ্রিক। গাছটি আগে থেকেই ছিল। পরে আরও চারাগাছ লাগানো হয়। গাছটির চারদিকে গোল করে ইট দিয়ে বাঁধানো। গাছের ডালে ঝুলানো থাকত নেটের দোলনা।আনুষ্ঠানিক খাবারের আয়োজন লিচুগাছতলায় করা হতো। স্টেইনলেস স্টিলের ক্যাটারিং তৈজসপত্রে খাবার সাজানো। হুমায়ূন নিজে তদারকি করত। খাবারের সময় সবার খোঁজখবর করা হুমায়ূনের সহজাত স্বভাব।

পৃষ্ঠা:৫১

তখন ওই জায়গা জুড়ে ছিল কাঠের খুঁটির ওপর পাটাতন বিছিয়ে কাঠের অবকাঠামোয় চারচালা ছনের ঘর। কাঠের সিড়ি বেয়ে ঘরে উঠতে হতো। চারদিকে কাঠের বারান্দা। কাঠের মেঝেতে পাটি ও মাদুর পাভানো। দরজার বেড়া ঘেঁষে কাঠের তাকে হরেক রকমের বই সাজানো। হুমায়ুনের লাইব্রেরি ও লেখালেখির জায়গা। বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবস্থাও আছে। সোলার প্যানেল বসানো। তখন নুহাশপল্লী এলাকায় বিদ্যুৎসংযোগ ছিল না।ঘরের পাশে সীমানা ঘেঁষে কাঁঠালগাছের ডালে কয়েকটি পরিপাটি ট্রি-হাউজ। হাত বাড়ালেই গাছভর্তি ঝুলন্ত কাঁঠাল। চড়ুই পাখির মতো এ গাছ থেকে ও গাছের ঘরে ছোটদের ছোটাছুটি।শীতের এক সন্ধ্যায় লিচু বাগানের পশ্চিম পাশের খোলা জায়গায় সবাই জড়ো হলো। কাঠের ঘরের সামনে সবুজ ঘাসের চতুরে গর্তের মধ্যে কয়লা পুড়িয়ে একটি আন্ত ভেড়ায় মসলা মাখিয়ে আগুনের আঁচ দিচ্ছে নাট্যাভিনেতা চ্যালেঞ্জার। তার উৎসাহের শেষ নাই। শীতের সন্ধ্যায় সবাই আগুনের ধারে গোলু হয়ে বসা। আলাপ চলছে, আগামীকালের সিলেট যাত্রার প্রোগ্রাম নিয়ে। কারা করি যাতের ট্রেনে সিলেট যাচ্ছে, তাদের তালিকা তৈরি হচ্ছে। ২০০০ সালের ২৪ সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি-বিজবিদ্যালয়ে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নামে স্থাপিত হলের নাম পাল্টা কর্মসূচির মুখে বিশ্ববিদ্যালয়। অপচেষ্টা রুখে দেওয়ার কর্মসূচি ও মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও ইয়াসমিন হক ওখানে অধ্যাপনা করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকে রবারের সবাইকে নিয়ে স্বাধীনতা দিবসে হুমায়ূন অনশন করবে। ছাত্র-শিক্ষকদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে অনশন প্রস্তুতির উপর প্রথম আলোতে তার একটি লেখা দেশজুড়ে সাড়া তুলেছে। হুমায়ুন পরিবার, ভাইবোনসহ ঢাকা থেকে সাংস্কৃতিক কর্মী, গুণীজন, সাধারণ মানুষসহ অনেকেই রাত্রের ট্রেনে সিলেট রওনা দিয়ে সকালে গণ-অনশনে যোগ দিবে। ট্রেনের একটি বণি রিজার্ভ করা হয়েছে।পরদিন রাত্রে কমলাপুর স্টেশনে সিলেটগামী ট্রেন ছাড়ার আগে খবর এল, নুহাশপল্লীর সেই কাঠের ঘরটায় কাবা যেন আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। বইপত্র সহ ঘরবাড়ি সব পুড়ে ছাই।নুহাশপল্লীর আকর্ষণীয় কাঠের বাংলোটি পুড়িয়ে দিয়েছে দুষ্কৃতকারীরা। আমন্ত্রিত বিশেষ অতিথিরা এখানে থাকতেন। পল্লীর অন্য ঘরগুলো টিন আর কাঠে নির্মিত, বেশ সাদামাটা, কিছু কিছু নষ্ট হতে চলেছে, সংস্কার প্রয়োজন। তখনো ওখানে কোনো দালান নির্মিত হয় নি। হুমায়ূন বন্ধু-স্বজন নিয়ে প্রায়ই আসে নুহাশপল্লীতে।

পৃষ্ঠা:৫২

রাতে এখানে থাকে। সাপখোপের উপদ্রব। এরকম অবস্থায় ২০০০ সালের শেষের দিকে হুমায়ুন এখানে একটি আধুনিক বাংলো নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিল। অনেকগুলো রুম থাকবে। অ্যাটাচ্ড বাথরুম থাকবে। একটা বড় খোলা বসার ঘর থাকবে। সেখানে বই থাকবে। একসঙ্গে অনেকে মেঝেতে বসে তুমুল আড্ডায় মেতে উঠবে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের জন্য জেনারেটর থাকতে হবে। বাংলোর সামনেই থাকবে একটি সুইমিংপুল। বন্ধু আর্কিটেক্ট করিমকে হুমায়ূন বলল, বাংলোর একটি নকশা করতে। নকশা চূড়ান্তও হলো। তারপর শুরু হলো এর নির্মাণ কাজ।এরই মধ্যে হুমায়ুনের জ্যেষ্ঠ কন্যা নোভার বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হলো। হুমায়ূন মনস্থ করল কন্যা আর জামাতাকে বিয়ের পরদিন নুহাশপল্লীতে রিসেপশন দেওয়া হবে। নোভাকে চমকে দিতে তার বিয়েতে পছন্দের ঔপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে দাওয়াত করল হুমায়ুন। সুনীল আসবেন বিয়েতে। নুহাশপল্লীতে কন্যা-জমাতার রিসেপশনে সুনীলসহ আরও কিছু ঘনিষ্ঠজন আমন্ত্রিত। নোভার বিয়ের আগেই নতুন এই বাংলোটির নির্মাণ কাজ শেষ করতে চায় হুমায়ূন।হুমায়ূন প্রতিনিয়ত নুহাশপল্লীতে আসা-যাওয়া করছে। আর্কিটেক্ট করিমের বিশ্রাম নেই। হুমায়ুন তাগাদা দিয়ে যাচ্ছে। গল্পগুজবে তারিখের আগে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হবে তো? কে ফাঁকে প্রশ্ন, নির্দিষ্ট আগের দিন সন্ধ্যায় হুমায়ূন পরিবাবু হাজির। প্রস্তুতির শেষপর্ব। নতুন দালানো উদিকে মাটি বিছিয়ে সমান করা হচ্ছে। ফুলের টব দিয়ে সাজানো হবে। জিন, বন্ধুবান্ধবসহ নুহাশপল্লীতে অনেকরাত হয়ে গেছে। শীে শিশির পড়ছে। এখনো দালানের সামনে এবং সিঁড়ির পাশে ছোট-বড় বৃদ্ধিওঠা বসানো হয়। নি। বড় ছোট সবাই একসঙ্গে হাত লাগাল। কিছুক্ষণ পর পরই তুমায়ূন চা। দিতে বলছে। নুড়িপাথর এদিক থেকে ওদিকে বসাচ্ছে। আনন্দ কোলাহলে গভীর রাতের নুহাশপল্লী মুখরিত।ঝরাপাতা জড়ো করে নতুন দালানের লাগোয়া জঙ্গলে আগুন জ্বালানো হয়েছে। কেউ গিয়ে হাত গরম করে আসছে আবার কেউ বলে গেছে আগুনের ধারে, আগুন পোহাবে। বাইরে শীত, নতুন দালানে নতুন বিছানা। সেদিকে কারও আকর্ষণ নেই। চারদিক কুয়াশাঢাকা। কনকনে শীত। মধ্যাকাশের চাঁদ হেলে পড়েছে। সবাই বাইরে থাকতে চায়।পরদিন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এল। নিভৃত বনানীর মধ্যমণি নুহাশপল্লীতে উষ্ণ অভ্যর্থনা পেন।পানিভর্তি টলটলে সুইমিং পুলের হালকা নীল রঙ নীলাকাশের সঙ্গে মিতালী পাতিয়েছে। সামনে নরম ঘাসে ঢাকা সবুজ খোলামেলা চত্বর, হরেক রকমের ফুলফলের গাছ, পাখির কলকাকলি, অদূরে শানবাধানো পুকুরঘাটে বাঁধা নৌকা।শীতের মিষ্টি রৌদ্রালোকে লিচু বাগানে খাবারের আয়োজন। বিভিন্ন স্বাদ ও শুদের বাংলাদেশি খাবার। তৈজসপত্র সব নতুন কেনা হয়েছে। লিচুবাগানের

পৃষ্ঠা:৫৩

রোদছায়ায় ঝলমল করছে। হুমায়ুন কোনো কিছুতেই খুঁত রাখতে চায় না। নিজেই তদারকি করছে।এই লিচুবাগানে হুমায়ূন বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করত। পড়ন্ত বিকেলে বড় লিচুগাছের নিচে সবাই জড়ো হতো। গল্প আডডার ফাঁকে ফাঁকে চা-নাস্তা।সহজ-সরল হুমায়ূন এখানেও খোলামেলা। কখনো প্যান্ট কখনো লুঙ্গি পরা, পায়ে স্যান্ডেল। কোনো সময় খালি গায়ে। কখনো সামনের দিকে একটু ঝুঁকে হাঁটছে।লিচুগাছের ডালে দোলনা বাঁধা। কেউ গাছে চড়ে কাঁচাপাকা লিচু পেড়ে নিচ্ছে। ছোটরা ব্যাডমিন্টন খেলছে। আর একটু বড়রা ক্রিকেট ব্যাট হাতে বল ছোড়াছুড়ি করছে, ঘোড়ার পিঠে চড়ার কসরত করছে।হুমায়ূনের আয়োজন থাকত সব বয়সী এবং সবার জন্য।এপ্রিল, ২০০৯। হুমায়ূনের সাথে সেবার শেষবারের মতো নুহাশপল্লীতে যাওয়া হয়েছিল। ওষুধি বাগান থেকে হুমায়ূন সবাইকে নিয়ে পুকুরঘাটে গিয়ে বসল। একজন কর্মী চা নিয়ে এল। সূর্য গাছের আড়ালে চলে-বিচ্যুৎ। গাছের লম্বা লম্বা ছায়া পানিতে। ছোট ছোট ঢেউয়ের সাথে ছায়া কাঁপছে। বাসজাতীয় এক ঝাঁক পাখি দূরদিগন্তে উড়ে যাচ্ছে। ঝোপজঙ্গলে পাখির কিচিরমিচির শব্দ।নুহাশপল্লীর ইমাম মাগরেবের আজাবন্তী হুমায়ূন বলল, চলেন নামাজ আল্লাহপাক বলেছেন, এ সময়ে রোমিও হবে। মাগরেবের নামাজের বিশেষ ফজিলত।লিচুবাগানের ধারে সুম সুমকে ভয়গায় কিছু অংশ পাকা করা হয়েছে। নামাজের জায়ণা। প্রতি ওধূক্তে নামাজের আগে আজান দেওয়া হয়।ধানমণ্ডির বাড়ির দোতলায়ও নির্জন কোণে নানান রঙের পাথর বসিয়ে হুমায়ুন একটি সুন্দর নামাজঘর বানিয়েছিল। সে অনেক বছর আগে।হুমায়ূন কোরানশরিফের বাংলা এবং একাধিক ইংরেজি তর্জমা ভালোভাবে নিজের আয়ত্তে এনেছিল। কোরানের কোনো আয়াতের অর্থ যুক্তিসহকারে ব্যাখ্যা করত। কোরানশরিফ থেকে উদ্ধৃতি লেখালেখিতে যথাযথভাবে প্রয়োগ করার ক্ষমতা রাখত। বাংলা এবং ইংরেজি তরজমাসহ হুমায়ূনের কাছে কয়েকটি কোরানশরিফ ছিল। আরও ছিল বিভিন্ন বর্মের মূল বই এবং ব্যাখ্যামূলক রচনাসমগ্র। বলত, তরভামা দিয়ে কোরান পড়া দুধের সাধ ঘোলে মেটানোর মতো। প্রতিটি শব্দ ও বাক্যের অন্তর্নিহিত ভাব বুঝতে, মর্মার্থ হৃদয়ঙ্গম করতে মূল আরবি ভাষা জানার বিকল্প নাই।সন্ধ্যা নেমে এল। ফেরার পালা। হুমায়ূন সুইমিংপুলের সামনে দাড়িয়ে বিদায় জানাল। নিজে থেকে গেল লেখালেখি করবে বলে। কদল, এদিকে আসা তো ছেড়েই দিয়েছেন। আজ জোর করে নিয়ে এলাম। আবার আসবেন।

পৃষ্ঠা:৫৪

হ্যাঁ, পরে একদিন গিয়েছিলাম। যেদিন হুমায়ূনকে নুহাশপল্লীতে চিরশয়ানে শায়িত করা হয়। হুমায়ূন সিঙ্গাপুর থেকে ফিরেছে। সংবাদ পেয়ে বাসায় গেলাম। হুমায়ূন লেখার টেবিলে উপুড় হয়ে লিখছে। কেমন আছেন? জবাবে মাথা তুলে সরাসরি বলল, ভালো নাই, ক্যানসার হয়েছে। শূন্যদৃষ্টিতে হুমায়ূনের মুখের দিকে তাকালাম। হুমায়ূন লেখার টেবিল থেকে উঠে অপেক্ষারত বন্ধুদের সঙ্গে বসল।ডাঃ করিম বলল, ঘটনা সত্য। কোলন ক্যানসার লিভারেও ছড়িয়েছে। ফোর্থ স্টেজ। চিকিৎসার জন্য আমেরিকা যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে।কিছুক্ষণের মধ্যে বুঝতে পারলাম, এ দুঃসংবাদটি অনেকেই জানে।হুমায়ুন বরাবরের মতো আসরের মধ্যমণি হয়ে গল্প জুড়ে দিল। মেয়েরা দেখতে এসেছে। কার ভাবসাব কেমন এসব স্বভাবসুলভ প্রেমিজ্ঞতায় বলে গেলেও ওরা এসেছে এটাই যেন বড় কথা। কিন্তু উপস্থিত বৃন্ধুজনরা এসব হালকা কথাও যেন আজ নিতে পারছে না। এক অব্যক্ত আশঙ্কায় সুরাই দ্রিয়মান।দিনকয়েক পরের এক সন্ধ্যা। এমন রাতে নিউইয়র্ক রওনা হবে। শুভাকাঙ্ক্ষীরা একে একে আসছে। দোই ঔীর শুভকামনা করছে। সবার সাথে ঘুমায়ুন যেন একাত্ম হয়ে গিয়েছে। যাএাট প্রস্তুতির ব্যাপারে আপনজনদের তাড়াকেও আমল দিচ্ছে না। এ আসরক্যানসার থেকে নিরাময় হবে, এ ব্যাপারে হুমায়ূন দারুণ আত্মবিশ্বাসী। বেঁচে থাকার আনন্দ ও লেখালেখির আনন্দ তাকে বাঁচিয়ে রাখবে।স্যুটকেস গোছানোর কথা উঠতে বলল, কাগজ আর কলমগুলো যেন আলাদাভাবে গুছিয়ে দেওয়া হয়।কয়েকদিন পর জানা গেল হুমায়ূন নিউইয়র্কে মেমোরিয়াল স্নোন ক্যাটারিং ক্যানসার সেন্টারে কেমোথেরাপি নেওয়া শুরু করেছে।একদিন নিউইয়র্কে টেলিফোনে কথা বলার ফাঁকে হুমায়ূনকে একটি বই পড়তে বলেছিলাম। তখন বইটির নামও লিখে নিয়েছিল। ২০১১ সালের পুলিৎজার পুরস্কার পাওয়া বই। The Empheror of all Maladies: A Biography of Cancer. ক্যানসার রোগের ওপর সাধারণ পাঠকের জন্য এক অসাধারণ গবেষণাধর্মী বই।খ্রিষ্টপূর্ব পাঁচ হাজার বছর আগে পারস্যের রাজকন্যা আত্তোশা তার গ্রীক ক্রীতদাসকে দিয়ে ক্যানসার আক্রান্ত গুন অপসারণ করিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপের রণাঙ্গনে মিত্রবাহিনীর সৈন্যদের ওপর হিটলার মাস্টার্ড গ্যাসের

পৃষ্ঠা:৫৫

বোমা ফেলেছিল। হলুদ রঙের এই গ্যাস নিঃশ্বাসের সঙ্গে মানবদেহে ঢুকে কোষকে খধ্বংস করে সৈনিকদের দ্রুত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। এই ধারণা থেকে ক্যানসার সেল কীভাবে ধ্বংস করা যায় তার ওপর চলে গবেষণা। ফলে কেমোথেরাপির আবির্ভাব। নিউইয়র্ক এবং বোস্টনের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্যানসার গবেষণার অগ্রদূত। মেমোরিয়াল স্নোন ক্যাটারিং ক্যানসার সেন্টার সবচেয়ে এগিয়ে আছে। হুমায়ূন এখানেই কেমোথেরাপি নিয়েছে।মানবদেহে কোষবিভাজনের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট প্রোগ্রাম অনুযায়ী কোষের বৃদ্ধি ঘটে এবং মরে যায়। মানুষ যৌবন থেকে বার্ধক্যের দিকে ধাবিত হয়। এক হিসাবে ১২০ বছরের কাছাকাছি সময়ে মানবদেহে কোষ বৃদ্ধির চেয়ে কোষ ধ্বংস হওয়ার হার দ্রুতভাবে বেড়ে যায়। ফলে মানুষের আয়ু মোটামুটি এক শ’ বিশ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ।প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ ওয়্যার ভেটার্ন ব্রিটিশ নাগরিক ফ্লোরেন্স গ্রীন মারা যায় ২০১২ সালে এক শ’ দশ বছর বয়সে। শেষ ভেটার্ন সৈনিক অস্ট্রেলিয়ার রুতে শোলসও মারা যায় এক শ’ দশ বছর বয়সে, ২০১১ সমূল।এ লেখার সময় বিশ্বের বেঁচে থাকা প্রবীণতম বুকি আপানের। ১১৫ বছর বরক্ষ পুরুষ জিরোয়েমন কিছুরা। সম্প্রতি হাসপাতাল স্ট্রোক ফেরা আমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিলারী ক্লিনটন এক শ’ বিশ বছর বেঁচে করেবে বলে তার স্বামী বিল ক্লিনটন আশীর্বাদ বাণী ব্যক্ত করেছে। হিলারীকে কারও দুটি স্বামী নেওয়ার আশার। বাণীওশুনিয়েছে আমেরিকার এ রোমান্টিক অর্ধেক প্রেসিডেন্ট। কোষবিভাজন নিম্নেণ করে মানবদেহের একটি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। অনিয়ন্ত্রিত বিভাজন থেকে ক্যানসারের এইৎপত্তি যা যে-কোনো বয়সে হতে পারে।বিজ্ঞানীরা মানবদেহের জিন-নকশার অজানা দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এই জিন হলো ডিএনএর অংশ। এ জিনের ত্রুটির কারণেই ক্যানসার। ক্যানসার সেল মানবদেহের স্বাভাবিক কোষ বিভাজন প্রোগ্রাম অনুযায়ী মরে না; বরং বাড়তে থাকে, বিভাজিত হতে থাকে। ফলে ক্যানসার আক্রান্ত টিউমার সৃষ্টি হয় যার বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের বহিরে চলে যায়।শেষবারের মতো আমেরিকা থেকে আসার সময় হুমায়ূন অনেক বই নিয়ে এসেছিল। সামনে উপস্থিত ‘অন্যপ্রকাশে’র কমলকে বলল, নুহাশপল্লী থেকে বইগুলো ‘দখিন হাওয়া’র ফ্ল্যাটে নিয়ে আসতে। আমার পছন্দের বইগুলি পড়তে দিতে।বললাম, আপনার অনুপস্থিতিতে কোনো বই নেব না। সুস্থ হয়ে ফিরে আসেন, তখন নেব।হুমায়ূন একটু মনঃক্ষুন্ন হয়ে বলল, আমি তো কোনো অসুবিধা দেখছি না।

পৃষ্ঠা:৫৬

একসময় হুমায়ুন জিজ্ঞেস করল, ক্যানসারের উপর লেখা বইটি আমার কাছে আছে কি না। বইটি নিউইয়র্কে কেনা হয় নি। যাওয়ার আগে নিয়ে আসতে বলল। একটু পরে বারান্দার কোণে লেখার টেবিলের দিকে ডেকে নিয়ে একটি মোটা বুক বাইন্ডিং হাতে তুলে দিয়ে হুমায়ূন বলল, কাল নুহাশপল্লী যাচ্ছি। এত বড় বই পড়ার সময় আমার নাই। আইন মন্ত্রণালয় থেকে দিয়ে গেছে। মামলার রায়ের বই।কয়েকটি প্রসঙ্গ টেনে এনে বলল, অমুক বিষয়গুলি কোন কোন জায়গায় আছে দেখেন।পাতা উল্টিয়ে চোখ বুলাতে বুলাতে আমি বইটির কয়েকটি পাতা মুড়িয়ে রাখলাম। হুমায়ুনকে বললাম, মুড়ানো পাতার অংশগুলো দেখে নেবেন। ‘দেয়াল’ উপন্যাসের পত্রিকায় প্রকাশিত অংশগুলি আমার সেভাবে পড়া হয় নি। মিল-অমিল বিষয়ে কিছু বলতে পারছি না।হুমায়ূন বলল, মিল-অমিলের কি আছে? আমি তো উপন্যাস লিখছি। ইতিহাস লিখছি না। বাদশাহ নামদার ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস হলেও বর্ণিত অনেক বিষয় পুরোপুরি ইতিহাসভিত্তিক নয়। উপন্যাসের প্রয়োজনে অনেক কিছুই এসেছে। এ নিয়ে তো কোনো প্রশ্ন ওঠে নাই। ঔপন্যাসিক গল্প ইতিহাস নয়।হুমায়ূনের মধ্যে একটু অস্থিরতার তাব। পরিকেল হালকা করার জন্য বললাম, অন্তত বাদশাহ নামদার উপন্যাসের শেষ অংশে অরুভূমির জোছনা রাতে হুমায়ূনপত্নী হামিদা বানু আর বাদশাহ হুমায়ূনের হাতুনেরধিরির দৃশ্য অবশ্যই ইতিহাসভিত্তিক নাবিকতটা তো আপনার শেখালেরিনারিধারা। আপনার উপন্যাসের নায়ক- হাত করে বৃত্তিংক উঠছে। জোছনা দেখে, আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে পাশাপাশিহুমায়ূনের ভাবান্তর নেউবরং একটু গম্ভীর হয়ে বলল, দেখেন মীর মশাররফ হোসেনের বিষাদসিন্ধু ইতিহাস আশ্রিত হলেও চরিত্র রূপায়ণে ইতিহাসের চেয়ে লেখকের আবেগ ও চিন্তা-চেতনাই বড় হয়ে উঠেছে। তবু বললাম, আপনার উপন্যাসের বিষয়টি হলো অতি সাম্প্রতিক কালের ঘটনার প্রেক্ষাপটে। এখানে কল্পনার পরিধি সীমাবদ্ধ। বাস্তবতার দলিল তো সামনেই আছে।হুমায়ূনের পাল্টা প্রশ্ন, এখন থেকে এক শ’ বছর পর যদি দেয়াল উপন্যাসটি লেখা হতো এসব নিয়ে তেমন কেউ মাথা ঘামাত। জোছনা ও জননীর গল্পের পূর্বকথায় নিজের অবস্থানকে হুমায়ূন একই ধারায় তুলে ধরেছে।শেষবারের মতো নিউইয়র্ক যাত্রার আগের দিন বিকেলে ক্যানসারের উপর লেখা বইটি নিয়ে ধানমণ্ডির ‘দখিন হাওয়া’র ফ্ল্যাটে গেলাম। কেউ বাসায় নেই। পল্লবীতে ফোন করে জানলাম, ওরা সবাই গুলশান চলে গেছে। সেখান থেকে পরদিন রওনা হয়ে যাবে। হুমায়ূনের জীবনে আর কখনো ‘দখিন হাওয়া’য় আসা হয় নি।

পৃষ্ঠা:৫৭

পল্লবী থেকে ফোন নম্বর নিয়ে গুলশানে ফোন করলাম। অন্য প্রান্তে শাওন। বলল, চাচা চলে আসেন। ঠিকানা দিল। বুয়েটের পূর্বসূরি মোহাম্মদ আলীর বাসা। স্ত্রী তহুরা আলী। দু’জনই পূর্বপরিচিত এবং বরাবরই আন্তরিক। বেশ কয়েক বছর আগে ‘দখিন হাওয়া’র ফ্ল্যাটে বসে একটি বোর্ডের ওপর সরু কাঠি আঠায় জোড়া লাগিয়ে শাওনকে একটি ঘরের ডিজাইন করতে দেখেছি। স্থাপত্যকলার এই ছাত্রীটির ওই ডিজাইনে ‘শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠ’ স্কুলটি নির্মিত হয়।সন্ধ্যার আগে আগে গুলশানের বাসায় গেলাম। বাসায় শোবার ঘরে খাটের পাশে ফ্লোরের ওপর বিছানো ভাজিমে হুমায়ূন বসে আছে। একজন থেরাপিস্ট পা ম্যাসেজ করে দিচ্ছে। হুমায়ূন বলল, পায়ের আঙুলগুলো শক্ত হয়ে যায়। তার শরীর-স্বাস্থ্যের দিকে তাকিয়ে শারীরিক অবস্থা জানার কোনো প্রশ্ন করতে বিব্রতবোধ করছিলাম। হুমায়ুন নিজেই বলল, কেমো শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে একেবারেই দুর্বল করে ফেলেছে। বড় কষ্ট। আমার প্রার্থনা, কোনো শত্রুরও যেন এ রোগ না হয়। একটু পরে সাথে আনা বইটা হাতে নিলাম। উল্টাতে উল্টাতে হুমায়ূন বলল, দীর্ঘ প্লেন যারা, সময় কাটবে। বলার মতো কোনো কথা খুঁজে পাচি হুমায়ূন বলল, থেকে যান। একসঙ্গে। না। উঠতে যাচ্ছিলাম, বিদায় নেব। বাদাওয়া করা যাবে। থেরাপিস্ট চলে গেল। হুম্যুর ঔকটু নড়েচড়ে বসল। এর মধ্যে পাখিবিশারদ এক অদ্রলোক এল। হুমায়ূন হাতে পাখেন পাথে নানান জাতের পাখি নিয়ে গল্প জুড়ে দিল। শুমোট পরিবেশটা যেন এক্টটু হালকা হয়ে উঠল।। শুভেচ্ছা জানিয়ে চলে গেল। । আরও কয়েকজন দেখা করে,এ কথা সে কথার ফাঁকে হুমায়ূন হাসতে হাসতে বলল, আম্মার কান্ড দেখেছেন। আমার কাছে বড় একটি টাকার পুঁটলি পাঠিয়ে দিয়েছেন। এত টাকা কোথায় পেয়েছেন, বৌজ নিতে গিয়ে জানতে পারলাম, আম্মা নানার দেশের বাড়িতে গিয়ে ভাইদের ধরে বললেন, আমার বড় বিপদ। পাওনা সম্পত্তি বিক্রি করে টাকা দিতে হবে।হুমায়ূন জিজ্ঞেস করল, সব টাকাপয়সা এভাবে দিয়ে দিচ্ছেন। আপনার বিপদে আপদে টাকা পাবেন কোথায়?জবাবে বললেন, আমার এর থেকে বড় বিপদ আর কী হবে? আর কিছু হলে তো তোরা দেখবি।সাফ জবাব। ছেলেদের কাছ থেকে বিভিন্ন উপলক্ষে পাওয়া টাকা মা আয়েশা ফয়েজ জমিয়ে রাখেন আর প্রয়োজন আছে এমন সব আত্মীয়স্বজনকে উপহার হিসেবে বিলিয়ে দেন।

পৃষ্ঠা:৫৮

চিকিৎসার জন্য প্রথম দফায় আমেরিকা যাওয়ার আগে সকল জমানো টাকাপয়সা হুমায়ূনকে দিয়ে দেন। জীবনের সংকটময় মুহূর্তে, হুমায়ুনের ক্যানসারের অসুখ মেনে নিতে পারছেন না। তখন তাঁকে প্রায়ই বলতে শুনি, আমার একদিন বেঁচে থাকার দরকার কী। নিজের কাছে নিজের প্রশ্নের উত্তর খোঁজেন, এক দোয়া দরূদ উপরে কি পৌঁছবে না?এ যেন লেখক হুমায়ূন আহমেদের বাদশাহ নামদার উপন্যাসের বাবর-হুমায়ূন আখ্যান। খেয়ালি রাজপুত্র হুমায়ূনের সকল ন্যায়-অন্যায় আবদারেও সদা ক্ষমাশীল মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাদশা বাবর নিজের জীবনের বিনিময়ে হুমায়ূনের জীবন ভিক্ষায় মগ্ন।শেষবারের মতো নিউইয়র্কে যাওয়ার আগের দিন গুলশানের বাসায় রাতের খাবার মুমায়ূন সবার সঙ্গে টেবিলে খেল। তার পছন্দের সব খাবার। ডেকে পাশে বসাল। হালকা মেজাজে, সবার সাথে গল্প আলাপে খাওয়া শেষ করল।হুমায়ুন খাবার টেবিল থেকে উঠে এল। বিশ্রাম দরকার। জাজিমের উপর একটু কাত হয়ে শোয়া। দু’হাঁটু মোড়ানো।শুভাকাঙ্ক্ষীরা যারা এতক্ষণ ছিল একে একে বললাম, হুমায়ূন যাই। । একসময় কাত হয়ে শোয়া অবস্থায়ই বলল, একটু থমকে এগিয়ে গিয়ে মাথার কর্তৃতি জাজিমের উপর বসলাম। চুপচাপ। কী বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না। খালাম্মাতৃর কখন দেখা হবে, জানতে চাইলাম।আগামীকাল দুপুরে আসবেল।  কপালে হাত রেখে বন্ধু  প্রতীভালো হয়ে আসেন। আবার দেখা হবে।গলার স্বর ভারী, হুমায়ুন লক্ষ করল কি না জানি না। মুখে শুধু বলল, রাত হয়ে গেছে, যান।এক অজানা আশঙ্কায় মনটা ভারী হয়ে গেল। আজ হুমায়ূন বিদায় চাইল কেন? ব্যাপারটা নাটকীয়। মনে পড়ল, এক দশক আগে বারডেমের সিসিইউতে হুমায়ূন আমাকে ঘুমন্ত অবস্থায় বিদায় জানিয়েছিল।পরদিন হুমায়ূন নিউইয়র্ক চলে গেল। ২রা জুন, ২০১২।কয়েকদিন পর খবর নিয়ে জানা গেল অপারেশনের পর হুমায়ুন বাসায় ফিরেছে। মনে কিছুটা স্বস্তি এল। কিছুদিনের জন্য দেশের বাইরে গেছি। সেখান থেকেই জানতে পারলাম, হুমায়ূন আবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, দ্বিতীয়বার অপারেশন হয়েছে।দেশে ফিরে ১৮ জুলাই পল্লবীতে ফোন করলাম। খালাম্মা বললেন, ইকবাল ও ইয়াসমিন ওখানে আছে। টেলিফোনে কথাবার্তা হয়। কিন্তু বাবা, আমি বড় পেরেশানিতে আছি। তুমি চেষ্টা করো জানতে হুমায়ূনের অবস্থা কেমন। আমাকে জানাবা।

পৃষ্ঠা:৫৯

জানতাম, যারা ফোন করে সবাইকে খালাম্মা একই কথা বলেন। নিউইয়র্কে জাফর ইকবালের সঙ্গে কথা বলে খালাম্বাকে জানালাম। খালাম্বা বললেন, একই কথা সবার কাছে গুনছি। ভালো কিছু শুনছি না। এতদিন হাসপাতালে পড়ে আছে কেন? আমার মন কিছুতেই মানছে না। কান্নায় ভেঙে পড়লেন।উনিশে জুলাই সন্ধ্যার পর জাফর ইকবালকে ফোনে পেলাম, নিউইয়র্কে তখন সকাল। জানাল, মাত্র কিছুক্ষণ আগে আইসিইউতে দাদাভাইকে দেখে এসেছে। ডাক্তার আসছে। ফুসফুসের অসুবিধাটা দেখবে।ওরা ডাক্তার আসার অপেক্ষায় আছে। পরে ফোন করতে বলল।কেউ কিছু পরিষ্কার করে বলছে না, অথবা কী বলবে বুঝতে পারছে না। ক্যানসারের অপারেশন হয়েছে কোলনে, শ্বাসকষ্ট কেন। দ্বিতীয়বার অপারেশন কেন। অপারেশনের পরপরই ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে কেন? এতদিনই বা কেন?তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ কেমোথেরাপি নিয়েছে দুনিয়াখ্যাত মেমোরিয়াল প্রোন করটারিং ক্যানসার সেন্টারে। ঝুঁকিপূর্ণ জটিল অপারেশনের জন্য হুমায়ূন বেলভিউ হাসপাতালে কেন? প্রশ্নের পর প্রশ্ন মনে জাগে।রাতের শোবার ঘরে আলো নিভানো। দরজা বন্ধ বাইরে থেকে দরজায় জোরে জোরে NCOM আনুমানিক সাড়ে এগারোটা। । আর্তকণ্ঠে চিৎকার    সবাই জড়ো হলো।করছে, হুমায়ূন আহমেদ মারা গেছেন, তাফসির বলছে, হুমায়ূন চন ওর আক্ষেপ, এত ভাইর ডিশন খোনো। করছে আদিবা তাঁরা গেলেন। এখন কার বই পড়ব। চলে গেলেন কেন। ? কত লোক আশি-নব্বই বছর বাঁচে। আরও দশ বছর বেঁচে থাকলে অনেক বই লিখতেন। অনেক বিষয়ে খোলামেলা লিখতে শুরু করেছিলেন। লেখালেখির বিষয় নিয়ে তাঁকে সহজে কেউ ঘাঁটাত না। ৩ বলেই যাচ্ছে, আমার মনটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। মিরপুর স্টেডিয়ামে পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশ দুই রানে হেরে যাওয়ার পর কয়েকদিন এমন হয়েছিল। সংবাদমাধ্যমগুলো রাতের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে দিয়েছে। এক পলকের জন্যও আমি টেলিভিশনের দিকে তাকালাম না। হুমায়ুন আহমেদ সবার। কেমন যেন এক ঘোরের মধ্যে রাত কেটে গেল।সকালের সংবাদপত্রের পাতায় পাতায় স্বজন হারানোর মর্মস্পর্শী প্রতিবেদন। দেশ বিদেশে বাংলা ভাষাভাষীদের হুমায়ূন আহমেদ আর নেই।সকালে পল্লবীর বাসায় গেলাম। সেই মা আয়েশা ফয়েজ। সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় ঢাকায় এসে সেলাই মেশিন হাতে নিয়ে ছেলেমেয়েদের বলেছিলেন, তোরা লেখাপড়া চালিয়ে যা। আমি আছি। জীবনসংগ্রামে, সংসারের সকল ঝড়কড়ায় সর্বদা অঞ্চল-অটল।

পৃষ্ঠা:৬০

হুমায়ূনের আশ্রয় নিউইয়র্ক থেকে ফেরার আগে বলেছিল, দেশে যাব মাকে দেখার জন্য।একাত্তরের সেই দুঃস্বপ্নের রাতে স্বামীহারা মা আয়েশা ফয়েজ চল্লিশ বছর পর সন্তানহারা হয়ে আবারও একটি ধাক্কা খেলেন। এ যেন টাইটানিকের আইসবার্গে ধাক্কা খাওয়ার পরবর্তী করুণ দৃশ্য।নীরব চোখাচোখি হতেই প্রশ্ন করলেন, বাবা, এত দোয়া-দরুদ কি উপরে পৌঁছে নাই?কফিনবন্দি হয়ে হুমায়ূন দেশে ফিরে আসছে। এই প্রথম দেখলাম একটি মৃত্যু কীভাবে একটি জাতিকে একমুখী করে ফেলেছে। সবাই আজ স্বজনহারা। সুখ এবং আনন্দের ভাগীদার সবাই। কিন্তু দুঃখ ও বেদনাকেও সমভাগে ভাগ করে নেওয়ার একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হলো হুমায়ূনের মৃত্যু। মৃত্যু হুমায়ূনকে মহান একটি উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। এ তো মৃত্যু নয়। হুমায়ূন কোথায় যেন লিখেছিল ‘লেখকের মৃত্যু নাই’। অন্য একজন লেখকের ভাষায়, মৃত্যুর পর একজন লেখক বই হয়ে যায়।হুমায়ূনের কফিনবন্দি লাশ শহীদ মিনারে আনা যুগে। সর্বস্তরের মানুষের ঢল। এত ভালোবাসা। এত ফুল। । এ নিভৃতচারী মানুষরিত স্টুষের। নুষের হৃদয়ে নিভৃতেই। একাত্ম হয়ে গিয়েছিল। শর্তহীন এ ভালোবাসা। সবার একটা আজ ফাঁকা ফাঁকা। দেশটাও ফাঁকা ফাঁকা। শহীদ মিনার ও জাতীয় ঈদ হয়ে মনটা একটু হালকা হলো। শুচ্ছি সমব্যথায় ব্যাথিত বহুজনের একজন জাতীয় ঈদগাহে জানাজা শের বারডেমের হিমঘরে আনা হয়েছে। কবরের জায়গা এখনো ঠিক হয় নিজেএনিয়ে টানাপোড়েন চলছে। স্বল্পপরিসর জায়গায় অপেক্ষারত আগে হুমায়ূনকে একনজর দেখবে। ভাইবোন, মেয়ে এবং স্বজনেরা। হিমঘরে ঢুকানোর AMARBOI হুমায়ূনের মুখের ওপর থেকে কাফনের কাপড় সরানো হলো। সাদা কাফনে ঢাকা হুমায়ূনের মুখমণ্ডল একটু নীলাভ। যেন প্রশান্তিতে ঘুমিয়ে আছে। মা আয়েশা ফয়েজ হুমায়ূনের গালে গাল রেখে মর্মভেদী কান্নায় ভেঙে পড়লেন। অন্যদের চাপা কান্নায় বাতাস ভারী। হিমঘরের মতোই হিমশীতল পরিবেশ।কবরের জায়গা নিয়ে সারা রাত অনেক জল্পনা-কল্পনা ও টানাপোড়েন হলো। হুমায়ূনকে শেষপর্যন্ত নুহাশপল্লীতেই কবর দেওয়া হবে। মা আয়েশা ফয়েজের ইচ্ছার কোনো মূল্যায়ন করা হলো না। যারা সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় প্রভাবিত করেছে তারা কিন্তু ঘাড়ে নিয়ে দিল বিশাল এক দায়িত্ব, ভবিষ্যতের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা।এ বিষয়ে আর বিতর্কের সুযোগ নাই। যার বেঁচে আছে, কালের অমোঘ নিয়মে একদিন তারা থাকবে না। প্রজন্মের পর প্রজনকে অতিক্রম করে দেশ ও সাহিত্যজগতের পরম সম্পদ হুমায়ূন আহমেদ তার সৃষ্টির মাধ্যমে চিরঞ্জীব হয়ে থাকবে।

পৃ্ষ্ঠা ৬১ নথেকে ৭৫

পৃষ্ঠা:৬১

মৃত্যু মেয়েদের সঙ্গে হুমায়ূনের শীতল সম্পর্কের পাহাড়সমান বরফকে গলিয়ে দিয়েছে। গভীর রাতে তারা ছুটে গিয়েছে দাদু আয়েশা ফয়েজের কাছে। কবরের জায়গা ঠিক করা নিয়ে বৃহত্তর পরিবারের সদস্যদের টানাপড়েনে তারা উপায়ান্তর না দেখে মত দিয়েছে যেখানে হোক কবরের ব্যবস্থা করতে। হিমঘরে রেখে তাদের বাবাকে কষ্ট না দিতে। দাফনের জায়গাটা নিশ্চিত হওয়ার পরও নিজের মধ্যে এলোমেলো ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে। কবরস্থান বরাবরই আমাকে কাছে টানে। চলার পথে কবরস্থান দেখলেই মাথা বাড়িয়ে তাকাই। কাছে গেলে এপিটাফের লেখাগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়ি। কোনো কোনো কবরস্থানে সমাহিতদের অনেকের সঙ্গে জীবন ও অস্তিত্ব মিশে আছে। চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার ওয়ার সেমিট্রি আমার প্রিয় জায়গা। কত দেশের কত বর্ণের, ধর্মের মানুষের স্মৃতি। মৃত্যু সবাইকে এককাতারে এনে দিয়েছে। এরা কোন মায়ের সন্তান। বিদেশিনী মা কি জীবনে জেনেছে তার প্রিয় সন্তান এখানে? সত্তর দশকের শেষের দিকে দেশ থেকে ছোটবোনের মৃত্যুর সংবাদে মিউনিখের ইংলিশ গার্ডেনের অদূরে এক কবরস্থানে ঘন্টার পর ঘণ্টইস্তিকা বসে থাকতাম। মৃতের আপনজনেরা আসত। ছোটবড় সবাই। নত মস্ত্যা করবে শ্রদ্ধা জানাত, ফুল দিয়ে যেত। মাঝে মধ্যে একগুচ্ছ ফুল নিয়ে যেতামু কে একটি কবরে একটি করে ফুল দিতাম। মন একটু হালকা হতো। সরকারি কাজ উপলক্ষে জেলে গিয়ে চার্লি চ্যাপলিনের কবর দেখতে গিয়েছিলাম, বছর কয়েক আগে। করইজানি অনেকগুলো কবরের সারিতে একটি কবর। দূর থেকে মনে হলো সদ্য অনাড়ম্বর কবরে ছোট ছোট ফুলগাছ এমনভা দিয়ে গেছে। একেবারে কাছে গিয়ে দেখলাম গাছ এমনভাবে লাগানো হয়েছে যেন পুরো কবরটাই নানা রঙের ফুলে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। অদূরে আরেকটি কবরে ছোট-বড় সবাই ফুল দিচ্ছে। চারদিকে কত কবর। কবরের সবাই অচেনা, তবুও যেন কত কাছের। মদিনার জান্নাতুল বাকীতে চৌদ্দশত বছর যাবৎ দিবারাত্রি লাখো মানুষ দু’হাত তুলছে। হে কবরবাসীগণ তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক…। শত শত বছর ধরে কতজনের স্মৃতিমাখা এ মাটির ধুলাবালু। কত দেশের কতবর্ণের মানুষ এখানে শায়িত আছে। জীবিতরা প্রতিনিয়ত তাদের জন্য প্রার্থনা করে।কবরস্থানে কে কাকে উপলক্ষ করে আসে তা বড় কথা নয়, প্রার্থনা সবার জন্যই করে। কবর কবরস্থানে হবে। নিত্যদিন সোকজন আসবে। শুধু জন্মদিন-মৃত্যুদ্দিন উপলক্ষ করে নয়। হুমায়ূদের কবর মসজিদের আঙিনায় কবি নজরুল বা হাছন রাজার কবরের মতো হবে না কেন?নিজের একরাশ প্রশ্নে নিজেই বিদ্ধ হই। এখন যারা বেঁচে আছে হুমায়ুনের অনেক কাছের, তারা চিরদিন থাকবে না। কবরের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা তখন কেমন

পৃষ্ঠা:৬২

হবে। বৃহত্তর পরিবারের অংশগুলোর মধ্যে টানাপোড়েনে নুহাশপল্লী এবং কবর ভবিষ্যতে অব্যবস্থাপনার শিকার হবে না? কে দায়িত্ব নেবে?নুহাশপল্লীর এমন কোনো আয় নাই। সিংহভাগ খরচ হুমায়ূন নিজেই বহন করত, লেখালেখি করে। হুমায়ূনের ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততা ও তার লেখালেখির কারণেই নুহাশপল্লীর জমির মূল্যের তুলনায় শৈল্পিক মূল্য অনেক বেশি। হুমায়ুনের অবর্তমানে তা কতটুকু ধরে রাখা যাবে সেটাই বড় প্রশ্ন।রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন তাঁর জীবদ্দশাতেই নিবিড় সম্পৃক্ততায় পরিপূর্ণ অবয়ব লাভ করেছে, প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে এবং কালক্রমে আরও শ্রীবৃদ্ধি হয়ে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। হুমায়ূন তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য অত দীর্ঘ জীবন পায় নি। আরও অনেক কিছু দেওয়ার আগেই চলে গেল। সবকিছু ঝেড়ে ফেলে আমি কল্পনা করতে চাই, নুহাশপল্লী হবে একটি সাহিত্য ও সংস্কৃতি কেন্দ্র। থাকবে একটি পাঠাগার, শিশুদের জন্য আলাদা। সারা দেশের স্কুল-কলেজে এর শাখা থাকবে। এখানে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা হবে, গণিত অলিম্পিয়াড অনুষ্ঠিত হবে, বিতর্ক প্রতিযোগিতা অনুচ্ছিত হবে। আমি কল্পনা করি, নুহাশপল্লী থেকে একটি সাহিত্য সাময়িকী প্রকাশিত হবে, যেখানে নবীন-প্রবীণ, ক্ষুদে লেখকদের লেখা থাকবে। এয়মিত কুমারূনের জীবন ও কর্মের ওপর একটি জাদুঘর থাকবে। স্টুডিওতে মুক্তিযুদ্ধস্তিন্তিও ও শিক্ষামূলক ছবি প্রদর্শিত হবে। দেশবরেণ্য ব্যক্তি ও সম্পদশালী ব্যক্তির বৃদ্ধ্যিটাভার এডিটাতার হাত বাড়িয়ে দেবেন।আমার ভাবতে ভালো লাগে মুহাশপল্লী হবে সংরক্ষিত এলাকা। ভবিষ্যতে কোনো মহল কর্তৃক একে কুক্ষিগত করার সুযোগ থাকবে না। রাজনীতি একে কালিমাযুক্ত করবে না। রাতে আঁধারে গাঁজা চরসসেবীরা এখানে আস্তানা গড়বে না।স্কুল ছাত্রছাত্রীরা এখানে শিক্ষা সফরে আসবে। বিদেশে বোটানিক্যাল গার্ডেন ও রেইন ফরেস্টে বাসের পর বাস ভর্তি স্কুল ছাত্রছাত্রীরা আসে, শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে। হাতে নোটবই ও পেন্সিল। ওরা সবাই গাছপালার নাম জানবে, ছুঁয়ে দেখবে, পেন্সিলে স্কেচ করবে। স্কুলে ফিরে পরীক্ষা দেবে, এটা স্কুল সিলেবাসের অংশ।বিভিন্ন প্রজাতির গাছসমৃদ্ধ বাংলাদেশের কয়টা গাছ আমরা চিনি।হরেক রকমের মৌসুমি ফল বাজারে আসে। আগ্রহ করে কেনাও হয়। কয়জন মা-বাবা ফল গাছের নাম জানে, চেনে? ছোটদের কথা বাদই দিলাম। ভিডিও গেম, টেলিভিশন এবং ইন্টারনেট যুগে শিশুদের বিশেষ করে শহুরে বাসিন্দাদের জীবনধারা বদলে যাচ্ছে। কমলা বা আপেল গাছ কমলার জুস বা আপেলের জুসের বোতলের মতো নয়, এটা বুঝতে শিশুদের যেন অনেকদিন অপেক্ষা করতে না হয়।নুহাশপল্লী নিয়ে এত প্রসঙ্গ টানছি কেন। অনেক বছর আগে পিরুজালীর দুর্গম অরণ্যে প্রথম টুকরা জমি কেনার সময় শহীদুল্লাহ হলে হুমায়ূনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার

পৃষ্ঠা:৬৩

কারণে। জমি কেনার ব্যবস্থা করেছিল ডাঃ এজাজ। পরে হুমায়ুনের হাতে গড়া নাট্যাভিনেতা।বারডেমের হিমঘর থেকে সকালের দিকে হুমায়ূনের লাশবাহী গাড়ি পুলিশের সহায়তায় নুহাশপল্লীর দিকে রওনা হয়েছে। নুহাশপল্লী থেকে কিলোমিটার দু’য়েক আগে তীব্র যানজট। একটি গাড়ি কালভার্টে আটকে গেছে। লাশবাহী গাড়ি আগেই পৌঁছে গেছে।অঝোর ধারায় শ্রাবণের বৃষ্টি নেমেছে। গাড়ি ছেড়ে হেঁটে রওনা হওয়া ছাড়া উপায় নেই। শেষ জানাজা এবং দাফনের সময় ঘনিয়ে আসছে। ঝড়ো বৃষ্টিতে ভেজা চপচপে কাপড়চোপড়ে কর্দমাক্ত রাস্তার পাশ দিয়ে এগুনো যাচ্ছে না। রোজার দিন, কিছুদূর গিয়ে হাঁপিয়ে উঠলাম। এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি। রাস্তার পাশ দিয়ে এঁকেবেঁকে মোটরসাইকেলে দুজন তরুণ পেছন দিক থেকে এগিয়ে আসছে। হাত তুলে জিজ্ঞেস করলাম, পেছনে বসে যাওয়া যায় কি না? স্থানীয় হবে হয়তোবা। আপাদমস্তক একবার দেখে নিয়ে চালকের আসনে বসা তরুণটি বলল, তিনজন বসতে পারবেন কি না দেখেন। শক্ত করে ধরবেন।তারাও নুহাশপল্লী যাচ্ছে। । ডানেবাঁয়ে এঁকেবেঁকে রামিজ ঝুঁকিপূর্ণ চালানো দেখে একবার ভাবলাম নেমে পড়ব। বৃষ্টি বাতাসের মোটরসাইকেলের পেছনে কসরত করে বসে যেতে যেতে মনে পড়ল, ডিপ্লেষ্ঠর সালের একদিন আর একটি মোটরসাইকেল ভ্রমণের স্মৃতি। ঢাকা বিশ্ববিটেলয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক নুরুল আমিনের হোভার পেছনে চড়ে ঘুমাবুন আমি ফুলার রোডের ব্রিটিশ কাউন্সিলে রওনা হলাম। দারুণ ফুর্তিবাজ একিকে হোন্ডায় চড়েই উড়তে চায়। দ্রুতগতির হোন্ডা ক্যাঁচ শব্দ করে থামব ভয়ে আমাদের দুজনের মুখ সাদা। হুমায়ুন এ হোন্ডাটির নাম দিয়েছিল, টিনটে হক। বোধহয় আমেরিকান নেভীর যুদ্ধবিমান বহনকারী প্রথমদিককার কোনো রণতরী হবে।অবিরাম শ্রাবণ মেঘের ধারার মাঝে নুহাশপল্লীতে এসে পৌঁছলাম। লোকে লোকারণ্য। কেউ গাড়িতে, কেউ পায়ে হেঁটে, বৃষ্টিতে ভিজে এসেছে। একটু পরেই শেষ জানাজা হবে। ত্রিপল দিয়ে শামিয়ানা টানানো কবর। হুমায়ূনের লাশকে নুহাশ, আহসান হাবীব, শহিদ আর দূরনবী হাতে তুলে পরম মমতায় কবরে শুইয়ে দিল। আহসান হাবীব কাফনের ভাঁজ থেকে কাগজের টুকরার মতো ছোট একটা কিছু নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিল। মুঠোমুঠো মাটিতে কবর ঢেকে যাচ্ছে।দাদাভাইয়ের কবরের পায়ের দিকে দুহাতে কোষবদ্ধ মাটি রেখে, কবরে মাথা ঠেকিয়ে ঢুকরে কেঁদে উঠল নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতালে অন্তিম মুহূর্তে পাশে থাকা সহোদর মুহম্মদ জাফর ইকবাল।মুনাজাত হলো। ‘হে আল্লাহ। দুনিয়াতে এ বান্দা তাঁর লেখনীর মাধ্যমে সবাইকে আনন্দ দিয়েছে। তোমার জ্ঞানের আলো ছড়িয়েছে। পরজগতে তাঁর জন্য তোমার সর্বোত্তম রহমতের আলোকিত দরজা খুলে দাও।’

পৃষ্ঠা:৬৪

আশপাশের গ্রাম থেকে আসা নানা বয়সী অচেনা কয়েকজন কবরে বিছিয়ে দিল বাদল দিনের তাজা কদমফুল। শ্রাবণের অঝোর বৃষ্টির ধারা কান্নার মতো করছে। আশ্রয় দরকার। অনেকেই অদূরে ‘বৃষ্টি বিলাসে’র দিকে এগিয়ে গেল। ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি। ওখানে নিষাদ একটুকরা কাগজে লাল-নীল পেন্সিলে আপন মনে নীল আকাশে তারা আর রকেটের ছবি আঁকছে। তাদের বাবা রকেটে চড়ে আকাশে গেছে। শিগগিরই ফিরে আসবে।একসময় বৃষ্টি থেমে গেল। মেঘলা দিনের পড়ন্ত বিকেলের আগেই যেন সন্ধ্যা নেমেছে।রমজানের শেষবেলা। সূর্য চলে গেছে মেঘের আড়ালে। কিছু লোকজন ইতস্তত ঘোরাফেরা করছে। লিচুবাগানে উঁচু করা কবরে মাটির নিচে হুমায়ূন শায়িত। কবরে কোনো ঘের নাই।নুহাশপল্লীতে পাকাঘর ভোলার আগে লিচুবাগানের বড় লিচুগাছটিকে কেন্দ্র করেই খোলাচত্বরে হুমায়ুনের বেশিরভাগ সময় কাটত। নামাজের জায়গাটাও সেখানে। এর আগেরবার যেদিন এসেছিলাম, নুহাশূল্লীর ইমামের ইমামতিতে সেদিন হুমায়ূনসহ সবাই মাগরিবের নামাজ আদায় করেছিলাম।নিজের মনের মাধুর্যে ভিলে ভিলে পড়ে ছেলেস্হিাশপল্লীর মাটি পরম মমতায় ধারণ করে নিয়েছে হুমায়ূনের দেহকে। মাটি দেহ মাটিতে মিশে যাবে। নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে গাইরে তার বইতে, সবার হৃদয়ে।চার দশকের কিছু সময় এগুটিবার কবরে ঘুমায়ূন লিখে দিয়েছিল- ‘নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে ও রয়েছ নয়নে নয়নে।’। সে কথামালার চেয়ে মানানসই আর কী হতে পারে হুমায়ূনের কররের শ্বেতপাথরের জন্য। তুরস্কের নোবেল বিজয়ী লেখক ওরহান পামুকের ভাষায়, প্রতিটি মানুষের মৃত্যু শুরু হয় তার পিতার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। মানুষের জীবন কত ছোট।পিতার স্মৃতিকে হুমায়ূন জীবন্ত রেখেছে তার লেখালেখিতে। হুমায়ূনের বেঁচে থাকার জন্য তার নিজের লেখালেখিই যথেষ্ট।“বাংলা সাহিত্য ক্ষেত্রে এক সুনিপুণ শিল্পীর এক দক্ষ রূপকারের এক প্রজ্ঞাবান দ্রষ্টার জন্মলগ্ন যেন অনুভব করলাম।” নাদিত নরকে উপন্যাসের ভূমিকায় আহমদ শরীফ এ কথাগুলো লিখেছিলেন। সে প্রজ্ঞাবান স্রষ্টা হুমায়ূন আহমেদ এলেন, জীবনশিল্পীর লেখনীতে জীবনের গল্প শোনালেন, আরও অনেক কিছু দেওয়ার অঙ্গীকারকে পেছনে রেখে নিয়তির হাত ধরে না-ফেরার দেশে চলে গেলেন।

পৃষ্ঠা:৬৫

পরিশিষ্ট চাঁদনিচকে:চাঁদের আলো নিয়ে যুগে যুগে অনেক কবিতা, গাথা রচিত হয়েছে। চাঁদের কলঙ্ককেও কবি, সাহিত্যিক, গীতিকারেরা নানা রঙে রঞ্জিত করেছে। চাঁদবিহনী পৃথিবী অথবা কলঙ্কহীন চাঁদ কেমন হতো। চাঁদের কলঙ্ক কিন্তু সর্বকালে আলঙ্করিক অর্থেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এ যেন পারস্যের কবি হাফিজের প্রিয়ার গালের একটি তিলক, যার বিনিময়ে সমগ্র বোখারা সাম্রাজ্য বিলিয়ে দেওয়া যায়।চাঁদ-তারারা আকাশে বিচরণ করে। মাঝে মধ্যে চাঁদ আর কিছু তারা মর্তলোকের বাসিন্দা হয়ে নেমে আসে। যুগে যুগে এসব আলোকিত মানুষ মানব সমাজকে করেছে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত। স্বঅলাকিত হুমায়ূন আহমেদের লেখায় জোছনার ছড়াছড়ি। তাঁকে নিয়ে লেখার সুতনুনন্তরী কিছু পাঁচমিশালী জোছনা প্রসঙ্গ এসে গেছে। পারিপার্শ্বিক জগতের অনেক না মেনে লেখালেখিতে ভিড় জমিয়েছে। সাপ্রবাহ, স্মৃতি, সময়ের সীমানা জীবন চলার পথে ক্ষণিকের পথিকন দিক কিছুই স্মৃতির ঝোলায় কুড়িয়ে নেয়। আপাতদৃষ্টিতে অনেক তুচ্ছ কাছে কুড়িয়ে পাওয়া সাত রাজার ধন। অনেক বাছবিচার করেও বাড়ছি ও বাড়ত্রি উরকিছু ফেলে দিতে মন চায়। নি। যতটুকু পেরেছি মূল লেখা থেকে আলাদা কষ্টে কষ্টে পরিশিষ্টের চাঁদনিচকে রেখে দিয়েছি।পাঠক নিজের জীবনে অবলোকিত অনেককিছুর সাথে হয়তোবা এর সাদৃশ্য খুঁজে পাবেন। স্মৃতির মণিকোঠায় হাতড়িয়ে আরও মূল্যবান মণিমুক্তা তুলে আনতে পারবেন। অনুধাবন করতে পারবেন লেখার এ অংশটুকু আলাদা এমন কিছু না। তবুও চাঁদবিচকের জন্য এটাই আমার কৈফিয়ত।একটা চাঁদকে নিয়ে এত ভাবনা। কিন্তু চাঁদকে আলোকিত করে সেই তারার খবর যেন আড়ালে পড়ে গেছে। তারাগুলো দেখতে ছোট বলে?ওই যে আকাশের তারাওলো, কোনোটির আলো স্থির, কোনোটি মিটমিট করছে। মিটমিট করে জ্বলা প্রভিটি ভারা এক-একটি নক্ষত্র, আর স্থির আলোর ভারা এক-একটি নক্ষত্রের গ্রহ-উপগ্রহ, যাদের কোনো নিজস্ব আলো নাই। আমাদের সূর্ব

পৃষ্ঠা:৬৬

একটি নক্ষত্র। পৃথিবী একটি গ্রহ, আর চাঁদ তার উপগ্রহ। সূর্য আর তার কতকগুলো গ্রহ-উপগ্রহ নিয়ে সৌরজগৎ।সূর্যকে নিয়ে এত বড় আমাদের এই সৌরজগৎ, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির একটি অতিক্ষুদ্র সদস্য। এই মিল্কিওয়েতে আছে দুইশত থেকে চার শ’ বিলিয়ন তারা বা সূর্য। নতুন তারা জন্ম নিচ্ছে। পুরোনো তারাদের কোনো কোনোটি নিজের আলো হারিয়ে শ্বেতবামনে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। তার গ্রহ-উপগ্রহগুলিও সাথে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। কোনো কোনো তারা সূর্যের তুলনায় কয়েক শতগুণ বড়। আর একটি তারা থেকে আরেকটি তারার দূরত্ব অকল্পনীয়। তাহলে এত সূর্য নিয়ে আমাদের গ্যালাক্সিটাই বা কত বড় হতে পারে। আমাদের গ্যালাক্সির কথা প্রসঙ্গে এসে যায় এ মহাবিশ্বে কতগুলো গ্যালাক্সি আছে। এটিও মানুষের কল্পনার বাইরে। তবে ধারণা করা হয় গ্যালাক্সির সংখ্যা শত শত বিলিয়ন।মহাবিশ্বের মহাকাশে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র একটি অংশ আমাদের নিকট দৃশ্যমান। এই দৃশ্যমান অংশেই আছে আশি থেকে এক শ’ বিলিয়ন গ্যালাক্সি। তাহলে সংখ্যায় কারা বেশি? চাঁদ না তারা। চাঁদ অবশ্য আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী। তার জন্য তাই এত মনের টান। মানুষের কল্পনায়, বিভিন্ন ধর্মের আচার-বিছন চাঁদ ঠাঁই করে নিয়েছে।আর মহাবিশ্ব ? যা কিছু আছে সব বন্থ। বন্ধু, শক্তি, গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি এবং স্পেসে যা কিছু আছে সবই মুহূরির্থের অন্তর্ভুক্ত। অসীম এই মহাবিশ্ব আবার সৃষ্টির অনাদিকাল থেকে অবিরাম সুধুকুপিরিত হচ্ছে। যখন সময়ের শুরু হয়েছিল।সংখ্যাতত্ত্ব ছেড়ে এবার তাদে এবং চলাফেরা প্রসঙ্গে আসা যাক। পৃথিবী তার অক্ষের উপর লাটিমের মূে দিনের কাছাকাছি সময়ে সূর্যে রকিাশ ঘণ্টায় একবার আবর্তিত হচ্ছে। ৩৬৫ ক একবার ঘুরে আসে। সূর্য কিন্তু বসে। নাই। সৌরজগতের নিজ পরিবার যুই মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিকে কেন্দ্র করে ২২৬ মিলিয়ন বছরে একবার পাক খায়। এক একটি পাককে বলা হয় এক কসমিক বর্ষ।গ্যালাক্সিরা কিন্তু তার বিলিয়ন বিলিয়ন নক্ষত্রদের জন্য আবর্তনের কেন্দ্র হয়েও নিজে স্বস্তিতে স্থির থাকতে পারছে না। মহাবিশ্বের স্পেসে তাদের আলাদা আলাদা গতি আছে। আর মহাবিশ্ব নিজেই সদা সম্প্রসারিত হচ্ছে।এই মহাবিশ্বে কারও স্থির থাকার উপায় নেই। যে যত ছোট সে তত বেশি রকমের গতির পাল্লায় পড়েছে। এত কিছুর মধ্যেও কিন্তু একটি শৃংখলা কাজ করছে।তাহলে ফল দাঁড়াচ্ছে এই, আমাদের পৃথিবী এই মুহূর্তে মহাবিশ্বের যে আয়গায় আছে আর কোনোদিন সে জায়গায় ফিরে আসবে না। অনেকগুলো পতির পাল্লায় পড়ে অনেকটা হেলিকেল স্প্রিংয়ের প্যাচানো বাঁকে বাঁকে নিরন্তর সামনের দিকে মহাশূন্যে স্থান বদল করছে।আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির সবচেয়ে কাছের বড় গ্যালাক্সি হলো এনড্রোমিডা গ্যালাক্সি। এই সবচেয়ে কাছের গ্যালাক্সি যে কতদূর তাও কল্পনার বাইরে। কয়েক

পৃষ্ঠা:৬৭

বিলিয়ন আলোকবর্ষ দিয়ে এর দূরত্ব বলতে হবে। এক আলোকবর্ষ হলো সেকেন্ডে এক লাখ ছিয়াশি হাজার মাইল গতিতে বছরে আলো যতদূর যায় তত্ত্বদূর দূরত্ব।মহাকাশ বিজ্ঞানীরা M33 নামে একটি গ্যালাক্সির সন্ধান পেয়েছে। মিল্কিওয়ের গতির আপেক্ষিকতায় ওই গ্যালাক্সিটি প্রতি সেকেন্ডে ১৯০ কিলোমিটর গড়িতে এনড্রোমিডা গ্যালাক্সির দিকে ধেয়ে আসছে। এই দুটি গ্যালাক্সির মধ্যে যদি সংঘর্ষ ঘটে তবে তারা ৪০০ বিলিয়ন বছরের মধ্যে আমাদের গ্যালাক্সি মিল্কিওয়ের সাথে এবীভূত হয়ে যাবে। আর সৌরজগতের ধ্বংস তখন অনিবার্য।প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে মায়া সভ্যতার কালচিন্তকেরা পৃথিবীর শেষ দিন। হিসেবে চিহ্নিত করে ২০১২ সালের ২১শে ডিসেম্বর। এরপর তাদের ক্যালেন্ডারে আর কোনো তারিখ নেই। ওই তারিখের একদিন আগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ক্রেমলিনে এক সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়ে দেন, আরও ৪৫০ কোটি বছর পর পৃথিবী ধ্বংস হবে। বিজ্ঞানের তত্ত্ব উল্লেখ করে বলেন, সবকিছুই শেষ হয়ে যাবে। সূর্য নিভে যাবে। আর সেটাই হবে বিশ্বের পরিসমাপ্তি। তবে এর আগে সূর্য শ্বেতবামন-এ পরিণত হবে।পৃথিবী থেকে প্রেরিত ভয়েজার পঁয়ত্রিশ বছরে মাত্র সৌরজগতের শেষ সীমানায় পৌঁছেছে। আশা করা যাচ্ছে একসময় ভয়েজার মৃত্যধুনীযান সৌরজগতের সীমানা ছাড়িয়ে মিল্কিওয়ের ইন্টারস্টেলার স্পেসে ঢুকে নিয়ে।গ্যালাক্সির মাঝের স্পেস, ইন্টারগ্যানাটিত্রে চাষে। এক গ্যালাক্সি থেকে আরেক ছোঁয়ার বাইরে। ভবিষ্যতে আরও নানাভাবে। সব তত্ত্ব উপস্থাপন করবে, ধারণাকে প্রতিনিয়ত শুধরিয়ে উঠবে। স্পৈস মহাকাশ বিজ্ঞানীদের ধরা- পেতুন তথ্য আসবে, মহাকাশ বিজ্ঞানীরা নতুন শুকে নিয়ে মানবজাতির বর্তমান ধ্যান-চার দশকের বেশি সময় আগে চাঁদের মাটিতে প্রথম পদাপর্ণ করে সদ্যপ্রয়াত নীল আর্মস্ট্রং-এর সেই বিখ্যাত উক্তি-One small step for a man, a giant leap for mankind, একদিন বাস্তবরূপ লাভ করবে। মানুষ সৌর জগতের অন্য গ্রহে যাবে। মঙ্গল গ্রহকে নিয়ে প্রতিনিয়ত জল্পনা-কল্পনা ও আগ্রহের শেষ নেই। অনেকেই মঙ্গলগ্রহে যাওয়ার টিকিট বুক করে রেখেছে। হয়তোবা সৌরজগৎ ছাড়িয়ে মানব জাতি নীহারিকা গ্যালাক্সির অন্যান্য সূর্যদের গ্রহের খোঁজখবর নিবে। ইন্টারগ্যালাটিকেল স্পেস পার হয়ে অন্য গ্যালাক্সির দ্বারপ্রান্তে গিয়ে হাজির হবে। সবই রুল্পনা।আশার কথা, বহু বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার নজিরও মানুষ ইতিমধ্যে স্থাপন করেছে।এক জীবনে চাঁদ-তারারা বায়বার ধরা দেয়। বিভিন্নজনের কাছে বিভিন্নভাবে। রাতের কমলাপুর রেলস্টেশন। ১৯৭২ সালের মার্চের প্রথমদিকে মহিউদ্দিন আর আমি রাতের ট্রেনে চট্টগ্রাম যাওয়ার জন্য প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছি। মহিউদ্দিন ঢাকা

পৃষ্ঠা:৬৮

বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের আগে চট্টগ্রাম যাবে। ট্রেনভর্তি লোক, কেউ বসে কেউ দাঁড়িয়ে। নরজার মুখে পাদানিতে পা রেখে হাতল ধরে অনেকে ঝুলছে। ছাদের উপরও প্রায় সমান সমান লোক। অদ্রগোছের একজন তার স্ত্রী ও সন্তানকে কাঁধে চড়িয়ে অনেক কসরত করে ছাদের উপরে তুলে দিল। সাথে আবার দুটো ব্যাগ। তাকে ভুলে দিতে আমরাও যোগ দিলাম।মহিউদ্দিন বলল, সড়কপথে বাসে যাওয়ার চেষ্টা করা যাক। আমি অসহায়ের মতো বললাম, এত রাতে বাস পাওয়া যাবে না। আর পাওয়া গেলেও আগামীকাল বিকেলের আগে পৌঁছানোর কোনো সম্ভাবনা নেই। কয়েকদিন আগে সড়কপথে এসেছি। অনেক ব্রিজ ভাঙা, দু’দুটি ফেরি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। চট্টগ্রামের কর্মস্থলে বড়ভাই অসুস্থ। আমি সকালের মধ্যেই পৌছতে চাই।ট্রেন ছাড়ার হুইপেল বাজল। হতাশায় মলিন আমার চোখ-মুখের দিকে একপলক তাকিয়ে মহিউদ্দিন বলল, ছাদে উঠার চেষ্টা করা যাক। ছাদে বসা কয়েকজন তরুণযাত্রী হাত ধরে একে একে আমাদের উপরে তুলে নিল।এখানে দেখি আরেক জগৎ। বয়সে প্রায় সবাই তৃরুণ, বেশির ভাগই ছাত্র। পাশের জনকে এমনিতেই জিজ্ঞেস করলাম, ট্রেন চটেম কখন পৌঁছবে। নিস্পৃহ কণ্ঠে বলল, ভোরে পৌঁছানোর কথা, তিন-চার শৃম্মতি দেরিও হতে পারে। পথে পথে শিকল টেনে ট্রেন থামিয়ে লোক উঠানামা করে। ট্রেনও অনেক ধীরে চলে।মুক্তিযুদ্ধের সময়ে অকেজো করে দেওবৃদ্ধ এগ্রিক ব্রিজের পুনঃনির্মাণ চলছে। ট্রেন শহর ছেড়ে এসেছে। চাচী নরম আলো। আকাশে চাঁদ। । মৃদু ঠান্ডা বাতাস। মনটা একটু হালকা হছে বিল।। । ট্রেন এগিয়ে যাচ্ছে। ভৈরব স্টেশনে পৌঁছার সময় কয়েকজন যাত্রী চিৎকার করে উঠল, মাখা নিচু করেন মাথা নিচু করেন। মাথা বরাবর উপরে প্লাটফরম ছাউনির লোহার ফ্রেম।এখানে আরও চার-পাঁচজন তরুণ যাত্রী যোগ হলো। একেবারে গাদাগাদি অবস্থা। তারা ট্রেনের ছাদের কিনারায় বসে পাশের জনের জামাকাপড় আঁকড়ে থাকল। কিন্তু উচ্ছ্বাসের কোনো কমতি নেই। কয়েকজনের সাথে আলাপ হলো। একজন নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিল। আখাউড়া স্টেশনের পরে দূরের একটি এলাকা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, ওদিকে বর্ডার। সেখানে যুদ্ধ করেছে। মেজর হায়দার ছিল সেক্টর কমান্ডার। এর আগে ছিল খালেদ মোশাররফ। দুই নম্বর সেক্টর। কে-ফোর্স। আখাউড়া, কসবা, গঙ্গাসাগর এলাকায় অনেক গেরিলা অপারেশনে অংশগ্রহণ করেছে। এ পথ দিয়ে গেরিলারা ঢাকায় যাওয়া-আসা করত এবং ঢাকায় গেরিলা অপারেশন চালাত। ঢাকায় অনেক পরিবার, ব্যক্তি, গেরিলাদের আশ্রয় দান করেছে। অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুন রাখার ব্যবস্থা করেছে। মাত্র কয়েক মাস আগের তরতাজা স্মৃতি থেকে তরুণটি মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের গল্প বলে যাচ্ছিল। সবকিছু মিলিয়ে আমরা যেন আলাদা জগতের বাসিন্দা হয়ে গেলাম।

পৃষ্ঠা:৬৯

ওই সময়ের ঢাকা শহরের কিছু স্মৃতি মানসপটে ভেসে উঠল। গেরিলাদের অপারেশনে সহায়তা করার জন্য বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষ এগিয়ে এসেছে। ছা- পোষা চাকরিজীবী, পেশাজীবী, ছাত্র, দোকানদার, গ্যারেজের কর্মী গেরিলাদের আশ্রয় দিয়েছে। গোলাবারুদ, অস্ত্র-শস্ত্র জায়গায় জায়গায় জমা করে লুকিয়ে রাখতে, গোপন খবর আদান-প্রদান করতে মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। এসব মানুষের খোঁজখবর কেউ কোনোদিন রাখবে না।পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে ধরা পড়া গেরিলা যোদ্ধাদের চরম নির্যাতন করে হত্যা করার আগে অন্য যোদ্ধা, সাহায্যকারী এবং অস্ত্র-শস্ত্রের খোঁজ বের করে নিত। সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে নতুন করে লোক ধরে এনে একইভাবে আরও খোঁজখবর বের করে তাদের হত্যা করত। পাকিস্তানি সৈন্যদের উঠিয়ে নেওয়া তরুণীরা তাদের নির্যাতন ও লালসার শিকার হতো।বাড়ির আঙিনায় মাটিতে পোঁতা অস্ত্রের সন্ধান পেয়ে, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’… এই কালজয়ী গানটির সুরস্রষ্টা আলতাফ মাহমুদকে পাকিস্তানি সৈন্যরা ১৯৭১ সালে সেপ্টেম্বর মাসে নির্মমভাবে হত্যা করে।গেরিলাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে The Train নামের একটি ষাট দশকের চলচ্চিত্রের দৃশ্য মানসপটে ভেসে উঠল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত তৈয়্যারিসের এক অসাধারণ চলচ্চিত্র। প্যারিসের মিউজিয়াম থেকে আর্মান বাহিনীর লুট করা ট্রেনভর্তি ছবি জার্মানিতে নিয়ে যাওয়াকে তৌকয়ে দিতে হবে। ছবিগুলোকে অক্ষত রাখতে ট্রেনটি ধ্বংস করা যাবে না। বা। বিভিন্ন স্টেশনের সিগন্যাল বদলিয়ে, পথে পথে ট্রেনের লাইন পরিবর্তন করিয়ে ভেটো গেরিলাদের সেই প্রাণান্তকর চেষ্টা এবং আত্মাহুতি বিশাল জার্মান বাহিনীর বিরুদ্ধে একদল গেরিলার এটি ছিল একটি অসম বুদ্ধ। জার্মান সৈন্যদের থেরিটেদিয়ে শেষ পর্যন্ত ট্রেনের গন্তব্য পথে এক জায়গায় রেললাইন পরিবর্তন করে ট্রেনের চলার দিক ফরাসিমুখী করা হয়। জার্মান কর্নেলের এটা বুঝতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধের মানচিত্র বদল শুরু হয়ে গেল। ছবিগুলি একসময় মুক্ত প্যারিসের মিউজিয়ামে ফেরত আসবে।মনে হলো, ট্রেনের ছাদে উঠে ভালোই করেছি। ট্রেনের ভেতরে থাকলে দম বন্ধ হয়ে যেত। রেলপথের দুদিকে অবারিত সবুজ জমিন। এ জমিনের মাটিতে কত অজানা মুক্তিযোদ্ধা আবদান করেছে, কত নিরীহ নারী-পুরুষ গণহত্যার শিকার হয়ে মাটিতে মিশে গেছে তাদের হিসাব কেউ কোনোদিন জানবে না।গভীর রাতে চাঁদের আলোতে আলোকিত ঘুমন্ত গ্রাম-বাংলার আদিগন্ত প্রসারিত সবুজ ফসলের মাঠ চিরে ট্রেন এক বিশেষ ছন্দে এগিয়ে যাচ্ছে। ট্রেনভর্তি যাত্রীরা সবাই যেন অনাদিকালের ধারায় জীবন পথের মুসাফির। একবার নেমে গেলে আর উঠবে না। এখন একসাথে, যার যখন সময় হবে নেমে যাবে। নতুন যাত্রী উঠবে।একজন গলা ছেড়ে গান ধরেছে, অন্যরাও গলা মেলাচ্ছে:আজি যত তারা আকাশে… 

পৃষ্ঠা:৭০

স্বাধীন দেশের মাটিতে, আকাশে-বাতাসে এত আনন্দ!দুদিন পর ঢাকা ফিরে এলাম। চাকরির ইন্টারভিউ আছে। এর মাত্র কয়েকদিন পর মার্চের চৌদ্দ তারিখে আমার অতি প্রিয় বড়ভাইটি মারা গেল।একেবারে ছোটবেলায় গ্রীষ্মের গ্রামের বাড়িতে এক পূর্ণিমার রাতের কথা মনে আছে। তখন বাড়িঘর ছিল অনেক ফাঁকা ফাঁকা। মাইলের পর মাইল সদ্য রবিশস্য তোলা তেপান্তরের মাঠে চাঁদের আলো তরুণদের ঘরের বাইরে, টেনে আনত। ধূলিধূসরিত মাঠে হা-ডু-ডু খেলার জন্য জড়ো হতো।সমন্বরে বোল তুলে অন্যদের ডাকত। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে এ ডাক পৌঁছে যেত অনেক দূরে। যুবক ছেলেরা গুটি গুটি পায়ে ঘর থেকে বের হয়ে এক দৌড়ে মাঠে গিয়ে হাজির। কেউ নিয়ে আসত ঢাউশ ঘুড়ি আকাশে ওড়াবে। অতি শৌখিন কারও ঘুড়ি বিকেল থেকেই আকাশে উড়ছে। একটা বোঁও-ও-শব্দ। দর্শক হিসেবে মাঝবয়সীরাও আসত। দু’একজনের হাতে বাঁশের বাঁশি। বাড়ির অদূরে ছোট ফেনী নদীর পাড়ে বা জমির আইলে বসে বাঁশিতে সুর আলোয় ঝিরঝিরে বাতাসে দূর থেকে ভেসে আসা নেহায়েত বেরসিকের মনকেও ক্ষণিকের জন্য। তুলত। নিশুতি রাতের চাঁদের যে ডাকাতিয়া বাঁশির সুর’ টিকরে দিয়ে যেত।রাতের বিছানায় দরজা-জানালার ফ চাদের আলোর ছটা এসে পড়ত। দূরের মাঠ থেকে ভেসে আসা আনন্দ-কেমে হিলের টানে নানান উসিলায় ঘরের বাইরে এলেও আমাদের সীমানা ছিল বাড়ির বানি, বড়জোর সামনের রাস্তা পর্যন্ত।শিক্ষক বাবার তীক্ষ্ণ নজর উয়ে রাত-বিরেতে বের হওয়ার কোনো উপায় নেই। আমাদের বাড়িটা অMA আলাদা। চারদিকে খোলা মাঠ।আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে এ পরিবেশ সম্পূর্ণ বদলে যেত। তখনো মুহুরি নদীতে বাঁধ হয় নাই। একাধারে বর্ষণ, পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢল আর জোয়ারের পানি একসঙ্গে ফুলে-ফেঁপে কয়েকদিনের মধ্যেই রাস্তাঘাটসহ বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে দিত। দূর-দূরান্তের বাড়িঘরগুলো যেন কোনোমতে পানির উপর নাক উচিয়ে থাকত। মাত্র কয়েক মাস আগে ধুলায় ধূসরিত খেলার মাঠের চার-পাঁচ ফুট উপরেও পানি। এমনি সময়ে পূর্ণিমার আগে পরের রাতগুলোতে ছোট ছোট ঢেউ খেলানো পানির উপর আলোর মেলা বসে।একবার বাবা গেলেন জেলা সদরে। দীর্ঘদিন যাবৎ জেলা জজ আদালতে জুরি সদস্য। বড় ধরনের খুনের মামলার শুনানির সময় দু’তিন সপ্তাহের জন্য আদালতে থাকতে হয়। স্কুল ছুটির আনন্দের মতো তখন আমাদের আনন্দ।আম্মাকে কিছুটা মানানো যেত। তবে রাশ ছাড়তেন না। সকাল-সন্ধ্যা পড়ার টেবিলে থাকা অবশ্য পালনীয় কর্তব্য মনে করতেন। সকালের নাস্তা পড়ার টেবিলেই দিয়ে দিতেন। পাছে সময় নষ্ট হয়।

পৃষ্ঠা:৭১

বড় বড় বিষয়, যেমন সন্ধ্যার পরও বাইরে খাকা, ধানের গোলায় লুকিয়ে রাখা কলার কাঁদি থেকে পাকা কলা উধাও হয়ে যাওয়া, পাকা সুপারির পিঁড়ির বদলে ফেরিওয়ালার কাছ থেকে ‘মোয়া’ কিনে ফেলা, নারিকেল গাছের কচি ডাব কাঁচা আম কাটার ছুরিতে বিশেষ কায়দায় ফুটো করে পাটকাঠির নল দিয়ে পানি টেনে খাওয়া, পাকা জামের ডালসহ নিচে পড়ে হাত-পা ভাঙা, ফাঁদ পেতে কানি বগ ধরা, বনবাদাড়ে ডাহুক পাখির পিছু নেওয়া, গাছের মগডালের বাসা থেকে খুঘুঘু পাখির ছানা নামিয়ে বুদ পানি দিয়ে বাঁচায় পালার চেষ্টা-এসব নালিশ চলে যেত বাবার দরবারে। এসবের পরেও বাবার অনুপস্থিতির সুযোগে ভরা পূর্ণিমার রাতে বাড়ির ঘাটের নৌকা নিয়ে আরও কয়েকজনসহ বেরিয়ে পড়তে কোনো বাধা নেই।এমন ভরা জোছনায় আশপাশে বাড়ির কেউ তালগাছের ডোঙ্গা নৌকা, কেউ কলাগাছের ‘ভেউরা’ নিয়েও বেরিয়ে পড়ছে। কোনো গন্তব্য নেই। অনেক দূরে গিয়ে পানিতে ভাসা, নৌকায় বসে থাকা, এদিক-ওদিক ঘোরাফেরা করা। হালকা ঢেউয়ে নৌকা দুলছে। একবার আকাশে চাঁদের দিকে তাকাচ্ছে আরেকবার পানিতে ছোটছোট ঢেউয়ে কাঁপানো চাদের আলোর কিকিমিকি দেখছে। একে অন্যকে হাতের ভালুর রেখা দেখাচ্ছে। কারটা বেশি স্পষ্ট। দূরে একটি কড় নৌকা আরও দূরে চলে যাচ্ছে। অনেক লোকের কোলাহল। ওরা অন্য গ্রামেত সাপ্তাহিক হাট থেকে ফিরছে। একটি ছইয়ের নৌকায় শিশুদের চেঁচামেচি। গ্রামেঊবধূ চাঁদনি রাতে বাপের বাড়িতে ‘নাইউর’ যাচ্ছে। আহা। কী আনন্দ। তবে বইতেছু ছাপিয়ে চাঁদের আলোর রাজত্ব। আসমানের চাঁদ আর তারা আজ নবসাজে, গাঁয়ের বধূর জন্য আলোকিত উপহার নিয়ে জমিনের পানিতে নেমে এসেছে সর চিলির আলোয় শাপলা ফুল চিকচিক করছে।কলমিলতার আগা ঢেউয়ের সাথে দু’তিনদিন পর খবর রেস্ট্রশাবা জজকোর্ট থেকে ফিরছেন। দারুণ উত্তেজনা। সবাই জেগে আছে। এক গয়নার নৌকায় বাড়ি ফিরলেন গভীর রাতে।অনেক দূরে থাকতেই নৌকা দেখা যাচ্ছে। নৌকার গলুইয়ের কাছে অ্যালুমিনিয়ামের বড় বড় ডেগচিগুলি চাঁদের আলোয় ঝলমল করছে। কয়েকটি কেরোসিনের টিনও চকমক করছে। সবগুলোই নানান পদের কাটা ইলিশ মাছে ভর্তি। টিনগুলোতে তেরছা গোল গোল করে কাটা বড় বড় ইলিশের টুকরা, লবণ পানি মেশানো নোনা ইলিশ। ডেগচিতে তাজা ইলিশ মাছ আধা পাকানো। তখনকার দিনে মফস্বল শহরে বরফের তেমন প্রচলন ছিল না। গ্রামে-গঞ্জে তরভাজা ইলিশের দেখা মিলত না। লবণ পানিতে ডোবানো লোনা ইলিশের কদর ছিল।গ্রামের মানুষ বাজার থেকে তেমন মাছ কিনত না। যার যার পুকুর, খালবিলের মাছ-ই ছিল যথেষ্ট।আশপাশের বাড়ির বয়স্কশ্রেণীর নিকটজনেরা যার যার নৌকায় এসে জড়ো হচ্ছে। হারিকেনের কোনো আলো নয়। চাঁদের আলোতেই চেয়ার, টুল আর পাটি পেতে উঠানে আসর বসেছে।

পৃষ্ঠা:৭২

প্রধান বক্তা বাবা। হাতাওয়ালা কুর্ণিতে বসে, স্কুলে ক্লাস নেওয়ার ভঙ্গিমায় বাবা বলে যেতেন খুনের মামলার বিবরণী। সাক্ষী, আসামি ও উকিলের জেরার জবানিতে। খুঁটিনাটি সব বর্ণনা। চরাঞ্চলের জমিতে ধান কাটার জমির দখল নিয়ে দু’পক্ষের লাঠিয়ালদের খুনাখুনি। বল্লম আর টেটা দিয়ে গেঁথে, মেরে কেটে মৃতের ছোট ছোট টুকরো অংশগুলো চরের বালুতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পুঁতে রাখায় সব লোমহর্ষক কাহিনি।ঘুম ঘুম চোখে হঠাৎ গা শিউরে ওঠে। পল্লীকবি জসীমউদ্‌দীনের নকশিকাথার মাঠের লাঠিয়াল রূপার আলেখ্যের মতো মর্মস্পর্শী সব কাহিনি।কখন চাঁদ পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে, সেদিকে কারও খেয়াল নেই। ভেসে আসছে পানির উপরে ঝিরঝিরে শীতল বাতাস। ফজরের নামাজের আজান দেওয়ার সময় হয়ে এল। এখন যে যার বাড়িতে যাবে।মৌলবি নুরুজ্জামান মাস্টার। ১৯৩০-৩১-এর উপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসিত ভারতের এক নবীন পুলিশ কর্মকর্তা থেকে মাস্টার বনে যাওয়ার কাহিনি বাবার কাছেই শুনেছি বিগত সত্তর দশকে। কিন্তু সূত্র ধরে দিয়েছে সেজো ভাই মীর আহমেদ।বাবার ব্যক্তিত্বের কারণে ছোটবেলায় তাঁর সঙ্গে ঔকটু দূরত্ব এমনিতেই ছিল। তাছাড়া আমার ছাত্রজীবনের বেশির ভাগ সমস্ টেছে বাড়ির বাইরে হোস্টেলে।বয়সের পার্থক্যেও অর্ধ-শতাব্দীর কাছাকাছি বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে এবং পরে। জীবনে অস্থিতিশীল অবস্থার কিছু কিছু ও চিঠিপত্র লিখতেন। বাবার শিক্ষকতা ঘটনা শুনেছি আমার কাছে। আরও অনেক লক্ষে ঢাকায় আসা-যাওয়া এবং আশি দশকের প্রথমদিকে ঢাকায় একসঙ্গে ভাঁড়ার সময় নিজের অতীর জীবন নিয়ে কিছু কিছু কথা বলতেন। তখন ভাবনাই আসে নি, এ নিয়ে কিছু লিখব। আক্ষেপ হয় কেন তাঁর জীবদ্দশায় বিস্তারিত সব জেনে নিলাম না। অনেক কিছু জানার ছিল।কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রামের চিত্তড়া হাইস্কুল থেকে ১৯২৫ সালের দিকে ফার্সি ভাষায় পেটার মার্কসহ এন্ট্রাস পরীক্ষা পাস করে বাবা ফেনী কলেজে ভর্তি হন। ১৯২৯ সালে কলেজে লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে কলকাতা রাইটার্স বিল্ডিংয়ে কিছুদিন ঘোরাফেরা করেন ঢাকরির প্রত্যাশায়। তখন সব জায়গায় শিক্ষিত হিন্দুদের দাপট। কোনো বিশেষ সুপারিশ ছাড়া ব্রিটিশ রাজত্বের মুসলমান ছেলেকে চাকরি কে দেবে? বাবা আবার সুপারিশের ধার ধারতেন না। মন-মেজাজ, চিন্তা-চেতনায় ছিলেন স্বাধীনচেতা। বা পরবর্তী সময়ে তাঁয় জীবনধারাকে বদলে দিয়েছে। কলকাতা থাকতে তখন দেখ্য-সাক্ষাৎ হতো সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত গ্রামের পাশের বাড়ির হাফিজুর রহমানের সঙ্গে। বাবাকে আত্মীয়তার সূত্রে মামা ডাকত। তিন দশক পরে তার ছোটভাই আজিজুর রহমান স্কুলে ছিল আমাদের সমসাময়িক। আজীবন আমাদের পারিবারিক শুভাকাঙ্ক্ষী এই ব্যাংক

পৃষ্ঠা:৭৩

কর্মকর্তার একমাত্র ছেলে স্কুলছাত্র তুষারকে ১৯৯৭ সালে রাজনৈতিক সন্ত্রাসীরা ফেনীতে নির্মমভাবে হত্যা করে। পত্র-পত্রিকায় এ নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছিল।তরুণ বয়সে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী বাবা শারীরিক গড়লে ছিলেন উঁচু লম্বা। ভালো ক্রীড়াবিদও ছিলেন। স্কুলে থাকতে কুমিল্লা থেকে ফেনী পর্যন্ত রাস্তায় সাইকেল রেসে প্রথম হয়ে একটি সাইকেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। ফেনী কলেজে থাকতে চৌদ্দগ্রামে প্রধান সড়কের পাশে জগন্নাথ দিঘি সাঁতরিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন।চাকুরির চেষ্টায় কলকাতা থাকতেই পুলিশ সার্ভিসের নির্বাচনী পরীক্ষায় পাস করে কলকাতার পুলিশ একাডেমিতে ছয় মাসের প্রশিক্ষণ দেন। প্রশিক্ষণ শেষে অবিভক্ত বাংলার বীরভূম জেলায় পোস্টিং হয় সহকারী সাব-ইন্সপেক্টর হিসেবে। মাসে ত্রিশ টাকা বেতন আর পুলিশের রেশন।দাদা হাজী আনোয়ার আলীকে চিঠি লিখে সব জানালেন। বাবা তাঁর একমাত্র ছেলে সন্তান।মুসলমানের ছেলে একটি সরকারি চাকরি পেয়েছে, তাও আবার পুলিশ অফিসারের চাকরি। আশপাশের পাড়াগ্রামে এ খবরটা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল।তখনকার গ্রামে গঞ্জে কোমরে চকচকে পিতৃদ্বেষ্ট তখমাসহ মোটা বেল্টপরা চৌকিদার-দফাদারকেও সরকারি লোক মনে করা হতো।বাবার চাচা সম্পর্কীয় এক আত্মীয় তৃষ্ণী বীরভূমেই জরিপ বিভাগে আমিনের থেকেডাবা তাঁর মারফত দাদার জন্য কিছু টাকা কাজ করত। প্রথম মাসের বেতন থেকে উঠানা পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। দুই মাস পেরোতেই পুলিশের ঊর্ধ্বতন মহলে শুরু হয় কানাঘুষা। তার বিরুদ্ধে কি এক ঠুনকোয়ারী চলছে।স্বদেশী আন্দোলনের কৃষ্টি সহানুভূতিশীল এক হিন্দু পুলিশ কর্মকর্তা বাবাকে গোপনে আগেই জানিয়ে দিয়েছেন, কলেজজীবনে তাঁর স্বদেশী আন্দোলনে জড়িত থাকার পুলিশ রিপোর্টের বিষয়টি।বাবা সমূহ বিপদের আঁচ করলেন। তৃতীয় মাসেই কাউকে না জানিয়ে চাকরিস্থল ত্যাগ করে চাকরিতে ইস্তেফাপত্র পাঠিয়ে দিলেন। সময়টা ১৯৩১ সালে প্রথম দিক।এবার পুলিশ বিভাগ সত্যিই নড়েচড়ে বসল। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ গুরুতর। ছাত্রাবস্থায় বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। স্বদেশী আন্দোলন এবং বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ।বৃহত্তর চট্টগ্রাম এবং আশপাশের জেলাতে তখন ব্রিটিশ সৈন্য এবং পুলিশের চরম তোলপাড় চলছে। মাস্টার দা সূর্যসেনের নেতৃত্বে ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল রাতে বিপ্লবীরা চট্টগ্রামে সশস্ত্র অভ্যুত্থান ঘটায়। জালালাবাদ পাহাড়ে ব্রিটিশ সৈন্যের চারদিনের অবরোধ ভেঙে একসময় বিপ্লবীরা পিছু হটে যায়। মাস্টারদাসহ বিপ্লবীরা গ্রামে জঙ্গলে লুকিয়ে আছে। পুলিশ তাদের হন্যে হয়ে খুঁজছে। সন্দেহভাজনদের গ্রেফতার করে জেলে পাঠিয়ে দিচ্ছে। বন্দিদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে তথ্য

পৃষ্ঠা:৭৪

নিত অন্য স্বদেশী বিপ্লবীদের ধরার জন্য। অনেক বিশ্বাসঘাতক আবার ঈর্ষার বশবর্তী হয়ে অথবা তোষামোদি করে নিজ থেকেই পুলিশকে সংবাদ পৌঁছিয়ে দিত।মাস্টারদা সূর্যসেনকে ধরিয়ে দিতে ব্রিটিশ সরকার দশ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছে। তিনি ধরা পড়েন আরও পরে ১৯৩৩-এর ফেব্রুয়ারি মাসে। গৈরালা গ্রামে খোদ আশ্রয়দানকারী বিশ্বাসঘাতক নেত্রসেদের গোপন খবরের ভিত্তিতে। বিশ্বাসঘাতক রেহাই পায় নি। বিপ্লবীরা তাকে হত্যা করে।স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপ্লবী নেতা মাষ্টারদা সূর্যসেনের ফাঁসি হয় ১৯৩৪-এর ১২ জানুয়ারি। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক কিংবদন্তি বীরপুরুষ হয়ে রইলেন।চাকরিস্থল ত্যাগ করে আসা বাবার জন্য ১৯৩১-এর পরবর্তী সময়টা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। বীরভূম থেকে ফেনীর ছোট ধলীয়ার বাড়িতে পৌঁছার আগ থেকেই সেখানে পুলিশের আনাগোনা চলছিল। প্রতবিরেতে পুলিশ হানা দেয়।দাদা হাজী আনোয়ার আলীর একমাত্র ভাই নাদেরুজ্জামান থাকত বারৈয়ার বহর গ্রামে। বাবাকে পাঠিয়ে দিলেন তাঁর চাচার কাছে। অনেক পরে নিঃসন্তান এই চাচা তার সকল সম্পত্তি ভ্রাতুস্পুত্রকে দিয়ে দিয়েছিলেন। M নিজ চাচার ওখানেও বাবার বেশিদিন থাকা থাক না। পুলিশের চর অচেনা লোকজন দেখলেই খোঁজখবর নিতে শুরু হয়েও বিপ্লবী এবং স্বদেশী আন্দোলনে জড়িতরা তখন সাধু, ধর্মপ্রচারক, শিক্ষক শ্রমিক, গোয়ালা, কৃষকের ছয়বেশ এবং হল্পনামে প্রত্যন্ত অঞ্চলে আত্মগোপন করত। মাস্টারদা সূর্যসেন একজন ধার্মিক মুসলমানের ছদ্মবেশেও কর্মিস ছিলেন।ব্যাপক তল্লাশি এবং ধরদিকের মুখে বাবা মনস্থ করলেন, শহরে চলে যাবেন। অনেক লোকের মাঝে থেকে ট্রেটিশ পুলিশের নজর এড়াতে সুবিধা হবে।নাদেরুজ্জামান বাবার হাতে একটি চিঠি দিয়ে দিলেন। ফটিকছড়িতে মাইজভাণ্ডার ত্বরীকার পীর সাহেবকে লেখা চিঠি। তিনি পীরের মুরিদ। বাবাকে যেন বিপদে আশ্রয় দেওয়া হয়।ট্রেনে চড়ে বাবা চট্টগ্রাম রওনা হলেন। গাড়িতে, স্টেশনে স্টেশনে পুলিশের নিয়মিত তল্লাশি। বাবার শারীরিক গঠন এবং চলনবলনই যেন তার শত্রু হয়ে দাঁড়াল। সহজেই নজরে পড়ে যান। তাছাড়া কিছুদিন আগেই পুলিশের চাকরিতে কঠোর শারীরিক ট্রেনিং নিয়েছেন। শরীর স্বাস্থ্য মজবুত।অবস্থা বেগতিক দেখে শেষপর্যন্ত চট্টগ্রাম না গিয়ে সীতাকুণ্ড স্টেশনে নেমে পড়লেন। কয়েকদিন থাকলেন নিজ গ্রামের পরিচিত দানা মিয়ার ছেলে ফজলের রহমানের সঙ্গে। ছেলেটি সেখানে রেলের খালাশি হিসেবে কাজ করত। এরমধ্যে সীতাকুণ্ড হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে দেখা করেন। স্কুলে ইংরেজি শিক্ষকের প্রয়োজন। বাবার চাকরি হয়ে গেল। একসময় (১৯১৪-১৫) এই স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহিদুল্লাহ।

পৃষ্ঠা:৭৫

কয়েক মাস না যেতেই একদিন হেডমাস্টার বাবাকে ডেকে জানাল, পুলিশের গোয়েন্দারা তাঁর খোঁজখবর করছে। থানায় যেতে বলেছে। সহানুভূতিশীল হিন্দু হেডমাস্টারের সঙ্গে পরামর্শ করে বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি স্কুল ছেড়ে চলে যাবেন।রেলকর্মী ফজলের রহমান বাবাকে মাইজভাণ্ডার শরীফের পথে সীতাকুণ্ডের পাহাড় পার করে কিছুদূর এগিয়ে দিয়ে পথ বাতলে দিল। তখনকার দিনে বাড়কুণ্ড, সীতাকুণ্ড থেকে বাৎসরিক ওরশে যোগদানের জন্য লোকজন পায়ে হেঁটেই মাইজভাণ্ডার যেত।পীর গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর সন্তানদের গৃহশিক্ষক হিসেবে বাবার থাকার ব্যবস্থা হলো। ইংরেজি এবং ফারসি ভাষায় পারদর্শী বাবা স্বল্প সময়েই পীর পরিবারের আস্থাভাজন হয়ে গেলেন। পীর সাহেবের অনুরোধে তাঁর দুই সন্তানকে নিয়ে ১৯৩২ সালের কোনো এক সময়ে বাবা দিল্লি যান। তাঁর ছাত্র, দুই সহোদরের কনিষ্ঠজন ছৈয়দ শফিউল বশরকে আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটিতে অন্যজনকে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দেন।স্যার সৈয়দ আহমেদ খান ১৮৫৭ সালে উত্তর প্রদেশের আলীগড়ে মাদ্রাসাতুল উলম-মুসলমানদে-হিন্দ স্থাপন করেন যা পরবর্তী সময়ে মোহামেডান এঙ্গলো ওরিয়েন্টেল কলেজ এবং আরও পরে ১৯২০ সারে ঘোলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটিতে রূপান্তরিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয় প্রধি এক বছর পরে। এ লেখালেখির সময় অনুসন্ধিৎসু হয়েও তথ্যের জন্য ছৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারীকে ফোন করলাম। তার কাছাকাছি সময়ে পীর পরিন্দর এ জানতে চাইলাম ১৯৩২ সালে অথবা কেউ দিল্লিতে পড়াশোনা করতে গিয়েছিল কি না। তিনি জানালেন, খুরু-চিতি ওই সময়ে তাঁর পিত্য ছৈয়দ শফিউল বশর মাইজভান্ডারিকে আলীগড় ইউনিভার্সিটিতে পাঠানো হয়েছিল। বিস্তারিত তথ্যের জন্য তাঁর বড়বোন ছৈয়দা লুৎফুস্ট্রেসার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বললেন। তিনি লেখালেখি করেন। তাঁর টেলিফোন নম্বরও দিলেন।ছৈয়দা লুৎফুন্নেসা জানালেন, তাঁর বাবা ছৈয়দ শফিউল বশর মাইজভান্ডারিকে চৌদ্দ বছর বয়সে পড়াশোনার জন্য আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়েছিল। পারিবারিক ইতিহাস নিয়ে তিনি কয়েকটি পুস্তিকা লিখেছেন। আমার অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর চট্টগ্রামের বাসা থেকে বইগুলো দিতে সম্মত হলেন। সেজোভাই বইগুলো নিয়ে এলেন। একটি বইতে লিখিত তথ্য অনুযায়ী চৌদ্দ বছর বয়সে ছৈয়দ শফিউল বশর মাইজভার্জরি তাঁর সেজোভাইসহ ১৯৩২ সালে আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটিতে পড়তে গিয়েছিলেন। আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে তিনি মাইজভাণ্ডার ফেরত আসেন। বিস্তারিত কোনো তথ্য নেই। থাকার কথাও না। লেখিকার জন্মেরও অনেক বছর আগের ঘটনা।বাবার কাছ থেকেই জেনেছি, ওই সময় ভারতের উত্তর প্রদেশে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক এলাকায় জিনি বেশ কিছুদিন অবস্থান করেছেন। তাঁর ছাত্রদের

পৃ্ষ্ঠা ৭৬ নথেকে ৯০

পৃষ্ঠা:৭৬

ভর্তির ব্যাপারে এমনিতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অফিসে যেতে হয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণীতে পাঠ্যসূচি এবং পড়ানোর ধরন বিষয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন। তাঁর দেখা আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গ মাকে মধ্যে তাঁর জীবদ্দশায় আলাপচারিতায় চলে আসত। ইংরেজরা দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ফারসি ভাষার পরিবর্তে অনেক আগেই ইংরেজি ভাষা চালু করেছে। শিক্ষাদীক্ষায় পিছিয়ে থাকা মুসলমান সমাজ আরও বেকায়দায় পড়েছে।আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে কাছে থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং আধুনিক ধ্যান-ধারণায় নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন যার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়েছে তার শিক্ষকতার জীবনে। চিন্তা-চেতনায় তিনি স্যার সৈয়দ আহমেদেরভাবশিষ্য ছিলেন। দিল্লি থেকে মাইজভাণ্ডার ফেরত আসার পর পীর সাহেব একদিন বাবাকে ডেকে বললেন, এখানে থাকাটা আপনার জন্য আর নিরাপদ হচ্ছে না। আপনি সীতাকুণ্ড স্কুল থেকে এসেছেন-এ খবর পুলিশের কাছে জানাজানি হয়ে গেছে। মাস্টারদা সূর্যসেন এ অঞ্চলে পলাতক আছে বলে পুলিশের ধারণা। এদিকে পুলিশের আনাগোনাও বেড়ে গেছে। রাঙ্গামাটিতে আমার এক মুরিদ আছে। রাস্তাটি হাইস্কুলের সাথে জড়িত। চিঠি দিয়ে দিচ্ছি। সঙ্গে লোকও যাবে। চট্টগ্রাম সমরইয়ে যাওয়া নিরাপদ নয়।ফটিকছড়ি থেকে নানুপুর, রাউজান হয়ে তার বাড়ির পথপ্রদর্শককে নিয়ে বাবা পাহাড়ি পথে পায়ে হেঁটে রাঙ্গামাটি গেছরিপন। চিঠির সূত্রে রাঙ্গামাটি হাইস্কুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক ভূষণ মোহকেওয়া বাবাকে শিক্ষকের একটি পদে বহাল করে নিল। সময়টা ১৯৩২-৩৩ সায়েরা দিতে হবে।কয়েকমাস পর বাড়ী বিদ্যোৎসাহী জমিদার হাবিবুর রহমান চৌধুরী বাবাকে চিঠি লিখে পাঠাদেন। বাড়বকুণ্ড মাইনর স্কুল ক্লাস সিক্স পর্যন্ত। হাইস্কুল করতে চান। বাবাকে হেডমাস্টার হিসেবে প্রয়োজন। সীতাকুণ্ড হাইস্কুলে থাকতেও একবার নিতে চেয়েছিলেন। তখন বাবা রাজি হন নি। নতুন স্কুলের কাজে লেগে গেলেন। বাড়বকুণ্ডে এসে পুলিশের নজরদারির মাঝেও কিছুটা স্বস্তিবোধ করলেন। কয়েক বছরের আপ্রাণ চেষ্টায় হাইস্কুলটি খাড়া হয়ে গেল। এরমধ্যে বিশ্বব্যাপী ব্রিটিশ উপনিবেশে রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করেছে। হিটলার ইউরোপ দখলে ব্যস্ত। জাপান এগিয়ে আসছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে। একসময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বেঁধে পেল। জার্মান বোমা হামলায় খোদ ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ ক্ষতবিক্ষত।জাপানিরা বার্মা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে। তারা ক্যালকাটায় দু’দফা বোমা ফেলেছে। নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজ ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বসেছে। অনেক ভারতীয় সৈন্য তাঁর ফৌজে যোগ দিয়েছে। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নে ব্রিটিশরা

পৃষ্ঠা:৭৭

আশসকামী। তাঁরা ইনিয়েবিনিয়ে ভারতীয় নেতাদের বুঝাতে চাচ্ছে, জাপানিদের ঠেকাও। যুদ্ধের পর ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে চলে যাবে। না গিয়েই বা উপায় কি? এদিকে বিপ্লবীদের ওপর তাদের কড়া নজরদারির সামর্থ্য ও সময় কোনোটাই নেই। বরং ভারতের স্বাধীনতাকামীরাই এখন নড়েচড়ে বসেছে। ইংরেজ খেদাও। অন্যদিকে আলীগড় আন্দোলন এবং সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ মুসলমানদের অধিকার আদায়ে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর হাতকে শক্তিশালী করল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর ভারতের স্বাধীনতার বিষয়টিও সামনে চলে এল।কংগ্লোস-মুসলিম লীগের দ্বন্দ্ব এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় রক্তক্ষয়ের মধ্যে ১৯৪৭ সাদে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম নিল।বাবাকে এবার বাড়ি ফিরে যেতে হবে। আর কতদিন বাড়িছাড়া থাকবেন। আম্বা সন্তানদের নিয়ে নতুন বাড়িতে বসবাস করেন। গ্রামীণ পরিবেশে একা বাড়িতে বসবাসের পরিবেশ অনুকূল ছিল না। রাতের বেলায় সারা রাত হারিকেন জ্বালিয়ে বাবার অনুপস্থিতিতে দিনের পর দিন নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন। যা তার জীবনীশক্তিকে ক্ষয়ে দিয়েছে।বাবা রাজাপুর হাইস্কুলে এলেন। বাড়ি থেকেই। হল আসা-যাওয়া।ইন্ডিয়ান পোস্টঅফিস সেভিংস ব্যাংকে ২৫৩১-এ খোলা বাবার পাস বইয়ে বাড়বকুণ্ড শাখা থেকে দুইশত পঁচাত্তর টাকা ফের্সার সর্বশেষ সিল পড়ে ৪ এপ্রিল, ১৯৪৮। তখনো এগার টাকা অবশিষ্ট জন্মছিল। আমার কাছে থাকা বাবার পুরনো কাগজপত্রের মধ্যে এই পাস কিছুদিন পর আবার ডাক খাবার নেবইজে হবে। বাড়বকুণ্ড বারৈয়াঢালা মাইনর স্কুলকে হাইস্কুল করতে। হেডমাস্টার দরকার। শিক্ষকতা পেশা বাবার যুক্তি, নতুন নতুন হাইস্কুল না হলে নতুন কলেজ খুলবে কীভাবে? আগে স্কুল না খুলে কলেজ খুলে লাভ কী? ছাত্র কোথায় পাবে? আর কলেজ না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় চলবে কীভাবে। উচ্চশিক্ষার কী হবে। ধানের চারা রোপার আগে বীজতলায় বীজ বুনতে হয়। স্কুল হলো বিদ্যা শিক্ষার বীজতলা।তিন-চার বছর বারৈয়াঢালা হাইস্কুলে কাটিয়ে আবার রাজাপুর হাইস্কুলে এলেন। সাতচল্লিশে ব্রিটিশরা বিদায় নিয়েছে। একবছরের মধ্যে জিন্নাহর মৃত্যু সদ্য স্বাধীন পাকিস্তানের ভিতটাকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পাঁয়তারা চলছে।সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববাংলা সবদিক দিয়েই উপেক্ষিত। মুসলিম লীগের সমর্থক হিসেবে পরিচিত বাবা যুক্তফ্রন্টের দিকে ঝুঁকে পড়লেন। শেরে বাংলার অবদানের প্রসঙ্গ, মওলানা ভাসানীর প্রসঙ্গ আলোচনায় নিয়ে আসতেন। রাজনীতিতে কখনো খোলামেলাভাবে যুক্ত হতেন না। সামাজিক কর্মকাণ্ড শালিশ-সরবারের মধ্যেই ছিল। শিক্ষকতার পেশাতেই থেকে গেছেন।

পৃষ্ঠা:৭৮

রাজাপুর হাইস্কুলে বাবা কয়েক বছর কাটালেন। জেলা জজ আদালতে জুরি সদস্যের দায়িত্ব পালনের জন্য মাঝেমধ্যে নোয়াখালী জেলা সদরে যান।এবার নজরে এল লক্ষিয়ারা মাইনর স্কুল। বাড়ি থেকে ফেনী আসা-যাওয়ার পথে পড়ে। এটিকে হাইস্কুল বানাতে হবে। এলাকাবাসীর অনুরোধে একজন প্রবীণ শিক্ষক হাইস্কুল ছেড়ে আবার প্রাইমারি স্কুলে চলে এলেন। পদ-পদবির কোনো মোহ নাই। নিজের লক্ষ্যে অটল।১৯৬৩ সালে আত্মার মৃত্যুতে পরিবারের সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেল। বয়স্ক শুভাকাঙ্ক্ষীরা পরামর্শ দেয়, মাস্টার মিয়া সাব, আপনার এত সয়সম্পত্তি। সংসার সামলাবে কে? বাবার এক কথা, আমার সন্তানদের মন ছোট হয়ে যাবে।একসময় লক্ষিয়ারা হাইস্কুল ছাত্রে ভরপুর হলো। পাকা দালান উঠেছে। তরুণ বয়সী একজন প্রধান শিক্ষক হয়ে এসেছে।সাড়ে চার দশক আগে ব্রিটিশ ভারতের এক বিপ্লবী, নবীন পুলিশ অফিসার সরকারি চাকরি ছেড়ে ঘটনাচক্রে সীতাকুণ্ডের হাইস্কুলে শিক্ষকতার জীবন শুরু করেছিলেন। বয়স পঁচাত্তরের কোঠায় ঠেকেছে। আর কত? সংগ্রামী জীবনের দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়েছেন। । ১৯৭৫ সালে বাবা পঁয়তাল্লিক তছরের শিক্ষকতা জীবনের ইতি টানলেন।কৃষি জমিতে কাজ করছে এমন ছেলেদু করে নিতেন দ। সন্তানের পিতারা এসে আপন্তিকামীড। থেকে উঠিয়ে নিয়ে স্কুলে ভর্তি তাদের কথা, মাষ্টার মিয়া সাব তাদের ছেলেদের স্কুলের লোভ দেখিয়ে ভিতি করছে। বর্গা চাষের সময় ছেলেরা স্কুলে চলে গেলে জমিনে চাষাবাদ বন্ধ বই, বেতন কে দেবে? হবে। এমনিতেই সংসারে টানাটানি। স্কুলের বাবা কাউকে বিনা কেউটে, কাউকে বই খাতা কিনে দিয়ে পড়ালেখা চালিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দিতেন। মাঝেমধ্যে বলতেন, অমুকের ছেলেটা লেখাপড়ায় ভালো। উন্নতি করবে। এদের মধ্যে অনেকেই পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে স্বীয় কর্মক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পদে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এরকম অনেক দৃষ্টান্ত আছে।তখনকার দিনে লেখাপড়া এবং ভালো রেজাল্ট শুধু শহর কেন্দ্রিক ছিল না। কোনো অখ্যাত স্কুল থেকেও প্রকৃত মেধাবীরা বোর্ডের পরীক্ষায় প্রথম দশ-বিশজনের মধ্যে স্থান করে নিত।প্রাইমারি স্কুলে থাকতে একবার বাবার পেছনে পেছনে হেঁটে ভুলে যাচ্ছি। বর্ষাকাল। ডুবো ডুবো রাস্তার দু’পাশে পানি। বাবার পরনে পাজামা, পাঞ্জাবি, আসকান। পায়ে জুতা, মাথায় লিয়াকত টুপি। আর হাতে ছাতা। হাঁটেন সামনে বরাবর তাকিয়ে। তার হাঁটার পথে বিপরীত দিক থেকে আসা লোকজন এমনিতেই সালাম দিয়ে একপাশে সরে আসে। বয়ঙ্করা ডাকে ‘দূরমিয়া মাস্টার’।সামনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, এক ছেলে রাস্তার পাশে কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে বই-খাতা।

পৃষ্ঠা:৭৯

বাবা জিজ্ঞেস করলেন, পানিতে কেন?কোনো জবাৰ নেই।ছেলেটিকে চিনলেন, তাঁর আগের স্কুলের ছাত্র।বিপরীত দিক থেকে আসা ছাত্রটি হঠাৎ হেডমাস্টার স্যারের মুখোমুখি হবে, তাল চেয়ে রাস্তার পাশে নেমে যাওয়াটাই উত্তম মনে করেছে। আজিমপুর টিএন্ডটির বাসায় থাকার সময় ১৯৮১ সালের জানুয়ারির বিশ তারিখে পিজি হাসপাতালে বাবা মারা যান।আকাশের চাঁদ আর মর্তের তুষারের মিতালি দেখেছিলাম সান্টাক্লজের হোম টাউন নামে খ্যাত ল্যাপল্যান্ডের রোভানিয়েদিতে। আর্কটিক সার্কেল অতিক্রম করার সময় শান্তাক্লজের দেখা মিলে। একেবারে চেয়ার-টেবিল সাজিয়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে অতি চেনা পোশাকে রীতিমতো অফিস করে। শান্তারুজের ভাবভঙ্গিতে পর্যটকদের অভ্যর্থনা জানায়। স্যুভেনির শপে বলগাহরিণ টানা শ্লেজ গাড়ি, রঙ-বেরঙের স্যুভেনির এবং আসল বলগা হরিণের চামড়া দেদার বিক্রি হচ্ছে।বাইরে তুষার ঢাকা আর্কটিক সার্কেলের লাইন বরাবর একটি হলুদ-লাল ডোরাকাটা রঙের খুঁটি পোঁতা চিহ্নিত স্থানে এমণাটি শান্তরেজের সাথে দাঁড়িঞ্জে ছবি তোলে। সেখানে দাঁড়িয়েই জলরঙে বল? এরিণের ছাপমারা মোটা কাগজে সুন্দর হস্তাক্ষরে নাম লিখে প্রত্যেককে শান্তা জাকিটি সনদপত্র হস্তান্তর করে।সনদপত্রের লেখাটাও বৈচিত্র্যময়, লায় অনুবাদ অনেকটা এরকম:প্রত্যায়ন করা যাচ্ছে B তিনি ১০.২.১৯৮৯ তারিখেফিনিশ ল্যাপল্যান্ডের বেটানিয়েমির নিকট ৬৬.৩৩ ০৭ বিষুব সার্কেলের এই সুর্নিদিষ্ট স্থানটি অতিক্রম করেছেন।রেখার উত্তর এবং ২০২০.৫১ গ্রীনউইচ রেখার পূর্বে আর্কটিক মধ্য গ্রীষ্মে এখানে অবিরত ৭২০ ঘণ্টা সূর্যের আলো থাকে। ডিসেম্বরে প্রতিদিন মাত্র কয়েক ঘন্টার জন্য সূর্যের দেখা মিলে। তারপর নেমে আসে অন্ধকার। এ আঁধার কিন্তু আঁধার ময়, প্রকৃতি নিয়ে আসে তার নিজস্ব নিয়মে নানান রঙের উপহার। শুনশান নীরবতা, অনাবিল শান্তি, অফুরন্ত বিশ্রাম আর দীর্ঘ ছুটির আমেজ।আজ এবং সব সময়ের জন্য সফল হোক তোমার জীবন। বারবার আমাদের ল্যাপল্যান্ডে আসবে, তোমার জন্য এ আমন্ত্রণ রইল।

পৃষ্ঠা:৮০

পৃথিবী যদি নিজ অক্ষ বরাবর সাড়ে তেইশ ডিগ্রি হেলে না থাকত তাহলে এ সনদপত্রের ভাষা কেমন হতো? এই ঋতুবৈচিত্র্য কি থাকত।দেশ-বিদেশে অনেক ছোটখাটো সনদ মিলেছে। কিন্তু এ ভিন্নধর্মী সনদটির স্মৃতি আলাদা হয়েই থাকবে।আপাতদৃষ্টিতে বৈরী জলবায়ুর এই দেশটি কিন্তু শিল্পে উন্নত। ফিনল্যান্ডের মাথাপিছু গড় আয় বাংলাদেশের তুলনায় পাঁচগুণ বেশি। কোনো বছর তুষারপাত কম হলে এরা হা-পিতোস করে। পাহাড়ের প্রাকৃতিক ঢালুতে স্কি করতে আসা পর্যটক কমে যাবে এই আশঙ্কায়।ফিনল্যান্ডের উত্তরে আর্কটিক সার্কেলের একেবারে কাছে এখনকার তাপমাত্রা হিমাঙ্কের চৌদ্দ-পনের ডিগ্রি সেলসিয়াস নিচে নেমে যায়। গড়ে বছরে ১৭৫ দিন তিন-চার ফুট তুষারাবৃত থাকে। ১৯৯৯ সালে তাপমাত্রা একবার হিমাঙ্কের সাতচল্লিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস নিচে নেমে যায়।হেলসিংকি থেকে দলেবলে বাসে চড়ে এক শীতের রাতে বলগা হরিণের দেশে রোভানিয়েমে এসেছি। চারদিক সফেদ তুষারে ঢাকা। রাস্তার দুই ধারে পাইনগাছের ঘন বনরাজি। গাছগুলোর গোড়ার কয়েক ফুট ওপর। তুষারের নরম ার। দূরের পাহাড়ে বরফ আলো-আঁধারে জ্বলজ্বল করছে। (হট্ট ভেদ করা শীতের মধ্যেও হোটেলে ট্যুরিস্ট ভর্তি। এরা এসেছে প্রাকৃতিক পরিবেশে পাহাড়ের ঢালে স্কি করতে। মধ্যরাতে বাস হোটেলের সামনে খাতে চারদিকে তিন-চার ফুট উঁচু তুষার। হোটেল লবির কাচের জানালা দিয়ে দূর্বতী তাকিয়ে দেখলাম, বাসের চালক রাস্তার পাশে বেলচা দিয়ে তুষার দুটি খুলে নিয়ে তুষারের টেড করছে। গর্তের উপরে বাসের ইঞ্জিন স্টার্ট দেওয়ার ব্যাটারি তুষারের স্তূপ করে ঢেকে দিল। বেলচাটি তুষারে খাড়া করে রেখে দিল্লী বোধহয় তুষার ঢাকা ব্যাটারি রাখা স্থানের চিহ্ন হিসেবে। অবাক দৃষ্টিতে দেখলাম। কিছুক্ষণ পর সবাই খাবার টেবিলে জড়ো হলো। অন্যান্য খাবারের সঙ্গে বলগা হরিণের মাংসের স্টেক। টেবিলের প্রায় সবাই বেতার টেলিযোগাযোগ এবং মোবাইল ফোন সম্পর্কীয় শিক্ষা কোর্সে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দেশ থেকে আগত শিক্ষার্থী।ব্যাটারি বাসে না রেখে তুষারে চাপা দিয়ে রাখার কারণটা বাসচালককে একজন জিজ্ঞেস করল। নিরুত্তাপ করে বাসচালক বলল, বাইরের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে। রাতের তুষারের ঝড়ে তাপমাত্রা আরও নেমে যাবে। ব্যাটারি গাড়িতে থাকলে অতিরিক্ত ঠান্ডায় জমে যাবে। সকালে বাসের ইঞ্জিন স্টার্ট দেওয়া যাবে না। আরেকজন বলে উঠল, তাহলে চালক বলল, কোনো সমস্যা হবে না। তুষারের নিচে চাপা ব্যাটারি জমে যাবে না। বাইরের তাপমাত্রা থেকে তুষারের নিচের তাপমাত্রা অনেক বেশি।গ্রীষ্মাঞ্চল থেকে আগত শিক্ষার্থীরা কেউ কেউ ফ্রব্রুকুঞ্চিত করল। এবার চালক নড়েচড়ে বসে বিজ্ঞের মতো বলল, ওই যে আশপাশের পাইন এবং বার্চ গাছের

পৃষ্ঠা:৮১

চিরসবুজ বনরাজী দেখা যাচ্ছে। সেখানে দলে দলে কলগা হরিণ তুষারের গর্তে শয্যা পেতে ঘুমাচ্ছে। তারা পুরু তুষারে গর্ত করে শুয়ে পড়ে। পায়ের খুর এবং শিং দিয়ে আশপাশের তুষার টেনে নিয়ে নিজেদের তুষারে ঢেকে দেয়। শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার জন্য তুষারের ফাঁকে শুধু নাকটা যাইরে রাখে। তুষার ঝড় এবং বাইরের হিমাঙ্কের নিচের তাপমাত্রা থেকে এভাবে নিজেদের আড়াল করে তুষার শয্যায় আরামে রাত কাটায়।স্কুলের পাঠ্যবইয়ে একটা কবিতা না বুঝেই মুখস্থ করেছিলাম, যার সারাংশটি ছিল, প্রকৃতিই আমাদের প্রকৃত শিক্ষালয়।শীতের কাপড় জড়িয়ে গভীর রাতে কয়েকজন বেরিয়ে পড়লাম রিকজেভিক হোটেল থেকে। সঙ্গে একজন নিরাপত্তা কর্মী এল। নরম তুষার ঢাকা সরুপথে খাদে পড়ে যাওয়া বা পথ হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যতদূর দৃষ্টি যায় শুধু বরফ আর তুষার, মাঝে মধ্যে সবুজ গাছপালা।আকাশে চাঁদ কেমন যেন একটু ম্রিয়মাণ হয়তোবা আবহাওয়ার কারণে। কিন্তু গভীর রাতেও তুষারের শুভ্রতা কুয়াশাচ্ছন্ন রাস্তার বাতির আলোকে হার মানিয়েছে। পায়ে দুই স্তরের মোজা যেন ভিজে চপচপ। আসুদ্রা কিন্তু তা না। জুতামোজা ভেদ করা শীতে এটি এক ধরনের অনুভূতি মাত্র। স্টুডে বাইরে থাকা গেল না। উড়ে ঢুকে পড়ছে। বেশিক্ষণপরদিন সকালে সবাই এস্কিমোদের পরীষ্টগ্রইগল। এঝিমোরা পিরামিড আকৃতির বরফের ঘর ইগলুতে বাস করে। ভুলে শ্রীধা ঝাঁপির মতো দরজা খুলে ভেতরে আরামদায়ক খানে নামলে পরিবেশ কিন্তু কাঠের আগুন জ্বালিয়ে বাসিন্দারা চারদিকে গোল হয়ে বসে। ।চা কেন্দ্রীয় গরম পানির দ্বারা। আপ্যায়িত করল।সবার কানের লতিতে কষ্টটুকরো করে বলগা হরিণের চামড়া কান। ফোঁড় করার মতো করে সেঁটে দিল। এটা নাকি তাদের গোত্রভুক্ত করে নেওয়ার একটি সামাজিক আচার। কয়েক ঘণ্টার জন্য আমরা এস্কিমো গোত্রের সদস্য বনে গেলাম। ছবি তুলতে গিয়ে কেউ কেউ তাদের এ-কান ও-কান ক্যামেরার লেন্সের দিকে এগিয়ে দিচ্ছে। বাইরে বড় বড় শিংওয়ালা ঘন রোমশ চামড়ার বলগা হরিণ চরে বেড়াচ্ছে। আড়কাঠে চাকডাক বলগা হরিণের মাংস ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। জমিয়ে রাখবার জন্য বাইরের তাপমাত্রাই যথেষ্ট।বরফের মধ্যে বা ঘন জঙ্গলে ট্যুরিস্ট হারিয়ে গেলে জায়গায় জায়গায় লাল-হলুদ চিহ্ন দেওয়া টেলিফোন বুথ থেকে বিনে পয়সায় ফোন করে সাহায্য চাওরা যায়। টেলিফোনের হ্যান্ডসেট তুলতেই দূরপ্রান্তে বেরার ব্যবস্থায় যোগাযোগ করে নিজের অবস্থান সাহায্যকারীকে জানানো যায়।জনমানবহীন তুষার ঢাকা একটি আয়গায় মাটির নিচে একটি টেলিফোন একচেঞ্জ। বেলচা দিয়ে তুষার সরিয়ে দরজা খুলতে হয়। ভেতরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ। ব্যবস্থা। বেতার ব্যবস্থায় টেলিফোন কাজ করে।

পৃষ্ঠা:৮২

এটা ১৯৮৯ সালের দিকের কথা। স্কানডিনেভিয়ার দেশ নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, সুইডেন মোবাইল ফোন প্রযুক্তিতে অনেক দূর এগিয়ে আছে। আমাদের বাসে একটি মোবাইল ফোন সেট ছিল, সঙ্গে বড় ব্যাটারি। এই ফোন থেকে চলন্ত বাসে বলে বিভিন্ন দেশ থেকে আগত কোর্সে অংশগ্রহণকারীরা তাদের নিজ নিজ দেশে সরাসরি ডায়াল করে কথা বলত। যেমন আজকের আমাদের দেশে সম্ভব। তখন বাংলাদেশেও মোবাইল ফোন চালুর কথাবার্তা হচ্ছে।১৯৯১ সালের প্রথমদিকে। টিএন্ডটি মন্ত্রী কেরামত আলী মগবাজার এক্সচেঞ্জ পরিদর্শনে এলেন। একসময়ের সরকারি আমলা। বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উপস্থিত। আলোচনায় এল টিএন্ডটিতে মোবাইল ফোন চালু করা যায় কিনা। মন্ত্রী বললেন, টিএন্ডটিকেই এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। প্রকল্প তৈরি করে নিয়ে আসেন। বাকিটুকু আমি দেখব।সবাই নড়েচড়ে বসল। উর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তার যুক্তি, এখনই টিএন্ডটিতে মোবাইল ফোন প্রযুক্তি চালু করার উপযুক্ত সময়। কয়েকটি শহর ছাড়া সব জায়গাতেই মান্ধাতার আমলের এনালগ টেলিফোন, ব্যবস্থা একেবারেই নাজুক। যাপে ধাপে না ‘অঞ্চলের টেলিযোগাযোগ তাঁর ব্যবস্থায় একবারেই লিফ- ফ্রণ করতে হবে। সময়, অর্থ ও জনবলের সন্তো করে একধাপে আধুনিক প্রযুক্তির জিএসএম মোবাইলে পৌছে যাওয়া যাদে প্যান্ডফোনকেও ধাপে ধাপে ডিজিটালে পরিবর্তন করা যাবে। এ কর্মকর্ত বছরখানেক আগে আমরা কয়েকজন ফিনল্যান্ডে গিয়েছিলাম। আর একজন ঊর্ধ্বতন পাল্টা যুক্তি খাড়া করল। আমেরিকায় সিডিএমএ মোবাইল ফোন হোঁচট খাইছে। ইউরোপে জিএসএম মোবাইল ফোন এখনো হাঁটি হাঁটি পায়ে এগুচ্ছে। দাম বেশি। সতর্ক পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রযুক্তি আরও উন্নত হোক ইত্যাদি। কয়েকদিন পর অফিসার সমিতির মধ্যম শ্রেণীর কর্মকর্তারা গেল মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে। আর দেরি না করে মোবাইল ফোনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। তাদের যুক্তি টিএন্ডটি একটি বিশেষায়িত সংস্থা। এখানে প্রশিক্ষিত মেধাবী টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলীদের সমাবেশ। ব্রিটিশ আমল থেকে গড়ে উঠা অবকাঠামো, জনবল, জায়গা জমির কোনো কমতি নেই। শুধু যন্ত্রপাতির টাকা এবং কিছু কারিগরি সহায়তার প্রয়োজন হবে। নদী-নালার দেশ বাংলাদেশে বেভার ব্যবস্থা অনেক সাশ্রয়ী। প্রকল্পের মূল্য বেশি হবে না।ডিফেন্স সার্ভিসকে টেলিযোগাযোগ সহায়তা প্রদান, প্রাকৃতিক দুর্যোগে দুর্গতি এলাকায় স্বল্প সময়ে টেলিযোগাযোগ সার্ভিস দেওয়ার কুরি কুরি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো। মন্ত্রীকে স্বরণ করিয়ে দেওয়া হলো, কীভাবে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের

পৃষ্ঠা:৮৩

টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থাকে তখনকার অবস্থায় নিয়ে আসা হয়েছে, বেতবুনিয়াতে উপগ্রহ ভূকেন্দ্র চালু হয়েছে, বেতার ব্যবস্থায় দেশে বিদেশে সরাসরি ডায়ালিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, সত্তরের প্রলংকরী ঘূর্ণিঝড়ে বিধায় দক্ষিণাঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় টেলিযোগাযোগ প্রকল্প কীভাবে বাস্তবায়ন করে বেতার ব্যবস্থায় আধুনিক টেলিযোগাযোগ পদ্ধতি চালু করা হয়েছে।মন্ত্রীর কাছে মোবাইল ফোন চালুর স্বপক্ষে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণে মধ্যমশ্রেণী কর্মকর্তাদের এটা ছিল আপ্রাণ চেষ্টা। মন্ত্রী মনোযোগ দিয়ে সব শুনলেন। স্বভাবসুলভ মৃদুকণ্ঠে বললেন, টেকনিক্যাল দিকটা আমি তেমন বুঝি না। আপনাদের ভেতরেই দ্বিমত। একজন এক ধরনের কথা বলে। প্রকল্প বানিয়ে মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।স্বপ্নের সে প্রকল্প আর মন্ত্রণালয়ে গেল না। বহু বছর পর বেসরকারি মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলির অনেক পেছনে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সরকারি টেলিটক মোবাইল ফোন এল। খোঁড়ানি রোগ এখনো সারে নি। যারা সেদিন বাধা দিয়েছিল, তাদের অনেকেই অবসর গ্রহণের পরপরই এমনকি অবসর প্রস্তুতিকালীন ছুটিও সমর্পণ করে মোটা বেতনে বেসরকারি মোবাইল ফোন কোম্পানিকে উঠিযদিন চাকরি করেছে।জ্যোৎস্না, সমুদ্র আর পাহাড় একসাথে ঘটা একবার ধরা দিয়েছিল বিদেশের মাটিতে, একার্থী। পাঠকের বিরক্তির বৃদ্ধনিষাবে জেনেও প্রাসঙ্গিক কিছু ঘটনা উল্লেখ করার লোভ সামলাতে পারছি না। বেনিতে শিবের গীত মনে করে ফেলে দেবেন না এ ভরসায়।ইংল্যান্ডের সর্ব বিষয়টি মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন।স্টিমে পোর্থ কার্নোর পেঞ্জাঞ্জ সীমান্তে ল্যান্ডসএন্ড। জায়গাটির নামের বাংলা অনুবাদ হতে পারে ভূমির একেবারে শেষ সীমানা। পাতায় আঙুলের নখের মতো বাড়ানো পাথরের সরু ভূ-খণ্ডের সীমানা সাগরে নেমে গেছে। ১৯৯০ সালে এখানকার ক্যাবল এন্ড ওয়্যারণে কলেজে বেতার তরঙ্গ ব্যবস্থাপনার ওপর এক কোর্সে অংশগ্রহণের জন্য এলাম। কোর্সের শিক্ষক প্রফেসর বধ অসাধারণ পদ্ধতিতে পড়িয়ে এবং হাতে কলমে শিখিয়ে তরঙ্গ ব্যবস্থাপনার বাতাসে যতক্ষণ অক্সিজেন আছে ততক্ষণ তার মূল্য আমরা বুঝি না। অক্সিজেনবিহীন পরিবেশে যেমন কোনো প্রাণী বাঁচতে পারে না তেমনি বেতার তরঙ্গ না হলে কোনো বেতার যোগাযোগ, সম্প্রচারসহ বিশ্বের মধ্যে এবং মহাবিশ্বের সাথে কোনো বেতার যোগাযোগই সম্ভব হতো না। বেতার তরঙ্গ স্বাভাবিক ইন্ডিয়ের ধরাছোয়ার বাইরে। কিন্তু এক একটা দেশের জন্য আধুনিক টেলিযোগাযোগ নির্ভর বিশ্বে এর মূল্য অপরিসীম। কত অপরিসীম তা অংক কষে বের করা দুষ্কর। শুধু

পৃষ্ঠা:৮৪

একটি নির্দিষ্ট এলাকার জন্য ব্যবহারযোগ্য এক একটি ক্ষুদ্র ব্যান্ডের ফ্রিকোয়েন্সি দাম যখন খোলা অকশানে বিলিয়ন ডলার উঠে, তখন বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন ব্যান্ডের ফ্রিকোয়েন্সির মূল্য কত হতে পারে তা দিন দিন কল্পনার বাইরে চলে যাচ্ছে।কলেজের শিক্ষা কোর্সে বেতার তরঙ্গ ব্যবস্থাপনার বিষয়টি সভের-আঠার বছর পর টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে থাকার সময় খুব কাজে লেগেছিল। বেভার তরঙ্গের সঠিক বণ্টন, ব্যবহার এবং ব্যবস্থাপনা একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।বেতার তরঙ্গের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য শুধু ন্যাশনাল ডাটাবেজ নয়, আন্তর্জাতিক মাস্টার ফ্রিকোয়েন্সি রেজিস্টার (MIFFR) নামক ডাটাবেজেও রেজিস্ট্রি করে নিতে হয়। দেশের অভ্যন্তরে কেউ বিনা অনুমতিতে বেতার তরঙ্গ ব্যবহার করছে কি না তার জন্য থাকতে হবে তরঙ্গ মনিটরিং ব্যবস্থা।আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ক্ষেত্রে, বিশেষ করে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে একই তরঙ্গ ব্যবহার নিয়ে কোনো বিতর্ক দেখা দিলে যে দেশ আগে MIFR-এ বেতার তরঙ্গ রেজিস্ট্রি করে রেখেছে তারা অগ্রাধিকার পায়।আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (TL)-এর নিয়ন্ত্রণাধীন MIFH দেশের বেতার তরঙ্গের জন্য একটি আন্তর্জাতিক এবং বেতার তরঙ্গ নির্ধারণের ক্ষেত্রে যে দেশ রক্ষাকরকাটেলাইটের জন্য অরবিট মোগে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে সে দেশকে তত কামেলা কম পোহাতে হয়-এ বিশ্ব টেলিযোগাযোগ সম্মেলনের, চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল আলমসহ জেনারেল হামাদুন-তুরে-এর সহায়তা চাওয়া হলো। টাকে জেনেভার সদরদপ্তরে কমিশনের হশের প্রতিনিধিগণ ITU-এর সেক্রেটারি দেখা করে বাংলাদেশের পক্ষে দুটি বিষয়ে বাংলাদেশের বেতার ঔরঙ্গ MIFR-এ রেজিস্ট্রির জন্য বিশেষজ্ঞ সহায়তা এবং নিজস্ব স্যাটেলাইটের জন্য অরবিট বরাদ্দসহ কারিগরি সহায়তা।সহায়তার আশ্বাস পাওয়া গেল। একটি প্রস্তাব তৈরি করে সেদিনই জমা দেওয়া হলো। কয়েক মাস পরেই তিনজন ITU বিশেষজ্ঞ ঢাকায় এসে MIFR-এর উপর প্রশিক্ষণ দিয়ে দেয় এবং কমিশন বেতার তরঙ্গ রেজিস্ট্রেশনের কার্যক্রম শুরু করে।স্যাটেলাইট অরবিট বিষয়ে সেক্রেটারি জেনারেল সেদিনই সংশ্লিষ্ট পরিচালকের সাথে একটি সভার ব্যবস্থা করেন। বাংলাদেশ প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে রেকর্ডপত্র দেখে ITU-এর পরিচালক জানালেন, সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য একটি অরবিট নির্ধারিত আছে। তবে বাংলাদেশ এ অরবিটের জন্য আবেদন করে নি। তাছাড়া আশপাশের কয়েকটি দেশ যেমন, চীন, ভারত, ইরান, হংকং যারা আগেই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করেছে তাদের স্যাটেলাইট বাংলাদেশের স্যাটেলাইটের অরবিটে বিরূপ প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা থাকতে পারে। এসব দেশ এবং স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করছে আরও অনেকগুলি দেশ থেকে বাংলাদেশকে অনাপত্তিপত্র নিতে

পৃষ্ঠা:৮৫

হবে। প্রয়োজনে বিকল্প অরবিটের ব্যবস্থা করা যাবে। তখন থেকে শুরু করা কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে বিষয়টি এগিয়ে যাচ্ছে। এটাই আশার কথা।ল্যান্ডসএন্ডে কলেজের অদূরে সমুদ্রের পাড়ে পাথর কেটে বানানো একটি আন্ডারগ্রাউন্ড মিউজিয়ামে সেই প্রথমদিক আমলের সব টেলিগ্রাফ ও বেতার যন্ত্র সংরক্ষিত আছে। ১৮৭০ সালে এ জায়গা থেকেই প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক সাবমেরিন টেলিগ্রাফ ক্যাবল চালু হয়, যার বিস্তৃতি ছিল সুদূর ভারত পর্যন্ত। এ জায়গা থেকেই ১৯০১ সালে মোর্স কোড ও বেতায় টেলিগ্রাফি ব্যবহার করে বিজ্ঞানী মার্কনি প্রথমবারের মতো ব্রিটেন থেকে আটলান্টিক মহাসাগরের ওপারে আমেরিকায় বেভার সিগনাল প্রেরণ করে দূর পাল্লার টেলিযোগাযোগের সূচনা করে। প্রায় একযুগ পর ডুবন্ত জাহাজ টাইটানিক থেকে ১৯১২ সালে মার্কনির আবিষ্কৃত বেতার যন্ত্র ব্যবহার করে আশপাশের বিপদ সংকেত পাঠানো হয়েছিল। হিমশীতল পানিতে ভাসমান নারী ও শিশুসহ অনেক মরণাপন্ন যাত্রীকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল।মিউজিয়ামের বাইরে এক পে-ফোন বক্স আছে। কলেজের বারান্দায়ও কয়েকটি পে-ফোন আছে, যেখান থেকে বিদেশি ছাত্রছাত্রীরা কয়েন ঢেলে নিজ নিজ দেশে কথা বলে। সারা দিন সময় পাওয়া যায় না। ডিনারের পর হোনিগুলোতে লম্বা লাইন। রাত বাড়ার অপেক্ষায় থাকতে হয় ।। বেশি রাত করার । সকালে ক্লাস আছে।একদিন রাত একটার দিকে কয়েন হাকে হোস্টেল রুম থেকে বেরিয়ে এলাম। পে-ফোন খালি পাব এই আশায়। প্রশিক্ষণার্থী তিনটা পে-ফোনের ইয়া দশা সাইজের ভিনদেশীয় তিনজন আরও কাছে গিয়ে দেখলাম একজন হ্যান্ডসেট কানে লাগিয়ে চেয়ারের উপর নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। অন্যজন দেয়ালে হেলান দিয়ে বসা, চোখ ঢুলুচুর নাকের ডগায় হ্যান্ডসেট ঝুলছে। আরেজনের কাত হয়ে শোয়া, বুকের উপর উক্ত হাতে ধরা হ্যান্ডসেট অন্য হাতে বোতল। চারদিকে ডজন দুয়েক বিয়ারের খালি বোতল, ক্যানের ছড়াছড়ি। বেহেড মাতাল অবস্থা। তাদের দেহের সাইজের দিকে তাকিয়ে মাতালদের ঘাঁটাতে সাহস হলো না।পায়চারি করতে করতে রাস্তায় নেমে এলাম। চারদিক চাঁদের আলোয় আলোকিত। মিউজিয়ামের দিকে এগিয়ে গেলাম। পে-ফোনে কয়েন চালাচালি করে কোনো কাজ হলো না। কয়েন ফেরত আসে।কানে এল সমুদ্রের গর্জন। এত কাছে সমুদ্র, দিনে খেয়াল করি নি। কয়েকটি ধাপ ভেঙে একটি উঁচু জায়গা। দুটি কাঠের বেঞ্চ। চন্দ্রালোকিত সফেদ ফেনা অনেকটা উঁচুতে উঠে মুক্তোর মতো ঝরে পড়ছে। সামনে উঁচুনিচু কালো পাথরের উপর ঢেউ আছড়িয়ে পড়ছে। পানির ফোঁটা অনেক দূর উপরে উঠে আবার নিচে পড়ছে। সামনে ভানে বাঁয়ে সমুদ্র। একেবারে খোলা, কোনো নৌযান বা জনমানবের চিহ্ন নেই।চাঁদের আলোতে অনেক দূরের ঢেউয়ের সাদা অংশটুকুও দেখা যাচ্ছে। অদূরে খাড়া পাহাড়ের ঢালে ঢেউয়ের ফেনাসিক্ত কালো অমসৃণ পাথরে ঠিকরে পড়া চাঁদের

পৃষ্ঠা:৮৬

আলো। কালো পাথরের রূপকে করেছে অপরূপ, যার বর্ণনা এ লেখনীতে আসবে না। আঁধারের রূপ বর্ণনা শরৎচন্দ্রের কাজ।গভীর রাতে নির্জন সাগরের পাড়ে বিদেশ ভূমিতে চাঁদের আলো মেশানো এমন নৈসর্গিক দৃশ্য একজীবনে একবারই ধরা দেয়।দেশে ফেরার পথে কন্তোস বিমানে রাতের ফ্লাইটে সিডনি থেকে ব্যাংকক আসছি। ১৯৯৪ সালে স্যাটেলাইট প্রযুক্তির উপর একটি সেমিনারে গিয়েছিলাম। বিমানে ডিনার শেষে যাত্রীরা সিটে হেলান দিয়ে বিশ্রামরত। যাত্রী কেবিনের বাতি নেভানো। সামনের সিটের যাত্রী বাঁ দিকে জানালার কভারটা উপরে তুলল। তার গায়ে আলোর ছটা। দেখাদেখি আমিও আনালার কভার খুলে বাইরে তাকালাম।ঠিক জানালা বরাবর বাইরের আকাশে গোলাকার চাঁদ। আলো মুখের উপর এসে পড়ল। মনে হলো জানালা দিয়ে হাতটা বের করতে পারলেই হাত বাড়িয়ে চাঁদটাকে ছোঁয়া যাবে। পঁয়ত্রিশ হাজার ফুট উপরে তারকাখচিত নির্মল আকাশ। অনেক নিচে পেঁজা তুলার মতো ঢেউ খেলানো ধবধবে সাদা মেঘের স্তর। সানা মেঘের ওপর যেন জোছনার চাদর বিছিয়ে দেওয়া উয়েছে। আলোয় আলোময়। পরিষ্কার আকাশের ভারাগুলো আরও উজ্জ্বল দেশ । জানালার পাশে দেখা চাঁদটি যেন আকাশের তারা আর নিচে মেঘের অবাক কাণ্ড। কয়েক ঘণ্টা জানালার আড়াল হচ্ছে না। ধরে লাঙ্গনে বেলুনের মতো ভেসে আছে। চনালার আশপাশ থেকে দেখা যাচ্ছে। একটু ভেবে দেখলাম, এই কোনো দৈব ব্যাপার নয়। চাঁদ পূর্বাকাশ থেকে পশ্চিমাকাশের দিকে যাচ্ছে। টিদিক থেকে পশ্চিম দিকে যাওয়া কান্তাস বিমানের নেভিগেশন রুটে ধাবমান বিমান ও চাঁদের আপেক্ষিক গতি শূন্যের কাছাকাছি ছিল। সৌর জগতের সবকিছু ধরাবাধা নিয়মে চলে।কারণ যাই হোক, সে রাতে আকাশে উড়ে যাচ্ছি, আর পূর্ণিমার চাঁদ জানালার ওপাশে থেকে আমার ভ্রমণ সঙ্গী হয়েছিল। এটাই বা কম কী!ডিসেম্বর ১৯৯৭। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির আওতায় খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে অস্ত্র সমর্পণ অনুষ্ঠান। প্রধানমন্ত্রী আসবেন। অনুষ্ঠানে যোগ দেবে দেশি-বিদেশি অতিথি এবং সাংবাদিকেরা। স্টেডিয়াম থেকে হটলাইনসহ টেলিযোগাযোগের ব্যবস্থা থাকতে হবে। তখন ওই অঞ্চলে মোবাইল ফোন চালু হয় নি। পার্বত্য জেলার সঙ্গে টেলিযোগাযোগের যা ব্যবস্থা আছে তাও অপর্যাপ্ত। ঢাকায় টেলিফোনের পরিচালক হিসেবে কাজ করছি। নির্দেশ এল অনুষ্ঠান উপলক্ষে খাগড়াছড়ি যেতে হবে।খাগড়াছড়ি এক্সচেঞ্জের পরিদর্শন রুমে উঠলাম। সহকর্মীদের আপ্রাণ চেষ্টায় দুদিনের মধ্যে বিকল্প রেডিওলিংক বসিয়ে ঢাকার সঙ্গে উন্নতমানের যোগাযোগ ব্যবস্থা

পৃষ্ঠা:৮৭

স্থাপন করা হলো। বিপত্তি দেখা দিল স্টেডিয়াম থেকে এক্সচেঞ্জ পর্যন্ত যোগাযোগ স্থাপনে। নিম্নমানের পুরাতন স্থানীয় ক্যাবলের মাধ্যমে ভালো মানের সংযোগ হচ্ছে না। পরের দিন সকালে অনুষ্ঠান। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে খাগড়াছড়ি এক্সচেঞ্জের বেতার প্রকৌশলী সহকর্মীদের প্রাণান্তকর অবস্থা। নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রশাসন উদ্বিগ্ন। বারবার খোঁজখবর নিচ্ছে। রাতের দিকে একটা অবস্থায় এল।শ্রান্ত ক্লান্ত হয়ে মধ্যরাতে পরিদর্শন রুমে এলাম। রুমটা এক্সচেঞ্জের দোতলায়। খাওয়াদাওয়া বাদ দিয়ে বাতি নিভিয়ে সরাসরি বিছানায়। ঘুম এল না। কী যেন এক অস্থিরতায় পেয়ে বসল। কয়েক ঘন্টা পরে অনুষ্ঠান। সব ঠিকঠাক থাকবে তো?সেদিনের খবরের কাগজটা হাতে নিয়ে নড়াচাড়া করতে করতে রুমের দরজা খুলে বাইরে এলাম।আমার জন্য অপেক্ষা করছিল এক বিশ্বয়কর অবাক করা দৃশ্য। রুপালি আলোয় চারদিক ঝলমল করছে। গাড়ি বারান্দার উপরে ছাদের খোলা জায়গা থেকে চাঁনটা নজরে এল।পূর্ণিমার চাঁদ কিংবা দু’একদিন আগে পরেরও হতে পারে। মফস্বল শহরে দূষণমুক্ত শীতের নির্মল আকাশ। গর্জীর রাতে সুন নীরবতার মাঝে চারদিক। আলোর আলোময়। একপাশে উঁচুনিচু পাহালের সবুজ বনানীর সাথে আলোর মিতালি। অনেকক্ষণ বসে থাকলাম। সময় যে এর্নেমে গেছে। নির্মল প্রশান্তিতে ক্লান্তি ভাব দূর হয়ে গেল।হাতের পত্রিকাটি উল্টের শিরোনাম আগামীকাল পার্ব চট্টগ্রামে দুই যুগের গৃহযুদ্ধের অবসান। রুম থেকে টুলের মতো একটি আসন এনে বসলাম। চাঁদের আলোতেই পড়ে ফেললাম। পত্রিকার প্রধান স্থান ও কালভেদে একই চাঁদ ধরা দেয় ভিন্ন ভিন্ন রূপে। প্যারিসের সিন নদীতে। রাত্রিকালীন নৌ বিহারে একবার চাঁদকে দেখলাম, আইফেল টাওয়ারের মাথা বরাবর। নদীর বাঁকগুলো এমন যে চলন্ত জাহাজ থেকে মনে হয় আইফেল টাওয়ারের চূড়া যেন চাঁদের পিছু ছাড়ছে না। এমনিতেই রাতের প্যারিসের দৃশ্য পর্যটকদের কাছে বরাবরই আকর্ষণীয়।মনের অজান্তেই যেন চমকে উঠতে হয়, এটা তো আমাদের দেশের চাঁদ। আকাশের চাঁদ যে সবার, মন এটা মানতে চায় না।দেশে-বিদেশে চলার পথে কিছু ক্ষণিকের দৃশ্যও মনে ছাপ ফেলে যায়। বারবার ফিরে তাকাতে ইচ্ছা করে। মনে হয় এ জীবনে আর একবার এখানে আসা হবে না। টোকিওর রাস্তার দু’ধারে তুষার জাত হয়ে নত চেরীফুল দেখে ভাবতে হয় কোনটি বেশি মনোরম, ধবধবে নরম তুষার না চেরীগাছের ডালে প্রস্ফুটিত চেরীফুল। অথবা দুটো মিলিয়ে অন্য এক অপরূপ দৃশ্য! সকালে এক রকম, রাতে নিয়ন আলোতে

পৃষ্ঠা:৮৮

অন্যরকম আর পার্কের চাঁদের আলোয় ভিন্নরূপে মায়াবী রঙের চেরিফুল।ভোরের আলোতে তুষার স্নিগ্ধ সিউলের হান নদীর ধারে রাস্তার একপাশে কুয়াশা ঢাকা নদী অন্যপাশে ফুটন্ত চেরিফুল গাছের সারি চলন্ত গাড়িতে বসা বিদেশির রাতের অতৃপ্ত ঘুম ঘুম দুচোখকেও জুড়িয়ে দেয়।ওয়াশিংটন ডিসিতে চেরি ব্লজাম ফেস্টিভেলে হাজার হাজার পর্যটকের ভিড়। মার্চের একদিন নিউইয়র্ক থেকে আরিফ নিজে গাড়ি চালিয়ে সবাইকে নিয়ে গিয়েছিল এই রাজধানী শহরে। সাথে সেলিনা ও সামিহা। হোয়াইট হাউস কেন্দ্রিক এ এলাকাটি মনুমেন্ট, মেমোরিয়াল হল, লেক, ব্যগান নিয়ে এমনিতেই আকর্ষণীয়। সব বয়সী দেশি-বিদেশি মানুষজন আয়েসি ভঙ্গিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মা-বাবাদের কোলে- পিঠে শিশুরা। সবাই সবকিছু যেন ক্যামেরাবন্দি করে নিতে চায়। হিমেল বাতাসকে কেউ পরোয়া করছে না।এমন কনকনে শীতের আমেজই চেরিফুলের এ স্বর্গোদ্যানের জন্য উপযুক্ত। ফুলের রিগ্ধতা আর কাকে বলে। চেরিফুলের সমারোহে দাঁড়িয়ে বিদগ্ধজনের ভুল ভাঙতে দেরি হয় না, শুধু জাপানই চেরিফুলের রাজা। অবশ্য এই শহরে প্রথম চেরিফুল গাছ আসে ১৯১২ সালের বসন্তে। টোকিও শহরের মেয়র বন্ধুত্বের নিদর্শন স্বরূপ গাছের চারাগুলি তখন ওয়াশিংটন শহরেক টুপ্ররের। উরের কাছে পাঠিয়েছিল।জাপানের প্রাচীন রাজধানী শহর কিয়োতোন টোকিও থেকে ট্রেনে গেলে বুলেট ট্রেনে চড়তে হয়। হেমন্তের শেষ বিক্রেজটি বাতাস জানান দিচ্ছে, শীতের আগমনি বার্ডার, হালকা তুষারপাতের। পার্কের সাঁপল গাছের পাতাগুলো ঝরে পড়ার আগে এক একটা যেন লালচে হলুদ রঙে স্কুল। স্কুল হয়ে গিয়েছে। গাছতলায় পাতার পর পাতা করে পড়ছে। চারদিকে ছেমভিটীগো লালিমা আভা। ওরে পড়ার আগে সব ম্যাপল পাতাই এরকম বর্ণিল হয়ে তুয়ি।এখানে সেখানে কয়েকটি গাছে শীতের ফুলের কুঁড়ি উকি দিচ্ছে। ঋতু পরিবর্তনের চক্রে প্রকৃতির নবরূপে সাজার প্রস্তুতি। বেঞ্চে বসে থাকা অনেকেই সহযাত্রীদের ভাড়া খেয়েও উঠতে চায় না।ম্যাপলপাতা ঢাকা পার্কের এককোণে পুরাতন আমলের কাঠের রেস্তোরা। এশিয়া প্যাসিফিক দেশগুলো থেকে আপান সরকারের আমন্ত্রিত টেলিযোগাযোগ ক্ষেত্রে কাজ করা অতিথিদের জন্য বিশেষ ডিনারের আয়োজন। মধ্যরাত পর্যন্ত জাপানি ঐতিহ্যের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। মন এমনিতেই চনমনে। বাইরে ম্যাপল পাতার রঙ আর চাঁদের আলো মেশানো মনোরম দৃশ্য। পার্ক ছেড়ে আসার সময় সবাই বারবার পেছনে তাকাচ্ছে। স্পেনের বার্সেলোনায় থাকতে ছুটির দিনের ফাঁকে আয়োজকেরা বিদেশি অতিথিদের। সাদা পাথরের পাহাড় দেখাতে নিয়ে গেল। গিয়ে মনে হলো, যেন সাদা মার্কেল

পৃষ্ঠা:৮৯

পাথরের তৈরি উঁচু-নিচু সব ভাষ্কর্যের সারি। শত শত বছর ধরে বাতাসের সঙ্গে ঘর্ষণে মসৃণ হয়ে এক-একটা পাথর একভাবে অবয়ব ধারণ করেছে। ছোট আকারের একটি জোড়া পাহাড় হয়ে গেছে অবিকল যুগল মূর্তি। ছোট ছোট গুলুবেষ্টিত পাহাড়ি অঞ্চলটি যেন এক জীবন্ত শ্বেতপাথরের নিবাস।একজন ভিনদেশি পর্যটক বলল, এখানকার সত্যিকার দৃশ্য উপভোগ করতে হলে আসতে হবে চাঁদনি রাতে। কিছু দুঃসাহসিক পর্যটক প্রায় প্রতিবছরই এ সময় আসে। একবার এলে বারবার আসে।কল্পনা করতে চেষ্টা করলাম এ দুর্গম অঞ্চলে এমন পরিবেশে চাঁদনি রাতের দৃশ্য কেমন হবে। নাহ! কল্পনায় আনা সম্ভব নয়। স্বপ্নপুরী স্বপ্নেই থাক। বাস্তবে দেখার সুযোগ নাই বা পেলাম।পাহাড়ঘেরা এক জনবসতি কোনো এক জাদুকরের জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় পাথর বনে গিয়েছিল-এটা কি সে রূপকথার জায়গা?পাহাড়ের গায়ে খাড়া পথে রেললাইন বসানো ক্যাবলটানা ট্রেনে আর একটু উচুতে গেলে ফুল-ফলের প্রাকৃতিক বাগান। জলপাই গুছের ডালগুলো ফলের ভারে নিচে নেমে এসেছে। বড় বড় টক মিষ্টি জলপাই ডাও একটি বাধা নেই। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে পাকা। লেবু। মুখে পুরতে কোনো এখানকার পাহাড়ি ছাগলের দুধে তৈরিচিত ধরনের সুস্বাদু পনির কেনার জন্য রাস্তার ধারে অস্থায়ী দোকানগু কায়দায় মোড়ানো এ পনির স্যুভেনির ছিসেবে স্থানীয় ঐতিহোয় মনকাড়াদোলেরে সুভেনির ও মিষ্টি বিক্রি করল FM-আশাক পাতায় বিশেষ সবাই নিতে চায়। বিক্রেতা তরুণীরা পরে হরেকরকমের ঘরে তৈরি সাইপ্রাসের নিকোশিয়া শহরে পড়ন্ত বিকেলের খোলাবাজারে ছোটখাটো টিলার মভো উঁচু উঁচু সব কমলার স্তূপ। ভূ-মধ্য সাগর অঞ্চলের মিষ্টি ফল। রঙও মিষ্টি। বিদেশিরা নানাভাবে ছবি তুলছে। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে দেখা যায় রাস্তার পাশে সারিবদ্ধভাবে কমলার গাছ। ছোট ছোট গাছভর্তি কাঁচা-পাকা কমলা। হাঁটার পথে হাত দিয়ে গাছের ডালের পাকা কমলা ছোঁয়া যায়। গাছের নিচে পাকা কমলা ঝরে পড়ে ছড়িয়ে- ছিটিয়ে আছে।সুন্দর এক দ্বীপ-দেশ। প্রেমের দেবী আফ্রোদিতি এ দ্বীপে সমুদ্রের ফেনা থেকে জন্ম নিয়েছে বলে মিথ আছে। নিকোশিয়ার বেশির ভাগ মেয়ের মুখের আদল গ্রিকদের মতো। শহরের অলিগলি দিয়ে আন্তর্জাতিক বর্ডার। উত্তর সাইপ্রাস তুরস্কের নিয়ন্ত্রণে।বাংলাদেশের ছেলেরা সাইপ্রাস বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যায়। সেখান থেকে কোনো এক ফাঁকে ইউরোপে পাড়ি জমায়। এদের বয়স কম। এমন বয়সই ঝুঁকি

পৃষ্ঠা:৯০

নেওয়ার উপযুক্ত সময়। আশির দশকের শেষে ফিনল্যান্ড থাকতে হেলসিংকি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত চব্বিশ-পঁচিশ বছর বয়সী এক বাঙালি ছাত্রের সাথে দেখা হয়েছিল। প্রায়ই সন্ধ্যায় হোটেলে আসত। ঢাকার বাড্ডা এলাকার মধ্যবিত্ত ঘরের এই ছেলেটি সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে ঢাকা-মস্কো বিমানে টিকিট কেটে ট্রেনে রাশিয়ার সর্ব পশ্চিমাঞ্চল শহর সেন্ট পিটার্সবার্গ হয়ে জাহাজে ফিনল্যান্ড উপসাগর পাড়ি দিয়ে হেলসিংকি শহরে হাজির হলো। সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে খরচ লাগে না-এ খবর আগেই নিয়েছিল। পার্ট-টাইম কাজ করে। তার ইচ্ছে, পড়াশোনা শেষ করে ইউরোপের অন্য কোনো দেশ অথবা আমেরিকায় পাড়ি জমানো। মেধা যাই থাক, এ ধরনের সাহসী তরুণদের জীবনে কোথাও ঠেকে যাওয়ার কথা নয়।এককালে ইউরোপীয় দেশগুলোর নাবিকেরা সাহলে নির্ভর করে পালতোলা জাহাজ এবং বাষ্পীয় জাহাজে চড়ে ভারতবর্ষ, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়েছিল। সেখানকার ধন-সম্পদ কুড়িয়ে নিয়ে নিজেদের দেশকে সমৃদ্ধশালী করেছিল। উত্তর আমেরিকায় নিউ ওয়ার্ল্ড আর অস্ট্রেলিয়ায় নতুন বসতি স্থাপন করেছিল।ক্যালিফোর্নিয়া সিয়েরা নেভেদার গ্রানাইট পাথঞ্জের সর্বতমালা এলাকায় ইয়োসেমি ন্যাশনাল পার্ক। জাকারিয়া স্বপন নিজে গাড়ি উঠলয়ে নিয়ে গিয়েছিল এই প্রাকৃতিক পার্কে। দুই থেকে তিন মিলিয়ন বছর আগে গ্রানাইট পাথরের দেয়াল বারবার হিমবাহের সঙ্গে ঘর্ষণে ক্ষয়ে পাহারের ভূঁড়া থেকে প্রায় আধা মাইল নিচে ইংরেজি ‘U’ অক্ষর আকৃতির ঝুলন্ত ভূপিতাকা সৃষ্টি হয়েছে। পার্কের এখানে-দেখানে খাড়াভাবে নেমে গেছে বর্ণ্য বুজিবীর সর্বোচ্চ ঝর্ণার পাঁচটি কর্ণা এখানে। আনাচে- কানাচে আছে ছোট-বড় তিন হাজারের বেশি লেক। পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে, উপত্যকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য স্রোতধারার মিলিত দৈর্ঘ্য সতের শত মাইল।সিয়েরা নেভেদার উত্তর দিকের চূড়া থেকে টোলুম নদী এবং দক্ষিণ দিকের চূড়া থেকে মার্সে নদীর উৎপত্তি। মার্সে নদীর বরফগলা পানি পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে পাহাড়ের উচুনিচু ঢাল বেয়ে এঁকেবেঁকে চলে গেছে। নদীর বাঁকগুলো উপর থেকে নিচের দিকে এমন, যেন নদী নিজেই ঢেউয়ের আদলে নিচে নেমে যাচ্ছে।ইয়োসেমি উপত্যকায় জড়ো হাওয়া পর্যটকেরা মাথার উপর দূরে, পাহাড়ের চূড়া, বরফ, নদী আর আকাশকে ক্যামেরার একই ফ্রেমে বন্দি করছে। একটু পরিষ্কার আবহাওয়ায় সন্ধ্যাকাশে অর্ধফালি চাঁদও একই ফ্রেমে এসে যায়। প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রকৃতির চেহারাই আলাদা। বন্যেরা বরাবরই বনে সুন্দর।সানফ্রান্সিসকোর গোল্ডেনগেট ব্রিজ পার হয়ে গাড়িতে কিছুক্ষণ গেদেই দেখা মেলে রেড উড ফরেস্টের। এ ফরেন্টের গাছের কাঠ লালচে বাদামি রঙের। বাকলের

পৃ্ষ্ঠা ৯১ থেকে ৯৭

পৃষ্ঠা:৯১

ফাঁকে জমাট রক্তিম কষ। এক একটি গাছ ৩২০ ফুটেরও বেশি উঁচু হয়। বিশ তলা ইমারতের সমান উঁচু। নিচ থেকে গাছের মাথা দেখা যায় না। পুরাতন গাছের কান্ডের বেড় ২৪ ফুটের মতো। আটজন মানুষের দুই প্রসারিত হাত লাগবে, কাণ্ডের চারদিকে বেড় দিতে।চৌদ্দ কোটি বছর আগে ডাইনোসরের যুগেও এ গাছের অস্তিত্বের প্রমাণ মিলে। তখন থেকেই এ প্রজাতির গাছের বংশ টিকে আছে। কোনো কোনো গাছ দুই হাজার বছরের অধিক সময় পর্যন্ত বাঁচে। কিছু গাছ সেই রোমান সাম্রাজ্যের আমল থেকেই কালের সাক্ষী হয়ে আছে। মধ্য ক্যালিফোর্নিয়া থেকে দক্ষিণ অরিগন অঙ্গরাজ্য পর্যন্ত প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল বরাবর রেড উড গাছের দেখা মিলে।মজার ব্যাপার হলো, এত উঁচু বিরাট গাছের বিচিগুলো একেবারে ছোট ছোট। লক্ষাধিক বিচির ওজন মাত্র এক পাউন্ড।ক্যালিফোর্নিয়া নেভেদা সীমান্তে সেক্রেমেন্টো হয়ে গেলাম মিষ্টি পানির হ্রদ লেক তাহো দেখতে। সহকর্মী কর্নেল সায়েফের উদ্যোগে ছুটির দিনে এ ভ্রমণ। তার বড়বোনের ছেলে থাকে সেক্রোমেন্টোতে। সফটওয়ার নিয়ে কাজ করে। বয়সে তরুণ। এক ডানপিটে ছেলে। মামাকে পেয়ে এ উপরি শতগুণে বেড়ে গেছে।তার গাড়ি চালানোর গতি আটকানো গুলো না। লেকের কাছাকাছি জায়গায় দু’পাশে বনের মাঝখানের রাস্তায় পুল্লিশ তাড়ি। ড়ি থামানোর সংকেত দিল। শ্বেতাঙ্গ মহিলা পুলিশ। রাস্তার পাশে কোদে অউেঠালে গাড়িতে ওত পেতে ছিল। । ছয় ফুটের বেশি লম্বা। হাতে ব্যাটন, কোমরে নিষ্ঠল। বলল, তুমি স্পিড লিমিট অতিক্রম করেছ।চালকের সপ্রতিক উত্তর মি সামনের গাড়িটিকে ফলো করেছি মাত্র। মহিলা পুলিশ মিষ্টি কন্ঠে ধীরে ধীরে বলল, সামনের গাড়িটি স্বাভাবিক গতিতেই। যাচ্ছিল। তুমি অনেক পেছন থেকে দ্রুত গতিতে পেছনে এসে ওভারটেকিংয়ের চেষ্টায় আছ।দু’শ ডলারের টিকিট ধরিয়ে দিল। ওয়ার্কিং ডে-তে এসে স্থানীয় কোর্টে হাজির হতে হবে।মাথায় বাড়ি! দু’শ ডলার না হয় গেল। কিন্তু একদিনের ছুটি নিয়ে আবার এতদূর এসে কোর্টে হাজিরা দেওয়াটা অনেক কঠিন শাস্তি। মায়ের জাত পুলিশটির কি কোনো মায়া-দয়া নেই।সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ছয় হাজার ফুটেরও বেশি উঁচুতে পাহাড়ঘেরা লেক তাহো। গভীরতা জায়গায় জায়গায় ষোলশ ফুটেরও বেশি। বাইশ মাইল লম্বা আর বারো মাইল চওড়া এই মিঠাপানির চুল উত্তর আমেরিকার বৃহত্তম আলপাইন লেক।এত উচ্চতায়ও লেকের পানি কখনো জমে না। পাইন ও কার গাছের সবুজে ঢাকা পাহাড় আর স্বচ্ছ নীলাভ পানি পর্যটকদের মন কেড়ে নেয়। শীতঋতুতে দলে

পৃষ্ঠা:৯২

দলে পর্যটক আসে পাহাড়ের ঢালে স্কি করতে। এর আগে সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে লেকের দক্ষিণ অংশে কাঁচা হলুদ রঙের স্যালমন মাছেরা জড়ো হয় ডিম ছাড়তে। মা মাছেরা মারা যাবে। পোনা মাছেরা চলে যাবে দূর-দূরান্তে। বছরের মাথায় ফিরে এসে তারা ডিম ছাড়বে। এ চক্র চলতেই থাকবে।এক প্রজন্মের মৃত্যু আর এক প্রজন্যের আগমনি বার্তা।ফেরার পথে সেক্রেমেন্টোতে ট্রেনে উঠব। আগেই টিকিট কাটা ছিল। দেরি হয়ে গেছে। সন্ধ্যাবেলায় হাইওয়েতে যানজট।আমাদের দুরন্ত চালক ঘণ্টা কয়েক আগে দু’শ ডলারের টিকিট খাওয়ার কথা ইতোমধ্যেই বেমালুম ভুলে গেছে। যে-কোনো উপায়ে মামার দলকে ট্রেন ধরিয়ে দিতে হবে। দ্রুত গতিতে গাড়ি চালাচ্ছে। এক লেন থেকে আরেক লেনে যাচ্ছে।স্টেশনের কাছে এসে দেখা গেল ট্রেন ছেড়ে চলে যাচ্ছে। তাতে কি? পরবর্তী স্টেশনে গিয়ে ধরবে। রেললাইন আর গাড়ির রাস্তা প্রায় সমান্তরাল। হরিণ ও চিতা বাঘের দৌড়। পরের স্টেশনেও অল্পের জন্য মিস। তৃতীয় স্টেশনে যাওয়ার উদ্যোগকে জোর করে বারণ করতেই হলো।সানফ্রান্সসিসকোর দিকে পরের ট্রেন ধরলায় স্টোপর্ব এ দুরন্ত তরুণটির দুরন্তপনা নিয়ে হাসি আর গল্প। গড় শীতে বুয়েটের বন্ধুরা পরিবার। করেছিল। ভরাপূর্ণিমার রাতে নিজনিয়ে সুন্দরবন ভ্রমণের আয়োজন নোঙ্গর ফেলা। আকাশের তারাগুলো কেন নিচে নেমে গেছে। কনকনে শীতে বিনের বনরাজীর অদূরে নদীতে জাহাজের বড় দেখাচ্ছে, ভারাখচিত চাঁদোয়া যেন অনেকটা শীতে গরম কাপড় গায়ে জড়িয়ে অনেকেই জাহাজের খোলা জায়গায় জড়ো হয়েছে। রাত বাড়ছে। একসময় গাইড এসে বলল, নৌকা প্রস্তুত। গভীর রাতের সুন্দরবনকে জানতে হলে জাহাজ ছেড়ে নৌকায় জঙ্গলের ভেতরে গালে ঢুকতে হবে।কে যাবে কে যাবে না? শেষপর্যন্ত নৌকাভর্তি। রওনা হওয়ার পর গাইড বলল, ইঞ্জিন চালান হবে না, হারিকেন, টর্চ জ্বালানো হবে না, কোনো কথা বলা যাবে না। এমনকি জোরে নিঃশ্বাসও ফেলা যাবে না। বনানীর একেবারে কাছাকাছি গিয়ে একসময় নৌকার বৈঠাও থেমে গেল। একজন জোরে নিঃশ্বাস ফেললে পাশের জন আলতো ধাক্কা দিয়ে সাবধান করে দেয়।এ তো একেবারে প্রকৃতি মায়ের কোলে। গাছের প্রাণ আছে। প্রাণীকুল জীবন্ত। কিন্তু জঙ্গল জলাভূমিও কি আলাদাভাবে জীবন্ত।মানুষকে সৃষ্টিকর্তা করুণা করে অনুভূতি দিয়েছেন বলেই প্রকৃতির কিছু কিছু রহস্য তার কাছে ধরা দেয়।

পৃষ্ঠা:৯৩

রাতের এমন পরিবেশে বলার চেয়ে শোনার অনেক কিছু আছে। কিছু শুনতে হয় গভীরতম অনুভূতি দিয়ে। তবুও একজন গুনগুন করছে:আমি কান পেতে রই আমার আপন।হৃদয় গহন দ্বারে…কোন রাতের পাখি গায় একাকী সঙ্গীবিহীন অন্ধকারে।হাজার রকমের পোকামাকড় ও ঝিঁঝি পোকার অবিরত শব্দ। চকিত হরিণের হঠাৎ নড়াচড়া, পেঁচার এক ডাস থেকে আরেক ডালে উড়ে যাওয়া, পানির উপর ব্যাঙের হেঁটে যাওয়ার শব্দ, টুপটাপ মাছের মাই, পানির ধারে ঝিনুকের খোসায় চাঁদের আলোর ঝিকমিকি, রাতের গভীর জঙ্গল-সবই স্থান করে নিয়েছে অনুভূতির রাজ্যে।অতি ভাবুক বনে যাওয়া কেউ মাঝিকে ইশারায় বলে, আর একটু ভেতরে যাওয়া যায় না। আর একজন অমনি হাত তুলে থামিয়ে দেয়। যেন বলতে চায়, বাঘ একেবারে সরাসরি নৌকায় লাফিয়ে পড়বে। আগের থেকেই শিকায় তাক করে নেয়। এক লাফে নৌকায় আর এক লাফে শিকার মুখে নিয়ে ডাঙ্গায় উঠে। হয়ে যায়। কোনো কিছু বুঝার আগেই নৌকার একই রূঙ্গলে অদৃশ্য গা শিউরে ওঠে। কে একজন ভয়ার্ত শব্দ য বলে উঠে, এখনই ফিরতে হবে। নিজের প্রিয়জন নৌকায় আছে কিনা তাকি দেখে নেয়। আরেকজন ততধিক উচ্চকণ্ঠে বলে উঠে, আমাদের না না চুপ। প্রাকার কথা। এখন কী হবে?তর-জ্বর মহামারীর মতো দ্রুত আড়িয়ে পড়ছে।রোমাঞ্চকর স্মৃতি মনে ট্রেতে গেল। বিস্তীর্ণ বনানী, অবারিত জলরাশির উপর ঝলমলে নরম আলোর থেকা আকাশে তারার মেলায় পূর্ণিমার চাঁদ, জনমানবহীন রাতের পরিবেশে প্রকৃতির রূপদর্শন-এ শুধু সুন্দরবনের বুকেই সম্ভব।বিদেশ ভূমিতে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার আগে নিজের দেশেরটা দেখে নেওয়ার চেয়ে ভালো কিছু হতে পারে না। এটা বুঝতে নিজেরও অনেক সময় পার হয়ে গেছে। দেশে যা আছে কম নয়। দরকার শুধু সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তা বিধান। উন্নতি যে হচ্ছে না তা নয়। তবে বিদেশি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করতে হলে আরও অনেক কিছু করার আছে। আশার কথা, বেসরকারি উদ্যোক্তারাও অনেক দূর এগিয়ে আছে। পার্বত্য অঞ্চলের অফুরন্ত সম্পদ, সৌন্দর্য এবং সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে। যতবারই ওদিকে যাই, পার্বত্য এলাকা যেন নতুন সাজে ধরা দেয়।কিছুদিন আগে ঘুরে এলাম বান্দরবানের নীলগিরি এলাকা। আয়োজক বন্ধু জাহাঙ্গীর আখতার। একসময়ে আর্মি ইঞ্জিনিয়ার্সে ছিল। দু’পরিবারের মাত্র ছ’জন সদস্য। কিন্তু তার আয়োজন দেখে মনে হলো আর্মির কোনো ব্যাটেলিয়ান স্থানবদল করছে। আয়োজনে কোনো ত্রুটি থাকতে পারবে না। প্রতিটি পদক্ষেপ ছকে বাঁধা।

পৃষ্ঠা:৯৪

সকালের নরম রোদে বান্দরবান এলাকায় প্রবেশ করতেই গাড়িতে সবাই নড়েচেড়ে বসল। ঝকঝকে তাজা পরিবেশ। মসৃণ রাস্তার দু’ধারে উঁচুনিচু পাহাড়, সবুজ বনানী, ঝোপঝাড়। জলাশয়ের পানিতে রঙ বেরঙের শাপলা ফুল আর কোথাও গভীর খাদে জলাধার। সবুজ গাছপালায় ঢাকা উপত্যকা, দিগন্তে রুপালি মেঘ, পাথরের ফাঁকে ফাঁকে নেমে আসছে স্বচ্ছ পানির ধারা। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে চলে গেছে আঁকাবাকা রাস্তা।কোথাও নিচে তাকালে দেখা যাবে একটু আগে ফেলে আসা রাস্তার বাঁক। আবার উপরে তাকালে দেখা যাবে অন্য পাহাড়ের গায়ে উঠে যাওয়া রাস্তা যা অতিক্রম করতে হবে একটু পরেই।বান্দরবান পার হয়ে নীলগিরির দিকের রাস্তা আরও বর্ণিল, মন কাড়ানো।এখানে জুম চাষ ছাড়াও পাহাড়ের ঢালে বিভিন্ন রকমের ফলের বাগান। যা কয়েক বছর আগেও তেমন দেখা যায় নি। জায়গায় জায়গায় গাড়ি থামিয়ে কার, বাস, মোটরসাইকেলের যাত্রীরা ফল কিনছে। এটা-ওটা পরখ করে দেখছে। কলা, আনারস, কমলা, পেঁপে, আমলকী, বাতাবিলেবু, কাগজিলেবু, মিষ্টি রসালো আখ, হরেকরকমের তাজা ফলের ডালা সাজিয়ে বসেছে পহেট্টের উপজাতীয় বাসিন্দারা। জায়গায় জায়গায় জবা ফুল আর নানান ঝোপঝাড়কে সাজিয়ে দিয়েছে। মাথায় জবা যুক্ত-উজে আর পিঠের ঝুড়িতে ফলমূল নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে পাহাড়ি মেয়েরা। কুড়িতে ওষা টসটসে পাকা আনারস খেতে চাইলে আশ্চর্য দ্রুততায় তাদের পাহাড়ি দা কিছু ছিলে টুকরো করে কলাপাতায় জড়িয়ে দিল। অনেক বছর আগে শ্রীলংকার পটডি এলাকায় পাহাড়ি রাস্তার ধারে গাড়ি থামিয়ে ইউরোপীয় পর্যটকদের ফছেরী কৈনার দৃশ্য মনে গেঁথে আছে। তারা বলগো এয়ারপোর্ট থেকে বাসভর্তি ইয়ে সরাসরি ক্যান্ডি চলে আসে। কলম্বো শহরে নামার প্রয়োজন মনে করে না। হোটেল-মোটেলে থাকে। সুইমিংপুলে সাঁতার কেটে, গলফ খেলে, ফলের বাগান, মসলার বাগানে ঘুরেফিরে, প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির দেখে দিন কয়েক সময় কাটায়। সেখান থেকেই সরাসরি কলম্বো এয়ারপোর্ট হয়ে দেশে চলে যায়।পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকা কিন্তু ক্যান্ডি থেকেও বেশি আকর্ষণীয়। কল্পনায় আসে, বিদেশি পর্যটকেরা চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সরাসরি চলে যাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, টেকনাফ ও সেন্টমার্টিনের পর্যটন এলাকায়। এ কল্পনা বাস্তবে রূপ দিতে বেসরকারি উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসছে, আরও এগিয়ে আসবে। সরকারকে শুধু অবকাঠামোগত সুবিধা এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।আমাদের দেশীয় পর্যটকদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। লম্বা ছুটির দিনগুলিতে পর্যটন এলাকাগুলো লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়।একটা বিষয়ে ঘাটতি সবসময় অনুভূত হয়। পর্যটন এলাকাগুলিতে বড়জোর দুই দিনের পর আর তেমন কিছু করার থাকে না। বিনোদনের বৈচিত্র্যের মাধ্যমে

পৃষ্ঠা:৯৫

পর্যটকদের অন্তত তিন-চার দিন কীভাবে আটকিয়ে রাখা যায় তা নিয়ে ভাবতে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশের সিংহ ভাগ জাতীয় আয় আসে শুধু পর্যটন শিল্প থেকে। অফুরন্ত সম্ভাবনায় বাংলাদেশ পর্যটন শিল্পে পিছিয়ে থাকবে কেন?দুপুরের দিকে নীলগিরির চূড়ায় পৌঁছালাম। দুই হাজার ছয় শ’ ফুট উঁচুতে সাজানো রিসোর্ট। একপলকে চারদিক তাকিয়ে দেখলাম। সবুজে ঢাকা নিচু উপতাকা অনেক দূর বিস্তৃত। উপত্যকার অপর প্রান্তে পাহাড়ের সারি দিগন্তে গিয়ে মিশেছে। যেন সাদা মেঘের গায়ে হেলান দিয়ে আছে।পূর্বদিকে উপত্যকার অনেক নিচুতে গাছের আড়ালে আবডালে সাঙ্গু নদী বয়ে যাচ্ছে এঁকে বেঁকে। পাহাড়ের উপর থেকে দেখা নিচে উপত্যকায় বহতা নদীর দৃশ্যই আলাদা। হেমন্ত-শীত ঋতুতে এ নদী কোথাও গভীর, কোথাও হাঁটু পানি। কোথাও প্রশস্ত আবার কোথাও সরু খালের মতো। বর্ষায় ভরা নদী আবার খরস্রোতা হয়ে যায়। তালগাছে ডোঙ্গা নৌকার পিছনে ইঞ্জিন লাগিয়ে নদীর উজানে বেয়ে উঠতে হয়। সারা বছর পানি সরবরাহের প্রধান উৎস এ সাঙ্গু নদী।রিসোর্টগুলো আধুনিক স্থাপত্যের ধাঁচে তৈরি। স্থক্তির গ্লাসের আধিক্য। ঘরে বসেই পাহাড় আর নীলাকাশের দেখা মিলবে। ।। অ্যাই জায়গার সোলার প্যানেল বসানো। বড় পানির ট্যাঙ্কে সেনাবাহিনীর পানিতে গাড়িতে সাঙ্গু নদীর পানি এনে জমা করা হচ্ছে। বৃষ্টির পানি সংগ্রহেরও আমাদের জন্য আলাদা একটি। একেবারে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ঢালুর ঘর থাকতে ওখানে থাকার জায়গা দূর দিকে টিনের ছাউনি ঘর। থেকে দেখে মনটা একটু দশে ল। পাকা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আবার কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ধরে যাওয়ারকাঠের ঘর। খুঁটির ওপর কাঠের পাটাতন বিছানো। তিনদিকে খোলা টানা বারান্দা, দুদিকে সিঁড়ি। লম্বা বারান্দা থেকে নিচের উপত্যকা সরাসরি দেখা যায়। দু’একটি গাছের পাতাও ছোঁয়া যায়। সুন্দর ছিমছাম দুটি রুম। বাথরুমে আধুনিক ফিটিংসহ সোলার আলোর ব্যবস্থা।সবাই খুব উল্লসিত। পাহাড় জঙ্গলে এরকম ঘরেই সবাই থাকতে চেয়েছিল। পরিবেশের সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি ঘর যেন একটি ট্রি-হাউস।রিসোর্টের নামটাও একটু আলাদা। বাকলসহ একটি চেরা কাঠের ওপর শৈল্পিক কায়দায় ইংরেজিকে খোদাই করা নাম: THEH-KHO-RESSA চীনের পর্যটন এলাকা হনজুতে আধুনিক ধাঁচের প্রাচীন একটি রিসোর্ট হোটেলে মনোমুগ্ধকর উপত্যকার পাশে একটি রাতের কথা মনে পড়ল। বনানীর ফাঁকে ফাঁকে উপত্যকায় হাজারো রঙের বাভি। অদূরে বিরাট লেক এবং প্রাচীন রাজাদের রাজকীয় সব প্রাসাদ। মাও-সে তুং ওই রিসোর্টে একসময় কিছুদিন থেকেছেন।

পৃষ্ঠা:৯৬

নীলগিরিতে আমাদের এই আবাসস্থানের সৌন্দর্যইবা কম কীসে। পড়ন্ত বিকেলে বাইরে তাকিয়ে দেখলাম চারদিকে যেন আঁধারি নেমেছে। সন্ধ্যার আগেই অন্ধকার নেমে এল। জলীয় ভাব, কুয়াশা আর থেমে থেমে বাতাস। কনকনে শীত আর কুয়াশার মতো জলকণা।গায়ে গরম কাপড় জড়িয়ে সবাই বাইরে এদিক-ওদিক পায়চারি করছে। গাছপালা, পাহাড় পর্বত দূরে থাক, কয়েক ফুট দূরের লোকজনকেও ছায়া ছায়া মনে হচ্ছে।ঘরে বসে থাকতে হবে। লোকজন বলল, গতকালও এমন ছিল না। পাতলা কপেড় পরে এ সময় লোকজন রোদে হেঁটেছে।সবার মন খারাপ। এক আয়োজন করে মাত্র একরাত থাকবে বলে এসেছে। সন্ধ্যার শেষ দিকে আস্তে আস্তে চারদিক পরিষ্কার হতে শুরু করল। আকাশের মেঘও সরে যেতে লাগল। একসময় গোলাকার চাঁদটাও মেঘের ফাঁক থেকে বেরিয়ে এল। সবাই বলাবলি করছে, নীলগিরির চূড়ার উপর দিয়ে বিশাল এক মেষ পশ্চিম থেকে পূর্বদিকে যাচ্ছিল। এতক্ষণ সবই মেঘের আড়ালে ঢাকা ছিল। এখন চলে গেছে।মেঘ কেটে গেছে। এখন ভরা পূর্ণিমার রাতে সোবিনার রাজত্ব। বাতে থাকতে আসা পর্যটকেরা সবাই ঘরের বাইরে। তাদের পরিবারের অল্পবয়স্কদের আটকানো যাচ্ছে না। কেউ চলে যাচ্ছে পাহাড়ের ঢালে,। কেউ যাচ্ছে সিঙ্গুরে খোলা জায়গায়। হেলিপ্যাডের দিকে, যার তিন দিকে খাড়া গিরি খাদ তালিপাস্টের সশস্ত্র প্রহরীরা সাবধান করে দিচ্ছে। বন্যশূকর ও বুনো শিয়ালের অম মানা। কাউকে যেতে দেবে না।ঢালের সীমানায় এখানে-সেখাে ড়িয়ে-ছিটিয়ে বসার জায়গা। রাত যত বাড়ছে পাহাড়ি প্রকৃতি চন্দ্রালোকে বিশ্লেকে তত মেলে ধরছে। লক্ষ তারারা আজ চাঁদের আলোর কাছে হার মেনেও চট্রার্দের অলংকার হয়ে থাকতে চায়। দূবের উপত্যকা আর দিগন্তের সীমানায় পাহাড়ের বনরাজি থেকে চাঁদের আলোর দ্যুতি বিচ্ছুরিত হচ্ছে। আকাশের তারাগুলো দিগন্তে নেমে এসে পাহাড়ের চূড়ায় তারার মুকুট পরিয়ে দিয়েছে। জ্যোৎজা আর পাহাড়ের সাথে আকাশের তারা মিতালি পাতিয়েছে।ঢালুতে বসার জায়গায় একটি পরিবারের ছোট-বড় সবাই সুরে বেসুরে গলায় গান ধরেছে। যত না গান তার চেয়ে বেশি হাসি আর করতালি। এ আনন্দের যেন শেষ নেই। নীলগিরির বুকে আজ আনন্দের ধারা বইছে।একটু দূরে রাতের খাবারের পর কেডস পরে হাঁটছোঁটি করছি। কারা যেন চিৎকার করে উঠল। একেবারে গা ঘেঁষে বড়সড় একটি বন্যবরাহ দৌড়ে চলে গেল। পরিষ্কার চাঁদের আলোতে এত কাছ থেকে বন্য প্রাণীটিকে দেখলাম।কারও ঘরে যাওয়ার ভাড়া নেই। মনটা বাইরে। গভীর রাতে সবাই বিছানায় গেল। মানসিক উত্তেজনায় কিনা জানি না, একটু ভোরবেলাতেই ঘুম ভেঙে গেল। তখনো সূর্য ওঠে নি। কাঠের বারান্দায় দাঁড়িয়ে চোখের দৃষ্টি মেলে ধরলাম।

পৃষ্ঠা:৯৭

নীলগিরি পাহাড়ের চূড়ায় রিসোর্টগুলোসহ আমরা যেন সাদা মেঘের উপর ভাসছি। রাতের দেখা উপত্যকা, সাঙ্গু নদী, দিগন্তের পাহাড়ের সারি সবই সাদা মেঘের নিচে ঢাকা পড়ে গেছে। আকাশও মেঘলা। আসমান দেখা যাচ্ছে না। উপরে নিচে মেঘ আমরা যেন মাঝখানে।মনে পড়ল তিন দশকেরও বেশি আগে দেখা প্রায় একই রকমের একটি দৃশ্য। অস্ট্রিয়ার একটি প্রদেশ টিরলের রাজধানী ইনসরুকের পর্যটন এলাকা। আল্পস পর্বতমালার একটি জনবসতিপূর্ণ উপত্যকার একপাশে উঁচু পাহাড়ের কোলে ইনসক্রকের শহর। পুরাতন আমলের ছোট ছোট বাড়িগুলোর স্থাপত্যশৈলী একেবারেই আলাদা। আল্পসের চূড়া এমনিতেই সারা বছর বরফে ঢাকা। শীতকালে পর্বতের ঢালে স্কি করার জন্য পর্যটকের ভিড় লেগেই আছে।রাতের কুয়াশায় জনবসতিপূর্ণ উপত্যকাটির বাড়িঘরগুলো সাদা কুয়াশার চাদরে ঢেকে যায়, পাহাড়ের চূড়ায় হোটেল থেকে জনপদের চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না। যেন কুয়াশা ঢাকা এক বিরাট হ্রদ। চারদিকে কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়ের রেখা। একসময় আলপস পর্বত চূড়ার বরফে ভোরের সূর্যের আলো চিরুন্ত্রিক করে ওঠে।উপত্যকা দিয়ে সম্রাট ফেরার পথে গাড়ির চালক-গাইড বলল, নেপোলিয়ন জার্মানির দিকে সৈন। পরিচালনা করেছিল। দুই দশক আগে, ১৯৯১ সালে, এ শহরের অদূরে অস্ট্রিয়া-ইটালি দেি দুই জার্মান হাইকার পাঁচ হাজার বছরের পুরানো প্রায় অবিকৃত এক মুক্তিদেহ আবিষ্কার করে দুনিয়াজোড়া হইচই ফেলে দিয়েছিল। ওটজাল আলপসেও জিমবাহে পাওয়া মৃতদেহটি একজন পয়তাল্লিশ বছর বয়স্ক পূর্বপুরুষের, যার চিরলিয়ান আইসম্যান’। আদর করে রাখা হয়েছে ‘ওটজি’ । আরেক নাম AMA নীলগিরির পূর্ব আকাশে ভোরের সূর্যের লালিমা দেখা দিল। একসময় মেঘের সীমানার ধারে ধারে আকাশ সোনালি আলোতে জ্বলজ্বল করে উঠল। ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলাচ্ছে। বর্ণালীর ছটা। পাহাড়গুলোর চূড়া মেঘের চাদর সরিয়ে আড়মোড়া ভেঙে উকিঝুঁকি মারছে।শীতের কাপড়ে সেজেগুজে পর্যটকেরা সপরিবারে অথবা দলে শেষবারের মতো সকালের নীলগিরিকে দেখে নিচ্ছে। শিশির স্নাত ঘাসের উপর পায়চারি করছে। নরম রোদে বিভিন্ন দিক থেকে ছবি তুলছে। পালা করে নিজেকেও নীলগিরির সাথে ক্যামেরায় বন্দি করে নিচ্ছে। ডাইনিং হলে সকালের নাস্তা সেরে বড় বড় কাচের জানালা দিয়ে বাইরেতাকালাম। সবকিছু আগের মতো। যেমনটি গতকাল এসে প্রথম দেখেছিলাম। চব্বিশ ঘণ্টারও কম সময়। নীলগিরির প্রকৃতি কত রূপেই না ধরা দিল। যাওয়ার সময় হলো। এখনই কাপ্তাইয়ের পথে রওনা হতে হবে।

হোম
ই-শো
লাইভ টিভি
নামাজ শিক্ষা
গেইমস
চাকুরি