Skip to content

এই আমি (১)

পৃষ্ঠা ০১ থেকে ১০

পৃষ্ঠা:০১

এই আমি

আমার বড় মেয়ে তার কালজে একটা কোয়েশ্চেনীয়ার জমা দেবে। সেখানে অনেকগুলি প্রশ্নের ভেতর একটা প্রশ্ন হচ্ছে ‘তোমার প্রিয় ব্যক্তি কে?’ সে লিখল, আমার মা।আমি ভেবেছিলাম সে লিখবে- বাবা।আমার সব সময় ধারণা ছিল আমার ছেলেমেয়েরা আমাকে খুব পছন্দ করে। অন্তত তাদের মা’র চেয়ে বেশি তো বটেই। করারই কথা, আমি কখনো তাদের বকা-ঝকা করি না। অথচ তাদের মা এই কাজ নিষ্ঠার সঙ্গে করছে-‘বাথরুম ভেজা কেন?”সন্ধ্যা হয়ে গেছে, পড়তে বসনি। পড়তে বোস।”টুথপেস্টের মুখ লাগানো নেই, এর মানে কি?’বন্ধুর সঙ্গে এতক্ষণ টেলিফোনে কথা কেন?”ফ্রকে ময়লা কি ভাবে লাগল?”মাছ তো গোটাটাই ফেলে দিলে। বোন-প্লেট থেকে তুলে এনে খাও। তোল বলছি। তোল।’এই সব যন্ত্রণা আমি তাদের দেই না। খাবার টেবিলে আমি ওদের সঙ্গে মজার মজার গল্প করি। ভিডিও ক্লাবে কোন ভাল ছবি পাওয়া গেলে সবাইকে নিয়ে এক সঙ্গে দেখি। তারচেয়েও বড় কথা, এমন সব কাণ্ড-কারখানা মাঝে মাঝে করি যা বাচ্চাদের কল্পনাকে উজ্জীবিত করবেই। যেমন শহীদুল্লাহ্ হল-এ যখন থাকতাম তখন ভরা জোছনার রাতে বাচ্চাদের ঘুম থেকে তুলে পুকুরে গোসল করতে নিয়ে যেতাম। বর্ষার প্রথম বৃষ্টিতে সবাইকে নিয়ে পানিতে ভেজা তো আমার চিরকালের নিয়ম। সব সময় করছি। যে মানুষটি এমন সব কাণ্ড-কারখানা করে সে কেন প্রিয় হবে না? আমার বড় মেয়ের কোয়েশ্চেনীয়ার দেখে হঠাৎ করে আমার

পৃষ্ঠা:০২

মনে হল- আমি কি এদের কাছ থেকে দূরে মরে গেছি? যদি দূরে সরে গিয়ে থাকি অহলে তা কখন ঘটল? সারাদিন নানান কাজে ব্যস্ত থাকি। ইউনিভার্সিটির কাজ, নটকের কাজ, লেখার কাজ। এর ফাঁকে ফাঁকে লোক আসছে। প্রকাশকরা আসছেন লেখার তাগাদা নিয়ে। এসেই চলে যাচ্ছেন না, বলছেন, গল্প করছেন। চা খাচ্ছেন। নাটকে অভিনয় করতে ইচ্ছুক তরুণ-তরুণীরা আসছে। যে ভাবেই হোক তাদের টিভি নটিকে সুযোগ দিতে হবে। আমার গল্প-উপন্যাস পড়ে খুশি হয়েছে এমন লোকজন আসছে। খুশি হয়নি এমন লোকজন আসছে। আসছে পত্রিকা অফিসের মানুষ। কেউ বুঝতে পারছে না, আমি ক্লান্ত ও বিরক্ত। আমার বিশ্রাম দরকার। নিরিবিলি দরকার। আমার অনেক দূরে কোথাও চলে যাওয়া দরকার। আমার সবটুকু সময় বাইরের লোজজন নিয়ে নিচ্ছে। আমার ছেলেমেয়েদের জন্যে, আমার স্ত্রীর জন্যে একটুও সময় আলাদা নেই।একটা শর্ট ফিল্ম বানাচ্ছি। সেই ছবির শ্যুটিং এর কারণে এক সপ্তাহের জন্যে বাইরে যেতে হল। যাবার আগ মুহূর্তেও লোকজন এসে উপস্থিত। তাদেরকে বিদেয় করতে করতে অনেক দেরি হয়ে গেল। ট্রেন মিস করব। ছুটে গিয়ে গাড়িতে উঠলাম। ড্রাইভারকে বললাম, খুব স্পীডে চালাও। ড্রাইভার উল্কার গতিবেগে ছুটল। আর তখন মনে হল, আসার সময় বিদেয় নিয়ে আসা হয়নি। বাচ্চারা হয়ত মনে মনে অপেক্ষা করছে, রওনা হবার আগে আমি বলব বাবারা, যাই কেমন? সেটা বলা হয়নি। তারা দেখছে অসম্ভব ব্যস্ত এক মানুষকে। একে তারা হয়ত ভালমত চেনেও না। একজন অতি-চেনা মানুষ এদ্রি করেই আস্তে আস্তে অচেনা হয়ে যায়। সম্ভবত আমিও অচেনা হয়ে গেছি। তবু ক্ষীণ আশা নিয়ে একদিন মেঝো মেয়েকে আড়ালে ডেকে নিয়ে গেলাম। গলা নিচু করে কথা বলছি যেন অন্য কেউ কিছু শুনতে না পায়।’কেমন আছ গো মা?”‘খুব ভাল, না মোটামুটি ভাল?”‘এখন বল দেখি তোমার সবচে’ প্রিয় মানুষ কে?”কোন প্রিয় মানুষ নেই বাবা।”না থাকলেও তো এমন মানুষ আছে যাদের তোমার ভাল লাগে। আছে না?”‘মা তোমার সবচে’ প্রিয়?”

পৃষ্ঠা:০৩

‘অর কেউ আছে?””আর ছোট চাচী।”আর কেউ?”শাহীন চাচা।’আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম লিস্ট লম্বা হচ্ছে কিন্তু সেই দীর্ঘ লিশেল্ট আমার নাম নেই। আমাকে সে হিসেবের মধ্যেই আনছে না। এ রকম কেন হবে। দু’দিন আমি খুব চিন্তা করলাম। ভেবেছিলাম ব্যাপারটা নিজের মধ্যেই রাখব। আমার পরী গুলতেকিনকে জানাব না। এক রাতে তাকেও বললাম। সে বলল, কি অদ্ভুত কথা বলছ? বাচ্চারাতোমাকে অপছন্দ করবে কেন? তুমি ওদের খুবই প্রিয়।’তুমি আমাকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্যে বলছ?’‘মোটেই না। আমার ধারণা তোমার মত ভাল বাবা কমই আছে।'”সত্যি বলছ?”হ্যা সত্যি। শীলার দুধ খাওয়ার ব্যাপারটা মনে কর। ক’জন বাবা এরকম করবে। শীলার দুধ খাওয়ার কথা মনে আছে?”আছে।’ আমার মেয়ের দুধ খাওয়ার গল্পটা বলি তার কাছে এই পৃথিবীর সবচে’ অপছন্দের খাবার হল দুধ। দুধের বদলে তাকে বিষ খেতে দেয়া হলেও সে হাসিমুখে খেয়ে ফেলবে। সেই ভয়াবহ পানীয় তাকে রোজ বিকেলে এক গ্লাস করে খেতে হয়। আমি আমার কন্যার কষ্ট দেখে, এক বিকেলে তার দুধ চুমুক দিয়ে খেয়ে ফেললাম। তাকে বললাম, মাকে বলিস না আমি পেয়েছি। এরপর থেকে বোঝ তার দূধ খেতে হয়। এক সন্বয় নিজের কাছেও অসহ্য বোধ হল। তখন দু’জন মিলে যুক্তি করে বেসিনে ফেলে দিতে লাগলাম। বেশিদিন চালানো গেল না। ধরা পড়ে গেলাম।বাবা হিসেবে আমি যা করেছি তা আদর্শ ব্যবার কাজ না। তবে শিশুদের পছন্দের বাবার কাজ তো বটেই। গুলতেকিন আমার কন্যার দুধের গল্প মনে করায় আমার উদ্বেগ দূর হল। আমি মোটামুটি নিশ্চিত হয়েই ঘুমুতে গেলাম। যাক, আমি খারাপ বাবা নই একজন ভাল বাবা। তবু সন্দেহ যায় না।পরদিন ছোটমেয়ে বিপাশাকে আইসক্রীম খাওয়াতে নিয়ে গেলাম। যে বিস্মিত, তাকে একা নিয়ে যাচ্ছি। অন্য কাউকে নিচ্ছি না। ব্যাপারটা কি? তাকে জলদি ভিটায় কোন আইসক্রীম কিনে ফিস ফিস করে বললাম, আচ্ছা

পৃষ্ঠা:০৪

মা বল তো, কাকে তোমার বেশি পছন্দ? তোমার মাকে, না আমাকে? সে মুখভর্তি আইসক্রীম নিয়ে বলল, তোমাকে। তার বলার ভঙ্গি থেকে আমার সন্দেহ হল। আমি বললাম, তোমার মা শিখিয়ে দিয়েছে এরকম বলার জন্যে, তাই না? ‘সে আর কি বলেছে?” ‘বলেছে বাবা যদি তোমাদের জিজ্ঞেস করে কে সবচে’ প্রিয় তাহলে আমার নাম বলবে না, তোমার বাবার নাম বলবে। না বললে সে মনে কষ্ট পাবে। লেখকদের মনে কষ্ট দিতে নেই।’ সত্যকে এড়ানো যায় ন, পাশ কাটানো যায় না। সত্যকে স্বীকার করে দিতে হয়। আমি স্বীকার করে নিলাম। নিজেকে বুঝালাম আমার ক্ষেত্রে যা ঘটেছে তা যে কোন ব্যস্ত বাবার ক্ষেত্রেই ঘটবে। একদিন এই ব্যস্ত বাবা অবাক হয়ে দেখবেন এই সংসারে তাঁর কোন স্থান নেই। তিনি সংসারের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। সংসারও তাঁর প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। এই এক আশ্চর্য খেলা। এই খেলা আমাকে নিয়েও শুরু হয়েছে। আমি একা হতে শুরু হতে করেছি। বন্ধু-বান্ধব কখনোই তেমন ছিল না। এখন আরো নেই। যারা আসেন কাজ নিয়ে আসেন। কাজ শেষ হয়, সম্পর্কও ফিকে হতে শুরু করে। পুরানো বন্ধুদের কেউ কেউ আসেন তখন হয়ত লিখতে বসেছি। লেখা ছেড়ে উঠে আসতে মায়া লাগছে। তবু এলাম। গম্প জমাতে পারছি না। সারাক্ষণ মাথায় ঘুরছে এরা কখন যাবে। এবা কখন যাবে? এবং এখনো যাচ্ছে না কেন? যে আন্তরিকতা, যে আবেগ নিয়ে তাঁরা এসেছেন আমি তা ফেরত দিতে পারলাম না। তাঁরা মন খারাপ করে চলে গেলেন। আদিও মন খারাপ করেই লিখতে বসলাম। কিন্তু সুর কেটে গেছে। লেখার সঙ্গে আর যোগসূত্র তৈরি হচ্ছে নয়। যে চরিত্ররা হাতের কাছে ছিল তারা দূরে সরে গেছে। তবু তাদের আনতে যেষ্টা করছি – অনেক কষ্টে কয়েক পৃষ্ঠা লেখা হল। ভাল লাগল না। ছিঁড়ে কুত্র কুচি করে ঘুমুতে গেলাম। মাথ্য দপ দপ করছে, ঘুম আসছে না। চা খেলে হয়ত ভাল লাগবে। গভীর রাতে কে চা বানিয়ে দেবে? রান্নাঘরে গিয়ে নিজেই খুটখাট করছি খুলতেকিন এসে দাঁড়াল। ঘুম ঘুম চোখে বলল, তুমি বারুদ্দায় বস, আমি চা বানিয়ে আনছি। সে শুধু আমার জন্যে । আনল না, নিজের জন্যেও আদল। অটিতলা ফ্ল্যাটের বারান্দায় বসে দুজনে চুক চুক করে চা খাচ্ছি। আমি খানিকটা লজ্জিত বোষ করছি। আমার কারণে এত রাতে গুলতেকিনকে উঠতে হল। লজ্জা কাটানোর

পৃষ্ঠা:০৫

জন্যে অকারণেই বললাম, চা খুব ভাল হয়েছে। একসেলেন্ট। সে কিছু বলল না।আমি বললাম, একটা লেখা মাথায় চেপে বসে আছে, নামাতে পারছি না। কি করি বল তো?সে হালকা গলায় বলল, লাঠি দিয়ে তোমার মাথায় একটা বাড়ি দেই, তাতে যদি নামে তো নামল। না নামলে কি আর করা।আমরা সুক্ষ্মনই হেসে উঠলাম। এতে টেনশান খানিকটা কমল। আমি বললাম, গল্পটা কি শুনতে চাও?’বল।’আমি বুঝতে পারছি তর শোনার তেমন আগ্রহ নেই। সারাদিনের পরিশুমে সে ক্লান্ত। ঘুমে তার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। তারপরেও আমাকে খুশি করার জন্যে জেগে থাকা। আমি প্রবল উৎসাহে গল্পটা বলতে শুরু করেছি-“মতি নামের একটা লোক। তাকে বেঁধে রাখা হয়েছে। গ্রামের লোকজন মিলে ঠিক করেছে খেজুরের কাঁটা দিয়ে তার দু’টা চোখই উপড়ে ফেলা হবে।”‘মতির চোখ তোলা হবে কেন? সে কি করেছে?”এখনো ঠিক করিনি সে কি করেছে। তবে গ্রামবাসীর চোখে সে অপরাধী তো বটেই, নয়ত তার চোখ তোলা হবে কেন? তাকে ভয়ংকর কোন অপরাধী হিসেবে আমি সেখাতে চাই না। ভয়ংকর অপরাধী হিসেবে দেখালে আমার পারপাস সার্ভড হবে না।’তোমার পারপাসটা কি?”‘চোখ তোলার ব্যাপারটা যে কি পারিমাণ অমানবিক সেটা তুলে ধরা। এমনভাবে গল্পটা লিখব যেন… কেন…’ ‘যেন কি?”তোমাকে ঠিক বুঝাতে পারছি না। মানে ব্যাপারই হল কি…’ গুলতেকিনকে বলতে বলতে গল্প লেখার আগ্রহ আবার বোধ করতে লাগলাম। আমার মনে হতে লাগল, এক্ষুণি লিখে ফেলতে হবে। এস্তুদি না লিখলে আর লিখতে পারব না। আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে ব্যাকণায় বসে আছি। আকাশে এক ফালি চাঁদও আছে। বারান্দায় সুন্দর জোছনা। অথচ এই জোছনায় আমি গুলতেকিনকে দেখছি না। দেখছি তার জায়গায় মতি মিয়া বসে আছে। তাকে দড়ি দিয়ে বাধ্য হয়েছে। সে অসহায়ভাবে তাকাচ্ছে আমার দিকে। চোখের দৃষ্টিতে বলছে- আমার ঘটনাটা লিখে ফেললে হয় না? কেন দেরি করছেন?আমি ক্ষীণ গলায় ডাকলাম, খুলতেকিন।’কি?”

পৃষ্ঠা:০৬

‘ইয়ে, তুমি কি আরেক কাপ চা বানিয়ে দিতে পারবে?’ ‘শুবে না?”‘না, মানে ভাবছি গল্পটা শেষ করেই ঘুমুতে যাই।”সকালে লিখলে হয় না?”‘উই।’সে উঠে চলে গেল। রান্নাঘরে বাতি জ্বলল।কিছুদূর লিখলাম। না, ভাল হচ্ছে না। মতিকে আমি নিজে যে ভাবে দেখছি সেভাবে লিখতে পারছি না। নিজের উপর রাগ লাগছে, সেই সঙ্গে আশেপাশের সবার উপর রাগ লাগছে। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মনে হল, পৃথিবীর কুৎসিততম চায়ে চুমুক দিলাম। না হয়েছে লিকার, না হয়েছে মিষ্টি। নিজের অজান্তেই বলে ফেললাম, এটা কি বানিয়েছ?ছোট ছেলে নুহাশের ঘুম ভেঙে গেছে। ঘুম ভাঙলেই সে খানিকক্ষণ কাঁদে। সে কাঁদছে। আমি বিরক্ত হবে গুলতেকিনকে বললাম, দাঁড়িয়ে দেখছ কি? কান্নাটা থামাও না।গুলতেকিন কান্না থামাতে গেল। সে কান্না থামাতে পারছে না। কান্না আরো বাড়ছে। কাঁদতে কাঁদতেই নুহাশ দু’বার ডাকল। বাব্য। বাবা। সে নতুন কথা শিখেছে। কি সুন্দর লাগে তার কথ্য!আমার উচিত উঠে গিয়ে তাকে কোলে নিয়ে আদর করা। ইচ্ছা করছে না। বরং রাগে শরীর জ্বলছে। মনে হচ্ছে, এরা সবাই মিলে প্রাণপণ চেষ্টা করছে যেন আমি লিখতে না পারি। আমি ক্রুদ্ধ ও বিরক্ত গলায় বললাম, সামান্য একটা কান্নাও থামাতে পারছ না। তুমি কি কর?গুলতেকিন ছেলে কোলে নিয়ে দরজা খুলে বাইরে যাচ্ছে। খোলা বারান্দায় খানিকক্ষণ হাঁটবে। মুহাশ আমাকে দেখে আবারও কাঁদতে কাঁদতে ডাকল, বাবা, বাবা। আমি বিচলিত হলাম না। আমার সামনে মতি। কিছুক্ষণের মধ্যে মতির চোখ উপড়ে ফেলা হবে। এমন ভয়াবহ সময়ে ছেলের কান্না কোন ব্যাপারই না। বাচ্চারা অকারণেই কাঁদে। আবার অকারণেই তাদের কান্না থেমে যায়। এর কান্না থামবে। এর দুঃখের অবসান হবে, কিন্তু মতি মিয়ার কি হবে।ছেলের কান্না থেমেছে। সে ঘুমিয়ে পড়েছে। তার মা তাকে বিছানায় শুইয়ে নিজে মাথার কাছে মূর্তির মত বসে আছে। আমার এখন খারাপ লাগতে শুরু করেছে। আমার মনে পড়েছে, নুহাশের সকাল থেকে জ্বর। তার মা তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছেলি। আমি নিয়ে যাইনি। ডাক্তারের চেম্বারে তিন ঘন্টা বসে থেকে নষ্ট করার মত সময় আমার নেই। তা ছাড়া অসুখ-বিসুখ আমার

পৃষ্ঠা:০৭

ভাল লাগে না। একগাদা রোগির মাঝখানে বসে থাকা। হাতে নম্বর ধরিয়ে দেয়া হয়েছে বিয়াল্লিশ। ডাক্তার সাহেব দেখছেন সাত নাম্বার। কখন বিয়াল্লিশ আসবে কে জানে? ডাক্তার নিয়ে যা করার খুলতেকিন করবে। অমি এর মধ্যে নেই।বাজারে যেতে হবে? নোংরা মাছ-বাজারে খলি হাতে ঘোরা এবং প্রতিটি আইটেমে ঠকে আসা আমাকে দিয়ে হবে ন। সেও খুলতেকিনের ডিপার্টমেন্ট। বাচ্চা-কাচ্চাদের পড়াশোনা দেখা? অসম্ভব ব্যাপার। নিজের পড়া নিয়েই কুল পাচ্ছি না। এদের পড়া কখন দেখব? যা হবার হবে। সংসার জলে ভেসে যাচ্ছে? যাক ভেসে। খুব স্বার্থপরের মত কথ্য। আমি অবশ্যই স্বার্থপর। নিজেরটাই দেখি আর কিছু না। টিভিতে নাটক চলছে আমার সমস্ত মমতা নাটকের জন্যে। রেকডিং থেকে রাত বারটা-একটায় ফিরি। কোন রকম ক্লান্তি বোধ করি না। বাসার সবাই যে না খেয়ে আমার জন্যে অপেক্ষা করছে তা আমার চোখে পড়ে না। নাটক ছাড়া তখন মাখায় আর কিছুই ঢুকে না। এই মুহূর্তে নাটক ছাড়া আমার ভুবনে আর কিছু নেই। মেয়ের অন্ন্মদিন হবে। সে তার সব বান্ধবীকে দাওয়াত দিয়েছে। না, আমি তো থাকতে পারব না। নাটকের রিহার্সেল আছে। জন্মদিন প্রতি বছর একবার করে আসবে। রিহার্সেল তো প্রতি বছর একবার করে আসবে না। এরা বুঝতে পারে না – নাটকের রিহার্সেল আমার অন্যে এত জরুরি কেন। আমি বুঝতে পারি না জন্মদিন ওদের এত জরুরি কেন? ক্রমে ক্রমেই আমরা দূরে সরে যাই। আমরা ব্যথিত হই। সেই ব্যথা কেউ কাউকে বুঝাতে পারি না। অন্যসব ছেলেদের মত আমারও ইচ্ছা ছিল নিজেকে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলব। অন্য দশজনের মত হলে আমার চলবে না। আমাকে আলাদা হতে হবে চারপাশের মানুষদের মধ্যে যা কিছু ভাল গুণ দেখেছি তাই নিজের মধ্যে আনার চেষ্টা করেছি। চেষ্টা পর্যন্তই, লাভ কিছু হয়নি। মানুষ পরিবেশ দিয়ে পরিচালিত হয় না, মানুষের চালিকাশক্তি তার ডি এন এ। যা সে জন্মসূত্রে নিয়ে এসেছে। তার চারপাশের জগৎ তাকে সামান্যই প্রভাবিত করে। আমি আমার ডি এন এ অণুর গঠন কি জানি না। আমাদের জ্ঞান সেই পর্যন্ত পৌঁছেনি। একদিন পৌঁছবে, তখন সবার ডি এন এ অণুর প্রিন্টআউট তাদের হাতে ধরিয়ে দেয়া হবে। তা দেখেই সে বুঝবে সে কেমন। অন্যরাও বুঝবে। সব রকম অস্পষ্টতার অবসান হবে।মায়েরা তখন বাচ্চার রেজাল্ট কেন খারাপ হয়েছে এ নিয়ে বাচ্চাকে বক-ঝকা

পৃষ্ঠা:০৮

করবেন না, কারণ তারা ডি এন এ প্রিন্ট আউট দেখেই বুঝবেন এ পরীক্ষায় কখনোই তেমন ভাল করবে না। প্রতিদিন একটা করে প্রাইভেট টিউটর গুলে খাইয়ে দিলেও লাভ হবে না। সেই সময় একটি শিশুর জন্মের পর পরই সবাই জানবে, বড় হয়ে এ হবে অন্যদের চয়ে একটু আলাদা। সে জোছনা দেখলে অভিভূত হবে, বৃষ্টি দেখলে অভিভূত হবে, সারাক্ষণ তার মাথায় খেলা করবে- অন্য এক বোধ।ব্যাপারটা হয়ত খুব সুখকর হবে না, কারণ তখন মানুষের ভেতর রহস্য বলে কিছু থাকবে না। একজন অন্য একজনকে পড়ে ফেলবে খোলা বইয়ের মত। মানুষের সবচে’ বড় অহংকার হল, সে বই নয়। তাকে কখনো পড়া যায় না। তারপরেও মানুষকে বই ভাবতে আমার ভাল লাগে। একেকজন মানুষ যেন একেকটা বই। কোন বই সহজ তড়ভড় করে পড়া যায়। কোন বই অসম্ভব জটিল। আবার কোন কোন বইয়ের হরফ অজানা। সেই বই পড়তে হলে আগে হরফ বুঝতে হবে। আবার কিছু কিছু বই আছে যার পাতাগুলি শাদা। কিন্তু সেখানে লেখা নেই। বড়ই রহস্যময় সে বই।আমার নিজের বইটা কেমন? খুব জটিল নয় বলেই আমার ধারণা। সবল ভাষায় বইটি লেখা। যে কেউ পড়েই বুঝতে পারবে।কিন্তু সত্যি কি পারবে?সারল্যের ভেতরেও তো থাকে ভয়াবহ জটিলতা। যেখানে আমি নিজেই নিজেকে বুঝতে পারি নাসেখানে বাইরের কেউ আমাকে কি করে বুঝবে?আমার নিজের অনেকটাই আমার কাছে অজানা। কিছু কিছু কাজ আমি করি- কেন করি নিজেই জানি না। অন্য কেউ আমাকে দিয়ে করিয়ে নেয় বলে মাঝে মাঝে মনে হয়। আমার এই স্বীকারোক্তি থেকে কেউ মনে না করেন যে, আমি আমার কর্মকাণ্ডের দায়-দায়িত্ব অন্য কোন অজানা শক্তির উপর ফেলে দেবার চেষ্টা করছি। আমি ভাল করেই জানি, আমার প্রতিটি কর্ম-কাণ্ডের দায়-দায়িত্ব আমার। অন্যের নয়।লেখালেখির ব্যাপারটাই ধরা যাক। অনেকবার আমার মনে হয়েছে, লেখালেখির পুরো ব্যাপারটিই আমার নিয়ন্ত্রণে নেই। নিয়ন্ত্রণ করছে অন্য কেউ। যার নিয়ন্ত্রণ কঠিন। যে নিয়ন্ত্রণের আওতা থেকে বের হওয়ার কোন ক্ষমতা আমার নেই। নিজের একটা লেখ্য থেকে উদাহরণ দেই কৃষ্ণপক্ষ।মিষ্টি প্রেমের উপন্যাস লিখব এই ভেবে শুরু করলাম। শুরুটা হল এইভাবে-“নোটটা বদলাইয়া দেন আফা, ছিড়া নেটি।”

পৃষ্ঠা:০৯

প্রথম বাক্যটি লিখেই পুরো গল্প মাথায় সাজিয়ে নিলাম। সমস্যা দেখা দিল তখন। দ্বিতীয় বাক্যটি আর লিখতে পারি না। কত পৃষ্ঠা যে নষ্ট করলাম প্রতিটিতে একটা বাক্য লেখা “নেটিটা বদলাইয়া দেন আফা, ছিড়া নোট।” বাসার সবাই অস্থির হচ্ছে কি এসব? তাদের চেয়েও বেশি অস্থির আমি। পুরো গল্প আমি সাজিয়ে বসে আছি, অথচ লিখতে পারছি না। এ কী যন্ত্রণা। শেষে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ঠিক করলাম, যা হবার হবে। আগে থেকে ঠিকঠাক করা গ লিখব না। যা আসে আসুক।শুরু হল লেখা। পাতার পর পাতা লেখা হতে লাগল। এমন এক গল্প যা আমি লিখতে চাই নি। উপন্যাসের নায়কের ভাগ্য যেন পূর্ব নির্ধারিত। লেখব হিসেবে তা বদলানোর কোন রকম ক্ষমতা আমাকে দেয়া হয়নি। আমি একজন কপিরাইটার। কপি করছি, এর বেশি কিছু না। কে করাচ্ছে কপি? আমার ডিএনএ অণু, না অন্য কিছু?আমি জানি না। মাঝে মাঝে এই ভেবে কষ্ট পাই নিজের সম্পর্কে আমরা এত কম জানি কেন? প্রকৃতি কি চায় না আমরা নিজেকে আনি? এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা বলি। সন্ধ্যা থেকেই কাজ করছি। খাটের পাশেছোট্ট টেবিল নিয়ে মাথা খুঁজে লিখে যাচ্ছি। এক মুহূর্তের জন্যেও মাথা তুলছি না। হঠাৎ কি যেন হল। মনে হল কিছু একটা হয়েছে। অদ্ভুত কিছু ঘটে গেছে। বিরাট কোন ঘটনা, আর আমি তাতে অংশগ্রহণ না করে বোকার মত মাথা গুঁজে লিখে যাচ্ছি। লেখার খাতা বন্ধ করে উঠে পড়লাম, কিন্তু বুঝতে পারলাম না ব্যাপারটা কি। অস্থিরতা খুব বাড়ল। একবার মনে হল, এইসব মাথা খারাপের পূর্ব লক্ষণ। মাথা খারাপের আগে আগে নিশ্চয়ই মানুষের এমন ভয়ংকর অস্থিরতা হয়। বারান্দায় এসে দাঁড়াবার সঙ্গে সঙ্গে অস্থিরতার কারণ স্পষ্ট হল আজ পূর্ণিমা। আকাশভরা জোছনা। প্রকৃতির এই অসাধারণ সৌন্দর্য উপেক্ষা করে আমি কি-না ঘরের অন্ধকার কোণে বসে আছি?অনেকেই বলবেন, এটা এমন কোন অস্বাভাবিক ঘটনা না। যেহেতু জোছনা আমার প্রিয়, আমার অবচেতন মন খেয়াল রাখছে কবে জোছনা। সেই অবচেতন মনই মনে করিয়ে দিচ্ছে। আর কিছু নয়। অবচেতন মনের উপর দিয়ে অনেক কিছু আমরা পার করে দেই। ডাক্তারদের যেমন ‘এলার্জি’, মনোবিজ্ঞানীদের তেমনি ‘অবচেতন মন’। যখন রোগ ধরতে পারেন না তখন ডাক্তাররা গম্ভীর মুখে বলেন এলার্জি, মনোবিজ্ঞানী যখন সমস্যা ধরতে পারেন না, তখন বিজ্ঞের মত মাথাঝাঁকিয়ে বলেন- অবচেতন মনের কারসাজি। আর কিছুই না। নেই অবচেতন মনটই বা কি? কতটুক তার ক্ষমতা? লেখকদের লেখালেখি

পৃষ্ঠা:১০

কি অবচেতন মন নামক সমুদ্রে ভেসে উঠে? সেখান থেকে চলে আসে চেতন জগতে? ইন্দ্রিয়-অগ্রাহ্য জগত থেকে ইন্দ্রিয়-গ্রাহ্য জগতে তার আগমন।সেই ইন্দ্রিয়-অগ্রাহ্য জগতটি আমার জানতে ইচ্ছে করে, বুঝতে ইচ্ছে করে। অনার্স ক্লাসে আমি কোয়ান্টাম বলবিদ্যা পড়াই। আমাকে পড়াতে হয় ভারনার হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা সূত্র। আমি বলি শোন ছেলেমেয়েরা, কোন বস্তুর অবস্থান ও গতি একই সময়ে নির্ণয় করা যায় না। এই দুয়ের ভেতর সবসময় থাকে এক অনিশ্চয়তা। তুমি অবস্থান পুরোপুরি জানলে গতিতে অনিশ্চয়তা চলে আসবে। আবার গতি জানলে অনিশ্চয়তা চলে আসবে অবস্থানে।ছাত্ররা প্রশ্ন করে স্যার কেন?আমি নির্বিকার থাকর চেষ্টা করতে করতে বলি এটা প্রকৃতির বেঁধে দেয়া নিয়ম। প্রকৃতি চায় না আমরা গতি ও অবস্থান ঠিকঠাক জানি। জজ্ঞানের অনেকখানি প্রকৃতি নিজের কাছে রেখে দেয়। প্রকাশ করে না।কেন স্যার?”জানি না।’কোয়ান্টাম বলবিদ্যার শিক্ষক হিসেবে ছাত্রদের অনেক প্রশ্নের উত্তরে আমাকে বলতে হয় “জানি না।”জ্ঞানের তীব্র পিপাসা দিয়ে মানুষকে যিনি পঠিয়েছেন তিনিই আবার জ্ঞানের একটি অংশ মানুষের কাছ থেকে সরিয়ে রেখেছেন।’কেন?’উত্তর জানা নেই।এই মহাবিশ্বের বেশির ভাগ প্রশ্নের উত্তরই আমাদের জানা নেই। আমরা জানতে চেষ্টা করছি। যতই জানছি ততই বিচলিত হচ্ছি। আরো নতুন সব প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে। বিজ্ঞানীরা নিদারুণ আতঙ্কের সঙ্গে লক্ষ্য করছেন তাঁদের সামনে কঠিন কালো পর্দা। যা কোনদিনই উঠানো সম্ভব হবে না। কি আছে এই পর্দার আড়ালে তা জানা যাবে না।আমার যাবতীয় রচনায় আমি ঐ কালো পর্দাটির প্রতি ইংগিত করি। আমি জানি না আমার পাঠক-পাঠিকারা সেই ইংগিত কি ধরতে পারেন, না-কি তার গল্প পড়েই তৃপ্তি পান। উদাহরণ দেই।কৃষ্ণপক্ষ উপন্যসের নায়ক মুহিবের বিয়ের দিন। একটা কটকটে হলুদ রঙের পাঞ্জাবি পরে এসেছিল। সবাই তাই নিয়ে খুব হাসাহাসি করল। ছেলেটি মারা গেল বিয়ের পর দিন। তার স্ত্রী অরুর বিয়ে হল অন্য এক জায়গায়। কোটে গেল দীর্ঘ কুড়ি বছর। কুড়ি বছর পর সেই অরুর মেয়ের বিয়ে হচ্ছে। বাড়িতে তুমুল

পৃষ্ঠা ১১ থেকে ২০

পৃষ্ঠা:১১

উত্তেজনা। বর এসেছে, বর এসেছে। অরু আগ্রহ করে নিজেও তাঁর কন্যার বর দেখতে গেলেন। ছেলেকে দেখেই তিনি চমকে উঠলেন। তার গায়েও কটকটে হলুদ রঙের পাঞ্জাবি। যেন এই ছেলে কুড়ি বছর আগের মুহিবের পাঞ্জাবিটা পরে চলে এসেছে।অনেকেই আমাকে বলেছেন, কৃষ্ণপক্ষ উপন্যাস থেকে হলুদ পাঞ্জাবির অংশটা বাদ দিলে উপন্যাসটা সুন্দর হত। উপন্যাসে এই অংশটুকুই দুর্বল। হিন্দী ছবির মত মেলোড্রামা।অথচ উপন্যাসটা লেখাই হয়েছে হলুদ পাঞ্জাবির ব্যাপারটির জন্যে। আমি কি আমার বোধ পাঠকদের কাছে ছড়িয়ে দিতে ব্যর্থ হচ্ছি? এরা হিমুর বাইরের রূপটি দেখে। তার উদ্ভট কাণ্ড-কারখানায় মজা পায় কিন্তু এর বাইরেও তো হিমুর অনেক কিছু বলার আছে। হিমু ক্রমাগত বলেও যাচ্ছে কেন কেউ তা ধরতে পারছে না? লেখক হিসেবে এরচে’ বড় ব্যর্থতা আরে কি হতে পারে?আমি আমার গল্পটা লিখে শেষ করেছি। মতির চোখ উপড়ে ফেলার গল্প। সাধারণত গল্পগুলি আমি গভীর রাতে শেষ করি। এই প্রথম শেষ করলাম বিকেলে। আনন্দে চোখে পানি এসে গেল। চোখ মুছে শোবার ঘরে এসে দেখি- আমার মেয়েরা সবাই সাজ-পোশাক পরছে। একেকজনকে পরীর মত দেখাচ্ছে। আমি বললাম, ব্যাপার কি?ওরা ঝলমল করতে করতে বলল, তুমি কাপড় পরে নাও। দেরি করছ কেন? আমরা বিয়েতে যাব না?ওদের মা বলল, তোর বাবার চোখ দেখে বুঝতে পারছিস না, সে যাবে ন্য? সে ঘরে চুপচাপ একা একা বসে থাকবে।বড় মেয়ে দুঃখীত গলায় বলল, বাবা তুমি যাবে না?আমি বললাম, অবশ্যই যাব। কে বলছে যাব না?শার্ট-পেন্ট ইস্ত্রি করা নিয়ে অতিরিক্ত রকম ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। বিয়েবাড়িতেও সবার সঙ্গে খুব হৈ-চৈ করলাম। গল্প-গুজব, রসিকতা। সবাই ভাবল, বাহ লোকটা বেশ মজার তো। কেউ আমার নিঃসঙ্গতাবুঝতে পারল না। শুধু এক ফাঁকে গুলতেবিন এসে বলল, তোমার কি হয়েছে?আমি জবাব দিলাম না। আমার কি হয়েছে আমি নিজেই কি ছাই জানি? শুধু জানি, মতি মিয়ার গল্প লিখে শেষ করেছি। মতি মিয়া এখন আর আমার দিকে তাকিয়ে থেকে কাতর অনুনয় করবে না স্যার, আমার ব্যাপারটা লিখে ফেলুন।

পৃষ্ঠা:১২

জীবনের গভীরতম বোধকে আমি অনুভব করতে পারি। জোছনার অপূর্ব ফুলকে আমি দেখতে পাই কিন্তু তারা অন্তরের এতই গভীরে যে, আমি তুলে আনতে পারি না। বার বার হাত ফসকে যায়। দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী জেগে আমি অপেক্ষা করি। কোন দিন কি পারব সেই মহান বোধকে স্পর্শ করতে? নিজেকে বোঝাই ভাগ্যে যা আছে তা হবে।Every man’s fate We have fastened On his own neek.(সুরা বনি ইস্রাফিল)আমরা কি করব না করব সবই পূর্ব-নির্ধারিত। কি হবে চিন্তা করে? নিয়তির হাতে সব ছেড়ে-ছুড়ে দিয়ে অপেক্ষা করাই ভাল। আমি অপেক্ষা করি।

পৃষ্ঠা:১৩

চোখ

আজ বাদ-আছর খেজুর কাঁটা দিয়ে মতি মিয়ার চোখ তুলে ফেলা হবে। চোখ তুলবে নবীনগরের ইদরিস। এই কাজ সে আগেও একবার করেছে।মতি মিয়াকে আটকে রাখা হয়েছে বরকত সাহেবের বাংলা ঘরে। তার হাত-পা বাঁধা। একদল মানুষ তাকে পাহারা দিচ্ছে। যদিও তার প্রয়োজন ছিল না, পালিয়ে যাওয়া দূরের কথা, মতি মিয়ার উঠে বসার শক্তি পর্যন্ত নেই। তার পাঁজরের হাড় ভেঙেছে। ডান হাতের সব কটা আঙুল থেঁতলে ফেলা হয়েছে। নাকের কাছে সিকনির মত রক্ত ঝুলে আছে। পরনের সাদা পাঞ্জাবি রক্তে মাখামাখি হয়ে গায়ের সঙ্গে লেগে গেছে। ঘণ্টাখানিক আগেও তার জ্ঞান ছিল না। এখন জ্ঞান আছে, তবে বোধশক্তি ফিরেছে বলে মনে হয় না। তার চোখ তুলে ফেলা হবে এই খবরেও সেবিচলিত হয়নি। ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলে বলেছে, নয়ন কখন তুলবেন?’ এই পর্ব বাদ-আছর সমাধা হবে শুনে সে ননে হল নিশ্চিন্ত হল। সহজ গলায় বলল, পানি খামু, পানি দেন।পানি চাইলে পানি দিতে হয়। না দিলে গৃহস্থের দোষ লাগে। রোজ’ হাশরের দিন পানি পিপাসায় বুক যখন শুকিয়ে যায় তখন পানি পাওয়া যায় না। কাজেই এক বদনা পানি এনে মতির সামনে রাখা হল। মতি বিরক্ত গলায় বলল, মুখের উপরে পানি ঢাইল্যা না দিলে খামু ক্যামনে? আমার দুই হাত বান্ধা। আপনেরার এইটা কেমুন বিবেচনা?যে বদনা এনেছে সে মোড়ায় বসে থাকা একজনের দিকে তাকিয়ে বলল, পানি ঢাইল্যা দিমু হাসান ভাই?হাসান আলী মতিকে কেন্দুয়া বাজার থেকে ধরে এনেছে। মতির ওপর এই কারণেই তার অধিকার সবাই স্বীকার করে নিয়েছে। মতির বিষয়ে যে কোন সিদ্ধান্ত নিতে হলে হাসান আলীর মতামত জানা দরকার। হাসান আলী পানি বিষয়ে কোন

পৃষ্ঠা:১৪

মতামত দিল না, বিস্মিত হয়ে বলল, হারামজাদা কেমন ঢং-এ কথা কয় শুনছেন? তার চউখ তোলা হইব এইটা নিয়া কোন চিন্তা নাই। ক্যাটক্যাট কইরা কথা বলতেছে। কি আচানক বিষয়। ঐ হারামজাদা, তোর মনে ভয়-ডর নাই?মতি জবাব দিল না, খু করে থুথু ফেলল। থুথুর সঙ্গে রক্ত বের হয়ে এল। তাকে ঘিরে ভিড় বাড়ছে। খবর ছড়িয়ে পড়েছে। একজন জীবিত মানুষের চোখ খেজুর কাঁটা দিয়ে তুলে ফেলা হবে এমন উত্তেজক ঘটনা সচরাচর ঘটে না। আশা করা যাচ্ছে, আছর ওয়াক্ত নাগাদ লোকে লোকারণ্য হবে। মতিকে দেখতে শুধু যে সাধারণ লোকজন আসছে তা না, বিশিষ্ট লোকজনও আসছেন। কেন্দুয়া থেকে এসেছেন রিটায়ার্ড স্টেশন মাস্টার মোবারক সাহেব। নয়াপাড়া হাই স্কুলের হেডমাস্টার সাহেবও এসেছেন। হাসান আলী নিজের চেয়ার ছেড়ে দিয়ে তাঁকে বসতে দিল। তিনি পাঞ্জাবির পকেট থেকে চশমা বের করতে করতে বললেন, এরই নাম মতি?হাসান আলী হাসিমুখে বলল, ছে হেডমাস্টার সাব, এই হারামজাদাই মতি। বাদ-আছর হারামজাদার চউখ তোলা হইব।’এরে ধরলা ক্যামনে?”‘সেইটা আপনের এক ইতিহাস।’পানদানিতে পান চলে এসেছে। হেডমাস্টার সাহেব পান মুখে দিতে দিতে উৎসাহের সঙ্গে বললেন, ঘটনাটা বল শুনি। সংক্ষেপে বলবা।হাসান আলী এগিয়ে এল। মতিকে ধরে আনার গল্প সে এ পর্যন্ত এগারোব্যর বলেছে। আরো অনেকবার বলতে হবে। বিশিষ্ট লোকজন অনেকেই এখনো আসেন-নি। সবাই আলাদা আলাদা করে শুনতে চাইবেন। তাতে অসুবিধা নেই। এই গল্প এক লক্ষবার কর যায়। হাসান আলী কেশে গলা পরিষ্কার করে নিল।”ঘরে কেরাছি ছেল না। আমার পরিবার বলল, কেরাছি নাই। আমার মিজান গেল খারাপ হইয়া। হাটবারে কেরাছি আনলাম, আর আইজ বাল কেরাছি নাই, বিষয় কি। যাই হউক, কেরাছিব বোতল হাতে লইয়া রওনা দিলাম। পথে সুলেমানের সাথে দেখা। সুলেমান কইল, চাচাজী, যান কই?…’মতি নিজেও হাসান আলীর গল্প আগ্রহ নিয়ে শুনছে। প্রতিবারই গল্পের কিছু শাখা-প্রশাখা বের হচ্ছে। সুলেমানের কথা এর আগে কোন গল্পে আসেনি। এইবার এল। সুলেমানের ভূমিকা কি কিছু বোঝা যাচ্ছে না।হাসান আলী গল্প শেষ করল। হেডমাস্টার সাহেব মুগ্ধ গলায় বললেন, বিরাট সাহসের কাম করছ হাসান। বিরাট সাহস দেখাইছ। কামের কাম করছ। মতির সাথে অস্ত্রপাতি কিছু ছিল না?

পৃষ্ঠা:১৫

‘আল্লাপাক তোমারে বাঁচাইছে। অস্ত্রপাতি থাকলে উপায় ছিল না। তোমারে জানে শেষ কইরা দিত।’উপস্থিত সবাই মাথা নাড়ল। হেডমাস্টার সাহেব বললেন, চউখ তোলা হইব কথাটা কি সত্য?’জ্বে সত্য। এইটা সকলের সিদ্ধান্ত। চউখ তুললেই জন্মের মত অচল হইব।খানা-পুলিশ কইরা তো কোন ফয়দা নাই।’ ‘অতি সত্য কথা, কোন ফয়দা নাই। তবে থানাওয়ালা ঝামেলা করে কিনা এইটা বিবেচনায় রাখা দরকার।”আছে, সবই বিবেচনার মইধ্যে আছে। মেম্বর সাব খানাওয়ালার কাছে গেছে।’মতি লক্ষ্য করল, হেডমাস্টার সাহেব তার দিকে তাকিয়ে আছেন। হেডমাস্টার সাহেবের চোখে শিশুসুলভ বিস্ময় ও আনন্দ। মনে হচ্ছে, চোখ তোলার ঘটনা দেখার জন্যে তিনি আছর পর্যন্ত থেকে যাবেন। মতি তেমন ভয় পাচ্ছে না। প্রাথমিক ঝড় কেটে গেছে এটাই বড় কথা। প্রথম ধাক্কায় চোখ চলে যেতে পারত। সেটা যখন যায়নি তখন আশা আছে। আছরের আগেই কেউ-না-কেউ দয়াপরবশ হয়ে বলে ফেলবে “খাটক, বাদ দেন। চউখ তুইল। লাভ নাই। শক্ত মাইর দিয়া ছাইড়া দেন।” একজন বললেই অনেকে তাকে সমর্থন করবে। তবে একজন কাউকে বলতে হবে। মতি নিজে ক্ষমা চাইলে হবে না। এতে এরা আরো রেগে যাবে। সে দুর্বল হলে সর্বনাশ। দুর্বলকে মানুষ করুণা করে না, ঘৃণা করে। মতি ঠাণ্ডা মাথায় ভাবে। চোখ বাঁচানোর পথ বের করতে হবে। হাতে অবশ্যি সময় আছে। আছরের এখনো অনেক দেরি। ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করাও সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারা শরীরে যন্ত্রণা, পিপাসায় বুক শুকিয়ে যাচ্ছে। পানির বদনা সামনে আছে কিন্তুকেউ মুখে ঢেলে না দিলে খাবে কিভাবে? হেডমাস্টার সাহেব সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, কি রেমতি, সিগ্রেট খাবি?সবাই হো-হো করে হেসে ফেলল। মতি চিন্তিত বোধ করছে। এটা ভাল লক্ষণ না। এরা তাকে দেখে মজা পেতে শুরু করেছে। মানুষ মজা পায় অন্তু জানোয়ার দেখে। এরা তাকে জন্তু-জানোয়ার ভাবতে শুরু করেছে। হাত-পা বাঁধা একটা ভয়াবহ প্রাণী। ভয়াবহ প্রাণীর চোখ উঠানো কঠিন কিছু না। তাছাড়া দূর দূর থেকে লোকজন মজা পাবার অন্যে আসছে। মজা না পেয়ে তারা যাবে না। মতি হেডমাস্টার সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল, স্যার, পানি খাব। একজন বদনার পুরো

পৃষ্ঠা:১৬

পানিটা তার মুখের উপর ঢেলে দিল। সবাই আবার হো-হো করে হেসে উঠল। মতির বুক ধক্ করে উঠল, অবস্থা ভাল না। তাকে দ্রুত এমন কিছু করতে হবে যেন সে পশুস্তর থেকে উঠে আসতে পারে। কি করা যায় কিছুই মাথায় আসছে না। চোখ দুটা কি আজ চলেই যাবে? মায়া-মমতা দুনিয়া থেকে উঠে যাচ্ছে। একটা সময় ছিল যখন তার মত লোকের শাস্তি ছিল মাথা কামিয়ে গলায় জুতার মালা ফুলানো। তারপর এল ঠেং-ভাঙা শাস্তি, ঠেং ভেঙে লুলা করে দেয়া। আর এখন চোখ তুলে দেয়া। একটা খেজুর কাঁটা দিয়ে পুট করে চোখ বের করে আনা। এতগুলি লোক তাকে ঘিরে আছে, কারো চোখে কোন মমতা নেই। অবশ্যি হাতে এখনো সময় আছে। মমতা চট করে তৈরি হয় না। মমতা তৈরি হতেও সময় লাগে। মতি হাসান আলীর দিকে তাকিয়ে হাসল। মানুষের হাসি খুব অদ্ভুত জিনিস। অন্তু জানোয়ার হাসতে পারে না। মানুষ হাসে। একজন ‘হাসন্ত’ মানুষের উপর রাগ থাকে না।হাসান আলী চেঁচিয়ে উঠল, দেখ, হারামজাদা হাসে। ভয়ের চিহ্নটা নাই। কিছুক্ষণের মইধ্যে চউখ চইল্যা যাইতেছে, তারপরেও হাসি। দেখি, এর গালে একটা চড় দেও দেখি।প্রচণ্ড চড়ে মতি দলা পাকিয়ে গেল। হাত-পা বাঁধা, নয়ত চার-পাঁচ হাত দূরে ছিটকে পড়ত। কিছুক্ষণের জন্যে মতির বোধশক্তি লোপ পেল। মাথার ভেতর ভো ভোঁ শব্দ হচ্ছে। চারদিক অন্ধকার। এরা কি চোখ তুলে ফেলেছে? মনে হয় তাই। পানির পিপাসা দূর হয়েছে। পিপাসা নেই। এটা মন্দ না। মাথার ভেতর পাক দিচ্ছে, মনে হচ্ছে সে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে। অজ্ঞান হবার আগে আগে এরকম হয়। অজ্ঞান হওয়া খুব আনন্দদায়ক ব্যাপার। দ্রুত শরীরের ব্যথা-বেদনা চলে যায়। শরীর হাল্কাহতে থাকে।না, চোখ যায়নি। চোখ এখনো আছে। এই তো সবকিছু দেখা যাচ্ছে। মতি মনে মনে বলল, “শালার লোক কি হইছে! মেলা বইস্যা গেছে।” বেলা পড়ে এসেছে। আছর ওয়াক্ত হয়ে গেল না-কি? না মনে হয়। আলো খুব বেশি। তাকে বাংলা ঘর থেকে বের করে উঠোনে শুইয়ে রখা হয়েছে। এই জন্যেই আলো বেশি লাগছে।মতি বলল, কয়টা বাজে?’কয়টা বাজে তা দিয়া দরকার নাই। সময় হইয়া আসছে। যা দেখনের দেইখ্যা নে রে মতি।’মতি চারদিকে তাকালো। তার আশেপাশে কোন ছোট ছেলেমেয়ে নেই। মহিলা নেই। এদের বোধহয় সরিয়ে দেয়া হয়েছে। লোকজন তাকে ঘিরে গোল হয়ে

পৃষ্ঠা:১৭

আছে। তার সামনে জলচৌকির উপর নীল গেঞ্জি এবং সাদা লুঙ্গি পরে যে বসে আছে সে-ই কি চোখ তুলবে? সে-ই কি নবীনগরের ইদরিস? কখন এসেছে ইদরিস? লোকটার ভাবভঙ্গি দশজনের মত না। তাকাচ্ছে অন্যরকম করে। তার চেয়েও বড় কথা, আশেপাশের লোকজন এখন নীল গেঞ্জিওয়ালাকেই দেখছে। মতির প্রতি তাদের এখন আর কোন আগ্রহ নেই। তারা অপেক্ষা করছে বড় ঘটনার জন্য। নীল গেঞ্জি পরা লেকটার সঙ্গে কথা বলে ব্যাপারটা জেনে নেয়া যায়। মতি অপেক্ষা করছে কখন লোকটা তাকায় তার দিকে। যেই তাকাবে গুন্নি মতি কথা বলবে। চোখের দিকে না তাকিয়ে কথা বললে কোন আরাম নেই। কিন্তু লোকটা তাকাচ্ছে না।’ভাইজান, ও ভাইজন।’নীল গেঞ্জি তাকাল যতির দিকে। মতি সঙ্গে সঙ্গে বলল, আফনের নাম কি ইদরিস মিয়া? নীল গেঞ্জি জবাব দিল না। মাথা ঘুরিয়ে নিল। মতি আরো আন্তরিক ভঙ্গিতে বলল, ভাইজান, আফনেই কি আমার চট্টখ তুলবেন?পেছন থেকে একজন বলল, হারামজাদা কয় কি। সঙ্গে সঙ্গে সবাই হেসেউঠল। এই কথায় হাসার কি আছে মতি বুঝতে পারছে না। কথাটা কি সে বিশেষকোন ভঙ্গিতে বলেছে? সাধারণ কথাও কেউ কেউ খুব মজা করে বলতে পারে।তার বৌ পারত। অতি সধারণ কথা এমনভাবে বলত যে হাসতে হাসতে চোখেপানি এসে যেত। ভাত বেড়ে ডাকতে এসে বলত, ভাত দিছি, আসেন। কষ্ট কইরাতিন-চাইরটা ভাত খান। না, বৌয়ের কথা ভাবার এখন সময় না। এখন নিজেরনয়ন বাঁচানোর বুদ্ধি বের করতে হবে। নয়ন বাঁচলে বৌয়ের কথা ভাবা যাবে। নয়ননা বাঁচলেও ভাবা যাবে। ভাবার জন্যে নয়ন লাগে না। বৌয়ের কথা সে অবশ্যিএন্ট্রিতেও বিশেষ ভাবে না। শুধু হাজতে বা জেলখানায় থাকলেই তার কথা মনেআসে। তখন তার কথা ভাবতেও ভাল লাগে। মেয়েটার অবশ্যি কষ্টের সীমা ছিলনা। সে জেলে গেলেই রাতদুপুরে চৌকিদার, থানাওয়ালা বাড়িতে উপস্থিত হত।বিষয় কি? খোঁজ নিতে আসছে মতি ঘরে আছে কি-না। সুন্দর একটা মেয়ে। খালিবাড়িতে থাকে। থানাওয়ালারা তো রাতদুপুরে সেই বাড়িতে যাবেই। বাড়িতে যাবে।পান খাবে। আরও কত কি করবে। ডাকাতের বৌ হল সবাব বৌ। এই অবস্থায়কোন মেয়ে থাকে না। তার বৌ-টা তারপরেও অনেক দিন ছিল। মতি প্রতিবারইবাড়ি ফিরত আতংক নিয়ে। বাড়ির সামনে এসে মনে হত এইবার বাড়িতে ঢুকেদেখবে, বাড়ি খালি। কেউ নেই।বৌ চলে গেছে গত বৈশাখ মাসে। কোথায় গেছে কেউ জানে না। পাড়ায় কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করেছিল। কেউ বলতে পারে না। একজন বলল, অনেক

পৃষ্ঠা:১৮

দিন তো থাকল, আর কত? বাজারে গিয়া খোজ নেও। মনে হয় বাজারে ঘর নিছে। জগতের অনেক সত্যের মত এই সত্যও সে গ্রহণ করেছে সহজভাবে। চোর ডাকাতের বৌদের শেষ আশ্রয় হয় বাজার। বাজারে তারা মোটামুটি সুখেই থাকে। মুখে রঙ-চত্র মেখে সন্ধ্যাকালে চিকন গলায় ডাকে, ও বেপারি, আহেন, পান- অমুক খাইয়া যান। শীতের দিন শইলডা গরম করন দরকার আছে।অবসর পেলেই মতি আজকাল বাজারে-বাজারে ঘুরে। বৌচাকে পাওয়া গেলে মনে শান্তি। তাকে নিয়ে ঘর-সংসার আর করবে না। তাতে লাভ কি? বৌটা কোন এক আয়গায় থিতু হয়েছে এটা জানা থাকলেও মনে আনন্দ। মাঝে-মধ্যে আসা যাবে। আপনার মানুষের কাছে কিছুক্ষণ বসলেও ভাল লাগে। আপনার মানুষ সংসারে থাকলেও আপনার, বাজারে থাকলেও আপনার। বৌ কেন্দুয়া বাজারে আছে এরকম একটা উড়া-খবর শুনে মতি কেন্দুয়া এসেছিল। উড়া-খবর কখনো ঠিক হয় না। তার বেলা ঠিক হয়ে গেল। বৌ এখানেই আছে। নাম নিয়েছে মর্জিনা। বাজারে ঘর নিলে নতুন নাম নিতে হয়। মর্জিনার সঙ্গে দেখা করতে যাবার মুখে এই বিপদ।আজান হচ্ছে। আছর ওয়াক্ত হয়ে গেছে। মতি অনেক কষ্টে পাশ ফিরল। তারা চোখ কখন তুলবে? নামাজের আগে নিশ্চয়ই না। কিছুটা সময় এখনো হাতে আছে। এর মধ্যে কত কিছু হয়ে যেতে পারে। মহাখালি রেল স্টেশনে সে একবার ধরা পড়ল। তাকে মেরেই ফেলত। ট্রেনের কামরা থেকে একট মেয়ে ছুটে নেমে এল। চিৎকার করে বলল, আপনারা কি মানুষটাকে মেরে ফেলবেন? খবদার, আর না। খবদার। মেয়েটির মূর্তি দেখেই লোকজন হকচকিয়ে গেল। লোকজনের কথা বাদ থাক, সে নিজেই হতভম্ব। জীবন বাঁচানোর জন্যে মেয়েটিকে সামান্য ধন্যবাদও দেয়া হয়নি। ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। সেই মেয়ে চলে গেছে কোথায় না কোথায়।আজ এই যে এত লোক চারপাশে ভিড় করে আছে এদের মধ্যেও নিশ্চয়ই কেউ-না-কেউ আছে ঐ মেয়েটির মত। সে অবশ্যই শেষ মুহূর্তে ছুটে এসে বলবে, “করেন কি। করেন কি।” আর এতেই মতির নয়ন রক্ষা পাবে। এইটুক বিশ্বাস তো মানুষের প্রতি রাখতেই হবে। মতি মিয়া অপেক্ষা করে। কে হবে সেই লোকটি। না জানি সে দেখতে কেমন। সেই লোকটির চোখ কি ট্রেনের মেয়েটির চোখের মত মমতামাখা হবে? যে চোখের দিকে তাকালে ভাল হয়ে যেতে ইচ্ছা করে। মতি মিয়া চাপা উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করে, অপেক্ষা করতে তার ভালই লাগে।

পৃষ্ঠা:১৯
পেট্রিফায়েড ফরেস্ট

অভিশাপে পাথর হয়ে যাবার ব্যাপার রূপকথার বই-এ পাওয়া যায়। ঐ যে দুষ্ট যাদুকর রাজকন্যাকে পাথর বানিয়ে ফেলল। বছরের পর বছর রোদ-বৃষ্টিতে পড়ে রইল সেই পাথরের মূর্তি। তারপর এক শুভক্ষণে রাজপুত্র এসে তাকে অভিশাপমুক্ত করল। পাথরের মূর্তি প্রাণ ফিরে পেল। তারা দু’জন সুখে শান্তিতে জীবন কাটাতে লাগল।শৈশবের রূপকথার গল্পকে গুরুত্ব দেবার কোন কারণ নেই, কিন্তু যৌবনে আবার শৈশবের গল্প নতুন করে পড়লাম। উপন্যাসটির নাম “পেট্রিফায়েড ফরেন্সী” অর্থ্যৎ প্রস্তরীভূত অরণ্য। এই উপন্যাসের তরুণ নায়ক সন্ধ্যাবেলা বিমল্ল মুখে ‘পেট্রিফায়েড ফরেস্ট’-এ ঘুরে বেড়ায়। চারদিকে পাথরের গাছপালা। তার মাঝে পাথরের মত মুখ করে এ যুগের নায়ক বসে থাকে। আমার কাছে মনে হয়, এ কী ছেলেমানুষি! রূপকথার পাথরের অবণ্য এই যুগে কোথেকে আসবে? পাথরেরঅরণ্য থাকতে পারে না।আমার অনেক ধারণার মত এই ধারণাও পরবর্তীতে ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত হয়। প্রস্তরীভূত অরণ্য দেখার দুর্লভ সৌভাগ্য হয়। সেই গল্প বলা যেতে পারে।তখন থাকি আমেরিকার নর্থ ডাকোটায়। সংসার ছোট আমি, আমার স্ত্রী এবং একমাত্র মেয়ে নোভা। টিচিং অ্যাসিসটেন্ট হিসেবে মাসে চারশ’ ডলারের মৃত পাই। দিনে আনি দিনে খাই অবস্থা। ঘুরে বেড়ানোর প্রচণ্ড শখ। শখ মেটানোর উপায় নেই। খুবই খরচান্ত ব্যাপার। আমেরিকা বিশাল দেশ। দেখার জিনিস ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তখনো কিছুই দেখা হয়নি। ছশ ডলার দিয়ে লক্কড় মার্কা একটি ফোর্ড গাড়ি কিনেছি। সেই গাড়ি নিয়ে বেরুতে সাহস হয় না। ইঞ্জিন গরম হলেই এই গাড়ি মহিষের মত বিচিত্র শব্দ করে।এই অবস্থায় বেড়াতে যাবার নিমন্ত্রণ পেলাম। আমার পাশের ফ্ল্যাটের মালয়েশিয়ান ছাত্র এক সকালে এসে বলল, আহমাদ, আমি গতকাল একটা নতুন গাড়ি কিনেছি শেব্রলেট। পাঁচ হাজার ডলার পড়ল। আমি বললাম, বাহ, ভাল তো।

পৃষ্ঠা:২০

‘এখন ঠিক করেছি গাড়িটা লং রুটে ট্রেন্ট করব। গাড়ি হচ্ছে স্ত্রীর মত। স্ত্রীকে যেমন পোষ মানাতে হয়, গাড়িকেও পোষ মানাতে হয়। আমি আজ সন্ধ্যায় রওনা হচ্ছি সাউথ ডাকোটায়।”খুব ভাল।”তুমিও আমার সঙ্গে যাচ্ছ। তোমার সঙ্গে যদিও আমার তেমন পরিচয় নেই, তবু তুমি আমার প্রতিবেশী। তুমি যেমন মুসলমান, আমিও মুসলমান। অবশ্য আমি খারাপ মুসলমান, নিয়মিত মদ খাই।’আমি মালয়েশিয়ান ছেলেটির কথাবার্তায় চমৎকৃত হলাম। সে বলল, আমিঃ তোমার নাম জানি, কিন্তু তুমি আমার নাম জান না। দশ ডলার বাজি। বল দেখি আমার নাম কি?আমি বললাম, ‘আইজেক।”অইজেক হচ্ছে আমার ছেলের নাম। আমার নাম আবদাল। যাই হোক, তুমি তৈরি থেকো। ঠিক সন্ধ্যায় আমরা রওনা হব।’আমি বললাম, নতুন গাড়িতে যাচ্ছ, তোমার স্ত্রী এবং ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে গেলেই তো ভাল হবে।’মোটেই ভাল হবে না। তুমি আমার স্ত্রীকে চেন না। ওকে আমি সহ্য করতে পারি না। তাছাড়া তোমাকে আগেই বলেছি, গাড়ি হচ্ছে পরীর মত। দু’জন পরীকে নিয়ে বের হওয়া কি ঠিক?’আমি আবদালের লজিকে আবারো চমৎকৃত হলাম। তাকে বিনীতভাবে বললাম, আমার পক্ষে আমার স্ত্রী ও কন্যাকে ফেলে একা একা বেড়াতে যাওয়া সম্ভব হবে না। ওদের মন খারাপ হবে। আমারও ভাল লাগবে না।আবদাল বিমর্ষ মুখে চলে গেল। আমার শত্রী গুলতেকিন বলল, ওর সঙ্গে যেতে রাজি না হয়ে খুব ভাল করেছ। পাগল ধরনের লোক। তবে ওর বউটা খুব ভাল। তার নাম ‘রোওজি’। এমন ভাল মেয়ে আমি কম দেখেছি। চেহারাও রাজকন্যাদের মত।বিকেলে আবদাল আবার এল। তার মুখের বিমর্ষ ভাব দূর হয়েছে। সে হাসিমুখে বলল, ঠিক আছে, তুমি তোমার স্ত্রী এবং কন্যাকে নিয়ে নাও। আমি আমারটাকে নিচ্ছি। ঘুরে আসি।আমি বললাম, এত মানুষ থাকতে তুমি আমাকে নিতে আগ্রহী কেন? আবদাল বলল, অনেকগুলি কারণ আছে তুমি আমার প্রতিবেশী, তুমি মুসলমান এবং তুমি রোজ বিকেলে তোমার মেয়েকে কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়াও। দেখতে বড় ভাল লাগে। আমারো ইচ্ছে করে আমার ছেলেটাকে কাঁধে নিয়ে ঘুরতে। তবে আমার

পৃষ্ঠা ২১ থেকে ৩০

পৃষ্ঠা:২১

ছেলেটা হল মহাশয়তান। মা’র কাছ থেকে সব শয়তানি বুদ্ধি পেয়েছে। এইজন্যেওকে কাঁষে নেই না। তাও একদিন নিয়েছিলাম। কাঁধে তোলামাত্র পিসাব করে দিল।প্রাকৃতিক কারণে করেছে তা না, ইচ্ছে করে করেছে। ‘রাতে রওনা হবার দরকার কি? আমরা বরং ভোরবেলা রওনা হই। দৃশ্য দেখতে দেখতে যাই।”আমেরিকায় দেখার মত কোন দৃশ্য নেই। মাইলের পর মাইল দু-ধু মাঠ। ঐ মাঠগুলি গরুর পায়খানা করার জন্য অতি উত্তম। কাজেই রাতে যাচ্ছি। তাছাড়া স্ত্রীকে যেমন রাতে পোষ মানাতে হয়, গাড়িকেও তেমনি রাতে পোষ মানাতে হয়।’সন্ধ্যা মিলাবার পর আমরা রওনা হলাম। গ্যাস স্টেশনে গ্যাস নেবার জন্যে গাড়ি দাঁড়াল। আবদাল নেমে গেল, গ্যাস নিল, দু’-একটা টুকিটাকি জিনিস কিনবে। আবদালের স্ত্রী রোওজি আমার দিকে তাকিয়ে পরিক্ষার ইংরেজিতে বলল, ভাইজান, আমি কি আপনার সঙ্গে দুটা কথা বলার অনুমতি পেতে পারি? আমি মেয়েটির চমৎকার ইংরেজি শুনে যেমন মুগ্ধ হলাম, তেমনি মুগ্ধ হলাম তার রূপ দেখে। মালয়েশিয়ানদের চামড়া আমাদের মত শ্যামলা। এই মেয়েটির গায়ের রং দুধে-আলতায় মেশানো। মিশরী মেয়েদের মত টানা-টানা চোখ, লম্বা চুল। লাল টকটকে কমলার কোয়ার মত ঠোঁট।আমি বললাম, বলুন কি বলবেন। আমি শুনছি।’আপনি যে আপনার স্ত্রী এবং কন্যাকে নিয়ে আমাদের সঙ্গে যাচ্ছেন এতে আমি খুব খুশি হয়েছি। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া। আপনি থাকায় আমি খুব ভরসা পাচ্ছি- আমার স্বামী খুব দ্রুত গাড়ি চালায়। আপনি একটু লক্ষ রাখবেন।”অবশ্যই লক্ষ রাখব।’তার চেয়েও বড় সমস্যা, রাতের বেলা হাইওয়েতে গাড়ি চালানোর সময় সে প্রায়ই স্টিয়ারিং হইল ধরে ঘুমিয়ে পড়ে।”সে কি।’জ্বি – অনেকবার বড় ধরনের অ্যাকসিডে হতে হতে বেঁচে গেছি।”আরো কিছু বলার আছে?’‘এখন বলব না। এখন বললে আপনি ভয় পাবেন। আল্লাহ আল্লাহ করে গ্রুপ শেষ করে ফিরে আসি, তারপর আপনাকে বলব।’সাউথ ডাকোটায় অনেক দেখার জিনিস আছে। টুরিস্টরা প্রথমে দেখে পাথরের গায়ে খোদাই করা চার প্রেসিডেন্টের মাথা। দল নিয়ে দেখতে গেলাম। আবদাল ভুরু কুঁচকে বলল, এর মধ্যে দেখার কি আছে বুঝলাম না। হাতুড়ি বাটাল দিয়ে

পৃষ্ঠা:২২

পাহাড়গুলি নষ্ট করেছে। এখানে দাঁড়িয়ে থেকে সময় নষ্ট করার কোন মানে হয়?রোওজি বলল, আমার কাছে তো খুব সুন্দর লাগছে।আবদাল বলল, তোমার কাছে তো সুন্দর লাগবেই। তুমি হলে বুদ্ধিহীনা নারী। বুদ্ধিহীনা নারী যা দেখে তাতেই মুগ্ধ হয়।আমি রোওজিকে অপমানের হাত থেকে বাঁচাবার জন্য বললাম, আমি বুদ্ধিহীনা নারী নই কিন্তু আমার কাছেও ভাল লাগছে।’ভাল লাগলে ভাল। তোমরা থাক এখানে, আমি দেখি কোন পাব-টাব পাওয়া যায় কিনা। কয়েকটা বিয়ার না খেলে চলছে না।’আবদাল বিয়ারের খোঁজে চলে গেল।আমরা অনেক ছবি-টবি তুললাম। খাঁটি টুরিস্টের মত ঘুরলাম। তারপর আবদালের খোঁজে গিয়ে দেখি সে পাঁড় মাতাল। টেবিল থেকে মাথা ভুলতে পারছে না এমন অবস্থা। আমাকে দেখেই হাসিমুখে বলল, খবর সব ভাল?আমি বললাম, ভাল। তোমার এ কী অবস্থা।কোন চিন্তা করবে না। মাতাল অবস্থায় আমি সবচেয়ে ভাল গাড়ি চালাই। চল, রওনা হওয়া যাক।’এখনি রওনা হওয়া যাবে না। আরো অনেক কিছু দেখার আছে। তাছাড়া তোমারও মনে হয় বিশ্রাম দরকার।”আমার কোনই বিশ্রাম দরকার নেই এবং এখানে দেখারও বিছু নেই।”স্ফটিক গুহার খুব নাম শুনেছি। না দেখে গেলে আফসোস থাকবে।’আবদাল বলল, গুহা দেখার কোন দরকার নেই। গুহা জন্তু-জানোয়ারদের জন্যে। মানুষের জন্যে না।তাকে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে স্ফটিক গুহা দেখাতে নিয়ে গেলাম। সারা পৃথিবীতে সন্তুরটির মত স্ফটিক গৃহা আছে। সেইসত্ত্বরটির মধ্যে যাটটিই পড়েছে সাউথ ডাকোটায়।পাঁচ ডলারের টিকিট কেটে আমরা স্ফটিক গুহায় ঢুকলাম। সে এক ভয়াবহ সৌন্দর্য। লক্ষ লক্ষ স্ফটিক ঝলমল করছে। প্রকৃতি যেন পাথরের ফুল ফুটিয়েছে। বিস্ময়ে হতবাক হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই।রোওজি মুগ্ধকণ্ঠে বলল, আহ, কি সুন্দর।আবদাল বলল, ন্যাকামি করবে না। তোমার ন্যাকামি অসহ্য। পাথর আগে দেখনি? পাথর দেখে আহ কি সুন্দরবলে নেচে ওঠার কি আছে? ন্যাকামি না করলে ভাল লাগে না?বোওজির মনটা খারাপ হল। আমারো মন খারাপ হল। এদের সঙ্গে না এলেই

পৃষ্ঠা:২৩

ভাল হত। কিছুক্ষণ পরপর একটি মেয়ে অকারণে অপমানিত হচ্ছে, এই দৃশ্য সহ্য করাও মুশকিল।মেয়েটি মনে হচ্ছে স্বামীর ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। খানিকক্ষণ মন খারাপ করে থাকে। তারপর আবার আনন্দে ঝলমল করে ওঠে। গৃহা থেকে বেরুবার পর গুহার কেয়ারটেকার বলল, কেমন দেখলে?আমি বললাম, অপূর্ব।আবদাল বলল, বোগাস। পাথর দেখিয়ে ডলার রোজগার। শাস্তি হওয়া উচিত। কেয়ারটেকার বলল, স্ফটিক গুহা তোমাকে মুগ্ধ করতে পারেনি। এখান থেকে দশ কিলোমিটার দূরে আছে পেট্রিফায়েড ফরেস্ট। পুরো অরণ্য পাথর হয়ে গেছে। এটি দেখ।আবদাল বলল, আমি আর দেখাদেখির মধ্যে নেই।তাকে ছেড়ে গেলে সে আবার কোন একটা পাক-এ ঢুকে পড়বে। আমাদের আর বাড়ি ফেরা হবে না। কাজেই জোর করেই তাকে ধরে নিয়ে গেলাম। দেখলাম পেটিফায়েড ফরেন্ট। অবিশ্বাস্য ব্যাপার। গাছপালা, পোকামাকড় সবই পাথর হয়ে গেছে। এমন অস্বাভাবিক ব্যাপার যে প্রকৃতিতে ঘটতে পারে তা-ই আমার মাথায় ছিল না। আমি আবদালকে বললাম, কেমন দেখলে?সে বলল, দূর, দূর।পের্টিফায়েড ফরেস্টে ছোট একটা দোকানের মত আছে। সেখানে স্যুভেনির বিক্রি হচ্ছে। পাথর হওয়া পোকা, পাথর হওয়া গাছের পাতা। কোনটার দাম ঝুড়ি ডলার, কোনটির পঁচিশ।রোগুজি ক্ষীণস্বরে তার স্বামীকে বলল, সে একটা পোকা কিনতে চায়। তার খুব শখ।আবদাল চোখ লাল করে বলল, খবদার, এই কথা দ্বিতীয়বার বলবে না। পোকা কিনবে কুড়ি ডলার দিয়ে? ডলার খরচ করে কিনতে হবে পোকা?‘পাথরের পোকা।’পাথরেরই হোক আর কাঠেরই হোক। পোকা হল পোকা। ভুলেও কেনার নামমুখে আনবে না।”অদ্ভুত এই ব্যাপার কি তোমার কাছে মোটেও ভাল লাগছে না?”ভাল লাগার কি আছে? আমার বমি করে ফেলার ইচ্ছা হচ্ছে। তোমরা ঘুরে বেড়াও। আমি সুভ্যেনির দোকানে গিয়ে বসি। ওদের কাছে বিয়ার পাওয়া যায় কি- না কে জানে।’

পৃষ্ঠা:২৪

আমরা ঘন্টাখানিক ঘুরলাম। রোওজি বলল, চলুন ফেরা যাক। ও আবার দেরি হলে রেগে যাবে।আবদাল রেখে টন হয়ে আছে। আমাকে দেখেই বলল, কুৎসিত একটা জায়গা। বিয়ার পাওয়া যায় না। চল তো আমার সঙ্গে, একটা পাব খুঁজে বের করি। ওরা এখানে থাকুক। আমি বললাম, না খেলে হয় না? আবদাল অবাক হয়ে বলল, বিয়ার না খেলে বাঁচব কিভাবে?অমি আবদালকে নিয়ে পাবের সন্ধানে বের হলাম। যাবার আগে সে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে কয়েকটা হুংকার দিল, খবর্দার, কিছু কিনবে না। পোকা-মাকড় বাসায়নিয়ে গেলে খুনোখুনি হয়ে যাবে। চুলের মুঠি ধবে গেট আউট করে দেব।পাবে দু’জন মুখোমুখি বসলাম।আবদাল বলল, আমি তোমাকে আলাদা নিয়ে এসেছি একটা গোপন কথা বলার জন্যে।’গোপন কথাটা কি?”‘রোওজির জন্যে কিছু পাথরের পোকা-মাকড় কিনেছি। আমি সেসব তাকে দিতে পারি না। তুমি দেবে। তুমি বলবে যে, তুমি কিনে উপহার দিচ্ছ।’আমি তাকিয়ে আছি। ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না।আবদাল বলল, আমি আমার স্ত্রীকে পাগলের মত ভালবাসি। কিন্তু ব্যাপারটা তাকে জানতে দিতে চাই না। জানলেই লাই পেয়ে যাবে। এই কারণেই তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করি।’মেয়েটা যে কত ভাল তা তুমি দূর থেকে বুঝতে পারবে না।”তুমি লোকটাও মন্দ না।”আমি অতি মদ। ইবলিশ শয়তানের কাছাকাছি। সেটা কোন ব্যাপার না। দুনিয়াতে ভাল মন্দ দু’ধরনের মানুষই থাকে। থাকে না?””হ্যা, থাকে।”এখন তুমি কি আমার শত্রীকে এইসব পোকা-মাকড়গুলি উপহার হিসেবে দেবে?”‘তুমি চাইলে অবশ্যই দেব। কিন্তু আমার ধারণা, তোমার স্ত্রী সঙ্গে সঙ্গে বুঝে ফেলবে- এইসব উপহার আসলে তোমারই কেনা।”না, বুঝতে পারবে না। আমি আমার ভালবাসা সব সময় আড়াল করে রেখেছি। ওর ধারণা হয়ে গেছে, ওকে আমি দুচক্ষে দেখতে পারি না।’

পৃষ্ঠা:২৫

‘এতে লাভটা কি হচ্ছে আমি কিন্তু বুঝতে পারছি না।’লাভটা বলি- কোন একদিন রোওজি হঠাৎ করে সবকিছু বুঝতে পারবে – বুঝতে পারবে আমার সবই ছিল ভান। তখন কি গভীর আনন্দই না পাবে। আমি সেই বিনটির জন্যে অপেক্ষা করছি।’আবদাল বিয়ারের অর্ডার দিয়েছে। দু’ জগ ভর্তি বিয়ার। নিমিষের মধ্যে একটা জগ শেষ করে সে বলল, জিনিসটা ফন্দ না।আমরা আবার পেট্রিফায়েড ফরেস্টে ফিরে গেলাম। রোওজি ক্ষীণস্বরে তার স্বামীকে বলল, সে ছোট একটা গোবরে পোকা কিনতে চায়। কি সুন্দর জিনিস। আবদাল চোখ লাল করে বলল, আবার। আবার ন্যাকামি ধরনের কথা?আমরা প্রস্তরীভূত অরণ্য দেখে ফিরে যাচ্ছি। আবদাল ঝড়ের গতিতে গাড়ি চালাচ্ছে। মাতাল অবস্থায় সে আসলেই ভাল গাড়ি চালায়। পেছনের সীটে বিষণ্ন মুখে রোওজি বসে আছে। কারণ গাড়িতে উঠার সময় সে আবদালের কাছ থেকে একটা কঠিন ধমক খেয়েছে।

পৃষ্ঠা:২৬

উৎসব

ঈদের আগের দিন বিকেলে আমাদের বাসায় একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেলো। বেশ বড় রকমের দুর্ঘটনা। আমার মেয়ের ঈদের জামাটা তার এক বান্ধবী দেখে ফেললো। দেখার কোন সম্ভাবনা ছিলো না। বাক্সে তালাবন্ধ করে একটা কাগজের প্যাকেটে মুড়ে রাখা হয়েছিলো। কপাল খারাপ থাকলে যা হয় বোতাম লাগাবার অন্যে জামা বের করা হয়েছে ওমনি বান্ধবী এসে হাজির। আমার মেয়ে প্রাণপণ চেষ্টা করেও তার জামা লুকাতে পারলো না। সে আকাশ ফাটিয়ে কাঁদতে লাগলো- জামা পুরানো হয়ে গেছে। জামা পুরানো হয়ে গেছে।সবকিছুই পুরানো করা চলে। ঈদের জামা জুতো তো পুরানো করা চলে না। জুতোর প্যাকেটটি বুকের কাছে নিয়ে রাতে ঘুমুতে হয়। জামাটা খুব কম করে হলেও পাঁচবার ইস্ত্রি করতে হয়। এবং দিনের মধ্যে অন্তত তিনবার বাক্স খুলে দেখতে হয় সব ঠিক আছে কি না। কিন্তু অন। কেউ দেখে ফেললেই সর্বনাশ। ঈদের আনন্দের পনেরো আনাই মাটি।বান্ধবী জান্য দেখে ফেলেছে এই দুঃখে আমার মেয়ে যখন কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলিয়ে ফেললো, তখন বললাম, চল যাই আরেকটা কিনে দেব। রাত দর্শনিয় তাকে নিয়ে জামা কিনতে বেরুলাম। চারদিকে কি আনন্দ। কি উল্লাস। শিশুদের হাতে বেলুন। মায়েদের মুখভর্তি হাসি। হাতে কেনাকাটার ফর্দ। বাবারা সিগারেট ধরিয়ে গম্ভীর ভঙ্গিতে হাঁটছেন।আগে যেসব ছোট ছোট শিশু শুকনো মুখে পলিথিনের ব্যাগ বিক্রি করতো, তারা আজ খুব হাসছে। খুব বিক্রি হচ্ছে ব্যাগ। এক ভদ্রলোককে দেখলাম তিনটি ব্যাগ কিনলেন। তিন টাক দাম। তিনি একটা কচকচে পাঁচ টাকার নোট দিয়ে বললেন, যা দুটাকা তোর বকশিশ। ছেটি বাচ্চাটি পাঁচ টাকার নোটটি নিশানের মত এক হাতে উঁচু করে ধরে ছুটে চলে গেলো।

পৃষ্ঠা:২৭

আমার মনে হলো আজ রাতে কোথাও কোন দুঃখ নেই। আজ কোন স্বামী স্ত্রীর ভেতর ঝগড়া হবে না। প্রেমিকারা আজ সুন্দর সুন্দর চিঠি লিখবে ভুলে- যাওয়া প্রেমিকদের। একজন ভিখিরিও হয়ত তার বহুদিনের শখ মেটানোর জন্যে দেড় টাকা খরচ করে একটা ৫৫৫ সিগারেট কিনে ফেলবে। উড়ির চরে আজ রাতে কোন বৃষ্টি হবে না। শিশুদের আনন্দ আমাদের সব দুঃখ ঢেকে ফেলবে।বাস্তব অবশ্যই অন্যরকম। অনেক বাড়িতে অন্য সব রাতের মত আজ রাতেও হাঁড়ি চড়বে না। উপোসী ছেলেমেয়েরা মুখ কালো করে ঘুরঘুর করবে। যাদের বাড়িতে হাঁড়ি চড়বে, তাদের দুঃখও কি কম? হয়তো কারোর একটি ছোট ছেলে ছিল, আয়া সে নেই। সে তার বাবা মা’র কাছে নতুন শার্ট-প্যান্টের বায়না ধরেনি। ঘুমুতে যাবার সময় মাকে জড়িয়ে ধরে বলেনি, আম্মা, খুব ভোরে ডেকে দিও। আজ রাত ঐ পরিবারটির বড় দুঃখের রাত। বাবা-মা আজ রাতে তাদের আদরের খোকনের ছবি বের করবেন। শূন্য ঘরের চারদিকে তাকিয়ে দেখবেন। এখনো খোকনের ছোট্ট জুতো জোড়া সাজানো, তার ছোট্ট শার্ট, ছোট্ট প্যান্ট আলনায় ফুলছে। শুধু সে নেই। আগামীকাল ভোরে হৈ হৈ করে সে ঘর থেকে বেরুবে না। ঈদের নামাজ পড়লাম নিউ মার্কেটের মসজিদে। ফিববার পথে দেখিআজিমপুর কবরস্থানের গেট খুলে দেয়া হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ সেখানে। একজন বাবা তার তিনটি ছেলেমেয়ে নিয়ে কবরস্থানে এসেছেন। ছেলেমেয়েদের গায়ে ঝলমলে পোশাক। ওরা একটি কবরের পাশে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কবরটির উপরে একটি ময়লা কাগজ পড়ে ছিলো। বড় মেয়েটি সে কাগজটি তুলে ফেলে গভীর মমতায় কবরের গায়ে হাত রাখলো। বাবাকে দেখলাম রুমাল বের করে চোখ মুছছেন। এটি কার কবর? ব্যচ্চাগুলির মার? আজকের এই আনন্দের দিনে এই মা ফিনি রান্না করেননি। গভীর মমতায় শিশুদের নতুন জামা পরিয়ে দেননি। নতুন শাড়ি পরে তিনি আজ আর লজ্জিত ভঙ্গিতে স্বামীর পাশে এসে দাঁড়ায়ে বলেননি কি, তোমাকেও সালাম করতে হবে নাকি?আসলে আমাদের সবচে’ দুঃখের দিনগুলিই হচ্ছে উৎসবের দিন।”

পৃষ্ঠা:২৮

উমেশ

ঊমেশের সঙ্গে আমার পরিচয় নর্থ ডাকোটার ফার্গো সিটিতে। মাদ্রাজের ছেলে। বানরের মত চেহারা। স্বভাব-চরিত্রও বানরের মত সারক্ষণ তিড়িং বিড়িং করছে। গলা খাঁকারি দিয়ে থুথু ফেলছে। হাসেও বিচিত্রভঙ্গিতে খিক খিক, করে, থেমে থেমে শব্দ হয়, সমস্ত শরীর তখন বিশ্রীভাবে দুলতে থাকে।সে এসেছে জৈব রসায়নে M.S. ডিগ্রী নিতে। আমি তখন পড়াশোনার পাট শেষ করে ফেলেছি। একটা ইলেকট্রিক টাইপ রাইটার কিনেছি, দিন-রাত খটুখা শব্দে থিসিস টাইপ করি। একেএকটা চ্যাপ্টার লেখা শেষ হয়, আমি আমার প্রফেসরের কাছে নিয়ে যাই। তিনি পড়েন এবং হাসিমুখে বলেন, অতি চমৎকার হয়েছে। তুমি এই চ্যাপ্টারটা আবার লেখ।আমি হতাশ হয়ে বলি, অতি চমৎকার হলে নতুন করে লেখার দরকার কি? প্রফেসরের মুখের হাসি আরো বিস্তৃত হয়। তিনি বলেন, অতি চমৎকার তো শেষ কথা নয়। অতি চমৎকারের পরে আছে অতি অতি চমৎকার। আমি তার জন্যে অপেক্ষা করছি।আমি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে আবার লিখতে বসি। এই সময়ে উমেশের আবির্ভান হল মূর্তিমান উপদ্রবের মত। তার প্রধান কাজ হল ‘আবে ইয়ার’ বলে আমার ঘরে ঢুকে পড়া। এবং আমাকে বিরক্ত করা।আমেরিকায় সে পড়াশোনা করার জন্যে আসেনি। তার মূল উদ্দেশা সিটিজেনশীপ। অন্য কোনভাবে আমেরিকা আস্যর ভিসা পাওয়া যাচ্ছিল না বলেই সে স্টুডেন্ট ভিসায় এসেছে। এখন তার দরকার ‘সবুজপত্র’ বা গ্রীনকার্ড। ঐ বস্তু কি করে পাওয়া যায় সেই পরামর্শ করতেই সে আমার কাছে আসে।আমি প্রথম দিনেই তাকে বলে দিলাম, আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না। জানার আগ্রহও বোধ করিনি। আমি এসেছি পড়াশোনা করতে। ঐ পর্ব শেষ

পৃষ্ঠা:২৯

হয়েছে, এখন দেশে চলে যাব। উমেশ চোখ-মুখ কুঁচকে ‘আরে বুরবাকশব্দদু’টি দিয়ে একগাদা কথা বলল, যার কিছুই আমি বুঝলাম না। হিন্দী আমি বুঝতেপারি না। তাছাড়া উমেশ কথা বলে দ্রুত। তবে তার মূল বক্তব্য ধরতে অসুবিধা হলনা। মূল বক্তব্য হচ্ছে- হুমায়ূন, তুমি মহা বুরবাক। এমন সোনার দেশ ছেড়ে কেউযায়?কাজের সময় কেউ বিরক্ত করলে আমার অসহ্য বোধ হয়। এই কথা আমি উমেশকে বুঝিয়ে বললাম। সে বিস্মিত হয়ে বলল, আমি তো বিরক্ত করছি না। চুপচাপ বসে আছি। তুমি তোমার কাজ কর। সে চুপচাপ মোটেও বসে থাকে না। সারাক্ষণ তিড়িং-বিড়িজ করে। এই বসে আছে, এই লাফ দিয়ে উঠছে। তাছাড়া তার শিস দিয়ে গান গাওয়ার শখও আছে। সে শিস দিয়ে নানান ধরনের সুর তৈরির চেষ্টা করে। সেই সুরের তালে পা নিজেই মুগ্ধ হয়ে নাচায়।সব মানুষের জীবনেই কিছু উপগ্রহ জুটে যায়। উমেশ হল আমার উপগ্রহ। সে জৈব রসায়নের তিনটা কোর্স নিয়েছে। এর মধ্যে একটা ল্যাব কোর্স। কাজ করে আমার ঘরের ঠিক সামনের ঘরে। কাজ বলতে জিনিসপত্র নাড়াচাড়া করা, ধোয়াধুরি করা, তারপর আমার সামনে এসে বসে থাকা। পা নাচানো এবং শিস দেয়া। আমি তাকে বললাম, কোর্স যখন নিয়েছ মন দিয়ে কোর্সগুলি করা দরকার। তুমি তো সারাক্ষণ আমার সামনে বসেই থাক।সে হাসিমুখে বলল, M.S. ডিগ্রীর আমার কোন শখ নেই। আমার দরকার সিটিজেনশীপ। স্টুডেন্ট ভিসা যাতে বজায় থাকে এই জন্যেই কোর্স নিলাম। পড়াশোনা করে হবেটা কি ছাতা?আমি বললাম, অনেক কিছুই হবে। একটা আমেরিকান ডিগ্রী পেলে এ দেশে চাকরি পেতে তোমার সুবিধা হবে। চাকরি পেলে গ্রীনকার্ড পাবে।’আবে ইয়ার- সাচ বাত।’উমেশকে এই উপদেশ দেয়ার মূল কারণ অন্য। আমি চাচ্ছিলাম তাকে পড়াশ্বেনায় ব্যস্ত করে তুলতে, যাতে সে আমাকে মুক্তি দেয়। সিন্দাবাদের ভূতের মত সে কেন আমার উপর ভর করল কে জানে। এমন না যে, এই নর্থ ডাকোটায় আমিই একমাত্র কাল চামড়া। কাল চামড়া প্রচুর আছে। ভারতীয় ছাত্রই আছে দশ-বার অন। অনেকে পরিবার নিয়ে আছে। নর্থ ডাকোটা ইউনিভাসিটির ইন্ডিয়ান স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন বেশ বড় এসোসিয়েশন। তারা প্রতিমাসেই টিকিট কেটে হিন্দী ছবি দেখানোর ব্যবস্থা করে। দোল উৎসব হয়। এর বাড়ি, ওর বাড়ি পার্টি

পৃষ্ঠা:৩০

লেগে থাকে। উমেশ ওদের সঙ্গে থাকতে পারে। তা কেন সে থাকছে না? কেন চেপে আছে আমার কাঁধে?যে কোন কারণেই হোক তার ধারণা হয়েছে, এই বিদেশে আমিই তাব সবচে’ নিকটজন। কাজেই আমার সময় নষ্ট করার পূর্ণ অধিকার তার আছে। একদিন না পেরে তাকে কফিশপে নিয়ে কফি খাওয়ালাম এবং শীতল গলায় বললাম, উমেশ, একটা কথা শুনলে তোমার হয়ত খারাপ লাগবে, তবু কথাটা তোমাকে বলা দরকার।’বল।”আমি তোমাকে খুবই অপছন্দ করি।’উমেশ বলল, কেন, আমার চেহারা খারাপ বলে?আমি কি বলব বুঝতে পারলাম না। উমেশ বলল, আমার চেহারা খুব খারাপ তা আমি জানি। স্কুলে আমার নাম ছিল ‘ছোটে হনুমান’। কিন্তু চেহারা তো বন্ধুত্বের অন্তরায় হতে পারে না। ভুল বলেছি?’না, ভুল বলনি।”আমি তোমাকে খুব বিরক্ত করি তা আমি আনি। কি করব বল, আমার ভাল লাগে না। ল্যাবে কাজ করতে ভাল লাগে না। পড়াশোনা করতে ভাল লাগে না।”আমার সামনে বসে শিস দিয়ে গান গাইতে ভাল লাগে?”শোন উমেশ। আমি একা একা কাজ করতে পছন্দ করি। তুমি যে আমার সামনে বসে থাক, এতেআমার কাজ করতে অসুবিধা হয়।”ও আচ্ছা।”আমাকে থিসিস লেখার কাজটা দ্রুত শেষ করতে হবে।”আচ্ছা।”তুমি যদি আর আমাকে বিরক্ত না কর তাহলে ভাল হয়।’উমেশ কফির মগ হাত দিয়ে সরিয়ে উঠে চলে গেল। একবার ফিরেও তাকালো না। আমার খানিকটা খারাপ লাগলেও মুক্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। আসলেই মুক্তি পেয়েছি কি না সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত হতে পারছিলাম না।মুক্তি পেলাম। উমেশ আর আমার ঘরে আসে না। তার সঙ্গে দেখা হলে সে চোখ ফিরিয়ে নেয়। আমার সামনের ল্যাবে সে রোজই আসে। একা একা কাজ করে। করিডোরে দাঁড়িয়ে উদাস মুখে সিগারেট খায়। আমার সাড়া পেলে চট করে ল্যাবে ঢুকে যায়। মাঝে মাঝে আমার মনে হয় এতটা কঠিন না হলেও পারতাম।

পৃষ্ঠা ৩১ থেকে ৪০

পৃষ্ঠা:৩১

মাসখানিক পরের কথা। নিজের ঘরে বসে কাজ করছি। হঠাৎ ফায়ার অ্যালার্ম বেজে উঠল। আমি বিচলিত হলাম না। এখানে কিছুদিন পরপর ফায়ার ড্রিল হয়। অ্যালার্ম বেজে উঠে। তখন ছুটে ঘর থেকে বের হয়ে মাঠে দাঁড়াতে হয়। ফায়ার মার্শাল আসেন পরীক্ষা করে দেখেন জরুরি অবস্থায় সব ঠিকঠাক থাকবে কি- না। আজও নিশ্চয়ই তেমন কিছু হচ্ছে। আমি বিরক্ত মুখে ঘর থেকে বের হলাম। অকারণে খোলামাঠে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। প্রচণ্ড শীতে মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা কোন সুখকর অভিজ্ঞতা নয়।করিডোরে এসে আমাকে থমকে দাঁড়াতে হল। কারণ আজকেরটা ফায়ার ড্রিল নয়। পালে বাথ পড়েছে। এবার সত্যি সত্যি আগুন লেগেছে। ধোঁয়ার কুণ্ডলি বের হচ্ছে উমেশের ল্যাব থেকে। সাদা ও কালো ধোঁয়ার জটিল মিশ্রণে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে উমেশ।আমি আতংকে জমে গেলাম। ল্যাবে আগুন মানেই ভয়াবহ ব্যাপার। প্রচুর দাহ্যবস্তুতে ল্যাব, থাকে ভর্তি। বোতলে ভরা থাকে ফসফরাস। জার ভর্তি তীব্র গাঢ়ত্বের এসিড। আছে নানান ধরনের অক্সিডাইজার। এরা মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে দেবে। ল্যাব অগ্নিকাণ্ড সব সময়ই ভয়াবহ হয়। প্রায়ই দেখা যায় এইসব ক্ষেত্রে শুধু লরব নয়, পুরো বিল্ডিং উড়ে যায়। আমি লক্ষ করলাম, আমেরিকান ছাত্র-ছাত্রী এবং শিক্ষকরা ছুটে বের হয়েযাচ্ছে। চারদিকে তীব্র আতংক। বিল্ডিং-এর বৈদ্যুতিক দরজা আপনা-আপনি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমার নিজেরও ইচ্ছা হল ছুটে বের হয়ে যাই। কিন্তু ল্যাবে উমেশ একা। সে গরুর মত বড় বড় চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি চিৎকার করে বললাম, দেখছ কি, বের হয়ে আস।উমেশ বিড়বিড় করে বলল, নড়তে পারছি না।উমেশের কি হয়েছে সঙ্গে সঙ্গে বুঝলাম। তীব্র আতংকে রিমরাস মটিসের মত হয়। শরীরের সমস্ত মাংসপেশী শক্ত হয়ে ফয়। মানুষের নড়াচড়ার ক্ষমতা থাকে না।আমি চিরকালের ভীতু মানুষ। কিন্তু সেদিন অসীম সাহসের কিংবা অসীম বোকামির পরিচয় দিয়ে ল্যাবে ঢুকে পড়লাম। প্রথম চেষ্টা করলাম উমেশকে টেনে বের করতে। পারলাম না তার শরীর পাথরের মত ভারি। উমেশ বলল, তুমিথেকো না। তুমি বের হও। এক্ষুনি এক্সপ্লোশন হবে। প্রাণী হিসেবে মানুষের অবস্থান আসলেই অনেক উপরে। আমি এই অসহায় ছেলেটিকে একা ফেলে রেখে বের হতে পারলাম না। আমার বুকের ভেতর থেকে কেউ একজন বলল, না, তা তুমি পার না। অথচ বাসায় আমার স্ত্রী আছে। ছোট

পৃষ্ঠা:৩২

ছোট দু’টি মেয়ে নোভা, শীলা। ছোট মেয়েটি সবে কথা শিখেছে। তাদের কথা মনে পড়ল না। প্রচণ্ড বিপদে আল্লাহকে ডাকতে হয়। সুরা পড়তে হয়। আমার কোন সুরা মনে পড়ছে না।বিল্ডিং-এর ইলেকট্রিক লাইন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। পুরো বিল্ডিং অন্ধকার। আগুনের হলকায় অস্পষ্টভাবে সবকিছু চোখে আসছে। আমি চলে গিয়েছি এক ধরনের ঘোরের মধ্যে। হুস করে বড় একটা আগুন ধরল। তাব আলোয়চোখে পড়ল, দেয়ালে বিরাট একটা কেমিক্যাল ফায়ার এক্সটিংগুইসার। সাধারণত ল্যাবেরআগুনে এদের ব্যবহার করতে হয়। কিভাবে এদের ব্যবহার করতে হয় তাও জানিনা। গায়ে বড় বড় অক্ষরে নির্দেশনামা আছে। চেষ্টা করা যাক। আমি ছুটে গেলামফায়ার এক্সটিংগুইসারের দিকে। নির্দেশ নাম্বার ওয়ান বড় লিভারটি টেনে নিচেনামাও। কোনটি বড় লিভার? দু’টিই তো এক রকম লাগছে। নির্দেশ নাম্বার দুই-ছোট লিভারটির কাউন্টার ক্লক ঘুরাও। কাউটার ক্লক মানে কি? ঘড়ির কাঁটারউল্টো দিক? ঘড়ির কাঁটা কোনদিকে ঘুরে? আশ্চর্যের ব্যাপার, ফায়ার এক্সটিংগুইসার চালু করতে পারলাম। এই অদ্ভুত যন্ত্রটি মুহূর্তের মধ্যে পুরো ল্যাব সুক্ষ্ম সাদা ফেনায় ঢেকে দিল। আমরা ডুবে গেলাম ফেনার ভেতর। আগুন নিভে গেল। তারো মিনিট দশেক পর ফায়ার সার্ভিসের মুখোশ পরা লোকজন আমাদের দুজনকে উদ্ধার করল। উমেশকে নিয়ে গেল হাসপাতালে। তার কথাও বন্ধ হয়ে গেছে। কথা বলতে পারছে না। জিহবাও শক্ত হয়ে গেছে।উমেশকে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছি। আমি ভেবেছিলাম, সে আমাকে দেখে আনন্দিত হবে। তা হল না। মুখ কালো করে বলল, তুমি কেন এসেছ? তুমি তো আমাকে দেখতে পার না। আমি শুধু তোমাকে বিরক্ত করি। তুমি চলে যাও।আমি হাসলাম।উমেশ হাসল না। চোখ বন্ধ করে পাশ ফিরল। সেআসলেই আমার সঙ্গে কথাবলতে চায় না। সে যে আমার ব্যবহারে কি রকম আহত হয়েছিল তাবুঝলাম যখন দেখলাম– তাকে আগুন থেকে উদ্ধারের মত ঘটনাতেও সে অভিভূত হয়নি। আমাকে দেখলে আগের মতই চোখ ফিরিয়ে হনহন করে হেঁটে চলে যায়। সে নর্থ ডাকোটা থেকে চলে গেল মুরহেড স্টেটে। যাবার আগের দিন আমাকে একটা খামবন্ধ চিঠি দেয়া হল। চিঠিটি তার লেখা না। তার বাবার লেখা। ভদ্রলোক লিখেছেন-

পৃষ্ঠা:৩৩

জনাব,আপনি আমার মা-হারা পুত্রের জীবন রক্ষা করেছেন। এর প্রতিদান আমার পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়। ঈশ্বর আপনাকে তার প্রতিদান দেবেন। ঈশ্বর কোন সৎকর্ম অবহেলা করেন না। উমেশ লিখেছে, আপনি তার জন্যে আপনার জীবন বিপন্ন করেছেন। আপনার থিসিসের কাগজপত্র আগুনে নষ্ট হয়েছে। আপনাকে আবার নতুন করে লিখতে হয়েছে। আমি নিজে একজন পাপী মানুষ। পাপী মানুষের প্রার্থনায় ফল হয় না, তবু আমি প্রতিদিন ঈশ্বরের কাছে আপনার জন্যে প্রার্থনা করি। যতদিন বাঁচব, করব। আপনি আমার ভক্তিপূর্ণ প্রণাম গ্রহণ করুন।আমেরিকার পর্ব শেষ করে দেশে ফিরছি। হেক্টর এয়ারপোর্টে অনেকেই আমাকে বিদায় দিতে এসেছে। হঠাৎ দেখি দূরে উমেশ দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখেই সে চোখ নামিয়ে নিল। দ্রুত চলে গেল ভেন্ডিং মেশিনের আড়ালে। আমি এগিয়ে গেলাম।উমেশ বলল, আমি তো তোমাকে বিদায় দিতে আসিনি। আমি যাব লস এঞ্জেলস। তার টিকিট কাটতে এসেছি।’ঠিক আছে। যাবার আগে তোমার সঙ্গে যেখা হল। খুব ভাল লাগছে। একদিন তোমার মনে কষ্ট দিয়েছি। তার জন্যে আমি ক্ষমা চাচ্ছি। প্লেনেওঠার আগে তোমার হাসিমুখ দেখে যেতে চাই।’উমেশ বলল, আমি তোমাকে মিথ্যা কথা বলেছি। আমি আসলে তোমাকে বিদায় দিতেই এসেছি।উমেশ আমাকে জড়িয়ে ধরল। সে ভেউ ভেউ করে কাঁদছে।প্লেনে ওঠার আগে সিকিউরিটি চেকিং-এ যাচ্ছি। বন্ধু-বান্ধবরা হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছে। রুমাল উড়াচ্ছে। শুধু উমেশ দু’হাতে তার মুখ ঢেকে আছে। ে তার কান্নায় বিকৃত মুখ কাউকে দেখাতে চাচ্ছে না।

পৃষ্ঠা:৩৪

সে

এরশাদ সাহেবের সময়কার কথা। সরকারি পর্যায়ে শিলাইদহে রবীন্দ্রজয়ন্তী হবে। আমার কাছে জানতে চাওয়া হল আমি সেই উৎসবে যোগ দেখ কি-না।আমি বললাম, রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে যে কোন নিমন্ত্রণে আমি আছি। এরশাদ সাহেবের উদ্যোগে অনুষ্ঠান হচ্ছে, হোক না, আমি কোন সমস্যা দেখছি না। রবীন্দ্রনাথকে ভালবাসার অধিকার সবারই আছে।যথাসময়ে শিলাইদহে উপস্থিত হলাম। কুঠিবাড়িতে পা দিয়ে গায়ে রোমাক হল। মনে হল পবিত্র তীর্থস্থানে এসেছি। এক ধরনের অস্বস্তিও হতে লাগল, মনে হল- এই যে নিজের মনে ঘুরে বেড়াচ্ছি, তা বোধহয় ঠিক হচ্ছে না। চারদিকে রবীন্দ্রনাথের পায়ের ফুলা ছড়িয়ে আছে। কবির কত স্মৃতি, কত আনন্দ-বেদনা মিশে আছে প্রতি ধূলিকণায়। সেই ধূলার উপর দিয়ে আমি হেঁটে যাব, তা কি হয়? এত স্পষা কি আমার মত অভাজনের থাকা উচিত?নিজের মনে ঘুরে বেড়াতে এত ভাল লাগছে। কুঠিবাড়ির একটা ঘরে দেখলাম কবির লেখার চেয়ার টেবিল। এই চেয়ারে বসেই কবি কত-না বিখ্যাত গল্প লিখেছেন। কুঠিবাড়ির দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে চোখে পড়ল কবির প্রিয় নদী প্রমত্তা পদ্মা। ১২৯৮ সনের এক ফাল্গুনে এই পদ্যার দুলুনি খেতে খেতে বজরায় আধশোয়া হয়ে বসে কবি লিখলেন,শ্রাবণ গগন ঘিরে ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে শূন্য নদীর তীরেরহিনু পড়ি যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।

পৃষ্ঠা:৩৫

একদিকে উৎসব হচ্ছে, গান, কবিতা আলোচনা, অন্যদিকে আমি ঘুরে বেড়াচ্ছি নিজের মনে। সন্ধ্যাবেলা কুঠিবাড়িতে গানের অনুষ্ঠানে আমি নিমন্ত্রিত অতিথি, উপস্থিত না থাকলে ভাল দেখায় না বলে প্যান্ডেলের নিচে গিয়ে বসেছি। শুরু হল বৃষ্টি, ভয়াবহ বৃষ্টি। সেই সঙ্গে দমকা বাতাস। বাতাসে সরকারি প্যান্ডেলের অর্ধেক উড়ে গেল। আমি রওনা হলাম পদ্মার দিকে। এমন ঝমঝমে বৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথও নিশ্চয়ই ভিজতেন। আমি যদি ন ভিজি তাহলে করিব প্রতি অসম্মান করা হবে।বৃষ্টিতে ভেজা আমার জন্য নতুন কিছু না। কিন্তু সেদিনকার বৃষ্টির পানি ছিল বরফের চেয়েও ঠাণ্ডা। আর হাওয়া? মনে হচ্ছে সাইবেরিয়া থেকে উড়ে আসছে। আমি ঠকঠক করে কাঁপছি। নব ধারা জলে স্নানের আনন্দ ঘুয়ে-মুছে গেছে। রেস্ট হাউসে ফিরে শুকনো কাপড় পরতে পারলে বাঁচি।কাপতে কাঁপতে ফিরছি। পদ্মা থেকে কুঠিবাড়ি অনেকটা দূর। কাঁচা রাস্তা। বৃষ্টির পানিতে সেই রাস্তা কাদা হয়ে গেছে। দ্রুত হাঁটা যাচ্ছে না। জায়গাটাও অন্ধকার। আধাআধি পথ এসে থমকে দাঁড়লাম। কে যেন রাস্তার পাশে গাছের নিচে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। চারদিক আলো করে বিদ্যুৎ চমকালো। আর তখনি আমার সারা শরীর দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল। আমি স্পষ্ট দেখলাম, গাছের নিচে যুবক বয়সের রবীন্দ্রনাথ দাঁড়িয়ে আছেন। এটা কি কোন মায়া? কোন সান্তি? বিচিত্র কোন হেলুসিনেশন? আমার চিন্তা-চেতনা জুড়ে রবীভনাথ ছিলেন বলেই তাঁকে দেখছি?আমি চিৎকার করতে যাচ্ছিলাম। তার আগেই ছায়ামূর্তি বলল, কে, হুমায়ন ভাই না?নিজেকে চট করে সামলে নিলাম। রবীন্দ্রনাথের প্রেতাত্মা নিশ্চয়ই আমাকে হুমায়ূন ভাই বলবে না। আমি ভৌতিক কিছু দেখছি না। এমন একজনকে দেখছি যে আমাকে চেনে, এবং যাকে অন্ধকারে খানিকটা রবীন্দ্রনাথের মত দেখায়। ছায়ামূর্তি বলল, হুমায়ূন ভাই, বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে কোথায় যাচ্ছেন?আমি বললাম, কুঠিবাড়ির দিকে যাচ্ছি। আমি কি আপনাকে চিনি? ‘জ্বি না, আপনি আমাকে চেনেন না। হুমায়ূন ভাই, আমি আপনার অনেক ছোট। আপনি আমাকে তুমি করে বলবেন।”তোমার নাম কি?”‘রবি।”ও আচ্ছা, রবি।’আমি আবার বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে গেলাম। নাম রবি মানে? হচ্ছেটা কি?

পৃষ্ঠা:৩৬

রবি বলল, চলুন, আমি আপনার সঙ্গে যাই।’চল।’ভিজতে ভিজতে আমরা কুঠিবাড়িতে উপস্থিত হলাম। ঝড়ের প্রথম কাপটায় ইলেকট্রিসিটি চলে গিয়েছিল, এখন আবার এসেছে। চারদিকে আলো ঝলমল করছে। আলোতে আমি আমার সঙ্গীকে দেখলাম, এবং আবারো চমকালাম। অবিকল যুবক বয়সের রবীক্তনাথ। আমি বললাম, তোমাকে দেখে যে আমি বারবার চমকাচ্ছি তা কি তুমি বুঝতে পারছ?’পারছি। আপনার মত অনেকেই চমকায়। তবে আপনি অনেক বেশি চমকাচ্ছেন।”তোমার নাম নিশ্চয়ই রবি না?”জ্বি না। যারা যারা আমাকে দেখে চমকায় তাদের আমি এই নাম বলি।”এসো, আমরা কোথাও বসে গল্প করি।”আপনি ভেজা কাপড় বদলাবেন না? আপনার তো ঠান্ডা লেগে যাবে।”লাগুক ঠান্ডা।’আমরা একটা বাঁধানো আমগাছের নিচে গিয়ে বসলাম। রবি উঠে গিয়ে কোথেকে এক চা-ওয়ালাকে ধরে নিয়ে এল। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। আমি আধভেজা সিগারেট ধরিয়ে টানছি। চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছি। সেই চা-ও বৃষ্টির পানির মতই ঠাণ্ডা। খুবই লৌকিক পরিবেশ। তারপরেও আমি লক্ষ্য করলাম,আমার বিস্ময়বোধ দূর হচ্ছে না।রবি হাসিমুখে বলল, হুমায়ুন ভাই। আমি শুনেছিলাম আপনি খুব সিরিয়াস ধরনের মানুষ। আপনি যে বাচ্চাদের মত বৃষ্টিতে ভিজে আনন্দ করেন তা ভাবিনি। আপনাকে দেখে আমার খুব মজা লেগেছে।আমি বললাম, তোমাকে দেখে শুরুতে আমার লেগেছিল ভয়। এখন লাগছে বিস্ময়।’আপনি এত বিস্মিত হচ্ছেন কেন। মানুষের চেহারার সঙ্গে মানুষের মিল থাকে না?”‘থাকে, এতটা থাকে না।’রবির সঙ্গে আমার আরো কিছুক্ষণ গল্প করার ইচ্ছা ছিল। সম্ভব হল না। সরকারি বাস কুষ্টিয়ার দিকে রওনা হচ্ছে। বাস দিস করলে সমসন। রবি আমার সঙ্গে এল না। সে আরো কিছুক্ষণ থাকবে। পরে রিকশা করে যাবে। তবে সে যে ক’দিন অনুষ্ঠান চলবে, রোজই আসবে। কাজেই তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ

পৃষ্ঠা:৩৭

রয়ে গেল।রাতে রেস্ট হাউসে ‘ফিরে আমার কেন জানি মনে হল পুরো ব্যাপারটাই মায়া। ছেলেটির সঙ্গে আর কখনোই আমার দেখা হবে না। রাতে ভাল ঘুমও হল না।আশ্চর্যের ব্যাপার। পরদিন সত্যি সত্যি ছেলেটির দেখা পেলাম না। অনেক খুঁজলাম। কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করলাম, দেখতে অবিকল ববীন্দ্রনাথের মত এমন একজনকে দেখেছেন?তারা সবাই আমার দিকে এমনভাবে তাকাল যেন আমি কিছুক্ষণ আগেই গাজা খেয়ে এসেছি। ঐ জিনিস তখন কুঠিবাড়ির আশেপাশে খাওয়া হচ্ছে। লালন শাহ-র কিছু অনুসারী এসেছেন। তাঁরা গাঁজার উপরই আছেন। উৎকট গন্ধে তাদের কাছে যাওয়া যায় না। তাঁদের একজন আমাকে হাত ইশারা করে কাছে ডেকে বলছেন, আচ্ছা স্যার, রবিঠাকুর যে লালন শাহ্-র গানের খাতা চুরি করে নবেল পেল এই বিষয়ে ভদ্রসমাজে কিছু আলোচনা করবেন। এটা অধীনের নিবেদন।তৃতীয় দিনেও যখন ছেলেটার দেখা পেলাম না, তখন নিশ্চিত হলাম, কড় বৃষ্টির রাতে যা দেখেছি তার সবটাই ভ্রান্তি। মধুর ভ্রান্তি। নানান ধরনের যুক্তিও আমার মনে আসতে লাগল। যেমন, আমি যখন জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কি কর?” সে অব্যব দেয়নি। আমার সঙ্গে সরকারি বাসে আসতেও রাজি হয়নি। নিজের আসলনামটিও বলেনি।অনুষ্ঠানের শেষ দিনে দেখি সে প্যান্ডেলের এক কোণায় চুপচাপ বসে আছে।আমি এগিয়ে গেলাম।’এই রবি, এই।’রবি হাসিমুখে তাকাল, এবং সঙ্গে সঙ্গে উঠে এল। আমি বললাম, এই ক’দিন আসনি কেন?’শরীরটা খারাপ করেছিল। ঐ দিন বৃষ্টিতে ভিজে ঠান্ডা লেগে গেল।’‘আজ শরীর কেমন।”‘আজ ভাল।”এই ক’দিন আমি তোমাকে খুব খুঁজেছি।”আমি অনুমান করেছি। আচ্ছা হুমায়ূন ভাই, দিনের আলোতেও কি আমাকে রবীন্দ্রনাথের মত লাগে?”‘হ্যা লাগে, বরং অনেক বেশি লাগে।’সে ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল, দেখুন মানুষের ভাগ্য। আমি শুধু দেখতে রবীন্দ্রনাথের মত এই কারণে আপনি কত অগ্রহ করে আমার সঙ্গে কথা বলছেন। ‘তার জন্য কি তোমার খারাপ লাগছে?”

পৃষ্ঠা:৩৮

‘না, খারাপ লাগছে না। ভাল লাগছে। খুব ভাল লাগছে। নিজেকে মিথ্যামিথ্যি রবীন্দ্রনাথ ভাবতেও আমার ভাল লাগে।”তুমি টিভিতে কখনো নাটক করেছ?”‘কেন বলুন তো?’তোমাকে আমি টিভি নাটকে ব্যবহার করতে চাই।”আমি কোনদিন নাটক করিনি কিন্তু আপনি বললে আমি খুব আগ্রহ নিয়ে করব। কি নাটক?’ ‘এই ধর, রবীওনাথকে নিয়ে নাটক। যৌবনের রবীন্দ্রনাথ। কুঠিবাড়িতে থাকেন। পদদ্মার তীবে হাঁটেন। গান লিখেন, গান করেন। এইসব নিয়ে ডকুমেন্টারি ধরনের নাটক।'”সত্যি লিখবেন?”‘হ্যা লিখব। একটা কাগজে তোমার ঠিকানা লিখে দাও।”ঠিকানা আপনি হারিয়ে ফেলবেন। আমি বরং আপনাকে খুঁজে বেরকরব।’ছুটির সময়ে মন সাধারণত তবল ও প্রবীভূত অবস্থায় থাকে। ছুটির সময়ে দেয়া প্রতিশ্রুতি পরে আর মনে থাকে না। আমার বেলায় সেরকম হল না। আমি ঢাকায় ফিরেই টিভির নওয়াজিশ আলি খান সাহেবের সঙ্গে দেখা করলাম। আমার পরিকল্পনার কথা বললাম। তিনি এক কথায় বাতিল করে দিলেন। তিনি বললেন, রবিঠাকুরকে সরাসরি দেখাতে গেলে অনেক সমস্যা হবে। সমালোচনা হবে। রবীন্দ্র-ভক্তরা বেগে যাবেন। বাদ দিন। আমার মনটাই খারাপ হয়ে গেল।মাস তিনেক পর ছেলেটার সঙ্গে আবার দেখা হল টিভি ভবনে। সে আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল নাটকটা লিখেছি কি-না। আমি সত্যি কথাটা তাকে কলতে। পারলাম না। তাকে বললাম, লিখব লিখব। তুমি তৈরি থাক।’আমি তৈরি আছি। আমি খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি।’চেহারাটা ঠিক রাগ, চেহারা যেন নষ্ট না হয়।’আমি টিভির আরো কিছু লোকজনের সঙ্গে কথা বললাম। কোন লাভ হল না। ছেলেটির সঙ্গে মাঝে মাকে দেখা হয়। আমি বলি হবে হবে, ধৈর্য ধর। এই মিথ্যা আশ্বাস যতবার দেই ততবারই খাব্যপ লাগে। মনে মনে বলি, কেন বারবার এর সঙ্গে দেখা হয়? আমি চাই না দেখা হোক। তারপরেও দেখা হয়।একদিন সে বলল, হুমায়ূন ভাই, আপনি কি একটু তাড়াতাড়ি নাটকটা লিখতে পারবেন?’কেন বল তো?”এমনি বললাম।’

পৃষ্ঠা:৩৯

‘হবে হবে, তাড়াতাড়িই হবে।’ তারপর অনেক দিন ছেলেটির সঙ্গে দেখা নেই। নাটকের ব্যাপারটাও প্রায় ভুলে গেছি। ব্যস্ত হয়ে পড়েছি অন্য কাজে। তখন ১৪০০ সাল নিয়ে খুব হৈচৈ শুরু হল। আমার মনে হল, এ-ই হচ্ছে সুযোগ। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নাটকটা লিখে ফেল যাক। নাটকের নাম হবে ১৪০০ সাল। প্রথম দৃশ্যে কবি একা একা পদ্মার পাড়ে হাঁটছেন, আবহ সংগীত হিসেবে কবির বিখ্যাত কবিতাটি (আজি হতে শতবর্ষ পরে …। পাঠ করা হবে। কবির মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাবে একঝাক পাখি। কবি আগ্রহ নিয়ে তাকাবেন পাখির দিকে, তারপর তাকাবেন আকাশের দিকে।দ্রুত লিখে ফেললাম। আমার ধারণা, খুব ভাল দাঁড়াল। নাটকটা পড়ে শুনালে টিভি-র যে কোন প্রযোজকই আগ্রহী হবেন বলে মনে হল। একদিন ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ করছি টিভি-র বরকতউল্লাহ সাহেবের সঙ্গে। পাশে আছেন জিয়া আনসার সাহেব। তিনি কথার মাঝখানে আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, রবিঠাকুরের ভূমিকায় আপনি যে ছেলেটিকে নেবার কথা ভাবছেন তাকে আমি চিনতে পারছি। গুড চয়েস।আমি বললাম, ছেলেটার চেহারা অবিকল রবিঠাকুরের মত না? “হ্যা। তবে ছেলেটিকে আপনি অভিনয়ের জন্যে পাবেন না।”কেন?”ওর লিউকোমিয়া ছিল। অনেক দিন থেকে ভুগছিল। বছরখানিক আগে মারা গেছে।’আমি অনেকক্ষণ কোন কথা বলতে পারলাম না। গভীর আনন্দ ও আগ্রহ নিয়ে ছেলেটা অপেক্ষা করছিল। তার সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল। সে কাউকে তা জানতে দেয়নি।বাসায় ফিরে নাটকের পান্ডুলিপি নষ্ট করে ফেললাম। এই নাটকটি আমি রবিঠাকুরের জন্যে লিখিনি। ছেলেটির জন্যে লিখেছিলাম। সে নেই, নাটকও নেই।

পৃষ্ঠা:৪০

নারিকেল-মামা

তাঁর আসল নাম আমার মনে নেই। আমরা ডাকতাম ‘নারকেল-মামা’। কারণ নারিকেল গাছে উঠে নারকেল পেড়ে আনার ব্যাপারে তাঁর অসাধারণ দক্ষতা ছিল। পায়ে দড়ি-টবি কিছু বাঁধতে হত না। নিমিষের মধ্যে তিনি উঠে যেতেন। নারকেল ছিঁড়তেন শুধু হাতে। তাঁর গাছে ওঠা, গাছ থেকে নামা, পুরো ব্যাপারটা ছিল দেখার মত। তাঁর নৈপুণ্য যে কোন পর্যায়ের তা দেখাবার জন্যেই একদিন আমাকে বললেন, এই পিঠে ওই। শক্ত কইরা গলা চাইপা ধর। আমি তাই করলাম। তিনি আমাকে নিয়ে তরতর করে নারকেল গাছের মগডালে উঠে দুই হাত ছেড়ে নানা কায়দা দেখাতে লাগলেন। অয়ে আমার রক্ত জমে গেল। খবর পেয়ে আমার নানাজান ছুটে এলেন। হুংকার দিয়ে বললেন, হারামজাদা, নেমে আয়। এই হচ্ছেন আমাদের নারিকেল-মানা। আত্মীয়তা-সম্পর্ক নেই। নানার বাড়ির সব ছেলেবাই যেমন মামা, ইনিও মামা। আমার নানার বাড়িতে কামলা খাটেন। নির্বোধ প্রকৃতির মানুষ। খুব গরম পড়লে মাথা খানিকটা এলোমেলো হয়ে যায়। কিংবা কে জানে মাথা হয়ত তাঁর সব সময়ই এলোমেলো। শুধু গরমের সময় অন্যরা তা বুঝতে পারে। নারিকেল-মামার মাথা এলোমেলো হবার প্রধান লক্ষণ হল হঠাৎ তাঁকে দেখা যাবে গোয়ালঘর থেকে দড়ি বের করে হনহন করে যাচ্ছেন। পথে কারো সঙ্গে দেখা হল, সে জিজ্ঞেস করল, কই যাস্? নারিকেল-যামা নির্বিকার ভঙ্গিতে বলবেন, ফাঁস নিব। উচা লম্বা একটা গাছ দেইখ্যা ঝুইল্যা পড়ব। প্রশ্নকর্তা তাতে বিশেষ বিচলিত হয় না। বিচলিত হবার তেমন কারণ নেই। এই দৃশ্য তার কাছে নতুন নয়। আগেও দেখেছে। একবার না, অনেকবার দেখেছে।

হোম
ই-শো
লাইভ টিভি
নামাজ শিক্ষা
গেইমস
চাকুরি