Skip to content

এলেবেলে হুমায়ুন আহমেদ

পৃষ্ঠা ১ থেকে  ২

পৃষ্ঠা:০১

এলেবেলে হুমায়ূন আহমেদ

আমাদের পাড়ায় মজিদ সাহেব নামে একজন রিটায়ার্ড পুলিশের এসপি থাকেন। তাঁর স্বভাব হচ্ছে দেখা হওয়ামাত্র অত্যন্ত চিন্তিতমুখে ‘হাই ফিলসফি’ গোছোর একটি প্রশ্ন করা। মহা বিরক্তকর ব্যাপার। সেদিন মোড়ের দোকানে সিগারেট কিনছি। হঠাৎ লক্ষ করলাম মজিদ সাহেব হন হন করে আসছেন। আমি চট করে আড়ালে চলে গেলাম। লাভ হলো না। ভদ্রলোক ঠিক আমার সামনে এসে ব্রেক করলেন এবং অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বললেন, প্রফেসার সাহেব, মানুষ হাসে কেন একটু বলুন তো। আমি বিরক্ত চেপে বললাম, হাসি পায় সেইজন্যে হাসে। হাসি কেন পাই সেইটাই বলুন। এত মহা যন্ত্রণা! ভদ্রলোক যেভাবে দাড়িয়ে আছেন তাতে মনে হচ্ছে জবাব না শুনে তিনি যাবেন না। তাঁর না হয় কাজকর্ম নেই, রিটায়ার্ড মানুষ; কিন্তু আমার তো কাজকর্ম আছে। আমি বললাম, মজিদ সাহেব আমি আপনাকে একটা গল্প বলি।

গল্পটা শুনে আপনি হাসবেন। তারপর আপনি নিজেই চেষ্টা করে বের করুন কেন হাসলেন। এটা মন্দ নয়। বলুন আপনার গল্প। আমি গল্প শুরু করলাম। এক লোক একটি সিনেমা একত্রিশবার দেখেছে শুনে তার বন্ধু বলল, একত্রিশবার দেখার মতন কি আছে এই সিনেমায়? লোকটি বলল, সিনেমার এক জায়গায় একটি মেয়ে নদীতে গোসল করতে যায়। সে যখন কাপড় খুলতে শুরু করে ঠিক তখন একটা ট্রেন চলে আসে। একত্রিশবার ছবিটি দেখেছি, কারণ আমার ধারণা কোনো-না- কোনোবার ট্রেনটা লেট করবে। রসিকতা যারা করেন তারা বেইজ্জত হবার আশঙ্কা মাথায় নিয়েই করেন। নো রিকস্ নো গেইনের ব্যাপার এবং দু একটা যখন লেগে যায় তখন তাদের উৎসাহের সীমা থাকে না। রসিকতা করাটাকে তখন তাঁরা পবিত্র দায়িত্ব মনে করেন। আগাড়ে বাগাড়ে রসিকত করে আশেপাশের মানুষদের বিরক্তির চরম সীমায় পৌছে দেন। আমি একবার শ্যামলী থেকে গুলিস্তান যাবার পথে এরকম একজনের দেখা পেয়েছিলাম। বাসে অসম্ভব ভিড়। প্রচন্ড গরম। ঘামের কটু গন্ধ। এর মধ্যে একজন তার পরিচিত একজনকে পেয়ে গেলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে বললেন, এই মোজাম্মেল একটু চুটটি শোন; একবার এক বিয়ে বাড়ীতে বরযাত্রী আসতে দেরী করেছে, তখন বরের ফুফাতো বোন মোজাম্মেল যার নাম যে একবার অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করল। তাতে লাভ হলো না। ভদ্রলোক দীর্ঘ গল্প শুরু শেষ করে দ্বিতীয় গল্প করলেন। টাক-মাথার এক লোক বিরক্ত হয়ে বললেন, চুপ করেন তো ভাই। কেন চুপ করব? আপনার কি অসুবিধা করলাম? কানের কাছে ভ্যান ভ্যান করছেন, এটা অসুবিধা না?

পৃষ্ঠা:০২

ভদ্রলোক চুপ করে গেলেন। সায়েন্স ল্যাবরেটার পর্যন্ত এসেই আবার তার গলা খুস খুস করতে লাগল। তিনি মোজাম্মেলকে তিন নম্বর রসিকতাটি বললেন। অত্যন্ত আশ্চর্য্যের ব্যাপার, এই রসিকতাটি হিট করল। বাসসুদ্ধ লোক হো হো করে হেসে উঠল। এমনকি সেই টাকা-মাথার ভদ্রলোক ঠা ঠা জাতীয় বিচিত্র শব্দ করে হাসতে লাগলেন। অবশ্যি এ সংসারে কিছু ভাগ্যবান লোক আছেন, তাঁদের সব রসিকতাই ‘পাবলিকে খায়’। এটা বিরাট একটা যোগ্যতা। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে যারা এই যোগ্যতা অর্জন করেন, অল্পদিনের মধ্যেই তাঁদেরকে কেমন যেন বিমর্ষ হয়ে যেতে দেখা যায়। জীবনের প্রতি সব রকম আকর্ষণ হারিয়ে ফেলতে থাকেন। চল্লিশ না হতেই তাদের দেখা যায় পঞ্চাশের মতো। কারণ খুব সহজ, এ জাতীয় জন্মরসিকদের সব কথাকেই আমরা সবাই রসিকতা হিসাবে নেই। যা একসময় জন্মরসিকের উপর মানষিক চাপ ফেলতে শুরু করে। উদাহরণ দেই। আমার এক বন্ধু আব্দুস সোবহান একজন জন্মরসিক। স্কুল জীবন থেকে সে আমাদের হাসাচ্ছে। কলেজ জীবনেও একই অবস্থা। সংসারে ঢুকে সে নানান সমস্যায় পড়ল। অল্প বেতন। অনেকগুলি ছেলেপুলে, অভাব-অনটন। একেকবার সে দুঃখের গল্প করে, আমরা হেসে গড়িয়ে পড়ি। একবার বিকেলবেলা মুখ শুকনো করে বলল, ঘরে আজ রান্না হয় নাই ভাই। একটা পয়সা ছিল না। তার কথা শুনে হাসতে হাসতে আমাদের পেটে খিল ধরে যাবার মতো অবস্থা। কী মজার ব্যাপার, ঘরে পয়সা নেই। শেষ করবার আগে এই প্রসঙ্গে একটা দামি উপদেশ দিতে চাচ্ছি। অল্পবয়েসী মেয়েদের সঙ্গে কখনো কোনো রসিকতা করবেন না। যদি এদের কোনো একটি রসিকতা পছন্দ হয়ে যায় তাহলে আপনার অবস্থা কাহিল। ‘ঐ গল্পটা আরেকবার বলেন না। ঐ গল্পটা আরেকবার বলেন না।’ শিরীন নামের এক মেয়েকে কোন এক কুক্ষণে নাসিরুদ্দিন হোজ্জার একটা গল্প বলেছিলাম। তারপর থেকে যেখানেই তার সঙ্গে দেখা হয়, সে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে এবং বলে ঐ গল্পটা আরেকবার বলেন, প্লিজ। আমাকে বলতে হয়। তিন বছরের মধ্যে আমি হাজার খানিকবার এই গল্প বললাম। জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠল। নাসিরুদ্দিন হোজ্জাকে কাছে পেলে কাঁচা খেয়ে ফেলি এমন অবস্থা। সেই সময়কার কথা, নিতান্ত উপায়ান্তর না দেখেই রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ব্লাডারের প্রেসার কমাচ্ছি, মনে মনে প্রার্থনা করছি যেন পরিচিত কারো সঙ্গে দেখা না হয়। ঠিক তখন আমার পেছনে একটা রিকশা থামল। আমার বুক ধক্ করে উঠল। শিরীনের আদুরে গলা: হুমায়ূন ভাই, এখানে কী করছেন? আমি মনে মনে বললাম, হারামজাদী দেখছিস না কী করছি? দ্রুত জীপার লাগাতে গিয়ে আরেকটা এক্সিডেন্ট হলো। জিপার দেয়া প্যান্ট যারা পরেন তাঁদের জীবনে এ জাতীয় দূর্ঘটনা একাধিকবার ঘটে। তবু ফ্যাকাশে হাসি হেসে বললাম, ‘তারপর কী খবর, ভালো তো?শিরীন বলল, এ হচ্ছে আমার বান্ধবী লোপা, অপনি ওকে ঐ গল্পটা বলেন তো। প্লিজ। না না, বলতেই হবে। আমি কোনো কথা শুনব না।সেই থেকেই আমি কারো সঙ্গে রসিকতা করতে পারি না। কারো রসিকতা শুনে হাসতেও পারি না। রিটায়ার্ড এসপি মজিদ সাহেবের মতো নিজেকে প্রশ্ন করি মানুষ হাসে কেন?

হোম
ই-শো
লাইভ টিভি
নামাজ শিক্ষা
গেইমস
চাকুরি