Skip to content

জনম জনম

পৃষ্ঠা ০১ থেকে  ২০

পৃষ্ঠা:০১

তিথি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কেন দাঁড়িয়ে আছে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। অবশ্যি আঠার-উনিশ বছরের মেয়েরা বিনা কারণেই আয়নার সামনে দাঁড়ায়। তিথির বয়স একুশ। সেই হিসেবে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকার একটা অর্থ করা যেতে পারে। এই বয়সের মেয়েরা অন্যের মাঝে নিজের ছায়া দেখতে ভালবাসে। যে কারণে পুকুর দেখলেই পুকুরের পানির উপর ঝুঁকে পড়ে। আয়নার সামনে থমকে দাঁড়ায়। নিজেকে দেখতে বড় ভাল লাগে। তিথির বয়স একুশ হলেও এইসব যুক্তি তার বেলায় খাটছে না। কারণ ঘর অন্ধকার। আয়নায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। যদিও বাইরে শেষ বেলার আলো এখনো আছে। সেই আলোর খানিকটা এ ঘরে আসা উচিত-কিন্তু আসছে না। বৃষ্টির জন্যে দরজা-জানালা বন্ধ করে রাখা হয়েছে। সারাদিন অবিশ্রান্ত বর্ষণ হয়েছে। এখন বৃষ্টি নেই। দরজা-জানালা অবশ্যি খোলা হয় নি। কারণ আবার বৃষ্টি আসবে। আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে। এই ঘরে সে ছাড়াও আরো একজন মানুষ আছে, তার বাবা-শিয়ালজানি হাই স্কুলের রিটায়ার্ড অ্যাসিসটেন্ট হেডমাস্টার জালালুদ্দিন সাহেব। জালালুদ্দিন সাহেব চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমুচ্ছিলেন। খানিকক্ষণ আগে তাঁর ঘুম ভেঙেছে। তিনি মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁর চোখে সমস্যা আছে। চোখ প্রায় নষ্ট। কিছুই দেখতে পান না। কড়া রোদে আবছা আবছা কিছু দেখেন। সত্যি দেখেন না কল্পনা করে নেন তা বোঝা মুশকিল। আজ তাঁর কাছে মনে হচ্ছে তিনি তাঁর বড় মেয়েকে এই অন্ধকারেও দেখতে পাচ্ছেন। শ্যামলা মেয়েটির বালিকাদের মত সরল মুখ, বড় বড় চোখ সব তিনি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন। কি আশ্চর্য কাও। জালালুদ্দিন সাহেব প্রচণ্ড উত্তেজনা বোধ করলেন। তাঁর চোখ কি তাহলে সেরে গেল নাকি? গত সাতদিন ধরে একটা কবিরাজী অষুধ তিনি চোখে দিচ্ছেন – ‘নেত্র সুধা’। অষুধটা মনে হচ্ছে কাজ করছে। জালালুদ্দিন চিকন গলায় ডাকলেন-ও তিথি। তিথি বাবার দিকে ফিরে তাকাল। কিছু বলল না। : চোখে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি রে মা। তোর পরনে একটা লাল শাড়ি না? পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। তিথি বলল, শাড়ির রঙ নীল। বলেই সে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। আজ সে বাইরে যাবে। বাইরে যাবার আগে কারো সঙ্গে কথা বলতে তার ভাল লাগে না। তিথি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল-আবার বৃষ্টি আসবে কি না বুঝতে চেষ্টা করল। বৃষ্টি আসুক বা না আসুক- তাকে বেরুতেই হবে। সে রান্নাঘরে ঢুকল। রান্নাঘরে তিথির মা মিনু চুলা ধরানোর চেষ্টা করছেন। কাঠ ভেজা। কিছুতেই আগুন ধরছে না। বোতল থেকে কেরোসিন ঢাললেও লাভ হয় না। ধপ করে জ্বলে উঠে কিছুক্ষণ পর আগুন নিভে যায়। কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া বেরুতে থাকে। তিথি একটা মোড়ায় বসে মাকে দেখছে। মিনু বিরক্ত গলায় বললেন-তুই বসে বসে ধোঁয়া খাচ্ছিস কেন? বারান্দায় গিয়ে বোস। তিথি নিঃশব্দে উঠে এল। বারান্দায় এসে দাঁড়াল। আবার বৃষ্টি হচ্ছে। টিনের চালে ঝমঝম শব্দ। ঘোর বর্ষা। তাদের বাসাটা কল্যাণপুর ছাড়িয়েও অনেকটা দূরে। জায়গাটার নাম সুতাখালি। পুরোপুরি গ্রাম বলা যায়। চারদিকে ধানী জমি। তবে ঢাকা শহরের লোকজন বেশির ভাগ জমিই কিনে ফেলেছে। তিন ফুট উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘিরে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছে-দিস প্রপার্টি বিলংস টু… দেয়াল ঘেরা অংশে পানি থৈথৈ করে। পানির বুক চিরে যখন-তখন হলুদ রঙের সাপ সাঁতরে যায়। জায়গাটায় সাপখোপের খুব উপদ্রব।

পৃষ্ঠা:০২

তবে অবস্থা নিশ্চয়ই এ রকম থাকবে না। তিন-চার বছরের মধ্যেই চার-পাঁচতলা দালান উঠে যাবে। ইলেকট্রিসিটি গ্যাস চলে আসবে। সন্ধ্যাবেলা চারদিক ঝলমল করবে। তিন কামরার একটি বাড়ির ভাড়া হবে তিন-চার হাজার টাকা। তিথিদের এই বাড়িটির ভাড়া মাত্র ছ’শ। রান্নাঘর ছাড়াই তিনটা কামরা আছে। এক চিলতে বারান্দা আছে। করোগেটেড টিনের শীটের বেড়া দিয়ে ঘেরা। রান্নাঘরের পাশে তিনটা পেঁপে গাছ আছে। তিনটা গাছেই প্রচুর পেঁপে হয়। ছ’শ টাকায় এ-ই বা মন্দ কি? মিনু চায়ের কাপ দিয়ে বারান্দায় এসে বিরক্ত মুখে বললেন, আবার বৃষ্টি নামল। এই বৃষ্টির মধ্যে যাবি কিভাবে? তিথি জবাব দিল না। আকাশের মেঘের দিকে তাকাল। মেঘ দেখতে সব মেয়েরই বোধ হয় ভাল লাগে। তিথির চোখে-মুখে এক ধরনের মুগ্ধতা। মিনু বললেন, চায়ে চুমুক দিয়ে দেখ মিষ্টি লাগবে কি-না। : চা খাব না মা। বাবাকে দিয়ে দাও। তোর বাবার জন্যে তো বানিয়েছি, তুই খা। ইচ্ছা করছে না। : শরীর খারাপ নাকি রে?: না। শরীর ভালই আছে। টুকু ঘরে আছে কি-না দেখ তো মা। আমাকে এগিয়ে দেবে।টুকু ঘরে ছিল। বাবার সাথে চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমুচ্ছিল। মিনু চাদর সরিয়ে প্রচণ্ড একটা চড় বসিয়ে দিলেন- হারামজাদা বাঁদর। সন্ধ্যাবেলায় ঘুম। টান দিয়ে কান ছিঁড়ে ফেলব।জালালুদ্দিন বিড়বিড় করে বললেন- ঘুমন্ত অবস্থায় মারধর করা ঠিক না। ব্রেইনে এফেক্ট করে। মিনু তীব্র গলায় বললেন-তুমি চুপ করে থাক। তোমাকে মারধর করা হয় নি। সামনে চায়ের কাপ আছে ফেলে একাকার করবে না।বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছবার আগেই হীরুকে দেখা গেল-পানিতে ছপছপ শব্দ করতে করতে আসছে। হীরু তিথির এক বছরের বড়। মুখ ভর্তি গোঁফ দাড়ির জঙ্গলের জন্য বয়স অনেক বেশি মনে হয়। হীরুর এক হাতে দড়িতে বাঁধা ইলিশ মাছ। অন্য হাতে টর্চ। ব্যাটারি ফুরিয়ে যাওয়ায় ঝাপসামত আলো বেরুচ্ছে। হীরু পাঁচদিন আগে আধমন চাল কিনবার টাকা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল-আজ ফিরছে। তিথি না-দেখার ভান করল।হীরু গম্ভীর গলায় বলল, তোরা কোথায় যাচ্ছিস?তিথি জবাব দিল না। যেমন হাঁটছিল তেমনি হাঁটতে লাগল। যেন সে এই মানুষটাকে চেনে না। এ যেন রাস্তার একজন মানুষ। পরিচিত কেট নয়।: কি রে, কথা বলছিস না কেন?: তোর সঙ্গে কথা বলার কিছু আছে?: আরে কি মুশকিল, এত রেগে আছিস কেন? বৃষ্টি-বাদলার দিনে এত রাগ ভাল না। বাসায় চল।: বাসায় গিয়ে কি হবে?: হবে আবার কি? গরম গরম ভাত আর ইলিশ মাছ, ফ্রাই খাবি। চল্লিশ টাকা দিয়ে কিনলাম। এমনিতে সত্তর টাকা দাম। বৃষ্টি-বাদলা বলে বাজারে লোক নেই। পানির দরে সব ছেড়ে দিচ্ছে।

পৃষ্ঠা:০৩

: তুই আমার সঙ্গে কথা বলিস না। বাসায় যা। বাসায় গিয়ে ইলিশ মাছ ভাজা খা।: রাতে ফিরবি তো? ফিরলে কখন ফিরবি বলে যা, বাস স্ট্যান্ডে থাকব। দিন- কাল ভাল না।: আমার জন্যে কাউকে দাঁড়াতে হবে না। আর একটা কথা বললে আমি কিন্তু চড় লাগাব। ফাজিল কোথাকার। চোরের চোর। : আরে কি মুসিবত, মুখ খারাপ করছিস কেন? আমি তোর সঙ্গে ভদ্র ব্যবহার করছি, তুই আমার সঙ্গে ভদ্র ব্যবহার করবি। আমি কি গালাগালি করছি? : চুপ কর: ধমক দিচ্ছিস কেন? তোর বড় ভাই হই মনে থাকে না? সংসারকে দুটা পয়সা দিয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করছিস। পয়সা কিভাবে আনছিস সেটা বুঝি আমি জানি না? এই শর্মা মায়ের বুকের দুধ খান না। সব বুঝে। তোর ঐ পয়সায় আমি পেচ্ছাব করে দেই। আই মেক ওয়াটার। বুঝলি-ওয়াটার। আমার স্ট্রেইট কথা। পছন্দ হলে হবে। না হলে- নো প্রবলেম। তিথি দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারে তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। সে কিছু-একটা বলতে গিয়েও বলল না। হীরু লম্বা লম্বা পা ফেলে বাড়ির দিকে রওনা হল। বারান্দায় উঠেই সে সহজ গলায় বলল-মা, মাছটা ধর তো। তার বলার ভঙ্গি থেকে মনে হতে পারে যে সে কিছুক্ষণ আগে মাছ কেনার জন্যেই গিয়েছিল। কিনে ফিরেছে। মিনু রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন ছেলের দিকে। হীরু মা’র দৃষ্টি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বলল, ঘরে সর্ষে আছে মা? যদি থাকে, সর্ষে বাটা লাগিয়ে দাও। কুমড়ো পাতা খোঁজ করছিলাম। পাই নি। পেলে পাতুরি করা যেত। বর্ষা- বাদলার দিনে পাতুরির মত জিনিস হয় না। মিনু শান্ত কণ্ঠে বললেন, তুই বেরিয়ে যা। হীরু অবাক হয়ে বলল, কোথায় বেরিয়ে যাব?: যেখানে ইচ্ছা যা। এই বাড়িতে তোকে দেখতে চাই না।: ঠিক আছে যেতে বলছ যাব।: এক্ষুণি যা।: আচ্ছা ঠিক আছে। মাছটা শখ করে এনেছি, রান্নাবান্না কর খেয়ে তারপর যাই। এক ঘন্টা আগে গেলেও যা পরে গেলেও তা।মিনু মাছ উঠোনের কাদার মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে রান্নাঘরে ঢুকে গেলেন। হীরু উচু গলায় বলল, আমার উপর রাগ করছ কর মাছের উপর রাগ করছ কেন? এই বেচারা তো কোন দোষ করে নি। একের অপরাধে অন্যের শাস্তি- এটা কি রকম বিচার?মিনু রান্নাঘর থেকে চেচিয়ে বললেন-ঘরে ঢুকলে বটি দিয়ে তোকে চাকা চাকা করে ফেলব। খবরদার। হীরুর তেমন কোন ভাবান্তর হল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই হীরুকে দেখা গেল গামছা লুঙ্গির মত করে পরে বটি নিয়ে অন্ধকার বারান্দায় মাছ কুটতে বসেছে। কথা বলছে নিজের মনে। এমন ভাবে বলছে যেন রান্নাঘর থেকে মিনু শুনতে পান-: সব কিছু না শুনেই রাগ। আরে আগে ঘটনাটা কি ঘটেছে শুনতে হবে না? না শুনেই চিৎকার, চেঁচামেচি। চাল কিনতে বাজারে ঢুকেছি। নাজিরশাল চাল। দেখেশুনে পছন্দ করলাম। বস্তার মধ্যে নিলাম বিশ সের। টাকা দিতে গিয়ে পকেটে হাত দিয়ে দেখি-পরিষ্কার। সাফা করে দিয়েছে। চাল না নিয়ে বাসায় ফিরি কিভাবে? চক্ষু-

পৃষ্ঠা:০৪

লজ্জার ব্যাপার আছে না? গেলাম রশীদের কাছে টাকা ধার করতে। সেইখানে গিয়ে দেখি রশীদ শালা টেম্পোর সঙ্গে একসিডেন্ট করে এই মরে সেই মরে… গেলাম হাসপাতালে, দিলাম ব্লাড। ব্লাড দেয়ার পরে দেখি নিজের অবস্থা কাহিল-তিরমি খেয়ে পড়ে যাচ্ছি, সিস্টার এসে ধরল… মিনু রান্নাঘর থেকে জ্বলন্ত চ্যালাকাঠ নিয়ে বের হলেন। শীতল স্বরে বললেন- আর একটা কথা না। হীরু চুপ করে গেল। জালালুদ্দিন নিচু গলায় বললেন, খালি পেটে চা খাওয়াটা ঠিক হবে না। আলসার- ফালসার হয়। ঘরে আর কিছু আছে? : মুড়ি আছে। মুড়ি মেখে দেব? : থাকলে দাও। ক্ষিধে ক্ষিধে লাগছে। : ঐ একটা জিনিসই তো তোমার লাগে- ক্ষিধা। সকালে ক্ষিধা, বিকালে ক্ষিধা, সন্ধ্যায় ক্ষিধা। মিনু আবার রান্নাঘরে ঢুকলেন। চাপা স্বরে বিড়বিড় করতে লাগলেন, এর নাম সংসার। সুখের সংসার। স্বামী-পুত্র-কন্যার সুখের সংসার। এত সুখ আমার কপালে। আমি হলাম গিয়ে সুখের রানী- চম্পাবতী। জালালুদ্দিনের চোখ এখন বন্ধ। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে চোখ করকর করে। চোখ দিয়ে পানি পড়ে। তিনি হাতড়ে হাতড়ে চায়ের কাপ নিলেন। চুমুক দিয়ে তৃপ্তির একটা শব্দ করলেন। নরম স্বরে ডাকলেন-ও টুকু। টুকন রে। টুকু জবাব দিল না। বিনা কারণে মার খেয়ে তার মন খুব খারাপ হয়েছে। সে বসে আছে গভীর মুখে। জালালুদ্দিন আবার ডাকলেন, ও টুকু। ও টুকুন। : কি?: চোখটা মনে হচ্ছে সেরেই গেছে। খানিকক্ষণ আগে তিথিকে দেখলাম। পরিষ্কার দেখলাম। শাড়ির রংটা অবশ্যি ধরতে পারি নি। টুকু কিছুই বলল না। তিনি তাতে খুব-একটা ব্যথিত হলেন না। এ বাড়ির বেশির ভাগ লোক তাঁর সঙ্গে কথা বলে না। কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেয় না। তার এখন অভ্যেস হয়ে গেছে।: ৩ টুকু? : কি? : মাগরেবের আযান হয়েছে? : জানি না। : চা খাবি? পিরিচে ঢেলে দেই? জ্বরের মধ্যে চা ভাল লাগবে। অষুধের মত কাজ করবে। পাতার রসটা ডাইরেক্ট আসছে। কুইনিন কি জিনিস? গাছের বাকলের রস। গাছেররস খুবঈপকারী। টুকু কোন কথা না বলে খাট থেকে নেমে গেল। তার বয়স তের। কিন্তু দেখে মনে হয় ন-দশ। শরীর খুবই দুর্বল। কিছুদিন পরপরই অসুখে পড়ছে। আজ জ্বরের জন্য সে অবেলায় ঘুমিয়ে পড়েছিল। বারান্দায় বালতিতে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা। টুকু মগ ডুবিয়ে পানি তুলছে। বরফ শীতল সেই পানিতে মুখ ধুতে গিয়ে শীতে কেঁপে কেঁপে উঠছে। নিশ্চয়ই এখনো গায়ে জ্বর আছে। নয় তো পানি এত ঠাণ্ডা লাগত না। মুখে পানি ঢালতে ঢালতে সে তিথির দিকে তাকাল। আপাকে কি সুন্দর লাগছে। পা আর একটু ফর্সা হলে কি অদ্ভুত হত। তিথি বলল, টুকু আমাকে বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত এগিয়ে দিবি?

পৃষ্ঠা:০৫

টুকু মাথা নাড়ল। ভেতর থেকে জালালুদ্দিন ডাকলেন-তিথি, শুনে যা তো মা। তিথি বারান্দা থেকে নড়ল না। সেখান থেকেই বলল- কি বলবে বল। : এই সন্ধ্যাবেলা কোথায় বেরুচ্ছিস? কি রকম ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে দেখছিস না। : আমার কাজ আছে। : ঝড়বৃষ্টির মধ্যে কিসের কাজ। বাদ দে। সে জবাব দিল না। জালালুদ্দিন বললেন, খবরদার বেরুবি না। কাঁথা গায়ে দিয়ে শুয়ে থাক। মানুষ কি পিঁপড়া নাকি যে রাতদিন কাজ করবে। মিনু ঝাঁঝাল গলায় বললেন, চুপ কর। সব সময় কথা বলবে না। : এই বৃষ্টির মধ্যে যাবে নাকি? : তোমাকে এটা নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না। : বৃষ্টিতে ভিজে একটা জ্বরজ্বারি বাঁধাবে… সিজন চেঞ্জ হচ্ছে। : বললাম তো তোমাকে মাথা ঘামাতে হবে না। তিথি যখন বেরুল তখন সন্ধ্যা নেমে গেছে। চারদিক অন্ধকার। ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। সে ঘর থেকে বেরুবার সময় কাউকে কিছু বলে বেরুল না। মিনু বারান্দাতেই ছিলেন-তাঁর দিকে তাকিয়ে একবার বললও না-মা, যাচ্ছি। যেন সে তাঁকে দেখতেই পায় নি। ঘরে ছাতা নেই। তিথি মোটা একটা তোয়ালে মাথায় জড়িয়ে রাস্তায় নেমেছে। খালি পা। স্যান্ডেল জোড়া হাতে। কাঁচা রাস্তা, খুব সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছে। টুকু আগে আগে যাচ্ছে। তার মাথায় কিছু নেই। বৃষ্টিতে মাথার চুল এর মধ্যেই ভিজে জবজবে। তিথি বলল, বাসায় গিয়ে ভাল করে মাথা মুছে ফেলবি। নয় তো জ্বরে পড়বি। টুকু মাথা কাত করল। মৃদু গলায় বলল, রাতে ফিরবে না আপা? ঃনা। : সকালে আসবে? : ই। এবার বর্ষা আগেভাগে এসে গেল তাই নারে টুকু। মনে হচ্ছে শ্রাবণ মাস। তাই না? : গতবারের মত এবারও ঘরে পানি উঠবে কি-না কে জানে। তোর কি মনে হয় উঠবে?টুকু জবাব দিল না। তার গা কাঁপিয়ে জ্বর আসছে। কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। কলাবাগানের ভেতরের দিকে একটা বাড়ির সামনে তিথি এসে উপস্থিত হয়েছে। তার শাড়ি কাদা-পানিতে মাখামাখি। হোঁচট খেয়ে স্যান্ডেলের ফিতা ছিঁড়ে গেছে। নখের খানিকটা ভেঙে যাওয়ায় রক্ত পড়ছে। অনেকক্ষণ কড়া নাড়বার পর মাঝবয়েসী এক লোক দরজা খুলল। তার খালি গা। হাঁটু পর্যন্ত উচুতে লুঙ্গি উঠে আছে। পরার ধরন এমন যে মনে হয় যে কোন মুহূর্তে খুলে পড়ে যাবে। তার কোলে তিন-চার বছরের একটি বাচ্চা। ভদ্রলোক বাচ্চাকে ঘুম পাড়াতে চেষ্টা করছেন। বাচ্চা ঘুমুচ্ছে না। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ ঝিম ধরে থাকে আবার মাথা তুলে ‘হিক’ জাতীয় বিচিত্র শব্দ করে। তিথি বলল, নাসিম ভাই কেমন আছেন? নাসিম বিরক্ত গলায় বলল, এই তোমার বিকাল পাঁচটা, ক’টা বাজে তুমি জান? তিথি চুপ করে রইল। নাসিম বলল, আটটা পচিশ। তিথি হালকা গলায় বলল, দূরে থাকি। ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে। তাই দেরি হল।

পৃষ্ঠা:০৬

: দূরে তুমি একা থাক নাকি? অন্যরা থাকে না? কতবার বললাম খুব ভাল পার্টি হাজার খানিক টাকা পেয়ে যাবে। বেশিও দিতে পারে। নতুন পয়সা-হওয়া পার্টি। এদের টাকার মা-বাপ আছে? উপকার করতে চাইলে এই অবস্থা। : ভেতরে আসতে দিন নাসিম ভাই। বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। মনে হচ্ছে জ্বর এসে যাচ্ছে। : আস আস, ভেতরে আস। পা কেটেছে নাকি? : । ঃ ইশ, রক্ত বের হচ্ছে দেখি। যাও, বাথরুমে ঢুকে শাড়ি বদলে ফেল। তোমার ভাবীকে বল শাড়ি দিবে। আজ রাতে তো আর কিছু পাওয়া যাবে না। ভাল একটা পার্টি চলে গেল। : আজ তাহলে চলে যাব? ঃ ঝড়বৃষ্টির মধ্যে যাবে কোথায়? কথা বলে সময় নষ্ট করছ কেন? বুকে ঠাণ্ডা বসে গেল মুশকিলে পড়বে। : নাসিম ভাই, এখানে কোন জায়গা থেকে একটা টেলিফোন করা যাবে? : কোথায় টেলিফোন করবে। তিথি চুপ করে রইল। নাসিম বলল, শোন তিথি একটা কথা বলি মন দিয়ে শোন-পার্টির সাথে বাড়তি খাতির রাখবে না। যত দূরে থাকা যায়। ফেল কড়ি মাখ তেল। এর বেশি কিছু নয়। : সে রকম কিছু না নাসিম ভাই। : সে রকম কিছু না হলেই ভাল। নাসিম গলা উচিয়ে বলল-রীনা, কই চা দাও দেখি। ঘরে স্যাভলন-ট্যাভলন আছে? বাথরুমের তাকে দেখ তো। আর এক বান্দরের বাচ্চা তো ঘুমুচ্ছে না। ইচ্ছা করছে আছাড় দিয়ে পেটটা গালিয়ে দেই। চুপ- কানবি না। একদম চুপ। রীনা এসে বাচ্চাটিকে নিয়ে গেল। একবার শুধু সরু চোখে দেখল তিথিকে। আগেও অনেকবার দেখেছে- কখনো কথা হয় নি। আজও হল না। রীনার বয়স বোল সতের। এর মধ্যে দুটি বাচ্চার মা হয়েছে। তৃতীয় বাচ্চা আসার সময়ও প্রায় হয়ে এল। রোগা শরীরের কারণে তার সন্তানধারণজনিত শারীরিক অস্বাভাবিকতা খুবই প্রকট হয়ে চোখে পড়ে। নাসিম বলল, এখনো দাঁড়িয়ে আছ কেন? যাও, ভেতরে গিয়ে শাড়ি বদলে আস। পায়ে কিছু দাও।: শাড়ি বদলাব না-চলে যাব। : এত রাতে? : রাত বেশি হয় নি। ব্যস আছে : রাতবিরাতে এরকম চলাফেরা ভাল না, কখন কোন বিপদ হয়। রীনা চা নিয়ে এসেছে। এত দ্রুত সে চা বানাল কি করে কে জানে। মেয়েটা খুবই কাজের। তিথির চা খেতে ইচ্ছা করছে না। মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে। জ্বর আসবে কি-না কে জানে। নাসিম পিরিচে ঢেলে বড় বড় চুমুকে চা খাচ্ছে। প্রতিবার চুমুক দিয়ে আহ্ করে একটা শব্দ করছে। সামান্য চায়ে এত তৃপ্তি। কিছু কিছু মানুষ খুব অল্পতে সুখী হয়। : ডিবি। : জ্বি। : থাকতে চাইলে থাক, অসুবিধা কিছু নেই। খালি ঘর আছে।

পৃষ্ঠা:০৭

: না থাকব না। : পরশু, তরশু একবার এসো। দেখি যদি এর মধ্যে ভাল কোন পার্টি পাই। ফওনেরে পারতে গেলে তাল এদের দরাজ দিল খুশি হলে কৃশ থাকে না করে সন না। কিছু আছে বিরাট খক্ষর। চামড়া সাদা হলেই যে দরাজ দিল হয় এটা ঠিক না। সাদা চামড়ার মধ্যেই খঙর বেশি। নাসিম নিজেই ছাতা হাতে তিথিকে বাসে তুলে দিতে গেল। যাবে-জানা কথা। যে অল্প কিছু ভাল মানুষের সংস্পর্শে তিথি এসেছে-নাসিম তার মধ্যে একজন সে বাসে তিথিকে শুধু যে উঠিয়েই দিয়ে আসবে তাই না বাসের ভাইভারকে বলে আসবে- একটু খেয়াল রাখবেন ভাইসাব, একা যাচ্ছে। বৃষ্টি ধরে গেছে। ঠাণ্ডা বাতাস দিচ্ছে। রাস্তায় জায়গায় জায়গায় পানি উঠে গেছে। পানি ভেঙে যেতে হচ্ছে নাসিম বলল, এক ফোঁটা বৃষ্টি হলে দুই হাত পানি হয়ে যায়। এই রহস্যটা কি বুঝলাম না। তিথি কিছু বলল না। নাসিম বলল, তোমার ভাই চাকরি-বাকরি কিছু পেয়েছে? ঃনা। : মটর মেকানিকের কাজ শিখবে নাকি জিজ্ঞেস করো তো। পাগিয়ে দেব ভাসমত কাজ শিখতে পারলে কাঁচা পয়সা আছে, জিজ্ঞেস করো। : সস্থা জিজ্ঞেস করব। : টেলিফোন করতে চেয়েছিলে- কার কাছে টেলিফোন? : চেনা একজন : পাওয়ারফুল কেউ হলে যোগাযোগ রাখবে-কখন দরকার হয় কিছুই বলা যায় না বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছানো মাত্র বাস পাওয়া গেল। ফাঁকা বাস। পেছনের দিকে তিন- চারজন মানুষ বসে আছে নাসিম বাসের ভাইভারতে বিন্দত ভঙ্গিতে বসল, ভাইজান একটু দেখেশুনে নামাবেন, মেয়েছেলে একা যাচ্ছে। পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটা এগিয়ে দিস নার্সিং সিগারেট খায় না, অনাকে দেবার জন্যে সব সময় সঙ্গে রাখে। তিথির হাতে সে একশ’ টাকার একটা নোট গুয়ে দিল। এটা হচ্ছে ধার হ’তে টাকা এলে শোধ দিতে হবে। বাদ না ছাড়া পর্যন্ত নাসিম ফুটপাতে দাঁড়িয়ে রইস তিথি ছোট একটা নিঃশ্বাস ফেলল-এই মানুষটা তার চমৎকার একজন বড় তাই হতে পারত। কেন হল না?২ হারিকেন জ্বালাতে গিয়ে মিনু দেখলেন তেল দেই। অথচ কাল হারিকেনে তেল জরাগ্র পরও বোতসে চার আঙুলের মত অবশিষ্ট ছিল গেল কোথায়? টুকু ফেলে নিয়েছে? সকালবেলা কেরোসিনের বোতল নিয়ে কি যেন কাড়িল। মিনুর বিরক্তির সীমা রইল না। টুকু বাড়ি নেই সকালে টুকুকে তিনি কিছু শান্তি দিয়েছেন। দু’বার চুল ধরে দেয়ালে মাথা ঠুকে দিয়েছেন সে নিঃশব্দে কেঁদেছে কিন্তু কিছু বলে নি। তিনি একাই চেচিয়েছেন- কঠিন কঠিন বাক্যবাণে বিন্ধ করেছেন। টুকু শুধু শুনে গেছে, মাঝে মাঝে এমন ভঙ্গিতে তাকিয়েছে যাতে মনে হয় পৃথিবীর হৃদয়হানতায় দে খুব অবাক হচ্ছে। এতে মিদুর রাগ আরও বেড়েছে সেই রাগের চরমতম প্রকাশ তিনি দেখালেন দুপুরে

পৃষ্ঠা:০৮

ভাত খাবার সময়। টুকুর সামনে থেকে ভাতের থালা সরিয়ে দিয়ে কর্কশ গলায় বলবেন, যা তোর ভাত নেই। দুই মাসের দিকে কয়েক৩৫ ০৫০ ০৫ মাতাল, উঠে গেল না বসেই রইল। সে ক্ষিবে সহ্য করতে পারে না। মিনু কঠিন গলায় বললেন-উঠ, নয় তো পিঠে চ্যালাকাঠ ভাঙব। টুকু তবু বসে রইল। তিনি সত্যি সত্যি হাতে চ্যালাকাঠ নিলেন। টুকু উঠে বারান্দার জলচৌকিতে বসে রইল। তার মনে ক্ষীণ আশা-কিছুক্ষণের মধ্যেই খাওয়ার ডাক আসবে। বিশেষ করে আপা আজ বাসায় আছে। সে নিশ্চয়ই তাকে ফেলে খাবে না। টুকু অবাক হয়ে দেখল-আপা তাকে রেখেই ভাত খেল। খাওয়ার শেষে বারান্দায় হাত ধুতে এসে বলল, টুকু আমাকে মোড়ের দোকান থেকে একটা পান এনে দে। বমি বমি লাগছে। টুকু পান এনে দিয়ে আবার এসে বসল বারান্দায়। অত্যন্ত বিষ্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করল, মা রান্নাঘরের ঝামেলা শেষ করে দরজায় শিকল তুলে দিচ্ছেন। এই বাড়ির একজন যে না খেয়ে আছে, এই কথা তিনি বোধ হয় সত্যি ভুলে গেছেন। টুকু তবুও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। ভয়ে ভয়ে শোবার ঘরে উকি দিল-মা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন। হয়ত ঘুমিয়েই পড়েছেন। সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। টুকু ভীতু ধরনের ছেলে। সাধারণত সন্ধ্যার আগেই ফিরে। আজ এখনো ফিরছে না। দিন খারাপ করেছে। আজও হয়ত ঝড়বৃষ্টি হবে, ক’দিন ধরে রোজ সন্ধ্যায় বৃষ্টি হচ্ছে। মিনু তেলশূন্য হারিকেন নিয়ে তিথির ঘরে এলেন। তিথি চাদর গায়ে বিছানায় বসে আছে। তার গায়ে জ্বর। ঐদিন বৃটিতে ভেজার পর থেকেই সে জ্বরে পড়েছে। এখন জ্বর খানিকটা বেড়েছে। খোলা জানালা দিয়ে যে বায়াস আসছে তা তেমন ঠাণ্ডা দয় তবু তিথির গা শিরশির করছে। উঠে জানালা বন্ধ করতে ইচ্ছা করছে না। মিনু ঘরে ঢুকেই বসলেন-চার ‘আঙুল তেল ছিল বোতলে কোথায় গেল জানিস? তিথি বসল, জানি না। : বাতাসে তো উড়ে যায় নাই। । বিড়াল ফেলে দিয়েছে হ্যাত। : এখন কাকে দিয়ে তেল আনাই? : টুকু আসে নি এখনো? : না। : ও এলে এনে দিবে। তুমি জানালাটা বন্ধ করে দাও তো মা, ঠাণ্ডা লাগছে। এই গরমে ঠাণ্ডা লাগছে? জ্বর নাকি? দেখি। : মিনু, তিখির কপালে ছুঁয়ে দেখতে গেলেন তিথি একটু সত্রে গিয়ে করুন, গায়ে হাও দিও না মা মিনু বিস্মিত হয়ে বললেন- গায়ে হাত দিসে কি? : কিছু না। আমার ভাল লাগে না। ঃ মা গায়ে হাত দিলে ভাল লাগে না, এটা কি ধরনের কথা? বলছিস কি এসব? : তোমার সঙ্গে বকবক করতেও ইচ্ছা করছে না। জানালাটা বন্ধ করে চলে যাও। মিনু আনাসা বন্ধ করে চলে গেলেন। তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হল। সমস্ত বাড়ি অন্ধকার। রান্নাঘরে চুলায় আগুন জ্বলছে বাড়িতে এইটুকুই মালো মিনু রায়া চড়িয়েছেন। আয়োজন তেমন কিছু না। গতকাদের ঝড়ে একটা পেপে গাছ পড়ে গেছে। সেই পেঁপের একটা তরকারি আর ডাল। চাল ক’জনের জন্যে নেয়া হবে তা তিনি বুঝতে পারছেন না। তিমির জ্বর এসেছে, সে নিশ্চয়ই রাতে কিছু খাবে

পৃষ্ঠা:০৯

না ইরু আসবে কি আসবে না কে জানে: গত তিন দিন ধরে রাতে খাওয়ার সময় আসছে। আজও হয়ত মসবে টুকু এখনো ফেরে নি তবে সে অবশ্যই ফিনাবে তার যাবার জায়গা নেই একদিন যখন হরর মত কোথাও জায়গা হবে তখন সেও আসা বন্ধ করবে। জালালুদ্দিন রান্নাঘরে এসে উপস্থিত হয়েছেন। আজ তাঁর চোখের যন্ত্রণাটা একটু কম। আগের কবিরাজী ওষুধ বাদ দিয়ে পহুমধু দিচ্ছেন- এতে সম্ভবত কাজ হচ্ছে। তবে চোখ আটা আটা হয়ে থাকে-এই যা কষ্ট।জালালুদ্দিন নিচু গলায় বললেন-এক ফোঁটা চা হবে? মিনু ঠাণ্ডা গলায় বললেন-না।: চুলা বন্ধ? : বৃষ্টি-বাদলায় গলাটা খুসখুস করে। কর একটু চা। আদা-চা: জালালুদ্দিন খানিকটা দূরত্ব রেখে স্ত্রীর কাছে বসলেন। আজ তাঁর চোখের যন্ত্রণা কম থাকায় মনটা বেশ ভাল। মিনুর সঙ্গে গল্পসল্প করতে ইচ্ছ করছে। প্রথম যৌবনে তাদের যখন নতুন সংসার হল-সোহাগী স্টেশনের কাছে বাসা নিয়েছিলেন। রান্নাঘর অনেক দূরে। মিনু একা রান্না করতে ভয় পেত। তখন কতই বা তার বয়স? তের কিংবা চৌদ্দ। নিতান্তই বাচ্চা মেয়ে। তাকে রাতের বেলা রান্নার সময় সারাক্ষণ স্ত্রীর পাশে বসে থাকতে হত। রান্না হবার পর খাওয়া-দাওয়া শেষ করে একবারে শোবার ঘরে আসা। কত মধুর স্মৃতি। কত বর্ষার রাত রান্নাঘরে পাশাপাশি বসে কেটেছে। অর্থহীন কত গল্প হাসি তামাশা মান-অভিমান। আজকের এই কঠিন মিনু সেদিন কোথায় ছিল? জাসাদুদ্দিন ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস গোপন করে বসসেন-চোখের মন্ত্রণা একেবারেই নেই এই যে আগুনের দিকে তাকিয়ে আছি-চোখ কিন্তু কড়মড় করছে না। : না করসে তো ভদেই। : দেখি একটু আগুন সিগারেট খাই একটা হীরু একটা প্যাকেট দিয়ে গেল। মিনু দেয়াশলাই এগিয়ে নিলেন। জালালুদ্দিন সিগারেট ধরিয়ে হৃষ্টচিত্তে টানতে লাগসেন। নরম গলায় বললেন, পদ্মমধূ আসলে খুব ভাল মেডিসিন। তবে খাঁটি জিনিস হতে হবে। দুনিয়া ভর্তি ভোল। পাবে কোথায় খাঁটি জিনিস? মিনু জবাব দিগেন না। ভাল চড়িয়েছিলেন, ডালের হাঁড়ি নামিয়ে এলুমিনিয়ামের একটা মগ চুলায় বসিয়ে দিলেন। চা হচ্ছে। জালালুদ্দিনের চোখ চকচক করছে। তিনি স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে খুশি খুশি গসায় বললেন-চোখ সতিা সেরে গেলে প্রাইভেট টিউশ্যানি ধরব। দু’তিনটা ছেলেকে পড়ালেই হাজার বার’শ টাকা চলে আসবে। ঢাকা শহরে প্রাইভেট টিউটরের খুবই অভাব। নাই বললেই হয়। তুমি কি বল?মিনু কিছু বললেন না, বিচিত্র একটা ভঙ্গি করলেন। জালালুদ্দিন চোখের অসুখের কারণে সেই ভঙ্গি দেখতে পেলেন না। দেখতে পেলে তাঁর খুব মন খারাপ হত। তিনি বলগেন, সংসারটা তখন ঠিকঠাক করা যাবে। তারপর হীরু একটা দোকান নেয়ার: দোকান দিচ্ছে? কথা বলছে, যদি সত্যি স’া দেয়- টাকা আসবে পানির মত।: বলল তো কালই সে।। দোকানের টাকা পাচ্ছে কোথায়।

পৃষ্ঠা:১০

। বন্ধু-বান্ধব আছে ঢাকা শহরে বুঝলে মিনু টাকা কোন সমস্যা না, তবে কায়দা-কানুন জানা থাকা চাই। ঢাকা শহরের বাতাসে পয়সা উড়ে। কেউ ধরতে পারে মিনু চায়ের কাপ স্বামীর দিকে এগিয়ে দিলেন জালালুদ্দিন চায়ে চুমুক না দিপ্লেই বললেন- চমৎকার! তুমিও এক কাপ খাও বৃষ্টি-বাদসার দিন ভাল লাগবে মিনু বিরক্ত গলায় বললেন-তোমার খাওয়া তুমি খাও। আামাকে নিয়ে ভাবতে হবে না। তিনি তিথির জন্যে দেবুর শরবত নিয়ে শোবার ঘরে গেলেন ঘর নিকষ অন্ধকার। এই অন্ধকারে ডিমি এখনো ঠিক আগের মতই বসে আছে সেতুর শরবত এনেছি-নে। : তিমি বলল- কিছু খাব না, খেতে ইচ্ছে করছে না: টুকু এসেছে? ঃনা।: বৃত্তির মধ্যে ভিজছে বেধে হ্যা। আবার একটা বড় অসুখ বাঁধাবে। মিনু তাঁর গলায় বললেন- আজ আসুক মামি হ’গ্রামসদোর বিষ ঝাড়ব তিথি শীতল গলায় বলল, বিষ ঝেড়ে ফেড়ে তো হারার এই অবস্থা করাছ। আর না হয় নাই ঝাড়ষে। মিনু তিথিকে একটা কঠিন কথা বলতে গিয়েও বললেন না। অনেক কন্ট্র নিজেকে সামসাসেন উঠোনে ছপহপ শব্দ হচ্ছে। মিনু বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন টুকু এসেছে বোধ হয়। টুকু না হীরু এসেছে। সে তার মায়ের মুখের উপর উই ফেলে বলল, চারদিক এমন ডার্ক করে রেখেছ-ব্যাপার কি। তিনি জবাব দিলেন না। হীরু মাকে পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, বাতি টাতি জ্বাগাও কারো কোন সাড়াশব্দও পণ্ডি না। সব ঘুমিয়ে পড়েছে নাকি? রাত তো বেশি হয় নি আপা বাসায় আছে? সে এই কথারও জবাব পেস না। এ বাড়িতে তার অবস্থাও তার বাবার মত। বেশির ভাগ কথারই কেউ কোন জবাব দেয় না জবাব দেবার প্রয়োজন মনে করে না। ইরু অন্ধকারেই গোসল সেরে ফেলল কেরোসিনের অভাবে বাতি জ্বলছে না জেনেও তার মধ্যে কোন ভাবান্তর দেখা গেল না সে অতি উৎসাহে তিথিকে বদরে শুরু করল কি করে সে আজ রডে নিউ একটা ছাতা জোগাড় করে ফেলেছে : বুঝলি তিথি, বাস থেকে নামার সময় হঠাৎ দেখি সামার পায়ের কাছে একটা ছাতা। আমার পাশে এক গর্দভ নাম্বার ওয়ান বসে ছিল দ্বাতা না নিয়েই ঐ শালা বৃষ্টিরমধ্যে নেমে পড়েছে: তুই ঐ ছাড়া নিয়ে চলে এসি?: হ্যাঁ। আমি না নিবে অন্য কেউ নিত কি-দিত নাঃ রান্ড নিউ জিনিস। লেবেলটা পর্যন্ত আছে: আমার সামনে থেকে যা, বকবক করিস না মাথা সহছে।: যার কাছেই যাই সেই বলে সামনে থেকে যা আমি যাবটা কোথায়? একদিন বাড়িঘর ছেড়ে চলে যাব তখন বুঝবি।ঃ চলে যা তোকে ধরে রাখছে কে?: যাবই তো। কয়েকটা দিন। জাস্ট ফিউ ডেজ। একদিন হঠাৎ দেখবি ফুডুৎ পাখি নেই। নো বার্ড।

পৃষ্ঠা:১১

হীরু সিগারেট ধরাল। সিগারেটের আলোয় দেখা গেল সে দাড়ি কেটে ফেলেছে। তবে গোঁফ এখনো মাছে। তিনি যবন, তুই মটর মেকানিদের কজে শিখাণঃহারু অবাক হয়ে বলল, আমি মামি মটর মেকানিকের কাজ শিখব। ইয়ার্কি করছিল? চোর-ছ্যাঁচড়ের কাজ শিখব আমি? অনা কেউ এ কথা বললে ধাক্কা দিয়ে ফেলে নিতাম। নেহায়েত তুই বলে এক্সকিউজ করে দিলাম।হীরু কেরোসিন নিয়ে এসেছে। আশেপাশে খানিকটা খুঁজেও এসেছে। টুকু নেই: এই নিয়ে তার মধ্যে বিন্দুমাত্র উদ্বেগ দেখা গেল না। ভাত খাবার সময় অত্যন্ত সহজভাবে বলল, দুই-এক রাত বাইরে না কাটালে ছেলেপুসে শক্ত হয় না। থাকুক বাইরে। হার্ড লাইফ সম্পর্কে ধারণা হোক। মেয়ে হলে ভয়ের কথা ছিল। মেয়ে তো না। মিনু একটি কথাও বললেন না। যথানিয়মে খাওয়া-দাওয়া করলেন। বাসন- কোসন ধুয়ে রান্নাঘরে শিকল উঠিয়ে দিলেন। রান্নাঘরের কাজ রাতের মত শেষ হল। আবার ভোরবেলায় খোলা হবে। গভীর রাতে বন্ধ হবে। এই ছোট্ট ঘরটার পেছনে জীবন কেটে যাবে তিমির জ্বর বেশ বেড়েছে। রাতে সে কিছুই খায় নি। মিনু দুটি আটার রুটি বানিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। সে বিরক্ত হয়ে বলেছে- রুটি বানাতে তোমাকে বলেছেটা কে?: না খেয়ে থাকবি?: হ্যাঁ, না খেয়ে থাকব। ভূমি য়াও-ঘুমাও।: আমার সঙ্গে এরকম করে কথা বলছিস কেন? : ভাল করে কথা বলা ভুলে গেছি এখন আমি শুধু বাইরের মানুষের সঙ্গে ভাল করে কথা বলতে পারি খুব মিষ্টি করে বলি। মিনু ঘর ছেড়ে বারান্দায় এলেন। উঠানের পানি বেড়ে বারান্দা ছুঁয়েছে, এবারো কি আগের বছরের মত ঘরে পানি উঠবে? এবারো হয়ত ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্য কোথা যেতে হবে। কিন্তু যাবেনই বা কোথায়? মিনু সারারাও বারান্দায় বসে কাটালেন। টুকুর জন্যে অপেক্ষা? হয়ত বা তাই। তবে টুকু বাড়ি না-ফেরায় তাঁকে খুব কাতর মনে হল না। তিনি ছেলে প্রসঙ্গে তেমন কোন দুশ্চিন্তাও করসেন না। শুধু বসেই রইলেন। শেষ রাতে মেঘ কেটে আকাশে চাঁদ উঠল। সুন্দর জ্যোৎস্না। একা একা জ্যোৎস্না দেখতে তাঁর ভালই লাগল। অথচ হীরু যখন প্রথম কাউকে কিছু না বলে বাইরে রাত কাটাস কি অসপ্তব দুশ্চিন্তাই না তিনি করেছিসেন। ঘরের একটি মানুষও ঘুমায় নি। এখন সময় পাল্টে গেছে: টুকুর বাড়ি না-ফেরা, কারো কিছু যাচ্ছে আসছে না। নিতান্তই যেন স্বাভাবিক ব্যাপার। যেন সবাই ধরে নিয়েছে এরকম হবেই। আগামীকাল ভোরে যথাসময়ে সবার ঘুম ভাঙবে। দিনের কাজকর্ম শুরু হবে। আবার রাত আসবে। এর মধ্যে টুকু ফিরে এসে ভালই, ফিরে না এলেও কিছু আসে যায় না। কে জানে হয়ত বা ভালই হয়। তখন হাঁড়িতে চাল কিছু কম দিলেও চলবে। যখন আকাশ ফরসা হল ঠিক তখন মিনু বারান্দা ছেড়ে উঠলেন। অনেক দিন পর ফজরের নামাজ পড়লেন। এ বাড়ি থেকে ধর্মকর্মও উঠে গেছে। ধর্ম সুখী মানুষদের জনো, যাদের ইহজগতের কামনার পরও পরবর্তী জগতের জনো কামনা থাকে তাঁর এখন কোন কামনা-বাসনা নেই। শুধু বেঁচে থাকা। তিনি রান্নাঘরে ঢুকলেন। চুলা ধরাতে খুব বেগ পেতে হল। শুকনো কাঠ নেই। এবারের বর্ষা তাঁকে খুব কষ্ট দেবে। তিবির ঘুম ভেঙেছে। মুখ না ধুয়েই সে এসেছে রান্নাঘরে। সে উদ্বিগ্ন গলায় বসল, টুকু বাড়ি ফিরে নিঃ

পৃষ্ঠা:১২

মিনু খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন, না। তোর জ্বর কমেছে? তিথি বসল, তুমি এত সহজভঙ্গিতে কথা বলছ কি করে? তোমার চিন্তা দাগছে না?: আমার এত চিন্তা-টিল্ডা নেই।: তাই তো দেখছি: তোর কাছে শ’ খানিক টাকা হবে? চাল কিনতে হবে।: ঐদিন না কিনলে?: কিনেছি-শেষ হয়েছে। আমি একা খেয়ে শেষ করি নি। বুড়ো বয়সে কি আর শুধু শুধু চাল চিবিয়ে খাওয়া যায়?: এসব কেমন ধরনের কথা, মা?: মুখ ধুয়ে আয়। চা খা। আজ কোন নাশতা নেই। শুধুচা। জালালুদ্দিন সাহেব যখন শুনলেন আজ শুধু চা তখন একটা হৈচৈ বাঁধাবার চেষ্টা করগেন। মিনু বরফশীতল গলায় বলপেন কোন রকম ঝামেলা করবে না। একবেলা নাশতা না খেলে কিছু হয় না।জালালুদ্দিন ক্ষীণ স্বরে বললেন- সকালের নাশতাটা হচ্ছে সারারাতের উপবাসের পর প্রথম খাওয়া। দুপুরে না খেলে কোন অসুবিধা নেই কিন্তু সকালে…: চুপ।তিনি চুপ করে গেলেন। টুকু ফিরেছে কি ফিরে নি এই ব্যাপারে তাঁর বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখা গেল না। দুপুরের আগে কিছু খেতে পারবেন না-এই চিন্তাটাই তাকে অস্থির করে ফেলল। তিথি একশ’ টাকা দিয়েছে। এই টাকায় দুপুরের বান্দার হবে। চাল কিনতে মিনু নিজেই গেলেন। হীরুকে টাকা দিয়ে পাঠানোর কোন মানে হয় না। ঘন্টাখানেক পর এসে শুকনো মুখে বসবে-গ্রেট টট্রাজেডি। পকেট সাষণ করে দিয়েছে। অল গন। দেশটা হয়ে গেছে চোরের। সবাই দিফ। গ্রেট ঘিফ। কিংবা দশ কেজি চাল এনে বলবে পনের কেজি। এই সংসারের বাজার অনেক দিন থেকেই মিনু করেন এই বয়সেও পনের কেজি চালের ভারী বস্তা টেনে এনে বাকি সময়টা শরীরের ব্যথায় নড়তে পারেন না।। রান্নাঘরে মাদুর পেতে শুয়ে থাকেন। দিনের বেলায় তিনি কখনো শোবার ঘরে ঘুমুতে যান না। দিনের বেলায় রান্নাঘরেই তাঁর শোয়ার ঘর। হীরু মায়ের সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছে মিনু একবার বললেন, তুই আমার সঙ্গে সঙ্গেআসছিস কেন?: এমনি আসছি।: না, তুই আসবি না।: আরে কি মুশকিল, এটা পাবলিকের রাস্তা। যার খুশি যাবে। যার খুশি যাবে না।তুমি বলার কে?: বলছি তো তুই আমার সঙ্গে আসবি না।: আরে এ তো বড় যন্ত্রণা দেখি, বাজারে গিয়ে টুকুর খোঁজখবর করব না? সারারাত ধরে একটা ছেলে মিসিং। চিন্তা হয় না?: আমি দাঁড়াচ্ছি। তুই যা। তুই যাবার পর আমি যাব। সঙ্গে সঙ্গে যাব না।: আমি সঙ্গে গেলে কি তোমার মান যাবে নাকি? কি মুশকিল-এরকম করে তাকাচ্ছ কেন? আচ্ছা বাবা চলে যাচ্ছি। নো হার্ড ফিলিংস।

পৃষ্ঠা:১৩

হীরু চলে যাবার পরও তিনি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। কাঁচা রাস্তা পানিতে জুবে গেছে। বাজারে রওনা হয়েছেন খালি পায়ে। থকথকে নোংরা কাদায় পা ফেলে যেতে হচ্ছে। এককালে তাঁর শুচিবায়ুর মত ছিল। নোয়া দেখবেই গা ঘিনঘিন কা০। যে শাড়ি পরে রাতে ঘুমুতেন ভোরবেলা উঠেই সেটা খুলে ফেলতেন। কোথায় গেছে শুচিবায়ু। এখন নোংরা আবর্জনা পাশে নিয়েও হয়ত ঘুমুতে পারবেন।তিথি বেরুচ্ছিল। জালালুদ্দিন বললেন, তুই বাইরে যাচ্ছিস? অর্থহীন কথা। জবাব দেয়ার কোন প্রয়োজন নেই। তবু তিথি বলল-হু।: আমার চোখটা বেশ ভালই লাগছে। রোদের দিকে তাকাতে পারছি। পদ্মমধু জিনিসটা অসাধারণ।তিবি কিছু বলল না: জালালুদ্দিন বললেন- একটু দেখ তো মা-হীরু মনে হয় সিগারেটের প্যাকেট ফেলে গেছে। প্যাকেটটা দিয়ে যা। সিগারেট জিনিসটা খারাপ হলেও মাঝে মাকে মেডিসিনের মত কাজ করে। সব খারাপ জিনিসের একটা ভাল দিক আছে। ইংরেজীতে একটা কথা আছে না- এভরি ক্লাউড হ্যাজ এ সিলভার লাইনিং।হীরু সত্যি সত্যি প্যাকেট ফেলে গেছে। বেশ দামী সিগারেট- বেনসন অ্যাও হেজেস। চারটা সিগারেট আছে। জালালুদ্দিন একটা ধরালেন। তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলদেন। তিথি শীতঙ্গ গলায় বলল, টুকু যে বাড়ি ফিরে নি তুমি জান?ঃ জানব না কেন, জানি।: চিন্তা লাগছে না তোমার?: চিন্তা তো লাগছেই। চিন্তা লাগবে না কেন? খুবই চিন্তা লাগছে।। দেখে কিন্তু মনে হচ্ছে না মনে হচ্ছে-সুখেই আছ।: চিন্তা করে হবেটা কি? হীরুর বেলায় তো কম চিন্তা করি নি। তাতে লাভটা কিহয়েছে?: তা ঠিক। কোন লাভ হয় নি।: মাঝে মাঝে তোর বেলায়ও তো এরকম হয়। রাতে বাড়ি ফিরিস না তোর বেলাতেই যদি…জালালুদ্দিন কথা শেষ করলেন না। তাঁর সিগারেট দিতে গিয়েছিল। তিনি সিগারেট ধরাবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। তিথি বলল, আমি যাচ্ছি বাবা। ভয় নেই। রাতে ফিরে আসব। তোমাকে দুশ্চিন্তা করতে হবে না। তিনি তার জবাব দিলেন না। সিগারেটটা ধরছে না। এত দামী সিগারেট অথচ বর্ষায় কেমন ড্যাম্প মেরে গেছে। চুলার পাশে রেখে দিলে হত। সিগারেটের সঙ্গে এক কাপ চা খেতে ইচ্ছে কাছে। তিথিকে বললে লাভ হবে না। সে এখন আর রান্নাঘরে ঢুকবে না। মিনু কখন ফিরবে কে জানে। বাজারে গেলে ফিরতে দেরি করে।তিথি এখনো যায় নি। দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। জালালুদ্দিন চোখে কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না তবু তাঁর মনে হচ্ছে মেয়েটাকে খুব সুন্দর লাগছে। চেহারা কেমন মায়া মায়া। তবে স্বভাব কঠিন হয়েছে। ব্যাসকালে এই মেয়ে তার মায়ের চেয়েও কঠিন হবে। তিথি বলল,ঃবাবা।: কি?

পৃষ্ঠা:১৪

। তোমাকে একটা কথার কথা জিজ্ঞেস করি-ধর, আমি যদি কোনদিন বাড়ি চেড়ে চলে যাই এনা আর ফিরে না আসি তাহলে কি হবে? জালালুদিন বিষ্মিত হয়ে বললেন- কোথায় যাবি তুই? এসব কি ধরণের কথা? তিথি জবাব না দিয়ে উঠোনে নামল। উঠোনে অনেক পানি। স্যান্ডেল জোড়া হাতে নিতে হয়েছে। অসম্ভব কাদা। বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত খালি পায়ে যেতে হবে। কি বিশ্রী অবস্থা। তিনি কখনো তার সঙ্গের পুরুষের দিকে ভাগ করে তাকায় না। সব পুরুষকেই তার কাছে এক রকম মনে হয়। একদল কদাকার হাঁসের ছানার মত। সব একই রকম। কাউকে আলাদা করা যায় না। তবে তিথি তার আজকের সঙ্গীকে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছে। যদিও খুঁটিয়ে দেখার মত কিছু এই লোকটির নেই। এর ব্যাস চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশের মধ্যে। কিছু বেশিও হতে পারে: গোঁফ অর্ধেকের বেশি পাকা-অবশ্যি মাথার চুল পাকে নি। হয়ত মাথায় কলপ দিয়েছে। গোঁফে দেয় নি। কিংবা দিয়েছিল- বারবার ধোয়ার কারণে উঠে গেছে। লম্বাটে মুখ। খুব খাড়া নাক। চোখে বেমানান এক চশমা। চশমা সাধারণত চোখের সঙ্গে লেগে থাকে-নাকের কারণে এর চশমা চোখ থেকে অনেকখানি দূরে। লোকটির মাথায় চুল খুব পাতসা। কপালের অনেকখানি পুরোপুরি ফাঁকা। সে রুমাস দিয়ে বারবার সেই ফাঁকা জায়গাটা ঘষছে। নার্ভাস একজন মানুষ। হয়ত আগে কখনো অপরিচিত মেয়ে নিয়ে বের হয় নি। এই ধরনের পুরুষ বেশ ভাল। এরা কিছুতেই জড়তা কাটাতে পারে না। অসম্ভব ঘাবড়ে যায়। এবং এক সময় বিতে গলায় বসে, তুমি চলে যাও- আমার কিছু লাগবে না। কেউ কেউ আবার হঠাৎ করে মহাপুরুস সেজে ফেলে। গম্ভীর গলায় বলে, তোমার মত মেয়ে এই লাইনে কেন? এই সব ছেড়ে বিয়ে-টিয়ে করে সংসারী হও। এখনো সময় আছে তারপর বলে-বাড়িতে আছে কে? ফ্যামিলি মেম্বার কত? এই লাইনে আসবার কারণটা কি? না-সোসাইটিটা একবারেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই লগ্নামুখো মানুষটা কি বলবে কে জানে। উদ্ভট কিছু করবে কি? বিচিত্র নয়। নার্ভাস ধরনের পুরুষ প্রায় সময়ই উদ্ভট কাণ্ডকডাখানা করে বুড়ো ধরনের এক লোক একবার কাঁদো কাঁদো গলায় বগল- কিছু মনে করো না। তুমি আমার মেয়ের মত। বিশ্রী অবস্থা। এ জাতীয় বিশ্রী অংস্থা মনে হচ্ছে এবারও হবে। লোকটি একটির পর একটি সিগারেট টেনে যাচ্ছে, তার ধোঁয়া টনোর ভঙ্গি, সিগারেটের ছাই ফেলার ভঙ্গি দেখেই বোঝা যাচ্ছে এ সিগারেট খায় না। তারা মগবাজারের একটা চাইনান্স গেইরেন্টে মুখোমুখি বসে আছে এগুলিকে বলে ফ্যামিলি রুম বেলা তিনটা ঘরটার দিকে ফ্যামিলি রুমগুলি ভর্তি হয়ে যায়। বয় পন টেনে দেয়। হুট করে ঢুকে পর্দা-ঘেরা মানুষগুলোকে বিরক্ত করে না। যার জন্যে মোটা বকশিস পাওয়া যায়। লোকটি চোখ থেকে চশমা নামিয়ে রুমাল দিয়ে চশমার কাঁত মুছছে। কিন্তু-একটা নিয়ে বাস্ত থাকা। এর বেশি কিছু না। :তোমার নাম কি?দে প্রশ্নটা করণ তিমির দিকে না তাড়িয়ে, তিথি বসব, আমার নাম নিয়ে হো আপনার কোন দরকার নেই। লোকটি এই উত্তর হয়ত আশা করে নি। কেমন হকচকিয়ে গেল।

পৃষ্ঠা:১৫

: আমি আগে কখনো এভাবে কারো সঙ্গে আসি নি। আমার ইচ্ছাও ছিল না। আমি একজন ফা’মিসি ম্যান। আমার কোন বনঙ্গআস নেই। মাঝে-মধ্যে সিগারেট খাই। আগে পান খেতাম জনা দিয়ে। ডাক্তার বলস জপাটা হাটের জন্যে খুব খারাপ। সিগারেটের চেয়েও খারাপ, তাই পানও ছেড়ে দিয়েছি। অবশ্যি এমনিতে গানটা কিন্তু খারাপ না, ভিটামিন সি আছে। ভিটামিন সি-টা শরীরের জন্যে খুবই দরকার। তিনি বলল, আমাকে এসব কথা কেন বলছেন?লোকটি অস্বস্তিতে রুমাল দিয়ে নাক ঘষতে লাগল। যেন খুব ধাঁধায় পড়ে গেছে। কি করবে- কি বলবে বুঝতে পারছে না।: তুমি গান জনে?ঃ না, জানি না আর জানলেও আপনি নিশ্চয়ই চান না এখানে আমি একটা খান শুরু করি। না-কি চান?: না না, তা চাই না সব কিছুরই একটা সময় আছে। তুমি বস আমি সিগারেট নিয়ে আসি। সিগারেট শেষ হয়ে গেছে।: একজন বয়কে বলসেই এনে দেবে। আপনার যেতে হবে না।: না থাক, আমিই যাচ্ছি।লোকটি দ্রুত বের হয়ে গেল। তার চলে যাবার ভঙ্গি দেখে মনে হল সে স্বপ্ন ফিরবে না। না ফিরলে মন্দ হয় না। তিথির ঘুম পাচ্ছে। সে মনে মনে ঠিক করল মিনিট দশেক অপেক্ষা করে চলে যাবে। না, লোকটি চলে যায় নি সিগারেট নিয়ে ফিরছে মুখ তর্তি পান তার গায়োর ধবধবে সানা পাঞ্জাবীতে পানের পিকের দাগ। অথচ একটু আগেই বলছিল-পান খায় না, তিমি বলল, আপনি কি আমাকে অন্য কোথাও নিয়েযাবেন? নাকি সারাক্ষণ এখানেই কাটাবেন।সোকটি খুবই দবাক হয়ে বলল, আমি তোমার কথা বুঝতে পারছি না। কোমায় নিয়ে যাব তোমাকে?: সে তো আপনি ঠিক করবেন। কোন হোটেলে বিধবা স্নাপনার বাসায়।ও কি সর্বনাশের কনা। বাসায় আমার স্ত্রী আছে- বড় মেয়ে ক্লাস সেভেনে পড়ে। আজিমপুর গার্লস স্কুলে ফরিদা যদি এইসব ব্যাপরে কিছু জানতে পারে তাহলে সে আমাকে কিচ্ছু বলবে না। সোজা ছাদে উঠে ছাদ থেকে লাফিয়ে নিচে পড়ে যাবে। ফরিনা হচ্ছে আমার স্ত্রীর নাম।: বুঝতে পারছি।ঃ খুবই চমৎকার মেয়ে, আদর্শ মা, আদর্শ স্ত্রী। এখন অবশ্যি শরীরটা খুবই খারাপ। বছর তিনেক ধরেবিছানায় পড়ে আছে। একেবারে কংকাল। ডাক্তার খুব খারাপ ধরনেরঅসুখ বলে সন্দেহ করছে। বাঁচবে না।ঃ ‘তাই নাকি?: হ্যাঁ তাই। ইয়ে তোমার নামটা কিন্তু বল নি।: আমার নাম পরী: বাহ্ সুন্দর নাম।: এটা আমার আসল নাম না নকল নাম।: নামের আবার আসল-নকল আছে নাকি?: কেন থাকবে না। মানুষের মধ্যেও তো আসল মানুষ নকল মানুষ আছে। যেমন আমি একজন নকল মানুষ।

পৃষ্ঠা:১৬

ভরলোক মনে হচ্ছে খুব ধাঁধায় পড়ে গেছে। সে বেশ খানিকক্ষণ চুপচাপ থেকে আচমকা বলল, ভূমি ঠাণ্ডা কিছু খাবে? ফান্টা কিংবা পেপসি?: না।: খাও, একটা ফান্টা খাও। এই বয়, দুটা ফান্টা দাও। আমি আবার ফান্টা ছাড়া কিছু খেতে পারি না। কোক পেপসি এইসব আমার কাছে অনুধের মত লাগে। আমার নাক আবার খুব সেনসেটিভ। ফরিদাও আমার মত। মানে ওর নাকও খুব সেনসেটিভ। দুধের কোন জিনিস খেতে পারে না, গন্ধ লাগে। অথচ দুধটা এখন তার খাওয়া দরকার। আচ্ছা, তুমি কি দুধে গন্ধ পাও?তিথি হেসে ফেলল।লোকটি বিব্রত স্বরে বলল, আমি খুব আবোল-তাবোল কথা বলছি তাই না? : না ঠিক আছে। বলুন, যা বলতে ইচ্ছা করে। শুধু ছ’টার আগে আগে ছেড়েদেবেন। আমি অনেক দূরে থাকি।: কোথায় থাক।: তা নিয়ে তো আপনার দরকার নেই। আপনি নিশ্চয়ই আমার বাসায় বেড়াতে যাবেন না না-কি যাবেন?: তুমি ঐসব মেয়েদের মত না। তুমি অন্য রকম।: আপনি কি ঐসব মেয়েদের সঙ্গে আগেও মিশেছেন?: তাহলে বুঝলেন কি করে, ঐসব মেয়েরা কেমন?: না মানে-যে রকম ভেবেছিলাম তুমি সে রকম না। অন্য রকম।: কি রকম ভেবেছিলেন।লোকটি জবাব দিল না। রুমাল দিয়ে মাথা ঘসতে লাগল। তিনি বলল, গল্প করতে চাচ্ছিলেন গর করুন। চুপ করে বসে আছেন কেন?: না মানে ওঠা দরকার, ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। পাঁচটার সময় অ্যাপয়েন্টমেন্ট। তোমাকে ওরা টাকা দিয়ে দিয়েছে তো: হ্যাঁ।: ভাল, খুব ভাল। খুবই ভাস।: চলুন, তাহলে উঠি। পাঁচটা বাজতে দেরি নেই।: আরেকটু বস। এই ধর দশ মিনিট। অবশ্যি তোমার যদি কোন কাজ না থাকে: আমার কোন কাজ নেই।লোকটি ভয়ে ভয়ে তার একটা হাত তিঘির জান হাতের উপর রাখল। রেখেই সরিয়ে নিল। মনে হচ্ছে এই কাজটি করে সে খুব সজ্জা পেয়েছে।তিথি বলল, আপনার টাকাটা তো মনে হচ্ছে জলে গেল।সোকটি নিচু গলায় বলল, তুমি একটি চমৎকার মেয়ে।: আমি চমৎকার মেয়ে, এটা আপনাকে বগল কো: বোঝা যায়। চেহারা দেখে বোঝা যায়।: আচ্ছা আপনি কি করেন?: ছোটখাট ব্যবসা করি। তেমনি কিছু না। তবে খারাপও না। গত বছর গাড়ি কিনলাম একটা। তবে আমি অবশ্যি গাড়িতে চড়ি না। কেমন যেন দমবন্ধ দমবন্ধ লাগে। রিকশাটা এদিক দিয়ে ভাল। হাওয়া খেতে খেতে যাওয়া যায়।: পাঁচটা বেজে গেছে- চলুন উঠি।

পৃষ্ঠা:১৭

ঃ তুমি আগে যাও, আমি পরে আসছি।: কেউ দেখে ফেলবে সেজন্যেলোকটি তার জরার দিল না। তিথি উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, আাপনি টি আমাকে একটা চাকরিজোগাড় করে দিওে পাড়ান? আমি এসএসসি পাস করেছি।: কি রকম চাকরি?: যে কোন চাকরি। টাইপিস্টের চাকরি বা এই জাতীয় কিছু।: টাইপিং জান?জ্বি-না। তবে আমি শিখে নিতে পারব। আমি খুব দ্রুত শিখতে পারি।: আমার কাছে কোন চাকরি নেই। আমার অফিসে অল্প কিছু কর্মচারী আছে। নতুন লোক নেওয়ার অবস্থা অফিসের নাই। তাছাড়া…। তাছাড়া কি?: হঠাৎ করে সুন্দরী একটা মেয়েকে চাকরী দিবে নানান কথা উঠবে। আমার স্ত্রী শুনতে পেলে মনে বউ পাবে। আমাকে অবশ্যি কিছু বলবে না।: ছাদ থেকে লাফিয়েও পড়তে পারেন, তাই না?লোকটি উঠে দাঁড়িয়ে মানিব্যাগ থেকে ভিজিটিং কার্ড বের করে নিচু গলায় বলল, এইখানে ঠিকানা আছে, দবির উদ্দিন বি.এ.। দবির ইন্ডাস্ট্রিজ ৩১/৩ জিগাতলা, তুমি মাস তিনেক পর একবার খোঁজ নিও।: মাস তিনেক পর খোঁজ নিতে বলছেন কেন? আপনার কি ধারণা মাস তিনেকের মধ্যেই আপনার স্ত্রীর ভালমন্দ কিছু হয়ে যাবে?লোকটি শীতণ গলায় বলল, তোমাকে যতটা ভাল মেয়ে আমি ভেবেছিলাম ততটা ভাল তুমি না। তোমারমত মেয়ে যে রকম সাধারণত হয় তুমিও সে রকমই। আলাদা কিছু না।তিমি হেসে ফেলল হাসতে হাসতেই বলল, আমাকে রাগিয়ে দেয়াটা কিন্তু বুদ্ধিমানের কাজ হয় নি। কার্ডেআপনার বাসার ঠিকানা আছে সেই ঠিকানায় যদি হঠাৎ উপস্থিত হয়ে যাই তখন কি হবে?দবির উদ্দিন জবাব দিল না। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল।তিখির ঠোঁটে এখন আর হাসি নেই। সে কঠিন চোখে তাকাচ্ছে দবির এই মেয়েটির দ্রুত ভাবান্তরের রহস্য ধরতে পারছে না। সব কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। তিথি নিচু গলায় বলল, পুরো টাকাটা জলে ফেলবেন কেন? কিছুটা অন্তত উসুল হোক-ব্লাউজ খুলে ফেলছি, আপনি আমার বুকে হাত দিন। অগ্র যদি তাও না চান অন্তত তাকিয়ে দেখুন। আপনার অসুস্থ স্ত্রীর বুক নিশ্চয়ই আমার বুকের মত সুন্দর না। দণিরের চেহারা ছাইবর্ণ হয়ে গেছে। সে অল্প অল্প কাঁপছে। বিদির মুখের কঠিন ভাঁজগুলি হঠাৎ সহজ হয়ে গেল। সে বলল, আমি আপনার সঙ্গে ঠাট্টা করছিলাম। আপনি কিছু মনে করবেন না। আপনি চমৎকার মানুষ। চলুন, আমরা যাই।হীরুকে ঘন্টাখানিক ধরে একতলা একটা টিনের ঘরের আশেপাশে ঘুরঘুর করতে দেখা যাচ্ছে। এই এক ঘন্টায় বাড়ির কাছাকাছি এসে কয়েকবার তীক্ষ্ণ শিস দিয়েছে। দু’বার ইটের টুকরা টিনের চালে ফেলেছে। এসব হচ্ছে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা। চেষ্টায় কোন ফল হচ্ছে না। কেউ বেরুচ্ছে না বা জানালা দিয়ে উকি দিচ্ছে না।বাড়িটা ইসমাইল সাহেবের।

পৃষ্ঠা:১৮

ইসমাইল সাহেব মীরপুর কৃষি ব্যাংকের ক্যাশিয়ার তাঁর ছয় মেয়ে। এই ছ’মেয়ের সূরীদেনের নাম গ্রানো। এনো এই বঙ্গঃ এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে প্রেজেন্টে হয় নি। এখন রেফান্টের জন্যে অপেক্ষার কাল চলছে। ইতর শিস এবং চালে ঢিল সবই এ্যানার উদ্দেশ্যে। তৃতীয় দফায় ডিল এবং শিস দেবার সঙ্গে সঙ্গে বসার ঘরের একমাত্র খোলা জানালাটাও বন্ধ হয়ে গেল। হীরু চাপা গলায় বলল, হারামজাদী। রাগে তার গা জ্বলে যাচ্ছে। এ্যানার কাণ্ডকারখানা সে ঠিক বুঝতে পারছে না। হারামজাদী আম্ল বেরুচ্ছে না কেন? বাবা বাসায় আছে নাকি?হীরু রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে পরপর তিনটা স্টার সিগারেট খেয়ে ফেলল। বুক পকেটে একটা বিদেশী ফাইভ ফাইভ আছে। সে ঠিক করে রেখেছিল এ্যানা বের হলে এটা ধরান হবে। এখন মনে হচ্ছে হারামজানী বেরুবে না। অবশ্যি তার হয়ত দোষ নেই। ছোটলোক বাপ হয়ত ঘরে বসে আছে। এই ছোটলোকটা প্রায়ই অফিস কামাই করে। ঘরে বসে বসে ঝিমায়। যার ছ’টা মেয়ে এবং সাত নম্বর মেয়ে স্ত্রীর পেটে বড় হচ্ছে তার কিমান ছাড়া গতি কিঃ হীরু কয়েকবার দেখেছে এ্যানার মা’কে। রোগা কাঠি। শ্যাওড়া গাছের ডালে এলোচুলে বসে থাকলেই এ মহিলাকে বেশি মানাতো। তা না করে তিনি কল্যাণপুরের একটা টিনের ঘরে বাস করেন এবং ভাঙা গলায়, সারাক্ষণ ছয় কন্যাকে বকাঝকা করেন। হীরু নিজেও একবার বকা খেয়েছে।এ্যানাদের বসার ঘরের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সে একবার ছোট্ট করে শিস দিতেই এই মহিলা জনালা দিয়ে মুখ বের করে বললেন, এই ছেলে তুই কি চাস? হীরু হতভম্ব।এই যুগে তার বয়েসী কোন ছেলেকে কোন মেয়ের মা যে ‘তুই’ করে বলতে পারে তা সে কল্পনাও করে নি। সে এতই অবাক হল যে মুখ দিয়ে কথা বেরুস না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইস। ভদ্রমহিলা তার ভাঙা গলায় দ্বিতীয়বার বললেন, চাস কি তুই? রোজ জানালার সামনে শিস। জিভ টেনে ছিড়ে ফেলব।হীরু খতমত খেয়ে বলল, কিছু চাই না মাডোম একটা ম্যাডড্রেস খুঁজছি সহের বাই তিন। ইকবাল সাহেবের বাসা। এটা কি ইকবাল সাহেবের বাসা? ভদ্রমহিলা ঘট করে জানালা বন্ধ করে দিতেন ইরুর প্রায় ঘাম নিয়ে জ্বর ছাড়ার মত অবস্থা। একি যন্ত্রণা।এই বাড়ির মেয়েগুসিও হয়েছে মায়ের মত। সব ক’টা মেয়ে পুরুষদের মত গলায় কথা বলে। চেহারাও পুরুষদের মত। হাবভাবও সে রকম: হীরু যে এদের একজনের জন্যে রোজ এতটা সময় নষ্ট করে এতেই এদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। হীরুর ধারণা ‘নরম্যাল পদ্ধতিতে’ এদের একটারও বিয়ে হবে না। প্রেম-ট্রেম করে যনি দু’একটা পার পায়। অথচ বাপ-মা এই জিনিসটাই বুঝে না।এ্যানার বাবা ইসমাইল সাহেবের কাজকর্ম একজন জেলের সুপারিনটেনডেন্টের মত। যতক্ষণ বাসায় থাকবেন কোন মেয়ে ঘর থেকে বেরুতে পারবে না। উকি-ঝুলি দিতে পারবে না। ঘরের জানালা থাকবে বন্ধ। আজকের লক্ষণও সে রকম। হীরু ঠিক করল মীরপুর গিয়ে দেখে আসবে তরলোক অফিসে গেছে না ছুটি নিয়ে বাসায় বসে আছে। যদি অফিসে না গিয়ে থাকে তাহলে তো কিছুই করার নেই। আর যদিদেখা যায় ভদ্রলোক অফিসেই আছেন তাহলে আরেকটা এটেম্পট নেয়া যায়। এত সহজে হাশছেড়ে দেয়া ঠিক না।ভদ্রলোক অফিসেই আছে। বিশাল চেহারা। ব্যাঙের চোখের মত বড় বড় চোখ, কচকচ করে পান যাচ্ছে। হীরু মনে মনে বলল, ‘খা ব্যাটা পান খা। আর প্রতি বছর

পৃষ্ঠা:১৯

একটা করে মেয়ে পয়দা কর।’ বলেই উরুর মনে হল-বলাটা ঠিক হল না। তার শ্বশুর হবার একটা ক্ষীণ সম্ভাবনা এই কোলা ব্যান্ডের আছে। হবু শ্বশুর সম্পর্কে এরকম মরুণ্য করা ঠিক না। শ্বশুরদের সম্পর্কে অভি-প্রভা থাকা দরকার। তবে এই লোক তার শ্বশুর হলেও বিপদ আছে। ঈদের দিন কোলাকুলি করতে হবে। হীরু একটা রিকশা নিয়ে দিগ। মীরপুর থেকে কল্যাণপুর ফেরার এই সমটোয় বাসে গাদাগাদি ভিড় থাকে। এ্যানার সঙ্গে দেখা হবে ভেবে ইস্ত্রী করা শার্ট পরে এসেছে। চাপাচাপিতে শার্ট ভর্তা হয়ে যাবে। রিকশা ভাড়ায় বাড়তি টাকা চলে যাচ্ছে। উপায় আর কি? এ্যানার সঙ্গে তার পরিচয় দীর্ঘদিনের নয়। আড়াই মাসের মত। পরিচয় পর্বটা খারাপ না। এসএসসি পরীক্ষার দ্বিতীয় দিন। হীরু মীরপুর রোডে এসে দাঁড়িয়েছে-কি করবে ঠিক বুঝতে পারছে না। বছর তিন চারেক আগে এই সময়ে মেয়েদের স্কুলে নকল সাপ্লাই করত। বয়সের কারণে এটা এখন মানায় না তবু পরীক্ষার সমায় গম্ভীর মুখে একবার ঘুরে আসে। অনেক দিনের অভ্যাস। চট করে ছাড়া মুশকিল। হারু ভাবছিল কোন স্কুলে যাবে। আশেপাশের সব ক’টা সেন্টার ঘুরে দেখা দরকার। রোজ রোজ একই সেন্টারে যাবার কোন মানে হয় না এই রকম যখন তার মনের অংস্থা তখনি এ্যানাকে তার চোখে পড়ল বেচারী রিকশা পাচ্ছে না। কোন রিকশা নেই। যাও আছে-ধাত্রী বোঝাই। মেয়েটা ছোটাছুটি করছে রিকশার জন্যে। ব্যাপারটা দেখতে হীরুর বেশ মজাই লাগছে। মেয়েটা দারুণ ভয় পেয়েছে। তার হাত থেকে এক সময় জ্যামিতি বাক্স পড়ে গেল চাঁদা, কম্পাস এইসব ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। সে বসে বসে এইসব বুলছে এবং চোখ মুছছে একটা রিকশাওয়ালাকে পাওয়া দেব-সে দশ টাকা ভাড়া চায়। মেয়েটার সঙ্গে বোধ হয় দশ টাকা নেই। সে অনুনয়-বিন্না করছে সাত টাকায় যাবার জন্যে। ইরুর এতক্ষণ বেশ মজাই লাগছিল এখন খানিকটা খারাপ লাগল-সব এসএসসি পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে কয়েকজন করে আত্মীয়-স্বজন থাকে। ও যাচ্ছে একা এবং সঙ্গে দশ টাকাও নেই। ইরু তখন এগিয়ে গেল গলার স্বর যথাসম্ভব গম্ভীর করে বলল, মুর্তী আমার কাছ থেকে দশটা টাকা নিয়ে নাও এক সময় দিয়ে দিসেই হবে আমি এই দিকেই থাকি। মেয়েটি শীতল চোখে হানিফক্ষণ তাকিয়ে দেকে বলল, আমার কাছে টাকা আছে। অগ্র যদি নাও থাকে আপনার কাছ থেকে নেব কেন? হীরু হতন্ত্র। নিজেকে সামসে দিতে সময় লাগল। মেয়েটি বলল, পাঁচ টাকা ভাড়া হয় আমি শুধু শুধু তাকে দশ টাকা দেব কেন?: তা তো বটেই। তবে দেরি হয়ে যাচ্ছে না?: হোক দেরিতোমার কোন স্কুলে সিট পড়েছে?: মেয়েটি জবাব না দিয়ে বিলু্যুৎবেগে এগিয়ে গেল। একটা বাস এসে থেমেছে। বাদে যথেষ্ট চিড়; বাস স্ট্যান্ডেও অপেক্ষমাণ ছোটঘটি জনতা। মেয়েটি সেই ভিড় কাটিয়ে বাসে উঠে পড়ল। দূর থেকে হীরু মনে মনে বলল-শাবাশ। বলেই তার খেয়াল হল যে তার পকেট ফাঁকা একটা টাকাও নেই। মেয়েটা যদি তখন বলত-দিন দশটা টাকা, তাহলে উপায়টা কি হত?

পৃষ্ঠা:২০

মেয়েটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হতে বেশি সময় লাগল না। দেখা হলে সে কথা বলে। হীরু ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দু’কেন রোমান্টিক কথাও বলেছে-তেমন কোন রি- অ্যাকশান ‘অবশ্যি তাতে বোকা যায় নি। এর মধ্যে একটা ডায়ালগ ছিল এ আজ তো তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে। মেয়েটি হেসে ফেলে বলেছে-শুধু শুধু মিথ্যা কথা বসেন কেন? যে সুন্দর না তাকে সুন্দর বললে তার খুব খারাপ লাগে এটা আপনি জানেন? মেয়েটার এইটাই হচ্ছে একটা সমস্যা। ফটফট করে কথা বলে। বেশি চালাক। মেয়েছেলের বেশি চালাক হওয়া ঠিক না। হীরু এ্যানাদের বাসার ঠিক সামনে রিকশা থেকে নামল। রিকশায় আসতে আসতে সে ঠিক করে রেখেছে-এ্যানাদের বসার ঘরের জানালার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে কয়েকবার কাশবে। যদ্ধারুগীর কাশি না-তদ্র কাশি, যাতে এ্যানা ভেতর থেকে শুনতে পেয়ে বের হয়ে আসে। হীরুকে কাশতে হল না। সে দেখল এ্যানা বাসার সামনের দোকান থেকে কি যেন কিনছে। এদের বাড়িতে কোন কাছের লোক নেই বলে দোকানের টুকটাক বাজার মেয়েদেরই করতে হয়। উরু এগিয়ে গেল। এ্যানা আধ কেজি চিনি কিনছে। গড়ীর মুখে দোকানদারকে বলল, পাল্লাটা ঠিকমত ধরেন ভাইজান। পাল্লায় ফের আছে? নগদ পয়সায় পাবলিক জিনিস কিনবে আর আপনি পাবলিককে ঠকাবেন তা তো হয় না। এ্যানা বলল, নগদ পয়সায় কিনছি না। বাকিতে কিনছি। বলেই হীরুকে দ্বিতীয় কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সে চিনির ঠোঙা হাতে নিয়ে রাস্তা পার হয়ে গেল। যেন হীরুকে সে চেনে না। যেন হীরু রাস্তার একটা ছেলে। হীরু মনে মনে বলল, হারামদানী। তার মন খারাপ হয়ে গেল। আজ দিনটাই তার জন্য খারাপ, হাতও পুরোপুরি খাসি যে সামান্য কিছু টাকা ছিল তার সবটাই রিকশা ভাড়ায় চলে গেছে। শ’খানেক টাকা সঙ্গে না থাকলে কেমন অস্থির অস্থির লাগে। কোথায় পাওয়া যায় টাকা? হারু দ্রুত চিন্তা করতে লাগল-ঢাকায় ধার চাওয়ার মৃত আত্মীয়-স্বজন কে কে আছে যাদের কাছ থেকে এখনো ধার চাওয়া হয় নি। তেমন কারোর নাম এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। উত্তর শাহজাহানপুরে দূর-সম্পর্কের এক মামা আছেন। তাঁর কাছে যাওয় যায়। তবে ঐ তদ্রলোকের নিজেরই দিনে আমি দিনে খাই অবস্থা। ধার চাইতে গিয়েকোন বিপদে পড়তে হয় কে জানে। হীরু জমা করে রাখা বিদেশী সিগারেটটা বের করল। জমা করে রাখার কোন অর্থ হয় না সে সিগারেট ধরিয়ে দু’টা টান নিয়েছে তখন দেখা গেল এ্যানা আবার আসছে। এবং তার কাছেই যে আসছে এটাও নিশ্চিত। হীরু ঠিক করে রাখল কোন কথা বলবে না। যে মেয়ে তাকে অপমান করে, দেখতে পেয়েও না দেখার ভান করে চলে যায় তার সঙ্গে কথা বলার কোন মানে হয় না। এ্যানা এসে হীরুণর সামনে দাঁড়িয়েছে। মেয়েটাকে ইরুর সত্যি সত্যি সুন্দর লাগছে। যতই দিন যাচ্ছে মেয়েটা কি ততই সুন্দর হচ্ছে? তা কেমন করে হয়। এ্যানা বলল, এরকম বিশ্রী করে শিস দিচ্ছিলেন কেন? কতবার না বললাম এ রকম করবেন না আর ছাদে ঢিল মারলেন কেন? এইসব কি?

পৃষ্ঠা ২১ থেকে  ৪০

পৃষ্ঠা:২১

কথা না বলার প্রতিজ্ঞা টিকল না। হীরু বলল, মন-মেজাজ খুব খারাপ মাদার ঠিক নাই। কি করতে কি করি: মাথার ঠিক নাই কেন?

। আর বলো না, ছোট ভাই মিসিং হয়ে গেছে। দৌড়াদৌড়ি ছোটাছুটি সব তো আমার ঘাড়ে। বড় ছেলে হবার বিরাট মুদ্রণা।: আপনার ছোট ভাই হারিয়ে গেছে নাকি: ব্লু, পালিয়ে গেছে। যাকে বলে…হীরু থেমে গেল। সে পালিয়ে গেছের একটা ইংরেজী বলতে চেয়েছিল- বলতে পারছে না। কারণ পালিয়ে গেছের ইংরেজী তার জানা নেই।এ্যানা বসল, পুলিশে খবর দিয়েছেন।। না, পুলিশে-ফুলিশে হবে না। পীর সাহেবের কাছে যেতে হবে। কলতা বাজারের পাঁর। ঘাঁন সাধনা আছে আমার সঙ্গে খুবই খাতির। অত্যন্ত স্নেহ করেনএ্যানা বলল, আপনাকে স্নেহ করেন? আপনাকে স্নেহ করার কি আছেহীরণা বিষ্ময়ের সীমা রইস না। এই মেয়ে বসে কি? কষে একটা চড় দিতে ইচ্ছা করছে। যে সব চমৎকার কথা বলবে বলে হীরু এসেছিল তার সবই এলোমেলো হয়েগেল। হারু বলল, যাই তাহলে?ঃ নিন পনের দেখা হবে না। ঢাকার বাইরে যাচ্ছি বিজনেসের ব্যাপারে।: যান, বিজনেস করে মাদুন।: তোমার ঠিকানাটা লিখে দাও তো, সময় যদি পাই একটা উঠি-ফিটি ছেড়েদেব: চিঠি দিতে হবে না, বাবা জানলে আমাকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলবেহারুর মনটাই খারাপ হয়ে গেস।মন খুব বেশি খারাপ হলে সে সাধারণত পীর সাহেবের কাছে য্যাঃ আজ তাও যাওয়া যাবে না, হাত একেবারে খালি। পীর সাহেব টাকা-পয়সা কিছুই নেন না তবে বিদেশী সিগারেট দিলে খুশি হন। এক প্যাকেট বেনসনের দাম কম হসেও পাঁচ পঞ্চাশ টাকা-এই টাকাটা সে পাবে কোথায়।হীরু ভেবে পেল না তাঁর এবং এ্যানার ব্যাপারটা সে পীর সাহেবকে বলবে কি বলবে না লজ্জা লজ্যা করে তবে একবার বসে ফেললে চির জীবনের জন্যে নিশ্চিন্ত। তাছাড়া টুকুর জন্যেও যাওয়া সরকার। হারানো মানুষ বাড়ি ফিরিয়ে অনার ব্যাপারে এই পার হচ্ছে এক নায়ার। পীর সাহেবের এগারটা জুনি আছে।জ্বীনেরমারফত খবর পান।হীরু খালি হাতেই পীর সাহেবের সন্ধানে রওনা হল।টুতু পার্কের একটা থেকিতে শুয়ে আছে।তার সমস্ত শরীরে এক ধরনের আরামদায়ক আলস্য। শুধু মাথাটা কেমন দেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। এসব হচ্ছে প্রবস জ্বরের লক্ষণ সে বুঝতে অনেওদানি জ্বর। ঘুসের জন্যেই শ্রাবণ মাসের পড়ন্ত দিনের অরামদায়ক মনে হচ্ছে রোদটা আরেকটু কড়া হলে ভাল হত পারছে তার গায়ে জ্বর। রোদ তার কাছে এত শীত শীত ভাবটা দূর হত।

পৃষ্ঠা:২২

টুকু চোখ মেলল। আকাশ অনেকখানি নিচে নেমে এসেছে। সকালে প্রথম যখন জ্বরের ভাবটা টের পেত্র তখন থেকেই সে লক্ষ্য করছে আকাশ ক্রমেই নেমে আসছে। মাথার উপর ছাদ নেই। চকচকে আকাশ। সে আকাশ এত দ্রুত নিচে নামছে যে ভয় ভয় করছে। টুকু চোখ বন্ধ করে ফেলব। বাসায় যখন জ্বর আদান এখনো এমন ২১, মনে ২০ ছাদটা নিচে নেমে এসেটে। এমন আজ নিয়ে দু’দিন সে পানি ছাড়া কিছুই খায় নি। ইচ্ছা করলে খেতে পারত, তার পকেটে সতের টাকা আছে। এই জীবনের পুরো সঞ্চয়। এই টাকার সবটাই সে পেয়েছে ডিবির কাছ থেকে। যতবার সে তিথিকে বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত এগিয়ে দিতে গেছে ততবার বাসে উঠবার আগে হাত ব্যাগ খুলে তিথি তাকে একটা টাকা দিয়ে বলেছে-নে রেখে দে। টুকু প্রতিবারই বসেছে-লাগবে না। তিনি বলেছে, না লাগলেও রেখে দে। টুকুর একচল্লিশ টাবরে মত জমেছিল। বাকি টাকাটা খরচ হয়েছে হীন বয়েজ ক্লাবের চাঁদায়। এই ক্লাবটা নতুন হয়েছে। ক্লাবের সেক্রেটারি বহুলু ভাই। উতিল সাহেবের বাড়ির গ্যারেজে ক্লাবের অফিস ঘর এবং লাইব্রেরী। সাইব্রেরীতে বইয়ের সংখ্যা একশ’ আটার। লাইব্রেরীতে ভর্তি হবার নিয়মে হল-একটা বই দিতে হবে এবং ভর্তি যা দশ টাকা দিয়ে মেউ হতে হবে। মেধার হয়ে গেলে প্রতি মাসে চাঁদা তিন টাকা টুকু এই লাইব্রেরীর প্রথম সদস্য। শুধু তাই না-চীন বয়েজ ক্লাবের মাসিক মুখপত্র ‘নতুন দেশ’-এর সে একজন চিত্রকর। এই খবর টুলুদের বাসার কেউ জানে না। কেউই জানে না টুকু শুধু যে একজন চিত্রকর তাই না সে গল্পও দেখে, একটি গল্প ইত্তেফাকের কচিকাঁচার আসরে ছাপা হয়েছে। গল্পের নাম ‘রাজকন্যা চম্পাবতী’ রূপকথা। রূপকথা লিখতেই টুকুর ভাল লাগে। তার মাথায় এই জিনিসই ঘুরে বেড়ায়।ভোরবেলায় সে যখন বাড়ি থেকে বের হল তখনো তার মাথায় ছিল একটা রূপকথার গল্প। যেন সে একদন রাজকুমার। রাজপ্রাসাদ ছেড়ে বের হয়েছে। ব্যো হবার কারণ ভাংেকণর একটা দৈা। দৈত্যটার নাম ‘কলরেক’। এই করুাবেক নৈভেলঃ করে সমস্ত পৃথিবী থরথর করে কাঁপছে। একে কেউ মারতে পারছে না। কারণ করুকের অমর। শুধু একজন পারে করুবেককে মারতে-সেই এবএন হচ্ছে সে নিজে তবে তার জন্যে তাকে সাধনা করতে হবে। সাতদিন উপবাস। উপবাসের অষ্টম দিনে ভার কাছে আসবেন একজন দেবদূত তিনি নরম গলায় বলবেন-হে বালক। তোমার সাধনায় তুষ্ট হয়েছি। তুমি কি চাও বসে? তিনটি বর তুমি প্রার্থনা কর। সে তখনচাইবে করবেন্ডকে হত্যার অস্ত্র।টুকুর উপবাসের অস্ব বিক্রয় দিন। প্রথম দিন যে বইটা হচ্ছিল আজ তা হচ্ছে না। টুকুর ধারণা আগামী দিন আস্তা কম হবে। বাসায় থাকলে কষ্ট হত ক্ষিধের এই ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত বানায় থাকলেই ক্ষিবে বেশি লাগে এবং যখন জানা যায় ঘরে খাবার নেই তখন হঠাৎ করে ক্ষিধের ৩৪ লক্ষগুণ বেড়ে যায়, জগৎ-সংসার অন্ধকার মনে হয়।  এরকম কষ্ট অবশ্যি টুকুকে খুব বেশি করতে হয় নি। এই জীবনে মাত্র তিনবার প্রথমবার যখন ব্যাপারটা হল তখন কষ্টের চেয়েও বিষয় প্রধান হয়ে দাঁড়াল। হয়তে একদিন দুপুরবেলা রান্না হল না। টুকুর বাবা বারাশায় বসে বারবার বসতে লাগলেন- তেরি ব্যাড টাইম। যাকে বলে দুঃসময়। কি করা যায়। না খেয়ে তো থাকা সম্ভব না ও মিনু, করা যায় কি বল তো?টুকুর মা রান্নাঘরের বারান্দায় মোড়াতে বসা ছিলেন। সেখান থেকে তিনি উচ্ছ্ব গলায় বললেন- তুমি কথা বসবে না।

পৃষ্ঠা:২৩

জালালুদ্দিন বিস্মিত গলায় বললেন কথা না বললে হবে কি করে? একটা বুদ্ধি বের করতে হবে না? চুপচাপ গালে হাত দিয়ে বসে থাকলে হবেঃ খানে’র একটা কথা না : তোমাকে নিয়ে বড় যন্ত্রণা হব তো। সমস্যা বুঝতে পারছ না। মানব জীবনে সমস্যা আসবেই। সেই সমস্যার সমাধান ঠাণ্ডা মাথায় বের করতে হবে। বুল ব্রেইনে ভাবতে হবে : সমস্যার সমাধান বের করা আছে। তোমাকে ভাবতে হবে না। জালালুদ্দিন উৎসাহী গলায় বললেন, কি সমাধান? : ঘরে ইদুর মারার বিষ আছে। ঐ খানিকটা করে খেয়ে শুয়ে থাক : পাগল হয়ে গেলে নাকি মিনু। : পাগল হই নি, পাগল হব কেন?: আত্মহননের চিন্তা যে মাথায় এসেছে- এটাই হচ্ছে পাগলামির সবচেয়ে বড় লক্ষণ। বড় বড় মনীষাদের কাছ থেকে আমাদের শিখতে হবে, বিপদে ধৈর্য ধারণ করতে হবে : আর একটা কথা যদি তুমি বল জোর করে তোমাকে বিষ খাইয়ে দের সব ফাজলামি। সময় জালালুদ্দিন চুপ করে গেলেন। টুকুরও ভার ভয় করতে লাগণ। মা’র চেহারা কেমন অদা রকম হয়ে গেছে। রূপকথার ডাইনীদের মত লাগছে হারু বাড়ি এস সন্ধ্যার আগে আগে। মুখ ভর্তি পান। হাতে সিগারেট। দুপুরে বাড়িতে খাওয়া হয় নি শুনে সে চোখ কপালে তুলে বলল- বিগ প্রবলেম মনে হকে জালাপুন্দিন দেসেন, তোর কাছে টাকা-পয়সা কিছু আছে নাকি রে হীরু। : আমার কাছে টাকা-পয়সা থাকবে কেন? কিছুই নেই। বিশ্বাস না হয় পকেটে হাত দিয়ে চেক করতে পড়া পাঁচটা টাকা ছিল এক প্যাকেট সিগারেট কিনে ফেলসাম। জাগাবুন্দিন ক্লান্ত গলায় বললেন-দেখি একটা সিগারেট সে সিগারেটের ক্ষিধে নষ্ট করার ক্ষমতা আছে জালালুদ্দিন বসে বসে সিগারেট টানতে লাগবেন তার সামনেই বসল হারু। কিছুক্ষণ পরপর সে বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলছে কালের রগ টিপে ধরছে তার ভাব- ভঙ্গি দেখে জালালুদ্দিন বলতে বাধ্য হবেন-এত চিন্তা করছিস কেন? এত চিন্তার কি আছে? রিদ্দিনের মালিক হচ্ছেন আল্লাহ স্বয়ং সেই রিদিক দিয়ে বেশি চিন্তা করার মানেই হচ্ছে অল্লাহকে বিশ্বাস না করা। মহাপাপের মিস আল্লাহর উপর প্রবল বিশ্বাস রেখে তিনি হীরণা কাছ থেকে নিয়ে পরপর তিনটি সিগারেট খেয়ে ফেললেন। আশ্চর্যের ব্যাপার দেখা গেল স্বয়ং আল্লাহ জালালুশিনের বিশ্বাসের মর্যাদা রাখলেন। মিনু কোন-এক গভীর গোপন থেকে গলার একটি হার বের করলেন। কি করে এটা অবশিষ্ট রয়ে গেল কে জানে। দু’ভরি থেকে আড়াই মত ওয়ান জালালুদ্দিন একগাল হাসলেন। হৃষ্টচিত্তে বললেন-কি বসেছিলাম নा अत সমস্যার সমাধান আছে। বিশ্বাস তো কর না। হীরা গয়না নিয়ে বেরুদ। আগেরগুলিও তার হাতেই বিক্রি হয়েছে তার নাকি কোন-এক চেনা দোকান আছে। ভাল দাম দেয়। খাদের জন্য কিছুই কাটে না।

পৃষ্ঠা:২৪

জালালুদ্দিন বললেন, ঐ সঙ্গে সপ্তাহের বাজার করে আনবি, বুঝলি। চাল, ডাল, চা চিনি। নোনা ইলিশ পাস কি-না দেখবি বধূর লতি দিয়ে নোনা ইলিশের কোন চুসনা হয় না। একেবারে বেহেশতী আদা কুমবি। হীরু গানো নিয়ে বেরুল স্বরে চিএব না: বেঞ্চে শুয়ে শুয়ে টুকু পুরনো কথা ভাবছে। ভারতে বেশ মজা লাগছে। হীরু তাইয়া না ফেরায় বাবা ঐ রাতে কি অবাকই না হয়েছিলেন। রাত এগারোটার দিকে ভয় পাওয়া গলায় বললেন, ও মিনু গয়না নিয়ে পালিয়ে গেল নাকি? মিনু সহজ গলায় বললেন- হ্যাঁ। : এখন কি করব? : ঘুমিয়ে পড়। যার কি করবে? : বল কি তুমি! মিনু সত্যি সত্যি ঘুমুবার আয়োজন করলেন। মশারি ফেলতে ফেলতে বললেন- ঘুমুতে না চাও জেগে থাক। রিদিকের জন্যে আল্লাহকে ডাক। তিনি ব্যবস্থা করবেন। ক্ষুধার্ত মানুষ ঘুমুতে পারে না বসে প্রচলিত যে ধারণা আছে তা ঠিক না। ক্ষুধা পেটে ঘুম ভাল হয়। ঐ রাতে শোয়া মাত্র টুকু ঘুমিয়ে পড়ল। রাত তিনটার দিকে তার ঘুম ভাঙনে হল। ভাত-ডসে রান্না হয়েছে। আগুন গরম ভাত ফুঁ দিয়ে তার বাবা খাচ্ছেন। তাঁর মুখে বিমসানন্দ। জানা গেল দু’বেসার মত খাবার ঘরে হিল সামন্দের দিন কেমন যাবে তা বোঝার জন্যে মিনু এই ব্যবস্থা করেছেন। সবাই আকণ্ঠ খেল। শুধু তিথি ভাতের খালা সামনে নিয়ে বসে রইল কিছু মুখে দিব না জালালুদ্দিন বদলেন, খাচ্ছিস না কেন রে মা? তিনি বলল, রচি হচ্ছে না বাবা তোমরা গাও। : দু’এক মলা মুখে দে তাহলেই দেখরি রুটি হচ্ছে। ডাল কাঁচামরিচ নিয়ে ডলা দে দেখবি কি রকম টেস্ট হয়। মিনু ওকে একটা পেয়াছ দাও। ঘরে পেয়াজ মাছে না? তিথি বলস, না-খাওয়া অগ্রাস করি বাবা সামনের দিনগুলিতে তো না খেয়েই থাকতে হবে। সে থালা সরিয়ে উঠে দাঁড়াব। মিনু একবারও তাকে খেতে ঢাকসেন না। আজ সকাল থেকে টুকুর মাথায় এসব ঘটনা ছবির মত আসছে পাশাপাশি অসেছে রূপকথার গল্পটা। টুকুর পায়ের কাছে এক ঠোঙা ঝালমুড়ি নিয়ে কে-একজন এসে বদস। টুকুর মনে হল এ করুবেলো গুপ্তার আর সাধনা তাঁঙাতে এসেছে। ঝালমুড়ির বোও দেখাচ্ছে। যাতে সে লোভে পড়ে ঝালমুড়িওয়ালাকে ডেকে দু’টাকার মুড়ি কিনে ফেলে। একবার কিনে ফেললেই সব শেষ। করুবেককে হত্যা করা তখন আর স হবে না। লোকটি একবার তার দিকে তাকিয়ে বলল, কি হইছে? টুকু জবাব দিল না। চোখ বন্ধ করে ফেলস। লোকটি দ্বিতীয় প্রশ্ন করল না। এই দুঃসময়ে কেউ বেশি প্রশ্ন করে না দেশি প্রশ্ন করণেই যদি কাঁধে দায়িত্ব এসে পড়ে দায়িত্ব খুব খারাপ জিনিস। এর থেকে যত্র দূরে থাকা যায় ততই ভাল।টুকু একবার ভাবণ-কেউ কি তাকে খুঁজতে বের হবে? সেই সাবনা কতটুকু? খুব বেশি না, খোঁজাখুঁজির যন্ত্রণায় কেউ যাবে না একজন মানুষ কমে গেদেই সংসারের জন্যে ভাল। তবে বদলু ভাই খবর পেলে নিশ্চয়ই বের হবেন। এবং খুজে বের করতে পারলে খুশি খুশি গলায় বলবেন-তুই যে ঘর থেকে পাসাতে পারলি

পৃষ্ঠা:২৫

এটা খুবই শুভ লক্ষণ। সব গ্রেটম্যানরাই কোন না কোন সময়ে বাড়ি থেকে পালিয়েছেন। একমাত্র ব্যতিক্রম রবি ঠাকুর। বাড়ি থেকে পাদান নি বলেই তাঁর লেখায় তুঃইঃ অটো বেশি বাড়ি থেকে পালাবে অভিজ্ঞতা হয়। নানান ধরনের মানুষের সক্ষে মেশা যায় শুত মান, ব্যাড যান সব ধরনের মানুষ পরবর্তী সময়ে এইসব অভিজ্ঞতা কাজে লাগে। তোর জন্যে এটা তো খুবই দরকার। লেখালেখি লাইনে যখন আডিস। অমাদের দেশের লেখকরা বড় হতে পারল না কেন? অভিজ্ঞতার অভাবে ম্যাক্সিম গোর্কির অভিজ্ঞতা ক’জনের আছে তুই বল? একজনেরও নেই। আমাদের দেশের লেখকরা কি করে? খায় দায় ঘুমায় আর আড্ডা দেয় এদের একবিন্দু অভিজ্ঞতা নেই আমি খুব খুশি যে ভোর অনেক অভিজ্ঞতা হয়ে গেল। মজার ব্যাপার হচ্ছে টুকুর তেমন কোন অভিজ্ঞতা হয় নি। সে নিজের মনে সময়। কাটিয়েছে। বেশির ভাগ সময় কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমিয়েছে, কেউ তাকে বিরক্ত করে নি। শুধু একবার একটা বুড়ি তাকে বলেছে- এই ছ্যামড়া তোর হইছে কি? শইলে তি বুড়ির গলায় স্নেহ-মমতার লেশমাত্র নেই টুকু সেই প্রশ্নের জবাব দেয় নি। চোখ বন্ধ করে ফেলেছে। বুড়ি আবার বলেছে, এই ছ্যামড়া উইঠ্যা ব দেহি। তোর বাড়ি কই? টুকু দিকে হয়ে উঠে গেছে নিজের পরিবারের মানুষনের বাইরে গত দু’দিন এই বুড়ি এবং ঝাসমুড়ির ঠোঙা হাতে লোক- এদের দু’জনের সঙ্গেই কথা হয়েছে। বিরাট কোন অভিজ্ঞতা দায় সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে টুকু, উঠে বসল, আকাশটা অনেকখানি নেমে আছে। আকাশের রঙ ঘন লাস সন্ধ্যাবেলা আকাশ খানিকটা পাস হয় এতটা লাল হয় নাকি? তার ধারণা হল জ্বর খুব বেড়েছে। একটা বাড়তে দেয়া ঠিক হয় নি। সে উঠে নাঁড়াতে গিয়ে দূরে নিচে পড়ে গেব, মুড়ির ঠোঙা হাতের লোকটি তাকিয়ে দেখল কিছুই বলল না। তার খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল সে ঠোগ ছুড়ে ফেলে উঠে দাঁড়াব। অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে সে হাঁটছে। একবারও পেছনে ফিরে তাকাচ্ছে না। দিনকার বদলে যাকে কেউ এখন মার বাড়তি কাবেলায় যেতে চায় না দেখতে দেখতে ছ’নিন হয়ে গেল-টুটুর খোঁজ নেই মিনু প্রায়ই দুপুরবেলা নিজেই ছেলেতে খুঁজতে বের হন কাউকে তা বলেন না। টুঃ প্রসঙ্গে কোন রকম কথাবার্তায় তিনি অংশগ্রহণ করেন না। যেন টুকু নামে তাঁর কেট ছিল না দিয়াছিস? এই ক’দিন তিথি টুকুর প্রসঙ্গ তুলে নি। আজ তুলস। ইরুকে বলস, থানায় খবর হক মহান্ত বিয়িত হয়ে বলল, না। : না কেন? টাকা : মারে থানায় খবর দিয়ে হবেটা কি? নাসিং। কিছুই হবে না। উল্টা শালাদের খাওয়াতে হবে।: টাকা খাওয়াতে হবে কেন?: পুলিশের কাছে যাবি আর টাকা খাওয়াবি না-এটা একটা বসা হল নাকি পুলিশ সম্পর্কে তুই কিছুই জানিস না: থানায় খবর নেওয়ার ব্যাপারটা তুই ফরগেটকরে ফেল: আমরা কিছুই করব না? হাত গুটিয়ে বসে থাকব?

পৃষ্ঠা:২৬

তোকে এই নিয়ে চিন্তা করতে হবে না-ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কি ব্যবস্থা? এসব জেনে তুই কি করবি? আমার উপর ছেড়ে দে :তোর উপর ছেড়ে দিয়ে তো এই অবস্থা…হীরু কোন উত্তর না দিয়ে খাওয়া শেষ করে উঠে গেল। হাতমুখ ধুয়ে তাকে এখন সিগারেট কিনতে যেতে হবে টুকু না থাকায় এই একটা সমস্যা হয়েছে-ছোট ছোট কাজে নিজেকেই যেতে হচ্ছে। ভরা পেটে হটিতে ভাল লাগে না। টুকুকে নিয়ে যে তিথি চিন্তা করছে এতেও সে বেশ মজা পাচ্ছে। পীর সাহেবের কথা মত দশ দিনের দিন টুকুর ফিরে আসার কথা। আসবে সেটা তো প্রায় নিশ্চিত। কাজেই ছোটাছুটি হৈচৈ এর কোন দরকার নেই। সিগারেট কিনতে কিনতে হীরুদর মনে হল আজ কি একবার যাবে পীর সাহেবের কাছে? এমি গিয়ে একটু কদমবুসি করে আসা আর কি?দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষ হবার পরপরই মিনু বের হয়ে গেলেন একটা ভবঘুরে কেন্দ্রের খোঁজ পেয়েছেন পুলিশ টাক ভর্তি চিখিরা নিয়ে ঐখানে আটকে রাখে বলে শুদেছেন। কে জানে টুকুকেও রেখেছে কি-না। তিনি ফিরলেন সন্ধ্যা মেলাবার পর। ঘর অন্ধকার। বারান্দায় তার বড় মেয়ে অরুর বর আব্দুল মতিন বসে আছে। রাগে মিনুর গা জুগে গেল। এ ছেলেকে দেখলেই তাঁর এ রকম হয়। আব্দুল মতিনের হাতে সিগারেটে। শাশুড়িকে দেখে সিগারেট সুকাবার এওটা ভঙ্গি করে উঠে এল, সিগারেট হাতেই পা ছুঁয়ে সালাম করল : কেমন আছেন আমা?মিনু শুকনো গলায় বললেন-তুমি কখন এসে? ঃ চারটার সময়। দেখি কেউ নাই তখন থেকে একলা একলা বসে আছি। বাসার আার লোকজন কোথায়?: জানি না কোথায়। আব্দুল মতিন বিখিত হয়ে বলল, ঘর খালি রেখে সব চলে গেছে-কি আশ্চয ব্যাপার। যে তালা দিয়েছেন এটা তো মাম্মা বাতাস লাগলে খুলে যাবে। : খুলে গেলে কি আর করা। ঘরে ‘আাছেই বা কি সে সিন্দুকের তালা লাগাতে হবে। সরু আছে কেমন?: মাছে মোটামুটি।: মোটামুটি কেন?: আরেকটা সন্তান হবে এই জনোই শশীরটা একটু ইয়ে। ডাক্তার বলেছে রক্তের অভাব। আয়রন ট্যাবলেট দিয়েছে। ঐ খাচ্ছে দিনে তিনটা করে।: তুমি ঢাকায় এসেছ কি জন্যে, কোন কাজে না এমি…: বিনা কাছে কি আর আম্মা আমার মত মানুষ আসা-যাওয়া করতে পারে? ঢাকা-কুমিল্লা যেতে আসতেই পঞ্চাশ টাকা খরচা। কাছে এসেছি।: কাজটা কি?। দ্বী বলব। একটু চা দিতে পারবেন? গত রাতে এক ফোঁটা ঘুম হয় নাই, শরীরটা একেবারে ইয়ে হয়ে গেছে। গোসল ভাব ভেবেছিলাম বাথরুমে দেখি সাবান নাই…

পৃষ্ঠা:২৭

: কি আর করবে সাবান ছাড়াই গোসল কর।মিনু রান্নাঘরে ঢুকে গেলেন। ঘরে কিছু নেই। শুধু টা দিতে ২৫ তার জন্যে মিনু কোন রকম সংকোচ শ্লেষ করলেন না।মতিন চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল, টাকাটার জন্যে আসলাম আম্মা। বিপদে পড়েছি। যার টাকা তাকে নিয়ে হয়, রোজ তাগদা দিচ্ছে। মিনু বিস্মিত হয়ে বলব-কিসের টাকা?: ঐ যে গত মাসে ইরু গিয়ে নিয়ে আসল।: হারু টাকা নিয়ে এল? কিসের টাকা?: আত্মার চোখ অপারেশনের টাকা। আমার হাত তখন একেবারে খালি তা অরু এমন কান্নাকাটি শুরু করল। আমি কি আর করব ধার করে জোগাড় করলাম। এমিতে তো কেউ টাকা দেয় না সুদ কবুল করে ধার। তা ভাবলাম কি আর করা-সেখ বসেকথা।: কত টাকা?মতিন অবাক হয়ে বলল, কত টাকা আপনি জানেন না? মিনু বিরক্ত গলায় বললেন, জানরে তোমাকে দিয়েস করতাম? জানি না বলেই জিজ্ঞেস করছি। কত টাকা এনেছে?: দুই হাজার।: কি সর্বনাশ বল কি তুমি!: আপনি কিছুই জানেন না? এ তো দেখি আরেক মুসিবত হয়ে গেল। হীরু মনে হচ্ছে ফাটকি মেরে টাকা নিয়ে এসেছে এখন কি করি আামি?: হীরু আসুক হীরুকে বল। যাকে টাকা দিয়েছ তার ঘাড় ধরে টাকা আদায় কর।আমার কাছে কি?অপদার কাছে কি মানে? এইসব আপনি কি বলছেন আমা?: সত্যি কথাই বলছি হরিণা সঙ্গে আমাদের কোন সম্পর্ক নেইঃ এ তো বিরাট সমস্যায় পড়লাম হীরুকে কি আমি টাকা দিয়েছি নাকি? টাকা নিলাম আপনাদের রাত দশটার টেনে ফিরব-এর মধ্যে যা হোক একটা ব্যবস্থা করেন। পুরোটা না হলেও অন্তত হাজারখানিক। নয়ত বিরাট বেইজ্জত হব।: বসলেই তো হবে না। টাকা পাব কোথায়? টাকা গাছ তো বারা পুঁতা নাই। সংসারের হাল অবস্থা তো জনে। জেনেশুনে এ রকম অনুকের মত কথা বললে হবে নাকি?: আমি কি অবুঝের মত কথা বলসাম? পুরো বেইজ্জত হব লোকের সামনে…ঃ না হয় শ্বশুর বাড়ির জানো খানিকটা বেইজ্জত হলেই।: আম্মা আপনি ব্যাপারটাই বুঝতে পারছেন না। মিনু ক্লান্ত গলায় বললেন, এ টাকার আশা তুমি ছেড়ে দাও বাবা। আব্দুল মতিন চোখ কপালে তুলে ফেলল। : ছেড়ে দেব? কি বলছেন? যা সত্যি তা বললাম আব্দুল মতিন খানিকক্ষণ গম্ভীর হয়ে বসে থেকে উঠে চলে গেল। কোথায় যাচ্ছে মিনু কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। যাক যেখানে ইচ্ছা পুরোপুরি চলে গেলেই ভাল। তবে

পৃষ্ঠা:২৮

পুরোপুরি চলে যায় নি হ্যান্ড ব্যাগ ফেলে গেছে। হ্যান্ড ব্যাগের জন্য আসবে। সম্ভবত হীরুর খোঁজে গিয়েছে।তিথি সন্ধ্যার একটু পরই বাড়ি ফিরে দেখে হুলস্থুল কাণ্ড। দুলাভাই এবং মা দু’জনেই গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে কি নিয়ে কথা হচ্ছে বোঝার কোন উপায় নেই। ডিবি বলল, এসব কি হচ্ছে দুলাভাই?মতিন চোখ লাল করে বলল, কি হচ্ছে তুমি জান না?: জ্বীনা।: বাজে কথা বসবে না। কি হচ্ছে তোমরা সবাই জান। এখন ভাল মানুষ সেজেছ। ভাইকে পাঠিয়ে টাকা আনবার সময় মনে ছিল না। এখন অধীকার যাচ্ছ। : কিছুই অস্বীকার যাচ্ছি না। আগে আপনি আমাকে ব্যাপারটা গুছিয়ে বলুন। এরকম রাগ করছেন কেন? মতিন পুরোপুরি গুছিয়েও বলতে পারব না। কথা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিস। তবু মূল ব্যাপারটা বোকা যাচ্ছে। তিথি ক্লান্ত গলায় বসল, আপনার টাকা নিয়ে দেব। এক সঙ্গে সবটা না পারলেও ভাগে ভাগে দেব। প্লীজ চিৎকার করবেন না। আপনার খাওয়া- দাওয়া হয়েছে দুলাভাই? মতিন কি-একটা বলতে গেল, বলতে পারল না। রাগে তার মুখে কথা আটকে যাচ্ছে। সে হ্যান্ড ব্যাগ হাতে নিয়ে নিয়েছে তিথি বলল, যাচ্ছেন কোথায় দুলাভাই? মিনু বললেন, যেখানে ইচ্ছা থাক। তুই কথা বলিস না। ফাজিদের ফাজিল। মতিন বাড়ি থেকে বের হবার আগে তাঁর গলায় বসল-এর ফল ভাস হবে না এর ফল কিন্তু ভাল হবে না। তখন কিন্তু আমাকে দুষবেন না। তিথি বলল, কাজটা কি ভাল করলে মা? দুলাভাই দিয়ে আলার উপর শোধ ভুগবে। ৪ তুললে তুলুক। মুখে অ্যাসিড মারুক। গলায় দড়ি নিয়ে বুলিয়ে দিক-যা ইদা করুক। : হয়েছে কি তোমার? : কিছু হয় নি। : বাবা কোথায় মা? : জানি না কোথায়। যাক যেখানে ইচ্ছা। তিথি এক দৃষ্টিতে মাকে দেখছে বোঝার চেষ্টা করছে যতই দিন যাচ্ছে মা বদলে যাচ্ছে। পরিবর্তন অতি দ্রুত হচ্ছে বলে খুব চোখে লাগছে। তিথি লক্ষ্য করল মা শান্ত ভঙ্গিতে নিজের জন্য চা বানিয়ে জলচৌকিতে বসে খাচ্ছে: তাঁর চেহারায় কোন রকম বিকার নেই। জালালুদ্দিন হীরুর সঙ্গে তার পীর সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। পীর- ফকিরের প্রতি তাঁর কোন রকম বিশ্বাস নেই তবু এসেছেন। কারণ ঘর থেকে বের হতে ইচ্ছে করছে। তাঁর মনে ক্ষীণ আশা ছিল যেহেতু চোখে দেখতে পান না ইরু হয়ত একটা রিকশা ভাড়া করবে। অন্ধ বাপকে তো আর হাঁটিয়ে নেবে না। হীরু রিকশার ধার দিয়েও গেল না। ঠেলেঠুসে এক বাসে তুলে ফেলল সেই বাসে গাদাগাদি ভিড়- এর মধ্যেও বসার জায়গা করে ফেলন। জানালার পাশে বসেছে এমন

পৃষ্ঠা:২৯

একরণ মানুষকে খুঁজে বের করল যাকে দেখে মনে হয় এর হৃদয়ে দয়ামায়া আছে, অনুরোধ করলে ফেলবে না। হীরু তার কাছে গিয়ে বিনয়ে প্রায় গলে গিয়ে বলন, ব্লাইন্ড পারসন নিয়ে এসেচি ভাই-জায়গা নিন। ব্লাইন্ড এবং সিক দুটাই এক সঙ্গে। যায় যায় অবস্থা বলতে পারেন।সঙ্গে সঙ্গে জায়গা হল। হীরু বলল, থ্যাংকস ভাই। মেনি থ্যাংকস। হরর কাছে মনে হল আজকের দিনটা খারাপ না। ৩০ পীর সাহেবের সঙ্গে দেখা হবে। সব দিন দেখা হয় না। লোকজনের ভিড় থাকে। কোন কোন দিন পীর সাহেব চিল্লায় বসেন। চিল্লা ব্যাপারটা কি সে জানে না তবে তার ধারণা ব্যাপারটা খুবই জটিল কিছু। কারণ পীর সাহেব যেদিন চিল্লায় বসেন সেদিন তাঁর খাদেমরা ইশারায় কথা বলেন। তখন কোন রকম শব্দ করা নিষিদ্ধ।যা ভাবা গিয়েছিল তাই যাওয়া মাত্র পীর সাহেবের সঙ্গে দেখা হল যে কোন কারণেই হোক আজ লোকজন একেবারেই নেই। পীর সাহেব বারান্দায় বিমসমুখে একা একা বসে আছেন। অনেকটা দূরে দু’জন বোরকা পরা মেয়ে। মেক্সে দুটি কাঁদছে। পীর সাহেব বললেন, খবর কিরে তোর?হারু বলল, আপনার দোয়া স্যার। আমি আমার ফাদারকে নিয়ে এসেছি। আপনারখুব ভক্তপীর সাহেব নিস্পৃহ গলায় বলসেন, ভাল করেছিস, খুব ভাল করেছিস। ছোট ভাইয়ের ব্যাপারটাও স্যার একটু মনে করিয়ে দিতে আসলাম। খুবই চিন্তাযুক্ত আছি। বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ।পীর সাহেব বড় করে হাই তুললেন। হীরু বাবার কানে কানে বলস, হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছে কেন? পা ছুঁয়ে সালাম করজালালুদ্দিন বিরক্ত গলায় বলসেন-পা দেখতেই পাচ্ছি না, সাদাম করব কি? হারু পীর সাহেবের দিকে তাকিয়ে হাত কচলাতে কচলাতে বলস-বাবার চোখে একটা সমস্যা আছে স্যার। বলতে গেলে ফ্লাইও একটু দয়া করে যদি দেখেন। পীর সাহেব হীরুর দিকে না তাকিদেই বললেন, চোখ ঠিক হয়ে যাবে, ইরু তার বাবার কানে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, এ৩ ওথায় কামেলা মিটিয়ে দিলাম। এখন বাড়িতে গিয়ে নাকে তেল দিয়ে ঘুমাও জাসাসুদিন বিশেষ জাসা পেলেন বলে মনে হল না। ফিসফিস করে বললেন, কাঁদছে কেরে? হারু বলল, মেয়েছেলে কাঁদছে। ওরা কাঁদবেই মেয়েছেলে মানেই কান্দন পার্টি যাদের সঙ্গে তিঘির সময় কাটাতে হয় তাদের কারোর চেহারাই তার মনে থাকে না যেন স্বপ্নদৃশ্য। ঘুম ভাঙলে স্বপ্ননৃশ্যের কাঠামো মনে থাকে, কিন্তু যাদের নিয়ে দৃশা তাদের চেহারা মনে থাকে না। তিথি হ্যান্ড ব্যাগ থেকে কার্ড বের করল। ইংরেজীতে সেবা কার্ড। তিনটা টেলিফোন নম্বর দেয়া। বেশ পয়সাওয়ালা মানূষ নিশ্চয়ই। লোকটির চেহারা মনে পড়ছে না-লম্বা না বেঁটে, রোগা না মোটা কিছুই মনে নেই। তবে নার্ভাস ধরনের মানুষ ছিল এটা খুব মনে মাছে। বারবার তার স্ত্রীর কথা বলছিল। স্ত্রীর নাম ফরিনা। বড় মেয়ে আজিমপুর গার্লস স্কুলে ক্লাস সেভেন পড়ে তাও মনে আছে, কিন্তু লোকটির চেহারা মনে নেই। কার্ডে লেখা-মোঃ দবিরউদ্দিন বিএ (অনার্স)। কারখানার ঠিকানা এবং বাসার ঠিকানা দুটোই দেয়া আছে। তিথি ঠিক করল বাসাতেই যাবে। এই সময়

পৃষ্ঠা:৩০

ভদ্রলোককে বাসাতেই পাওয়া যাবে। ন’টা এখনো বাজে নি। এত তোরে ভরলোক নিশ্চয়ই কারখানায় চলে যান নি। তাছাড়া বাসায় যাবার অন্য একটা উদ্দেশ্যও আছে। অদৃশ্য চাপ সৃষ্টি করা। বাসায় গিয়ে তিথি যদি বলে, আপনি আমাকে একটা চাকরি দেবেন বলেছিলেন, তখন ভদ্রলোক হকচকিয়ে যাবেন, চেষ্টা করবেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাকে বিদেয় করতে। চাকরির প্রসঙ্গে ভদ্রসোক হয়ত বসবেন, স্বাচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে ব্যবস্থা করছি। তুমি কাল আমার অফিসে এসো।তুমি করে নাও বলতে পারে। হয়ত আপনি করে বলবে। না চেনার তানও করতে পারে। তবে এই লোক তা করবে না। এ নার্ভাস ধরনের তীতু একজন মানুষ। নার্তাস এবং তীতু মানুষ চট করে মিথ্যা বলতে পারে না মিথ্যা বলতে চেষ্টা করে, কিন্তু বলার সময় সত্যি কথাই বলে। সে যে ভুল করে সত্যি কথা বলছে তা নিয়ে শুরুতে বুঝতে পারে না। যখন বুঝতে পারে তখন সে আরো নার্ভাস হয়ে যায়। তিথি নিজের মনেই খানিকক্ষণ হাসল। কেন জানি তার খুব মণ্ডা লাগছে। যদিও মজা লাগার মত কিছু হয় নি।বাসা খুঁজে পেতে দেরি হল না। দোতলা একটা বাড়ি তিনতলার কাজ চলছে। বাড়ির সামনে ইট, সিমেন্ট, রড গাদাগাদি করে রাখা। ছ’সাত জন মিস্ত্রী কাজ করছে। চৌবাচ্চার মত একটা জায়গার চারপাশে গোল হয়ে বসে ইট পরিষ্কার করছে। রাশ দিয়ে ইট ঘষে পানি ঢালছে। সেই ইট মাথায় করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে দোতলার ছাদে। তিমি বলল, এটা কি দবির সাহেবের বাসা? ছুটালো দাড়ির এক মিস্ত্রী বিরক্তমুরে বাস, জানি না কার বাসা আফনে জিগান গিয়া। এই বলে সে নিচু গলায় আরো কি যেন কবল। কোন কুৎসিত ইঙ্গিত কিংবা কোন অশ্লীল রসিকতা, কারণ সঙ্গী সবাই শব্দ করে হেসে উঠল। দু’জন আড় আড়চোখে তাকাল ডিগ্রি দিকে। মেয়ে হয়ে জন্মানোর অনেক সমস্যা। কুৎসিত ইঙ্গিত বা কুৎসিত রসিকতা সব সময় মেয়েদের নিয়েই করা হয়। পুরুষদের নিয়ে নয়।কিথি ছুঁচালো দাড়ির মিস্ট্রীটির দিকে তাকিয়ে শীতল গলায় বলল, তুমি কি বলসে? মিন্ত্রী এই প্রশ্নের জন্যে তৈরি ছিল না। সে আমতা আমতা করতে লাগল। তিথি বলল, তোমার দাড়ি ধরে তোমাকে আমি এই পানির মধ্যে চুবিয়ে ধরব বুঝতে পারছ? মিস্ত্রীদের কেউ কোন কথা বলল না। তারা ইট পরিষ্কারের ব্যাপারে এখন অতিরিক্ত মনোযোগী। গুদের একজন লজ্জিত গল্যা, বলস, কিছু মনে লইয়েন না আফা। এইডা দবির স্যারের বাসা। ডাইন নিকে যান। তিথি এগিয়ে যাচ্ছে। দাড়িওয়ালা মিস্ত্রীটি কি বলেছিল কে জানে। তার জানতে ইচ্ছা করছে। অনেক কিছুই আমাদের জানতে ইচ্ছা করে, শেষ পর্যন্ত জানতে পারি না। এটা এক দিক নিয়ে ভাল। সবচে সুখী মানুষ তারাই যারা সংচে কম জানে। এটা তিথির বাবা জালালুদ্দিন সাহেবের কথা। জালালুদ্দিন সাহেব এক সময় দার্শনিকের কথাবার্তা বলতেন। এখন বলেন না। তাঁর এখনকার সব কথা নিজের চোখ নিয়ে এবং খাদ্যদ্রব্য নিয়ে। আব্দও তিনি বেরুবার সময় অনেকক্ষণ বকবক করলেন। । একজন বড় চোখের ডাক্তারের কাছে আমাকে নিয়ে যাতে মা বাঁ চোখটায় এখন আর কিছুই দেখতে পাই না আগে কিছুটা দেখতাম, হীরুর পীরের কাছে যাওয়ার পর থেকে একেবারে সাড়ে সর্বনাশ। এই দেখ, ডান চোখ বন্ধ করে তোর দিকে তাকাচ্ছি। তোকে দেখছি না। কিচ্ছু না-অন্ধকার। ঐ শাসা পীরের কাছে কেন যে গেলাম।: ডানটা কি ঠিক আছে?

পৃষ্ঠা:৩১

ঃ এখনো আছে আর কিন্তু বেশিদিন থাকবে না। একটা গেলে অনাটা যায়- এটাই নিয়ম। তিথি অন্যমনস্ক স্বরে বলল, তুমি দেখি অনেক নিয়ম-কানুন জান। তার উত্তরে জাবাবুদ্দিন কিছু বলেন নি। অদ্ভুৎ চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়েমেন তিনি বলে৯ে সামনের সপ্তাহে একজন বড় ডাজারের কাছে নিয়ে যাব।: দেরি হয়ে যাবে তো।: দেরি হলেও কিছু করার নেই। হাত খালি। ডাক্তার বিনা পয়সায় তোমাকে দেখবে না নগদ একশ’ টাকা দিতে হবে জালালুদ্দিন নিতু গলায় বললেন, আমার কাছে কিছু আছে।তিখির জন্যে এই খবরটা অবাক হবার মত। রান্না হয় নি, খাওয়া-দাওয়া হয় নি এমন দিনও তাদের গেছে। জালালুদ্দিন শব্দ করেন নি। শুকনো মুখে উপোস দিয়েছেন। অথচ তাঁর কাছে টাকা ছিল। তিখি বলল,:কত টাকা আছে?তিনি জবাব দেন নি। চোখ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। একটা হাত একবার ডান চোখের সামনে ধরছেন একবার বাঁ চোখের সামনে। তিমি বলল, কত টাকা বস? আমি চো নিয়ে যাচ্ছি না।: আছে কিছ: সেই কিছুটা কত?: এই ধরশ পাঁচেক।: এইগুলি টাকা নিয়ে ঘাপটি মেরে ছিলে? তুমি তো বেশ মজার মানুষ বাবা। দাও মামাকে একশ’ টাকা ধার দাও। ভয় নেই, ফিরিয়ে দেব। তিনি না-শোনার ভান করলেন। খাট থেকে নেমে হাতড়ে হাতড়ে রওনা হলেন বাথরুমের দিকে। তিনি বাড়ি থেকে বের না হওয়া পর্যন্ত তিনি বেরুসেন না।তের-চৌদ্দ বছরের রোগা একটা মেয়ে দরজা খুলে দিল। মেয়েটির চেহারা খুব মায়াকাড়া। ভারী কোমল চোখ। গোলাকার মুখ। যেন কেউ কাঁটা কম্পাস দিয়ে মুখ একেছে। পাতলা ঠোঁট এত পাতলা যে মনে হয় তীক্ষ্ণ চোখে তাকালে রক্ত চলাচল দেখা যাবে।ঃ দবির সাহেবের বাসা।: উনি আছেন?খ্রি গোসল করছেন: কে হন তোমার?: আমার বাবা।: আমি উনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।। বসুন। বাবা বের হলে বলব উনার বের হতে অনেক দেরি হয়।: তোমার নাম কি?: বাহ্ খুব সুন্দর নাম তো।। আমার ভাল নামটা খুব খারাপ।: ভাল নাম কি?অব্দপ্তা কিছু বলল না। আগ্রহ নিয়ে সে তিথিকে দেখছে। মনে মনে বলছে, এই মেয়েটার গলার স্বর এত মিষ্টি কেন? শুধু শুনতে ইচ্ছা করে। তার একটু মন খারাপও

পৃষ্ঠা:৩২

হল। অজন্তার ধারণা তার গলার স্বরটা খুব বাজে। কর্কশ, কানে লাগে। এই জন্যে বাইরের মানুষের সামনে সে কথাবার্তা একেবারেই বলে না। তব এই মহিলাটির সঙ্গে সে অনেক কথা বলে ফেলেছে এখন মন খারাপ লাগছে। তার ধারণা এই মহিলা মনে মনে বলছেন অজন্তা মেয়েটা এত সুন্দর কিন্তু তার গলার স্বর এরকম কাকের মত কেন। তিথি বলল,তোমার আজ স্কুল নেই অজন্তা?: কিসের ছুটি?: এসএসসি পরীক্ষার ছুটি। আমাদের স্কুলে সিট পড়েছে।: তুমি ক্লাস সেভেন পড়, তাই না?অজন্তা অবাক হয়ে বলল, কি করে বুঝলেন? তিথি হাসিমুখে বলল, চেহারা দেখে আমি অনেক কিছু বুঝতে পারি। এখন যাও দেখ তোমার বাবা বের হয়েছেন কি না।: বের হন নি।: কি করে বুঝলে?: বাথরুমের দরজা খুসেই তিনি আমাকে ডাকেন দেবুর শরবত দেবার জন্যে গোসল শেষ করে তিনি এক গ্লাস লেবুর শরবত খান। ভিটামিন সি আছে শরবতে। বেশি করে ভাইটামিন সি খেলে মাথায় চুল ওঠে।তিমি হেসে ফেলল। অজন্তা সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে গেল। নিজের উপর তার খুব রাগ লাগছে কাকের মত গসায় সে এতক্ষণ ধরে কথা বলেছে। কি সজ্জা-জিভটা কেটে ফেলতে পারলে বেশ হত। ভেতর থেকে ভারী গলা ভেসে এল-মজু, মা মজু অজন্তা মুখ কালো করে বলল, বাবা আমাকে আদর করে মধু ডাকেন। কি বিশ্রী যে লাগে শুনতে। দবির সাহেব খালি গায়ে, কাঁবে শুধু একটা ভেজা গামছা জড়িয়ে বসার ঘরে ঢুকেই পাথরের মুর্তির মত হয়ে গেলেন তিথি উঠে দাঁড়াল। তিনি ভাঙা গলায় বসলেন-বস। বন। তিথি বলস, আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন….: আমার নাম মনে আছে আপনার?: না, নাম মনে নাই। আমার কোন মানুষের নাম মনে থাকে না। চেহারা মনে থাকে। একবার কাউকে দেখলে সারা জীবন মনে থাকে। তুমি বস, আমি একটা শাট গায়ে দিয়ে আসি।: আমি কি আপনাকে কোন অস্বস্তিতে ফেলেছি?ঃ ই, তা তা তা কিছুটা… কি জন্যে এসেছ?: আপনি আমাকে আসতে বসেছিলেন।: আমি, আমি আসতে বলেছিলাম? বল কি।একটা কার্ড দিয়েছিসেন। সেখান থেকেই ঠিকানা পেলাম।ও আচ্ছা আচ্ছা।: বলেছিলেন আমাকে একটা চাকরি জোগাড় করে দেবেন।: চাকরি? চাকরি আমি কোথায় পাব?: তা তো জানি না। আপনি আমাকে আসতে বলেছিলেন, তাই এসেছি। চলে যেতে বললে চলে যাব।

পৃষ্ঠা:৩৩

: না না ধস। একটু বস: চা খাও। আমি একটা শার্ট গায়ে দিয়ে আসছি। ঘরে কোন কাজের লোক নেই। চারজন ছিল। গত সোমবার একসঙ্গে চারজনকে বরখাস্ত সেটা সম্ভব না। আমার ধারণা, ওরা ধরাধরি করে টিভিটা চোরের রিকশায় ভুলে দিয়ে করেছি মাংশে ইঞ্চি ৩০টির কালার টিসও চুট্টা হয়েছে। ঋলের সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়াএসেছে: আই অ্যাম পজিটিভ।

দবির উদ্দিন শার্ট গায়ে দেবার জন্যে দোতলায় চলে গেলেন। তাঁর ঘর তাঁর স্ত্রী ফরিদার ঘরের পাশে। এক সময় তারা দু’জন এক খাটে ঘুমুতেন। এখন তা সম্ভব না। ফরিনার গায়ে একটু হাত রাখলে সে ব্যথায় নীস হয়ে যায় দীর্ঘদিন বিছানায় শুয়ে থেকে থেকে তার পিঠে দগদগে ঘা হয়েছে। সেখান থেকে কটু গন্ধ আসে। দবির উদ্দিন সেই গন্ধ সহ্য করতে পারেন না। সমস্ত শরীর পাঁক দিয়ে ওঠে। মনে হয় বমি করে ফেলবেন বহু কষ্টে বমির চাপ সামলাতে হয় সামলাতে না পারলে খুব খারাপ ব্যাপার হবে, ফরিদা মনের কষ্টেই মরে যাবে।দবির উদ্দিন ফরিদার ঘরের পাশ দিয়ে যাবার সময় থমকে দাঁড়ালেন। সকাল বেলার এই সময়টায় সে আচ্ছন্ন অবস্থার মধ্যে থাকে। কিছু জিজ্ঞেস করলে কথা বলে না তাকায় না পর্যন্ত কথা বলতে শুরু করে বিকেলের দিকে। আজ অন্য রকম হল। ফরিদা খীল কণ্ঠে ডাকলেন- এই শোন। দবির উদ্দিন ঘরে ঢুকলেন। দরজার ও-পাশথেকে বললেন-কি?: কোন মেয়েটা?ফরিদা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, যার সঙ্গে এতক্ষণ কথা বললে। দবির উদ্দিন ফ্যাকাশে হয়ে গেলেন। ফরিদা বলদেন, মেয়েটাকে আমার এখানে একটু আসতে বল। আমি কথা বগর।তিধি অনেকক্ষণ কিছু দেখতেই পেস না। জানালা ভারী পর্দায় ঢাকা। ঘরের তিনটি দরজার দুটোই বন্ধ যেটা খোসা, সেখানেও জানালার মতই ভারী পর্না। অন্ধকারে চোখ সয়ে আসার আগেই তিথি শুনল কেউ-একরন তীক্ষ্ণ গলায় বলছে, ভেতরে এসে দাঁড়াও। পর্দা ধরে দাঁড়িও না। পর্দার কাঠ ‘আলগা হয়েআছে, মাথার উপর পড়বে।তিনি খানিকটা এগুলো। এগুতেও ভয় লাগছে। কোন কিছুর সঙ্গে হয়ত ধাক্কালাগবে: তোমার বাঁ দিকে চেয়ার আছে, তুমি চেয়ারে বসসে বসল না। দাঁড়িয়ে রইল। চোখে অন্ধকার সয়ে গেছে। ঘর দেখা যাচ্ছে। পুরনো আমলের পালংক দেখা যাচ্ছে। পালংকে শুয়ে থাকা মহিলাকে দেখা যাচ্ছে। খুব রুগ্‌ণ মানুষকে আামরা কংকাল বলি। এই মহিলাটি তাও নয়, তরে কংকালও যেন শুকিয়ে ছোট হয়ে গেছে। হাঁটু পর্যন্ত চাদরে ঢাকা। মাথার উপর শ্লথগতিতে একটা ফ্যান ঘুরছে ঘরের ভেতর চাপা এক ধরনের গন্ধ।: বসতে বললাম, বসছ না কেন?তিথি বসল। তাকিয়ে রইল দেয়ালের দিকে। ফরিদা বললেন, চেয়ারটা ঘুরিয়ে বস। তোমার মুখ দেখতে পারছি না। তিথি চেয়ার ঘুরিয়ে বসল।: তোমার চেহারা তো বেশ ভাল। বেশ্যাদের এত সুন্দর চেহারা থাকে জানতাম না। আমি শুনেছি ওদের শরীর ভাল থাকে, চেহারা ভাল থাকে না। তিথি তাকিয়ে রইল। কিছু বলল না।

পৃষ্ঠা:৩৪

: তোমাকে বেশ্যা বলায় রাগ করলে নাকি? ও আমাকে তোমার বিষয়ে বলেছে। ও আমাকে সব কিছু বলে। কোন কিছু লুকিয়ে রাখতে পারে না: সাপান মনে এচ্ছে খুব অগাত্রো।: ঠাট্টা করলে নাকি?তিথি কিছু বলল না। ফরিদা বললেন, আমি অবশ্যি শুনেছি তোমার মত মেয়েরাখুব ঠাট্টা-তামাশা করতে পারে। । আমাদের সম্পর্কে এত খবর জানলেন কিভাবে?: ইচ্ছা করলেই জানা যায়। একে-গুকে জিজ্ঞেস করে জেনেছিতিথি বলল, আপনার কথা কি শেষ হয়েছে- আমি এখন ওঠব? : না বস। আরো খানিকক্ষণ বস। তোমার কাজের ক্ষতি হলেও বস, আমি পুষিয়ে: কিভাবে পুষিয়ে দেবেন? ঘন্টা হিসেবে টাকা দেবেন।: হ্যাঁ দেব। তুমি বস। চা খেয়েছ তুমি? চা দিয়েছে?: না দেয় নি। চা খেলে আপনার কাপ নোওরা হয়ে যাবে না?: হবে। আমার এত শুচিবায়ু নেই। আচ্ছা তুমি বণ ও তোমার সঙ্গে কি কি করেছিল?: আপনার স্বামী আমার সঙ্গে কি কি করেছিল তা শুনতে চান?:ই।: উনি আপনাকে কিছু বলেন নি?: বসেছে। তবু তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই। তুমি বল। আমি তোমাকে টাকা দেব।: এটা বলার জন্যে আপনি আমাকে টাকা দেবেন?: হ্যাঁ দেব। ও ভীষণ লাজুক। ওর মত লাজুক একটা মানুষ তোমার মত সুন্দরীএকটা মানুষ নিয়ে কি করল তাই জানতে চাই।: আপনিও তো এক সময় সুপরা ছিলেন। আপনাকে নিয়ে উনি কি কি করেছিলেন। : আমি আর তুমি এক হলাম?: এক না? আমাদের দু’জনের শরীরই তো এক রকম? তাই নয় কি?: তুমি খুবই ফাজিল একটা মেয়ে।: আমার মত মেয়েরা ফাজিলও হয়- এই খবরটা বোধ হয় আপনি জানেন না। অন্য মেয়েদের সঙ্গে আমরা খুব ফাজলামী করি আবার ছেলেদের সঙ্গে মধুর ব্যবহার।এখান থেকে যাবার সময় আমি করব কি জানেন? আপনার মুখে থুথু দিয়ে যাব। আপনার শরীরের যে অবস্থা আপনি আমার সেই ঘুধু মুখে মেখে শুয়ে থাকা ছাড়া কিছু করতে পারবেন না।খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার ফরিদা এই কথায় রাগ করলেন না, বরং তার দুখের রেখাগুসি কোমল হয়ে গেল। তিনি শান্ত স্বরে বললেন, তোমার নাম কি?: আমার দশটা নাম আছে। কোন্টা আপনাকে বলব?: সত্যি নামটা বল।: সত্যি নাম আমার নেই। আমার সবই নকল নাম।।: তুমি আমার উপর খুব রাগ করেছ। আমি খুবই অসুস্থ একজন মানুষ। মার অল্প কিছু দিন বেঁচে আছি। এরকম একজন মানুষের উপর রাগ করা ঠিক না দেব।

পৃষ্ঠা:৩৫

ঃ আপনার মৃত রুগীরা সহজে মরে না। আপনি দীর্ঘদিন বাঁচবেন। এই বাড়ির প্রতিটি মানুসের হাড় ভাজা ভাজা করবেন। এই বাড়ির প্রতিটি মানুষ এক দিন মনে মনে স্থাপনার মৃত্যু কামনা বদারে- উধু মাপান মারেন না।ফরিদা বললেন, তুমি সত্যি কথাই বলেছ। তুমি আমার আরো কাছে মাস তো তোমাকে ভাল করে দেখি। জানালার একটা পর্দাও সরিয়ে দাও। ঘর বেশি অন্ধকার হয়ে আছে আজ এত অন্ধকার কেন বস তো? ঝড়বৃষ্টি হবে নাকি? আকাশে কি মেঘ আছে? তিমি একটি প্রশ্নের জবাবও দিস না: চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। শান্ত স্বরে বলল, যাই। ফরিদা বললেন, থুথু দিয়ে গেলে না? তিথি তার জবাব না দিয়ে নিচে নেমে গেল। দবির উদ্দিন বারান্দায় মেয়ের মাথার চুল আঁচড়ে দিচ্ছিলেন। তিথি তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে উঠোনে নামল দবির উদ্দিন শংকিত চোখে তাকিয়ে রইলেন কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না অজন্তা বাবাকে জিজ্ঞেস করল, এই মেয়েটা কে বাবা? দবির উদ্দিন মেয়ের প্রশ্নের জবাব দিতে পারলেন না। কিছু একটা বলতে গেলেন, গঙ্গা নিয়ে শব্দ বের হল না গলার মধ্যে আটকে গেলটুকু অনেকক্ষণ পর্যন্ত বুঝতেই পারল না সে কোথায় আছে। অন্ধকার এবং অপরিচিত একটা ঘর সে শুয়ে আছে মেঝেতে। তার গায়ে দুর্গন্ধ মোটা একটা কাঁথা সে শুনল ইনিয়ে-বিনিয়ে স্বর বয়েসী একটা বাচ্চা কাঁদছে: কান্নার শব্দ শুনতে শুনতে টুকু চোখ বন্ধ করল। এই মুহূর্তে সে কিছু ভাবতে চায় না। ঘুমুতে চায়। আরামে তার শরীর অল্প অল্প কাঁপছে। ঘুম এত অল্লামের হয় সে আগে কখনো ভাবে নি। এখানে সে কিভাবে এল? দিয়ে নিজে নিশ্চয়ই হাসে নি কেউ এসে দিয়ে গেছে। কতদিন আগে নিয়ে গেছে? এক নিদ, দু’দিন না সাত দিন? বাড়ি থেকে যেদিন সে বের হল সেদিন কি বার ছিল? সোমবার না মঙ্গলবার? এটা কোন্ কাল? শীত না গ্রীষ্ম? কিছুই মনেপড়ছে নাপায়ের উপর রাখা মোটা কাঁথা থেকে দুর্গন্ধ আসছে। ঘুমের মধ্যেও সেই দুর্গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। আরো যেন বেশি পাওয়া যাচ্ছে। পেটের ভেতর পাক দিয়ে উঠছে। বমি বমিলাগছে। টুকু দ্বিতীয়বার চোখ মেলল। সঙ্গে সঙ্গে মোটা একটা গসা শোনা গেণ-নাম কি তোর? এই নাম কি রে?টুকু জবাব দিস না। জবাব দেবার আগে লোকটাকে দেখতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু লোকটা বসেছে এমনভাবে যে তাকে দেখতে হলে মাথা ঘুরিয়ে তাকায়ে হয়। মাথা ইস্ক’ করছে নাঘুরাতে : এই পোলা, এই! কিছু খাবি? খাবি? কথা কস না ক্যান? বোবা নাহি। এই এই। টুকু বলা না বলাই ডাল বিবেচনা করব কথা বলতে শুরু করসেই এরা অসংখ্য প্রশ্ন করবে বাড়ি কোমায়। বাবার নাম কি? থাক কোথায়? পড়াশোনা কর। কি হয়েছে তোমার?এরচে এই যে চুপচাপ পড়ে আছে এটা কি ভাল না? টুকু স্বাগ্রহ করে আশে- পাশের জীবনযাত্রা দেখছে যে লোকটি তার সঙ্গে কথা বলছে তার চেহারা সে এখনো দেখে নি। তার কথা শুনে মনে হচ্ছে বুড়ো কেউ হবে কথার সঙ্গে সঙ্গে সে খুব কাশছে।

পৃষ্ঠা:৩৬

৪ এই পোলা, তুখ লাগছে? কিছু খাবি? ও মতির মা, এই পুলারে খাওন দেও। মতির মা ঘরে ঢুকল। হাতে এলুমিনিয়ামের বাটি এবং চামচ। বাটিতে তরল সবুন্দ খুব কম। একে দেখে মনে হয় না মতি বলে তার কোন দেশে আছে। এটা কি একটা হিনেস, মাএর মা’র পরনে গা? সবুজ রঙের ৩০০০ট শাসের: মতির মা, এই পুলার জবান বন্ধ। তার মুখে তুইল্যা চাইরডা খাওয়াইয়া দাও। মতির মা চামচে করে সবুজ রঙের ঐ জিনিস টুকুর মুখের কাছে ধলে। মতির মা’র মুখ ভাবলেশহীন। এই ছেসে কিছু থাক না থাক তাতে তার কিছু যায় আসে না। টুকু আগ্রহ করে খেল। জিনিসটা খেতে ভাল। টকটক এবং প্রচণ্ড ঝাল। মতির মা যতবার চামচটা মুখের কাছে ধরছে ততবারই তার হাতের চুড়ি টুনটুন করে বাজছে। মেয়েটির হাত ভর্তি গাঢ় লাল রঙের চুড়ি। সবুজ শাড়ি পরা একটি মেয়ের যদি হাত ভর্তি লাল চুড়ি থাকে তাহলে দেখতে অন্য রকম লাগে।বুড়ো কাশতে কাশতে ডাকস,ও মতির মা।: কিছু: এই পুলার তো জবান বন্ধ। তারে ঘরে আইল্যা তো দেহি আগ্রক বিপদেপড়লামঃ ফালাইয়া দিয়া আহ।: হুসার গায়ে ঘুর আছে কি-না দেহ দেহি।মতির মা টুকুর গায়ে হাত না দিয়েই বসস, জ্বর নাই: আর একটা দিন দেখি তারপরে যেখান থাইক্যা আনছি হেইখানে ফাসাইয়াথুইয়া আসমু: যা ইচ্ছা কর।টুকু আগ্রহ করে চারদিক লক্ষ্য করছে। এটা নিশ্চয়ই বস্তির কোন-একটা ঘর। চৌকি-টৌকির কোন ব্যবহার নেই। ঘরের এ মাথা ও-মাথা পর্যন্ত চাটাই বিছানো যখন যার ইচ্ছা হচ্ছে এসে অদিতক্ষণ ঘুমিয়ে যাচ্ছে। রাঙা এবং যাওয়ার বাবস্থ বারান্দায়। বিরাট একটা হাড়িতে কি যেন রান্না হয়েছে। বাড়ির শোকমন নিজের নিজের ইচ্ছামত খেয়ে চলে যাচ্ছে এই পরিবারের লোক ক’জন টুকু ধরতে চেষ্টা করল। পারল না মনে হচ্ছে অনেকগুণি মানুষ। এতগুলি মানুষের মেয়েতে দুমুরর জায়গা হয় কি করে কে জানে? এর মধ্যে একটি মেয়ের মনে হয় নতুন বিয়ে হয়েছে। সবাই তাকে নয়া বৌ নয়া বৌ বলছে মেয়েটা বেশ সেজেগুজে আছে।বিকেলের দিকে টুকু উঠে বসল। ঘোর বর্ষা স্বাকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছে। এই ঘরে এক ফোঁটা বৃষ্টির পানি পড়ছে না-এই স্নানন্দেই বাড়ির মানুষগুলি উদ্রসিড। আধবুড়ো একটা লোক বারবার বলছে-পলিথিনের কাগজ দিয়ে কেমুন মেরামও করলাম দেখছ? পচিশ টাকা খরচ হইছে কিন্তু মারাম হইছে কত টেকার? পর্তশহাজার টেকার আরাম। নয়া বৌ এই কথায় খিলখিল করে হাসন বুড়ো টুকুর দিকে তাকিয়ে বলল,শইসডা এখন কেমন লাগে?টুকু কিছু বলল না। ভাবলেশহীন মুখে তাকিয়ে রইস।: পেশাব-পায়খানা করবি নাকি? এই পুলা?টুকু তাকিয়ে রইল। চোখের পলক ফেলল না।বুড়ো দুঃখিত মুখে বলল, আহা জবানডা বন্ধ। ঐ পুসা থাক শুইয়া থাক।

পৃষ্ঠা:৩৭

টুকু সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে পড়ল। কে তাকে এখানে এনেছে তা জানতে ইচ্ছা করছে কিন্তু কাউকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা করছে না। কেউ তাকে কিছু বসছেও না। জবাননয়া বৌ-এর স্বামী শ্যামদী দিনেমা হলের গেট মানে। সে বাড়ি ফিরণ রাত বারটায়। টুকুকে দেখে বলব, হারামজাদা এখনো আছে?বুড়ো বলল, গাইলমন্দ করিস না। এই পূর্ণার জবান বন্ধ। গুংগা পুলা। লোকটি বাড়ি ঢুকেই শাড়ি টানিয়ে ঘরের কোণায় পর্দা ঘেরা একটা জায়গা তৈরি করে ফেলল। এই ঘরের ছোট ক’টা বাচ্চা ছাড়া সবাই প্রায় জেগে আছে। সে এই সব অগ্রাহ্য করে পর্না ঘেরা জায়গায় চলে গেলপর্নার ভেতরে একটা কৃগি জ্বলছে বলে এদের দু’জনের কালো ছবি পর্দায় পড়ছে। এরা কি করছে না করছে সব পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। বাড়ির অন্যান্যদের সঙ্গে টুকুও খুব আগ্রহ নিয়ে পর্দায় দিকে তাকিয়ে আছে সমস্ত ব্যাপারটা তার এত অদ্ভুত লাগছে।পুরো ব্যাপারটা অবশ্যি দেখা গেল না। বুড়ো বিরক্ত গলায় বলল, এ হারামন্দানা পুলা বাতি নিভা। তাড়াতাড়ি বাতি নিভা।বাতি নিতে ঘর অখবার হয়ে গেল। অপূর্ব ছায়াছবিঃ শেষটা দেখা গেল না বলে টুকুর মনটাই খারাপ হয়ে গেল। সারারাও বৃষ্টি হল। তুমুল বৃষ্টি ঘরের দরজা দিয়ে বৃঠির ছাট আসছে। তাতে কারো কোন অসুবিধা হচ্ছে না। টুকুর ঘুম আসছে না তার চমৎকার লাগছে মজার মজার সব চিন্তা মাথায় আসছে। সেই সব চিন্তার একটা হচ্ছে-এটা যেন বস্তির কোন ঘর না। এটা হচ্ছে সমুদ্রগামী জাহাজ। কড়ে এই জাহাজের কলকন্দ্রা নষ্ট হয়ে গেছে, জাহাজ ভেসে যাচ্ছে নিরুদ্দেশো পথে জাহাজের যাত্রীরা সবাই মরণাপন্ন কারণ জাহাজে খাদ্য নেই, পানি নেই। আহান্সের তপান্টতে একটা ফুটো হয়েছে সেই ফুটো দিয়ে কলকল করে পানি হাসছে, ফুটো বন্ধ করার চেষ্টা করেও লতে হয় নি। এখন সবাই হাস ছেড়ে দিয়ে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে।ভুগতে জাহাজ এগুস্কে।দুগতে টুকু সারা সত্যি এক ধ্যানের দুলুনি অনুভব করতে করতে এক সমহ তুমিরে পড়ল। ঘুম ভাঙল খুব ভোরে মাকাশ খানিকটা আলো হয়েছে। মেঘ নেই বৃষ্টি কেন্দ্রা টাটকা একটা নিন টুকু সাবধানে ঘুমন্ত মানুদদের ডিডিয়ে ঘর থেকে বেরুল। হাঁটা শুরু করল। একবারও পেছনে ফিরে তাকাল নাএকটা সময় আছে যখন আমাদের পেছন ফিরতে ইচ্ছা করে না।পর সাহেব বলেছিলেন টুকু সাতদিনের মাথায় ফিরে আসবে। কিন্তু সত্যিই যে সাতদিনের মাথায় টুকু এসে উপস্থিত হবে এই বিশ্বাস হরণা ছিল না কাজেই তোর বেলা দরজা খুলে টুকুকে বারান্দায় বসে থাকতে দেখে সে বিষয়ে অভিভূত হয়ে গেছে। মনে মনে দু’বার বলস, এ ভেরি গ্রেট পীর সাহেব এ ভেরি গেট পার সাহেবমুখে সে অবশ্যি রাগ এবং বিরওিনা ভঙ্গি ফুটিয়ে বসস, টুকু নাকি? একি চেহারা হয়েছে। তুই তো দেখি কংকাল হয়ে গেছিস। স্কেপিটন। শরীরে তো হান্ডিও ছাড়া কিছু দেখছি না ছিলি কোথায়?টুকু জবাব দিল না। কথা না-বলা তার ঋলেস হয়ে গেছে।হারু বলল, বাসার সবাই একটা প্লেটে চিন্তার মধ্যে ছিল। আমি অবশ্যি চিন্তা করছিলাম না পার সাহেব চিন্তা করতে নিষেধ করেছিলেন কলতা বাজারের পার

পৃষ্ঠা:৩৮

তোকে একদিন নিয়ে যাব হেসী পাওয়ার সোকটার। আমার ধারণা শ’ খানেক জ্বীন তাঁর হাতে আছে। বেশিও হতে পারে।টুকুন্ডে ফিরতে দেখে বাসার কেউ কোন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করল না। মিনু একটি কথাও বললেননা।

সকালে খিচুড়ি নাশতা হল, সেই খিচুড়ির এক খালা টুকুর সামনে রেখে তিনি কঠিন গলায় বললেন-খা। খেয়ে আমাকে উদ্ধার কর। টুকুর সঙ্গে এই হল তাঁর প্রথমকথা। তিথি ভাইকে দেখল কিন্তু কিছু বলল না, হাসগ সেই হাসি চিন্তা দূর হবার হাসি। যা পরিকার বুঝিয়ে দেয় টুকু ফিরে আসায় সে খুশি হয়েছে।জালালুদ্দিন রাগা গলায় খানিকক্ষণ বকাঝকা করসেন। বকাঝকার ফাঁকে ফাঁকেউপদেশ দিসেন-বাড়ি পালান হচ্ছে একটা অসুখ। সব অসুখের চিকিৎসা মাছে কিন্তু বাড়ি পাসান অসুখ এবং ক্যানসার এই দু’এর কোন চিকিৎসা নেই। একবার যার বাড়ি পালান রোগ হয়েছে সে দু’দিন পরপর পালাবে এটা জানা কথা তিনি বেশিক্ষণ উপদেশ দিতে পারলেন না। তাঁর প্লেটের খিচুড়ি শেষ হয়ে গেছেশূন্য থালা সামনে নিয়ে কথা বলতে তাঁর ভাল লাগে না। তিনি নিছু গলায় বললেন, ও মিনু খিচুড়িটা তো অসাধারণ হয়েছে। আতপ চাল ছিল তাই না? আতপ চাল ছাড়া এইজিনিস হয় না আছে নাকি আরো?মিনু বসলেন- না।। এক হাতা নাও দেখি। মুখের ক্ষিধেটা যাচ্ছে না পেট অবশ্যি ভর্তি। তবু মুখের ক্ষিধের একটা ব্যাপার আছে।: বললাম তো নাই।৪ ও সাচ্ছা, ঠিক আছে না থাকলে কি আর করা। আজ দুপুরেও খিচুড়ি আলে কেমন হয়? আতপ চাল কি আরো আছে?: চুপ কর তো। খাওয়া, খাওয়া আর খাওয়া। খাওয়া ছাড়াও তো আয়া জিনিস আছে।সেই জিনিসটা কি?: চুপ করজালালুদ্দিন চুপ করতে পারসেন না টুকুকে সাবার উপদেশ দিতে শুরু করসেন- বুঝলি টুকু, ঘর হচ্ছে মানুষের মা। শিশু থাকে মায়ের পেটের ভেতর। আামরা থাকি ঘরের পেটের ভেতর। সেই জন্যে ঘর হচ্ছে আমাদের মা। ঘর থেকে পালান মা’কে অপমান করা এই কাজ খবর্দার করবি না মায়ের পেট থেকে যে বের হয়ে যায় সে আর মায়ের পেটে ঢুকতে পারে না তেমনি ঘর থেকে যে বের হয়ে যায় সে মার ঘরে ঢুকতে পারে না। বুঝলি?টুকু মাথা নাড়ল। যেন সে এই জটিল ফিলসফি বুঝে ফেলেছে। তার মাথা নাড়া জালালুদ্দিন দেখতে পেলেন না তবে টুকু যখন নিয়ের থালার খিচুড়ি বাবার থালায় ঢেলে দিল তখন আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন চিকন গলায় বললেন, তুই খাবি না?: না কেন? জিনিসটা তো ভাল হয়েছে।: ক্ষিধে নেই।:এইটুকু খিচূড়ি খেতে ক্ষিধে লাগে নাকি? এ তো দেখি পাগলের প্রলাপ ও মিনু, একটা শুকনা মরিচ পুড়িয়ে এনে দাও তো।

পৃষ্ঠা:৩৯

টুকু বসে বসে বাবার খাওয়া দেখল। তার বড় ভাল লাগল। দুপুরে গেল বন্দপু ভাইয়ের খোঁজে।? টুকু সহজ গলায় বলল,ছিলি বড়পু তাকে দেখে আঁৎকে উঠে বলল, কি সর্বনাশ ভোর একি অবস্থা! বোদয়ে: এক জায়গায় বেড়াতে গিয়েছিলাম।: বেড়াতে যাবি, বলে যাবি না? তোর বড় তাইকে একদিন জিজ্ঞেস করলাম- টুকু কোথায়? সে বলল, আমিকি করে বলব কোথায়? আমি কি ডিটেকটিভ। কি কথার কি উত্তর। তা তোর স্বাস্থোর এই অবস্থা কেন?: জ্বর হয়েছিল।: কাজের সময় দূরত্বারি বাঁধিয়ে দিস, আশ্চর্য। তোর জন্যে শ্রাবণ সংখ্যা দেয়াল পত্রিকা বের হল না। শিল্প-সাহিতা এইসব তো ছেলেখেলা না। একদিন করবি দশদিন করবি না তা তো হবে না কমিটমেন্ট দরকার।দুপুর থেকেই টুকু কাজে লেগে গেল। এবারে শ্রাবণ সংখ্যা দেয়াল পত্রিকা নতুন আঙ্গিকে বেরুচ্ছে। পুরো দেয়াল পত্রিকা পলিথিনের কাগজে মুড়ে বৃষ্টির মধ্যে চোখে দেয়া হবে। শ্রাবণ সংখ্যা পড়তে হলে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে পড়তে হবে। এই অসাধারণআইডিয়া বজলুর মাখাতে এসেছে এরকম আইডিয়া তার প্রায়ই আসে।সন্ধ্যা না মেলান পর্যন্ত টুকু দেয়াল পত্রিকার কাজ করল। সন্ধ্যা মেলাবার পরপর কাউকে কিছু না বলে চলে গেল বস্তির ঐ ঘরে।বুড়ো লোকটি বারান্দায় বসে’ কাঠের চেয়ারে বেডের কাজ করছিল সে টুকুকে দেখে গলা ফাটিয়ে চোঁতে লাগল-ও মতির মা, ও মতির মা। ঐ পুলা আবার আসছে জবান বন্ধ পুলা ঐ হারামজাদা তুই কৈ গেছিলি? আমরা চিন্তায় চিন্তায় স্বস্থির। ঐ পুলা দেহি এদিকে আয়।শুধু মতির মা না, ঘরের সবাই বের হয়ে এল। টুকু এমনভাবে তাকাচ্ছে যেন সে কিছুই বুঝতে পারছে না।মতির মা বলল, নয়া বৌ এই পুলাডার খাওন দাও। এ নাখাইয়া সারাদিন কই কই যেন ঘুরছে।নতুন বৌ তৎক্ষণাত ভাত বেড়ে ফেলল। তাত এবং ডাঁটা দিয়ে রান্না করা ছোট মাছের তরকারি। তরকারিতে এমন ঝাল দেয়া হয়েছে যে মুখে দিসেই চোখে পানি এসে যায়। টুকু সেই আগুন ঝাল তরকারি তৃপ্তি করে খেল। ঘুমে তার চোখ জড়িয়ে আসছে। তার ঘুমের জন্যে জায়গাও করে দেয়া হয়েছে: তবে সে ঘুমুচ্ছে না, অনেক কষ্টে জেগে আছে। তার এখানে আসার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে-শুড়ি দিয়ে ঘেরা অংশে নতুন বৌ এবং তার স্বামীর অভিনীত অংশটা দেখা টুকু মনে মনে আশা করছে আজো যেন কুপী নিভাতে ওরা ভুলে যায়।হীরক বলল, মনটা খুবই ব্যাড হয়ে আছে।এ্যানা হেসে ফেলল।হীরু রাগী গলায় বলল, হাসলে কেন।: আপনি বললেন মনটা খুব ব্যাড হয়ে আছে-এই শুনে হাসলাম। বললেই হয় মনটা খারাপ হয়ে আছে।হীরু গড়ীর হয়ে গেল। এই মেয়ে ইদানিং উল্টাপাল্টা কথা বসে তাকে কষ্ট দিচ্ছে। অবশ্যি এটাই মেয়েদের নেচার। কোন না কোন ভাবে মানুষকে কষ্ট দেয়া।

পৃষ্ঠা:৪০

ওরা দু’জনে বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছে। দু’জনের দেখা হয়ে গেছে কাকতালীয়ভাবে। হীরু যাচ্ছিল পীর সাহেবের কাছে। বাস স্টপে এসে দেখে-এ্যানা। চা- পাঁচদিন চেষ্টা করেও তার সঙ্গে দেখা করতে পারে নি। পরশু দিন তো প্রায় গোটা দিন এ্যানাদের বাসার সামনে হাঁটাহাঁটি করে কাটাল। লাভ হল না। আর আজ কি-না দেখা হয়ে গেল বাস স্টপে। একি যোগাযোগ। সে মধুর স্বরেবগল, যাচ্ছ কোথায় এ্যানা?: যাত্রাবাড়িতে। আমার ছোট চাচার বাড়িতে।: যাত্রাবাড়িতে যাচ্ছ? বল কি। আমিও তো ঐ দিকে যাচ্ছি।আমার এক ফ্রেন্ডের বাসা। ক্লোজ ফ্রেন্ড। জন্ডিস হয়ে পড়ে আছে। খবর পাঠিয়েছে যাবার জন্যে। মেইন রোডে বাসা।এ্যানা হেসে ফেলল।হীরু বলল, হাসলে কেন?: আপনি যে সারাক্ষণ মিথ্যা কথা বলেন এই জন্যে হাসলাম।: কি মিথ্যা বললাম।: যাত্রাবাড়িতে বন্ধুর কাছে যাওয়ার ব্যাপারটা পুরো মিথ্যা আমি যদি বলতাম, আমি বাসাবো যাচ্ছি, তাহলে আপনি বসতেন আপনিও বাসাবো যাবেন বন্ধু আছে বাসাবোতে। তার জন্ডিস। এখন-তখন অবস্থা।আপনার একহীরু এ্যানার বুদ্ধি দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল। একটু মন খারাপও হল। এরকম একটা বুদ্ধিমতী মেয়েকে বিয়ে করে শেষে বেবন্ যন্ত্রণা হয় কে জানে। বিয়ে না করেও তো উপায় নেই। প্রেম যখন হয়ে গেছে।বাসগুলিতে অসম্ভব ভিড়পরপর দুটা বাস মিস হল-চেষ্টা করেও তারা উঠতে পারল না। হারদর খুব ইচ্ছা একটা রিকশা নিয়ে দু’জনে চলে যায়। গল্প করতে করতে যাওয়া যাবে। তার উপর আছে এ্যানার গা ঘেঁষে বসার আনন্দ। সমস্যা হচ্ছে তার কাছে আছে মাত্র দশটা টাকা। সত্তর টাকা ছিল। পীর সাহেবের জন্যে এক প্যাকেট বেনসন কিনতে গিয়ে ষাট টাকা বের হয়ে গেল। অবশ্যি কোন-একটা দোকানে বেনসনের প্যাকেট কেচে দেয়া যায়। চল্লিশ টাকা বললে ওরা লুফে নেবে।৪ এ‍্যানা।: চল একটা রিকশা নিয়ে নেই। এক দানে যাওয়া যাবে না। ভেঙে ভেঙে যেতে হবে। এখান থেকে নিউ মার্কেট। নিউ মার্কেট থেকে গুলিস্তান-তারপর গুলিস্তান থেকে যাত্রাবাড়ি।হীরুকে অবাক করে দিয়ে এ্যানা বলস, রিকশা দিয়ে নিন।: সত্যি বলছ? টুষ?: ই, সত্যি।রিকশা নেবার আগে হীরু বেনসনের প্যাকেট বিক্রি করস পঁয়তাল্লিশ টাকায়। তার মনে একটু খচখচানি লেগে রইল-পীর সাহেবের জন্যে কেনা জিনিস বিক্রি করা ঠিক হল না।রিকশায় উঠে সেই খচখচানি দূর হয়ে গেল। এত ভাল লাগস এ্যানাকে পাশে নিয়ে বসতে। এ্যানা একটা হাত রেখেছে হীরর ডান পায়ের উপরে। একটা মেয়ে তার

পৃষ্ঠা ৪১ থেকে  ৬০

পৃষ্ঠা:৪১

হাত রেখেছে হীরুর হাঁটুতে এতেই এত আনন্দ হচ্ছে কেন? হীরুর চোখে পানি এসে যাচ্ছে। হীরু বলস, মনটা খুব খারাপ এ্যানা। খুবই খারাপ।: কেনা টুকুকে পাওয়া যাচ্ছে না।: টুকু আবার কে?: আমার ইয়ংগার ব্রাদার।সে তো অনেক আগেই গেছে।এসেছিল। সকালে এসে সারাদিন থাকল সন্ধ্যাবেলা আবার গন।: কোথায় গেছে?: জানি না কোথায়। পীর সাহেবের কাছে যাব। দেখি উনি কি বলেন।: কিছু-একটা হলেই আপনি পীর সাহেবের কাছে চলে যান, তাই না?: সাংঘাতিক পাওয়ার উনার। তোমাকে একদিন নিয়ে যাব।: পীর সাহেবের কাছে যাবার আমার কোন শখ নেই। পীর আবার কি? শুধু টাকা নেওয়ার ফন্দি।তওবা কর এ্যানা, এক্ষুণি তওবা কর। ইমমিডিয়েট।: চুপ করুন তো। আমি তওবা-টওবা করতে পারব না।: তওবা না করলে আমি কিন্তু নেমে যাব।এ্যানা বলল, নেমে যান। আপনাকে কে আটকাচ্ছে? আমি কি দড়ি দিয়ে আপনাকে বেঁধে রেখেছি।হীরুর রাগ উঠে যাচ্ছে। রাগটা কনট্রোল করার জন্যে সে সিগারেট ধরাল। এ্যানা- বলল, সিগারেট ফেলুন তো। চোখে ছাই পড়ছে।: ছাই পড়লে অসুবিধা কি? চোখ কি ক্ষয়ে যাচ্ছে নাকি?। হ্যাঁ, ক্ষয়ে যাচ্ছে: তুমি বড় যন্ত্রণা করছ এ্যানা।।আপনি নিজেই যন্ত্রণা করছেন ফেলুন সিগারেটমেয়েছেলের কথায় ফস করে সিগারেট ফেলে দেয়া খুবই অপমানের ব্যাপার। তবুইরু সিগারেট ফেলে দিল। দুনিয়াটাই এরকম যে মেয়েছেলের মন রক্ষা করে চলতে হয়।এ্যানা বলস, নামার কথা বসে আবার দেখি বসে আছেন আপনার লজ্জা নেই?: এইসব করলে কিন্তু সত্যি সত্যি নেমে যাব। বেশ তো নেমে যান। এই রিকশা থাম তো উনি নামবেন।: রিকশা থামল। হীরু দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। বোঝা যাচ্ছে এই মেয়ে তাকে যন্ত্রণা দেবে। একে বিয়ে করলে জীবনটা ভাজা ভাজা হয়ে যাবে। কিন্তু বিয়ে না করেই বা উপায় কি? প্রেম বলে কথা। প্রেম না থাকসেএতক্ষণে একটা চড় দিয়ে সে নেমে পড়ত। প্রেমের কারণে চড়টা দেয়া যাচ্ছে না।এ্যানা বলল, কই নামলেন না?: মেয়েছেলে একা একা যাবে এই জন্যে বসে আছি।ঃ একা একা যাওয়া আমার অভ্যাস আছে। আপনি নেমে যান। নেমে গেলেই ভাল।ভাল কেন?: আপনাকে আমার অসহ্য লাগছে।

পৃষ্ঠা:৪২

: অসহ্য লাগার এমন কি করলাম। সিগারেট ফেলতে বলেছ। ফেলে দিয়েছি। মামলা ডিসমিস।ঃ বেশ খাবি খালি কথা বাড়াচ্ছেন। এত বককে কান্ন শিখসেন এর কাছে? আপনার পীর সাহেবের কাছে?এর পরে আর বসে থাকা যায় না।হীরু নেমে গেল।তার মনে ক্ষীণ আশা, রিকশা থেকে নামা মাত্র এ্য্যানা তার ভুল বুঝতে পারবে এবং মধুর গলায় বলবে, উঠে আসুন হীরু ভাই। হীরু অবশ্যি সঙ্গে সঙ্গে উঠবে না। এতে মান থাকে না। এ্যানা তখন বলবে, না হয় একটা ভুল করেছি তাই বলে আপনি এমন করবেন? তখন হীরু উঠবে। কারণ মেয়েছেলের উপর বেশিক্ষণ রাগ করে থাকা ঠিক না। মেয়েছেলের কাজই হচ্ছে ভুল করা। তারা ভূস করবেই। বিবি হাওয়া তাদের পথ দেখিয়ে গেছে।আশ্চর্যের ব্যাপার- এ্যানা কিছুই বলল না। রিকশা ফরফর করে এগিয়ে চলল। রাগে হীরুর ব্রহ্মতালু জ্বলে গেল। সে মনে মনে তিনবার বলল- হারামজাদী, হারামজাদী, হারামজাদী। রাগ এতে পড়ে গেল তিন সংখ্যার এই গুণ রাগ করে তিনবার কোন একটা কথা বললে রাগ পড়ে যায়, মন শান্ত হয়ে আসে।হীরুর মন এখন শান্ত। বেশ অনুশোচনাও হচ্ছে, রিকশা থেকে নেমে পড়াটা বিরাট বোকামি হয়েছে। ইংরেজীতে যাকে বলে গ্রেট মিসটেক। বেচারীর কাছে রিকশা ভাড়া আছে কি-না কে জানে। মনে হচ্ছে নেই। বেচারী রিকশা থেকে নেমে মনটা খারাপ করবে। রিকশাওয়ালার সঙ্গে খচাখচি করবে। আজকাল রিকশাওয়ালারা মেয়েছেলের সমান রেখে কথা বসে না। মেয়েছেলেদের সঙ্গে ইচ্ছে করে যেন আরো খারাপ ব্যবহার করে।হীরু একটা চায়ের স্টলে ঢুকে পড়ল সারাটা দিন কি করে কাটাবে তার একটা পরিকল্পনা করা উচিত। সন্ধ্যাবেলায় আরেকবার এগনার খোঁজে গেলে কেমন হয়? সঙ্গে একটা চিঠি নিয়ে যাবে। একটা মাত্র লাইন সেখানে লেখা থাকবে। এমন লাইন যে পড়া মাত্র মনটা উদাস হয়ে যায়। চোখ হয় ছলোছলো-এ রকম লাইন খুঁজে পাওয়া খুবই কষ্ট। চা খেতে খেতে এটা দিয়ে ভাবা যেতে পারে।আজ হীরুর ভাগ্যটাই খারাপ। কাপ থেকে চা ছলকে পড়ল পাঞ্জাবীতে। চায়ের এই দাগ সহজে উঠবে না। দুধ নিয়ে ধুয়ে দিতে পারলে হাতে উঠত। এখানে দুধ পাবে কোথায়? হীরু দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলস। এ রকম যে হবে সে জানত। পীর সাহেবের নামে কেনা সিগারেট সে বিক্রি করে দিয়েছে। কাজেই একের পর এক অঘটন ঘটবে। এ্যানা যে তাকে রিকশা থেকে নামিয়ে নিল এর কারণ তো আর কিছুই না-পীর সাহেবের বরদোয়া। এই জন্যেই পীর-ফকিরের সঙ্গে মেলামেশা কম করতে হ্যা, সব জিনিসের ভাল-মন্দ দুটা দিকই আছে। পীর-ফকিরের সঙ্গে খাতির থাকা যেমন ভাল আবার তেমনি মন্দ। এখন মনে হচ্ছে মন্দটাই বেশি।হীরু উদাস ভঙ্গিতে দ্বিতীয় কাপ চায়ের অর্ডার দিল।জালালুদ্দিন বললেন, কে?তিনি বারান্দায় বসে আছেন। সকাল ন’টার মত বাজে বাড়িতে তিনি ছাড়া দ্বিতীয় ব্যক্তি নেই। মিনু গেছেন বাজারে। তিনি কোথায় গেছে তিনি জানেন না। যাবার আগে

পৃষ্ঠা:৪৩

তাঁকে বলে যায় নি। হীরু গত রাতে বাড়ি ফিরে নি। টুকু অবশ্যি রাতে বাড়িতেই ছিল। ভোরবেলা কোথায় বেরিয়ে গেছে। এই চেলে বড় গৃন্ত্রণা করছে। কখন আসছে কখন যাচ্ছে কোন ঠিক নেই। শক্ত মারার করতে পারেন না-এই একটা সমস্যা। অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে মনে হয় মারের দায়িত্বটা তাকেই নিতে হবে। ইচ্ছার বিরুদ্ধেই নিতে হবে। টুকু থাকলে সুবিধা হত। এই যে লোকটা এতক্ষণ এসেছে। কথাবার্তা বলছে না-নাঁড়িয়ে আছে, তার ব্যাপারটা কি তা টুকু চট করে ধরে ফেলত। লোকটা কোন বদ মতলবে এসেছে কি-না কে জানে।জালালুদ্দিন আবার বললেন, কে?লোকটি এইবার কথা বসল। তার গলার স্বর নরম এবং সে ইতস্তত ভঙ্গিতে কথা বলছে। কাজেই লোকটা সম্ভবত খারাপ না। খারাপ লোক এইভাবে কথা বলে না। : আমার নাম দবির। আমার ছোটখাট ব্যবসা আছে। আপনি আমাকে চিনবেন না। আপনার সঙ্গে আগে আমার দেখা হয় নি।  ৪ দেখা হলেও চিনতাম না। আমি চোখে দেখি না। : তাই নাকি? জালালুদ্দিন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেসে বললেন, বিরাট যন্ত্রণায় আছি ভাই। আপনি বাইরের মানুষ। ভেতরের কথা আপনাকে কি বসব। সামান্য চিকিৎসা করালেই অসুখ সারে। সেটা কেউ করাবে না। আপুনি কার কাছে এসেছেন? দবির ইতস্তত করে বলসেন, পরী কিংবা তিথি বলে কেউ কি এখানে থাকেন। : পরী বলে কেউ থাকে না। তবে তিথি আছে। আমার দ্বিতীয়া কন্যা। ভাল নাম ইশরাত জাহান। ও কোথায় যেন গেছে।: কোথায় গেছে জানেন?ঃ জ্বি না আমাকে কিছু বলে যায় নি। আগে বলত এখন আর বলে-টলে না। সম্ভবত ওর মা’কে বলে গেছে। বসুন, ওর মা এসে পড়বে। ওর মা কাঁচার বাজারে গেছে। ঘরে কাজের লোক নেই। নিজেদেরই সব করতে হয়। ঐখানে একটা জলচৌকি আছে। টেনে নিয়ে বসুন। ঘরের ভেতর চেয়ার আছে, ঘরে তালা দিয়ে গেছে- এই জন্যে চেয়ার দিতে পারছি না। নিজগুণে ক্ষমা করবেন।দবির বললেন, আমি বসব না। কাজ ফেলে এসেছি। আপনি দয়া করে তিথিকে বলবেন, আমি এসেছিলাম। নাম বললেই হবে। আমার নাম দবির। তাকে একটু বলবেন যেন আমার বাসায় যায়। আমার স্ত্রীর কিছু কথা আছে তার সঙ্গে। জরুরী কথা।: বলব। অবশ্যই বলব। বাসার ঠিকানা কি তিথি জানে?: জ্বি জানে। তাছাড়া এই কার্ডটাও রেখে গেলাম। কার্ডে ঠিকানা লেখা আছে।: বলব। তিথি আসলেই বলব। তা এসেছেন যখন খানিকক্ষণ বসেই যান। আমার স্ত্রী এনে পড়বেন। তখন চা খেতে পারবেন। কষ্ট করে এসেছেন শুধু মুখে যাবেন এটা কেমন কথা।: থ্রি-না। আজ আর বসব না।জালালুদ্দিন খানিকক্ষণ দ্বিধাগ্রস্ত থেকে বললেন, ভাইসাব আপনার কাছে সিগারেট আছে? প্যাকেটটা রয়েছে ভেতরে। আমার স্ত্রী ঘরে তালা দিয়ে চলে গেলেন। চাবিটাওনেই। থাকলে আপনাকে বলতাম না।দবির বললেন, সিগারেট তো আমি খাই না তবে এনে দিচ্ছি।: তাহলে দরকার নেই। বাদ দেন। সঙ্গে থাকলে ভিন্ন কথা।

পৃষ্ঠা:৪৪

: কোন অসুবিধা নেই।জালালুদ্দিন, এই অপরিচিত লোকটির ভদ্রতায় মুগ্ধ হয়ে গেলেন। লোকটা এক প্যাকেট ফাইন্ড ফাইত ২৫ একটা নিয়াশলাই কিনে নিয়ে গেছে শুধু তাই না একটা সিগারেট ধরিয়ে দিয়ে গেছে। এরকম একজন বিশিষ্ট ভরলোডের সঙ্গে তাঁর মেয়ের পরিচয় আছে-ভাবতেই ভাল লাগছে। এমন চমৎকার একজন মানুষকে চা খাওয়ান গেল না। এই দুঃখে তিনি খুবই কাতর হয়ে পড়লেন পরের বার এলে চা এবং চায়ের সঙ্গে দু’টা মিষ্টি দিতে হবে। এইটুকু ভদ্রতা না করলে খুবই অন্যায় হবে।মিনু চলে এসেছেন। তাঁর পায়ের শব্দ কানে যেতেই জালালুদ্দিন সিগারেটের প্যাকেট লুকিয়ে ফেললেন। মেয়েদের মন থাকে সন্দেহে ভরা। হাজারটা প্রশ্ন করবে। কি দরকার। তিনি উৎসাহের সঙ্গে বলদেন, বাজার কি আনলে মিনু।মিনু জবাব দিবেন না। স্বামীর প্রশ্নের জবাব দেয়া তিনি ইদানিং ছেড়েই দিয়েছেন।মাহ-টাহ কিছু পাওয়া গেল?: মিনু সেই প্রশ্নেরও উত্তর দিগেন না। বাজার নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে গেলেন। জালালুদ্দিন তাতে মন খারাপ করবেন না। খানিকক্ষণ অপেক্ষা করে বললেন, এক ফোঁটা চা দিও তো মিনু। বুকে কফ বসে গেছে। চা কফের জন্যে খুবই উপকারী।আমার কথা না। বড় বড় ডাক্তাররা বলেন।মিনু এই কথায় ঝাঁঝিয়ে উঠলেন না। এটা খুবই ভাল লক্ষণ। হয়ত চা পাওয়া যাবে। চা এলে চায়ের সঙ্গে একটা সিগারেট ধরাতে হবে। সব জিনিসের একটা অনুপান আছে। চায়ের অনুপান হচ্ছে সিগারেট। দৈ-এর অনুপান মিষ্টি।তিমির অবাক হবার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেছে।বিছুতেই সে এখন আর অবাক হয় না। ইরুরু যদি তাকে কোনদিন এসে বলে, দেখ তিথি আমি এখন আকাশে উড়তে পারি। এবং সত্যি সত্যি যদি খানিকক্ষণ উড়েদেখায়, তাহলেও বোধ হয় তিথি অবাক হবে না।অথচ দবির উদ্দিনের রেখে-যাওয়া কার্ড দেখে সে অবাক হল এই লোক তারঠিকানা পেল কোথায়? সে তো কোন ঠিকানা রেখে আসে নি তার ঠিকানা জানার কথা নয়। দবির উদ্দিনের স্ত্রী তার সঙ্গে কথা বলতে চান, এই খবরটিও অবাক হবার মত। তবে তাতে তিথি অবাক হল না। ভদ্রমহিলা অসুস্থ, তাঁর নিশ্চয়ই সমায় কাটে না। গল্পগুজব করবার জন্যে তাঁর কিছু মজার চরিত্র দরকার তিথির মত মজার চরিত্র তিনিআর কোথায় পাবেন।ঐ বাড়িতে তিথির যেতে ইচ্ছা করছে না তবু সে হয়ত যাবে। দবির উদ্দিন নামের ঐ লোক তার ঠিকানা কোথায় পেল এটা জানার জন্যেই তাকে যেতে হবে। আর যেতে যখন হবে তখন আজ গেলে কেমন হয়?তিথি কাপড় বদলাল।হালকা রঙের একটা শাড়ি পরল। চুলে বেণী রূপ। আয়নার দিকে তাকিয়ে ভাবল একটু কাজল কি দেবে? চোখের পল্লব ঘোঁদে হালকা রেখা-যা চোখে পড়বে না আবার পড়বেঃ।মিনু ঘরে ঢুকে দেখলেন তিথি খুব সাবধানে চোখে কাজল দিচ্ছে। তিনি থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন। তিথিবলল, তুমি কিছু বলবে?: না।: তাহলে দাঁড়িয়ে আছ কেন? চলে যাও।

পৃষ্ঠা:৪৫

মিনু ক্ষীণ স্বরে বললেন, তুই কি আমাকে দেখতে পারিস না তিথিঃ তিথি মা’র দিকে না তাকিয়ে বলল, না। পারি না।: আামি কি করেছি? আমার দোষটা কি?

: তোমাকে কি আমি কোন দোষ দিয়েছি? দোষ ছাড়াই তোমাকে দেখতে পারি ना।মিনু খানিকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আগের .েয়েও ক্ষীণ গলায় বললেন, অরু চিঠি দিয়েছে।তিথি কিছু বলল না।মিনু বললেন, তোর টেবিলের উপর রেখেছি।: আমার টেবিলের উপর রেখেছ কেন? আমি ঐ সব চিঠি-ফিঠি পড়ব না। ভাল্লাগে না।মিনু চলে গেলেন। তিথি অবশ্যি ঘর থেকে বেরুবার আগে বোনের চিঠি পড়ল। একবার না দু’বার পড়ল। খুবই সংক্ষিপ্ত চিঠি। মা’র কাছে বেখা।মা,আমার সালাম নিও আমি বুঝতে পারছি তোমরা ওর টাকাটা নিতে পারছ না কিংবা দিচ্ছ না। আমি ঐ নিয়ে আর কিছু বলব না। কিন্তু মা তোমার পায়ে পড়ি আমাকে কিছুদিন তোমাদের কাছে এনে রাখ। এখানে আমি মরে যাচ্ছি। হীরুকে পাঠাও মা, আমাকে নিয়ে যাক।তোমার অরু।এত সংক্ষিপ্ত চিঠি অরু কখনো লেখে না। তার চিঠি হয় দীর্ঘ। চিঠির শেষের দিকে এসে বাবার বাড়ির সবার সম্পর্কে কিছু না কিছু লেখা থাকে। এই চিঠিতে সে সব কিছুই নেই। তিথি ভাবতে চেষ্টা করব-বড় আপ’ কি ধরনের কষ্টে আছে। কষ্টের নমুনাটা কি? বড় আপার কষ্টের সঙ্গে তার নিজের কষ্টের কি কোন মিল আছে? সম্ভবত নেই। সে যে জাতীয় যাতনা বোধ করছে বড় মাপার সে সম্পর্কে কোন ধারণা নেই, ধারণা থাকার কথাও না। তার বয়স তখন কত? পনের না কি সোন? এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে, তখনো রেজাল্ট হয় নি-বাবা তাকে পাঠালেন মনজুর সাহেবের কাছে। বাবার দূর-সম্পর্কের ভাই। তিথি তাঁকে কখনো দেখে নি। ভদ্রলোকের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। এ জি অফিসে কাজ করেন। থাকেন সরকারী কোয়ার্টারে তাঁকে একটা চিঠি দিতে হবে। চিঠিটা বাবার জবানীতে লিখেছে তিথি। চিঠির বিষয়বস্তু খুবই সাধারণ-জালালুদ্দিন সাহেব তাঁর ফুপাতো ভাইকে জানাচ্ছেন যে তিনি সাময়িকভাবে খুবই অসুবিধায় পড়েছেন। যদি দু’শ টাকা তাকে দেয়া হয় তাহলে তিনি চির কৃতজ্ঞ থাকবেন। টাকাটা তিনি সামনের মাসে যে করেই হোক ফেরত দেবার ব্যবস্থা করবেন।তিনি নিজেই আসতেন- ইদানিং চোখের একটা সমস্যার জন্যে আদতে পারছেন না। চিঠি নিয়ে যাবার কথা হীরুর। সে গম্ভীর গলায় বলল, এটা তো ভিক্ষা চাওয়া চিঠি। যাকে বলে ‘বেগিং’। আমি বেগিং বিসনেসে থাকতে পারব না। জালালুদ্দিন কিছুতেই তাকে রাজি করাতে পারলেন না। শেষটায় মেয়েকে ফলসেন, তুই যাবি তিথি। গভমেন্ট কোয়াটার। খুঁজে বের করতে কোনই অনুবিধা হবে না। পারবি মা? তিথি বলল, উনি যদি চিনতে না পারেন?: বলিস কি তুই? চিনতে পারবে না মানে। পরিচয় পেলে দেখবি কত খাতির-যত্নকরে।: টাকা যদি না দেন তাহলে তো বাবা খুব লন্দার ব্যাপার হবে।

পৃষ্ঠা:৪৬

। তোর কিসের লজ্জা? তুই তো আর টাকা চাস নি। আমি চেয়েছি। লজ্জা হলে আমার হবে।: আমার কেন আনি মনে হয়ে উনি খুব খারাপ ব্যবহার করবেন। বিরক্ত হবেন। : আহা গিয়ে দেখ না। বিশিষ্ট ভদ্রলোক।: যদি চিনতে না পারেন?মনজুর সাহেব তাকে চিনতে পারলেন। হাসিমুখে বললেন, তোমাকে খুব ছোটবেলায় দেখেছি। তোমার মনে নেই। তবে তোমার বড় বোনের নিশ্চয়ই মনে আছে। কি নাম যেন তার? অরুনিমা না।: জ্বি। ডাকনাম অরু।। তোমার বাবার তো আবার খুব কাব্যিক নাম রাখার বাতিক। তোমার নাম কি?: তিথি।: বাহ্ খুব সুন্দর নাম। তিনি খুটিয়ে খুঁটিয়ে অনেক প্রশ্ন করলেন। তিথিদের অবস্থা শুনে খুবই দুঃখিত হলেন এবং আন্তরিক ভঙ্গিতে বললেন, এই সাময়িক সাহায্যে তো কিছু হবে না। স্থায়ী কিছু করতে হবে। কিভাবে করা যায় সেটা হচ্ছে কথা। তোমার ভাইকে পাঠিয়ে দিও। আমার কিছু জানাশোনা আছে দেখি কোথাও লাগিয়ে দেয়া যায় কি-না। তিথির মনে যে চাপা উদ্বেগ ছিল তা দূর হয়ে গেল। বাবার এই ফুফাতো ভাইকে তার পছন্দ হল। ছোটখাট মানুষ। সারাক্ষণ পান খাচ্ছেন। একটু পরপর পানের রস গড়িয়ে পড়ছে। সরুণদ্যা টানার মত সেই রস টেনে নিচ্ছেন। মাথায় এক গাছিও চুস নেই। চকচকে টাক। কিছুক্ষণ পরপর টাকে হাত বুলাচ্ছেন। তখন তাঁর মুখের ভঙ্গি দেখে মনে হয় টাকে হাত বুলিয়ে তিনি খুব আরাম পাচ্ছেন। তিথি খানিক গল্পগুজবও করল। সহজ স্বরে বলস, নাসায় আর কেউ নেই কেন। চাচী কোথায়?ও ও থাকে গফরগায়ে। ছেলেমেয়েরা ঐখানেই স্কুল-কলেজে পড়ে। ঢাকার এত খরচ চালান কি সোজা ব্যাপার। সরকারী বাসা পাওয়ায় রক্ষা হয়েছে। অর্ধেক সাব- লেট করে দিয়েছি। আমি দু’টা ঘর নিয়ে থাকি।: একা একা খারাপ লাগে না আপনার?ঃ না। সপ্তাহে সপ্তাহে যাই। বৃহস্পতিবার দুপুরে চলে যাই শনিবার সকালে আসি।খানিকটা কষ্ট হয়। কি আর করা বল।: খাওয়া-দাওয়া কোথায় করেন।: বেশির ভাগ সময় নিজেই রাঁধি। বাইরেও খাই।তিনি তিথিকে সুজির হালুয়া রেঁধে খাওয়ালেন। দু’শ টাকা দিয়ে নিজে এসে একটা রিকশা ঠিক করে রিকশা ভাড়াও দিয়ে দিলেন তিথিকে বললেন, একা একা ঢাকা শহরে ঘুরাফিরা করা ঠিক না। তোমার বাবাকে বলবে আর যেন তোমাকে এভাবে না পাঠান।তিথিকে পরের মাসে আবার আসতে হল। এবারের আবেদন একশ’ টাকার। যে করেই হোক দিতে হবে।মনজুর সাহেব টাকা দিয়ে দিলেন এবং সেদিনও সুজির হালুয়া রেঁধে খাওয়ালেন। তবে ঐ দিনের মত গড়গুজব হল না বা এগিয়ে এসে রিকশা ঠিক করে দিলেন না।তার পরের মানে তিথি আবার এল। সারাপথ কাঁদতে কাঁদতে আসল। টাকা চাইতে হবে এই দুঃখে তার মরে যেতে ইচ্ছা করছে। বাসে বসে তার মন চাইছিল একটা ট্রাকের সঙ্গে এই বাসটার অ্যাকসিডেন্ট হোক। সেই অ্যাকসিডেন্টে সে যেন মারা যায়। সে মরল না। এক সময় মনজুর সাহেবের বাসার কড়া নাড়ল। মনজুর

পৃষ্ঠা:৪৭

সাহেন দরজা খুলদেন তবে ডাকে দেখে খুব অবাক হলেন না। শুকনো গলায় বললেন, কি খবর? তিথি মাথা নিচু করে বলল, বাবা একটা চিঠি দিয়েছেন।: আবার চিঠি। এস ভেতরে এস. তিথি ভেতরে এসে বসল। মনজুর সাহেব বললেন, এইবার কত টাকা চেয়েছে?তিথির ধারণা ছিল এবারে তিনি টাকা দেবেন না। কিন্তু তার ধারণা ভুল প্রমাণিত হল। তিনি পঞ্চাশ টাকার দু’টা নোট তিথির হাতে দিলেন এবং বললেন, ঘেমে-টেমে কি হয়েছে ফ্যানের নিচে বস। বিশ্রাম কর।: জ্বি-না। তাড়াতাড়ি বাসায় যেতে হবে। টুকুর খুব জ্বর। ডাক্তার আনতে হবে। : দু’তিন মিনিট বসে গেলে ক্ষতি হবে না। তিনি হাত ধরে তিথিকে তার পাশে বসাসেন। পরমুহূর্তেই তিথিকে জড়িয়ে ধরলেন। তিথি ভয়ে কাঠ হয়ে গেল। কোনমতে বলল, ছাড়ুন চাচা। আমাকে ছেড়ে দিন। তিনি আহ্ বলে বিরক্তি প্রকাশ করলেন। তিথিকে ছাড়লেন না। তিনি চিৎকার করতে চেষ্টা করল গলা দিয়ে কোন শব্দ বের হল না। সিগারেটের গন্ধ ভরা, গান খাওয়া একটা মুখ তার মুখের উপর লেপ্টে রইল। দুটি হাত মাকড়সার মত তার সারা শরীরে বিলবিল করতে লাগল। এর পর কি কি ঘটল সে মনে করতে পারে না। শুধু যা মনে আছে তা হচ্ছে সে বেতের সোফায় চিৎ হয়ে পড়ে আছে। মনজুর সাহেব একটা বাটিতে সুজির হালুয়া বানিয়ে এনে তাকে বলছেন- এই তিথি, নাও হালুয়া খাও। এর পরেও অনেকবার তিথিকে তাঁর কাছে আসতে হয়েছে। প্রতিবারেই মনজুর সাহেব তাকে টাকা দিয়েছেন। এবং বলেছেন, দরকার হলেই আসবে। কোন অসুবিধা নেই। তিথি বড় আপার চিঠি টেবিলে রাখতে রাখতে মৃদু স্বরে বলল, তুমি তো সুখেই আছ আপা। কত সুখে আছ তুমি জান না। জানলে এ রকম চিঠি লিখতে না। এ হচ্ছে নিজের সঙ্গে বিড়বিড় করে কথা বলা। নিজের সঙ্গে কথা বলার এই অদ্ভুত অসুখ তিথির ইদানিং হয়েছে। মনে মনে ভাবা কথাগুলি সশব্দে বের হয়ে আসে। রিকশায় আসতে আসতে একবার এরকম হল। রিকশাওয়ালা ডিবির বিড়বিড় শুনে চমকে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। অবাক হয়ে বলল, কি কন আফা? এগুলি কি পাগল হবার লক্ষণ? এক সময় সে কি পাগল হয়ে যাবে। হয়ত হবে। কিংবা কে জানে এখনি হয়ত সে খানিকটা পাগল।বাড়ি থেকে বেরুবার মুখে হীরুর সঙ্গে দেখা। হীরু বলল, তিথি যাচ্ছিস কোথায়? তোর সঙ্গে আমার খুব জরুরী কথা আছে, তেরি আর্জেন্ট।ডিথি বলল, আমার কোন জরুরী কথা নেই। বিরক্ত করিস না তো।হীরু সঙ্গে সঙ্গে আসতে লাগল। তিথি বলল, কেন বিরক্ত করছিস?: তুই আমাকে স্ত্রী থাউজেন্ড টাকা জোগাড় করে দিতে পারবি?: না। : এর জন্যে তুই আমাকে তোর পা ধরতে বলিস আমি তোর পা ধরে বসে থাকব। টাকাটা আমার খুবই দরকার। : দরকার হলে চুরি কর, ছিনতাই কর। কানে দুল পরে মেয়েরা যায়। ঐ সব দুল টান দিয়ে ছিঁড়ে নিয়ে পালিয়ে যা।: তুই কি পাগল হয়ে গেলি তিথি? আমি ভদ্রলোকের ছেলে না।

পৃষ্ঠা:৪৮

: হ্যাঁ, ভদ্রলোকের ছেলে। তুইও ভদ্রলোকের ছেলে, আমিও ভদ্রলোকের মেয়ে। আমি টাকা কিভাবে আনি তুই জানিস? নাকি তোর জানা নেই?ইীরু চুপ করে গেল। তিথি বলল, আমি কিভাবে টাকা অনি সেটা কেউ যানে না, আবার সবাই জানে। মন্দার একটা খেলা। তুই আমার পেছনে পেছনে আসবি না। যদি আসিস তাহলে ধাক্কা দিয়ে নর্দমায় ফেলে দেব।হীরু দাঁড়িয়ে পড়ল। তিথিকে বিশ্বাস নেই-এই কাও সে সত্যি সত্যি করে বসতে পারে। একবার নর্দমায় পড়ে গেলে চৌদ্দবার গোসল করলেও গন্ধ উঠবে না। হীরুর মন খারাপ হয়ে গেল। তিথির কাছ থেকে সে টাকা পাবে না-এটা জানত। টাকা চাওয়ার উদ্দেশ্য ভিন্ন। হীরুর ধারণা ছিল টাকার কথা শুনেই তিথি বলবে- এত টাকা নিয়ে তুই কি করবি? তখন হীরু কারণটা ব্যাখ্যা করবে।

কারণটা বেশ অদ্ভুত। আব্জ হাঁটতে হাঁটতে সে পীর সাহেবের কাছে গিয়েছে। খালি হাতে গিয়েছে, এই জন্যে সে আর তাঁর সঙ্গে দেখা করল না। উঠোনে মাথা কামানো এক লোবের সঙ্গে গল্প জুড়ে দিল। মাথা কামানো লোকটির নাম সবুর। তার বাড়ি কালিয়াকৈর মাস তিনেক আগে বিয়ে করেছে। গত সপ্তাহে তার বৌ হঠাৎ পালিয়ে গেছে। অনেক জায়গায় খোঁজখবর করেও সে কোন সন্ধান না পেয়ে পীর সাহেবের কাছে এসেছে। পীর সাহেবের সঙ্গে এখনো দেখা হয় নি। হীরু বলল, ঠিক জায়গায় এসে পড়েছেন ভাইজান। মোটেই চিন্তা করবে না, এক মিনিটের মামলা। পীর সাহেব ফড়ফড় করে সব বলে দেবেন।: সত্যি?: সত্যি মানে? আমার নিজের ইয়ংগার ব্রাদার মিসিং হয়ে গেল। নাম তার টুকু। পীর সাহেবকে বললাম। উনি বললেন-চিন্তা করিস না। এক সপ্তাহের মধ্যে ফিরবে।: ফিরস এক সপ্তাহের মধ্যে?৪ ফিরবে না মানে? পীর সাহেবের সঙ্গে ইয়ার্কি চলে না। ডাইরেক্ট অ্যাকশান। আপনি খালি হাতে আসেন নি তো?: একশ’ টাকা এনেছি- গরীব মানুষ।: টাকা-পয়সা পীর সাহেব নিবেন না। টাকা-পয়সা উনার কাছে তেজপাতা। সিগারেট দিতে হবে, বিদেশীসিগারেট।: বিদেশী কি সিগারেট।: ধরেন ডানহিল, বেনসন। মোড়ের দোকানে গিয়ে বললেই হবে-পীর সাহেবের সিগ্রেট। ওরা জানে। বাজারের চেয়ে কম রেইটে পাবেন। যান সিগ্রেট নিয়ে আসেন পীর সাহেবকে কদমবুসি করে সিমেটের প্যাকেটটা বাম দিকে রাখবেনসবুর মিয়া সিগ্রেট আনতে গেল আর তখনি বাড়ির ভেতর থেকে পীর সাহেব খালি পায়ে বের হয়ে এলেন। বারান্দায় এবং উঠানে এতগুসি লোক বসা, কাউকে কিছু না বলে হীরুকে হাত ইশরা করে ডাকলেন। হতভম্ব হীরু ছুটে গেল। পীর সাহেব বললেন, তুই বিসমিল্লাহ বলে একটা ব্যবসা শুরু কর। ব্যবসায় তোর তরকি হবে। স্বয়ং নবী করিম ব্যবসা করতেন। হীরু কাঁপা গলায় বলল, কিসের ব্যবসা করব? পীর সাহেব গম্ভীর হয়ে বললেন, তোর ব্যবসা হবে গরম জিনিসের। একটা চায়ের দোকান দিয়ে দে। এই বলেই পীর সাহেব আবার ঘরে ঢুকে গেলেন। মার কি আশ্চর্য যোগাযোগ- তার পরদিনই সে কল্যাণপুরের বর্ণীর মোল্লার চায়ের দোকানে চা খেতে

পৃষ্ঠা:৪৯

গেছে, বশীর মোল্লা বলল, দোকান বেচে দিব হীরু ভাই। খদ্দের যদি পান একটু বলবেন।ইরু গটর হয়ে কান, চেনেন কেন? চাবু দোকান।। চালু কোথায় দেখলেন? দিনে পঞ্চাশ কাপ চা চেতে পারি না। বিশ-পচিশ কাপ পাড়ার ছেলেরা খায়। দাম চাইলে বলে খাতায় লিখে রাখেন।: দাম কত চান দোকানের?৪ দশ হাজার পাইলে রাখমু না।: দশ হাজার। দোকানে আপনার আছে কি? দুইটা কেভলী, পনের-বিশটা কাপ। হাজার তিনেক হলে আমাকে বলবেন ক্যাশ দিয়ে নিয়ে যাব। নো প্রবলেম।বশীর মোল্লা আর কিছু বলল না। চিন্তিত মুখে দাঁত খুঁচাতে লাগল। এই সবই হচ্ছে যোগাযোগ। এরকম যোগাযোগ আপনা-আপনি হয় না। উপরের নির্দেশ লাগে। পীর সাহেবের দোয়ায় অ্যাকশন শুরু হয়ে গেছে। এরা হচ্ছেন অণি মানুষ- এঁদের দোয়া কোরামিন ইনজেকশনের মত। সঙ্গে সঙ্গে অ্যাকশনহীরুর ইচ্ছা ছিল টাকা চাওয়ার উপলক্ষ্যে পুরো ঘটনাটা তিথিকে বসবে। তিথি সেই সুযোগ দিল না। পরে সাহেবের দোয়ার ফল তো সে একা ভোগ করবে না। সবাই মিলে ভোগ করবে। তার টাকা-পয়সা হলে সে কি ভাইবোন ফেলে দিবে? অবশ্যই না। ভাই-বোন, ফাদার-মাদার এরা থাকবে মাথার উপরে।ফরিদার চোখ দুটি আজ যেন আরো উজ্জ্বল আরো তীক্ষ্ণ। চুলার গনগনে কয়লার মত ঝকঝক করছে। তাঁর পরনের শাড়িটাও লাল। মাথার চুলগুলিও কেন জানি লালচে দেখাচ্ছে শুধু মুখের চামড়া আরো হলুদ হয়েছে এমন হলুদ যে মনে হয় হাত দিয়ে খুলে হাতে হলুদ রঙ লেগে যাবে। ফরিদা বললেন, বস তিমি। চেয়ার টেনে বস।তিথি বলস, আপনি আমাকে ডেকেছেন?ফরিদা চুপ করে রইসেন তবে খুব আগ্রহ নিয়ে তিথির দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তাঁর জ্বলজ্বলে চোখের মণিতে এক ধরনের কৌতুক। এক সময় হাসিমুখে বললেন, তুমি কি চোখে কাজল দিয়েছ না-কি?তিথি শান্ত স্বরে বসল, হ্যাঁ দিয়েছি। কেন, আমার মত মেয়ের কি চোখে কাজল দেয়া নিষেধ?ফরিনা তিথির প্রশ্নের প্রতি মোটেই গুরুত্ব দিবেন না। নিজের মনে বললেন, বিয়ের আগে আমারও চোখে কাজল দেয়ার শখ ছিল। খুব কাজল দিতাম। একদিন আমার মামা আমাকে বললেন, চোখে কাজল দেয়া ঠিক না। কাজল হচ্ছে কারবন। কারবনের সূদ্ধ কণা চোখের ক্ষতি করে। ঐ মামার কথা আমর খুব বিশ্বাস করতাম…তিথি ফরিদাকে থামিয়ে দিয়ে বলস, আপনি আমাকে কি জন্যে ডেকেছেন।ঃ গল্প করার জন্যে। কেন তুমি কি রাগ করছ? আমি পুষিয়ে দেব।: কিভাবে পুষিয়ে দেবেন? গল্পের শেষে টাকা দেবেন ঘন্টা হিসেবে?ফরিদা হেসে ফেললেন। যেন তিথি খুব মজার কিছু বসেছে। তিথি বিষ্মিত হল। ফরিদা কেন হেসে ফেলেছে তা বুঝতে না পেরে খানিকটা বিব্রতও বোধ ক্যাল।ফরিদা বললেন, ঐদিন তুমি আমার উপর খুব রাগ করেছ। তারপর থেকে আমার মনটা খারাপ ছিল। নিজের পরিচিত মানুষজন, আত্মীয়-স্বজন যদি রাগ করে আমার খারাপ লাগে না। তুমি বাইরের একটি মেয়ে। তুমি কেন আমার উপর রাগ করবে?

পৃষ্ঠা:৫০

: আপনি কি এটা বলার জন্যে ডেকেছেন? : হ্যাঁ। আমার আরেকটা উদ্দেশ্যও আছে। সেটা তোমাকে পরে বসছি। তার আগে তোমার জন্যে একটা ধাঁধা আছে। এখানে একটা ছবি আছে। এই ছবিতে তিনটি মেয়ে বসে আছে। এই তিনজনের একজন আমি। সেই একজন কে তুমি বের করে দেবে।:যদি বের করতে পারি তাহলে নিশ্চয়ই টাকা-পয়সা দেবেন?: তুমি চাইলে দেব কিন্তু তুমি আমার সঙ্গে এমন কঠিন ভাষায় কথা বলছ কেন? খানিকক্ষণ সহজভাবে আমার সঙ্গে কথা বল। অসুস্থ একজন মানুষের এই কথাটা রাখ।তিথি ছবিটা হাতে নিল। দেখেই মনে হচ্ছে তিন ফুল বান্ধবী কোন উপলক্ষ্যে প্রথম শাড়ি পরেছে। তিনজনই হাত ধরাধরি করে বসে আছে। পেছনে গোলাপ ঝাড়ে অনেক গোলাপ ফুটে আছে। ফটোগ্রাফার নিশ্চয়ই ভেবেচিন্তে এই কম্পোজিশন বের করেছেন।। দেরি করছ কেন? বল কোন্ মেয়েটি আমি?: বলতে পারছি না।মেয়েগুলি দেখতে কেমন?রূপবতী।: কি রকম রূপবর্তী সেটা বল।খুবই রূপবতী।এই তিনটি মেয়ের মধ্যে আর কোন মিল দেখতে পাচ্ছ?: না।খুব ভাল করে দেখ। আলোর কাছে নিয়ে দেখ।: আমি আর কোন মিল দেখতে পাচ্ছি না। তিনটি মেয়ের মুখ তিন রকমের।: আরেকটা মিস আছে। এই তিনজনের চিবুকের কাছে তিল আছে। ছবিতেও বোঝা যায় আমরা খুব বন্ধু ছিলাম। গলায় গঙ্গায় বন্ধু। ধর আমাদের মধ্যে একজনের অসুখ হয়েছে সে স্কুলে যায় নি। আমরা দু’জন স্কুলে গিয়ে যখন দেখতাম একজন আসেনি তখন আমরাও স্কুল ফেলে বাসায় চলে আসতাম।: আপনাদের চিবুকে তিল ছিল বলেই আপনাদের এত বন্ধুত্ব ছিল?: শুধু তিল না আরো অনেক মিল ছিল আমাদের মধ্যে। আমরা তিনজনই বেশ ভাল ছাত্রী ছিলাম। একজন তো ছিল খুবই ভাল। স্কুলে বরাবর ফার্স্ট সেকেন্ড হত অথচ মেট্রিক রেজাল্ট বের হলে দেখা গেল তিনজনই সেকেন্ড ডিভিশন পেয়েছি।: তাই নাকি?কলেজে ফাস্ট ইয়ারে পড়ার সময়ই তিনজনের বিয়ে হয়ে গেল। তার পরে: মিল আছে। বল তো মিলটা কি।। আপনারা তিনজনই এখন অসুস্থ?না? : না। দু’জন মারা গেছে। আমি শুধু বেঁচে আছি। এই বাঁচা তো মৃত্যুর মতই। তাই। হ্যাঁ তাই। আপনার ঐ দুই বান্ধবী কিভাবে মারা গেলেন?: প্রথম মারা গেল তৃণা। বাচ্চা হতে গিয়ে মারা গেল। তারপর মারা গেল বরুনা।ম্যানিনজাইটিস হয়েছিল। কথা বলতে বলতে ফরিদা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। হাতের ইশারায় তিনি তিথিকে পানির গ্লাস আনতে বললেন। তিথি পানি এনে দিল। সবটা খেতে পারলেন না। চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়লেন। তিথি বলল, আপনার কি কষ্ট হচ্ছে?

পৃষ্ঠা:৫১

: थी।: কোন অষুধপত্র কি আছে যা খেলে কষ্ট কমবে?: না।: আমি কি চলে যাব? নাকি আপনি আমাকে আরো কিছু বলবেন? ফরিদা চোখ না মেলেই বললেন, যাও। তিমি বলল, আপনার কি খুব বেশি কষ্ট হচ্ছে?: আমি বরং আপনার পাশে বসে থাকি। ব্যথা যখন আরেকটু কমবে তখন যাব।: ব্যথা কমবে না। তুমি যাও।তিথি উঠে দাঁড়াতেই ফরিদা বললেন, একটু বস। তিথি বসল না। দাঁড়িয়েই রইল।ফরিদা চোখ মেলে তাকালেন। খানিকক্ষণ ইতস্তত করে বললেন, তোমার নিজের চিবুকেও তিল আছে- এটা কি তুমি কখনো লক্ষ্য করেছ? তিথি কিছু বলল না। ফরিদা কঠিন কণ্ঠে বদলেন, তোমার ভাগ্যও আমার মতই হবে।: হলে কি আপনি খুশি হন?ঃ না খুশি হই না।তিনি চোখ বন্ধ করে ফেললেন। তাঁর বন্ধ চোখের পাতা উপচে টপটপ করে পানি পড়তে লাগল। মানুষের মন বড় বিচিত্র। তিথি ফরিদার চোখের পানি দেখে হঠাৎ অভিভূত হয়ে গেল। তার নিজের বুক ঠেলে কান্না উঠে আসতে লাগল।ফরিদা বললেন, তুমি কি একটু অজন্তার বাবাকে ডেকে আনবে? পাঁচটার মধ্যে সে আসে। এখন পাঁচটা দশ বাজে। সে নিচে আছে: তিথি দবির উদ্দিনকে পেল না। বসার ঘরে অজন্তা একা একা বসে ছিল। সে বলল, বাবা ছিলেন, আপনি এসেছেন শুনে শার্ট গায়ে দিয়ে কোথায় যেন চলে গেলেন। বলতে বলতে অজন্তা মুখ টিপে হাসল। এবং একটু যেন লজ্জাও পেল। এই লজ্জার কারণ তার নিজের কাছেও স্পষ্ট নয়।ভাদ্র মাসের শুরুতে অরু এসে উপস্থিত। হাতে একটা স্যুটকেস। তাকে নিয়ে এসেছে সদ্য গোঁফ উঠা মুখচোরা ধরনের এক ছেলে। তীতু চাউনি, একবারও মাথা উঁচু করে তাকাচ্ছে না। স্যুটকেস নামিয়ে রেখেই দে উধাও হয়ে গেল। মিনু বললেন, ব্যাপার কিঅরুণ মরাকান্না জুড়ে দিলকান্নার ফাঁকে ফাঁকে ভাঙা ভাঙা কথা থেকে যা জানা গেল তা হচ্ছে- স্বামীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সে পালিয়ে এসেছে। যে তাকে পৌঁছে দিয়েছে তার নাম সাঈদ। কলেজে আই কম পড়ে। পাশের বাড়িতে লজিং থাকে। মিনু কঠিন গলায় বসলেন, তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? পেটে ছয় মাসের বাচ্চা নিয়ে পালিয়ে চলে এলি? তার আগে বিষ খেয়ে মরতে পারলি না। বাজারে বিষ পাওয়া যায় না?অরু শুকনো গলায় বলল, সব কিছু না শুনেই তুমি এই কথা বললে? বেশ, বিষ এনে দাও আমি খাব। সময় তো শেষ হয়ে যায় নি।জালালুদ্দিন বসলেন, কি শুরু করলে মিনু, মেয়েটা একটু ঠাণ্ডা হোক। সব আগে শুনি। না শুনেই বকাঝকা।মিনু ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, সব কিছুর মধ্যে কথা বলবে না। কথা শোনাশুনির এখানে কি আছে? বোকার বেহন্দ মেয়ে। পেটে ছ’মাসের বাচ্চা নিয়ে চলে এসেছে। কি সর্বনাশের কথা।

পৃষ্ঠা:৫২

জালালুদ্দিন বললেন, একটা ব্যবস্থা হবেই। এত চিন্তার কি? বিপদ দেবার মালিক চিনি, বিপদ হাগ করার মালিকও তিনি। ভূমি এক কাপ গরম চা মেয়েটিকে মাও। মুড়ি থাকলে তেল-মরিচ দিয়ে মেখে দাও। অংগ মা, তুই আয় আমার কাছে। ঘটনা তি শুনি। মিনু বললেন,: তোমাকে কোন ঘটনা শুনতে হবে না। তিনি মেয়ে নিয়ে শোবার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিসেন। তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, এখন বল কি হয়েছে? তোর এত বড় সাহস কেন হল শুনি। অরু কিছুই বলল না, মাকে জড়িয়ে ধরে ব্যাকুল হয়ে কাঁদতে লাগল। সমস্ত দিনেও এই কান্না থামল না।তিথি এল চারটার দিকে। তিথিকে দেখে অরুর কান্না আরো বেড়ে গেল। জালালুদ্দিন বললেন, মেয়েটা কিছুই খায় নি। তিথি মা দেখ তো কিছু খাওয়াতে পারিস কি-না। বিরাট সমস্যা হয়ে গেল। বেশি কারা ভাল না। চোখের ক্ষতি হয়।হীরু এল সন্ধ্যার আগে আগে। সে কিছু না শুনেই খুব লাফঝীফ দিতে লাগল- দুলাভাই বলে রেয়াত করব না চটি জুতা নিয়ে পিটিয়ে চামড়া ঢিলা করে দেব। দাঁত সব ক’টা খুলে ফেলব। শালাকে চেনটিস্টের কাছে গিয়ে দাঁত বাঁধাতে হবে। তিথি এসে ধমক দিয়ে হীরুকে খামাল। এবং বুঝিয়ে-সুঝিয়ে টেলিগ্রাম করতে পাঠাল। টেলিগ্রাম করা হবে আব্দুল মতিনকে। সেখানে লেখা থাকবে- “অর” এখানে আছে। চিন্তার কোনকারণ নাই।”হীরু টেলিগ্রাম করে টাকা নষ্ট করার তেমন কোন প্রয়োজন অনুভব করল না। বললেই হবে- টেলিগ্রাম করা হয়েছে। চিঠি যদি মিস হতে পারে তাহলে টেলিগ্রামও হতে পারে। বর্তমানে হাত একেবারেই খালি। টেলিগ্রাম উপলক্ষ্যে পাওয়া বিশ টাকারনোটটা কাজে লাগবে। হীরু চলে এস ঢাকা মেডিকেল কলেজের হাসপাতালে।এ্যানার মা চারদিন হল হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বেশির ভাগ সময় রাতে এ্যানা তাঁর সঙ্গে থাকে। ভাগ্য ভাল হলে আজও হয়ত সেই আছে।অবশ্যি হাসপাতালে গিয়েও লাভ হবে না। ভদ্রমহিসার এখন-তখন অবস্থা। সারাক্ষণই নাকে অক্সিজেনের নল ফিট করা মা’কে এই অবস্থায় ফেলে মেয়ে নিশ্চয়ই তার সঙ্গে বকবক করবে না। তবু চেষ্টা করতে তো দোষ নেই।ফিমেল ওয়ার্ডের দোতলায় জানালা ঘেঁষে এ্যানার মা’র বেড। ফিল্মেস ওয়ার্ডে যাবার ব্যাপারে খানিকটা কড়াকড়ি আছে। হীরণা তেমন সমস্যা হল না। কলাপসেবল গেটের দারোয়ানকে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ভাই অমোর মা ছিলেন হাসপাতালে। মারা গেছেন- এ রকম সংবাদ পেয়ে এসেছি। একটু যদি কাইন্ডলি…হাসপাতালের লোকজনও মৃত্যুর খবরে বিচলিত হয়। দারোয়ান তাকে ছেড়ে দিল। হীরু চলে এল দোতলায়। আশ্চর্য ব্যাপার- এ্যানা বারান্দাতেই আছে। রেপিং-এ ভর দিয়ে স্বাকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। কাঁদছে নাকি? তার মা’র কি অল-মন্দ কিছু হয়ে গেল? তেমন কিছু হলে চেঁচামেচি করে বাড়ি মাথায় তোগার কথা। হাসপাতালে বোধ হয় সে রকম কিছু করার নিয়ম নেই। :এই এ্যানা।এ্যানা চমকে তাকাল। বিরক্ত গলায় বলল, আবার হাসপাতালে চলে এসেছেন? পরশু দিন না বললাম হাসপাতালে আসবেন না।: তোমার কাছে তো আসি নি। আমার এক ক্লোজ ফ্রেন্ড ইমতিয়াজ, ব্যাটার হঠাৎ পেটে ব্যথা, অ্যাপেনডিসাইটিস-ফাইটিস হবে। হাসপাতালে নিয়ে এসেছি,

পৃষ্ঠা:৫৩

ব্যাটার এখন অপারেশন হচ্ছে। অপারেশন হওয়া পর্যন্ত থাকতে হবে। কাজেই ভাবলাম খোঁজ নিয়ে যাই। তোমার মা, তার মানে বলতে গেলে আমারো মা।: আপনার মা হবে কেনা কি-সব উল্টাপাল্টা কথা বলেন। এইসব আর বলবেন না। রাগে গা জ্বলে যায়।:উনি আছেন কেমন?তা দিয়ে আপনার দরকারটা কি? মা’র খোঁজে তো আপনি আসেন নি।তোমার মা’র খোঁজে আসি নি-তাহলে এলাম কেন?: এসেছেন আমাকে বিরক্ত করতে।হীরু অতি দ্রুত প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলল, নিচু গলায় বলল, এখানে সিগারেট খাওয়া যায় এ্যানা?: না, খাওয়া যায় না আপনি এখন চলে যান তোতুমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছ কেন?মা ঘুমুচ্ছে তাই দাঁড়িয়ে আছি।: তুমি ঘুমাও কোথায়?ঘুমাবো আবার কোথায়? এখানে কেউ কি আমার জন্যে বিছানা করে রেখেছে?:সারা রাত জেগে থাক?: ই, অনেকেই বারান্দায় চাদর পেতে ঘুমায়, আমি পারি না। ঘেন্না লাগে।বলতে বলতে এ্যানা হাই তুলস। বেচারীর শরীর খারাপ হয়ে গেছে, তেজা ভেজা চোখ মুখ শুকিয়ে কেমন হয়ে গেছে। উরুর মনটা মায়ায় ভরে গেল। সে কোমলগলায় বলল, চা খাবে নাকি এ্যানা?: কি-সব কথাবার্তা আপনার। এখানে চা খাব কোথায়? এটা কি রেস্টুরেন্ট।। হাসপাতালের গেটের ভেতর এক বুড়ো চা বিক্রি করছে। চা খেলে তোমার রাতজাগতে সুবিধা হবে। চল না।: এক কাপ চা খেসেই আপনি চলে যাবেন?: চলে যাব না তো কি? আমার ঐ ফ্রেন্ডের অপারেশনের তি হল খোঁজখবর করে বাসায় যেতে হবে। বিরাট সমস্যা বাসায়। আমার বড় বোন পাসিয়ে চলে এসেছে। হেতীক্রাইং হচ্ছে।: আপনার বাসাটা তো খুব অদ্ভুত। সব সময় কেউ পালিয়ে যাচ্ছে। কিংবা পালিয়ে আসছে।ই’রু এর উত্তর দিল না। তার বড় ভাল লাগছে রাতের বেলা এ্যানাকে পাশে নিয়েচা খাওয়া, এত আনন্দ সে রাখবে কোথায়? মেয়েটা যে তার দিকে কি রকম ‘উইক’এই ঘটনায় তাও প্রমাণ হয়ে যাচ্ছে। এক কথায় চা খেতে চলল। এদিকে তার মাএখন-তখন অবস্থা। মুখে অবশ্যি এই মেয়ে সরাক্ষণ উল্টো কথা বলছে তা বসুক,এটা মেয়েছেলের ধর্ম। সোজা কথা সোজাভাবে বললে আর মেয়েছেলে রইল কোনায়।চায়ে চুমুক দিয়ে এ্যানা বলল, চা’টা তো ভাল হীরু দরাজ গলায় বলল, ভাললাগবে আরেক কাপ খাও।এ্যানা হেসে ফেলল। এত সুন্দর লাগল মেয়েটার হাসিমুখ। আজ আবার শাড়ি পরেছে ছাপা শাড়ি। পরীর মত লাগছে দেখতে। আল্লাহতালা মেয়েগুলিকে এত সুন্দর করে পাঠিয়েছেন কেন কে জানে। মেয়েদের সবই সুন্দর। এরা রাগ করলেও ভাল লাগে, অপমান করলেও ভাল লাগে ভালবাসার কথা বলতে কেমন লাগবে কে জানে। এ্যানার মুখ থেকে ভালবাসার একটা কথা শুনতে ইচ্ছা করে।

পৃষ্ঠা:৫৪

: এ্যানা।: বলুন কি বলবেন?: আমি নিজে চায়ের দোকনে দিচ্ছি, ভেরি সুন।: খুব ভাল। নাম একটা মনে মনে ঠিক করে রেখেছি এখনো ফাইন্যাল করি নি। নামহচ্ছে-এ্যানা টি স্টল এ্যানা চায়ে চুমুক দিয়েছিল। হঠাৎ হাসি এসে যাওয়ায় বিষম খেস। হীরু অপ্রস্তুত গলায় বলল, হাসির কি হল?: কিছু হয় নি, এমি হাসছি।: পীর সাহেবের কথামত দিচ্ছি। পীর সাহেব বলে দিলেন।: চায়ের দোকান দিতে বললেন?: পীর সাহেবের কথা ছাড়া আপনি কিছুই করেন না? না।: তাহলে উনার কাছে আমি একদিন যাব। হীরু উৎসাহিত হয়ে উঠল। উৎসাহটা প্রকাশ করল না। মেয়েটা ঠাট্টা করছে কি- না বুঝতে পারল না। ঠাট্টা হবারই সম্ভাবনা।: উনার কাছে সিগারেটের প্যাকেট নিয়ে যেতে হবে তাই না?ঃ ই। টাকা-পয়সা নেন না। টাকা-পয়সা উনার কাছে তেজপাতা।: দিনে ক’ প্যাকেট সিগারেট পান?: অনেক। ত্রিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ।: একটা মানুষ কি এত সিগারেট খেতে পারে?হীরু সাবধান হয়ে গেল প্রশ্ন কোন দিকে যাচ্ছে বুঝতে পারল না। এই মেয়ে বড়ই ধুরন্ধর। এই মেয়েকেবিয়ে করলে জীবনটা শেষ হয়ে যাবে।এ্যানা বলল, আপনার পীর সাহেব ঐ সব সিগারেট বাজারে বেচে দেয়। এখন বুঝলেন ব্যাপারটা? পঞ্চাশ প্যাকেট সিগারেট একটা লোক খেতে পারে না, তাই না? ঃ পীর-ফকির সম্পর্কে সাবধানে কথা বলবে এ্যানা। কখন ফট করে বরদোয়া লেগে যাবে।: লাগুক।এ্যানা চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল। হীরুর বুক ছীৎ করে উঠল। এখন নিশ্চয়ই চলে যাবে। ইশ আরো খানিকক্ষণ মনি আটকে রাখা যেত। এ্যানা গেল না। দাঁড়িয়ে রইল। তারও সম্ভবত রুগ্‌ণ মায়ের পাশে সারাক্ষণথাকতে ভাল লাগে না।: আপনার চায়ের দোকান কবে স্টার্ট হচ্ছে।: শিগগিরই ক্যাপিটেলের অভাবে আটকা পড়ে আছে। হাজার পাঁচেক টাকাপেলেই খাঁ করে বেরিয়ে যেতাম।: টাকার জোগাড় হচ্ছে না?: হয়ে যাবে। পীর সাহেব বসে দিয়েছেন। ঐ নিয়ে চিন্তা করি না।: আপনি এতবোকা কেন?

পৃষ্ঠা:৫৫

হীরু আহত চোখে তাকিয়ে রইল। রাগ হবার কথা। কিন্তু রাগ লাগছে না। মনটা খারাপ হয়ে গেছে। চোখে পানি এসে যাচ্ছে। এ্যানা বোধ হয় ব্যাপারটা টের পেল। সে কোমর গলায় বলল, আকে কাপ চা খান।হীরুর মন খারাপ ভাবটা সঙ্গে সঙ্গে কেটে গেল। সে মনে মনে বলল- অসাধারণ মেয়ে। অসাধারণ। এই মেয়ে পাশে থাকলে চোখ বন্ধ করে সমুদ্রে কাঁপ দেয়া যায়। বাঘের মুখের ভেতর মাথা ঢুকিয়ে দেয়া যায়।

এ্যানা চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, আপনাকে একটা কথা বলব।: কি কথা?ও আমার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে।: কি বলছ এই সব।মা’র খুব ইচ্ছা। মরবার আগে মেয়েদা বিয়ে দেখতে চায়।তোমার বড় বোনেরই তো বিয়ে হয় নি?: ওদের সম্বন্ধ আসে না। আমার এসেছে। ছেলে আরব বাংলাদেশ ব্যাংকে কাজ করে। অফিসার। বড় অফিসার। আগে একটা বিয়ে করেছিল। বট মরে গেছে। ছেলে চুলে কিছু নেই।: এইসব পাগলামি চিন্তা একদম করবে না। স্টপ। কমপ্লিট স্টপ।এ্যানা তরল গলায় বলল, কষ্ট করতে ভাল লাগে না। বড়সোকের বট হতে ইচ্ছা করে। রোজ গাড়ি করে ঘুরব।ঠাট্টা করছ তাই না?: : ঠাট্টা ভাবলে ঠাট্টা। আমি এখন যাচ্ছি। মা’র বোধ হয় ঘুম ভেঙেছে ঘুম ভেঙে আমাকে না দেখসে পাগলের মত হয়ে যায়: বিয়ের ব্যাপারটা ঠাট্টা না সত্যি?: ঠাট্টা ভাবলে ঠাট্টা। সত্যি ভাবতে সত্যি।এ্যানা চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে শাড়ির গ্রাঁচলে ঠোঁট মুছল হীরুর দিকে না তাকিয়ে বলল-সাই হীরু কিছুই বলতে পারল না। তার মনে হল সে ঠিকমত নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। যতটা বাতাদ তার দুই ফুসফুসের জন্যে দরকার ততটা বাতাস এখন নেই চায়ের বুড়ো দোকানদারের সামনে ইরু দাঁড়িয়ে রইল, নড়ল না। তার কেবলি মনে হচ্ছে এক্ষুণি এ্যানো নেমে এসে বসবে-আপনার সঙ্গে তামাশা করছিলাম। আপনি এমন বোকা কেন? মেয়েদের কোন কথা চট করে বিশ্বাস করতেনেই-বুঝলেন সাহেব এক ঘন্টা পার হল, এ্যানা নামব না। হীরুর মনে হল নির্ঘাৎ মা’র ঘুম ভেঙেগেছে। মা’কে খাইয়ে-টাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে তারণা নামবে।অপেক্ষা করতে করতে রাত এগারেটা বারুদ। এ্যানা নামল না।চায়ের দোকানদার এক সময় বসস, আর কত চা খাইবেন? বাড়িত যান। চা বেশি খাওয়া ঠিক না। ভাইজান আপনের চা হইছে তেরটা। আপনের এগারোটা ‘আপার দুইটা। তের টাকা পাওনা।হীরু টাকা বের করে দিল। হাসপাতাসের গেট পার হয়ে খোলা রাস্তায় অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। একজন রিকশাওয়ালা বলল, স্যার ভাড়া যাবেন? সে বিনা বাক্যব্যয়ে রিকশায় উঠে বসল। পরক্ষণেই নরম গলায় বলল, না আমি যাব না। ভাই আপনি কিছু মনে করবেন না। এক্সকিউজ করে দেন

পৃষ্ঠা:৫৬

রিকশায় উঠেই তার মনে হয়েছে, এ্যানা নেমে এসে তাকে না দেখে ফিরে যাচ্ছে। তার চেয়েও বড় কথা, এ্যানার মা’র যদি এই রাতে ভণমন্দ কিছু হয় তাহলে তো চোরী বিরাট প্রবলেমে পড়বে এখনো এসে যাই বলুক রাতটা তার থেকে যাওয়াই উচিত।হীরু দ্বিতীয়বারে ফিমেস ওয়ার্ডে ঢুকতে পারল না। কলাপনেবল গেট অবশ্যি খোলা। দু’জন দারোয়ান সেখানে বসে আছে। তারা পাস না দেখে কাউকে ছাড়বে না। রেসিডেন্ট ফিজিশিয়ান ডিউটিতে আছেন। তিনি খুবই কড়া লোক। পাস ছাড়া কাউকে দেখলে তাদের না-কি চাকরি চলে যাবে।হীরু রাত একটার দিকে হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরল। সারা পথ প্রতিজ্ঞা করতে করতে এল-এই জীবনে মেয়েছেলের সঙ্গে সেকোন কথা বলবে না। মেয়েছেলের সঙ্গে কথা বলার চেয়ে কাচা ও খাওয়া ভাল।অরু বিছানা থেকে নেমে বারান্দায় গিয়ে বসস, ঠাণ্ডা হাওয়া নিচ্ছে সরুর চোখ আবার তিদে উঠতে শুরু বরন। বড় খারাপ লাগছে। সুমনের জন্যে বুকের মাঝখানে সন্ধ্যা থেকেই যন্ত্রণা হচ্ছিল সেই যন্ত্রণা এখনতাঁর হয়ে তাকে অতিবৃত করে দিচ্ছে।সুমনের বয়স তিন। এই বয়সেই সে সব কথা বলতে পারে তিনটা ছড়া জানে। তালগাছ ছড়াটা বলার সময় কেমন এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে। পুরো ছড়াটা সে এক পায়ে দাঁড়িয়ে বলতে চেষ্টা করে, শেষ পর্যন্ত অবশ্যি পারে না। চুপ করে পড়ে যায়। তখন ছলোছলো চোখে বলে-সামা, তালগাছ ব্যথা দেয়।অরুকে তখন বসতে হয়- মাহারে ময়না সোনা।দিনের মধ্যে কতবার যে ধূপ করে এসে তার কোসে বসবেমিটি মিটি গলায় বলবে, আদর খাও আমা আদর খাও তখন অরুকে হামহুম করে আদা খাওয়ার ভঙ্গি করতে হয় মার হেসে পুটুপুটি খায় সুমন। হাসির মধ্যেই সুমন বলে, মারো আদর খাও আম্মা আরো খাও।: তুমি বড় বিরক্ত করছ সোনামনি, এখন যাও খেলা কর।: না আম্মা তুমি আদর খাও।সুমনের ছোট হল রিমন। বয়স দেড় বছর। এমন শান্ত বাচ্চা পৃথিবীতে আর জনেছে বসে অরুর মনে হয় না। ক্ষিধে পেলেও কাঁদবে না। মুখে চুকচুক শব্দ করতে থাকবে। একবার খাইয়ে দিলে হাত-পা এলিয়ে ঘুমুবে কিংবা নিজের মনে খেলা করবে।বিছানায় চারজনের এক সঙ্গে জাগো হয় না, সুমন ঘুমায় তার দাদীর সঙ্গে রাতের বেলা চুপিচুপি উঠেএসে দরূণর পায়ের কাছে গুটিসুটি মেরে পড়ে থাকে। একদিন দু’দিন না, এই কাণ্ড হয় রোজ রাতে। স্বাদ বেচারা কার সঙ্গে ঘুমিয়েছে? ঘুম ভেঙে সে কি অরুকে খুঁড়ছে না?অরুর চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগল।তিথি এসে অরুর সামনে দাঁড়াল। কোমল গলায় বলল, ‘আপা।অরু চোখ তুলে তাকাল। কিছু বলল না। সে কান্না থামাতে চেষ্টা করছে, পারছে না। কান্না বন্যার জলের মত। বাঁধ দিতে চেষ্টা করসেই যেন বড় বেশি ফুলে উঠে।: এস আপা বিছানায় শুয়ে গল্প করি।অরু ধরা গলায় বলস, সুমনের জন্যে মনটা ভেঙে যাচ্ছে রে তিথি: খুব বেশি খারাপ লাগলে ফিরে যাও।

পৃষ্ঠা:৫৭

: না-রে ফিরে যাওয়া যাবে না।: এখানে থাকলে তুমি যে কষ্ট পাবে তারচে বেশি কষ্ট কি দুলাভাইয়ের ওখানে। ওখানে তো তোমার সুমন, রিমন মাছে। এখানে কে আছে? আমরা তোমার কেউ না আপা। এস ঘুমুতে এস।অরু উঠে এল, এখন সে শান্ত। এখন আর কাঁদছে না। কাঁদারও হয়ত সীমা আছে। সীমা অতিক্রম করার পর কেউ কাঁদতে পারে না। সে শুয়েছে তিথির সঙ্গে। কিছুক্ষণ শুয়ে থাকে। আবার উঠে বসে। খাট থেকে নেমে বারান্দায় যায়, জলচৌকির উপর গিয়ে বসে। তিথি এক সময় বলল, বড় বিরক্ত করছ আপা।: ঘুম আসছে না।: চুপচাপ শুয়ে থাক। ছটফট করে লাভ হবে কিছু? অরু ক্ষীণ গলায় বলল, এখানে এসে ভুল করেছি তাই না?: ভুল করেছ কি শুদ্ধ করেছ তা জানি না। কোল্টা ভুল কোল্টা ভুল না, তা এখন আর আমি জানি না।: তোরা সবাই বদলে গেছিস। তিথি তরল গলায় হেসে উঠল। অরু তীক্ষ্ণ গলায় বলস, হাসছিস কেন?: সিরিয়াস সিরিয়াস সময়ে আমার কেন জানি হাসি আসে।: তোর সম্পর্কে যে সব শুনি সেগুলি কি সত্যি?: কি শোন?চুপ করে রইল। তিথি বলল, মুখে আনতে লজ্জা লাগছে, তাই না? তোমার কি আমার সঙ্গে ঘুমুতে এখন ঘেন্না লাগছে? ঘেন্না লাগলে মায়ের সঙ্গে ঘুমাও।ঃ যা শুনছি সবই তাহলে সত্যি?: হ্যাঁ সত্যি।: কণতে তোর লজ্জা লাগল না?: না।: আমি হলে গলায় দড়ি দিয়ে মরে যেতাম।: না মাতে না। এই যে এত যন্ত্রণার মাঝ দিয়ে তুমি যাচ্ছ তুমি কি গলায় দড়িদিয়েছ? দাও নি। বাঁচার চেষ্টা করছ। করছ না।অরু ক্ষীণ গলায় বলল, বাচ্চা দু’টার জন্যে বেঁচে আছি। নয়ত কবেই…তিথি আবার হেসে উঠল। অরু বলল, হাসিস নাআস্থা যাও হাসব না। তুমিও ঘুমুবার চেষ্টা কর।ঘুম আসছে না।: আমার কাছে ঘুমের অসুধ আছে, খাবে? মাঝে মাঝে আমি খাই।দু’টা আস্ত বোতল আছে একেকটাতে বত্রিশটা করে ট্যাবলেট-এর পনেরটাথেসেই ঘুম হবে খুবই আনন্দের। খাবে আপা। অরু কাঁরে কাঁদো গলায় বলল, ঠাট্টা করছিস তিথি? আমার এই অবস্থায় তুই ঠাট্টা করতে পারিস?৪ হ্যাঁ পারি। আমি যে কি পরিমাণ বদলে গেছি তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। :তুই আমাকে ফিরে যেতে বলছিস?: বলছি।একটা ব্যাপার শুধু তোকে বলি তার পরেও যদি তোর মনে হয় আমার চলে যাওয়াই ভাল, আমি চলে যাব।

পৃষ্ঠা:৫৮

: বেশ তো বল।অরু কিছু বলল না, চুপ করে রইল। তিথি বলল, বলতে যনি তোমার খারাপ লাগে তাহলে বলার সাকোর নেই।: খারাপ লাগবে না, তুই শোন-কোন-একজনকে বলার দরকার: কাকে বলব বল? আমার বলার লোক নেই।অরু খানিকক্ষণের জন্যে থামল। তারপর নিচু গলায় বলতে লাগল-তোর দুলাভাই যে খুব নামাজী মানুষ তা তো তুই জানিস? পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, তাহাজ্জ্বত পড়ে। রোজ ভোরবেলা আধঘন্টা কুরআন শরীফ পড়ে।রাতের বেলা সে কখনো স্বামী-স্ত্রীর ঐ ব্যাপারটায় যাবে না। কারণ তাতে তার শরীর অপবিত্র হবে। গোসল করতে হবে, নয়ত ফজরের নামাজ হবে না। কাজেই সে ফজরের নামাজ শেষ করে কুরআন শরীফ পড়া শেষ করে আমার ঘুম ভাঙাবে। দিনের পর দিন এই যন্ত্রণা। শারীরিক সম্পর্কের মধ্যে কি প্রেম-ভালবাসা থাকতে নেই। তুই কি আমার যন্ত্রণা বুঝতে পারছিস তিথি?পারছি।আরো শুনবি?: না।তিথি দু’হাতে বোনকে জড়িয়ে ধরল। দু’জন দীর্ঘ সময় বসে রইল চুপচাপ। এক সময় অরু বলল, বাচ্চা দু’টাকে ছেড়ে আমি থাকতে পারব নারে তিথি। আমি কাল সকালে চলে যাব।তিথি কিছু বলল না। অনেকদিন পর তার কান্না পাচ্ছে, অনেক অনেক দিন পর।ফরিদা তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, কে?দরজার পাশ থেকে কে যেন সরে গেল। ফরিদা বললেন, ভেতরে এস অজন্তা। অজন্তা ভয়ে ভয়ে ভেতরে ঢুকল। তার গায়ে স্কুলের পোশাক, হাতে বই-খাতা এবং পানির ক্লান্ত। ফরিদা বলল, স্কুলে যাচ্ছ? অজন্তা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। মা’কে সে খুব ভয় পায়।: তুমি আরেকটু কাছে আস তো তোমাকে ভান করে দেখি।অজন্তা পায়ে পায়ে এগিয়ে এল। ফরিদা বঙ্গসেন, তুমি আগের চেয়ে একটু সম্বা হয়েছ তাই না?: কত লম্বা হয়েছ জান সেটা? মেপেছ কখনো?না।: তাহলে বুঝলে কি করে-লম্বা হয়েছ?: জামাটা ছোট হয়েছে।৪ তাই তো, জামা ছোট হয়েছে। আজ তোমার বাবাকে বলবে কাপড় কিনে যেন দরজির দোকানে দিয়ে আসে।: তুমি কি স্কুলে যাবার আগে রোজই আমার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাক?অজন্তা জবাব দিল না। মাথা নিচু করে ফেলল।: আমি বেঁচে আছি কিনা তাই দেখ, ঠিক না?

পৃষ্ঠা:৫৯

অজন্তা কথা বলল না, মাথাও তুলল না। তার খুব অস্বস্তি লাগছে।মা’কে কেন জানি একই সঙ্গে ভয় লাগে এবং ভাস লাগে। ফরিদা বললেন, আমি আরো মাসখানিক তে থাকব।অজন্তা এবার চোখ তুলে তাকাল। তার চোখে স্পষ্ট শংকার ছায়া। ফরিদা বসলেন, তোমাকে আগেভাগে কলসাম যাতে মনে মনে তৈরি হতে পার। এখন যাও।অজন্তা দরজা পর্যন্ত যেতেই ফরিদা বললেন, তোমার বাবাকে বলবে আজ যেন সে তোমাকে স্কুলে দিয়ে বাসায় চলে আসে। তার সঙ্গে কিছু জরুরী কথা আছে। বলবে মনে করে। আর নিচে খটখট শব্দ হচ্ছে কিসের দেখ তো। শব্দ আমার সহ্য হয় না তবু সবাই মিলে এত শব্দ করে। ফরিদা চোখ বন্ধ করে ক্লান্ত শ্বাস ফেললেন।দবির সাহেবের খুব অস্বস্তি বোধ হচ্ছে। ফরিদা তাকে কি বলতে চায় এটা ডিনি ঠিক আঁচ করতে পারছেন না। তিনি মেয়েকে কয়েকবারই জিজ্ঞেস করলেন-সে কি বলেছে জরুরী কথা?অজন্তা বলস, ই’।: কি এমন জরুরী করা তা তো বুঝলাম না।অজন্তা বলল, বাবা ভূমি কি মা’কে ভয় পাও?দবির সাহেব লজ্জা পেয়ে গেলেন। ভয় পান না এত বড় মিথ্যা মেয়েকে সরাসরিবলতে পারেন না। তার এই মেয়ে খুব বুদ্ধিমতী হয়েছে।অঙ্গন্তাকে স্কুলে নামিয়ে চিন্তিতমুখে দবির সাহেব বাসার দিকে রওনা হলেন। তাঁর কেবলি মনে হতে লাগল, ফরিনা নিশ্চয়ই তিথির কথা তুলবে।তিথি প্রসঙ্গে ফরিদা এখন পর্যন্ত তাঁকে কিছুই বলে নি। যদিও তিনি নিজ থেকে হড়বড় করে অনেক কিছু বলেছেন। ফরিদা চোখ বড় বড় করে শুনেছে। কিছুই বলে নি। এটা ফরিদার স্বভাব। কোন-একটা ঘটনা ঘটে যাবার অনেক দিন পর ফরিদা সেই প্রসঙ্গে কথা বলবে। মনে হয় দীর্ঘদিন সে ঘটনা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে। এক সময় স্থির সিদ্ধান্তে আসে। তখন কথা বলে। আজো কি সে কোন সিদ্ধান্তে এসেছে?: আসব ফরিদা!ফরিদা হেসে ফেলে বললেন, আমার ঘরে আসতে তো আগে কখনো অনুমতি নিতে না আজ নিচ্ছ কেন?এস, বস। দবির উদ্দিন শুকনো গলায় বললেন, তোমারশরীর কেমন?: ভালই। খুবই ভালদবির উদ্দিন চিস্তিতমুখে ফরিদাকে লক্ষ্য করলেন- আজ তাকে অন্য রকম দেখাচ্ছে। চোখে-মুখে অস্বাভাবিক এক উজ্জ্বলতা। ফরিদা ফলদেন,: আমি আর মাসখানিক আছি।: কি বললে বুঝলাম না।। আমি আর মাসখানিক তোমাকে বিরক্ত করব তারপর তোমার মুক্তি।দবির উদ্দিন অস্পষ্ট স্বরে বলবেন, কি যে তুমি বল।ফরিদা তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, এখন পর্যন্ত আমিকে কখনো গজেবাজে কথা কিছু বলেছি?দবির উদ্দিন হ্যাঁ-না কিছু বলতে পারলেন না। যা মৃদু হাসলেন। পর মুহূর্তেই হাসি গিলে ফেলে বললেন, কিকরে বুঝলাম এক মাস ‘এছি তা জিজ্ঞেস করলেনা।: কি করে বুঝলে?

পৃষ্ঠা:৬০

: আমার দুই বান্ধবীর কথা তোমাকে বলেছি না। কাল শেষ রাতে তারা আমার ঘরে এসেছিল। এসে বসল আমার পায়ের কাছে। তখন রাত চারটা দশ। আমার মনে আছে, ওরা ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে আমি ঘড়ি দেখলাম আর বনল, ফরিদা তোকে ছাড়া আমাদের কেমন জানি একলা একলা লাগে। তুই চলে আয়। আমরা তোকে নিতে এসেছি। আমি বললাম, আমার নিজেরো এখানে থাকতে আর ভাল লাগছে না। তোরা এসেছিস অলই হয়েছে। তবে এখানকার কাজকর্ম গুছিয়ে তারপর যাব। তোরা এক মাস পরে আয়। তারা বলল, আচ্ছা।দবিরউদ্দিন বললেন, এইসব হচ্ছে স্বপ্ন। স্বপ্নে মানুষ কত কিছু দেখে, স্বপ্ন নিয়েমাথা ঘামান ঠিক না। : তুমি সব সময় বাজে কথা বল। আমি কি বলছি শোন- এটা স্বপ্ন না। আচ্ছা বেশ, স্বপ্ন না।: আমি আমার মেয়েটার জন্যে চিন্তা করি। আমি মারা যাবার পর সে খুব কষ্টে পড়বে।: কষ্টে পড়বে না। ওকে আমি কি পরিমাণ ভালবাসি এটা তুমি জান না। : জানি। জানব না কেন। তুমি অজন্তার নামে এই বাড়িটা লিখে দাও। দলিল- টসিল করবে মিউটেশন করবে। সব ঝামেলা এক মাসের মধ্যে শেষ করবে।: তার কোন দরকার আছে।: না থাকলে বলছি কেন।: তুমি যা চাও তাই হবে।ফরিদা চোখ বন্ধ করে ফেললেন। এতক্ষণ এক নাগাড়ে কথা বলে তিনি সম্ভবত ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। চোখ মেললেন অনেকক্ষণ পরে। দবির উদ্দিন বললেন, আমি কি এখন চলে যাব? জরুরী কিছু কাজ ছিল।: আর খানিকক্ষণ বস। তোমাকে আরো একটা কথা বলা প্রয়োজন। আজই বলেফেলি।:কল।: তিথিকে নিয়ে তুমি যে বের হয়েছিলে এতে আমি রাগ করি নি মানুষ ফেরেশতা নয়। তুমি দিনের পর দিনএকা কাটিয়েছ। শরীরেয়া একটা দাবী তো মাহেই।আমি কিছু মনে করি নি।: তিথির সঙ্গে কথা বলা ছাড়া আমি…: জানি। তবে কথা বলার বাইরে কিছু হলেও কোন ক্ষতি ছিল না। এই ব্যাপারটা আমার নিন্দেরই দেখা উচিত ছিল। দেখতে পারি নি।দবির উদ্দিন ক্ষীণ গলায় বললেন, এই প্রসঙ্গটা থাক।: থাকবে কেন? লজ্জা পাচ্ছ?: লজ্জার কিছু নেই। তুমি তাকে নিয়ে বের হতে যদি লজ্জা না পাও কথা বললে লজ্জা পাবে কেন?তাছাড়া তোমাকে লজ্জা দেবার জন্যেও বলছি না। ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করা উচিত তাই আলোচনা করছি।: বেশ আলোচনা কর।দবির উদ্দিন মাথা নিচু করে ফেললেন, ফরিদা এই দৃশ্য দেখে কেন জানি হেসেফেলগেন।

পৃষ্ঠা ৬১ থেকে  ৮০

পৃষ্ঠা:৬১

: তুমি কি আমাকে পাশ ফিরিয়ে দিবে। এবইটিকে যত্নের সঙ্গে ব্যবহার করতে পারি না।দাগ্র উদ্দিন স্ট্রীকে পাশ ফিরিয়ে দিলেন ফরিলা বরবেন, তুমি যখন সদন পাঙ্গ তখন ঐ প্রসঙ্গ থাক। তোমাকে লজ্জা দিতে ইচ্ছা করছে না। বরং অন্য একটা প্রসঙ্গে কথা বলি।: বল।আমি সংসারের খরচ থেকে কিছু টাকা আলাদা করে রাখতাম এটা তুমি: নিশ্চয়ই জান?: জানি।: পরশু হিসাব করলাম। আমার ধারণা ছিল অনেক টা হয়েছে। আসলে অনেকহয় নি। অল্পই জমেছে… : তোমার টাকার দরকার থাকলে বল আমি তোমাকে দিচ্ছি।: কথা শেষ করার আগেই তুমি কথা বব নে? বড় বিরক্ত লাগে। যা বলছিলাম শোন, আমি পরশুদিন দেখি মাত্র এগার হাজার তিনশ’ তেত্রিশ টাকা জমেছে। এই টাকাটা দিয়ে কি করা যায় বল তো?: কি করতে চাও?: সেটাই তো বুঝতে পারছি না। বুঝতে পারবে কি তোমাকে জিজ্ঞেস করতাম?: অজন্তাকে দিয়ে দাও।ঃ না। ওকে যা দেবার তুমিই দেবে, আমি এই টাকাটা তিথিকে দিতে চাই।দবির উদ্দিন এই কথায় তেমন বিত্থিত হবেন না। তাঁর কেন যেন মনে হচ্ছিল ফরিদা এই কাজটিই করবেতিনি বলসেন, ও তোমার টাকা নেবে না।: কেন নেবে নাতা জানি না। তবে সে যে নেবে না- এইটুকু জানি।: আমারও তাই ধারণা। তবে ও যেন নেয় সেই ব্যবস্থা সহজেই করা যায়।: কিভাবে?: আমি মরবার পর তুমি যদি তাকে বল টাকাটা আমি তার জন্যে রেখে গেছিতাহলে সে একটা সমস্যায় পড়বে জীবি মানুষের কথা আমরা অগ্রাহ্য করতে পারি মৃত মানুষের কথা পারি না। তাছাড়া আমি তাকে একটা চিঠিও লিখে রেখে যাব। তুমিখুব দামী কিছু কাগজ কিনে এনো তো।: দামী কাগজ লাগবে কেন?: শেষ চিঠিটা দামী কাগজে লিখতে ইচ্ছা করছে।: বেশ, আনব দামী কাগজ। এখন তাহলে উঠি?: না, আরেকটু বস।ফরিদা তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছেন। দবির উদ্দিন অস্বস্তি বোধ করছেন। তাঁর কাছে ফরিদার দৃষ্টি খুব স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না: তার চোখ তো এড উজ্জ্বল কখনো ছিল না। ফরিদা বললেন, চিঠিটা লিখব কি করে এস তো? আমি তো হাতই নাড়তে পারি না।: আমি লিখে দেব।ফরিদা হাসলেন। প্রথমে মৃদু স্বরে, পরক্ষণেই সেই হাসি উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল। দবির উদ্দিন হাসির কারণটা ধরতে পারলেন না। তার কাছে মনে হচ্ছে এই হাসি স্বাভাবিক মানুষের হাসি না-একজন অসুস্থ মানুষের হাসি।

পৃষ্ঠা:৬২

ফালো বললেন, তুমি, আমাইােতটা একটু ধর তো, দেখি কিভাবে হাত ধর।: কি বললে?আমদর হস্তটা একটু পরদবির উদ্দিন, ফরিদার হাতে হাত রাখবেন রোগশীর্ণ পাণ্ডুর হাত। নীল শিরাগুলি পর্যন্ত ফুটে রয়েছে। ফরিনা অস্পষ্ট স্বরে বসসেন, কারণে-অকারণে তোমাকে অনেককষ্ট দিয়েছি, তুমি কিছু মনে করো না। ফরিদার চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল।টুকু অরুকে ফিরিয়ে দিতে যাচ্ছে।যাচ্ছে বাসে। স্বরু বসার জায়গা পেয়েছে। টুকু তার পাশেই হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে। অরু বলল, টুকু তুই আমার কোলে বোস।টুকু খুব লজ্জা পেল। কারো কোলে বসে যাবার ব্যাস কি আছে? তার বয়স বাড়ছে- এই কথাটা কারোরই মনে থাকে না। টুকুর প্যান্টের পকেটে স্টার সিগারেটের প্যাকেটে তিনটা সিগারেট পর্যন্ত আছে। এই খবর জানতে পারলে আপার নিশ্চয়ই খুব মন খারাপ হবে।দাউদকান্দিতে পৌঁছাবার পর টুকু বসার জায়গা পেল। অরুর পাশের বৃদ্ধা নেমে গেছেন। অরু বসল, তুই জানালার পাশে বসবি টুকু?ঃনা।: আয় নাবোস, সুন্দর দেখতে দেখতে যাবি।: তুমি দেখতে দেখতে যাও।আপার দিকে তাকাতে টুকুর বড় ভাল লাগছে ফিরে যাবার আনন্দে আপার চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে আছে, কেমন ছটফট করছে- আনন্দ ধরে রাখতে পারছে না। অরু নিচু গলায় বলল, টুকু তোর কি মনে হয়, আমাদের দেখলে তোর দুলাভাই রাগারাগি করবে?: জানি না আপা।: কিছু তো করবেই। পুরুষ মানুষের এমিতেই রাগ বেশি থাকে। তোকে হয়ত কিছু বকাঝকা দিবে, তুমিকিছুই মনে করিস না।: আমি কিছু মনে করি না।। মনে না করাই তাগ। এত কিছু মনে পুষে রাখলে সংসার চলে না।: কথা বলো না আপা। সবাই শুনছেঅরু চুপ করে গেল, কিন্তু বেশিদণ চুপ থাকতে পারস না। ফিসফিস করে বলল- সুমন আমাকে দেখলে কি করবে আাপাজ কর তো টুকু?টুকু জবাব দিস না। ২৫ বলল, প্রথম এরকম ভান করবে যে আমাকে চিনতে পারছে না। শুর এই স্বভাব, তার নানাবার তিন দিনের জন্যে বাইরে গিয়েছিল, ফিরে আসার পর সুমন এমন ভাব করে দেন বাবাকে চেনে না অথচ ঠিকই চিনেছে। রিমন আবার ঠিক তার আগে।। শব্দ পেলেই ঝাঁপ দিয়ে কোলে পড়বে।: আপা চুপচাপ: রিমনের শার্টটা ছোটই ফোনে। সুমনের জন্যে একটা পাঞ্জাবী কিনেছি আর রিমনের জন্যে শার্ট ৫৬টু বড় কেনার দরকার ছিল। ওদের কাপড়গুলি তুই দেখেছিস?

পৃষ্ঠা:৬৩

: না।: দেখবি?: এখন দেখব না ঋণা হয় তুমি এত কথা বন্ধ কেন?ঃ কেউ তো আর শুনতে পারছে না, ফিসফিস করে বলছি।চুপচাপ বসে থাক আপা, ঘুমুবার চেষ্টা কর।দূর বোকা, বাসে কেউ ঘুমায়?তারা বাড়িতে পৌঁছল সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে। আব্দুল মতিনের সঙ্গে দেখা হল বাংলাঘরের সামনে। সেমাগরেবের নামাজের জন্যে অজু করছিল। মতিন কড়া গলায়বলল, কে?টুকু বলল, দুলাভাই আমরা।: আমরা। আমরাটা আবার কে?: আপাকে নিয়ে এসেছি দুলাভাই।: কে আনতে বলেছে?অরু নিচু গলায় বলল, রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বকাবকি করছ কেন? ঘরে যাইতারপর….: এ দেখি ফড়ফড় করে কথাও বলে।টুকু বিখিত গলা, বলল, এইসব কি বলছেন দুলাভাই। আব্দুল মতিন খেকিয়ে উঠল, চামচিকা দেখি আমাকে ধমক দেয় দূর হহারামজাদা।টুকু হতভম্ব হয়ে গেল। হৈচৈ শুনে লোকজন জড়ো হয়েছে। ভেতর থেকে অরুর এক মামাশ্বশুর বের হয়েছেন। তিনি কোন কথা বললেন না। সুমন তার গলা জড়িয়ে ধরে আছে এবং ভীত চোখে তাকাচ্ছে তার বাবার দিকে। অরু অসহায় ভঙ্গিতে ছেলের দিকে এগিয়ে গেল। আব্দুল মতিন চেচিয়ে উঠল, এই কোথায় যাস তুই, খবনার।সরুর চোখে পানি এসে গেছে, সে গুছিয়ে কিছু চিন্তা করতে পারছে না। কি করবে সেঃ ছুটে গিয়ে তার স্বামীর পায়ে উপুড় হয়ে পড়বে। কিন্তু এত লোকজন চারদিকে জড়ো হচ্ছে-আহা, যদি কেউ না থাকত। অরু ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, তুমি এ রকম করছ কেনা: চুপ। চুপ।অপরিচিত এক ভদ্রলোক বললেন, ভিতরে নিয়া যান। যা হওনের হইছে আব্দুল মতিন কঠিন গলায় বলল, যেটা জানেন না সেটা নিয়া কথা বলবেন না। এরছোট বোন বেশ্যাবৃত্তি করে-এটা জানেন?গরু জলভরা চোখে টুকুর দিকে তাকিয়ে বসল, চল, চলে যাই।টুকু বলল, চল।মরু তার ছেলের দিকে তাকাল। সুমনের চোখে অপরিচিতের দৃষ্টি। যেন মা’কে সে চিনতে পারছে না।টুকু, বোনের হাত ধলে। কোমল গলায় বলল, চল আপা। এতগুলি মানুষ তালে। চারপাশে-কেউ কিছুই বদন না।রাত দু’টায় ঢাকা যাওয়ার একটা ট্রেন আছে। তারা স্টেশনে বসে রইল। টুই ভেবেছিস আপা পুরোপুরিভেঙে পড়বে। দেখা গেল অরু বেশ শক্তই আছে। টুকু বলন,কিছু খাবে আপা?অরু বলল, টাকা মাছে?

পৃষ্ঠা:৬৪

: আছে কিছু।: টিকিট কাটার তো টাকা লাগবে। ঐ টাকা আছে?: আমার টিকিট লাগবে না তোমার টিকিট কাটব।: তাহলে যা কিছু কিনে আনে। খুব ক্ষিধে লেগেছে।: পরোটা ভাজি আনব আপা?: আন।টুকু পরোটা, আলুভাজি আর কলা নিয়ে এল। অরু বেশ আগ্রহ করেই খেল। তার সত্যি সত্যিই খুব ক্ষিধে পেয়েছিল।: কি রে?: আমার কি মনে হচ্ছে জান। আমার মনে হচ্ছে-ওরা আমাদের খোঁজে স্টেশনে আসবে। বাড়িতে মুরুরি আছে, তারা যখন শুনবে তখন….অরু সহজ গলায় বলল , কেউ আসবে না। টুকু, আমার খুব ঘুম পাচ্ছে। কি করি বল তো? কয়েক রাত দুখ হয় নি এখন ঘুমে একেবারে চোখ জড়িয়ে আসছে।: মেয়েনের ওয়েটিং রুমে বেঞ্চিতে শুয়ে ঘুমাও। চল যাইঃ চল।লম্বা কাঠের বেঞ্চিতে অরু কুণ্ডুলী পাকিয়ে শুয়ে পড়ল মাবার নিচে হ্যান্ড ব্যাগ। শোবার সঙ্গে সঙ্গেই সে ঘুমিয়ে পড়ল। টুকু সারাক্ষণই বোনের পাশে বসে রইল। এক সময় দেখল ঘুমের মধ্যেই অরু ফুঁপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে।দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত টুকুর প্রথম গল্পে এই দৃশ্যটি ছিল। চমৎকার একটি গল্প, যদিও বেশির ভাগ মানুষই এই গল্প পড়ল না। পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক কি মনে করে জানি টুকুকে একটি চিঠি লিখলেন। সেই চিঠিতে অনেকখানি উচ্ছ্বাস ছিল। সাহিত্য সম্পাদকরা কখনো এই জাতীয় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন না।বাড়ি ফিরেও অরু তেমন কোন আবেগ বা উচ্ছ্বাস দেখাল না। মনে হল জীবনের কঠিন বাস্তবকে সে বেশ সহজভাবেই গ্রহণ করেছে। একবারও নিজের বাচ্চা দুটির কথা বলল না। তিথিকে বলল, তুই কি আমারজন্যে কোন চাকরি-টাকরি জোগাড় করে দিতেপারবি?তিথি বলল, ‘আমি চাকরি কোথায় পাব আপা?অর নিঃশ্বাস ফেসে বগল, তাও তো ঠিক যে কোন ধরনের চাকরি হলেই হয়। আয়ার কাজও করতে পারি। আজকাল তো শুনেছি বড়লোকদের বাড়িতে বেতন দিয়েঅয়া রাখে।: আমি এইসব খোঁজ রাখি না আপা।: পত্রিকায় একটা বিজ্ঞাপন দিলে লাভ হবে?: জানি না আপা।: তোর তো অনেকের সঙ্গে জানাশোনা সবাইকে যদি বলে-টসে রাখিস…: আমার সঙ্গে কারোর কোন জানাশোনা নেই, এইসব নিয়ে আমাকে বিরক্ত করো না তো আপা।: আচ্ছা আর বিরক্ত করব না। দিন পনের পরে আব্দুল মতিনের পক্ষ থেকে উকিলের চিঠি এসে উপস্থিতহল। সেই চিঠির বক্তব্য হচ্ছে- আব্দুল মতিন তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে মানিয়ে নিতে সক্ষম হচ্ছে না।

পৃষ্ঠা:৬৫

কারণ তার স্ত্রী নষ্ট চরিত্রের অধিকারী। আব্দুল মতিন স্ত্রীর চরিত্র সংশোধনের অনেক চেষ্টা করেও সফলকাম হয় নি। স্ত্রীর কারণে সে সামাজিকভাবে অপদস্ত হয়েছে মানুসের সামনে মুখ দেখাতে পারছে না। কাজেই সে ইউনিয়ন কাউদ্দিমো চেয়ারম্যানের এবং দু’জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সাক্ষী রেখে তার স্ত্রী শাহানা বেগম ৩০ে অরুকে ইসলামী বিধি মোতাবেক তালাক দিচ্ছে।এই চিঠিতেও অরুর কোন ভাবান্তর হল না। মনে হল সে আগে থেকেই জানত এ ধরনের একটি চিঠি আসবে। মিনু খুব কান্নাকাটি করতে লাগলেন।জালালুদ্দিন গভীর হয়ে বলসেন, কান্নাকাটি করে লাভ নেই, সবই কপালের লিখন। শুধু বংশের উপরএকটা দাগ পড়ে গেল- এটাই আফসোসের কথা। এত বড় বংশ।হীরু খুব চেচামেচি করতে লাগল, হারামজাদা ভেবেছে কি, হারামজাদাকে আমি হাইকোর্টে নিয়ে তুলব। জেদের ভাত খাওয়াব। জেলের মোটা ভাত পেটে পড়লে বুঝবে ‘সাইফ’ কাকে বলে। এমি এমি ছাড়ব আমি সেই পাত্রই না। কাস্টডি মামলা করব। সুমন, নীমন থাকবে তার মা’র সাথে।অরু বলল, চেঁচাস না তো-চুপ কর।: চুপ করব কেন? কাস্টডি মামলা করলে বাপ বাপ করে সুমন, রিমনকে দিয়েযাবে।: ওদের এখানে দিয়ে গেলে লাভ কি হবে? খাওয়াব কি? যেখানে আছে, ভাবই আছে। তুই খামোখা চিৎকার করিস না।। তোমার নিজের ব্যন্ডাদের জন্যে তোমার হার্টে কোন ‘লাভ’ নেই?: বল কি?। এত গাধা তুই কি করে হলি, বল তো হীর?: হ্যাঁ গাধা যত দিন যাচ্ছে তুই ততই গাধা হচ্ছিস।হীরু মন খারাপ করে বেরিয়ে গেল। মেয়েছেলের মতিগতি বোঝা খুব মুশকিল। ভাল বলবে মন্দ বুঝে। তি অদ্ভুত একটা জাত আল্লাহতালা সৃষ্টি করেছেন এই জয়ের মুখের দিকে তাকানও উচিত না। নিমক হারাম জাত।নারী জাতির উপর হীরুর ভক্তি-শ্রদ্ধা কোন কালেই বেশি ছিল না। ইদানিং নারী জাতিকে সে সহ্যই করতে পারছে না। কারণ এ্যানার বিয়ে ঠিকঠাক হয়ে গেলে। এ্যানার মা হাসপাতাল থেকে ফিরে এসে দেয়ে বিয়ের জন্যে উঠেপড়ে লেগেছেন। শেষ পর্যন্ত যে ছেলেটির সঙ্গে বিয়ে ঠিকঠাক হয়েছে সে ডাক্তার। প্রাইভেট ক্লিনিকে চাকরি করে। চেহারাও ভাল। অপছন্দ করার মত কিছু তার মধ্যে নেই। হীরু খোঁজ নিয়েজেনেছে ইতিমধ্যে এ্যানা দু’দিন সেই ডাক্তারের সঙ্গে চাইনীজ খেতে গিয়েছে।হরু পীর সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল, লজ্জার মাথা খেয়ে পার সাহেবকে ব্যাপারটা বলেছে। পীর সাহেব হাসিমুখে বলেছেন-চিত্তার কিছু নাইরে ব্যাটা। চিন্তার কিছু নাই সবই আল্লাহর হুকুম।হীরু বিনীতভাবে বসেছে, আল্লাহর হুকুমটা কি সেটা যদি একটু জেনে দেন। বড়অশান্তিতে আছি।পীর সাহেব অভয় দেয়া স্বত্রে বললেন, তোর চিন্তার কিছু নাই।

পৃষ্ঠা:৬৬

হীরু এই প্রথম পীর সাহেবের কথায় বিশেষ ভরসা পেল না। ডাক্তার ছেলে, চেহারা ভাল, বয়স অল্প, নারায়ণগঞ্জে বাড়ি আছে- এই ছেলেকে ফেসে এ্যানা আসবে তার কাছে। গাধা টাইপ মেয়ে হলেও একটা কথা ছিল। এ্যানার মত বুদ্ধিমতা একটা মেয়ে কি কখনো এই কাজ করবে।ডাক্তার ছেলেটিকে একটা উড়ো চিঠি পাঠানোর চিন্তা ইীরুর মাদায় এসেছিল। সেই উদ্দেশ্যে অনেও ঝামেলা করে নারায়ণগঞ্জের ঠিকানাও জোগাড় করেছিল। অনেক চিন্তা-ভাবনা করে চিঠির একটা খসড়াও দাঁড় করিয়েছিল।ডাক্তার সাহেব,সালাম পর সমাচার এই যে, পরস্পরায় শুনিতে পাইলাম এ্যানা নাম্নী জনৈকার সহিত আপনার বিবাহ। এক্ষণে আপনাকে জানাইতেছি যে, এই মেয়েটির চরিত্র উত্তম নয়। পাড়ার যে কোন ছেলেকে জিজ্ঞাসা করিলেই ইহা জানিতে পারিবেন। চরিত্র দোষ ছাড়াও এই মেয়েটির মেজাজ অত্যন্ত উগ্র। বিবাহ করিবার আগে অগ্র-পশ্চাৎ বিবেচনা করিবেন। তাহা যদি না করেন তা হইলে আপনার বাকি জীবন ছারখার হইয়া যাইবে।ইতি-আপনার জনৈক বন্ধু।শেষ পর্যন্ত চিঠিটা হীরু পাঠাতে পারল না। এ্যানা সম্পর্কে আজেবাজে কথা লিখতে ইচ্ছা করল না। একটা ভাল মেয়ের নামে বদনাম দেয়াটা ঠিক না। তারচে বং ছেলেটার নামে কিছু বদনাম এ্যানার কানে উঠিয়ে দিয়ে দেখা যেতে পারে। অনেক চেষ্টায় সেই সুযোগ পাওয়া গেল। বাস স্টপে এ্যানাকে একা পাওয়া গেল। হীরু হাসি মুখে এগিয়ে গেল।: কি খবর এ্যানা?এ্যানা সহজ ভঙ্গিতে বলল, কোন খবরটা জানতে চান?: বিয়ে হচ্ছে শুনলাম।: ঠিকই শুনেছেন।: ডেট হয়ে গেছে না-কি?: এখনো হয় নি তবে শিগগিরই হবে।: ব্যাপারটা নিয়ে একটা সেকেন্ড ঘট দাও। বিয়ে দু’একদিনের ব্যাপার না। সারাজীবনের ব্যাপার। শেষে আফসোসের সীমা থাকবে না।এ্যানা হাসি হাসি মুখে বলল, ছেলের চরিত্র খুব খারাপ তাই না?হীরু খানিকটা হকচকিয়ে গেল। যে কথা তার নিজের বলার কথা সেই কথা এ্যানা বলে ফেলায় গুছিয়ে রাখা কথাবার্তা সব এলোমেলো হয়ে গেল। এ্যানা বলল, আপনি কি ভেবেছেন ছেলেটার চরিত্র খারাপ শোনামাত্র আমি বিয়েভেঙে দেব?: কবে নাগাদ হবে বিয়েটা?: বললাম তো এখনো ডেট হয় নি। ডেট হলে আপনাকে জানাব। :তোমার রেজাল্ট কবে হবে?: রেজাল্ট তো গত সপ্তাহেই হল আপনার পীর সাহেবের খবর ছাড়া আপনিদেখি আর কোন খন্ডাং, রাখেন না।: পাস করেছ?ঃ হ্যাঁ। ফার্স্ট ডিভিসন, চারটা লেটার।: ঠাট্টা করছ?

পৃষ্ঠা:৬৭

: ঠাট্টা করব কেন? আপনি কি আমার দুলাভাই।হীরু এর উত্তরে কি বলবে ভেবে পেল না। কথাবার্তা না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাক’ও ভাল দেখায় না। ক্ষত কোন কথাই মনে আসছে নাকোন কলেজে ভর্তি হবে?: জানি না। ও সেখানে ভর্তি করায়।: কি পড়বে?: আইএসসি পাস করে ডাক্তারি পড়ব। স্বামী-স্ত্রী দু’জন ডাক্তার হলে খুব ভাল হয়।হীর মনে মনে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। মনটা ক্রমেই বেশি খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এই মেয়ে জাতটা বড় অদ্ভুত। কি বললে পুরুষ মানুষের মন ভাল হ্যা সেটা যেমন জানে অবার কি বললে পুরুষ মানুষদের মাথা খারাপ হয়ে যায় সেটাও জানেবাস এসে গেল। এ্যাদা বাসের দিকে এগুতে এগুতে অবলীলায় বলল, বিয়েতে আসবেন কিন্তু। রাগ করেবাসায় বসে থাকবেন না।এ্যানা বাসে উঠে গেল।হীরু হতভম্ব হয়ে লক্ষ্য করস তার চোখে পানি এসে গেছে। কি লজ্জার কথা। সে একজন পুরুষ মানুষ আর তার চোখে কি-না পানি? সম্ভবত এটা কেয়ামতের নিশানা। পীর সাহেব একবার বলেছিলেন- “কেয়ামত যত কাছে আসবে উল্টাপাল্টা ব্যাপার ততই বেশি হতে থাকবে। মেয়েছেলে হবে পুরুষের মত তাদের দাড়ি-গোঁফ গজাবে, হায়েজ-নেফাস হবে বন্ধ। আর পুরুষ হবে মেয়েদের মত। পুরুষদের দাড়ি উঠবে না। প্রতি মাসে কয়েক দিন তাদের সিঙ্গ দিয়ে দূষিত রক্ত বের হবে। ওই আল্লাহতালার কি খুদরত। বলেন-ইয়া নবী সালাম আলায় কা…”অনেকদিন পর তিথি, নাসিমুদ্দিনের কাছে এসেছে। নাসিম দরসা খুলে অবাক, মারে তুমি?তিথি নিচু গলায় বলল, কেমন আছেন নাসিম ভাই? শরীর এমন কাহিল লাগছে কেন?: ইনফ্লুয়েঞ্জার মত হয়েছিল। প্রতি বছর শীতের শুরুতে এরকম হয়। জ্বরঘুারি। এবার খুব বেশি হয়েছে।এস ভেতরে এস।তিথি ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, ভাবী বাসায় নেই?: না, বাপের বাড়ি গেছে। ছেলেপুলে হবে।: আবার।নাসিম লজ্জিত ভঙ্গিতে হাসল। দরজা বন্ধ করতে করতে বলল, তুমি অনেকনিন আস না দেখে ভাবলাম তোমার সমস্যার সমাধান হযেছে। বিয়ে-শাদী করে সংসার পেতেছ। এ রকম হয়। চিরকাস তো আর খারাপ যায় না।: কারোর কারোর আবার যায়।: তোমাকে দেখে মনটাই খারাপ হয়ে গেল। মেয়েদের এই কই আমি সহ্য করতে পারি না-আর আমিই কি-না এর দালালী করি।

পৃষ্ঠা:৬৮

কেন করেন?ঃ অভাব, বুঝলে তিথি-অভাব। প্রথম যখন এই রকম দালালী করলাম তখন মন্দের অবস্থাটা কি হয়েছে শোন-তিনশ’ টাকা পেয়েছি। টাকাটা বাসায় নিয়ে আসলাম। রাত তখন এগারটা, ঝুম বৃষ্টি। এই বৃষ্টির মধ্যে… বৃষ্টির মধ্যে কি?: বাদ দাও। ঐ সব বলে কি হবে। আমি এই লাইন ছেড়ে দিব তিবি। মিরপুরে একটা দোকান নিচ্ছি- টেইলারিং শপ।: দরজির কাজ আপনি জানেন?: না জানি না। কারিগর রাখব। নিজে শিখে নিব। : ভালই ভো। কিন্তু আমাদের মত মেয়েদের কি অবস্থা হবে? আমরা তো সেইপথে পথেই ঘুরব। আপনার মত একজন ভাগ মানুষ পাশে থাকলে মনে সাহস থাকে। : ভালমানুষ। আমি ভালমানুষ? এই কথা না বলে স্যান্ডেল খুলে তুমি আমার গায়ে একটা বাড়ি দিলে না কেন? তাহলেও তো কষ্ট কম পেতাম। চা খাবে?: না।: খাও একটু চা। তোমার উপলক্ষ্যে আমিও এক ফোঁটা খাই।: রান্নাবারা নিজেই করেন?: হ্যাঁ। চারটা ডালভাত খাবে আমার সাথে।: खि-ना।নাসিম রান্নাঘরে গিয়ে গ্যাসের চুলায় কেতলি বসিয়ে দিল। ডিবি পেছনে পেছনে গেল। নাসিম বলল, তুমি কি কাজের সন্ধানে এসেছ?ঃই।: একটা কাজ হাতে আছে। কোরিয়া থেকে তিনজনের একটা টিম এসেছে।জয়েন্ট ভেনচারে বাংলাদেশে ইনভান্তি খুলবে। ওদের খুশি করবার জন্যে বাংস্যদেশী পার্টনাররা উঠেপড়ে লেগেছে। ওদের তিনজনের জন্যে তারা তিনজন বান্ধবী চায়। এরা তাদের সাথে ঘুরবে। রাঙ্গামাটি, কক্সবাজার এইসব জায়গায় ধাবে, চার-পাঁচদিনেরব্যাপার। তুমি যাবে?তিথি জবাব দিল না।নাসিম বলল, টাকা-পয়সা ভালই পাবে। গুদের সঙ্গে ঘুরলে মনটাও হতে ভালথাকবে।তিথি তীক্ষ্ণ গঙ্গায় বলল, মন ভাল থাকবে? : এমি বললাম তিথি। কথার কথা। নাও চা দাও।তিথি নিঃশব্দে চায়ের কাপে চুমুক দিতে লাগল। নাসিম বলল, তুমি যদি যেতেচাও তাহলে ১১ তারিখের মধ্যে জানাবে। ওরা ১২ তারিখ রওনা হবে।: টাকা কেমন দেবে জানেন?: : না। হাজার পাঁচেক তো পাবেই। আজ তাহলে উঠি নাসিম ভাই?: এস তোমাকে এগিয়ে দিয়ে আসি, যাবে কোথায়? বাসায় তো?: চল।নাসিমুদ্দিন তাকে উঠিয়ে দিল। জোর করে হাতে একশ’ টাকার একটা নোট গুজে দিল। বাস ছেড়ে না-দেয়া পর্যন্ত বাস স্টপে দাঁড়িয়ে রইল।

পৃষ্ঠা:৬৯

জালালুদ্দিন সাহেব খুবই আনরের সঙ্গে বললেন, জনাব আপনার নাম এবং পরিচয়?ভদ্রলোক বললেন, আমার নাম দবির উদ্দিন। আগেও একবার এসেছিলাম। আপনার: কিছুই মনে থাকে না ভাই সাহেব। চোখে না দেখনে মনে থাকবে কিভাবে বলেন? দৃষ্টিশক্তি নেই। সামান্য চিকিৎসায় আরাম হয়। সেটাই কেউ করাচ্ছে না। বসুন ভাই।: আমি আপনার মেয়ের কাছে এসেছিলাম, তিথি।ঃ তিথি বাসায় নেই। এসে পড়বে। একটু বসেন সুখ-দুঃখের কথা বলি, আপনেরদেশ কোথায়?দবির উদ্দিন তাঁর দেশ কোথায় সেই প্রসঙ্গে গেলেন না। পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করলেন।: আপনার জন্যে এক প্যাকেট সিগারেট এনেছিলাম।: সত্যি?: জ্বি, এই নিন।সিগারেটের প্যাকেট হাতে দিয়ে আনন্দ ও বিষ্ময়ে জালালুদ্দিন স্তব্ধ হয়ে গেলেন।পৃথিনাতে এখনো এত ভাল মানুষ আছে?: ভাই সাহেব বড়ই খুশি হলাম। বসুন একটু চায়ের কথা বলে আসি। নিবে কি না বলতে পারছি না। আপনি বন্ধু মানুষ, আপনাকে বলতে বাধা নেই- এই সংসারে অমি কুকুর-বিড়াদের অধম। বিড়াল অদি একবার ম্যাও করে-তার সামনে একটা কাঁটা ফেলে দেয়। আমার বেলায় তাও না।জালালুদ্দিন সাহেব চায়ের কোন ব্যবস্থা করতে পারলেন না। মিনু চায়ের কথা শুনে এমন এক ধমক দিলেন যে জাসাসুদ্দিন সাহেবের মনে হল সংসারে বেঁচে থাকার কোন অর্থ হয় না। এরচে রাস্তায় ভিক্ষা করা এবং রাতে কমলাপুর রেলস্টেশনে শুয়ে খাবা মনেও ভাল। শেষ পর্যন্ত হয়ত তাই করতে হবে। এমন বিশিষ্ট একজন মেহমান অথচ তাকে এক কাপ চা খাওায়ান যাচ্ছে না। এরচে মাফসোসের ব্যাপার আর কি হতে পারে?: ভাই সাহেব, নিজ গুণে ক্ষমা করবেন। চা খাওয়াতে পারলাম না।: ঐ নিয়ে চিন্তা করবেন না। তিথি কখন আসবে বলে আপনার মনে হয়?: কিছুই বলতে পারছি না ভাই সাহেব। এই সংসারের কোন নিয়ম-কানুন নাই।যার যখন ইচ্ছা আসে। যখন ইচ্ছা যায়। সরাইখানারও কিছু নিয়ম-কানুন থাকে এই বাড়ির তাও নাই।। আমার খুবই জরুরী কাজ আছে আমাকে চলে যেতে হবে। আমি আপনার কাছে কি একটা প্যাকেট রেখে যাব-তিথিকে দেবার জন্যে।: চোখে যান।: আপনার মনে থাকবে তো? ভুলে যাবেন না তো আবার?: থ্রি-না ভুলব না।: প্যাকেনের ভেতর একটা জরদী চিঠিও আছে।: আাগ তাহলে উঠি?: আমি দিয়ে দেব। আপনি চিন্তা করবেন না। আসা মাত্র দিয়ে দেব।: কোন মুখে আর আপনাকে বসতে বলি? এক কাপ চা পর্যন্ত দিতে পারলাম না। বড়ই শরমিন্দা হয়েছি ভাই সাহেব। নিজ গুণে ক্ষমা করবেন।

পৃষ্ঠা:৭০

দবির উদ্দিনের চিঠিটি দীর্ঘ এবং সুন্দর করে লেখা। চিঠি পড়লেই বোঝা যায় ভদ্রলোক বেশ সময় নিয়ে লিখেছেন। ঠিকঠাক করেছেন। একটা রাফ কপি করবার পর আবার ফেয়ার কপি করা হয়েছে কাণ চিঠিতে কোন রকম কাটাকুটি নেই। তিথি খুব আগ্রহ নিয়ে চিঠিটা পড়ল। অনেকদিন পর কেউ তাকে চিঠি লিখস। তাও এমন গুছিয়ে সেখা চিঠি।প্রিয় তিথি, একটা দুঃসংবাদ দিয়ে চিঠি শুরু করছি। আমার স্ত্রী ফরিদা মারা গেছে এই মাসের ১৮ তারিখে। সৌভাগ্যক্রমে মৃত্যুর সময় আমি তার পাশে ছিলাম। সে সামাকে বলল, তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। মনে কোন রাগ রেখো না। তার মৃত্যু খুব সহজ হয় নি। নিঃশ্বাসের কষ্ট শুরু হল। এই কষ্ট চোখে দেখা যায় না এই প্রচণ্ড কষ্টের মধ্যেও সে হাসি হাসি মুখ করে বসল, কিছুক্ষণের মধ্যেই সব কষ্ট শেষ হবে ভাবতেই আনন্দ লাগছে। ফরিদা তোমার জন্যে কিছু টাকা রেখে গেছে। আশা করি মৃত মানুষের প্রতি সম্মান দেখিয়ে টাকাটা তুমি গ্রহণ করবে। টাকার পরিমাণ তেমন কিছু না তবে প্রতিটি টাকাই ফরিদার। সে কোন-এক বিচিত্র কারণে তোমাকে পছন্দ করেছে। ফরিনার ঘৃণা এবং ভালবাসা দুইই খুব তীব্র। ফরিদার মৃত্যুর পর বুঝলাম তাকে আমি কি পরিমাণ ভালবাসতাম। আজ আমার দুঃখ ও বেদনার কোন সীমা নেই। অজন্তা খুব কষ্ট পাচ্ছে। তবু এই কষ্টের মধ্যেও আমার কষ্টটা তার বুকে বাজছে। সে তার নিজের মত করে আমাকে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করছে। এই দৃশ্যটিও মধুর তিথি এই মধুর দৃশ্যটি কি তুমি এসে দেখে যাবে। যদি এই দৃশ্য তোমার ভাল লাগে তাহলে তুমি এসে যোগ দাও আমাদের সঙ্গে। তোমার শুরুর জীবনটা কষ্টের ছিল, শেষেরটা মধুর হতে ক্ষতি কি? এস ধরে নেই যে, আমাদের কারোর কোনঅতীত ছিল না। যা আমাদের আছে তা হচ্ছে বর্তমান।তিথি, এককালে আমি খুব গুছিয়ে চিঠি লিখতে পারতাম। আমি খুব চেষ্টা করছি এই চিঠিটিও গুছিয়ে লিখতে পারছি না। তবে মনে মনে অপূর্ব একটি চিঠি তোমার কাছে এই মুহূর্তে লিখছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস এই চিঠি কোন না কোন ভাবে তোমারকাছে পৌঁছবে।তিথির চোখ ভিজে উঠল। সে শাড়ির আঁচলে চোখ মুছে মনে মনে ভাবস, আশ্চর্য এখনো আমার চোখেপানি আসে।: তিথি।তিথি দেখন হীরু দরজা ধরে শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে আছে। যেন কোন কারণে অসম্ভব ভয় পেয়েছে। তিথি শুকনো গলায় বলল, কি ব্যাপার?। একটু বাইরে আয়।: যা বলার এখানে বললেই হয়।: না, একটু বাইরে আয়।তিথি উঠানে এসে দাঁড়াল। হীরু নিচু গলায় বলল, সর্বনাশ হয়েছেরে তিথি। ভেরিবিগ প্রবলেম।: প্রবলেমটা কি?: এ্যানা চলে এসেছে।: এ্যানা চলে এসেছে মানে? এ্যানাটা কো

পৃষ্ঠা:৭১

: বলেছিলাম না একটা মেয়ের কথা, আমার সঙ্গে ইয়ে আছে। আজ সকানেই তার গায়ে হলুদ হয়েছে। আর এখন এই সন্ধ্যাবেসায় কি গ্রেট ঝামেলা, এক কাপড়েচলে এসেছে। : চলে এসেছে মানে? তোর কাছে কি ব্যাপার?: আহ্ কি যন্ত্রণা-আমাদের মধ্যে একটা Lone চলছে না। এখন করি কি বল?: মেয়েটা কোথায়?: বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, কি যে প্রবলেমে পড়লাম। বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়াই তো ভাল। কি বসিস তিথি।তিথি বিস্মিত হয়ে বাইরে এসে দেখল, কাঁঠাল গাছের অন্ধকারে হলুদ শাড়ি পরা একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তিথি তীক্ষ্ণ গলায় বলল, কে?এ্যানা সহজ গলায় বসল, আপা আমি এ্যানো : তুমি এইসব কি পাগলামি করছ? বাসায় যাও। চল আমি তোমাকে দিয়ে আসি।: বাসায় ফিরে যাবার জন্যে তো আসি নি আপা।: তুমি বিরটি বড় একটা ভুল করছ এ্যানা।: জানি আপা।: আমার তো মনে হয় না তুমি জান। আমার ভাইকে আমি খুব ভাল করে চিনি।ওর জন্যে তুমি এত বড় ডিসিশান নিতে পার না। হীরু শুকনো মুখে বলল, তিথি ‘রাইট’ কথা বলছে। ভেরি রাইট এবং ওয়াইজ কথা।এ্যানা বিরক্তমুখে বলল, তোমাকে কত বার বলেছি-কথার মধ্যে মধ্যে বিশ্রী ভাবে ইংরেজী বলবে না।এই প্রথম এ্যানা ইরুকে ‘তুমি’ করে বলল। হীরুণর বুক কেমন ধড়ফড় করতে লাগল: চোখ পানিতে ভর্তি হয়ে যাচ্ছে। এই মোটোর জন্যে কিছু করতে ইচ্ছা করছে। কি করা যায়? মেয়েটাকে খুশি করবার জন্যে সে অনেক কিছু করতে পারে। হাসিমুখে চলন্ত ট্রেনের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। ডান হাতটা কেটে পানিতে ফেলে দিতেপাত্র।তিমি বলল, এখনো সময় আছে খানা। এখনো সময় আছে।এ্যানা মিষ্টি করে হাসল। মেয়েটা দেখতে তত সুন্দর না। কিন্তু তার হাসিটি বড়ই স্নিগ্ধ। তিথি বলল, এখন যে কত রকম ঝামেলা হবে তুমি কল্পনাও করতে পারছ না। তোমার বাবা পুলিশে খবর দেবেন। পুলিশ আসবে, তোমাকে এবং হীরুকে পুলিশে ধরেনিয়ে যাবে। এ্যানা বলল,: এইসব কিছুই হবে না আপা। আমি বাসায় না বলে তো আসি নি। বলেই এসেছি। সবাই জানে আমি কোথায়। কেউ কোন ঝামেলা করবে না। কারণ আমি তাদের এমন একটা কথা বলে এসেছি…কথা শেষ না করেই এ্যানা হাসল। তিথি বলস, কি কথা বলে এসেছ?এটা আপা বলা যাবে না।: এস ঘণ্ডা এস।এ্যানা জালালুদ্দিন সাহেবের পা ছুঁয়ে সালাম করস। জাসাসুদ্দিন বিস্মিত হয়েবললেন, কে?এ্যানা বলল,বাবা আমার নাম এ্যানো আমি আপনার একজন মেয়ে।

পৃষ্ঠা:৭২

জালালুদ্দিন হকচকিয়ে গেলেন। কি ব্যাপার কিছু বুঝতে না পেরে বসলেন, মা আপনার শরীর কেমন?মিনুকে সালাম করতে যেতেই মিনু বললেন, খবর্ণার তুমি আমার পায়ে হাত দিও না। এ্যানা সহজ গলায় বলল, আমার সঙ্গে এমন কঠিন করে কথা বললে তো হবে না মা। আমি এই বাড়িতেই থাকব। আমাদের তো মিলেমিশে থাকতে হবে। হবে না?রাত সাড়ে দশটায় কাজী এনে বিয়ে পড়ান হল, এ্যানার বাবাকে খবর দেয়া হল। আশ্চর্যের ব্যাপার-তিনি বিয়েতে এলেন। হীরু যখন তাঁকে সালাম করস তখন ষ্টরুকে একটা আঙটি এবং দু’শ টাকা দিলেন।টাকাটা পাওয়ায় হীরুর খুব লাভ হল। তার হাতে একটা পয়সা ছিল না। কেন জানি তার মনে হল এ্যানা খুব পয়মন্ত মেয়ে। এইবার সংসারের হাল ফিরবে।হাঁরুর খুব ইচ্ছা ছিল তার চায়ের দোকানের নাম রাখবে “এ্যানা টি উপ”। এ্যানার কারণে তা হল না। এ্যানা কঠিন গলায় বলল, ফাজলামি করবে না তো। ফাজলামি করলে গুড় খাবে। হীরু অভান্ত বিখিত হয়ে বলল, গুড় যাব মানে? এটা কি ধরনের কথা। ওয়াইফ হয়ে হাসবেন্ডকে চড় দেয়ার কথা বলছ। ‘সান’ কি আজ পূর্বদিকে ‘রাইজ’করণ?: হ্যাঁ, করল। চায়ের দোকানের কোন নাম লাগবে না।:একটা দোকান দের তার নাম থাকবে না?না। পাঁচ পয়সা দামের বোকান তার আবার নাম।: পাঁচ পয়সা দামের দোকান মানে? নংগনে চার হায়রে সাতশ’ টাকা নিজেরপকেট থেকে নিলাম।নিজের পকেট থেকে তুমি একটা পয়সাও দাও নি। তিমি আপা টাকাটাদিয়েছে।: একই হল: না একই হয় নি। এখন যাও- যথেষ্ট বকবক করেছ।হীরু মন খারাপ করে বের হয়ে এল। তার এখন সত্যি সতিা মনে হচ্ছে এই মেয়েকে বিয়ে করে ‘গ্রেট’ ভুল করা হয়েছে। এই মেয়ে তার জীবনটা ভাজা ভাজা করে ফেলবে দিনরাত যুগড়া করবে। ঘরের চালে কাক-পক্ষী বসতে দেবে নামিন্টুর সঙ্গে এানোর বড় রকমের একটা ঝগড়া হয়ে গেল তিন দিন না পেরুবার আগেই। এ্যানা রাভাঘরে ভাত বসিয়েছে। মিনু বললেন- কি করছ?: ভাত বসিয়েছি।: তোমাকে ভাত বসাতে বলেছি।: না, বলেন নি বলতে হবে কেন? আপনার কি ধারণা আমি ভাত রাঁধতে জানিনা?মিনু স্তম্ভিত গসায় বললেন, এ রকম করে কথা বলা তোমাকে কে শিখিয়েছে? । কেউ শেখায় নি। ভাত বসিয়োছি তা নিয়ে আপনিই বা এত হৈচৈ করছেন কেন? মিনু চাপা গলায় বললেন, তুমি তো ভয়ংকর বদ মেয়ে।

পৃষ্ঠা:৭৩

এ্যানা সহজ স্বরে বলল, আমি বদ মেয়ে না। আপনার ছেলেটা বদ। আপনার ছেলের ভাগ্য ভাল যে মমি তাতে নিয়ো করেছি।মেয়েটির পাবে প্রচণ্ড একটা বড় চড় কমিয়ে দেবার ইচ্ছা মিনু অনেক কষ্টে দমন করলেন। নতুন বউয়ের গায়ে এত তাড়াতাড়ি হাত তোলা ঠিক হবে না। তাছাড়া ছেলের বউকে শায়েস্তা বসাতে হয় ছেলেকে দিয়ে। তিনিও তাই করবেন।জালালুদ্দিন এ্যানাকে বেশ পছন্দ করলেন। তেজী মেয়ে। এই সংসারের জন্যে এ রকম তেজী মেয়েই দরকার। মেয়েটির সঙ্গে খাতির রাখলে ভবিষ্যতে সুবিধা হবে- এই ধারণা নিয়ে তিনি ভাব জমানোর প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগলেন। মধুর স্বরে যখন- তখন ঢাকেন-মা এ্যানা, একটু শুনে যাও তো। এ্যানা সঙ্গে সঙ্গে এসে পুরুষালী গলায় বলে, কি জন্যে ডাকছেন?: এন্নি ডাকছি মা। এন্নি। গল্প করি।: কি গল্প করবেন?সুখ-দুঃখের গল্প।: গল্প শুনতে আমার ভাল লাগে না। চা খেতে চাইলে বলুন চা এনে দিচ্ছি।: আস্থা দাও, তাই সাও। চোখ দু’টা যাওয়ায় একেবারে অচল হয়ে পড়েছি।চিকিৎসাও হচ্ছে না।: চিকিৎসা হচ্ছে না কেন?: কে করাবে চিকিৎসা।: কেন- আপনার ছেলে করাবে?। আমার ছেলে আমার চিকিৎসা করাবে।: আপনার ছেলে আপনার চিকিৎসা করাবে না তো বাইরের মানুদে চিকিৎসা করাবে?: এই সংসারের মানুস তুমি চিন না মা। এই সংসারের মানুষগুলি কেমন তোমাকে বলি।জালালুদ্দিন বিমসানন্দ ভোগ করছেন সংসারের মানুষ চিনিয়ে দেবার দায়িত্ব খুব সহজ দায়িত্ব নয়। মনোযোগী শ্রোতার সঙ্গে দার্শনিক কথাবার্তা বলতে তাঁর ভাল লাগে। এই মেয়েটার মনোযোগী শ্রোতা হবার সম্ভাবনা আছে।এ সংসারে মানুষ থাকে তিন রকমের-অগ্নি-মানুষ, মাটি-মানুষ আর জল-মানুষ অমানুষও থাকে তিন পদের… জালালুদ্দিনের হঠাৎ সন্দেহ হল সামনে কেউ নেই। মানুষ কয় প্রকার ও কি কি এই প্রসঙ্গ বন্ধ রেখে মৃদু স্বরে ডাকলেন-মা কোথায় গো? মা কোথায়? মা’র জবাব পাওয়া গেল না। মা চা বানাতে গেছে। শ্বশুরের দার্শনিক কথাবার্তায় তার কোন আগ্রহ নেই।: বাবা চা নিন।জালালুদ্দিন গড়ীর মুখে হাত বাড়িয়ে চায়ের কণে নিলেন। চায়ে চুমুক দিলেন- চমৎকার চা, কিন্তু তাঁর গম্ভীর মুখভঙ্গির কল হল না। এ্যানাকে তিনি বুঝতে পারছেন না কাউকে বুঝতে না পারলে অস্বস্তি সেগে থাকে। কে জানে এই মেয়েটা ঘর ভাঙানি মেয়ে কি-না। ঘর যদি ভেঙে দেয় তাহলে তিনি যাবেন কোথায়? তাঁর এই বয়সে, শরীরের এই অবস্থায় একটি শক্ত আশ্রয় প্রয়োজন। চা তাঁর কাছে বিস্বাদ মনে হল।

পৃষ্ঠা:৭৪

হীরুর ইচ্ছা ছিল তার চায়ের দোকানের প্রথম চা খাওয়াবে পীর সাহেবকে। তাঁকে হাতে-পায়ে ধরে নিয়ে আসবে এতে দোকানের একটা পাবলিসিটিও হবে, এত বড় পরে এসে চা খেয়ে গিয়েছে কম কথা না। পাত্র সাহেণ আদতে গ্রাছি হলেন না তবে চায়ের বিশাল কেতলিতে ফুঁ দিয়ে দিলেন। বললেন, এতেই কাজ হবে। হীরু বিশেষ ভরসা পেল না।জুন মাসের তিন তারিখ ভোর ছ’টায় তার চায়ের দোকান চালু হল। চা, পরোটা, সবজি ভাজি এবং ডাল এই তিন আইটেম। পরোটা, ভাজি এবং ডালের জন্য একজন কারিগর রাখা হল। কারিগরের নাম-মজনু মিয়া কারিগরের দেশ ফরিদপুর। ব্যাস পঞ্চাশ। ছোটখাট মানুষ, কথা বলে ফিসফিস করে এবং সেই সব কথার বেশির ভাগই বোঝা যায় না। কারিগরের বাঁ হাতটা অচল সেই অচল হাত শুকিয়ে দড়ির মত হয়ে আছে। শরীরের অনাবশ্যক অঙ্গ হিসেবে হাতটা কাঁধের সঙ্গে ঝুলতে থাকে। একটি সচল হাত কারিগর মজনু মিয়ার জন্যে যথেষ্ট এই হাতে অতি দ্রুতগতিতে সে পরোটা ভাজে। সেই দৃশ্য মুগ্ধ হয়ে দেখার মত দূশা।

মজনু মিয়া নামকরা কারিগর। তাকে নিয়ে যে ক’টা রেস্টুরেন্ট শুরু হয়েছে সব ক’টা টিকে গেছে। রমরমা বিজনেস করছে। মজনু মিয়ার নিয়ম হল- কোন রেস্টুরেন্ট যখন টিকে যায় তখন সে সরে পড়ে। রেস্টুরেন্ট বড় হওয়া মানে নতুন নতুন কারিগরের নিযুক্তি। নতুনদের সঙ্গে তার বনে না। সে কাজ করতে চায় একা। কাজের সময় সে কারো দিকে তাকায় না, কথা বলে না, হ্যাঁ-ই পর্যন্ত না। কাজের সময় সে শুধু ভাবে। ভাবে নিজের একটা রেস্টুরেন্ট হয়েছে। গমগম করছে রেস্টুরেন্ট। কাস্টমার আসছে যাচ্ছে পরোটা কেজে সে কূল পাচ্ছে না। এই স্বপ্ন সে গত ত্রিশ বছর ধরে দেখছে। আজ সেই স্বপ্নকে বাস্তব করার মত ক্ষমতা তার আছে। ত্রিশ বছরে সে কম টাকা জমায় নি। টাকা না জমিয়েই বা কি করবে? টাকা খরচের তার জায়গা কোথায়? আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব কেউ নেই। থাকার আবানা ঘর এই জীবনে করা হয় নি। যে রেস্টুরেন্টে কাজ করেছে সেই রেস্টুরেন্টের বেঞ্চিতেই রাত কাটিয়েছে। নিজের একটি ঘরের প্রয়োজন সে ত্রিশ বছর আগেও বোধ করে নি। আজো করে না রেস্টুরেন্ট চালুর দিনে হীরু অসঃব উত্তেজনা বোধ করণ। তার মনে হচ্ছেকানের পাশ দিয়ে তৌ-তৌ করে গরম হাওয়া বের হচ্ছে। এই গরম হাওয়া শরীরের ভেতরই তৈরি হচ্ছে কিন্তু বের হচ্ছে কোন পথে তা সে ধরতে পারছে না। বুকে হৃদপিণ্ড বেশ শব্দ করেই লাফাচ্ছে। তার হার্টের কোন অসুক আছে কি-না কে জানে। সম্ভবত আছে। আগে ধরা পড়ে নি। এখন ধরা পড়ছে। পীর সাহেব বলে দিয়েছেন, প্রতিদিন দোকান খোলার আগে তিনবার সুরা ফাতেহা এবং তিনবার দরূদ শরীফ পড়তে। সজ্জার ব্যাপার হচ্ছে হীরুর কোন দরুদ শরীফ মুখস্থ নেই। ভেবেছিল একটা নামাজ শিক্ষা এনে রাখবে। নামাজ শিক্ষায় সব দোয়া-দরুদ বাংলায় লেখা থাকে। দেখে দেখে তিনবার পড়ে ফেললেই হবে। কিন্তু নানান ঝামেলায় নামাজ শিক্ষা কেনা হয় নি বিরাট খুঁত রয়ে গেল। হীরু খুবই বিষন্ন বোধ করল। তার বিধ্যাভাব দীর্ঘস্থায়ী হল না। প্রথম দিনেই রেস্টুরেন্ট জমে গেল। কারিগর মজনু মিয়ার ভাজি এবং পরোটা দুইই অতি চমৎকার হল। ভাজির রঙ লালাভ, একটু টকটক এবং প্রচণ্ড ঝাল। শুধু খেতেই ইচ্ছা করে। মজনু মিয়া কিছু-একটা দিয়েছে সেখানে- কি কে জানে। হীরুর মনে হল ভাজি রান্নার গোপন কৌশল শিখে রাখা দরকার। না শিখে রাখলে পরে সমস্যা হবে মজনু মিয়া যদি দোকান ছেড়ে যায় তাহলে সে একেবারে পথে বসবে। তার রেস্টুরেন্টে তখন কেউ থুথু ফেলতেও আসবে না।

পৃষ্ঠা:৭৫

টুকু অরুকে নিয়ে বের হয়েছে, কোথায় নিয়ে যাচ্ছে কিছুই বলয়ে না কয়েকবার জিভেস করেও ২৮ কোন জবাব পায় নি। টুকু শুধু বলেছে-চল না যাই।অরু সুতির একটা শাড়ি পরেছে। সাধারণ শাড়ি, কিন্তু কোন বিচিত্র কারণে এই সাধারণ শাড়িটি তাকে খুব মানিয়ে গেছে। তাকে দেখাচ্ছে কিশোরী একটি মেয়ের মত। যে মেয়ের চোখে পৃমিরী তার রহস্য ও আনন্দের জানালা একটি একটি করে খুলতে শুরু করেছে।টুকু বলল, এইখানে একটু দাঁড়াও আশা: একতলা সাদা রঙের একটা দালানের সামনে অরু দাঁড়িয়ে আছে। বাড়ির সামনের জায়গাটা ফুলের গাছে ভর্তি। নিকেদের চশমা পরা বৃদ্ধ একজন ভদ্রলোক বাগানে কাজ করছেন। অরু বলল, এটা কার বাড়ি।: ওসমান সাহেবের বাড়ি।এই বাড়িতে কি?: আছে একটা ব্যাপার। তুমি দাঁড়াও। আমি উনার সঙ্গে কথা বলে আসি।ব্যাপারটা কি তুই আমাকে বলবি না?: একটা চাকরির ব্যাপার। তোমার একটা চাকরি হয় কি-না দেখি।: তুই আমার চাকরি জোগাড় করে দিবি?না, আমি দেব কিভাবে? বজলু ভাই চেষ্টা-চরিত্র করছেন।বজলু ভাইটা কে?: তুমি চিনবে না, স্ত্রীন বয়েজ ক্লাবের সেক্রেটারি। বঙ্গনু ভাইয়ের এখানে থাকার কথা। দাঁড়াও, আমি খোঁজ নিয়ে আসি। বজলু ভাই এসে চলে গেলেন কি-না কে জানে।অরু দাঁড়িয়ে রইল। সুন্দর একটা বাতির গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকার এক ধরনের লজ্জা আছে। গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকার মানে- এই সুন্দর বাড়ির ভেতরে ঢোকার অনুমতি তার নেই। সে বাইরের একজন। অর দেখল বুড়ো ভদ্রলোক নিজের মনে কাজ করছেন। টুকু হাত কচলে কচলে কি-সব বলছে। টুকুর ভঙ্গি বিনীত প্রার্থনার ভঙ্গি। অভাব দুঃখ দুর্দশার কথা বলছে বোধ হয়। অরর খুব লজ্জা লাগছে। কি আশ্চর্য, ভদ্রলোক একবার মুখ তুলে তাকাচ্ছেনও না। কি হয় একবার তাকালে? একটা মানুষ নিশ্চয়ই বাগানের গাছগুলির চেয়েও তুচ্ছ না।টুকু ফিরে এল। তার মুখ লজ্জায় এতটুকু হয়ে গেছে। ছোট ছোট নিঃশ্বাস ফেলছে।কি কথা হয়েছে কে জানে। অরু বলল, চল যাই। টুকু বলল, আচ্ছা চল শুধু শুধু আসলাম। অরু বলল,তোকে অপমান করে নি তো? : আরে না। অপমান করবে কি। খুব যারা বড় মানুষ তারা কাউকে অপমান করে না: তারা খুব মিষ্টি মিষ্টি করে কথা বলে। অভাবী মানুষদের কথা শুনলে আবেগেআপ্লুত হয়ে যায়। তখনি আমার রাগ লাগে। অসম্ভব রাগ লাগে। । তোকে দেখে কিন্তু মনে হয় না তোর শরীরে রাগ আছে। তোর চেহারাটা কেমন ঠান্ডা ঠান্ডা।টুকু হঠাৎ গলার স্বর খাদে নামিয়ে ফেলে বলল, তুমি কোন রকম চিন্তা করবেনা আপা, বজলু ভাই একটা ব্যবস্থা করবেই। খুব ছোটাছুটি করছে। ঃ তোর বজলু ভাইয়ের হাতে বুঝি অনেক চাকরি?: না। বঙ্গবু ভাই আমাদের মতই গরীব নুষ। তবে অন্য গরীবের জন্যে খুবছোটাছুটি করতে পারে। ৪ কেন ছোটাছুটি করে।

পৃষ্ঠা:৭৬

: জানি না। ছোটাছুটি করতে বোধ হয় ভাল লাগে।: একটা রিকশা নে টুকু, আর হাঁটতে পারছি না। আমার কাছে টাকা আছে। টুকু রিকশা দিল, মা বলল, ফেরার পরা ইরর রেস্টুরেন্ট দেখে যাই চল।টুকুর রেস্টুরেন্টে যাবার কোন ইচ্ছা নেই। সে ক’দিন ধরেই হারুনকে এড়িয়ে চলছে। কারণ হীরু চায় টুকু ক্যাশে এসে বসুক। হীরু হচ্ছে দোকানের মালিক তাকে তো সারাক্ষণ ক্যাশ বাক্স নিয়ে বসে থাকলে চলে না। ক্যাশে বসবে টুকু। সে হবে ম্যানেজার। রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার। খুব সহজ ব্যাপার তো না। এই বাজারে ম্যানেজারি পাওয়া আর বাঘের দুধ পাওয়া এক কথা। টুকু রাজি হয় না। তার ভাল লাগে পথে পথে ঘুরতে।হীরু ক্যাশে বসে ছিল। টুকুদের নামতে দেখে অস্বাভাবিক গভীর হয়ে গেল। এই প্রথম নিজের লোক রেস্টুরেন্ট দেখতে আসছে। এ্যানা বা তিথি এখনো আসে নি। বাসায় কারো মনে হচ্ছে কোন আগ্রহ নেই। যাক তবু দু’জন এল।অরু বলল, হীরু তোর কাজকর্ম দেখতে এলাম। বাহ্ সুন্দর তো। হীরুণা মনটা ভাল হয়ে গেল। চারদিকে সবুজ কাগজ সেঁটে দোকানটাকে সে মন্দ সাজায় নিঃ টেবিলে ধবধবে সাদা ওয়াল কুথ। তিন দিকের দেয়ালে ক্যালেন্ডার থেকে সুন্দর সুন্দর ছবি কেটে বসান হয়েছে। তার সীমিত সাধ্যে যতটুকু সম্ভব সে করেছে। হীরু বলল, গরীব মানুষের রেস্টুরেন্ট আপা। দেখার কিছু নেই। কেবিনে চলে যাও। কেবিনে বসে চা খাও। এই-এক নম্বর কেবিনে দু’টা চা দে। কাপ গরম পানি দিয়ে ধুয়ে আনবি।: কেবিনও আছে না-কি?: থাকবে না। কি বল তুমি! মেয়েছেলের জন্যে দু’টা কেবিন। এক নম্বর কেবিন আর দু’নম্বর কেবিন:ঃ চা ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায় না?: পরোটা-ভাজি আর ডাল আছে। আগামী সপ্তাহ থেকে দুপুরে তেহারি হবে- ফুল প্লেট দশ, হাফ প্লেট ছ’টাকা। তেহারির সঙ্গে সালাদ ফ্রী।অরু এবং টুকু চা খেল। কেবিন অরুণা খুব পছন্দ হল। পদা টেনে নিলেই নিজেদের ছোট্ট আলাদা একটা জগৎ। সে মনে মনে ঠিক করে ফেলল তার যদি সত্যি কোনদিন চাকরি-টাকরি হয় তাহলে সে প্রায়ই কোন বন্ধু-বান্ধব জোগাড় করে এই রেস্টুরেন্টের কেবিনে বসে চা খেতে খেতে গল্প করবে। সুখ-দুঃখের একান্ত কিছু গল্প।অরুরা চলে যাবার সময় হীরু বলল, চায়ের দাম দিয়ে যাও আশা, ফ্রী’র বেদন কারবারই নেই। আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব সবার নগন পয়সা দিতে হবে। রাগ কর বানা কর- এটা হল ব্যবসা।অরু বসল, কত দিতে হবে রে?ঃ দু’টাকা। অরু হাসিমুখে দু’টাকা বের করল।হীরুর সময় এত ব্যস্ততায় কাটছে যে এ্যানার সঙ্গে সুখ-দুঃখের গল্প করারও সময় পাচ্ছে না। অফিস-আদালত ছুটির দিনে বন্ধ থাকে কিন্তু রেস্টুরেন্ট ছুটির দিনে সকাল সকাল খুলতে হয়, বন্ধ করতে হয় গভীর রাতে। অবশ্যি রাত যতই হোক এ্যানা তার জন্য অপেক্ষা করে। কড়কড়া ঠাণ্ডা ভাত খেতে হয় না। হীরু বাসায় পা দোয়া মাত্র এ্যানা সব কিছু গরম করতে বসে। একজন তার জন্যে না খেয়ে অপেক্ষা করছে এটা ভাবতেও ভাল লাগে।

পৃষ্ঠা:৭৭

রাতে পাশাপাশি ঘুমুতে গিয়ে হীরুর প্রায়ই মনে হয় সবটাই বোধ হয় করনা তার মত একটা ছেলেকে এ্যানা বিয়ে করবে কেন? এ্যানা নিশ্চয়ই অন্য কাউকে বিয়ে কণ্ডঃ মঃসুখে আছে জয় পাশে যে শুয়ে আছে সে ধরহের কেট না কল্পনার একজন মানুষ। হারু খুব দীর্ঘ একটা স্বপ্ন দেখে চলছে। একদিন স্বপ্ন কেটে যাবে। সে দেখবে তার পাশে কেউ নেই পকেটে দু’টা ডেম্প সিগারেট, একটা দেয়াশলাইয়ের বাক্স এবং ন্যাতন্যাতে ময়লা কয়েকটা নোট নিয়ে সে রাস্তায় হাঁটছে। চুমুতে যাবার আগে হীরুর খুব ইচ্ছা করে এ্যানার সঙ্গে আবেগ এবং ভালবাসার কিছু কথা বলতে। রেস্টুরেন্টের কথা না, সংসারের কথা না, অন্য রকম কিছু কথা। যা বলতে হয় অস্বাভাবিক নরম গলায়। যা বলার সময় গলার স্বর কেঁপে যায়, বুকের গভীরে সুখের মত কিছু ব্যথা বোধ হয়। হীরু এসব কথা কখনো বলতে পারে না। বলতে গেলেই এ্যানা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, চুপ কর তো এই সব কথা কোথেকে শিখলে। ছিঃ।

হীরু আহত হয়ে বসে-ছিঃর কি আছে?: ঘুমাও। সিনেমা সিনেমা কথা আমার অসহ্য লাগে।হীরুর চোখে পানি আসার উপক্রম হয়। চোখের পানি আটকাতে তার খুব বেগ পেতে হয় এ্যানা এই ফাঁকে সংসারের কথা নিয়ে আসে। এইসব কথা শুনতে হীরুর একেবারে ভাল লাগে না। তবু সে মন দিয়ে শুনে। এ্যানার সঙ্গে কথা বলারও আলাদা আনন্দ আছে। এই মেয়েটি একান্তই তার অন্য কারোর নয় সায়ের সঙ্গে গা লাগিয়ে তারা দু’জন কথা বলছে-এও তো এক পরম বিষ্ময় তার মত ক’জন মানুষের এই সৌভাগ্য হয়? হীরু ভয়ে ভয়ে এ্যানার গায়ে হাত রাখে। সারাক্ষণই তার মনে হয় এই বৃত্তি এ্যানা তার হাত সরিয়ে দিল। এ্যানা হাত সরায় না, এও কি কম আনন্দের ব্যাপার? এ্যানা ঘুমঘুম গলায় বলে, তিথি আপা সারাদিন কোথায় কোথায় ঘুরে বস তো?: জানি না।: কারো সঙ্গে কথাও বলে না। চুপচাপ থাকে: একেক জনের একেক স্বভাব।: তিঘি আপাকে নিয়ে অনেক আাব্জেবাজে কথা শুনি-এসব কি সত্যি।: টুকু যে কিছু করে না, পড়াশুনা না কিছু না- রাতদিন ঘুরাফিরা। তোমরা কিছু: বললেও শুনে না।: বলে দেখেছ কখনো?ইরুর ঘুম পায়। সে কোন উত্তর দেয় না। এ্যানা শান্তভঙ্গিতে বলে, তুমি হচ্ছসংসারের বড়। তোমাকেই তো সব দেখতে হবে।: দেখাদেখি করে কিছু হয় না-সব ভাগ্য।: আমার কলেজে ভর্তির ব্যাপারেও তো তুমি কিছু বলছ না।হীরণর ঘুম কেটে যায়। সে শংকিত গলায় বলে, তুমি কলেজে পড়বে না-কি?: পড়ব না-পড়ব না কেন?: মেয়েছেলের পড়াশোনার কোন দরকার নেই শুধু শুধু সময় নষ্ট আর পয়সা নষ্ট: এইসব বাজে কথা তোমাকে কে শিখিয়েছে?: শেখানোর কি আছে? সবাই তো জানে।: আজেবাজে কথা আর আমার সামনে বসবে না।

পৃষ্ঠা:৭৮

: আচ্ছা।ঃ গা থেকে হাত সরাও। হাত সরিয়ে ঘুমাও।একবার ঘুম কেটে গেলে হীরুর আর সহজে ঘুম আসতে চায় না। সে গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকে। এ কড়িতে গভীর রাত পর্যন্ত আরো অনেকেই জাগে। আগেন মিনু, প্রায় রাতেই তাঁর এক ফোঁটা ঘুম আসে না। জেেগ তিমি ও অরু। দু’জন এক খাটে ঘুমুয়। দু’জনই জানে অন্যজন জেগে আছে তবু একজন অন্যজনকে তা জানায় না। শুধু নিশ্চিন্ত মনে ঘুমান আগাবুদ্দিন। আজকাল রাতে তার ভাল ঘুম হয়। এক ঘুমে রাত শেষ করে দেন। ঘুমের মধ্যে নানান রকম স্বপ্ন দেখেন। চোখে দেখতে পান না বলেই বোধ হয় রাতের স্বপ্নগুলির জন্যে মনে মনে অপেক্ষা করে থাকেন। তাঁর কাছে স্বপ্নের মানুষগুলিকে বাস্তবের মানুষদের চাইতেও অনেক বেশি সুন্দর মনে হয়।জুন মাসের মাঝামাঝি অরুর চাকরি হয়ে গেল। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে পোস্টিং। একটি বিদেশী এনজিওর অস্থায়ী চাকরি। চাকরির মেয়াদ তিন থেকে চার মাস। একুশ শ’ টাকা বেতন। খাওয়া-থাকা ফ্রী। হালুয়াঘাটে গারো ছেলেমেয়েদের জন্যে স্কুল করা হয়েছে। সেই স্কুলে টিচার। অকে, বাংলা, ইংরেজীর সঙ্গে সঙ্গে হাতের কাজ সেলাই এসবশেখাতে হবে।টুকু বলল, আপা আজ দিনের মধ্যে ওদের জানাতে হবে তুমি যাবে কি যাবে না যদি যাও তাহলে আজই ঢাকার হেড অফিসে জয়েন করবে। আজ থেকেই তোমার বেতন শুরু হবে। তুমি যাবে?: বুঝতে পারছি না।টুকু বিরক্ত হয়ে বলল, সবই তো বুঝিয়ে বললাম, আর কি বুঝতে পারছ না? চাকরি করতে পারব কি পারব না-এইটাই বুঝছি না। আমাকে দিয়ে কিএইসব হবে?: অন্য মেয়েরা কিভাবে করে?: আমি কি অন্য মেয়েদের মত?: কেন, তুমি আলাদা কিভাবে?: তুই বুঝতে পারছিস না। বাসা থেকে ওরা ছাড়বে কেন? এত দূরে চাকরি,ঢাকায় হলেও একটা কথা ছিল।: তুমি তাহলে চাকরি নেবে না: নেব না তো বণি নি, ভাবছি।। যা ভাবাভাবির ঘণ্টাখানিকের মধ্যে ভেবে নাও। বাসার কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করার দরকার নেই। বাসার সঙ্গে তোমার কি সম্পর্ক।: টেম্পোরারি চাকরি। চার মাস পর ছাড়িয়ে দেবে।ঃ চার মাসের অভিজ্ঞতা হল না, এই অভিজ্ঞতা তখন কাজে লাগবে। এইটা দেখিয়ে অন্য চাকরি জোগাড় করব।: কাউকে কিছু বলব না?: তুই বলছিস সত্যি সত্যি আমার চাকরি হয়ে গেছে? আমার কিন্তু বিশ্বাস হচ্ছে না।

পৃষ্ঠা:৭৯

: তুমি মনস্থির কর আপা। কি করবে ভেবে ফেল। অনেক কষ্টে এই চাকরি পাওয়া গেছে।ও চল যাই। গারি করব কি ক্যান না যেয়ে যেতে ঠিকআম ভেবেছিল বিরাট কোন অফিস হবে। দেখা গেল সে রকম কিছু না। ধানমণ্ডিতে একতসার ছোট্ট বাড়ি। বসার ঘর বেতের সোফা নিয়ে সাজান। বসার ঘরে শিশুদের হাসিমুখের বড় বড় কিছু পোস্টার। প্রতিটি পোস্টারের নিচে লেখা-এই শিশুটি যুদ্ধ চায় না সে আনন্দে বাঁচতে চায়। বসার ঘরে আরোকয়েকজন মহিলা বসে আছেন। টুকু অরুকে তাদের পাশে বসিয়ে রেখে চলে গেস। ভেতরে খবর দেয়া হয়েছে। যথাসময়ে ডাক পড়বে। যে ভদ্রলোক কথা বলবেন তার নাম ডঃ বরাট গোরিং। ফিলসফির অধ্যাপক ছিলেন। বর্তমানে এই সংস্থার প্রধান। অরু বলগ, আমি তো ইংরেজী বলতে পারি না, উনার সঙ্গে কথা বলব কি করে?৪ উনি বাংলা জানেন। তোমার চেয়ে ভাল বাংলা বলেন।অর অস্বস্তি দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। ঘন্টাখানিক বসে থাকার পরও তার ঢাক পড়ল না। মরুব ধারণা হল ভদ্রলো হয়ত তার কথা ভুলেই গেছেন। তার কি উচিত চলে যাওয়া? না-কি তার উচিত যাবার আগে ভদ্রলোকের সঙ্গে নিজেই গেচে গিয়েকথা বলা?: মিস শাহানা বেগম কি আপনার নাম?মরু শূন্যদৃষ্টিতে ভদ্রলোকের দিকে তাকাল, শাহানা বেগম তারই নাম। এই নামে কেউ কখনো ডাকে না। সবাই অরু ডাকে। এই বিদেশীর মুখে শাহানা নামটা কি রকম অচেনা লাগছে। আর এ রকম একজন বিদেশী এত সুন্দর করে বাংলা বলছে কিভাবে?: আপনার নাম কি মিস শাহানা।: আমি এতক্ষণ আপনাকে বসিয়ে রেখেছি সেই কারণে আপনি কি আমার উপররাগ হয়েছেন?: দ্বি-না আমি রাগ করি নি। রাগ করব কেন?: আপনি কি আমার বাংলা বুঝতে পারছেন?। পারছি। আপনার খুব সুন্দর বাংলা।: আসুন আমার ঘরে আসুন।সরু অবাক হয়ে লক্ষ্য করণ শুরুর অস্বস্তির কিছুই এখন আর তার নেই। গাড়। নীল রঙের চকচকে হাওয়াই শার্ট পরা এই বিদেশীকে তার ভাল লাগছে। দূরের কেউ বসে মনে হচ্ছে না। এ রকম মনে হবার কারণ কি? সে চমৎকার বাংলা বলছে- এটাই কি একমাত্র কারণ? না-কি তার গলার স্বরের আন্তরিক ভাব অরুকে আকৃষ্ট কাছে? না-কি ভদ্রলোকের মাথাভর্তি সোনালী চুল? চুলগুলি হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছা করে।: মিস শাহানা।:জ্বি।: আপনার তাহলে এই ধারণা হয়েছে যে আমি ভাল বাংলা বলি।: আপনার ধারণা যথাযথ নয়। প্রায়ই আমি ক্রিয়াপদগুসি এলোমেলো করে ফেলি। তাছাড়া আপনাদের বাংলা ভাষার কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যা আমি এখনো বুঝতে পারি না। আমার কাছে খুবই অদ্ভুত মনে হয়।

পৃষ্ঠা:৮০

: কি বৈশিষ্ট্য? : যেমন ধরুন ‘দেখা’ শব্দটির মানে হচ্ছে To see. চোখ দিয়ে দেখা। অন্য ‘আপনারা নানানভাবে শপটি ব্যবহার করেন-গানটা শুনে দেখি। মিষ্টিটা খেতে দেখি একটু বসে দেখি। গান শোনা, মিষ্টি খাওয়া বা বসার সঙ্গে চোখের কোন সম্পর্ক নেই। অথচ প্রতিটি ক্ষেত্রে আপনারা ‘দেখা’ শব্দটা ব্যবহার করছেন। অরু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইস। এভাবে সে কখনো ভাবে নি। সত্যি তো মজার ব্যাপার। : তারপর মিস শাহানা বেগম, বাংলা ভাষা নিয়ে গবেষণা এখন স্থগিত। অন্য বিষয় নিয়ে কথা বলি-চাকরিটি কি আপনার পছন্দ হয়েছে? : জ্বি, হয়েছে। : পছন্দ হবার মত তেমন কিছু নয় তবু খারাপ লাগবে না জায়গাটা খুব সুন্দর। তাছাড়া যাদের সঙ্গে আপনি কাজ করবেন তাদের আপনার ভাল লাগবে। আপনি কাজ করবেন শিশুদের নিয়ে। শিশুদের মত সুন্দর আর কিছু তো হয় না। তাই না? : জ্বি অবশ্যই। এখন বাজছে একটা পাঁচ। চা খাবার সময় নয় তবু যদি আপনি আমার সঙ্গে চা খান আমি খুশি হব। লাঞ্চ খেতে বলতে পারছি না কারণ আমার লাঞ্চের একটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। অরু চা খেল। পটে করে চা নিয়ে এসেছিল। ভদ্রলোক অরুকে লজ্জায় ফেলে নিজেই চা বানিয়ে এগিয়ে দিলেন, এটা হয়ত ওদের সাধারণ ভদ্রতা। অথচ কি সুন্দর এই ভদ্রতা। : আমি আপনার অতীত ইতিহাস সবই শুনেছি। আমরা আমাদের কাজের জন্যে আপনার মত মেয়েদের খুঁজে বের করি। আমার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, আপনার মত মহিলারা সুযোগ পেলেই তাদের অসাধারণ কর্মদক্ষতা দেখানোর চেষ্টা করেন, প্রমাণ করতে চেষ্টা করেন যে, তারা তুচ্ছ নন। ভদ্রলোক গাড়ি করে অরুকে বাসায় পাঠালেন। গাড়িতে উঠবার সময়ও একটা কাও হস, তিনি নিজে এসে দরজা খুলে দিলেন বললেন, আপনি ইচ্ছা করলে আমার সঙ্গে হালুয়াঘাট যেতে পারেন। আমি আগামী সপ্তাহে বাই রোডে যাব। আর বাই রোডে যেতে না চাইলে টেনে করে চলে যাবেন। আপনার থাকা-খাওয়ার যাবতীয় ব্যবস্থা করে রাখবার জন্য আমি মেসেজ পাঠিয়ে দেব। অরু বলল, আমি আপনার সঙ্গেই যাব। বলেই তার মনে হল যে অন্যায় কোন কথা বলছে। এরকম কথা তার বলা উচিত হয় নি। ভদ্রলোক কিছু মনে করলেন বি- না কে জানে। কিছু মনে করলে খুব লজ্জার ব্যাপার হবে।অরু ভেবেছিল তার ঢাকার বাইরে চাকরি করতে যাওয়ার খবরে খুব হৈচৈ হবে। দেখা গেল কোন রকম হৈচৈ হল না। মিনু বললেন, যা ইচ্ছা কর। আমি কাউকেই কিছু বলব না। জালালুদ্দিন বললেন, অধ্যাপনা অতি উত্তম ধর্ম। পৃথিবীর সবচে বড় দান হচ্ছে বিদ্যা দান। তাছাড়া বেতন ভাল। মনে হচ্ছে খৃস্টান করে ফেলবে। ঐদিকে নজর রাখবি। এই বংশের কেউ খৃস্টান হয়ে গেলে সজ্জার সীমা থাকবে না। শুধু তিথি আপত্তি করল। নরম গলায় বলল, এদের সম্পর্কে নানান রকম গুজব আছে আপা। মেয়েদের নিয়ে ফষ্টিনষ্টি করে। ওদের সম্পর্কটা অনেক খোলামেলা, ওরা এটাকে বড় কিছুও মনে করে না। : তুই কি বলছিস আমি যাব না?

পৃষ্ঠা ৮১ থেকে  ৮৫

পৃষ্ঠা:৮১

থাকতেন।: তা বলছি না। এখানে থেকেই বা তুমি কি করবে। শুধু বলছি যে, সাবধানেনিতান্ত কাকতালায় একটা ব্যাপার ঘটল অরুণর হালুয়াঘাট রওনা হবার 24 আগের দিন-একটি রেদিন্তি চিঠি এসে উপস্থিত। প্রাপক শাহানা বেগম। প্রেরক আব্দুস মতিন। খাম খুলে দেখা গেল বিয়ের নিমন্ত্রণ পত্র। ধূপচাঁচা গ্রামের মৌলানা আবু বকর সাহেবের তৃতীয় কন্যা মোসাম্মত নুরুন নাহার বেগম (শাইলীর। সহিত কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের জনাব আব্দুল কুদ্দস সাহেবের প্রথম পুত্র আব্দুল মতিনের শুভ্র বিবাহ। বিবাহ অনুষ্ঠানে সবান্ধব উপস্থিত থাকার জন্যে অনুরোধ করা হয়েছে। অরুকে আহত করবার জন্যেই চিঠি পাঠান। তবে অরু আহত হল কি-না বোঝা গেল না। তার চেহারায় মনের অবস্থার কোন ছাপ পড়ল না।অরু হালুয়াঘাট পৌঁছে কোন খবর দিল না। তিথি পরপর দুটি চিঠি লিখল-সেই চিঠিরও জবাব এল না। এক মাসের মাথায় টুকু চিন্তিত হয়ে ধানমণ্ডির বাসায় খোঁজ নিতে গেল। ডঃ গোরিং অফিসেই ছিলেন। তিনি সব শুনে চিন্তিতমুখে বললেন- চিঠির জবাব দিচ্ছেন না কেন তা তো বুঝতে পারছি না। তার সঙ্গে গত সপ্তাহেই দেখা হয়েছে। সে বেশ ভাল আছে- এইটুকু বলতে পারি।: চিঠি কি হাতে পৌঁছোচ্ছে না।: না পৌঁছানোর কোন কারণ নেই। তাছাড়া তোমাদের চিঠি না পেলেও তো সে তার খোঁজ দেবে। দেবে না।: দেওয়ার তো কথা।: আমার কি মনে হয় জান-সে নিজেকে আড়াল করে ফেলতে চেষ্টা করছে। পরিচিত জগৎ থেকে লুকিয়ে পড়তে চাইছে। তোমাদের বাংলাদেশী মেয়েরা সামাজিক অমর্যাদার ব্যাপারে খুব সেনসেটিভ। তুমি বরং প্রিপেড টেলিগ্রাম করে দাও। তারপরেযদি জবাব না আসে নিজেই চলে যাও। হালুয়াঘাট এমন কিছু দূরের জায়গা নয়। প্রিপেড টেলিগ্রামের জবাব এল। অরু জানিয়েছে-সে ভাল আছে। তার কিছুনি। পর টুকুর কাছে দুই লাইনের চিঠি এল।আমি ভাল আছি। কাজ শুরু করেছি। আমাকে নিয়ে শুধু শুধু কেউ যেন দুশ্চিন্তা না করে।ইতি-অরু আপা। অরুণর সঙ্গে তার পরিবারের এই হচ্ছে শেষ যোগাযোগ। এই পরিবারের সদস্যরা অরুর আর কোন খোঁজ পায় নি। টুকু এবং গ্রীন বয়েজ ক্লাবের সেক্রেটারি বজলুর রহমান খুঁজে বের করার অনেক চেষ্টা করল তেমন কিছু জানা গেল না। এই এনজিও কাজকর্ম গুটিয়ে স্বদেশে চলে গেছে। এখানকার কেউ তেমন কিছু বলতে পারে না। ডঃ গোরিং একজন বাঙালী মহিলাকে সঙ্গে নিয়ে দেশের বাইরে চলে গেছেন- এইটুকু জানা গেল। তবে সেই একজন অরু কি-না তা কেউ নিশ্চিত হয়ে বলতে পারল না। নিউইয়র্ক এনজিওর হেড অফিসে যোগাযোগ করেও কিছু জানা গেল না। হেড অফিস জানাল ডঃ গোরিং এখন আর তাদের সঙ্গে কর্মতে নয়। কাজেই তারা তাঁর বর্তমানঅবস্থান সম্পর্কে কিছু বলতে পারছে না।শুধু হীরুর পীর সাহেব হীরুর কান্নাকাটিতে গলে গিয়ে জ্বীনের মারফত খবর এনে দিলেন- অরু ভালই আছে। তার একটি কন্যাসন্তান হয়েছে। মাতা ও কন্যা

পৃষ্ঠা:৮২

সুখেই আছে। পীর সাহেবের কোন কথাই হীরু অবিশ্বাস করে না। এইটা করল। ক্ষীণ স্বরে বলল, কি বললেন স্যার? কন্যাসন্তান হয়েছে?: হ্যা বাবা হয়েছে: জ্বানের মারফত খবর পেয়েছি।: জ্বীন কোন ভূল করে নি তো? মানে মিসটেক। মানুষ যেমন ভুল করতে পারেজ্বীনও নিশ্চয়ই পারে। : তুমি এখন যাও হীরু।: অন্য একটা জ্বীনকে দিয়ে যদি স্যার একটু ট্রাই করেন-মানে আমরা খুব কষ্টে আছি।তুমি বিদেয় হও তো।: হীরু মুখ কালো করে চলে এল। এই প্রথম পীরের আস্তানা থেকে বের হয়ে সে মনে মনে বলল-শালা ফাটকাবাজ।তিথি অনেকক্ষণ ধরে হাঁটছে। হাঁটতে তার ভাল লাগছে। আকাশ ঘন নীল। কলমলকরছে। রোদে শিশুদের গায়ের ওম। এমন সময় হাঁটতে ভাল লাগারই কথা। তিথিরকোন গন্তব্য নেই। একটা ফুলওয়ালীর কাছ থেকে সে ফুল কিনল। একজন ভদ্রলোকতার কাছে জানতে চাইলেন, দিলু রোড কোন্ দিকে? সে ভদ্রলোককে খুব ভাল করেদিলু রোডে যাবার পথ বলে দিল। ভদ্রলোক কৃতজ্ঞচোখে চলে যাচ্ছেন। সে হাঁটছে। বড়ভাল লাগছে হাঁটতে। একেকটা দিন এ রকম হয় হটিতে ভাল লাগে। বিশেষ করে যখন গন্তব্য বলে কিছু থাকে না। যাবার কোন বিশেষ জায়গা না থাকার মানেই হচ্ছে সব জায়গায় যাওয়া যায়।তিথি বিকেলের দিকে নিতান্ত ক্লান্ত ও বিরক্ত হবার পরই নাসিমুদ্দিনকে দেখতে গেল। সে অনেকদিন ধরে হাসপাতালে পড়ে আছে। তাকে দেখতে যাওয়া হয় না। বিশেষ কোথাও যেতে তিথির ইচ্ছা করে না। নাসিমুদ্দিন যদি রাস্তায় থাকত বেশ হত। অনেকবার দেখা হত।নাসিম বত্রিশ নম্বর ওয়ার্ডের বারান্দায় পড়ে আছে। তিথিকে দেখে উজ্জ্বল চোখে তাকাল, এস তিথি এস। একমাত্র ভূমিই আস। আর কেউ আসে না। আমার স্ত্রীও আসে না।: আপনি কেমন আছেন?: ভাস না: পায়ে কি যেন হয়েছে-কেট কিছু বলেও না। না না-কি কেটে বাদ দিতে হবে। পাপে ধরেছে, বুঝলে তিথি পাপ। এই জীবনটা মহা পাপ করতে করতে কাটালাম।: খুব ব্যথা হয়?: আমার কথা বাদ দাও। তুমি কেমন আছ?: ভাল আছি।তোমার ভাইয়ের ব্যবসা না-কি ভাল হচ্ছে?: হ্যাঁ।: তোমাকে সহ্য করে তো। একবার টাকা-পয়সার মুখ দেখলে পুরোনো কথা কেউ মনে রাখে না। তোমার ভাই কি তোমাকে হাতখরচ দেয়? : দেয়।

পৃষ্ঠা:৮৩

: ভাল। খুব ভাল। শুনে খুণি হলাম। তোমার মুখ এমন শুকনো লাগছে কেন সিথিঃ কিছু খাবে? একটা কলা খাও এত হাসপাতাল থেকে কলা ডিম এহসান দো, খেতে পারি না। তুমি করাটা খাও।তিথি বিনা বাক্যব্যয়ে কলা খেল। তার ক্ষিধে পেয়েছে আসলেই সারনি কোন খাওয়া হয় নি।: তিথি।: জ্বি।: তোমার যে একটা বোন কোথায় চলে গিয়েছিল তাকে কি পাওয়া গেছে?: খ্রি-না।: ঢাকা শহর হল অদ্ভুত শহর। এই শহর হঠাৎ মানুষ গিলে খেয়ে ফেলে স্বর খোঁজ পাওয়া যায় না।:আমি উঠি?: না-না বস। আর একটু বস। কেউ আসে না। তুমি মাঝে-মধ্যে আসে ভাল লাগে। পাপের শাস্তি হচ্ছে। মহাপাপ করেছিলাম: আপনি কোন পাপ করেন নি। আপনি না থাকসে আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াতাম? আপনার কাছে আমার অনেক ঋণ।: এইটা ভুল কথা বদলে তিথি খুব ভুল কথা। আমাদের কারোর কাছে কারোর কোন ঋণ নাই।: যাই এখন?: বস। আরেকটু বস।তিথি বসে। তার তো যাবারো তেমন জায়গা নেই। বসে থাকতেই বা অসুবিধা কি? রাত বাড়ে ক্যানসারে স্বাক্রান্ত মানুষটার মাথার কাছে তিথি বসে থাকে। এক সময় নাসিম বনে- এখন চলে যাও। রাত হচ্ছে। তিথি বলে-মারেকটু বসি কোন অসুবিধা নেই।জালাবুদ্দিনের চোখের অপারেশন হল প্রাইভেট ক্লিনিকে হীরু দরাজ গলায় বলল, ফাদার-মাদারের জন্যটাকা খরচ করব না তো কোন্ শালার জন্যে করব? টাকং- পয়সা হচ্ছে আমার কাছে তেজপাতা, অপারেশনের পর ডাক্তার চোখে হলুন আসো ফেলে বললেন, কিছু দেখতে পাচ্ছেন, ক’টা আঙুল বলুন তো?: পরিষ্কার বলতে পারছি না। মনে হচ্ছে তিনটা।। তার মানে কিছু দেখছেন না।: কে বলল দেখছি না? পরিকার দেখছি। আপনার আঙুল হচ্ছে দু’টা-ঠিক না? ডাক্তারের মুখ বিমর্ষ হয়ে যায় কিন্তু জালালুদ্দিন বড়ই আনন্দ বোধ করেন। এতগুলি টাকা শুধু তার জন্যই খরচ হচ্ছে-এটা কি কম কথা? দরকার হলে আরো খরচ হবে হীরু তো বলেছে- টাকা-পয়সা তার কাছে তেজপাতা। এ হচ্ছে তার গেষ্ট সন্তান। শুরুতে বুঝতে পারেন নি, শুরুতে আসলে কিছুই বোঝা যায় না। “মনিং শোজ সা ডে।” কথাটাই ভুল। দেখা যায় সকালে ঝলমলে আলো দুপুর হলেই চারদিক অন্ধকার করে বড়।এসব কথা সব বদলে ফেলা দরকার। কোমলমতি শিশুদের ভুল কথা শেখান হচ্ছে। উচিত না। কাজটা খুবই অনুচিত হচ্ছে। ঃ ও বাবা হীরু।

পৃষ্ঠা:৮৪

: চোখটা তো মনে হয় দেত্রেই গেল। ডাক্তারের হাতের আঙুলগুলি পরিষ্কার দেখলাম, গুনতে পারলাম না। দেখা এক মিনিস মার গুনা এক জিনিস। ঠিক কি-না বাবা বল।: তা তো ঠিকই। এখন চল বাড়ি যাই। : আরো কয়েকটা দিন থাকি। এদের আদর-যত্ন অসাধারণ একটা নসে আছেনাম রুচিতা। ভাবছি এই মেয়েটাকে ধর্ম মেয়ে বানিয়ে ফেলব। অসাধারণ একটা মেয়ে। পহেলা শ্রাবণ হীরু নতুন বাড়িতে উঠল। সেই উপলক্ষে কাঙালী ভোজ হল। মিলান হল। বাড়ি বিশাল কিছু না, তবে ভবিষ্যতে বড় হবে। তিনতলা ফাউন্ডেশন। নতুন বাড়িতে ঢুকে আনন্দে ঘুমুতে পারেন না জালালুদ্দিন ঘন ঘন এ্যানাকে ডাকেন।: ও বৌমা। বৌমা।এ্যানার হাতে শতেক কাজ তবু সব বিরুক্তি মুছে পাশে দাঁড়ায়। জালালুদ্দিন ধরা গলায় বললেন, সব তোমার জন্যে হচ্ছে গো মা-সবই তোমার জন্যে। তোমার একটাছবি বড় করে বাঁধিয়ে আমার ঘরে সাজিয়ে রাখ তো মা। : সাজিয়ে রাখলে কি হবে? আপনি তো আর দেখতে পারবেন না?: আমি না পারলাম। অনো দেখবে। সেই আসবে তাকেই বলব, এই দেখ গোসবই আমার বৌমার ভাগ্যে হল। এই হচ্ছে আমার বৌমা : আপনি বড় বেশি কথা বলেন। কথা কম বলবেন চা খেতে চাইলে বলেন চাএনে দিচ্ছি। : একটু কফি দাও। কফির কাছে চা দাঁড়ায় না গো মা কফির মজাই অন্য।এ্যানা কফি আনতে যায়। আপনমনে কথা বসেন জালালুদ্দিন। নিজের মনে কথা বলতে তার বড় ভাল লাগে। জীবনটা বড়ই মধুর মনে হয়। বড়ই সুখের বলে বোধ হয়। গুনগুন করে আজকাল গানও গান-ওগো দয়াময়। বড় দয়া তোমার মনে ওগো দয়াময়- সবই তাঁর স্বরচিত গান তিনি যে একজন স্বভাবকবি এই তথা আগে জানা ছিল না। হীরা বেশ কিছু কর্মচারীও এই বাড়িতে থাকে তাদের সাথেও তার বড় মধুর সম্পর্ক। জীবন কি? জীবনের অর্থ কি? এসব গূঢ় কথা তিনি তাদের বলেন। খুব আগ্রহ নিয়ে বলেন-৪ ভাগ্য- সবই ভাগ্য এই জিনিসটা তোমরা খেয়াল রাখবা আজ যে রাজা কাল সে পথের ফকির। এর কারণ কি? এর কারণ ভাগ্য এখন ৩’। বি…তিনি সবাইকে ভাগ্য কি তা ব্যাখ্যা করেন। সবাই মন দিয়ে শুনে। আশ্চর্যের ব্যাপার মন নিয়ে শুনে টুকু। টুকু কেন এত আগ্রহ নিয়ে বাবার কথা শুনে তা জালালুদ্দিনও ঠিক বুঝতে পারেন না।টুকুর ঘুরে বেড়ানোর স্বভাব আরো বেড়েছে। মাঝে মাঝে মাসের পর মাস তার কোন রকম খোঁজ পাওয়া যায় না। তারপর হঠাৎ একদিন মুখ ভর্তি দাড়ি-গোঁফ নিয়ে উদয় হয়। হীরু ভীষণ বিরক্ত হয়, আমার আপন ভাই ঘরে মার আমার কি-না তিন হান্দার টাকা বেতন দিয়ে ম্যানেজার রাখতে হয়। আফসোস। বড়ই আফসোস। এখন আমার দরকার নিজের দোক।হীরুর নিজের লোকের অভাবে সত্যি সত্যি অসুবিধা হয়। অনেক টাকার সেন- দেন। সব একা সামলাতে হয়। মাথার ঠিক থাকে না। টুকু লেখালেখির চেষ্টা করে। তার খুব ইচ্ছা করে নিজেদের জীবনের কথাটাই সুন্দর করে লিখে ফেলতে। দুঃখ,

পৃষ্ঠা:৮৫

বেদনা ও গ্লানির মহান সংগীতকে স্পর্শ করতে ইচ্ছা করে। পারে না। তবে মনে হয় পারবে। একদিন না একদিন জনম জনমের পর বের হয়ে আসবে।ইরু নিজেদের ব্যবহারের জন্যে রিকন্ডিসান্ড টয়োটা স্টারলেট একটা কিনেছে। সেই গাড়িতে রোজ জালালুদ্দিন সাহেব খানিকক্ষণ হাওয়া খান। রোজ খানিকটা ফ্রেশ অক্সিজেন না নিলে তার না-কি রাতে ভাল ঘুম হয় না।এই পরিবারের একজন মাত্র মানুষ রাতে এক ফোঁটা ঘুমুতে পারেন না। তিনি মিনু চোখ মেলে তিনি সারারাত তিথির পাশে শুয়ে থাকেন। মাঝে মাঝে একটা হাত রাখেন তিথির গায়ে। ডিৰি সেই হাত সরিয়ে দিয়ে কঠিন গলায় বলে-গায়ে হতে দিও না মা।: এত আদর করে গায়ে হ’ত রাখি তুই এমন করিস কেন মা?তিথি কঠিন গলায় বলে, গায়ে হাত দিলেই মনে হয় পুরুষ মানুসের হাত কেমন গা ঘিনঘিন করে।: মা-রে তুই শুধু আমাকে শান্তি দিচ্ছিস কেন? :আমি কাউকে শাস্তি দিচ্ছি না মা।: এত শখ করে হীরু গাড়ি কিনেছে একবার চড়ে দেখবি না? । চড়ব। কালই চড়ব। এখন ঘুমাও। মিনু ঘুমুতে চান। ঘুমুতে পারেন না। রাতএক সন্ধ্যায় মনুজর সাহেব হীরুদের বাড়িতে বেড়াতে আসেন। রমরমা দেখে বিম্বিত ও মুগ্ধ হন। তিনি মেয়ে বিয়ে দিচ্ছেন। সেই বিয়ের দাওয়াতের কার্ড নিয়ে এসেছেন। চারদিকের কায়দা-কানুন এদেশে হকচকিয়ে গেছেন। তিথি বের হয়ে বলল, কেমন আছেন চাচা? তিনি ইরককিয়ে বেরজন। বিড়বিড় করে বললেন, ভাল আছি। আমি ভাল আছি। তুমি কেমন সব মা তিথি তীক্ষ্ণ গলায় বলে, আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন? ঐ যে অভাবের সমানকার ঘর্মেয় যেতাম। আপনি এত আদর করতেন। মনে আছে। মনজুর সাহেব কিছু হলেন ল্লো, দুখ শজা করে বসে থাকেন।। মেয়েরা বিয়ে দিচ্ছেন প্রাপ্তিঃ। বড় মেয়ে না ছোট মেয়ে?: ছোট দেয়ে, চযও বিচ্ছুন্ন: যাব। অবশ্যই ধাবী আপনার কাছ থেকে আদর খেয়ে আসব। আপনার আদরেরকথা সব সময় আমার মনে হয়।: উঠ ডিবি।ঃ না, না মাপনি কেন উঠবেন। আমি আপনাকে চা বানিয়ে খাওয়াব। আপনার মনে আছে চাচা আপনি একদিন হালুয়া বানিয়ে চামুচে করে আমাকে খাইয়েছেন। মনে আছে, না মনে নেই? মনজুর সাহের বড়ই অস্বস্তি বোধ করেন। তার অর্থপ্তি দেখে গভীর করুণায় তিথির মন হঠাৎ কেমন যেন ভরে যায়। হঠাৎ মনে হয় কি দোস এই লোকটার? কোন দোষই তো নেই।

হোম
ই-শো
লাইভ টিভি
নামাজ শিক্ষা
গেইমস
চাকুরি