Skip to content

ইসলামি নৈতিকতা

পৃষ্ঠা ১ থেকে ২০

পৃষ্ঠা:০১

ইসলামী নৈতিকতা

সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য। দরূদ ও সালাম অবতীর্ণ হোক তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামের উপর। আমরা সেই আল্লাহর প্রশংসা করি, যিনি ইসলামের মত সম্পদ দিয়ে আমাদের প্রতি বড় অনুগ্রহ করেছেন। আর আমাদেরকে উত্তম চরিত্রে চরিত্রবান হওয়ার প্রতি অনুপ্রাণিত করেছেন এবং এর জন্য অঢেল নেকী দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন। সুন্দর চরিত্র হলো, নেক লোক এবং আম্বিয়ায়ে কেরামদের গুণসমূহের এমন এক বিশেষ গুণ, যদ্দ্বারা মর্যাদা-সম্মান বৃদ্ধি পায়। আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসা ল্লামের সমূহ চারিত্রিক উৎকর্ষকে কুরআনের একটি আয়াতে এইভাবে একত্রিত করে দিয়েছেন যে,

وَ إِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ﴾ القلم ٤٠

অর্থাৎ, ‘আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী।’ (৬৮ঃ ৪) উত্তম চরিত্র আপসে প্রেম-প্রীতি ও ভালবাসার জন্ম দেয়। পক্ষান্তরে নোংরা ব্যবহার ও জঘন্য চরিত্র পারস্পরিক বিদ্বেষ ও হিংসা-বিবাদ সৃষ্টি করে। যার চরিত্র উত্তম, সে দুনিয়া ও আখেরাতে সর্বত্র সুফল লাভ করে। কেননা, আল্লাহ তার মধ্যে তাকওয়া ও মহৎচরিত্র উভয় গুণকে একত্রিত করে দিয়েছেন। যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেন, أكثر ما يدخل الناس الجنة تقوى الله و حسن الخلق الترمذي والحاكم

পৃষ্ঠা:০২

অর্থাৎ, ‘সব থেকে অধিকহারে যে জিনিসটি লোকদের জান্নাতে প্রবেশ করাবে, তা হলো, খোদাভীতি ও উত্তম চরিত্র।’ (তিরমিযী- হাকিম) আর উত্তম চরিত্র হলো, হাস্যময় হওয়া, সুন্দর ব্যবহার প্রদর্শন করা, কোন মানুষকে কষ্ট না দেওয়া, কথা-বার্তা ভাল বলা, রাগ দমন ও গোপন করা। কষ্ট সহ্য করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেন, بعثت لأتمم مكارم الأخلاق )) أحمد والبيهقي অর্থাৎ, ‘আমি প্রেরিত হয়েছি উত্তম চরিত্র ও নৈতিকতার শিক্ষা দানের জন্য।’ (আহমদ-বায়হাকী) আর তিনি আবু হুরায়রা (রাঃ) কে এই বলে অসীয়ত করেন যে, হে আবু হুরায়রা (রাঃ)! সুন্দর চরিত্র অবলম্বন কর। আবু হুরায়রা জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সুন্দর চরিত্র কি? তিনি (সাঃ) বললেন, تصل من قطعك، وتعفو عمن ظلمك، وتعطي من حرمك البيهقي অর্থাৎ, ‘যে সম্পর্ক ছিন্ন করে, তুমি তা জোড়ার চেষ্টা কর। যে তোমার উপর যুলুম করে, তুমি তাকে ক্ষমা কর। আর যে তোমাকে বঞ্চিত করে, তুমি তাকে দাও।’ (বায়হাকী) প্রিয় মুসলিম ভাইয়েরা! লক্ষ্য করুন, প্রশংসিত এই বৈশিষ্ট্যের কত বড় প্রভাব এবং কত অজস্র নেকী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেন, (( إن الرجل ليدرك بحسن الخلق درجة الصائم القائم أحمد অর্থাৎ, ‘নিশ্চয় মানুষ মহৎচরিত্রের গুণে রাত জেগে ইবাদতকারী

পৃষ্ঠা:০৩

রোযাদারের মর্যাদা পায়।’ (আহমদ) অনুরূপ তিনি মহৎচরিত্রকে ঈমান পূর্ণকারী বিষয়ের মধ্যে গণনা করেছেন। যেমন, তিনি বলেন, (( أكمل المؤمنين إيمانا أحسنهم أخلاقا الترمذي অর্থাৎ, ‘মুমিনগণের মধ্যে পরিপূর্ণ ঈমানদার তো সেই ব্যক্তি, যার চরিত্র সব থেকে বেশী উন্নত।’ (তিরমিযী) প্রিয় ভাইয়েরা! রাসূল সাল্লা- ল্লাহু আলাইহি অসাল্লামের নিম্নের বাণীটির প্রতি খেয়াল করুন। তিনি বলেন, (( أحب الناس إلى الله أنفعهم، وأحب الأعمال إلى الله عز وجل سرور تدخله على مسلم، أو تكشف عنه كربة، أو تقضي دينا، أو تطرد جوعا، ولأن أمشي مع أخي المسلم في حاجة أحب إلى من أن اعتكف في المسجد شهرا الطبراني অর্থাৎ, ‘মানুষের সব থেকে বেশী উপকারকারী ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট বেশী প্রিয়। আর আল্লাহর নিকট সব চেয়ে উত্তম কাজ হলো, এমন আনন্দ যা তুমি কোন মুসলমানের অন্তরে প্রবেশ করিয়েছ, কিংবা তার কোন কষ্ট দূর করেছ, অথবা তার ঋণ পরিশোধ করে দিয়েছ, বা তার ক্ষুধা নিবারণ করেছ। আমি যদি আমার কোন মুসলমান ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণের জন্য যাই, তাহলে এটা আমার নিকট মসজিদে এক মাস এতেকাফ করার থেকে শ্রেয়।’ (তাবরানী) মুসলিম ভাই! সহজ সরল ও নরম বাক্যালাপে তোমার নেকী হয় এবং তোমার জন্য তা সাদকায় পরিণত হয়। যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেন,

পৃষ্ঠা:০৪

الكلمة الطيبة صدقة)) متفق عليه অর্থাৎ ‘সুন্দর বাক্য তোমার জন্য সাদকায় পরিণত হয়।’ (বুখারী- মুসলিম) আর এ সব এই জন্য যে, সুন্দর বাক্যের দ্বারা ভাল প্রভাব সৃষ্টি হয়। তা মানুষের অন্তরকে জুেড়ে। পারস্পরিক ভালবাসা সৃষ্টি করে। হিংসা-বিদ্বেষ দূরীভূত করে। উত্তম চরিত্রে চরিত্রবান হওয়ার প্রতি এবং কষ্টের সময় সহ্য করার প্রতি উৎসাহ দানকারী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামের উপদেশা- বলীর সংখ্যা অনেক। তন্মধ্যে তাঁর এই বাণী, (( اتق الله حيثما كنت، واتبع السيئة الحسنة تمحها، وخالق الناس بخلق حسن الترمذي অর্থাৎ ‘সর্বত্র আল্লাহকে ভয় কর, মন্দ ও অসৎ কাজ হয়ে গেলে, সৎকাজ কর, তা পাপ কাজকে মুছে দেবে। আর মানুষের সাথে সদাচারণ কর।’ (তিরমিযী) সর্বত্র ও সব সময় সৎচরিত্রতা অবলম্বন করা মুসল- মানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই চরিত্র তাকে মানুষের নিকট প্রিয় পাত্র করে তুলে। প্রত্যেক পথে ও প্রত্যেক স্থানে তাকে মানুষের অতি নিকটে করে দেয়। এমন কি মানুষ তার স্ত্রীর মুখে যে লোকমা তুলে দেয়, তার দরুন সে নেকী পায়, এ কথারও ঘোষণা ইসলাম দিয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেন,وإنك مهما أنفقت من نفقة فهي صدقة، حتى اللقمة ترفعها إلى فيامرأتك البخاري

পৃষ্ঠা:০৫

অর্থাৎ, ‘তুমি যা কিছু (আল্লাহর পথে) ব্যয় কর, সবই সাদকায় পরিণত হয়। এমন কি যে লোকমা তোমার স্ত্রীর মুখে তুলে দাও, তা- ও।’ (বুখারী) প্রিয় ভাইয়েরা! মুমিনরা আপসে ভাই ভাই। কাজেই প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অত্যাবশ্যক হলো, সে নিজের জন্য যা ভালবাসবে, তা তার অন্য মুসলিম ভাইয়ের জন্যও বাসবে। লক্ষ্য করে দেখুন আপনি কী ভালবাসেন, সেটা আপনার অন্য ভাইয়ের জন্যও পেশ করুন। আর আপনি যা অপছন্দ করেন, তা তার থেকে দূরে রাখুন। খবরদার! যে ব্যক্তি আল্লাহকে প্রভু বলে, ইসলামকে দ্বীন হিসাবে এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামকে নবী বলে বিশ্বাস করেছে, তাকে ঘৃণা করবে না। কারণ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম এ থেকে সতর্ক করেছেন। যেমন, তিনি সাল্লাল্লা আলাইহি অসল্লাম বলেন, بحسب امرئ من الشر أن يحقر أخاه المسلم مسلم  —-অর্থাৎ, ‘কোন মুসলমান ভাইকে ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখা পাপ ও অন্যায় বলে পরিগণিত হওয়াতে যথেষ্ট।’ (মুসলিম) প্রিয় ভাই! পথ খুবই সহজ। ইবাদতটি খুবই আসান। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম আবুদদারদা (রাঃ) কে লক্ষ্য করে বলেন, ألا أدلك على أيسر العبادات وأهونها أخفها على البدن؟ قال ابوالدرداء بلی یا رسول الله ! فقال (( عليك بالصمت، وحسن الخلق فإنك لن تعمل مثلها —–অর্থাৎ, ‘তোমাকে কি ইবাদতসমূহের মধ্যে সহজ ও শারীরিক দিক দিয়ে আরামদায়ক ইবাদতের কথা বলব না? আবুদদারদা বলল, অবশ্যই

পৃষ্ঠা:০৬

বলুন, হে আল্লাহর রাসূল! তখন তিনি বললেন, ‘তুমি নীরবতা অবলম্বন করবে এবং সদাচারণ করবে। কারণ, এর থেকে (সুন্দর) কাজ তুমি কখনোই করতে পারবে না।’ মুমিন সৎচরিত্রের গুণে রাত জেগে ইবাদ- তকারী রোযাদার মুমিনের সমান নেকী পায়। যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেন, إن الرجل ليدرك بحسن الخلق درجة الصائم القائم)) (أحمد) —-অর্থাৎ, ‘নিশ্চয় মানুষ মহৎচরিত্রের গুণে রাত জেগে ইবাদতকারী রোযাদারের মর্যাদা পায়।’ (আহমদ) আর এই জন্য পরম সম্মানী সাহাবী আবুদদারদা (রাঃ) বলতেন, (( إن العبد المسلم يحسن خلقه يدخله حسن خلقه الجنة، ويسيء خلقه حتى يدخله سوء خلقه النار)) অর্থাৎ, ‘যে মুসলিম বান্দা তার চরিত্রকে উন্নত করবে, তার এই উন্নত চরিত্র, তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে। আর যে তার চরিত্রকে নোংরা করে, তার এই নোংরা চরিত্র তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবে।’

সুন্দর চরিত্রের নিদর্শন

মহৎচরিত্রের নিদর্শনসমূহকে বিশেষ কয়েক ধরণের গুণের মধ্যে একত্রিত করে দেওয়া হয়েছে। যেমন, মানুষের অত্যধিক লজ্জাশীল হওয়া। কাউকে কষ্ট না দেওয়া। খুব বেশী সংশোধন প্রিয় হওয়া। সত্যবাদী হওয়া। কথা কম বলা। আমল বেশী করা। ভুল-ত্রুটি কম করা। অনর্থক কথা না বলা। নেক ও সৎ হওয়া। ধৈর্যশালী ও কৃতজ্ঞ হওয়া।

পৃষ্ঠা:০৭

অতিশয় তুষ্ট ও সহিষ্ণু হওয়া। কোমল, নরম ও স্বচ্ছ অন্তরের মালিক হওয়া। অভিসম্পাতকারী, অশ্লীল ও অসভ্য (চোয়াড়), চুগলখোর এবং পরচর্চাকারী না হওয়া। দ্রুততা প্রিয়, বিদ্বেষী, কৃপণ এবং হিংসুক না হওয়া। হাস্যমুখ, নরম ও মোলায়েম প্রকৃতির মানুষ হওয়া। আল্লাহর নিমিত্ত ভালবাসা। আল্লাহর নিমিত্ত সন্তুষ্ট থাকা এবং তাঁরই নিমিত্তে অসন্তুষ্ট হওয়া। মহৎচরিত্রের অধিকারী ব্যক্তি মানুষ কর্তৃক প্রদত্ত কষ্ট সহ্য করে। সব সময় মানুষের ভুলের-ত্রুটির জন্য অজুহাত খোঁজে। তাদের ভুল- ত্রুটির পিছনে পড়া থেকে এবং খুঁজে খুঁজে তাদের দোষ বের করা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে খুবই আগ্রহী থাকে। মুমিন কোন অবস্থাতেই নোংরা ও জঘন্য চরিত্রের অধিকারী হতে পারে না। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বহু স্থানে উত্তম চরিত্রের গুরুত্ব সম্পর্কে তাগিদ করেছেন এবং উন্নত চরিত্রে বিভূষিত ব্যক্তি যে প্রচুর নেকী লাভ করে, সে কথারও উল্লেখ করেছেন। যেমন উসামা বিন শারীক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন,كنا جلوسا عند رسول الله صلى الله عليه وسلم . . إذ جاءه أناس فقالوا:من أحب عباد الله إلى الله تعالى؟ قال: ((أحسنهم أخلاقا)) الطبراني  অর্থাৎ, ‘একদা আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামের নিকটে বসে ছিলাম। সহসা তাঁর নিকট কিছু মানুষ উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞাসা করে, বান্দাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সব থেকে প্রিয় কে? তিনি বললেন, ‘যার চরিত্র সব থেকে উন্নত।’ (তাবরানী) আর আব্দুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি

পৃষ্ঠা:০৮

অসাল্লামকে বলতে শুনেছি। তিনি বলেছেন, ألا أخبركم بأحبكم إلي، وأقربكم مني مجلسا يوم القيامة؟ قالوا: نعم يا رسول الله، قال: أحسنكم خلقا احمد —–অর্থাৎ, ‘তেমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সব থেকে আমার নিকট প্রিয় এবং যে কিয়ামতের দিন তোমাদের চেয়েও আমার নিকটে থাকবে, তার ব্যাপারে কি তোমাদের বলব না? সাহাবীরা বললেন, হ্যাঁ, বলুন, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, সে ঐ ব্যক্তি যার চরিত্র সব থেকে সুন্দর। (আহমদ) তিনি আরো বলেন, (( ما من شيء أثقل في ميزان العبد يوم القيامة من خلق حسن أحمد —–অর্থাৎ, ‘কিয়ামতের দিবসে বান্দার হিসাবের দাঁড়ি-পাল্লায় সচ্চরিত্র- তার থেকে কোন জিনিস বেশী ভারী হবে না।’ (আহমদ)

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামের চরিত্র 

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম তাঁর সাহাবীদের জন্য অনুপম চরিত্রের সুমহান দৃষ্টান্ত ছিলেন। তিনি এরই প্রতি সকলকে আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সাহাবীদের মধ্যে নির্দেশ ও নসীহত দ্বারা চারিত্রিক উৎকর্ষ সৃষ্টি করার পূর্বে স্বীয় উৎকৃষ্ট নৈতিকতার দ্বারা এর বীজ বপন করতেন। তাই তো আনাস (রাঃ) বলেন, (( خدمت النبي صلى الله عليه وسلم عشر سنين، والله ما قال لي: أف قط، ولا قال لشيء: لم فعلت كذا؟ وهلا فعلت كذا؟ مسلم

পৃষ্ঠা:০৯

অর্থাৎ, ‘আমি দশ বছর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামের খেদমত করেছি। আল্লাহর শপথ! কখনো আমাকে ‘উঃ’ পর্যন্ত বলেন নি। আর না কোন দিন কোন কাজের জন্য বলেছেন, এরকম কেন করলে? বা এরকম কেন করলে না?’ (মুসলিম) অন্য এক হাদীস আনাস (রাঃ) থেকেই বর্ণিত। তিনি বলেন, كنت أمشي مع رسول الله صلى الله عليه وسلم وعليه برد غليظ الحاشية فأدركه أعرابي فجيده جبذة شديدة، حتى نظرت في صفحة عاتق رسول الله وقد أثرت به حاشية البرد من شدة الجيدة، ثم قال: يا محمد مر لي من مال الله الذي عندك فالتفت إليه رسول الله، وضحك، وأمر له بعطاء) البخاري অর্থাৎ, ‘আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামের সাথে যাচ্ছিলাম। তাঁর গায়ে ছিল একটি চাদর। চাদরের উভয় পাশ ছিল বেশ পুরু। এক গ্রাম্য লোক তাঁকে পেয়ে বসল। সে তাঁর চাদরটিকে ধরে ভীষণ জোরে টান দিল। আমি লক্ষ্য করে দেখলাম, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামের ঘাড়ের পার্শ্বদেশে সজোরে চাদর টানার দরুন চাদরের পাড়ের দাগ লেগে রয়েছে। অতঃপর লোকটি বলল, হে মুহাম্মাদ! (সাঃ) তোমার নিকট আল্লাহর দেওয়া যে মাল-সম্পদ তার থেকে আমাকে কিছু দেওয়ার ব্যবস্থা করুন। তিনি লোকটির প্রতি তাকালেন। তাকিয়ে হেসে দিলেন। তারপর তাকে কিছু দিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন।’ (বুখারী) আর আয়েশা রাযীয়াল্লাহু আনহাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম ঘরে কি কাজ করতেন? তিনি বলেছিলেন,

পৃষ্ঠা:১০

كان يكون في مهنة أي خدمة أهله فإذا حضرت الصلاة يتوضأ ويخرج إلى الصلاة)) مسلم —অর্থাৎ, ‘ তিনি ঘরে থাকাকালীন ঘর কন্নার কাজ করতেন। অর্থাৎ, নিজ পরিবার পরিজনদের কাজে সহযোগিতা করতেন। অতঃপর যখন নামাযের সময় হত, তখন ওযু করে নামাযের জন্য চলে যেতেন।’ (মুসলিম) আব্দুল্লাহ বিন হারেস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, (( ما رأيت أحدا أكثر تبسما من رسول الله صلى الله عليه وسلم الترمذي  —-অর্থাৎ, ‘আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামের অপেক্ষা বেশী স্নিগ্ধ হাসতে অন্য কাউকে দেখি নাই। (তিরমিযী) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামের উৎকৃষ্ট চরিত্রের ব্যাপারে একথা প্রসিদ্ধ যে, তিনি অত্যধিক দানবীর ছিলেন। কোন জিনিসের ব্যাপারে কৃপণতা করেন নি। তিনি এমন নির্ভীক ছিলেন যে, হজ্বের ব্যাপারে অনড় থাকতেন। তিনি এমন ন্যায়পরায়ণ ছিলেন যে, কখনো কোন অবিচার করেন নি। তাঁর জীবনই ছিল সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততায় ভরপুর। জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ما سئل رسول الله صلى الله عليه وسلم قط فقال: (لا)) متفق عليه —-অর্থাৎ, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামের নিকট কখনো কোন জিনিস চাওয়া হলে, তিনি না করেন নি।’ (বুখারী-মুসলিম) তিনি তাঁর সাহাবীদের সাথে হাসি ঠাট্টা করতেন। তাঁদের সংসর্গে থাকতেন। তাঁদের সন্তানদের সাথে কৌতুক করতেন। শিশুদের কোলে নিতেন। দাওয়াত

পৃষ্ঠা:১১

কবুল করতেন। রোগাক্রান্ত লোকদের দেখতে যেতেন। অজুহাত পেশ- কারীর অজুহাত কবুল করতেন। তিনি তাঁর সাহাবীদেরকে তাঁদের নিকট প্রিয় নামেই ডাকতেন। কোন ব্যক্তির কথা কাটতেন না। আবু কাতাদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামের নিকট নাজ্জা- সীর লোকজন আসে, তখন তিনি তাদের সেবার জন্য দাঁড়িয়ে যান। সাহাবীরা বললেন, আমরা আপনার পক্ষ থেকে যথেষ্ট। তিনি বললেন, ‘এঁরা আমার সাহাবীদের বড় সম্মান করেছেন। অতএব তার প্রতিদান আমি নিজে দেওয়াই ভালবাসি। তিনি বলেন, ‘আমি তো একজন বান্দামাত্র। তাই আমি সেইভাবেই খাই, যেভাবে বান্দার খাওয়া উচিত। আর ঐভাবেই বসি, যেভাবে বান্দার বসা উচিত।’ তিনি গাধায় আরোহণ করতেন। অভাবীদের দেখতে যেতেন। দরিদ্রদের সাথে উঠা-বসা করতেন।

সত্যবাদিতা

মুসলিম তার প্রভুর সাথে, সকল মানুষের সাথে এবং অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে সততার পরিচয় দেয়। সে তাঁর কথা ও কাজে সত্যবাদী হয়। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ( يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينِ) التوبة ١١٩ অর্থাৎ, ‘হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক।’ (৯ঃ ১১৯) আয়েশা রাযীয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, (( ما كان خلق أبغض إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم من الكذب احمد

পৃষ্ঠা:১২

অর্থাৎ, ‘মিথ্যার অপেক্ষা অন্য কোন অভ্যাস রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামের নিকট ঘৃণিত ছিল না।’ (আহমদ) আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হলো, (( أيكون المؤمن جيانا؟ قال: نعم، قيل له: أيكون المؤمن بخيلا؟ قال: نعم، قيل له: أيكون المؤمن كذابا؟ قال “لا …)) رواه مالك অর্থাৎ, ‘মুমিন কি ভীতু হয়? তিনি বললেন, হ্যাঁ। জিজ্ঞাসা করা হলো, মুমিন কি কৃপণ হয়? বললেন, হ্যাঁ। জিজ্ঞাসা করা হলো, মুমিন কি মিথ্যুক হয়? বললেন, না।’ (মালিক) আর দ্বীনের ব্যাপারে মিথ্যা বলা সব থেকে নিকৃষ্টতম অপরাধ। এটা সমূহ মিথ্যার মধ্যে সব থেকে কঠিন মিথ্যা, যার পরিণতি জাহান্নাম। যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেন, من كذب علي متعمدا فليتبوأ مقعده من النار)) البخاري অর্থাৎ, ‘যে ব্যক্তি জেনে-শুনে আমার উপর মিথ্যা গড়ে, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।’ (বুখারী) ইসলাম ধর্মও অমাদে- রকে আমাদের ছোটদের অন্তরে সততার বীজ বপন করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছে। যাতে তারা সততার উপর গড়ে উঠে। যেমন আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেছেন, من قال لصبي: تعال هاك، ثم لم يعطيه فهي كذبة أحمد অর্থাৎ, ‘যে ব্যক্তি কোন শিশুকে বলল, এসো, নাও। অতঃপর যদি

পৃষ্ঠা:১৩

তাকে না দেয়, তাহলে এটাও মিথ্যায় পরিণত হবে।’ (আহমদ) অনুরূপ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম তাঁর উম্মতকে মিথ্যা থেকে বাঁচার জন্য তাগিদ করেছেন, যদিও তা ঠাট্টাচ্ছলে হয়। আর তিনি তার জন্য জান্নাতের মধ্যেকার একটি ঘরের যামিন হয়েছেন, যে ঠাট্টাচ্ছলে হলেও মিথ্যা পরিহার করে। যেমন তিনি বলেন, ( أنا زعيم ببيت في وسط الجنة لمن ترك الكذب وإن كان مازحا أبو داود  —-অর্থাৎ, ‘আমি তার জন্য জান্নাতের মধ্যেকার একটি ঘরের যামিন হলাম, যে ঠট্টাচ্ছলে হলেও মিথ্যা ত্যাগ করে।’ (আবু দাউদ) ব্যবসায়ী তার দ্রব্যাদি বিক্রয় করার ব্যাপারে কখনো মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে থাকে। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম তাকেও মিথ্যা থেকে সতর্ক করেছেন। যেমন তিনি বলেন, (( لا يحل لمسلم يبيع سلعته يعلم أن بها داء (يعني عيب) إلا أخبر به )) البخاري —অর্থাৎ, ‘কোন মুসলমানের জন্য তার দোষযুক্ত দ্রব্যাদি জেনে-শুনে বিক্রয় করা বৈধ নয়, যদি সে দোষ সম্পর্কে অবহিত না করিয়ে দেয়।’ (বুখারী)

আমানত

ইসলাম তার অনুচরদের আমানতসমূহকে তার প্রাপকদের নিকট পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। আর মানুষ ছোট-বড় যে কাজই সম্পাদন করে, সে সমস্ত কাজে তাদেরকে স্বীয় প্রতিপালককে পর্যবেক্ষণ বলে মনে রাখারও নির্দেশ দেয়। মুসলিম তার উপর আল্লাহ কর্তৃক অর্পিত

পৃষ্ঠা:১৪

ওয়াজিব কাজ আদায়ে এবং মানুষের সাথে জড়িত কারবারে বিশ্বস্ততার প্রমাণ দেবে। আর মানুষের উপর অর্পিত দায়িত্বকে সুন্দরভাবে আদায় করতে আগ্রহী হওয়ার নামই হলো আমানত। আল্লাহ তা’য়লা বলনে,إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُمْ بَيْنَ النَّاسِ أَنْ

تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ النساء ٥٨অর্থাৎ, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দেন যে, তোমরা যেন প্রাপ্য আমানতসমূহ প্রাপকদের নিকট পৌঁছে দাও। আর যখন তোমরা মানুষের কোন বিচার-মীমাংসা করতে আরম্ভ কর, তখন মীমাংসা কর ন্যায়ভিত্তিক।’ (৪৪ ৫৮) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেন,(( لا إيمان لمن لا أمانة له…)) أحمدঅর্থাৎ, ‘আমানত লোপ পাওয়া ব্যক্তির ঈমানও থাকে না।’ (আহ মদ) আর হেফাযতের জন্য রক্ষিত বস্তুই শুধু যে আমানত-যেমন অনেকেই মনে করে-তা নয়। বরং আমানতের অর্থ আরো সম্প্রসারিত। আমানত আদায় করার অর্থ হলো, মানুষ তার উপর অর্পিত দ্বীন ও দুনিয়া সম্পর্কীয় সকল কাজে বিশ্বস্ততার পরিচয় দেবে।

নম্রতা

মুসলিম লাঞ্ছনাবিহীন স্থানে বিনয় ও নম্রতা অবলম্বন করবে। মুসলমানের দাম্ভিক ও অহংকারী হওয়া কখনোই উচিত নয়। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,

وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِمَنْ اتَّبَعَكَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ الشعراء ٢١٥

পৃষ্ঠা:১৫

অর্থাৎ, ‘এবং আপনার অনুসারী মুমিনদের প্রতি সদয় হোন।’ (২৬ঃ ২১৫) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেন,

ما تواضع أحد إلا رفعه الله) مسلم অর্থাৎ, ‘যখনই কোন ব্যক্তি আল্লাহর নিমিত্ত বিনয় হয়, আল্লাহ তার মর্যাদা-সম্মান বৃদ্ধি করে দেন।’ (মুসলিম) তিনি আরো বলেন, (( إن الله أوحى إلي أن تواضعوا حتى لا يفخر أحد على أحد، ولا يبغي أحد على أحد مسلم অর্থাৎ, ‘আল্লাহ আমার নিকট ওহী পাঠিয়েছেন যে, তোমরা পরম্পর পরস্পরের সাথে বিনয় ও নম্রতার অচরণ কর। যাতে কেউ কারো উপর ফখর ও গৌরব না করে এবং একজন আরেক জনের উপর বাড়াবাড়ি না করে।’ (মুসলিম)

নম্রতার পরিচয় হলো,

 ফকীর-মিসকীনদের সাথে উঠা-বসা করা। নিজেকে তাদের উর্ধে না ভাবা। মানুষের সাথে সহাস্যে মেলা-মেশা করা। নিজেকে অন্য মানুষের থেকে উত্তম মনে না করা। সমস্ত উম্মতের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম নিজ হাতে ঘরে ঝাড়ু দিতেন। ছাগলের দুধ দোয়াতেন। কাপড়ে তালি লাগাতেন। স্বীয় খাদেমের সাথে আহার করতেন। বাজার থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস নিজে কিনে আনতেন। ছোট-বড়, ধনী-গরীব সকলরে সাথে মুসাফা করতেন।

পৃষ্ঠা:১৬

লজ্জাবোধ

লজ্জা ঈমানের শাখা-প্রশাখার একটি শাখা। আর লজ্জা ভাল ব্যতীত অন্য কিছুই বয়ে আনে না। যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত হাদীসে বলেছেন। আর শ্রেষ্ঠ এই সৃষ্টির মধ্যে মুসলমানদের জন্য উত্তম নমুনা হলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম। তিনি ছিলেন সর্বাধিক লজ্জাপ্রবণ ব্যক্তি। আবু সায়ীদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, فإذا رأى شيئا يكرهه عرفناه في وجهه البخاري  —-অর্থাৎ, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম যখন কোন কিছুকে অপছন্দ করতেন, আমরা তাঁর মুখমন্ডল থেকেই তা বুঝে নিতাম।’ (বুখারী) তবে মুসলমানের লজ্জা যেন হকু বা সত্য কথা বলতে, অথবা জ্ঞানার্জনে, কিংবা ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধ প্রদানে তার কোন অন্তরায় সৃষ্টি না করে। যেমন উম্মে সুলাইম রাযীয়াল্লাহু আনহার লজ্জা তার জন্য (সত্যের ব্যাপারে) বাধা হয়ে দাঁড়ায় নি। তিনি বলেছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তো হজ্বের ব্যাপারে লজ্জা করেন না। তাই বলি, মহিলার যদি স্বপ্নদোষ হয়, তবে তার উপর কি গোসল ওয়াজিব হবে? তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, যদি বীর্য বা ভিজে দেখে।’ (বুখারী) তবে হ্যাঁ, লজ্জা মানুষকে অন্যায়-অনাচার কাজ থেকে, তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে অবহেলা করা থেকে, মানুষের গোপনীয় দোষ প্রকাশ করা থেকে এবং তাদের সাথে মন্দ ব্যবহার করা থেকে বাধা দেবে।  আল্লাহকে লজ্জা করা হলো, সর্বোত্তম লজ্জা। কাজেই মুমিন তার

পৃষ্ঠা:১৭

সৃষ্টিকারী, বহু সম্পদ দিয়ে তার প্রতি অনুগ্রহকারী স্রষ্টার আনুগত্যে অবহেলা করতে এবং তাঁর নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন না করার ব্যাপারে লজ্জাবোধ করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেন, (( فالله أحق أن يستحيا منه من الناس) البخاري অর্থাৎ, ‘আল্লাহ মানুষের চেয়ে বেশী অধিকার রাখেন যে তাঁকে লজ্জা করা হোক।’ (বুখারী)

মন্দ চরিত্র

যুলুম করা। যে প্রকৃত মুসলমান, সে কারো উপর যুলুম করে না। কারণ যুলুম করা ইসলামে হারাম। মহান আল্লাহ বলেন,

وَمَنْ يَظْلِمُ مِنْكُمْ نُذِقْهُ عَذَاباً كَبِيراً ) الفرقان ١٩ অর্থাৎ, ‘তোমাদের মধ্যে যে অত্যাচারী, আমি তাকে গুরুতর শাস্তি আস্বাদন করাবো।’ (২৫ঃ ১৯) হাদীসে কুদসীতে বর্ণিত। আল্লাহ তা’য়লা বলেন, (( يا عبادي إني حرمت الظلم على نفسي وجعلته بينكم محرما فلا تظالموا) অর্থাৎ, ‘হে আমার বান্দারা, আমি নিজের উপর যুলুমকে হারাম করে রেখেছি এবং তোমাদের উপরও তা হারাম করেছি। সুতরাং তোমরা একে অপরের প্রতি যুলুম করবে না।’ (মুসলিম) আর যুলুম তিন প্রকা- রের হয়। যেমন,

১। বান্দার তার প্রতিপালকের প্রতি যুলুম করা। আর এটা হয় তাঁর

পৃষ্ঠা:১৮

কুফুরী করে। যেমন তিনি বলেন,

وَالْكَافِرُوْنَ هُمُ الظَّالِمُونَ) البقرة ٢٥٤ অর্থাৎ, ‘যারা কুফুরী করেছে, তারাই বড় অত্যাচারী।’ (২ঃ ২৫৪) আল্লাহর ইবাদতে কাউকে শরীক করলেও তাঁর উপর যুলুম করা হয়। অর্থাৎ, কোন প্রকারের ইবাদত গায়রুল্লার নামে সম্পাদন করা। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,

إن الشَّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ لقمان ١٣ অর্থাৎ, ‘শির্ক হলো সব থেকে বড় যুলুমের কাজ।’ (৩১ঃ ১৩) ২। মানুষের সৃষ্টির অন্য কারো সাথে যুলুম করা। আর এটা হয় অন্যায়- ভাবে তার সম্ভ্রম লুটে, কিংবা শারীরিক ও মাল- ধনের ব্যাপারে কোন কষ্ট দিয়ে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেন,

كل المسلم على المسلم حرام دمه وماله وعرضه البخاري অর্থাৎ, ‘প্রত্যেক মুসলমানের উপর তার অন্য ভাইয়ের রক্ত, মাল-ধন এবং মান-মর্যাদা হারাম।’ (বুখারী) তিনি আরো বলেন,

(( من كان عنده مظلمة لأخيه من عرض أو شيء فليتحلله منه اليوم من قبل أن لا يكون دينار ولا درهم، إن كان له عمل صالح أخذ بقدر مظلمته، وإن لم يكن له حسنات أخذ من سيئات صاحبه فحمل عليه البخاري অর্থাৎ, ‘কোন ব্যক্তির উপর তার অপর ভাইয়ের যদি কোন দাবী থাকে, আর তা যদি তার মান-মর্যাদা, অথবা অন্য কিছুর যুলুম নির্যাতন

পৃষ্ঠা:১৯

সম্পর্কীয় হয়, তবে সে যেন আজই কপর্দকহীন হওয়ার পূর্বেই তার কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করে নেয়। অন্যথায় (কিয়ামতের দিন) তার যুলুমের সমপরিমাণ নেকী তার কাছ থেকে নিয়ে নেওয়া হবে। যদি তার নেকী না থাকে, তবে তার প্রতিপক্ষের গোনাহ থেকে যুলুমের সমপরিমাণ তার হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করে দেওয়া হবে।’ (বুখারী) ৩। মানুষের তার নিজের উপর যুলুম করা। আর এটা হয় হারাম কাজ সম্পাদন করে। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,

وَمَا ظَلَمُوْنَا وَلَكِنْ كَانُوْا أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُوْنَ﴾ البقرة ٥٧ অর্থাৎ, ‘বস্তুতঃ তারা আমার কোন ক্ষতি করতে পারেনি, বরং নিজেদেরই ক্ষতি সাধন করেছে।’ (২ঃ৫৭) কাজেই হারাম কাজ করলে ক্ষতি তার নিজেরই হয়। কারণ, তা আল্লাহর শাস্তিকে ওয়াজিব করে দেয়।

হিংসা

হিংসাও মন্দ চরিত্রের আওতায় পড়ে, যা ত্যাগ করা প্রত্যেক মুসলমানের অপরিহার্য কর্তব্য। কারণ, এতে আল্লাহ কর্তৃক তাঁর বান্দা- দের মধ্যে (ধন-সম্পদ ও মান-মর্যাদা ইত্যাতি) বন্টনের উপর অভিযোগ উত্থাপিত করা হয়। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,

أَمْ يَحْسُدُوْنَ النَّاسَ عَلَى مَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ ﴾ النساء ٥٤ অর্থাৎ, ‘তারা অন্যান্য লোকদের প্রতি শুধু এই জন্যই কি হিংসা পোষণ করে যে, আল্লাহ তাদেরকে তাঁর অনুগ্রহ দান করেছেন।’ (৪ঃ ৫৪) আর হিংসা দু’প্রকারের হয়। যথা,

পৃষ্ঠা:২০

১। অন্যের ধন-সম্পদের, অথবা জ্ঞানের, কিংবা রাজত্বের ধ্বংস কামনা করা। যাতে সে তা অর্জন করতে পারে।

২। অন্যের ধন-সম্পদের বিনাশ কামনা করা। তাতে সে তা অর্জন করতে পারুক, বা না পারুক। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেন,

(( إياكم والحسد، فإن الحسد يأكل الحسنات كما تأكل النار الحطب أو العشب أبو داودঅর্থাৎ, ‘তোমরা হিংসা থেকে বাঁচো। কারণ, হিংসা সমস্ত পুণ্যকে ঐভাবেই খেয়ে নেয়, যেভাবে আগুন কাঠ বা জ্বলানী খেয়ে নেয়।’ (আবু দাউদ) তবে যদি কারো নিকট বিদ্যমান নিয়ামতের ধ্বংস কামনা না করে, তা পাওয়ার আশা করা হয়, তাহলে তা হিংসা বলে গণ্য হবে না।

ধোঁকা দেওয়া

প্রত্যেক মুসলমান তার অন্য ভাইদের সুপরামর্শদাতা হবে। কাউকে ধোঁকা দেবে না। বরং সে নিজের জন্য যা ভালবাসে, তা অন্য ভাইদের জন্যও বাসবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেন,

من غشنا فليس منا مسلم অর্থাৎ, ‘যে ধোঁকা দেয়, সে আমার উম্মতের মধ্যেকার নয়।’ (মুসলিম) মুসলিম শরীফে অন্য এক বর্ণনায় এসেছে,

أن رسول الله صلى الله عليه وسلم مر على صبرة (أي: كومة طعام فأدخل يده فيها، فنالت يده بللا، قال: ما هذا يا صاحب الطعام؟ قال:

পৃষ্ঠা ২১ থেকে ২৯

পৃষ্ঠা:২১

أصابته السماء (أي المطر يا رسول الله، قال: أفلا جعلته فوق الطعام حتى يراه الناس من غشنا فليس منا) অর্থাৎ, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম খাদ্য শস্যের একটি স্তূপের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় তাতে হাত ঢুকিয়ে দিলেন। তাঁর হাতের আঙ্গুলগুলো ভিজা মনে হল। তিনি বললেন, হে শস্যের মালিক, একি? সে বলল, বৃষ্টিতে ভিজে গিয়েছে, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, তাহলে এগুলি উপরে রাখ নি কেন? লোকে দেখেশুনে ক্রয় করত। যে আমাদেরকে ধোঁকা দেয়, সে আমার উম্মতের মধ্যেকার নয়। (মুসলিম)

অহংকার

কখনো মানুষ তার জ্ঞান নিয়ে অহংকার ও গর্ববোধ করে। জ্ঞান তাকে এমন বানিয়ে দেয় যে, সে নিজেকে সবার উর্ধে মনে করে এবং তখন সে অন্য মানুষদের, বা জ্ঞানীদের ঘৃণা করে। আবার কখনো মাল নিয়ে গর্ব করে। মালের কারণে নিজেকে সর্বোচ্চ মনে করে। আবার কখনো সে তার শক্তি ও ইবাদত ইত্যাদিকে নিয়ে অহংকার করে। তবে যে প্রকৃত মুসলমান, সে অহংকার করা থেকে নিজেকে বাঁচায় এবং তা থেকে সতর্ক থাকে। আর সে সস্মরণ করে যে, ইবলীসকে জান্নাত থেকে বের করে দেওয়ার কারণই হলো, তার অহংকার। যখন আল্লাহ তাকে আদমকে সেজদা করার নির্দেশ দেন, সে তখন বলল, আমি তো আদমের থেকে উত্তম। কারণ, তুমি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছ। আর আদমকে মাটি থেকে। ফলে এটাই তার জন্য আল্লাহর রহমত থেকে বিতাড়িত হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ালো। আর অহংকারের ওষুধ

পৃষ্ঠা:২২

হলো, মানুষ সব সময় মনে রাখবে যে, জ্ঞান, মাল ও সুস্থতা ইত্যাদি সহ আজ আল্লাহ তাকে যে সম্পদই দিয়েছেন, এ সম্পদগুলি তিনি যে কোন মুহূর্তে ছিনিয়ে নিতে পারেন।

সুন্দর চরিত্র গঠনে সাহায্যকারী কতিপয় উপায়

সন্দেহ নাই যে, অভ্যস্ত স্বভাবকে পরিবর্তন করাই হলো মানুষের জন্য বড় কঠিন ও ভারী কাজ। তবে এটা অসম্ভবও নয়। বরং কিছু উপায়-উপকরণ রয়েছে, যার মাধ্যমে মানুষ তার চরিত্রকে মহৎ ও সুন্দর বানাতে পারে। আর তা হলো,

১। আক্বীদা পরিশুদ্ধ করা। কারণ, আক্বীদার ব্যাপারটা সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। আর মানুষের আচার ব্যবহারই হলো, তার চিন্তা, আক্বীদা বিশ্বাস এবং তার দ্বীনী বিশ্বাসের ফল। তাছাড়া আক্বীদাই হলো ঈমান। আর মুমিনদের মধ্যে পরিপূর্ণ ঈমানদার সে-ই, যার চরিত্র সবার থেকে উন্নত। কাজেই আক্বীদা ঠিক হয়ে গেলে, চরিত্রও ঠিক হয়ে যায়। কেননা, আক্বীদাই মানুষকে সততা, বদান্যতা, ধৈর্যশীলতা এবং নির্ভী- কতা ইত্যাদি মহৎ চরিত্রের উপর উদ্বুদ্ধ করে। অনুরূপ মিথ্যাচার, কৃপণতা, ক্রোধ এবং মূর্খতা ইত্যাদি মন্দ চরিত্র থেকে তাকে বাধা প্রদান করে।

২। দোআ করা। দোআ বড় এক উন্মুক্ত দরজা। যখনই বান্দার জন্য এ দরজা খুলে দেওয়া হয়, তখনই অজস্র কল্যাণ ও বরকত ক্রমাগত- ভাবে এই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে থাকে। কাজেই যে ব্যক্তি উত্তম চরিত্রে চরিত্রবান হতে এবং নোংরা চরিত্র থেকে বাঁচতে আগ্রহী, সে যেন তার প্রতিপালকের শরণাপন্ন হয়। তিনি তাকে সচ্চরিত্র অর্জনের

পৃষ্ঠা:২৩

তৌফীক দিবেন এবং অসৎচরিত্র থেকে তাকে রক্ষা করবেন। সর্ব ক্ষেত্রেই দোআ বড় উপকারী। এই জন্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম কাকুতি মিনতি সহকারে তাঁর প্রতিপালকের নিকট খুব বেশী বেশী সুন্দর চরিত্র অর্জনের তৌফীক কামনা করতেন। আর তিনি দোআয়ে ইস্তিফতায় বলতেন,

(( اللهم اهدني لأحسن الأخلاق، لا يهدي لأحسنها إلا أنت، واصرف عني سينها، لا يصرف سينها إلا أنت مسلم অর্থাৎ, ‘হে আল্লাহ! তুমি আমাকে সচ্চরিত্র অর্জনের তৌফীক দান কর। তুমি ছাড়া এর তৌফীকদাতা আর কেউ নাই। আর অসৎচরিত্রকে আমার থেকে দূরে রাখ। তুমি ব্যতীত তা কেউ দূর করতে পারে না।’ (মুসলিম) ৩। শ্রম-সাধনা করা। শ্রম-সাধনা মহৎচরিত্র গঠনের ব্যাপারে বহু সুফল দেয়। তাই যে ব্যক্তি উত্তম নৈতিকতা লাভের জন্য এবং নোংরা চরিত্র থেকে বাঁচার জন্য স্বীয় নাফসের সহিত জিহাদ করে, সে বহু কল্যাণ সঞ্চয় করতে ও অনেক অপ্রীতিকর জিনিস থেকে নিষ্কৃতি পেতে সক্ষম হয়। কেননা, চরিত্রের ব্যাপারটা হলো, তা জন্মগতও হয়। আবার অভ্যাস ও কর্মের মাধ্যমে সঞ্চিতও হয়। আর নাফসের সাথে জিহাদ করার অর্থ এই নয় যে, একবার, দু’বার, অথবা ততোধিকবার করবে। বরং মরণ পর্যন্ত নাফসের সাথে জিহাদ করতে থাকবে। কারণ, নাফসের সাথে জিহাদ করা আল্লাহ তা’য়লার ইবাদত। তিনি বলেন,

وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ الحجر ٩٩

পৃষ্ঠা:২৪

অর্থাৎ, ‘এবং পালনকর্তার ইবাদত করুন, যে পর্যন্ত আপনার কাছে নিশ্চিত কথা না আসে।’ (১৫ঃ ৯৯)

৪। আত্মসমালোচনা করা। আর এটা হবে কোন অন্যায়-অনাচার কাজের জন্য নাফসকে তিরস্কার করে এবং আগামীতে উক্ত কাজ পুন- রায় না করার উপর তাকে বাধ্য করে।

৫। মহৎচরিত্রের দ্বারা অর্জিত সুফলের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করা। কারণ, কাজের সুফল সম্পর্কে জানলে এবং তার সুন্দর পরিণামকে স্মরণে রাখলে, তা সেই কাজ করতে ও তার জন্য প্রচেষ্টা করতে বড় মাধ্যম সাব্যস্ত হয়।

৬। অসৎচরিত্রের পরিণাম সম্পর্কে ভাবা। অর্থাৎ, যে জঘন্য চরিত্র সব সময়ের জন্য অনুতাপ, অবিচ্ছেদ দুশ্চিন্তা, আক্ষেপ-অনুশোচনা এবং সৃষ্টির অন্তরে ঘৃণার জন্ম দেয়, সে সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করা।

৭। নাফসের সংশোধনের ব্যাপারে নৈরাশ না হওয়া। মুসলমানের হতাশ হওয়া কখনই উচিত নয়। বরং তার উচিত হবে স্বীয় পরিকল্পনাকে সুদৃঢ় করা এবং নাফস থেকে দোষণীয় জিনিসকে দূরীভূত করতঃ তাকে পরিপূর্ণ করতে প্রচেষ্টা করা।

৮। সহর্ষ ও সহাস্য হতে প্রচেষ্টা করা এবং মুখ ভেংচানো ও বিরক্তির প্রকাশ থেকে বাঁচা। কোন মানুষের তার মুসলমান ভাইয়ের সামনে স্নিগ্ধ হাসা তার জন্য সাদকায় পরিণত হয় এবং তাতে সে নেকী পায়। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেন,

(( تبسمك في وجه أخيك لك صدقة الترمذي —–অর্থাৎ, ‘তোমার ভাইয়ের সামনে মুচকি হাসা তোমার জন্য সাদকায়

পৃষ্ঠা:২৫

পরিণত হয়।’ (তিরমিযী) তিনি আরো বলেন, لا تحتقرن من المعروف شيئا ولو أن تلقى أخاك بوجه طلق مسلم অর্থাৎ, ‘কোন সৎ কাজকে অবজ্ঞা কর না, যদিও তা তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করার কাজ হয়।’ (মুসলিম)

৯। দৃষ্টি নত রাখা। দেখেও না দেখার ভান করা। আর এটা হলো, বড় ও মহান ব্যক্তিদের চরিত্র বিশেষ। এ গুণ দু’টি প্রেম-প্রীতি ও ভালবাসা সৃষ্টি করতে ও তা অব্যাহত রাখতে এবং শত্রুতাকে দাফন করতে সাহায্য করে।

১০। ধৈর্যশীলতা। ধৈর্যশীলতা হলো সর্বোত্তম চরিত্র। এটা জ্ঞানী ব্যক্তি- দের অত্যাবশ্যকীয় বিষয়। আর ধৈর্যশীলতা হলো, উত্তেজিত ক্রোধের সময় নিজেকে সংযত (Control) রাখা। তবে ধৈর্যশীলতার অর্থ এই নয় যে, ধৈর্যশীল ব্যক্তি কখনো রাগান্বিত হবে না। বরং এর অর্থ হলো, রাগ সৃষ্টিকারী কারণের জন্য উত্তেজিত হয়ে উঠলে, নিজেকে সংযত (Control) রাখা। মানুষ যখন ধৈর্যশীলতার গুণে গুণান্বিত হয়, তখন তার বন্ধুর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। তার শত্রুর সংখ্যা লোপ পায় এবং তার মর্যাদা-সম্মান বৃদ্ধি পায়।

১১। মূর্খ জাহেলদের থেকে দূরে সরে থাকা। যে ব্যক্তি মূর্খ জাহেলদের থেকে দূরে থাকে, সে তার সম্মান বাঁচিয়ে নেয়। তার আত্মা প্রশান্তি লাভ করে এবং কষ্টদায়ক জিনিস শুনা থেকে সে নিষ্কৃতি পায়। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,

خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ﴾ الأعراف ١٩٩

পৃষ্ঠা:২৬

অর্থাৎ, ‘আর ক্ষমা করার অভ্যাস গড়ে তোল, সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং মূর্খ জাহেলদের থেকে দূরে সরে থাক।’ (৭ঃ ১৯৯)

১২। কটুবাক্য ও গালাগালি করা থেকে বিরত থাকা।

১৩। দুঃখ কষ্ট ভুলে যাওয়া। অর্থাৎ, কারো দ্বারা তুমি কষ্ট পেয়ে থাকলে, তা ভুলে যাও। যাতে তোমার অন্তর তার জন্য পরিষ্কার হয়ে যায়। তাকে অপরিচিত ভাববে না। কেননা, যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইদের কর্তৃক প্রদত্ত কষ্টকে মনে রাখে, তাদের জন্য তার ভালবাসা স্বচ্ছ হয় না। অনুরূপ যে ব্যক্তি তার সাথে কৃত লোকদের দুর্ব্যবহারকে স্মরণে রাখে, তাদের সাথে তার বসবাস তৃপ্তিকর হয় না। অতএব ভুলে যাও, যত ভুলে যাওয়া তোমার পক্ষে সম্ভব।

১৪। ক্ষমা ও মার্জনা করা এবং মন্দ কাজের মোকাবেলায় অনুগ্রহ করা। এটা উচ্চ মর্যাদা লাভের মাধ্যম। এতে প্রশান্তিও লাভ হয় এবং প্রতি- শোধ নেওয়ার পরিবর্তে অন্তরে ক্ষমার প্রেরণাও সৃষ্টি হয়।

১৫। দানশীল হওয়া। এটা প্রশংসনীয় অভ্যাস। যেমন কৃপণতা হলো ঘৃণিত অভ্যাস। দানশীলতা ভালবাসা টেনে আনে ও শত্রুতা দূর করে। সুন্দর প্রশংসা অর্জন করে এবং দোষসমূহ ও খারাপ কাজগুলিকে ঢেকে দেয়।

১৬। মহান আল্লাহর নিকট নেকীর আশা করা। এটা মহৎচরিত্র অর্জনে সাহায্যকারী মাধ্যমসমূহের সুমহান মাধ্যম। এটা ধৈর্য ধরার উপর, শ্রম- সাধনা করার উপর এবং মানব কর্তৃক প্রদত্ত কষ্ট সহ্য করার উপর সহযোগিতা করে। সুতরাং যখন সে নিশ্চিত হবে যে, আল্লাহ তাকে তার উত্তম চরিত্রের এবং নাফসের সাথে জিহাদ করার প্রতিদান দেবেন, তখন সে উত্তম চরিত্র অর্জনের প্রতি আগ্রহী হবে। আর তখন এ পথে

পৃষ্ঠা:২৭

প্রত্যেক দুরূহ কাজ তার জন্য সহজ হয়ে যাবে।

১৭। ক্রোধান্বিত হওয়া থেকে বাঁচা। কারণ, ক্রোধ হলো, অন্তরে প্রজ্বলিত এমন অগ্নিচূর্ণ, যা মানুষকে আক্রমণ করার প্রতি এবং প্রতিশোধ নেওয়া প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। কাজেই মানুষ যদি ক্রোধের সময় নিজেকে সংযত (Control) রাখতে পারে, তাহলে সে স্বীয় মর্যাদা-সম্মান সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হবে এবং অজুহাত পেশ করা ও অনুতপ্ত হওয়া থেকে বেঁচে যাবে। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,

جاء رجل فقال: يارسول الله، أوصني، فقال: لا تغضب، ثم ردد مرارا فقال: لا تغضب البخاري অর্থাৎ, ‘এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামের নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে উপদেশ দেন। তিনি বললেন, ক্রোধান্বিত হয়ো না। সে ব্যক্তি কয়েকবার একই কথার পুনরা- বৃত্তি করল, আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বললেন, রাগ কর না।’ (বুখারী)

১৮। উদ্দেশ্যমূলক নসীহত এবং সংশোধনমূলক প্রতিবাদ গ্রহণ করা। তাই তার মধ্যে বিদ্যমান দোষ সম্পর্কে সতর্ক করা হলে, তা মেনে নিয়ে তা থেকে বিরত থাকা তার উপর অপরিহার্য। কেননা, নাফসের মধ্যে বিদ্যমান দোষ থেকে উদাসীন হয়ে তার সংশোধন সম্ভব নয়।

১৯। মানুষের উপর অর্পিত দায়িত্বকে পরিপূর্ণরূপে পালন করা। এতে সে নিজেকে তিরস্কার, ভৎসনা ও অজুহাত পেশ করা থেকে বাঁচিয়ে নিবে।

পৃষ্ঠা:২৮

২০। ভুল হয়ে গেলে, তা স্বীকার করে নেওয়া এবং তা বৈধ মনে না করা। এটা মহৎচরিত্রের নিদর্শন। তাছাড়া এর দ্বারা সে নিজেকে মিথ্যা থেকে বাঁচাতে পারবে। অতএব ত্রুটি স্বীকার করা এমন এক গুণ, যা এই গুণে গুণান্বিত ব্যক্তির মর্যাদা বৃদ্ধি করে।

২১। সততাকে আঁকড়ে ধরে থাকা। সত্যবাদিতার বড় প্রসংশনীয় প্রতিক্রিয়া রয়েছে। সত্যবাদিতার গুণে মানুষের মর্যাদা-সম্মান বৃদ্ধি পায়। সত্যবাদীকে সততা মিথ্যার অপবিত্রতা থেকে, অন্তরের গ্লানি থেকে এবং অজুহাত পেশ করার লাঞ্ছনা থেকে মুক্তি দেয়। আর তাকে মানুষের নোংরা ব্যবহার থেকে এবং তার থেকে বিশ্বস্ততা যাতে লোপ না পায়, তা থেকে রক্ষা করে। অনুরূপ সে (সততার গুণে) সম্মান, নির্ভীকতা এবং বিশ্বস্ততা লাভ করে।

২২। কেউ কোন ভুল করলে, তাকে বেশী ধমকানো ও তিরস্কার করা থেকে বিরত থাকা। কারণ খুব বেশী তিরস্কার করা রাগের জন্ম দেয়, শত্রুতা সৃষ্টি করে এবং তাকে কষ্টদায়ক জিনিস শুনতে বাধ্য করে। তাই জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি ছোট-বড় প্রত্যেক ভুলের কারণে তার ভাইদের তিরস্কার করে না। বরং তাদের জন্য অজুহাত খোঁজে। অতঃপর যদি তিরস্কারের যোগ্য কোন কিছু পায়, তাহলে কোমল ও নরমভাবে তাকে বুঝায়।

২৩। সৎচরিত্রবান ও নেক লোকদের সঙ্গ গ্রহণ করা। এটা এমন একটি বিষয়, যা মানুষকে উন্নত চরিত্রের উপর গড়ে তোলে এবং উত্তম চরিত্রকে তার মধ্যে পাকাপোক্ত করে দেয়।

পৃষ্ঠা:২৯

২৪। কথোপকথন ও মজলিসের আদবের খেয়াল রাখা। আর এ ব্যাপারে যেসব আদবের খেয়াল রাখতে হয়, তা হলো, কেউ কথা বললে, তার কথা মন দিয়ে শোনা। তার কথা কাটা থেকে বিরত থাকা। তাকে মিথ্যুক সাব্যস্ত না করা। তার কথাকে হালকা মনে না ভাবা এবং তার কথা পূর্ণ হওয়ার আগে উঠে না যাওয়া। প্রবেশ করার সময় এবং বের হওয়ার সময় সালাম করা। মজলিসে স্থান প্রশস্ত করা। কোন মানুষকে তার স্থান থেকে উঠিয়ে সেখানে না বসা। অনুমতি ব্যতীত দুই ব্যক্তির মধ্যে বসে তাদেরকে পৃথক না করা এবং তৃতীয়জনকে বাদ দিয়ে দু’জনে কথা না বলা ইত্যাদি সবই উক্ত আদবের আওতায় পড়ে।

২৫। নবী জীবনী সম্পর্কে সর্বদা পড়া-শুনা করা। কারণ, নবী জীবনী পাঠকের সামনে মানবতার এক চিত্র এবং মানব জীবনের জন্য হেদায়েত ও নৈতিকতার এক পরিপূর্ণ নকশা পেশ করবে।

২৬। সাহাবায়ে কেরামদের-আল্লাহ তাঁদের উপর সন্তুষ্ট হন-জীবনী সম্পর্কেও আলোচনা করা।

২৭। আখলাক ও চরিত্রের উপর লিখিত বই-পুস্তকের পড়া-শুনা করা। কারণ, তা মানুষকে উত্তম চরিত্র অর্জনের উপর উৎসাহ দান করবে। আর সুন্দর চরিত্রের ফজিলতের কথার স্মরণ করে দেবে এবং তা অর্জন করতে সাহায্য করবে। অনুরূপ নোংরা চরিত্র থেকে তাকে সতর্ক করা সহ তার মন্দ পরিণাম তার সামনে উদ্ভাসিত করে দেবে এবং তা থেকে মুক্তির পথও বলে দেবে।

হোম
ই-শো
লাইভ টিভি
নামাজ শিক্ষা
গেইমস
চাকুরি