Skip to content

বাংলার ফকির বিদ্রোহ

কবিতা ১ থেকে ৬

কবিতা:০১

বাঙলার ফকীর-বিদ্রোহ

পলাশীর আয়-কাননে বাঙলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজুদ্দৌলার অপ্রত্যাশিত ভাগ্য-বিপর্যয়ে মুসলমানরা সাময়িকভাবে দিশাহারা ও মূহ্য- মান হয়ে পড়েছিল। দেশের আজাদী অকস্মাৎ এভাবে বিপন্ন হয়ে ১২১৩, বিদেশ থেকে আগত মুষ্টিমেয় একদল বেনিয়া ছল-চাতুরীর কৌশলে হঠাৎ দেশের তাজ, তখতের মালিক হয়ে বসবে, এ-কথা আগে এউ স্বপ্নেও ভাবতে পারে নি। কিন্তু নেমকহারাম মীর জাফর, উর্মীচাঁদ, জগৎশেঠ আর দুর্লভরামের দেশদ্রোহিতার ফলে এ অঘটনই ঘটে গেল। পলাশীর তথাকথিত যুদ্ধে পরাজয়ের পর মীর জাফর-তনয় ৯ রণের হাতে বন্দী নবাবকে প্রাণ দিতে হলো; আর ইংরাজ বণিকদের হাতের ক্রীড়নকরূপেই মীর জাফরকে বসানো হলো নবাবী তখ,তে।

ইতিহাসের এ আকস্মিক পট-পরিবর্তনে দেশবাসী সাময়িকভাবে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেও, আত্মসম্বিৎ ফিরে পেতে তাদের দেরী হলো না। তারা বুঝতে পারল দেশবাসীর সাহায্য-সহযোগিতা না পেলে মুষ্টিমেয় ইংরাজ বণিকের পক্ষে এদেশে টিকে-থাকা কিছুতেই সম্ভবপর হবে না। মুসলিম অভিজাত সম্প্রদায় ও আলেম-সমাজ অগৌণে ইংরাজ বণিকদের বিরুদ্ধে অসহযোগ নীতি ঘোষণা করলেন।

ভাদের সহিত কোনরূপ সহযোগিতা করা, লেনদেনে নিয়োজিত হওয়া- এমন কি তাদের ভাষা ইংরাজী শিক্ষা করাও হারাম বলে আলেম সমাজ ফৎওয়া দিলেন। সঙ্গে সঙ্গেই দেশের আজাদী ফিরিয়ে আনার জন্যে সশস্ত্র সংগ্রামেরও সূচনা হয়ে গেল দেশের নানা অংশে নানাভাবে।

আমাদের প্রথম যুগের সে আজাদী-সংগ্রামে জাতির যেসব বাঁর যোদ্ধা তরবারি হাতে এগিয়ে এসেছিলেন, ফকীর-সরদার মজনু শাহ মস্তানা নিঃসন্দেহে উয়দের মধ্যে অন্যতম অগ্রনায়ক। তিনি ছিলেন মাদারী বোরহানা মস্তানা তরিকার ফকীরদের নেতা। কয়েক সহস্র সশস্ত্র ফকীর অনুচর নিয়ে তিনি ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর ইংরাজ বণিক সম্প্রদায় এবং তাদের সহায়ক খাজানা-আদায়কারী তথাকথিত জমিদার দল ও সুদখোর অত্যাচারী মহাজনদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। পলাশীর তথাকথিত যুদ্ধের মাত্র ছয় বছর পরে ১৭৬৩ অব্দে এই ফকীর নেতা সর্ব-প্রথমে সংগ্রাম-ক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন এবং ঊনবিংশ শতকের প্রথম কয়েক বছর পর্যন্ত ফকীরদের এ সংগ্রাম অনেকটা অব্যাহতভাবেই চলতে থাকে।

মজনু শাহ গোয়ালিয়র রাজ্যের (বর্তমানে ভারতে) মেওয়াত এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মাদারী বোরহানা তরিকার ফকীর বা দরবেশ ছিলেন। এই বিশেষ তরিকার ফকীরদের সম্পর্কে মরহুম নওয়াবজাদা আবদুল আলী (ভূতপূর্ব ইম্পিরিয়াল্ রেকর্ড-কীপার) ১৯০৩

অব্দে কলকাতা থেকে প্রকাশিত এসিয়াটিক সোসাইটীর জার্ণালে লিখেছেন:

They grow long hair on their head, put on coloured clothes and use iron shackles and long tongs. They subsist mainly on unboiled rice, clarified butter and salt. They do not eat fish or meat and until recent years they lived a life of celibacy. In their tours they carry the fish- standard and are accompanied by a huge retinue and their title is Burhana. The Faqirs are the member of the Basria group, Taifuria-Khanwadu and Tabagati ghar. In other words, as I understand from this, the Taifuria. Khanwadu is a branch of Basria ghar and the Tabagati ghar is again a branch of Taifuria-Khanwadu, an order introduced by Shah Madar.

অর্থাৎ: “তা’রা মাথায় লম্বা চুল রাখে, রঙীন কাপড় পরে এবং লোহার শিকল ও লম্বা চিমটা ব্যবহার করে। প্রধানতঃ আতপ চাল, ঘি ও নুনই তাদের খাদ্য। তারা মাছ-মাংস খায় না এবং কিছুদিন আগে পর্যন্তও কৌমার্যের জীবন পরিচালনা করত। সফরের সময় তারা মৎস্য- প্রতীক শোভিত পতাকা বহন করে এবং বিরাট দলবল নিয়েই তারা চলাফেরা করে। তাদের উপাধি ‘বোরহানা’। এসব ফকীর ‘বসরিয়া’

তরিকার ‘তৈফুরিয়া-খানওয়াড়ো’ ও ‘তাবাগাতি’ ঘরের অন্তর্ভুক্ত। অন্য কথায় বলতে গেলে, আমি যতটা বুঝি, ‘তৈফুরিয়া খানওয়াড়ো’ হচ্ছে ‘বসরিয়া’ ঘরেরই’ একটি শাখা এবং ‘তাবাগাতি ঘর’ হচ্ছে ‘তৈফুরিয়া খানওয়াড়ো’ ঘরেরই একটি শাখা। শাহ মাদার হচ্ছেন, এ তরিকার প্রবর্তক।”

বর্তমান ভারতের কানপুর থেকে চল্লিশ মাইল দূরে অবস্থিত মকান- পুর নামক স্থানে শাহ, মাদারের দরগায় মজনু শাহ বাস করতেন। এখান থেকেই তিনি সহস্র সশস্ত্র অনুচরসহ প্রায় প্রতি বর্ষেই তৎকালীন ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর অধিকারভুক্ত বাওলা ও বিহারের বিভিন্ন স্থানে অভিযান করতেন। তাঁর কার্যক্ষেত্র প্রধানতঃ বিহারের পূর্ণিয়া অঞ্চল এবং বাঙলার রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, রাজশাহী, কোচবিহার, জলপাই- গুড়ি, মালদহ, পাবনা ও ময়মনসিংহ জেলায় বিস্তৃত ছিল। মধ্যে মধ্যে তিনি ঢাকা, সিলেট এবং নিম্ন-বঙ্গের কোন কোন জায়গায়ও অভিযান পরিচালনা করেছেন বলেও প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রকৃতপক্ষে, এ-দেশে বৃটিশ শাসনের প্রথম যুগে তৎকালীন ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর ইংরাজ বণিকের দল এবং তাদের সহায়ক জমিদার-মহাজনদের মধ্যে মজনু শাহ বিরাট ত্রাসেরই সঞ্চার করেছিলেন।

 কবিতা:০২

মস্তানগড় দূর্গ

১৭৭৬ অব্দে মজনু শাহ বগুড়া জেলার মহাস্থান নামক জায়গায় একটা দুর্গ নির্মাণ করেন। তাঁর এ দুর্গ থেকেই জায়গাটার অপর নাম

‘মস্থানগড়’ (ম্যানের গড় বা দুর্গ) হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। ফকীর-সরদারের এ দূর্গ নির্মাণের কথা বগুড়ার (তৎকালে ‘সেল, বস’ নামে পরিচিত) তৎকালীন কালেক্টর মিঃ ফ্রান্সিস, গ্লাডউইন এক পত্র মারফত দিনাজপুরস্থ কোম্পানীর সদর দফতরে (The Provincial Council of the Company) বিদিত করেছিলেন। এ দুর্গই পরবর্তীকালে বহু বছর পর্যন্ত ফকীর-বাহিনীর অভিযান পরিচালনার কেন্দ্ররূপে ব্যবহৃত হয়। মস্তানগড় দুর্গ ছাড়াও মজনুশাহ বগুড়া থেকে ১২ মাইল দক্ষিণ দিকে অবস্থিত মাদারগঞ্জে অপর একটি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৮৬১ অব্দে প্রকাশিত ‘সেতিহাস বগুড়ার বৃত্তান্ত’ নামক একখানা প্রাচীন পুস্তিকায় মজনু শাহ ফকীরের মাদারগঞ্জ কেন্দ্রের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, দেখা যায়। এ পুরনো পুস্তিকায় ফকীর-সরদারের বিস্ময়কর অস্ত্র ‘ভেলা’ সম্পর্কেও আলোচনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে যে, এ অগ্নের সঙ্গে একটা চক্র সংযুক্ত ছিল এবং চক্রটির ঘূর্ণনের ফলে চারদিকে অজস্র ধারায় অগ্নি বর্ধিত হতো।

 কবিতা:০৩

ঢাকা-কুঠি আক্রান্ত

১৭৬৩ সালে ফকীর বাহিনী কর্তৃক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর ঢাকা ‘কুঠি’ আক্রান্ত হয়। সম্ভবতঃ বৃটিশদের বিরুদ্ধে ফকীর-বাহিনীর প্রথম আক্রমণ ছিল এটাই। কোম্পানীর তৎকালীন কাগজপত্রে দেখা যায় যে, মিঃ র‍্যালফ, লিসেস্টার নামক জনৈক ইংরাজ সে-সময়ে ঢাকা-কুঠির ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী ছিলেন। ফকীর-বাহিনীর আগমনে এ স্বেতাঙ্গ

ভদ্রলোক এতটা ভয় পান যে, কোনরূপ প্রতিরোধের প্রয়াস না পেয়েই কুঠি ত্যাগ করে তিনি বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকায় গিয়ে আগ্রয় গ্রহণ করেন। কাজেই সম্পূর্ণ বিনা বাধায়ই ফকীর দল ঢাকা ‘কুঠি’ লুণ্ঠনের সুযোগ পেয়েছিল। কুখ্যাত লর্ড ক্লাইভ সে-সময়ে কোম্পানীর গভর্ণর ছিলেন। ঢাকার এ দুঃসংবাদ পেয়ে তিনি মিঃ লিসেন্টারের আচরণকে ‘কাপুরুষোচিত’ আখ্যা দিয়ে ফকীরদের “হোট লোকের একটা দল” (a rabble of Faqirs) বিশেষণে অভিহিত করেছিলেন।

ঢাকা-কুঠির এ আক্রমণের পর থেকে প্রায় অব্যাহতভাবেই ফকীর- বাহিনী বাঙলার বিভিন্ন স্থানে তাদের অভিযান চালিয়ে যেতে থাকে। দেখা যায় যে, প্রায় সকল ক্ষেত্রেই কোম্পানীর কুঠিসমূহ এবং তাদের খাজানা-আদায়কারী তথাকথিত জমিদারদের কাহারীগুলি ফকীরদের আক্রমণের লক্ষাস্থল ছিল। জমিদারদের আবাস বাটী এবং অনেকস্থলে সুদখোর মহাজনদের বাড়ীতেও তারা আক্রমণ পরিচালনা করে লুটপাট করতো। কোম্পানীর তৎকালীন কাগজপত্রের সাক্ষা থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, প্রায় সকল ক্ষেত্রেই মজনু শাহ, মস্তানা আক্রমণকারী ফকীর-বাহিনীর পরিচালক ছিলেন এবং মুসা শাহ, পরাগল শাহ, চেরাগ আলী শাহ, সোবহানী শাহ, করিম শাহ প্রভৃতি ছিলেন তাঁর বিশিষ্ট শিষ্য ও সহচর। পরাগল শাহ তাঁর পুত্র ছিলেন বলে কথিত হয় এবং এ-ও জানা যায় যে, মুসা শাহ হিলেন তাঁর জ্ঞাতি ভ্রাতা। প্রান্ত দলীল-পত্র থেকে পরিষ্কারই প্রমাণিত হয়েছে যে, মুসা শাহ ছিলেন ফকীর-সরদারের দক্ষিণ-হস্ত স্বরূপ এবং তাঁর সাথে পরামর্শ

করেই মজস্ব শাহ স্বাঁয় অভিযানের পরিকল্পনা রচনা করতেন। প্রকৃতপক্ষে, মজনু শাহর মৃত্যুর পর বহু বছর পর্যন্ত মুসা শাহই ফকীর বাহিনী পরিচালনা করেছিলেন বলেও প্রমাণ পাওয়া যায়।

 কবিতা:০৪

সেনাপতি কীথ, নিহত

১৭৬৯ অব্দের ডিসেম্বর মাসে অভিযানকারী ফকীর বাহিনীর বিরুদ্ধে কোম্পানী একদল সৈন্য প্রেরণ করে। পরগনা-সিপাইদের সমন্বয়েই এ সেনাদল গঠিত হয়েছিল এবং লেফটেন্যান্ট কীথ, নামক জনৈক বৃটীশ সামরিক অফিসার সেনাদলের পরিচালক নিযুক্ত হন। মোরাং অঞ্চলে (পূর্ণিয়ার উত্তরে অবস্থিত নেপাল-তেরাই এলাকা) এ সেনাদল ফকীর বাহিনীর সম্মুখীন হয় এবং যুদ্ধে সেনাপতি কীথ, নিহত হন। কাঁথের অধীনস্থ সিপাইদেরও সকলকেই ফকীদের তীব্র আক্রমণের মুখে প্রাণ দিতে হয়।

লেফটেন্যান্ট কীথের উপর এ বিজয়ের ফলে স্বভাবতাই ফকীরদের সাহস বেড়ে যায় এবং পর বৎসর বিপুল সংখ্যায় তারা বাঙলায় আগমণ করে। ১৭৭ অব্দের নভেম্বর মাসে কোম্পানীর দিনাজপুর কুঠির ইংরাজ সুপারভাইজার কর্তৃপক্ষের নিকট লিখিত এক পত্রে জানান:

“ফকীরদের একটি বিরাট দল প্রদেশে এসে পৌঁছেছে। এদের বিরুদ্ধে ১০ জন সিপাই ও ১০০ বরকন্দাজ পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু

দিনাজপুরের রাজার কাছ থেকে জানাগেল যে, ফকীরদের সংখ্যা নাকি পাঁচ হাজার। এ জন্যেই শেষ পর্যন্ত সেপাই ও বরকন্দাজদের ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এত অল্প-সংখ্যক লোক নিয়ে ফকীরদের এ বিরাট দলের মোকাবিলা করা সম্ভবপর নয়।”

দিনাজপুরের সুপারভাইজারের এ রিপোর্টের কিছুদিন পর ১৭৭১ অব্দের ফেব্রুয়ারী মাসে পাবনা জেলার বেলকুচি নামক স্থান থেকে ক্যাপ্টেন রেনেল, (ইনি তখন জরীপের কাজে নিেেয়াজিত ছিলেন) লিখে পাঠান:

“এ অঞ্চলে বর্তমানে ফকীরদের এক বিরাট দলের আবিভাব হয়েছে। গতকাল তারা ছিল লক্ষ্মীনামপুর নামক জায়গায়। এখান থেকে তা’ চার ক্রোশ দূরে। সেখানকার গঞ্জ-দারোগার কাছ থেকে দু’শো টাকা আদায় করে ফকীর দল উত্তর দিকে ‘পুচারিয়া’ অঞ্চলের (বর্তমান ময়মনসিংহ জেলার পুখারিয়া পরগনা) দিকে চলে গিয়েছে। তাদের সংখ্যা প্রায় এক হাজার হবে এবং তারা অনেকটা ভাল-ভাবেই অস্ত্রসজ্জিত। পশ্চিম প্রদেশ থেকে তারা মাস-খানেক আগে এখানে এসেছে।”

 কবিতা:০৫

কাজীপাড়ার সংঘর্ষ

ক্যাপ্টেন রেনেলের চিঠি পেয়ে মুর্শীদাবাদস্থ কর্তৃপক্ষ লেফটেন্যান্ট টেইলর নামক জনৈক সেনাপতির নেতৃত্বে দু’ দল সেপাই পাঠিয়ে দেন।

সঙ্গে সঙ্গেই রংপুরের সুপারভাইজারও লেফটেন্যান্ট ফেল, থামের নেতৃত্বে দু’ দল সেপাই ঘোড়াঘাটের দিকে পাঠিয়ে দেন ফকীরদের পথ রোধ করার জন্যে। ফেলথামের এ সেনাদল গোবিন্দগঞ্জ থেকে ১২ মাইল দূরবর্তী কাজীপাড়া নামক গ্রামের পার্শ্বে দু’টি ঝিলের মাঝখানে ফকীরদের শিবিরে এসে অতর্কিতভাবে হানা দেয় এবং ফলে এক খন্ডযুদ্ধ সংঘটিত হয়। ক্যাপ্টেন রেলেল এ যুদ্ধের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন:

“রংপুরের সেনাদলসহ ফেল, থাম ঘোড়াঘাট ও গোবিন্দগঞ্জের পথে অগ্রসর হয়ে ২৫শে তারিখ সকালে অতর্কিতভাবে ফকীরদের শিবিরে হানা দেয়। স্বল্পকাল স্থায়ী এক খণ্ডযুদ্ধের পর ফকীর দল পরাজিত হয়ে ছত্রভঙ্গভাবে পলায়ন করে। তাদের নেতা শেখ মজনু (Sheikh Mujenoo) খোড়ায় সওয়ার হয়ে ‘মস্তান-গড়ে’ (Mustan Gurr) পলায়ন করে এবং তার দলবল পরে সেখানে গিয়ে তার সহিত মিলিত হয়।”

 কবিতা:০৬

রাজশাহী অঞ্চলে ফকীরদের আবির্ভাব

পরবর্তী বৎসর-অর্থাৎ ১৭৭২ অব্দের প্রথম দিকে-বিপুল সংখ্যক সশস্ত্র অনুচরসহ মজনু শাহ পুনরায় উত্তরবঙ্গে আবির্ভুত হন। তাঁর এ আবিভাব সম্পর্কে রাজশাহীর সুপারভাইজার ২২শে জানুয়ারী (১৭৭২) তারিখে লিখিত পত্রে কোম্পানীর রাজত্ব-নিয়ন্ত্রণ কাউন্সিলকে ( Controlling Council of Revenue) জানান যে, মজনু শাহের

নেতৃত্বে ২০০০ মুসলমান ফকীর উরু অঞ্চলে এসে উপনীত হয়েছে। ‘তৎকালে কোম্পানীর ইংরাজ কর্মচারীরা সাধারণতঃ কিরূপ ভাষা ব্যবহার করত, তার নমুনা স্বরূপ এ পত্রের কিয়দংশ নিয়ে এবয় উজ্জ্বতে হলো:

“Shaw Mudjenoo, the Burrana Fakeer, being arrived with a numerous body in the Pargana, carried away one of the principal men under confinement, The Fakeers are very numerous and it is difficult to repel them. There is some treasure here, and what will be the result I know not

এই উদ্ধতির অনুবাদ করা যেতে পারেঃ “বোরহানা ফকীর শাহ মজনু বিপুল সংখ্যক অনুচরসহ এ পরগনায় এসে একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে বন্দী করে রেখেছে। ফকীরদের সংখ্যা অনেক বেশী এবং তাদের প্রতিহত করা কঠিন। এখানে কিছু অর্থ-সম্পদ রয়েছে; আমি জানি না কি পরিণতি হবে।”

রাজশাহীর সুপারভাইজার তাঁর উপরোক্ত পত্রে দয়ারাম রায়ের এক গ্রাম্য আমলার কাছ থেকে পাওয়া এক পত্রের বরাত দিয়ে আরো উল্লেখ করেন: “তিন শ’ ফকীরের একটি দল আদায়করা খাজনার ১০০ টাকা নিয়ে গিয়েছে এবং আশঙ্কা করা যাচ্ছে যে, তারা হয় তো পরগনা- কাচারীই দখল করে বসবে। তলোয়ার, বর্শা, গাদাবস্তুক এবং হাউই

কবিতা ৭ থেকে ১৪

ব্যজির হাতিয়ারে তারা সজ্জিত। কেউ কেউ বলে তাদের কাছে নাকি ঘূর্ণায়মান কামানও রয়েছে।”

১৭৭২ অব্দের ২৫শে জানুয়ারী তারিখে লিখিত নাটোরের সুপার- ভাইজারের পত্রে বলা হয়:

“মজনু তাঁর শিষ্যবর্গকে সর্বপ্রকার অত্যাচার ও কঠোরতা পরিহার করার এবং লোকেদের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত দান ব্যতীত অন্য কোন প্রকার অর্থাদি গ্রহণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু বিভিন্ন পরগনা থেকে আমি যেসব বিবরণ পেয়েছি, তা থেকে জানা যায় যে, দয়ারাম রায়ের এলাকাধীন নূরনগর গ্রাম থেকে ফকীররা ৫০০ ঢাকা আদায় করেছে এবং জয়সিন্ কাচারী থেকেও ১৬৯০ টাকা নিয়ে গিয়েছে। ফকীরদের দেখেই কাচারীর লোকেরা ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। জানা গিয়েছে যে, ফকীরদলের সহিত দুটো উল্টু, প্রায় ৪০টি হাউই, ৪০০ গাদা বন্ধুকধারী লোক, কয়েকটি ঘূর্ণায়মান কামান এবং সর্বমোট প্রায় এক হাজার সশস্ত্র লোক রয়েছে। মজনু নিজে একটি খুব ভালো ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে যাতায়াত করেন এবং তাঁর সহচরদেরও কয়েকজনের টাট্ট, ঘোড়া রয়েছে।”

কবিতা :০৭

ক্যাপ্টেন টমাসের মৃত্যু

১৭৭২ অব্দের জানুয়ারী মাসের কাছাকাছি সময়ে রংপুরের সুপারভাইজার মিঃ পালিং কোম্পানীর কাছে রিপোর্ট প্রেরণ করেন যে,

ফকীর দল ঘোড়াঘাট অঞ্চলে এসে জমায়েত হয়েছে এবং কোন কোন জায়গায় কিছুটা অত্যাচারেরও অনুষ্ঠান করেছে। পরিস্থিতির এরূপ বর্ণনা প্রদান করে মিঃ পালিং লিখেন: “এ জন্যেই আমি ক্যাপ্টেন টমাসকে এক দল সিপাইসহ গোবিন্দগঞ্জ অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার আদেশ দিয়েছি।”

কোম্পানীর নিয়াণ-পরিষদ (Controlling Council) মিঃ পালিংএর অবলম্বিত ব্যবস্থা অনুমোদন করেন। কিন্তু এ ঘটনার কয়েক মাস পরেই একদল সশস্ত্র সন্ন্যাসীর সহিত সঙ্ঘর্ষে ক্যাপ্টেন টমাস নিহত হন।

কবিতা :০৮

দু’বছর পর

উপরোক্ত ঘটনার প্রায় ছ’ বছর পর আবার উত্তরবঙ্গে ফকীরদের আবির্ভাব হয়। এ সম্পর্কে কোম্পানীর তৎকালীন কাগজপত্রে লিখিত বিবরবী থেকে জানা যায় যে, ১৭৭৩ অব্দের ১৮ই ডিসেম্বর তারিখে রাজশাহীর কলেক্টর সপারিষদ গভর্ণরকে জানান:

“৭. অনুচরসহ পরগনা ‘মেসিদায়’ (বর্তমানে দিনাজপুর জেলায় উপনীত হয়ে শাহ মজনু তথাকার ক্ষমতাচ্যুত জমিদারের কাছ থেকে ১৫০০ টাকা দাবী করেন। তাঁর এ লিখিত দাবীর কোন সন্তোষ- জনক উত্তর না পেয়ে জমিদারকে ধরে আনার জন্য তিনি দু’শো

ফকীরকে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু জমিদার আগের দিন রাত্রেই পলায়ন করেছিল। ফকীর দল প্রায় ত্রিশ মাইল দূরে অবস্থিত ‘লেঙ্গুবাড়িয়া’ পর্যন্ত পলায়িত জমিদারের অনুসরণ করে। কর্মচারী আগে থেকেই পলায়ন করেহিল। ১০৫৭ টাকা ফকীররা নিয়ে গিয়েছে। ফকীরদের ভয়ে সকল কাচারীতে সঞ্চিত খাজানার তারা জমিদারের বাড়ী ও কাচারীতেও লুটতরাজ করে এবং পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন গ্রাম থেকে প্রায় ১৫০০ টাকা আদায় করেছে।”

রাজশাহীর কলেক্টরের কাছ থেকে এ বিবরণী পেয়ে কোম্পানীর কর্তৃপক্ষ লেফটেন্যান্ট উইলিয়ামস্-এর নেতৃত্বে ২৩শে ডিসেম্বর তারিখে চার কোম্পানী সেপাই প্রেরণ করেন। ফকীর-দল এর পর উত্তর-বঙ্গ এলাকা ত্যাগ করে চলে যায় এবং এর কিছুদিন পরেই পূর্ণিয়া এলাকা থেকে তাদের কর্মতৎপরতার সংবাদ পাওয়া যায়।

কবিতা :০৯

মস্তানগড় এলাকায় ফকীরদের তৎপরতা

১৭৭৬ থেকে শুরু করে ১৭৮০ অব্দ পর্যন্ত সময়ে উত্তর-বঙ্গ অঞ্চলে মজনু শাহ ও তাঁর ফকীর বাহিনীর নূতনতর তৎপরতার পরিচয় পাওয়া যায়। ১৭৭৬ অব্দের ১৯শে মার্চ তারিখে সেল, বরস্ (বগুড়া) থেকে মিঃ ফ্রান্সিস্ গ্লাডউইন কোম্পানীর সদর দফতরে জানান:

“আমি জানতে পেরেছি যে, মজনু এ অঞ্চলে-বিরাট একদল ফকীরকে সমবেত করেছে। তারা সশস্ত্রভাবে মস্তানগড়ের মেলায়

যোগদান করবে বলে প্রকাশ। এ মাসের ২০শে তারিখে মেলা অনুষ্ঠিত হবে।”

পরিস্থিতির এ বর্ণনা প্রদান করে মিঃ গ্লাডউইন কোম্পানীর কাছে সেনা-সাহায্য চেয়ে পাঠান। কিন্তু সে-সময়ে কোম্পানীর কাছে পাঠাবার মতো যথেষ্ট সৈন্য ছিল না। কোম্পানীর কর্তৃপক্ষ মিঃ গ্লাডউইনকে পত্র লিখে জানান যে, তিনি যদি নিজেকে নিরাপদ মনে না করেন, তা’ হলে কোম্পানীর অর্থাদি নিয়ে দিনাজপুরে চলে যেতে পারেন। কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এরূপ নির্দেশ পাওয়ার পরও মিঃ গ্লাডউইন ২৪শে মার্চ তারিখে আবার লিখে জানান: “এর মধ্যেই শাহ মজনু একদল ফকীর অনুচরসহ মস্তানগড়ের মসজিদে এসে আস্তানা গেড়েছে।”

সে বছরই বর্ষাকালে মস্তানগড় অঞ্চলে ফকীর বাহিনীর পুনরা বির্ভাব হয়। মিঃ গ্লাডউইন তখন পত্র লিখে কোম্পানীর কর্তাদের বিদিত করেন:

“আজ সকালে বিরাট একদল সশস্ত ফকীরসহ শাহ মজনু মস্তানগড়ে এসে উপনীত হয়েছেন। আমি খবর পেয়েছি যে, আরো বহু লোক এসে শীঘ্রই তাঁর দলে যোগ দিবে। নিজের নিরাপত্তা সম্পর্কে আমি মোটেই ভাবি না। কিন্তু আমি আশঙ্কা করছি যে, ফকীররা স্থানীয় অধিবাসীদের কাছ থেকে জোর-জবরদস্তি করে ঢাকা আদায় করবে।

এ জন্যেই আমি আপনাদের জানাতে চাচ্ছি যে, শক্তিশালী একটা সেনাদল পাঠিয়ে দিলে আমি ফকীরদের এ অঞ্চল থেকে বিতারিত করতে পারব।”

কিন্তু এবারও কোম্পানীর প্রাদেশিক পরিষদের পক্ষ থেকে মিঃ গ্লাডউইনকে কোনরূপ সেনা-সাহায্য পাঠান সম্ভব হলো না। এক পত্র লিখে কর্তৃপক্ষ মিঃ গ্লাডউইনকে জানালেন যে, পূর্ববর্তী শীতকালে ফকীররা যখন কোনরূপ অত্যাচারের অনুষ্ঠান করে নি, এবারও আশা করা যাচ্ছে যে, তারা হয় তো নিরুপদ্রব থাকবে। সঙ্গে-সঙ্গেই কোম্পানীর কর্তৃপক্ষ মজনু শাহ মস্তানার নিকট এক পত্র লিখে তাঁকে অনুরোধ করেন যে, তিনি যেন তাঁর সশস্ত্র অনুচরদের মস্তানগড় এলাকা থেকে সরিয়ে দেন।

উক্ত বর্ষেরই ২২শে অক্টোবর তারিখে গভর্ণর জেনারেল হেস্টিংস্ স্বয়ং প্রাদেশিক কাউন্সিলকে বিদিত করেন: “আজ সকালে একটা ব্যক্তিগত চিঠির মারফত আমি জানতে পেরেছি যে, ২০০ সন্ন্যাসীর (Senassies) ক্ষুদ্র একটা দল শেখ মজনুর নেতৃত্বে এমাসের ১৬ তারিখে সেল, বসে’র এলাকাধীন ‘কুট্টা’ গ্রামে আবির্ভূত হয়েছে। শেখ মজনুই কয়েক বছর আগে এ-প্রদেশে এসে নানারূপ অনাচারের অনুষ্ঠান করেছিল।”

৩০শে অক্টোবর তারিখে মিঃ গ্লাডউইন গভর্ণর জেনারেলকে জানান যে, ফকীরদল ঘোড়াঘাটের দিকে চলে গিয়েছে এবং তারা আপাততঃ এ

এলাকা ত্যাগ করবে বলেই মনে হয়। মিঃ গ্লাডউইন আরো জানান যে, তাঁর হরকরারা (সংবাদবাহক) তাঁকে জানিয়েছে যে, ফকীরদের দলে সেনাদল থেকে পলায়িত ২৫ জন সৈনিকও রয়েছে।

কবিতা :১০

ফকীরদের সহিত আর একটী সম্মুখ-যুদ্ধ

পরিশেষে লেফটেন্যান্ট রবার্টসনের অধিনায়কতায় মজনু শাহ ফকীরের বিরুদ্ধে বহরমপুর থেকে একদল সৈনিক পাঠানো হলো। ১৭৭৬ অব্দের ১৪ই নভেম্বর তারিখে এ বৃটশ সেনাপতিকে বগুড়া থেকে চার মাইল দূরবত। এক জায়গায় ফকীর-সরদারের বাহিনীর সহিষ্ক এক সম্মুখ-যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয়। মিঃ গ্লাডউইনের নিকটে লিখিত এক পত্রে রবার্টসন নিজেই এ যুদ্ধের এক চমৎকার বিবরণী প্রদান করেছেন। তিনি বলেন:

“গত রাত ৯টায় নিজের ক্যাম্প থেকে যাত্রা করে প্রায় নয় ক্রোশ পথ অতিক্রম করার পর আজ সকালে সূর্যোদয়ের পূর্বে আমরা মজনুর শিবিরের নিকটে গিয়ে উপনীত হলাম। আমাদের আগমন সম্পর্কে তারা আগে কোন খবরই পায় নি, এবং এ-জনেই প্রজ্জলিত আগুনের চারপাশে তারা অসতর্কভাবে বসেছিল। তাদের সংখ্যা ছিল প্রায় তিন শো। তাদের প্রহরা এত শিথিল ছিল যে, আমরা তাদের বিশ গজের মধ্যে গিয়ে পৌঁছার পূর্বে আমাদের আগমন সম্পর্কে তার। আঁচই করতে পারে নি। যখন তারা আমাদের দেখতে পেল এবং হাতিয়ার নিয়ে

উঠে দাঁড়াল, আমি তখনই আমার সেনাদের গুলী করার আদেশ দিলাম। ফকীর দল তাদের ১৫ গজ পেছন দিকে অবস্থিত এক ছনের জঙ্গলে গিয়ে আশ্রয় নিল। সেখান থেকে তারা আমাদের প্রতি গুলী বর্ষণ করতে লাগল। এ গুলী বর্ষণে আমাদের কয়েকজন সিপাই আহত হলো এবং আমি নিজেও একটা গুলীর ঘায়ে পায়ে আঘাত পেয়েছি। সম্পূর্ণ অতর্কিত আক্রমণের পরও তারা যে এভাবে রুখে দাঁড়াতে পারবে, আমি তা’ ভাবতেও পারিনি। প্রায় আধ ঘণ্টা এভাবে যুদ্ধ চলার পর ফকীর দল স্থান ত্যাগ করে। মজনু ঘোড়ায় চড়ে পলায়ন করতে সমর্থ হয়।”

১৭৭৮ অব্দের এপ্রিল মাসে দিনাজপুর নয়-আনী জমিদারীর মালিক রাজা গৌরনাথ কোম্পানীকে বিদিত করেন যে, ঘোড়াঘাট অঞ্চলে ফকীর- সরদার মজনু শা’র আবির্ভাব হয়েছে। কিন্তু মনে হয়, এবার ফকীর- দল উত্তর-বঙ্গ এলাকায় বেশী দিন ছিল না। কারণ, অল্প দিনের মধ্যেই তারা ময়মনসিংহ জেলার আলপসিং পরগনার দিকে অগ্রসর হয় বলে জানা যায়।

কবিতা :১১

ময়মনসিংহে ফকীর দল

১৭৮৩ অব্দের প্রথমাংশে খবর পাওয়া যায় যে, মজনু শাহ, কর্তৃক পরিচালিত এক দল ফকীর ময়মনসিংহ জেলার কেন্দ্রস্থলে এসে হাজীর হয়েছে। কোম্পানীর বেগুনবাড়ী কুঠির রেসিডেন্ট মিঃ হেন্দ্রী লজ, এ-সম্পর্কে কর্তৃপক্ষকে জানান- “একজন জমাদার কর্তৃক পরিচালিত

৬০ জন সেপাই রাম-ভাওয়াল পরগনার ইল্লাৎপুর থেকে আট দশ ক্রোশ দূরে অবস্থিত ছাতারকাইৎ নামক জায়গায় মজনু শাহ ফকীরের দলের সম্মুখীন হয়। স্বল্পকালস্থায়ী ক্ষুদ্রতর এক সঙ্ঘর্ষের পর ফকীর দল জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে আশ্রয় নেয়। দুর্ভেদ্য গভীর জঙ্গলে ফকীরদের অনুসরণ করা সেপাইদের পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। বিশেষতঃ, মজনু শা’র এ সুবিধা রয়েছে যে, দত্ত্বর মতো একটা বাজার তার দলের সাথে সাথে চলে।”

কবিতা :১২

আরো সঙ্ঘর্ষ

১৭৮৫ অব্দের মার্চ মাসে কোম্পানীর সেনাদলের অন্যতম সেনানী লেফটেন্যান্ট ক্রো মজনু শাহ পরিচালিত ফকীর বাহিনীর একটি দলের সহিত সংঘর্ষের সম্মুখীন হন। এ সঙ্ঘর্ষের বিবরণী সেলবসে’র তৎকালীন কলেক্টর মিঃ চ্যাম্পিয়ন কোম্পানীর রেভেনিউ-কর্তৃপক্ষের নিকটে প্রেরিত এক পত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন:

“মহাস্থান থেকে ৬ মাইল দূরে থাকতেই লেফটেন্যান্ট ক্রো তাঁর দলের একজন সেপাই ও একজন বরকন্দাজকে ফকীরের ছদ্মবেশে মজনু শা’র শিবিরে পাঠিয়ে ফকীরদের প্রকৃত শক্তির সন্ধান নেন। তিনটার সময় লেফটেন্যান্ট ক্রো তাঁর দলবল নিয়ে ফকীরদের শিবিরের নিকটে গিয়ে উপস্থিত হলে শিবিরের প্রহরীরা তাদের পরিচয় জানতে চাইল। সৈনিকদের পক্ষ থেকে কোন সদুত্তর না পেয়ে ফকীররা তাদের

প্রতি তীব্র গুলীবর্ষণ শুরু করে দিল। কোম্পানীর সেপাইরাও প্রত্যুত্তরে গুলী চালাতে কুণ্ঠিত হলো না। এ সঙ্ঘর্ষে কোম্পানীর একজন সেপাই নিহত এবং অপর একজন আহত হয়। একজন বরকন্দাজও ভীষণভাবে আঘাত পায়। গুলী ফুরিয়ে যাওয়ায় লেফটেন্যান্ট ক্রো নিজের জায়গায় ফিরে আসেন। মজনুর দলে চার শো সশস্ত্র ফকীর এবং আরো দু’শো তলোয়ার ও বর্ণাধারী লোক ছিল।”

১৭৮৬ অব্দে ফকীরদের দু’টো স্বতন্ত্র দল বাঙলায় আবির্ভূত হয়। তন্মধ্যে স্বয়ং মজনু শা’র নেতৃত্বে পরিচালিত একটা দল ময়মনসিংহ জেলায় এসে তাদের তৎপরতা শুরু করে দেয় এবং অপর দলটি মুসা শা’র পরিচালনায় উত্তর বঙ্গে অভিযান করে। সম্ভবতঃ বৃর্টশিদের বেশী করে ব্যতিব্যস্ত করার মতলবেই ফকীর দল এভাবে দ্বিমুখী অভিযানের -পরিকল্পনা করেছিল।

আগস্ট ও সেপ্টেম্বর (১৭৮৬) মাসে ফকীর-সরদারকে ইংরাজদের

বিরুদ্ধে পর-পর দু’টো সঙ্ঘর্ষের সম্মুখীন হতে হয়। ১৭ই আগষ্ট

তারিখে সেলবস’ থেকে প্রায় দশ ক্রোশ দূরে অবস্থিত এক জায়গায়

মজনু শাহকে লেফটেন্যান্ট আঁশলী পরিচালিত এক সেপাই-দলের

সম্মুখীন হতে হয়। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে ২৯শে সেপ্টেম্বর তারিখে লেফটে-

ন্যান্ট রেণান কর্তৃক পরিচালিত অপর একটি সেনাদলের সহিত

‘কালেশ্বর’ নামক স্থানে তাঁকে মোকাবিলা করতে হয়। উভয় ক্ষেত্রেই

ফকীরদের পক্ষে যেমন কিছু লোক হতাহত হয়, ইংরাজদেরও অহরূপ-

ভাবেই কিছু ক্ষয়-ক্ষতি স্বীকার করে নিতে হয়েছিল।

কবিতা :১৩

জমিদারদের পলায়ন

কোম্পানীর রাজস্ব আদায়কারী জমিদারদের বিরুদ্ধে ফকীর-সরদার যেসব বাবস্থা অবলম্বন করেন, তার ফলে উত্তর-বঙ্গের কতিপয় জমিদারকে তাদের পিতৃ-পুরুষের ভিটা ত্যাগ করে স্থানান্তরে পলায়ন করতে হয়েছিল। বগুড়া জেলার বড়াইবাড়ী নামক স্থানের বিখ্যাত জমিদারেরা এ-সময়ে নিজেদের বাড়ীঘর ত্যাগ করে ‘কামরূপ পরগনায়’ পলায়ন করেন। বগুড়া জেলার ‘ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারে’ উল্লেখ করা হয়েছে যে, আসাম গৌরীপুরের বিখ্যাত রাজ-পরিবারের পূর্ব-পূরুষ ছিলেন কড়াইবাড়ীর পলায়িত এ জমিদারেরা। বগুড়া জেলার ‘কড়ই নামক স্থানের জমিদার শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরীকেও মজনু শা’র ভয়ে পিতৃ- পুরুষের ঘরবাড়ী ত্যাগ করে ময়মনসিংহ জেলার জাফরশাহী পরগনায় পলায়ন করতে হয়েছিল। ময়মনসিংহ গৌরীপুরের জমিদার পরিবারের কুমার সৌরিন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী তাঁর ‘ময়মনসিংহে বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ” নামক পুস্তকে শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরীর পলায়ন সম্পর্কে চমৎকার একটা কাহিনী বর্ণনা করেছেন। তাঁর কাহিনীতে বলা হয়েছে যে, ফকীর সরদার মজনু শাহ শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরীর নিকটে পঞ্চাশ হাজার টাকা দাবী করে একটা নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে টাকা প্রদানের জন্য চাপ দেন। কিন্তু এত টাকা প্রদানের ক্ষমতা হয়তো জমিদারের ছিল না, কিংবা মুসলমান ফকীরের এ দাবী মেটাতে তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। ফকীরের হাত থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্যে তিনি এক অভিনব পন্থা অবলম্বন করলেন। তিনি তাঁর হাজার হাজার রায়তকে বেগার

খাটিয়ে এক রাতের মধ্যে এক খাল খনন করে ‘নাগর’ নদীর সহিত তাঁর বাড়ীর সংযোগ সাধন করলেন। অতঃপর উক্ত খালে কয়েকটা নৌকা এনে পরিবারের সকল লোক এবং মূল্যবান দ্রব্যাদি ও ধনরত্নসহ সেসব নৌকায় আরোহণ করে রাতের অন্ধকারে তিনি গৃহত্যাগ করলেন। এভাবে পলায়নের পর শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরী জাফরশাহী পরগনার (বর্তমান জামালপুর মহকুমা) ‘মালঞ্চ’ গ্রামে এসে বাসস্থান নির্দিষ্ট করলেন। পরে এ পরিবারের লোকেরা গৌরীপুর, কালীপুর, রাম- গোপালপুর প্রভৃতি বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে এবং আজ পর্যন্তও তারা সেসব জায়গায়ই বাস করছে।

কবিতা:১৪

চন্দ্রশেখর আচার্য

ফকীর দলের অত্যাচারে বগুড়ার ‘খাম্পা ঝাকর’ গ্রামের জমিদার চন্দ্রশেখর আচার্যকেও পৈত্রিক বাসস্থান তাগ করে ময়মনসিংহে পলায়ন করতে হয়েছিল। আচার্যেরই বংশধর। মুক্তাগাছার মহারাজার পরিবার এ চন্দ্রশেখর ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর দলীলপত্রে উল্লেখ রয়েছে যে, ফকীর-বাহিনী চন্দ্রশেখর আচার্যের বাড়ী লুণ্ঠন করে এবং তাঁকে বন্দী করে ‘নিমগাছি’ গ্রামে নিয়ে গিয়ে আটক রাখে। কোম্পানীর পূর্ণিয়াদ্ধ কাউন্সিলের ১৪ই মার্চ (১৭৮) তারিখের কার্য-বিবরণীতে এ ঘটনা সম্পর্কে লিখিত রয়েছে:

“This year with a body of people he (Majnoo Shah) has attacked the house of the Zaminder of Alapsing at a

place called Shakur (Jhakar in Bogra) and plundered it of all the effects. He has, moreover, seized upon the person of Chunder Seekar Acharjee, who is the son of one of the Zaminders, and confined him at Neemgatchy under Zilla Dinajpur-Bugwarah. A letter to the Chief at Dinajpur, as also one of the Chief at Bagwarah may be sent that they may procure the enlargement of the aforesaid Acharjee.”

এ উধতি কোম্পানীর কার্য-বিবরণীর হুবহু অনুলিপি। বাঙলায় অনুবাদ করলে বিবরণীটি দাঁড়ায় “এ বছর একদল লোক নিয়ে সে (মজনু শাহ) আলপসিং এর জমিদারের শকুর (বগুড়ার ঝাকর) নামক প্রানের বাড়ী আক্রমণ করে তার সর্বস্ব লুঠন করে। অধিকন্তু সে একজন জমিদারের পুত্র চন্দ্রশেখর আচার্যকে ধরে নিয়ে গিয়ে জেলা দিনাজপুর-বগুড়ার অধীনস্থ নীমগাছিতে আটক রেখেছে। উপরোক্ত আচার্যকে মুক্ত করার জন্যে দিনাজপুর। প্রধান কর্মকর্তা এবং বগুড়ারও প্রধান কর্মকর্তার কাছে একখানা করে চিঠি পাঠানো যেতে পারে।”

শেষ পর্যন্ত কিভাবে চন্দ্রশেখর আচার্য মুক্তিলাভ করেন এবং তার পরিবার-পরিজনই বা কিরূপে মুক্তাগাছায় প্রস্থান করেন, তৎকালীন সরকারী দলিল-পত্রে সে সম্বন্ধে কোন উল্লেখ নেই। সম্ভবতঃ পরিশেষে দয়াপরবশ হয়েই ফকীর সরদার আচার্যকে মুক্তি প্রদান করেন এবং এর

পরই কোন রকমে তিনি স্বীয় পরিবারবর্গসহ মুক্তাগাছায় পলায়ন করতে সমর্থ হন।

সুদখোর সন্ন্যাসীদের সহিত বিরোধ

জমিদারদের মতোই ফকীর দল সুদখোর মহাজনদেরও ঘোরতর বিরোধী ছিল। বিশেষতঃ রূপগিরি, ভূপৎগিরি, অজিতগিরি প্রমুখ তথাকথিত সন্ন্যাসী সরদারদের বিরুদ্ধে নির্মমভাবেই তারা সংগ্রাম করে গিয়েছে। এসব সন্ন্যাসী সরদার ডাকাতি করত এবং সঙ্গে সঙ্গে তারা কুসাঁদ ব্যবসায়ও পরিচালনা করত। একদল অর্ধ উলঙ্গ ‘রামায়েত’ সন্ন্যাসীর সহায়তায় তারা দেশের সর্বত্র ডাকাতির অনুষ্ঠান করত এবং এভাবে সঞ্চিত অর্থরাশি গরীব জন-সাধারণের মধ্যে সুদী-কর্জ হিসাবে বিনিয়োগ করত। দেশের দরিদ্র জনগণ এ শ্রেণীর সন্ন্যাসী মহাজনদের অত্যাচারে সে-সময়ে প্রকৃতই অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। দরিদ্র-বান্ধব মজনু শাহ এসব মহাজনের নির্মম অত্যাচার থেকে বিপন্ন দেশবাসীকে উদ্ধার করার জন্যে সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। কয়েক স্থানে এ সংগ্রাম সন্নাসী ও ফকীরদের মধ্যে অনুষ্ঠিত রক্তাক্ত যুদ্ধেরই রূপ পরিগ্রহ করে। ময়মনসিংহের এলাকাধীন কোম্পানীর বেগুনবাড়ী কুঠির সুপারভাইজার মিঃ হেন্দ্রী লজ, ফকীর ও সন্ন্যাসীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত এরূপ একটি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের বিবরণ প্রদান করেছেন। ১৭৮২ অব্দের ১১ই ডিসেম্বর তারিখে লেখা তাঁর বিবরণে বর্ণিত হয়েছে:

“A fray has happened between the Sannyasis and a party of others, Fakeers etc, headed by one Mudgejeenoo.

In the fray he got the better of the Ramtaat (Ramayet) Sannyasis, of whom 30 or 40 were killed. The followers of Mudgejeenoo are about one thousand.”

অর্থাৎ- “সন্ন্যাসী দল এবং মজনু নামক ব্যক্তির পরিচালনাধীন ফকীর ও অন্যান্য লোকদের মধ্যে এক সংঘর্ষ অনুষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে। এ সঙ্ঘর্ষে রামায়েত সন্ন্যাসীদের সে পর্য, দৃপ্ত করতে সমর্থ হয়। সন্ন্যাসীদের মধ্যে ৩০ বা ৪০ জন নিহত হয়। মজনুর অনুচরদের সংখ্যা প্রায় এক হাজার।”

হোম
ই-শো
লাইভ টিভি
নামাজ শিক্ষা
গেইমস
চাকুরি