Skip to content

ইসলাম ও বিজ্ঞান

পৃষ্ঠা ১ থেকে ৫

পৃষ্ঠা:০১

ইসলাম ও বিজ্ঞান

ইসলাম ও বিজ্ঞান সম্পর্কে আলোচনা করতে হলে প্রথমে ইসলাম ও বিজ্ঞানের সংজ্ঞা নির্ণয় করা প্রয়োজন। ইসলাম কাকে বলে আর বিজ্ঞান কাকে বলে, এর সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করার পরই এ দুটোর পারস্পরিক সম্পর্কের সন্ধান করা সহজ হতে পারে। ইসলাম বিজ্ঞানচর্চাকে উৎসাহিত করে কি না, বিজ্ঞানের কোনো আবিষ্কার ইসলামের কোনো অভিমতের বিরোধী হতে পারে কি না, আজ পর্যন্ত বিজ্ঞানের প্রমাণিত কোনো প্রাকৃতিক তথ্য ইসলামবিরোধী বলে সাব্যস্ত হয়েছে কি না ইত্যাদি আলোচনার পূর্বে ইসলাম কী ও বিজ্ঞানই বা কী সে বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করা অত্যাবশ্যক।

ইসলামের পরিচয়

আরবী ইসলাম শব্দটির আভিধানিক অর্থ আত্মসমর্পণ। নিজের স্বাধীন ইচ্ছার বদলে কেউ অন্য কোনো মহান সত্তার ইচ্ছা অনুযায়ী চললেই বোঝা গেল যে, সে নিজেকে অন্যের নিকট সমর্পণ করেছে।

কুরআনের পরিভাষায়, ইসলাম মানে আল্লাহর ইচ্ছার নিকট আত্মসমর্পণ করেছে বা ইসলাম গ্রহণ করেছে। ইসলাম শব্দের অপর অর্থ হলো শাস্তি। আল্লাহ মানুষের জন্য যে জীবনবিধান দান করেছেন তা-ই তাঁর ইচ্ছা। মানুষ যদি তা মেনে চলে তাহলেই শান্তি পায়। আল্লাহর বিধান অমান্য করে যারা নিজের মনগড়া পথে চলে তারাই অশান্তি ভোগ করে। মানুষ যদি সত্যিই শান্তি পেতে চায় তাহলে তার নিজের মরজিমতো জীবনযাপন না করে আল্লাহর দেওয়া বিধান মেনে চলতে হবে। তাই তিনি তাঁর রচিত জীবনবিধানের নাম রেখেছেন ইসলাম বা শান্তি। ইসলাম শব্দের মূল শব্দ সিল্ম (১)। এ শব্দ থেকেই ‘সালাম’ শব্দ গঠিত। সালাম অর্থও শান্তি। ‘আস্সালামু আলাইকুম’ মানে আপনার উপর সালাম বা শান্তি বর্ষিত হোক। শান্তি কামনা করে সম্বোধন করার এ পদ্ধতি কতই না চমৎকার!

ইসলামের উৎস

ইসলামের উৎস দুটি- ১. কুরআন ও ২. হাদীস। কুরআন আল্লাহর বাণী; অন্য কারো রচনা নয়। ফেরেশতা জিবরাঈল রাসূল (স)-এর নিকট এ বাণী ২৩ বছরে কিছু কিছু করে তিলাওয়াত করে শুনিয়েছেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে আল্লাহরই নির্দেশ অনুযায়ী যখন যে পরিমাণ বাণী প্রয়োজন তা বিশ্বস্ততার সাথে পৌঁছে দিয়েছেন। তাই তাঁকে উপাধি দেওয়া হয় ‘আমীন’ বা বিশ্বস্ত।

পৃষ্ঠা:০২

দীর্ঘ ২৩ বছরে অবর্তীর্ণ বাণীসমূহ আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী রাসূল (স) সংকলিত করার ব্যবস্থা করেন, নিজে মুখস্থ করেন এবং তাঁর সাথীগণের অনেকেও কণ্ঠস্থ করেন। মুখস্থ রাখার ব্যাপারে রাসূল (স)-কে চিন্তিত হতে আল্লাহ নিষেধ করে আশ্বস্ত করেন যে, তিনি ভুলবেন না।রাসূল (স)-এর ওপর কুরআন শুধু তিলাওয়াত করে শুনিয়ে দেওয়ার দায়িত্বই ছিল না; কুরআনকে বুঝিয়ে দেওয়া এবং কুরআনের বিধানকে কীভাবে মানতে হবে তা পালন করে দেখিয়ে দেওয়ার দায়িত্বও রাসূলকেই দেওয়া হয়েছে বলে কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। একমাত্র তিনিই আল্লাহর পক্ষ থেকে কুরআনের সরকারি ব্যাখ্যাতা। তাঁর ব্যাখ্যার সাথে খাপ খায় না এমন কোনো ব্যাখ্যাই আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য নয়।তাই নবুওয়াতের ২৩ বছরের জীবনে রাসূল (স) যা কিছু বলেছেন ও যা কিছু করেছেন সবই কুরআনের সঠিক ব্যাখ্যা। এ সবই হাদীস নামে পরিচিত।এ কুরআন ও হাদীসই ইসলামের মূল উৎস। যেহেতু আল্লাহ তাআলার কোনো ভুল হওয়া স্বাভাবিক নয়, তাই কুরআন ও সহীহ হাদীস সবই নির্ভুল।

বিজ্ঞানের পরিচয়

বস্তুজগৎ ও প্রাকৃতিক জগৎ সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ, সাধনা, গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সঠিক তথ্য জানার চেষ্টা করাকেই বিজ্ঞান বলে। বিজ্ঞান মানে বিশেষ জ্ঞান।বিজ্ঞান বস্তু (Matter) ও বস্তুগত শক্তি (Matarial energy) নিয়েই চর্চা করে। এর বাইরে কোনো বিষয় চর্চা করা বিজ্ঞানের দায়িত্ব নয়। নৈতিক বিষয়ে চর্চা করা বিজ্ঞানের কাজ নয়। সত্য কথা বলা ভালো আর মিথ্যা বলা মন্দ কি না এসব বিষয় বিজ্ঞানের আওতার বাইরে।

বিজ্ঞান যেসব তথ্য আবিষ্কার করে, এর ভিত্তিতে বস্তুকে মানুষের কাজে ব্যবহার করার জন্য উপায় উদ্ভাবন করা ও সে অনুযায়ী যন্ত্রপাতি তৈরি করাকে প্রযুক্তি (Technology) বলা হয়। বিজ্ঞান হলো জ্ঞানগত দিক, আর প্রযুক্তি হলো প্রয়োগের দিক। বিজ্ঞানের ফসলই হলো প্রযুক্তি। বিজ্ঞান বৈদ্যুতিক শক্তির সন্ধান দিয়েছে। প্রযুক্তি বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করেছে। পাখি কেমন করে আকাশে উড়ে সে বিষয়ে বিজ্ঞান গবেষণা করে যে তথ্যাবলি আবিষ্কার করেছে, প্রযুক্তি তা কাজে লাগিয়ে বিমান তৈরি করেছে। বিজ্ঞান মানবদেহ অধ্যয়ন করে যেসব তথ্য পরিবেশন করেছে, তাকে ভিত্তি করেই প্রযুক্তি চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে। এভাবেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মিলে বস্তুজগৎকে ব্যবহার করার মাধ্যমে মানব সভ্যতাকে ক্রমাগত অগ্রসর করে চলেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বলে মানুষ দূরত্বকে জয় করেছে। সৃষ্টিজগৎকে মানুষের সেবকে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছে এবং গ্রহ-উপগ্রহে বিচরণের যোগ্যতা অর্জন করেছে।

পৃষ্ঠা:০৩

ইসলাম ও বিজ্ঞানের সম্পর্ক আলোচনার প্রয়োজন কেন?

আমরা ইসলামের পরিচয় জানলাম এবং বিজ্ঞান সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা পেলাম। প্রশ্ন ওঠতে পারে যে, উভয়ের মধ্যে সম্পর্ক আছে কি না, সে বিষয়ে আলোচনার প্রয়োজন কী? কয়েকটি কারণে এ আলোচনা অত্যাবশ্যক:

১. জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিস্ময়কর উন্নতির ফলে এক শ্রেণীর আধুনিক শিক্ষিত লোক মনে করেন যে, মানব জীবনের জন্য মেধা, অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানই যথেষ্ট। Divine Guidance (স্রষ্টার পথনির্দেশ)-এর কোনো প্রয়োজন নেই। যারা জড়বাদ বা বস্তুবাদে (Materialism) বিশ্বাসী তারাই এ ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করে। তারা আল্লাহ, রাসূল ও আখিরাতে বিশ্বাস করে না। কারণ এর কোনোটাই বন্ধু নয়। তারা বস্তুর উর্ধ্বে বা বাইরে কোনো কিছুই বিশ্বাস করে না। তারা দার্শনিক Hume-এর ‘Theory of Materialism-এ বিশ্বাসী।

২. যারা জার্মান দার্শনিক Hegel-এর Theory of Dialection (দ্বন্দুবাদ)-এ বিশ্বাসী তারা বিশ্বাস করে যে, Thesis anti-thesis synthesis (নয়, প্রতি নয়-সমন্বয়) প্রক্রিয়ায় মানব সভ্যতা জ্ঞানের ভ্রান্তি থেকে মুক্ত হয়ে ধাপে ধাপে এগিয়ে চলছে। যা অতীত তা পরিত্যাজ্য। মানুষ অতীতকে পেছনে ফেলেই ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলছে। তাই দেড় হাজার বছরের পুরাতন ইসলাম ও কুরআনের কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ সে যুগের বিধান এ যুগে অচল।

৩. মহাশূন্য বা আকাশমণ্ডল সম্পর্কে কুরআনে যেসব তথ্য দেওয়া হয়েছে, এর সঠিক মর্ম উপলব্ধি না করার কারণে বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে তারা দাবি করেন যে, বিজ্ঞানের সাথে কুরআন সাংঘর্ষিক বা কুরআনের তথ্য বিজ্ঞানে সত্য প্রমাণিত নয়।

বিজ্ঞানের উন্নতিতে পুলকিত, বিমোহিত ও প্রভাবিত হয়ে যারা উপরিউক্ত ভ্রান্ত মতবাদে বিভ্রান্ত, তাদের ভ্রান্তি দূর করার প্রয়োজনেই ইসলাম ও বিজ্ঞান সম্পর্কে আলোচনা অত্যাবশ্যক।

যিনি বিশ্বজগতের স্রষ্টা কুরআন তাঁরই বাণী

বিজ্ঞান সৃষ্টিজগতের যেসব বস্তু ও বস্তুগত শক্তি নিয়ে চর্চা করে তা বিজ্ঞানীরা সৃষ্টি করেননি; Laws of Nature স্রষ্টারই অবদান। বিজ্ঞান সাধনা মানে অজানাকে জানার প্রচেষ্টা। স্রষ্টা যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তা আবিষ্কার (Discover) করাই বিজ্ঞানের কাজ। বিজ্ঞান invent করে না। যার অস্তিত্ব নেই, তা সৃষ্টি করার সাধ্য বিজ্ঞানের নেই। স্রষ্টার সৃষ্টিকে জানার সাধনা করাই বিজ্ঞানের কাজ।বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে আবিষ্কার করেছেন যে, পানির মধ্যে দুটো মৌলিক উপাদান বিশেষ পরিমাণে রয়েছে। বিজ্ঞানের ভাষায় H2O = water. অর্থাৎ পানিতে

পৃষ্ঠা:০৪

হাইড্রোজেনের দুই ভাগ ও অক্সিজেনের এক ভাগ উপাদান রয়েছে। আল্লাহ পানিকে এ দুটো উপাদান ঐ পরিমাণে দিয়েই সৃষ্টি করেছেন। এ তথ্য এককালে মানুষ জানত না। বিজ্ঞান এ তথ্য আবিষ্কার করেছে। এ তথ্য বিজ্ঞানের সৃষ্টি নয়। বিশ্বের সকল বিজ্ঞানী ঐক্যবদ্ধ হয়ে চেষ্টা করলেও অন্য কোনো উপাদান দিয়ে বা ঐ দুটো উপাদানের পরিমাণে রদবদল করে এক ফোটা পানিও তৈরি করতে পারবে না। তাই আমরা এ কথা মেনে নিতে বাধ্য যে, আল্লাহ তাআলা যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তা নিয়েই বিজ্ঞান গবেষণা করে। বিজ্ঞান যেসব বস্তু সম্পর্কে চর্চা করে তার স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহ। কুরআনও ঐ আল্লাহরই বাণী। কুরআন বিজ্ঞানের পুস্তক নয়। আল্লাহ কুরআনে মানব জাতির জন্য যে জীবনবিধান দান করেছেন তা মেনে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি তাওহীদ ও আখিরাতে বিশ্বাস করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাওহীদ ও আখিরাতে বিশ্বাস জন্মানোর উদ্দেশ্যে কুরআনে সৃষ্টিজগতের অনেক তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। কীভাবে মেঘের সৃষ্টি এবং মেঘ থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হয়, মায়ের পেটে মানব শিশুর ভ্রূণ কেমন করে গঠিত হয় এবং ক্রমে ক্রমে পূর্ণ দেহ সৃষ্টি হয়, মহাশূন্যে সূর্য-চন্দ্র-গ্রহ-উপগ্রহ কীভাবে কক্ষপথে বিচরণ করে, পাহাড়-পর্বত সৃষ্টির উদ্দেশ্য কী, কী উদ্দেশ্যে জমিনকে নদী-সমুদ্র দিয়ে বিভক্ত করা হয়েছে ইত্যাদি কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। ভূগোল বা জ্যোতির্বিদ্যা শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়; তাওহীদ ও আখিরাতে বিশ্বাস জন্মানোর জন্য পরোক্ষ জ্ঞান দান করার উদ্দেশ্যেই ঐসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। বিজ্ঞান ঐসব তথ্য নিয়েই গবেষণা করে থাকে। কুরআনে উল্লেখিত যেসব তথ্য বিজ্ঞানের আওতায় আসে সেসব বিষয়ে আল্লাহর দেওয়া তথ্য কোনোটা ভুল প্রমাণ করা কিছুতেই সম্ভব নয়। আল্লাহ তো অবশ্যই ভুলের উর্ধ্বে। কুরআনের কোনো তথ্য এমন হতে পারে, যা বোঝার যোগ্যতা বিজ্ঞান এখনো অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। যেমন কুরআনে বারবার সাতটি আসমানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর সঠিক ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা বিজ্ঞান এখনো অর্জন করেনি।

প্রথম আসমানের পরিচয়

সূরা মুল্ক-এর ৫ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘আমি দুনিয়ার আসমানকে উজ্জ্বল বাতিসমূহ দ্বারা সজ্জিত করেছি’। দুনিয়া শব্দের অর্থ নিকট। মানুষের নিকটের আসমানকে সূর্য-চন্দ্র-তারার মতো বাতি দিয়ে তিনি সাজিয়েছেন। তাহলে বোঝা গেল যে, গোটা সৌরজগৎ প্রথম আসমানেরই অন্তর্ভুক্ত। বিজ্ঞান এখনো প্রথম আসমানের জ্ঞানই পরিপূর্ণভাবে অর্জন করতে পারেনি। সাত আসমানের নাগাল পেতে আরো কত সময় লাগবে কে জানে!

পৃষ্ঠা:০৫

বিজ্ঞানকেই যারা সবকিছু বলে বিশ্বাস করে তারা সূর্যের মতো বলতে পারে যে, আসমান আবার কী? আসমান বলে কোনো জিনিস তো বিজ্ঞান স্বীকার করে না। সাত আসমান কথাটিতো আরো অবাস্তব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের প্রফেসর ড. আবদুল জব্বারের লেখা একটা বই ছাত্রজীবনে পড়েছিলাম। বইটির নাম ছিল ‘এ ব্রহ্মাণ্ড কী প্রকাণ্ড’। তিনি লিখেছেন, আমরা যে সৌরজগতে আছি, এর ব্যাস হচ্ছে তিন লক্ষ আলোকবর্ষের পথ। সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবী ও গ্রহ-উপগ্রহের যে জগৎ, এর এক কিনারা থেকে অপর কিনারা পর্যন্ত যে দূরত্ব তা অতিক্রম করতে আলোর গতিতে তিন লক্ষ বছর প্রয়োজন। আলোর গতি হলো প্রতি সেকেন্ডে এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইলেরও বেশি। আলো এ পৃথিবীটার চারদিকে এক সেকেন্ডে ৭ বারেরও বেশি ঘুরতে পারে। তাহলে এ গতিতে তিন লক্ষ বছরে আলো যে দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে তা হিসাব করার জন্য কত অংক দরকার? এ বইটিতে লেখক বিজ্ঞানের তথ্য দিয়েই বলেছেন যে, মহাশূন্যে আমাদের সৌরজগতের মতো কোটি কোটি জগৎ আছে। কথাটি শুনতে একেবারেই অলীক মনে হয়। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বললে তা কি উড়িয়ে দেওয়া যায়? তাহলে এ মহাবিশ্ব কত প্রকাণ্ড তা মানুষের কল্পনারও বাইরে। এ কোটি কোটি জগৎ দুনিয়ার আসমান বা প্রথম আসমানের পরিধির অন্তর্ভুক্ত কি না তা বিজ্ঞানীরাই বলতে পারেন।

কুরআন যার বাণী তাঁর জ্ঞানই অনন্ত

মানুষ অতীতের কতটুকু জ্ঞানের অধিকারী? আমাদের পূর্বপুরুষগণ যতটুকু জ্ঞান সংরক্ষণ করে যেতে সক্ষম হয়েছেন, এর অতিরিক্ত এক বিন্দু জ্ঞানও কারো কাছে নেই। পৃথিবী, সূর্য, চন্দ্র ও গ্রহ-তারা বর্তমানে যে আকারে আছে তা কবে থেকে আছে তা কে বলতে পারে? এর আগে কী ছিল তা জানার কি কোনো উপায় আছে? মানুষের সৃষ্টি কত বছর আগে তা কি ইতিহাসে নির্ণীত হয়েছে?কুরআন বলছে, এক সময়ে শুধু পানি ছিল। পৃথিবী ও গ্রহ-তারা সব এক সাথে ছিল। এক সময় এসবকে পৃথক করা হয়েছে। পৃথিবীতে প্রথমে উদ্ভিদজগৎ সৃষ্টি করা হয়েছে। এরপর প্রাণীজগৎ এবং সবশেষে মানুষকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে। কুরআন আরো বলছে, পৃথিবীতে যা কিছু সৃষ্টি করা হয়েছে সবই মানুষের প্রয়োজন পূরণের উদ্দেশ্যে। অর্থাৎ উদ্ভিদজগৎ ও প্রাণীজগৎ সৃষ্টি করে পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের উপযোগী বানানোর পরই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে। যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি সকল জ্ঞানের অধিকারী। তিনি কুরআনে উপরিউক্ত যে কয়টি তথ্য দিয়েছেন, এর ভিত্তিতে বিজ্ঞানীরা গবেষণা করতে পারেন। বিজ্ঞান ঐসব বিষয়ে কিছুই জানে না। শুধু অনুমানের ভিত্তিতে বিভিন্ন বিজ্ঞানী বিভিন্ন মতবাদ বা থিউরি প্রকাশ করেছেন। এসবকে বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণিত সত্য মনে করা একেবারেই ভুল।

পৃষ্ঠা ৬ থেকে ১০

পৃষ্ঠা:০৬

সৃষ্টিকর্তা কুরআনে তাঁরই সৃষ্টিজগৎ সম্পর্কে কোনো তথ্য দিয়ে থাকলে তা অবশ্যই নির্ভুল। ঐ তথ্য মানুষ বুঝতে ভুল করতে পারে, কিন্তু তথাকে ভুল প্রমাণ করা সম্ভব নয়। আজ পর্যন্ত বিজ্ঞানের কোনো আবিষ্কার কুরআনের কোনো তথ্যকে ভুল প্রমাণিত করেছে বলে আমাদের জানা নেই।

বিজ্ঞানীর আবিষ্কারও ভুল হতে পারে

সৃষ্টিজগতের কোনো তথ্য সম্পর্কে কোনো বিজ্ঞানী একসময় যে ধারণা করেন, পরবর্তীকালে অন্যকোনো বিজ্ঞানী পৃথিবী সৌরজগতের কেন্দ্র এবং সূর্য-গ্রহ-নক্ষত্র একে ঘিরে আবর্তন করে, প্রাচীন গ্রীক পণ্ডিতদের এই ধারণাকে ‘টলেমি তত্ত্ব’ আকারে উপস্থাপন করেন। পরে গ্যালিলিও (মতান্তরে কোপার্নিকাস) মতবাদ দেন যে, সূর্যকে কেন্দ্র করে গ্রহ-নক্ষত্র, পৃথিবী আবর্তিত হচ্ছে। বর্তমানে প্রমাণিত হয়েছে যে, যদিও সূর্যকেই কেন্দ্র করে সৌরজগতের গ্রহ-নক্ষত্রগুলো আবর্তিত হচ্ছে, তথাপি সূর্যও নিজ অক্ষের উপর ঘুরছে এবং গোটা সৌরজগৎটিও ছায়াপথের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথে বিচরণ করছে। কুরআন দেড় হাজার বছর পূর্বেই ঘোষণা করেছে যে, পৃথিবী, চন্দ্র, সূর্য এবং সকল গ্রহ উপগ্রহই মহাশূন্যে বিচরণ করছে, কেউ স্থির বা স্থবির নয়। (সূরা ইয়াসীন: ৩৮-৪০)

জ্ঞানের প্রসারের কারণে কুরআনের ব্যাখ্যার পরিবর্তন

সূরা লুকমানের ৩৪ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তিনিই জানেন যে, মায়ের পেটে কী তৈরি হচ্ছে’। প্রসবের পূর্বে পেটে কি ছেলে হচ্ছে না মেয়ে, এ বিষয়ে যখন মানুষ জানতে পারত না, তখন ঐ আয়াতের অর্থ করতে গিয়ে বলা হতো যে, শুধু আল্লাহই জানেন, ছেলে হবে না মেয়ে হবে। কিন্তু বর্তমানে জানা যায় যে, পেটের শিশুটি ছেলে না মেয়ে। তাই ঐ অর্থ এখন আর সঠিক নয়।এখন এর অর্থ করা হয়, পেটের শিশু কী কী গুণের অধিকারী হবে। মেধাবী হবে না বোকা হবে, কেমন চরিত্রের হবে ইত্যাদি শুধু আল্লাহরই জানা। মানুষের জানা সম্ভব নয়। উক্ত আয়াতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। শুধু ব্যাখ্যায় পরিবর্তন হয়েছে। এ কারণেই মানুষের জ্ঞান যতই বৃদ্ধি পাচ্ছে কতক আয়াতের ব্যাখ্যাও নতুন করে করতে হচ্ছে। যুগে যুগে কুরআনের তাফসীর লেখার প্রয়োজন এজন্যই শেষ হবে না। বিজ্ঞানের আরো কত উন্নতি হলে এবং আকাশমণ্ডলী ও মহাশূন্য সম্পর্কে জ্ঞান কী পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে কুরআনে উল্লেখিত সাত আসমানের সঠিক ব্যাখ্যা জানা যাবে, এ বিষয়ে কোনো ধারণা করাও বর্তমানে সম্ভব নয়।মুহাম্মদ (স) সর্বশেষ নবী এবং কুরআন আল্লাহর সর্বশেষ কিতাব। তাই কিয়ামত পর্যন্ত এ কিতাবই মানবজাতির পথপ্রদর্শক। এ কিতাবের ব্যাখ্যা কোনো যুগেই শেষ হতে পারে না।

পৃষ্ঠা:০৭

কুরআনভিত্তিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা

কুরআন বিজ্ঞানময় হলেও বিজ্ঞানের পুস্তক নয়। কিন্তু বস্তুজগৎ ও প্রাকৃতিক জগতের যেসব তথ্য কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে, এর ভিত্তিতে বিজ্ঞানের চর্চা হতে পারে। এসব তথ্য বিজ্ঞানের থিউরি বা হাইপথেসিস হিসেবে গণ্য হতে পারে। ঢাকাস্থ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডাইরেক্টর জেনারেল থাকাকালে মরহুম এ. এফ. এম ইয়াহইয়া বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার আটজন বিজ্ঞানীর একটি কমিটি গঠন করে, তাঁদেরকে কুরআন সম্পর্কে গবেষণা করার দায়িত্ব দেন। তাদের সাথে কমিটিতে একজন বড় আলেম আছেন। গবেষণার ফসল হিসেবে ‘Scientific Indications in the Holy Quran’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যা ১৯৯০ সালে প্রকাশিত হয়। অত্যন্ত চমৎকার ইংরেজি ভাষায় বইটি রচিত। বাংলাদেশের প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ড. এম শমশের আলী ঐ কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সাড়ে পাঁচ শ’ পৃষ্ঠার প্রন্থটির শেষদিকে কমিটির সকল সদস্যের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও বিষয়গত গুণাবলি উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে শুধু

নামগুলো উল্লেখ করছি:

১. ড. এম শমশের আলী (পদার্থ বিজ্ঞান)

২. এম. আকবর আলী (রসায়ন বিজ্ঞান)

৩. প্রফেসর আবদুল কাদের চৌধুরী (রসায়ন বিজ্ঞান)

৪. প্রফেসর এম. এ. জব্বার (গণিতশাস্ত্র)

৫. এম. ফেরদৌস খান (পদার্থ বিজ্ঞান)

৬. ড. এম. সালার খান (উদ্ভিদ বিজ্ঞান)

৭. খন্দকার এম, মান্নান (পদার্থ বিজ্ঞান)

৮. ডাক্তার এম. গোলাম মুয়ায্যাম (চিকিৎসা বিজ্ঞান)

৯. মাওলানা মুহাম্মদ সালাহউদ্দীন

কুরআনের যেসব আয়াতে সামান্য বৈজ্ঞানিক ইঙ্গিতও রয়েছে, এর অত্যন্ত চমৎকার ব্যাখ্যার কারণে গ্রন্থটি কুরআনপ্রেমিক ও বিজ্ঞানমনা সবার জন্য অত্যন্ত সুখপাঠ্য হয়েছে।

কুরআনেই বিজ্ঞানের নির্ভুল সূত্র পাওয়া যায়

বিজ্ঞানের যে কয়টি সূত্র কুরআনে পাওয়া যায়, তা অবশ্যই নির্ভুল। ফ্রান্সের চিকিৎসাবিদ ডা. মরিস বুকাইলির ‘The Bible, the Quran and Science’ নামক পুস্তকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। বইটির বাংলা অনুবাদও প্রকাশিত হয়েছে। অনুবাদ করেছেন প্রখ্যাত সাংবাদিক জনাব আখতার-উল-আলম।

পৃষ্ঠা:০৮

বইটির প্রথম প্রকাশক ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশন’। প্রকাশনার দায়িত্বশীল হিসেবে অধ্যাপক আবদুল গফুর লিখেন, ‘ডা. মরিস বুকাইলি বৈজ্ঞানিক বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে, পবিত্র কুরআনই একমাত্র আসমানী কিতাব, যা সকল ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। শুধু তাই নয়, এই পবিত্র কুরআনেই রয়েছে বিজ্ঞান-সম্বলিত এমন সব বক্তব্য ও বর্ণনা- আয়াত ও ইঙ্গিত, যা আধুনিক যুগের সর্বাধুনিক তথ্যজ্ঞান ও আবিষ্কারের নিরিখে সঠিক ও সত্য বলেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।ডা. মরিস বুকাইলি পুস্তকটির ভূমিকায় বলেন, ‘আমার আলোচনার বিষয়বস্তু হলো: আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যজ্ঞানের আলোকে আসমানী বা ধর্মগ্রন্থসমূহের বক্তব্য কতটা সঠিক? ……প্রাকৃতিক বিষয় সম্পর্কে আসমানী কিতাবসমূহের যা কিছু বক্তব্য, যা কিছু মন্তব্য ও ব্যাখ্যা তা-ই আমাদের বর্তমান গবেষণার উপজীব্য।…… আলোচনার জন্য গৃহীত এতদসংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ে কুরআনের বাণী যেমন প্রচুর, বক্তব্যও তেমনি সমৃদ্ধ। পক্ষান্তরে, এই একই বিষয়ে ইহুদী ও খ্রিস্টধর্মের বাণী ও বক্তব্য খুবই অপ্রতুল।সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পুরাতন যাবতীয় ধ্যান-ধারণা পরিহার করেই আমি সর্বপ্রথম কুরআনের বাণীসমূহ পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ব্রতী হয়েছিলাম। আধুনিক বৈজ্ঞানিক সত্যের সাথে কুরআনের বিরোধ কতদূর, তা-ই ছিল আমার অনুসন্ধানের বিষয়। …..এরপর আমি আরবী ভাষা শিখি এবং অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কুরআনের আয়াতসমূহ পরীক্ষা করতে শুরু করি। সাথে সাথে প্রাকৃতিক বিষয় সংক্রান্ত কুরআনের বাণীসমূহের একটি তালিকা তৈরি করি। এভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ শেষ হলে আমার হাতে পর্যাপ্ত প্রমাণ-পঞ্জী জমা হয়। পরিশেষে এসব প্রমাণ-দলীলের ভিত্তিতে আমি এই স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে, কুরআনে এমন একটি বক্তব্যও নেই, যে বক্তবকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক বিচারে খণ্ডন করা যেতে পারে’।দীর্ঘ ৪০০ পৃষ্ঠার এ বইটিতে তিনি দলীল-প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, একমাত্র কুরআনই আল্লাহর বাণী। বাইবেল নামে যত প্রকার গ্রন্থ রয়েছে তা সবই মানব রচিত। ডাক্তার বুকাইলি একজন চিকিৎসাবিজ্ঞানী। তিনি শহীদ বাদশাহ ফায়সালের চিকিৎসক ছিলেন। বাদশাহ ফায়সালের পরামর্শেই তিনি কুরআন অধ্যয়নে ব্রতী হয়।

বিজ্ঞানের কর্মসীমা কতটুকু?

বিজ্ঞানের বিষ্ময়কর ও দ্রুত উন্নতিতে প্রভাবিত হয়ে কিছু লোক এ ভ্রান্ত ধারণা করতে পারে যে, মানুষের জীবনে জ্ঞানের যাবতীয় প্রয়োজন একমাত্র বিজ্ঞানই পূরণ করতে পারে। প্রকৃতপক্ষে বিজ্ঞানের কর্মসীমা বস্তুজগতেই সীমাবদ্ধ।মানুষ তো নৈতিক জীব। মানবদেহ অবশ্যই বন্ধু। কিন্তু নৈতিক চেতনা ও বিবেক-বুদ্ধি তো অবশ্যই বন্ধু নয়। বিবেকশক্তিই আসল মানুষ। বিজ্ঞান শুধু বস্তুজগতের জ্ঞানই দিতে পারে। মানুষের সুস্থ পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবন ইত্যাদির জন্য কোনো একটি বিধানও বিজ্ঞান দিতে সক্ষম নয়।

পৃষ্ঠা:০৯

কোন্টা মানুষের জন্য ভালো ও কোন্টা মন্দ, এ বিষয়ে বিজ্ঞানে কোনো চর্চাই হতে পারে না।

এমনকি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যেসব বস্তুশক্তি মানুষের হাতে তুলে দেয়, তা কোন কাজে ব্যবহার করা উচিত ও কোন কাজে অনুচিত সে বিষয়ে বিজ্ঞান কোনো বিধান দেয় না। এটা বিজ্ঞানের দায়িত্ব নয়। তাই মানব জীবনের জন্য বিজ্ঞানের অবদানই যথেষ্ট নয়। বিজ্ঞান শুধু মানুষের বস্তুগত প্রয়োজন পূরণ করে।

মানুষের জন্য নির্ভুল জীবনবিধান অপরিহার্য

সর্বকালেই এবং সকল দেশেই মানুষ পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনের জন্য বিধান রচনা করে। এছাড়া কোনো ক্ষেত্রেই শান্তি-শৃঙ্খলা বহাল থাকতে পারে না। এমনকি মানব দেহটিতে যেসব যোগ্যতা ও শক্তি রয়েছে তা সঠিকভাবে ব্যবহার করার জন্যও বিধি-বিধান প্রয়োজন।এটা মানবজাতির তিক্ত অভিজ্ঞতা যে, মানব জীবনের সকল ক্ষেত্রেই যেসব মনগড়া বিধান মানুষ চালু করে, তা নির্ভুল নয়। তাই যখনি কোথাও কোনো সমস্যা দেখা দেয় তখন নতুন বিধান রচনা করে এর সমাধান করার চেষ্টা চালায়। এতে কখনো কখনো আরো বড় সমস্যা দেখা দেয়। এর কারণ, নির্ভুল জ্ঞানের অভাব।নির্ভুল জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছে আছে। তাই আল্লাহ মানুষের মধ্য থেকেই রাসূল নিযুক্ত করে নির্ভুল জ্ঞান দান করেন।আল্লাহ মানুষকে বহুবিধ যোগ্যতা দিয়ে যে দেহ দান করেছেন, তা কীভাবে প্রয়োগ করা কল্যাণকর এবং বিজ্ঞান বস্তুজগৎকে কাজে লাগানোর জন্য যেসব বস্তুশক্তি মানুষের হাতে তুলে দেয়, তা কীভাবে ব্যবহার করা উচিত, এ বিষয়ে রাসূলের নিকট প্রেরিত নির্ভুল জ্ঞান অপরিহার্য। এ জ্ঞান ‘বিজ্ঞান’ থেকে পাওয়া যায় না।বিজ্ঞান আমার হাতে বন্দুক তুলে দিয়েছে। এ যন্ত্রটি ডাকাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য ব্যবহার করব, না ডাকাতি করার কাজে ব্যবহার করব, সে বিষয়ে বিজ্ঞান আমাকে কোনো পরামর্শ দেয় না। এ বিষয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী নির্দেশ দেয়।তাই বাস্তব সত্য এটাই যে, বিজ্ঞানের দায়িত্ব পালন যেখানে শেষ হয়, সেখানেই নবীর দায়িত্ব শুরু হয়। যারা নবীর নিকট থেকে Divine Guidance গ্রহণ করে তারাই নির্ভুল বিধান লাভ করতে পারে। যারা তা করে না, তারাই স্কুলের পর ভুল করতে থাকে এবং আজীবন অশান্তি ভোগ করে।

কুরআনে বিজ্ঞানচর্চার নির্দেশ

সূরা বাকারার ২৯ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا .

পৃষ্ঠা:১০

অর্থাৎ, ‘(হে মানুষ!) তিনিই ঐ সত্তা, যিনি পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সবই তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন।’ আমরা লক্ষ্য করি যে, বাতাস, পানি, আগুন, গাছপালা, পশু-পাখি সবই মানুষের প্রয়োজন পূরণ করে। অর্থাৎ, এসব মানুষের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে অন্য কারো প্রয়োজন পূরণের জন্য মানুষকে সৃষ্টি করা হয়নি। তাই দেখা যায়, ঐসব জিনিস ছাড়া মানুষের চলে না। কিন্তু মানুষ না থাকলে ঐসব জিনিসের কোনো অসুবিধা হয় না বরং মানুষ না থাকলে পশু-পাখির সুবিধাই হয়।আল্লাহ মানুষের জন্য যেসব জিনিস সৃষ্টি করলেন, তা কাজে লাগাতে হলে বিজ্ঞানের সাহায্য নিতেই হয়। বিজ্ঞানচর্চার প্রাথমিক এক যুগের নাম লৌহ যুগ। ঐ যুগে বিজ্ঞানচর্চার মাধ্যমে কৃষিকাজ ও পশু শিকার করার উদ্দেশ্যে লোহার যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করা হয়। বিজ্ঞানের বর্তমান উন্নতির যুগে মানুষ উন্নতমানে জীবনযাপনের যে অগণিত উপকরণ ব্যবহার করছে, এ সবই বিজ্ঞানের অবদান।আল্লাহর সৃষ্ট জিনিসকে কাজে লাগানোর জন্য চেষ্টা না করে যে সন্ন্যান্সী বা বৈরাগী হয়ে বনে-জঙ্গলে গাছের নিচে বসে ধ্যান করে, সে প্রকৃতপক্ষে তাকে সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যই জানে না। এর জন্য আল্লাহর নিকট সে শাস্তিরই যোগ্য বিবেচিত হতে পারে।

সূরা আলে ইমরানের ১৯০ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ البَلِ وَالنَّهَارِ لَأَبَتِ لِأُولِي الْأَلْبَابِ . অর্থাৎ, ‘নিশ্চয়ই আসমান ও জমিনের সৃষ্টির মধ্যে এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনের মধ্যে বুদ্ধিমানদের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।’বুদ্ধিমান মানুষ সৃষ্টির এসব বিষয়ে চিন্তাভাবনা করলে, এসব নিদর্শন থেকে আল্লাহর পরিচয় পাবে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে এসব নিয়ে গবেষণা করলে সৃষ্টির কৌশল সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারবে। এভাবে কুরআন বিজ্ঞানচর্চার নির্দেশ দিয়েছে।

যিকির ও ফিকির-এর সমন্বয় অত্যাবশ্যক

যিক্র মানে স্বরণ, আর ফিল্ম মানে চিন্তা-গবেষণা। সূরা আলে ইমরানের ১৯১ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ فِيمَا وَقُعُودًا وَعَلَى جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السمواتِ وَالْأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلًا . —অর্থাৎ, ‘যারা উঠতে, বসতে ও শুইতে সর্বাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আসমান ও জমিনের গঠনপ্রকৃতি সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে (তারা অন্তর থেকে বলে উঠে), হে আমাদের রব! এসব তুমি অনর্থক ও বিনা উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করনি।’

পৃষ্ঠা ১১ থেকে ১২

পৃষ্ঠা:১১

এ আয়াতে বলা হয়েছে যে, যারা আল্লাহকে স্মরণে রেখে সৃষ্টিজগৎ নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করে তারা যা কিছু আবিষ্কার করে তা জীবনের আসল উদ্দেশ্য পূরণের জন্য ব্যবহার করে। আল্লাহ মানুষকে দুনিয়ায় যে উদ্দেশ্যে পাঠিয়েছেন এবং তাঁর সৃষ্টিজগৎকে যে উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন, তা তারা সঠিকভাবে উপলব্ধি করে।যারা আল্লাহকে স্মরণ করে না, কিন্তু বিজ্ঞানচর্চা করে তারা যা কিছু আবিষ্কার করে তা স্রষ্টার উদ্দেশ্যের পরিবর্তে নিজের প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে। মুসলিম জাতি যখন বিশ্বে নেতৃত্বের মর্যাদায় ছিল তখন তারা আল্লাহকে স্মরণে রেখে বিজ্ঞানচর্চা করত। ইতিহাসে মুসলিম বিজ্ঞানী হিসেবে যারা খ্যাত তারা সবাই আল্লাহর নেক বান্দাহ ছিলেন। তাদের আবিষ্কার মানব কল্যাণেই ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহর উদ্দেশ্যের বিপরীত পথে তারা ব্যবহার করেননি। আজ মুসলিম জাতির মধ্যে যারা যিক্র করেন, তারা ফিক্স করেন না। আর অমুসলিম বিশ্বে যারা বিজ্ঞানচর্চা করেন, তারা আল্লাহকে স্মরণ করেন না। তাই তাদের আবিষ্কার মানব কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণেই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। শুধু বিজ্ঞানীদেরকে এর জন্য দায়ী করা যায় না। তবে যদি আল্লাহকে স্মরণ করার নীতি তাদের সমাজে চালু থাকত তাহলে বিজ্ঞানের আবিষ্কার মানব জাতির অকল্যাণে ব্যবহৃত হতো না। মুসলিমদের মধ্যে যারা বিজ্ঞানচর্চা করেন, তাদের মধ্যে আল্লাহর স্মরণের সমন্বয় অত্যাবশ্যক।

যিকিরের অভাবে বিজ্ঞানের উন্নতিই বিশ্বের অশান্তির কারণ

সূরা রূমের ৪১ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ . অর্থাৎ, ‘জলে স্থলে যে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে তা মানুষেরই কামাই’। আল্লাহ পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিলেন যে, পৃথিবীতে সর্বত্র জলে ও স্থলে যত অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, এর জন্য আল্লাহ মোটেই দায়ী নন; এর জন্য একমাত্র মানুষই দায়ী। বিরাটসংখ্যক মানুষ বিবেকের বিরুদ্ধে চলে। যা করা উচিত নয় বলে বিবেক রায় দেয় তা-ই তারা করে। এর ফলে অশান্তি সৃষ্টি হয় এবং পরিণামে সকলেই দুঃখ-কষ্ট ভোগ করে। বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে বস্তুশক্তি যতই বৃদ্ধি পাচ্ছে তা বিবেকহীন মানুষ মানবসমাজের অকল্যাণেই ব্যবহার করছে। বিজ্ঞানের অবদানকে কাজে লাগিয়েই ভয়ানক মারণাস্ত্র তৈরি করা হয়। গত বিশ্বযুদ্ধে যে বিরাট ধ্বংসলীলা চলেছে এর জন্য কি মানুষই দায়ী নয়? আমেরিকার নেতৃত্বে আফগানিস্তান, ইরাক ও লেবাননে মারণাস্ত্র প্রয়োগ করে যে চরম অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে তা জঘন্য হিংস্রতা ও পশুত্বের পরিচায়ক। মানবতার প্রতি এর চেয়ে বড় আঘাত আর কী হতে পারে?

পৃষ্ঠা:১২

স্রষ্টার দেওয়া জীবনবিধান মেনে না চলার ফলে বহুশক্তিকে ব্যাপকভাবে অপব্যবহার করার পরিণামে বিপর্যয় সৃষ্টি হচ্ছে। এভাবেই বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ ও পরিবেশ-দূষণ হচ্ছে।বিদ্যুৎ, পেট্রল, গ্যাস ও অন্যান্য খনিজ তরল পদার্থের যথেচ্ছ ব্যবহারের প্রতিক্রিয়ায় ঊর্ধ্বলোকে ওজনস্তর ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। সূর্যের যেসব ক্ষতিকর রশ্মি পৃথিবীতে আসতে ওজনস্তর ঠেকিয়ে রাখে, তা পুরোপুরি ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এর পরিণামে পৃথিবীতে তাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। মেরু অঞ্চলের বরফ গলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বিপদসীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। গোটা বিশ্বে আবহাওয়ার ভারসাম্য বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শীতের দেশেও প্রচণ্ড গরম পড়ছে। এসব মানুষেরই কর্মফল।আল্লাহ সৃষ্টিজগৎকে ব্যবহার করার ক্ষমতা ও অধিকার মানুষকে দিয়েছেন। সে ক্ষমতাবলেই বিজ্ঞানের এত উন্নতি। সঠিক ব্যবহারের বদলে অপব্যবহার করে মানুষ স্রষ্টার সুসজ্জিত ও ভারসাম্যপূর্ণ সৃষ্টিজগতের শৃঙ্খলাই বিনষ্ট করতে সক্ষম। মানবজাতিকে বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে হলে স্রষ্টার রচিত বিধানকে মেনে চলতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। মানুষের জন্য একমাত্র ভারসাম্যপূর্ণ পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধানই ইসলাম। যাঁর মাধ্যমে মানুষ এ জীবনবিধানের বাস্তব শিক্ষালাভ করেছে, সে মানুষটিকে আল্লাহ ‘রাহমাতুললিল আলামীন’ উপাধিতে ভূষিত করেছেন। আল্লাহ তাঁকে শুধু রাহমাতুললিল মুমিনীন, এমন কি রাহমাতুললিন্নাসও বলেননি। মুমিনদের বা মানব জাতির জন্য রহমত না বলে বিশ্বজগতের জন্য রহমত বলা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মুহাম্মদ (স) আল্লাহর পক্ষ থেকে যে বিধান মানুষের মধ্যে বাস্তবে চালু করে দেখিয়ে দিলেন, তা যদি মানবজাতি যথাযথভাবে মেনে চলে তবে প্রাকৃতিক জগতের ভারসাম্যও বহাল থাকবে। যে ভারসাম্য মানুষের কারণে বিনষ্ট হচ্ছে তা বহাল থাকলে আল্লাহর রহমত গোটা বিশ্বই ভোগ করবে। তাই আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূল (স)-কে রাহমাতুললিল আলামীন বা ‘সমগ্র বিশ্বজাহানের জন্য রহমত’ বলে ঘোষণা করেছেন।হয়তো পৃথিবী একদিন মানুষের হাতেই ধ্বংস হবে। বিজ্ঞানের আরো উন্নতি হলে আরো কত বিরাট বিরাট শক্তি মানুষের আয়ত্তে আসবে। জার্মানির হিটলার ও আমেরিকার বুশের মতো ক্ষমতাশদমত্ত বিবেকহীনদের হাতে ঐসব শক্তির অপব্যহারের ফলে মানবজাতির অস্তিত্বই বিপন্ন হতে পারে।, যারা স্রষ্টাকে স্মরণ করে না এবং স্রষ্টার নিকট থেকে পথনির্দেশের প্রয়োজন মনে করে না, তাদের হাতে বিশ্বের নেতৃত্ব থাকা মানবজাতির জন্য আল্লাহর মারাত্মক অভিশাপ।

সমাপ্ত

হোম
ই-শো
লাইভ টিভি
নামাজ শিক্ষা
গেইমস
চাকুরি