Skip to content

মিছরি ভালোবাসি

পৃষ্ঠা ০১ থেকে  ২০

পৃষ্ঠা-১

রচনাসমগ্র

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। সূর্যের লালিমা আঁধারে মিলিয়ে যাচ্ছে। শহর যেন খোলস বদলাচ্ছে। ব্যস্ত নগরীর যন্ত্রমানবেরা ঘরে ফিরতে শুরু করেছে। গাড়িগুলো যেন পাল্লা দিয়ে ছুয়ে। পাখিরাও সব নীড়ে ফিরতে শুরু করেছে। কিন্তু আমার… ফাজিলটাকে কতবার ফোন করলাম! নিজে তো একটি বার করলই না, আমারটাও রিসিভ করল না। আজ আসুক…দাঁত কিড়মিড়িয়ে বেলকনির গ্রিল ধরে বাইরে তাকিয়ে আছে স্নেহা। বেশ রেগেছে আজ। আদিব আসলেই যেন ওকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। অনেকটা এই টাইপের। মাঝে মাঝে গ্রিল ছেড়ে দিয়ে আলতো পায়ে সামন্য পায়চারি করছে। একটু পর আবার গ্রিলে হাত রেখে বাইরের কোলাহলে দৃষ্টি ফিরাচ্ছে।এরইমধ্যে হঠাৎ একটু দমকা হাওয়া এসে স্নেহার চুলগুলো এলোমেলো করে দিল। মুখটাকে ঢেকে দিল। স্নেহা মাথাটি মৃদু দুলিয়ে হাতের আলতো ছোঁয়ায় চুলগুলো কানের পিঠে গুজতে গিয়েই কেমন যেন সুড়সুড়ি পেল। হাত দিয়ে চুলগুলো ঘাড়ের সাথে চেপে ধরে একটু আড়চোখে পেছনে তাকাতেই যেন পিলে চমকে গেল!-এ কী! আদিব তুমি!আদিব কিছু বলল না। হাত নামিয়ে চুপচাপ দাড়িয়ে রইল। স্নেহা কপট রাগ দেখিয়ে বলল, ‘এভাবে চুপচাপ আসলে যে! ভয় পাই না বুঝি?”কী করব! দরজা খুলে রেখে এখানে এসে দাড়িয়ে থাকলে একটু তো ভয় দেখানোই উচিত।’ ‘কী! দরজা খোলা ছিল?”নাহ।’ ‘তাহলে তুমি আসলে কী করে?’ ‘কোথায় আসলাম? এটা আমি না তো। ভুত!’

পৃষ্ঠা-২

এই বলে চোখ বড় করে স্নেহার চোখের দিকে তাকিয়ে জোরে শ্বাস নিতে থাকল আদিব। স্নেহা এক-পা দু-পা করে পিছাচ্ছে। অমনি আদিব খপ করে স্নেহার বালুতে ধরে ফেলল। আ…উঃ করে মৃদু চিৎকার করে উঠল স্নেহা। আদিব বলল, ‘কাই এত আনমনা কেন হুম? কাছাকাছি চলে এসেছিলাম তাই ফোনটা রিসিভ করিনি।”এই তুমি কে সত্যি করে বলো। সত্যি সত্যি তু ভু ভুত-টুত না তো?’বেচারি ভয় পেয়েছে কিছুটা। আদিব ওর কানে একটা চিমটি কেটে বলল, ‘কী মনে হয় শুনি?”ছেলে মানুষ দিয়ে বিশ্বাস নেই। হতেও তো পার।’ অস্ফুটে বলল। স্নেহা। ‘চিমটি খেয়েও বিশ্বাস হচ্ছে না? আরও কিছু করতে হবে?”অ্যাই! আরও কিছু মানে? আজ আমি অনেক রেগে আছি। একদম মিল দিতে আসবা না। যাও, তোমার কাজে যাও। আসতে বলেছে কে?”বা রে! আমার আসার জন্য দরজাটা পর্যন্ত খুলে রেখেছ, আর বলছো আসতে বলেছে কে?”দেখো! একদম ভাব জমাতে চেষ্টা করবা না বলে দিচ্ছি। আজ অনেক কষ্ট করে রাগ জমিয়েছি। সারারাত একটু একটু করে ঝাড়ব তোমাকে।’ এই বলে চোখ ফিরিয়ে নিল স্নেহা। মুখের খুন করা হাসিটুকু আড়াল করতেই কি না!মেয়েটি ভারি অভিমানী। কিন্তু সেটা একদমই ধরে রাখতে পারে না। কারণে- অকারণে নিজেই রাগ হবে, আবার নিজেই ফিক করে হেসে দেবে। আবার সেটা যেন আমি না দেখি, সেজন্য মুখটি আড়ালে লুকাবে। আমি চাতক পাখির মতো এই হাসিটুকু দেখার অপেক্ষায় থাকি। অন্য সময়ের হাসির চেয়ে এই হাসিটি অত্যধিক রোমাঞ্চকর। এক ঝলকেই যেন ভেতরটা খুন করে ফেলে। অসার হয়ে যাই আমি। ইশ, পাগলীটা বরাবরের মতো এবারও মুখ লুকিয়ে নিল। মনটা যা চাচ্ছে না…এই ভাবতে ভাবতেই ফিরে তাকাল স্নেহা। খোলা চুলের কিছুটা অংশ চেহারার একপাশ ঢেকে রেখেছে। একচোখেই ভ্রু নাচিয়ে বজ্রকণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘কীহ! বলেছি না কোনো প্রকার ষড়যন্ত্র চলবে না! এমনকিছু করলে আজ আর রক্ষ্যে নেই এই বলে দিলাম।’স্নেহার রোমান্টিক ধমক খেয়ে মৃদু ভয় আর এক চিমটি দুষ্টবুদ্ধি মাথায় চেপে বসল। আদিব চুপচাপ বেরিয়ে এসে ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে কোলের ওপর কুশন। রেখে একটি প্যাড ও কলম নিয়ে কিছু একটা লিখতে শুরু করল।

পৃষ্ঠা-৩

প্রায় ১৫-২০ মিনিট পর…ফাজিলটা সত্যি সত্যি ভয় পেল নাকি! নাহ, এটাকে আজ আন্ত ভর্তা বানাব। এই ভেবে হন্তদন্ত হয়ে ড্রয়িংরুমে এসে দেখে আদিব লিখছে তো লিখছেই।কাছে এসে প্যাডটা ছোঁ মেরে নিয়ে নিল। অনেকটা চিলের ছোঁ মারার মতোন। আদিব ভড়কে গেল! যদিও ওর লেখা শেষ। তবুও ফর্মালিটির খাতিরে বলল, ‘আরে আরে এ কী। আর একটুখানি বাকি দাঁড়াও।’উহু… কে শোনে কার কথা। প্যাডের লেখা পেইজটি একটানে ছিড়ে ফেলল। আদিবের ড্যাবডেবে চাহুনি দেখে ৯০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে একটা ভেংচি কেটে ছেড়া পেইজটি পড়তে শুরু করল স্নেহা। শুরুতেই বড় করে শিরোনাম লেখা- ‘বউ’!শিরোনাম দেখেই মুখ তুলে কেন যেন আদিবকে একপলক দেখে নিল। এরপর এক আকাশ রাগ নিয়েপড়তে শুরু করল।শুরুতেই আছে ভূমিকা। সেখানে ছিল…ভূমিকা: বউ একটি দুষ্টু মিষ্টি পাগলির নাম। পাগলের মতো এদের জটলা চুল না থাকলেও পাগল করে দেওয়ার মতো সুরভিত রেশমি চুল ঠিকই থাকে।এটুকু পড়েই এত রাগের মাঝেও কেন যেন পেট নেচে উঠল স্নেহার। সাথে ঠোঁটও। আরেকবার দেখে নিল ফাজিলটাকে। এরপর আবার পড়তে শুরু করল…উপকারিতা: এদের দ্বারা সাধারণত উপকার ছাড়া অপকার হয় না। কেননা এদের বক্র চাহুনিতেও হৃদয় প্রশান্ত হয়। যেটা হার্টের জন্য অনেক উপকারী।এটুকু পড়ে চোখ বাঁকা করে তাকাল আদিবের দিকে। আদিব চোখ নামিয়ে নিল। এই সুযোগে স্নেহা একটু নিঃশ্বব্দে হেসে নিল। আদিবের ভাষায় যেটা- খুন করা হাসি। ব্যাটা মিস করল হাসিটা। এরপর আবার পড়তে লাগল।ক্রেডিট: এদের মাঝে মোহনীয় কথা বলার যাদুকরি শক্তি বিদ্যমান। দিনশেষে ক্লান্ত বদনে ঘরে ফিরলে এদের দুষ্টু হাসি ও মিষ্টি কথার মোহে পড়ে মুহূর্তেই মনের গভীরে ভালোবাসার প্রাণোচ্ছল ঢেউ খেলে যায়।স্নেহা এবার একটু লজ্জা পেল কি না! কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার পড়ে যাচ্ছে…শখ: এদের কাছে চটপটি-ফুচকা, আইস্ক্রিম-আমসত্তা আর চকলেট সোনার চেয়ে দামি হলেও দিনশেষে প্রাণপ্রিয় স্বামীর একটু সান্নিধ্য হলো হীরার চেয়েও দামি।

পৃষ্ঠা-৪ 

এটুকু পড়ে কেন যেন একটু আনমনা হয়ে পড়ল স্নেহা। ক্ষানিক পর আবার পড়তে শুরু করল।চাহিদা: প্রতিদিন না হোক, অন্তত প্রতি শুক্রবার রাতে বাসায় ফেরার সময় একটি অর্ধফুটন্ত গোলাপ এনে খোঁপায় গুজে দিতে হবে। আর মাঝে মাঝেই চাঁদনি রাতে পরস্পর হেলান দিয়ে তারা গুনতে হবে।এটুকু পড়তেই স্নেহার ঠোঁটে আবারও সেই খুন করে দেওয়া হাসি…। আদিবের প্রতি এখন কোনো খেয়াল নেই স্নেহার। সে এখন পড়ছে। গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়ছে। এরপর…কার্যকারিতা: সারাদিন প্রাণপ্রিয় স্বামীর ঘরে ফেরার অপেক্ষায় মনটা আঁকুপাঁকু করতে থাকবে আর ঠিকসময়ে ঘরে ফিরে এলেও অভিমানী কণ্ঠে ‘আজ এত দেরি করেছেন কেন?’ এই বলে একা একাই কিছুক্ষণ ঝগড়া করে গাল-নাক ফুলিয়ে কান্নাজুড়ে দেবে।এবার হাসির সাথে ফিক করে একটু শব্দ বেরিয়ে এলো। মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে পরেরটুকু পড়তে লাগল…অধিকার: স্বামী সত্যি সত্যিই একটু দেরি করে ফিরলে সেদিন রাত্রিকালীন রোজা ফরজ করে ছাড়বে। নাকের পানি ও কাজল ধোয়া চোখের পানির স্রোতে এলিয়েন সাজবে। আর এসময় যদি কোনক্রমে মোবাইল হাতে দেখে তাহলে বেচারা স্বামী যখন ওয়াশরুমে ঢুকবে তখন ফিরে এসে মোবাইলের সিম আবিষ্কার করবে ফ্রিজে রাখা তাজা ‘শিম’ এর এর মধ্যে। ব্যাটারি আবিষ্কার করবে বারান্দায় ইঁদুর মারার কলের মধ্যে। আর অবশিষ্ট কংকাল আবিষ্কার করবে বালিশের কাভারের মধ্যে। তবে এই আবিষ্কারটা হবে দুর্ঘটনার মিনিমান সপ্তাহ খানেক পর।স্নেহা এবার মাথা তুলে আদিবের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিল! নাহ! মোবাইল- টোবাইল হাতে নেই। বেঁচে গেছে এবারের মতো। নেক্সট…স্বভাব: প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার সময় কপালে ভালোবাসার মিষ্টি ছোঁয়া এঁটে দিয়ে বলবে, মহিলা কলিগদের সাথে কথা বলবেন না। জরুরি প্রয়োজন হলে কাগজে লিখে দিবেন। তবুও কথা বলবেন না। আর তাকানোর তো প্রশ্নই আসে না।এটুকু পড়ে মুচকি হাসির সাথে মাথা দুলিয়ে পাগলটাকে কী বলে যে একটা বকা দেবে ঠিক খুজে পাচ্ছে না। ফাজিলটা এত্ত ভালো কেন হুম! এত্ত ভালো কেনা এই সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই সর্বশেষ প্যারায় চোখ বুলাল…

পৃষ্ঠা-৫

উপসংহার: মূলত এরা বড্ড ছুঁচি প্রকৃতির হয়। হ্যাঁ, একটু দুষ্টু মিষ্টি ভালোবাসার ছুঁচি।এটুকু পড়েই ঠোঁট কামড়ে ধরে চোখ বন্ধ করে নিল স্নেহা। অজান্তেই কাগজটি বুকে চেপে ধরল। কাজল ধোয়া কয়েকটি উষ্ণ ফোঁটা টুপ করে গড়িয়ে পড়ল। গালে কিছু একটার শীতল ছোঁয়া পেয়ে স্নেহা চমকে উঠল! চোখ মেলে দেখে আদিবের হাত ওর গাল ছুয়ে দিচ্ছে। গড়িয়ে পড়া ফোটা আলতো ছোঁয়ায় মুছে দিচ্ছে।আদিব অস্ফুটে বলল, ‘এই পাগলী! কান্না কেন হুম? পিট্টি দেব কিন্তু। একদম কান্না না। একদম না।’স্নেহা আদিবের চোখের দিকে কোমল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘এভাবে লিখতে হয় বুঝি?’তো কীভাবে লিখতে হয় শুনি?”দাঁড়াও। দেখাচ্ছি কীভাবে লিখতে হয়। বসো ওখানে। স্নেহা এই বলে আদিবের লিখিত কাগজটির অপর পিঠেই লিখতে শুরু করল। আদিব চুপচাপ বসে রইল।প্রায় ১৫-২০ মিনিট পর…’এই নাও। মনে মনে পড়বে। যাও, ওদিক গিয়ে পড়। আর আমাদের সোনামণিই বাদ পড়বে কেন? যাও যাও, ওদিক যাও।’

‘সোনামণি বাদ পড়বে কেন বলতে?”ও তুমি বুঝবে না। যাও তো এখন ঐদিকে যাও, ঐ যে ঐদিকে!’আঙুল উঁচিয়ে বেলকনির দিকে ইশারা করে প্যাডের নতুন একটি পাতায় আবার লিখতে শুরু করল স্নেহা।কী করা! আদিব একটু পাশে গিয়ে স্নেহার লেখাটি পড়তে শুরু করল। শুরুতেই বড় করে একটি শিরোনাম ছিল- ‘জামাই’।আদিব মুচকি হেসে দিয়ে মাথা দুলিয়ে অস্ফুটে বলল, পাগলী একটা…যা হোক, এবার একটানা পুরোটা পড়ে ফেলল আদিব। পড়া শেষে আদিবের চেহারা ক্ষানিকটা বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল। কিন্তু কেন বলুন তো? চলুন দেখে নিই। আদিবের ‘বউ’ রচনার অপর পিঠে স্নেহা লিখেছে ‘জামাই’ রচনা। ইয়া বড় এক শিরোনামের পর যা ছিল…

পৃষ্ঠা-৬

ভূমিকা: জামাই একটি টক-ঝাল-মিষ্টি পাগলের নাম। পাগলের মতো এদের অদ্ভুতুড়ে স্বভাব না থাকলেও টক-ঝাল-মিষ্টির অমায়িক মিশেলে নারীর স্বপ্নিল স্বপ্ন পুরুষ হয়ে অভিভূত করে দেওয়ার মতো একটি মন ঠিকই আছে। উপকারিতা: এরা নারীর উপকারের প্রধান উৎস। এদের আলতো ছোঁয়ায় নারীর শ্বাসপ্রশ্বাসের মাত্রা বেড়ে যায়। এতে ফুসফুসে অক্সিজেন সরবরাহের মাত্রাও বেড়ে যায়। যেটা দেহাভ্যন্তরীণ কোষকলার জন্য বেশ প্রয়োজনীয়।

ক্রেডিট: এদের মাঝে অভিমান ভাঙ্গানোর বাজিকরন শক্তি বিদ্যমান। ঢং দেখিয়ে হোক বা রাগ দেখিয়ে হোক কোনরকম একটু অভিমানী ভাব ধরলেই শুরু হয় একেক সময় একেক কাণ্ডকারখানা। কখনও পকেট থেকে লাভ ক্যান্ডি বের করে অনুগত বেবির মতো নিজ হাতে খাইয়ে দেওয়ার পাঁয়তারা। তখন কি আর আম্মম্মম্ম… করে চকলেটে কামড় না দিয়ে পারা যায়? তাছাড়া যখন কলমের ম্যাজিক দেখিয়ে এমনকিছু লিখে দেয়, যা পড়ে হাসি-কান্না-অভিমান-আবেগ ও ভালোবাসার সাথে এক চিমটি রাগ মেশানো ঝালমুড়ি টাইপ অনুভূতির সৃষ্টি হয়, তখন আর যাই হোক, অন্য কাউকে আর সেটার ভাগ দিতে ইচ্ছে হয় না। একাই গাপুসগুপুস… শখ: এদের কাছে পালচার আর আইফোন হট ফেভারিট হলেও অভিমানী পাগলির বাকা ঠোঁটের খুন করে দেওয়া মিষ্টি হাসি আর কাজল কালো চোখের দুষ্টু চাহুনি গোটা পৃথিবীর চেয়েও দামি।

চাহিদা: অন্তত প্রতি শুক্রবার রাতে বাসায় আসার পর যতক্ষণ মনে চায় ততক্ষণ কোলে মাথা রেখে আচ্ছামত গাল টেনে দিতে হবে। আর গুণগুণ রবে কখনও তিলাওয়াত কিংবা কখনও সুললিত সুরে কিছু একটা গেয়ে শুনাতে হবে।

কার্যকারিতা: সারাদিন পাগলিটির কথা ভাবতে ভাবতে কাজের ফাঁকেও পকেট থেকে ফোনটা বের করে আদিযুগে পাঠানো মেসেজটি বিড়বিড় করে আওড়াবে আর একা একাই পাগলের মতো হাসবে। এরপর বাসায় এসে, ‘তোমাকে একটুও ভালোবাসি না, শুধু আমার কাজকেই ভালোবাসি। এজন্য দেখো না সারাক্ষণ কাজের মধ্যেই থাকি?’ এই কথা বলে শুধু শুধুই প্রেশারটা হাই করে দেবে।

অধিকার: মাঝে মাঝেই সবজান্তা ভাব ধরে আসবে সাজিয়ে দিতে। লিপিষ্টিক দিতে গিয়ে লিপিষ্টিককে নাকিষ্টিক বানিয়ে ফেলবে। মানে সমানতালে নাকেও এঁটে দেবে। আর চোখে কাজল দিতে গিয়ে একেবারে এলিয়েন বানিয়ে ছেড়ে দেবে। আর যদি একটু শিখিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় তাহলেই থ্রেট দেবে যে, আমার বউকে আমি সাজাব, যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই সাজাব, তোমার কী? কী আর করা! মগের মুল্লুকের আদিবাসী বলে কথা…

পৃষ্ঠা-৭

স্বভাব: রাতে কখনও ঘুম ভেঙে গেলে ডাক না দিয়ে ঘুমন্ত চেহারার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকবে। হঠাৎ ধরা খেয়ে গেলে বলবে, ‘কী! ঘুম আসছে না? দেখি ঘুম পাড়িয়ে দিই…।’ এই বলে মাথায় হাত বুলিয়ে চুলগুলো আলতো করে টানতে থাকবে, এরপর পরম সুখে আবার ঘুমিয়ে পড়লে এরপর সেই ঘুমে টুটুবে চেহারটা পুনরায় শুধু দেখতেই থাকবে আর দেখতেই থাকবে।

উপসংহার: এরা মূলত রাক্ষুসে প্রকৃতির হয়। এদেরকে ভালোবাসা যতোই দেওয়া হোক তাতে মন আর ভরে না। যতই দেওয়া হয় ততোই চায়। আরও চায়, আরও চায়, আরও চায়, অনেক চায়, এত্তগুলা চায়, পাগল কোথাকার।পড়া শেষ হলে আদিব বেচারা কী করবে ঠিক দিশা পাচ্ছে না। সাত-পাঁচ ভেবে কিছু না পেয়ে ফ্লোরে কপাল ঠেকিয়ে টুপ করে একটা ডিগবাজি খেয়ে নিল। এরপর গ্রিল ধরে খিকখিক করে সত্যিকার পাগলের মতোই একটা তাল ছাড়া হাসি দিল।ওর আজগুবি হাসির শব্দ শুনে ওদিকে স্নেহাও হিহি করে হেসে উঠে অস্ফুটে বলল, ‘এই তো আধপাগলের হাসি। পুরো পাগল হওয়ার ব্যবস্থা করছি আর একটু অপেক্ষা কর।’আদিব কিছু বলল না। সে এখন একটি পরীকে নিয়ে চাঁদে ভ্রমণ করছে। গ্রিলের ফাঁক গলিয়ে আসা জ্যোৎস্নার পিঠে চড়ে সোজা চাঁদের কোলে… আদিব! আর একটা পরী! খুন করে দেওয়া হাসি আর কাজল চোখের অধিকারী সেই পরী! ‘বউ’ রচনার প্রত্যুত্তরে ‘জামাই’ রচনা লিখে দেওয়া সেই পরী…কাঁধে কিছু একটার ছোঁয়া পেয়ে আঁতকে উঠল আদিব- ‘কে রে!”আমি পেত্নী!”আর আমি কবিরাজ! হে হে… তিড়িং বিড়িং করলে বোতলে নয়, সোজা খাঁচায় ভরব, একদম বুকের খাঁচায়! মুহু হা হা হা…!’স্নেহা আদিবের বুকে টুপ করে কিল মেরে বসল। আদিব হাতটা বুকে চেপে ধরতেই দেখে হাতে আরও একটি কাগজ! ‘এই রে! আবার এটা কী!’ ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল আদিব।’বলতে মানা। কিন্তু পড়তে নেই মানা।’ মৃদু মাথা নাড়িয়ে বলল স্নেহা।আদিব ভাঁজ খুলে সেটা পড়তে লাগল। শুরুতেই দেখে বড় করে শিরোনাম লেখা- ‘বাবু’!দেখামাত্রই চিকন স্বরে হেসে উঠল আদিব। শেষমেশ বাবুও! হা হা হা…

পৃষ্ঠা-৮

স্নেহা একটু লজ্জা পেল কি না। চোখ নামিয়ে নিরবতায় ডুব দিল। আদিব এবার সেটা মৃদু শব্দ করে একটানে পড়ে ফেলল। পড়ার পর… আচ্ছা আগে দেখে নিই কী ছিল স্নেহার বাবুর মধ্যে। মানে ওর ‘বাবু’ রচনার মধ্যে।শুরুতেই…

ভূমিকা: বাবু একটি কিউট ড্রামের নাম। যার মধ্যে তেল, পানি বা চাউল না থাকলেও গোলগোলা চোখের ড্যাবড্যাবে চাহুনি আর ফোকলা দাঁতের বোকলা হাসি দিয়ে মুহূর্তেই পাথুরে মনকে মোমের মতো গলিয়ে দেওয়ার মতো ম্যাজিক্যাল পাওয়ার ঠিকই আছে। আরও আছে মাতৃত্বের অব্যক্ত যন্ত্রণাকে প্রথম চমকেই ভুলিয়ে দিয়ে ব্যথায় ঝুঁকিয়ে উঠা বক্র চেহারায় স্বর্গীয় সুখের বিভা ফুটিয়ে তোলার এক অত্যাশ্চর্য শক্তি।

উপকারিকা: এরা আব্বুদের জন্য যথেষ্ট উপকারী। আম্মুরা যখন এদের জন্য পরম মমতা মাখানো সবজি-খিচুড়ি রান্না করে তখন এই খিচুড়ি আব্বুদেরও পুষ্টি সাধনে বেশ কার্যকরী ভূমিকা রাখে। চুরি বিদ্যার প্রতিফলন আরকি। তবে আম্মুদের জন্যও এরা কম উপকারী নয়। বাবু একটু বড় হলে বাবুর জন্য আনা চকলেট, আইসক্রিম আর চিপসের ওপর টমের প্রতিপক্ষ জেরির থিউরি চালাতে আম্মুরা বেশ সিদ্ধহস্ত। খিচুড়ি চুরির প্রতিশোধ আরকি।

ক্রেডিট: এরা ঝগড়া মেটানোর পরাশক্তি হিসেবে আখ্যায়িত। সাংসারিক বিভিন্ন টানাপোড়েনে এদের কথা চিন্তা করে খুব সহজেই একটি মিমাংশিত অবস্থা তৈরি হয়। অতঃপর পুনরায় খিচুড়ি চুরি আর ‘জেরি’ থিউরির ব্যবহারিক পর্ব হাজির হয়।

শখ: সারাদিন আম্মুর কোলে থাকতে থাকতে দিনশেষে মনেহয় আব্বুর একটু ছোঁয়া পেতে বেশ আঁকুপাঁকু করতে থাকে। আব্বু ঘরে ফিরে এসে যেই একটু কোলে তুলে নিবে অমনি সাথে সাথে হিসসস…

চাহিদা: বাবুর নিষ্পাপ হৃদয় ব্যাংকের চেকবই চায় না, পাজারো আর পালচারের চাবি চায় না কিংবা হাজার টাকার জামা কিংবা লক্ষ টাকার গহনাপত্রও চায় না। এরা সারাদিন আম্মুর আদরের পর দিনশেষে আব্বুরও একটু আদর চায়, দুষ্টু মিষ্টি একটু শাসন চায়, কাজ থেকে ফিরে আব্বু নিজ হাতে এক কোষ কমলা মুখে দিয়ে দেবে এটা চায়, কোলে তুলে আ…বু…! এভাবে ডেকে ডেকে আম্মুকে নিয়ে একসাথে হাসবে, খেলবে, এটা চায়।

কার্যকারিতা: সারাদিন আম্মুর কোলে রেখে আদর করার পর যখন ঘুমিয়ে যায় তখনও বিছানায় শোয়াতে গেলে ওয়্যা… করে এক চিৎকার! নাহ, কোলেই ঘুমাবে সে।

পৃষ্ঠা-৯

দিনে তো বেচারি আম্মুকে একটু বিশ্রাম দেবেই না, আবার রাতেও ক্ষানিক পরপর হিসসস…। আর একটু বড় হলেই শুরু হয় সারাদিন লাটিমের মতো ঘুরে ঘুরে ঘরের একেকটা জিনিষ একেক জায়গায় ফিট করা আর আম্মু কিছু বলতে গেলেই ভ্যা… আর সেইসাথে চুল টানা তো ফ্রি আছেই।আর আব্বু বাসায় এলে যেখানেই থাকুক, পায়ে জুতো আর ময়লা যা-ই থাকুক একলাফে কোলে উঠে একটানে দাড়ি একগোছা হাতে। কী আর করা। আসলে মা- বাবার কাছে এটাই সুখ…।অধিকার: যখন-তখন, যেখানে-সেখানেই হিসসস…! জায়নামায, নতুন ইস্ত্রি করা কাপড় পড়া অবস্থায় কোলে আর খাবার প্লেট কোনোটাকেই এরা বঞ্চিত করে না।আর হ্যাঁ! এই ‘বাবু’ ডাকটি শোনা কেবল ওদেরই অধিকার। ওদের এই অধিকার খর্ব করে আজকালকার আপুমনিরা তাদের ইয়েদেরকে যে ‘বাবু’ ডাকে এটা কিন্তু একদমই ঠিক না।

স্বভাব: সারাদিন ওয়্যা… ওয়্যা… করে আম্মুর কলিজা ঝাঁজরা করা আর রাতে নাইট ডিউটিতে বাধ্য করা।

উপসংহার: এরা মূলত ছাগলের মতো হয়। বুঝিয়ে-সুঝিয়ে কলাপাতা দেখিয়ে এদের দ্বারা অনেক কিছুই করানো যায়। কিন্তু জোরাজুরি করলেই ছাগলের মতো সামনে দু’পা মেলে- এ্যা…দ্যা ইন্ড…শেষটুকু পড়ে হাসতে হাসতে কাশি উঠে গেল আদিবের। স্নেহাকে ধরে সোজা সোফায় বসিয়ে নিজে তার পাশে ধপাস করে পড়ে গিয়ে বলল, ‘এ্যা…!স্নেহা বলে, ‘কী এ্যা?”আদিব বলে, ‘এ্যা…!’স্নেহা বলে, ‘আরে বাবা তুমি না তো। ঐ যে বাবু, মানে বাবু আরকি।’এ্যা…”ঐ এখন কিন্তু পানি ঢালব মাথায়!’১২আদিব নাক-মুখ বাঁকিয়ে- ‘এ্যা…!’

পৃষ্ঠা-১০

বকুল মালা

কিছু বই একবার পড়ার জন্য নয়: বারবার পড়তে, বারবার ভাবতে এবং ব্যক্তিসত্তাকে অনন্য এক উচ্চতায় নিতেই লেখা হয়।আদিব এমনই একটি বই স্নেহার হাতে দিয়ে পড়তে বলল। কিন্তু সে এখন পড়বে না। ভালো লাগছে না। শুধুই শুয়ে শুয়ে এটা-সেটা করে সময় কাটাচ্ছে। আদিব হাসতে হাসতে আলতো করে কয়েকটি কেনু (কনুই দিয়ে গুতো দেওয়াকে কেনু বলে।) দিয়ে বলল, ‘ইইই পড়তেই হবে।’

কিন্তু স্নেহা রাজি না। এখন সে পড়বেই না। দিল আম্মুকে ডাক- আম্মু! কইতরটা শুধু শুধুই সময় নষ্ট করছে। পড়ে না।আদিব রাগ করে স্নেহাকে মাঝেমাঝে কইতর বলে ডাকে। যেটার ভদ্র রূপ হলো কবুতর। স্নেহার সাথে কবুতরের বেজায় মিল। কবুতর ঠোকর মেরে খায়, আর স্নেহা সবসময় আদিবের হাতে খায়, এ-ই পার্থক্য। না হয় ওড়াউড়ি, ছোটাছুটি, বুদ্ধিমত্তা ও কিউটনেসের দিক থেকে কবুতরকে স্নেহার ছোটবেলায় মেলায় হারিয়ে যাওয়া বোন বললে খুব একটা অত্যুক্তি বোধহয় হবে না। এই যাহ! ভাইও তো হতে পারে! আচ্ছা সে যাকগে।স্নেহা ওর শাশুড়ি আম্মু আসার আগেই চট করে বইটি হাতে নিয়ে গুনগুনিয়ে পড়া শুরু করে দিল। আদিবও অন্য একটি বই নিয়ে পড়তে লাগল। কিছুক্ষণ পর…নাহ! আদিব পড়তে পারছে না। স্নেহা গুনগুনিয়ে পড়ছে। গুনগুন শব্দ কানে গেলে পড়া যায়? মনে মনে পড়তে বলল। কিন্তু হু কেয়ারস! সে শব্দ করেই পড়বে। না হয় পড়বেই না। কী মুশকিল! আদিব আম্মুকে ডেকে বলল, ‘আম্মু! কইতরটা আমাকে পড়তে দিচ্ছে না। একটু আস্তে পড়তে বলেন না।’আম্মু বলল, ‘নালিশ করা পছন্দ করি না।’আম্মুর একথা বলতে দেরি! এদিকে স্নেহা কেমন যেন ভুতুড়ে টাইপের একটা হাসি দিয়ে উঠল। কেমনটা লাগে?!

পৃষ্ঠা-১১

এমনসময় আদিবের ছোটভাই জিয়াদ বাজার নিয়ে হাজির। আম্মুকে ডেকে বাজারের কথা বলায় স্নেহা বইটা রেখে আড়চোখে জব্বর একখান টিপ্পনী কেটে উঠে গেল। যাব্বাবাহ…জিয়াদ মাছ এনেছে। আরও টুকিটাকি কিছু এনেছে।ওর এখন ছুটি চলছে। তাই সুযোগ পেলে ওকেই বাজারে পাঠায়। আদিব যায় না। ওর আম্মু আবার জিয়াদকে পাঠাতে চায় না। দাম নাকি বেশি দিয়ে আসে। আদিবের কথা হলো- এখন দুই টাকা বেশি দিয়ে আসলেও অনেককিছু শিখবে। এখন না শিখলে শিখবে কখন? আর এখন শিখে রাখলে আগামীতে চার টাকা বাঁচিয়ে আসতে পারবে। লাভ না? আদিবের আম্মু আর কিছু বলে না।

স্নেহা মাছ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আজ পাঙ্গাশ এনেছে। ওর যা ইচ্ছা আনতে বলেছিল। বসে বসে মাছটা ঘঁষে সাদা করে ফেলেছে। আদিব জানালা দিয়ে দেখে বলল- শুভ! এভাবে পরিষ্কার করে এরপর ভেজে ভুনা করলে দারুণ লাগে!আদিবের আম্মু মেশিনে বসে টুকিটাকি সেলাই করছিল। সেলাই থামিয়ে মাথা নাড়িয়ে আদিবের কথায় সায় দিয়ে বলল, ‘চাষের মাছের চেয়ে নদীর মাছে স্বাদ বেশি। কেন বলো তো! কারণ, নদীর মাছের সুখ বেশি। স্বাধীনভাবে চলতে পারে। খেতে পারে। জোয়ার-ভাটায় নাইতে পারে। কোনো জবরদস্তি নেই। আর চাষের মাছ! কোনো স্বাধীনতা নেই। যা খেতে দেবে তা-ই খেতে পাবে। জোয়ার-ভাটার ছোঁয়া নেই। না চাইতে সব পেলেও মনে কোনো সুখ নেই। সেই অসুখীর প্রভাবেই- চাষের মাছে তেমন কোনো স্বাদ নেই।’আম্মু এটা কী ব্যাখ্যা করল? বুঝতে কিছু সময় লাগবে। নির্দিষ্ট একটা বয়স লাগবে। সে যাকগে।

স্নেহা এবার মাছ কাটায় মন দিল। একটুপর পর মাছের দাম নিয়ে বলল, ‘আচ্ছা এখানে মাছের দাম এত কেন! এখানেই তো ধরে, তবু এত দাম!’আম্মু বলল, ‘এখান থেকে ধরে সব মাছ শহরের দিকে পাঠিয়ে দেয়। এদিকে এখানে মাছের ঘাটতি পড়ে যায়। তাই এমনিই দাম বেড়ে যায়।’আসলে শুধু মাছের দামই না। আজকাল নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছুরই এমন আকাশছোঁয়া দাম যে- কেউ তা ছুঁতে গেলে প্যারাসুট লাগবে। হাত ফসকে গেলেই কোমর ভাঙবে। এতসবের পরেও সামর্থ্যবানরা অপচয় করবে। আর বাকিরা সব না খেয়ে মরবে।

পৃষ্ঠা-১২

প্রকৃতপক্ষে এগুলো আমাদের জন্য রবের পক্ষ থেকে আজাব! আমাদের বদ আমলের জন্যই পৃথিবীর যাবতীয় বিশৃঙ্খলা। এসবকিছুই আমাদের দু’হাতের কামাই। আমরা ব্যক্তি পর্যায়ে সৎ হয়ে যাই, ভালো ‘মানুষ’ হয়ে যাই- আল্লাহ তা’য়ালা পৃথিবীর পরিবেশকে শান্তিপূর্ণ করে দেবেন।তো একপর্যায়ে স্নেহা ডেকে বলল, ‘এই বলেন তো! জান্নাতে সর্বপ্রথম কী খেতে দেওয়া হবে?”কী?”মাছের কলিজা ভুনা!”বাব্বাহ! তাই!’

‘জিহ। কিন্তু এই মাছের কলিজা তো একদম ছোট। অনেকসময় খুজেই পাওয়া না। কিন্তু সেই মাছ হবে তুলনাহীন! অকল্পনীয়।’ যায়’কিন্তু তুমি তো কলিজা খাও না! তাই তোমার ভাগেরটা আমার!’ বলেই আদিব হো হো করে একগাল হেসে দিল।এরপর আদিব একটু ওয়াশরুমে গেল। বের হয়ে অযু করতে যাবে, কিন্তু তার মাছ ধোয়ার জন্য দাড়িয়ে থাকতে হলো। একটু জায়গা দিতে বলায় আরও আটকে বসল। এভাবে কতক্ষণ দাড়িয়ে থাকা যায়? এখন অযু ছাড়া ঘরে চলে গেলে অনেক লস হয়ে যাবে।একাধিকবার তাহকিক করে জানা গেছে- অযুর শুরুতে ‘বিসমিল্লাহি ওয়ালহামদুলিল্লা’ এটা পড়ে অযু শুরু করলে যতক্ষণ এই অযু থাকবে ততক্ষণ তার আমলনামায় নেকী লেখা হতে থাকবে। কিন্তু এখন ঘরে চলে গেলে অনেকটা বঞ্চিত হয়ে যাবে।সাহবা (রা.)রা এমন করতেন। নেকীর জন্য চালাকি করতেন। বাড়ি থেকে নামাযের জন্য মসজিদে যেতে প্রতিটি কদমে একটি করে নেকী হয় ও একটি করে গুনাহ মাফ হয়। তাই ইচ্ছে করেই ছোটছোট কদমে মসজিদে যেতেন। কী চালাকি! না?আমরাও কম যাই না। সেদিন এত এত ডায়াল করলেই বাংলালিংক-এ ১জিবি করে ফ্রি পাওয়া যায় শুনেই হামলে পড়েছিলাম। যাক বাবা! কয়েকদিনের খোরাক মিলল। আমরা হলাম দ্বিগুণ চালাক। এটা একেবারে নগদ। ঝটপট!

পৃষ্ঠা-১৩

কিন্তু এই দুই চালাকির মধ্যে কী বিস্তর ব্যবধান তাই না? এই ব্যবধানের জন্যই সর্বত্র তারা বিজয়ী ছিলেন। সুসংবাদ প্রাপ্ত ছিলেন। অস্ত্রহীন হলেও শত্রুর আতঙ্ক ছিলেন। আর আমরা!এই-যাহ! কোথায় চলে গেলাম। তো এরপর স্নেহার মাছ ধোয়ার অপেক্ষায় না থেকে এক মগ পানি নিয়ে একপাশে গিয়ে অযু করে ঘরে চলে এলো আদিব। তবে আসার আগে আদিবকে সাইড না দেওয়ায় এক আঁজলা পানি খুব যত্ন করে স্নেহার মুখে মেখে দিল। আহা! বেচারি কিছু বুঝে ওঠার আগেই আদিব এক দৌঁড়ে আম্মুর কাছে…’এই দিন দিন না! আরও দিন আছে..!’ এই বলে স্নেহা এক হাঁক ছাড়তেই আদিব হাসতে হাসতে পল্টি খাওয়ার যোগার।বেচারির মাছ ধোয়া শেষ হলে তাতে লবণ দিয়ে রেখে ফ্রেস হয়ে আবার পড়তে বসল। কিন্তু শব্দ আর কমলো না। এবার আরও জোরে পড়তে লাগল। উফ…আদিব আম্মুকে আবারও বলল, ‘এই আম্মু! কিছু বলবেন? আমাকে একটুও পড়তে দিচ্ছে না। কী হিংসুটে।’আম্মু বলল, ‘এই স্নেহা! এবার তুমি আস্তে পড়ো।’শুনলো না। তার মতো সে পড়তেই আছে। এবার আম্মু বলল, ‘এইটা হচ্ছে ঘাউরা বউ! আদিব তুমি ঐ রুমে গিয়ে পড়ো।’এই কথা বলতে দেরি! অমনি পড়া বন্ধ করে হাঁক ছাড়ল- ‘কী আম্মু! আমি কী…!’

আম্মু মুড অফ। এদিকে আদিব তো হাসতে গিয়ে না আবার কারো কাঁধে চড়ে বসে! ঘাউরা বউ! হা হা হা…!আম্মু বলল, ‘একটু আগে একবার তোমার পক্ষ নিয়েছি। ওর নালিশ শুনিনি। আর এবার ওর পক্ষ নিলাম। সমান-সমান আরকি।’স্নেহা- ‘ত্যা’…আদিব- ‘ভ্যা ভ্যা! হা হা হা…!’

পৃষ্ঠা-১৪

আসলে ‘সুখ’ কোনো বস্তুগত জিনিস নয়। এটা কেউ কাউকে দিতে পারে না। টাকা দিয়েও কিনতে পারে না। এর জন্য সু-বিশাল বাড়ি আর অঢেল অর্থবিত্তের প্রয়োজন নেই। কোটি টাকার ব্যাংক-ব্যালেন্স আর ক্ষমতার আস্ফালনেরও দরকার নেই। এসবের মাঝে সুখ নেই।সুখ হলো বিচ্ছিন্ন কিছু অনুভূতির নাম। ছড়িয়ে থাকা বকুল কুড়িয়ে মালা গাঁথার নাম। সেই মালা প্রিয়জনকে নিজ হাতে পরিয়ে দেওয়ার নাম।এর মাঝে যে ধুলিকণা থাকবে না- সেটা নয়। জীবনপ্রবাহের প্রতিটি পরতই ধূলিকণাময়। এতে বিষাক্ত সব পয়জন সুপ্ত আছে। একটু বেখেয়ালিতে এই রাজ্য ধ্বংস হওয়ার জন্য যথেষ্ট। একটু অসতর্কতাতেই সুখের সংসার বিষে নীল হওয়ার জন্য খুব যথেষ্ট।উচিত হলো- বকুলগুলো কুড়িয়ে সযত্নে সংগ্রহণ করা। আর ধুলিকণাগুলো শ্রেফ ঝেড়ে ফেলে বকুলের মালা গাঁথায় মন দেওয়া। আর! আর একান্তে প্রিয়জনের গলায় সেই মালা পরিয়ে দেওয়া…

পৃষ্ঠা-১৫

গিফট বক্স

আদিব আজ স্নেহার জন্য শপিং করতে গিয়ে জ্যামে পড়ে সারপ্রাইজ দেওয়ার স্বাদ অর্ধেকটাই পেয়ে গেছে। বাকিটা দেখা যাক।ঘণ্টাদুই পর শপিং থেকে ফিরে এসে স্নেহাকে ব্যাগগুলো দিয়ে প্রোগ্রামের প্রিপারেশনে ব্যস্ত। গেস্ট সবাই এসে গেছে। মাহিরকে নিয়ে স্নেহাও ওদিকে ব্যস্ত হয়ে গেল। মাহিরকে একজোড়া সাদা পাঞ্জাবী-পাজামা পরিয়ে চোখে একটি কালো সানগ্লাস লাগিয়ে ওর দিকে অপলক তাকিয়ে আছে স্নেহা। চাঁদের সবটুকু সৌন্দর্য যেন মাহিরের চেহারায় জ্বলজ্বল করছে। কী নিষ্পাপ!অমনি রুহি হাঁক ছেড়ে বলল, ‘ভা…বী! কথাও তো একটু ভাবা উচিৎ তাই না?’ ছেলেকে লেকে স সাজালেই হবে? ভাইয়ার’ত বে রে! দাঁড়া…!’রুহি উঠেপড়ে দৌড়। ওকে সরিয়ে দিয়ে ব্যাগ থেকে সব বের করে মহাযজ্ঞ বাধিয়ে দিল স্নেহা। পাক্কা দেড় ঘণ্টা নানান তেলেসমাতি শেষে আয়নায় দাড়িয়ে স্নেহা নিজেকেই চিনতে পারছে না। আদিব বেচারা যে কীভাবে চিনবে কে জানে…আদিবের প্রোমোশন হয়েছে। সেই খুশিতে আজকের এই প্রোগ্রাম। কাছের মানুষগুলোকে আজ মনভরে আপ্যায়ন করাবে। সেইসাথে স্নেহার জন্য আছে বিশেষ সারপ্রাইজ…’এই স্নেহা! এই আদিব! আরে কোথায় তোমরা! জলদি এইদিকে আসো না! আমরা সবাই বসে আছি তো…!’আম্মুর তাড়া করা ডাক। আম্মুর ডাক শুনে তড়িঘড়ি করে আদিবের রুমে ঢুকে গেল স্নেহা। ঢুকে দেখে আদিব সোনালী রঙের পাঞ্জাবি পরে আয়নায় মুখ দেখছে।

পৃষ্ঠা-১৬

স্নেহা চাপা কণ্ঠে বলে উঠল, ‘আমার মহারাজাকে যে আজ স্কয়ার মহারাজার মতো লাগছে।’ আদিব ফিক করে হেসে দিয়ে বলল, ‘স্কয়ার মহারাজা? সেটা আবার কী?”ও তুমি বুঝবে না।”তাই। তাহলে আমার মহারানীকে তো আজ ত্রিপল মহারাণীর মতো লাগছে।”ত্রিপল মহারানী! ওমাহ! এটা আবার কী?”ও তুমি বুঝবে না।’স্নেহা চোখ বড় করে তাকিয়ে আছে। আদিব টেবিল থেকে একটি গিফট বক্স স্নেহার সামনে উঁচিয়ে ধরে বলল, ‘এই! এই ত্রিপল মহারানী রাগ করে না প্লিজ! এই নাও তোমার আজকের গিফট!’হা… করে মুখে আঙুল চেপে বড় বড় চোখ করে বক্সটির দিকে তাকিয়ে আছে স্নেহা। বাহারি রঙের রঙিন কাগজে মোড়ানো বক্সটি হাতে নিয়ে আদিবের দিকে তাকিয়ে বাঁকা ঠোঁটের ভেঙচি কেটে সোফায় বসে বক্সটি খুলতে শুরু করল।সে কী! ভেতরে দেখছি আরও একটি ছোট বক্স। সেটাও খুলছে। ধুর ছাই। এটার ভেতরেও আরও একটি ছোট বক্স। এবার ভ্রু কুঁচকে আদিবের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তিনটি বক্স দিয়ে মোড়াতে হয় বুঝি?’আদিব শান্ত গলায় বলল, ‘আমার ত্রিপল মহারানী বলে কথা!’‘স্নেহা এবার রাগ হয়ে খালি বক্সগুলো আদিবের দিকে ছুড়ে মারল। আদিব তো ক্যাঁচ ধরে হেসে কুটিকুটি…শেষের ছোট বক্সটি খুলে দেখে ভেতরে একটি সাদা খাম। সেটার উপর লেখা- “Danger! Keep away!”- এটা দেখে তো স্নেহার চোখ চড়কগাছ!-হচ্ছেটা কী? হু?আদিব খালি বক্সগুলো দিয়ে মুখ ঢেকে বলল, ‘যা লেখা আছে ফলো করে দেখে নাও হচ্ছেটা কী!’স্নেহা বেশ ভয়ে ভয়ে, সন্তর্পণে খামটি খুলে ভেতরে আরও একটি সাদা কাগজ দেখল। আদিবকে একপলক দেখে নিয়ে এবার খুলছে সেটা। আদিব এবার ওয়‍্যারড্রবের পেছনে লুকোতে যাচ্ছে।’এই! কোথায় লুকোচ্ছো! দাঁড়াও বলছি!’

পৃষ্ঠা-১৭

এই বলেই কাগজটি খুলে দেখে তাতে ব…ড় করে লেখা-I…… You!এটা দেখা মাত্রই কেন যেন স্নেহার হার্টবিট বেড়ে গেল। আদিব ওদিকে লুকানোর ভান ধরছে। স্নেহা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, ‘1. You মানে কী হুম?”বলব না!”বলো বলছি!”না বলব না!”এখন কিন্তু!”কী?”বলো বলছি!”উম হুম! বলব না…।’আহা ভাইয়া! বলো না! স্নেহা- ‘I Love You!আদিব-স্নেহা দু’জনই হা… করে তাকিয়ে দেখে জানালার পর্দার আড়ালে রুহি দাঁড়িয়ে আছে!এই কথা শুনে স্নেহা তো লজ্জায় একদম লাল-নীল-গোলাপী হয়ে গেল।’তবে রে পাজি…!’ এই বলে রুহিকে দৌড়ানি দিয়ে সোজা গেস্ট রুমে চলে গেল আদিব।এদিকে ছোট্ট সেই সাদা কাগজটি হাতে নিয়ে স্নেহা হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে।’হ্যাঁ রে স্নেহা! আর কতক্ষণ!’আম্মুর ডাক শুনে তাড়াতাড়ি করে কাগজটি লুকিয়ে ফেলতে গেলে রুহি পেছন দিয়ে ঘুরে এসে খপ করে কাগজটি নিয়ে ভোঁ দৌড়!’রুহি! এই রুহি! আরে এই পাজি বুড়িইইই…!’রুহি দৌড়াচ্ছে। পেছন-পেছন তার দুই ভাবিও দৌড়াচ্ছে। যে করে হোক, কাগজটা উদ্ধার করতেই হবে। নইলে ফাজিলটা অবিরত ব্লাকমেইল করেই যাবে।তো দেখা যাক! আজ কে জিতে…

পৃষ্ঠা-১৮

ভালোবাসার ব্যবচ্ছেদ

এক পড়ন্ত বিকেলে রাস্তার পাশ ঘেঁষে আদিব আর হাসান হেঁটে যাচ্ছে। বেশকিছু দিন হলো দু’জন একসাথে কিছু খাওয়া হয় না। অথচ একসময় একজনকে রেখে অন্যজন কোনোকিছু খাওয়ার চিন্তাও করত না। যা-ই খাক, লুকোচুরি করেও কেউ কারো কাছ থেকে নিস্তার পেত না। খাওয়া-দাওয়ার কথা শুনলে বা ইঙ্গিত পেলেই হলো, সেদিন আর পিছু ছাড়াছাড়ি নেই। দু’জনই একরকম। বড় মধুর ছিল সেই দিনগুলো।অথচ আজ উভয়েরই ফ্যামিলি আছে। জব আছে। টাকা আছে। নেই শুধু সেই দিনগুলো। দু’জনই হয়ত ভাবছে এসব। কিন্তু কেউ কিছু বলছে না। মানুষ বড় হলে। অনুভূতি আড়াল করে রাখার এক মারাত্মক প্রবণতা দেখা যায়।বাল্যকালটা অবশ্য এর একদম বিপরীত। সেখানে যে-কেউ অকপটে তার মনের কথাগুলো গড়গড় করে বলে দেয়। কোনো রাগ-ঢাক নেই সেখানে। কুটিলতার বালাই থেকেও মুক্ত সেই সময়টা। পরশ্রীকাতরতা, হিংসা, কপট রাগ, প্রতিশোধ প্রবণতা এসব কোনোকিছুই সেই সময়টাকে কলুষিত করতে পারে না। সকালে লঙ্কাকাণ্ড বাধিয়ে বিকেলেই আবার একসাথে দেখা যায়। আজ নাক ফাটিয়ে পরদিনই একসাথে গোল্লাছুট খেলতে দেখা যায়। মন্দ বিষয়গুলো ছিল খড়-কুটোর মতো। যা কিছুক্ষণ পরই ভেসে যায়। আর সম্পর্কগুলো ছিল পাথরে খোদাইকৃত নকশার মতো। যাতে ধুলো পড়লেও মুছে যেত না। মুছতে চাইলেও পারা যেত না। বাল্যকাল বুঝি এমনই হয়। না না, সবার বাল্যকাল অবশ্য এমন হয় না।বর্তমান শিশুদের বাল্যকালটা বড় একপেশে। যান্ত্রিক। একঘরে। যেটাকে আমাদের সময় শাস্তি হিসেবে দেখা হতো। অথচ আজ সেটাকেই ক্যারিয়ার গড়ার মাধ্যম ভাবা হয়। ছোট থেকেই শিশুদেরকে বই, কম্পিউটার, স্মার্টফোন, আর কোচিং-এর মধ্যে বন্দি করে ফেলা হয়। এরা সেই গোল্লাছুটের মজা বুঝবে না। বুঝবে না দুই টাকার ঝালমুড়ি নিয়ে কাড়াকাড়ি করে জামায় দাগ পড়ানো সেই ঝগড়ার স্বাদ। মায়ের বকুনির ভয়ে বন্ধুর বাড়ি থেকে জামা ধুয়ে আনা সেই স্মৃতির দাগ। বুঝবে না এরা।

পৃষ্ঠা-১৯

ত্রুটি বেলার বেলুন, খুন্তি, ঝাড়ু, হেঙ্গার, চামচ এসব দিয়ে মায়ের শাসন পাওয়া। আমাদের সেই বাল্যকাল ছিল প্রকৃত মানুষ গড়ার ভিত। সত্য করে বলছি, মায়ের। সেই বৈচিত্র্য শাসন না পেলে আমাদের বাল্যকালটা নষ্ট স্মৃতিতে তলিয়ে যেত। আজকের মতো গর্বের হতো না। আর আমরাও আজকের এই আমরা হতাম না। বেশির চেয়ে বেশি দোপেয়ে কোনো জন্তু হতাম।বর্তমানের মায়েদের শাসন হলো, অ্যাই এখন পড়তে বসো। নইলে কিন্তু ওয়াই-ফাই এর পাসওয়ার্ড চেঞ্জ করে দেব। ব্যস, পাসওয়ার্ড হারানোর ভয়ে বাচ্চারা পড়তে বসে। পড়া শেষে এই পাসওয়ার্ডের জগতে প্রবেশ করে। তো এই পাসওয়ার্ডের যুগের বাচ্চারা বড় হলে যন্ত্র হবে না তো কী হবে? আজকাল বৃদ্ধাশ্রম তো আর এমনিতেই বানানো হয়নি তাই না? কই! আমাদের সময় তো এসব কিছু ছিল না! আমাদের বৃদ্ধ মা-বাবার জন্য আমরাই যথেষ্ট ছিলাম।

এই যাহ! কোথায় হারিয়ে যাচ্ছি। আসলে আমাদের বাল্যকালটা এমনই। যেখানে নির্ভয়ে হারিয়ে যাওয়া যায়। ইশ! সেই বাল্যকালে সত্যিই যদি আবার হারিয়ে যেতে পারতাম! তাহলে এই যন্ত্রের যুগে আর ফিরে আসতাম না।আদিব-হাসান হাঁটতে-হাঁটতে দু’জনই কেমন যেন নিরবতায় হারিয়ে গেল।’এই চল, আজ বজলু মামার হাতের লাল চা খাই। হেব্বি হয় মামার চাটা। নিরবতা ভেঙে আদিব বলে উঠল।হাসান বলল, ‘শুধু চা খাওয়াবি?”বাকিটা তুই খাওয়া। সমান সমান।”‘আর ভালো হলি না। আচ্ছা চল। সমান সমান না, সবটাই আজ আমি খাওয়াব।”মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি! আ হা হা! চল চল।”মামা ভালো করে দুই কাপ চা দাও তো। আর কেক দিও দুইটা।’ দোকানিকে উদ্দেশ্য করে হাসান বলল।বাইরে বেঞ্চে বসে পড়ল দু’জন।আদিব বলল, ‘কী রে! তোর চোখ-মুখ কেমন শুকনা দেখাচ্ছে। কোনো ঝামেলা হয়েছে নাকি?’

পৃষ্ঠা-২০

বাল্যবন্ধুদের এই একটা দোষ। চেহারা দেখেই অনেককিছু ধারণা করে ঠাসকরে মুখের ওপর বলে দেয়। অনেকটা মিলেও যায়। কীভাবে সম্ভব? সে যাকগে। হাসান বলল, ‘না, তেমন কিছু হয়নি।”তেমন কিছু না হলেও কিছু না কিছু হয়েছে। বলবি না সেটাই বল।’হাসান চোখ নামিয়ে নিল।’বড় হয়েছিস। কথা লুকানোর সেই স্বভাবটা আজও ধরে রেখেছিস। ভাবির সাথে ঝগড়া হয়েছে?’হাসান নিশ্চুপ।’মামা চা নেন।’ এই বলে দোকানি চায়ের কাপ সামনে ধরে তাকিয়ে আছে। আদিব কাপ দু’টি নিয়ে হাসানকে একটা দিল, নিজে একটা নিল। প্রথম চুমুক লাগিয়ে কাপটি হাতে রেখে বলল, ‘আচ্ছা হাসান, কিছু কথা বলি। মাইন্ড করিস না। কথাগুলো আমার দিক থেকে বলছি। তুই আবার নিজের দিকে টেনে নিস না।’আদিবের এমন কথার অর্থ হাসান ভালো করেই বুঝে। আদিব যখন হাসানকে কোনো পরামর্শ বা উপদেশ দিতে চায় ঠিক তখন ও এভাবেই শুরু করে। নিজেকেই নিজে উপদেশ দেয়। অথবা মাঝেমধ্যে অন্য কাউকে উদ্দেশ্য করে বলে। সরাসরি শ্রোতার নাম ধরে কিছু বলে না। হাসান বুঝতে পেরে সম্মতি দিল।’হুম বল।”আমি জানি, সাংসারিক দিকটা তুই আমার চেয়ে ভালো বুঝিস। কিন্তু তবুও আজ আমার কিছু দৃষ্টিভঙ্গি তোর সাথে শেয়ার করতে চাই। হয়তো নিজে একটু স্বস্তি পাব। আর কিছু না। শুনবি?”অবশ্যই শুনব। বল।’আদিব বলতে শুরু করল- ‘আসলে সাংসারিক জীবনের অক্সিজেন হলো ভালোবাসা। অক্সিজেন-এর ঘাটতি হলে যেমন দম আটকে আসে, কিছুক্ষণের মধ্যেই মানুষ মারা যায়, তেমনি সংসারে ভালোবাসার ঘাটতি দেখা দিলে সম্পর্কে আঘাত আসে। এই অবস্থা বেশিক্ষণ চলতে থাকলে সম্পর্কের বন্ধনটি টাস করে ছিড়ে যায়। ‘ভালোবাসা’ শব্দটি আমার কাছে পৃথিবীর সর্বোচ্চ অপার্থিব একটি শব্দ। যার সাথে পার্থিব কোন চাহিদা, আশা, লোভ, উদ্দেশ্য এসব কোনোকিছুই থাকে না। থাকে কিছু আবদার, অভিমান, খুনসুটি আর পাগলামো।

পৃষ্ঠা ২১ থেকে  ৪০

পৃষ্ঠা-২১

আমার কাছে…সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ এক অকৃত্তিম অনুভূতির নাম ভালোবাসা।মুহূর্তেই নিষ্প্রাণের মাঝে প্রাণসঞ্চার করার মতো এক অদ্ভুত শক্তির নাম ভালোবাসা।হৃদয়াকাশে কষ্টের ভারী মেঘের তর্জন-গর্জনকে বাতাসে মিলিয়ে দেওয়ার মতো এক প্রবল শক্তির নাম ভালোবাসা।চৈত্রের ক্ষররৌদ্রের প্রখরতায় চৌচির হওয়া ফসলি মাঠের বৈশাখের ঝটিকা বর্ষণে প্লাবিত হওয়ার মতো চটকদার এক ম্যাজিকের নাম ভালোবাসা।অনুর্বর জমির উর্বরতা বৃদ্ধিতে ‘সার’ এর মতো কার্যকরী উপাদানের নাম ভালোবাসা।বৈদ্যুতিক যন্ত্রের জন্য বিদ্যুতের প্রয়োজনীয়তার মতো অকল্পনীয় প্রয়োজনের নাম ভালোবাসা।জীবেনে বেঁচে থাকার স্বার্থে দেহাভ্যন্তরীণ রক্তের ‘হিমোগ্লোবিন’ এর ন্যায় অত্যাবশ্যকীয় উপাদানের মতো বাধ্যতামূলক এক উপাদানের নাম ভালোবাসা।প্রাণীকোষের প্রাণ ‘নিউক্লিয়াস’ এর মতো এক প্রাণোৎসের নাম ভালোবাসা।দুষ্টদের অনিষ্টকারী শক্তিকে ম্লান করে বিশ্বাসের ভিত্তিতে সম্পর্কে নতুনত্ব এনে দেওয়ার মতো এক পরাশক্তির নাম হলো ভালোবাসা।দারিদ্রের গ্লানিকে পায়ে ঠেলে কুঁড়েঘরকে রাজপ্রাসাদে পরিণত করার মতো অব্যর্থ কংক্রিটের নাম ভালোবাসা।ডানাবিহীন আকাশে ওড়া, চাকাবিহীন গাড়িতে চড়া, জাহাজবিহীন সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার মতো দুঃসাহসের নাম ভালোবাসা।হৃদয়াভ্যন্তরীন নিকষকালো অন্ধকার দূরীভূতকরণে আলোর ন্যায় অদ্বিতীয় মাধ্যমের নাম ভালোবাসা।চোখাচোখির এক বর্ণহীন ভাষার নাম ভালোবাসা।ধুরছাই, আর কত ‘বলব? আসল কথা হলো, পাগলামোর অপর নামই ভালোবাসা।এই বলে আদিব দম ফেলতেই হাসান হেসে ফেলল। চোখ পাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী রে! লাভ গুরু হলি কবে থেকে?’

পৃষ্ঠা-২২

‘হা হা হা! পাগলটা কী বলে দেখা ওসব কিছু না। আসলে আমার অনুভব থেকে ভালোবাসার কিছু সংজ্ঞায়ন করলাম।”তো এমন বিচিত্র সংজ্ঞায়নের ডেফিনেশন কেমন হবে রে?’ হাসানের বিস্ময়মাখা প্রশ্ন।আদিব বলল, ‘তা জানি না। তবে আমি যেটুকু বুঝি, এই ভালোবাসাকে যেমন একেকজন একেকভাবে সংজ্ঞায়িত করে, তেমনি একেকজন একেক চোখে দেখে। একেকভাবে অনুভব করে। কারও সাথে কারও মিল পাওয়া যায় না। কিছুটা পার্থক্য থাকেই থাকে।”যেমন?”যেমন- কিছু হতভাগী আছে, যাদেরকে ভালোবাসার নামে বিভিন্ন ভেলকিবাজিতে কুপোকাত করে কিছু ভিজাবিড়াল তাদের লালসা পূরণার্থে ওঁৎ পেতে থাকে।সেই হতভাগীরা ওদের সেই নোংরামিতে ভালোবাসা খুজে পায়। ভালোবাসা আর লালসার মাঝে পার্থক্য করতে না পেরে অনেকেই নিজের বিবেক ও চরিত্রকে বিসর্জন দেয়। কিন্তু আমি…!”আমি কী? থামলি কেন? বল না!’ আগ্রহভরে বলল হাসান।আদিব বলতে শুরু করল, ‘বিছানায় মাথা রেখে পাগলীটির মুখাবয়ব পানে অপলক তাকিয়ে থাকার মাঝে ভালোবাসা খুজে পাই…

একাকি পথচলাকালীন পাশে অদৃশ্য কারও উপস্থিতি টের পেয়ে হাতটি আলতো করে বাড়িয়ে দিয়ে ওর কল্পিত আঙুল মুষ্টিবদ্ধ করে বাকি পথ অতিক্রম করার মাঝে ভালোবাসা খুজে পাই…খাবারের প্রথম লোকমা ওর মুখে তুলে দিতে গিয়ে আলতো কামড়ে নিজের আঙুলটি ওর মুখে আটকে থাকার দৃশ্য দেখার মাঝে আমি ভালোবাসা খুজে পাই…দিনশেষে ঘরে ফেরার সময় একটি চকলেট কিনে নিয়ে দু’জন ভাগাভাগি অতঃপর কাড়াকাড়ির খুনসুটির মাঝে আমি ভালোবাসা খুজে পাই…নিভৃতে নামাজ শেষে ওর হাতটি টেনে নিয়ে ওর আঙুলেই তসবিহ গণনা করার মাঝে আমি ভালোবাসা খুজে পাই…একান্তভাবে নিজের অবিচ্ছেদ্য অংশ বানিয়ে আমৃত্যু একসাথে কাটিয়ে জান্নাতেও চিরসঙ্গী করে নেওয়ার পবিত্র স্বপ্নের মাঝে আমি ভালোবাসা খুজে পাই…

পৃষ্ঠা-২৩

কী রে আছিস? না চৌঠা আসমানে ভ্রমণে গেছিস?’দীর্ঘক্ষণ পর আদিবের প্রশ্ন শুনে হাসান বলল, ‘চৌঠা আসমানে না। তোর দৃষ্টিভঙ্গির মাঝে হারিয়ে গেছি। বল। এরপর বল।’আদিব পুনরায় বলল, ‘জানিস! একবার আমি দেখলাম, এক বৃদ্ধ রাস্তার পাশে দাড়িয়ে একটি মোবাইল দু’হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে দাড়িয়ে আছে এবং একটু পরপর মোবাইলের স্ক্রিনে তাকাচ্ছে আর মিটিমিটি হাসছে। আমি এগিয়ে গিয়ে কারণ জিজ্ঞেস করলে বৃদ্ধ বলল, এহন আপনের চাচির লগে কথা কইলাম। পরে ফোন রাখতে যাইয়া দেহি এইখানে আপনের চাচির সেফ করা নাম ভাইসা উঠছে। সেইটা দেইখা কেন যানি খুব ভালা লাগতাছে বাজান।আমি বৃদ্ধের এই সরলতার মাঝে আকাশের মতো বিশাল একটি হৃদয় খুজে পাই। আর তাতে কেবল নিখাঁদ ভালোবাসাই দেখতে পাই।’আদিবের কথাগুলো শুনে বেশ বড়বড় চোখ করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে হাসান।’এই তোর চা তো শরবত হয়ে গেল। খেয়ে নে। আর এত বড়বড় চোখে তাকালে ভয় পাই তো। চা শেষ কর আগে।’ আদিবের কথা শুনে হাসান চায়ের কাপে মুখ লাগাল। কয়েকটানে শেষ করে বলল, ‘তোরটা কই?’কথার ফাঁকে সেই গতকালই শেষ করেছি। হা হা হা..!”হাসান নিশ্চুপ। নিরবতা ওর আপাদমস্তক আচ্ছন্ন করে আছে। সেইসাথে রাজ্যের চিন্তাও। আদিবের কথাগুলো কেমন যেন ভেতরটায় তোলপাড় শুরু করে দিয়েছে। ভালোবাসার এতরকম সংজ্ঞা হতে পারে? এর ডেফিনেশন এমন হতে পারে? মানুষের পারস্পরিক দৃষ্টিভঙ্গির এতটা ব্যবধান থাকতে পারে? এই সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই তাতে ছেঁদ ফেলে আদিব বলল, ‘আমার ভালো লাগা, স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করা, আর ভালোবাসার অনুভূতি খুজে পাওয়ার ক্ষেত্রগুলো বলি এবার। মন দিয়ে শোন।’হাসান বাধ্যগত ছেলের মতো আদিবের কথায় নিরব সম্মতি দিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। আদিব আবারও বলতে শুরু করল- ‘ভালোবাসার মানুষটিকে মানুষ সকাল-বিকেল ও বিভিন্ন উপলক্ষ্যে শুভেচ্ছা জানিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। আর আমি তাকে নিয়ে গদ্য-পদ্য রচনায় শব্দরাজ্যে হারিয়ে যেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।

পৃষ্ঠা-২৪

মানুষ বিভিন্ন প্রোগ্রামে আতশবাজি আর বেলুনের মোহনীয় পরিবেশে বাছবিচারহীন ধস্তাধস্তিতে পৈশাচিক আনন্দ পায়। আর আমি জ্যোৎস্নারাতের মাখো- মাখো চাঁদের আলোয় পাশে বসিয়ে ওর কাজল কালো হরিণী চোখ দেখতে দেখতে রাত্রি পার করার মাঝে স্বর্গীয় আনন্দ পাই।ওরা নিজের ভালোবাসাকে বাইকের পেছনে চড়িয়ে দিগ্বিদিক ঘুরে বেড়ানোর মাঝে উৎফুল্লতা খুজে পায়। আর আমি তার হাতে হাত রেখে ভোরের শিশির মাড়িয়ে দীর্ঘ পথ হেঁটে বেড়ানোর মাঝে প্রফুল্লতা খুজে পাই।ওরা পার্কে পরস্পর হেলান দিয়ে উন্মুক্ত পরিবেশে অশ্লীল খোশালাপে টাইম পাস করে। আর আমি তার কোলে মাথা রেখে তার মিষ্টি কণ্ঠে কালামুল্লাহর তেলাওয়াত শোনার মাঝে বিভোর হয়ে থাকি।বিশেষ দিনে ওরা রেস্টুরেন্টে হাজার টাকা বিল দিয়ে গার্লফ্রেন্ডকে খুশি করার মাঝে ক্রেডিট খুজে পায়। আর আমি বিশেষ দিনে আমার অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে তাকে প্রস্ফুটিত গোলাপ গিফট করার মাঝে ক্রেডিট খুজে পাই।ওরা গার্লফ্রেন্ডের অভিমান ভাঙাতে শপিংমলে নিয়ে যায়। আর আমি তার অভিমান ভাঙাতে আচমকা কোলে তুলে নিয়ে কপালে আলতো করে ভালোবাসার মিষ্টি ছোঁয়া এঁটে দেওয়াকেই যথেষ্ট মনে করি।ওরা ভালোবাসি ভালোবাসি বলে বলে মুখে ফেনা তোলার মাধ্যমে ভালোবাসা প্রকাশ করে। আর আমি তাকে কখনও কইতর, কখনও ভূত বলে ডাকার মাঝে ভালোবাসা প্রকাশ করি।ওরা নিভৃতে লালসা পূরণের মাঝে ভালোবাসার প্রমাণ খুজে পায়। আর আমি মুনাজাতে জান্নাতেও একসাথে থাকার কামনা করার মাঝে ভালোবাসার প্রমাণ খুজে পাই।ওরা পরস্পরের ফেসবুক আইডির পাসওয়ার্ড জানার মধ্যে বিশ্বস্ততা খুজে পায়। আর আমি গভীর রাতে উভয়ে পাশাপাশি দাড়িয়ে তাহাজ্জুদ পড়ার প্রতিজ্ঞা করার মাঝে বিশ্বস্ততার প্রমাণ পাই।ওরা গার্লফ্রেন্ডের ‘কিউট বেবি’ হওয়ার মাঝে উত্তেজনা খুজে পায়। আর আমি তার স্বপ্নপুরুষ হবার অদম্য অভিপ্রায় পোষণ করার মাঝে উদ্যমতা খুজে পাই।

পৃষ্ঠা-২৫

ওরা সামাজিকতা স্বরূপ কমিউনিটি সেন্টারে ভোজনোৎসবের গন্ডি পেরিয়ে ভাঁজ মহলে হানিমুনের স্বপ্ন দেখে। আর আমি তাকে নিয়ে এহরামের কাপড় পরে বাইতুল্লাহ তাওয়াফের স্বপ্ন দেখি।’এই পর্যন্ত বলেই আদিব উৎকণ্ঠিত হয়ে বলল, ‘কী রে হাসানা তুই কাঁদছিস?আদিবের একের পর এক ভালোবাসার সব কল্পকথা শুনে হাসান কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল। না কিছুর সন্ধানে গিয়েছিল? কী জানি।যেখানেই যাক। কিন্তু চোখে পানি কেন? আদিবের জিজ্ঞাসার পর হাসান একটু নড়েচড়ে বসে বলল, ‘আদিব, আমার জন্য একটু দু’আ করিস। তোর মতো করে যেন আমিও ভাবতে পারি। আমিও তাকে নিয়ে এমন করে স্বপ্ন দেখতে পারি। স্বপ্নগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে পারি। দু’আ করিস খুব। করবি তো?”তা না হয় করলাম। কিন্তু তোর চোখে পানি দেখে তো সহ্য হচ্ছে না রে। ভাবিস না, সব ঠিক হয়ে যাবে। তোর জায়গা থেকে তোর দায়িত্বটুকু তুই করে যা। ভাবির পক্ষ থেকে এরপরও কোনো ত্রুটি হয়ে গেলে ধৈর্য ধর। অপেক্ষা কর। মনে রাখিস, ভালোবাসা কোনো চুক্তির নাম নয় যে, তুমি আমার জন্য এই এই করবে, বিনিময়ে আমিও এই এই করব। তুমি করবে না, তো আমিও বাধ্য না।ভালোবাসা একটি নিঃস্বার্থ সম্পর্ক। এখানে লেনাদেনার কোনো হিসেব থাকতে নেই। পাওয়া-না পাওয়ার কোনো অংক কষতে নেই। যেখানে এসবের হিসেব হয়, প্রতিটি পদক্ষেপের অংক কথা হয়, সেখানে ভালোবাসা কীভাবে হয়।তাই স্ত্রী, সংসার, বিয়ে এসব নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত ফ্যান্টাসিতে ভোগা বেশকারণ স্বপ্নের ক্যানভাসে ইচ্ছেমতো রংতুলির আঁচড় কাটা যায়, চাহিদামতো ভার অবয়ব গড়া যায়, কিন্তু বাস্তবতা এত সরল নয়। আর জীবনটাও তুলির আঁচড়ে ক্যানভাসে আাঁকা কোনো শিল্প নয়।এখানে আশানুরণ প্রাপ্তি না-ও হতে পারে। স্বপ্নের মতো করে কাউকে অবিষ্কারের অভিলাষ ব্যর্থও হতে পারে। অনাগত সব অলীকতায় ভোগার আগে এসব ভেবে দেখা উচিত। এরপর পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে তবেই বৈধাহিক জীবনে পা খাড়ানো উচিত। এবং সাংসারিক জীবনে সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ ফেলা উচিত।

পৃষ্ঠা-২৬

চাহিদা ও স্বপ্নের পরিধি যদি সীমিত হয়, তাহলে প্রাপ্তি অল্প হলেও তৃপ্ত হওয়া যায়। অন্যথায় আলাদিনের চেরাগ হাতে পেলেও সুখী হওয়া দায়।আর একটি বিষয় খুব স্মরণ রাখবি। তুমি সঠিক বলে আমি ভুল, ব্যাপারটি এমন নয়। কারণ, তোমার কাছে যেটা 6. আমার কাছে সেটা 9।তাই, ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করা ও পরিবেশকে শান্ত রাখা উচিৎ। নিজেদের মধ্যে কোনো বিষয় নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে নিজের মতটাকে শিথিল করে তারটা মেনে নেওয়া উচিত। কী। এতে কি খুব বেশি ক্ষতি হয়ে যাবে? আর হুটহাট রেগে যাবি না। কেননা রাগ হলো আগুন। যা নিয়ন্ত্রিত হলে উপকারী, বেপরোয়া হলে ধ্বংসকারী।তাছাড়া অন্যের নিকট থেকে প্রত্যাশার মাত্রা কমিয়ে আনা চাই। দেখবি- প্রত্যাশা ছাড়াই যেটুকু মিলবে, তাতে সুখ পাবি, ভালো লাগবে। অন্যথায় অতৃপ্তি নিয়েই জীবন কাটবে।’হাসান মন্ত্রমুগ্ধের মতো আদিবের কথাগুলো শুনছে। টু শব্দটুকুও করছে না। এর একটু পর হাসান কিছু একটা বলতে যাবে, অমনি আদিব ফের বলে উঠল, ‘আজ তোর কাছ থেকে কিছু শুনব না। আজ শুধু বলব। শুনব অন্যদিন। আজকের বলা কথাগুলো কিছুদিন অ্যাপ্লাই কর, এরপর তোর বাকি কথা সব শুনব।’আদিব এই বলে পুনরায় বলতে শুরু করল।’এবার স্বামী-স্ত্রী দুজনের জন্যই লক্ষণীয় কিছু বিষয় বলব। কারন তুই আর আমি প্রায় কাছাকাছি সময়েই বিয়ে করেছি। অথচ আমার একটি সন্তান আছে। কিছুদিন পর ওর অ্যাকাডেমিক পড়াশোনাও শুরু হবে। আর তুই আজও কোনো সন্তান নেওয়ার কোনো প্লানই করিসনি। জীবনকে একটু উপভোগ করবি বলে তোর এই সিদ্ধান্ত। অথচ সেই জীবন থেকেই তুই এখন পালিয়ে বেড়াতে চাস। কেন? কেন এমনটা হলো? থাক সেই কথা। সেটা নিয়ে সরাসরি কোনো ডাক্তারের সাথে আলোচনা করব একসময়। আর সর্বশেষ যেটা বলতে চাচ্ছি, খুব মন দিয়ে শোন।বিষয়টি হলো, স্বামী বা স্ত্রীর একে অপরের সাথে অন্যকোনো পুরুষ বা নারীকে কখনো তুলনা করা উচিত না।মনেকর, তোর স্ত্রী দেখতে ততটা সুশ্রী না। যতবার তাকে দেখিস ততবারই কোনো না কোনো সুশ্রী নারী তোর চোখে ভেসে ওঠে। আর মনে মনে প্রলাপ বকতে থাকিস- ইশ! ঐ মেয়েটা যদি আমার স্ত্রী হতো। অথবা আমার স্ত্রী যদি ওরকম সুন্দর হতো। এটা একটা যো ওয়েজ্ঞায়

পৃষ্ঠা-২৭

স্ত্রীর মানবিক কোনো ত্রুটি নজরে আসার সাথে সাথে অন্য কোনো নারী তের কল্পনায় চলে আসল। স্বপ্নের রানী হিসেবে তাকে নিয়ে স্বপ্ন বোনা শুরু হয়ে গেল এটি আরও একটি স্লো পয়জন।আবার স্ত্রীদের জন্য তার স্বামী তার সার্বিক চাহিদা মিটাতে সর্বদিক দিয়ে পার্ফেক্ট হলেও ধরি কোনো একদিক দিয়ে কিছুটা পিছিয়ে। তো যতবার তার এই দুর্বল দিকটি মনে পড়ে ততবারই এই দিকটাতে সবল কোনো পুরুষের কথা তার স্মরণ হয়ে যায়। কল্পনায় তার সাথে একপশলা বৃষ্টি বিলাসও অতিত হয়ে যায় স্ত্রীদের জন্য এটা বড় মারাত্মক একটা স্লো পয়জন।স্বামীর অবদানগুলো ঘুণাক্ষরেও চোখে পড়ে না। হঠাৎ কোনো মিসবিহেব দেখতে পেলে সেটাকে খামচে ধরে জটলা পাকানোটা মারাত্মক স্লো পয়জনের পাশাপাশি একপ্রকার মানষিক ব্যাধিও বটে।এজাতীয় স্লো পয়জন সংসারের সুখগুলোকে জ্বালিয়ে তন্ম করে দেয়। অশান্তি ও অহেতুক সন্দেহের বিষ ঢেলে দিয়ে জীবনকে অতিষ্ট করে দেয়।আবার কত ভাইদের দেখি নিজের স্ত্রীকে নিয়ে একদমই সন্তুষ্ট নয়। স্ত্রীর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেই চেহারার দিকে আর তাকানো যায় না। অনেক বোনকেও দেখা যায় স্বামীর ব্যাপারে যথেষ্ট বিরাগভাজন। মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তিটিই তার স্বামী। আমরা আসলে শোকর করতে জানি না। যেটুকু পেয়েছি এটুকুর যত্ন নিলে হয়তো এই মানুষটিই একদিন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্বামী হতে পারবে। কিংবা দীল জুড়ানো ও চক্ষু শীতলকারিনী স্ত্রী হতে পারবে।মনে রাখবি- পৃথিবীতে কোনো মানুষই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের যে ত্রুটি দেখে নিজের মন অন্য কারো প্রতি ঝুঁকতে চায়, সেই কাঙ্ক্ষিত ব্যাক্তিটিরও নিশ্চয়ই এমনকিছুতে কোনো ত্রুটি আছে, হয়তো সেইদিকটায় তার স্বামী বা স্ত্রী একেবারে সুপারস্টার! তো যে কোনোভাবে তাকে পাওয়ার পর যখন তার লুকিয়ে থাকা সেই ত্রুটিগুলো নজরে আসবে তখন আবার তৃতীয় কারো প্রতি মন ঝুঁকতে চাইবে। কারণ পৃথিবীর মানুষ কবরের মাটি ছাড়া কোনোকিছুতেই তৃপ্ত হতে পারে না।আসলে শতভাগ ত্রুটিহীন স্বামী বা স্ত্রী পাওয়া একমাত্র জান্নাতেই সম্ভব। তাই উচিত হলো, অযথা অতৃপ্তিতে না ভূগে আল্লাহ যাকে দিয়েছেন তার ত্রুটিগুলো দাফন করে গুণগুলো নিয়ে বেঁচে থাকা, আর জান্নাতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকা। সেখানে আল্লাহ প্রত্যেকটা স্বামী ও স্ত্রীকে শতভাগ ত্রুটিমুক্ত করে দেবেন।

পৃষ্ঠা-২৮

আরও একটি বিষয় লক্ষ্য রাখা উচিত, স্বামী-স্ত্রী উভয়েই অপরাপর নারী-পুরুষ থেকে দৃষ্টিকে সংযত রাখা, ভাবনার জগতকে কেবল নিজের স্বামী বা স্ত্রীর জন্যই উন্মুক্ত রাখা। তাকে ঘিরেই স্বপ্নের জগতটা চাষাবাদ করা। এতে দিনদিন সুখের রাজ্য বিস্তর হতে থাকবে। আর দুঃখরা সব লেজ গুটিয়ে পালাবে।একটু সবর! এই তো আর ক’টা দিন…এই মামা তোমার বিল নাও।’শেষে এই বলে আদিব পকেট থেকে টাকা বের করতে গেলে হাসান নিষেধ করে বলল, ‘রাখ আদিব, অন্যদিন দিস।’আদিব নাকে নাকে বলল, ‘বন্ধুকে কিছু দেওয়ার চেয়ে বন্ধুর কাছ থেকে কিছু নেওয়ার মাঝে অধিক আনন্দ। ধন্যবাদ তোকে।’ এই বলে মানিব্যাগ পকেটে রেখে দিল।হাসান বলল, ‘শোধবোধের নীতিটা কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না।’দেখ হাসান, নিশ্চয়ই এখন আমরা আগের সেই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী নই! সো, আজকের চায়ের বদলে চা ছাড়া অন্যকিছু ডিমান্ড করলে কিন্তু জামায় রঙ মেখে দেব।”আমি বুঝি বসে থাকব?”কী করবি তুই?”রঙ মাখা জামা সোজা ভাবির কাছে পাঠিয়ে দেব। সাথে চিরকুট লিখব- আজ এটা ধুয়ে না দিলে কাল নিজের স্বামীরটা সহ ধুতে হবে।”তবে রে…!’

পৃষ্ঠা-২৯

লেডি অফিসার

‘আমার কলিজাটা কোথায় রে…”এই আমাকে আর কলিজা কলিজা করবা না। এটা কমন। আর কমন জিনিস আমার ভাল্লাগে না।”আচ্ছা তাহলে খুকু। আমার পাকস্থলীটা কোথায় রে….’এ্যা… কী বিচ্ছিরি ডাক! এইটা না। আনকমন ঠিক, তবে গর্জিয়াস হতে হবে।”আচ্ছা আবার খুকু। কলিজার ইংলিশ ভার্সন- আমার লিভারটা কোথায় রে…!!’আরে মাবুদ! তুমি একটু রোমান্টিক আর কবে হইবা?”আচ্ছা এবারও থুকু। আমার কিডনি দুইটা কোথায় রে…!’অমনি খপ করে আদিবের কলার ধরে ফেলল স্নেহা। হ্যাঁচকা টানে মাথাটা কাছে এনে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল, ‘দুইটা আসলো কোথেকে? আরেকটার নাম কী? বাড়ি কোথায়? কবে থেকে এই ভণ্ডামি? দেখি মোবাইল দেখি। নাম্বার কোনটা বলো। কিয়ামত ঘটাই দিমু আজ! সাক্ষাত কিয়ামত!’এই বলে কলার ছেড়ে দিয়ে আদিবের পকেটে হাত দিল স্নেহা। আদিবগোবেচারা ভাব নিয়ে ড্যাবড্যাবিয়ে তাকিয়ে আছে স্নেহার দিকে। আদিবেরচোখেমুখে অসহায়ত্বের স্পষ্ট ছাপ। দু’হাতে স্নেহারহাতদু’টি চেপে ধরে অস্ফুটেবলল, ‘স্নেহা প্লিজ! কালই আমি রোমান্টিক কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়ে রোমান্সশিখব। এবারের মত আমাকে ক্ষ্যামা দাও সোনা।”চুপ! এক্কেবারে চুপ! কিডনি দুইটা কোথায় রে… ওলে লে লে লে! কী রোমান্টিক ডাক! আজ আরেকটা কিডনির রহস্য আমি বের করেই ছাড়ব।’আদিবের পকেটটা ছিড়ে ফেলল বুঝি! তবুও ছাড়ছে না। কারণ ফোনটা ওর হাতে গেলে রহস্য উদঘাটন হোক বা না হোক, ফোনটাকে উদ্ধার করতে আদিবের পনেরো গোষ্ঠী পর্যন্ত উদ্ধার হবে নির্ঘাত।

পৃষ্ঠা-৩০

‘সোনা আমার! আমার কিডনি তো দুইটাই। বিশ্বাস না হয় হসপিটালে চলো।’না! সোজা বাসায় যাব। নিজ হাতে কেটেকুটে নিজ চোখে দেখব আমি। আমাকে ঠকানোর চেষ্টা। আমার কিডনি দুইটা কোথায় রে… আ হা হা। চলো আগেবাসায়।আদিব কিছু না বলে চুপচাপ স্নেহার সাথে হাঁটতে লাগল। খুশিতে মাঝেমাঝে ফিক করে হেসে ফেলছে আদিব। স্নেহা কড়া গলায় বলল, ‘আমার রাগ দেখে আবার হাসি? খুব খুশি তাই না? দুইটা কিডনি নিয়ে মাস্তি করে বেজায় খুশি। হবাই তো হবা না! আমি কী আর সেই কপাল নিয়ে এসেছি…।’গলা ধরে এলো স্নেহার। কাঁপা কাঁপা ঠোঁট। ছলছল চোখ। অভিমানী মুখ।আদিব দাড়িয়ে গেল। স্নেহার বাজুতে ধরে ওর চোখের দিকে গভীর দৃষ্টি ফেলে অপলক তাকিয়ে রইল। স্নেহা নিশ্চুপ। আদিব বলল, ‘হ্যাঁ, আমি খুশি। আমি আজ বেজায় খুশি। কারণ আমি জানি, একটি মেয়ে তার জীবন দিতে পারে। কিন্তু নিজের ভালোবাসার ভাগ কাউকে দিতে পারে না। আর এজন্যই সে তার প্রিয় মানুষকে নিয়ে অজানা শঙ্কায় থাকে- এই বুঝি হারিয়ে গেল! জানো স্নেহা! এই মেয়েগুলো তার প্রিয় মানুষটিকে পাগলের মতো ভালোবাসে।এখন তুমিই বলো! এমন ভালোবাসা পেয়ে সেই ভাগ্যবান ছেলেটি যদি খুশিতে আত্মহারা হয়ে অজ্ঞাতেই একটু হেসে ফেলে, এটা কি অন্যায় হবে?’স্নেহা কেন যেন কেঁদে ফেলল। চিকন ফ্রেমের চশমার ফাঁক গলিয়ে মায়াবী সে কাজল চোখের নোনতা জলে কয়েকমুহূর্তেই নেকাব ভিজে গেল। আদিব বলল, ‘এই পাগলী! বাসায় চলো। মাহির ওর দাদুর কাছে কান্নাকাটি শুরু করে দেবে। চলো তো, চলো চলো।’আদিব এই বলে স্নেহার হাত ধরে গুনগুনিয়ে কালামুল্লাহর সুর ধরল। হাতদু’টি দোলাতে দোলাতে, তিলাওয়াতের মূর্ছনা ছড়াতে ছড়াতে দু’জন বাড়ির পথ ধরল।অভিমান, সতর্কতা, শাসন এগুলো অনেকটা মরিচের মতো। একেবারে বেখবর হলে অর্থাৎ খাবারে মরিচ পরিমিত না হলে সেটা খাওয়া যায় না। পানসে লাগে। আবার অতিরিক্ত হয়ে গেলে সেটা আর খাওয়ার উপযুক্ত থাকে না। ঝালে চোখমুখ লাল হয়ে আসে।সঙ্গীর গতিপ্রকৃতির প্রতি একটু লক্ষ্য রাখা ভালো। কিন্তু এটা নিয়ে অতিরিক্ত কিছু না করা ভালো।

পৃষ্ঠা-৩১

হার্ট যেমন মানুষের দেহ ও মনের কেন্দ্রবিন্দু, এর গতিপ্রকৃতে সামান্য হেরফের হলে স্ট্রোক করার আশঙ্কা থাকে। তেমনি সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘বিশ্বাস’। সম্পর্কে এই বিশ্বাসের সামান্য ত্রুটি থাকলে সেই সম্পর্কে পচন ধরে। আজ না হয় কাল, পচে যাবে। কোনো না কোনোভাবে কিংবা কারণে-অকারণে লঙ্কাকাণ্ড বেধে যাবে। ফলাফল, নিশ্চিত বিচ্ছেদ। বাহ্যিক বিচ্ছেদ হয়তো নানান প্রতিকূলতায় বিলম্বিত হতে পারে, কিন্তু মনের বিচ্ছেদ ঠেকাবে কী দিয়ে?আজ শুক্রবার। ওরা ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল। বাসার কাছেই চেম্বার। পায়ে হেঁটেই যাওয়া যায়। স্নেহা অন্তঃসত্ত্বা। কিছুদিন হলো স্নেহার শরীর খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। হাল্কা পেটে ব্যথা, অতিরিক্ত অস্থির লাগা, দুর্বল লাগা এইসব। তাই চেক-আপ করাতে গিয়েছিল। ইউরিন টেস্ট, ব্লাড টেস্ট, আলট্রা সহ সব রিপোর্ট আদিবের কাছে। কী হয়েছে না হয়েছে বা কন্ডিশন কী এসব কিছু স্নেহাকে জানায়নি এখনও। বলেছে সবকিছু স্বাভাবিক আছে। ধীরেধীরে কমে যাবে। স্নেহাও অতটা গুরুত্ব দেয়নি। রিপোর্টের কাগজগুলো হাতে নিয়ে দোলাতে দোলাতে আনমনা হয়ে হাঁটছে আদিব। বড় কোনো সমস্যা হয়নি তো? প্রশ্নটি আদিবের না। সে তো জানেই সবকিছু। প্রশ্নটি স্নেহার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।’আচ্ছা কী হয়েছে আমার?’ জিজ্ঞেস না করে আর থাকতে পারল না স্নেহা।’কই কিছু না তো!”না, কিছু একটা লুকাচ্ছো মনে হচ্ছে।”লুকাব কেন বোকা!”তা জানি না, তবে লুকাচ্ছো।”ওরকম কিছু না। টেনশনের কিছু নেই।”যে রকমই হোক, আমাকে বললে কী হয়?”না বললে কী হয়?’স্নেহার চোখদুটো গোলগোলা হয়ে গেছে। খুব রাগ হলে ওর এরকম হয়। সেই সাথে কিছুক্ষণের জন্য চোখের পলক ফেলাও বন্ধ হয়ে যায়। আদিবের খুউব ভাল্লাগে এমন রাগান্বিত চোখ দেখতে। আদিব বলল, ‘ইশ, বাসায় যাওয়ার পরও এভাবে থাকবে কিছুক্ষণ। তোমার গোলগোলা চোখের সাথে লাল হয়ে আসা গালদুটোর কম্বিনেশন দেখতে খুউব ভাল্লাগে।’

পৃষ্ঠা-৩২

ঘুরে দাড়িয়ে মাথা ঝাকানো প্রশ্ন স্নেহার। মুখোমুখি অবস্থান। কোমরে হাত। আদির বলল, ‘এইরে, রাস্তাঘাটে মারধর কোরো না প্লিজ। বাসা পর্যন্ত যাই, এরপর বালিশ, কোলবালিশ সব হাতে ধরিয়ে দেব। যত ইচ্ছা মেরো তখন। প্লিজ!’স্নেহা একবার আশপাশে চোখ ফিরিয়ে দেখে নিল কেউ আছে কি না। নাহ, কয়েকটা পিচ্চিপাচ্চু ঝামেলা পাকালো। শেষে নিরূপায় হয়ে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল, ‘বালিশ নেব না বাঁশ নেব সেটা বাসায় গিয়েই সিদ্ধান্ত নেব। চল আগে।’আদিব কয়েক ঢোক বাতাস গিলে হাঁটতে শুরু করল। যাক বাবা। বাসা পর্যন্ত যাওয়া যাক আগে।চলে এসেছে প্রায়। গার্ড গেইট খুলে দিলে স্নেহা সোজা রুমে ঢুকে গেল। আদিবও পেছন-পেছন গেল। গিয়ে ড্রয়িংরুমে বসে পড়ল। স্নেহা বেডরুমে গিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। বেশ ক্লান্ত লাগছে। ফাজিলটা অনেকটা পথ হাঁটিয়ে এনেছে। মাইলখানেক তো হবেই। বিড়বিড় করে বলল স্নেহা। কিছুক্ষণ রেস্ট নিতেই মাহির চলে আসল।’আম্মু আম্মু! আম্মু ও আম্মু! ও আম্মু আম্মু!’ এভাবে এলোপাথাড়ি কিছুক্ষণ ডাকাডাকির পর স্নেহা লাফ দিয়ে উঠল।১’জি আম্মু কী হয়েছে?”আম্মু তুমি পঁচা হয়ে গেছ। আমাকে না নিয়ে কোথায় গিয়েছিলে হি?”আম্মু একটু ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। এভাবে বলে না বাবা! এই তো আমি চলে এসেছি।’ এই বলে কোলে তুলে কয়েকটি পাপ্পা এঁটে দিল।অমনি রিপোর্টের কথা মনে পড়ল। কী এসেছে রিপোর্টে? অস্থির হয়ে উঠল মুহূর্তেই। মাহিরকে বলল, ‘বাবা একটু খেলা করো এখানে, আমি এখনই আসছি কেমন?’এই বলে ড্রয়িংরুমে গেল আদিবের কাছে। গিয়েই কোমরে হাত রেখে বলল- ‘অ্যাই! তুমি কি রিপোর্টে কী আসছে তা বলবা?’আদিব কোনো কথা না বলে চুপচাপ উঠে গিয়ে স্নেহার সামনে দাঁড়াল। অস্ফুটে বলল, ‘চোখ বন্ধ করো।”সে কী! চোখ বন্ধ করতে হবে কেন?’

পৃষ্ঠা-৩৩

‘করোই না! ভয় পেও না, বালিশ-বাঁশ কোনোটারই ভয় নেই।’স্নেহা ফিক করে হেসে ফেলল। ‘আচ্ছা এই করলাম।’স্নেহার ঠোঁট কাঁপছে। বুকের ধুকপুকানি বেড়ে যাচ্ছে। ফাজিলটা এতক্ষণ লাগাচ্ছে কেন! এইভাবতে ভাবতেই আদিব বলল, ‘হুম, চোখ খোলো।’স্নেহা চোখ খুলতেই দেখল, আদিব ছোট্ট একটি চিরকুট হাতে নিয়ে সামনে ধরে আছে। স্নেহা ইশারা করল, ‘এটা কী।”রিপোর্ট…।’বেশ ভয়ে-ভয়ে চিরকুটটি হাতে নিয়ে সেটা খুলল। তাতে লেখা- “আসসালামু আলাইকুম আম্মু! চিন্তা কোরো না, আমি শীঘ্রই আসছি! আর হুম, আমার আব্বুকে কিন্তু একদম মারবে না বলে দিচ্ছি।”লেখাটা স্নেহার মাথার ঠিক দশ হাত ওপর দিয়ে গেল। ‘মানে কী? কে লিখেছে?’ বোকাবোকা স্বরে স্নেহার জিজ্ঞাসা।আদিব স্নেহার পেটের দিকে ইশারা করে বলল, ‘আমাদের নতুন লেডি অফিসার।’

জোয়ার-ভাটা

‘ব্যাটা নদীর পাড়ের মানুষ হয়েও জোয়ার-ভাটা বুঝিস না।”মানে?”মানে নদীতে যেমন জোয়ার নামে, আবার ভাটাও পড়ে। তাই বলে কি নদীর সাথে আঁড়ি পাততে হবে? আর পাতলে ক্ষতি কার? প্রকৃতির নিয়মের সাথে বিদ্রোহ করা সাজে না। তাহলে প্রকৃতিও বিদ্রোহী হয়ে উঠে। তেমনি সাংসারিক জীবনেও সুখের জোয়ার-ভাটা আসে। সুখের পারদ সর্বোচ্চ থেকে কখনও শূণ্যে নেমে আসে। আবার হুট করে কখন যে উপরে উঠে যায়, এই লীলাখেলা বোঝা বড় দায়। এটাই প্রকৃতি। এটাকে মেনে নিতে হয়।’আদিবের কথা শুনে হাসান আর কোনো প্রত্যুত্তর করল না। ক্ষানিক পর বলল, ‘কিন্তু তোর তো জোয়ার আর ফুরোয় না। ভাটার কপাল বুঝি একা আমারই।’আদিব হেসে ফেলল। এটাকে অবশ্য ঠিক হাসি বলা যায় না। মুখটা নিচু করে, মাথাটা মৃদু দুলিয়ে, ঠোঁটদু’টো নাড়িয়ে কিছু একটা বলল মনে হচ্ছে।’কিছু বললি?’ হাসানের জিজ্ঞাসা।’নাহ। কী বলব।”কী যেন বললি মনে হচ্ছে।”শোন, দূর থেকে গোলাপের সৌন্দর্য দেখা যায়। এতে কাটার ঘাঁ খেতে হয় না। কিন্তু সৌরভে বিমোহিত হতে গেলে, কাছে এলে, ছুঁতে গেলে কাটা থেকে বেঁচে থাকা যায় না।’কী বুঝাতে চাইলি?’

পৃষ্ঠা-৩৪

‘না তেমন কিছু না। তবে এটুকু বলি, টুকিটাকি মনোমালিন্য আমাদের মাঝেও হয়। এবং কখনও কখনও সেটা বেশ সিরিয়াস রকমও হয়। কিন্তু এসব কাউকে বলি না বিধায় কেউ জানে না। যেটুকু বলি, কেবল পজিটিভটুকু। এতে করে পজিটিভিটি বাড়ে। এই যেমন তুই তো বলেই দিলি, আমার নাকি জোয়ার ফুরোয় না। আসলে যখন ফুরোয় তখন তোদেরকে জানানো হয় না। এটাই প্রকৃতি। এমন হবেই। হুজুর সা. এর স্ত্রীদের সাথেও সম্পর্কের জোয়ার-ভাটা এসেছিল। কিন্তু তারা সবসময় পজিটিভ ছিলেন। পরস্পরের পজিটিভিটি নিয়ে আলোচনা করতেন। নেগেটিভটুকু ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করতেন।”তারমানে তোরাও ঝগড়াঝাটি করিস? বাহ! বাহ!”শুধু কি তাই? একবার তো তোর ভাবি বলেই ফেলল, বাবার বাড়ি চলে যাবে। বাচ্চাকে নিয়ে ব্যাগ-ট্যাগ গুছিয়েও ফেলেছিল। কিন্তু…।”কিন্তু কী?’ আদিবের রহস্য-ঘন কিন্তু’র উত্তর শুনতে হাসান উদগ্রীব হয়ে আছে। আদিব বলল, ‘কিন্তু যখন দেখলাম স্নেহা সত্যিই খুব সিরিয়াস। তখন আমি উঠে গিয়ে দরজাটা বাইরে থেকে লাগিয়ে দিলাম।’হাসান হা করে তাকিয়ে আছে আদিবের দিকে।’এরপর?”এরপর আর কী! তখম মনে হচ্ছিল যেন, দরজাটা ভেঙ্গে, সেটা দিয়ে আমাকে মেরে, আহত-টাহত করে, দাঁত দু’চারটা ফেলে এরপর বাচ্চাকে কোলে তুলে নিয়ে সোজা বাপের বাড়ি…!!’ভারি মুশকিল তো! এরপর?”এরপর আর কী! কোনোরকম দাঁত-মুখ চেপে রেখে প্যাড-কলম নিয়ে বসেগেলাম।’

পৃষ্ঠা-৩৫

‘এই অবস্থায় প্যাড-কলম দিয়ে কী হবে?”শুধু ‘কী’ হবে না। যা হবার এই প্যাড-কলম দিয়েই হবে।”মানে?’ ‘মানে তখন প্যাড-কলম হাতে নিয়ে বসে কিছু একটা লিখে ফেললাম।”কী সেটা?”সেটা হলো অভিমান।’

‘অভিমান মানে?”যেটা পড়ে স্নেহা মানে তোর ভাবি বাপের বাড়ি যাবে তো দূরে থাক, আর কখনও এমন কথা মুখে আনবে না মর্মে ওয়াদা করেছিল। সেইসাথে কাজল ধোয়া চোখের পানিতে বেচারি ভুত সেজে উঠেছিল।’আদিবের কথা শুনে হাসান ইশে পড়ে গেল। ইশে বলতে ইশে আরকি। মানে চিপায়। মাইনকা চিপা না কী যেন বলে সেখানে আরকি। বেচারা অবাক হবে? খুশি হবে? না ব্যথিত হবে? ঠিক বুঝে উঠতে না পারার এই সিচুয়েশনটাকে কী বলবেন আপনারা? আচ্ছা যাক সে কথা।আগ্রহ আর ধরে রাখতে না পেরে শেষমেশ জিজ্ঞেস করেই বসল, সেই ‘অভিমান’ কী ছিল রে আদিব?’আদিব কিছু না বলে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে এরমধ্যে ভাঁজ করে রাখা ছোট্টি একটি কাগজ বের করল। হাসান আগ্রহভরে কাগজটির দিকে তাকিয়ে থাকল। কিছুক্ষণ পর আদিব হাসানের হাতে কাগজটি দিয়ে বলল, ‘এই দেখ। পড়ে দেখ সেই ‘অভিমান’। নজরুলের ‘অভিশাপ’- এর মেলায় হারিয়ে যাওয়া সেই জমজ বোনের নাম এই ‘অভিমান’।

পৃষ্ঠা-৩৬

“অভিমান”নিশিত রাতে একলা যখন আমায় মনে পড়বে, খুঁজবে আমায় হন্যে হয়ে নখটি তোমার দুলবে, হুশ হারিয়ে এদেশ-ওদেশ খুঁজবে আমায় খুঁজবে- বেলা হারিয়ে বুঝবে।বুকটি চিরে উথলে উঠবে গুপ্ত বোবা কান্না, দেখবে কেউ এই ভয়েতে ফাটবে হৃদের পান্না, খুঁজবে আমায় খুঁজবে, শেষ বিকেলে বুঝবে।নীলিমা যখন রাত-বিরাতে অঝোর ধারায় কাঁদবে, রুক্ষ জমিন সিক্ত হবে মরুর জীবন কাটবে, রাত-দুপুরেই কপাট খুলে খুঁজবে আমায় খুঁজবে- হারালেই তবে বুঝবে।অনুভবে আবছা ছোঁয়া পেয়ে আতকে উঠবে, চমকে গিয়ে হতাশ হয়ে ডুকরে শুধু কাঁদবে, খুঁজবে আমায় খুঁজবে, ঘোর কাটলে বুঝবে।বিষন্নতার তিক্ত বিষে উন্মাদ হয়ে ভাববে, নামটি আমার তোমার বুকে বিনবিনিয়ে বাঁজবে, ভগ্ন দেহ অসারতায় ভুগবে সদা ভুগবে- সত্যি তখন বুঝবে।অবহেলার তীরের ঘা’তে মূর্ছা যাবার প্রান্তে, কলজে চিরে রক্তস্রোতে ডুবালে মোরপ্রাণকে,খুঁজবেআমায়খুঁজবেভুলটাসেদিনবুঝবে কবিতাটি পড়া শেষ করতেই হাসানের চোখ ছলছল।

পৃষ্ঠা-৩৭

‘কী রে! তোর আবার কী হলো?’ হাসানের কাঁধে হাত রেখে আদিবেরজিজ্ঞাসা।কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে হাসান বলল, ‘নাহ, আমার কিছু হয়নি। ভাবছি।”কী?”ভাবছি, এমন করে লিখলে ভাবি তোকে ছাড়া অন্যকিছু ভাববে কীভাবে? তোর জন্য পাগল না হয়ে থাকবে কী করে?”তবুও তো মাঝেমধ্যে নেটওয়ার্ক ডিসটার্ব দেয় রে নরে…ন। নেটওয়ার্ক আনতে উল্টেপাল্টে, থাবরে-টাবরে আরও কতভাবেই না চেষ্টা করা হয়। তবে একটি জিনিস কি জানিস?”কী?”মেয়েরা এই রাগ ভাঙ্গানোর ব্যাপারটি খুব ইনজয় করে। এজন্য কারণে- অকারণেই গাল ফুলিয়ে অল্প…! এবার তার রাগ ভাঙ্গাতে নিজেকে আলাদিন বানাও। আর যেখান থেকে যেভাবে পারো প্রয়োজনে দৈত্য দিয়ে হলেও তার অভিমান ভাঙ্গাও। এসবে অবশ্য আমিও বেশ আনন্দ পাই। সারাক্ষণ ভালোবাসা- ভালোবাসা ভাল্লাগে না। বেশি মিঠা খেলে পেটে কৃমি হয় জানিস তো? আম্মু বলতো আরকি! হা হা হা…!’হাসানও একটু হেসে ফেলল। আদিব পুনরায় বলল, ‘এজন্য আম্মুর কথা মতোসেই ছোট্ট থেকেই টক-ঝাল-মিষ্টির কম্বিনেশন পছন্দ করি। সেই পছন্দের ছাপআমার সাংসারিক জীবনেও। এটাই ভাল্লাগে।”তুই পারিসও বটে।’ হাসান বলল।আদিব বলল, ‘স্ত্রীর জন্য এটুকু না হয় করলামই। নিজের ইগোকে বগলদাবা করে একটু ছলাকলা না হয় করলামই। বেশরমের মতো স্ত্রীর পিছে পিছে একটু ঘুরঘুর না হয় করলামই। ক্ষতি কী? এতে বরং নেকি আছে, নেকি। বখাটেরা গার্লফ্রেন্ড-এর পেছনে ঘুরে। তার মন জয় করতে কত কিছুই না করে। আহা! আমি না হয় আমার স্ত্রীর পেছনেই ঘুরলাম। তার মনটাকে চুরি করতে একটু এদিক-ওদিক না হয় করলাম। মন্দ কী।

পৃষ্ঠা-৩৭

বিয়ে করলে তার সবকিছুর ওপর অধিকার আসে এটা ঠিক, কিন্তু তার মনটাকে আলাদা করে জয় করে নিতে হয়। বিয়ে করলেই একটি মেয়ের মন পাওয়া যায় না। এটা সাধনার বস্তু। একটু চেষ্টা করে একবার যদি স্ত্রীর মনটা কেড়ে নিতে পারিস, বেচারি আজীবনের জন্য তোর অংশ হয়ে যাবে। শারীরিক সম্পর্কের তৃপ্তি যদি দুই আনা হয়, তাহলে এই মন কেড়ে নেওয়ার তৃপ্তি হলো বাকি চৌদ্দ আনা। ভালোবাসার স্বাদ তখন পূর্ণতা পায়।যা হোক, আজ আসি রে। বউটাকে নিয়ে আজ বাইরে বেরুনোর ডেট। মাসে একদিন বাচ্চাকে সহ ওকে নিয়ে বাইরে থেকে বেরিয়ে আসি। ফুচকা, চটপটি, চকলেট যা চায় কলিজা পর্যন্ত খাইয়ে আনি। এরপর বাসায় এসে সারামাস ওর কলিজা হয়ে থাকি। নাহ, আর বলা যাবে নাহ। যাই যাই। দেরি হয়ে যাচ্ছে।’এই বলে আদিব উঠে চলে গেল। আর হাসান এক আকাশ মুগ্ধতা নিয়ে ওর চলে যাওয়া দেখতে লাগল। অতঃপর ‘অভিমান’ কবিতাটি পুনরায় পড়তে লাগল…

মাতৃত্বের নেশা

বৃষ্টিবিঘ্নিত অন্ধকারাচ্ছন্ন বিদঘুটে একটি রাত। যদিও শুষ্ক মৌসুম। কিন্তু আবহাওয়া কি আর ধরাবাঁধা মৌসুম বুঝে? মাঝেমধ্যে সে-ও বিদ্রোহ করে ওঠে। সেদিন বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টির সাথে বাতাসের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, তিনতলা ভবনের ভেতর থেকেও মনে হচ্ছে এই বুঝি মাথার ওপর কিছু একটা আছড়ে পড়ল।সৈকত বাড়ি ফিরতেও আজ খুব লেট করছে। অবশ্য অফিসের চাপে প্রায়ই এমন লেট হয়। একা নিস্তব্ধ বাড়ি তার উপর এমন মুহূর্মুহু ঝটিকা বৃষ্টির শোঁ শোঁ আওয়াজ বেশ ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি করেছে।নীলিমা অন্তঃসত্ত্বা। বড্ড সরলমনা একটি মেয়ে। মৃত্যুভয়কে সাদরে আলিঙ্গন করে মাতৃত্বের স্বাদ পেতে দীর্ঘদিন যাবত বেশ মুখিয়ে আছে। সন্তানের কোমল পরশে একটু তৃপ্ত হবার মাদকীয় নেশায় বুদ হয়ে আছে। এটাকে একপ্রকার নেশা বলা যায়। মাতৃত্বের নেশা। বড় শৈল্পিক ও অকৃত্তিম নেশা এটা। নারীত্বের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ-এ নেশা।এ কী! মাথাটা ছট করে কেমন যেন ঝিমঝিম করছে। সবকিছু কেমন ঘোলাটে দেখাচ্ছে। অমনি ধপাস করে বিছানায় পড়ে গেল নীলিমা। কোনরকম বালিশটি মাথার নিচে গুজে দিতেই হাত-পা কেমন অবস হতে শুরু করল। পুরো দেহটা বড় ভঙ্গুর হয়ে গেল মুহূর্তেই।পুরো তিনতলা ভবনটি যেন নীলিমার মাথার ওপর ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম। ভয়ে মেয়েটি কেঁদে ফেলল। এরপর কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলল, আমি এখনই মরতে চাই না। আমার কলিজা চেরা ধনকে একনজর দেখার আগে আমি মরতে চাই না। কেবল একটিবার দেখা হলে আমার আর কোনপ্রকার আপত্তি থাকবে না। আমায় রহম করো আল্লাহ।’এই বলতে বলতেই আচমকা চৈতন্যহীন হয়ে পড়ল নীলিমা। একদম চুপসে গেল।

পৃষ্ঠা-৩৮

ডিম লাইটের মৃদু আলোতে নীলিমার নিষ্প্রভ মুখাবয়ব বিন্দু বিন্দু ঘামের কারণে চিকচিক করছে। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরলে বাকরুদ্ধ হয়ে ক্ষানিক পরপরই খুব শক্ত করে ঠোঁট কামড়ে ধরে বিছানার চাদরটি খুব করে খামচে ধরছে। পুরো চাদরটিকে মুড়িয়ে ফেলেছে মুহূর্তের মধ্যেই।মনে হচ্ছে যুদ্ধবিধ্বস্ত ধ্বংসস্তুপ থেকে কোন এক অবলা প্রাণ নিজেকে শেষ রক্ষার তাগিদে কোন নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে দিগ্বিদিক হয়ে পথ খুঁজছে। কিন্তু নিরূপায় হয়ে বিছানার চাদরটিকেই আঁকড়ে ধরে আশার ঝাণ্ডা পুনরায় বসন্তের মুক্তাকাশে পতপত করে উড়াতে চাচ্ছে।এভাবে প্রায় আধাঘণ্টা পর্যন্ত অতিবাহিত হলো। অব্যক্ত যন্ত্রণায় নীলিমার ক্ষীণ দেহের প্রতিটি হাড় যেন গলে যাচ্ছে। মাংশপেশীগুলো চড়চড় করে চিরে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। চোখদু’টি বোধহয় এবার উঠেই চলে আসবে। কলিজাটা বুঝি মুখ দিয়েই বেড়িয়ে পড়বে। হৃৎপিণ্ডটা বোধহয় শেষবারের মত নিজেকে প্রবলভাবে প্রকম্পিত করে নিচ্ছে। ফুসফুসদ্বয় এই বুঝি নিঃশ্বাসকে আটকে দিতে চাচ্ছে। শ্বাস নিতে অত্যধিক কষ্ট হচ্ছে।’আচ্ছা! আমার এমন লাগছে কেন?’ নিজেকে উদ্দেশ্য করে নিলীমার স্ফীত উক্তি।অমনি বাইরে প্রবল বর্ষণের তর্জন-গর্জনকে ম্লান করে দিয়ে বিকট এক চিৎকারে আকাশ-বাতাস তুমুল আলোড়িত হয়ে উঠল। বড় নিষ্পাপ সে আওয়াজ। বহু কাঙ্ক্ষিত সে চিৎকার। ক্রমাগত চিৎকারে মেঘও যেন ভয় পেয়ে থমকে যাবার উপক্রম।কিন্তু নীলিমা হঠাৎ আঁকড়ে ধরে রাখা বিছানার চাদরটি ছেড়ে দিল কেন? অব্যক্ত চাঁপা যন্ত্রণায় গোঙ্গানির শব্দ হুট করেই শুণ্যে মিলিয়ে গেলো কেন? সে কী! ডিম লাইটটিও দেখছি নিজেকে নিভিয়ে নিয়ে নীলিমাকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে দিল। এমন হচ্ছে কেন সবকিছু? ওর ভয় হয় না বুঝি? এমনিতেই মেয়েটি অন্ধকারকে খুব ভয় পায়।এমনসময় কলিং বেল বেজে উঠল- টিং… টুং…ভেতর থেকে কেবল সদ্যজাত শিশুর কান্নার আওয়াজ ছাড়া কিছু শোনা যাচ্ছে না। আচমকাই আনন্দের একপশলা ঝুমবৃষ্টি যেন হৃদয়টা প্রশান্ত করে দিল। কিন্তু দরজা খুলছে না কেন?

পৃষ্ঠা-৩৯

‘নীলিমা! এই নীলিমা…।’মিনিট পাঁচেক ডাকাডাকি করেও কোন সাড়া না পেয়ে পাশের ক্লিনিক থেকে একজন নার্স ও সাথে একজন মিস্ত্রী ডেকে এনে প্রবল উত্তেজনায় দরজা ভেঙে ফেলল। নার্স দ্রুত ভেতরে ঢুকে সবকিছু ম্যানেজ করে বাচ্চাটিকে সৈকতের হাতে তুলে দিল। সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া নিজের কন্যাসন্তানকে পেয়ে বড় আপ্লুত হয়ে পড়ল সৈকত। ওকে চুমু খেতে খেতে নীলিমাকে ডেকে বলল, ‘ওগো দেখো! কী মায়াময় চেহারা! ঠিক যেন মায়ার এক রাজ্য দখলে নিয়েই আমাদের কোলে এসেছে। এই শোনো! ওর নাম কিন্তু আমি ‘মায়া’ রেখে দিলাম…!”আনন্দের অতিসজ্জে সৈকত একা একাই কিছুক্ষণ বিড়বিড় করে এবার থেমে গেল। তাকিয়ে দেখে, নীলিমা বালিশ থেকে মাথা নামিয়ে মুখটা মায়ার দিকে ফিরিয়ে ঠোঁট দু’টিতে কিঞ্চিৎ হাসি এঁটে অপলক তাকিয়ে আছে।কিন্তু নীলিমা এভাবে করে তাকিয়ে আছে কেন? আর আমার কথার উত্তর দিচ্ছে না কেন?’ প্রশ্নটি সৈকতের হৃদয়ে মুহূর্তেই ঝড় তুলে দিল। চোখদুটি ছানাবড়া। হয়ে গেল!মায়াকে রেখে নীলিমার গালে ছুয়ে দিতেই মুখটা অন্যদিকে ঘুরে পড়ে গেল।-এসব কী হচ্ছে? নীলিমা এমন করছো কেন? নীলিমা! এই নীলিমা…!এই বলতে বলতেই বিকট এক চিৎকারে নীলিমার উপর আছড়ে পড়ল সৈকত। নীলিমার চোখদু’টি আঙ্গুল দিয়ে মেলে ধরে বলল, ‘এই নীলিমা! দেখো দেখো! তোমার মায়া কেমন করে তাকিয়ে আছে তোমার দিকে। আর তুমি ওকে ফিরেই দেখছো না। এই নীলিমা। নীলিমা! এই পাগলী! এই…!’এই বলে নীলিমাকে বুকের পাঁজরের সাথে শেষবারের মতো খুব করে চেপে ধরেছে। এই মুহূর্তে সৈকতের কলিজাটা যেন পাঁজর ভেদ করে বেরিয়ে আসতে চাইছে। উপচে পড়া শুভ্র নোনা রক্তে ভেতর-বাহির চুপচুপ হয়ে গেছে…আচ্ছা! এ দেশের সৈকতরা কি নীলিমাদের এই ব্যথা অনুভব করতে পারে না? নিজের অস্তিত্বকে বিসর্জন দিয়ে তাদেরকে বাবা হবার স্বাদ এনে দেওয়ায় একটু কৃতজ্ঞ কি হতে পারে না? এই কঠিন মুহূর্তে তাদের পাশে থেকে মাথায় একটুখানি হাত বুলিয়ে দেওয়ার কি সময় তাদের হয় না?দীর্ঘক্ষণ পর আদিব থামল। গল্প বলার সাথে সাথে কিছু সময়ের জন্য নিজেই যেন সৈকত হয়ে গিয়েছিল। এতক্ষণে চোখজোড়া আর্দ্র হয়ে এসেছে। ভেতরে এক আকাশ মেঘ জমেছে।

পৃষ্ঠা-৪০

হাসান বলল, ‘এমন করে না বললেও পারতিস। আমি জানি, একটি মেয়ে এই সময়ে কতটা কষ্ট সহ্য করে।’ হাসান এই বলে আদিবের অলক্ষ্যে চোখ মুছে নিল।আদিব আনমনা হয়ে কোথাও তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ পরপর অনুভূতির ঢোক গিলছে। যাতে কষ্টগুলো চোখ বেয়ে নিচে নেমে যায়। ঠিক এমনসময় টুপ করে একটি ফোঁটা গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। আলতো ছোঁয়ায় সেটা মুছে নিয়ে হাসানের উদ্দেশ্যে বলল, ‘হাসান, জানা আর অনুভব করার মাঝে বিস্তর ব্যবধান।’হাসান খুব কঠিন মনের মানুষ হলেও নীলিমার আত্মত্যাগ ওর চোখকে শিশু করেছে। কিছুটা হলেও কাঠিন্য ভেদ করতে পেরেছে। সেটাকে আরও তরান্বিত করতে আদিব আবারও বলতে শুরু করল, ‘হাসান, বল তো, নীলিমা তখন ঘামছিল কেন?’হাসানের নিরবতায় আদিবই এর উত্তর বলতে লাগল।’শোন, আমরা সাধারণত জানি যে, শারীরিকভাবে কেউ আঘাতপ্রাপ্ত হলে সে ব্যথায় ঝুঁকিয়ে ওঠে, কাতরাতে থাকে। কিন্তু ঘর্মাক্ত হয় না। ঘর্মাক্ত হয় ভয়ের কারণে। হ্যাঁ, ভয়। মুহূর্তেই দপ করে পুরো শরীর ঘেমে নেয়ে ওঠে।বেশ কিছুদিন আগে একবার নামাজের মধ্যে ঠিক সালাম ফিরানোর আগমুহূর্তে হুট করেই আমার পুরোটা শরীর ঘেমে একদম ভিজে হয়ে গেল। নিজেও বুঝতে পারিনি ঘটনা কী। সালাম ফিরিয়ে নিশ্চিত হলাম যে, মাত্রই বড়সড় ভূমিকম্প হয়ে গেল। ততক্ষণে গলা সহ পুরো কণ্ঠনালী শুকিয়ে গিয়েছিল। কপাল থেকে ঘাম টপকে পড়ছিল তখনও। হ্যাঁ, এই ঘামের কারণ হলো ভয়।যখন স্কুলে SSC টেষ্ট এক্সামের রেজাল্ট দিবে তার ঠিক আগমুহূর্তে আমার সাদা শার্টটি ঘেমে একদম শরীরের সাথে মিশে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল যে, হাতের তালু যেন মাত্রই টিউবওয়েল থেকে ধুয়ে এলাম, আর আঙ্গুল বেয়ে টপটপ করে সেই পানির ফোটা পড়ছে। সেইসাথে মাথার চুলগুলোও ভিজে তালুর সাথে লেপ্টে গেছে। এতটা ঘর্মাক্ত হবার কারণ হলো এক অজ্ঞাত শঙ্কা! সব সাবজেক্টে পাশ করব তো? যদি ফেল আসে তবে মুখ দেখাব কীভাবে? এই শঙ্কায় জিহ্বাটাও শুকিয়ে যাচ্ছিল। আমার চেয়ে ভালো ভালো স্টুডেন্টদেরকে কয়েক সাবজেক্টে ফেইল করার কারণে কান্নারত দেখতে দেখতে হাপিয়ে উঠছিলাম। অবশেষে শুকরিয়া যে, বিশেষ বিবেচনা ছাড়া সবগুলো সাবজেক্টে বেশ ভালোভাবেই পাশ করেছিলাম।

পৃষ্ঠা ৪১ থেকে  ৬০

পৃষ্ঠা-৪১

তো একজন মায়ের যখন প্রসব বেদনা শুরু হয় তখন অব্যক্ত যন্ত্রণার কারণে সে ঝুঁকিয়ে ওঠে, কিন্তু সেইসাথে তার কপালে গুড়িগুড়ি বৃষ্টির ফোঁটার ন্যায় ঘামের আধিক্য হয় কেন? যেমনটা নীলিমার হয়েছিল!মুহূর্তেই ব্যথার প্রচণ্ডতায় তার বাকশক্তিটুকুও স্তব্ধ হয়ে যায়। ঘামে শরীরের কাপড় সব ভিজে যায়। কপালের ঘামগুলো নাক বেয়ে, গাল বেয়ে পড়তে থাকে। জিহ্বাটা যেন পুরোটাই বেরিয়ে আসতে চায়। কলিজাটা সহ যেন ছিড়ে আসতে চায়। অনেকে সেন্সলেসও হয়ে যায়…এই ব্যথাটাকে অনেক ডাক্তাররাই ২০টি হাড় একসাথে ফ্র্যাকচার হওয়া অর্থাৎ ভেঙ্গে যাওয়ার ব্যথার সাথে তুলনা করেছেন। তবে এই ব্যথার প্রকৃত ভয়াবহতা কেবল সেই মা ছাড়া পৃথিবীর দ্বিতীয় কারো পক্ষে অনুভব করা কোনভাবেই সম্ভব নয়।এই হলো ব্যথার অবস্থা। আর ঘামের কারণটা একবার বলেছি যে, এটা হয় ভয়ের কারণে। এই বুঝি আমার প্রাণপ্রিয় পাগলটাকে হারিয়ে চিরদিনের জন্য অচেনা পথ ধরলাম, আর বুঝি প্রিয় মানুষটাকে বুকে জড়িয়ে একটু কান্না করার ভাগ্য হবে না, আর বুঝি ওর সাথে দুষ্টু মিষ্টি ঝগড়া করার সুযোগ মিলবে না, আর বুঝি ওর আদুরে ডাকটুকু শুনতে পারব না, আর মনেহয় ওকে নিজ হাতের রান্না করা খাবারটুকু খায়িয়ে দিতে পারব না, আমার কলিজা চেরা সন্তানের চাঁদমুখখানি দেখার সৌভাগ্য বুঝি আর হবে না…

এসব ভেবে ভেবে প্রচণ্ডরকম ভয় ও শঙ্কা ওর কলিজা নিঙড়ে কপাল ও শরীর থেকে ঘাম বের করে মুহূর্তেই শরীরটাকে চুপচুপে করে দেয়।এসময় মেয়েটি তার পাশে এমন কাউকে চায়, যে তার কপালের ঘাম মুছে দিয়ে কপালটাতে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলবে, ‘এই পাগলী! তোমার কিচ্ছু হবে না, এইতো আমি আছি তোমার পাশে। আজীবন তোমাকে আমার বুকের খাঁচায় বন্দি করে রাখব। কোথাও হারাতে দেব না। প্রতিরাতে তোমার হাতের খাবার আমার মুখে তুলে নেব। কী? পারবে না আজীবন খাইয়ে দিতে?এই বলে মাথায় হাত বুলাতে থাকবে আর মেয়েটি দু’চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে তাতে সম্মতি জানাবে…

পৃষ্ঠা-৪২

জানিস হাসান! মাত্র এইটুকুন কেয়ারিং মেয়েটির ২০টি হাড় একসাথে ফ্র্যাকচার হওয়ার চেয়েও অধিক এই ব্যথার কথা মুহূর্তেই ভুলিয়ে দিয়ে, অনাগত হাজারও শঙ্কা মুছে দিয়ে অনাবিল এক প্রশান্তি ওর হৃদয়টাকে শিক্ত করে দেয়। বিশ্বাস কর হাসান, এমন সব মুহূর্তে মেয়েদের চোখে যে অশ্রু দেখা যায়, ওটা অশ্রু নয়, সুখ; যা অমৃত।’আদিবের কথা শুনে হাসান কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে রইল! তেপান্তর ঘুরেও কিছু বলার মত ভাষা খুজে পাচ্ছে না। শেষমেশ বলল, ‘আচ্ছা আদিব! অনুভূতির এতটা গভীরে গিয়ে কী করে ভাবতে পারিস?’আদিব মৃদু হাসলো। হাসানের কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘তোর প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই। তবে আমার স্ত্রীকে আমি খুব কাছ থেকে দেখি। ও যখন আনমনে কোনো কাজ করে, আমি ওকে পরখ করি। যখন বাচ্চাকে নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে বেড়ায়, ওকে সামলাতে পাগলপ্রায় হয়ে যায়, আমি ওর প্রতিক্রিয়া দেখি। কখনও অকারণে ওর উপর রাগ করে ফেললে আমি ওর ধৈর্যের সুদৃঢ় প্রাচীর দেখি। সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে বাচ্চাকে ঘুম পাড়িয়ে যখন চোখবুজে শ্বাস নেয়, আমি তখন ওর প্রতিটি শ্বাসপ্রশ্বাসের গভীরতা মাপি। এভাবেই ওর প্রতিটি অভিব্যক্তিকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করার চেষ্টা করি। আবার মাঝেমাঝে ওর স্থানে নিজেকে কল্পনা করে বেশ হাপিয়ে উঠি। ভাবি, এতসব কী করে পারে এরা! কোনো সদুত্তর পাই না। তখন অজান্তেই শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতায় মাথা নুইয়ে আসে। ভালোবাসার অশ্রুতে চোখ ভরে আসে।’হাসান যেন কিছু সময়ের জন্য কোনো দূর অজানায় কল্পনার জগতে হারিয়ে গেল। যেখানে অবিচার তো দূরে থাক, সদাচারের প্রতিযোগিতা হয়। হাসানের ভাবনায় ছেদ ফেলে আদিব পুনরায় বলল, ‘আমার স্ত্রী যখন প্রথমবার অন্তঃসত্ত্বা হয়, তখন একদিন ওর বড় বোনের সাথে ফোনে কথা বলছিল। আমি ওর পাশেই ছিলাম। তখন ওপাশ থেকে আসা একটি কথা আমাকে ছুয়ে গেল। কথাটি ছিল- ‘প্রতিটি মেয়ের এই বিশেষ অবস্থাটি স্বামীদের নিজচোখে দেখা জরুরি।’এটি একটি সাবলীল ‘কথা’। কিন্তু কত বিস্তর তার ব্যাখ্যা। কথাটি শোনামাত্রই ভাবনার সীমাহীন জগতে হারিয়ে গিয়েছিলাম। এরপর ভাবলাম, সত্যিই, নিজচোখে এসবকিছু দেখলে হৃদয়হীন স্বামীও স্ত্রীর প্রতি কিছুটা হলেও সহৃদয় না হয়ে পারবে না।

পৃষ্ঠা-৪৩

আচ্ছা! একজন মায়ের তখন আসলে কেমন অনুভূত হয়? অভ্যন্তরীণ ব্যাপক পরিবর্তনের প্রভাবে তার অস্থিরতার মাত্রা ঠিক কতটা গভীর হয়? অনাগত শল্পায় তার ভেতরে কতটুকু ভয়ের সঞ্চার হয়? জানতে ইচ্ছে হয়। খুব ইচ্ছে হয়, খুব।জানি, কোনো স্বামীর পক্ষেই এটা আঁচ করা সম্ভব নয়। কিন্তু এই পুরোটা সময় যদি স্বামী তার স্ত্রীর পাশে থাকে তাহলে কিছুটা হলেও অনুধাবন করতে পারবে।সেটা যদি সম্ভব না-ও হয়, অন্তত প্রতিটি মা যখন শেষ সময়ে পর্দার আড়ালে একটুকরো চাঁদের আশায় নিজেকে উৎসর্গ করতে উদ্যত হয়- তখনকার সেই আর্তচিৎকার আর কলিজা চেরা আর্তনাদ প্রতিটি স্বামী যদি নিজকানে শুনতে পেত। তাহলে জীবন বাকি থাকতে তার স্ত্রীর প্রতি জুলুম তো দূরে থাক, আড়দৃষ্টিও দিতে পারতো না।আমি প্রায়ই একটি অলীক স্বপ্ন দেখি। দেশের সর্বত্র যদি এই শেষ সময়ে স্বামীদের পাশে থাকার নিয়মটি বাধ্যতামূলক হয়ে যেত! আর সকলেই এটাকে যথাযথ গুরুত্ব দিত! তাহলে নারীসত্তা নতুন করে বাঁচতে শিখতো। সুখের রাজ্যে নিজে রানী হয়ে স্বামীকে মহারাজার মুকুট পরাতো।”ভাইজান, মালা নিবেন?’এক পথশিশুর ডাক শুনে আদিব কথা থামাল। হাসান বলল, ‘কীসের মালা এটা?’শিশুটি হাতের মালাগুলো উচিয়ে ধরে টানাটানা স্বরে বলল, ‘এইগুলা হইল। বকু…ল মালা। বকু…ল ফুলের মালা।’আদিব পকেট থেকে একশ’ টাকার একটা নোট বের করে বলল, ‘সোনামণি দুইটা দাও তো আমাকে।’ও দু’টি মালা আদিবের হাতে দিয়ে বলল, ‘মিয়া ভাই ভাংতি তো নাই।”ভাংতি লাগবে না। রেখে দাও। বাকিটা দিয়ে লাভ ক্যান্ডি কিনে খেও।’শিশুটি যা একটা হাসি দিল না। যেন আসমানের চাঁদ পেয়ে গেছে। কিছু মানুষ অনেক অল্পতেই আকাশসম সুখ পায়। আচ্ছা সুখ এত সস্তা কেন? আবার সন্তাই যদি হবে, তাহলে কোটি টাকা দিয়েও তাকে ছোঁয়া যায় না কেন?আদিব প্রশ্নগুলো বাতাসে ছড়িয়ে একটি মালা হাসানের হাতে দিয়ে বলল, ‘এটা আজ ভাবির খোঁপায় পরিয়ে দিবি। কী! দিবি তো?”আজ যদি খোঁপা করে চুল না বাঁধে?” একদিন না হয় নিজহাতে খোঁপাটাও বেঁধে দিলি।”যাহ! এসব পারব না।’আদিব পকেট থেকে একটি লাভ ক্যান্ডি বের করে হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘নে, এটা খেতে খেতে চেষ্টা করবি। দেখবি পেরে গেছিস।’লাভ ক্যান্ডিটি হাতে নিয়ে হাসান হাসলো। মুচকি হাসি।

পৃষ্ঠা-৪৪

মিয়া ভাই

এক’এই ফাহিম, তুষারকে ফোন লাগা তো।”ভাইয়া তো মোবাইল বাসায় রেখে একটু শপিং-এ গেছে।”আসবে কখন?”রাত হবে আসতে আসতে।”এসময় ও শপিং-এ? ব্যাটারে পাইলে না! ওরে ছাড়া খেলা জমবো?”কোন খেলা ভাইয়া?”আজ একটা ক্লাবের সাথে ম্যাচ ছিল। ওকে ছাড়া টিমের ব্যাটিং লাইন-আপ এক্কেবারে নড়বড়ে। কী করি এখন! ধ্যাত।’রাসেল কথাটি বলেই একটি নুড়িপাথরে লাথি মারতে মারতে চোখের আড়ালে চলে গেল। ফাহিম একটি চায়ের দোকানে বসে ছিল। রাসেলের চলে যাওয়ার পর দোকানি মিয়া ভাই আগ্রহভরে জিজ্ঞেস করল, ‘তুষার আইজ খেইল বাদ দিয়া শপিং-এ কেন রে ছোট? খেইলের লিগা তো ও দুনিয়া ছাড়তে রাজি, তবু খেইল ছাড়তে নারাজ।’মিয়া ভাইর কথা শুনে ফাহিম মুচকি হাসল।’কিও মিয়া। হাসো কেরে?”আগামীকাল ভাইয়ার ফাইনাল ম্যাচ তো, তাই সেটার গোছগাছ করতেই শপিং-এ যাওয়া।’

পৃষ্ঠা-৪৫

মিয়া ভাই পিটপিট করে ওর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে গলা খাকাড়ি দিয়ে বলল, ‘কিরাম কিরাম জানি ঠেকে! ব্যাপারখানা কী উ? আর ফাইনাল ম্যাচেরই বা রহস্যডা কী!”আপনি ব্যাচেলর মানুষ ওসব বুঝবেন না। এগুলো প্রাপ্তবয়স্ক কথাবার্তা।’ ফাহিম মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলল।মিয়া ভাই এখন একদলা ডায়লগ দুম করে ছুড়ে মারবে ফাহিমের দিকে। ভাবসাব তেমনই। শেষে চোখমুখ পাকিয়ে বলল, ‘আমারে কী তুমার নাবাল্লেক নাবাল্লেক লাগে? মাইয়া রেডি করো, মুহূর্তই কেল্লা ফতে কইরা দিমু। হুহ।’ফাহিম খিকখিক করে হেসে উঠল। এরপর বলল, ‘মিয়া ভাইয়ের শখ তো কম না দেখা যায়! তো এতদিন ধরে কী করছো? বয়স তো আর কম হলো না।’মিয়া ভাই চা বানাতে মন দিল। চামচে টিংটিং শব্দ তুলে বলল, ‘ছোটমিয়া চা খাও। নেও।”চা দিবাঃ দাও। দোয়া দিলাম, তোমার ফাইনাল ম্যাচটাও যেন দ্রুতই হয়ে যায়।মিয়া ভাই মাথা উঠিয়ে ফাহিমের দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তুষার মিয়ার বিয়া বুজি?’ফাহিম হাসতে হাসতে মাথা নাড়ল- ‘হুম’।’এই তাইলে বড়মিয়ার ফাইনাল ম্যাচ! হা হা হা…! অনেক ভালা। খুশি হইলাম শুইনা। তো চলনে যাইবা কবে?”কাল সকালেই।”যাউক, বেচারার খেইলের নেশা তো যাইবা না গেলেও বউয়ের নেশায় ঐসব বেশিদিন টিকবার পারব না। বউয়ের প্যারা আশি টাকা তোলা। হা হা হা….’তোমারটা কতদূর মিয়া ভাই?’ছোট্ট করে দু’টো ঢোক গিলে লুঙ্গিতে হাত মুছতে মুছতে বলল, ‘আমাগো লাহান গরিবের কপালে বউ নাই রে।’

পৃষ্ঠা-৪৬

‘বউ নাই মানে। শিক্ষিত ছেলে অনেক আছে, কিন্তু তোমার মতো নম্র, ভদ্র ও সরল একটা ছেলে আশপাশের দুই গ্রামেও নেই। তুমি রাজি থাকলে তোমার ব্যাপারটা আমি দেখতে পারি।’ফাহিমের কথা শুনে সামনে ঝুলে থাকা পলিব্যাগের ভেতর থেকে একটি কেক বের করে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘খালি চা কি খাওন যায়? লও এই কেকটা লও।'”এখন আর কিছু খাব না মিয়া ভাই। তুমি শুধু একটু দু’আ কোরো।’মিয়া ভাইয়ের লাজুক ভাব ও উৎসুক চোখদু’টো দেখলে মনে হবে যেন, একটু পরই তাতে জ্যোৎস্না জাগবে, অমাবস্যার ঘোর কেটে মধুচন্দ্রিমার আগমন ঘটবে। কিন্তু তবুও কেমন যেন অস্পষ্ট জিজ্ঞাসা নিয়ে ফাহিমের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে বেচারা। ফাহিম আশ্বস্ত করে বলল, ‘টাকা-পয়শা নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না। তুমি যে ঘরে থাকো, সে ঘরেই ভাবিকে রেখো। তোমার বিছানার একপাশে তাকে শুতে দিও। তোমার ডাল-ভাতটুকুই ভাবির সাথে ভাগাভাগি করে খেও। বাড়তি কোনো ঝামেলার দরকার নেই। পারবে না? ফরিদের চোখদু’টো ইদানীং বোড্ড বেয়াড়াপনা করছে। কথা শুনতে চায় না। হুটহাট কারণে-অকারণেই ভিজে আসে। তবে বর্ষায় না। এটা ওর একটা বদস্বভাব বলা যায়।আমগাছ তলার ছোট্ট এই চায়ের দোকানটিই ওর একমাত্র সম্বল। গরীবের জন্য আজকাল বিয়ের নাম মুখে নেওয়ার পাপ- এই ধারণাই ওর মন-মগজে। গরীব হলেও ২-৪ লাখ টাকা মহর ও ২-৩ ভরি স্বর্ণ ছাড়া যেন আজকালকার বিয়ে শুদ্ধ হয় না। কয়েকটি মেয়ে দেখেছিল অবশ্য। সেটাও প্রায় ১০-১২ বছর আগে। ওর মা- বাবা বেঁচে থাকতে। তাদের মৃত্যুর পর ছোটবোন দু’টোকে নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে এই দোকানটিই ওর রসদ যুগিয়ে যাচ্ছে।ফরিদের বয়স এখন চল্লিশ ছুঁইছুই। ফরিদ শুধু ওর ছোট্ট দু’টি বোনেরই মিয়া ভাই নয়, ও এই পাড়ার মিয়া ভাই। পাড়ার ছেলেরা সবাই ওকে মিয়া ভাই বলে ডাকে।’কী এত ভাবছো মিয়া ভাই?’ফরিদ অপ্রস্তুত হয়ে মুখটা ঘুরিয়ে নিল। লুঙ্গির কোণার দিকটা দিয়ে চোখ পরিষ্কারের ছুঁতোয় নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘ফাহিম, এমুন একখান কতা আমার মায় মইরা যাওনের পর পয়লা এই তোমার মুখেই শুনলাম। মায়ের মেলা শখ আছিল পোলার বউয়ের মুখখান দেইখা যাওনের। কিন্তু…।’

পৃষ্ঠা-৪৭

এরপর একটি দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল, ‘কিন্তু টেকার লিগা একখান বউ আমার মায়রে আমি আইনা দিতে পারি নাই। মায় একখান মাইয়া দেখছিল, ২ লাখ চো মহর আর ২ ভরি স্বর্ণ চাইছিল হেরা। দিবার পারি নাই দেইখা আমারে মাইয়াও দেয় নাই। কই থেইকা দিমু? টেকার লিগা তো মায়ের চিকিৎসাও করাইতে পারি। নাই। এর কয়দিন পরেই মা আমার চইলা গেল। বউয়ের মুখ আর দেখা অইল না মায়ের।’একথা বলতেই ফরিদ হেরে গেল। দীর্ঘকাল ধরে বুকে জমে থাকা ঘন মেঘের প্রবল বর্ষণে আচমকা ডুকরে কেঁদে উঠল। বড় বিভৎস দেখাচ্ছিল ফরিদকে। ক্ষানিকটা ভয়ঙ্করও।ছেলেদের কান্নাটা ঠিক কেমন যেন। কোনো রাগ-ঢাক নেই। একেবারে এবড়ো-থেবড়ো কান্না। আসলে এরা নিয়মিত কাঁদে না বলে, বস্তুত অল্পতেই কাঁদতে পারে না বলে কাঁদার আদব-কায়দা খুব একটা রপ্ত নেই। তাই ঝুপ করে যখন কান্না জুড়ে দেয়, তখন সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো করে ফেলে। অনেকটা উন্মাদ হয়ে যায়।ফাহিম আর বসে থাকতে পারল না। উঠে এসে ফরিদকে শান্ত করতে চাচ্ছে। কিন্তু তাতে যেন ফরিদের ভেতরটা আরও ফেটে যাচ্ছিল। এবং ফাহিমের ওপর একটু রাগও হচ্ছিল। মায়ের চলে যাবার সাথে সাথে ফরিদের বিয়ের ইচ্ছেটাও মরে গেছে। আজ এতদিন পর ফাহিম বিয়ের কথা উঠিয়ে এবং সেটার দায়িত্ব নিয়ে কেন ফরিদকে কাঁদিয়ে দিল? কেন? রাগ তো একটু হওয়াই উচিত। না?!মিনিট দশেক পর একটু স্থির হলে ফাহিম বলল, ‘মিয়াঁভাই, তোমার কাস্টমার এসেছে।’ফরিদ তড়িঘড়ি করে নিজেকে সামলে নিয়ে কাস্টমারের দিকে মন দিল। ফাহিম বলল, ‘মিয়া ভাই আমি আজ আসি? সকালেই চলনে যেতে হবে। কিছু গোছগাছ বাকি আছে।’ফরিদ মাথা নাড়িয়ে সায় দিল।ফাহিম কয়েক কদম এগিয়ে আবার পেছন ফিরে বলল, ‘মিয়া ভাই! কাল আমাদের সাথে তুমিও যাবা। আমি মেনেজ করব সব। তৈরি হয়ে থেকো।’ এই বলে ফরিদের কিছু বুঝে উঠার আগেই ফাহিম চলে গেল।

পৃষ্ঠা-৪৮

‘এই ভাইয়া! তোর ইন্টারনাল প্রিপারেশন শেষ হলে এদিকে আয়। এক্সটার্নাল দিকটা আমি দেখে দিচ্ছি।’তৃবার কথা শুনে তুষার ক্ষানিকটা লজ্জা পেয়ে বলল, ‘আমি পারব রে। তোরা তৈরি হয়ে নে।”পারব মানে? আমার ভাবির জন্য আমার ভাইকে আমি সাজাব, এতে নাক গলাস না। আসতে বলেছি আয়, কুইক।’ এই বলে একটি তুড়ি বাজিয়ে সোফায় বসে মেকাপ বক্সটা খুলতে লাগল।একটু পর তুষার আসলে ওকে সোফায় বসিয়ে মুখটা উঁচু করে গালদু’টো চিপে ধরে চুল আঁচড়ে দিচ্ছে। তুষার চোখ পাকিয়ে আধো বুলিতে বলল, ‘কী রে! গাল ভেঙে ঠোঁট বেড়িয়ে যাবে তো! আস্তে ধর। আমি বড় হয়েছি। দেখছিস না বিয়ে করতে যাচ্ছি!’তুবা কিছু না বলে অপলক তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ‘কী রে! কী দেখছিস?”নাহ কিছু না। আচ্ছা ভাইয়া শোন, বিয়ের পর নাকি ভাইয়ারা বোনদেরকে ভুলে যায়। সত্যি নাকি রে?’তুষার অপ্রস্তুত হয়ে তাকিয়ে রইল তুবার দিকে। দেখল, ওর ঠোঁটজোড়া কেন যেন কেঁপে উঠল। চোখজোড়া কেমন জ্বলে উঠল। কণ্ঠটা ভারী হয়ে আসল। ‘বল না রে, সত্যিই কি ভুলে যায়?’তুষারের চোখ ভিজে গেল। টুপ করে কয়েকটি ফোঁটা গড়িয়ে পড়তেই তুবার হাত এসে তা মুছে দিল। এরপর অস্ফুটে বলল, ‘কোনো আপত্তি নেই ভাইয়া। তবু সুখে থাকিস। ভাবিকে কষ্ট দিস না। বেচারি সব ছেড়ে তোর কাছে চলে আসবে। তুই কষ্ট দিলে ওকে কে দেখবে আর? আমার কোনো সমস্যা হবে না। আমার আম্মু আছে, আব্বু আছে, আর ফাহিম তো আছেই।’এই বলে একটা দৌঁড় দিয়ে ওর রুমে ঢুকে দপ করে দরজা আটকে দিল। বিছানায় ঝাপিয়ে পড়ে ফুপিয়ে কান্না জুড়ে দিল।

পৃষ্ঠা-৪৯

তুষারের ৬ বছরের ছোট তুবা। এবার অনার্স অ্যাডমিশন নিল। তুষার নিল মাস্টার্সের অ্যাডমিশন। আর ফাহিম অনার্স থার্ড ইয়ারে। প্রত্যেকেই জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট। তিনভাই-বোন একই ভার্সিটিতে চান্স পাওয়াটা বেশ ভাগ্যের ব্যাপার।তৃষার কিছুক্ষণের জন্য নিজেকে হারিয়ে ফেলল। বেশ কিছুক্ষণ সোফায় বসে থেকে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসল।এদিকে সবাই তৈরি হয়ে গেছে। গাড়িও সাজানো হয়ে গেছে। ফাহিমের দায়িত্বে ছিল এটা। একটা প্রাইভেটকার আর দুইটা মাইক্রোবাস আনা হয়েছে। প্রাইভেটকারটা বরের জন্য। ফাহিম ওটা মিয়া ভাইকে সাথে নিয়ে মনের মতো করে সাজিয়েছে।

সামনে গাদা ফুলের মালা, গোলাপ-কলি আর পাশে রজনীগন্ধার ভিড়ে গাড়িটিকেই যেন বর বর লাগছে। মিয়া ভাইয়ের হাতের ছোঁয়ায় গাড়িটি জীবন্ত হয়ে উঠেছে। চোখ ফেরানো দায়।এসব সেরে ফাহিম এসে হাঁক ছেড়ে বলল, ‘ক’টা বাজে এখন, হিসেব আছে? সবাই গিয়ে গাড়িতে ওঠো।’বাড়িতে আজ অনেক মানুষ। তুষারের দুই চাচ্চু ও তার পরিবার, তিন মামা ও তার পরিবার এবং বন্ধুদের মধ্যেও জন পাঁচেক আছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৩০-৩৫ জন হবে। সবাই গিয়ে গাড়িতে বসতে লাগল।বরের গাড়িতে তুষার ও ফাহিম পেছনে আর ওর আব্বু সামনে বসছে। বাকিরা সবাই মাইক্রোতে। তুষারের হঠাৎ চোখ পড়ল তুবার দিকে। বাইরে দাড়িয়ে আছে।’এই তুবা! উঠছিস না কেন?’ গাড়ির গ্লাস নামিয়ে জিজ্ঞেস করল তুষার।তুবা চুপচাপ দাড়িয়েই রইল। সবাই যার যার মতো টুকরো আলাপে মেতে রইল। তুষার গাড়ি থেকে নেমে এসে ওর হাত ধরে উঠিয়ে দিতে গেলে তুবা থমকে দাড়িয়ে বলল, ‘ভাইয়া শোন, বিয়ের পর তো ভাবিকে নিয়েই ঘুরবি। শেষবারের মত তোর পাশে বসিয়ে নিবি আমাকে? ভাবি আসলে আর চাইব না। নে না শেষবারের মতো।

পৃষ্ঠা-৫০

তৃষার ঠোঁট কামড়ে আকাশে তাকাল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চোখ নামিয়ে দেখল, তুবা ঠিক ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখজোড়া লাল হয়ে গেছে তুবার। মনে হচ্ছে তাতে মুক্তাদানা টলমল করছে। এখনই উপচে পড়বে। কিন্তু তুষারের এখন কাঁদা চলবে না। ভেতরটা হু হু করে ফুপিয়ে উঠলেও তুবাকে বুঝতে দিল না। ওর চোখের নিচে আঙুল ছুঁইয়ে বলল, ‘একদম কাঁদবি না।একটা কথা মনে রাখিস- মানুষ সারাদিন সূর্যের আলোতে কাজ সমাধা করলেও রাতের জ্যোৎস্নার প্রয়োজন তার ফুরিয়ে যায় না। বরং দিনের ব্যস্ততার ক্লান্তি মুছতে জ্যোৎস্নাকেই সে খুজে বেড়ায়। কিন্তু সেই জ্যোৎস্না বিলানো চাঁদটিই মাঝেমাঝে অমাবস্যায় হারিয়ে যায়। কী রে! স্বামীকে পেয়ে এভাবে আবার হারিয়ে যাবি না তো?’ তুবার কথা বলার শক্তি নেই। মনে হচ্ছে কিছু একটা এসে যেন গলাটা চেপে ধরেছে। বেশ ব্যথা অনুভূত হচ্ছে। চোখ বন্ধ হয়ে আছে। সামাজিকতাকে মেনে নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে চোখদু’টো অঝোরে কাজল ধোয়া পানি ঝরাচ্ছে।তুষার কিছু না বলে গাড়ির দিকে এগিয়ে ফাহিমকে বলল, ‘ফাহিম, তুই একটু ঐ গাড়িতে গিয়ে বস। তুবা বসবে এখানে।’ফাহিম কিছু না বলে নেমে গিয়ে মাইক্রোতে ড্রাইভারের পাশে গিয়ে বসল।তুবাকে হাতে ধরে নিয়ে এসে ভেতরে বসিয়ে দরজা লক করে দিল। এরপর তুষার পেছন দিয়ে ঘুরে এসে গাড়ির ডানপাশের সিটে বসে দরজা লক করে বলল, ‘ড্রাইভার, বিসমিল্লাহ বলো।’ গাড়ি চলতে শুরু করল…তৃষার সামনে তাকিয়ে আছে। তুবা বাঁ-পাশের গ্লাসটা খুলে বাইরের দ্রুতগামী বিল্ডিংগুলো দেখছে। মনে হচ্ছে যেন ছটছট করে বিল্ডিংগুলো পেছনে চলে যাচ্ছে। উঁচু-নিচু ঝাঁকিতে তুবা মাঝেমাঝে হালকা লাফিয়ে উঠছে। একপর্যায়ে গ্লাস বন্ধ করে সিটে হেলান দিয়ে তুষারের দিকে তাকিয়ে দেখে- তুষার একদৃষ্টে তুবার দিকে তাকিয়ে আছে। তুবা অপ্রস্তুত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী রে? কী দেখছিস?”মায়া দেখছি।”মানে?”আচ্ছা তুবা! মেয়েদের মধ্যে এত মায়া কেন রে?’

পৃষ্ঠা-৫১

তুবা দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে অস্ফুটে বলল, ‘এই মায়ার জন্যই তো মেয়েদের এত কষ্ট। এই জিনিসটা না থাকলে মেয়েদের আর কষ্টই থাকতো না।”যদি তা-ই হতো, তাহলে পৃথিবীতে এত বৈচিত্র্য থাকতো না। অসার এক জগতে কেবল মৃত্যুর প্রয়োজনে বেঁচে থাকতাম আমরা। এই মায়াই নির্জীব পৃথিবীকে সজীব রেখেছে, নিষ্প্রাণ সত্তাকে প্রাণবন্ত করেছে। পৃথিবী তোদের কাছে ঋণী।”হয়েছে হয়েছে, আর আদিখ্যেতা দেখাতে হবে না। ভাবির জন্য স্পেশাল কিছু নিয়েছিস?’তুবার ধমক শুনে তুষার একটু নড়েচড়ে বসে বলল, ‘না তো! স্পেশাল আবার কী নেব?”সেটাও বলে দিতে হবে? খুব তো মেয়েদের গুন-কীর্তণ করলি, তো মেয়েরা যে সবসময় ছোট হোক, কিন্তু স্পেশাল কিছু আশা করে এটা জানিস না?’তুষার ড্যাবড্যাবে চোখে তাকিয়ে আছে তুবার দিকে। তুবা ভ্রু নাচিয়ে বলল, ‘কী? কিছুই বুঝিস না?’তুষারের মুখ থেকে কথা বের হচ্ছে না। তুবার কথা যেন ওর মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে।এরপর তুবা ওর পার্স থেকে দু’টি লাভ ক্যান্ডি বের করে বলল, ‘ভাবিকে এই লাভ ক্যান্ডি দু’টা দিবি। শত দামি জিনিসের ভিড়ে মেয়েরা এই ছোট ছোট জিনিসগুলোকে খুব পছন্দ করে। পূর্ণ ভালোবাসার সাথে দেওয়া এই তুচ্ছ জিনিসটিই তার কাছে অনেক স্পেশাল কিছু হয়ে যায়। তোরা ছেলেরা এসব বুঝবি না। মাঝে মাঝে এমন ছোটখাটো কিছু কিনে দিস ভাবিকে। খুব খুশি হবে। লাখ টাকায়ও সেই খুশি কিনতে পাবি না।’এই বলে তুষারের হাতে ক্যান্ডি দু’টি গুজে দিল। তুষার হাতের ক্যান্ডি দু’টি নিয়ে দেখতে লাগল, আর তুবার কথাগুলো ভাবতে লাগল। সত্যিই কি মেয়েরা এমন? এত অল্পতেই তাদেরকে খুশি করা যায়? কেমন যেন লাগছে ব্যাপারটা।তুবা ওর ভাব বুঝতে পেরে বলল, ‘সব মেয়ের কথা জানি না, তবে ভালো মেয়েরা এমনই হয়। তাদেরকে খুশি করতে খুব বেশিকিছু লাগে না। ভালো একটা মন থাকলে কাগজের খেলনা ফুল দিয়েও তাদেরকে খুশি করা যায়।’

পৃষ্ঠা-৫২

বড় বোন যেন তার ছোট ভাইকে শেখাচ্ছে। ভাবসাব এমনই। তুষার বলল, ‘বেশ পাকনা হয়ে গেছিস দেখছি। ক’টা দিন ওয়েট কর। কোনো চকলেটওয়ালা দেখে ধরিয়ে দেব।”তা নিয়ে তোর এত চিন্তা করতে হবে না। আব্বুই যথেষ্ট।’ তুবা এই বলে দাঁত কিড়মিড়িয়ে কষিয়ে একটা ভেংচি কেটে সামনে তাকাল।তুষার ফিক করে হেসে বলল, ‘তার মানে চকলেটওয়ালায় রাজি? হেহ হে…! তো তোর চকলেটওয়ালার কাছ থেকে আমার জন্য আরও এক প্যাকেট লাভ ক্যান্ডি রাখিস। ভয় পাস না, ওটা টাকা দিয়েই নেব।’তুবা ফুসছে। ফণা তুলছে। তুষারের দিকে তাকিয়ে থেকে-থেকে ফোসফাস করে উঠছে। আজ বরযাত্রীতে রওয়ানা না করলে এক্ষুণি তুষারের চুলের একটা দফারফা করে ছাড়তো। তুষার হাবভাব বুঝতে পেরে পকেট থেকে ফোন বের করে হুদাই কানে দিয়ে বাইরে দৃষ্টি ফিরাল। মুখে চিকন হাসি… তিন

‘এই মিলি! কই হলো? ওদের আসার সময় হয়ে গেল তো!”জি আন্টি, এই তো শেষ।’ মিলি এই বলে সারার গালে একটা চিমটি দিয়ে বলল, ‘প্রথম দেখাতেই জামাই বাবু যদি ফিট না হয়েছে না! দেখে নিস। এই তোরা লবণ-পানি রেডি রাখিস। মাথায় ঢালতে হবে। শত হলেও এ বাড়ির জামাই বলে কথা। বেশিক্ষণ ফিট হয়ে পড়ে থাকতে দেওয়া যাবে না। বোন আমার একা একা ভয় পাবে। হিহিহি…।হাফসা, শাকেরা, শামিমা, মার্জিয়া, আফিয়া সবক’টা মিলে সারাকে ধরে চিমটাতে শুরু করল। সারা মুখ তুলে বলল, ‘ঐ লাগছে তো। আর তোদের মতো এত ভীতু না আমি হুহ।”হয়েছে হয়েছে। সময় হলেই দেখা যাবে। এই লবণ-পানি একটু বেশি করে রাখিস। ওর মাথায়ও ঢালতে হতে পারে।’ সবগুলো খিটখিটিয়ে হেসে উঠল।’কী রে হলো?’

পৃষ্ঠা-৫৩

‘জি আন্টি এই শেষ, আসছি। এই চল চল, ওকে মনভরে একটু শ্বাস নিয়ে দে। বর আসলে ভয়ে না আবার শ্বাস নেয়া ভুলে যায়, অ্যাডভান্স কিছু শ্বাস নিয়ে রাখ সারা। রাতে কাজে লাগবে।’সারা হাত উঠিয়ে কিল রেডি করতেই হুড়মুড়িয়ে উঠে বেরিয়ে গেল ওরা।দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। বেলা ৩টা টুইটুই। এখনও কোনো সাড়াশব্দ নেই। এদিকে ভারী কাপড়ের গরমে সারার অবস্থা বে-শামাল। ফ্যান থাকার পরও ঘেমে- নেয়ে একাকার। আম্মুকে ডেকে বলল, ‘আম্মু, শাড়িটা একটু খুলে রাখি? খুব অস্থির লাগছে।’সারার আম্মুর কড়া আওয়াজ, ‘না! যেকোনো সময় ওরা চলে আসবে। তখন তাড়াহুড়ো করা যাবে না। ফ্যানের নিচে স্থির হয়ে বসো।’ মুখ ভার করে চুপসে রইল সারা।সারার বাবা পায়চারি করছে। কপালের বিন্দু বিন্দু ঘাম টেনশনের বার্তা দিচ্ছে। এরমধ্যে সারার আম্মু ডেকে বলল, ‘এই আরেকবার কল করে দেখো তো ধরে কি না!”এই নিয়ে কম করে হলেও ১০ বার কল দিয়েছি। একবারও রিসিভ করেনি।”আজ ঠিক আসবে তো?”আসবে মানে? বের হওয়ার পর মাঝ পথেও আমার সাথে কথা হয়েছে। এতক্ষণ তো লাগার কথা না। বুঝতে পারছি না কিছু।”কী রেখে কী করি! এদিকে অন্য সবাই ক্ষুধায় অস্থির। তারা না আসলে খেতেও পারছে না কেউ। সারা তো সেই কাল রাতে খেয়েছে এখন পর্যন্ত আর কিছু খাওয়াতে পারলাম না।”সে কী! এক কাজ করো, বাকিদেরকে খাবার দিয়ে দিতে বলো, আর তুমি গিয়ে ওকে আদালা করে খাইয়ে দাও এখনই।”আচ্ছা বলে দিচ্ছি। কিন্তু ওকে তো খাবার কথা বললেই বলে ক্ষুধা নেই। আমি আছি মহা জ্বালায়। একদিকে মেয়ের জ্বালা, অন্যদিকে মেয়ের বাপের জ্বালা, আবার আজ মেহমানরাও যা শুরু করল। আর পারি না…।’

পৃষ্ঠা-৫৪

নাজমা বেগম একরাশ অস্বস্তি নিয়ে ভেতরে গিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। গতরাতে একফোটাও ঘুম হয়নি। রাত জেগে রান্নাবান্না ও গোছগাছ করা নিয়ে বেশ ধকল গেছে। আসলাম সাহেবও বেশ ক্লান্ত। সারার আম্মু ভেতরে চলে গেলে তিনি ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লেন। এই সুযোগে চট করে গোসলটা সেরে নিলে মন্দ হয় না।গোসল সেরে বের হয়ে ফোন হাতে নিয়ে দেখে মিসড কল! তুষারের বাবার কল। দ্রুত কলব্যাক করতেই তুষারের বাবা জনাব ইরফান সাহেব ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, ‘আসলাম সাহেব, আমরা চলে এসেছি। আর সর্বোচ্চ ৩০ মিনিট লাগবে।’আসলাম সাহেব ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন- ৪টা বেজে গেছে। একটু বিরক্তি মিশিয়ে বললেন, আরও ৩০ মিনিট?”একটু ধৈর্য ধরুন প্লিজ, এই তো এসে গেছি।’আসলাম সাহেব টুপ করে ফোনটা কেটে দিলেন। সারার আম্মুকে ডেকে বললেন, ‘এই কই গেলে! উনারা কাছাকাছি চলে এসেছে। উঠে ফ্রেস হও। সারাকে তৈরি থাকতে বলো।’নাজমা বেগম তড়িঘড়ি করে উঠে বসলেন। মাত্র চোখটা লেগে আসছিল। কাচা ঘুমের চোখ পোড়ানি বেশ কষ্টের। তবুও উঠে গেলেন। ফ্রেস হয়ে সারার রুমে গিয়ে দেখে সারাও বালিশে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে গেছে।’এই সারা! ওঠো আম্মু। মেহমান চলে আসবে এখনই। উঠে ফ্রেস হয়ে নাও।’কিছুক্ষণ পর সারা আড়মোড়া ভেঙে ওয়াশরুম থেকে ফ্রেস হয়ে এসে আসরের নামায পড়ার জন্য জায়নামাজ বিছাতেই বাইরে হৈ-হুল্লোড় শুনতে পেল। বোধহয় মেহমানরা চলে এসেছে। ওদিকে কান না দিয়ে সারা নামায পড়ে নিয়ে খাটের এক কোণে চুপচাপ বসে রইল।মাইক্রোবাস দু’টো গেইটের সামনেই রাখা। আসলাম সাহেব মেহমানদেরকে প্যান্ডেলে নিয়ে বসিয়ে দিতে দিতে মেহমানদের একজনকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী ব্যাপার? বেয়াই সাহেবকে দেখছি না যে!’তুষারের আম্মু এগিয়ে এসে বললেন, ‘বেয়াই সাহেব, খাবার-দাবার শেষে কিছু জরুরি কথা আছে। এরপর কাজী সাহেবের সাথে কাজটা শেষ করব। তুষারের আব্দু একটু কাজে আটকে গেছে। ওর চাচারা আছে। অসুবিধার কিছু নেই।’

পৃষ্ঠা-৫৪

তুষারের আম্মুর কথা শুনে আসলাম সাহেব আর কথা বাড়ালেন না। ‘আচ্ছা ঠিক আছে। এই পর্ব শেষ হোক।’সবকিছু শেষ করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। চলে যাওয়ার মুহুর্তে। নাজমা বেগম হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ল। মাথায় পানি ঢেলে তাকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। মেয়েকে বিদায় দিতে হবে। কিন্তু আসলাম সাহেব অসুস্থ স্ত্রীকে আর ডাকতে চাইলেন না। মিলিকে ডেকে বললেন, ‘এই মিলি, সারাকে নিয়ে এসো।’মিলি, হাফসা, শাকেরা, শামীমা, মার্জিয়া ও আফিয়া সবাই মিলে সারাকে নিয়ে আসল। সারা অঝোরে কাঁদছে। হাঁটতে পারছিল না। মিলি খুব শক্ত করে ধরে রেখেছে ওকে। আসলাম সাহেব একবার সারার দিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলেন। এমন মুহূর্তে মেয়ের দিকে কোনো বাবা তাকিয়ে থাকতে পারার কথা না। আসলাম সাহেবও পারলেন না। তার চোখজোড়া লাল টকটকে হয়ে আছে। খাবারের পর থেকে এ পর্যন্ত কম করে হলেও ১০ বার ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে পানির ঝাপটা দিয়েছেন। মনে হচ্ছিল যেন চোখে রক্ত জমে গেছে। স্থির হয়ে সারাকে বললেন, ‘সারা, কাদিস না মা। এক মা-বাবার ঘর ছেড়ে আরেক মা-বাবার ঘরেই যাচ্ছিস। আশাকরি কোনো পার্থক্য পাবি না। দেখে নিস!’সারা ওর আব্বুর হাতটি বুকের সাথে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। কাঁদতে কাঁদতে কেমন যেন অসাড় হয়ে গেল। মুখে কোনো কথা বের হচ্ছে না। মিনিট খানেক পর আসলাম সাহেব সারাকে ধরে নিজ হাতে গাড়িতে তুলে দিলেন। বরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘বাবা! আমার বুকের কলিজাটা দিয়ে দিচ্ছি। ঠিক বুকের মাঝখানেই রেখ। পাগলীটা আমার অন্যকোথাও বাঁচতে পারবে না।’কেউ আর কোনো কথা বলল না। রাজ্যের নিরবতা নেমে এসেছে। মিলি, হাফসা, শাকেরা, শামীমা, মার্জিয়া ও আফিয়া যারা ওর সেই বাল্যকালের সাথী, ওরাও একপাশে দাড়িয়ে ওড়না দিয়ে মুখ চেপে রেখেছে। কিন্তু তাতে ফুপানো আওয়াজকে আর চেপে রাখতে পারেনি। ডুকরে কাঁদছে পাগলীগুলো।ড্রাইভার গেইট লক করে গাড়ি স্টার্ট দিতেই সবাই একটু সরে এল। আসলাম সাহেব ঠোঁট কামড়ে ধরে নির্বাক দাড়িয়ে রইলেন। গাড়ি চোখের আড়াল হতেই টুপ করে বসে পড়লেন। এবার দু’হাতে মুখটা চেপে ধরে গলা ছেড়ে বাচ্চাদের মতো হ হু করে কেঁদে উঠলেন…

পৃষ্ঠা-৫৫

চার জ্যোৎস্না রাত। জানালার ফাঁক গলিয়ে চাঁদের নির্মল আলো ঠিকরে পড়ছে সারার গায়ে। একটি কপাট খুলে দিয়ে উন্মুক্ত চাঁদের মাঝে সারা হারিয়ে গেল। ঝিঁঝিপোকার ডাকে একটু ভয় অবশ্য লাগছিল। কিন্তু শূন্য দেহে ভয় কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। কারণ, সারা এখানে থাকলেও তার মনটা এখন চাঁদে। এখানে কেবল অসাড় দেহটি ঘোমটা ফেলে বসে আছে।আচমকা একটি খচখচ শব্দ শুনে সারা নড়েচড়ে বসল। জানালার বাইরের দিকে নিচ থেকে আসছে শব্দটা। বিড়াল-টিড়াল হবে হয়ত। সারা আলতো করে জানালাটি লাগিয়ে দিয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে ঠিক রাত ১টা! সারা কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। চোখ পোড়ানি আর ঝিমুনির কারণে আর বসে থাকা যাচ্ছে না। কতক্ষণই বা পারা যায়! উনি প্রথম দিনেই এত দেরি করে আসছে! কোনো সমস্যা হয়নি তো? নাকি আমাকে পছন্দ হয়নি! না অন্য কোনো পছন্দ ছিল! তাহলে আগে বললেই পারতো। এখন কেন এমনটা করছে? কিছুটা রাগ হচ্ছে সারার। সাথে বিরক্তি মিশ্রিত ভয়ও।সারার এসব সাত-পাঁচ ভাবনায় ছেঁদ ফেলে হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। সারা আঁতকে উঠল। ভয় আর আকাঙ্ক্ষার তীব্রতায় হার্টের কয়েকটি বিট মিস হবার উপক্রম! গলা শুকিয়ে আসছে। ঘুমপরী যেন ফুড়ৎ করে অজানায় হারিয়ে গেছে। দুরুদুরু বুকে আস্তে করে দরজাটা খুলে দিয়েই টুপ করে বিছানায় বসে ঘুমটা টেনে দিল সারা।মেয়েলি কণ্ঠে সালাম শুনে সারা ঘুমটা তুলে তাকিয়ে দেখে- একটি প্রস্ফুটিত গোলাপ। সম্ভবত এবাড়ির মেয়ে হবে।’আসসালামু আলাইকুম ভাবি।”ওয়া আলাইকুমুসসালাম’ বলে সারা নিশ্চুপ। সালামের জবাব দিয়ে অপলক তাকিয়ে আছে মেয়েটির প্রতি। তুবা মৃদু হেসে বলল, ‘ভাবি, এতরাতে এখানে আসার জন্য সরি।”না না ঠিক আছে। বসুন।’তুবা সারার পাশে গিয়ে বসল। সারার ঘোমটা পুরোটা নামিয়ে কিছুক্ষণ ওর চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। লাল টকটকে হয়ে আছে মেয়েটার চোখ। ক্লান্তি আর ঘুমের স্পষ্ট ছাপ চোখে-মুখে। তবুও যেন চোখ ফেরানো দায়।’

পৃষ্ঠা-৫৬

এমন চাঁদমুখ থাকলে জ্যোৎস্না বিলাস করতে আমার ভাইয়ার আর আকাশের চাঁদ লাগবে না।’ অস্ফুটে বলে উঠল তুবা।সারা খানিকটা লজ্জা পেল। মুচকি হেসে দিয়ে বলল, ‘চাঁদ যে এ বাড়িতে আরও একটি আছে, অন্য কারো জ্যোৎস্না বিলাসের রানী হবার অপেক্ষায়, সে খবর রেখেছেন কি?!’ এই বলে সারা তুবার প্রতি একদৃষ্টিতে তাকিয়েই রইল। ত্ববা লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিল।একটু পর দেখল, তুবার লজ্জাবনত চোখের কাজল ধুয়ে গড়িয়ে পড়ছে। ঠোঁটজোড়া মৃদু কাঁপছে।’কী ব্যাপার আপু!”ভাবি, কিছু কথা বলি? রাগ করবেন না তো?”আরে না! কী বলছেন এসব! বলুন না!’তুবা স্থির কণ্ঠে বলল, ‘ভাবি, আমার ভাইয়াটা না অনে…ক ভালো। অবশ্য আপনিও অনেক ভালো। কিন্তু ভালো হলে কী হবে, ভাইয়াটা বেশ বোকা। আচ্ছা ভাবি, ভাইয়াকে তো আপনি দেখেননি তাই না?”ঠিক দেখিনি। তবে ছবি দেখেছি।”কেমন লেগেছে? পছন্দ হয়েছে?’এবার সারা কিছুটা লজ্জা পেল। কিন্তু কিঞ্চিৎ শঙ্কাও ডানা বাধল। ভাবছে- আমাকে তার পছন্দ হয়েছে তো! নাকি অন্যকোনো পছন্দ ছিল? আবারও সেই সাত-পাঁচের ঝামেলা।তুবা বলল, ‘আচ্ছা ভাবি! আমি চলে যাবার পর ভাইয়া যদি ভূত হয়ে আপনার সামনে আসে, তাহলে কি ভয় পাবেন?’কথাটি সারার মাথার ওপর দিয়ে গেল। কিন্তু হা করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু বলল না।’ভাবি, একদম ভয় পাবেন না। ভুত হলেও সে আপনাকে অনেক ভালোবাসবে। তাকে কষ্ট দিয়েন না ভাবি। বুঝিয়ে-সুঝিয়ে যা বলবেন সব শুনবে। তার সাথে কখনও ঝগড়া করবেন না। ভাইয়ার মতো ভূতটা অত সুন্দর না হলেও এর সুন্দর একটা মন আছে। আশাকরি সেই মনে আপনার স্বপ্নের প্রাসাদ দারুণ শোভা পাবে।

পৃষ্ঠা-৫৭

আচ্ছা আমি এখন আসি। রাত হয়েছে অনেক। আর হ্যাঁ, আমার নাম তুবা। আপনার একমাত্র ননদিনী। আসি ভাবি, আসসালামু আলাইকুম।’ অদ্ভুতুড়ে এই কথাগুলো বলে মুখে হাত রেখে ভেতর থেকে আসতে চাওয়া জলচ্ছাস চেপে ধরে একদৌড়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল তুবা।সারা কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। কীসব বলে গেল মেয়েটা। ভাইয়া! ভূত! ভয় পাব না! সুন্দর মন। স্বপ্নের প্রাসাদ! মাথা গুলিয়ে যাচ্ছিল সারার। অমনি পুরুষালী কণ্ঠে গলা খাকাড়ির শব্দ। দরজা খোলাই আছে। সারা তড়িঘড়ি করে ঘোমটা তুলে নিল। আঁচ করল, কেউ একজন ঘরে প্রবেশ করেছে। সালাম দিয়ে ওয়্যারড্রবের উপর পাগড়িটা রাখছে। ঘোমটার নিচ দিয়ে হাঁটু পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। সাদা পাজামার সাথে সোনালী পাঞ্জাবি পরেছে। সারা চোখ ফিরিয়ে নিয়ে লজ্জায় এটুকু হয়ে গেছে।তুষার এসে সারার পাসে বসে পড়ল। সারার শ্বাস ভারী হতে লাগল। নিশ্বাস উত্তপ্ত হতে লাগল। মিনিট পাঁচেক দু’জনই চুপচাপ রইল। উভয়েই একে অপরের ঘোর ভাঙার অপেক্ষায়। শেষমেশ ভার কণ্ঠে তুষার জিজ্ঞেস করল, ‘অনেক কষ্ট হয়েছে তাই না? সরি।’সারা অস্ফুটে বলল, ‘আরে না! কী বলছেন! ঠিক আছি আমি।’তুষার ঘড়ি দেখে বলল, ‘দেড়টা বেজে গেছে। নিশ্চয়ই অনেক কষ্ট পেয়েছেন এতক্ষণ। আর মনে মনে খুব বকেছেন আমায় তাই না?’বকবই তো! কেন বকব না! সেই গতকালকের পর থেকে আর কিছু খেতে পারিনি। ঠিকমতো ঘুমাতেও পারিনি। তার উপর আজ সারাটা দিন এত ভারী কাপড়-চোপড় পরে থেকে সিদ্ধ হয়ে গেছি, মোটের ওপর বাবার বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে মানুষিক দিক থেকে এমনিই আধমরা হয়ে আছি, এরপর এত রাতে এসে আবার জিজ্ঞেস করছেন- মনেমনে খুব বকেছেন আমায় তাই না? বুঝাব মজা। ক’টা দিন যাক। হুহ।কথাগুলো এভাবে হরহর করে উগড়ে দিতে পারলে ভেতরে একটু শান্তি লাগত সারার। কিন্তু তা আর হলো না। মনের কথা মনেই হজম করতে হল।’কী ব্যাপার? কিছু বলছেন না যে!’তুষারের প্রশ্নে সারা অপ্রস্তুত হয়ে বলল, ‘কী যে বলেন। আমি একদম বকিনি।’

পৃষ্ঠা-৫৮

‘উহু, মেয়েদের সব কথা বিশ্বাস করতে নেই।’আড়চোখ করে তুষারকে একটু দেখার চেষ্টা করল সারা। মন চাচ্ছে… কিছু না। প্রথমদিনেই কোনো অ্যাকশনে যাওয়া যাবে না। সময় আসুক। ঠোঁট কামড়ে নিজেকে বুঝ দিল সারা।’আপনাকে কিছু কথা বলব। জানি না কীভাবে নেবেন।’কী রে বাবা। সত্যি সত্যি ভূতের পাল্লায় পড়লাম নাকি। না ভুতের রাজ্যেই এসে পৌঁছলাম। একটু আগে এর বোন এসে কীসব বলে গেল কিছুই বুঝলাম না। এখন আবার উনি নিজেই… সারার মনে আবারও সেই সাত-পাঁচের উটকো ঝামেলা।মৃদুস্বরে বলল, “জি বলুন। অসুবিধা নেই।’তুষার একটু সোজা হয়ে বসে বলল, ‘দেখুন তো আমাকে চিনতে পারেন কি না।’সারা পিটপিট করে তাকাতে চেষ্টা করছে। পারছে না দেখে তুষার বলল, ‘ঘোমটা নামিয়ে নিন না।’সারা একটু সোজা হয়ে ঘোমটাটা আলতো করে পেছনে নিতেই যেন দপ করে জ্বলে উঠল! এ কী। কে আপনি?। আর আপনি এখানেই বা কেন?-তুবা আপু! এই তুবা আপু!তুষারকে দেখামাত্রই ভড়কে গিয়ে ভয়ে তুবাকে ডাকতে লাগল সারা।সারার আঁতকে ওঠা দেখে তুষারও ক্ষানিকটা ভয় পেয়ে গেছে। সাথে সাথে রাজ্যের জড়তা-সংকোচ যেন মুষড়ে ফেলল ওকে। ঠিক কী বলবে এখন সারাকো শেষমেশ ঝট করে বলে ফেলল, ‘আমি ফাহিম, তুষার আমার বড় ভাইয়ার নাম।’একথা শুনে সারার পুরো গায়ে যেন তড়িৎ খেলে গেল!’আপনি ছোটভাই হয়ে এইভাবে বড়ভাইয়ের বাসরঘরে… উফ! বেরোন। এক্ষুণি বেরোন! না হয় আমি চিৎকার করব এখনই!’ সোজা দাড়িয়ে গিয়ে ঝাঁঝালো কন্ঠে হাত নাড়াতে নাড়াতে বলল সারা।ফাহিম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। আড়ষ্ট হয়ে দুম করে বলে দিল- ‘দেখুন, একটু স্থির হোন। আমিই আপনার স্বামী।’

পৃষ্ঠা-৫৯

এটা কী হলো! সারার মুখাবয়ব যেন মুহূর্তেই বিধ্বস্ত হয়ে গেল। দপ করে বসে পড়ল। হাত-পা যেন অবশ হয়ে আসছে ওর। দম যেন আটকে যেতে চাচ্ছে। ফাহিম বুঝতে পেরে বলল, ‘প্লিজ আপনি একটু স্থির হোন, আমার কথাগুলো শুনুন একটু।’বিয়ের আগে তুষারের কেবল ছবি দেখেছিল সারা। সরাসরি দেখা বা কথা কোনোটারই সুযোগ হয়ে উঠেনি। কিন্তু এখন এসব কী শুনছে সারা! ছবিতে একপলক দেখেই যার মাঝে হারিয়ে গিয়েছিল, যার বুকে মাথা রাখার নেশায় এতক্ষণ বিভোর হয়েছিল এখন কি না তার ছোটভাই…! এটা কীভাবে সম্ভব! আর এটা কী করেই বা ঘটা সম্ভব। সারা নিথর হয়ে বসে রইল। ওর কাজল ধোয়া চোখের পানি চিবুক পর্যন্ত নেমে আসল। আর কথা বলার শক্তি পাচ্ছে না মেয়েটি। মাথা আলতো কাত করে ফাহিমের দিকে একপলক তাকিয়েই ফুপিয়ে কান্না জুড়ে দিল। কোলে মাথা নুইয়ে যেন আষাঢ়ের বাদল নামিয়ে নিল।ফাহিম ইস্পাত-দৃঢ় হয়ে বসে রইল। মিনিট দশেক পর অস্ফুটে বলল, ‘একটু বসুন। আগে আমার কথাগুলো একটু শুনুন।’সারা মাথা তুলে বসল। ফাহিমের দিকে তাকাতেই ফাহিম বলল, ‘প্লিজ!’সারা হাটু ভাঁজ করে হাত দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে তার ওপর মাথাটি রেখে রাজ্যের নিরবতায় হারিয়ে গেল।ফাহিম বলতে শুরু করল।আজ সকালে স্বাভাবিক বরযাত্রীর মতো আমরাও রওয়ানা হয়েছিলাম। আব্বু, আম্মু, চাচ্চু ও মামারা সহ প্রায় ৩০-৩৫ জনের মতো ছোট্ট একটি বরযাত্রী। তুবা ভাইয়ার জন্য বড্ড পাগল। ওদের দু’জনের মাঝে সারাক্ষণ যেমন লেগেই থাকে, তেমনি কেউ কাউকে ছাড়া দূরে থাকতে পারে না। তো আজ রওয়ানা হবার সময়ও ওদের ঝগড়া বাদ পড়েনি। শেষমেশ আব্বু, তুবা আর ভাইয়া বরের গাড়িতে, আর আমরা বাকিরা মাইক্রোবাসে।যথারীতি গাড়ি চলছিল। ভাইয়াদের গাড়িটা আমাদের সামনে ছিল। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ গাড়িটা চোখের আড়াল হয়ে গেল। ভাবলাম আমরা পেছনে পড়ে গেছি। তাই ড্রাইভারকে একটু দ্রুত চালাতে বললাম। হঠাৎ আব্বুর ফোন। রিসিভ করতেই বেশ জোরেসোরে ডাকাডাকির শব্দ শুনলাম। কাঁপা স্বরে আব্বু বলল, ‘ফাহিমনের… গাড়ি ঘুরিয়ে সোজা জাবেদা মেমোরিয়াল হাসপাতালে চলে আয়।’

পৃষ্ঠা-৬০

‘আব্বু কী হয়েছে। হাসপাতালে কেন? আকর।’ আব্বু ওটক বলেই ফোন রেখে দিয়েছেন।এরপর আর কালবিলম্ব না করে দ্রুত গাড়ি থামিয়ে পেছনের গাড়িটিকেও থামালাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই হাসপাতালে পৌঁছে গেলাম। আব্বুকে আবার কল করতেই রিসিভ করে আব্বু বলল, ‘তোমার আম্মুকে নিয়ে তুমি একা ভেতরে। আসো। বাকিদের কিছু বলার দরকার নেই। বাইরে বসতে বলো।’সেভাবেই করলাম। সবাইকে গাড়িতে বসিয়ে রেখেই আম্মুকে নিয়ে ভেতরে গেলাম। নার্স এসে আমাদেরকে সোজা অপারেশন থিয়েটারের দিকে নিয়ে গেল। গিয়ে দেখি আব্বু আর তুবা বাইরে বসা। তুবা আমাকে দেখেই আমার ওপর ঝাপিয়ে পড়ল। ওকে কোনোরকম ধরে বসিয়ে আব্বুর দিকে তাকালাম।’কী হয়েছে আব্বু?’

আব্বুর মুখে কথা বের হচ্ছে না। রুমালে মুখ চেপে রেখে থমথমে স্বরে বলল, বসো ফাহিম। বসো এখানে। তোমার ভাইয়া বোধহয় আমাদের সাথে অভিমান করেছে। জানি না আর আমাদের সামনে আসবে কি না! এই বলেই দু’হাতে মুখ ঢেকে নিয়ে ফুপিয়ে কান্না জুড়ে দিল। আর তুবা! ও এতক্ষণে সেন্সলেস হবার উপক্রম। ওর অবস্থা দেখে নার্স একজন ওর সাথেই আছে।আমি কেমন যেন অসার হয়ে গেলাম। অনুভূতিশূণ্য হয়ে গেলাম। সবকিছুতে কেমন যেন ঘোর লেগে ছিল। স্থির কন্ঠে নার্সকে জিজ্ঞেস করলাম- আপা কী হয়েছে একটু বলবেন?নার্স বলল, আপনার ভাইয়া অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক। মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছে।নার্সের কথাটি আমার কলিজাটা খপ করে ধরে বসল। মুহুর্তের মধ্যে শরীরে কম্পন শুরু হয়ে গেল। গলা শুকিয়ে আসতে লাগল। চোখদুটি আকস্মিক চাপ সামলাতে না পেরে চাপা ব্যথায় যেন ঝুঁকিয়ে উঠল। বন্ধ হয়ে আসছিল। পৃথিবীটা ঝাপসা দেখাচ্ছিল। কণ্ঠ কে যেন চিপে ধরতে চাচ্ছিল।কিছুক্ষণ পর লম্বা কয়েকটি শ্বাস নিয়ে নার্সকে কিছু বলতে যাব অমনি সার্জন বেরিয়ে আসলেন। এসে আব্বুকে ডেকে নিয়ে ওপাশের রুমে বসালেন। আমি নার্স থেকে মনোযোগ সরিয়ে আব্বুর দিকে তাকিয়ে রইলাম। হাত-পা খুব কাঁপছিল তখন আমার।

পৃষ্ঠা ৬১ থেকে  ৮০

পৃষ্ঠা-৬১

একটু পর হঠাৎ আম্মুর কথা মনে হতেই তাকিয়ে দেখি নার্সের মুখ থেকে অ্যাক্সিডেন্টের কথা শুনেই আম্মু সেন্সলেস হয়ে গেছেন। নার্সকে বললাম, আপা ওকে রেখে আম্মুকে দেখুন একটু। প্লিজ।নার্স আপা দ্রুত স্ট্রেচার এনে আম্মুকে ভেতরে নিয়ে গেলেন।এদিকে আমার পুরো শরীর ঘেমে-নেয়ে জবুথবু অবস্থা। নিশ্বাসে যেন জলন্ত স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ছে। আব্বুর দিকে কয়েক কদম আগালাম। সে কী! আব্বুর বেশুরা কান্নার আওয়াজ!দ্রুত রুমে ঢুকে গেলাম। ডাক্তারকে সরাসরি বললাম, স্যার, আমি পেসেন্টের ছোটভাই। কী অবস্থা ভাইয়ার?ডাক্তার আমার দিকে তাকিয়ে উনার চশমাটি খুলে পাশে রাখলেন। রুমালে আলতো করে চোখ মুছে নিয়ে অস্ফুটে বললেন, দেখুন, আমরা আমাদের সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু নিয়তি আমাদেরকে হারিয়ে দিয়েছে। আই এম সরি।আমি লক্ষ করলাম, সরি শব্দটি তার মুখ থেকে বেরুতে চাচ্ছিল না। ঠোঁটের আগায় কয়েক সেকেন্ড আটকে ছিল শব্দটি। আব্বু টেবিলে মাথা রেখে বাচ্চাদের মতো কেঁদে যাচ্ছেন।হুট করে আমি নিজেও কেন যেন অভদ্রের মতো কেঁদে উঠলাম। ঠিক গুছিয়ে ঘন অভদ্রের মতো। রাখতে পারছিলাম না নিজেকে। ভাইয়ার পাগড়িটা আব্বুর হাতে ছিল। ওতে কোনো দাগ লাগেনি। গাড়িতে খুলে রেখেছিল ওটা। আমি ফ্লোরে বসে পড়লাম। বেশ কিছুক্ষণ পর আধো কণ্ঠে বললাম, স্যার, ভাইয়াকে একটু দেখা যাবে?ডাক্তার আমার পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন, যদিও আমি নিজেই মানতে পারছি না। তবুও বলতে বাধ্য হচ্ছি- আমি আবারও সরি। কারণ পেসেন্টের মাথার স্কাল্প ফেটে গেছে। সেইসাথে চেহারাও নষ্ট হয়ে গেছে। আপনার ভাইয়া গাড়ির ডান পাশে বসেছিল। হঠাৎ দোকান থেকে ঠান্ডা কিছু কিনতে গাড়ি থামাতে বলে। ড্রাইভার গাড়ি থামালে যে-ই না আপনার ভাইয়া নেমে দাঁড়াল অমনি পেছন থেকে একটি দ্রুতগামী বাস এসে এক ধাক্কায়… আর সেই ধাক্কাটা সরাসরি মাথায় লেগেছিল। আমাদের এখানে আসার কিছুক্ষণ পরই তার হার্টবিট পাচ্ছিলাম না। তবুও কেন যেন নিজেকে মানাতে পারিনি। তার রক্তাক্ত শেরওয়ানি আমাকে মানতে দিচ্ছিল না। অহেতুক কিছুক্ষণ চেষ্টা করে নিজেকে সান্তনা দিতে চাচ্ছিলাম। শেষমেশ আর পারলাম না আমরা…। এই বলতেই দ্বিতীয়বারের মত স্যারের চোখ ভিজে আসল।

পৃষ্ঠা-৬২ 

এরপর বলল, আপনাদের প্রতি একটা অনুরোধ থাকবে, লাশটি কাউকে দেখতে দেবেন না। নিজেরাও কেউ দেখবেন না। এতে যে দেখবে তার ক্ষতি হতে পারে। শক সইতে না পেরে স্ট্রোক করে বসতে পারে। এমন অনেক এক্সপেরিয়েন্স আছে আমাদের। এমনকিছু ঘটে গেলে তখন আমরা নিজেরাও আর স্থির থাকতে পারি না। আমরাও যে মানুষ। আর দশটা মানুষের মতো আমরাও রক্তমাংসের গড়া। প্লিজ, যে করেই হোক, এই রিকোয়েস্টটি রাখবেন।আব্বু একটু স্থির হয়ে ঘড়ি দেখছেন। ৩টা ছুঁইছুঁই। পকেট থেকে ফোন বের করে দেখলেন আপনার বাবার অনেকগুলো মিসড কল। কলব্যাক করে বললেন, বেয়াই সাহেব আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই আসছি। একটু ধৈর্য্য ধরুন প্লিজ। এই বলে ফোন রেখে দিলেন।আব্বুর কথা শুনে আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। আব্বুকে বললাম, আব্বু। কিছুক্ষণ পর যাচ্ছেন মানে? আর তাদেরকে কিছু জানালেন না যে?কিছুদিন হলো আব্বুর দাড়িতে পাক ধরেছে। সাদাকালো দাড়িগুলো ভিজে গেছে একদম। দাড়ি-মুখ মুছে নিয়ে এবার স্থির হলেন। মুহুর্তের মধ্যে একেবারে শান্ত হয়ে গেলেন। ডাক্তারকে লাশ দিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে বলে আমাকে নিয়ে ওয়েটিংরুমে চলে গেলেন। এতক্ষণে আম্মু আর তুবাও নার্সের মাধ্যমে ভাইয়ার খবর পেয়ে গেছে। অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর। তারা দু’জন এখন সেই পাথর হয়ে বসে আছে। চোখের পলক ফেলাও যেন ভুলে গেছে। ফ্যাকাসে চেহারা নিয়ে অপলক তাকিয়ে আছে কোথাও।আব্বু ওখানে গিয়ে আম্মুকে বললেন, তুমি ফাহিমকে নিয়ে ওখানে চলে যাও। আর বাকিদেরকে এসবকিছু বলার প্রয়োজন নেই। যা বলার, পরে আমি বলব।আম্মু চোখ ফিরিয়ে স্থির তাকিয়ে রইল আব্বুর দিকে। আম্মুকে স্থির হতে বলে আব্বু বলল, এই যে তুষারের পাগড়িটি আমার হাতে। এটাকে ফাহিমের মাথায় পরিয়ে দিলাম। যাও, পুত্রবধূকে বাড়ি নিয়ে আসো। এদিকটা আমি দেখছি।এই বলে আব্বু পাগড়িটি আমার মাথায় পরিয়ে দিয়ে বললেন, বাবা! এই সংবাদ মেয়েটা শুনলে সহ্য করতে পারবে না। ওকে কিছু বুঝতে দিস না। সবকিছু হয়ে গেলে নিজের মতো করে বুঝিয়ে বলিস। আমি ওকে নিজের মেয়ে বানিয়ে নিলাম। আর আমার মেয়েকে আমি শোকের সাগরে ভাসিয়ে ফেলে রাখতে পারি না। আমার মেয়ে আমার বাড়িতেই আসবে। আমার মেয়ে আমার ছেলের বধূ হয়েই আসবে।

পৃষ্ঠা-৬৩

আব্বুর কথা শুনে আমার পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে গেল।আমি এক-পা পিছিয়ে গিয়ে বললাম, আব্বু। এটা কী করে সম্ভব!আব্বু দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, আমি বলেছি, তাই সম্ভব। অসম্ভবের কিছু তো দেখছি না। আমার লাজ রাখিস ফাহিম। এই বলে আব্বু আম্মুর হাত ধরে গাড়িতে তুলে। দিলেন। সাথে আমাকেও। আব্বুকে কিছু বলার মত কোনো শব্দ আমি খুজে পাচ্ছিলাম না। আম্মুও কোনোদিন আব্বুর কথার অমত করেনি। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। স্বামীর আদেশের সামনে ছেলের শোক যেন স্নান হয়ে গেল।আব্বু একটু শক্ত করে আম্মুকে বললেন, ওখানে গিয়ে বেয়াই আর বেয়াইন ছাড়া আর কাউকে কিছু জানাবে না। আর আমার সিদ্ধান্তটাও স্পষ্ট জানিয়ে দেবে। আশাকরি অমত করবে না। আর বলে দেবে, আমার ছেলে দু’টা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। তার মেয়েকে অসুখী রাখবে না এটা হলফ করে বলে দিতে পারি। যাও, সবকিছু গুছিয়ে মেয়েটাকে নিয়ে আসো। আর বৌমাকে বোলো, এটা ওর শ্বশুরবাড়ি নয়, এটা ওর নিজের নতুন বাড়ি।আম্মু কয়েকটি উষ্ণ ফোঁটা বিসর্জন দিয়ে স্বামীর আদেশকে শীরোধার্য মেনে নিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লেন। গাড়ি চলতে শুরু করল…এরপর সেখানে পৌঁছে আপনার আব্বু-আম্মুকে বিস্তারিত বলার পর তাদের পায়ের তলা থেকেও যখন মাটি সরে যাচ্ছিল ঠিক তখনই আম্মু আমাকে সামনে এনে তাদের পা মাটিতে স্থির করে দিলেন। মিশ্র অনুভূতির চাপ তারা সাময়িক সইতে না পেরে উদ্ভ্রান্ত হয়ে পড়েন। আপনার আম্মু তো রীতিমতো অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিছুক্ষণ পর আপনার আব্বু সবকিছু মেনে নিয়ে, আনুষ্ঠানিকতা সেরে আমাদেরকে বিদায় দিলেন।আর হ্যাঁ! একটা মানুষের কথা বলা হয়নি। সে হলো আমাদের মিয়া ভাই। সবাই তাকে মিয়া ভাই বলে ডাকে। ভাইয়ার পাগড়িটি আমার মাথায় পরিয়ে দেওয়ার পরামর্শটি সে-ই আমার আব্বুকে দিয়েছে। আব্বু প্রথমে মানতে চায়নি। পরে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আব্বুকে রাজি করিয়ে চুপচাপ তিনি গাড়িতে উঠে বসে যান। এবার ভাবছি, কিছুদিনের মধ্যেই আপনি আর আমি মিলে মিয়া ভাইয়ের জন্য একটা দফারফা করব। কী! পাত্রী খোঁজায় আপনাকে পাশে পাব তো?কান্নার কারণে মেয়েটির শ্বাস বন্ধ হবার যোগাড়! মাথা তুলছে না। ফাহিম মাথায় হাত রেখে বলল, ‘প্লিজ, একটু রিল্যাক্স হোন। সব ঠিক হয়ে যাবে।’

পৃষ্ঠা-৬৪

কিছুক্ষণ পর সারা মাথা তুলল। এরপর ফাহিম আবার জিজেস করল, ‘মিয়া ভাইয়ের ব্যাপারে কিছু বললেন না যে?।’ সারা চোখ-মুখ মুছে নিয়ে অস্ফুটে বলল, ‘জি অবশ্যই। তার প্রতি যে আমরা ঋণী।’দীর্ঘক্ষণ পর ফাহিম একটু তৃপ্তির শ্বাস নিল। এরপর সারা বলল, ‘আচ্ছা আপনার ভাইয়ার কোনো ছবি আছে আপনার কাছে? একটু দেখতে দেবেন? জাস্ট একটু! একবার।’ফাহিম পকেট থেকে ফোন বের করে বরযাত্রী রওয়ানা হবার আগে তোলা ছবিটি বের করে দিল। ফোনটা হাতে নিয়ে ছবিটির দিকে উদ্ভ্রান্তের মতো কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল সারা।কিছুক্ষণ পর ঝাপসা চোখে আর কিছু দেখতে না পেয়ে ফোনটা রেখে ফাহিমকে বলল, আপনার হাতটি একটু টুই?ফাহিম নিশ্চুপ হয়ে অপলক তাকিয়ে রইল সারার দিকে। ফাহিমের নিরবতা সারাকে অনুমতি দিলে ফাহিমের ডান হাতটি নিয়ে তাতে একটি চুমু খেয়ে বুকের সাথে জড়িয়ে নিয়ে হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দিল মেয়েটি। আষাঢ়ের মেঘের গর্জন সবাই শুনেছে। কিন্তু নববধূর এমন মিশ্র অনুভূতির বিরল কান্না সেদিন ফাহিম ছাড়া আর কেউ দেখেনি। ফাহিম যেন অসাড় হয়ে গেল। জবান আড়ষ্ট হয়ে গেল। নিরব চোখের পানি ছাড়া ওর আর কোনো প্রত্যুত্তর নেই।

বেশ কিছুক্ষণ পর মাথা তুলে সারা বলল, ‘আজ কেন যেন মনে হচ্ছে, আমি একেবারে নিঃস্ব। আবার এ-ও মনে হচ্ছে, আমার জীবন ধন্য। এমন বিভ্রম হচ্ছে কেন?’ফাহিম নির্বাক। সারা ফের বলে উঠল, ‘আচ্ছা আমি যদি আজ রাতটির জন্য আপনার হাতটি আর না ছাড়ি তাতে কি আপনার কষ্ট হবে?’ফাহিম অপর হাতটি সারার মাথায় রেখে স্থির কণ্ঠে বলল, ‘বরং ছেড়ে দিলেই কষ্ট হবে।’

পৃষ্ঠা-৬৫

সরস চিঠি

এক

গোধূলি পেরিয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। আশপাশের দালানগুলোতে আলো জ্বলতে শুরু করেছে। সেই আলোর প্রতিবিম্ব পুকুরের স্বচ্ছ পানিতে নেচে বেড়াচ্ছে। থেকে- থেকে মৃদু দুলছে। এভাবে অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়েছে। হঠাৎ পেছন থেকে টুব করে কে যেন ঢিল ছুড়ল। আলোগুলো ঝপাৎ করে কেঁপে উঠল।’এই কে রে!’ হন্তদন্ত হয়ে বলে উঠল হাসান। তাকিয়ে দেখে- আদিব খিলখিল করে হাসছে।’কী রে! এই অসময়ে তুই এখানে?’ কিছুটা বিস্ময় হাসানের কণ্ঠে।আদিব বলল, ‘তোকে বাসায় না পেয়েই এখানে আসা।”ও আচ্ছা! তো আমি এখানে বুঝলি কী করে?”তোর বাসায় গিয়েছিলাম। দরজা নক দিলে ভাবি দরজা না খুলেই বলে দিল- আপনার ভাই বাসায় নেই। পুকুরপাড় গিয়ে দেখুন। তাই চলে আসলাম। ব্যাপার কী হাসান? কিছু হয়েছে?”না তেমন কিছু না। আচ্ছা বস এখানে।’ এই বলে একটু সরে বসে আদিবকে বসতে দিল। আদিব এগিয়ে এসে বসে পড়ল। এরপর ফিসফিস করে বলল, ‘ঝগড়া হয়েছে?’হাসান মাথা নাড়ল- ‘হুম।”স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ঝগড়া টুকটাক হতেই পারে। কিন্তু তাই বলে তুই তো রাগ করে বাইরে চলে আসার ছেলে না! সিরিয়াস কিছু হয়নি তো?’ আদিবের উৎকণ্ঠা মনের পূর্ণ মনোযোগ হাসানের প্রতি।হাসান অস্ফুটে বলল, ‘আর পারছি না রে আদিব। বড় ভুল করে ফেলেছি।’

পৃষ্ঠা-৬৬

‘মানে? কী ভুল?’ আদিবের বিস্মিত জিজ্ঞাসা।’অনেক বড় ভুল।”ধুর ব্যাটা। বুঝিয়ে বল কী হয়েছে।”ম্যাচ হচ্ছে না। কোনোকিছুতেই ম্যাচ হচ্ছে না। একদম সহ্য হচ্ছে না। কিছু ভালো লাগছে না।”যেমন? একটু খুলে বলবি?”আর শুনে কী হবে? আমি ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি।”হোয়াট! ডিভোর্স?!”হ্যাঁ, পুরো পাঁচটা বছর দেখেছি। আর পারছি না।”কিন্তু কী এমন হলো যে এমনকিছুই ভাবতে হলো?’হাসান চুপসে আছে। পুকুরে পিটপিট করে জ্বলতে থাকা দালান দেখছে। সেই দালানের গাঁ বেয়ে ঊর্ধ্বাকাশে দৃষ্টি ফিরিয়ে আদিব বলল, ‘বুঝেছি, আবহাওয়া বেশ উত্তপ্ত। একপশলা ঝুম বৃষ্টির প্রয়োজন…।হাসান এখনো কিছু বলছে না। আদিব পুনরায় বলল, ‘এই শোন, আজ বাসায় যা। আর কাল বিকেলে তোর ভাবিকে নিয়ে তোর বাসায় বেড়াতে আসব। তোর বাসায় আসি না অনেকদিন হলো। তবে সেই কিপ্টামোপনা ছেড়েছিস তো নাকি?’হাসান ফিক করে হেসে ফেলল। বলল, ‘তা জানি না, তবে বাসায় আসলে দু’জন দু’কাপ চা ছাড়া যে আর কিছু পাবি না, এটা নিশ্চিত।”ধুর শালা। আর মানুষ হলি না।’ আদিব এই বলতেই হাসান হেসে ফেলল। আদিবও হেসে বলল, ‘আচ্ছা আমরা যা নিয়ে আসব তা-ই একটু বেরে-টেরে দিস। নাকি তা-ও লুকিয়ে রাখবি? একা একাই খাবি? আর আমাদের শুধু চা খাইয়েই বিদায় করবি? কোনটা?’হাসান আদিবের পেটের চামড়ায় সজোরে চিমটি দিয়ে চেপে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘তোর মতো ভাবিস নাকি হ্যাঁ? আগে তো আয়। এরপর দেখ, শুধু চা খাইয়েই বিদায় করি, নাকি চা বানিয়ে তোর মাথায় ঢালি।’

পৃষ্ঠা-৬৭

‘তাহ! আসছে! কালই দেখা যাবে। কে কার মাথায় চালে। আচ্ছা ওঠ এখন। আর রাগ করিস না। বাসায় দিয়ে খাওয়া-দাওয়া সেরে আরাম কর। ওঠ।’ এই বলে আদিব উঠে দাঁড়াল। হাসানও মাটিতে ভর করে উঠে দাড়িয়ে হাত দিয়ে জামার পেছনটা ঝেড়ে নিল।হাসান সোজা বাসায় চলে গেল। আদিবের বাসা একটু দূরে। ১৫-২০ মিনিট হাটতে হবে। পুকুরপাড় থেকে বেরিয়ে রাস্তায় উঠতেই ফোনটা হাতে নিয়ে কাউকে। কল দিল। ওপাশ থেকে রিসিভ করতেই আদিব বলল, ‘আসসালামু আসসালাইকুম, কে বলছেন?’ উত্তর এলো- ‘ওয়া আলাইকুমুসসালাম। ও আচ্ছা! আমি কে বলছি?”জি, পরিচয়টা বলুন প্লিজ।”আপনি ফোন করলেন আবার আপনিই পরিচয় চাচ্ছেন? আপনি কার কাছে ফোন করেছেন?”আমি এই ফোনের মালিকের কাছে ফোন করেছি। আপনি কে? এই ফোন আপনি কোথায় পেলেন?”ঐ মিয়া ঐ! পেয়েছেনটা কী হু! মেয়েদের কন্ঠ পেলে আর হুশ থাকে না?”এই যে ম্যাডাম শুনুন! বাজে বকবেন না! একদম বাজে বকবেন না বলে দিচ্ছি! আপনিও তো কম না! সোজাসাপ্টা বলে দিলেই তো হয় আপনি কে? আর এই ফোনের মালিক কোথায়? আমাদের মতো ইন্নোসেন্ট ছেলেদের আকর্ষণীয় ভয়েস শুনে শুধুশুধুই কথা বাড়াচ্ছেন। ভালো হয়ে যান।’টুট টুট টুট…ফোনটা কেটে গেল। আদিব রিডায়াল করে এখন বন্ধ পাচ্ছে। যা হোক, এশার নামাযের সময় হয়ে গেছে। পাশেই মসজিদ। নামায সেরে মসজিদ থেকে বের হয়ে হাঁটতে-হাঁটতে বাসার গেইটে এসে গেছে আদিব।’আসসালামু আলাইকুম! স্নেহা! এই স্নেহা!’ আদিব এই বলে দরজা নক করছে। কিন্তু কোনো সাড়া নেই। একবার, দুইবার এভাবে তিনবার ডাকার পর মাহির এসে দরজা খুলে দিল।’আ……!’ এই বলে ঝপাৎ করে আদিবের কোলে উঠে গেল। আদিব ওকে জড়িয়ে নিয়ে সোজা ঘরে ঢুকে স্নেহার পাশে গিয়ে বসল।

পৃষ্ঠা-৬৮

‘আব্বু তুমি একটু বারান্দায় খেলতে যাও তো।’ এই বলে মাহিরকে বারান্দায়। পাঠিয়ে স্নেহাকে আদিব বলল, ‘কী ব্যাপার! আজ দরজা তুমি না খুলে মাহিরকে পাঠালে যে? তুমি জানো না। ঘরে এসে সাথে সাথেই তোমাকে না দেখলে আমার কষ্ট হয়? তোমার হাতের একগ্লাস শরবত না খেলে রাতটাই আমার মাটি হয়? কী? কী হয়েছে হুম?’স্নেহা অস্ফুটে বলল, ‘আমি ভালো হতে চেষ্টা করছি। তোমার মতো ইন্নোসেন্ট ছেলের সাথে কথা বলতে আমার বয়েই গেছে!”ওহ হো! সেই মোবাইল চোর মেয়েটা তাহলে তুমিই?”কী…!’ এই বলেই আদিবকে কিল উঠাল স্নেহা। আদিব তো হাসতে হাসতে লুটোপুটি খেয়ে দৌড়!

‘অ্যাই! যাচ্ছ কোথায়! আমার পরিচয় নেবে না? কে আমি? ফোনের মালিকের সাথেও তো কথা বলা হলো না! আসো আসো। মালিকের সাথে কথা বলো!’ এই বলে স্নেহাও আদিবের দিকে এগিয়ে গেল। স্নেহা কাছে আসতেই সিরিয়াস মুড নিয়ে আদিব বলল, ‘এই এই দাঁড়াও!’ স্নেহা কিছু না বুঝেই থেমে গেল।’কী?”আমারদিকে তাকাও।”হুম, তাকালাম। কী?’অমনি আদিব কষে একবার চোখ মেরে দিল!স্নেহা কিছুক্ষণ ভ্রু-কুঁচকে তাকিয়ে রইল আদিবের দিকে। এরপর ফিক করে হেসে দিয়ে বলল, ‘তুমি ভালোহবে কবে শুনি?’আদিব স্নেহার বাজুতে শক্ত করে ধরে বলল, ‘কোনোদিন না। কোনোদিন না! কোনোদিন না!’স্নেহা অস্ফুটে বলল, ‘যেদিন থেকে তুমি ভালো হয়ে যাবে, ঠিক সেদিন থেকেই আমি মরে যাব। অন্তত আমাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য হলেও তুমি আজীবন এমনই থেকো। কোনোদিন ভালো হবার দরকার নেই। কোনোদিন না। কোনোদিন না।’স্নেহার চোখ ছলছল করে উঠল। গাল বেয়ে টুপ করে দু’ফোটা ভালোবাসা গড়িয়ে পড়ল। মনের গহীনে প্রেমের সরোবর যেন উথলে উঠল। হ্যাঁ, এটাই

পৃষ্ঠা-৬৯

ভালোবাসা। ভালোবাসা শুধু জড়িয়ে ধরার নাম না। কখনও কখনও কাজল ধোয়া চোখের পানিও ভালোবাসা হয়। একদম নিখাঁদ ভালোবাসা।আদিব স্নেহার চোখদুটো আলতো করে মুছে দিয়ে বলল, ‘তুমিও এমন পাগলীটিই থাকবে। কোনদিন এরচেয়ে বেশি ভালো হবে না! একদম না।’এরমধ্যেই বারান্দা থেকে মাহির চলে এসে- ‘আা……। আজ না দাদু ফোন করেছিল! কালই চলে আসবে। আমি না অনেএএএক্ষণ কথা বলেছি…!মাহিরের আকস্মিক এমন হাঁক ছাড়ায় স্নেহা চমকে উঠেছে। তারচেয়ে বেশি লজ্জা পেয়েছে। আদিব চট করে স্নেহার বাজু ছেড়ে দিল। ভাবছে, ধরে থাকা অবস্থায় মাহির আবার দেখে ফেলল কি না! দেখলে কী লজ্জা!আদিব হেসে দিয়ে মাহিরকে কোলে তুলে নিয়ে বলল, ‘আব্বু, দাদু আর কী বলল?’আধো বুলিতে মাহির বলল, ‘দাদু বলেছে- তুমি যদি আম্মুকে বকা দাও তাহলে আমি যেন তোমাকে বোপ করে দিই। বো…প! এভাব…!”ওরে বাবা! তাই! তাহলে তো তোমার আম্মুকে আ…র বকা দেওয়া যাবে না। চলো, এবার খেতে যাই।’খাওয়া-দাওয়া সেরে ফ্রেস হয়ে একটুপর সবাই শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাহির ঘুমিয়ে গেল। স্নেহারও বুঝি চোখ লেগে আসল। কিন্তু হঠাৎ কপালে সুড়সুড়ি পেয়ে চোখ মেলে দেখে- আদিব!’কী ব্যাপার হুম? ওপাশ থেকে ছেলেকে ডিঙিয়ে এপাশে কী?’ ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল স্নেহা।আদিব অস্ফুটে বলল, ‘এপাশেই তো আমার সব! আমার দিনের ব্যস্ততা আর রাতের নির্জনতা সবটা ঘিরেই তো তুমি। শুধুই তুমি।’ এই বলে বলে আলতো করে স্নেহার কপাল ছুয়ে দিচ্ছে আদিব।নিশ্চুপ স্নেহা আদিবের চোখের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে।’কী দেখছো?’ আদিবের ক্ষীণ প্রশ্ন।স্নেহা বলল, ‘আমাকে।”আমাকে মানে?’

পৃষ্ঠা-৭০

*কেন। চোখাচোখির বর্ণহীন ভাষা গড়ীয়তা পেলে একের চোখে অন্যকে দেখা যায়। জানো না?!’আদিব লজ্জা পেয়ে গেল। চোখ নামিয়ে স্নেহার গাল টেনে দিয়ে বলল, ‘তো নিজেকে কেমন দেখলে শুনি?!”নিজেকে দেখলাম- বেশ বুড়ি হয়ে গেছি।”ঐ! বুড়ি মানে?”এক বাচ্চার মা, বুড়ি না তো কী! চেহারার আগের সেই চমক কি আর আছে!”বলে কী! আমি তো মাঝে মাঝে খটকা খেয়ে যাই। মানুষ দিন গেলে ফ্যাকাসে হয়ে যায়, আর তুমি দিনদিন যুবতী হয়ে উঠছো। দেখলে না। ওপাশ থেকে কীভাবে এপাশে চলে এলাম!’স্নেহা হাত দিয়ে মুখ ঢেকে নিল। হেসে ফেলল। আদিবও স্নেহাকে আলতো করে বুকে টেনে নিল।একটু পর আদিব বলল, ‘এই শোনো!”হুম, বলো!”হাসানের অবস্থা খুব একটা ভালো না।”কেন কী হয়েছে?”ও ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’স্নেহা হতচকিত হয়ে বলল, ‘মানে!”হুম, আজ হাসানের সাথে কথা হয়েছে। যেটুকু বুঝলাম, বিশেষ কোনো সমস্যা না, সামান্য মনোমালিন্য ও কিছু ভুল বুঝাবুঝি আছে দু’জনের মাঝে।”মাইশা তো এমন মেয়ে না! যথেষ্ট বুদ্ধিমতী মেয়ে ও! ও আর আমি একসাথেই বড় হয়েছি। গলায়-গলায় মিল ছিল আমাদের। আমি অল্পতেই রেগে গেলে ও আমাকে কতশত বুঝিয়ে থামিয়ে রাখতো, বুঝাতো। ওর সাথে তো এমন হওয়ার কথা না! আমি কালই ওর বাসায় যাব।”তা আর বলতে হবে না। তোমার আগেই আমি হাসানের কাছ থেকে ইনভাইটেশন কনফার্ম করে এসেছি।’

পৃষ্ঠা-৭১

‘আচ্ছা তাহলে তো আরও ভালো হলো।”জি, এবার চোখটা বন্ধ করুন, তাহলে আরও অনে…ক ভালো হবে।”ঐ দুষ্টু! কী ভালো হবে হুম?”বলা যাবে না। আগে চোখ বন্ধ…!”আচ্ছা! এই যে বন্ধ…!’

দুই

‘চাচা, ফুটটা উঠিয়ে দিন তো। খুব রোদ লাগছে।’রিক্সাওয়ালাকে উদ্দেশ্য করে বলল আদিব। চাচা রিক্সা থামিয়ে ফুট উঠিয়ে দিয়ে পুনরায় চলতে শুরু করল। মাহির আদিবের কোলে বসা। কিছু ফাস্টফুড আইটেম নিয়েছে হাসানের বাসায় নেওয়ার জন্য। ওটা স্নেহার হাতে।স্নেহা বলল, ‘এই বিকেলে হাসান ভাইয়াকে বাসায় পাব তো?”হুম থাকবে। কথা হয়েছে।’ আদিব এই বলতেই রিক্সার এক ঝাঁকুনিতে স্নেহার সাথে আলতো করে ধাক্কা খেল। অমনি মাহির বলে উঠল, ‘এই আব্বু। তুমি আম্মুর সাথে ছোঁয়া দিলে কেন? জানো না মেয়েদেরকে ছুঁতে হয় না? ভালো ছেলেরা মেয়েদেরকে ছোঁয় না। আমি দাদুকে বলে দেব আব্বু পঁচা হয়ে গেছে। আজ আম্মুকে ছুয়ে দিয়েছে, হুম।’রিক্সাওয়ালা চালা খিলখিলিয়ে হেসে ফেলল। আদিবের জিহ্বায় কামড়! স্নেহা চোখ নামিয়ে চুপ করে আছে। ‘এই ছেলেটাকে নিয়ে আর পারা গেল না। দাদু একবার যেটা বলেছে সেটা নিয়েই, যখন-তখন…! আল্লাহ…!’ বিড়বিড় করে বলল আদিব।আদিবের কথা শুনে স্নেহাও খিটখিটিয়ে হেসে উঠল। আড়চোখে আদিবকে দেখতে লাগল। আদিবের ‘বে-চারা’ ভাব মাখানো চেহারাটা দেখে মজা নিতে লাগল। অমনি আরেক ঝাঁকুনি। এ’এহ্ঝাঁকুনিতে স্নেহার মাথা ফুটের সাথে বারি খেলে ‘উফ’ করে উঠল।

পৃষ্ঠা-৭২

‘ইয়া আল্লাহ! ব্যথা পেলে? দেখি দেখি।’ এই বলে আদিব মাথায় হাত দিয়েদেখতে গেলে অমনি মাহির বলে উঠল, ‘উঁহু আব্বু, আমি দিখি। তুমি এই সুযোগে আম্মুকে ছুয়ে ফেলবে। পঁচা হয়ে যাবে। আমি আমি! দিখি আম্মু দিখি…!”স্নেহা মাথা ডলতে ডলতে এবারও হেসে ফেলল। ‘কিছু হয়নি না আব্বু, সেরে গেছে সাথে সাথেই।’ওদের কথাবার্তা শুনে রিক্সাওয়ালা চাচা এখনও হাসছে। আদিব বলল, ‘চাচা আপনি হাসছেন? আমি পড়েছি মহা বিপদে। কেন যে আমার আম্মু ওর সামনে এগুলো বলে আর শেখায়…!”পোলাডার নাম কী বাজান?”ওর নাম মাহির, চাচা।”ম্যালা সুন্দর নাম। অনেক বড় হোক আপনের পোলাডা। দোয়া করি।দেখতে দেখতেই হাসানের বাসার কাছে এসে গেছে। ‘চাচা নামিয়ে দিন আমাদের।’ আদিব এই বলে পকেট থেকে টাকা বের করছে। স্নেহার কোল থেকে মাহির টুপ করে একটা লাফ দিয়ে নেমে গেল। স্নেহাও নামল। চাচার ভাড়া দিয়ে আদিব ফোন বের করে হাসানকে কল দিল।হাসান রিসিভ করতেই আদিব কন্ঠ পরিবর্তন করে বলল, ‘হ্যালো হাসান সাহেব বলছেন?”জি বলছি। কে বলছেন আপনি?”আমি ডিবি অফিস থেকে এসেছি। আপনার সাথে একটু জরুরি দেখা করতে চাই। একটু বাইরে আসুন প্লিজ।’অমনি পেছন থেকে একটি কাগজের গোল্লা ছুড়ে মেরে হাসান বলল, ‘জি স্যার আমি বাইরেই আছি। তো ডিবি অফিস থেকে আসলে বিবি সাথে কেন?’আদিব জিহ্বায় কামড় দিয়ে হেসে ফেলল। এরপর বলল, ‘উনি হলেন মহিলা ডিবি। আপনার স্ত্রীও অপরাধী। তাই তাকে আনা।”শালা তাহলে বাচ্চা এনেছিস কেন?”ব্যাটা বাচ্চার কারণেই আজ বেঁচে গেলি। নইলে তোকে…!'”‘নইলে কী?’

পৃষ্ঠা-৭৩

‘বলব না। বাচ্চা শিখে ফেলবে। এখন গেইট খোল এসে।’হাসান খিটখিটিয়ে হাসতে হাসতে কাছে এসে সালাম দিল। ‘আসসালামু আসসালামু ভাবি, কেমন আছেন?’স্নেহা হাসিমুখে উত্তর দিল, ‘ওয়া আলাইকুমুসসালাম, জি ভাইয়া, আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। আপনি ভালো আছেন?”‘এই তো আছি, আলহামদুলিল্লাহ।”তো আসুন ভেতরে আসুন।’ এই বলে গেইট খুলে ভেতরে গিয়ে রুমের দরজা খুলতে লাগল। নীচতলায়ই থাকে ওরা। হাসান দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই আদিব বলল, ‘কী রে! শুধু ভাবিকেই ভেতরে ঢুকতে বললি। আমাকে বলবি না?”কান টানলে মাথা আসে। মাথা আলাদা করে টানতে হয় না। হা হা হা…!!স্নেহা একটু চিন্তায় পড়ে গেল। আমাকে কিছু বলল না তো? আদিবও স্নেহার দিকে তাকিয়ে ভাবছে, শালা বউয়ের সামনেও বাঁশ দিতে ছাড়ল না। এক মাঘে যে জীবন যায় না, এটা ওর বোঝা উচিত ছিল। যা হোক, ‘আসো আব্বু, ভেতরে আসো।’ এই বলে মাহিরকে হাত ধরে ভেতরে নিয়ে গেল আদিব।হাসান ওদেরকে ড্রয়িংরুমে বসতে দিয়ে মাইশার রুমে চলে গেল।বেলকনিতে গ্রিল ধরে দাড়িয়ে আছে মাইশা। হাসান পেছন থেকে এসে বলল, ‘মাইশা, তোমার বান্ধবী স্নেহা আর ওর হাজবেন্ড এসেছে।হাল্কা চা-নাস্তা করে দাও।’হাসানের কথা শুনে মাইশা ঘুরে দাঁড়াল। বলল, ‘সাথে ওদের পিচ্চিটা এসেছে?”হুম, মাহিরও এসেছে।”আচ্ছা, আমি চা-নাস্তা রেডি করছি। তুমি স্নেহাকে আমার রুমে আসতে বলো। মাহিরকে নিয়ে ভাইয়া আর তুমি গেস্টরুমেই বসো।”আচ্ছা ঠিক আছে।’হাসান গিয়ে বলল, ‘ভাবি, আপনি ভেতরে ওর রুমে চলে যান। আমরা এখানে বসি।”আচ্ছা ভাইয়া, সেটাই ভালো হবে। মাহির আসো আব্বু।’

পৃষ্ঠা-৭৪

‘ভাবি, মাহির আমাদের সাথে থাকুক।”আচ্ছা ঠিক আছে।’ এই বলে স্নেহা ভেতরে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর চা-নাস্তা হয়ে গেলে মাইশা হাসানকে ডেকে বলল, ‘এই শুনছো! নাস্তাটা নিয়ে যাও!’হাসান এসে নাস্তা নিয়ে গেল। আদিব আর হাসান ওদের চা পর্ব শুরু করে। দিল। মাহিরের জন্য আদিবকে বেশ ভদ্রতা দেখাতে হচ্ছে আজ। দেখা যাক, সুযোগটা হাসান কীভাবে কাজে লাগায়।

তিন

স্নেহা ভেতরে আসল। মাইশার রুমে ঢুকে বোরকা খুলতেই মাইশা হুড়মুড়িয়ে ওর কাছে এসে ওকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল।’সে কী! কী হয়েছে মাইশা? এভাবে কান্না কেন রে? ধুর বোকা। বস তো এখানে। একদম কাঁদবি না। এখনও সেই ছোট্টোটি রয়ে গেলি। কী হয়েছে? খুলে বল সব। আজ তোর সবকিছু শোনব। কিচ্ছু লুকোৰি না আমাকে। বল।’মাইশা কিছুক্ষণ অঝোরে কাঁদল। এরপর ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, ‘স্নেহা জানিস! হাসান আমাকে ডিভোর্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে।’স্নেহা একটু শক্ত হয়ে বলল, ‘সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। দেয়নি তো?’মাইশা একটু থমকে গেল। স্নেহা এমন করে বলল কেন? ওকে কিছু বলতে না দিয়েই স্নেহা পুনরায় বলল, ‘কেন এমন সিদ্ধান্ত নিতে যাবে না বল? আমার তো মনে হয় আরও আগে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত ছিল।”কী বললি তুই? আমার বান্ধবী হয়ে এমন কথা তুই বলতে পারলি?’ স্নেহার অমন কথা শুনে মাইশার চক্ষু তো চড়কগাছ! কী বলল এটা স্নেহা! আরও আগে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত ছিল?স্নেহা ওর জামার একটা কোণা ধরে বলল, ‘এটা কী পরেছিস?”কেন?”বল কী পরেছিস?”তো বাসার মধ্যে আর কী পরব?”কেন আর ভালো জামা নেই? নতুন কাপড় নেই?’

পৃষ্ঠা-৭৫

‘আছে।”তো?”ওগুলো কোথাও বের হলে পরি। এমনিতে বাসায় এগুলোই পরি।”কোথাও বের হলে বোরকা পরিস না?”তা তো অবশ্যই।”তাহলে তখন ভেতরে এসব স্বাভাবিক জামাগুলো পরলেই বা ক্ষতি কী। রেট তো আর দেখবে না! আর বাসায় তো তোর স্বামী দেখবে। এত কষ্ট করে টাকা। কামাই করে সেটা দিয়ে তোর জন্য সুন্দর সুন্দর জামা কিনে দেয় সেটা তুই পরদি সে দেখবে। দু’চোখ ভরে দেখবে। ছেলেদের সুখ এটা। তো আজ এসে তোকে যা পরা দেখলাম, এতে তো আমারই বিতৃষ্ণা তৈরি হচ্ছে। ভাবছি ভাইয়া এতদিন সহা করল কী করে?”তুই কি আমাকে ইনসাল্ট করছিস?’স্নেহা মাইশার হাত ধরে খাটে বসাল। মুখটা ওর দিকে ঘুরিয়ে গালদু’টো টেনে দিয়ে বলল, ‘শোন পাগলী, ছেলেরা সৌন্দর্যের পাগল। বাইরে কতশত সুন্দরী ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় চোখে পড়ে, অনেকসময় প্রয়োজনে কথাও বলতে হয়, তো নফস তখন খুব ওয়াস-ওয়াসা দেয়, ধোকা দেয়, ঐ নারীর প্রতি পুরুষদেরকে আকৃষ্ট করতে চায়। কিন্তু সে ব্যক্তিত্ববান হওয়ায় সেই ফাঁদে পা দেয় না। নিজ স্ত্রীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে না। তো দিনশেষে সে যখন ঘরে ফিরে, তখন তার স্ত্রীকে যদি বাইরে দেখে আসা সুন্দরীদের চেয়ে অধিক সুন্দরী আর পরিপাটি হিসেবে না পায়, তবে ধীরেধীরে সে এই স্ত্রীর প্রতি আকর্ষণ হারাতে থাকে। বাইরের সেই নারীদের প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকে। আর এভাবে চলতে থাকলে বিপথগামী হতে সময় লাগে না। এখানে দোষ কার বলতে পারিস? আসলে দোষ না। এখানে স্ত্রীর অলসতা আর উদাসীনতাই দায়ী।’এটুকু বলতেই স্নেহাকে থামিয়ে দিয়ে মাইশা বলল, ‘শোন, আমি বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই দেখছি, প্রথম কয়েকমাস বেশ ভালোই ছিল। এরপর থেকে কেমন যেন বদলে যেতে থাকে। ঘরের সব কাজকর্ম আমি নিজ হাতে করি। তার মা-বাবা সহ পরিবারের সবার সাথে অত্যন্ত ভালো ব্যবহার করি, যখন যেভাবে বলে সেভাবেই করি, তবুও যত দিন যাচ্ছে আমার প্রতি তার অবহেলা যেন বেড়েই চলছে। কী করব আমি বল? আজকের হাসান আর সেই আগের হাসান নেই। অনেক বদলে গেছে সে। অনেক।’

পৃষ্ঠা-৭৬

‘কিছু শক্ত কথা বলি?’মাইশা কিছু বলছে না।’কী মনে করবি জানি না, তবে বলা উচিত বলে মনে করছি। একটা কথা সবসময় মনে রাখবি, কারও মনের অবস্থা বুঝতে চাইলে সর্বপ্রথম নিজেকে তার স্থানে বসাবি।

এরপর তার মতো করে কিছুক্ষণ ভাববি, তার স্থানে তুই নিজে থাকলে কী করতি। এই প্রশ্নটি নিজেকে সবসময় করা দরকার। এতেকরে অন্যকে বোঝা সহজ হয়। যেমনটা আমি নিজে করি। আমিও তো একটা মেয়ে। আর প্রায় কাছাকাছি সময়েই আমাদের বিয়ে হয়েছে। আমার হাসবেন্ড আর হাসান ভাইয়া দু’জনই খুব রসিক ও ভালো মনের মানুষ। আমি তো বেশ ভালো আছি, আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু তোর ক্ষেত্রে এমন হলো কেন?’মাইশা নিশ্চুপ। স্নেহা বলে যাচ্ছে…’আজ খোলামেলা কিছু কথা তোকে না বললেই নয়। ছোট থেকেই তোকে জানি আমি। তাই ভূমিকা না রেখে যা বলার সরাসরি বলছি।একটা জিনিস মনে রাখবি, দিনশেষে ছেলেরাও কিন্তু মানুষ। আবেগ, অনুভূতি আর অভিমান এদেরও আছে। আছে প্রস্ফুটিত জুই-চামেলির ন্যায় কোমল একটি হৃদয়। আছে নিষ্পাপ শিশুসুলভ ছেলেমানুষি একটি মনও। কিন্তু দায়িত্ব আর বাস্তবতার ভারে সেগুলো চুপসে যায়। ভুলিয়ে দেয় এসবের কথা!এরা মেয়েদের ন্যায় আবেগ, অনুভূতি আর অভিমানের বহিঃপ্রকাশ কেন যেন করতে পারে না। এটা কি এদের ব্যর্থতা? না সত্যিই দায়িত্ব আর বাস্তবতার ভার? ভেবে দেখা উচিত।জানিস! এরা বড় নিষ্ঠুর প্রকৃতির হয়। নিজের জন্যও এরা একটু কাঁদতে পারে না। এটা কি ঠিক? অন্তত নিজের জন্য হলেও কি একটু কাঁদতে পারা উচিৎ নয়? আমার মনে হয় কী জানিস? কাঁদাটা বোধহয় এদের সাথে মানায়ই না।এরা অনেকটা রাবার প্রকৃতির হয়। যত ইচ্ছা টেনে ছেঁড়ে দিবি, মুহূর্তেই আগের জায়গায় ফিরে আসবে।এরা অনেকটা রোবটের ন্যায়। চাহিদার সুইচ অন করলেই পটাপট চাহিদা মিটিয়ে যায়। কি করা? এদের নিয়ন্ত্রণ যে ‘মেয়ে’ নামক এক কোমল কী প্যাডের মাঝে। এদের অস্তিত্বই যেন চাহিদা মিটিয়ে যাওয়ার নিমিত্তে।

পৃষ্ঠা-৭৭

মেয়েদের অভিমানী অভিপ্রায়-এর বিপরীতে এসকল রোবটিক ছেলেদের অভিমানের অধিকার থাকতে নেই। থাকতে নেই মুখ লুকিয়ে নিভৃতে একই অশ্রুসিক্ত হওয়ার অধিকার। সেসবকি এদের মানায় বল? এরা এসব ন্যাকামো করলে কাজ করবে কখন? একটু পরেই যে আবার চাহিদার সুইচ অন হয়ে যাবে। মা-বাবা, ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তান সহ সকল প্রয়োজন মেটাতে সবাই তখন ডাকবে। সেখানে ব্যর্থ হলে কত লাঞ্চিতই না হতে হয়, সেটা আমরা মেয়েরা কি একটু বোঝার চেষ্টা করি?অনেক সময় আমরা নিজেই সেই লাঞ্চনার নায়িকা বনে যাই। আর মা-বাবা? সে তো এক পায়ে! ভাই-বোন কিংবা প্রতিবেশী? সে যেন বাতাসে উড়ে…জানিসই তো, কবি-লেখকদের অনুভূতিশক্তি হয় মারাত্মক ধরণের। তারা জীবনপ্রবাহের নানান ঠুনকো বিষয়কেও শব্দালংকারের যাদুতে জীবন্ত করে তুলতে পারে। কিন্তু এই অভাগা ছেলেদের অব্যক্ত কথন সেই কবি-লেখকদের অনুভূতিকেও ছুঁতে পারে না। এজন্য দেখবি, কবিদের কলম শুধু মেয়েদেরকে ঘিরেই নাচে, ছেলেদেরকে যেন তারা চেনেই না।অভাগা হওয়া ভালো, তাই বলে এতটা? তুই’ই বল, এটা কি ঠিক? এরা যে এতটা অভাগা ও অপয়া হয় আগে বুঝিনি আমি।এদের কাজ শুধু ছাঁয়া দিয়ে যাওয়া। এই রোবটিক জীবনপ্রবাহে ছাঁয়া পাবার অধিকার থাকতে নেই এদের। থাকতে নেই অসুস্থতার বাহানায় বিশ্রাম নেওয়ার অধিকারও।এদের কাজ রক্ত পানি করে চাহিদা মিটিয়ে যাওয়া। কিন্তু রক্তবর্ধক খাবার খাওয়ার সময়টুকুও এদের নেই। সর্বদা খাইখাইপনা এদের জন্য না। কোনরকম ঠেলেঠুলে মুখে কিছু পুরে দিয়ে ঢোক ঢোক করে কয়েকগ্লাস পানি সাপ্লাই দিয়ে দিলেই ব্যাস…রোদে পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া, ধুলোবালিতে নোংড়া হয়ে যাওয়া, হাত-পা টুকটাক কেটেকুটে যাওয়া এসব নিয়ে তেমন মাথা ব্যথা নেই এদের।সৌন্দর্যটা এদের জন্য নাথিং। চামড়ার রঙ দিয়ে এরা কী করবে? এটা কারো প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন যেটার সেটা হলো ‘টাকা’! এটা হলেই হয়, ছেলেদের চামড়া-টামড়া অত ধর্তব্য নাহ। আর মেয়েদের সাদা চামড়া ছাড়া অন্যকিছু গ্রহণযোগ্য নাহ!

পৃষ্ঠা-৭৮

কেননা আজকাল মেয়েদের মান হলো রঙে, আর ছেলেদের মান ধনে। এজন্যই তো কেউ দৃষ্টি দেয় না কারো মনে। বড় আজব দুনিয়া তাই না?ধুলোবালি? ও তো গোসল দিলেই ফিনিশ। আর টুকটাক কেটেকুটে গেলে মুখ থেকে একটু লালা লাগিয়ে দিয়ে কাজে মনোযোগী হওয়াই বেটার।জানিস। এদিকে হাতে প্রচণ্ড কাজ আর কপালে চিন্তার ভাঁজ নিয়ে একটি ছেলে যখন ক্লান্ত বদনে উর্ধ্বাকাশে দৃষ্টি ফেরায়, তখন সে কী ভাবে? কাকে ভাবে? কেন ভাবে? যেহুতু জানিস না, এতদিন জানার চেষ্টাও করিসনি, সেহেতু অজানাই থাকুক। সব বিষয়ই যে জানতে হবে এমন তো কোন কথা নেই…আর ওদিকে কেউ একজন ভাবে, ও আর আগের মতো নেই, আগের সেই কেয়ারিং-শেয়ারিং আর ভালোবাসা এখন শুধুই স্মৃতি।প্রিয়তমা? মা-বাবা? ভাইবোন? এমন ভাবনার বাইরে কেউ-ই আর অবশিষ্ট থাকে না। সকলের এক সুর- ‘ও আর আগের মত নেই।’এই কথাটি যখন কোন ছেলেকে সরাসরি বলা হয় তখন ছেলেটির কেমন লাগে? ওর ভেতরটাতে কেমন অনুভূত হয় তখন? জানা আছে কি?তবে কী জানিস! আমি নিজেও মাঝেমাঝে ভাবি, আচ্ছা! আসলেই কি ছেলেরা কিছুদিন পর আর আগের মত থাকে না? নাকি দায়িত্ব ও বাস্তবতার ভারী বোঝা তাকে আর আগের মতো থাকতে দেয় না? এ’দুয়ের মাঝে কোনটা হতে পারে?তোর মনে কী উত্তর আসে? ওদেরকে নিজের মত করে এভাবে অনুভব করার চেষ্টা কর। দেখবি, কষ্ট হবে না। হুটহাট প্রতিক্রিয়া দেখাবি না। হজমশক্তি বাড়ানোর চেষ্টা কর। যার শারীরিক হজমশক্তি ভালো, সে সুস্থ থাকে। আর যার কথা হজম করার শক্তি ভালো, সে সুখি হতে পারে। বিদ্রোহী মেয়েরা সুখের মুখ দেখতে পারে না। আর অলস মেয়েরা সুখ ধরে রাখতে পারে না।’একমনে স্নেহার কথাগুলো শুনে যাচ্ছিল মাইশা। অবাক চোখে স্নেহার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুই ছেলেদেরকে এতটা ফিল করতে পারিস।”ঠিক তা না। আমি আমার স্বামীকে আমার সর্বোচ্চটা দিয়ে ফিল করার চেষ্টা করি। ওর মন যা চায় সেটাকে বলার আগেই করে ফেলার চেষ্টা করি। আর রবের কাছে অবিরাম দু’আ করি। ব্যস। আল্লাহ আমাকে অনেক সুখে রেখেছেন, আলহামদুলিল্লাহ।’

পৃষ্ঠা-৭৯

‘খুব ঈর্ষা হচ্ছে রে।’দেব চুলটানা! নেকামো রেখে যা বললাম ঠিকঠিক পালন করার চেষ্টা করবি। আর একটা বিষয় হলো, একবার যেটা বলে দ্বিতীয়বার সেটা যেন আর তাকে বলয়ে না হয়। খুব সিরিয়াস থাকবি এই বিষয়টাতে।কারণ, ভালোবাসা হলো পেন্সিল-রাবারের মতো। পেন্সিল ভুল লিখলে রাবার তা মুছে দেয়। কিন্তু একই ভুল পুনঃপুন লিখতে থাকলে শেষমেশ খাতাটিই কিন্তু ছিড়ে যায়।’স্নেহার কথাগুলো মাইশাকে খুব ছুয়ে যাচ্ছে। ভেতরটা তোলপাড় করে ফেলছে। ওর চাহুনি, অঙ্গভঙ্গি এমনটাই বলছে। পরম আকুলতা মাখানো করুণ চাহুনি স্নেহার প্রতি। জমে থাকা রাজ্যের অভিযোগ শুরু করার আগেই যেন যথাযথ প্রেসক্রিপশন দিয়ে দিল। যেমনটা অভিজ্ঞ ডাক্তারদের ক্ষেত্রে হয়। এক আকাশ বিস্ময় নিয়ে মৃদু স্বরে স্নেহাকে জিজ্ঞেস করল, ‘এই স্নেহা! আমার জন্য তুই একটু দু’আ করিস। আমার মন বলছে, তুই দু’আ করলে কিছু একটা হবে। করবি তো?’স্নেহা ওর কপালের চুলগুলো সরিয়ে গালের পাশে আলতো করে দু’হাতে চেপে ধরে বলল, ‘কেন করব না হুম? তবে তার চেয়ে বেশি কাজ হবে তুই নিজে দু’আ করলে। আচ্ছা বল তো, নিজের জন্য, নিজের স্বামীর জন্য মনভরে দু’আ করেছিস কখনও?’স্নেহার প্রশ্ন শুনে মাইশা ক্ষানিকটা বিব্রত হলো। কী উত্তর দেবে স্নেহাকে? দু’আ তো দূরে থাক, নামাযটাই ইদানীং নিয়মিত আদায় হচ্ছে না। কিন্তু এসব স্নেহাকে বলা যাবে না। যেই আমি কি না স্নেহাকে নামাজের জন্য কতশত বলে বুঝাতাম, আজ সেই আমিই… ছিঃ ছিঃ।।মাইশা এভাবে কিছুক্ষণ নিজেকে প্রবোধ দেওয়ার পর সম্বিত ফিরে পেয়ে বলল, ‘আচ্ছা স্নেহা, তুই তোর স্বামীর জন্য কী কী দু’আ করিস?”সেটা একান্ত আমার পার্সোনাল বিষয়। তুই তোর স্বামীকে যেমন দেখতে চাস তোর রবের কাছে তেমন দু’আ করবি। তুই তোর সংসারকে যেভাবে সাজাতে চাস, তোর রবের কাছে সেভাবে চাইবি।’মাইশা ভাবনার জগতে কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে গেল। সে তার স্বামীকে কেমনদেখতে চায়?

পৃষ্ঠা-৮০

ওর ভাবনায় ছেদ ফেলে স্নেহা বলল, ‘পাশাপাশি নিজেকেও এমনভাবে গড়তে হবে, যেভাবে তোর স্বামী চায়। সেটাও রবের কাছ থেকে চেয়ে নিতে হবে। প্রয়োজনে স্বামীর কাছ থেকেও সাহায্য নেয়া যেতে পারে।তবে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্মরণ হলো, তোরা এখনও সন্তান নেওয়ার কোনো প্লান করিসনি কেন?’মাইশা নিশ্চুপ। ক্ষানিকটা লজ্জা পেয়ে গেল। কিছু বলতে পারল না। স্নেহা আবার প্রশ্ন করল, ‘কারও শারীরিক কোনো সমস্যা?’মাইশা মাথা দুলাল, ‘উঁহুম, সমস্যা নেই।”তো!’ স্নেহা কিছুটা রেগে গেল।

‘কারো কোনো সমস্যা নেই তবুও পাঁচটি বছর চলে গেল সন্তান নেওয়ার কোনো প্লান করিসনি কেন? আমি তো একদম শুরুতেই তোর ভাইয়াকে জানিয়ে দিয়েছি, আমরা সন্তান নিতে দেরি করব না। উনিও আর নিষেধ করলেন না। তাই প্রথম থেকেই আমরা কোনো ফ্যামিলি প্ল্যানিং-এর মধ্যে যাইনি। আলহামদুলিল্লাহ এখন আমাদের সন্তানের বয়স প্রায় চার বছর। বিশ্বাস করবি কি না জানি না, সন্তান নেওয়া পর থেকে আমাদের ভালোবাসা দিনদিন আকাশচুম্বী হয়েছে। মাঝেমাঝে যদিও টুকটাক মান-অভিমানের বালাই হানা দিয়েছিল, কিন্তু সন্তানের মুখটা দেখলে সেসবকিছু হাওয়া হয়ে গেছে। এই সন্তানটা আমাদের জন্য অনেকটা অঘোষিত বিচারক হিসেবে কাজ করেছে। এখনও করছে। আমাদের দুজনের মধ্যে দোষ যে-ই করুক, সন্তানের মুখের দিকে চোখ পড়লে অকপটে দোষটা নিজের ঘাড়ে নিয়ে নিই। ব্যস, ওর সেই নিষ্পাপ চেহারাই আমাদের মাঝে মিমাংসার রায় দিয়ে দেয়। প্রতিটা মেয়েরই এমনটা করা উচিত। বিয়ের পর যত দ্রুত সম্ভব সন্তান নিয়ে নেওয়া উচিত। এতে করে সংসারের ভিত মজবুত হয়। অন্যথায় সংসারটি দোদুল্যমান থাকে। সামান্য বাকবিতণ্ডায় ডিভোর্স লেটার চোখে ভাসে। শুরুতে বেবি না নিয়ে বড় ভুল করে ফেলেছিস।’স্নেহার কথা শুনে মাইশা কী বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘আসলে প্রথমে কিছুদিন একটু রিল্যাক্স থাকতে চেয়েছিলাম। শুরুতে তোর ভাইয়া বলেছিল, আমরা সন্তান নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিই। কিন্তু আমি ভাবলাম, শুরুতেই বেবি নিলে জীবনটা কেমন একপেশে হয়ে যাবে। তাই কিছুদিন একটু রিল্যাক্স থেকে জীবনকে ইনজয় করি। ফ্রেস থাকি। এরপর সময় করে না হয়…।’

পৃষ্ঠা ৮১ থেকে  ১০০

পৃষ্ঠা-৮১

‘থাক। এখন তাহলে ডিভোর্স লেটার হতে নিয়ে চিরদিনের জন্য রিল্যাক্স হয়ে যা’। ইনজয় কর জীবনকে। আমি গেলাম।’এই বলেই স্নেহ্য উঠে দাড়িয়ে গেল। ‘এই এই রাগ করিস না, প্লিজ। ভুল করে ফেলেছি। এখন কিছু একটা কর। আর নইলে আমাকে গলা টিপে মেরে ফেল। এরপর চলে যা। ভয় নেই, নিজেকে দায়ি করে চিরকুট লিখে যাব।’রাগে গা জ্বলছিল স্নেহার। কিন্তু মাইশার অভিমানী কথা শুনে মন ভিজে গেল। বসে পড়ে বলল, ‘শোন পাগলী, তোর সাথে আমি রাগ করে থাকতে পারি? অনেক দু’আ করি তোর জন্য। কিন্তু আমি দেখছি তোর নিজের কিছু ভুলের কারণেই আছ। তোর এই দশা।”এখন কী করতে পারি আমি? আমাকে স্পষ্ট করে কিছু বল।’মাইশার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাল স্নেহা। বলল, ‘তো এতক্ষণ যা বলেছি তা কি অস্পষ্ট করে বললাম?”মাইশা কিছুটা লজ্জা পেল।’বুঝেছি, টেনশনে কিছু কানে ঢুকেনি। জানতাম ঘণ্টাখানেক বকবক করার পর বলবি, কী যেন বললি! যেমনটা সেই প্রাইমারি থেকে করে আসছিস। আজও সেই অভ্যাস গেল না। এজন্য আমিও একটি চিঠি নিয়ে এসেছি।”বাব্বাহ! চিঠি! কী চিঠি দেখি! কার চিঠি?”এটা বিয়ের কয়েকদিন পর প্রথম যখন আমাদের বাড়ি বেড়াতে গেলাম তখন আমার বড় ভাবি আমাকে দিয়েছিল। চিঠিটা ভাবির বিয়ের সময় তাকেও কেউ একজন দিয়েছিল। ভাবি আমাকে খুব আদর করে। যেকোনো সমস্যা আমি নির্দ্বিধায় ভাবিকে বলতে পারি। তো তিনিই আমাকে শেষমেশ কানেকানে বলে দিয়েছিল, দ্রুত যেন সন্তান নেওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়ে নিই। আমি খুব লজ্জা পেয়েছিলাম তখন। তবে তার কথাটি খুব ভালোভাবে মনে গেঁথে নিয়েছিলাম। মূলত ভাবির সেই পরামর্শটিই আমার জীবনে সুখ এনে দিল। বাকিটা আমার দু’আ, চেষ্টা আর তোর ভাইয়ার আন্তরিকতা। সর্বপরি রবের এহসান। সুখের প্রকৃত মালিক তো তিনিই। তাকে অসন্তুষ্ট করে কখনও কেউ সুখি হতে পারে না। অথচ এই সহজ সমীকরণটিই আমরা বুঝি না।”হাজার সালাম তোর বড় ভাবিকে।’

পৃষ্ঠা-৮২

‘শুধু হাজার সালামে কাজ হবে না। নিজেরও সেই পরামর্শ অনুযায়ী আমল করতে হবে। এখন ভাইয়ার সাথে আলোচনা করে খুব দ্রুত সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিবি। আর যেই বিষয়গুলো বললাম, মাথা ঝাকিয়ে সেগুলো মনে করে করে আমল করার চেষ্টা করবি। আর এই নে চিঠিখানার একটা ফটোকপি। আসল চিঠিটা আমার কাছে। ওটাকে আমি আজীবন আগলে রাখব ইন-শা-আল্লাহ। আচ্ছা আজ আসি রে। সন্ধ্যা হতে চলল। বাসায় গিয়ে মাহিরের আব্বুর জন্য আজ একটা স্পেশাল আইটেম বানাব। ভালো থাকিস।’স্নেহা এই বলে চিঠিটা মাইশার হাতে দিয়ে বোরকাটা পরে নিয়ে রুম থেকে বের হলো। ‘মাহিরের আব্বু চলো, সন্ধ্যা হতে চলল। সন্ধ্যার আগে বাসায় ফিরতে হবে।”ভাবি, অনেকদিন পর আসলেন। আজ না হয় থেকে যান!”ধন্যবাদ ভাইয়া। আর একদিন সকাল থেকে না খেয়ে থেকে বিকেল হলেই চলে আসব। রাতে আচ্ছামতো খেয়েদেয়ে মাইশার সাথে ইচ্ছেমতো গল্পগুজব করে সারারাত পার করে দেব। আজ তো খেয়ে এসেছি। তাই সরি। যাই ভাইয়া?’স্নেহার কথা শুনে হাসান বেশি না, গুনে গুনে দু’ইটা কাশি দিল। আদিব মুখ ঘুরিয়ে উপরে তাকিয়ে আছে। স্নেহা বলল, ‘কী ব্যাপার মাহিরের আব্বু, চলো না।”ও হ্যাঁ, চলো।’

চার

মাইশা সেই চিঠিখানা হাতে নিল। আগ্রহভরে চিঠির প্রতি চোখ ফেরাল। চিঠিটা হাতে নিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে তা পড়তে লাগল। গভীর মনোযোগ দিয়ে প্রতিটি কথা মনের মধ্যে গাঁথতে লাগল।সেই চিঠিতে লেখা ছিল-বিয়ের পর শুরুতেই আপনার স্বামীর আন ও যোগ্যতার স্তর সম্পর্কে ধারণা নিন। আপনার চেয়ে কম বা বেশি এটাই হোক- তার মতামত, ইচ্ছা ও মিঞ্চস্তকে ঠেকায় পড়ে নয়; সন্তুষ্টচিত্তে প্রাধান্য দিন।

পৃষ্ঠা-৮৩

স্বামীকে সম্মান করুন। এয়া করুন। মনে রাখবেন- সম্মান ও শ্রদ্ধাহীন সম্পর্ক এবং কচু পাতার পানির মানো কোনো পার্থক্য নেই। আজ না হয় কাল- পড়ে যাবে।কেবল নিষিদ্ধ বিষয় ছাড়া অবশিষ্ট সকল বিষয়ে তার প্রতি পূর্ণ অনুগত থাকুন। কতটা অনুগত? ঘণ্টা অনুগত থাকার জন্য হুজুর সা. একথা বলেছেন- ‘আল্লাহ তা’য়ালা ছাড়া অন্য কাউকে যদি সিজদাহ করা আয়েজ হতো, তাহলে আমি স্ত্রীদেরকে হুকুম করতাম তারা যেন তাদের স্বামীকে সিজদাহ করে।’সদা হাস্যজ্জল থাকুন। একথার অর্থ এই নয় যে, সারাক্ষণ পাগলের মতো হাসতে হবে। এর অর্থ হলো, স্বামীর সাথে হাসিমুখে কথা বলুন।তার সাথে জেদ করবেন না। আড়াআড়ি করবেন না। মনে রাখবেন- স্বামীর সাথে জেদ করা মানে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা।পুরুষ নারীর নমনীয়তাকে ভালোবাসে। কোমলতাকে ভালোবাসে। তার কাছে অমূল্য হতে চাইলে নিজেকে নমনীয় রেখে ক্রোমন ব্যবহার রপ্ত করুন। সুখি হবেন।নাজুক হোন। লাজুকতা পুরুষত্বকে আকর্ষণ করে। স্বামীর মনকে চুপিচুপি চুরি না করে সরাসরি ডাকাতি করে।অতিরিক্ত সন্দেহ করা থেকে বিরত থাকুন। বিয়ের আগে অভিভাবকের মাধ্যমে ছেলের চারিত্রিক স্তর মেপে নিন। তবুও বিয়ের পর বিচ্যুতি দেখা দিলে বা সন্দেহ হলে গোয়েন্দাগিরি না করে তার যত্ন নেয়া বাড়িয়ে দিন। তার বাবা-মাকে আগের চেয়ে বেশি ভালোবাসুন। তাদের প্রতি খুব খেয়াল রাখুন। স্বামীর কাপড়- চোপড় সহ কখন কী প্রয়োজন ও ব্যবহৃত জিনিসপত্র সহ সাংসারিক টুকিটাকি বিষয় নখদর্পণে রাখুন। তার সবকিছুতে যত্নের ছোয়া লাগিয়ে দিন। তার ভালো লাগা বিষয়কে নিজেও পছন্দ করুন, আর অপছন্দনীয় বিষয় থেকে বিরত থাকুন।তাকে একথা বুঝিয়ে দিন- পৃথিবীতে আপনার চেয়ে বেশি ভালোবাসা তাকে আর কেউ দিতে পারবে না। তবে সাবধান! মুখে নয়: কাজে প্রমাণ করুন। পারনে সুযোগ বুনো চিরকুষ্ট কিছু লিখে তার উঠিলে, আমার পকেউ অথবা সহজে চোখে পড়ে এমন স্থানে রেখে দিন। ম্যাজিক হবে ম্যাজিক।

পৃষ্ঠা-৮৪

অলসতা নেড়ে ফেলুন। খুব ভোরে ওঠার অভ্যাস করুন। এটা স্বামীর বাড়ি। স্বশুর-শাশুড়ি, দেবর-ননদ সবাই আছে এখানে। তাদের মন বুঝুন। সবাইকে বশে নিয়ে আসুন। বশে আনতে অবিজ-কবচ নাগে না। সুন্দর ব্যবহার করুন। কর্মঠ, বুদ্ধিমতী ও চপলমতি হোন। এমনিই বশে চলে আসবে।আলস্য ও গোমড়া মুখকে নোটিয়ে বিদায় করুন। না হয় এগুলোই আপনার সুখকে দাফন করে দেবে। তবুও অনাকাঙিক্ষত কিছু দেখা দিলে ঘরের কথা বাইরে না বলে সবর করুন। চুপ থাকুন। এক আল্লাহকে মন খুলে সন্ত বলুন।

আপনার স্বামী আপনাকে রেখে অন্য কারো দিকে ঝুঁকে পড়ে কখন? কেন? নিজেকে প্রশ্ন করেছেন কখনও? অনেক স্ত্রী নিজেকে এই প্রশ্ন করলেও অধিকাংশই একটি সরল উত্তর পায়। তা হলো- আমার স্বামী আসলে চরিত্রহীন। চোখ খারাপ। ভণ্ড। এর কাছে এসে আমার জীবনটাই ব্লা ব্লা…!খামুন! একজন দ্বীনদার ও ব্যক্তিত্ববান স্বামীকে এসব বলতে লজ্জা করুন। আল্লাহকে ভয় করুন। বরং এসব কল্পনা করা থেকেও বিরত থাকুন। নতুবা সংসারের শান্তি স্রেফ উবে যাবে। ভালোবাসার অচিন পাখি আগামীকালের পরিষর্তে আজেই ফুচুৎ করে উড়ে যাবে।আপনার স্বামী নিজের চরিত্র ও নজরকে হেফাজত করতে কী পরিমাণ স্ট্রাগন করে তা আপনি বুঝবেন না। কর্মস্থলে, পথেঘাটে, ডানেনামে, দেওয়ালে, এমনকি নিচের দিকে তাকিয়ে হাটলেও রাস্তায় পড়ে থাকা পেপার, কাগজ, বিভিন্ন লিফটে ও বিজ্ঞাপনে নোংরা বিউটি কুইনদের অর্ধ-উলঙ্গ কামনীয় দেহ আকুপাকু করে তাকে ফুসলাতে থাকে। আর বেচারা স্বামীর চেয়েও এক ইঞ্চি বড় দ্বীনদার(!) ইবলিশ সাহেব সেদিক থেকে খাহেশাতের বিষাক্ত তীর ঠিক তার হার্ট বরাবর ছুড়ে মারে। এই তীরের প্রভাব যে কষ্টা তীব্র হয় তা অব্যক্ত।এছাড়াও কর্মস্থলে ও পথেঘাট ইচ্ছা-অনিচ্ছায় কতশত সুন্দরী রমণীর মোহনীয় রূপের ছষ্টায় সে বিধ্বস্ত হয় সে খবর কী আপনার আছে? এই বিস্তান্ত অবস্থায় বেচারা যখন ঘরে ফিরে- সে তখন বাইরে থেকে দেখে আসা সুন্দরীদের চেয়েও অধিক সুন্দরী কারো সোহাগ চায়। আল্লাহ আপনাকে গ্রেটুকু দিয়েছেন স্টুেকুতেই আপনি তার কাছে ভুবনজয়ী সুন্দরী। তা না হলে সে আপনাকে বিয়ে করতো না।মনে রাখবেন, জগতের প্রতিটি স্ত্রীই তার স্বামীর কাছে অপরূপা হয়। তো আপনার যেটুকু আছে এটুকুই একটু পরিপাটি করে ডিসঙ্গে করুন না।

পৃষ্ঠা-৮৫

বাইরে বের হতে কোলে বোরকার নিচেও যেটক সাজুভজু করেন, আপনার স্বামীর জন্য অন্তত অংক সাসুভদ্ভুত আপনি করেন না। স্বামীর সামনে কনস যাওয়া সেটা পরেন। চুলগুলো পাটের বস্ত্র বানিয়ে রাখেন। সাংসারিক কাজ করে भव्य-प्लप्स অক্কেবারে অনুशत रस शाকেন। স্বামী বেচারা আপনাকে দেশুনে পাত ক্লান্ত শরীর আরও কুপ্ত হয়ে যায়। অরুচি ধরে যায়। আর নফস ঠিক তখনই চন্দ পেয়ে যায়। বাইনে দেখে আসা সুন্দরীদের নিয়ে নানান জল্পনা-কল্পনা শুরু হয় যায়। এখানে দোষ্টা কার? নফস থেকে কেউ মুক্ত না। আসলে দোষ না। বার্জশী স্ত্রী হিসেবে আপনার ব্যর্থতাই আপনার স্বামীকে অনালে তার ফেরাতে বাধ্য করছ। রিমাইন্ড ইউরসেল্ফ। প্রশ্ন করুন নিজেকে।স্বামী ঘরে আসার আগেই গোসন করে, সুন্দর-আকর্ষণীয় আমাকাপড় পরে পারফিউম (অবশ্যই হালাল হতে হবে। নারীদের জন্য নিজের স্বামীকে খুশি করছে নিরাপদ পরিবেশে সুগন্ধী ব্যবহার করা আয়েজ। অন্যথায় বাইরে বের হবার সময় অথবা অন্য পুরুষের নাকে যেতে পারে এমন আশঙ্কা হলে নারীদের শুর সুগন্ধি/পারফিউম কবহার করা জায়েজ নেই।) ব্যবহার করে, টুকিটাকি সাংস্কৃচত্ত্ব করে নিজেকে বাইরের ফাহেসা নারীদের চেয়ে বেশি সুন্দর করে সাজিয়ে রাখুন।বাহির থেকে আসলে দরজা পর্যন্ত গিয়ে তাকে এগিয়ে আনুন। হাতে উঁচু থাকলে নিজহাতে নিয়ে পাশে রেখে দিয়ে আগে বসতে দিন। একটু বাতাস করুন। আমার বুতাটা খুলে দিন। মিনিটখানেক পর একমাস শরবত করে দিন।ব্যাস… দ্রোগ চেনেন চোগ? ডোগ নিলে যেমন নেশায় ধরে, আপনার কর্মীতেও তেমন নেশায় ধরবে। আপনার নেশা। ভালোবাসার নেশা! হালান নেশা!তাকে প্রচণ্ড ভালোবাসুন। সন্দেহ জড়িয়ে নয়, বিশ্বাসের মোড়কে মিডিয়াম রকমের ভালোবাসুন। আর এই বিশ্বাসের ভিত্তি এতটাই মজবুত রাখুন, আ সন্দেহের সাইক্লোন এসেও তা টলাতে না পারে।প্রতিজ্ঞা করুন- আপনার স্বামীর প্রতি অন্যকোনো মেয়ের ভালোবাসা খাতে আপনার চেয়ে বেশি হতে না পারে। কেমন স্ত্রী আপনি? আপনার স্বামীতে আর একটা মেয়ে আপনার চেয়ে বেশি ভালোবাসা দেখিয়ে ছিনিয়ে নিতে চায়। রক্ত আই নিন। জিতে যাবেন। ছেলেদের প্রচুর ইসো। কোনোভাবে তাকে অপমান করে আপনার শরীরে? জেদ হয় না? হ্যা, স্বামীকে ভালোবাসা দিয়ে সেই জেদ মিডি না। স্টোক্ষ করবেন না। কোনো ত্রুেটি নজরে আসনে যখন-তখন প্রতিপ্রিয়া দেখাবেন না। সারাক্ষণ ঘ্যানরঘ্যানর করবেন না। সকাল-বিকাল প্রঋচিয়োন করবেন না।

পৃষ্ঠা-৮৬

একান্ত সময়ে, বিনয়ের সায়ে, ভালোবাসা মাখিয়ে বুঝিয়ে শুনুন, রোজো-রাজ্য সংষ্টাই আপনার হবে। ট্রাস্ট মি…বিয়ের পর স্বামীর সাজানো বাগানে এসে তাতে পানি চালুন। দেখবেন, একসময় পুরো বাগানটিই আপনার হয়ে গেছে। কাউকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে কান্তে চালাবেন না। তাহলে দেখবেন, অজান্তে নিজেই ঝড়ে যাবেন।স্বামীকে রাজার মতো মানুন। রানীর মর্যাদা পাবেন। সোনামের মতো ভাবনে- বান্দির মতো থাকবেন। চয়েছে আপনার।স্বামী বাইরের পরিবেশ থেকে কেমন মন নিয়ে ফিরে আসে তা অজ্ঞাত। আপনার আশা- সে আছ গোলাপ হাতে ঘরে ফিরবে। আদর করে খোপায় গেছে দিয়ে সোহাগ করবে।কিন্তু এমনও তো হতে পারে- বেচারা আজ অ্যাক্সিডেন্টের হাত থেকে এ যাত্রায় কোনোমতে বেচে ফিরুন। নার্ভাসনেস তার রন্দ্রে-রন্দ্রে। রোমান্স গেছে আজ সোজা চান্দে! কী অসম্ভব কিছু? সবকিছু হয়তো বলে না আপনাকে। আপনি দুঃশ্চিন্তা করবেন তাই। আপনি সারাদিন তার অপেক্ষায় থাকলেন। আর সে এসেই ওপাশ করে শুয়ে পড়ল। অমনি আপনি অল্পপ্পল্প… বুঝলেন না বেচারাকে। বিশ্বাস করুন! আপনার প্রতি ধীরে ধীরে এভাবেই তার রুচি নষ্ট হয়ে যায়।আপনার ইচ্ছা- সারাক্ষণ স্বামী আপনার পাশে থাকবে। আপনাকে ভালোবাসবে। আদিখ্যেতায় আপনাকে মাতিয়ে রাখবে। হে বোন। আপনার স্বামীর মনেও একই ইচ্ছা। একই আশা। স্বাদ-অহ্লাদ তারও কম নেই। কিন্তু দিন শেষে আপনার মুখে দু’মুঠো খাবার কে তুলে দেবে? আপনার অসুস্থতায় পাগলের মতো ছোটাছুটি করে ডাক্তারের পেছনে বেহিসাব টাকা কে বিনাবে? আপনার অনাগত সন্তানের দুলনিটা কে কিনে দেবে? বাবুর প্যাম্পাস, ছোটছোট নতুন কাপড় আর নানানপদের খেলনা কে এনে দেবে?বোন আমার! যে মানুষটি বিয়ের আগে দুরন্তপনায় একাধিক হাওয়াই নোবেন পেয়েছে, গুরুজন কর্তৃক অকর্মার ঢেকি উপাধিতে ভূষিত হয়েছে, ঠিক সেই মানুষটিই আজ আপনার ও আপনার সন্তানের একটু নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য, দু’মুঠো ভাতের যোগান দেওয়ার জন্য, সুনিশ্চিত এক ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে সোলাম বানিয়েছে, প্রফ মোলাম। তাই সর্বদা তার থেকে তাজা সোনাপের আশা না করে মাঝেমধ্যে নিজেও একটি গোলাপ তাকে উপহার দেওয়া যায় না? তাআ লাগবে না, জাস্ট কাগজে আকা খেলনা গোলাপ। কী! যায় না?!

পৃষ্ঠা-৮৭

আর হ্যা, শাশুড়ির বিষয়টি সর্বদা মতায় রাখবেন। মনে রাখবেন, এই মানুষটি হলো আপনার সংসার নামক গাছের শেকড়ে। ওখানে নিয়মিত পানি চালুন, সুস্তাদু ফল চেপহার পাবেন। এখানে কুড়ান চালাবেন তো নিজেড মরবেন, স্বামীকেও মারবেন।তিনি যেহেতু আপনার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ্টার মা, তাই তাকে তার প্রাদা সম্মানটা দেওয়ার চেষ্টা করুন।আজ যাকে পেয়ে আপনি গর্বিত, যে স্বামীর কারণে আপনি অন্যদের চেয়ে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন, তাকে এই পর্যন্ত নিয়ে আসতে তিলতিল করে এই মানুষটি নিজের রক্ত পানি করে দিয়েছেন, নিজে না খেয়ে তাকে খাইয়েছেন, নিজের পুরোটা সত্তা তার জন্য বিলিন করে দিয়েছেন, যার ফলস্বরূপ আজকের আপনার এই স্বামী।গাছ লাগিয়েছেন তিনি, আদর-যত্ন করে বড় করেছেন তিনি, এখন ফল ধরার মৌসুমে গাছটিকে আপনার হাতে সোপর্দ করেছেন। আপনাকে গিফন্ট দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে এমন মানুষটির ব্যাপারে আপনার কী পরিমাণ কৃতজ্ঞ ও বিনয়ী হওয়া উচিত ভাবতে পারেন?একটা জিনিস খেয়াল রাখবেন, ছেলেদের প্রতি সবচেয়ে বেশি অধিকার খাতে তার মায়ের। আর মেয়েদের প্রতি সবচেয়ে বেশি অধিকার থাকে তার স্বামীর।তাই বিশেষ কোনো সমস্যা না হলে স্বামীকে আলাদা থাকার জন্য চাপ দেবেন না। কারণ প্রতিটি মায়েরই তার ছেলে ও ছেলের বউকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন থাকে। তারা সাধারণ কিছু সেবা-যত্নের আশা লালন করে। আপনি যখন শাশুড়ি হতেন তখন বুঝবেন। সেই দিকটাতে একটু দৃষ্টি রাখুন।স্বাশুড়ির সামনে স্বামী-স্ত্রী স্বাভাবিক থাকুন। রোমান্স বা খুনসুটিতে মজতেন না। তবে মানো মানো তাকে নিয়ে একসাথে কিছু সময় কাটাতে ও আনন্দ কমত পারেন। ভালো লাগবে।তর্ক করবেন না। কথার পিঠে কথা বলতে যাবেন না। ভালো ও সত্য করা হলেও না। তার আচরণে কখনও নেগেটিভ কোনো রিঅ্যাক্ট করবেন না। অকালে কোনো বন্ধু কথা বললেও এক কান দিয়ে শুনে অপর কান দিয়ে নিक करत দिন। ভেতরে জমা রাখবেন না। অপারা না হলে স্বামীর কাছেও এসব আনাতেন না। জাস্ট হজম করে নিন।

পৃষ্ঠা-৮৮

শাশুড়ির সংসারে অসেই চোইভার সাজতে যাবেন না, হেল্লার হিসেবে থাকুন। যখন যা করবেন সবকিছু জিজ্ঞেস করে নিন। কী রান্না করবেন, কী দিয়ে করবেন, কষ্টুকু করবেন সরাসরি জিজ্ঞেস করে নিন। যেচারে শুনে সেভাবেই করুন। নিজের আনা থাকলেও সাময়িক ছাত্রীর পরিচয় দিন। তার রান্নার প্রশংসা করুন। কাজের প্রশংসা করুন। তার ঔষয়ের বাটি, কাপড়-চোপড় এগুলোর দিকে নক্ষা রাখুন। তার ভালো লাগা ও মন্দ লাগার বিষয়গুলো সহ টুকিটাকি সকল বিষয়ে পাই-টু-পাই জ্ঞান রাখুন ও সেভাবে চলার চষ্টা করুন।শুরুতেই খুব বেশি মিশতে যাবেন না। উনাকে বুঝার চেষ্টা করুন। অবসরে আমিয়ে গল্প করুন। মনোযোগ দিয়ে চেনার কথা শুনুন। বয়স্করা বলতে ভালোবাসে। যে যত বেশি তাদের কথা মন দিয়ে শোনে তারা তাকে তত শ্রেশি আপন মনে করে। তার কষ্টের কথায় ব্যথিত হোন, সুখের কথায় আপ্লুত হোন।অঅধিক জুলুম না হলে তার যেসব করহার ভালো না লাগবে ওসব ব্যাপার নিজের বাবার বাড়ি বা স্বামী কাউকে কিছু বলবেন না।দ্বীন-দুনিয়া কোনো বিষয়ে তাকে পরামর্শ দিতে যাবেন না। এটার অন্য তার জ্বেলে আছে। প্রয়োজনে আপনার স্বামীকে সুন্দর করে বুঝিয়ে বলে তার মাধ্যমে কিছু এটা করুন। আপনি আস্ট তার সাথে মিশে যান। প্রতিপক্ষ হবেন না। পাশাপাশি নিজের আমন, দ্বীনদারিত্ব এসবের প্রতিও সিরিয়াস থাকুন। তাতে ত্রুটি দেখা দিলে একান্ত সময়ে স্বামীকে বলুন। আবার যখন-তখন না।মান্তোমানো শাশুড়ির জন্য স্বামীকে কিছু গিফন্ট কিনে আনতে বলুন। আর সেটা নিজ হাতে তাকে দিন। নিজের অন্য শপিং করার সময় তার অনাও কিছু না কিছু किनून।দেবর, ননদ গুদের প্রতি সদয় হোন। ওদের অন্যও মানোমধ্যে কিছু কেনাকাটা করুন। ওদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবুন, স্বামীর সহযোগী হোন, ওদের হিতাকাও ক্ষী হোন। ওদেরকে নিজের ভাই-বোনের মতো মনে করুন। তবে দেবরের সাভে পর্দার বিষয়টি সর্বদা মাথায় রাখুন। প্রয়োজন ছাড়া দেবরের সাথে অহেতুক কথা শুনবেন না। নিজের একটা ওয়েট এক্ষেত্রে ধরে রাখুন। তবে ননন্দিনীর সাথে ফ্রি করুন। তাকে বান্ধবী বানিয়ে নিন। বিপদে ঢাল হিসেবে কাজে দেবে।এসবের ভিড়ে স্বশুরকেও ভুলে যাবেন না। সাধ্যের মধ্যে তার প্রতিও খেয়ান রাখুন। কখন কী প্রয়োজন হয় তা গুছিয়ে গুনে দিন। তবে সরাসরি শারীরিক কোনো সেবা করা থেকে বিরত থাকুন। যেমন হাত-পা টিপে দেওয়া ইদি।

পৃষ্ঠা-৮৯

এতকিছুর পরেও শাশুড়ি বা তার বাড়ির জন্য কারও দ্বারা কষ্ট পেনে আল্লাহর জন্য সবর করুন। এর বিনিময়ে নেকির আনা রাখুন। স্বামীর সাথে এসর নিয়ে মনোমালিন্য করবেন না। সব কথা মন খুলে আপনার রথের কাছে প্রকাশ করুন। একান্ত অপারগ হলে শান্ত মনে স্বামীর কাধে মাথা রেখে তার কাছে নিজেকে মনে গুরুন। কষ্টের আয়গাভেলো একে একে তুলে ধরুন।গুনে রাখা ভালো, স্বশুর-শাশুড়ির খেদমত করার জন্য যদিও আপনি বাধ্য নন, কিন্তু আপনার স্বামীর আদেশ মানতে আপনি বাধ্য। স্বামীকে খুশি রাখতে, শুধু সন্তুষ্ট আর্জন করতে সর্বাত্মক কষ্টা করা আপনার প্রধান দায়িত্ব। তাই গদ্যে সাধারণ বেদমতের বিষয়টি যদি আপনার স্বামীর আদেশ হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে এটি আপনার অন্য জরুরি বটে। কারণ, ইসলামের বিরুদ্ধে না যায় স্বামীর এমন সব আদেশ মানা স্ত্রীর অন্য ওয়াজিব। আর তার আদেশ যদি ইসলামের বিরুদ্ধে ডজ এমন হলে আপনি বাধ্য নন। তবে স্বামীরও উচিত স্ত্রীর প্রতি যেন জুলুম না হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা।অতঃপর…এভাবে নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে যখন আপনার সংসারটিকে জান্নাতের নামান বানাতে শেষরাতে রবের কাছে দু’হাত তুলবেন, চোখের পানিতে কাজেন মুহূরে ইন-শা-আল্লাহ আপনি বিজয়ী হবেন। জি বোন, আপনিই বিজয়ী হবেন।”

পৃষ্ঠা-৯০

ডিমান্ড এন্ড সাপ্লাই

মু’হাতে হাঁটু পেঁচিয়ে মাথাটা নুইয়ে হাঁটুর সাথে মিশিয়ে ক্রোন্ত বলে গাজ অধরা।অপরাহ্ন পেরিয়ে বিকেল হতে চলল। চারটা টুইটুই। বসন্তের দিবসে এমনিতেই ক্ষনজন্য। শুরু হতেই শেষ হবার তোড়জোড়। সারাদিনের এর এয় কাজ সব শেষ করে অধরা এখন ক্লান্ত প্রান্ত। অমনি আকাশ এসে ধড়াম ধড়াম করে কয়েকটি শব্দ করল। কিছু একটা রেখেছে বোধহয়।সে যাকগে, আজ অবরাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা। কিছুলি ওয় ওর ঘুম হচ্ছে না। মাকে মাঝেই পেটে খাঁমচে ধরা ব্যথা উঠে। ভেতরের সর্বনিল্য একেবারে ছিড়ে যেতে চায় যেন। খাবারদাবারেও কচি নেই। কেমন উত্তযুদ্ধ চুন। ফ্যাকাসে চেহারা। মাসখানেক ধরে আকশকে বলে বলে অবশেষে রাজি হয়ে। আজ নিয়ে যাবে বলে।আকাশকে দেখে এগিয়ে গিয়ে বলল, ‘কখন বের হবেন?’আকাশ চড়া গলায় উত্তর দিল, ‘এখনই। চলো। ঘন্টাখানের মধ্যে শেষ কয়ে ফিরতে হবে। আর একটা কাজ আছে আজ।’অধরা তড়িঘড়ি করে তৈরি হওয়া শুরু করল। ওয়াশরুম থেকে ফ্রেস হয়ে গ্রা কোনরকম হাতমুখ মুছেই বোরকা পরতে গেলে আকাশ হাত থেকে বোরকাট ছো মেরে নিয়ে গেল। অধরা কিছু বুঝে উঠতে পারার আগেই আকাশ ঝাড়ি মেয়ে কলার ‘এসব ঝামেলা করতে পারবে না। এমনি চলো।’অধরা অস্ফুটে বলল, ‘বোরকা ছাড়া যাব কী করে?’একথা বলতেই ‘চুপ! একদম চুপ।’ এই বলে অধরার চোখ বরাবর মঙ্গল উচিয়ে শাসিয়ে উঠল আকাশ। নির্বাক মেয়েটি ছলছল দৃষ্টিতে আকাশের একজন দিকে অপলক তাকিয়ে আছে।আকাশ এবার একটু নিশপিশ করে হাতটি উচিয়ে বলল, ‘আর একবার হট বোরকার নাম শুনি, তবে তোর দাঁতগুলো আমি ফেলে দেব। ফ্রেন্ডদের সাথে একী প্রেমাবেও অ্যাটেন্ড করতে পারি না এই তোর জন্য। গেঁয়ো ভূত কোথাকার?

পৃষ্ঠা-৯১

একথা শুনে অধরা করজোড় করে বলছে, ‘তোমার সব কথা আমি মাথা পেতে দেখ, কিন্তু প্লিজ তুমি আমায় আমার রবের হুকুমের বিরুদ্ধে চলতে বাধ্য কোরো নাংগএকথা বলতে দেরি অমনি ‘ঠাশ্য করে ওঠা শব্দের সাথে অধরা বিছানার ওপর আছড়ে পড়ল।আঘাতটি যেন অধরার গাল নয়; ওর কলিজাকে রক্তাক্ত করে দিল। তাইতো বাগে নয়। বুকে হাত দিয়ে বিছানায় পড়ে গেল অধরা। যেন ভেতর থেকে কলিজাটি বেরিয়ে না পড়ে।আকাশ এরপর অধরার একমাত্র বোরকাটি পায়ের নিচে রেখে সজোরে টান মেয়ে দু’টুকরো করে ওর মুখের উপর ছুড়ে মেরে বলল, ‘কথাটা মনে থাকে যেনা’ এই বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।কলিজার উপচে পড়া রক্ত বন্ধ করতে ছেড়া বোরকাটি বুকের মাকে খুব জোরে চেপে ধরেছে অধরা। নিস্তব্ধ ঘরে এবার বুকের সবটুকু শক্তি দিয়ে চিৎকার করে ‘ইয়া আল্লাহ…।’ বলেই কান্নায় ভেঙে পড়ল।এর বেশিকিছু আর বলতে পারছে না মেয়েটি। এরপর বিছানায় আলতো করে গা এলিয়ে দিল। দীর্ঘক্ষণ পর জ্ঞান ফিরলে দেখে, ওর ৫-৬ বছরের একমাত্র কলিজার টুকরো ছেলে বাহাত খেলাধুলা করে এসে না খেয়েই সুমিয়ে পড়েছে। অধরা নিজেকে একটু সামলে নিয়ে ওয়াশরুম থেকে ফ্রেস হয়ে এসে রাহাতের পাশেশুয়ে একা একাই বিড়বিড় করে বলছে, ‘আর না, অনেক হয়েছে। এই সাভ’টি বছরে বোধহয় সাত’বারও বাবার বাড়ি যাওয়ার ভাগ্য হয়নি। যতবার গিয়েছি ভার প্রতিবারই বোরকা পরা নিয়ে তুলকালাম বাধিয়েছে। আজ বছরখানেক ধরে প্রায়ই অকারণে পেটে ব্যথা হয়, ডাক্তারের কাছেও যেতে চাইনি শুধুমাত্র বোরকা ছাড়া যেতে হবে বলে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কোনদিন ন্যূনতম তিন-চার ঘণ্টাও ঘুমানো হয়ে উঠেনি। দৈনিক তিনবেলার একটি বারও গরম খাবার নসিবে জুটেনি। সারাদিন বদির মত খেটে যাচ্ছি, উপরন্তু পান থেকে চুন খসলেই মা-বাবা সহ চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে ছাড়ে। তবুও আমার রাহাতের দিকে তাকিয়ে জীবনটি এভাবেই কাটিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। শুধু আমাকে আমার রবের হুকুমটা মানতে দিলে আমি আর কিছুই চাই না, কিছু না। কিন্তু আমাকে সেটাও দেবে না।আর না। আমার রবের হুকুমের সাথে কোন আপোষ নেই। আমি আর আমার এই দুখ ওকে দেখাব না। আজই আমি আমার দু’চোখ যেদিকে যায় সেদিকে হারিয়ে ফেলব নিজেকে। চিরদিনের জন্য হারিয়ে যাব ওর জীবন থেকে।’

পৃষ্ঠা-৯২

এখন দলেই দু’ থাকে মুখটা চেজে নিয়ে শেখ কান্নাটা কেঁদে নিচ্ছে শাপলাটি।আমার মনে হয়েছে, আমি যে কোনোদিন একা পথ চলিনি, একা বের (or life। যাই কয়েক কিলোমিটার পরই বাবার বছি বোনের একা একা থেকে পারি না। তবে বীভাবে আমি হারিয়ে যাবা অহ কোথাওই বা বিয়ে উঠএই ভারতে ভাবতে ওর হাত পা কেঁপে উঠল। আবারও অশ্রুশিক্ত হয়ে একদম চুলগে গেল।কিন্তু না। ও আর থাকবে রাজি নয়। নিজেকে সামলে নিয়ে ছোট একটি ব্যাগে একসেট কাপড় আর কানের, নাকের জিনিষগুলো খুলে ভরে নিল। আকাশ বাড়ি ফিরলে ঘুমিয়ে গেলেই বেরিয়ে পড়বে অজানায়। নিজেকে হারিয়ে ফেলবে কোন এক দূর সীমানায়।রাত ১টা টুইটুইং আকাশ এসেই বিয়ানায় শুয়ে পড়ে বলল, ‘আমি বাইরে থেকে গেছে এসেছি, খেয়ে যে তুই। আমি না আসা পর্যন্ত তো আবার খাবার টেবিলে যাস না।’ এই বলেই কম্বল মুবি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।অধরা চুপচাপ অনক্ষণ বসে থেকে ব্যাগটি হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। রাত প্রায় ২টা এখবা শীতে হাত-পা ব্যথা হয়ে যাচ্ছে। তাতে কী, ওকে আজ হারাতেই হবে। শেষবারের মত কলিজার টুকরোটাকে একটু দেখে নিচ্ছে সামনে থেকে।ঘুষের মধ্যে রাহাতের ঠোঁটদুটি মৃধু নড়ছে দেখে অধরা ভাবছে, আমার রাহাত বুঝি আধুনি আস্থনি বলে ডাকছে আমাকে। এই ভেবেই বুকটা খিচে ধরল ওর। ব্যাগটা ফেলে রেখে ওকে একটু আদর করতে চাইল, কিন্তু ধরলে যদি জেগে যায়া তাহলে তো আর হারাতে দেবে না।আবার ব্যাগটা হাতে নিয়ে সোনা মানিকটাকে প্রাণভরে দেখে নিচ্ছে। যেন ও বড় হলে যদি কখনও পথে-ঘাটে দেখা হয় ঠিক ঠিক চিনতে পারে।এবার ওপাশে গেল আকাশকে শেষবারের মত একপলক দেখেই পা বাড়াবে। আকাশ মাথাটা বের করে কথল গায়ে দিয়ে ঘুমুচ্ছে। ওর দিকে তাকাতেই অধর চোখে আর বাঁধ মানল না। আষাড়ের বাদল নামল অঝোর ধারায়। বুকে ব্যথা শুরু হয়ে গেছে। শরীরে কম্পন উঠে যাচ্ছে। ভাবছে শেষবারের মত শাষটার কপালে একটু ভালোবাসার অপতো ছোঁয়া এঁটে দিয়েই কর জীবন থেকে ইতি টানবে। পুরুটার এই শেখ ছৌঘাটুকুর স্বাদ নিয়েই না হয় বাকিটা জীবন কাটিয়ে দেবে।

পৃষ্ঠা-৯৩

এই ভাবতে ভাবতে মুখটা ওর কপালের দিকে নিয়ে যেতেই চোখের কাজল এরয়া পানির কয়েকটি ফোঁটা আকাশের চেহারার উপর পড়ার উপক্রম- অমনি পেছাদে সরে এসে মুখে ওড়না চেপে মেঝেতে বসে পড়ল অধরা। বলিজা চেরা অনন্তা বক্তগুলো বুঝি আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না, সবটুকুই আজ উপচে পড় ভেতরটা যেন মরুদ্যান হয়ে যাবে।নহ। কীণ দেহের সবটুকুন নির্জাস বুঝি শেষ হয়ে গেল। উঠে দাঁড়াতেও বড্ড বেগ পেতে হচ্ছে এবার। শেষ আশা টুকুনও উড়িয়ে দিয়ে ভাবছে, ‘আমার চোখের এই শেরা পানিতে ওর ঘুমটা ভেঙে গেলে নাজানি আবার বলে বদে যে, ওকে বালিশ চেপে মারতে গিয়েছি। যাকগে, ওর জীবন থেকে সরে যখন যাজ্ঞিই তখন আর অহ্লাদ দেখিয়ে কাজ নেই।’ এই বলে ব্যাগটা হাতে নিয়ে পা বাড়াল দরজাসরজাটা আস্তে করে খুলতেই অধরার পা’টা কেমন যেন অবস হয়ে গেল। হাত থেকে ব্যাগটা পড়ে গেল। চোখে যেন কেমন অন্ধকার দেখছে সর্বা মুহূর্তেই মাঘা ঘুরে মেঝেতে বশাস করে লুটিয়ে পড়ল।ওর পড়ে যাওয়ার শব্দে আকাশের ঘুম ভেঙে গেল। আকাশ দৌড়ে এসে ওকে তোলে তুলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। বোধহয় টয়লেটে যাবার সময় পা পিছলে পড়ে গেছে, এই ভেবে ওর গায়ে কথল বিছিয়ে দিয়ে আবার শুয়ে পড়ল। ঘুমের মোরে আর কিছু বলল না।এই পর্যন্ত বলে আদিৰ থামল।সেদিন নীলিমার গল্প শোনানোর পর হাসান জোর করে ধরেছিল আরও একটি এর শোনাতে। তাই আজকের অধরার উপস্থিতি। দু’জনই আদিবের পরিচিত। ধানা দুটি নিছক বলার জন্য বলা নয়।এরপর হাসানকে উদ্দেশ্য করে আদিব বলল, ‘এরকম মেয়েদের দিয়ে আসলে কিছু হবে না। কিচ্ছু না। বরাবরের মত এবারের যাত্রাটিও ভেস্তে গেল অধবার। আসলে একটা জিনিস আমাকে খুব ভাবায়।সবাই বলে- একজন ভালো স্ত্রী পৃথিবীর অমূল্য সম্পদ। জগতের শ্রেষ্ঠ নিজমত। কথা ঠিক।কিন্তু একজন ভালো স্বামীও যে কত বড় নিয়ামত, এটা খুব একটা শোনা যায়।

পৃষ্ঠা-৯৪

স্ত্রী বুঝবাদ ও দ্বীনদার না হলে ছেলেদের কতটা কষ্ট হয় সেটা সবাই কমবেশ জানি। কিন্তু এটাও কি ভেবেছি যে, স্বামী যাদি বুঝবান ও দ্বীনদার না হয় তাহলে সেটা মেয়েদের জন্য কতটা কষ্টের হয়?স্বামী চাইলে স্ত্রীকে বিদায় দিয়ে অন্যকাউকে গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু স্ত্রী? সে কি চাইলেই অন্য কোন স্বামী গ্রহণ করতে পারে?তার সন্তান। তার ভগ্নদেহ। তার সামর্থ্য। সবকিছু যেন একেকটি পাহাড় হয়ে দাঁড়ায়। তার পরিবার ও সমাজ এক্ষেত্রে তার জন্য “The great wall of China” এর ভূমিকা পালন করে।জীবনের শেষ সময়টুকু পর্যন্ত মেয়েটিকে একই চুলোর অদৃশ্য অনলে থেকেথেকে জ্বলতে হয়। পুড়ে ভন্ম হতে হয়। আর সময়-অসময়ে কলিজা পোড়া ভ্যাপসা গন্ধে চৈতন্য হারায়। এর মধ্যদিয়েই আবার স্বামী, সন্তান ও শ্বশুরালয়ের সবার চাহিদাও মিটিয়ে যেতে হয়।দিনশেষে মেয়েটি একটি যুদ্ধবিষ্কান্ত রণক্ষেত্রের মৃতপ্রায় সৈনিক হয়ে বিনা চিকিৎসায় কোঁকাতে থাকে। কিন্তু আফসোস। মেয়েটির এই কোঁকানো আওয়াজ, ছেলের গাড়ি-বাড়ি-টাকা দেখে বিয়ে দেওয়া লোভী ও অচেতন মা-বাবা সহ কারো কান অবধি পৌঁছে না। আর মেয়েটিও অভিমান, শঙ্কা আর ভয়ে কাউকে কিছু বলে मा…একজন ভালো দ্বীনন্দার স্বামীর প্রয়োজনীয়তা, মর্ম ও মর্যাদা এই ভুক্তভোগী মেয়েটি ছাড়া অন্যদের জন্য বুঝতে পারাটা বেশ কষ্টকর। নিজে পতিত হবার আগপর্যন্ত সকলের চোখ থাকে ঐ বাড়ি-গাড়ি-টাকার প্রতিই।কী দুনিয়াদার আর কী দ্বীনদার। ছেলে শুধু দ্বীনদার কিন্তু গরীব হলে তখনই খলের বিড়াল বেরিয়ে আসে। আর সে বিড়ালের বিষাক্ত আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত হয় অবলা মেয়েটি।হায়। সকল মা-বাবাদের যদি একটু বোধোদয় হতো। তাদের মেয়েগুলো তাহলে দুনিয়াতেই স্বর্গীয় সুখ পেত।’হাসান বলল, ‘আমাদের সমাজটাই কেমন যেন হয়ে গেছে রে।’আদিব বলল, ‘সমাজ নয়, বল আমরাই কেমন হয়ে গেছি। কারণ সমাজ আলাদা কোনো সত্তা নয়। আমাদেরকে নিয়েই সমাজ। আমরা ভালো হলেই সমাজ ভালো হয়ে যাবে। এজন্য সর্বপ্রথম আমার নিজেকে ভালো হতে হবে। পাশাপাশি সচেতনতা বাড়াতে হবে।’

 পৃষ্ঠা-৯৫

মানলাম, কিন্তু তুই তো শুধু ছেলেদের দোষটাই দেখলি। মেয়েটাকে স্বাধীনতা। চচ্ছে না। চর্যার করছে। আবার শেষে এসে পার্ডিয়ানকে কিছুটা দোহারোপ করলি। তো মেয়েরা কি সব দুধে-আলতা? গুদের কোনো দোষ নেই?”হাসানের কথা শুনে আদিব বলল, ‘এইখানে বস।’এই বলে ঘাসের ওপর বসে পড়ল। হাসানও বসল।’দাড়িয়ে দাড়িয়ে আর কতক্ষণ। প্য ভার হয়ে এসেছে। আরাম করে বস। আজ যের একটি ক্লাস নেব।”তাস নিবি? কী ক্লাস?”ডিমান্ড & সাপ্লাই এর ক্লাস।”কীসের ডিমান্ড আর কীসের সাপ্লাই?”আগে তো শোনা”আচ্ছা বল।’আবার যোগান রেখা যদি চাহিদা রেখাকে ছেদ করে তাহলে মূল্য রেখা হয়নিঃমুখী। অর্থাৎ সাল্লাই যদি ডিমান্ড-এর চেয়ে বেশি হয় তাহলে পণ্যের দাম তখনকমে যায়।’খুব মনোযোগ না থাকলে এলার্ট।”হম, বল।’আদিব বলতে শুরু করল, ‘ইকোনমিকস-এ একটি থিওরি পড়েছিলাম।চাহিদা রেখা যদি যোগান রেখাকে ছেদ করে তাহলে মূল্য রেখা হয় উর্ধ্বমুখী। অর্থাৎ ডিমান্ড যদি সাপ্লাই-এর চেয়ে বেশি হয় তাহলে পণ্যের দাম বেড়ে যায়।মোটকথা পণ্যের দাম ওঠানামার সম্পর্ক হলো পণ্যের ডিমান্ড ও সাপ্লাইয়ের হ্যাকার ব্যবধান কত সেটার ওপর। সহজ কথায়- পণ্যের দাম কমবেশি হয় পণ্যের চাহিদা ও যোগানের মাঝে যে ব্যবধান থাকে সেটার পরিমাণের ওপর।বিওরিটি ভালোভাবে বুঝে নে আগে। প্রয়োজনে আবার রিভিউ করি। করবা ‘ বুঝতে পেরেছি। এরপর বল।’

 পৃষ্ঠা-৯৬

‘আচ্ছা, এবার তাহলে মূল কথায় আসি।ছেলেদের দিক থেকে সুন্দরী মেয়েদের চাহিদা আকাশচুম্বী। কিন্তু এর যোগন। খুবই সীমিত। অর্থাৎ এখানে চাহিদা রেখা যোগান রেখাকে ছেদ করেছে। আর তাই অল্পসংখ্যক সুন্দরী মেয়ে যারা আছে তাদের দামও অনেক বেশি।আবার তুলনামূলক কম সুন্দরী ও গরীব/মধ্যবিত্ত মেয়ের চাহিদা তুলনামূলক কম। কিন্তু বাস্তবতা হলো- এমন মেয়ের সংখ্যাই সমাজে বেশি। অর্থাৎ এখানে যোগান রেখা চাহিদা রেখাকে ট্রেন করেছে। আর তাই এসকল মেয়ের নামও খুব কম।মোটকথা যোগানের তুলনায় যে পণ্যের চাহিদা বেশি, সেটার দাম বেশি। সচেতন ব্যবসাযীমহল সেই পণ্যের দিকেই মনোযোগী হন এবং সেটার উৎপাদন বাড়াতে সক্রিয় হয়ে উঠেন। অন্যদিকে যে পণ্যের চাহিদা কম সেটার উৎপাদনশীলতা স্বভাবতই হ্রাস পায়। সক্রিয় উৎপাদকগনও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন।”একটু বুঝি বল বিষয়টা।”এখানে মেয়েদেরকে আমি পণ্যের সাথে তুলনা করছি না। জাস্ট বুঝার সুবিধার্থে উদাহরণ দিচ্ছি। ভুল বুঝিস না। এবার আসল কথা শোন- আমরা ছেলেরা মেয়েদের সৌন্দর্যকে সর্বাধিক প্রাধান্য দেই বলে মেয়েরাও নিজেদেরকে বেশির থেকে বেশি সুন্দরী হিসেবে প্রমাণ করতে দুনিয়া জুড়ে তুলকালাম বাধিয়ে ফেলছে।আবার গুনগত মান, শিক্ষা, দ্বীনদারী ও নৈতিকতাকে সৌন্দর্যের চেয়ে প্রাধনা কম দেই বলে মেয়েরাও নিজেদের গুনগত মান, সুশিক্ষা, দ্বীনদারী ও নৈতিকতা সুদৃঢ়করণে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে।কাজেই নারীদের অগ্রযাত্রা ও সার্বিক উন্নয়নের জন্য পুরুষের চাহিনার ধরণ বদলাতে হবে আগে।সৌন্দর্যের তুলনায় আমরা যখন নারীর গুনগত মান, সুশিক্ষা, স্বীনদারী ও নৈতিকতাকে প্রাধান্য দেব তখন নারীরাও মাত্রাতিরিক্ত রূপচর্চায় মত্ত না হয়ে নিজেদের কোয়ালিটি বাড়াকে সচেষ্ট হবে।

সুতরাং আমরা পুরুষরা আমাদের চাহিদাকে শুধরে নিই, নারীরাও তাদের সাল্লাই দেওয়াটাও শুধরে নেবে। একটু ভেবে দেখ হাসান। সামাজিক এক বিপ্লব হয়ে যেতে পারে যদি এই একটি বিষয় আমরা সংশোধন করে নিতে পারি।

 পৃষ্ঠা-৯৭

এককথায়, নারীরা নিজেদেরকে পুরুষের আকাঙ্ক্ষিত কিছু হিসেবে তৈরি করতে কলা উমটব থাকে। এটা তাদের কখন সাইকোলজি। এখন পুরুষের আকাক্ষাত এরয়াটি করাতে পারলেই গুণগত মান, সুশিক্ষা, দ্বীনদারী ও নৈতিকতাসম্পন্ন শরী প্রতিটি ঘরে ঘরে তৈরি হবে।মেজের তো অভাব নেই, কিন্তু বিয়ের জন্য মেয়ে খুঁজতে গেলে দেখি ভালো কোনো মেয়েই নেই- এই কথাটিকে আমরা খুব শীঘ্রই তাহলে বহিত ঘোষণা করতে পরব ইন-শা-আল্লাহ।’আদিবের কথা শেষ হতেই হাসান বলে উঠল, ‘আমার বিয়ের ঘটকটা যে তুই কেন হলি না…।’ঐ বেটা, তখন তো আমার নিজের জন্যই মেয়ে দেখা হচ্ছিল। সেসময় তোর জন্য কীভাবে কী করতাম?”‘তুম বুঝেছি তুই আমার কেমন বন্ধু।”তী বুঝেছিস জানি না, তবে একবার একজনের জন্য ঘটকালি করতে গিয়ে মেয়ে পক্ষ বরকে নিয়ে কথা না বলে আমার নাম-ঠিকানা জিজ্ঞেস করা শুরু করেছিল। কী একটা ব্যাপার বল তো দেখি! সেই থেকে নাক ধরেছি ঘটকালি আর করব না। অন্তত বিয়ের আগে তো না-ই। বিয়ের পরও কয়েকবাচ্চার বাবা না হওয়া পর্যন্ত এই লাইনে আর উকি দেব না।”দোস্ত, সেই মেয়েটা কে ছিল রো’খুর শালা। আর ভালো হলি না। চল, আজ তোকে মাসুদ ভাইয়ের স্পেশাল চটপটি খাওয়াব।”এসব মেয়েদের খাবারদাবার। গ্রীল খাব আজ।’বা, বাসায় গিয়ে জনালার সবগুলো গ্রিল একটা একটা করে খা। আমি বউয়ের জন্য চটপটি কিনে বাসায় গেলাম।”এই এই দাঁড়া। আরে অ্যাই ব্যাটা দাঁড়া…!”

 পৃষ্ঠা-৯৮

মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ

‘উপার্জনের জন্য বিদেশগমন নাজায়েজ ঘোষণা করা দরকার।’জনিসের কথা শুনে রীতিমতো গা জ্বলে উঠল হাসানের। এক কাজিনের জন্য পরামর্শ চাইলাম, কোথায় একটু পরামর্শ দেবে তা না, উল্টো বয়ান শোনাচ্ছে। এক হটুন রাগ মিশিয়ে নাকমুখ এক করে হাসান প্রত্যুত্তর করল, ‘কী বললি তুই?’অনিব এক-পা পিছিয়ে বিনয়ের সাথে বলল, ‘দাঁড়া, তেড়ে আসবি না। আগে পেন আমার কথা।’শত হলেও আদিব অহেতুক রাগিয়ে দেওয়ার মতো কথা বলার ছেলে না। কিন্তু এমন একটি কথা বলার কারণই বা কী। হাসান ভাবছে। আদিব ওর ভাবনায় ছেদ ছেলে বলল, ‘একটু রিল্যাক্স হয়ে ভেবে দেখ হাসান। আমারা আমাদের পরিবারকে সুখ করতে ও নিজে স্বচ্ছল হতে একগাদা টাকা খরচ করে বিদেশ পাড়ি জমিয়ে যে প্রমানবিক কষ্ট করি, সেই টাকা ও সেই পরিশ্রম যদি দেশে ইনভেস্ট করতাম তবে হমি মনে করি পরিবার নিয়ে বেশ ভালো থাকতাম।কিন্তু সমস্যা হলো আমাদের ইগো। বিদেশ গিয়ে সুইপার হতে বাজি। আর দেশে একটা চায়ের দোকান দিতে বা চটপটি বেঁচতে রাজি না। সেখানে কী মানবেতর জীবন অতিবাহিত করতে হয় তা ভাবলে গা শিউরে ওঠে।মাসুদ ভাইকে তো চিনিস। আজ অনেকদিন হলো আমাদের বাসার পাশেই রূপটি বিক্রি করে। একদিন জিজ্ঞেস করে জানতে পারি, দৈনিক তার ৫-৬ হাজার টাকার মতো বিক্রি হয়। এরমধ্যে ২-৩ হাজার টাকা তার লাভ থাকে। অর্থাৎ মাসে ৬০-৬০ হাজার টাকা। ভাবতে পারিস?’হাসন ক্ষানিকটা বিব্রত বোধ করল। বিশ্বাস হতে চাইল না, একজন উপটিওয়ালা মাসে ৬০-৯০ হাজার টাকা আয় করে। কিন্তু ঐ যে। দেশে থাকলে সবাই চটপটিওয়ালা বলবে। আর বিদেশ গেলে তো ভাবই আলাদা। হই না ঈপর। কেউ কি গিয়ে দেখছে নাকি আমি কী করি না করি….

 পৃষ্ঠা-৯৯

আসলে ঠিক এভাবে বলার জন্য আমি সরি। কিন্তু তোর কাছে মন খুলে কিছু বলতে না পারলে আর বলবই বা কার কাছে বল? আমি জানি, এভাবে বলাই প্রবাসীদের জন্য কষ্টের কারণ হতে পারে, কিন্তু তবুও ধরে নে, একবার ইচ্ছে করেই না হয় একটু কষ্ট দিলাম। তাই তাদের সকলের কাছে আমি সরি বলে নিচ্ছি।আজ কেন এটা করলাম জানিস? আর কেনই বা ক্ষমা চাইলাম। আমি জনি,প্রবাসীরা সেখানে অনেক অবর্ণনীয় কষ্ট করছেন। তাদের মাধ্যমে অনেক বৈদেশিরমুদ্রাও আমরা অর্জন করছি। এই দেশ প্রচুর রেমিট্যান্স পাচ্ছে। কাজেই আমাদেরদেশ ও দেশের রেমিট্যান্স যোদ্ধা এই প্রবাসীদের প্রতি বাহ্যত বিরূপ মন্তন্য করায়আমার এই ক্ষমা চাওয়া। এবার শোন তাহলে কেন এমনটা করলাম।”আচ্ছা বল তোর এমন কথার হেতু, বল।’আদিব পুনরায় বলতে শুরু করল, ‘ইনসাফের সাথে একটু ভাবা উচিৎ। একটি মেয়ে তার শেকড় ছেড়ে অপরিচিত কোনো ছেলের কাছে নিজেকে সলে দেয় কীসের আশায়: এর পেছনে কি কেবল আর্থিক চাহিদাই থাকে? না। থাকে শারীরিক ও মানুষিক কিছু চাহিদাও। স্ত্রী হিসেবে যে মানুষটি আমার ঘরে পড়ে আছে, দিনরাত খেটেখুটে তার আর্থিক চাহিদা তো আমরা সিল্কিা পূরণ করছি। সেজন্য ধন্যবাদ। কিন্তু ভার শারীরিক ও মানুষিক চাহিদা কে পূরণ করবে?সরি টু সো একটি মেয়ে স্বামী ব্যতীত সর্বোচ্চ চার মাস নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। এর বেশী হলে তার খুব কষ্ট হয়। কত কষ্ট? এককথায় ‘খুব কষ্ট’। এটা বলা যায় না। বলার জিনিস না।মেয়েটি যদি খুব বেশি ধার্মিক না হয় সেক্ষেত্রে অধিকাংশ মেয়েই পরকীয়া নামক বিষাক্ত জীবাণুতে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। সামাজিক মূল্যবোধ ধরে রাখতে চাইলে পরকীয়ায় না জড়িয়ে ইন্টারনেটের অন্ধকার জগতে দিনরাত ডুবে থাকে, এবং একপর্যায়ে অনিয়ন্ত্রিত হয়ে গিয়ে নিজের হাত বা অন্যকিছুতে নিজের স্বামী বানিয়ে নেয়। এসব কথা মুখে বলতেও লজ্জা হচ্ছে আমার। কিন্তু তবুও এই সমাজকে বাঁচাতে হলে আমাকে বলতে হবে।তো এর ফলাফল দাঁড়ায়- পরকীয়ার কারণে সামাজিক নানান জটিলতা সহ যত্রতত্র অবৈধ সন্তানের ছড়াছড়ি। আর সমেহনের কারণে স্বামীর চাহিদা ধীরে ধীরে হ্রাস পায়।

 পৃষ্ঠা-১০০

যেীবন ফুরিয়ে টাকার বস্তা নিয়ে স্বামী যখন দেশে আসবে, তখন যদি এদে দেখে স্ত্রী লাপারা, সেটা খুব একটা অস্বাভাবিক হবে না। আর যদি এমনটা সা-৫ এর সেক্ষেত্রে শুরু হবে করণে-অকারণে তিলকে তাল বানিয়ে বেষারেষি আর প্রথমদিনাতা। এভাবে জীবনের অবশিষ্ট প্রতিটি ক্ষণ বিধিয়ে উঠবে।আর মেয়েটি যদি দ্বীনদার ও লাজুক প্রকৃতির হয় তাহলে সে এসব গুনাহে জড়াতে পারে না। আবার কোন সমাধানও পায় না। এমনকি কাউকে এই চাপা কষ্টের কথা বলতেও পারে না।এই ব্যাপারে একবার ডা. রাকিব স্যারকে আমি কিছু প্রশ্ন করেছিলাম। যে সার, এমতাবস্থায় এমন মেয়েদের ঠিক কী ধরণের সমস্যায় পড়তে দেখা যায়? ব্যা কী ধরণের সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়?সারে তখন খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু আলোচনা করেছিলেন। বেশকিছু সমস্যা ও তার সমাধানের কথাও আমাকে বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘এমনসব মেয়েদের প্রচণ্ড মানুষিক চাপ ও বিষন্নতায় শারীরিক ও মানুষিক নানান জটিল সব সমস্যা দেখা দেয়। সারাক্ষণ আনমনা হয়ে থাকা, চেহারা, চুল ও ত্বক উচ্চমুদ্ধ হওয়া, স্বাস্থ্য ভেঙ্গে যাওয়া, ঘুম না হওয়া, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, নির্জনতাপ্রিয় হওয়া, কোনকিছুতেই ভালো না লাগা এমনকি সুইসাইড পর্যন্ত আগাতে পারে।এবার তুই বল, একটা মেয়ের এসব সমস্যার মূল কারণ যেটা, তার স্বামী দূরে থাকা, এই কথা, এই ব্যথা সে কোথায় বলবো কার কাছে বলবে।’আদিবের কথাগুলো হাসান খুব মন দিয়ে শুনছে। এই পর্যায়ে এসে হাসান অদিবকে জিজ্ঞেস করল, ‘তো স্যার কি স্পেসিফিকভাবে কোনো পেসেন্টের অবস্থা শেয়ার করেছে? বা তুই জিজ্ঞেস করেছিস? না নীতিকথার মত কিছু শুনিয়ে দিল আর তুইও সেটা….হাসানকে থামিয়ে দিয়ে আদিব বলল, ‘না, স্যারকে তখন আমি স্পষ্ট জিজ্ঞেস করেছি, স্যার, এধরণের কোনো পেসেন্ট আপনি পেয়েছেন কি না?”তো স্যার কী বলল?’স্যার তখন বলল, এধরণের অনেক পেসেন্ট আসে। একবার এক পেসেন্ট এসেছে ব্যথা নিয়ে। পুরো শরীর ব্যথা। বিশেষকরে বুকে ও মাথায়। কিছু খেতে পারে না। দিনদিন চুপসে যাচ্ছে। হাসপাতাল ঘুরে ঘুরে ফকির হবার পালা এবার।

পৃষ্ঠা ১০১থেকে  ১২০

পৃষ্ঠা-১০১

কোন রোগ ধরাও পড়ছে না। আবার সারয়েও না। হিস্ট্রি শুনে দেখি কোন এক কারণে তার স্বামী আজ দীর্ঘদিন যাবত তার কাছ থেকে দূরে একটু টায় দিয়ে ক্রিয়ার হলাম এটাই তার এই অসুস্থতার কারণ। হ্যাঁ, এটাই।এই কয়েকদিন আগেও আরেক পেসেন্ট এসে কো সরাসরি অভিযোগই করে বসল তার স্বামীর ব্যাপাবে। সে চায় তার স্বামী দেশে থেকে দিন আনবে দিন যাবে। তবুও সে তার পাশে থাকুক। কিন্তু এটা তাকে না পারছে বলতে না পারছে সইতে। শেষমেশ সমেহনের দ্বারা শারীরিক কোন ক্ষতি হয় কি না জানতে চাইল। আমি অবাক হইনি। অবাক হওয়ার কিছু নেই-৩। খুব অল্প দিনেই এই পেশায় বিচিত্রসর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। কী করবে এখন বেচারি: কপট রাগ বা ধূণা না দেখিয়ে ঠান্ডা মাথায় এর ক্ষতিকর প্রভাব ও গুনাহের বিষয়টি তাকে জানিয়ে দিই। এবং ধৈর্য ধরার পরামর্শের পাশাপাশি এটাও বলে দিই- অনেক চেষ্টার পরেও আপনি যদি একান্ত অপারগ হন, কোনো প্রকার সমাধানের পথ না পান তাহলে আপনার অভিভাবক ডেকে ভিন্ন ব্যবস্থা নিতে পারেন। অর্থাৎ বিচ্ছেদ ঘটিয়ে অন্য স্বামী গ্রহণ করতে পারেন। যদিও এটা বলতে আমার শুরু কাঁপছিল, কিন্তু তার কন্ডিশন দেখে তার বেঁচে থাকার স্বার্থে এমনকিছু না বলেও আমি পারিনি।আমার কথা শুনে তিনি কেঁদে ফেললেন। শুধুমাত্র সন্তানের কথা ভেবে তিনি সবকিছু মেনে নিয়ে নিজেকে শেষ করে দিতেও রাজি হয়ে চুপ হয়ে গেলেন। শেষে বললেন, আমার সন্তানের জন্য নিজেকে আমি উৎসর্গ করে দিলাম স্যার। আমি অন্যকিছু ভাবতে গেলে ওদের জীবনটা নষ্ট হয়ে যাবে। এরপর আমাকে ধন্যবাদ দিয়ে চলে গেল। সেই মুহূর্তে কিন্তু সময়ের জন্য আমি বাকরুদ্ধ ছিলাম।স্যার এই পর্যন্ত বলে থামলেন। আচ্ছা হাসান, এই পেসেন্টের স্থানে তোর বোন থাকলে তুই কী করতি। আর ডাক্তারের ভূমিকায় তুই নিজে থাকলে তখন-ই বা এই পেসেন্টকে ঠিক কী পরামর্শ দিতি। তোর কাছে কি আছে এর কোনো বিকল্প?’আদিবের কথাগুলো হাসানকে স্তব্ধ করে দিল। কী বলবে কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। সেটা বুঝতে পেরে আদিব পুনরায় বলল, ‘এজন্য হযরত ওমর ফারুক রা, বিবাহিত মুসলিম সৈন্যদের চার মাসের বেশি বাইরে রাখতেন না। এমনকি বর্তমানে বিশ্বব্যাপী প্রচলিত ‘দাওয়াত ও তাবলীগ’-এর শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরামের নিকট থেকে জিজ্ঞেস করে জেনেছি যে, সেখানেও তাদের সফর করার সময়সীমা একাধারে সর্বোচ্চ চার মাস। ছয় মাস বা এক বছরের জন্যও অনেকে যায়, তবে সেক্ষেত্রে সে বিবাহিত হলে চার মাস পর তাকে তার বাড়িতে যাওয়ার জন্য সুযোগ করে দেওয়া হয়। অথবা তার এলাকার কাছাকাছি কোনো জামাতের সাথে তাকে দেওয়া

 পৃষ্ঠা-১০২

নকলা তার তীর পূর্ণ সমর্থন নিয়ে এবং তার অন্যান্য খাপতীয় চাহিদা পূরণ করে লোপা নিশ্চিত করে এরপর যায়।অর্থ উপার্জনের জন্য বিদেশগমনের এই ব্যাপারটিতে কোন ফতোয়া আছে কি না জানি না, যদি না থাকে তাহলে দেশের শীর্ষস্থানীয় ওলামাদের প্রতি একটি মনখাত পেশ করব যে- দুটি শর্ত পূরণ করতে না পারলে বিবাহিত পুরুষদের জন্য বিদেশগমন নাজায়েজ ঘোষনা করা হোক।১। বিদেশে যেতে চাইলে বিয়ের আগে যতদিন ইচ্ছা থেকে আসুক। কিন্তু বিয়ের পর বিদেশে গেলে তার স্ত্রীকে সাথে করে নিয়ে যেতে হবে। নতুবা চারমাস পরপর দেশে এসে স্ত্রীকে ন্যূনতম কিছু সময় দিতে হবে।২। এর বেশি থাকতে হলে আগে স্ত্রীর সন্তুষ্ট বিধান নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি তার শারীরিক, মানুষিক ও আদর্শিক বিপর্যয় যাতে না ঘটে সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।কোনো প্রকার ফাঁকফোকর এখানে একদম চলবে না। হীকে সাধারণভাবে পাশ ঝটিয়ে গেলেও হবে না। ভাসাভাসা একটা কিছু জিজ্ঞেস করে ফর্মালিটি রক্ষা করলে হবে না। একান্ত সময়ে তার মনের প্রকৃত অভিব্যক্তি জানতে হবে। এরপর সিদ্ধান্ত। ভয় হয়, তাদের ভরণপোষণের জন্য এত কষ্ট করার পরেও ময়দানে। হাশরে তাদের এই হকু অনাদায়ে না আবার পাকড়াও হতে হয়। তাই এসব মামলা এখনই ঢুকিয়ে নেয়া উচিত। আল্লাহর পানাহ…..একান্ত অপারগ হয়ে কথাগুলো বললাম। পরকীয়া আর সমেহনের বিষাক্ত পয়জনে আমার বোনদের স্বাস্থ্য, ঈমান, আমল সব শেষ হওয়ার পাশাপাশি সমাজিক অবকাঠামো আজ একেবারে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। তাই প্রবাসী ভাইদের প্রতি এবং যারা প্রবাসে যেতে চাচ্ছে তাদেরকে করজোড়ে আবেদন করব- বিষয়টি আমলে নিয়ে আমাদের এই সমাজকে সামাজিক অবক্ষয় ও ধ্বংসের হাত থেকে বচান। আমার এই আবেদনটি প্রধাসে যেতে চাওয়া তোর সেই কাজিনকে পৌঁছে দিতে পারবি হাসান?’আদিবের কথার প্রেক্ষিতে এক দীর্ঘশ্বাস হাসানের। দোদুল্যমান হয়ে আদিবের প্রতি অপলক তাকিয়ে আছে। কাজিনকে এই কথাগুলো পৌঁছাতে পারবে কি না ভাবছে। ঠিক কীভাবে শুরু করবে আর কোথায় গিয়ে শেষ করবে সেটাও নির্ণয় করার চেষ্টা করছে। কিন্তু ওদের সাংসারিক টানাপোড়েনের কথা মাথায় আসতেই সবকিছু যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। শেষমেশ অস্ফুটে বলল, ‘আদিব, তোর কথাগুলো মোটেই ফেলনা নয়।

 পৃষ্ঠা-১০৩

কিন্তু ওদের সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় প্রবাসে যাওয়ার কোনো বিকল্পও যে আপাতত দেখছি না। এমতাবস্থায় এই কথাগুলো আমি ওকে কীভাবে বলি।হাসানের কাঁধে হাত রেখে আদিব বলল, ‘শোন, বুঝতে পারি আমি, একটা নিম্নবিত্ত পরিবার ঠিক কোন পর্যায়ে এসে ভিটেমাটি বেঁচে হলেও পরিবারের ছেলেটিকে প্রবাসে পাঠায়। আগেই বলেছি, এর সমপরিমাণ শ্রম ও টাকা যদি দেশে ইনভেস্ট করতে পারতো তাহলে হয়তো কিছু একটার ব্যবস্থা হয়েই যেত। কিন্তু তবুও যদি একান্তই নিরূপায় হয়ে পড়ে, সেক্ষেত্রে তার স্ত্রী, মা-বাবা সহ পরিবারের সবাইকে কিছু বিষয় খোলাখুলিভাবে বলা উচিত।”যেমন?”‘যেমন, একান্ত নিরিবিলি একটা সময় বেছে নিয়ে তাদেরকে কথাগুলো খুব গভীরভাবে বুঝানো। তুই নিজেই কাজটির দায়িত্ব নে।”হুম, তুই।”আচ্ছা কীভাবে কী বলতে হবে এক্ষেত্রে একটু হেল্প কর তাহলে।”শোন, জন্মের পর শিশুকাল পেরিয়ে কিশোর থেকে আজ আমি একজন পুরুষ। একটি পরিবারের ড্রাইভার, ইঞ্জিন, ডিজেল সবই আমি। আবেগ, অভিমান আর ভালোবাসা আমারও আছে। আছে আর দশজনের মত একটি মন। আছে অন্যদের মত কিছু আশা আর স্বপ্ন। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, আমি এখন পুরুষ। এই আমার ওপর নির্ভর করছে একটি পরিবারের মা-বাবা, ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তান প্রত্যেকের একগাদা স্বপ্ন, আশা আর আকাঙ্ক্ষা। তাদের প্রতি দায়িত্বশীলতার ভারে ন্যুজ হয়ে পড়া এই আমি’র তেমন কোন আশা ও স্বপ্ন আজ আর বেঁচে নেই। বেঁচে থাকলেও তাতে প্রাণ নেই। প্রাণ থাকলেও সেদিকে ফিরে তাকানোর যোঁ নেই।দিগ্বিদিক হয়ে আমার এই ছুটে চলা, বায়োডাটা নিয়ে অফিসে অফিসে দৌড়ানো, কোটা নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় আন্দোলন করে বেড়ানো, শেষমেশ দিশা হারিয়ে বিদেশ পাড়ি জমানো এসবকিছু বৃদ্ধ মা-বাবা আর অসহায় স্ত্রী-সন্তানের চাঁদমুখের একফালি হাসি দেখে মরতে পারার জন্য।হ্যাঁ, এভাবে মরতে পারাও যে অনেক শান্তির। ক’জন পারে এই হাসিটুকু ফুটানোর পর মরতে। অফিসে অফিসে দৌড়ে ব্যর্থ হওয়া দেশের লক্ষাধিক বেকায় যুবকরা পারেনি, সরকারি চাকরিতে কোটার ফ্যারে পড়ে অনেক মেধাবীরাও পারেনি, বিদেশ পাড়ি দিয়েও দালালের খপ্পরে পড়ে আরও অনেকেই পারেনি।

 পৃষ্ঠা-১০৪

হাত। আমি যদি সেই হাসিটুকু ফুটিয়ে মরতে পারাদের দলে থাকতে পারতাম। এই অকৃতি প্রতিটি পুরুষের। প্রতিটি ছেলের। প্রতিটি বাবার। প্রতিটি স্বামীর…বোনদের উদ্দেশ্য করে বলছি- হ্যাঁ বোন, আমি এসব সত্যি বলছি। পুরুষেরা রক্তের প্রতিটি অণুচক্রিকায় মিশে আছে এই একটি মাত্র আকৃতি। তাদের এই প্রকৃতির রেশ হয়তো আপনাদের পর্যন্ত পৌঁছে না। কার্যত পৌঁছতে দেওয়া হয় না। গ্রসলে পৌঁছতে দেয় না এই পুরুষগুলো।এরপরেও দিনশেষে আপনার চাহিদার পরিধি যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, আপনার খমীর সামর্থ্যকে ডিঙ্গিয়ে যায় তখন বেচারা স্বামী কতটা হীনমন্যতায় ভোগে জানেনা কতটা লজ্জা আর হতাশায় কুঁকড়ে ওঠে জানেন। যতটা গরমে নিরীহ কোন প্রণী জিহ্বা বের করে হাসফাস করতে থাকে ততটা। যতটা শীতে কাঁপুনির প্রকোপে দেহটা আড়ষ্ট হয়ে যায়, রক্তকণিকা জমাট বেঁধে যেতে চায় ঠিক ততটা।উপায়ন্তর না পেয়ে অবশেষে চোখ বন্ধ করে হাত চালায়। আপনারআকাশছোঁয়া চাহিদা মিটানোর অভিপ্রায় নিয়ে সে হাত গিয়ে পড়ে কখনও কারোমাথায়, পিঠে আর কখনো গলায়…। চুরি, ডাকাতি, সুদ, ঘুষ, স্মাগলিং আর দুর্নীতিসহ নানান অপরাধমূলক বিষয়ের সাথে যে সকল পুরুষগুলো জড়িত এরা প্রত্যেকেইকিন্তু আপনাদেরই কারো না কারো স্বামী।বোন। একান্ত সময়ে পবিত্রতার মিষ্টি ছোঁয়া তার কপালে চুঁইয়ে যদি বলতেন- আমি পাঁচতলা নয়, টিনসেডেই আমার জান্নাতি বাগান ফুলেফনে ভরাতে চাই। নিতা মছ-গোস্ত নয়, ডালভাতে জীবন কাটাতে চাই। কিরণমালা, জামদানি আর নামী নদী ব্রান্ডের কসমেটিক্স নয়, সাদামাটা সুতি কাপড় আর পূর্ণিমার জ্যোৎস্না মেখে তোমার রানী সাজতে চাই।তাহলে আমার মনেহয় কমনসেন্স আছে এমন কোন পুরুষ আর অবৈধ পথে পা বাড়াবে না। আপনাদের সবাইকে ছেড়ে পারিবারিক বন্ধন আর ভালোবাসার ঘাড় নাড়িয়ে বছরের পর বছর স্বেচ্ছায় প্রবাস নামক কারাবাস গ্রহণ করবে না।হে বোনা আপনার চাহিদাকে আপনি আমার ভাইয়ের সামখোর ভেতরে গুটিয়ে দিন, আমি আশাবাদী- আমার ভাই আপনার অন্যান্য সকল চাহিদা পূরণ করা ও আপনাকে একান্তে সময় দিতে আর অক্ষমতা প্রকাশ করবে না ইন-শা-আল্লাহ…..ব্যস, এভাবে বলতে পারবি না?’

 পৃষ্ঠা-১০৫

আদিব থামলো। হাসান কিছুক্ষণ মাথা চুলকিয়ে বলল, ‘আচ্ছা অমর কাজিনের বাসায় তুইও না হয় চল একদিন আমার সাথে।’আদিব ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে প্রত্যুত্তর করল, ‘এমন গা বাঁচিয়ে চলা বাদ দিয়ে দায়িত্বশীল হতে শেখ। মেয়েরা দায়িত্বশীল স্বামী পছন্দ করে। শুধু-শুধুই কি অর ভাবি আমার ওয়াইফের কাছে নালিশ দেয়? আহারে বেচারি। এই বলদ বন্ধুটাকে নিয়ে আমার জীবনটাই তো শেষ। সে যে কীভাবে আছে কে জানে…।”শেষমেষ বাঁশটা না দিলেও পারতিস। আচ্ছা তোর যেতে হবে না। যেভাবে পাবি মেনেজ করে নেব।”এবার তাহলে একটা ধন্যবাদ দে।”মানে?”এই যে বাঁশ দিয়ে হলেও তোকে একটা কাজের জন্য তৈরি করতে পেরেছি। এজন্য একটা না, মিনিমাম কয়েকটা ধন্যবাদ আমি পেতেই পারি।’হাসান কপট রেগে গিয়ে বলল, ‘আচ্ছা ধন্যবাদ আদিব স্যার। ধন্যবাদ অদিব সাহেব। বন্যবাদ আদিব ভাই। ধন্যবাদ শালা আদিব্বা…।’আদিব হেসে ফেলল।

 পৃষ্ঠা-১০৬

পারিবারিক পেসক্রিপশন-১

‘মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ‘মগ’ নামে স্পেসাল একটি পার্ট/কম থাকে। সেটা জানেন তো?এখানে কোন অপারেশন করা হয় না, কোন ডাক্তার এখানে পেসেন্টও দেখেন। না। এখানে কিছু বর্জ্য রাখা হয়। যেটা জগতের সর্বোচ্চ ভয়ঙ্কর বর্জ্য। সেখানে এসব বর্মী না থাকলেও সাধারণ কোন মানুষ সহজেই সেখানে যেতে সাহস পর্যন্ত করে না।এটা কী এমন বর্জ্য যে, এর অনুপস্থিতিতেও মানুষ ঐ স্থানকে ভয় পায়? শুনুন তাহলে, এখানকার বর্জ্য হলো লাশ। মানুষের লাশ।হাসপাতালে চিকিৎসারত শতশত মানুষ যখন এই মর্গের বর্ষের্জ পরিণত হয় তখন এই মর্গটিতে একটি ভৌতিক অবস্থা বিরাজ করে। একদিকে নিটোল নিস্তব্ধতা আর অন্যদিকে কিছু কর্কশ শব্দের কলিজা চেরা আর্তনাদ। ভাবতেই লোমকূপ সতেজ হয়ে উঠছে…হাসপাতালে প্রতিনিয়ত মৃতের প্রিয়জনদের বিকট চিৎকারের কানফাটা আওয়াজ চতুর্দিকের দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। শরীরের এনট্রিকুন ফুরিয়ে গেলে কেউ সেখানেই নেতিয়ে পড়ে সেন্সলেস হয়ে যায় আবার কেউ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে নিরেট পাথর হয়ে যায়।আশ্চর্যের কথা কী জানেন? আমার কাছে এই অংশটিকে তেমন ভয়ঙ্কর মনে হয় না। এ যেন, স্বাভাবিক জীবনচক্রের অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ। জি. এটা জীবনচক্রের খুবই স্বাভাবিক এবং অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ। আমার কাছে ভয়ছা মনে হয় জীবনের সেই অংশটিকে যখন কেউ মর্গে না গিয়েও মর্গের বজ্যে পরিগড হয়। কেউ তার জন্য তখন কাঁদে না, আর কাঁদবেই বা কেন? সে তো এখনও জীবিত, বর্জ্য হয়ে উঠেনি। হয়ে গেলে তখন না হয় একদফা দেখা যাবে। এখা অহেতুক কাউকে নিয়ে এসব ভেবে ইমেজ নষ্ট করে কাজ নেই।

 পৃষ্ঠা-১০৭

জানেন? কেন যেন মর্গের ঐ প্রতিধ্বনিত কর্কশ আওয়াজের চাইতে কিছু মানুষের হাসির আওয়াজ আমার কাছে অনেক বেশি ভয়ঙ্কর মনে হয়। ঐ আওয়াজ জামার কানে পৌঁছে আমাকে অনেকটা ভাবিয়ে তুলে ঠিকই, কিন্তু ভীত করতে পারে র। কিন্তু সেই জীবিত মানুষগুলোর হাসি কেন যেন হৃদয়টাকে তোলপাড় করে আমাকে মূর্ছা যাবার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে চায়….গুড় হয়ে যাই এদের হাসির মাঝে লুকায়িত অব্যক্ত আর্তনাদ দেখে। খুব ইচ্ছে হয় এদের বুকের ভেতর থেকে সকল অবাঞ্ছিত অনুভূতিগুলোকে সিরিঞ্জ দিয়ে টেনে বের করে ফেলি। আর মুখে একচিলতে হাসি এনে দিই। জীবনের অবশিষ্ট সময়টুকুন অন্তত একটি জীবিত মানুষের পূর্ণ স্বাদ আস্বাদন করুক এরা…এদের খুব ইচ্ছে হয়, কেউ একজন এসে একটু বুকে টেনে নিয়ে পিঠ চাপড়ে দিয়ে কানে ফিস ফিস করে বলুক, এই বোকা, কিচ্ছু হবে না, সব ঠিক হয়ে যাবে ইন-শা-আল্লাহ, আমি আছি তো। এইতো আমি…।ডা. বাকির বেশ ইমোশনাল হয়ে পড়লেন কথাগুলো বলে। আদিব অবশ্য আজ মসনকে নিয়ে আসেনি। আজ ওর এক দূরসম্পর্কের বোনের জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিতে এসেছে। আদিবের কথার প্রেক্ষিতে ডা. রাকিব এসব কথা বলছিলেন।বোনটির অনেকগুলো সমস্যা। কোনটা রেখে কোনটার জন্য পরামর্শ দেবে? তাই তিনি আদিবের কাছে বোনটির বিস্তারিত জানতে চাইলেন। সে-সব শুনে তিনি কলম আর প্যাড সাইডে রেখে বললেন, ‘সব চিকিৎসা মেডিসিন দিয়ে হয় না। সুস্থতার জন্য এর বাইরেও অনেককিছু আছে।’ডা. রাকিব আরও বললেন, ‘আচ্ছা মি. আদিব, আপনার সেই বোন কি অস্বাভাবিক কান্না করে? নাকি অনুভূতিহীন পর্যায়ে চলে গেছে?’আদিব বলল, ‘জি স্যার, অঝোর ধারায় কাঁদতে থাকে। এজন্য তো সর্দি-কাশি আর মাথাব্যথাও লেগে থাকে।’ডা. রাকিব দীর্ঘশ্বাস ফেলে পুনরায় বলতে লাগলেন, ‘কিছু অরু আসলে পানি না। এটা ক্ষরিত রক্তের রূপান্তরিত রূপ।’ডা. রাকিবের এই শক্তপোক্ত বাক্যটি শুনে আদিব কপাল কুঁচকালো। ‘সরি, ঠিক কী বুঝাতে চাইলেন স্যার? বুঝতে পারিনি।’

 পৃষ্ঠা-১০৮

ডা. রাকিব স্থীর চিত্তে বললেন, ‘অনুভূতিরা খুন হয়ে বুক চিরে যে রক্তিম প্রোর প্রবাহিত হয়, সেখান থেকে এক আঁজলা রক্ত প্রক্রিয়াজাত হয়ে রঙ বদলে টুপটুপ করে চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে। রঙ বদলায় এই কারণে যে, যাতে কেউ তার রক্তক্ষরণের বিষয়টি বুঝতে না পারে। তাই সে স্বচ্ছ পানির রঙ-কে বেছে নেয়। এতে সবাই এটাকে সাধারণ পানির মতোই মনে করে।এসব পানি মনস্তাত্ত্বিক ল্যাবে ডায়াগনোসিস করলে, কলিজা বিদীর্ণকারী আর্তনাদ, স্বপ্নভঙ্গের তরুণ কীর্তি, নিপীড়িত হওয়ার অব্যক্ত কথন, কথার রীডুবানে মৃতপ্রায় এবং সর্বস্বহারা এক নিরীহ ক্ষতবিক্ষত সত্তার নির্জীব উপস্থিতি স্পষ্টভাবে পাওয়া যাবে।

একে যদি প্রিন্ট করা সম্ভব হতো, তবে এর প্রতিটি অক্ষর হিরোসিমা নাগাসাকির পরিণতির মতকরে জাগ্রত’ বিবেক সত্তাকে কষ্টানুভূতির বিষক্রিয়ায় ধ্বংসস্তুপে পরিণত করে ছাড়তো। দেহের প্রতিটি অণুচক্রিকাকে প্রবল গতিময় করে উচ্চরক্তচাপের অভ্যুদয় ঘটাতো।একে যদি নিক্তি দিয়ে পরিমাপ করার সুযোগ থাকতো, তবে এর মরে লুকায়িত কষ্টের তীব্রতা ঐ নিক্তির লৌহদত্তকে নুইয়ে দিতো।একে যদি গাণিতিক ধারায় বিশ্লেষণ করার সূত্র আবিষ্কৃত হতো, তবে এর সমাধানে খুবই সামান্য একটু কেয়ারিং-শেয়ারিং, একচিলতে নির্লোভ হাসি ও এক টুকরো মিষ্টি কথাই প্রমাণিত হতো। আর একটা কথা কী জানেন?’ এই বলে তা রাকিব থামল।অদিনের নিকট তার কথাগুলো বেশ কঠিন মনে হলো। কয়েকবার শুনতে পারলে হয়তো বুঝা সহজ হতো। তবুও আরও কিছু শোনার আগ্রহ নিয়ে আদিব অস্ফুটে প্রত্যুত্তর করল, ‘জি বলুনা’ডা. রাকিন পুনরায় বলতে শুরু করলেন, ‘মানুষের-ইচ্ছেগুলো বড্ড বেয়ারা হয়। ভাবনাগুলো বেজায় বেপরোয়া হয়। উদ্ভট হয়।কখনও কখনও এই ইচ্ছে আর ভাবনাগুলোকে উগড়ে দিয়ে হালকা হতে হয়। স্থীর হতে হয়। কিন্তু যথোপযুক্ত ক্ষেত্রের অভাবে ইচ্ছে আর ভাবনায়া বুক চিরে বেরুতে না পেরে ভেতরটাকে ঠুকরে খেতে থাকে।

 পৃষ্ঠা-১০৯

শিকারকৃত মুক্তিকামী পাখি যেমনটি করে খাচার প্রতিটি শিক তার ঠুনকো সেটের আঘাতে টুক টুক করে ভাঙতে চায় ঠিক তেমন করে। বড়শিতে আটকে পড়া মাছ যখন বাঁচার শেষ চেষ্টা হিসেবে নিজের ঠোঁট ছিড়ে হলেও ছুটতে চেয়ে এদিক-ওদিক ? মারে ঠিক তেমন করে। শ্রাবণের আকাশ ঘন ভারী মেঘে উইটুম্বর হয়ে যেমন করে প্রহর গুনে হঠাৎ আছড়ে পড়ে ঠিক তেমন করে।খুব ভয় হয়। ইচ্ছে আর স্বপ্নভঙ্গের ক্রমাগত আঘাতে বেদনার নীল রক্তগুলো চিনকি দিয়ে নাকমুখ দিয়ে রূপবাপ করে না আবার বেরিয়ে পড়ে। হৃৎপিন্ডের ভেইন, আর্টারিগুলো না আবার টাস-টাস করে ফেটে রক্তগুলো উপচে পড়ো মস্তিষ্কের সৃদ্ধ অাটারিগুলো চিড়চিড় করে ছিড়ে ব্রেইনটা রক্তকণিকায় না আবার লালেলাল হয়ে যায়। চক্ষুষয় ছিটকে বেরিয়ে পড়ে পুরো দুনিয়াটা না আবার আঁধারে ছেয়ে যায়।মি, আদিব সাহেব, আসলে কী জানেন। অনুভূতিহীনদের দৃষ্টিগোচরে অনুভবের বাজো প্রতিনিয়তই এসব ঘটে চলছে। সম্মুখের তরতাজা মানুষটির এমন বিভৎস প্রতিমূর্তি সকলে আঁচ করতে পারে না। যারা পাবে, চাইলেই তাদেরকে কাছে পাওয়া যায় না।প্রতিটি মানুষের ইচ্ছে আর ভাবনাগুলোর অবাধ বিচরণের জন্য একটি যথোপযুক্ত ক্ষেত্রের খুব প্রয়োজন। আর সেটা খুব বেশি দেরি হয়ে যাবার আগেই।এই কীসব আবোলতাবোল বকছি আমি। যা হোক, তো আপনার বোন এই মুহূর্তে কোনো মেডিসিন গাছে কিআদিব মুহূর্তের জন্য কোথাও হারিয়ে গিয়েছিল। স্যারের বর্ণনার গভীরতা আর চিন্তার প্রববতার মাঝে নিজেকে খুজে বেড়াচ্ছিল। শেষমেশ স্যারের প্রশ্ন শুনে সম্বিত ফিরে পেয়ে ধীর কন্ঠে বলল, ‘স্যার, অনেক মেডিসিনই তো খেয়েছে। দয়াগনোসিসও করেছে। কোনো ফলাফল নেই। কোনো প্রবলেমও ধরা যাচ্ছে না।’ডা. রাকিব টেবিলে রাখা পানির বোতল থেকে কয়েক ঢোক পানি খেয়ে আদিবকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘আসবে মি. আদিব, আপনার বোনের সমস্যার মূল কারণ যেটা বুঝলাম সেটা হলো সাইকোলজিক্যাল প্রব্লেম। এর অন্যতম প্রধান কারন হলো মানুষিক প্রেশার ও টেনশন। জেনারেলি এসবের সূত্রপার হয় পারিবারিক বিষয়কে কেন্দ্র করে। বিষয়টা আপনিও কিছুটা জানিয়েছেন। এবার দামি আমার দিক থেকে বলি।

 পৃষ্ঠা-১১০

প্রথমর পারিবারিক বিষয়গুলোর মধ্যে আছে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে সন্দেহ কর, একে অন্যের প্রতি অনাস্থা, একের ইচ্ছার বিপরীত অন্যজন চলা, শারীরিক কোন অক্ষমতা, তুচ্ছ বিষয় নিয়ে কথা বাড়ানো, বউ-শাশুড়ীর মনোমালিন্য, ছেলে-মেয়ে। অবাধ্যতা, অর্থিক অস্বচ্ছলতা, সেক্রিফাইজ হীনতা, পরকীয়া সম্পর্ক, নিজেরে উইৎআউট কন্ট্রল রাখা ইত্যাদি ইত্যাদি….এখন আমাকে এটা বলুন, এগুলোর মধ্যে কোন বিষয়টি আপনার বোনেরঅদিব একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘অনেকগুলোই আছে, তবে আমার কাছে যেটা প্রধান সমস্যা বলে মনে হয় সেটা হলো একের ইচ্ছার বিপরীত অন্যজন চলা। অর্থাৎ কেউ কারো মনমতো চলে না। কথা শোনে না। বোনটি চায় তার স্বানী দ্বীনের পথে চলুক। আর তার স্বামী চায় সে মর্ডান হয়ে চলুক। এখান থেকেই মূলত ডা, রাকিব বললেন, ‘জি বুঝতে পেরেছি ব্যাপারটি। এখানে আসলে প্রথমেই একটি বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে যে, প্রতিটি মানুষই তার নিজস্ব চিন্নাধারার বাস্তবায়ন করতে চায়। সবাইকে তার সেই কল্পিত পথে হাটাতে চায়; বিশেষকরে খমী-স্ত্রীর যাবে বিদায়ট খুবই প্রকট। হোক সেটা ভুল বা সঠিক। এক্ষেতে কোনপ্রকার আপত্তি সে মেনে নিতে চায় না, আর তাতেই ঘটে বিপত্তি…মনে রাখা দরকার, স্ত্রীর যেমন কিছু ইচ্ছা থাকে যে, আমার স্বামী এভাে এক্সাবে চলবে, নামায় পড়বে, সুন্নাতের উপর-ধীনের উপর চলবে ইত্যাদি। তেমনি স্বামীরও কিছু ইচ্ছা থাকে যে, আমার স্ত্রী এভাবে এভাবে চলবে।তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বামীর গতিতেই স্ত্রীর স্বপ্ন সব ভেস্তে যায়, খুব অল্পসংখ্যক নারী তাদের পরম ভালবাসা আর আপ্রাণ চেষ্টার মাধ্যমে তার পাত্রের বড়ব্যান করতে পারে।এমতাবস্থায় উক্ত কারণে এবং শ্বশুরালয়ের সবারই উন্নভাব, ষ্টীদের ব্যপার উদাসিনতা ইতাদির কারনে স্ত্রী সিমাহীন মানুষিক চাপ ও টেনশনের শিকার হন। এমনকি অনেকে মারাত্মকলবে অসুস্থও হয়ে পড়েন।এমন অনেক শেসেন্ট দেখা যায় যে, তাদের অনেক পরীক্ষা-নিরিস্কার করার ফিজিক্যালি কোন সমস্যাই ধরা পড়ে না। বিভিও পেইন ইত্যাদি সমস্যায় ভখো ইঞ্জেকশন মেডিসিন দিয়েও নো রেসপন্স…।

 পৃষ্ঠা-১১১

অবশেষে ফুল লাইফ হিস্ট্রি শুনে বুঝতে পারি আলোচ্য সাংসারিক বিষয়টিই এর সমস্যা। তাকে অনেকটা সময় দেওয়া এবং তার ভেতরের কথাগুলো শোনার মথমে বিষয়টি হ্যান্ডেল করার চেষ্টা করি। কিন্তু পেসেন্ট মহিলা হওয়ার কারনে তারপুর হ্যান্ডেল করা সম্ভব হয়ে উঠে না। এক্ষেত্রে কোনো মহিলা ডাক্তারের কাছে রেফার করে দিই।একবার প্রচণ্ড বুকে ব্যথার সাথে পেটেও মৃদু ব্যথা, নিদ্রাহীনতা, অরুচি, মাখা বখা, মাথা ঝিম ঝিম করা, ইরেগুলার মিন্সট্রুয়েশন এবং ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে এক পেমেন্ট আসে। ইতিপূর্বে অনেক ট্রিটমেন্ট নিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি নিঃসন্তান, তো সন্তান ধারণের জন্যও ট্রিটমেন্ট চলছে। কিন্তু কোনো কিছুতেই নো রেসপন্স।পরে তার সাথে আসা বাবার কাছে জানতে পারি যে, সে প্রায় ১০ বছর যাবত বিসন্তান। শ্বশুরালয়ে গেলেই তার এই ব্যখা প্রকটভাবে বেড়ে যায়। বাবার বাড়িতে অসঙ্গে তুলনামূলক কিছুটা ভালো থাকে। তাই বছরের অধিকাংশ সময় বাবার বাড়িতেই সময় কাটাচ্ছে।এখন আর বুঝতে বাকি নেই যে, তিনি তার শ্বশুরালয়ের অমানুষিক টর্চারের স্বীকার। হোক সেটা শারীরিক কিংবা মানষিক।এধরনের শেসেন্ট সাধারনত প্রচন্ড মাথা ব্যাথা, বুকে ব্যাথা, অস্থিরতা, নিম্নতা, নিদ্রাহীনতা, অরুচি, ভগ্ন স্বাস্থ্য, চোখের নিচে কালো দাগ পড়া ইত্যাদি সমস্যা নিয়ে আসে।কো এদের ক্ষেত্রে করণীয় হলো-

১। এ ধরনের পেসেন্টদের প্যাথলজিক্যাল কোন রিপোর্ট সো করে না। মেডিসিনেও তেমন ইম্প্রভ করে না। তাই অযথা এদিক-ওদিক অর্থ অপচয় না করে কোন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়ার পাশাপাশি তার সমস্যাটি সমাধানের চেষ্টা করাই বেটার অপশন।

২। তাকদিরে আল্লাহ তা’য়ালা যা রেখেছেন সেটাই হবে। তাই টেনশন না করে আগত অবস্থার সমাধানের জন্য চেষ্টা ও দোয়া করা। যিনি এই অবস্থা দিয়েছেন, তিনিই পারেন এর সমাধান করতে। তাই তার কাছেই সমাধান রান।

 পৃষ্ঠা-১১২

৩। টেনশনের দ্বারা কোন রেজাল্ট আসে না, বরং অবস্থা আরও জটিল হয় এবং নিজের অবস্থাও হয় কেরোসিন। যদি টেনশন করলে অবস্থার উন্নতি হ তবে বলুন, আমি নিজেও সবার পক্ষ থেকে দৈনিক ঘণ্টাখানেক টেনশন কার দিই।এই পর্যন্ত এসে আদিব হেসে ফেলল। ডা. রাকিব অবিরত বলতে থাকলেন।

৪। যতই বলি টেনশন এসেই পড়ে? তবে যখনই টেনশন হয় যায়ে সাথেই নিজেকে কোন কাজে লাগিয়ে নিন। চিন্তাকে কনভার্ট করে দিন। পারলে অযু করে দু’রাকাত নামাজ পড়ে নিন, ফ্রেশ লাগবে।

৫। কোন বিষয় সিরিয়াসলি নেবেন না। ইজিলি হ্যান্ডেল করতে এই করুন। আর ভাবুন যে, আপনার চাইতে কত মানুষ আরও অনেক যেদি সমস্যায় আছে। চাইলে যে কোন হাসপাতালে গিয়ে একটু ঘুরে আসুন। দেখে আসুন, মানুষ আপনার চেয়ে কত বেশি কষ্টে আছে। সো, আপনি আসেন ‘অনেকের চেয়ে অনেক বেশিই ভালো আছেন। তাই সর্বদা আল্লাহর শোকা করুন।

৬। আগনি ছেলে হলে মুসআব ইবনে উমায়ের রা, এর জীবনি থেতে সবক নিন। মেয়ে হলে ফেরাউনের স্ত্রী হযরত আছিয়া রা. এর জীবনি খেতে সবক নিন। জানা না থাকলে কোন আলেমের নিকট থেকে জেনে নিন।।

৭। আপনার হিতাকারকী এমন দু-একজনের সাথে মনের সকল বাধা ও কথা অকপটে সব শেয়ার করুন। এতে মনটা বেশ প্রফুল্ল থাকবে। কষ্ট চেপে রাখবেন না, এতে সমাধান না এসে কষ্ট বাড়তেই থাকবে। তবে যার-তার কাছেও শেয়ার করবেন না। শতভাগ নিরাপদ ও বিশ্বস্ত কারও কাছেই শেয়া করুন।

৮। মনমরা হয়ে না থেকে সর্বদা হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করুন।

৯। আপনার স্বদিচ্ছা পূরনে অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাবেন। হাল হ যাবে না এবং মোটেও হতাশ হওয়া যাবে না।

১০। তার যখন মন ভাল থাকে তখন তাতে অল্প অল্প করে বুঝাতে চেয়া করুন। মন ভাল না থাকা অবস্থায় নিরবতা পালন করুন। তাকে সান্তনার তবে দু-এক দিনেই সম্পূর্ন ভাল করে ফেলার আশা করবেন না। ধীরে তাঁর এগোতে থাকুন, আল্লাহ ভরসা।

 পৃষ্ঠা-১১৩

১১। মাঝেমাঝে স্থান পরিবর্তন করে কোথাও বেড়াতে যাওয়াও বেশ পজিটিভ। তবে অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে দ্রুত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তরের বারস্থ হওয়া জরুরি।সবশেষে আমি বলি কী, প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর, অর্থাৎ প্রতিকারের প্রয়ে প্রতিরোধ ভালো।বিয়ের পর সাংসারিক এসকল সমস্যা এড়াতে চিকিৎসা ইত্যাদির চেয়ে বিয়ের পূর্বেই দ্বীনদারী, সম্পদ, সৌন্দর্য ও বংশের বিষয়গুলো দেখার পাশাপাশি বিপরীত মানুষিকতার কাউকে পছন্দ না করে নিজের সমপর্যায় বা কাছাকাছি মানুষিকতার কাউকে পছন্দ করলে অধিকাংশের ক্ষেত্রে বিষয়টি শুরুতেই প্রতিরোধ হয়ে যায়।এই ব্যাপারটিতে আমাদের গার্ডিয়ান মহলের যথাযন বোধদয় হোক।ডা. রাকিব তার কথা শেষ করেই উঠে দাঁড়ালেন। সাড়িয়ে বললেন, ‘ভো মি. অদিব, আশাকরি আপনি উপকৃত হয়েছেন।”অবশ্যই স্যার! তবে একটি বিষয়ের জন্য আমি সরি বলে নিচ্ছি, সেটা হলোআপনার অনুমতি ছাড়া আপনার আজকের এই কথাগুলো আমি রেকর্ড করেনিয়েছি। যাতে কোনোটা মিসিং না হয়ে যায়। এবং পরবর্তীতে বারবার শুনতে পারি। কথাগুলো ভালোভাবে বুঝতে পারি।’ডা. রাকিব হাসলেন।’ও আচ্ছা। না এতে কোনো সমস্যা নেই। আপনার বোনের জন্য অনেক অনেক দু’আ রইল। তো আজ আমরা উঠি তাহলে। বাসায় যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। দেরি করে গেলে ওদের মা-ছেলের শাসনে পরতে হয়।”বাব্বাহ! আপনাকেও শাসন করো”কেন মি. হাসানা আপনাকেও করে নাকি?”না মানে…।”বুঝেছি বুঝেছি। হোমমিনিস্টার বলে কথা। হা হা।

 পৃষ্ঠা-১১৪

পারিবারিক প্রেসক্রিাশন-২

‘জি, নিয়মিত জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি খেতো। তবে বিয়ের শুরুতে অনেকবার ইমারজেন্সি কন্ট্রাসেপটিভ পিলও খেয়েছে।”আচ্ছা! তো এখন সব বাদ দিয়েছে কতদিন হয়?”এই তো বছরখানেক হলো।”এরমধ্যে একবারও কনসিভ করেনি?”জি না। গতমাসে এক গাইনী ডাক্তারকেও দেখাই। ওর কিছু টেস্ট করিয়ে দেখল তেমন কোনো সমস্যা ধরা পড়ছে না। ভাবলাম আমার কোনো সমস্যা কি না, উনাকে এটা বলার পর আমাকেও কিছু টেস্ট দিল। রেজাল্টও ভালো। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? তাই আদিবের পরামর্শে আজ আপনার কাছে আসলাম।’হাসানের কথা শুনে ডা. রাকিব আদিবের প্রতি দৃষ্টি ফেরাল। গলা থেকে স্টেথিস্কোপটি নামিয়ে রেখে তিনি বললেন, ‘আদিব সাহেব, মি, হাসানকে আমার কাছে নিয়ে আসার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।”জি স্যার, আশাকরি আপনার কিছু পরামর্শ ওর জন্য বেশ ইফেক্টিভ হবে।’ টেবিল থেকে হাত নামাতে নামাতে বলল আদিব।ডা. রাকিব হাসানের আপাদমস্তক একবার পরখ করে একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘হাসান সাহেব, কিছু মনে না করলে খোলামেলা কিছু আলাপ করতে চাই। অসুবিধা নেই তো?”না না, বলুন স্যার।”আপনি কি জানেন, বাংলাদেশে বর্তমান নিঃসন্তান দম্পতির সংখ্যা কত?'”জি না স্যার।”সংখ্যাটা প্রায় ৩০ লক্ষ বা তার চেয়েও কিছু বেশি।’সংখ্যাটা শুনে হাসান ক্ষানিকটা ভড়কে গেল। বিড়বিড় করে বলল, ‘৩০ লক্ষেরও বেশিা?’

 পৃষ্ঠা-১১৫

সত্যিই অবাক হওয়ার মত। আবার এই রেট ক্রমেই বাড়ছে। ইনফার্টিলিটি ট্রিটমেন্ট সেন্টারগুলোতে গেলে বুঝা যায় কী পরিমাণে বাড়ছে এই হার। আর নিঃসন্তান দম্পতির দীর্ঘশ্বাস সত্যিই খুব করুণ।’ ডা. রাকিবের কন্ঠে ক্ষানিকটা হতাশা।হাসানের চেহারায় আতঙ্কের স্পষ্ট ছাপ দেখতে পাচ্ছে আদিব। ডা. রাতিব একটি কলম হাতে নিয়ে নাড়তে নাড়তে বলতে শুরু করলেন- ‘আমার এক ফ্রেন্ড বিনি ইনফার্টিলি ট্রিটমেন্ট সেন্টারে কাজ করে, সেখানকার এক রোগীর কথা সেদিন বলল, যে কিনা করজোড়ে অভান্ত মিনতির সাথে বলছিলেন, ডাক্তার সাহেব একটা বাচ্চা চাই, তার বিনিময়ে যা করতে হয় সব করতে রাজি আছি। টাকা যত লাগে দিতে রাজি আছি। শুধু একটা সন্তান চাই আমার…আরো এক পরিচিত শেসেন্ট আছে যিনি প্রায় ১০ বছর যাবত এই অব্যক্ত যন্ত্রনার ভূক্তভোগী এবং আরো জানা-অজানা এমন পেসেন্ট অনেক আছে। তাদের মধ্যে অনেকে প্রায়ই ফোনে আমাকে নক করে। পরামর্শ চায়। বিষয়টি খুব ভাবাচ্ছে আমাকে।একটা প্রশ্ন সহজেই মাথায় আসে, আজ থেকে মাত্র ১০০ বছর আগেও অর্থাৎ আমাদের নানা-সাদাদের সময়ে তো এত বেশি এরকমটা শোনা যায়নি। কেন এই সামান্য সময়ে আজ এত পরিবর্তন?’আদিব, হাসান উভয়ের মুখেই স্পষ্ট জিজ্ঞাসা- কেন?ডা. রাকিন বললেন, ‘কারণগুলোর ভেতর আমার কাছে যা মনে হয়।প্রথমত, বিয়ের পর পর আল্লাহর নেয়ামতকে অস্বীকার করা।সন্তান আল্লাহর নেয়ামত। অনেকেই মনে করেন সবেমাত্র বিয়ে হলো, আরও ২.৪ বছর ইনজয় করি, ক্যারিয়ার গড়ি তারপর বাচ্চা নেওয়ার চিন্তা করব। তো এরপর পিল খাওয়া শুরু হয়। হ্যাঁ, সব ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি এ্যাড দেয় সম্পূর্ন পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া মুক্ত আমাদের এই শিল। অথঞ্চ আমরা জানি, প্রতিটি মেডিসিনেরই কিছু না কিছু পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া বা সাইডইফেক্ট আছে। চাই সেটা এন্টিবায়োটিক হোক, ব্যথানাশক হোক, গ্যাস্ট্রিকের সমস্যার জন্য হোক কিংবা প্যারাসিটামলই হোক।

 পৃষ্ঠা-১১৬

এহনকি ওরস্যালাইন, যেটাকে আমরা ক্ষতিকর হিসেবে কল্পনাও করতে পারি এ অপরিমিত ব্যবহারে এই ওরস্যালাইনেরও কিছু সাইডইফেক্ট আছে।একটা জিনিস সহজে বুঝা দরকার, সিগারেট কোম্পানী কিন্তু কখনও ভলরেটের বদনাম করবে না। যেটুকু করে সরকার বাধ্য করে বলে করে।একটু চিন্তা করি, প্রতি মাসে একজন বোন ২৮/২১টা পিল খাচ্ছেন। এটা প্রতি দিয়চ সাইকেলে হরমোনাল চেজ নিয়ে আসছে। যেটা স্পার্ম এবং ওভামকে উর্বর আরে দিচ্ছে না। এইভাবে ১-২-৩ বছর চলার পর স্বাভাবিক হরমোনাল কন্ডিশন অনেক ক্ষেত্রেই আর ফিরে আসে না। এমন অনেক পেসেন্টও দেখেছি যে, এগুলো খাওয়া বন্ধ করার পরও বছরের পর বছর চলে যাচ্ছে কিন্তু তার ‘মা’ হওয়ার কোন ভবনা দেখা যাচ্ছে না। এদিকে আবার ক্লিনিক্যাল রিপোর্টেও বিশেষ কোনো অস্যা ধরা পড়ছে না।’ডা. রাকিবের কথা শুনে আদিব আর হাসান পরস্পর চোখাচোখি করছে। তিনি তা বলছেন এসবা এমনকিছু তো ঘুণাক্ষরেও ভাবিনি আমরা। ডা. রাকিব ওদের বিম্বিত ভাব বুঝতে পেরে বললেন, ‘জানি, আমার কথাগুলো বেশ উদ্ভট মনে হচ্ছে আপনাদের কাছে। কিন্তু সবকিছুর উর্ধ্বে আমিও মানুষ। তাই কিছু অপ্রচলিত সত্য কথা একান্ত আপনজনদের কিংবা হিতাকাঙ্ক্ষীদের না বলেও পারি না।আমার কথাগুলো খুব মন দিয়ে শুনুন।বিজ্ঞানের আর এক আবিষ্কার ইমারজেন্সি পিল। ৭২ ঘণ্টা বা কিছু কম-বেশি সময়ের মধ্যে অ্যাক্সিডেন্টাল প্রেগন্যান্সি বা অনিচ্ছাকৃতভাবে কনসিভ করা এড়াতে এটা ব্যবহার করা হয়। একটোপিক প্রেগন্যান্সির সবচেয়ে বড় কারন এই ইমারজেন্সি দিল। একটোপিক প্রেগন্যান্সি বড় ভয়াবহ এক জিনিস। যেটা সংক্ষেপে, বঙা হবে কিন্তু বাচ্চা ইউট্রাসে না হয়ে অন্য কোন যায়গায় হবে। এবং বাচ্চা বড় হয়ে যাওয়ার পর আল্ট্রাসোনোতে ধরা পড়লে ইউট্রাস কেটে ফালানো ছাড়া আর উপায় থাকে না। ভাবতে পারেন ব্যাপারটা?আবার বাচ্চা কনসিভ হয়ে গেছে এরপরের আর এক আবিষ্কার এমএমকিট। যেটা ইউট্রাস থেকে বাচ্চা সদৃশ বস্তুকে ছুড়ে ফেলে দেয়, প্রচুর রক্তক্ষরন হয় এতে।এসবকিছু ছাপিয়ে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর কথা হলো, অনেক বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, একজন নারী জরুরি জন্য নিরোধক পিল খেয়ে বলছে- “আমি এখন নিশ্চিত”। কিন্তু আসলেই কি এসব জন্য নিরোধক পিল খেয়ে নারী নিশ্চিন্ত হতে পারছে?

 পৃষ্ঠা-১১৭

হয়ত তার গেটে সন্ধান বাসা বাধছে না, কিন্তু বাসা বাধছে ক্যান্সারসহ বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধি।সম্পাতি আমরা দেখেছি- রেনিটিডিন গ্রুপের ঔষধ সেবনে ক্যান্সারের ঝুঁকি থাকে বিধায় তা দেশ থেকে নিষিদ্ধ করা হয়।ধুমপানে ক্যান্সার হয়, বিধায় সিগেরেটের প্যাকেটে বড় করে লেখা থাকে, “ধুমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।” কিন্তু জন্মনিরোধীকরণ পিল সেবনে ক্যাগারে শুকি থাকার পরও সেখানে লেখা থাকে- নিশ্চিন্ত, নিরাপদ, ভাবনাহীন… আশ্চর্য!উল্লেখ্য দেশে নারীদের মধ্যে ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে জরায়ু ও স্তন ক্যাদর। রোগীর সংখ্যা। এসবের কারণ কী? নিকিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, এটা যে পিলের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে হাজে তা মিডিয়া ও অধিকাংশ ডাক্তারগণ প্রকাশ্যে এড়িয়ে যাচ্ছে। উপরন্তু কিছু মিডিয়া দাবী করছে, বাল্যবিবাহের কারণে নাকি নারীদের ক্যান্সার বাড়ছে। কিন্তু কথা হলো- বাংলাদেশে তো বাল্যবিবাহ কমছে, তাহলে তো সূত্রমতে নারীদের ক্যান্সারও কমার কথা ছিল। কিন্তু ব্যস্তবে বাল্যবিবাহ কমলেও ক্যান্সার বাড়ছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, বাল্যবিবাহ ক্যান্সারের পেছনে দায়ী নয়, দায়ী অন্য কিছু, যা নারীদের মধ্যে ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং অবশ্যই সেটা জন্মনিরোধীকরণ পিল, কিন্তু সেই বিষয়টি বিস্ময়করভাবে এড়িয়ে যাচ্ছে সবাই।এখন কথা হলো- সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের একটি সাধারণ নবি তোলা উচিত, তা হলো- ক্যান্সারের ঝুঁকি থাকার কারণে হয় এসব জন্মনিরোধীকান পিল নিষিদ্ধ হোক অথবা সিগেরেটের প্যাকেটের মত এসব শিলের প্যাকেটেও বড় করে লেখা হোক। “সাবধান। জন্মনিরোধীকরণ পিল ক্যান্সার সৃষ্টির কারণ।”ডা. রাকিবের কথা শুনে আদির বেশ চমৎকৃত হচ্ছে। মনেমনে শোকর করছে যে, সে এসবের কোনোকিছু অ্যাপ্লাই করেনি। কিন্তু হাসানের মুখটা শুকিয়ে যাচ্ছে। অম্লাত, ভয় আর অপরাধবোধ কেমন যেন ঘিরে ধরছে তাকে।

 পৃষ্ঠা-১১৮

এরপর ডা. রাকিব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘একটা মায়ের উপর এতগুলো ধকল চালানোর পর যখন ৩-৪ বছর পার হয় তখন চিন্তা করে এবার একটা বাচ্চা চাই। কিন্তু আল্লাহ তা’য়ালা ততদিনে অসন্তুস্ট হয়ে নেয়ামতকে উঠিয়ে নেন। এবার দৌড় শুরু হয় ইনফার্টিলিটি সেন্টারে, মাজারে, তাবিজ কবজ সহ আরও কত কী। তবে এই ইনফার্টিলিটি যে শুধু মেয়েদের হয় তা নয়, ছেলেদেরও হয়। কিন্তু আমরা দোষ সব মেয়েদেরকেই দিই। সন্তান না হলেই তাকে ডিভোর্স দিয়ে ভাগাড়ে ছুড়ে ফেলি। এতদিনের রঙিন স্বপ্ন, আর প্রতিশ্রুতিকে নিজ হাতে গলা টিপে হত্যা করি।'”আচ্ছা স্যার, পুরুষ এবং মহিলার এই ইনফার্টিলিতে চলে যাওয়ার উল্লেখযোগ্য কিছু কারণ স্পষ্টভাবে বলবেন কি?’ আদিবের প্রশ্ন ডা, রাকিবের প্রতি।ডা. রাকিব একটু নড়েচড়ে বসে বললেন, মহিলাদের ইনফার্টিলিটির বেশকিছু কারণ আছে। এর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো-

১। Stress অর্থাৎ অতিরিক্ত চাপে থাকা। বিশেষ করে চাকুরিজীবি মহিলাদের ক্ষেত্রে। ঘরেও চাপ অফিসেও চাপ। এজন্যই দেখা যায় গৃহিণী মহিলার চেয়ে চাকরিজীবি মহিলাদের ইনফার্টিলিটি রেট বেশি।অর্থাৎ তারা সন্তানধারণে গৃহিণী মহিলাদের চেয়ে তুলনামূলক কম সক্ষম।

২। অতিরিক্ত ভাপমাত্রায় ও শব্দে বেশি সময় অবস্থান। যেটা গার্মেন্টস কর্মীদের দেখা যায়।

৩। অধিক সময় জন্মনিয়ন্ত্রন করা। আর এটাই মহিলাদের ইনফার্টিলিটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

৪। অধিক বয়সে সন্তান নেওয়ার প্রবণতা।আর পুরুষদের ইনফার্টিলিটির ব্যাপারটি একটু ভিন্ন। যেকোন কারণে পুরুষের প্রতি ML সিমেনে যদি স্পার্ম-এর পরিমাণ ২০ মিলিয়নের কম হয়ে যায়, তখন সে ইনফার্টিলিটিতে চলে যায়। এর অনেকগুলো কারনের মধ্যে অন্যতম হলো-

১। স্মোকিং, ড্রাগস বা যেকোন ধরনের নেশা।

২। এছাড়া পরিবেশ দূষনও একটা বড় কারণ।

৩। অতিরিক্ত তাপমাত্রা বা শব্দে যারা লম্বা সময় কাজ করে এটাও একটা কারণ।

 পৃষ্ঠা-১১৯

হয়ত তার গেটে সন্ধান বাসা বাধছে না, কিন্তু বাসা বাধছে ক্যান্সারসহ বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধি।সম্পাতি আমরা দেখেছি- রেনিটিডিন গ্রুপের ঔষধ সেবনে ক্যান্সারের ঝুঁকি থাকে বিধায় তা দেশ থেকে নিষিদ্ধ করা হয়।ধুমপানে ক্যান্সার হয়, বিধায় সিগেরেটের প্যাকেটে বড় করে লেখা থাকে, “ধুমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।” কিন্তু জন্মনিরোধীকরণ পিল সেবনে ক্যাগারে শুকি থাকার পরও সেখানে লেখা থাকে- নিশ্চিন্ত, নিরাপদ, ভাবনাহীন… আশ্চর্য!উল্লেখ্য দেশে নারীদের মধ্যে ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে জরায়ু ও স্তন ক্যাদর। রোগীর সংখ্যা। এসবের কারণ কী? নিকিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, এটা যে পিলের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে হাজে তা মিডিয়া ও অধিকাংশ ডাক্তারগণ প্রকাশ্যে এড়িয়ে যাচ্ছে। উপরন্তু কিছু মিডিয়া দাবী করছে, বাল্যবিবাহের কারণে নাকি নারীদের ক্যান্সার বাড়ছে। কিন্তু কথা হলো- বাংলাদেশে তো বাল্যবিবাহ কমছে, তাহলে তো সূত্রমতে নারীদের ক্যান্সারও কমার কথা ছিল। কিন্তু ব্যস্তবে বাল্যবিবাহ কমলেও ক্যান্সার বাড়ছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, বাল্যবিবাহ ক্যান্সারের পেছনে দায়ী নয়, দায়ী অন্য কিছু, যা নারীদের মধ্যে ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং অবশ্যই সেটা জন্মনিরোধীকরণ পিল, কিন্তু সেই বিষয়টি বিস্ময়করভাবে এড়িয়ে যাচ্ছে সবাই।এখন কথা হলো- সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের একটি সাধারণ নবি তোলা উচিত, তা হলো- ক্যান্সারের ঝুঁকি থাকার কারণে হয় এসব জন্মনিরোধীকান পিল নিষিদ্ধ হোক অথবা সিগেরেটের প্যাকেটের মত এসব শিলের প্যাকেটেও বড় করে লেখা হোক। “সাবধান। জন্মনিরোধীকরণ পিল ক্যান্সার সৃষ্টির কারণ।”ডা. রাকিবের কথা শুনে আদির বেশ চমৎকৃত হচ্ছে। মনেমনে শোকর করছে যে, সে এসবের কোনোকিছু অ্যাপ্লাই করেনি। কিন্তু হাসানের মুখটা শুকিয়ে যাচ্ছে। অম্লাত, ভয় আর অপরাধবোধ কেমন যেন ঘিরে ধরছে তাকে।

 পৃষ্ঠা-১২০

আবার মানসম্মান বাঁচাতে অবৈধ সন্তানকে খুন করে কেনই-বা জাহান্নাম কিনে মিছেন? এতই যখন মানসম্মানের ভয় তাহলে কেনই-বা এমন অশ্লীলতায় গা ভাসিয়ে দিলেনা সরি এটা আপনাদেরকে বলছি না। যারা করে তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলছি।জানি, এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। এক দলা ঘৃণা এসকল মানুষের জন্য। মি. আদিব ও মি. হাসান আপনারা হয়তো আমার কথা শুনে কষ্ট পেতে পারেন, কিন্তু আমি স্ট্রেট যা বলার বলে দিলাম। সেজন্য সরি। জানেন। এই সেদিনও এক সম্পতি এসেছিল এবসনের ব্যাপারে পরামর্শ নিতে। তাদের ২টি সন্তান। এখন আর নিতে চাচ্ছে না। আমি তাদেরকে প্রশ্ন করলাম, আল্লাহ যখন দিয়েছেনই, তাহলে দিয়ে নিন না। বাচ্চাটাকে হত্যা করা ঠিক হবে না। তখন তারা নানান অপারগতা প্রকাশ করতে লাগল। তাদের আর্থিক সমস্যা এই-সেই ইত্যাদি। আমি তখন বললাম, ওর রিযিক নিয়েই ও পৃথিবীতে আসবে। আপনারা একটু ধৈর্য ধরুন। আল্লাহ মানুষকে পৃথিবীতে পাঠানোর আগেই তার বিধিক নির্ধারণ করে দেন। ভয়ের কিছু নেই।তারা অনড়। অবশেষে আমি বললাম, তাহলে একটা কাজ করুন। গর্ভের এটিন যেমন আপনার সন্তান, আর বাকি দুইটাও আপনারই সন্তান। তো আপনার বড় সন্তানটি তো কিছুদিন পৃথিবীর আলো-বাতাস পেয়েছে। এবার তাহলে ওকে খুন করে ফেলুন। আর এই গর্ভের বাচ্চাটিকে কিছুদিনের জন্য পৃথিবীর আলো-বাতাসে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে দিন। সন্ধান হিসেবে প্রত্যেকের অধিকারই তো সমান তাই না?উনি আমার কথা শুনে উভ্রান্তের মতো কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, ডা. রাকিব এসব কী বলছেন আপনি? আমি সাবলীলভাবে আবারও বললাম, হ্যাঁ, আপনার বড় সন্তানটিকেই বরং খুন করে ফেলুন।পাশ থেকে তার স্ত্রী এমনসময় বলে উঠল, ডাক্তার সাহেব, আমাদের কথা আপনি একটু বুঝার চেষ্টা করুন প্লিজা ভার স্ত্রীর এই কথা শুনে আমি বুঝতে পারলাম, আর কাজ হবে না। শেষমেশ পকেট থেকে বেশকিছু টাকা বের করে বললাম, আচ্ছা এই টাকাটা রাখুন। এটা দিয়ে আলো ও পুষ্টিকর খাবার কিনে খাবেন। এতে গর্তের সন্তানটা হৃষ্টপুষ্ট হবে। এরপর যখন ও পৃথিবীতে আসবে তখন ওকে আমাকে নিয়ে দেবেন। আমিই ওকে নিজ সন্তানের পরিচয়ে বড় করব। আমিই ওর বাবা হব। আমার স্ত্রী ওর মা হবে। তো এই সন্তানটা যেহেতু আমি নিয়ে নিলাম, সেহেতু ওর ভরণপোষণের দায়িত্বটাও আমার। আর ভাই এই টাকাটা সিলাম। রাখুন এটা।

পৃষ্ঠা ১২১ থেকে  ১৩৪

পৃষ্ঠা-১২১

একথা বলার পর লোকটির স্ত্রীর চোখে পানি দেখলাম। লোকটিও একদয় বোকা বনে গেল। মনে হচ্ছিল এক আকাশ লজ্জা তার আপাদমস্তক ঢেকে নিয়েছে। হঠাৎ সে আমার দু’হাতে ধরে কান্না জুড়ে দিল। অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাইল। আই বললাম, ক্ষমা আমার কাছে না, আল্লাহর কাছে চান। তিনি যেন আপনাদের ওপর গোখা হয়ে না যান।ভার স্ত্রী সেই মুহূর্তে অঝোরে কাঁদছিল। তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, আসলে এমন করে বলার জন্য আমি সরি বলছি। কিন্তু আপনাদের এবর্মনের কথ শোনামাত্রই একটা নিষ্পাপ চেহারা আমার চোখের সামনে সকরুণভাবে বলছিল, আয়েস আমাকে বাঁচান। আমি বাঁচতে চাই। আমি সেই শিশুর আকুতি ফেলছে না পেরে অনেকটা বাধ্য হয়ে আপনাদেরকে কষ্ট দিলাম। আমি আবারও সরি।’আমাদেরকে আর লজ্জা দেবেন না প্লিজ। সহ্য করতে কষ্ট হচ্ছে খুব। আমাদের ভুলটা এভাবে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য আপনার প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞ থান স্যার।’ এই কথা বলে তারা বিদায় নিতে চাইলেন। অমনি তার স্ত্রী বলে উঠল, স্যার, আমাদের এই সন্তানের নামটা যদি আমরা আপনার নামেই রাখি, আপনার এতে কোনো আপত্তি থাকবে না তো?তার স্ত্রীর একথা শুনে আমার চোখদুটো আর সহ্য করতে পারল না। কেঁদে ফেললাম। এরপর অনেক দু’জা করলাম সেই বাচ্চাটির জন্য। তাদের স্বামী-স্ত্রীর জন্য। এরপর ভারা চলে গেলেন।ডা. রাকিব থামলেন।অদিব ও হাসানের চোখ ছলছল করছে। এমনকরে কোনোদিন কোনো ডাক্তার কাউকে বলেছে বলে শোনেনি কখনও। হয়তো কল্পনাও করেনি। উভয়ে মাে রাকিবের অন্য কল্যাণের দু’আ করলেন।ক্ষানিক পর আদিব অম্বুটে বলল, ‘স্যার, আরও একটি বিষয়ে আপনাকে এটী কষ্ট দের।”না না সমস্যা নেই। বলুন।'”স্যার, বর্তমানে ডিভোর্স দেওয়ার প্রবণতা ও এর সমাধান সম্পর্কে গুলি কিছু বলতেন। হাসান ইদানীং ওর ওয়াইফের সাথে ম্যাচ করতে পারছে না। অনেক বিয় করার পর অবশেষে ডিভোর্সের দিকে যেতে চাচ্ছিল। কোনরকম আটকে রেখেছি।

 পৃষ্ঠা-১২২

তখাটি বলতেই হাসান কিছুটা বিব্রতবোধ করল। মুখফুটে বলল, ‘স্যার, আসলে আমি এখনও চাচ্ছি আমাদের সম্পর্কটা স্থায়ী হোক। কিন্তু কেন যেন পেরে তাছি না। আক্ষেপের সুর হাসানের কণ্ঠে।ডা. রাকিব পেশায় একজন ডাক্তার হলেও বেশ যুগসচেতন। সামাজিকভাবেও দায়িত্বশীল। তাই এসকল বিষয় সম্পর্কে মোটামুটি ভালো জ্ঞান রাখে। কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে তিনি বললেন, ‘আসলে হাসান সাহেব, মানুষ অদৃশ্যের কথা জানে না। কারো মনের কথাও কেউ জানে না। এটার মালিক একমাত্র আল্লাহ। তাই ডিভোর্স সংক্রান্ত আমার কিছু ধারণা আজ আপনাদের সাথে শেয়ার করব। কিন্তু তাই বলে আপনার ব্যাপারটিও যে এমন হবে সেটা নয়, আমি কেবল আমার ধারণাটা শেয়ার করছি। রাগ করবেন না তো?’

‘আরে না না! কী বলছেন এসব। আপনি নিঃসংকোচে বলুন।’ডা. রাকিব পাশে রাখা বোতল থেকে কয়েক ঢোক পানি খেয়ে নিয়ে বললেন, ‘এবার আসলে একটু বৃত্তের বাইরে আসতে চাচ্ছি। মুখের জড়তা ভেঙ্গে কিছু কথা বোলামেলাভাবেই বলতে চাচ্ছি। সেজন্য অগ্রিম সরি…।”আপনি বলুন স্যার। আদিবের সম্মতিসূচক উক্তি।’বেশ কিছুদিন আগে একটি জাতীয় দৈনিকের রিপোর্টে দেখলাম- শুধুমাত্র ঢাকায় ডিভোর্সের হার মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়েই চলছে। যার অধিকাংশ হলো স্ত্রীর পক্ষ থেকে। রিপোর্টের কাটপিছটা এইমুহূর্তে কাছে নেই। বাসায় আছে।বোদ্ধা মহল এটার নানান কারণ ও সম্ভাব্য সমাধান ব্যাখ্যা করেছেন। সোশ্যাল মিডিয়াতেও এটা নিয়ে বেশ লেখালেখি দেখেছি। কিন্তু তখন একেবারে চুপ ছিলাম আমি। কারণ, চলমান ইস্যুতে খুব জরুরি মনে না করলে তালে গা ভাসানো আমার পছন্দ না। কিন্তু এবার আপনাদের জন্য হলেও কিছু বলতে ইচ্ছে করছে।ডিভোর্সের যেসকল কারণ নিয়ে আলোচনা শোনা গেছে তা বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে। আমি সেদিকে যাচ্ছি না। আমি এমন একটি কারণ হাইলাইট করতে চাচ্ছি যেটা এযাবৎ কোথাও আলোচনা করতে দেখিনি। হয়তো কেউ করেনি অথবা ঠিক এভাবে করেনি। অন্তত আমার চোখে পড়েনি। কারণটি খুবই সেন্সিটিভ। তাই আবারও সরি বলে নিচ্ছি।’আদিব ও হালানের পূর্ণ মনোযোগ ডা. রাকিবের প্রতি।’ডিভোর্সের এই ক্রমবর্ধমান হারের একটি মূল কারণ হলো পর্নোগ্রাফি।’

 পৃষ্ঠা-১২৩

পর্নগ্রাফি শুনেই দু’জনের চক্ষু তো চড়কগাছ। ‘একটু স্থির হোন। মন দিয়ে গুনুন।’ ডা. রাকিবের মহর উক্তি।’অন্ধকার জগতের এই বিচিত্র জগতে যে একবার পা ফেলে সে খুব সহজেই আর পা তুলতে পারে না। নেশা চেনেন? নেশাখোর হুটহাট নেশা করা ছাড়তে পারে? পারে না। কতশত চৌটা, চিকিৎসা আর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা আছে, তবুও যেন নেশাখোরের পরিমাণ ও এর মাত্রা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।পর্নোগ্রাফিও একটি নেশা। বড় ভয়াবহ নেশা। ড্রাগসের নেশা থেকে বাঁচাতে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে বেশ তোড়জোড় চোখে পড়লেও পর্নোগ্রাফির নেশা থেকে আমাদের যুবসমাজকে বাঁচাতে তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। অথচ ভাগসের নেশার চেয়ে পর্নোগ্রাফির এই দেশটি অনেক বেশি ক্ষতিকর।ড্রাগস বিভিন্নভাবে আমাদের সামাজিক পরিবেশকে নষ্ট করে নানাবিধ অপরাধ প্রবণতা ও অসংগতি বাড়াচ্ছে। আর পর্নোগ্রাফি সরাসরি আমাদের সামাজিক ব্যবস্থাকেই ভেঙ্গে দিচ্ছে। এমনকি এই ভেঙ্গে পড়া সমাজকে রিপেয়ার করার সম্ভাবনাটুকুও নিভিয়ে দিচ্ছে। এক গভীর অমানিশার ঘোরে আমাদেরকে হার-পা বেঁধে যুপ করে ধাক্কা মেরে ফেলে দিচ্ছে।এবার মূল কথায় আসি। খুব সংক্ষেপে বুঝে নেবেন। একজন স্বামী যেপর্নোগ্রাফির চিত্তাকর্ষক অ্যাক্টরকে দেখে নিজের স্ত্রীকেও বিছানায় ঠিক সেভাবেইপেতে চায়। বিকৃত সব আচরণ নিজের অবলা স্ত্রীর কাছেও আশা করে। বেচারা তীভাতে অসম্মতি বা অনল্লাহ জানালেই ছোঁ করে ছুড়ে ফেলে তাকে। বেচারি আড়ালেমুখ লুকার, কেঁদে বুক ভাসায়, না পারে সেটা করতে আর না পারে কাউকে কিছুবলতে। এভাবেই দিনের পর দিন চলে যায়। একপর্যায়ে স্বামী তার প্রতি আরআকর্ষণ বোধ করে না। পর্দার মেকাপ করা স্লিম আর রসালো নারী দেহের কাছেতার স্ত্রী নিতান্তই অখাদ্য হয়ে যায়। শুরু হয় পরকীয়া অথবা ফ্ল্যাট বিজনেস। এবংএকপর্যায়ে নিশ্চিত ডিভোর্স।একই চিত্রের দ্বিতীয় পর্বও আছে। পর্নোগ্রাফির নেশায় যে কেবল ছেলেরই মরেছে সেটা নয়, মেয়েদেরও অনেক বড় একটা অংশ এই নেশায় ব্যাগ্রিড। পর্ণর স্বেত ভল্লুকের পারফর্মেন্স দেখে দেখে নিজের স্বামীকে একলাফে ভাজাভঙ্গ রোগী বানিয়ে ফেলে। অবশ্য ঘণ্টাব্যাপী পারফর্মকারীকে দেখে দেখে ৮-১০ মিনিটওয়ালাকে নিছক কাজভঙ্গ রোগী মনে করাটাও অলীকতা নয়। অথচ এদেশের পুরুষদের গড় স্বাভাবিক সক্ষমতা হলো প্রায় ৩ থেকে ৭ মিনিট। এর বেশি মাগ সেটা বোনাস।

 পৃষ্ঠা-১২৪

এখানে আমাদের বোঝা দরকার, প্রথমত পশ্চিমাদের খাদ্যাভ্যাস, আবহাওয়া ও জীবন প্রবাহের বৈচিত্র্যের জন্য স্বাভাবিকভাবেই এই উপমহাদেশের পুরুষদের তুলনায় ওরা একটু বেশি শক্তিশালী। এটা প্রাকৃতিকভাবেই নির্ধারিত। রবের ফয়সালা এমনই।তদুপরি নীল পর্দার নায়কদের যেসব পারফর্ম করতে দেখা যায় তা কিন্তু প্রাকৃতিক না। এমনকি বিরতিহীনও না। নানান কৌশল আর মেডিসিনের কারিশমায় ছোট ছোট ক্লিপের অনেকগুলো খণ্ডচিত্রের সম্মিলিত রূপকেই দেখতে পাওয়া যায়। সাধারণ জ্ঞান বলে এটা একবারে ও একটানাই হয়েছে। তাই না? কিন্তু উঁহু। একদম না।একটু ভাবুন, ২ ঘণ্টার একটা সিনেমা কি একবারেই শেষ হয়? হয় না। মাসের পর মাস লেগে যায় একটা সিনেমা কমপ্লিট করতে। তেমনি এটাও একটা সিনেমা। একটা ফিল্ম। তবে পর্ণফিল্ম। এখানেও একেকটা ক্লিপ একবারেই কমপ্লিট হয় না। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেকগুলো ক্লিপ রেকর্ড করে সেখান থেকে বাছাইকৃত ক্লিপগুলো একত্র করেই সেটা ফাইনাল করা হয়।কিছু পয়েন্টনাম্বার ওয়ান- পশ্চিমারা প্রাকৃতিকভাবেই আমাদের এই উপমহাদেশের পুরুষদের চেয়ে একটু বেশি শক্তিশালী।নাম্বার টু- পর্দায় ওদের এই পারফর্ম সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক নয়। নানান মেডিসিন ও কৌশলের সমষ্টিগত রূপ এটা।নাম্বার থ্রি- ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেকগুলো কাটপিছের সমষ্টি এটা।আর এভাবেই তারা ঘন্টাব্যাপী পারফর্ম করে যায়। এসব দৃশ্য একজন স্ত্রী যখন দেখে, তখন স্বাভাবিকভাবেই নিজের স্বামীর কাছ থেকেও এমন পারফর্ম চায়। কিন্তু বেচারা স্বামী সারাদিন অফিস করে এসে প্রথমত ক্লান্ত, এরপর ফ্রেস হয়ে রাতের খাবার খেয়েই বিছানায় যায়। এদিকে মোবাইলে-ল্যাপটপে এসব ভিডিও দেখে স্ত্রী উতলা হয়ে আছে। অতঃপর বেচারা স্ত্রীকে খুশি করতে গিয়ে খুব দ্রুএত অল্প সময়ে স্ত্রী খুবই অতৃপ্তি বোধ করে। তার মাথায় ভিডিও ক্লিপের সেই নায়ক ভেসে ওঠে। আর স্বামীকে বাজভঙ্গ রোগী সাব্যস্ত করে ছ্যাঁক করে ঝাড়ি মেরে ওপাশে ফেলে দেয়। ডাক্তারের কাছে পাঠায়।

 পৃষ্ঠা-১২৫

এভাবে কয়েকবার এমন হলে বেচারা স্বামী আগের চেয়ে নিজেকে আরও বেশি দুর্বল হিসেবে খুজে পায়। শেষমেশ ডাক্তারের কাছে গেলে সবকিছু শুনে ডাক্তার দেখে- তার আসলে শারীরিক তেমন কোনো সমস্যা নেই। যেটা আছে সেটা হলো সাইকো সেঞ্চুয়াল ডিসফাংশন। যেটা সম্পূর্ণ মানুষিক একটি সমস্যা।

ক্লান্তি ও মানুষিক চাপ নিয়ে স্ত্রীর কাছে গেলে স্ত্রীকে খুশি করা সম্ভব না। একদম খালিপেটে কিংবা ভরাপেটেও সম্ভব না। তদুপরি পর্নোগ্রাফি আসক্ত স্ত্রীকে তো কোনোভাবেই সন্তুষ্ট করা সম্ভব না। ফলাফল- সম্পূর্ণ সুস্থ-সবল একজন পুরুষ কল্পিত কাজভঙ্গ রোগী। আর এই সুযোগে কলিকাতা হারবাল সহ বাহারি শিরোনামের ম্যাজিশিয়ানদের পকেট গরম। সবকিছু মিলিয়ে কিছুদিন পর বেচারা স্বামীর পেট-পিঠ সবটার অবস্থা একেবারে চরম!ব্যস, অতৃপ্তি থেকে কিছুদিন পর শুরু হয় অশান্তি ও মারামারির ধাপ পেরিয়ে পরকীয়া ও ডিভোর্সের মাধ্যমে এই অধ্যায় ক্লোজ হয়। শুরু হয় নতুন অধ্যায়। নতুন বলতে অন্ধকার জীবনের আরও অন্ধকারময় বিচ্ছিরি এক নতুন অধ্যায়…পৃথিবীর সকল স্ত্রীদেরকে ডেকে একটি কথা আমার খুব করে বলতে ইচ্ছে হয়, প্রিয় বোন আমার। চোখের এই গুনাহটি ছেড়ে দিন। স্বামীর শারীরিক ও মানুষিক অবস্থা বুঝে প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ মতো উপযুক্ত সময়ে শালীনতা বজায় রেখে জীবনকে উপভোগ করুন। আর হ্যাঁ, আপনার স্বামীকে নীল পর্দার নায়ক ভাববেন না। সে খেটে-খাওয়া একজন সাধারণ মানুষ। তাকে সাধারণ মানুষ ভাবুন। কারণ, কেবল শারীরিক চাহিদাই জীবন নয়, এটা জীবনের ক্ষুদ্র একটি অংশ মাত্র। গুনাহের পথ থেকে ফিরে এসে স্বামীকে বুঝুন, তার মন-মেজাজের খবর রাখুন, আল্লাহকে ভয় করুন, সুখী হবেন। যে সুখ- অমৃত। যাতে কোনো খাঁদ নেই।

আর সকল স্বামীদেরকে ডেকে বলতে ইচ্ছে হয়, প্রিয় ভাই আমার। চোখের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের দ্বারা নিজেকে ঋধ্বংস করবেন না। আর আপনার স্ত্রীকে নীল পর্দার নায়িকা ভাববেন না। সে সারাদিন আপনার ঘরের কাজকর্ম সমাধা করে আপনার অপেক্ষায় থাকা এক বিষণ্ণ মাননী। প্লিজ, তাকে নিছক উপভোগ্য একপিচ মাংশের দলা ভাববেন না। তার এই তুলতুলে দেহের অভ্যন্তরে তদপেক্ষা অধিক কোমল ও প্রস্ফুটিত একটি মন আছে, সেটাকে আবিষ্কার করুন, ভালোবাসুন, সুব পাবেন। যে সুখ অম্লান। যাতে কোনো কলঙ্ক নেই।এখানে আরও একটি কথা। অনেক অবিবাহিত ভাই-বোন জাবেন, বিয়ো জাগে এসবে অভ্যস্ত হয়ে পড়লে বিয়েই একমাত্র সমাধান। বিয়ে হলে সব ঠিক হয়ে যাবে।

 পৃষ্ঠা-১২৬

তাদের এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। বিয়ের দ্বারা কিছুটা উপকৃত হওয়া যায়। কিন্তু এই মারাত্মক নেশা থেকে সম্পূর্ণ বাঁচা যায় না। এজন্য তাদেরকে আমি বলি, আপনারা কিছু টিপস ফলো করুন, তা হলো-

১। দিনে-রাতে কখনওই একা থাকবেন না। একান্তই কাউকে না পেলে দরজা-জানালা খোলা রাখুন, নিজেকে আড়ালে রাখবেন না। রাতেও একা ঘুমাবেন না।

২। নেট দুনিয়া ও ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইস অর্থাৎ মোবাইল, ল্যাপটপ, টিভি এসব থেকে কিছুদিনের জন্য দূরে থাকুন। বাটন ফোন ইউজ করুন।

৩। অশ্লীল ও অশালীন রোমান্টিক গল্প-উপন্যাস, পত্রিকা কিংবা ম্যাগাজিন পড়া থেকে বিরত থাকুন।

৪। নিজেকে প্রচুর ব্যস্ত রাখুন। ব্রেইনকে কাজ দিন। সে অলস থাকতে পারে না। কাজ দিলে করবে, কাজ না দিলে এদিক-ওদিক ঘুরবে। আর ঘুরে ফিরে সেই অন্ধকারেই পা বাড়াবে।

৫। শারীরিক পরিশ্রম করুন। ব্যয়াম বা খেলাধুলা করুন।

৬। দ্বীনি বই-পত্র পড়ুন। শিক্ষনীয় ও ইসলামী গল্প-উপন্যাস পড়ুন।

৭। বাজে বন্ধু ও অশ্লীলভাষীদের এড়িয়ে চলুন।

৮। পরিবেশ পরিবর্তন করুন। এজন্য সবচেয়ে সহজ ও উত্তম হয় কিছুদিনের জন্য তাবলীগে চলে গেলে। ৪০ দিন, ১২০ অথবা যতদিন সুযোগ হয় সময় লাগিয়ে আসুন। ভিন্নমতের হলে অন্যকোথাও বেড়িয়ে আসুন। প্রিয়দের সাথে দর্শনীয় কোথাও ঘুরে আসুন।

৯। নিয়মিত নামায-তিলাওয়াতে মন দিন।

১০। প্রতিবার মিসিং-এর জন্য নিজের প্রতি ফাইন ধরুন। যেমন- একবার ওসব করলে বা দেখলে ১০ রাকাত নামায ফাইন। অথবা ৫০০/১০০০ টাকা ফাইন। পরে সেটা সদকা করে দিন।

১১। সবচেয়ে বড় কথা হলো, প্রতিজ্ঞা করুন, নিজের সাথে জেন করুন, শয়তানকে চ্যালেঞ্জ করুন, আল্লাহর কাছে কেঁদে কেঁদে দু’আ করুন, এভাবে যতবার হয়ে যায় ততবারই করুন, হতাশ হবেন না, বেঁচে থাকা অবধি হাল ছাড়বেন না। একসময় জিতে যাবেন।

 পৃষ্ঠা-১২৭

তাছাড়া এর সবচেয়ে সহজ সমাধানে সয়ং আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, যার অর্থ “হে নবী। আপনি মুমিনদেরকে বলে দিন, তারা যেন তাদের চক্ষুকে নিম্নগামী রাখে।” অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণে রাখে। শআল্লাহর এই আদেশটি অমান্য করার ফলাফল কী জানেন?’ডা. রাঙিব তার দীর্ঘ কথা শেষ করে আদিব ও হাসানের প্রতি শেষে এই প্রশ্নট জুড়ে দিল।আদিব ক্ষীন কণ্ঠে বলল, ‘জি বলুন স্যার।’ডা. রাকিব টেবিলের ওপর রাখা পত্রিকাটি হাতে নিয়ে বললেন, ‘আজকাল এসব পত্রিকায় এমনসব নিউজ পাওয়া যায় যা পড়ে দেখাও দায়। গা ঘিনঘিন করে। গায়ের লোম দাড়িয়ে যায়। হচ্ছেটা কী দেশে!মেয়ের জামাই শাশুড়িকে নিয়ে উধাও।আপন ছোটবোন স্বামী-সন্তান রেখে বড়ভাইকে নিয়ে উধাও। ছেলে তার মাকে। বাবা তার নিজ মেয়েকে… শিক্ষক তার ছাত্রিকে হাত্র তার এগুলো তোপত্রিকার নিউজ। আমি নিজেও এমন একটি ঘটনার কথা জানি, যেখানে আপন বড়ভাই তার ছোট বোনের শ্লীলতাহানি করে প্রকাশ হবার ভয়ে খুন করে ফেলে। মা জেনে ফেললে তাকেও খুনের হুমকি দেয়।আর এসবের যুগে পরকীয়া তো এখন নৈতিক অধিকারের মত। প্রবাসীর স্ত্রী প্রতিবেশী কোনো ছেলের সাথে উধাও হওয়াটাও যেন সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে।এজাতীয় বিষয়গুলো খুবই স্পর্শকাতর। কিন্তু তবুও আজকাল এসবকিছু কেমন যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। সইতে সইতে এখন আর খুব একটা প্রতিক্রিয়া অনুভব হয় না।

 পৃষ্ঠা-১২৮

স্বাভাবিকভাবে প্রতিটি বিবেকবান মানুষই এসবের প্রতিকার চায়। কিন্তু সেজন্য করণীয় কী সেদিকে কারো দ্রুক্ষেপ নেই।অন্ধকার তাড়াতে দৌঁড়ঝাপ, মিছিল-মিটিং, হম্বিতম্বি ইত্যকার সকল কার্যক্রম শরভাগ ব্যর্থ। এখানে প্রয়োজন বাতি জ্বেলে দেওয়া। বাতি না জ্বেলে যতকিছুই করা হোক, আমাদের ঘাম ঝরবে ঠিকই, প্রয়োজনে রক্তও করবে কিন্তু অন্ধকার দূর হবে না।এখন উপরোক্ত ঘটনাগুলো হলো অন্ধকার। এসব দূর করতে দ্বীনের বাতি। ছেলে দেওয়ার বিকল্প নেই।সেই দ্বীনে শাশুড়ি মাহরাম হলেও মেয়ের জামাইর সাথে শাশুড়ির সম্পর্কের একটা সীমারেখা দেওয়া আছে। সেই সীমারেখা অতিক্রম করলেই অন্ধকার নামবে।

সেই দ্বীন আপন ভাইবোনদের মাঝেও একটা পর্দা টেনে দিয়েছে। ১০ বছর বয়সেই বিছানা পৃথক সহ যাবতীয় রক্ষাকবচ দিয়ে দিয়েছে। সেটাকে এড়িয়ে গেলেই কেলেঙ্কারি ঘটবে।নিজ মা ও সন্তানের মাঝেও জ্বীন তার সীমারেখা এঁকে দিয়েছে। একটু বড় হলেই বিছানা আলাদা সহ আরও কিছু বিধি-নিষেধ ঠুকে দিয়েছে। এসবের ধার না ধারলে অন্ধকার নেমে আসবেই।বাবার ও মেয়ের সম্পর্কেও কিছু বিধিনিষেধ আছে। ছোটবেলা থেকেই আদর সোহাগের মাঝে একটা শালীনতা রাখা প্রয়োজন। তার সামনে মেয়ের গোপনীয়ভা রক্ষা করা প্রয়োজন। অন্যথায় যেই বাবার অন্তরে রোগ আছে সেটার প্রভাব তার মেয়েকে ধ্বংস করবেই।শিক্ষাক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মিশ্রণ যে কতটা মারাত্মক। জ্বীন সেটা বলে দিতে মোটেও কার্পণ্য করেনি। বিপরীত লিঙ্গের কারো থেকে শিক্ষা নিতেও কড়া নিষেধাজ্ঞা রাখার পাশাপাশি দিয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কবার্তা। এসবে কেয়ারলেস হলে ফেতনাও ঘাড় বাকিয়ে বলবে, হু কেয়ারস।তাই তার আপন ভাইয়ের সাথে, বোন তার আপন বোনের সাথে কতটুকু মিশতে পারবে সেটারও একটালিমিটেশন দিয়ে দেওয়া হয়েছে।বন্ধুদের সাথেও সম্পর্কের একটা রোডম্যাপ এঁকে দেওয়া হয়েছে।আর পরকীয়া রোধে সর্বোচ্চ কার্যকরী ব্যবস্থা এই দ্বীন ছাড়া আর কোথায়

 পৃষ্ঠা-১২৯

সবশেষে কেউ যদি এই সীমারেখা লঙ্ঘন করে তার শাস্তিও এই দ্বীনে নির্ধারিত করা আছে।আমাদের জীবনব্যবস্থায় দ্বীনের এই বাতি না জ্বালা পর্যন্ত কস্মিনকালেও। অন্ধকার দূর হবে না।মূলত পর্নোগ্রাফিই এসব বিকৃত চিত্র ও আইডিয়া আমাদের মানস্পটে এঁকে দিচ্ছে। নারী মানেই ভোগের বস্তু এমন একটা কনসেপ্ট আমাদের মাঝে তৈরি করে দিচ্ছে। ফলে মানুষও ধীরেধীরে সেটাকে অ্যাপ্লাই করার চেষ্টা করছে। নারীকুলের মধ্যে সে যাকেই দেখে তাকে জাস্ট একটা লাস্যময়ী মাংশপিও রূপে দেখে। ব্যবসায়ীরাও নারীকে নিজেদের বিজনেস চাঙ্গা করতে টোপ হিসেবে ব্যবহার করছে। নারীর সবকিছুকেই তারা মার্কেটিংয়ের মাধ্যম বানিয়েছে। অবশেষে একজন পুরুষ কামনার আগুনে ভস্ম হয়ে আপন-পর পার্থক্য করার ব্যাপারেও হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে।ঠিক এই সময়টাতে এসে সে একটু সুযোগ পেলেই যার-তার ওপর হামলে পড়ছে। যাকে-তাকে নিয়ে যাচ্ছেতাই ভেবে যাচ্ছে। কী ৮০ বছরের বৃদ্ধা আর কী ৮ বছরের বালিকা কেউ ভার থাবা থেকে বাঁচতে পারে না।এই পর্নোগ্রাফি আমাদের শেষ করে দিল। একটি সবুজ বাগানে হিংস্র লালসার আগুন জ্বেলে সবকিছু ভস্ম করে দিল…আমি সবসময় যুবকদেরকে বলি, পর্নোগ্রাফিকে না বলো। বোনদের জন্যও বলি, পর্নোগ্রাফির বিষ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখো। না হয় আগামী প্রজন্মকে কী জবাব দেবে?’ডা. রাকিব থামার সাথে সাথেই আদিব বলল, ‘কিন্তু স্যার, নফসের সাথে যে পেরে ওঠা দায়। আমার অনেক বন্ধু এমন আছে, যে কি না প্রতিনিয়ত এসব থেকে বেঁচে থাকতে চায়। কিন্তু যত চায়, ঠিক ততটাই জড়িয়ে যায়। ওর জন্য কী করণীয়?’ একটি সম্পূরক প্রশ্ন জুড়ে দিল আদিব।ডা. রাকিব বললেন, ‘আমার এক স্যার ছিলেন। ছাত্রদেরকে প্রায়ই বিভিন্ন নসিহা করতেন। তো একবার আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলছিলেন- গুনাহের এবল ঝোক থেকে যখন তুমি ফিরে আসতে পারবে, তখন নিজের ভেতর ঈমানের এমন এক স্বাদ তুমি পাবে, যা অমৃত। এমন এক শক্তি তুমি পাবে, যা অপরাজেয়।

 পৃষ্ঠা-১৩০

এই কথাটি আপনার বন্ধুকেও শোনাতে পারেন। সেইসাথে একটু আগে যেই ১১টি টিপস বললাম সেটা ফলো করতে বলতে পারেন। সেইসাথে একটু চেষ্টা, অধ্যাবসার আর দৃঢ়তা প্রয়োজন। ব্যস, বাকিটা আল্লাহ করে দেবেন। ইন-শা- আল্লাহ।আচ্ছা আদিব সাহেব, চলুন একটু বের হই, পাশের চায়ের দোকানটাতে বসি। একটুপর এশার আযান হবে। নামায পড়ে একটু তাড়াতাড়ি বাসায় যেতে হবে।’অনেক দীর্ঘসময় ধরে ভারী ভারী সব কথা শুনতে শুনতে আদিব আর হাসানকেও ক্ষানিকটা ক্লান্ত দেখাচ্ছে। একটু হাঁটলে বেশ ভালোই লাগবে। সাথে হালকা পিকারের লাল চা। শরীরটা চাঙ্গা হয়ে উঠবে।’জি অবশ্যই, চলুন তাহলে।’ আগ্রহভরে বলল আদিব।হাসান বলল, ‘স্যার, রাতে পেসেন্ট আসে না? এত দ্রুতই বাসায় চলে যাবেন?”আসলে। আমি এখানে বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত বসি। এখান থেকে মাগরিবের নামায পড়ার পর দটা বাজলেই সোজা বাসায় চলে যাই। কিন্তু ইচ্ছে করলে রাত ১০টা কিংবা ১১টা পর্যন্তও পেসেন্ট দেখা যায়।’তাহলে দেখছেন না যে?”‘জিজ্ঞেস যখন করেই ফেলেছেন তখন বলি, আমার একটা মাত্র ছেলে। ক্লাস টু-তে পড়ে। আশাকরি শীঘ্রই আরও একজনের আগমন ঘটবে। সকাল থেকেই নানান ব্যস্ততা শুরু হয়। বাচ্চার সাথে সকালে তেমন একটা কথা বলার বা খোঁজখবর নেওয়ার সময় পাই না। তাই যাতে একটু দ্রুত বাসায় গিয়ে প্রতিদিন শুদের সাথে ২ঘন্টা সময় কাটাই। তাছাড়া আপনাদের ভাবি এখন বিশেষ সময় পার করছে। তাই তাকেও একটু সময় দেওয়া প্রয়োজন। সব মিলিয়ে ৭টার মধ্যে যে করেই হোক কাজ শেষ করি। পাশেই বাসা। আরেকটা মসজিদও আছে সাথে। গিয়ে ফ্রেস হয়ে মসজিদে গিয়ে এশার নামাজটা পড়ে নিই। এত আগে যাই তবুও শোবার আগে ১০-১১টা বেজে যায়। তো আরও দেরি করে গেলে গিয়েই শুয়ে পড়তে হবে। বাচ্চার সাথে রিলেশনশিপটা তখন আর হবে না। স্ত্রীর সাথেও বোঝাপড়ার অধ্যায়টা চকচকে থাকবে না। তাহলে আমার এতসব ব্যস্তাতা ঠিক কার জন্য? যা হোক, চলুন তাহলে। অনেক কথা বলে ফেললাম।’ডা. রকিব অ্যাসিস্ট্যান্টকে রেখে আদিয় আর হাসানকে সাথে নিয়ে চেম্বার থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো। ওরা সন্ধ্যার পর চেম্বারে এসেছিল। হেমন্ত পেরিয়ে শীতের আমেজ শুরু হয়ে গেছে। ৬টার মধ্যেই সন্ধ্যা নামে।

 পৃষ্ঠা-১৩১

আজকের রোগীগুলো সন্ধ্যার আগেই মোটামুটি শেষ হয়ে গেছে। তাই বেশ লম্বা সময় পেল ওরা। প্রায় ঘন্টাখানেক। ভাগ্যও বলতে হয়। উনার মতো একজন মানুষের সাথে এওটা সময় ধরে কথা বলতে পারা সবার ভাগ্য হয় না।’চান্না, তিনটা লাল চা দিন তো।’ দোকানিকে উদ্দশ্য করে বললেন ডা. রাকিব। অনিব আর হাসান পাশের বেঞ্চে বসল। ডা. রাকিবও ওদের সাথে বসলেন।হাসান কেমন যেন আমতা আমতা করছে। ‘কী ব্যাপার মি. হাসানা কোনো অসুবিধা হচ্ছে? কিছু বলবেন?'”চি না স্যার। তেমন কিছু না। একটি কথা অবশ্য জিজ্ঞেস করার ছিল। স্মরণ ছিল না। এখন তো বের হয়ে পড়েছি।’অসুবিধা নেই। বলুন।”‘না মানে, বাইরে, কেমন দেখায়…।”‘কোনো অসুবিধা নেই। দোকানি চাচা আমার খুব প্রিয় মানুষ। বেশ রসিক। বলতে পারেন সমস্যা নেই।”আসলে বলতে চাচ্ছিলাম যে, “আপনার সব কথাই খুব মন দিয়ে শুনেছি। কিন্তু তবুও আমার স্ত্রীকে কেন যেন আমার কাছে আর আগের মতো ভালো লাগে না। খুব চেষ্টা করি মনটা ধরে রাখতে। পেরে উঠছি না।’ডা. রাকিব চায়ে কয়েক চুমুক লাগিয়ে হাসানের প্রতি মনোযোগী হলেন। খোলা পরিবেশে হাসানের এমন প্রশ্ন শুনে আদিব কিছুটা ইতস্তত বোধ করছে। এদিক- ওদিক চোখ ফিরিয়ে ডা. রাকিবের দিকে তাকাতেই ডা, রাকিব বললেন, ‘মি, আদিব আর মি. হাসান, সর্বশেষ কিছু কথা বলছি। একটু খেয়াল করুন। ‘দৃষ্টিভ্রম’ শব্দটির সাথে আপনাদের পরিচয় আছে?’আদিব-হাসান কেউ কিছু বলছে না। ডা. রাকিব বললেন, ‘সেদিন একটি ছবি দেখলাম। পাঁচ কোণা বিশিষ্ট গোলাকৃতির মতো দেখতে। অনেকটা ফুটবলের উপরের ছাপের মতো। তাকাতেই মনে হলো ছবির সবকিছু ঘুরছে। এবার নিমিয় একস্থানে গভীর দৃষ্টি স্থির রেখে দেখি, আসলে কিছুই ঘুরছে না। আবার দৃষ্টি হালভা করে দেখি, ঘুরছে। অদ্ভুত না?।এটা হলো ‘দৃষ্টিভ্রম’। রিয়েলিটি এক জিনিস, অথচ দেখি আরেক জিনিস। আমরা ধোকাটা খাই ঠিক এখানেই। এটাকে হ্যালুসিনেশন বলে। আমি এর কোনো সাইন্টিফিক ব্যাখ্যায় যাচ্ছি না। সরাসরি মূল কথায় আসছি।

 পৃষ্ঠা-১৩২

আমরা এমন অনেক কিছুই দেখি, যা আসলে যেমনটা দেখা যায়, ঠিক তেমনটাএনএন। তবে কোনো সুক্ষ্মদর্শী যদি গভীর দৃষ্টিতে দেখে, তাহলে সে বিষয়টি বুঝতেআমরা দেখি, বৃষ্টির বাড়ির ছাল ঘেঁষে আকাশ নেমেছে। গিয়ে দেখি, ফক্কা। রাজার তাকিয়ে দেখি, বৃষ্টির বাড়ি ডিঙিয়ে রাত্রির বাড়িতে গিয়ে গোটা আকাশ খাঁচাতে ছেঁয়েছে। এবার গিয়ে দেখি, আভা। আকাশ বোধহয় আঁধারেই মিলিয়ে গেছে। আবার ভোর হতেই দেখি, আকাশ আবারও তার স্টেশন বদলেছে। ভণকোষাও সে ল্যান্ড করেছে।চাঁপনি তাতে পথচলতে গিয়ে কেউ কখনও চাঁদের সাথে হেঁটেছেন? হাঁটতে পারেন। কিন্তু আমি হাঁটিনি। বরং চাঁদ নিজেই আমার সাথে হেঁটেছে। আমি দাঁড়ালে সে-ও থমকে গেছে। আবার আগালে, সে-ও আমার সাথ ধরেছে।স্ত্রী অদ্ভুত আমাদের দেখা তাই না?যেই মেয়েটিকে একাধিক ছেলে দেখতে গিয়ে পছন্দ না করে ফিরে যায়, অথচ এমন একজন একদিন আসে, যার চোখে এই মেয়েটিকেই অপরূপা মনে হয়। ছেলেটি তার কাছে ভালোবাসার তরী হয়। আর তাতে চড়ে মেয়েটি সুখের সাগরে ভেসে বেড়ায়।আমাদের চোখের দেখা এমনই বৈচিত্র্যময়। সৌন্দর্যের মাপকাঠি ব্যক্তিভেদে এভাবেই বদলে যায়। আর না হয়, কারও চোখের বিষ কারও হৃদয়ের মালি কী করে হয়ত।ডা. রাকিবের এমন অভূতপূর্ব কথাগুলো শুনে আদিব আর হাসান রীতিমতো বিস্মিতা কী সুন্দর কথা। কী মাধুর্য মাখা। যেন অমৃত…ডা. রাকিব ওদের প্রতি লক্ষ্য না করে বলে যাচ্ছেন। তিনি বললেন, ‘তবে মাশ্চর্যের বিষয় কী জানেন? আমাদের চোখ পরনারীকে লাস্যময়ী হিসেবে দেখে। অনলে দেখানো হয়। ইবলিশ ভার আপডেট ফটো ইডিটরের ভেলকিতে জাদু’টোকে স্রেফ ছানাবড়া করে দেয়।নিজের ঘরে চোখ ঝলসানো রূপসী স্ত্রী থাকলেও পাশ দিয়ে বেদের মেয়ে হেঁটে সেলে ওটাকেই বেশি সুন্দরী মনে হয়। আকর্ষণীয় দেখায়। কাছে পেতে ইচ্ছে হয়। পু-লুই কি আর কেউ পরকীয়ায় জড়ায়? দৃষ্টিভ্রমের ফাঁদে পড়েই মানুষ এসকল এছারাও ঘটায়। এজন্যই দৃষ্টিকে সংযত রাখতে হয়। রব্বে কারীমের আদেশও

 পৃষ্ঠা-১৩৩

একবার তাকে পেয়ে গেলে খুব দ্রুতই ভ্রম কেটে যায়। আসল রূপ সামনে এসে যায়। অভিশপ্ত এই চোখ তখন আবার নতুন কিছু খুজে বেড়ায়।এক্ষেত্রে অবশ্য স্ত্রীদেরও দোষ আছে। যেটাকে খুব মারাত্মক দোষ হিসেবে দেখি আমি।একটি মেয়ে বিয়ের পূর্বে কতশত স্বপ্ন বুনে, বাহারি রকম সাজে মজে, দিনরাত আবেগ-উচ্ছ্বাসের বাঁধ ভাঙে। কিন্তু বিয়ে হতেই কেমন যেন সেসবকিছু থেকে যে একপ্রকার ইস্তফা দেয়। এদিকে অন্যকেউ দৃষ্টিভ্রমের জাল ফেলে বেচারা স্বামীকে বাগে নেয়। বাস, আর কী চাই। বাকিটা অটোই হয়ে যায়…আচ্ছা। সে কেমন স্ত্রী?? যার স্বামীকে তার চেয়ে শতগুণ অযোগ্য ও কুৎসিত কেউ দৃষ্টিভ্রমের জালে আটকে দেয়? তার সৌন্দর্য নিজের স্বামীকেই যদি নিবেদন করে তাকে ধরে রাখতে না পারে, তাহলে বলুন তো, এই সৌন্দর্য হাতে, পায়ে নাকি মাথায় দেয়??আমাদের দ্বীনদার বোনদের মধ্যে এই বিষয়ে মাত্রাতিরিক্ত ঘাটতি রয়েছে। আজ শুধু আপনি না, অনেক দ্বীনদার স্বামীদের এই বিষয়ে গোপন অভিযোগও রয়েছে। বেচারা স্বামী কেবল ঈমান ও ব্যক্তিত্বের দাবিতে দিনের পর দিন নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখছে।আমার পক্ষ থেকে সেসব স্বামীকে স্যালুট দিচ্ছি। আর সেসব বোনের প্রতি করুণা প্রকাশ করছি। সেই সাথে মি. হাসান আপনাকেও স্যালুট। স্যালুট মি আদিব আপনাকেও।”স্যার, স্যালুট তো আমরা আপনাকে দেব। এতটা সময় দিচ্ছেন আমাদের। সেইসাথে এত এত অমূল্য পরামর্শ।”না না। আপনারা সচেতন স্বামীর পরিচয় দিয়েছেন। সাহস করে সমাধানের জন্য অকপটে আমাকে সব খুলে বলেছেন। অনেকে তো এটুকুও করে না। সমাধানের ন্যূনতম চেষ্টাটুকুও করে না।স্বামী বলে- অ্যাই।স্ত্রী বলে- এবার তাইলে বাপের বাড়ি যাই।

 পৃষ্ঠা-১৩৪

মাকে থেকে সন্তানগুলো বলির পাঠা হয়। খুব কষ্ট হয় এদের জন্য। যা হোক, আমার বাসার কাছেই মসজিদ আছে। ওখানেই নামাযটা পড়ে নেব। আপনারা এখান থেকেই পড়ে যান। আজ আসি তাহলে?”স্যার আর একটি কথা বাকি রয়ে গেছে। কিন্তু আপনার যে দেরি হয়ে’ভূম, বলুন মি. হাসান। বলে ফেলুন।”স্যার, আমার দাঁতেরও একটু সমস্যা। মাঝেমাঝে খুব দুর্গন্ধও হয়। কী যে করি।’ এই বলে মাথা চুলকাচ্ছে হাসান। ডা. রাকিব একটা চিকন হাসি দিয়ে বললেন, ‘ইয়াং ম্যান! স্ত্রীর সাথে মনোমালিন্য হওয়ার এটাও একটা কারণ। স্ত্রী কাছে আসতে চায় না। এই ব্যাপারে খুব কিউট একটা পরামর্শ দিচ্ছি।যাদের দাঁতের মাড়ি দুর্বল, একটুতেই পেইন হয়, ব্রিডিং হয়, শক্ত আবরণ পড়ে ও হলদেটে হয়ে যায় এবং মুখে দুর্গন্ধ সহ বিভিন্ন সমস্যা হয় তাদের জন্য অব্যর্থ একটি মেডিসিন হলো ‘মেসওয়াক’।তবে দাঁতের বিশেষ সমস্যার জন্য ডেন্টিস্ট দেখানোর বিকল্প নেই। এর পাশাপাশি প্রায় সকল পেসেন্টকেই এই সাজেশনটি দেওয়া যায়। শুরুর কয়েকদিন একটু ব্রিডিং হওয়া বা রক্ত আসলেও কিছুদিন নিয়মিত ব্যবহার করার পর ইন-শা- আল্লাহ সুস্থতার দেখা মিলবে…মাড়ি শক্ত, পেইন উধাও, ব্লিডিং বন্ধ, শক্ত আবরণ পড়া বন্ধ ও ঝকঝকে ফ্রেস এবং সুইটি-কিউটি এক ফ্লেভারে মুখটা কেমন যেন মাখোমাখো হয়ে যায়। নিজের কাছেই খুউউউব ভাল্লাগে…বিবাহিতদের জন্য টিপসটি বেশ রোমান্টিক। অবিবাহিতরাও প্রিপারেশন হিসেবে শুরু করেতে পারে…তো ঠিক আছে! আজ আসছি তাহলে। হ্যাপি রোমান্টিসিজম….

হোম
ই-শো
লাইভ টিভি
নামাজ শিক্ষা
গেইমস
চাকুরি