Skip to content

আয়েশা রা. সম্পর্কে ১৫০ টি শিক্ষণীয় ঘটনা

পৃষ্ঠা ০১ থেকে ১৫

পৃষ্ঠা:০১

১. আয়েশা-এর নাম ও বংশ পরিচয়

আয়েশা-এর পুরো নাম হচ্ছে, আয়েশা বিনতে আবু বকর ইবনে আবু কুহাফা (প্রকৃত নাম উসমান) ইবনে আমের ইবনে আমর ইবনে ওহাব ইবনে সা’দ ইবনে তাইম ইবেন মুররাহ ইবনে কাব ইবনে হুয়াই। তার বংশের নাম ছিল বনী তাইম, যা কুরাইশ বংশেরই একটি শাখা। আর তার মায়ের নাম ছিল, উম্মে রুমান বিনতে আমের ইবনে উমায়ের ইবনে আবদে শামস ইবনে আবদে মানাফ ইবনে আযিল্লাহ ইবনে সুবাই’ ইবনে হুহামান ইবনে হারেস ইবনে আবদ ইবনে মালেক ইবনে কিনান। আবার কেউ বলেন, উম্মে রুমানের অপর নাম হলো, যায়নাব। কাসেম ইবনে মুহাম্মদ বলেন, উম্মে রুমান ছিলেন আবু বকর গুদ্র-এর স্ত্রী এবং আয়েশা -এর মাতা। যখন তাকে কবরে নামানো হয় তখন রাসূল বলেন, যে ব্যক্তি জান্নাতী কোনো হুরকে দেখে খুশী হতে চায়, সে যেন উম্মে রুমানকে দেখে নেয়। আয়েশা প্রশ্ন জন্মগ্রহণ করেন রাসূল-এর নবুওয়াত লাভের ৪ অথবা ৫ বছর পর।

২. কুনিয়াত

ইবনে হিব্বান বর্ণনা করেন। আয়েশা বলেন, যখন আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর জন্মগ্রহন করল তখন আমি তাকে নিয়ে রাসূল এর কাছে আসলাম। অতঃপর তিনি তাকে খেজুর চিবিয়ে তার রস মুখে দিলেন। অর্থাৎ তাহনীক করলেন। আর এটা ছিল তার প্রথম খাবার, যা তার পেটে প্রবেশ করে। অতঃপর তিনি বলেন, এ হচ্ছে আব্দুল্লাহ। আর তুমি হলে উম্মে আবদুল্লাহ বা আব্দুল্লাহর মা। এরপর হতে আয়েশা পক্ষএর কুনিয়াত হিসেবে উম্মে আব্দুল্লাহ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। যদিও তার কোনো সন্তান ছিল না।

পৃষ্ঠা:০২
আবু বকর ইবনে আবু খাইছামা আয়েশা পুল্ল হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি রাসূল-কে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল। আমার সকল সাথিদের কুনিয়াত রয়েছে। সুতরাং আমার কি কোনো কুনিয়াত নেই? তখন তিনি বললেন, তোমার কুনিয়াত হচ্ছে তোমার ছেলে আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইরের নামে। এরপর হতে মৃত্যু পর্যন্ত তার কুনিয়াত হয়ে যায়, উম্মে আব্দুল্লাহ। কেউ কেউ বলেন, তার গর্ভ হতে আব্দুল্লাহ নামে রাসূল-এর একজন সন্তান জন্মগ্রহণ করেছিল, যে শৈশবেই মৃত্যুবরণ করেন। ফলে তাকে উম্মে আব্দুল্লাহ বলে ডাকা হতো। তবে এ বক্তব্য সঠিক নয়, যা অসংখ্য দলিলের ভিত্তিতে প্রমাণিত। তাছাড়া এ কথাটি আয়েশা -এর প্রথম বক্তব্যটির দ্বারাই বাতিল বলে গণ্য হয়।

৩.আয়েশা -এর অন্য আরেকটি নাম

ইমাম তিরমিযী (রহ.) তার শামায়েল গ্রন্থে ইবনে আব্বাস টুদ্র হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূল বলেন, আমার উম্মতের মধ্যে যার দুটি শিশু সন্তান মারা যাবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। তখন আয়েশা আপনার উম্মতের মধ্যে কারো একটি সন্তান মারা যায়? তখন রাসূল বলেন, যদি বলেন, হে মাওফিকা। একটি সন্তান মারা গেলেও আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। অতঃপর আয়েশা আবার জিজ্ঞেস করলেন, আর যদি কারো কোনো সন্তান মারা গিয়ে না থাকে? তখন রাসূল বললেন, নিশ্চয় আমি হলাম আমার উম্মতের মধ্যে একজন “ফারত”। আমার মতো আর হতে পারবে না। বিঃ দ্রঃ এখানে ৮১ (ফারত) বলতে যার একটি শিশু সন্তান মৃত্যুবরণ করেছে। সুতরাং فزعان )ফারতান) বলতে যার দুটি সন্তান মৃত্যুবরণ করেছে তাকে বুঝানো হয়েছে।

পৃষ্ঠা:০৩

8.আয়েশা-এর হিজরত

ইমান তাবারানী হালাল বললে আয়েশা ঊন্দ্র হতে বর্ণণ্য কয়েল। তিনি বলেন, আমরা হিজরত করছিলাম। অতঃপর যখন আমরা সু’বা উপত্যকা অতিক্রম করছিলাম, তখন উট আমাদের নিয়ে দৌড়াতে লাগল। এমতাবস্থায় আমি তার ওপর শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বসেছিলাম।

৫.আয়েশা-এর ফযীলত

ইবনে হিব্বান আয়েশা পুল্ল হতে বর্ণনা করেন। একদা নবী ফাতেমা সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন। তখন আমি মাঝখানে কথা বলে ফেললাম। তখন রাসূল আমাকে বললেন, তুমি দুনিয়াতে ও আখেরাতে আমার স্ত্রী হিসেবে থেকেও সন্তুষ্ট হবে না? ইবনে শাইবা মুসলিম ইবনে বুতাইন হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূল বলেছেন, আয়েশা জান্নাতেও আমার স্ত্রী। ইমাম তিরমিযী একটি সহীহ সনদে আব্দুল্লাহ ইবনে যিয়াদ আল আসাদী হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি আম্মার হতে শুনেছি যে, তিনি বলেন, তিনি (আয়েশা) হচ্ছেন দুনিয়া ও আখিরাতে রাসূল-এর স্ত্রী। ইবনে হিব্বান আয়েশা হতে আরো বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! জান্নাতে আপনার স্ত্রী হিসেবে কে থাকবে? তিনি বললেন, তুমি কি তাদের মধ্যে নও? আয়েশাল্লা বলেন, অতঃপর আমার খেয়াল হলো যে, রাসূল ﷺ তো আমাকে ছাড়া কুমারী অবস্থায় আর কাউকে বিবাহ করেননি। আবুল হাসান আল খাইলী আয়েশা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূল আমাকে বললেন, হে আয়েশা! নিশ্চয়ই তুমি মরণ পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। কেননা, আমি তোমাকে জান্নাতেও আমার স্ত্রী হিসেবে দেখতে পাব।

পৃষ্ঠা:০৪

৬.রাসূল-এর সবচেয়ে প্রিয় স্ত্রী

ইমাম তিরমিযী সহীহ সূত্রে আমর ইবনে গালেব থেকে কর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আম্মার টু এর সামনে আয়েশা সম্পর্কে সমালোচনা করতে লাগলেন। তখন তিনি বললেন, তুমি লাঞ্ছনা ও বন্ধুনার মধ্যে পতিত হও। তুমি কি রাসূল-এর সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে কষ্ট দিচ্ছ?

৭.রাসূল-এর নিকট সবচেয়ে প্রিয় ছিলেন আয়েশা

আমর ইবনে আসা বর্ণনা করেন। একদা রাসূল কে বলা হলো, আপনার নিকট সবচেয়ে প্রিয় মানুষ কে? তিনি বললেন, আয়েশা। অতঃপর বলা হলো, পুরুষদের মধ্যে কে? তিনি বললেন, তার পিতা অর্থাৎ আবু বকর ইমাম তাবারানী একটি হাসান সনদে আয়েশা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার নিকট সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি কে? তখন তিনি বললেন, কেন? আমি বললাম, যাতে করে আপনি যাকে ভালোবাসেন আমিও তাকে ভালোবাসতে পারি। তখন তিনি বললেন, আয়েশা। বর্ণিত আছে, আয়েশা -এর মৃত্যুর দিন কেউ বলল, আজ রাসূল-এর সবচেয়ে প্রিয় মানুষটি মৃত্যুবরণ করেছে। দারাকুতনী আয়েশা প্রশ্ন হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, একদা আমি রাসূল-কে বললাম, আপনি আমাকে কিরূপ ভালোবাসেন? তিনি বললেন, রশ্মির গিটের মতো। আমি বললাম, কিরূপ গিটের মতো। তখন তিনি বললেন, বিপরীতমুখী দুই গিটের বন্ধনের ন্যায়।

পৃষ্ঠা:০৫

৮.নবী-এর চোখের ঝাঁড়ফুঁক দানে আয়েশা

ইমাম মুসলিম আয়েশা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, একদা রাসূল (সা:) আমাকে তার চোখে ঝাঁড়ফুঁক দেয়ার জন্য আদেশ করেন। রাসূল সকল স্ত্রীদের কাছে পরিভ্রমণ করতেন এবং আয়েশা -এর মাধ্যমে শেষ করতেন। উমর আল মালা আয়েশা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, যখন রাসূল আসরের নামায আদায় করতেন, তখন প্রতিটি স্ত্রীর কাছে গমন করতেন এবং আমাকে দিয়ে শেষ করতেন। যখন তিনি আমার ঘরে প্রবেশ করতেন, তখন তিনি তার হাঁটু আমার রানের ওপর রাখতেন এবং তার হাত আমার কাঁধের ওপর রাখতেন। অতঃপর তিনি আমার প্রতি ঝুঁকে পড়তেন এবং আমিও তার প্রতি ঝুঁকে পড়তাম।

৯.নবী-এর প্রতি ভালোবাসার উৎসাহ প্রদান

আবু ইয়ালা এবং বাযযার একটি হাসান সূত্রে আয়েশা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, একদা ত্রে আমার ঘরে প্রবেশ করে দেখলেন যে, আমি কাঁদতেছি। তখন তিনি বললেন, কিসে তোমাকে কাঁদাল? আমি বললাম, ফাতেমা আমাকে গালি দিয়েছে। অতঃপর তিনি ফাতেমাকে ডাকলেন এবং বললেন, হে ফাতেমা। তুমি কি আয়েশাকে গালি দিয়েছ? ফাতেমা বলল, হ্যাঁ হে আল্লাহর রাসূল। তখন তিনি বললেন,  হে ফাতিমা! আমি যাকে ভালোবাসি তুমি কি তাকে ভালোবাস না? ফাতেমা বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, আমি যার ওপর রাগান্বিত হই তুমি কি তার ওপর রাগান্বিত হও না? ফাতেমা বলল, হ্যাঁ। তখন তিনি বললেন, আমি আয়েশাকে ভালোবাসি। সুতরাং তুমি আয়েশাকে ভালোবাস। অতঃপর ফাতেমা বলল, আমি আর কখনো আয়েশাকে এমন কথা বলব না, যার দ্বারা তিনি কষ্ট আয়শা।

পৃষ্ঠা:০৬

১০.আয়েশা-কে বিজয়ের প্রতি উৎসাহ দান

ইমাম নাসাঈ আয়েশা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, একদা না জেনে আমি বিনা অনুমতিতে যায়নাবের ঘরে প্রবেশ করে ফেলি। তখন তিনি আমার ওপর রাগান্বিত হয়ে রাসূল-কে বলেন, যখন আমি আপনাকে গ্রহণ করেছি, তখন আবু বকরের মেয়ে কোন অযুহাতে এখানে প্রবেশ করে? অতঃপর তিনি আমাকে চুম্বন করেন এবং তিনি মুখ ফিরিয়ে নেন। তখন রাসূল বলেন, তোমাকে ছাড়া আমি আর কাকে সাহায্য করব? অতঃপর তিনি তাকে চুম্বন করেন। তারপর আমি তার দিকে তাকিয়ে দেখলাম তার চেহারা লজ্জায় লাল হয়ে গেছে। ফলে সে আর কোনো প্রতিউত্তর করল না। তারপর আমি রাসূল-এর দিকে তাকিয়ে দেখলাম, তার চেহারা নুতন চাদের মতো উজ্জ্বল হয়ে আছে।

১১.আয়েশা-এর প্রতি অন্যান্য স্ত্রীদের ঈর্ষা

আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল এর স্ত্রীগণ ফাতেমাকে রাসূল (সা:)-এর নিকট প্রেরণ করলেন। অতঃপর তিনি রাসূল-এর নিকট অনুমতি চাইলেন। এমতাবস্থায় রাসূল ছিলেন। অতঃপর রাসূল আমার সাথে আমার চাদরে চিত হয়ে শুয়ে তাকে অনুমতি দিলেন। তারপর তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার স্ত্রীগণ আমাকে আপনার নিকট এ বিষয়ে প্রেরণ করেছেন যে, তারা আপনার নিকট আবু কুহাফার মেয়ের ব্যাপারে ইনসাফ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে এবং এরকম এরকম কথা বলেছে। তখন আমি চুপ থেকেছি। আয়েশা বলেন, তখন রাসূল তাকে বললেন, হে আমার মেয়ে! তুমি কি ভালোবাস না যা আমি ভালোবাসি। তখন তিনি বললেন, হ্যাঁ ভালোবাসি। রাসূল বললেন, তবে তুমি এটাই ভালোবেসে যাও।

পৃষ্ঠা:০৭

আয়েশা বলেন, যখন তিনি রাসল থেকে এসব কথা শুনলেন তখন তিনি দাড়িয়ে গেলেন এবং স্ত্রীদের কাছে ফিরে গেলেন। অতঃপর তিনি যা বললেন তা তাদেরকে জানিয়ে দিলেন এবং রাসূল তাদেরকে সংবাদ দিলেন। যা বললেন তাও অত:পর তারা তাকে বললেন, আমরা তোমাকে দেখি না যে, তুমি আমাদেরকে কোনো কিছুর অমুখাপেক্ষী করতে পারলে। সুতরাং তুমি রাসূল-এর নিকট আবার ফিরে যাও এবং বল, নিশ্চয় আপনার স্ত্রীগণ আবু কুহাফার মেয়ের ব্যাপারে আপনার নিকট ইনসাফ চায়। তখন ফাতেমা শুল্লা বললেন, আমি আর এ কথাগুলো বলতে পারব না। আয়েশা বলেন, তারপর নবী-এর স্ত্রীগণ যায়নাব বিনতে জাহাশ কে প্রেরণ করলেন। অতঃপর তিনি রাসূল-এর কাছে প্রবেশের জন্য অনুমতি চাইলে। এমতাবস্থায় রাসূল অবস্থায় ফাতেমা আয়েশার সাথে একই চাদরে শুয়ে ছিলেন, যে তাকে পেয়েছিলেন। অতঃপর রাসূল তাকে প্রবেশের অনুমতি দিলেন। অতঃপর যায়নাব বিনতে জাহাশ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার স্ত্রীগণ আমাকে আপনার নিকট এ বিষয়ে প্রেরণ করেছেন যে, তারা আপনার নিকট আবু কুহাফার মেয়ের ব্যাপারে ইনসাফ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে। নবী বললেন, শুন সে তো আবু বকরের মেয়ে।

১২.আয়েশা-এর ঘরে হাদীয়া প্রেরণ

ইবনু আবী খাইসামা বর্ণনা করেন- রমিসা বিনতে হারেস হতে বর্ণিত, নবী-এর বিবিগণ উন্মু সালামা -কে বললেন, আপনি রাসূল-কে বলুন, মানুষেরা আয়েশা শুল্ল-এর পালার সময় বেশি বেশি হাদীয়া পাঠায়। রাসূল লোকদের যেন বলে দেন, সবার পালার সময় যেন হাদীয়া পাঠায়। কেননা, আয়েশা (রা:) যেমন কল্যাণ পছন্দ করেন আমরাও নিশ্চয় তেমন কল্যাণ পছন্দ করি। উন্মু সালামা যখন রাসূল-এর নিকট এসে কথাগুলো বললেন, রাসূল তখন মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তার নিকট এসে জিজ্ঞাসা করল যে, রাসূলকি

পৃষ্ঠা:০৮

বলেছেন? উন্মু সালামা বলেন, রাসূল মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তারা সকলে উম্মে সালামাকে বলল আবার যেয়ে বলো। উম্মে সালামা পুনরায় সেই কথাগুলো বললে রাসূল তাকে বললেন হে উম্মে সালামা আয়েশার ব্যাপারে আমাকে কষ্ট দিবে না। আল্লাহ আয়েশার লেপের নিচে ছাড়া তোমাদের কারো নিকটেই ওহি অবতীর্ণ করেননি। আবু আমর ইবনু সিমাক বর্ণনা করেন: আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এ বিষয়ে স্বতন্ত্রের জন্য অন্যান্য স্ত্রীদের নিকট গর্ব করতাম। একমাত্র আমাকে কুমারী বিবাহ করেন, আমার ঘর ছাড়া অন্য কারো ঘরে কুরআন অবতীর্ণ হয়নি। পবিত্র কুরআনে আমার পবিত্রতা ঘোষণা করা হয়েছে।

১৩.আয়েশা-এর জন্য নবীর দু’আ

ইমাম তাবরানী বাসার ইবনু হিব্বান (রহ) নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণনা করেন, আয়েশা (রা:) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল-কে প্রফুল্ল দেখলাম এবং বললাম, হে আল্লাহর রাসূল-আপনি আল্লাহর কাছে আমার জন্য দোআ করুন। তিনি বলেন, হে আল্লাহ! আয়েশার আগের ও পরের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য গুনাহ ক্ষমা করে দিন। দু’আ শুনে আয়েশা পড়ে গেল। তখন রাসূল আয়েশা হেসে দিলেন। এমন হাসলেন যে, বালিশ থেকে মাথা বললেন, আমার দু’আ তোমাকে আনন্দিত করেছে? বলেন, কি বলেন, আপনার দু’আ আমাকে আনন্দিত করবে না? নবী বললেন, আল্লাহর শপথ এ দু’আ আমি প্রত্যেক নামাযে আমি আমার উম্মতের জন্য করি।

পৃষ্ঠা:০৯

১৪.নবী রোযা অবস্থায় চুম্বন

নবী তাঁর স্ত্রীরদেরকে আনন্দ দানের জন্য বিভিন্ন সময় চুম্বন করেছেন। এমনঘটনা বহুবার অনেক স্ত্রীর ক্ষেত্রেই ঘটেছে। কিন্তু আয়েশা বলেন, রাসূল রোযা অবস্থায়ও আমাকে চুম্বন করেন।

১৫.কার প্রতি তুমি সন্তুষ্ট?

ইবনু আসাকীর (রহ) আয়েশা পুল্লহতে বর্ণনা করেন,। তিনি বলেন, আমার ও রাসূল -এর মাঝে কোনো বিষয়ে কথা কাটা-কাটি হয়। নবী আয়েশাকে বললেন, আমার ও তোমার মাঝে ফয়সালার জন্য কাকে ডাকবো। কার প্রতি তুমি সস্তুষ্ট? তুমি কী উমরের ফয়সালা মানবে? আয়েশা বলেন, না ওমর রূঢ় হৃদয়ের অধিকারী। নবী বললেন, তোমার ও আমার মাঝে ফায়সালার জন্য তোমার বাবাকে পছন্দ কর? আয়েশা বললেন, হ্যাঁ, রাসূল (সা:) লোক পাঠিয়ে তাকে ডেকে আনলেন। আবু বকর দ্রে আসলে রাসূল তাকে বললেন, দেখুন সে এগুলো ঘটিয়েছে। আয়েশা করুন সত্য ব্যতীত বাড়িয়ে বলবেন না। বলেন, আমি বললাম, আল্লাহকে ভয় এ কথা শুনে আবু বকর টুল্ল আমার নাক ভেঙ্গে দেয়ার জন্য হাত উঠালেন এবং বললেন, হে উম্মে রুমানের মেয়ে; বরং তুমি সত্য বল এবং তোমার বাবা সত্য বলুক। আর রাসূল-এর ব্যাপারে এরূপ বলবে না। তবে তিনি আমার কথা কেড়ে নিলেন। মনে হলো তারা দুজন একপক্ষ হয়ে গেলেন। তখন রাসুল (সা:) বললেন, (আবু বকর) তোমাকে এজন্য ডেকে আনিনি। আয়েশা বলেন, আবু বকর (রা:) দাঁড়িয়ে ঘরের মধ্য হতে একটি খেজুরের ডাল নিয়ে আমাকে মারতে লাগলেন আর আমি তার কাছ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য রাসূল-এর

পৃষ্ঠা:১০

শরীর ঘেষে দাঁড়ালাম। রাসূল বলেন, আবু বকর। তুমি কি জন্য বের হয়ে যাচ্ছ না নিশ্চয় আমি তোমাকে এজন্য ডাকিনি। যখন আবু বকর টুল্ল বের হয়ে গেলেন তখন আমিও রাসূল ﷺ এর নিকট হতে সরে যেতে লাগলাম। রাসূল তাকে ডাক। আমি তাকে ডাকতে অস্বীকার করলাম। তখন রাসূল বললেন, মুচকি হেসে বললেন, (কিছুক্ষণ) আগেই তো (মার থেকে বাঁচার জন্য) আমার পিঠের সাথে লেগে ছিলে। ইমাম মুসলিম, নাসায়ী এবং দারাকুতনী (রহ) বর্ণনা করেন, আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল আমাকে বলেন: তুমি কখন রাগান্বিত থাক আর কখন স্বাভাবিক থাক তা আমি জানি। আমি বললাম, আপনি কিভাবে জানেন। তিনি বলেন, যখন তুমি সন্তুষ্ট (স্বাভাবিক) থাক তখন বল: মুহাম্মদের প্রভুর কসম আর যখন আমার ওপর রাগান্বিত থাক তখন বল: ইব্রাহীমের প্রভুর কসম। আমি বললাম, আপনি ঠিকই বলেছেন। এর পর থেকে আপনার নাম আর ত্যাগ করবো না।

১৬.আয়েশার সাথে রাসূল-এর দৌড় প্রতিযোগিতা

ইবনু আবী শায়বা, আবু দাউদ নাসায়ী প্রমুখ সহীহ সনদে আয়েশা (রা:) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি কোনো এক সফরে রাসূল-এর সাথে ছিলেন। রাসুল তাকে বললেন, আস আমরা দৌড় প্রতিযোগিতা করি। এতে আমি তাঁর অগ্রগামী হই। এর পরবর্তীতে আবার দৌড় প্রতিযোগিতা দেই তখন আমি একটু মোটা হয়েছিলাম। এবার রাসূল অগ্রগামী হয়ে বললেন, হে আয়েশা! এটা ঐ বারের প্রতিশোধ।

পৃষ্ঠা:১১

১৭.নবী আয়েশার জন্য দাড়িয়ে খেলা দেখেছিলেন

ইমাম তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনু আদীসহ অন্যান্যরাও আয়েশা করেন। বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল হতে বর্ণনা বসেছিলেন এমন সময় শিশুদের – আওয়াজ শুনা গেল। অন্য বর্ণনা মতে, নারী ও শিশুরা বের হলো রাসূল উঠে দেখলেন হাবশী শিশুরা নৃত্য করছে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, তারা মসজিদে বর্ণা নিয়ে খেলছে আর শিশুরা চারদিকে ঘিরে রয়েছে। রাসূল বললেন, আয়েশা আমার সাথে আস এবং দেখ। আর ইমাম নাসায়ী (রহ)-এর বর্ণনা মতে, হে হুমায়রা! তুমি কি তাদের খেলা দেখতে পছন্দ কর? আমি বললাম, হ্যাঁ, তখন আমি আমার থুতনি রাসূল-এর কাধে রাখলাম আর তিনি আমাকে আড়ালে করে রাখলেন। আমি তার মাথা ও কার্ধের মাঝ দিয়ে খেলা দেখতে লাগলাম। আয়েশা বলেন, রাসূল বলতে লাগলেন, হে আয়েশা। তোমার দেখা হয়েছে? তোমার দেখা হয়েছে? অন্য শব্দে বলা হয়েছে তোমার দেখা কী যথেষ্ট হয়েছে? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল তাড়াহুড়া করবেন না। রাসূল দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ পর আবার বললেন, আয়েশা যথেষ্ট হয়েছে কী? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল করবেন না। তাদের খেলা দেখতে আমার ভালো লাগছে। তাড়াহুড়া বারকানী আয়েশা হতে বর্ণনা করেন,। তিনি বলেন: রাসূল আমার নিকট আসলেন। এসময় আমার নিকট দুটি বালিকা “বুয়াস” যুদ্ধের গান গাচ্ছিল। আমি তাদের দিকে মুখ করে বিছানায় শুয়েছিলাম। আর সেখানে আবু বকর আসলেন এবং আমাকে ধমকাতে লাগলেন এবং গান গাওয়া দেখে বললেন, নবী-এর সামনে শয়তানের বাঁশি বাজানো হচ্ছে? রাসূলতার দিকে এগিয়ে গেলেন এবং বললেন, হে আবু বকর। তাদেরকে গাইতে দাও। যখন তাদেরকে চোখ দিয়ে ইশারা করলেন তখন তারা চলে গেল।

পৃষ্ঠা:১২

আয়েশা বলেন, একদা এক ব্যক্তি ঢাল ও বর্শা নিয়ে খেলছে। রাসূল (সা:) আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি খেলা দেখতে চাও? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি আমাকে তার পেছনে নিয়ে দাঁড়ালেন। এক সময় রাসূল ক্লান্তিবোধ করলেন এবং বললেন, হে আরফাদের মেয়ে! তোমার কী অবস্থা, যথেষ্ট হলো কি? আমি বললাম, হ্যাঁ, তিনি বললেন, তবে যাও।

১৮.ইচ্ছা প্রদানের আয়াত নাযিলের উত্তর

ইমাম মুসলিম (রহ.) আয়েশা হতে বর্ণনা করেন যে, যখন আল্লাহ তায়ালা ইচ্ছা প্রদানের আয়াত নাযিল করলেন, তখন প্রথমে আয়েশা শু থেকে শুরু করলেন এবং বললেন, আমি তোমাকে এমন একটি বিষয় সম্পর্কে বলছি, যে বিষয়ে তুমি তোমার মাতা-পিতার সাথে পরামর্শ না করে কোনো উত্তর দেবে না। অতঃপর তিনি এ আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন। يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ إِنْ كُنْتُنَّ تُرِدْنَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا فَتَعَالَيْنَ امَتِّعْكُنَّ وَأَسَرِ حُكُنَّ سَرَاحًا جَمِيلً ঃঅর্থাৎ হে নবী। তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে বলে দাও যে, যদি তোমরা পার্থিব জীবন ও তার সৌন্দর্য চাও, তবে এসো আমি তোমাদের ভোগের ব্যবস্থা করে দেই এবং সম্মানের সাথে তোমাদেরকে বিদায় দেই। (সুরা আহযাব: আয়াত-২৮) অতঃপর আয়েশা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি এ ব্যাপারে আর কি পরামর্শ করব। আমি তো আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকেই অগ্রাধিকার দেই।

পৃষ্ঠা:১৩

১৯.অসুস্থ অবস্থায় আয়েশা-এর নিকট নবী-এর অবস্থান

হিশাম তার পিতা থেকে, তিনি আয়েশা থেকে বর্ণনা করেন। যখন রাসূল (সা:) অসুস্থ হয়ে পড়লেন, তখন তিনি তার সকল স্ত্রীদের নিকট ঘুরাফিরা করতে লাগলেন এবং বললেন, আগামীকাল আমি কোথায় থাকব? তবে তিনি আয়েশা-এর ঘরে থাকাকেই বেশি পছন্দ করতেন। আয়েশা শু বলেন, এরপর রাসূল-এর অন্যান্য স্ত্রীগণ তাকে আমার ঘরে থাকার অনুমতি দিলেন এবং তিনি মৃত্যু পর্যন্ত আমার ঘরেই অবস্থান করলেন।

২০.সে তো আমার সাথে

সহীহ মুসলিম ও বারকানী উভয়ে আনাস স্ত্রে থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, পারস্যের এক ব্যক্তি যে রাসূল এর প্রতিবেশী ছিল। একদা লোকটি কিছু খাদ্য তৈরি করে রাসূল-কে আহ্বান করল। এমতাবস্থায় আয়েশা শু তাঁর নিকটই ছিলেন। অতঃপর লোকটি আয়েশা -এর দিকে ইঙ্গিত করে রাসূল এর মাধ্যমে তাকেও আসতে বলল। তখন রাসূল আয়েশা-কে লক্ষ্য করে বললেন, সে তো আমারই সাথে। লোকটি (বুঝতে না পেরে) বলল, না। অতঃপর লোকটি আবার আয়েশা প্রশ্ন-এর দিকে ইঙ্গিত করলে রাসূল বললেন, সে তো আমারই সাথে। তখন লোকটি আবারও বলল, না। লোকটি তৃতীয় বার আয়েশা -এর দিকে ইঙ্গিত করলে রাসূল আয়েশা -এর দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, সে তো আমারই সাথে। তখন লোকটি বলল, হ্যাঁ। অতঃপর তাঁরা উভয়ে লোকটির বাড়িতে চলে আসেন।

পৃষ্ঠা:১৪

২১.আয়েশা-এর মর্যাদা

ইবনে আবী শাইবা, ইমাম আহমদ, বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, নাসাঈ ও ইবনে মাজাহ প্রমুখ ইমামগণ আনাস থেকে বর্ণনা করেন। ইমাম আহমদ অন্য বর্ণনায় আয়েশা থেকে। ইমাম তাবারানী কুররা বিন ইয়াস থেকে, ইমাম তাবরানী অন্য বর্ণনায় সহীহ সনদে আবী সালামা আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রা:) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূল বলেছেন, নিশ্চয় মহিলাদের ওপর আয়েশার মর্যাদা ঠিক তেমন যেমন সমস্ত খাদ্যের ওপর সারিদের মর্যাদা। আবু তাহের আল মুখলিস শাবী থেকে এবং ইমাম তাবরানী সহীহ সনদে আমর বিন হারেস বিন মুসতালাক থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল আয়েশা-এর ফযীলত বর্ণনা করবার জন্য যিয়াদ বিন সুমাইয়াকে আমার বিন হারেস এর সাথে কিছু হাদীয়া ও ধন-সম্পদ দিয়ে উম্মুল মুমিনীনদের কাছে পাঠালেন সালামা। এমনকি সাফিয়া -এর কাছেও পাঠালেন। তখন তারা বললেন, যদি তিনি তার এরূপ মর্যাদা বলে থাকেন, তাহলে রাসূল ছিলেন আমাদের নিকট তার থেকে অধিক মর্যাদাবান। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূল উম্মে সালামার নিকট আয়েশা এর মর্যাদা বর্ণনা করলে তিনি বলেন, যিয়াদ তাদের নিকট তার মর্যাদা বর্ণনা করেছে। অবশ্য যিনি যিয়াদ থেকে অধিক মর্যাদাবান (রাসূল) তিনিই তো তার মর্যাদা বর্ণনা করেছেন।

পৃষ্ঠা:১৫

২২.আয়েশা-এর প্রতি সালাম

ইবনে শাহীন আনাস থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, একদা রাসূল (সা:) আমাদের মধ্যে ছিলেন। তিনি আয়েশা-এর গৃহে সালাত পড়ছিলেন। এমতাবস্থায় আয়েশা বললেন, আমি এরকম এরকম একজন লোক দেখতে পাই। কিন্তু আমি জানি না তিনি কে? ফলে আমি রাসূলকে এ ব্যাপারে সংবাদ দিলে রাসূল কাপড় পরিধান করলেন এবং লোকটির দিকে বেরিয়ে গেলেন। পরর্তীতে আমি জানতে পারলাম যে, তিনি হলেন জিবরাঈল (আ)। তিনি (জিবরাঈল (আ) বলছিলেন, আমরা ঐ গৃহে প্রবেশ করি না, যে গৃহে কুকুর, পেশাব ও ছবি রয়েছে। অতঃপর রাসূল গৃহে প্রবেশ করে কুকুরটিকে ধরে বাহিরে নিক্ষেপ করলেন। ফলে জিবরাঈল (আ) গৃহে প্রবেশ করলেন। ইবনে আবী শাইবা আয়েশা প্লান্ন থেকে কর্ণনা করেন। রাসূল তাকে (আয়েশা -কে) উদ্দেশ্য করে বললেন, নিশ্চয় জিবরাঈল (আ) তোমাকে সালাম দিয়েছেন। তখন আয়েশা শু বললেন, তার প্রতিও সালাম, রহমত ও বরকত হোক। তাবরানী উম্মে সালামা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি আয়েশা এর গৃহে প্রবেশ করলাম এবং জিজ্ঞেস করলাম, রাসূল কোথায়? তিনি বলেন, রাসূল সে গৃহে যে গৃহে তার প্রতি ওহি করা হয়। উন্মু সালামা বলেন, অতঃপর আমি সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থান করলাম। তখন রাসূল-কে বলতে শুনলাম যে, জিবরাঈল তোমার প্রতি সালাম প্রদান করেছেন।

পৃষ্ঠা ১৬ থেকে ৩০

পৃষ্ঠা:১৬

২৩.তায়াম্মুম দ্বারা উম্মতের ওপর প্রশস্ততা দান

হিশাম তার পিতার সূত্রে আয়েশা শুল্লা থেকে বর্ণনা করেন। একদা আয়েশা (রা:) আসমা-এর গলার হার দার নিলেন। অতঃপর তা হারিয়ে ফেললেন। তখন রাসূলআনাস-কে ঐ হার খোঁজার জন্য পাঠালেন। এমতাবস্থায় সালাতের সময় হয়ে গেলে তারা অযু ব্যতিতই সালাত আদায় করে নেন। অতঃপর যখন তারা রাসূল-এর নিকট ফিরে আসলেন, তখন ঐ বিষয়ে তাঁর নিকট জানতে চাইলে তায়াম্মুমের আয়াত অবতীর্ণ হয়। যা পবিত্র কুরআনের সূরা নিসার ৪৩ নং আয়াত এবং সূরা মায়েদার ৬ নং আয়াত হিসেবে পরিচিত। তখন উসাইদ বিন হুযাইর দ্রে আয়েশা -কে লক্ষ্য করে বললেন, আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আল্লাহর শপথ! আল্লাহ আপনাকে কেন্দ্র করে এমন একটি বিধান অবতীর্ণ করেছেন যা আর কাউকে কেন্দ্র করে তা করেননি। আর এতে আল্লাহ মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য বরকত নিযুক্ত করে দিয়েছেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, আবু বকর গুল্ল রাগান্বিত হয়ে আয়েশা -কে তিরস্কার করে বলছিলেন, তুমি সকল লোককে আটকে রেখেছ যে সময় তাদের সাথে কোনো পানি নেই। তখন তায়াম্মুম এর আয়াত অবতীর্ণ হয়। ইবনে শিহাব বলেন, আমাদের নিকট এরূপ বর্ণনা পৌঁছেছে যে, আবু বকর কে বললেন, আল্লাহর শপথ! নিশ্চয় তুমি বরকতময়। আয়েশা

পৃষ্ঠা:১৭

২৪.আয়েশা-এর দশটি বৈশিষ্ট্য

ইবনে সাদ আয়েশা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমাকে এমন দশটি বৈশিষ্ট্য দেয়া হয়েছে যা রাসূল-এর কোনো স্ত্রীকে দেয়া হয়নি। তখন তাকে বলা হলো সেগুলো কি? তিনি বললেন, ১. রাসূল আমাকে ছাড়া আর কাউকে বাকেরা অবস্থায় বিবাহ করেননি।  ২. তিনি আমাকে ছাড়া এমন কাউকে বিবাহ করেননি, যার পিতা-মাতা উভয়ে মুমিন ও মুহাজির।  ৩. আমার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আকাশ থেকে আয়াত নাযিল হয়েছে। ৪. জিবরাঈল (আ) রাসূল-কে বলেন, তুমি তাকে বিবাহ কর। নিশ্চয় সে তোমার স্ত্রী।  ৫. আমি এবং রাসূল এক সাথে এক পাত্রে গোসল করতাম, যা তিনি অন্য কোনো স্ত্রীর সাথে করেননি।  ৬. তিনি আমার কাছে থাকাবস্থায় ওহি নাযিল হতো,  ৭. অন্য কোনো স্ত্রীর নিকট থাকাবস্থায় ওহি নাযিল হয়নি।  ৮. আল্লাহ তায়ালা রাসূলকে আমার বুকের ওপর থাকাবস্থা মৃত্যু দান করেন। ৯. তিনি এমন এক রাত্রিতে মৃত্যুবরণ করেন যে রাত্রিতে তিনি আমার নিকট প্রদক্ষিণ করতেন। ১০. তাকে আমার বাড়িতেই দাফন করা হয়। অন্য বর্ণনায় তিনি বলেন, আমাকে এমন কতগুলো বৈশিষ্ট্য দেয়া হয়েছে, যা তার অন্য কোনো স্ত্রীকে দেয়া হয়নি। তা হলো, ১. রাসূল আমাকে ৬ বছর বয়সে বিবাহ করেন। ২. ফেরেশতা আমার আকৃতিতে আগমন করেছিল।  ৩. নয় বছর বয়সে আমি তাঁর ঘরে যাই।

পৃষ্ঠা:১৮
৪. আমি জিবরাঈল (আ)-কে দেখেছি, অন্য কোনো স্ত্রী জিবরাঈলকে দেখতে পারেনি।
৫. আমি ছিলাম স্ত্রীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসার পাত্র। ৬. আর আমার পিতাও ছিলেন সাহাবীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভালবাসার পাত্র। ৭. রাসূল আমার বাড়িতেই অসুস্থ হয়েছে পড়েন। ৮. আর আমার বাড়িতেই মৃত্যুবরণ করেন, যা আমি এবং ফেরেশতা ছাড়া আর কেউ প্রত্যক্ষ করেননি। ওজীর আয়েশা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমাকে দশটি বৈশিষ্ট্য দেয়া হয়েছে, যা আমার পূর্বে অন্য কাউকে দেয়া হয়নি। তা হলো, ১. মায়ের গর্ভে আসার পূর্ব থেকেই আমাকে রাসূল-এর জন্য বিশেষভাবে আকৃতি প্রদান করা হয়েছে। ২. তিনি আমাকে বাকেরা অর্থাৎ কুমারী অবস্থায় বিবাহ করেন। ৩. অন্য কোনো স্ত্রীকে তিনি বাকেরা অবস্থায় বিবাহ করেননি। ৪. তার মাথা আমার উরুতে রাখা অবস্থাতেই ওহি নাযিল হয়েছিল।  ৫. আকাশ থেকে আমাকে নির্দোষ প্রমাণ করে আয়াত নাযিল হয়েছে। ৬. তার নিকট আমিই ছিলাম মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রিয় ব্যক্তি। ৭. আমার পালার দিন তিনি মৃত্যু বরণ করেন। ৮. আমার ঘরেই তাকে দাফন করা হয়। এভাবে তিনি দশটি বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেন। এ বর্ণনায় তা উল্লেখ করা হয়নি। আবু ইয়ালা আয়েশা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমাকে এমন নয়টি বৈশিষ্ট দেয়া হয়েছে, যা মারইম বিনতে ইমরান ব্যতীত অন্য কাউকে দেয়া হয়নি। সেগুল হলো, ১. জিবরাঈল (আ) তাঁর আকৃতিতে নাযিল হয়ে রাসূল-কে তাকে বিবাহ করার আদেশ করেন।২. বাকেরা অবস্থায় আমাকেই বিবাহ করেন।

পৃষ্ঠা:১৯

৩. তার মাথা আমার কোলে রেখেই মৃত্যুবরণ করেন। ৪. তাকে আমার বাড়িতেই দাফন দেয়া হয়। ৫. ফেরেশতারা আমার বাড়ি ঘেরাও করেছে। ৬. ওহি নাযিল হওয়ার সময় তিনি আমার বাড়িতেই থাকতেন। ৭. আমি তাঁর খলিফা ও বন্ধুর মেয়ে। ৮ আমার সমস্যার কারণে আকাশ থেকে বিধান নাযিল হয়। ৯. আমি সুগন্ধি তৈরি করতাম এবং তা তিনি ব্যবহার করতেন। ফলে আমি ক্ষমা ও উত্তম রিযিক প্রাপ্ত হতাম।

২৫.ইলমের দিক থেকে সবচেয়ে জ্ঞানী মহিলা

ইমাম তিরমিযী হাসান এবং সহীহ সূত্রে বর্ণনা করেন। আবু মূসা আশআরী বলেন, আমাদের কোনো হাদীসের ব্যাপারে যদি কোনো সন্দেহ হতো, তখন আমরা আয়েশা-কে জিজ্ঞাসা করলে জানতে পারতাম। আবু খাইছামা এবং তাবরানী নির্ভরযোগ্য যুহরী হতে বর্ণনা করেন। রাসুল বলেন, যদি এই উম্মতের সব মহিলাদের জ্ঞান একত্রিত করা হয় এবং তাদের মধ্যে রাসূলের স্ত্রীরাও থাকে। তবুও আয়েশা পা-এর ইলম বেশি হবে। সাঈদ ইবনে মানুসর গ্রে ইবনে খাইছামা, তাবরানী ও হাকিম হাসান সূত্রে মাসরূপ (র.) হতে বর্ণনা করেন তিনি আল্লাহর নামে শপথ করতেন যে, আমি রাসূল এর বড় বড় সাহাবীদেরকেও দেখেছি। অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসূল-এর বড় বড় সাহাবীদেরকেও দেখেছি যে, তারা আয়েশা -এর কাছ থেকে ফারায়েয সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে নিতেন। উরওয়াহ ইবনে যুবাইর ন্দ্রে হতে হাসান সূত্রে আরো বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কুরআন, ফারায়েয, হালাল, হারাম, ফিকহ, চিকিৎসা, কবিতা, আরবদের ইতিহাস এবং বংশীয় হিসাবের দিক থেকে আয়েশা-এর চেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি আর কখনো দিখিনি। তাবরানী সহীহ সূত্রে মূসা ইবনে তালহা হতে বর্ণনা

পৃষ্ঠা:২০

করেন। তিনি বলেন, আমি কখনো আয়েশার চেয়ে বেশি স্পষ্টভাষী আর দেখিনি। ইমাম আহমদ উরওয়া ন্দ্রে হতে বর্ণনা করেন যে, উরওয়া টুদ্র আয়েশাকে বলতেন, হে উম্মুল মুমিনীন! আমি আপনার মুখ দেখে আশ্চর্য হই না। কারণ আপনি রাসূল-এর স্ত্রী এবং আবু বকর এর মেয়ে। তিনি আরো বলেন, আমি আপনার কবিতা ও মানুষের বয়স সম্পর্কে জ্ঞান দেখেও আশ্চর্য হই না। কারণ আপনি আবু বকর টুল্ল-এর কন্যা। আর তিনিও এসব বিষয়ে সকলের চেয়ে বেশি জানতেন। তবে আমি আপনার চিকিৎসাবিদ্যা দেখে আশ্চয়ই হয়ে যাই। এ জ্ঞান আপনি কোথায় এবং কিভাবে শিখলেন? উরওয়াহ বলেন, অতঃপর আয়েশা তার কাঁধে মারলেন এবং বললেন, রাসূল অসুস্থ হতেন আমি তার সেবা করতে করতে শিখেছি। ইমাম আহমদ ও হাকেম আহনাফ ইবনে কায়েস হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি আবু বকর, ওমর, উসমান, আলীসহ আরো অনেক খলিফার বক্তব্য শুনেছি। তারা প্রত্যেকেই তাদের বক্তব্যে কিছু না কিছু বাড়তি শব্দ করতেন। কিন্তু আয়েশা -এর চেয়ে বেশি সুন্দর ও রুচিশীল কথা আর কারো থেকে শুনিনি। ইমাম হাকিম ইবনে খাইছামা আতা ইবনে রিবাহ হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আয়েশা ছিলেন সবচেয়ে বড় ফিকহ শাস্ত্রবিদ, সবচেয়ে জ্ঞানী এবং দেখতেও সবচেয়ে বেশি সুন্দরী। ইবনে আবি খাইছামা সুফইয়ান ইবনে উয়াইনা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রা:) বলেন, হে ইয়াযীদ! কোন ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী? তিনি বললেন, হে আমিরুল মুমিনীন! আপনিই সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী? তখন তিনি বলেন, আপনি। তোমার ব্যাপারে এরূপ উত্তরই ধারণ করেছিলাম। কিন্তু আমিও একজনকে আমার থেকে বেশি জ্ঞানী বলে ধারণা করি। আর তিনি হচ্ছে আয়েশা । আর বালাযারী কুবাইছা ইবনে হুয়াইব হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আয়েশা ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় জ্ঞানী। অনেক বড় বড় সাহাবীরা তার কাছে প্রশ্ন করে জেনে নিত। কাশেম ইবনে মুহাম্মদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,

পৃষ্ঠা:২১

আয়েশা খলিফা আবু বকর, ওমর, উসমান গুল্লু-এর যোগে মুফতীর পদে নিযুক্ত ছিলেন। আর তিনি এ অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করেন। আয়েশা ২২১০টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তার মধ্যে ইমাম বুখারী ও মুসলিমে যৌথভাবে রয়েছে ৪৭০ টি হাদীস। আর শুধুমাত্র বুখারীতে এককভাবে রয়েছে ৪৫ টি এবং মুসলিমে রয়েছে ৮৭ টি হাদীস।

২৬.আয়েশা-এর বিবাহ

যখন রাসূল এর খালা খাওলা বিনতে হাকিম আয়েশা -এর কথা তার সামনে উপস্থাপন করলেন, তখন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয়জনের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য রাসূল-এর অন্তরের দরজা খুলে যায়।

২৭.বিবাহের প্রস্তাব

এ ব্যাপারে আয়েশা বলেন, একদিন খাওলা বিনতে হাকিম এসে আবু বকর -এর ঘরে প্রবেশ করলেন। সেখানে তিনি উম্ম রুমান অর্থাৎ আয়েশা প্লা এর মাকে পেলেন। অতঃপর তিনি বললেন, হে উম্ম রুমান! আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য কতইনা কল্যাণ ও বরকত রেখে দিয়েছেন? উম্মে রুমান বললেন, কি ব্যাপার? তিনি বললেন, রাসূল আমাকে আয়েশার বিবাহের প্রস্তাব দিয়ে পাঠিয়েছেন। তখন উম্মে রুমান বললেন, স্বাগতম! আপনি আবু বকর -এর জন্য একটু অপেক্ষা করুন। অতঃপর যখন আবু বকর ঘুড়ে আসলেন তখন খাওলা আবু বকর -কে বললেন, হে আবু বকর! আল্লাহ আপনার ঘরে কতইনা বরকত রেখে দিয়েছেন। কেননা, রাসূল আমাকে আয়েশার বিবাহের প্রস্তাব দিয়ে পাঠিয়েছেন। তখন আবু বকর দ্রে বললেন, এটা কি ঠিক হবে? সে তো তার ভাইয়ের মেয়ে? অতঃপর রাসূল-এর খালা ফিরে আসলেন এবং সবকিছু খুলে বললেন। তখন রাসূল বললেন, আপনি আবার আবু বকরের কাছে যান এবং বলুন,

পৃষ্ঠা:২২

সে আমার মুসলিম ভাই। আর আমিও তাঁর মুসলিম ভাই। তার মেয়ে আমার জন্য বিবাহ করা বৈধ। অতঃপর তিনি আবু বকর গুদ্র-এর কাছে ফিরে গেলেন এবং রাসূল-এর কথাগুলো উপস্থাপন করলেন। তখন আবু বকর ন্দ্রে তাকে বললেন, আপনি আমার ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। উম্মে রুমান বলেন, ইতোপূর্বে মুতইম ইবনে আদি তার ছেলে খুবাইরের জন্য আয়েশাকে প্রস্তাব দিয়ে রেখেছিল। আর যেহেতু আবু বকর ন্দ্রে কোনো দিন ওয়াদা ভঙ্গ করেননি। তাই তিনি মুতইমের কাছে গেলেন। তখন তার সাথে খুবাইরের মাও উপস্থিত ছিল। আর সে ছিল মুশরিক। তখন খুবাইরের মা বলল, হে ইবনে আবু কুহাফা। সম্ভবত তুমি আমার ছেলের সাথে তোমার মেয়েকে বিবাহ দেয়ার জন্য আগমন করেছ? আর তুমি এর মাধ্যমে তাকে (খুবাইবকে) তোমার দ্বীনের মধ্যে প্রবেশ করাতে চাও? তখন আবু বকর প্লে তার কথাটিকে প্রত্যাখ্যান করলেন এবং সব কিছু খুলে বললেন। এমনকি প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন। তারপর তিনি বাড়িতে ফিরে এসে খাওলাকে বললেন, আপনি রাসূল-কে নিয়ে আসুন। ফলে খাওলা রাসূল কে আবু বকর টু-এর বাড়িতে নিয়ে আসেন। তারপর আবু বকর দ্রে আয়েশাকে রাসূল-এর সাথে বিবাহ দিয়ে দেন। তখন আয়েশা -এর বয়স ছিল মাত্র ৬ অথবা ৭ বছর। তার মোহরের পরিমাণ হলো প্রায় পঞ্চাশ দিরহাম। ইবনে আব্বাস বলেন, যখন রাসূল আবু বকর-কে আয়েশা – এর বিবাহের প্রস্তাব দিলেন। তখন আবু বকর পুত্র বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি তো এ ব্যাপারে মুতইম ইবনে আদি ইবনে নাওফেল ইবনে আবদে মানাফকে তার ছেলের ব্যাপারে ওয়াদা দিয়ে দিয়েছি। অতঃপর তিনি তাদেরকে ডেকে তা ফিরিয়ে দিতে বললেন। ফলে তিনি তাই করলেন।

পৃষ্ঠা:২৩

২৮. আয়েশা বিনতে সিদ্দিক

আয়েশা -এর গোত্র বনী তাইম বীরত্ব, সম্মান, আমানতদারিতা ইত্যাদি বিষয়ে খুব প্রসিদ্ধ ছিল। আর তাই আয়েশা-এর পিতা আবু বকর গুদ্র পিতৃ সূত্রেই আবু বকর উল্ল একটি উত্তম মিরাস লাভ করেন। সে হলো তিনি চারিত্রিকভাবে ছিলেন খুবই নম্র ও ভদ্র। তিনি আরবদের বংশীয় জ্ঞানে সবচেয়ে বেশি জানতেন। আর তিনি একজন সৎ আমানতদার ব্যবসায়ী ছিলেন। আবু বকর পুত্র ইসলামের প্রথম দিকেই ইসলাম গ্রহণ করে সম্মানিত হয়েছেন। আর তিনি রাসূল থেকে তার ক্ষমতা অনুযায়ী অনেক বিপদ প্রতিহত করেছেন। তিনি ছিলেন একজন একনিষ্ট ও উৎসাহী দায়ী। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছেন তারা হলেন, ১. উসমান ২. যুবাইর ইবনে আওয়াম ৩. আবদুর রহমান ইবনে আউফ ও ৪. সা’দ বিন আবু আকাস। তারা হলেন দশজন সাহাবীদের অন্তর্ভুক্ত যারা দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছিলেন। রাসূল বলেন, কোনো মাল আমার এতটুকু উপকারে আসেনি যতটুকু উপকারে এসেছে আবু বকরের মাল। বর্ণিত আছে যে, তখন আবু বকর টুল্ল কেঁদে ফেললেন এবং বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি এবং আমার মাল কি আপনার জন্য নয়?

পৃষ্ঠা:২৪

২৯. আয়েশা-এর মাতা

আয়েশা-এর মা রুমান বিনতে আমের ছিলেন বিশিষ্ট মহিলা সাহাবীদের মধ্যে অন্যতম। জাহেলী যুগে আবদুল্লাহ ইবনে হারেছ তাকে বিবাহ করেন। অতঃপর তার থেকে তুফাইল নামে এক সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। তারপর আবদুল্লাহ ইবনে হারেছ মৃত্যুবরণ করেন এবং আবু বকর গুল্ল তাকে বিবাহ করেন। তখন আয়েশা ও আবদুর রহমান জন্ম গ্রহণ করেন। রাসূল-এর সাহাবী হওয়ার কারণে তিনি মদিনায় হিজরত করেন। যখন আয়েশা -এর মা রাসূল (সা:) জীবদ্দশায় মৃত্যুবরণ করেন, তখন রাসূল নিজে তার করবে নেমে তাকে কবরে শায়িত করেন এবং বলেন, হে আল্লাহ! সে তোমার এবং তোমার রাসূল এর জন্য কোনো বিপদকে ভয় করেনি। কাশেম ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর হতে বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ আছে যে, যখন উম্মে রুমান অর্থাৎ আয়েশার মাকে কবরে শায়িত করা হলো তখন রাসূল (সা:) বলেছিলেন, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি জান্নাতী হুর দেখে আনন্দ পায় সে যেন উম্মে রুমানকে (অর্থাৎ আয়েশার মাকে) দেখে নেয়।

৩০.আয়েশার বিবাহ আল্লাহর পক্ষ থেকে

আয়েশা প্রশ্ন মক্কায় ইসলাম আগমনের পাঁচ বা চার বছর পর জন্মগ্রহণ করেন এবং প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পূর্বেই তিনি এবং তার বোন আসমা করেন। তখন মুসলামনদের সংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য। ইসলাম গ্রহণ সহীহ বুখারীতে বর্ণিত আছে যে, আয়েশা বলেন, আমার পিতা-মাতা আমাকে জ্বীনী জ্ঞান ছাড়া অন্য কোনো জ্ঞান শিক্ষা দিতেন না। বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত, আয়েশা -এর হাদীসে বর্ণিত আছে যে, নবী (সা:) তাকে বলেন, আমি তোমাকে একটি সাদা রেশমের কাপড় আবৃত অবস্থায় দুবার স্বপ্নে দেখেছি। আর আমাকে বলা হচ্ছে যে, এটা তোমার স্ত্রী, তার ওপর হতে সাদা কাপড়টা উঠাও। তারপর আমি তা উঠিয়ে দেখি তুমি। সুতরাং আমি বলবো এটা আল্লাহর পক্ষ হতে।

পৃষ্ঠা:২৫

৩১. বিবাহের সাথে তার মনোভাব

সাহাবাদের মাঝে বিবাহের কথা প্রকাশ হওয়ার পর আয়েশা বিস্মিত হননি; বরং সাধারণ অবস্থায়ই ছিলেন। আর ইসলামের শত্রুরাও এ বিবাহের ব্যাপারে কোনো কথা বলতে পারেনি। কারণ আয়েশা -কে রাসূল এর আগেও জুবাইর ইবনে মুতইমের জন্য বিবাহের জন্য প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। তারপর আবু বকর খুঁষ্ট্রে তার প্রস্তাব থেকে মুক্ত হয়ে রাসূল-এর সাথে বিবাহ দেন। অতঃপর তারা আশ্চর্যবোধ করে এ ব্যাপারে যে, পিতার বয়সি একজন পুরুষের সাথে একটি ছয় বছরের মেয়েকে বিবাহ দেয়া হলো কিভাবে। কিন্তু উমর আলী-এর মেয়েকে বিবাহ করেছেন অথচ ওমর আলী প্লে-এর চেয়েও বয়সে বড়। ওমর আবু বকর-কে তার মেয়ে হাফসাকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছেন।

৩২.রাসূল-এর ওসীয়ত

আবু বকর -এর পরিবারের আনন্দ ছিল মহান একটি সম্পর্কের মাধ্যমে। এ বিষয়ে সহীহ এবং মুতাওয়াতির সূত্রে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। যেমন আসমা বিনতে আবু বকর হতে বর্ণিত, রাসূল আবু বকর -এর বাড়িতে বারবার আসতেন এবং বলতেন, হে উম্মে রুমান। আমি আয়েশার ব্যাপারে ওসীয়ত করছি যে, তুমি তার ব্যাপারে আমাকে হেফাজত কর। এ কথা বলার পর বাড়িতে আয়েশার গুরুত্ব বেড়ে যায়। আর রাসূল বকর টু-এর বাড়ি না গিয়ে পারতেন না। কোনো দিন আবু আবু বকর ইসলাম গ্রহণ করার পর থেকে হিজরতের পূর্ব পর্যন্ত কখনো কখনো রাসূল আয়েশাকে তার বাড়িতে পর্দার ভিতর লুকিয়ে কান্না করা অবস্থায় পেতেন। রাসূল আয়েশাকে তার কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি তার মায়ের ব্যাপারে অভিযোগ করতেন। তখন রাসূল উম্মে রুমানকে বলেন, হে উম্মে রুমান! তোমাকে তো আমি আয়েশার ব্যাপারে ওসীয়ত করেছি।

পৃষ্ঠা:২৬

৩৩. বিবাহের পূর্বে হিজরত

যখন আল্লাহ তায়ালা হিজরত করার অনুমতি দিলেন, তখন সাহাবীরা দলে দলে হিজরত করে মদিনায় যেতে লাগলেন। এভাবে মুসলমানগণ হিজরত করে মদিনায় গিয়ে পূর্ববর্তী হিজরতকারিদের সাথে মিলিত হতে লাগল। এমনকি দেখা গেল যে, মক্কায় রাসূল আবু বকর ও আলী ন্দ্র সহ আরো কয়েকজন মুসলিম মক্কায় অবশিষ্ট রয়েছেন। ফলে আবু বকর (রাঃ)ও হিজরত করার ইচ্ছা পোষণ করে প্রিয় বন্ধু নবী-এর কাছে অনুমতি চাওয়ার জন্য এলেন। তখন নবী তাকে বললেন, “হে আবু বকরা তুমি হিজরতের ব্যাপারে তাড়াহুড়া কর না। সম্ভবত আল্লাহ তোমাকে আমার সাথি বানাবেন।” এ পবিত্র সংবাদ শুনে আবু বকর ত্রে খুবই উদ্ভাসিত হলেন এবং মনে মনে খুবই প্রফুল্ল অনুভব করলেন। সাথে সাথে এও ভাবতে লাগলেন যে, তিনি যে মদিনায় হিজরত করার ব্যাপারে নবী-এর সাথি হতে যাচ্ছেন, এতে তার করণীয় কি? আর কখনইবা তার সাথি হিজরতে বের হওয়ার জন্য ডাক দেবেন? এসব ভেবে ভেবে তিনি অপেক্ষা করতে লাগলেন এবং প্রস্তুতিও গ্রহণ করতে লাগলেন। অন্যদিকে কুরাইশ মুশরিকরা লক্ষ্য করল যে, মুসলিমরা মক্কা ছেড়ে হিজরত করতেছে। তখন তারা রাসূল-এর হিজরতের বিষয়েও সতর্ক হয়ে যায়। তারপর তাদের পরামর্শ সত্তা দারুন নাদয়াতে একত্রিত হয়। আর দারুন- নাদওয়া হলো কুশাই ইবনে কিলাব এর ঘর। যেখানে কুরাইশরা তাদের সকল পরামর্শ করত। তখন রাসূল এর ব্যাপারেও তারা পরামর্শ সভায় একত্রিত হলো। তাদের মধ্যে উপস্থিত ছিল উকবা ইবনে রাবিয়া, আবু হিন্দা, শাইবা এবং তার ভাই আবু সুফিয়ান ইবসে হারব ও যুবাইর ইবনে মুতঈমসহ আরো অনেকে। পরিশেষে তারা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, প্রত্যেক গোত্র হতে একজন করে যুবক নিবে এবং সবাইকে একটা তলোয়ার দেয়া হবে। আর তারা সবাই এক সাথে রাসূল-এর ওপর ঝাপিয়ে পড়বে এবং তাকে হত্যা করবে। তখন আব্দে মানাফ গোত্র কিছুই করতে পারবে না। কারণ সব গোত্রের সাথে যুদ্ধ করে

পৃষ্ঠা:২৭

পারবে না। ফলে তারা দিয়াত দিতেই বাধ্য হবে। দেখতে দেখতে হঠাৎ একদিন নবী আল্লাহর পক্ষ থেকে মদিনা মুনাওয়ারায় হিজরত করার অনুমতি পেয়ে গেলেন। সুতরাং রাসূল দিন শুরু হওয়ার সাথে সাথেই বের হয়ে গেলেন এবং মুশরিকদেরকে ধোঁকা দিলেন। কেননা, তারা তাদের হিজরতের কোনো কিছুই দেখতে পেল না। অনুমতি পাওয়ার পর রাসূল তাঁর বন্ধু আবু বকর সিদ্দিক স্রে-এর বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলেন। অতঃপর আবু বকর গ্রা-এর বড় মেয়ে আসমা রাসূল -কে আসতে দেখলেন এবং তার পিতাকে বললেন, হে আমার পিতা। রাসুল এ অসময়ে আসতেছেন। কিন্তু সাধারণত তিনি এ সময় আগমণ করেন না। তখন আবু বকর উঠে দাঁড়ালেন এবং রাসূল-কে আমন্ত্রণ জানাতে গেলেন এবং বললেন, আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবান হোক! আল্লাহর শপথ! আপনি তো এ সময় কোনো বিশেষ কারণ ব্যতীত আগমন করেন না। নিশ্চয় আপনার আগমনে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। অতঃপর যখন তিনি ঘরের সামনে গেলেন তখন ঘরে প্রবেশ করার জন্য অনুমতি চাইলেন। ফলে অনুমতি দেয়া হলে তিনি ঘরে প্রবেশ করলেন এবং আবু বকর (রা”)-কে বললেন, তোমার নিকট যারা আছে তাদের সবাইকে বের করে দাও। আর তখন তার সাথে ছিল আসমা ও আয়েশা । তাই আবু বকর গুদ্রে বললেন, এরা তো আমার দুই কন্যা। অতঃপর রাসূল বললেন, আমি হিজরতের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার অনুমতি পেয়েছি। তখন আবু বকর গুদ্রে আনন্দে কেঁদে কেঁদে বললেন, আমি কি আপনার সাখি হতে পারব? রাসূল বললেন, হ্যাঁ। আয়েশা প্লা বলেন, আল্লাহর কসম! আবু বকরকে কাঁদতে দেখার পূর্বে আমি জানতাম না যে, অতি আনন্দের কারণেও মানুষ কাঁদতে পারে। অতঃপর আবু বকর আবদুল্লাহ ইবনে আরিকাতকে ডেকে আনলেন। সে ছিল এক বিশ্বস্ত ব্যক্তি। আর সে মরুভূমির রাস্তা সম্পর্কে অভিজ্ঞ ছিল। রাসূল এ তার চাচাত ভাই আলী-কে তার ঋণগুলো পরিশোধ করার দায়িত্ব অপর্ণ করে মদিনার পথে রওনা হলেন এবং জাবালে ছুর নামক পাহাড়ে আশ্রয় গ্রহণ করলেন। আর আয়েশা -এর ভাই আবদুল্লাহ ছিল ছোট কিন্তু বুদ্ধিমান। সে আবু বকর ও রাসুলকে মক্কার খবর জানাও। আর আয়েশার বোন

পৃষ্ঠা:২৮

আসমা তাদের খাবার ও পানি নিয়ে আসতেন। কুরাইশরা তাদের হিজরতের কথা জানতে পেরে যে ব্যক্তি তাদেরকে ফিরিয়ে এনে দিতে পারবে তাকে ১০০ টি উট পুরুস্কার হিসেবে দেয়ার কথা ঘোষণা করে। আবদুল্লাহ ইবনে উরাইকিত ‘জাবালে সাওর’-এর গুহার নিকট চলে আসল। তখন আবু বকর একটি গুহার সামনে বসলেন তখন রাসূল বের হয়ে আসলেন। এমন সময় আসমা তাদের খাবার নিয়ে আসলেন কিন্তু তিনি তা বাধার জন্য রশি আনতে ভুলে যান। তাই তিনি নিজের কমরের ফিতাকে দুভাগ করে একভাগ দিয়ে তাদের খাদ্য বেধে দেন আর একভাগ নিজে পরে নেন। আর এই জন্যই আসমাকে الن উার্ড বা দুই ফিতাওয়ালা বলা হয়। তারপর আবু বকর দুটি উটের উত্তমটা নবী-এর জন্য নির্বাচন করেন এবং বলেন, হে আল্লাহর রাসূল। আপনি আরোহণ করুন। তারপর তিনি আরোহন করলেন এবং রওনা হলেন। এদিকে আবু জাহেল ও তার সহচররা জানতে পারল যে, মুহাম্মাদ আবু বকর পুত্র-কে নিয়ে হিজরত করেছেন। তখন তারা মক্কার আনাচে-কানাচে বনী হাশেম এবং তাদের অনুগত গোত্রগুলোর ঘরে ঘরে তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগল। কিন্তু কোথাও খুঁজে পেল না। অবশেষে কুরাইশদের একটি দল আবু বকর -এর বাড়িতে গেল। সে দলে ছিল সবচেয়ে বড় খবীশ আবু জাহেল। প্রথমে সে আবু বকর-এর বাড়ির দরজায় লাথি মারল। কিছুক্ষণ পর দরজা খোলা হলো। তখন বাড়িতে ছিল, আসমা পু, আয়েশা এবং আয়েশা পাল্ল এর জন্মদাত্রী মা উম্মে রুমান শু। অতঃপর কথা বলার জন্য আসমা বের হয়ে এলেন। ফলে আবু জাহেল আসমা শল্পকে জিজ্ঞাস করল, হে আবু বকরের। মেয়ে! তোমার পিতা কোথায়? তখন আসমা বললেন, আল্লাহর কসম! তিনি কোথায় আছেন তা আমি জানি না। তখন সাথে সাথে আবু জাহেল আসমা কে চড় মারল এবং এতে তার গালে দাগ বসে গেল। আর রাসূল জানতে পারলেন ইয়াসরিব তথা মদিনার জনগণ তার জন্য অপেক্ষায় আছেন। প্রতিদিন তারা একটি জায়গায় এসে নবীর জন্য অপেক্ষা করে আর ফিরে যায়। এক ইহুদী একটি উঁচু পাহাড়ে উঠে তাদেরকে দেখতে পায় এবং চিৎকার দিয়ে বলে উঠে যে, তোমরা যার অপেক্ষায় আছ তিনি এসেছেন। এভাবেই নবী-এর মদিনায় হিজরত সম্পন্ন হয়।

পৃষ্ঠা:২৯

৩৪.আয়েশা -এর বিবাহ

মদিনায় রাসূল-এর স্থায়ী হওয়ার পর তিনি যায়েদ ইবনে হারেসা গ্রে-কে নবী -এর মেয়েদেরকে নিয়ে যাওয়ার জন্য মক্কায় পাঠান। আর আবু বকর ও হারেসার মাধ্যমে তার ছেলে আবদুল্লাহকে উম্মে রুমান, আর তার দুই মেয়ে আয়েশা ও আসমা-কে নিয়ে মদিনায় চলে আসার জন্য একটি চিঠি দেন। হারেসা মক্কায় পৌঁছার পর ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় উম্মে রুমান এর কাছে আশ্রয় গ্রহন করেন। আর আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর টুলু, তালহা ইবনে আবদুল্লাহ এবং যায়েদ ইবনে হারেসা তাড়াতাড়ি করে রওনা হয়। আর রাসূল আয়েশা টুদ্র-এর জন্য একটি ঘর সাজিয়ে রাখেন। মদিনায় মদিনায় গিয়ে তারা উটকে ছেড়ে দিলেন। কারণ উট যেখানে গিয়ে বসবে তিনি সেখানেই বাড়ি তৈরি করবেন। পরে উটটি আবু আইয়ুব আল আনসারী – এর জায়গায় বসে যায় এবং রাসুল সেখানেই বাসস্থান এবং মসজিদ নির্মাণ করেন। আর এই মসজিদের চারপাশে নয়টি বাড়ি ছিল। কোনোটা খেজুর ডালের, আবার কোনোটা মাটির তৈরি, আবার কোনোটা পাথরের তৈরি। আর এ সকল ঘরের দরজা ছিল মসজিদ বরাবর। এগুলোর মধ্যে একটিতে রাসূল এর দুই মেয়ে উম্মে কুলসুম ও ফাতেমা থাকতেন। তার আরেক মেয়ে রুকাইয়া স্বামী উসমান-এর সাথে থাকতেন। তারপর একদিন আবু বকর বিবাহ সম্পন্ন করার জন্য রাসূল-এর সাথে কথা বলেন, যে চুক্তি মক্কায় তিন বছর আগেই হয়েছিল। ফলে রাসূল সম্মতি দিলেন এবং বিবাহ সম্পন্ন করেন।

পৃষ্ঠা:৩০

৩৫.আয়েশা-এর বিবাহের রাত

আয়েশা নিজেই তার বিবাহের ঘটনা বর্ণনা করেছেন যে, একদা নবীসহ আমাদের বাড়িতে অনেক মানুষ আসল। এমন সময় আমি আমার দোলনায় বসে আছি। আমার মা এসে আমার চুলগুলো ঠিক করে দিলেন এবং পানি দিয়ে আমার মুখ মাসাহ করে আমাকে চুম্বন করলেন। তারপর আমার মা রাসূল যে খাটে বসা আছেন সেই খাটের ওপর আমাকে বসিয়ে দিলেন এবং বললেন, এ হলো আপনার পরিবার। আল্লাহ আপনাকে বরকত দান করুন। তখন আমি ছিলাম নয় বছরের মেয়ে। তারপর এক পেয়ালা দুধ এনে রাসূল-কে দেয়া হলে তিনি তা পান করলেন। পরে আমাকের দুধ দেয়া হয় আমি লজ্জিত অবস্থায় দুধটুকু পান করেছিলাম। আয়েশা ছিলেন খুব সুন্দরী হালকা শরীরের একজন মেয়ে। বিবাহ সম্পন্ন করার পর তিনি তার নতুন বাড়িতে চলে যান। সহীহ মুসলিমে উরওয়াহ হতে বর্ণিত রয়েছে। তিনি বলেন, আয়েশা বলেন, রাসূল আমাকে বিবাহ করেন শাওয়াল মাসে। 

৩৬.হাফসার অবস্থান

তার দাম্পত্য জীবন নতুন স্বামীর সাথে বেশ আনন্দেই কাটাতে আয়েশা শুরু করেন। আর উম্মম্মুল মুমিনীন সাওদা ও তাকে তার দাম্পত্য জীবনে একদিন ও একরাত একরাত করে শরীক করে নেন। আর আয়েশা -এর ভয় ছিল যে, আল্লাহর রাসূল করবেন। আর খাদিজা বেঁচে থাকতে রাসূল তার ওপর আবার বিবাহ কোনো বিষাহ করেননি। হাফসা -এর পর রাসূল অন্যান্য বিবাহ করেন। এমনকি তাঁর স্ত্রীদের সংখ্যা নয় পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তাদের মধ্যে ছিলেন,

পৃষ্ঠা ৩১ থেকে ৪৫

পৃষ্ঠা:৩১

১. যায়নাৰ বিনতে জাহাশ ২. উম্মে কুলসুম বিনতে উমাইয়াহ ৩. জুয়াইরা বিনতে হারেস ৪. উম্মে হাবিবা বিনতে আবু সুফিয়ান ৫. মারিয়াহ আল মিশরী যিনি ছিলেন ইবরাহীমের মা। ৬. রায়হানাহ বিনতে আমর, তিনি ছিলেন বনি কুরাইযা গোত্রের সবচেয়ে সুন্দরী নারী। নবী তাকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণে বিবাহ করেন।

৩৭.আয়েশা এবং উম্মে সালমা

ফাতেমা আল খাযায়ী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আয়েশা -কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, একদিন রাসূল আমার ঘরে প্রবেশ করলেন। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! এতদিন আপনি কোথায় ছিলেন? তিনি বলেন, হে হুমায়রা! আমি উম্মে সালমার কাছে ছিলাম। অতঃপর আমি বললাম, আপনি উম্মে সালমার কাছ থেকে কিসের পরিতৃপ্তি অনুভব করেন? আয়েশা বলেন, অতঃপর তিনি মুচকি হাসলেন। এরপর আবার আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল। আমি আপনার অন্যান্য স্ত্রীদের মতো নই। আপনার প্রত্যেক স্ত্রীই পূর্বে কোনো স্বামীর কাছে ছিল আমি ছাড়া। আয়েশা তখনও তিনি মুচকি হাসেন। বলেন,

পৃষ্ঠা:৩২

৩৮.আয়েশা এবং যায়নাব

আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী যায়নাব বিনতে জাহাশের ঘরে অবস্থান করে মধু পান করতেন। অতঃপর আমি ও হাফসা পরামর্শ করে ঠিক করলাম, আমাদের দু’জনের মধ্যে যার কাছেই নবী আগমন করবেন সে যেন বলে, আমি আপনার মুখ হতে মাগাফীরের গন্ধ পাচ্ছি। আপনি কি মাগাফীর খেয়েছেন? অতঃপর রাসূল তাদের একজনের কাছে আসলে তিনি ঐ কথা বলেন। জবাবে তিনি বলেন, না। বরং আমি যায়নাব বিনতে জাহাশের কাছে মধু পান করেছি। আমি আর কখনো মধু পান করব না। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়।يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ لِمَ تُحَرِّمُ مَا أَحَلَّ اللهُ لَكَ تَبْتَغِي مَرْضَاتَ أَزْوَاجِكَ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌঃঅর্থাৎ হে নবী! আপনি কেন সে বস্তু হারাম করলেন, যা আল্লাহ আপনার জন্য হালাল করেছেন? আপনি কি আপনার স্ত্রীদের খুশি করতে চান? আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূন্ন অধরীম: আয়াত-১)

৩৯,৪০. আল্লাহর পক্ষ হতে সাহায্য

উরওয়াহ্ ইবনে যুবাইর আয়েশা পুল্লল্ল থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, যখন রাসূল কোনো সফরের নিয়ত করতেন, তখন তাঁর স্ত্রীদের মধ্যে লটারি করতেন। তাদের মধ্যে যার নাম উঠতো সফরে তিনি তাঁকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। একদা কোনো একটা যুদ্ধের সময় তিনি লটারি করলেন। তাতে আমার নাম উঠল এবং আমি তাঁর সঙ্গে সফরে রওয়ানা হলাম। এটা পর্দার হুকুম অবতীর্ণ হওয়ার পরের ঘটনা। আমি হাওদায়ে (ছইয়ের ভিতরে) বসলে তা সহ আমাকে

পৃষ্ঠা:৩৩

সওয়ারীতে উঠিয়ে দেয়া হতো এবং ঐভাবেই নামানো হতো। এভাবেই আমাদের সফর চলল। অতঃপর রাসূল যখন ঐ যুদ্ধ শেষ করে ফিরে আসলেন এবং প্রায় মদিনার কাছে পৌঁছে গেলেন, তখন যাত্রা বিরতী দেন। এরপর তিনি রাত্রেই কাফিলা রওয়ানা হওয়ার আদেশ করলেন। রওয়ানা হওয়ার ঘোষণা দেয়া হলে আমি উঠে সৈন্যবাহিনী অতিক্রম করে বাইরে আসলাম এবং আমার কাজ সেরে ফিরে আসলাম। এরপর আমার গলায় হাত দিয়ে দেখতে পেলাম আমার গলার হারটা ছিঁড়ে পড়ে গেছে। অতঃপর আমি আমার হারের সন্ধান করতে লাগলাম এবং খুঁজার ব্যস্ততায় দেরী করে ফেললাম। অতঃপর যারা আমার হাওদাজ (উটের পিঠে) উঠিয়ে দিত ইতোমধ্যে তারা আসল এবং আমি যে উটে আরোহণ করতাম সে উটের পিঠে তা উঠিয়ে দিল। তাদের ধারণা ছিল যে, আমি ভিতরেই আছি। কারণ সে সময় মেয়েরা হালকা পাতলা হতো, ভারী বা মোটাসোটা ও মাংসল হতো না। কেননা; তখন তারা খুব অল্প পরিমাণই খাবার খেতে পেত। সুতরাং হাওদাজ উঠিয়ে দেয়ার সময় লোকেরা বুঝতেই পারেনি যে, আমি তার ভিতরে নেই। তাই উঠিয়ে দিয়েছে। উপরন্তু সে সময় আমি কম বয়সী কিশোরী ছিলাম। অতঃপর তারা উট হাঁকিয়ে চলে যাওয়ার পর আমি আমার হার খুঁজে পেলাম। কিন্তু তাদেরকে পেলাম না। তখন আমি যে স্থানে ছিলাম সেখানেই থেকে যেতে মনস্থ করলাম। আমি মনে মনে ধারণা করলাম, তারা যখন আমাকে পাবে না তখন আমার খোঁজে এখানে ফিরে আসবে এবং আমি বসে থাকলাম। ঘুমে আমার চোখ বন্ধ হয়ে আসলে ঘুমিয়ে পড়লাম। এদিকে সাফওয়ান ইবনে মুআত্তাল, যিনি প্রথমে সুলামী ও পরে যার্কওয়ানী হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তিনিও সৈন্যদলের পেছনে (পরিদর্শক হিসেবে) থেকে গিয়েছিলেন। ভোরে আমার স্থানের কাছাকাছি এসে ঘুমে মগ্ন মানুষের মতো দেখতে পেয়ে আমার নিকট আসলেন। পর্দার নিয়ম নাযিল হওয়ার আগে তিনি আমাকে দেখতে পেতেন। সে তার উট থামিয়ে ইন্নালিল্লাহ পাঠ করলে আমি জেগে উঠলাম। অতঃপর সে তার উটের দুই পা চেপে ধরে রাখলে আমি সওয়ার হলাম। আমাকে নিয়ে তিনি উটের লাগাম ধরে কাফেলার দিকে হেঁটে চললেন।

পৃষ্ঠা:৩৪

এদিকে লোকেরা ঠিক দুপুরে সওয়ারী হতে নেমে আরাম করছিল। সে সময় আমরা গিয়ে সৈন্যদলের সাথে মিলিত হলাম। অতঃপর ধ্বংসযোগ্য লোকেরা ধ্বংসপ্রাপ্ত হলো। অপবাদ আরোপের ব্যাপারে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল নেতৃত্ব দিচ্ছিল। পরে আমরা মদিনায় পৌঁছলাম। আমি একমাস পর্যন্ত অসুস্থ থাকলাম। অপবাদ আরোপকারীদের অপবাদ লোকদের মাঝে ছড়িয়ে পড়তে থাকল। অসুস্থ অবস্থায় আমার সন্দেহ হচ্ছিল যে, এর পূর্বে অসুস্থ হয়ে পড়লে আমি নবী থেকে যে মায়া ও মনোযোগ দেখেছি, (এখন) তা দেখতে পাচ্ছি না। তিনি আসতেন এবং সালাম দিয়ে বলতেন, কেমন আছ? আমি এর কিছুই বুঝলাম না। শেষ পর্যন্ত আমি খুব দুর্বল হয়ে পড়লাম। একদা আমি কিছুটা সুস্থবোধ করলে (একদিন রাতের বেলা) আমি ও মিসতার মা জঙ্গলে পায়খানার জায়গার দিকে (প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার জন্য) বের হলাম। (এজন্য) আমরা শুধু রাতের বেলাতেই বের হতাম। এটা আমাদের ঘরের কাছাকাছি জায়গায় পায়খানা বানানোর আগের ঘটনা। আমরা প্রথম যুগের আরবদের মতো জঙ্গলে কিংবা দূরে গিয়ে প্রয়োজন সেরে আসতাম। আমি ও আবূ রুহমের কন্যা উম্মু মিসতাহ বের হয়ে হাঁটতে থাকলে সে তার কাপড় পেচিয়ে পড়ে গেল এবং বলে উঠল, মিসতা ধ্বংস হোক। আমি তাকে বললাম, তুমি খুব মন্দ কথা বললে। তুমি এমন এক লোককে গালি দিচ্ছ যে বদর যুদ্ধে শরীক হয়েছিল। তখন সে (মিসতার মা) বলল, আরে, অবলা। তারা কি বলেছে তাকি তুমি শুননি? তখন তিনি অপবাদ আরোপকারিদের কথা আমাকে জানালেন। এরপর আমার অসুস্থতা আরো বেড়ে গেল। আমি ঘরে ফিরে আসলে রাসূল (সা:) আমার নিকট এসে জিজ্ঞেস করলেন, কেমন আছ? আমি বললাম, আমাকে আমার পিতামাতার নিকট যাওয়ার অনুমতি দিন। আয়েশা বর্ণনা করেছেন, আমি সে সময় তাদের (আমার পিতামাতা) কাছ থেকে অপবাদ রটনার সংবাদ সম্বন্ধে সঠিকভাবে জানতে আগ্রহী ছিলাম। রাসূল আমাকে অনুমতি দিলে আমি আমার পিতা-মাতার নিকট চলে গেলাম। সেখানে আমার মাকে জিজ্ঞেস করলাম, লোকেরা কি বলে বেড়াচ্ছে? তিনি বললেন, হে আয়েশা। তুমি বিষয়টাকে নিজের জন্য হালকাভাবেই গ্রহণ করো। আল্লাহর কসম! কোনো

পৃষ্ঠা:৩৫

মেয়ে যদি সুন্দরী হয়, তার স্বামীও যদি তাকে ভালোবাসে, আর যদি তার সতীন থাকে তাহলে তারা অনেক কথাই বলে থাকে। আমি বললাম, সুবহানাল্লাহ! লোকেরা এ কথা বলাবলি করছে। অতঃপর সে রাত আমি এমনভাবে কাটালাম যে, ভোর পর্যন্ত চোখের পানি বন্ধ হলো না এবং চোখের দু’টি পাতা এক করতে পারলাম না। এভাবেই রাত কেটে ভোর হলো। পরে ওহি অবর্তীর্ণ বন্ধ থাকার ফলে রাসূল তাঁর স্ত্রীকে (আমাকে) আলাদা করে দেয়ার বিষয়ে পরামর্শের জন্য আলী ইবনে আবি তালিব এবং উসামা ইবনে যায়েদ -কে ডাকলেন। উসামা যেহেতু জানতেন যে, তিনি তার স্ত্রীদেরকে খুবই ভালোবাসেন, তাই তিনি সেভাবেই কথা বললেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর কসম! আপনার স্ত্রী সম্পর্কে আমি তো তাঁদের বিষয়ে ভালো ছাড়া খারাপ কিছু জানি না। আর আলী ইবনে আবি তালিব বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর তরফ থেকে কোনো কিছুই আপনার জন্য সংকীর্ণ বা কঠোর করে দেয়া হয়নি। তাকে ছাড়া স্ত্রীলোক আরো অনেক আছে। বাদিটিকে জিজ্ঞেস করুন সে (এ বিষয়ে) অবশ্যই আপনাকে সঠিক কথা বলবে। সুতরাং রাসূল (বাঁদি) বারীরাকে ডেকে বললেন, হে বারীরা! তুমি কি তার (আয়েশা) মধ্যে সন্দেহজনক কিছু দেখেছ? বারীরাহ্ বলল, না, সেই মহান সত্তার কসম, যিনি আপনাকে সত্য বিধানসহ পাঠিয়েছেন! আমি তাঁর মধ্যে এ ছাড়া আর কোনো কিছুই দোষণীয় দেখিনি যে, কম বয়সী হওয়ার কারণে তিনি আটার খামির রেখে ঘুমিয়ে পড়েন আর বকরি এসে তা খেয়ে ফেলত। অতঃপর রাসূল সে দিনই খুতবা দিতে দাঁড়ালেন এবং আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুলের মুকাবিলায় সহযোগিতা চাইলেন। রাসূল বললেন, ঐ লোকের মুকাবিলায় আমাকে কে সাহায্য করবে যে আমার পরিবার সম্পর্কে আমাকে কষ্ট দিচ্ছে? আল্লাহর কসম! আমার স্ত্রী সম্পর্কে আমি ভালো ছাড়া অন্য কোনো কিছুই জানি না। আর লোকেরা এমন এক লোককে জড়িয়ে কথা বলছে যার সম্পর্কেও আমি ভালো ছাড়া অন্য কোনো কিছুই জানি না। আর সে তো আমার সঙ্গে ছাড়া আমার স্ত্রীদের সম্মুখে যেত না।

পৃষ্ঠা:৩৬

তখন (আওস গোত্রের) সা’দ (ইবনে মুআয় আনসারী) দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর কসম। তার মুকাবিলায় আমি আপনাকে সাহায্য করব। সে যদি আওস সম্প্রদায়ের লোকও হয়ে থাকে, আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেব। আর যদি আমাদের ভাই খাযরাজ সম্প্রদায়ের লোক হয়ে থাকে, তাহলে আপনি আদেশ করুন তার বিষয়ে আমরা আপনার আদেশ পালন করব। এরপর খাযরাজ সম্প্রদায়ের নেতা সা’দ ইবনে উবাদাহ উঠে দাঁড়ালেন। এর আগে তিনি একজন সৎ ও মেক্কার লোক ছিলেন। কিন্তু সম্প্রদায়ের প্রতি অনুরাগ তাকে উত্তেজিত করে তুলল। তিনি বললেন, তুমি মিথ্যা বলেছ। আল্লাহর শপথ! তুমি তাকে হত্যা করতে পারবে না এবং সে সামর্থও তোমার নেই। সঙ্গে সঙ্গে উসাইদ ইবনে হুযাইর উঠে বললেন, তুমি মিথ্যা বলছ। আমরা নিশ্চয় তাকে হত্যা করে ছাড়ব। তুমি একটা মুনাফিক। তাই মুনাফিকের পক্ষ নিয়ে বিবাদ করছ। এরপর আওস ও খাযরাজ উভয় সম্প্রদায়ই তৈরি হয়ে লড়াই করতে অগ্রসর হলো। রাসূল তখনও মিম্বারের ওপর ছিলেন। তিনি মিম্বার থেকে নেমে সবাইকে নিরন্ত করলেন। ফলে সবাই থেমে গেল এবং তিনিও থেমে গেলেন, কিন্তু আর কিছু বললেন না। আয়েশা বলেন, অতঃপর আমি সারাদিন কাঁদতে থাকলাম। আমার অশ্রু বন্ধ হলো না কিংবা সামান্যতম সময়ও ঘুমের পরশ পেলাম না। আমার পিতামাতা আমার পাশেই থাকতেন। ইতোমধ্যে ক্রন্দনরত অবস্থায় একটা রাত ও দিন অতিবাহিত হয়ে গেল। আমার মনে হলো, ক্রমাগত কান্নায় আমার কলিজা বিদীর্ণ হয়ে যাবে। তাঁরা (আমার পিতামাতা) উভয়ে আমার পাশে বসা ছিলেন আর আমি কাঁদছিলাম। সে সময় একজন আনসারী মহিলা (বাড়ির ভিতরে) আসার অনুমতি চাইলে আমি তাকে অনুমতি দিলাম। সেও আমার পাশে বসে কাঁদতে শুরু করল। এমন সময় রাসূল প্রবেশ করে (আমার পাশে) বসলেন। অথচ যেদিন থেকে অপবাদ রটানো হয়েছে তারপর থেকে তিনি আমার পাশে আর বসেননি। ইতোমধ্যে একমাস অতিবাহিত হয়ে গেছে। ওহি অবতীর্ণ করে আমার বিষয়ে রাসূল-কে কিছুই জানানো হয়নি। তিনি তাশাহহুদ পড়ে আমাকে বললেন, হে আয়েশা! তোমার সম্পর্কে আমি এরূপ এরূপ কথা শুনেছি। তুমি যদি নির্দোষ ও নিষ্পাপ হয়ে থাক, তাহলে অচিরেই আল্লাহ তোমার নির্দোষ হওয়ার কথা অবতীর্ণ করবেন। আর যদি তুমি পাপ কাজে লিপ্ত

পৃষ্ঠা:৩৭

হয়ে থাক, তাহলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও এবং তাওবাহ্ কর। কেননা, বান্দা যখন পাপ স্বীকার করে তাওবা করে আল্লাহ তার তাওবা কবুল করেন। রাসূল তাঁর কথা শেষ করলে আমার অশ্রু বন্ধ হয়ে গেল। এমনকি আমি এক বিন্দু অশ্রুও অনুভব করলাম না। তখন আমি আমার পিতাকে বললাম, আমার পক্ষ থেকে রাসূল-কে জওয়াব দিন। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! আমি বুঝতে পারছি না রাসূলকে কি জওয়াব দেব? তখন আমার মাকে বললাম, আমাকে রাসূল যা বললেন আমার পক্ষ থেকে তার জওয়াব দিন। তিনিও (আমার মা) বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি বুঝতে পারছি না যে, রাসূল -কে কি জওয়াব দেব? তখনো আমি ছিলাম কম বয়সী কিশোরী, ফলে আমি কুরআন বেশি পড়িনি। তবুও আমি বললাম, আল্লাহর কসম। আমি জানি লোকেরা যা বলাবলি করছে তা আপনারা শুনেছেন এবং তা আপনাদের মনে বদ্ধমূল হয়ে গেছে। আর তা আপনারা সত্য বলে ধরে নিয়েছেন। আমি যদি বলি, আমি নির্দোষ ও নিষ্পাপ, আর আল্লাহ তো জানেন যে, আমি নির্দোষ ও নিস্পাপ তাহলেও আপনারা ঐ বিষয়ে আমাকে বিশ্বাস করবেন না। আর যদি আমি আপনাদের কাছে বিষয়টা স্বীকার করি, আল্লাহর কসম! তিনি জানেন এ বিষয়ে আমি নিস্পাপ ও নির্দোষ, তাহলে আপনারা আমাকে বিশ্বাস করবেন। আল্লাহর কসম! ইউসুফ (আ)-এর পিতাকে ছাড়া আমি আপনাদের ও আমার জন্য কোনো উদাহরণ খুঁজে পাচ্ছি না। অতঃপর তিনি বলেছিলেন, “ধৈর্যই (এখন আমার জন্য) উত্তম। তোমরা যা কিছু বলছ সে বিষয়ে আল্লাহই আমার সাহায্যকারী-” (সূরা ইউসুফ ১৮)। অতঃপর আমি বিছানায় পাশ ফিরলাম। আমি আশা করছিলাম যে, আল্লাহ আমাকে পবিত্র ও নির্দোষ ঘোষণা করবেন। কিন্তু আল্লাহর কসম! আমি কখনো ধারণ করিনি যে, আমার বিষয়ে ওহি অবতীর্ণ হবে। আমি নিজেকে এতটুকু যোগ্যও মনে করতাম না যে, আমার ব্যাপারে কুরআনের আয়াত আসবে। তবে আমি এ মর্মে আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতাম যে, রাসূল আমার পবিত্রতা ও নির্দোষিতা বিষয়ে স্বপ্ন দেখবেন। আল্লাহর কসম! তিনি তাঁর জায়গা ছেড়ে তখনও উঠে পড়েননি, আর বাড়ির অপর কেউ বের হয়ে পড়েননি, ঠিক তখনি তাঁর ওপর ওহি অবতীর্ণ হল। ওহি অবতীর্ণের আগের সময়ে তাঁর যে কষ্টকর অবস্থা হতো তাই আরম্ভ ঢুলো। এমনকি এ অবস্থায় শীতের দিনেও তাঁর শরীর

পৃষ্ঠা:৩৮

থেকে মুক্তার বিন্দুর মতো ঘাম বের হতো। রাসূল-এর এ অবস্থা দূর হলে তিনি হাসলেন। তিনি সর্বপ্রথম যে কথাটা বললেন তা হলো, হে আয়েশা! আল্লাহর প্রশংসা কর। আল্লাহ তোমাকে পবিত্র ও নিষ্পাপ ঘোষণা করেছেন। তখন আমার মা আমাকে বললেন, উঠে রাসূলকে সম্মান দেখাও। আমি বললাম, না, তা করব না। আল্লাহর প্রশংসা ব্যতীত আমি আর কিছুই করব না। মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ আয়াত অবতীর্ণ করেছিলেন,ঃإِنَّ الَّذِينَ جَاءُ وَ بِالْإِفْكِ عُصْبَةٌ مِنْكُمْ لَا تَحْسَبُوهُ شَرًّا لَّكُمْ بَلْ هُوَ خَيْرٌ لكُمْ لِكُلِّ امْرِي مِنْهُمْ مَا اكْتَسَبَ مِنَ الْإِثْمِ وَالَّذِي تَوَلَّى كِبْرَهُ مِنْهُمْ لَهُ عَذَابٌ عَظِيمٌ – لَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بِأَنْفُسِهِمْ خَيْرًا وَقَالُوا هَذَا إِفَلَهُ مُّبِينٌ – لَوْلَا جَاءُوا عَلَيْهِ بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَإِذْ لَمْيأْتُوا بِالشُّهَدَاءِ فَأُولَئِكَ عِنْدَ اللهِ هُمُ الْكَاذِبُونَ – وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِعَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ لَمَسَّكُمْ فِي مَا أَفَضْتُمْ فِيْهِ عَذَابٌعَظِيمٌ – إِذْ تَلَقَّوْنَهُ بِأَلْسِنَتِكُمْ وَتَقُولُونَ بِأَفْوَاهِكُمْ مَّا لَيْسَ لَكُمْ بِهِعِلْمٌ وَتَحْسَبُونَهُ هَيِّنًا وَهُوَ عِنْدَ اللهِ عَظِيمٌ – وَلَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ قُلْتُمْ مَّايَكُونُ لَنَا أَنْ نَتَكَلَّمَ بِهَذَا سُبْحَانَكَ هُذَا بُهْتَانٌ عَظِيمٌ – يَعِظُكُمُ اللَّهُ أَنْتَعُودُوا لِمِثْلِهِ أَبَدًا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ – وَيُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمُ الْآيَاتِ وَاللَّهُعَلِيمٌ حَكِيمٌ – إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّوْنَ أَنْ تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوالَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَاللهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ – وَلَوْلَافَضْلُ اللهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ وَأَنَّ اللهَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ – يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوالَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ وَمَنْ يَتَّبِعُ خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ فَإِنَّهُ يَأْمُرُبِالْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ وَلَوْلَا فَضْلُ اللهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ مَا زَكَى مِنْكُمْ مِنْ

পৃষ্ঠা:৩৯

أَحَدٍ أَبَدًا وَلَكِنَّ اللَّهَ يُزَنِّى مَنْ يَشَاءُ وَاللهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ – وَلَا يَأْتَلِ أُولُو الْفَضْلِ مِنْكُمْ وَالسَّعَةِ أَنْ يُؤْتُوا أُولِي الْقُرْبَى وَالْمَسَاكِينَ وَالْمُهَاجِرِينَ فِي سَبِيلِ اللهِ وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوْا اَلَا تُحِبُّونَ أَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُوْرٌرَّحِيمঃ“যারা এ অপবাদ আরোপ করেছে তারা তোমাদের মধ্যেকারই একদল লোক। এটাকে তোমরা তোমাদের জন্য খারাপ মনে করো না; বরং তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর তাদের প্রত্যেক লোক যে পাপ অর্জন করল তা তার জন্য নির্দিষ্ট থাকবে। আর যে এ বিষয়ে বড় অংশ অর্জন করবে তার জন্য রয়েছে বড় আযাব। তোমরা যখন তা শুনলে তখন ঈমানদার নারী ও পুরুষেরা নিজেদের সম্পর্কে ভালো ধারণা পোষণ করলে না কেন? তারা কেন বললে না যে, এটা একটা অপবাদ। এ বিষয়ে তারা কেন চারজন সাক্ষী আনলো না। সুতরাং যখন তারা সাক্ষী আনতে ব্যর্থ হয়েছে তখন নিজেরাই আল্লাহর কাছে মিথ্যাবাদী। দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহর ফযল ও রহমত যদি তোমাদের প্রতি না হতো তাহলে যা তোমরা করেছ সেজন্য তোমাদের ওপর বড় দুর্যোগ নেমে আসত। যখন তোমরা জিহ্বায় এমন একটা বিষয় আওড়াচ্ছিলে আর মুখে মুখে উচ্চারণ করছিলে যে বিষয় সম্পর্কে তোমাদের কিছুই জানা ছিল না। আর একে খুবই সহজ ব্যাপার মনে করছিলে। কিন্তু আল্লাহর নিকট তা ছিল ভয়ানক। যখন তোমরা ঐ কথা শুনলে তখন কেন বললে না যে, এ সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা করা আমাদের উচিত নয়। হে আল্লাহ। তুমি মহান ও পবিত্র, আর এটা হলো মারাত্মক অপবাদ। তোমরা ঈমানদার হয়ে থাকলে পুনরায় অনুরূপ কাজ না করার জন্য আল্লাহ তোমাদের আদেশ দান করছেন, আর তার হুকুম স্পষ্ট বর্ণনা করে শুনাচ্ছেন। তিনি সর্বাপেক্ষা গুণী ও বিজ্ঞ। যারা ঈমানদারদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে দেয়া পছন্দ করে, দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে। আল্লাহ সব কিছু জানেন কিন্তু তোমরা জান না। আল্লাহর ফযল ও রহমত তোমাদের প্রতি না হলে (তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যেতে)। “আল্লাহ দয়ালু ও মেহেরবান।” (সূরা আন-নূর। আয়াত-১১-২০)

পৃষ্ঠা:৪০

আবু বক্স সিদ্দীক আত্মীয়তার কারণে মিসতা ইবনে উসামার জন্য ব্যয় করতেন। আমার পবিত্রতা সম্পর্কে আল্লাহ এসব আয়াত অবতীর্ণ করলে তিনি বলেন, আমি মিসতাহর জন্য কিছুই ব্যয় করব না। কারণ সে আয়েশার বিরুদ্ধে অপবাদ রটিয়েছে। এ সময় আল্লাহর এ নির্দেশ অবতীর্ণ হয়-يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ وَمَنْ يَتَّبِعْ خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ فَإِنَّهُ يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ مَا زَكَى مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ أَبَدًا وَلَكِنَّ اللَّهَ يُرَبِّي مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ “তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহর নিম্নমত প্রাপ্ত ও স্বচ্ছলতার অধিকারী তারা আল্লাহর রাস্তায় আত্মীয়-মিসকীন ও মুহাজিরদেরকে না দেয়ার জন্য যেন শপথ না করে; বরং তাদের উচিত ক্ষমা করে দেয়া ও ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা। তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ তোমাদের মাফ করে দিন। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছু শোনেন এবং জানেন। (দূর খান-দূর। আয়াত-২১) তখন আবূ বক্র ন্দ্র বললেন, আল্লাহ আমাকে মাফ করে দিন তাই আমি পছন্দ করি। তিনি মিসতাহকে এর আগে যা দিতেন তাই দিতে থাকলেন। রাসূলযায়নাব বিনতে জাহাশকে আমার বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, হে যায়নাব! আয়েশার ব্যাপারে তুমি কি জান এবং কি দেখেছ? জওয়াবে তিনি বলেছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল। আমি আমার কান ও চক্ষুকে রক্ষা করেছি। আল্লাহর কসম! আমি তাঁর সম্পর্কে ভালো ছাড়া খারাপ কিছুই জানি না। আয়েশা বলেন, তিনিই (যাইনার) আমার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। কিন্তু পরহেযগারী ও আল্লাহভীতির কারণে আল্লাহ তাঁকে রক্ষা করলেন।

পৃষ্ঠা:৪১

৪১.আয়েশা-এর হিজরত

ওয়াকিদ এবং ইবনে জারির বর্ণনা করেন। যখন আবদুল্লাহ ইবনে আরিকাত আদ দাইলী মদিনা থেকে মক্কায় ফিরে যায়, তখন রাসূল ও আবু বকর উভয়ে যায়েদ ইবনে হারেস ও রাফেকে তার সাথে প্রেরণ করেন। আর তারা উভয়ে ছিল রাসূল-এর দাস। যাতে করে তারা মক্কা থেকে তাদের পরিবারকে মদিনায় নিয়ে আসতে পারে সে জন্য তিনি তাদেরকে দুটি বাহনে পঞ্চাশ দিরহাম দিলেন। তারপর তারা আবু বকর ভূদ্র-এর স্ত্রী, রাসূল-এর দুই মেয়ে ফাতেমা ও উম্মে কুলসুম এবং দুই স্ত্রী আয়েশা ও সাউদা ট্রে-কে নিয়ে আসেন। আয়েশা বলেন, অতঃপর আমি একজন ঘোষণাকারীকে ঘোষণা করতে শুনেছি যে, আল্লাহর অনুমতির মাধ্যমে আমরা নিরাপদ হয়ে গেলাম।

৪২.নবী-এর ঘরে আয়েশা

আয়েশা যখন নবী ঘরে উঠেন তখন তিনি ছিলেন খুবই অল্প বয়সী। আয়েশা বলেন, তখন আমি নবী-এর সামনে বাচ্চাদের সাথে খেলা করতাম। আর আমার অনেক খেলার সাথি ছিল। যখন রাসূল আমাদেরকে সাথে পেতেন, তখন তিনি আমাদেরকে খুব আনন্দ দিতেন এবং আমাদের সাথে খেলা করতেন। আয়েশা আরো বলেন, একদিন আমার কাছে দুটি বাচ্চা ছিল, যারা আমার সাথে খেলা করছিল। এমন সময় আবু বকর ন্দ্রে এসে তাদেরকে খেলা বন্ধ করার জন্য ধমক দিলেন। তখন রাসূল বলেন, তাদেরকে খেলতে দাও।

পৃষ্ঠা:৪২

৪৩.আয়েশা-এর বর্ণনা

আয়েশা বলেন, একদা রাসূল বাচ্চাদের খেলার শব্দ শুনতে পেলেন। তখন তারা বর-কনে সাজিয়ে চারপাশে বসে খেলা করছিল। এমতাবস্থায় রাসূল (সা:) আয়েশা -কে বলেন, হে আয়েশা। এদিকে দেখ তো। অতঃপর আমি আসলাম এবং আমার থুতনি রাসূল-এর কাধের ওপর রাখলাম। আর আমি রাসূল (সা:)-এর দুই কাধের ওপর দিয়ে দেখতে ছিলাম। তখন রাসূল বলেন, তুমি কি তৃপ্তি পাচ্ছ না? আয়েশা বলেন, অতঃপর আমি বললাম, না। আর আমি এটা জন্য বলি, যাতে করে আমি তাঁর নিকট আমার অবস্থানটা লক্ষ্য করতে পারি। কিছুক্ষণ পর ওমর পুত্র আসলেন। আয়েশা বলেন, অতঃপর সকলেই খেলা বন্ধ করে দিলেন। তখন রাসূল বললেন, আমি জিন অথবা মানুষের মধ্য হতে কোনো শয়তানকে দেখতে পাচ্ছি না। নিশ্চয়ই তারা ওমরকে দেখে পালিয়ে গেছে।

88.শৈশব

আয়েশা-এর শিশু অবস্থা হতে বেড়ে উঠাটা লক্ষ্য আল্লাহর রাসূল করলেন। আর তার স্বাভাবিক আচার-আচারণ সবাইকেই আনন্দ দেয়। আয়েশা বর্ণনা করে বলেন, রাসূল তাবুক অথবা খায়বার থেকে ফিরে আসেন। আর এমন সময় তাঁর খেলনাতে পর্দা দেয়া ছিল। হঠাৎ করে বাতাস এসে তার খেলনার এক পাশের পর্দার কিছু অংশ উঠিয়ে দেয়। তখন রাসূল বলেন, হে আয়েশা! এটি কি? আয়েশা বলেন, এটা আমার মেয়ে (আসলে তার খেলার পুতুল বিশেষ) তারপর তিনি দুটি পাখা বিশিষ্ট একটি মাটির ঘোড়া দেখতে পান। তখন তিনি বলেন, এটা কি? তিনি বলেন, ঘোড়া। রাসূল বলেন, তার ওপর ঐ দুটা কি? তিনি বললেন, পাখা। রাসূল বললেন, ঘোড়ার কি পাখা হয়? আয়েশা বলেন, আপনাকি শুনেননি সুলাইমান (আ)-এর ঘোড়ার দুটি পাখা ছিল? রাবী বলেন, তখন রাসূল সে দেন, এমনকি তার দুই চোয়ালের দাঁত দেখা যাচ্ছিল।

পৃষ্ঠা:৪৩

৪৫.আয়েশা ও মদিনার মহামারি

আয়েশা বলেন, রাসূল যখন মদিনায় আসলেন তখন সেখানে জ্বরের মহামারি চলছিল। তখন সাহাবীরা সবাই একে একে অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন। অতঃপর রাসূল-এর আগমনের কারণে আল্লাহ তায়ালা মদিনা হতে এ বিপদ দূর করে দেন। আয়েশা বলেন, আবু বকর  আমের ইবনে ফুহাই টু এবং আবু বকর এর দাস বেলাল একই বাড়িতে ছিলেন এবং তারাও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে গিয়েছিলেন। অতঃপর আমি তাদের কাছে গেলাম এবং তাদেরকে আহবান করলাম। আর এ ঘটনা ছিল আমাদের ওপর পর্দার বিধান নাযিল হওয়ার পূর্বে।।

৪৬.আয়েশা ও খাদিজা

আয়েশা ও খাদিজা উভয়ই ছিলেন রাসূল-এর স্ত্রী। উভয়ই ছিলেন রাসূল এর সবচেয়ে বেশি প্রিয়প্রাত্র। যার প্রমাণ রাসূল-এর কথা ও কাজের মাধ্যমেই পরিলক্ষিত হয়। তবে উভয় কখনো একই সাথে রাসূল-এর স্ত্রী হিসেবে থাকেননি। একজন মারা যাওয়ার পর, অপরজন তার স্থান দখল করেন। উভয়েই নিজ নিজ দক্ষতার দ্বারা রাসূল-এর হৃদয়ের সবচেয়ে বড় জায়গাটি দখল করে নিয়েছিলেন। শ্রেষ্ঠত্বের দিক দিয়ে কেউ কারো চেয়ে কম অগ্রসর হননি। তবে খাদিজা -এর দিকেই পাল্লাটা একটু ভারি। আয়েশা (রা:) বলেন, রাসূল খাদিজাকে যতটুকু ভালোবাসতেন তার অন্যান্য স্ত্রীকে ততটুকু ভালোবাসতেন না। আমি রাসূল-এর কাছে তার আলোচনা অনেক শুনেছি। আমার বিবাহের পূর্বেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। যখনই আমি তার ব্যাপারে কোনো কিছু শুনতাম, তখন তা মনে রাখতাম। একদা শুনতে পেলাম যে, আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীকে আদেশ করেন যে, তিনি যেন খাদিজাকে জান্নাতের মধ্যে একটি ঘরের সুসংবাদ দেন। তাছাড়া যখনই রাসূল কোনো ছাগল জবাই করতেন, তখন তা খাদিজার বন্ধুদেরকে সেখান থেকে হাদিয়া দিয়ে দিতেন।

পৃষ্ঠা:৪৪

অন্য বর্ণনায় আয়েশা বলেন, রাসূল খাদিজাকে যতটুকু ভালোবাসতেন তার অন্যান্য স্ত্রীকে ততটুকু ভালোবাসতেন না। আমি তাকে দেখিনি, তবে রাসূল খুব বেশি করে তার আলোচনা করতেন। আবার কখনো কখনো ছাগল যবাই করে তার বন্ধু-বান্ধবদের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। ফলে কখনো আমি বলে ফেলতাম, দুনিয়াতে খাদিজা ছাড়া আর কোনো মেয়ে নেই? তখন তিনি বলতেন, সে তো আছেই; তার ওপর আমি তার কাছ থেকে সন্তানও পেয়েছি। অন্য বর্ণনায় আয়েশা আরো বলেন, হে আল্লাহর রাসূল আপনাকে আল্লাহ তার চেয়ে আরো ভালো স্ত্রী দান করেছেন। তখন তিনি বলেন, তার চেয়ে উত্তম আল্লাহ আমাকে দেননি। সবাই যখন আমাকে অবিশ্বাস করেছিল, তখন সে আমার ওপর ঈমান এনেছে। সবাই যখন আমাকে মিথ্যাবাদী বলেছে তখন সে আমাকে সত্যবাদী বলেছে। আমাকে মানুষ যখন বঞ্চিত করেছে তখন সে আমাকে সান্ত্বনা দিয়েছে। আর আল্লাহ তাঁর পক্ষ থেকে আমাকে ছেলে সন্তান দান করেছেন।

৪৭.আয়েশা ও উম্মে সালমা

আয়েশা শু রাসূলের দুই স্ত্রী উম্মে সালমা এবং যয়নাব বিনতে জাহাশ। প্রথম স্ত্রী ছিল খুবই জ্ঞানী নবী-কে পরামর্শ দিতেন। আর তিনি হলেন হিন্দা বিনতে উমাইয়া। আর রাসূল-এর সাথে দুই হিজরতের সময় সাথি ছিলেন। তার দোয়ার কারণে তার স্বামীর মৃত্যুর পর আল্লাহর ইঙ্গিতেই তিনি তাকে বিবাহ করেন। রাসূল-কে বলতে শুনেন যে, নিশ্চয় আমরা আল্লাহর নিকটই ফিরে যাই। হে আল্লাহ! আমার এই বিপদ থেকে আমাকে মুক্তি দান করুন। তার শহীদ স্বামী আবু সালমা -এর দোয়া কবুলের কারণে তিনি দোয়া করেন, হে আল্লাহ! আমাকে উম্মে সালমার জন্য আমার পরে আরো চিন্তিত একটি স্বামী মিলিয়ে দিও। তুমি তাকে চিন্তিত বা কোনো প্রকার কষ্টে ফেল না। আবু সালমা যখন মৃত্যুবরণ করেন তখন উম্মে সালমা বললেন, আবু সালমার চেয়ে উত্তম কে আছে। এখানে কি রাসূল-এর চেয়ে উত্তম কেউ আছে। তাকে তাই রাসূল বিবাহ করেন।

পৃষ্ঠা:৪৫

৪৮. ঈর্ষার কারণ

উম্মে সালমা-এর প্রতি উন্মুল মু’মিনীন আয়েশা -এর ঈর্ষার কারণ হচ্ছে, তিনি মনে করতেন যে, রাসূল বিবাহ করেননি; বরং তার প্রতি রাসূল তাকে অন্যদের ন্যায় শুধু মানবীয় কারণেই এর অতিরিক্ত ভালোবাসাও ছিল। হিন্দা বিনতে হারেস আল ফারেসীয়া বলেন, রাসূল বলেন, আয়েশার প্রতি আমার এক অন্য রকম মহব্বত ছিল যা অন্য কারো জন্য ছিল না। অতঃপর তিনি যখন উম্মে সালমাকে বিবাহ করলেন তখন এই মহব্বত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি চুপ থাকলেন। এ থেকে বুঝা যায় যে, উম্মে সালমার প্রতি তাঁর মহব্বত ছিল। আমেনা বলেন, যখন রাসূল আমার নিকট আসলেন তখন বললাম এতক্ষণ আপনি কোথায় ছিলেন? তিনি বলেন, হে হুমায়রা! আমি উম্মে সালমার কাছে ছিলাম। তখন তিনি বলেন, আপনি উম্মে সালমার প্রতি বেশি আশক্ত? এই কথা শুনে তিনি মুচকি হাসলেন। এ ঈর্ষার অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে, উম্মে সালামার কাছে যে জিনিস আছে তা আয়েশা -এর কাছে থাকত না। তাছাড়া আয়েশা -এর ঘরে ওহি অবতীর্ণ হতো। আর এটি নিয়ে রাসূল এর স্ত্রীরা গর্ব করত। কিন্তু যখন তিনি উম্মে সালমাকে বিবাহ করেন, তখন থেকে ওহি তার ঘরেই অবতীর্ণ হতো।

৪৯.আবু লুবাবার তওবা

একদা উম্মে সালামার ঘরে আবু লুবাবার তওবা সংক্রান্ত ওহি নাযিল হয়। আর আবু লুবাবা ছিল ঐ ব্যক্তি, যিনি বনু কুরাইযার ব্যাপারে রাসূল হত্যার ফায়সালাটি ইশারার মাধ্যমে তাদের নিকট প্রকাশ করে দেন। এতে তিনি মনে করেন যে, এর মাধ্যমে সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্য হয়ে গেলেন। যার ফলে তিনি নিজেকে মসজিদের খেজুরের খুঁটির সাথে ছয় রাত বেঁধে রাখেন এবং কসম করেন যে, যতক্ষণ না রাসূল নিজেকে মুক্ত করবে না। রাসূল তাকে মুক্ত না করেন ততক্ষণ পর্যন্ত সে যখন বিষয়টি জানতে পরলেন তখন বললেন, যতক্ষণ না আল্লাহ তার তওবা কবুল না করেন ততক্ষণ পর্যন্ত আমি তাকে মুক্ত করব না। এরপর উম্মে সালমার ঘরে প্রত্যুষে তার ব্যাপারে আয়াত নাযিল হয়। উম্মে সালমা বলেন, যখন এ আয়াত নাযিল হয়, আমি রাসূল

পৃষ্ঠা ৪৬ থেকে ৬০

পৃষ্ঠা:৪৬

এর হাসি শুনতে পেলাম। ফলে আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকে কিসে হাসাল?জবাবে রাসূল বলেন, আবু লুবাবার তওবা কবুল করা হয়েছে। তারপর তিনি নাযিলকৃত আয়াতটি তিলাওয়াত করে শুনান। আয়াতটি হলো, وَأَخَرُونَ اعْتَرَفُوا بِذُنُوبِهِمْ خَلَطُوا عَمَلًا صَالِحًا وَآخَرَ سَيْئًا عَسَى اللَّهُ أَنْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ: অর্থাৎ আর অন্য কতক লোক তাদের অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছে। তারা একটা সৎ কাজের সাথে আরেকটি মন্দ কাজকে মিশ্রিত করে নিয়েছে। আশা করা যায়, আল্লাহ তাদের প্রতি দয়ার দৃষ্টি নিক্ষেপ করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল ও অতীব দয়ালু। (সূরা তাওবা। আয়াত-১০২)তখন উম্মে সালামা বললেন, আমি কি এই সুসংবাদ দিব না? তিনি বলেন, হ্যাঁ! যদি তুমি চাও তবে দিতে পার। অতঃপর তিনি তার দরজায় দাঁড়ালেন এবং বললেন, হে আবু লুবাবা! সুসংবাদ গ্রহণ কর, আল্লাহ তোমার তওবা কবুল করেছেন। অতঃপর রাসূল তাকে ফজরের নামাযের সময় মুক্ত করে দেন।

৫০.তাবুক যুদ্ধের ঘটনা

অনুরূপ ঘটনা ঘটে তাবুক যুদ্ধে। যখন সাহাবীরা সকলেই যুদ্ধে চলে গিয়েছিল, কিন্তু তিনজন বিশ্বস্ত সাহাবী যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পেছনে পড়ে গিয়েছিলেন। তারা খাঁটি মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র নিজেদের অলসতা ও বেখেয়ালের কারণে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে ব্যর্থ হন। ফলে তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে আল্লাহর কাছে তওবা করেন। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাদের শাস্তিস্বরূপ এবং মুসলমানদের শিক্ষার জন্য তাদের তওবা কবুল করতে বিলম্ব করেন। কাব বিন মালেক, যিনি ছিলেন সে তিনজনের একজন। তিনি বলেন, যখন রাতের শেষ এক তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকে তখন আল্লাহ তায়ালা আমাদের তওবার ব্যাপারে আয়াত নাযিল করেন। এমতাবস্থায় রাসুল উম্মে সালামার ঘরে অবস্থান করতে ছিলেন। তখন রাসূল বলেন, হে উম্মে সালমা। কাবের তওবা কবুল করা হয়েছে।

পৃষ্ঠা:৪৭

৫১.আয়েশা ও যায়নাব বিনতে জাহাশ

উন্মুল মুমিনীন আয়েশা রাসূল এর স্ত্রীদের মধ্যে উম্মে সালামার পরে যার সাথে বেশি ঈর্ষা পোষণ করত তিনি হচ্ছে উম্মুল মুমিনীন যায়নাব বিনতে জাহাশ । যখন আয়েশা শু উম্মে সালমা -এর ব্যাপারে ঈর্ষার কথা হাফসাকে জানালেন তখন হাফসা তাকে নসিহত করলেন এবং স্মরণ করিয়ে দিলেন বেশি বয়সের ব্যাপারে; বরং তাকে নসিহত করলেন তার চেয়ে উত্তম স্ত্রীর ব্যাপারে ঈর্ষা করতে। যখন উম্মে সালমার ব্যাপারে সবাই অথবা কেউ কেউ এরূপ ঈর্ষা পোষণ করতে আরম্ভ করলেন, তখন আল্লাহ তায়ালা রাসূলকে সম্ভ্রান্ত কুরাইশী বংশের মেয়ে এবং নিজের চাচাতো বোন যায়নাব বিনতে জাহাশ আল আসাদী বিনতে উমাইয়া বিনতে আব্দুল মুত্তালিবকে বিবাহ করতে আদেশ দিলেন। আর এটি ছিল তৎকালীন আরব সমাজের পালক পুত্রের সন্তানকে বিবাহ করা যাবে না এ প্রথাকে বাতিল করার জন্য। কেননা, যায়নাব ছিলেন রাসূলের পালক পুত্র যায়দ-এর স্ত্রী। যে কারণে যায়েদ ট্রে-কে যায়েদ ইবনে মুহাম্মদ বলে ডাকা হতো। কিন্তু পরবর্তীতে আল্লাহ তায়ালা তাকে তার মূল নামে ডাকার জন্য আদেশ দিয়ে এ আয়াত নাযিল করেন যে,أَدْعُوهُمْ لِآبَائِهِمْ هُوَ أَقْسَطُ عِنْدَ اللهِ فَإِنْ لَمْ تَعْلَمُوا آبَاءَهُمْ فَإِخْوَانُكُمْ في الدِّينِ وَمَوَالِيْكُمْ وَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ فِيمَا أَخْطَأْتُمْ بِهِ وَلَكِنْ مَا تَعَمَّدَتْ قُلُوبُكُمْ وَكَانَ اللَّهُ غَفُوْرًا رَّحِيمًاঃ অর্থাৎ তোমরা তাদেরকে তাদের পিতার নাম ধরে আহ্বান কর। আর আল্লাহর কাছে অধিক ন্যায়। (সূরা আহযান। আয়াত-৫) ফলে তার নাম হয়ে যায় যায়েদ ইবনে হারেসা।

পৃষ্ঠা:৪৮

তৎকালীন আরবে এই রীতি ছিল যে, শাপক পুত্রের তালাক দেয়া স্ত্রীকে বিবাহ করা হারাম। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা এ রীতিকে বাতিল করার জন্য রাসূল-কে যায়েদ ইবনে হারেসা -এর তালাককৃত স্ত্রীকে বিবাহ করার আদেশ দেন, যাতে করে এটি একটি অনুসরণযোগ্য দৃষ্টান্তে রূপ নেয় এবং এতে কেউ কোনো ধরনের অসুবিধা মনে না করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-وَإِذْ تَقُولُ لِلَّذِي أَنْعَمَ اللهُ عَلَيْهِ وَأَنْعَمْتَ عَلَيْهِ أَمْسِكَ عَلَيْكَ زَوْجَكَ وَاتَّقِ اللهَ وَتُخْفِى فِي نَفْسِكَ مَا اللهُ مُبْدِيْهِ وَتَخْشَى النَّاسَ وَاللَّهُ أَحَقُّ أَنْ تَخْشَاهُ فَلَمَّا قَضَى زَيْدٌ مِنْهَا وَطَرًا زَوَّجْنَاكَهَا لِكَيْلَا يَكُونَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ حَرَجٌ فِي أَزْوَاجِ أَدْعِيَاتِهِمْ إِذَا قَضَوْا مِنْهُنَّ وَطَرًا وَكَانَ أَمْرُ اللَّهِ مَفْعُولًاঃঅর্থাৎ অতঃপর যখন যায়েদ যায়নাবের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করল তখন আমি তাকে তোমার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করে দিলাম্। যাতে করে মুনিদের পোষ্যপুত্ররা তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলে সেসব নারীকে বিবাহ করার ব্যাপারে কোনো বিঘ্ন না হয়। আর আল্লাহর আদেশ কার্যকরী হবেই। (সূরা আহযাব: আয়াত-৩৭)সৌন্দর্য, যৌবন ও তার আত্মীয়তাই ছিল রাসূল-এর ছোট এবং বিচক্ষণ স্ত্রী আয়েশা শু-এর অন্তরে ঈর্ষা জাগ্রতা হওয়ার মূল কারণ। তাছাড়া তার বিয়ে হয়েছিল আল্লাহর আদেশে এবং কুরআনের ওহি মাধ্যমে, যা কিয়ামত পর্যন্ত তিলাওয়াত করা হবে। তার ঈর্ষা আরো বেড়ে যেত যখন জয়নাব অহংকার করে বলতেন, তোমাদের বিবাহ তোমাদের পরিবার দিয়েছে। কিন্তু আমার বিবাহ দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ। তিনি আরো বলতেন, আমি ওলী ও মধ্যস্ততাস্থীতি করণের দিক দিয়ে তোমাদের চেয়ে বেশি সম্মানিত। এখানে ওলী দ্বারা উদ্দেশ্য আল্লাহ। কেননা, আল্লাহ তায়ালা বলেন, جناگها;; অর্থাৎ আমি তাকে বিবাহ দিলাম। আর মধ্যস্ততা স্থীতি

পৃষ্ঠা:৪৯

দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে জিবরাঈল (আ)। আয়েশা যায়নাবের ব্যাপারে ঈর্ষাটাকে অস্বীকার কিংবা গোপন করেননি; বরং তিনি এ কথার মাধ্যমে তার ঈর্ষার বিষয়টি আরো প্রকাশ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, যয়নাব ছাড়া অন্য কারো প্রতি রাসূল-এর ভালোবাসা আমাকে এতবেশি কষ্ট দেয়নি। যায়নাবের প্রতি আয়েশা এ ঈর্ষাটা ছিল স্বাভাবিক বিষয়, যেভাবে এক মহিলা অপর মহিলার ব্যাপারে করে থাকে। কিন্তু রাসূল তাদের ঈর্ষার ব্যাপাটাকে পছন্দ করতেন না। একদিন রাসূল হাদিয়া পেলেন, এমতাবস্থায় তিনি আয়েশার নিকট ছিলেন। অতঃপর তিনি সেগুলো তার প্রত্যেক স্ত্রীর নিকট ভাগ করে পাঠিয়ে দিলেন, কিন্তু জয়নাব সেটি ফেরত দিলেন। এমতাবস্থায় আয়েশা শু এমন একটি কথা বললেন, যার কারণে রাসূল অসন্তুষ্ট হলেন এবং রাগান্বিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে উঠে চলে গেলেন। কখনো কখনো রাসূল-এর সামনে উভয়ের মাঝে বিতর্ক সৃষ্টি হতো, তখন রাসূল তাদেরকে সেই অবস্থায় ছেড়ে দিতেন। একদিন আয়েশা যায়নাব-কে পরাস্ত করলে রাসূল বলেন “সে হচ্ছে আবু বকরের মেয়ে”। মুচকি হাসেন এবং

৫২.আয়েশা ও মারিয়া কিবতিয়া

আমেনা বলেন, মারিয়া রাসূল-এর অন্তরে একটি বিশেষ স্থান দখন করে নেন। অই তার ব্যাপারেও ঈর্ষা করা হতো। তিনি বলেন, আমি মারিয়া ছাড়া অন্য কোনো মহিলার ঈর্ষা করেনি। কেননা, তিনি ছিলেন কোনো ডাগর চোখ বিশিষ্ট মহিলা এবং অন্যদের তুলনায় বেশি সুন্দরী। তাকে রাসূল পছন্দ করতেন। রাসূল রাত এবং দিনের অধিকাংশ সময় তার নিকট কাটাতেন।

পৃষ্ঠা:৫০

৫৩.

একদা রাসূল হাফসা -এর বাড়িতে আসলেন। কিন্তু তাকে বাড়িতে পেলেন না। অতঃপর মারিয়া আসলেন, যিনি ছিলেন ইবরাহীমের মা। তিনি আশে পাশে ঘুরাফিরা করছিলেন। ফলে তিনি রাসূল-কে হাফসা -এর ঘরে পেলেন এবং তার কাছে রয়ে গেলেন। অতঃপর হাফসা এলেন এবং তিনি লজ্জা পেয়ে তাদের উভয়ের মাঝে প্রবেশ না করে ঈর্ষান্বিত হয়ে দরজার পাশে বসে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর রাসূল বেরিয়ে গেলেন এবং তাকে চিন্তিত ও মনক্ষুন্ন হয়ে বসা অবস্থায় পেলেন। তখন হাফসা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমার দিনে, আমার ঘরে, আমার বিছানায়, আমার ব্যাপারে এমন একটি কাজ করলেন যা অন্য কোনো স্ত্রীর ব্যাপারে করেননি? রাসূল এ ঘটনা ছড়িয়ে পড়া অপছন্দ করলেন, তাই তাকে শান্ত হতে বললেন। কিন্তু রাগে সে তা অস্বীকার করল। তাই তাকে খুশি করার জন্য কসম করে বলে ফেললেন যে, মারিয়াকে আমি আমার ওপর হারাম করে দিলাম এবং পরবর্তী দিকে তার নিকট আর যাব না। এ কথা শুনে তিনি খুশি হয়ে গেলেন। আর রাসূল যেহেতু সম্পূর্ণ বিষয়টিকে গোপন রাখতে চেয়েছেন, তাই তিনি এ ঘটনাটিকে হাফসা শুশু-এর ওপর আমানত হিসেবে ছেড়ে দিয়ে বললেন, সে আমার ওপর হারাম। অতএব তুমি এটি গোপন রাখবে, যাতে কেউ জানতে না পারে। ফলে হাফসা বুঝে নিলেন যে, রাসূল এই কাজটি তার খুশি রাখার জন্য করেছেন, যা তার অধিকারে নেই। অতঃপর তিনি এর মাধ্যমে অহংকার ও গর্ব করার ইচ্ছা করলেন। ফলে শয়তান তার ওপর প্রভাব বিস্তার করল এবং তিনি এই ঘটনাটি আয়েশা-এর কাছে বলে দিলেন।

পৃষ্ঠা:৫১

৫৪.সেদিনের প্রতিশোধ

রাসূল ছিলেন অত্যন্ত সহনশীল ও নম্র-ভদ্র হৃদয়ের অধিকারী। ফলে তিনি আয়েশা-এর সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতেন, যাতে করে আয়েশা বিশ্বাস করে নেন যে, তিনি তাকে দয়া, অনুগ্রহ ও দেখা-শুনার ব্যাপারে অমনোযোগী নন। এগুলো হচ্ছে রাসূল-এর অন্তরের চিরস্থায়ী গুণ, যা আল্লাহ তায়ালা বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছেন। আয়েশা বলেন, কোনো এক সফরে আমি রাসূল-এর সাথে ছিলাম। তখন আমি ছিলাম ছোট বালিকা। রাসূল লোকদেরকে বললেন, তোমরা অগ্রগামী হও। ফলে লোকেরা আগে চলে গেল। তখন রাসূল বললেন, হে আয়েশা! এসো আমরা দৌড় প্রতিযোগিতা করি। ফলে তাতে অংশগ্রহণ করি। আর এতে আমি জয়ী হলাম। কিন্তু এতে তিনি কিছু বললেন না। অতঃপর যখন আমি মোটা ও স্থুলাকার দেহ বিশিষ্ট হয়ে গেলাম এবং আবার তার সাথে সফরে বের হলাম। তখন তিনি লোকদেরকে বললেন, অগ্রগামী হও। ফলে লোকজন আগে চলে গেল। তারপর তিনি বললেন, এসো দৌড় প্রতিযোগিতা করি। কিন্তু এবার তিনি বিজয়ী হলেন এবং হেসে হেসে বললেন, এটা সেদিনের প্রতিশোধ।

৫৫.আমাকে তোমাদের খুশির অংশীদার কর

রাসূল আয়েশার নিকট সুখ-দুঃখ সব সময় আসতেন। আর আবু বকর সিদ্দীক দ্রেও মাঝে মাঝে রাসূল-এর বাড়িতে আগমন করে উভয়ের সাথে মজাদার ও বরতকময় প্রেক্ষাপটগুলোতে ভাগ বসাতেন। নুমান বিন বশির বলেন, একদিন আবু বকর এমতাবস্থায় আয়েশা রাসূল-এর নিকট প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। -এর কথা রাসূল-এর কথার ওপর একটু উচু হয়ে

পৃষ্ঠা:৫২

গেল। তখন আবু বকর বলেন, হে অমুকের মেয়ে! তুমি রাসূলের ওপর কথা বল! এমতাবস্থায় রাসূল উভয়ের মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে গেলেন। অতঃপর আবু বকর বের হয়ে গেলেন। আর রাসূল আয়েশাকে খুশি করলেন এবং বললেন, তুমি কি দেখোনি যে, আমি সেই ব্যক্তি ও তোমার মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে গিয়েছিলাম। অতঃপর আবু বকর আবার প্রবেশের অনুমতি চাইলেন এবং উভয়ের মাঝে হাসির আওয়াজ শুনতে পেলেন। তখন তিনি বললেন, তোমাদের খুশির সময় আমাকে অংশীদার বানাও যেমনিভাবে তোমাদের দ্বন্দের সময় আমাকে অংশীদার বানিয়েছিলে।

৫৬/১.নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী

আয়েশা রাসূল-এর এমন মহান চরিত্র অবলোকন করেছেন, যা কলমে বর্ণনা করা অসম্ভব। তবে আল্লাহ তায়ালার এ কথার দ্বারা তার প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি বলেন, وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍঃঅর্থাৎ নিশ্চয় তোমার মাঝে রয়েছে উত্তম আদর্শ। (সুরা কালান: আয়াত-৪) আয়েশা বলেন, রাসূল আল্লাহর পথে জিহাদ ছাড়া কখনো কাউকে হাত দ্বারা আঘাত করেননি, এমনকি কোনো স্ত্রী বা চাকরকেও না। কেউ তার ক্ষতি করলে কখনো তিনি তার নিকট হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। কিন্তু কেউ যদি আল্লাহর হারাম বিষয়াদীর মধ্যে লিপ্ত হয়, তবে তিনি আল্লাহর নিমিত্তে প্রতিশোধ গ্রহণ করেছেন। নবী কারীম ইবাদাতে অনেক ব্যস্ততা ও সাহাবীদের প্রতি মনোযোগী থাকা সত্ত্বেও, তিনি ছিলেন একজন দৃষ্টান্তমূলক স্বামী, এমনকি পৃথিবীতে তার মতো স্বামী পাওয়া অসম্ভব। তিনি তার পরিবারকে বাড়ির কাজে সহযোগিতা

পৃষ্ঠা:৫৩

করতেন। এমনকি ঐ সময়েও, যখন কেউ অসুস্থতার কারণে তার স্ত্রীকে এক গ্লাস পানি দিতেও অস্বীকার করত। একদা আয়েশাকে জিজ্ঞেস করা হলো যে, রাসূল বাড়িতে কি কাজ করতেন? তখন তিনি বলেন, তিনি সর্বদা পারিবারিক কাজে ব্যাস্ত থাকতেন। কিন্তু তিনি আযান দিলে নামাযের জন্য বেরিয়ে যেতেন।

৫৬/২.মূল্যবান দারস

রাসূল আয়েশা পু-কে লালন-পালন, দেখাশুনা ও বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা দান করতেন। সর্বদাই তিনি তাকে বলতেন, সহানুভূতি ও দয়া প্রত্যেক কল্যাণের মূল। সুরাইহ বিন হানী বলেন, আয়েশা একদিন ঘোড়ায় আরোহণ করলেন। ফলে ঘোড়ার কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু তিনি তাকে বারবার হাকাতে লাগলেন। তখন রাসূল (সা:) তাকে বললেন, তোমার উপর দায়িত্ব হচ্ছে সহানুভূতি করা। উমর বিন জুবায়ের স্রে কর্ণনা করেন। আয়েশা শু বলেন, একদিন রাসূল। নিকট একদল ইহুদী আসল এবং বলল اَشامُ عَلَيْكُمْ অর্থাৎ তুমি ধ্বংস হও। আয়েশা পুল্ল বলেন, আমি তাদের কথার কৌশল বুঝে ফেললাম, তাই বললাম  وَعَ الشامُ وَاللَّعْنَةُ অর্থাৎ বরং তোমরা ধ্বংস হও এবং তোমাদের ওপর আল্লাহর লা’নত বর্ষিত হোক। তখন রাসূল বললেন, আস্তে আয়েশা। আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক কাজে সহানুভূতি পছন্দ করেন। অতঃপর আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! তারা কি বলেছে আপনি কি তা শুনেননি? তখন রাসুল শুনেছি তাই আমি বলেছি, وَعَلَيْكُمْ অর্থাৎ তোমাদের ওপরও। বলেন, আমি

পৃষ্ঠা:৫৪

ইনসাফ করা

রাসূল কোনো ক্ষেত্রেই পক্ষপাতিত্ব করতেন না। তিনি সব সময় ইনসাফ করতেন। একদিন আয়েশা সাফিয়া-এর খাঁট হওয়া সম্পর্কে রাসূল এর সাথে কথা বললেন। তখন রাসূল বললেন, হে আয়েশা। তুমি এমন একটি কথা বলেছ, তা যদি সাগরের সাথে মিশানো হয় তবে তাকেও মলিন করে দেবে।

৫৮.রাসূল-এর প্রতি আয়েশা-এর ঈর্ষা

আয়েশা রাসূলকে ভালোবাসতেন। আর তাই আয়েশা-এর প্রতি রাসূল-এর ছিল খুবই গভীর আগ্রহ। বর্ণিত আছে যে, এক রাত্রে রাসূল (সা:) আয়েশা (রা:)-এর নিকট থেকে বের হলেন। আয়েশা বলেন, এতে আমি তাঁর উপর ঈর্ষান্বিত হয়ে গেলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তিনি ফিরে আসেন, ফলে আমি যা করছিলাম তা প্রত্যখ্যান করলাম। তখন তিনি বললেন, হে আয়েশা। তোমার কি হয়েছে, তুমি কি ঈর্ষা করছ? আমি বললাম আমার কি হলো যে, আপনার মত মানুষের ওপর আমার জন্য ঈর্ষা কি ঠিক হবে? রাসূল বললেন, এইমাত্র তোমার নিকট শয়তান এসেছিল, তাই না? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার সাথেও শয়তান আছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, প্রত্যেক মানুষের সাথেই কি শয়তান আছে? তিনি বললেন হ্যাঁ। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল। আপনার সাথেও কি শয়তান আছে? তিনি বললেন হ্যাঁ, কিন্তু আমার প্রতিপালক আমাকে তার ওপর সাহায্য করেছেন। ফলে সে আমার অনুগত হয়ে গেছে।

পৃষ্ঠা:৫৫

আয়েশা হতে বর্ণনা করেন, একদা সকল মহিলা একত্রে উপবিষ্ট আছেন। এমতাবস্থায় রাসূল আমাদের নিকট অনুমতি চাইলেন, যার কিছুক্ষণ পূর্বে নিম্নের আয়াতটি অবতীর্ণ হয়- تري مَنْ تَشَاءُ مِنْهُنَّ وَتُؤْوِى إِلَيْكَ مَنْ تَشَاءُ وَمَنِ ابْتَغَيْتَ مِمَّنْ عَزَلْتَ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكَ ذَلِكَ أَدْنَى أَنْ تَقَرَّ أَعْيُنُهُنَّ وَلَا يَحْزَنَ وَيَرْضَيْنَ بِمَا أَتَيْتَهُنَّ كُلُهُنَّ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا فِي قُلُوبِكُمْ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَلِيمًاঃঅর্থাৎ আপনি আপনার স্ত্রীদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা পৃথক রাখতে পারেন এবং যাকে ইচ্ছা কাছে রাখতে পারেন। আর আপনি যাকে পৃথক রেখেছেন, তাকে আবার চাইলে তাতে আপনার কোনো গুনাহ নেই। এতে অধিক আশা করা যায় যে, তাদের চক্ষু শীতল থাকবে, তারা কষ্ট পাবে না এবং আপনি যা দেন তাতে তারা সবাই সন্তুষ্ট থাকবে। তোমাদের অন্তরে যা আছে তা তিনি জানেন। আল্লাহ মহাজ্ঞানী ও সহনশীল। (সূরা আহযাব: আয়াত-৫১) তখন আমি তাদেরকে (উপবিষ্ট মহিলাদেরকে) বললাম, এ ব্যাপারে তোমাদের মতামত কি? তখন এক মহিলা বলল, আমার নিকট বিষয়টি যদি এরূপ হতো তাহলে আমি বলব যে, হে আল্লাহর রাসূল। আমি চাই না যে, আপনার ওপর অন্য কেউ প্রভাব ফেলুক।

পৃষ্ঠা:৫৬

৫৯.তোমাদের মা ঈর্ষান্বিত হয়েছেন

এখানে একটি লালন-পালন সম্পর্কিত শিক্ষণীয় পাঠ। আমাদের নিকট সুস্পষ্ট করে দেবে যে, রাসূল কিভাবে বিপদের সময় পরস্পরের সাথে লেন-দেন করেছেন এবং নিজ প্রজ্ঞা ও দয়ার মাধ্যমে বড়ত্বেও পরিচয় দিয়েছেন। বুখারী (রহ) আনাস দ্রে থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, একদা নবী তার কোনো এক স্ত্রীর নিকট অবস্থান করছিলেন। এমতাবস্থায় উম্মাহাতুল মুমিনীনদের মধ্য হতে কোনো কিছু খাবার ছিল। তখন নবী একজন এমন একটি পত্র প্রেরণ করেন, যাতে যার গৃহে ছিলেন তিনি সেবকের হাতে প্রহার করলেন। ফলে পাত্রটি পড়ে গেল এবং ভেঙ্গে গেল। অতঃপর নবী পাত্রটির ভাঙ্গা টুকরোগুলো একত্রিত করলেন এবং তার নিকট যে পাত্র ছিল সেই পাত্রে খাদ্যগুলো একত্রিত করলেন এবং বললেন, “তোমাদের ঈর্ষা করেছে”। অতঃপর নবী যার গৃহে ছিলেন তার নিকট থেকে একটি পাত্র না নিয়ে আসা পর্যন্ত সেখানে খাদেমকে অবস্থান করতে বললেন। অতঃপর যার পাত্রটি ভাঙ্গা হয়েছিল তার নিকট নবী ভালো পাত্রটি প্রদান করলেন এবং যে পাত্রটি ভেঙ্গেছিল ভাঙ্গা পাত্রটি তার গৃহেই রেখে দিলেন। এমনিভাবে নাসায়ীতে সহীহ সনদে উম্মে সালমার হাদীস থেকে বর্ণনা করা হয়েছে যে, একদা উম্মে সালমা একটি পাত্রে কিছু খাবার নিয়ে রাসূল ও তাঁর সাহাবীদের নিকট আসলেন। অতঃপর আয়েশা চাদর খুলিয়ে নিজ হাত দ্বারা কোনো কিছু নিয়ে আসলেন এবং হাতের সেই বস্তু দ্বারা পাত্রটি ভেঙ্গে ফেললেন। অতঃপর নবী পাত্রটির ভাঙ্গা টুকরোগুলোর মাঝে থাবার একত্রিত করলেন এবং বললেন, “তোমরা খাও, তোমাদের মা ঈর্ষা করছে” এ কথা দুবার বললেন। অতঃপর রাসূল আয়েশা এর কাছ থেকে একটি পাত্র নিলেন এবং তা উম্মে সালমার নিকট প্রেরণ করে দেন।

পৃষ্ঠা:৫৭

আবু ইয়ালা আল-মুছিলি হাসান সনদে আয়েশা শু থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, একদা আমি নবী-এর নিকট কিছু রান্না করা শষ্য নিয়ে আসলাম। অতঃপর আমি সাওদা -কে বললাম। এমতাবস্থায় নবী আমার এবং তার মাঝে অবস্থান করছিলেন। তখন তিনি সাওদা গুল্লু-কে বললেন, তুমিও খাও। কিন্তু তিনি খেতে অস্বীকার করলেন। তখন আমি বললাম, তুমি অবশ্যই খাবে, নতুবা তোমার মুখম-লে এই খাবারগুলো লাগিয়ে দেব। তারপরও তিনি খেতে অস্বীকার করলেন। ফলে আমি আমার হাত খাবার মধ্যে রাখলাম এবং তার মুখম-লে তা লাগিয়ে দিলাম। ফলে নবী হাসলেন এবং সাওদাকে বললেন, তুমিও তার মুখে খাবার লাগিয়ে দাও। ফলে আয়েশা এর মুখেও খাবার লাগিয়ে দেয়া হলো। এবারো নবী ওমর টুল্ল অতিক্রম করছিলেন, তখন নবী একটু হাসলেন। এমতাবস্থায় ডাক দিয়ে বললেন, হে আল্লাহর বান্দা! হে আল্লাহর বান্দা! অতঃপর নবীর ধারণা করলেন যে, তিনি শিগগিরই তাদের মাঝে প্রবেশ করবেন। ফলে তিনি স্ত্রীদ্বয়কে বললেন, তোমরা দু’জন দ-ায়মান হও এবং তোমাদের মুখম-ল ধৌত করে নাও।

৬০.আপনার প্রতিপালককে আপনার মনের বাসনা পূরণে আগ্রহী দেখছি

আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ঐ সকল মহিলাদের ওপর বেশি ঈর্ষাপরায়ন ছিলাম, যারা নিজেদেরকে রাসূল-এর শানে হেবা করে দিত। তখন আমি বলতাম, কোন মহিলা কি নিজেকে হেবা করতে পারে? অত:পর যখন আল্লাহ তায়ালা এ আয়াতটি অবতীর্ণ করলেন, تُرْجِ مَنْ تَشَاءُ مِنْهُنَّ وَتُؤْوِى إِلَيْكَ مَنْ تَشَاءُ وَمَنِ ابْتَغَيْتَ مِمَّنْ عَزَلْتَ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكَ ذَلِكَ أَدْنَى أَنْ تَقَرَّ أَعْيُنُهُنَّ وَلَا يَحْزَنَ وَيَرْضَيْنَ بِمَا ا تَيْتَهُنَّ كُلُّهُنَّ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا فِي قُلُوْبِكُمْ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَلِيْمًا

পৃষ্ঠা:৫৮

অর্থাৎ আপনি আপনার স্ত্রীদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা পৃথক রাখতে পারেন এবং যাকে ইচ্ছা কাছে রাখতে পারেন। আর আপনি যাকে পৃথক রেখেছেন, তাকে আবার চাইলে তাতে আপনার কোনো গুনাহ নেই। এতে অধিক আশা করা যায় যে, তাদের চক্ষু শীতল থাকবে, তারা কষ্ট পাবে না এবং আপনি যা দেন তাতে তারা সবাই সন্তুষ্ট থাকবে। তোমাদের অন্তরে যা আছে তা জানেন। আল্লাহ মহাজ্ঞানী ও সহনশীল। (সূরা আহযাব: আয়াত-৫১) তখন আমি বললাম, আমি আপনার প্রতিপালককে আপনার মনের বাসনা পূরণে খুব দ্রুতগামী হিসেবেই দেখছি।

৬১.বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তা

আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে রাত্রে নবী আমার নিকট অবস্থান করতেন এমন এক রাত্রিতে তিনি আমার ঘরে প্রবেশ করলেন এবং চাদর ও জুতা খুললেন। অতঃপর এগুলো তার পায়ের নিকট রাখলেন। তারপর মতিনি তাঁর লুঙ্গির একটি অংশ বিছানার ওপর বিছিয়ে দিলেন এবং শুয়ে পড়লেন। অতঃপর ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি শুয়ে থাকলেন, যতক্ষণ না তার ধারণা আসে যে, আমি ঘুমিয়ে পড়েছি। অতঃপর রাসূল আস্তে আস্তে তার চাদর নিলেন এবং জুতা পরিধান করলেন। তারপর তিনি দরজা খুলে বের হয়ে গেলেন। অত:পর আমি আমার ঢাল মাথায় নিলাম, ওড়না পরিধান করলাম এবংআমি আমার ইযার দ্বারা গোমটা পরিধান করলাম। অতঃপর তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করলাম। এমনকি তিনি “বাকী” নামক কবরস্থানে আসলেন এবং দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। অতঃপর তিন বার তার হাত উত্তোলন করলেন। অবশেষে আসার সময় রাস্তা পরিবর্তন করলেন এবং আমিও রাস্তা পরিবর্তন করলাম। তিনি দ্রুত চললেন এবং আমিও দ্রুত চললাম। তিনি উপস্থিত হলেন এবং আমিও উপস্থিত হলাম। তবে আমি তার পূর্বে আসলাম ও ঘরে প্রবেশ করলাম। অতঃপর তিনি আমার শুয়ে থাকাবস্থায় ঘরে প্রবেশ করলেন। অত:পরবললেন, হে আয়েশা! তোমার কি হয়েছে? উঁচু টিলার মতো শুয়ে আছ কেন?

পৃষ্ঠা:৫৯

তখন আমি বললাম, না কিছু হয়নি। তারপর তিনি বললেন, তুমি আমাকে খবর দিবে নাকি যিনি সূক্ষ্ম বিষয়ে সবচেয়ে বেশি খবর রাখেন, তিনি আমাকে খবর দিয়ে দিবে। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল। আপনার জন্য আমার পিতা মাতা উৎসর্গ হোক, আমিই আপনাকে খবর দিচ্ছি। অতঃপর তিনি বললেন, তুমিই কি সেই কালো ছায়া, যা আমি আমার সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম? আমি বললাম, হ্যাঁ। ফলে তিনি তাঁর হাতের তালু দ্বারা আমার বক্ষে মৃদু আঘাত করলেন, যাতে আমি একটু ব্যাথা অনুভব করলাম। অত:পর বললেন, তুমি কি ধারণা কর যে, আল্লাহর রাসূল তোমার ওপর জুলুম করবে? তখন আমি বললাম, মানুষ যা গোপন করে আল্লাহ তো তা আপনাকে জানিয়ে দেন। অতঃপর তিনি বললেন, আমার নিকট জিবরাঈল এসেছিলেন, এমনকি আমি তাকে দেখতে পাচ্ছিলাম। তিনি শুধুমাত্র আমাকে ডাকলেন এবং তোমার থেকে তা গোপন রাখলেন। আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম এবং তোমার থেকে তা গোপন করলাম। আর আমি ধারণা করলাম যে, তুমি এই মাত্র ঘুমিয়ে পড়েছ। আর তাই তোমার বিরক্ত হওয়ার ভয়ে আমি তোমাকে জাগ্রত করতে অপছন্দ করলাম। অতঃপর তিনি বললেন, নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক তোমাকে বাকীর অধিবাসীদের নিকট যেতে এবং তাদের জন্য ক্ষমা চাইতে আদেশ দিয়েছেন। তিনি প্লে বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! কিভাবে তাদেরও জন্য ক্ষমা চাইব? তিনি মন্ত্র বললেন, তুমি এটা বলবে যে- السلام على أَهْلِ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُسْلِمِينَ وَيَرْحَمُ اللَّهُ الْمُسْتَقْدِمِينَ مِنَّا وَالْمُسْتَأْخِرِينَ وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ بِكُمْ لَا حِقُوْنَ অর্থাৎ কবরবাসীদের মধ্যে যারা মুমিন ও মুসলিম তাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আমাদের মধ্যে যারা গত হয়ে গেছে এবং যারা পরে আগমন করবে আল্লাহ তায়ালা সকলের ওপর দয়া প্রদর্শন করুন। যদি আল্লাহ চান, তবে নিশ্চয় আমরা তোমাদের সাথে মিলিত হব।

পৃষ্ঠা:৬০

এখানে এটাই তার বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার পরিচয় যে, যখন আয়েশা জানতে পারলেন যে, নবী রাগান্বিত হয়েছেন, তখন তিনি তার বাক্যকে রাসূল (সা:)-এর রাগেও কারণ থেকে অন্য এক পূন্নধর্তী এগ্নেয় পিক্ষে গড়িঘর্তণ ফয়ে নেন। হে মুসলিম বোন! তুমি শিক্ষা গ্রহণ কর। নিশ্চয় যখন কোনো মুসলিম মহিলা তার স্বামীকে রাগান্বিত অবস্থায় পায়, তখন তার উচিত সে তার কথাকে অন্য বিষয়ের দিকে পরিবর্তন করবে। যাতে করে তার স্বামীকে সে বিষয় আরো রাগান্বিত না করে তোলে। নতুবা এতে আরো বড় ধরনের বিপদের আশঙ্কা রয়েছে।

৬২.মধুর ঘটনা

এখানে একটি কৌশল ও সূক্ষ্ম কৌতুকের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে, যা আমাদের মাতা আয়েশা ও সাওদা গুল্লু ঘটিয়েছিলেন। আয়েশা বর্ণনা করে, তিনি বলেন, রাসূল মধু ও মিষ্টি খুব পছন্দ করতেন। আর রাসূল-এর একটি অভ্যাস ছিল যে, তিনি আসর সালাত থেকে ফিরে আসার পর তার স্ত্রীদের নিকট দেখা করতেন। অতঃপর তাদের কারো নিকট (প্রথমে) যেতেন। এভাবে পর্যায়ক্রমে হাফসা বিনতে ওমরের নিকট যেতেন। অন্যান্য স্ত্রীদের নিকট যতটুকু সময় অতিবাহিত করতেন হাফসা বিনতে ওমরের নিকট একটু বেশি সময় অতিবাহিত করতেন। এতে আমি ঈর্ষান্বিত হই এবং এ বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করি। অতঃপর জানতে পারলাম যে, হাফসার গোত্রের কোনো এক মহিলা তাকে একটি ঘিয়ের পাত্রে মধু হাদিয়া দিয়েছে। আর হাফসা সেই মধু থেকে রাসূলকে কিছু মধু পান করান। তখন আমি সাওদার সাথে এ বিষয়ে পরামর্শ করলাম এবং বললাম, আল্লাহর শপথ। অবশ্যই আমরা এ ব্যাপারে কৌশল অবলম্বন করব। অতঃপর আমি সাওদা বিনতে যামআকে বললাম, অচিরেই রাসূল তোমার নিকট আসবেন। যখন তিনি তোমার নিকটবর্তী হবেন তখন তুমি তাকে বলবে আপনি কি “মাগাফির” খেয়েছেন? তখন তিনি তোমাকে বলবেন, না। এরপর তুমি বলবে, তাহলে এই গন্ধ কিসের যা আমি আপনার কাছ থেকে পাচ্ছি? তখন

পৃষ্ঠা ৬১ থেকে ৭৫

পৃষ্ঠা:৬১

তিনি হয়তো তোমাকে বলবে, হাফসা আমাকে মধু পান করিয়েছে। অতঃপর তুমি বলবে, দুর্গন্ধযুক্ত উদ্ভিদ থেকে মধু সংগ্রহ করার মতো মনে হচ্ছে। এরপর একই কথা আমিও বলব। হে সুফিয়া! তুমিও একই কথা বলবে। আয়েশা বলেন, সাওদা মুস্ত্র বলল আল্লাহর শপথ! তিনি আমার দরজায় অবস্থান করছেন। আমি ইচ্ছা করছি তুমি আমাকে যা করার আদেশ করবে তা আমি তোমার ভয়ে সূচনা করব। অতঃপর রাসূল যখন তার নিকট আসলেন তখন সাওদা (রা:) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল আপনি কি মাগাফির খেয়েছেন? তিনি বললেন, না। তারপর তিনি বললেন, তাহলে এটা কিসের গন্ধ যা আমি আপনার কাছ থেকে পাচ্ছি? তিনি বললেন, হাফসা আমাকে মধু পান করিয়েছে। তখন তিনি বললেন, মনে হয় দুর্গন্ধযুক্ত উদ্ভিদ থেকে মধু সংগ্রহ করা হয়েছে, যা থেকে আপনি পান করেছেন। অতঃপর যখন তিনি আমার নিকট আসলেন তখন আমিও একই কথা বললাম এবং যখন তিনি সুফিয়ার নিকট গেলেন তখন সুফিয়াও একই কথা বলল। এভাবে রাসূল যখন পরের দিন হাফসার নিকট গেলেন তখন তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল। আমি কি সেখান থেকে আপনাকে কিছু পান করাব? তখন তিনিদ্রবললেন, না! তা আমার কোনো প্রয়োজন নেই। আয়েশা প্লা বলেন, আল্লাহর শপথ, আমরা রাসূলকে তা থেকে বিরত রেখেছিলাম। কিন্তু সাওদা তা বলে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি তাকে বললাম, চুপ থাক।

৬৩.খাদিজা-এর প্রতি ঈর্ষা

আয়েশা পুল্লাহতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী-এর অন্যান্য স্ত্রীদের প্রতি আমি তেমন বেশি ঈর্ষা করতাম না যেমনটি ঈর্ষা করতাম খাদিজার ওপর অথচ আমি তাকে দেখিনি। কিন্তু রাসূল তার কথা অনেক বেশি বেশি করে স্মরণ করতেন। অনেক সময় ছাগল যবেহ করে তার কিছু অংশ খাদিজার বান্ধবীদের বাড়িতেও প্রেরণ করে দিতেন। অনেক সময় আমি বলতাম, মনে হয় খাদিজার

পৃষ্ঠা:৬২

মতো কোনো মহিলা দুনিয়াতে আর নেই। তখন তিনি বলতেন, নিশ্চয় সে এরকম এরকম ছিল। তাছাড়া তার গর্ভে থেকেই আমি সন্তান লাভ করেছি।আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা খাদিজার বোন হালাত বিনতে খুইয়ালিদ রাসূল এর নিকট অনুমতি চাইলেন। তখন তিনি তাকে খাদিজা মনে করলেন। কিন্তু পরক্ষণেই তাকে চিনতে পারলেন এবং এর জন্য তিনি ভীতু হয়ে বললেন, হে আল্লাহ! হালাত।আয়েশা বলেন, তখন আমি ঈর্ষান্বিত হয়ে গেলাম এবং বললাম, মুখের দুই কোণ লাল বিশিষ্ট কুরাইশ বৃদ্ধা মহিলাদের মধ্য হতে শুধুমাত্র একজন মহিলাকেই উল্লেখ করার কি আছে? সে তো বহু আগেই মারা গেছে। আর তার পরিবর্তে আল্লাহ আপনাকে আরো উত্তম স্ত্রী দান করেছেন। আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি শুধুমাত্র রাসূল-এর স্ত্রীদের মধ্য থেকে খাদিজার ওপর বেশি ঈর্ষা করতাম। কিন্তু আমি তাকে দেখতে পাইনি। তিনি আরো বলেন, খাদিজার প্রতি রাসূল-এর ভালোবাসা এতই প্রবল ছিল যে, যখন রাসূল কোনো ছাগল যবেহ করতেন তখন বলতেন, ছাগলেন গোশতগুলো খাদিজার বান্ধবীদের বাড়িতে দিয়ে আস। আয়েশা (রা:) বলেন, একদা আমি রাসূল-এর ওপর খুবই রাগান্বিত হলাম এবং বললাম, শুধুই কি খাদিজ্য? রাসূল বললেন, নিশ্চয় আমি তার ভালোবাসার মাধ্যমে রিযিক প্রাপ্ত হয়েছি। ইমাম যাহাবী বলেন, আমি এ বিষয়ে খুবই আশ্চর্যবোধ করি যে, আয়েশা -এর ঈর্ষা ছিল এমন এক বৃদ্ধা মহিলার ওপর যে মহিলা নবী (সা:) আয়েশাকে বিবাহ করার পূর্বে মারা গিয়েছিল। আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা একজন কালো মহিলা রাসূল-এর নিকট রাসূল তার দিকে অগ্রসর হলেন। তখন আয়েশা শু প্রবেশ করল। ফলে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল। আপনি কি এই কালো মহিলাকে অভিন্দন দেয়ার জন্য আগমন করলেন? তখন তিনি বললেন, সে ঐ মহিলা, যে খাদিজার নিকটও প্রবেশ করেছিল। তাছাড়া উত্তম সাক্ষাত হলো ঈমানে অঙ্গ।

পৃষ্ঠা:৬৩

৬৪. নিশ্চয়ই সে আবু বকরের মেয়ে

আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল এর স্ত্রীগণ রাসূল এর মেয়ে ফাতেমাকে রাসূল-এর নিকট প্রেরণ করলেন। অতঃপর তিনি রাসূল-এর নিকট অনুমতি চাইলেন। এমতাবস্থায় রাসূল আমার সাথে আমার চাদরে চিত হয়ে শুয়ে ছিলেন। অতঃপর রাসূল তাকে অনুমতি দিলেন। তারপর তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার স্ত্রীগণ আমাকে আপনার নিকট এ বিষয়ে প্রেরণ করেছেন যে, তারা আপনার নিকট আবু কুহাফার মেয়ের ব্যাপারে ইনসাফ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে (অর্থাৎ তারা ইনসাফের ব্যাপারে সমান চায়) এবং এরকম এরকম কথা বলেছে। তখন আমি চুপ থেকেছি। আয়েশা শুদ্রা বলেন, তখন রাসূল তাকে বললেন, হে আমার মেয়ে! তুমি কি ভালোবাসনা যা আমি ভালোবাসি। তখন তিনি বললেন, হ্যাঁ ভালোবাসি। রাসূল বললেন, তবে তুমি এটাই ভালোবেসে যাও। আয়েশা বলেন, যখন তিনি রাসূল থেকে এসব কথা শুনলেন তখন তিনি দাড়িয়ে গেলেন এবং স্ত্রীদের কাছে ফিরে গেলেন। অতঃপর তিনি যা বললেন তা তাদেরকে সংবাদ দিলেন এবং রাসূল যা বললেন তাও তাদেরকে সংবাদ দিলেন। অত:পর তারা তাকে বললেন, আমরা তোমাকে দেখি না যে, তুমি তাকে আমাদের থেকে কোনো কিছুর অমুখাপেক্ষী করতে পারলে। সুতরাং তুমি রাসূল-এর নিকট আবার ফিরে যাও এবং বল, নিশ্চয় আপনার স্ত্রীগণ আবু কুহাফার মেয়ের ব্যাপারে আপনার নিকট ইনসাফ চায়। তখন ফাতেমা বললেন, আমি আর এ কথাগুলো বলতে পারব না। আয়েশা শু বলেন, তারপর নবী-এর স্ত্রীগণ রাসূল-এর স্ত্রী যায়নাব বিনতে জাহাশ-কে প্রেরণ করলেন। আর তিনি আমার সাথে রাসূল এর সামনে দ্বীনের শিক্ষার ব্যাপারে প্রতিযোগিতা করতেন। তাছাড়া দ্বীনের ব্যাপারে আমি যায়নাবের চেয়ে কোনো ভালো মহিলা দেখিনি। আর আমি আল্লাহকে ভয় করি, সত্য কথা বলি, আত্মীয়তান সম্পর্ক বজায় রাখি এবং সদকা দেয়াটাকে পছন্দ করি। পক্ষান্তরে যায়নাব বিনতে জাহাশ ছিলেন নিজের

পৃষ্ঠা:৬৪

আমলের ক্ষেত্রে অপব্যয়ের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর, যা দ্বারা সদকা প্রদান করা হয় এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা হয়। অতঃপর তিনি রাসূল-এর কাছে প্রবেশের জন্য অনুমতি চাইলে। এমতাবস্থায় রাসূল আয়েশার সাথে একই চাদরে শুয়ে ছিলেন, যে অবস্থায় ফাতেমা (রা:) তাকে পেয়েছিলেন। অতঃপর রাসূলতাকে প্রবেশের অনুমতি দিলেন। অতঃপর যায়নাব বিনতে জাহাশ শুল্প বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার স্ত্রীগণ আমাকে আপনার নিকট এ বিষয়ে প্রেরণ করেছেন যে, তারা আপনার নিকট আবু কুহাফার মেয়ের ব্যাপারে ইনসাফ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে।

৬৫.আয়েশা এবং রাসূল-এর স্ত্রীগণ

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস দ্রে থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী-এর সহধর্মিণীদের মধ্যে ঐ দু’সহধর্মিণী সম্পর্কে ওমরের নিকট প্রশ্ন করতে সর্বদা আগ্রহী ছিলাম যাঁদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, “যদি তোমরা দু’জনে তরব কর তবে সেটাই হবে তোমাদের জন্য মঙ্গলজনক। কেননা তোমাদের অন্তর বাঁকা হয়ে গেছে।” একবার আমি তাঁর সাথে হজ্জে রওয়ানা করলাম। (কিছু পথ চলার পর) তিনি রাস্তা থেকে সরে গেলেন। আমিও একটি পানির পাত্র নিয়ে তাঁর সঙ্গে গেলাম। তিনি (একটু দূরে গিয়ে) প্রাকৃতিক প্রয়োজন শেষ করে ফিরে এলেন। আমি পানির পাত্র থেকে তাঁর দু’হাতে পানি ঢাললাম। তিনি অযু করলেন। তখন আমি (তাঁকে) প্রশ্ন করলাম, হে ‘আমীরুল মু’মিনীন। নবী-এর সহধর্মিণীদের মধ্যে ঐ সহধর্মিণী কারা ছিলেন যাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, “যদি তোমরা দু’জনে তরব কর তবে সেটাই হবে তোমাদের জন্য মঙ্গলজনক। কেননা তোমাদের অন্তর বাঁকা হয়ে গেছে।” তিনি বললেন, হে ইবনে ‘আব্বাস। তোমার জন্য অবাক লাগে (তুমি বুঝি এটা জান না)। এ দু’জন হলো আয়েশা ও হাফসা । অতঃপর ‘ওমর পুরো ঘটনা বলতে শুরু করলেন। তিনি বললেন, আমি ও আমার এক প্রতিবেশী

পৃষ্ঠা:৬৫

আনসার মদিনার অদূরে বানু উমাইয়া ইবনে যাইদের এলাকায় বাস করতাম। আমরা দু’জন পালাক্রমে নবী-এর কাছে আসতাম। একদিন তিনি যেতেন আর একদিন আমি যেতাম। আমি যখন যেতাম সেদিনকার অবস্থা তথা ওহি ইত্যাদি বিষয়ক সংবাদ তাকে জানাতাম। আর তিনি যখন যেতেন তখন তিনিও তাই করতেন। আর আমরা কুরাইশ সম্প্রদায়ের লোকেরা (সব সময়) মহিলাদের ওপর কর্তৃত্ব করতাম। কিন্তু যখন আমরা (মদিনায়) আনসারদের নিকট আসলাম তখন দেখলাম তাদের মহিলারা তাদের ওপর কর্তৃত্ব করছে। আস্তে আস্তে আমাদের মহিলারাও আনসারী মহিলাদের রীতিনীতি রপ্ত করতে علامتها : একদিন আমি আমার স্ত্রীকে শক্ত করে একটা কথা বললে সে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিউত্তর করতে থাকল। আমি তার এ প্রতিউত্তর মেনে নিতে পারলাম না, এতে সে বলল, আপনার প্রতিউত্তর করাকে মেনে নিচ্ছেন না কেন? অথচ নবীর স্ত্রীগণ তাঁর প্রতিউত্তর করে থাকে। এমনকি তাদের মধ্যে কোনো স্ত্রী সারাদিন তথা রাত পর্যন্ত তাঁকে পরিত্যাগ করে থাকে। বিষয়টি আমাকে আতঙ্কিত করে তুলল। আর আমি মনে মনে বললাম, যে এরূপ করবে সে অবশ্যই ক্ষতিগ্রান্ড হবে। তাঁরপর আমি জামা-কাপড় গায়ে জড়িয়ে হাফসার কাছে গেলাম এবং বললাম, হে হাফসাহ্! তোমাদের কেউ নাকি রাত পর্যন্ত পুরো দিন রাসূল কে অখুশি রাখে? সে বলল, হ্যাঁ। আমি বললাম, তবে তো সে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তোমাদের কি ভয় হয় না যে, রাসূল অখুশি হলে আল্লাহ অখুশী হবেন এবং (এর ফলে) তুমি বরবাদ হয়ে যাবে। সাবধান! রাসূল-এর সাথে বেশি কথা বলো না এবং তাঁর কোনো কথার প্রতিউত্তর করো না এবং (কিছু সময়ের জন্যও) তাঁর থেকে পৃথক হয়ো না। তোমার কোনো কথা বলার থাকলে আমাকে বল। তোমার নিকট প্রতিবেশিনী তোমার চাইতে অধিক সুন্দরী এবং রাসূল-এর অধিক প্রিয়। এ যেন তোমাকে ধোঁকায় না ফেলে। ঐ সময় আমাদের মধ্যে আলোচনা চলছিল যে, গাসসানের অধিবাসীরা আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য ঘোড়াগুলোকে প্রস্তুত করছে। আমার সাথিটি তার পালার দিন রাসূল-এর কাছে গেলেন এবং রাতের বেলা ফিরে এসে আমার দরজায় খুব জোরে আঘাত করলেন এবং বললেন, তিনি (ওমার) কি এখানে

পৃষ্ঠা:৬৬

আছেন? আমি অস্থির মনে বেরিয়ে এলাম। তিনি বললেন, বিরাট ব্যাপার ঘটে গেছে। আমি বললাম, সেটা কি? গাসানের লোকেরা কি এসে পড়েছে? তিনি বললেন না; বরং তার চাইতেও কঠিন ব্যাপার। রাসূল তাঁর সহধর্মিণীদের তালাক দিয়েছেন। তিনি (ওমর) বললেন, তাহলে তো হাফসার সর্বনাশ হয়েছে এবং সে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর আমি (আগে থেকেই) মনে করছিলাম যে, এমন একটা কিছু ঘটে যাবে। তারপর (রাত শেষ হয়ে এলে) আমি জামা-কাপড় পরিধান করে বেরিয়ে পড়লাম এবং রাসূল-এর সাথে ফজরের নামায পড়লাম। সালাত শেষে তিনি তাঁর ঘরে প্রবেশ করে নির্জনে বসে থাকলেন তখন আমি হাফসার নিকট গিয়ে দেখি সে কাঁদছে। আমি বললাম, (এখন) কাঁদছ কেন? কি তোমাকে আগে থেকে সাবধান করিনি? রাসূল কি তোমাদের তালাক দিয়েছেন? সে বলল, আমি জানি না। তিনি এখন তাঁর ঘরে রয়েছেন। আমি (হাফসার কাছ। থেকে) বেরিয়ে মিম্বারের নিকট আসলাম। দেখি যে, তাঁর (মিম্বারের) চারপাশ জুড়ে লোকেরা বসে আছে এবং কেউ কাঁদছে। আমি তাদের সাথে কিছুক্ষণ বসলাম। তারপর আমার কি যেন খেয়াল চাপল। আমি সে ঘরের নিকটে আসলাম যেখানে রাসূল অবস্থান করছিলেন এবং তাঁর একটা কালো দাসকে বললাম, ‘ওমরের জন্য (প্রবেশের) অনুমতি নাও। অতঃপর সে ঢুকে নবী-এর সঙ্গে আলাপ করল। তারপর বেরিয়ে এসে বলল, আমি আপনার কথা তাঁকে বলেছি। কিন্তু তিনি নীরব থাকলেন (কিছুই বললেন না)। আমি ফিরে আসলাম এবং মিম্বারের পাশের লোকগুলোর কাছে গিয়ে বসে পড়লাম। কিছুক্ষণ পর আমার (আবার) খেয়াল চাপল। আমি এসে গোলামটাকে বললাম। সে রাসূল এর নিকট থেকে এসে) একই উত্তর দিল। আমি (আবার) মিম্বারের পাশের লোকদের সাথে গিয়ে বসলাম। তারপর (পুনরায়) আমার খেয়াল আমাকে বাধ্য করল। আমি গোলামটাকে এসে বললাম, ‘ওমরের জন্য (প্রবেশের) অনুমতি চাও। এবারও সে একই উত্তর দিল।

পৃষ্ঠা:৬৭

তারপর আমি যখন (বাড়ি দিকে) ফিরে চললাম তখন হঠাৎ গোলামটি আমাকে ডেকে বলল, রাসূল আপনাকে অনুমতি দিয়েছেন। ফলে আমি তাঁর নিকট প্রবেশ করলাম। দেখলাম তিনি খেজুরের ছোবড়া ভর্তি একটা চামড়ার বালিশে হেলান দিয়ে চাটাইয়ের ওপর শুয়ে আছেন। তাঁর শরীর ও চাটাইয়ের মাঝে ফরাশ ছিল না। ফলে তাঁর শরীরের পার্শ্বদেশে চাটাইয়ের দাগ পড়ে গিয়েছিল। সেখানে গিয়ে প্রথমে আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তারপর দাঁড়ানো অবস্থায় আমি তাঁকে বললাম, আপনি কি আপনার সহধর্মিণীদের তালাক দিয়েছেন? তিনি আমার দিকে চোখ তুলে তাকালেন এবং বললেন, ‘না’। তারপর আমি পরিবেশটাকে অন্তরঙ্গ করার জন্য দাঁড়িয়ে থেকেই বললাম, হে আল্লাহর রাসুল। দেখুন আমরা কুরাইশ বংশের লোকেরা (সব সময়) মহিলাদের ওপর কর্তৃত্ব করতাম। তারপর আমরা এমন একটা সম্প্রদায়ের নিকট এলাম যাদের ওপর তাদের মহিলারা কর্তৃত্ব করছে। অতঃপর এ ব্যাপারে বর্ণনা করলে রাসূল মুচকি হাসলেন। তারপর আমি বললাম, আপনি হয়ত লক্ষ্য করেছেন যে, আমি হাফসার কক্ষে গিয়েছি। আমি তাকে বলেছি, “তুমি এ কথা ভুলে যেও না যে, তোমার প্রতিবেশিনী (সতীন) তোমার চাইতে অধিক সুন্দরী এবং রাসূল-এর অধিকতর প্রিয়।” এ কথা দ্বারা তিনি আয়েশার দিকে ইশারা করেছেন। (আমার কথা শুনে) তিনি আবার মুচকি হাসলেন। তাঁকে মুচকি হাসতে দেখে আমি বসে পড়লাম। তারপর আমি তাঁর ঘরের ভিতরে (এদিক-সেদিক) দেখলাম। কিন্তু আল্লাহর কসম! তিনটা কাঁচা চামড়া তিন্ন আর কিছুই দেখতে পেলাম না। আমি আবেদন করলাম, আল্লাহর নিকট দু’আ করুন, তিনি যেন আপনার উম্মতকে (আর্থিক) স্বচ্ছলতা দান করেন। কেননা, পারস্য ও রোমের বাসিন্দাদেরকে স্বচ্ছলতা দান করা হয়েছে এবং তাদেরকে অনেক ধন-সম্পদ দেয়া হয়েছে। অথচ তারা আল্লাহর ইবাদত করে না। তখন তিনি হেলান দিয়েছিলেন। তিনি বললেন, হে ইবনুল খাত্তাব! তোমার কি এতে সন্দেহ রয়েছে যে, তারা এমন এক সম্প্রদায় যাদেরকে তাদের ভালো কাজের প্রতিদান ইহকালেই দিয়ে দেয়া হয়েছে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল। আমার জন্যে ক্ষমার দু’আ করুন।

পৃষ্ঠা:৬৮

হাফসা আয়েশার নিকট এ ধরনের কথা প্রকাশ করার কারণেই নবী (সা:) সহধর্মিণীদের থেকে পৃথক হয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমি এক মাস তাদের নিকট যাব না। কেননা, (দুনিয়াবী প্রাচুর্যের কথা বলার কারণে) তাদের ওপর তাঁর ভীষণ রাগ হয়েছিল। অবশেষে আল্লাহ তাঁকে মৃদু ভর্ৎসনা করলেন। উনত্রিশ দিন কেটে গেলে তিনি সর্বপ্রথম আয়েশার নিকট গেলেন। আয়েশা শু তাঁকে বললেন, আপনি শপথ করেছেন এক মাস আমাদের কাছে আসবেন না। আর এ পর্যন্ত আমরা উনত্রিশ রাত অতিবাহিত করেছি যা আমি ঠিক ঠিক গণনা করে রেখেছি। নবী বললেন, মাস উনত্রিশ দিনেও হয়। আর (মূলতঃ) ঐ মাসটা উনত্রিশ দিনেরই ছিল। আয়েশা পু বলেন, যখন ইখতিয়ার সূচক আয়াত অবতীর্ণ হলো তখন সর্বপ্রথম তিনি আমার কাছে আসলেন এবং বললেন, আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাচ্ছি। তবে তোমার পিতা-মাতার সাথে পরামর্শ না করে তড়িঘড়ি তার উত্তর দেয়া তোমার জন্য অত্যাবশ্যক নয়। আয়েশা শু বলেন, তিনি এ কথা জানতেন যে, আমার পিতা-মাতা তাঁর থেকে পৃথক হওয়ার পরামর্শ আমাকে কখনো দেবেন না। তারপর তিনি বললেন, আল্লাহ বলেন- يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ إِنْ كُنْتُنَّ تُرِدْنَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا فَتَعَالَيْنَ امَتَعْكُنَّ وَأَسَرِ حُكُنَ سَرَاحًا جَمِيلًاঃঅর্থাৎ হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের বলুন, যদি তোমরা দুনিয়ার জীবনের ভোগ-বিলাস আশা কর তবে আমি তোমাদেরকে (পার্থিব) বস্তু দেব এবং তোমাদেরকে খুব সত্ত্বাবে বিদায় করব। আর যদি তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এবং পরকালের সুখ ভোগ করতে চাও তবে (জেনে নাও) তোমাদের মধ্যে সৎকর্মশীলদের জন্য আল্লাহ মহা প্রতিদান তৈরি করে রেখেছেন। (সূরা আহযাব- ২৮) (এ আয়াত শোনার পর) আমি বললাম, এ ব্যাপারে আমি আমার বাবা মার কাছ থেকে কিসের পরামর্শ নেব! আমি তো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের খুশি এবং পরকালীন (সুখের) ঘর জান্নাত পেতে চাই। তারপর তিনি তাঁর অপর সহধর্মিণীদেরকেও ইতিয়ার দিলেন এবং প্রত্যেকেই সে উত্তর দিলেন যা আয়েশা দিয়েছিলেন।

পৃষ্ঠা:৬৯

৬৬.রাসূল-এর অন্তরে আয়েশা-এর স্থান

আয়েশা রাসূল কেননা রাসূল -এর অন্তরে একটি সুউচ্চ স্থান দখল করে নিয়েছিলেন। তাকে ছাড়া অন্য কাউকে কুমারী অবস্থায় বিবাহ করেননি। ওমর ইবনে আস গুল্লু, যিনি ৮ম হিজরীতে ইসলাম গ্রহণ করেন তিনি বলেন, একদা রাসূল-কে জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার নিকট সবচেয়ে বেশি প্রিয় ব্যক্তি কে? তিনি বলেন, আয়েশা। অতঃপর আবার প্রশ্ন করা হলো, আর পুরুষদের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি কে? তিনি বললেন, তার পিতা আবু বকর। রাসূল বলেন, যদি আমি আমার উম্মতের মধ্য হতে কাউকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতাম, তবে আবু বকরকে গ্রহণ করতাম। তবে মুসলিম ভ্রাতৃত্বই সর্বোত্তম। আয়েশা -এর প্রতি রাসূল-এর ভালোবাসা ছিল স্বাভাবিক বিষয়। তবে তাদের ভালোবাসার গভীরতা কতটুকু ছিল তার রাসূল-এর মৃত্যু সময় আয়েশা-এর পাশে থাকাতেই প্রমাণ পাওয়া যায়।

৬৭.রাসূল-এর জান্নাতের সাথি

আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার স্ত্রীদের মধ্য হতে জান্নাতে কে আপনার সাথে থাকবে? তখন রাসূল তুমি কি তাদের মধ্যে নও? বললেন, আয়েশা বলেন, তখন আমার খেয়াল হলো যে, এর দ্বারা তিনি আমার দিকেই ইঙ্গিত করেছেন। কেননা, তিনি আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে কুমারী অবস্থায় বিবাহ করেননি।

পৃষ্ঠা:৭০

৬৮.রাসূল-এর প্রিয় মানুষ

আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার নিকট সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি কে? তখন তিনি বললেন, কেন? আমি বললাম, যাতে করে আপনি যাকে ভালোবাসেন আমিও তাকে ভালোবাসতে পারি। তখন তিনি বললেন, আয়েশা।

৬৯.আয়েশা-এর কান্না

আয়েশা বলেন, একদা রাসুল আমার ঘরে প্রবেশ করলেন। আর তখন আমি কাঁদছিলাম। তখন তিনি বললেন, কিসে তোমাকে কাঁদাল? আমি বললাম, ফাতেমা আমাকে গালি দিয়েছে। অতঃপর ফাতেমা -কে ডেকে বললেন, হে ফাতেমা! তুমি কি আয়েশাকে গালি দিয়েছ? তিনি বললেন, হ্যাঁ। রাসূল (সা:) বললেন, আমি যাকে ভালোবাসি তুমি তাকে ভালোবাস না? তিনি বললেন, হ্যাঁ। রাসূল বললেন, আমি যার ওপর রাগান্বিত হই তুমি কি তার ওপর রাগান্বিত হও না? তখন তিনি বললেন, হ্যাঁ। অতঃপর রাসূল বললেন, আমি আয়েশাকে ভালোবাসি। সুতরাং তুমিও তাকে ভালোবাস। তখন ফাতেমা বললেন, আমি আর কখনো আয়েশাকে এমন কথা বলব না, যাতে তিনি কষ্ট পান।

৭०.আয়েশা-এর মর্যাদা

আমর ইবনে হারেস ইবনে মুস্তালিক চন্দ্র হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা যিয়াদ- কে কিছু হাদীয়া ও মাল-সম্পদ দিয়ে উম্মুল মুমিনীনদের কাছে পাঠানো হলো। অতঃপর তিনি তাদের নিকট আয়েশা -এর মর্যাদা বর্ণনা করেন। পরবর্তীতে যখন রাসূল উম্মে সালামার নিকট আসেন, তখন উম্মে সালাম বলেন, যিয়াদ তাদের নিকট তার মর্যাদা বর্ণনা করেছে। অবশ্য যিনি যিয়াদ থেকে অধিক মর্যাদাবান (রাসূল) তিনিই তো তার মর্যাদা বর্ণনা করেছেন।

পৃষ্ঠা:৭১

৭১.একই পাত্রে পান করা

আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি হায়েয অবস্থায় পানি পান করতেছিলাম। তারপর রাসূলও সে পাত্র থেকে পান করতে শুরু করলেন। আমি দেখলাম যে, পাত্রের যে স্থানে আমি মুখ লাগিয়ে ছিলাম, তিনিও সে স্থানে মুখ রাখলেন এবং পান করলেন। তখন আমি বললাম, আপনি এ পাত্র থেকে পানি পান করলেন? অথচ আমি তো হাযেয় অবস্থায় রয়েছি? অতঃপর নবী আমার মুখ লাগানো স্থানে মুখ লাগিয়ে পান করলেন। আবার

৭২.ছারিদ খাদ্যের সাথে তুলনা

আবু মুসা আশআরী পুত্র হতে বর্ণিত। নবী বলেন, পুরুষদের মধ্যে অনেকেই পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। কিন্তু মহিলাদের মধ্যে শুধুমাত্র ফিরাউনের স্ত্রী আসিয়া ও ইমরানের মেয়ে মারইয়াম ছাড়া আর কেউ পূর্ণতা লাভ করতে পারেনি। আর মহিলাদের মধ্যে আয়েশার মর্যাদা হলো, খাদ্যের মধ্যে ছারিদের মর্যাদার মতো। বিঃ দ্রঃ ছারিদ হচ্ছে এক প্রকার খাদ্য, যা রাসূল এর যুগে শ্রেষ্ঠ খাবার বলে পরিচিত ছিল।

৭৩.ইহকাল ও পরকালের স্ত্রী

আয়েশা হতে বর্ণিত। একদা রাসূল ফাতেমা এর সাথে আলোচনা করছিলেন। কিন্তু তাদের মাঝে আমি কথা বলে ফেললাম। তখন রাসূল (সাঃ) বললেন, তুমি কি দুনিয়া ও আখিরাতে আমার স্ত্রী হওয়াতে সন্তুষ্ট নও। তখন আমি বললাম, আল্লাহর শপথ। হ্যাঁ। অতঃপর রাসূল আখিরাতে তুমিই আমার স্ত্রী। বললেন, দুনিয়াতে ও

পৃষ্ঠা:৭২

৭৪.কে সবচেয়ে উত্তম

আবু উসমান ছদ্র হতে বর্ণিত। একদা আমর ইবনে আস চন্দ্র-এর নেতৃত্বে সালাসিল নামক স্থানে একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। রাবী বলেন, অতঃপর আমি রাসূল-এর কাছে আসলাম এবং বললাম, আপনার নিকট কোন ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি উত্তম? তিনি বললেন, আয়েশা। তারপর আবার জিজ্ঞেস করলাম, পুরুষদের মধ্যে কে? তিনি বললেন, তার পিতা আবু বকর। তারপর আবার জিজ্ঞেস করলাম, তারপর কে? তিনি বললেন, আমর। অতঃপর আমি আমার নামটি পেছনে পড়ার ভয়ে আর জিজ্ঞেস করলাম না, বরং চুপ থেকে গেলাম।

৭৫.আমি তাকে মুক্ত করে দিয়েছি

আয়েশা বলেন, একদিন রাসূল একটি বন্দী নিয়ে আমার কাছে আসলেন। অতঃপর আমি তাকে মুক্ত করে দেই। ফলে সে চলে যায়। কিন্তু কিছুক্ষণ পর যখন রাসূল ফিরে আসলেন তখন বন্দীটিকে দেখতে না পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, বন্দীটি কোথায়? তখন আমি বললাম, আমি তাকে মুক্ত করে দিয়েছি, বিধায় সে চলে গেছে। তখন রাসূল তাকে খোঁজার জন্য বের হয়ে গেলেন এবং আমাকে বললেন, তোমার দুই হাত ধ্বংস হোক। অতঃপর তিনি বের হয়ে গেলেন এবং লোকদেরকে বন্দীটি খোঁজে বের করে আনতে আদেশ করেন। তখন লোকেরা তাকে খোঁজাখুঁজি করে বের করে আনল। অতঃপর রাসূল আবার আমার কাছে ফিরে আসলেন। আর আমি তখন আমার হাতকে লুকিয়ে রাখছিলাম। এ অবস্থায় দেখে রাসুল আমাকে বললেন, তোমার কি হয়েছে, তুমি তোমার হাত লুকিয়ে রাখছ কেন? তখন আমি বললাম, যেহেতু আপনি আমার ব্যাপারে বদ দোয়া করেছেন, তাই আমি আমার হাতের ব্যাপারে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ভয় করছিলাম।

পৃষ্ঠা:৭৩

অতঃপর রাসূল আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তন করলেন এবং দুই হাত উঠিয়ে বললেন, হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি একজন মানুষ, তাই আমিও রাগ করি। যেমনিভাবে সাধারণ মানুষেরা রাগ করে থাকে। আর আমি কোনো একজন মুমিন বান্দা অথবা বান্দীর ওপর বদ দোয়া করে ফেলেছি। সুতরাং আপনি তাকে এ থেকে মুক্তি দান করুন এবং তাকে পবিত্র করুন।

৭৬.রাসূল-এর সফরের সাথি

আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল যখন কোনো সফরে বের হতেন তখন তাঁর স্ত্রীদের মধ্যে লটারি করতেন। অধিকাংশ সময় লটারিতে আয়েশা ও হাফসা -এর নাম আসত এবং তাদের সাথে সফরে বেরহতেন। আর রাসূল যখন রাতে সফর করতেন, তখন আয়েশাকে সাথে নিয়ে যেতেন। অতঃপর তারা দুজনে গল্প-গুজব করতেন। একদা হাফসা আয়েশা বললেন, তুমি কি আমার আরোহীতে এবং আমি তোমার আরোহীতে ভ্রমণ করব, এতে কি তুমি রাজি আছ? তখন আয়েশা বলেন, হ্যাঁ। অতঃপর আয়েশা হাফসা -এর উটে আরোহণ করলেন এবং হাফসা (রা) আয়েশা -এর উঠে আরোহণ করলেন। আর রাসুল আয়েশার উটের কাছে আসলেন, যাতে হাফসা ছিলেন। অতঃপর রাসূলতাকে সালাম প্রদান করেন এবং অবতরণ করার পূর্ব পর্যন্ত তার সাথে সফর করেন।আয়েশা-এর ইতিকাফ আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল যখন রমযানের শেষ দশকের ইতিকাফ সম্পর্কে আলোচনা করলেন, তখন আমি ইতিকাফ করার অনুমতি চাইলাম। ফলে তিনি আমাকে অনুমতি দিলেন। অতঃপর হাফসা আমাকে রাসূল-এর অনুমতির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন এবং তিনিও তাই করলেন। এরপর যয়নাব ও তাদের দেখাদেখি ইতিকাফে বসার ইচ্ছা পোষণ করলেন

পৃষ্ঠা:৭৪

এবং আরো একটি তাবুও তৈরি করতে আদেশ দেন। ফলে তার জন্যও একটি তাবু টানাতে বললেন। অতঃপর রাসূল যখন নামায পড়তেন, তখন তিনি ঐ তাবুগুলোর দিকে তাকাতেন। ফলে একদিন জিজ্ঞেস করলেন, এগুলো কার তাবু। তখন তাকে বলা হলো, আয়শা, হাফসা ও যায়নাব -এর তাবু। অতঃপর রাসূল বললেন, ইতিকাফ অবস্থায় ভালো কাজের এরকম প্রতিযোগিতা চলছে! তারপর তিনি ফিরে যান এবং শাওয়াল মাসের দশ দিন ইতিকাফে লিপ্ত ছিলেন।

৭৮.আয়েশা এর রাগ ও সন্তুষ্টি

আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আল্লাহর রাসূল আমাকে বললেন, আমি জানি কখন তুমি আমার প্রতি খুশি এবং কখন রাগান্বিত থাক। আমি বললাম, কি করে আপনি তা বুঝতে পারেন? তিনি বললেন, যখন তুমি রাজি থাক তখন বল, না, মুহাম্মাদের রবের শপথ! কিন্তু যখন আমার ওপর রাগান্বিত থাক তখন বল, না; ইবরাহীমের রবের শপথ! এ কথা শুনে আমি বললাম, হ্যাঁ। আপনি সত্য বলেছেন। কিন্তু আল্লাহর কসম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনার নাম ছাড়া আর কিছুই বাদ দেই না। (অর্থাৎ আমার অন্তরে আপনার মহব্বত ঠিকই থাকে)।

৭৯.জিবরাঈল (আ) কর্তৃক আয়েশা -কে সালাম প্রদান

নিম্নে বর্ণিত ঘটনাটি আয়েশা -এর একটি বিরাট মহত্ত্বের কথাই প্রকাশ করে, যা ছিল জিবরাঈল (আ) কর্তৃক আয়েশা আবু সালামার সূত্রে বর্ণনা করেন। আয়েশা -কে সালাম প্রদান। ইবনে শিহাব বলেন, একদা রাসূল বলেন, হে আয়েশা! ইনিই হচ্ছেন জিবরাঈল। তিনি তোমাকে সালাম প্রদান করেছেন। অতঃপর আমি বললাম, আপনার ওপরও শান্তি, রহমত ও বরকত নাযিল হোক।

পৃষ্ঠা:৭৫

৮০.আয়েশা-এর লেপের ভিতর থাকাবস্থায় ওহি নযিল

ইবনু আবী খাইসামা বর্ণনা করেন, রমিসা বিনতে হারেস হতে বর্ণিত। নবী এর বিবিগণ উম্ম সালামাকে বললেন, আপনি রাসূলকে বলুন, মানুষেরা আয়েশা -এর পালার সময় বেশি বেশি হাদীয়া পাঠায়। রাসূল লোকদের যেন বলে দেন, সবার পালার সময় যেন হাদীয়া পাঠায়। কেননা, আয়েশা যেমন কল্যাণ পছন্দ করেন আমরাও নিশ্চয় তেমন কল্যাণ পছন্দ করি। উন্মু সালামা যখন রাসূল এর নিকট এসে কথাগুলো বললেন রাসূল তখন মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তার নিকট এসে জিজ্ঞাসা করল যে, রাসূল কি বলেছেন? উম্মু সালামা বলেন, রাসূল (সা:) মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তারা সকলে উম্মে সালামাকে বলল আবার যেয়ে বলো। উম্মে সালামা পুনরায় সেই কথাগুলো বললে রাসূল তাকে বললেন, হে উম্মে সালামা আয়েশার ব্যাপারে আমাকে কষ্ট দিবে না। আল্লাহ আয়েশার লেপের নিচে ছাড়া তোমাদের কারো নিকটেই ওহি অবতীর্ণ হয়নি। আবু আমর ইবনু সিমাক বর্ণনা করেন, আয়েশা শু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এ বিষয়ে স্বতন্ত্রের জন্য অন্যান্য স্ত্রীদের নিকট গর্ব করতাম। একমাত্র আমাকে কুমারী বিবাহ করেন, আমার ঘর ছাড়া অন্য কারো ঘরে কুরআন অবতীর্ণ হয়নি। পবিত্র কুরআনে আমার পবিত্রতা ঘোষণা করা হয়েছে।

৮১.সাতটি বৈশিষ্ট্য, যা অন্যান্য স্ত্রীদের নেই

আয়েশা বলেন, আমার নিকট সাতটি বৈশিষ্ট্য আছে, যা মারইয়াম ইবনে ইমরান ব্যতীত অন্য কোনো মহিলার মধ্যে নেই। আল্লাহর শপথ! এ কথাগুলো আমি আমার সাথিদের ওপর অহংকার করে বলছি না। অতঃপর আব্দুল্লাহ ইবনে সাফওয়ান কি? তখন তিনি বলেন: বলেন, হে উম্মুল মুমিনীন! সেগুলো

পৃষ্ঠা ৭৬ থেকে ৯০

পৃষ্ঠা:৭৬

১. ফেরেশতা আমার আকৃতিতে অবতরণ করেন। ২. রাসূল আমাকে সাত বছর বয়সে বিবাহ করেন।৩. রাসুল আমাকে নয় বছর বয়সে ঘরে উঠিয়ে নেন।৪. রাসূল আমাকে কুমারী অবস্থায় বিবাহ করেন।৫. তিনি আমার ব্যাপারে আর কাউকে শরীক করেননি।৬. আমার লেপের ভিতর থাকাবস্থায় ওহি নাযিল হয়।৭. তার নিকট আমি ছিলাম মানুষের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয়। তিনি আরো বলেন।১. আমি ছিলাম রাসূল-এর নিকট সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তির কন্যা।২. আমার ব্যাপারে কুরআনের আয়াত নাযিল হয়।৩ আমার কারণে জাতি ধ্বংস হওয়ার উপক্রম হয়েছিল।৪. আমি জিবরাঈল (আ)-কে দেখেছি, যা রাসূল ﷺ এর অন্য কোনো স্ত্রীই দেখেনি।৫. আমার বাড়িতেই রাসূল-এর জান কবজ করা হয়।৬. আর আমার পরে রাসূল আর কোনো স্ত্রীর সাথে মিলন করেননি। অর্থাৎ শেষ সময় পর্যন্ত তিনি আমার সাথেই ছিলেন।

৮২.আয়েশা-এর নয়টি গুণ

আবদুর রহমান ইবনে যাহহাক হতে বর্ণিত। একদিন আবদুল্লাহ ইবনে সাফওয়ান আয়েশা -এর কাছে আসল। তখন আয়েশা বললেন, আমার নিকট নয়টি বৈশিষ্ট আছে, যা মারইয়াম (আ) ছাড়া অন্য কাউকে দেয়া হয়নি। আল্লাহর কসম। আমি এ নিয়ে আমার সাথি তথা রাসুল-এর স্ত্রীদের ওপর গর্ত করছি না। তখন ইবনে সাফওয়ান বলেন, সেগুলো কি? আয়েশা বলেন,

পৃষ্ঠা:৭৭

১ রাসূল-এর নিকট একজন ফেরেশতা আমার আকৃতিতে এসেছেন।২. তিনি আমাকে কুমারী অবস্থায় বিবাহ করেছেন।৩. তিনি আমার লেপের ভিতর থাকাবস্থায় ওহি নাযিল হতো।৪. আমি ছিলাম মানুষের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয়।৫. আমার ব্যাপারে কুরআনের আয়াত নাযিল হয়।৬. আমার কারণে মুসলিম উম্মত ধ্বংস হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়।৭. আমি জিবরাঈল (আ)-কে দেখেছি, যা রাসূল দেখেনি। ৪-এর অন্য কোনো স্ত্রীই৮. আমার বাড়িতেই রাসূল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।৯. তিনি কোনো স্ত্রীর নিকট পালা ছাড়া অবস্থান করেননি, তবে তিনি আমার নিকট থেকেছেন।

৮৩.আয়েশা-এর তপস্যা

আয়েশা ছোটকাল থেকেই তার পিতা আবু বকর এর ঘরে লালিত পালিত হয়ে উঠেন। ফলে তার থেকে তিনি অনেক তপস্যা আয়ত্ত করে ফেলেন। যেমন, আবু বকর প্লে কর্তৃক আল্লাহর উদ্দেশ্যে সকল মাল-সম্পদ খরচ করে দেয়া এবং এ ব্যাপারে মনের মধ্যে বিন্দু পরিমাণ সন্দেহ না রাখা। দুনিয়ার প্রতি কোনো ধরনের লোভ বা আশা-আকাঙক্ষা না থাকা ইত্যাদি। অতঃপর যখন আয়েশাকে রাসূল বিবাহ করেন, যিনি ছিলেন তপস্যাকারীদের নেতা। তখন তার নিকট তপস্যার পরিপূর্ণ স্তর পৌঁছে যায়। কেননা, তিনি খুব সূক্ষ্মভাবে রাসূল এর জীবনের তপস্যা প্রত্যক্ষ করেছেন। আর এও তিনি সরাসরিভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন যে, দুনিয়ার চাকচিক্যের প্রতি

পৃষ্ঠা:৭৮

রাসূল-এর দৃষ্টিভঙ্গি কেমন? এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষাস্বরূপ যা আসে তা তিনি কোন দৃষ্টিতে দেখেন? যখন আল্লাহ তায়ালা আমাদের নবী মুহাম্মদ-কে দুনিয়ার সমস্ত ধন-ভাণ্ডারের চাবি দিয়ে দিতে প্রস্তাব পেশ করেন, তখন তিনি তা নিতে অস্বীকার করেন। তাছাড়া তিনি ঐসব বিষয়কে অপছন্দ করতেন, যা সৃষ্টিকর্তা অপছন্দ করতেন। আর সৃষ্টিকর্তা যা পছন্দ করতেন তিনি তাই করতেন। দ্বীনের ব্যাপারে তিনি অসাধারণ কষ্ট সহ্য করেছেন, যা অন্য কারো মধ্যে এর দৃষ্টান্ত লক্ষ্য করা যায়নি। অত্যধিক কঠিন অবস্থার সময় ক্ষুধার যান্ত্রণায় তিনি পেটে পাথর বাঁধতেন। তিনি দুনিয়ার ব্যাপারে কাউকে ভয় করতেন না এবং আখিরাতের ব্যাপারে কাউকে ছাড় দিতেন না। তিনি কোনো বান্দা থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি, তবে দ্বীনের বৃহত্তম স্বার্থে তাকে শরীয়ত অনুযায়ী শান্তি প্রয়োগ করেছেন। এভাবে রাসূল-এর যতগুলো সুন্দর সুন্দর বৈশিষ্ট্য আছে আয়েশা তা সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করেন এবং নিজ জীবনে তা বাস্তবায়ন করতে প্রয়াস পান।

৮৪.অকাতরে দান

আবু হুরায়রা টু বর্ণনা করেন, রাসূল বলেছেন, আমার কাছে যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ মওজুদ থাকে তবে তিন দিন অতিবাহিত হওয়ার পূর্বেই তা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে দিব। কেননা, এছাড়া আমি খুশি হতে পারব না।

৮৫.ঘরে তো কিছু নেই

আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন রাসূল মৃত্যুবরণ করেন, তখন কোনো প্রাণী খেতে পারে এমন কিছু ঘরে ছিল না। তবে আমার নিকট একটি যবের অর্ধেক রুটি ছিল।

পৃষ্ঠা:৭৯

৮৬,রাসূল কিছুই রেখে যাননি

উন্মুল মুমিনীন যুওয়াইরিয়া বিনতে হারেস-এর ভাই আমর ইবনে হারেস (রা:) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল তাঁর মৃত্যুর সময় দাস-দাসী, দিনার- দিরহাম কোনো কিছুই রেখে যাননি। তবে একটি সাদা গাধা যার ওপর তিনি আরোহণ করতেন এবং একটি অস্ত্র ও নিজ ভূমি রেখে গেছেন, তাও তিনি পথিকদের উদ্দেশ্যে দান করে গেছেন।

৮৭.রাসূল-এর বিছানা

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ দ্রে হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল একটি চাটায়ের ওপর ঘুমিয়ে ছিলেন। আর তাই তার পিঠে দাগ পড়ে যায়। তখন আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি একটি তোষক গ্রহণ করলে ভালো হতো। তখন তিনি বলেন, দুনিয়া আমার জন্য নয়। আর আমি দুনিয়াতে একজন পথিক ছাড়া আর কিছুই নই। আমি গাছের ছায়া থেকে ছায়া গ্রহণ করব।

৮৮.রাসূল-এর পরিবারের খাবার

আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল -এর পরিবার একাধারে দুদিন যাবত যবের রুটিও তৃপ্তি সহকারে আহার করতে পারেনি। আর এমতাবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

পৃষ্ঠা:৮০

৮৯.রাসূল জীবন যাপন

উরওয়া দ্রে আয়েশা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, হে আমার ভাতিজী! দুই মাস ধরে আমার বাড়িতে কোনো আগুন জ্বলেনি। আমি বললাম, তাহলে আপনারা কিভাবে জীবন ধারণ করেছেন। আয়েশা বলেন, দুটি কালো বস্তুর মাধ্যমে। তা হলো ১. খেজুর এবং ২. পানি। তাছাড়া রাসূল-এর কিছু আনসার সাহাবী ছিলেন, যাদের ছাগল ও উটের পাল ছিল। তারা রাসূল এর কাছে ঐ উট বা ছাগলের দুধ হাদিয়া পাঠাত।

৯০.পেটে পাথর বাধা

জাবের হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল যখন খন্দক খনন করেন। তখন সাহাবীদের ওপর কঠিন পরিশ্রম অর্পিত হয়। এমন কি রাসূল পেটে পাথর বেঁধে নেন। ক্ষুধার যন্ত্রণায়

৯১.দুনিয়ার বিলাসিতা বর্জন

আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক আনসারী মহিলা আমার ঘরে প্রবেশ করল এবং রাসূল-এর বিছানাটিকে ভাজ করা অবস্থায় দেখতে পেল। অতঃপর সে তার নিজের ঘরে চলে গেল এবং আমার কাছে একটি ভাল উন্নত পশমের বিছানা পাঠাল। তারপর রাসূল এসে তা দেখে বলেন, এটা কি? আমি বললাম, একজন আনসারী মহিলা এসে আপনার বিছানা দেখে এটা আমার কাছে পাঠিয়েছে। তিনি বলেন, হে আয়েশা! এটা ফেরত পাঠাও। কিন্তু আমি আর পাঠাইনি। তারপর আমাকে তিনি তিনবার বলেন যে, হে আয়েশা! তুমি ফেরত পাঠাও। আল্লাহর শপথ, আমি যদি ইচ্ছা করি তাহলে পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ ও রৌপ্য ঘরে রাখতে পারি। এভাবে যখনই আয়েশা দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যেতেন, তখনই তিনি নিজের পিতা এবং স্বামীর সুহবতে দুনিয়া বিরাগী হয়ে যেতেন।

পৃষ্ঠা:৮১

৯২.পেট ভরে খেতেন না

আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল-এর কাছে কোনোদিন খাদ্যে তৃপ্তি পাইনি। যদি আমি কাদতে ইচ্ছা করতাম আমি কাঁদতে পারতাম। তাছাড়া রাসূল-এর পরিবারও তৃপ্তি পায়নি। আর এমতাবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

৯৩.আয়েশা-এর দান

উরওয়া আয়েশা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি আয়েশা কে ৭০ হাজার দিনার বা দিরহাম বণ্টন করতে দেখেছি। অথচ নিজের বর্মটাই ছিল তালিযুক্ত।

৯৪.দানের ক্ষেত্রে আসমা ও আয়েশা

আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর দ্রে বলেন, আমি কখনো এমন দুজন মহিলাকে দেখিনি, যারা আয়েশা ও আসমা -এর চেয়ে অধিক দানশীলা। তাদের দানশীলতা ছিল ভিন্ন রকম। যেমন, আয়েশা মাল জমা করে রাখতেন। অতঃপর যখন অনেকগুলো জমা হয়ে যেত, তখন তা বণ্টন করে দান করে দিতেন। পক্ষান্তরে আসমা আগামীকালের জন্য কিছুই জমা করে রাখতেন না।

৯৫.কিছু জমা রাখতেন না

উরওয়া হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আয়েশা ল্প যা পেতেন তাই সদকা করে দিতেন এবং কিছুই জমা রাখতেন না।

পৃষ্ঠা:৮২

৯৬.মুয়াবিয়ার হাদিয়া

উরওয়া খুল্ল বলেন একদিন মুয়াবিয়া দ্র আয়েশা-এর কাছে এক লক্ষ দিরহাম পাঠালেন। অতঃপর তিনি তার সবগুলো বন্টন করে দেন এবং কোন কিছু জমা রাখেননি। তখন বুরাইদা ত্রে বলেন আপনি তো রোযা রেখেছেন। আপনি এখান থেকে কিছু দিরহাম নিয়ে গোশত ক্রয় করে নিন। তখন তিনি বলেন, যদি আগে স্মরণ করতে তাহলে আমি তা করতাম। বুরাইদা থেকে আরো বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, আয়েশা ৭০ হাজার দিরহাম বণ্টন করেন অথচ নিজের বর্মটাই তালি দিয়ে ঠিক করতেছেন।

৯৭.আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইরের হাদিয়া

মুহাম্মাদ ইবনে মুনজির প্লে উম্মে যার’আ থেকে বর্ণনা করেন। যিনি ছিলেন আয়েশা এর দাস। তিনি বলেন, একদা আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর ন্দ্রে আয়েশা -এর কাছে দুই বস্তা সম্পদ পাঠালেন। রাবী বলেন, আমি দেখেছি তার পরিমাণ ছিল এক লক্ষ আশি হাজার দিরহাম। আর তখন তিনি ছিলেন রোযাদার। অতঃপর তিনি বসে বসে তা বণ্টন করে শেষ করে দেন এবং নিজের কাছে কোনো কিছু বাকি রাখলেন না। তারপর তার দাসীকে ইফতার নিয়ে আসতে বলেন। ফলে তার দাসী তেল আর রুটি নিয়ে আসল। তখন উম্মে যুর’আ বললেন, হে আয়েশা! তুমি সেখান থেকে কিছু দিরহাম দিয়ে গোশত কিনে আনতে পারতে। তখন তিনি বলেন, তুমি যদি আমাকে আগে স্মরণ করিয়ে দিতে তাহলে আমি তা করতাম।

পৃষ্ঠা:৮৩

৯৮.আয়েশা -এর বর্ম

ইবনে ইয়ামীন আল মাক্কী বলেন, আমি আয়েশা -এর কাছে গেলাম। তখন তিনি একটি বর্ম পড়া ছিলেন। যার মূল্য মাত্র পাঁচ দিরহাম। অতঃপর তিনি আমাকে বললেন, তুমি তোমার দাসীর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ কর। রাবী বলেন, অতঃপর আমি তার দিকে তাকালাম, দেখলাম যে এটা ঘরে পরিধান করার জন্য।

৯৯.আয়েশা-এর দয়া

আয়েশা শু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার নিকট একটি মহিলা আসল। তার সাথে দুটি বাচ্চা সে আমার কাছে কিছু চাইল। তখন আমার কাছে মাত্র একটি খেজুর ছিল। আর আমি তা ভাগ করে তার দুই বাচ্চার হাতে দিয়ে দিলাম। অতঃপর যখন রাসূল আসলেন, তখন মহিলাটি রাসূল-কে সবকিছু খুলে বলল। তখন তিনি বলেন, যে এ রকম বাচ্চাদের দয়া করে সে খুব উত্তম কাজ করে। কিয়ামতের দিন তার এবং জাহান্নামের মাঝে একটি পর্দা থাকবে। সহীহ মুসলিমের অন্য বর্ণনায় রয়েছে। আয়েশা প্রশ্ন বলেন, আমার নিকট একটি মিসকিন মহিলা আসল। আর তার সাথে ছিল দুটি বাচ্চা। এ সময় আমার নিকটখাওয়ার জন্য তিনটা খেজুর ছিল। তখন দুটা খেজুর মহিলাটির দুই বাচ্চাকে দিয়ে দিলাম এবং একটি নিজে খাওয়ার জন্য মুখে উঠালাম, তখন মহিলাটির দুই বাচ্চা সেটাও খেতে চাইল। ফলে আমি সে খেজুরটাকেও দুই ভাগে ভাগ করে ঐ দুই বাচ্চাকে দিয়ে দিলাম। এ ঘটনা দেখে মহিলাটি আমার ওপরআশ্চর্য হয়ে গেল। অতঃপর যখন রাসূল আসলেন, তখন ঐ মহিলা ঘটনাটি রাসূল-এর কাছে উল্লেখ করল। তখন তিনি বলেন, এ কারণেই আল্লাহ তায়ালা তাঁর ওপর জান্নাত ওয়াজিব করে দিয়েছেন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেছেন।

পৃষ্ঠা:৮৪

১০০, ১০১.আয়েশা-এর রোযা

কাশেম বলেন, আয়েশা অধিকাংশ সময় ধরে রোযা রাখতেন। উরওয়া হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আয়েশা অধিকাংশ সময় রোযা রাখতেন। তবে ঈদুল আযহা আর ঈদুল ফিতরের দিন রোযা রাখতেন না।

১০২.আয়েশা-এর আল্লাহভীতি

উরওয়া গুল্ল হতে আরো বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, আমি প্রায়ই আয়েশা – এর বাড়িতে থাকতাম। একদিন সকালে দেখি তিনি তাসবিহ পাঠ করছেন এবং কুরআনের এ আয়াত তিলাওয়াত করছেন-فَمَنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا وَوَقَانَا عَذَابَ السَّمُوْمِ অর্থাৎ অতঃপর আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং দগ্ধকারী আযাব হতে আমাদেরকে রক্ষা করেছেন। (সূরা ভূর: আয়াত-২৭) অতঃপর তিনি দোয়া করছেন এবং কান্না করছেন। আর আমি আমার প্রয়োজনে বাজারে গেলাম এবং আবার ফিরে এসেও দেখি তিনি কান্না করতে করতে নামায আদায় করছেন।

পৃষ্ঠা:৮৫

১০৩.আল্লাহ আদম সন্তানের জন্য এটা লিখে দিয়েছেন

আয়েশা সম্পূর্ণ আগ্রহী ছিলেন যে, তিনি কখনো রাসূল এর আনুগত্য হারাবেন না এবং আল্লাহর অতি নিকটবর্তী হবেন। আমর ইবনে হারাম বলেন, আমরা হজ্জ করার জন্য আসলাম। আমাদের সাথে আয়েশা ও আসলেন। এমতাবস্থায় রাসূল তার কাছে গিয়ে দেখেন যে, তিনি কান্না করছেন। তখন তিনি তাকে বলেন, তুমি কাঁদছ কেন? তখন আয়েশা বলেন, আমার হায়েয শুরু হয়েছে। তখন রাসূল বলেন, নিশ্চয় এটা এমন একটা বিষয় যে, আল্লাহ তায়ালা মেয়েদের জন্য অবশ্যক করে রেখেছেন। সুতরাং এখন তুমি গোসল কর এবং হজ্জের তালবীয়া পাঠ কর। ফলে আয়েশা (রা:) তাই করলেন।অতঃপর যখন তিনি পবিত্র হয়ে যান, তখন তিনি কাবা ও সাফা মারওয়া তওয়াফ করেন। তারপর রাসূল আয়েশা -কে বলেন, তোমার হজ্জ এবং উমরা উভয়টাই পূর্ণ হয়ে গেছে। তখন আয়েশা বলেন, হে আল্লাহর রাসূল। আমার হজ্জ তওয়াফ করে তৃপ্ত হয়নি, আমি আরো তওয়াফ করতে চাই। তখন রাসূল আয়েশা-কে তাওয়াফ করার জন্য তার সাথে তার ভাই আব্দুর রহমান বিন আবু বকরকে পাঠালেন।

১০৪.তোমাদের জিহাদ হচ্ছে হজ্ব

আয়েশা-এর কাছে খবর পৌঁছল যে, জিহাদ আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায় জিহাদ সর্বোত্তম আমল। তখন আয়েশা জিহাদে যাওয়ার জন্য রাসূল এর অনুমতি চাইলে তিনি বলেন, তোমাদের জিহাদ হজ্জ হলো। আয়শা (রা:)- :)- অন্য বর্ণনায় আয়েশা বলেন, রাসূলের স্ত্রীরা তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, নিশ্চয় জিহাদ ও হজ্জ কতই না সুন্দর।

পৃষ্ঠা:৮৬

১০৫, ১০৬.সম্মান এবং জিহাদের অধ্যায়

উহুদ যুদ্ধে আয়েশা মুজাহিদদের পানি পান করানোর কাজে ব্যস্ত ছিলেন। আর তখন তিনি ছিলেন অল্পবয়স্ক কিশোরী। তবুও তিনি প্রথমবারের মতো এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। আনাস টুল্ল বলেন, আমি আয়েশা এবং উম্মে সুলাইম -কে দেখেছি তারা দুজন আহত লোকদের সেবা করছেন।

১০৭.খন্দকের যুদ্ধে আয়েশা

খন্দক যুদ্ধে আয়েশা অনেক বীরত্ব ও সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন, এমনকি তিনি মুজাহিদদের প্রথম কাতারে যেতে শুরু করছিলেন। কিন্তু ওমর ল্লে তা অপছন্দ করছিলেন। এ ব্যাপারে আয়েশা বলেন, আমরা যখন খন্দক যুদ্ধের জন্য বের হলাম। তখন আমি লোকদের পেছনে অবস্থান করছিলাম। এমতাবস্থায় আমি একটি গর্ত খোরার আওয়াজ শুনতে পেলাম। অতঃপর আমি সেদিকে তাকিয়ে সা’দ ইবনে মুয়ায এবং ভাতিজা হারেস ইবনে আউস উল্ল-কে দেখতে পেলাম। সে একটি লোহার ডাল বহন করছিল। অতঃপর আমি মাটিতে বসে পড়ি। কিছুক্ষণ পর সা’দ আমার পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। আর তার সাথে একটি লোহার বর্ম ছিল, যার এক পার্শ বের হয়েছিল। ফলে আমি তাকে ভয় পাচ্ছিলাম যে, না জানি সেই বের হওয়া অংশটুকু আমার শরীরে লেগে যায়। কেননা, সে ছিল একজন লম্বা ও বিশাল দেহের অধিকারী।  অতঃপর আমি একটি বাগানের পার্শ্বে দাঁড়ালাম, তখন মুসলমানদের একটি দলকে দেখতে পেলাম। আর সে দলে তালহা ইবনে আবদুল্লাহকে দেখতে পেলাম যে, তিনি ওমর টুল্ল-কে বলছেন, হে ওমর। আল্লাহ থেকে পলায়নের সুযোগ কোথায়?

পৃষ্ঠা:৮৭

১০৮, ১০৯.অপবাদ থেকে মুক্তি লাভ

আয়েশা বনি মুসতালাক যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার সময় তিনি তার (প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য বের হলেন) এই যুদ্ধে আয়েশা পরীক্ষিত হয়েছেন একটি মিথ্যা অপবাদের মাধ্যমে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাকে পরিপূর্ণভাবে মুক্তি দান করেন। তার সততা প্রকাশ করে আল্লাহ তায়ালা কুরআনে আয়াত নাযিল করেছেন।

১১০.মুসলিমদের ঘর

আয়েশা বলেন, একদা আমার দুধ সম্পর্কের চাচা আমার ঘরে আসার অনুমতি চাইলেন। কিন্তু আমি তাকে অনুমতি দিলাম না। অতঃপর যখন রাসূল আসলেন তখন আমি বললাম, আমার দুধ সম্পর্কের চাচা আমার ঘরে আসতে চাইছিলেন। কিন্তু আমি তাকে আসতে দেইনি। তখন রাসূল বলেন, তোমার উচিত তোমার চাচাকে অনুমতি দেয়া। অতঃপর আমি বললাম, আমাকে দুধ পান করিয়েছে একজন মহিলা, পুরুষ নয়। তারপর রাসূল নিশ্চয় সে তোমার চাচা। সুতরাং সে তোমার কাছে আসতে পারবে। বলেন,

১১১.আয়েশা-এর স্বপ্ন

একদা আয়েশা একটি স্বপ্ন দেখেন। অতঃপর তা তার পিতা আবু বকর কে বলেন। তখন আবু বকর বলেন, তোমার স্বপ্ন যদি সত্যি হয় তাহলে তোমার বাড়িতে বিশ্ববাসীর মধ্য হতে তিনজন উত্তম মানুষকে দাফন করা হবে। অতঃপর যখন রাসূলকে দাফন করা হয়েছে তখন আবু বকর বলেন, এটাই হলো তোমার স্বপ্নের প্রথম চাঁদ। আর এটাই হচ্ছে সর্বোত্তম। তারপর স্বপ্নের দ্বিতীয় চাঁদ আবু বকর গুজু-কে দাফন করেন। তারপর তৃতীয় চাঁদ ওমর কে দাফন করেন। আর এভাবেই আয়েশা -এর স্বপ্নে পূর্ণতা লাত করে।

পৃষ্ঠা:৮৮

১১২.আয়েশা এবং তাঁর লজ্জা

আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন রাসূল ও আমার পিতাকে আমার বাড়িতে দাফন করা হয়, তখন আমি আমার উড়না ছাড়াই বাড়িতে প্রবেশ করতাম। কিন্তু যখন উমর উল্ল-কে দাফন করা হলো, তখন আমি আমার উড়না ভালোভাবে না লাগিয়ে কোনো দিনই সেখানে প্রবেশ করতাম না। ওমর পুত্র মৃত অবস্থায় সেরকমই লজ্জাবোধ করতেন, যেভাবে তিনি জীবিত অবস্থায় পেতেন।

১১৩.যুলুম হতে তার ভয়

আয়েশা বিনতে তালহা আয়েশা হতে বর্ণনা করেন। একদা আয়েশা (রা:) একটি মুশরিক জিনকে হত্যা করেন। পরে তাকে স্বপ্নে দেখানো হয় যে, তিনি একজন মুসলিমকে হত্যা করেছেন। তখন আয়েশা মুসলিম হতো তাহলে সে নবীর স্ত্রীদের নিকট আসত না। বলেন, যদি সে তারপর তাকে বলা হলো, যখন সে তোমার নিকট প্রবেশ করে তখন তোমার ওপর কি কোনো কাপড় ছিল না? অতঃপর তিনি হতভম্ব হয়ে ঘুম থেকে জাগ্রত হন। আর তাকে ১২ দিরহাম আল্লাহর রাস্তায় খরচ করতে বলা হয়। ফলে তিনি তাই করলেন। কিন্তু তার অন্তরে আল্লাহর একটি ভয় সৃষ্টি হয়ে যায় যে, মনে হয় সে কোনো যুলুমে লিপ্ত হয়েছে। কেননা, তিনি রাসূল-এর কাছ থেকে অনেক বার উম্মতদেরকে যুলুম থেকে সর্তক করতে শুনেছেন। তিনি বলেছেন, তোমরা যুলুম থেকে বেঁচে থাক। কেননা, যুলুম কিয়ামতের দিন একটি বিরাট অন্ধকার হয়ে দাঁড়াবে। তিনি আরো বলেন, তোমরা মাজলুমের দোয়া থেকে বেঁচে থাক। কেননা, এটা মেঘ খণ্ডের উপরেই অবস্থান করে। আর আল্লাহ তায়ালা বলেন,

পৃষ্ঠা:৮৯

وَعِزَّتِي وَجَلَا لِي لِأَنْصُرَنَّكَ وَلَوْ بَعْدَ حِينٍ ঃঅর্থাৎ আমার সম্মান ও মাহাত্মের শপথ। আমি তোমাকে সাহায্য করব, যদি কিছুকাল বিলম্ব হয়। তিনি আরো বলেন, মাযলুমের দোয়া থেকে বেঁচে থাক, যদিও সে কাফের হয়। কেননা, তার দোয়া এবং আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা থাকে না।

১১৪.আয়েশা-এর বরকত

আয়েশা -এর অনেক বরকত রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় বরকত হচ্ছে, তার কারণে তায়াম্মুমের আয়াত নাযিল হওয়া, যা মুসলিমদেরকে অনেক কষ্ট থেকে বাঁচিয়ে দেয়। আয়েশা বলেন, একদা আমরা রাসূল-এর সাথে কোনো এক সফরে বের হলাম। অতঃপর আমরা যখন বাইদা নামক স্থানে পৌঁছলাম, তখন আমার গলার হার ছিড়ে পড়ে গেল। তখন রাসূল আমার জন্য থেমে গেলেন এবং লোকেরাও থেকে গেল। এমতাবস্থায় তাদের সাথে কোনো পানি ছিল না। তখন সবাই আৰু বকর ট্রে-এর কাছে এসে বলল, আপনি কি জানেন, আয়েশা -এর জন্য নবীসহ সবাই রাস্তায় আটকে আছে? তখন আবু বকর ট্রে এসে দেখেন আয়েশা-এর রানের ওপর রাসূল ঘুমিয়ে আছেন। এমতাবস্থায় আবু বকর প্রশ্ন আয়েশা (রা:)-কে তিরস্কার করতে লাগলেন এবং কোমরে খুঁচাতে আরম্ভ করেন। কিন্তু আয়েশা রাসূলকে তা বুঝতে দেননি। ফলে রাসূল কোনো পানি ছাড়াই সকাল করে ফেলেন। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা তায়াম্মুমের আয়াত নাখিল করেন এবং সকলেই তায়াম্মুম করে নামায আদায় করে নেন। তখন উসাইদ বিন হুযাইর বলেন, হে আবু বকর গুল্ল আপনার পরিবার কতই না বরকতময়। অতঃপর আমার উটটি উঠানো হলো, যার ওপর আমি আরোহণ করতাম। ফলে উটটির নিচে হারটি পাওয়া গেল।

পৃষ্ঠা:৯০

১১৫.আয়েশা-এর অভিযোগ

আয়েশা বলেন, একদা নবী বাকী নামক কবরস্থান থেকে জানাযা পড়ে বাড়ি ফিরে আসেন। অতঃপর তিনি আমাকে মাথা ব্যথা অবস্থায় পেলেন। তখন আমি শুধু বলতেছিলাম, হে মাথা, হে মাথা। তখন তিনি বললেন, হে আয়েশা! তোমার মাথার কি হয়েছে? যদি তুমি আমার আগে মৃত্যুবরণ কর তাহলে আমি নিজে তোমাকে গোসল করাব, তোমার জানাযা পড়াব এবং তোমাকে দাফন করব।

১১৬.মৃত্যুর সময় সদকা

আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল অসুস্থতার সময় এক খণ্ড স্বর্ণ সদকা করতে বললেন, যা আমাদের কাছে ছিল। আয়েশা বলেন, যখন তিনি জ্ঞান ফিরে পেলেন তখন তিনি বললেন, বলেন কি করলে? তখন আয়েশা বলেন, আমি ব্যস্ত ছিলাম। তখন তিনি বলেন, তা আমায় নিকট নিয়ে আস। অতঃপর আয়েশা নয় বা সাতটি দিনার নিয়ে আসলেন। তখন রাসূল এগুলো থাকাবস্থায় মারা যান। বলেন, মুহাম্মদ সম্পর্কে কি ধারণা হবে, যদি তিনি

১১৭.বরকতের আশায়

আয়েশা শু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন রাসূল অসুস্থ হয়ে পড়তেন, তখন তিনি সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করতেন এবং শরীরে ফুঁক দিতেন। অতঃপর যখন তার অসুস্থতা বেড়ে গেল, তখন আমি সূরাগুলো পাঠ করতাম এবং বরকতের আশায় রাসূল-এর নিজ হাত দিয়ে তার শরীর মুছে দিতাম।

পৃষ্ঠা ৯১ থেকে ১০৫

পৃষ্ঠা:৯১

১১৮.আবু বকরকে নামায পড়াতে বল

আবু মুসা আশআরী বলেন, যখন রাসূল অসুস্থ হয়ে গেলেন এবং সে অসুস্থতা আরো বৃদ্ধি পেয়ে গেল, তখন তিনি বলেন, তোমরা আবু বকরের কাছে যাও এবং তাকে লোকদের ইমামতি করতে বল। তখন আয়েশা বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি তো কোমল হৃদয়ের নরম মানুষ। সুতরাং যখন তিনি আপনার স্থানে দাঁড়াবেন, তখন তিনি লোকদের নামায পড়াতে সক্ষম হবেন না। কিন্তু রাসূল আবার বলেন, তোমরা আবু বকরের কাছে যাও এবং তাকে লোকদের এমামত করতে বল। তোমরা তো ইউসুফের সাথি। অতঃপর দূত তাকে খবর দিয়ে নিয়ে আসল। ফলে তিনি রাসূল-এর জীবদ্দশায় লোকদের এমামত করেন।

১১৯.নবী-এর শেষ মুহূর্ত

আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সুস্থ থাকাবস্থায় বলেছেন, কোন নবীকে আল্লাহ ততক্ষণ পর্যন্ত মৃত্যু দান করেন না যতক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে তাঁর জন্য নির্ধারিত স্থান না দেখেন। আয়েশা প্লা বলেন, যখন রাসূল-এর কাছে মৃত্যুর ফেরেশতা উপস্থিত হলেন, তখন তার মাথা আমার রানের ওপর ছিল। এমতাবস্থায় রাসূল বেঁহুশ হয়ে পড়লেন এবং কিছুক্ষণ পর যখন তিনি আবার জ্ঞান ফিরে পেলে, তখন ছাদের দিকে তাকালেন এবং বললেন, اللهم الرفيق الأعلى যার মর্মার্থ হচ্ছে, হে আল্লাহ। তুমি আমাকে আমার মহান বন্ধুর সাথে মিলিয়ে দাও। অর্থাৎ আমি আল্লাহর নিকট চলে যাচ্ছি।

পৃষ্ঠা:৯২

১২০.আয়শার ঘরে রাসূল

আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন রাসূল তখন তিনি তাঁর সকল স্ত্রীদের নিকট ঘোরাফিরা করতে আগামীকাল আমি কোথায় থাকব? তবে তিনি আয়েশা বেশি পছন্দ করতেন। অসুস্থ হয়ে পড়লেন, লাগলেন এবং বললেন, -এর ঘরে থাকাকেই আয়েশা বলেন, এরপর রাসূল-এর অন্যান্য স্ত্রীগণ তাকে আমার ঘরে থাকার অনুমতি দিলেন এবং তিনি মৃত্যু পর্যন্ত আমার ঘরেই অবস্থান করলেন। অতঃপর যখন তিনি মৃত্যুবরণ করেন তখন তাঁর শেষ নিঃশ্বাস আমার নিঃশ্বাসের সাথে মিশে গিয়েছিল। আয়েশা বলেন, তারপর যখন আবদুর রহমান বিন আবু বকর উন্দ্র প্রবেশ করল, তখন তার সাথে একটি মেসওয়াক ছিল, যা দ্বারা সে মেসওয়াক করত। তখন আমি তাকে বললাম, হে আবদুর রহমান! তোমার মেসওয়াকটা দাও তো। অতঃপর সে তা দিলে আমি তা দিয়ে রাসূলকে মেসওয়াক করিয়ে দিলাম। আর তখন তিনি আমার বুকের ওপর শুয়েছিলেন। অন্য বর্ণনায় আয়েশা বলেন, রাসূল আমার বাড়িতে, আমার পালার দিনে এবং আমার বিছানায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর একেবারে শেষ মুহূর্তে আবদুর রহমান বিন আবু বকর আমার ঘরে প্রবেশ করেন। আর সাথে ছিল একটি মেসওয়াক। আর রাসূল তখন সে মেসওয়াকের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। এমনকি আমার মনে হলো যে, তিনি সেটা চাচ্ছেন। ফলে আমি তা আবদুর রহমানের কাছ থেকে নিলাম এবং তাকে মেসওয়াক করে দাত পরিষ্কার করে দিলাম। অতঃপর রাসূল-এর হাত পড়ে গেল এবং তাঁর চক্ষু আকাশের দিকে উঠে গেল। তখন তিনি বললেন, الرفيق الأغى যার মর্মার্থ হচ্ছে, হে আল্লাহ! তুমি আমাকে আমার মহান বন্ধুর সাথে মিলিয়ে দাও। অর্থাৎ আমি আল্লাহর নিকট চলে যাচ্ছি। অতঃপর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

পৃষ্ঠা:৯৩

১২১.রাসূল-এর মৃত্যুতে ফাতিমা-এর প্রতিক্রিয়া

আনাস খুঁন্দ্র হতে বর্ণিত। যখন নবী-এর অসুস্থতা ভারি হয়ে যাচ্ছিল, তখন ফাতেমা বলছিলেন, হায়, আমার পিতার বিপদ। তখন রাসূল বললেন, আজকের পর তোমার পিতার আর কোনো বিপদ নেই। তাকে অতঃপর যখন তিনি মৃত্যুবরণ করেন তখন ফাতেমা বলেন, হায় আমার পিতার বিপদ। আমার পিতা তাঁর প্রভুর ডাকে সাড়া দিলেন। হায় আমার পিতার বিপদ! আপনার ঠিকানা জান্নাতুল ফিরদাউস। অতঃপর যখন তাকে দাফন দেয়া হয়, তখন ফাতেমা বললে, হে আনাস! আপনি কি রাসূল-এর ওপর মাটি দেয়াতে আনন্দবোধ করছেন? তখন আনাস চন্দ্র বললেন, যেদিন রাসূল মদিনায় প্রবেশ করেন, তখন মদিনা আলোকিত হয়েছিল। আর যখন তিনি মদিনা থেকে বের যান (অর্থাৎ মৃত্যুবরণ করেছেন) তখন মদিনা অন্ধকার হয়ে গেছে।

১২২.নবী-কে কাফন দান

আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন লোকেরা নবী-কে গোসল দেয়ার ইচ্ছা করল। তখন তারা দুই দলে বিভক্ত হয়ে গেল যে, রাসূল-এর কাপড় সাধারণ মৃত ব্যক্তির মতো খুলবে কিনা? তখন মদিনার এক প্রান্ত থেকে এক ব্যক্তি ঘোষণা করল যে, তোমরা নবী-কে তার ওপর কাপড় রেখেই গোসল দাও। কিন্তু সেই ব্যক্তিকে কেউ চিনতে পারেনি। তারপর নবী-কে কাপড় না খোলেই গোসল দেয়া হয়। আয়েশা বলেন, আমি আমার দায়িত্ব থেকে আগে চলে যাইনি এবং পেছনেও চলে যাইনি। নবী-কে শুধু তার স্ত্রীরাই গোসল দেন এবং তিনটি সাদা কাপড় দিয়ে তাকে দাফন করা হয়। আলেমগণ একমত হয়েছেন যে, নবী ৬৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। ৪০ বছর বয়সে নবুওয়াত লাভ করেন। অতঃপর ১৩ বছর মক্কায় থাকেন এবং ১০ বছর মদিনায়।

পৃষ্ঠা:৯৪

১২৩.আয়েশা -এর পিতার মৃত্যু

আয়েশা বলেন, যখন আবু বকর উন্দ্র অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন আমি তাঁর কাছে পেলাম। এমতাবস্থায় তিনি ছিলেন মৃত্যু শয্যায় শায়িত। কখন আমার মন থেকে এ পঙতিগুলো বের হয়ে গেল। যার মর্মার্থ হচ্ছে, তোমার বয়সের কসম! যখন মৃত্যু উপস্থিত হবে, তখন এই পৃথিবীর কোনো কিছু কোনো যুবকেরও কাজে আসবে না। তখন তিনি আমার ব্যাকুলতার দিকে লক্ষ করলেন এবং বললেন, হে উন্মুল মুমিনীন! এ রকমটা বল না; বরং আল্লাহর কথাই সবচেয়ে বেশি সত্য। তিনিঃإِذْ يَتَلَقَّى الْمُتَلَقِيَانِ عَنِ الْيَمِينِ وَعَنِ الشِّمَالِ قَعِيدٌ  ঃঅর্থাৎ দু’জন লেখক ডানে ও বামে বসে (মানুষের আমলসমূহ) লিখছেন। (সূরা কাফ- ১৭) এভাবে আবু বকর গুদ্র-এর অসুস্থতা ১৫ দিন চলছিল। তখন ছিল ১৩ হিজরীর জমাদিউস সানী মাসের ২২ তারিখ সোমবার দিন এবং মঙ্গলবার রাত। এমতবস্থায় আবু বকর আয়েশা -কে জিজ্ঞেসা করলেন যে, রাসূলকি রাতে মৃত্যুবরণ করেন? তিনি বলেন, সোমবার দিন। তখন আবু বকর বলেন, আল্লাহ যদি ইচ্ছা পোষণ করে তবে আমিও অনুমান করছি যে, আমিও এ রাত্রেই মৃত্যুবরণ করব। তারপর তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, রাসূল-কে কয় কাপড়ে দাফন দেয়া হয়? আয়েশা বললেন, সাদা রং বিশিষ্ট এমন তিনটি কাপড় দিয়ে তাকে দাফন দেয়া, যার কামিস বা পাগড়ী ছিল না। তখন আবু বকর দ্রে বলেন, হে আয়েশা! আমার কাপড়গুলো নিয়ে এস এবং আমাকে দেখাও। আর তা ধৌত কর না কারণ এতে মেশক ও জাফরান রয়েছে। তখন আয়েশা বলেন, এগুলো তো পুরাতন। তখন তিনি বলেন, জীবিতরাই নতুন কাপড় পরিধান করার বেশি হকদার। আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবু বকর চন্দ্র যে দিন

পৃষ্ঠা:৯৫

মৃত্যুবরণ করবেন সেদিন তিনি আয়েশা-কে ডেকে বলেন, আজ কি বার? আয়েশা দুবার বলেন, আজ সোমবার। তখন আবু বকর টুল্ল বলেন, আজ যদি আমি মৃত্যুবরণ করি, তবে তোমরা আমার জন্য সকাল হওয়ার অপেক্ষা কর না। অতঃপর মৃত্যুবরণ করেন। তখন তার বয়স ছিল ৬৩ বছর।

১২৪.নিঃস্বার্থভাবে ঘোড়ায় আরোহণ

আবু বকর ক্ষুদ্র-এর মৃত্যুর পর ওমর ত্রে মুসলিম বিশ্বের আমির নিযুক্ত হলেন। যখন থেকে তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন, তখন থেকেই মুসলমানরা ন্যায়পরায়ণতা, দয়া এবং বিভিন্ন সাহায্য ও সহযোগিতার ছত্রছায়ায় জীবন যাপন করতে শুরু করেন এবং দেশের পর দেশ জয় করতে শুরু করেন। দিন যতই অতিবাহিত হতে লাগল ওমর টুল্ল আরো বেশি যুদ্ধ চালিয়ে যেতে লাগলেন, যাতে করে তিনি আল্লাহর পথে শহীদ হতে পারেন। কেননা, তিনি সবচেয়ে বড় বন্ধু রাসূল-এর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ইঙ্গিত পেয়েছিলেন।অতঃপর যখন ওমর গুদ্র-এর মৃত্যু উপস্থিত হলো, তখন তিনি তার ছেলে আবদুল্লাহ-কে ডেকে বলেন, হে আবদুল্লাহ। তুমি আয়েশার -এর কাছে যাও এবং প্রথমে তাকে আমার সালাম প্রদান কর। তারপর আমাকে আমার দুই সাথি (অর্থাৎ আবু বকর ও মুহাম্মাদ)-এর কবরের পাশে দাফন করার জন্য অনুমতি চাও। অতঃপর আবদুল্লাহ ই আয়েশা -এর কাছে গেলেন এবং প্রথমে সালাম দিলেন। তারপর বললেন, আমার পিতার মৃত্যুও সন্নিকটে। এমতাবস্থায় তিনি তার দুই সাথির পাশে তাকে দাফন করার অনুমতি চাইলেন। তখন আয়েশা বলেন, আমি আমার নিজের জন্য সেই স্থানটি নির্বাচন করে রেখেছি। তারপর আয়েশা তার নিঃস্বার্থতার শক্তিতে ওমর ট্রে-কে সেখানে দাফন করার অনুমতি দিয়ে দেন।

পৃষ্ঠা:৯৬

১২৫.জঙ্গে জামালের দিন আয়েশা শ্রীশল্প-এর উপস্থিতি

যখন মুয়াবিয়া এবং আলী চন্দ্র-এর মাঝে ফিতনা সৃষ্টি হলো তখন আয়েশা ও লোকদের মাঝে একটি মিমাংসা কামনা করছিলেন। আর এই বিরোধটা সৃষ্টি হয়েছিল মূলত উসমান-এর হত্যার বিচার হওয়াকে নিয়ে, যার নেতৃত্বে ছিলেন মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান টুদ্র। তিনি ছিলেন উসমান টুদ্র-এর গোত্রের লোক এবং শাম দেশের গভর্ণর। ইমাম যাহাবী বলেন, আয়েশা -এর অঙ্গে জামালে উপস্থিত হওয়াটা ছিল অবশ্যই প্রশংসনীয় বিষয়। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি যে, এই যুদ্ধ এত দূর পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। আবদুল্লাহ ইবনে যিয়াদ আল আসদী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন তালহা, যুবায়ের এবং আয়েশা বসরার দিকে ভ্রমণ করলেন, তখন খলিফা আলী আম্মার ইবনে ইয়াসার এবং হাসান ইবনে আলী গুদ্র-কে কুফায় পাঠালেন। অতঃপর যখন তারা কুফায় পৌঁছলেন, তখন হাসান গন্দ্র মিম্বারে আরোহণ করলেন এবং আম্মার পুত্র তার নিচে দাঁড়ালেন। অতঃপর লোকেরা একত্রিত হলো। রাবী বলেন, অতঃপর আমি আম্মার পুত্র-কে বলতে শুনেছি যে, হে লোক সকল! নিশ্চয় আয়েশা বসরার দিকে আমগন করছেন। আর তিনি হচ্ছে দুনিয়াতে ও আখিরাতে তোমাদের নবী-এর স্ত্রী। সুতরাং আল্লাহ তোমাদেরকে এটা পরীক্ষা করছেন যে, তোমরা তার অনুসরণ কর কি না?

১২৬.নবী কর্তৃক আয়েশা -কে দু’আ শিক্ষা দান

আনাস ত্র হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূল আমার ঘরে প্রবেশ করলেন এবং আমাকে জ্বর অবস্থায় দেখলেন। তখন তিনি আয়েশাকে বলেন, হে আয়েশা! তোমাকে এমন অবস্থায় কেন দেখছি। তিনি বলেন, আমার জ্বর হয়েছে। তখন রাসূল বলেন, হে আয়েশা। তুমি জ্বরকে গালি দিও না; কেননা, সে আদেশপ্রাপ্ত। তুমি যদি চাও আমি তোমাকে কিছু শব্দ শিখিয়ে দেব, যার দ্বারা আল্লাহ তোমাকে রোগ থেকে মুক্তি দেবেন।

পৃষ্ঠা:৯৭

১২৭. আয়েশা-এর পালা এবং তাঁর ঈর্ষা

আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে রাত্রে নবী আমার নিকট অবস্থান করতেন এমন এক রাত্রিতে তিনি আমার ঘরে প্রবেশ করলেন এবং চাদর ও জুতা খুললেন। অতঃপর এগুলো তাঁর পায়ের নিকট রাখলেন। তারপর তিনি তাঁর লুঙ্গির একটি অংশ বিছানার ওপর বিছিয়ে দিলেন এবং শুয়ে পড়লেন। অতঃপর ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি শুয়ে থাকলেন, যতক্ষণ না তাঁর ধারণা আসে যে, আমি ঘুমিয়ে পড়েছি। অতঃপর রাসূল আস্তে আস্তে তার চাদর নিলেন এবং জুতা পরিধান করলেন। তারপর তিনি দরজা খুলে বের হয়ে গেলেন। অতঃপর আমি আমার ঢাল মাথায় নিলাম, ওড়না পরিধান করলাম এবং আমি আমার ইযার দ্বারা গোমটা পরিধান করলাম। অতঃপর তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করলাম। এমনকি তিনি “বাকী” নামক কবরস্থানে আসলেন এবং দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। অতঃপর তিন বার তার হাত উত্তোলন করলেন। অবশেষে আসার সময় রাস্তা পরিবর্তন করলেন এবং আমিও রাস্তা পরিবর্তন করলাম। তিনি দ্রুত চললেন এবং আমিও দ্রুত চললাম। তিনি উপস্থিত হলেন এবং আমিও উপস্থিত হলাম। তবে আমি তাঁর পূর্বে আসলাম ও ঘরে প্রবেশ করলাম। অতঃপর তিনি আমার শুয়ে থাকাবস্থায় ঘরে প্রবেশ করলেন। অতঃপর বললেন, হে আয়েশা! তোমার কি হয়েছে? উঁচু টিলার মতো শুয়ে আছ কেন? তখন আমি, না কিছু হয়নি। তারপর তিনি বললেন, তুমি আমাকে খবর দিবে নাকি যিনি সূক্ষ্ম বিষয়ে সবচেয়ে বেশি খবর রাখেন, তিনি আমাকে খবর দিয়ে দিবে। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল উৎসর্গ-হোক, আমিই আপনাকে খবর দিচ্ছি। আপনার জন্য আমার পিতা মাতা অতঃপর তিনি বললেন, তুমিই কি সেই কালো ছায়া, যা আমি আমার সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম? আমি বললাম, হ্যাঁ। ফলে তিনি তাঁর হাতের তালু দ্বারা আমার বক্ষে মৃদু আঘাত করলেন, যাতে আমি একটু ব্যাথা অনুভব করলাম।

পৃষ্ঠা:৯৮

অত:পর বললেন, তুমি কি ধারণা কর যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমার ওপর জুলুম করবে? তখন আমি বললাম, মানুষ যা গোপন করে আল্লাহ তো তা আপনাকে জানিয়ে দেন। অতঃপর তিনি বললেন, আমার নিকট জিবরাঈল এসেছিলেন, এমনকি আমি তাকে দেখতে পাচ্ছিলাম। তিনি শুধুমাত্র আমাকে ডাকলেন এবং তোমার থেকে তা গোপন রাখলেন। আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম এবং তোমার থেকে তা গোপন করলাম। আর আমি ধারণা করলাম যে, তুমি এই মাত্র ঘুমিয়ে পড়েই। আর তাই তোমার বিরক্ত হওয়ার ভয়ে আমি তোমাকে জাগ্রত করতে অপছন্দ করলাম। অতঃপর তিনি বললেন, নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক তোমাকে “বাকীর” অধিবাসীদের নিকট যেতে এবং তাদের জন্য ক্ষমা চাইতে আদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! কিভাবে তাদের জন্য ক্ষমা চাইব? তিনি বললেন, তুমি এটা বলবে যে, السَّلَامُ عَلَى أَهْلَ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُسْلِمِينَ وَيَرْحَمُ اللَّهُ الْمُسْتَقْدِمِينَ مِنَّا وَالْمُسْتَأْخِرِينَ وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ بِكُمْ لَا حِقُونَঃঅর্থাৎ কবরবাসীদের মধ্যে যারা মুমিন ও মুসলিম তাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আমাদের মধ্যে যারা গত হয়ে গেছে এবং যারা পরে আগমন করবে আল্লাহ তায়ালা সকলের ওপর দয়া প্রদর্শন করুন। যদি আল্লাহ চান, তবে নিশ্চয় আমরা তোমাদের সাথে মিলিত হব। উরওয়া ইবনে যায়নাব বলেন, নবী-এর স্ত্রী আয়েশা বলেন। এক রাতে নবী বের হয়ে গেলেন। অতঃপর আমি তাকে ধোঁকা দিলাম। তারপর তিনি ফিরে আসেন এবং আমাকে যে অবস্থায় রেখে গিয়েছিলেন, তিনি আমাকে সে অবস্থায় পেলেন। অতঃপর তিনি বললেন, হে আয়েশা! তোমার কি হয়েছে যে, তুমি আমাকে ধোঁকা দিয়েছ?

পৃষ্ঠা:৯৯

আয়েশা বলেন, অতঃপর আমি সব ঘটনা খুলে বললাম। তখন রাসূল (সা:) বললেন, তোমাকে কি তোমার শয়তানে গ্রাস করে ফেলেছিল? আমি বললাম, আমার সাথেও কি শয়তান আছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, প্রত্যেক মানুষের সাথেই কি থাকে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, আপনার সাথেও কি আছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমার সাথেও রয়েছে, তবে আমার প্রতিপালক আমাকে সাহায্য করেছেন। ফলে সে মুসলিম হয়ে গেছে।

১২৮.রাসূল কর্তৃক তাকে শিক্ষা দান

আতা ইবনে আবু রিয়াহ আয়েশা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, যখন ঝড়ো বাতাস প্রবাহিত হতো, তখন রাসূল বলতেন,اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَهَا وَخَيْرَ مَا فِيهَا وَخَيْرَ مَا أُرْسِلَتْ بِهِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَيْهَا وَشَرْ مَا فِيْهَا وَشَرِّ مَا أُرْسِلَتْ بِهِঃআয়েশা বলেন, আর যখন আকাশের রং বার বার পরিবর্তন হতে থাকত। তখন তিনি একবার ঘর থেকে বের হতেন এবং একবার প্রবেশ করতেন। একবার সামনে অগ্রসর হতেন এবং একবার পেছনে হটে যেতেন। অতঃপর যখন বৃষ্টি শুরু হতো, তখনও তিনি এমনটি করতে থাকতেন। একদা আয়েশা এ ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, হে আশেয়া। তুমি আদ সম্প্রদায়ের পরিণতি কি হয়েছিল তা কি জান না? আল্লাহ বলেন,فَلَمَّا رَأَوْهُ عَارِضًا مُسْتَقْبِلَ أَوْدِيَتِهِمْ قَالُوا هَذَا عَارِضٌ مُبْطِرْنَا بَلْ هُوَ مَا اسْتَعْجَلْتُمْبِهِ رِيحٌ فِيهَا عَذَابٌ أَلِيمٌ অর্থাৎ তারপর যখন তারা আযাবকে তাদের এলাকার দিকে আসতে দেখল তখন তারা বলতে লাগল, এটা তো মেঘ, যা আমাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করবে। তা

পৃষ্ঠা:১০০

নয় বরং এটা ঐ জিনিস, যার জন্য তোমরা তাড়াহুড়া করছিলে। এটা এখন তুফানি বাতাস, যার ভিতর কষ্টদায়ক আযাব রয়েছে। (সূর আহকাফ। আয়াত-২৪) সুলাইমান ইবনে ইয়াসার আয়েশা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলন, আমি কখনো রাসূল-কে জোরে হাসতে দেখিনি। কখনো যদি তিনি একটু আনন্দ বোধ করতেন, তখন তিনি মুচকি হাসতেন। তিনি আরো বলেন, রাসূল যখন আকাশে মেঘ অথবা প্রচন্ড বাতাস বইতে দেখতেন, তখন তার চেহারার মধ্যে চিন্তায় চাপ ফুটে উঠত। একদা আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল। মানুষ মেঘ দেখলে বৃষ্টি হওয়ার আশায় আরো খুশি হয়। কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছি যে, যখন আপনি তা দেখেন তখন আপনার চেহারা কালো হয়ে যায়, এর কারণ কি? অতঃপর তিনি বলেন, হে আয়েশা। তুমি আযাবের প্রতি বিশ্বাসী নও? যে আযাব বাতাসের মাধ্যমে নূহের ওপর পতিত হয়েছিল। যখন তারা আযাব দেখছিল তখন তারা বলেছিল, এটা তো আমাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করবে।

১২৯.জাহেলী আচরণ সম্পর্কে প্রশ্ন

আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! নিশ্চয় ইবনে জাদআন লোকদেরকে খাবার খাওয়ায় এবং মেহমানকে সেবা করে। সুতরাং সে কি এতে কিয়ামতের দিন কোনো উপকৃত হতে পারবে? তখন রাসূল বললেন, না, বরং সে যদি এ কথা না বলে যে, رَبِّ اغْفِرْ لِي خَطِيئَتِي يَوْمَ الدِّينِঃঅর্থাৎ যে আমার প্রতিপালক। আপনি আমাকে বিচার দিবসের দিন আমার সকল গোনাহসমূহ ক্ষমা করে দিন।

পৃষ্ঠা:১০১

১৩০.প্লেগ রোগ থেকে পলায়ন

আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল প্লেগ রোগ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। ফলে তিনি আমাকে সংবাদ দিলেন যে, এটা হচ্ছে এক ধরনের আযাব, যা আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের মধ্য হতে যাদের প্রতি ইচ্ছা প্রেরণ করে থকেন তবে নিশ্চয় আল্লাহ মুমিন বান্দাদের প্রতি দয়া করে থাকেন। এই প্লেগ রোগ ফিরিয়ে নেয়ামত কারো ক্ষমতা নেই। এটা একটি শহরে কিছু দিনের জন্য অবস্থান করে। তবে জেনে রেখ যে আল্লাহর কিতাবে যা কিছু লিখা আছে তা ছাড়া অন্য কোনো বিপদই কারো ওপর পতিত হয় না। আর এ রোগের কারণে যারা মারা যায়, আল্লাহ তাদেরকে শহীদের মর্যাদা দান করেন।

১৩১.আবু বকর কর্তৃক আয়েশা ও রাসূল-এর মাঝে মিমাংসা

আয়েশা হতে বর্ণিত। একদা আয়েশা ও রাসূল-এর মাঝে কিছু কথা কাটাকাটি হয়। তখন তিনি আয়েশা-কে বললেন, আমার ও তোমার মাঝে কাকে বিচারক হিসেবে মেনে নেবে? তুমি কি ওমরকে মানতে রাজি আছ? আয়েশা বললেন, না, আমি শুধুমাত্র ওমরকে বিচারক হিসেবে মানতে রাজি নই, কেননা সে অধিক কঠোর। তারপর তিনি বললেন, তুমি আমাদের বিষয়ে তোমার পিতাকে বিচারক হিসেবে মানতে রাজি আছ? আয়েশা বললেন, হ্যাঁ। আয়েশা বলেন, অতপর রাসূল আবু বকর -কে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন, আমাদের মাঝে এরূপ এরূপ ঘটনা ঘটেছে। আয়েশা বলেন, তখন আমি বললাম, আল্লাহকে ভয় করুন এবং সত্য কথা বলুন। অতঃপর আবু বকর দ্র তার দুই হাত উঠালেন, তা নাকের ওপরে উঠে গেল। তখন তিনি বললেন, আমার পিতা-মাতা তোমার জন্য কুরবান হোক। তুমি সঠিক কথাই বলেছ। তোমার ওপর আমার পিতা-মাতা কুরবান হোক। এতক্ষন রাসূল কিছু বলেননি। ফলে তখন তিনি বলে উঠলেন, আমরা তো তোমাকে এ জন্য ডেকে আনিনি। শা (রা:)-৮ আয়শা

পৃষ্ঠা:১০২

১৩২.নবী কর্তৃক শিক্ষা দান

আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বাইতুল্লাহতে গিয়ে প্রথমে নামায পড়তে খুব ভালোবাসতাম। অতঃপর একদিন রাসূল আমার হাত ধরলেন এবং আমাকে কাবা ঘরে নিয়ে গেলেন। তারপর তিনি হাতিম নামক স্থানে নামায পড়ার নির্দেশ দিলেন এবং বললেন, তোমার সম্প্রদায় যখন কাবা ঘর নির্মাণ করেছিল, তখন এ অংশটি বাইরে রেখে দিয়েছিল। তবে মূলত এটা কবা ঘরেরই অংশ। যদি তোমার সম্প্রদায় নতুন মুসলিম না হতো, অর্থাৎ ফিতনার আশংকা না থাকত, তাহলে আমি এ স্থানকে কাবা ঘরের সাথে মিলিয়ে দিতাম।

১৩৩.আয়েশা ও উহুদ যুদ্ধ

উরওয়া পড়ে আয়েশা থেকে বর্ণনা করেন। (একদা) আয়েশা নবী (সা:)-কে বললেন, উহুদের দিনের চাইতেও কি কোনো কঠিন বিপদ আপনার ওপর দিয়ে গিয়েছে? তিনি বললেন, তোমার জাতির নিকট থেকে যেসব বিপদের মুখোমুখি আমি হয়েছি, তা-তো হয়েছি। আর যেদিন আমি সবচেয়ে কঠিন বিপদের মুখোমুখি হই, সে ছিল আকাবার দিন। সেদিন আমি নিজে যখন ইবনে ‘আবদে ইয়ালীল ইবনে ‘আবদে কুলালের সম্মুখে উপস্থিত হই, তখন আমি যা চেয়েছিলাম, তার কোনো সঠিক জবাব সে দেয়নি। অতএব আমি মনক্ষুন্ন হয়ে ফিরে আসলাম। তখনো আমার জ্ঞান ফিরে আসেনি, এমনি অবস্থায় আমি কারনিস-সা’আলাবে এসে পৌঁছলাম। অতঃপর মাথা তুললাম। হঠাৎ দেখলাম, এক টুকরা মেঘ আমাকে ছায়া দিচ্ছে। যখনি সেদিকে তাকালাম, তাতে জিবরাঈলকে দেখতে পেলাম। তিনি আমাকে ডাকলেন এবং বললেন, আপনার সঙ্গে আপনার জাতির যে আলাপ-আলোচনা এবং তাদের যে প্রতি উত্তর হয়েছে অবশ্যই আল্লাহ তা সব শুনেছেন। তিনি পাহাড়ের (দায়িত্বে নিয়োজিত) ফেরেশতাকে আপনার নিকট পাঠিয়েছেন। উদ্দেশ্য, এসব লোকের সম্পর্কে আপনি তাকে যেমন ইচ্ছা আদেশ দিতে পারেন। তখন পাহাড়ের ফেরেশতা আমাকে ডাকল, সালাম করল এবং বলল, হে মুহাম্মদ! এসব ব্যাপার আপনার ইচ্ছার ওপর

পৃষ্ঠা:১০৩

নির্ভরশীল। আপনি যদি চান, ‘আখশাবাইন’ নামক পাহাড় দু’টি তাদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারি। (এ কথা শুনে) নবী বললেন, (না, তা কখনো হতে পারে না); বরং আমি আশা করি, মহান আল্লাহ তাদের বংশে এমন সন্তান দান করবেন, যারা এক আল্লাহরই ‘ইবাদত করবে এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরীক করবে না।

১৩৪.নবী-এর নিকট থেকে হারিয়ে গেলেন

আয়েশা বলেন, আমি নবী-এর সাথে এক সফরে বের হলাম। অতঃপর যখন আমরা যারাফ নামক স্থানে গেলাম তখন আমরা যাত্রা বিরতি করলাম। অতঃপর যখন রওয়ানা দেয়ার সময় হলো, তখন সবাই চলে গেল। কিন্তু আমি পেছনে পড়ে গেলাম। পরে আল্লাহ আমাকে তাদের সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন।

১৩৫.স্বামীর সাথে স্ত্রীর গল্প

আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! যদি আপনি এমন একটি গাছের তলায় অবতরুণ করেন, যেখানে থেকে মানুষ খায়। আর যদি এমন স্থানে অবতরণ করেন যেখান থেকে খাওয়া যায় না। এমতাবস্থায় আপনি কোথায় আপনার উট অবতরণ করবেন? তিনি বলেন, যেখান থেকে খাওয়া হয় না।

১৩৬,উটের প্রতি দয়া

আয়েশা তারপর রাসূল বলেন, একদা রাসূল আমাকে একটি কালো উট দিলেন। সেটাকে স্পর্শ করলেন এবং বরকতের জন্য দু’আ করলেন। তিনি বলেন, এর ওপর আরোহন কর এবং নরম আচরণ কর। কেননা, যে জিনিসের প্রতিই দয়া করা হয় তার সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায় এবং যে জিনিসের প্রতি দয়া করা হয় না তা কলুষিত হয়ে যায়।

পৃষ্ঠা:১০৪

১৩৭,আয়েশা-এর জন্য দোয়া

আয়েশা বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার জন্য দোয়া করুন। তখন তিনি আমার জন্য এই বলে দোয়া করলেন যে, হে আল্লাহ! আপনি আয়েশাকে ক্ষমা করে দিন, যেসব পাপ কাজ সে আগে অথবা পরে করেছে। যা সে গোপনে করেছে এবং যা প্রকাশ্যে করেছে। তখন আয়েশা এমনভাবে হাসলেন যে, তার মাথার খোপা থেকে তার বাঁধন খুলে পরে যাচ্ছিল। তখন রাসূল বলেন, নিশ্চয় এই দোয়াটি আমার উম্মতের জন্য প্রত্যেক সালাতের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অন্য বর্ণনায় আছে আয়েশা বলেন, হে আল্লাহর রাসূল। অ্যাপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, যাতে করে তিনি আমার আগের এবং পরের সকল গোনাহ ক্ষমা করে দেন। তখন রাসূল তার দুই হাত উত্তোলন করলেন, এমনকি তার বগলের শুভ্রতাও দেখা যাচ্ছিল। তিনি বলেন, হে আল্লাহ। আপনি আয়েশা বিনতে আবু বকরের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সকল গোনাহকে ক্ষমা করে দিন। এরপর যাতে সে আর কোনো ভুল অথবা গোনাহ করতে না পারে সে তাওফীক দান করুন। অতঃপর রাসূল বলেন, হে আয়েশা। তুমি কি খুশি হয়েছ? আয়েশা বলেন, ঐ সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন। অবশ্যই আমি খুশি হয়েছি। রাসূল বলেন, ঐ আল্লাহর শপথ যিনি আমাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন। নিশ্চয় আমি এই দোয়াটি আমার উম্মতের মধ্যে তোমার জন্য নির্দিষ্ট করে দেব না। কেননা, আমার উম্মতের দিনে ও রাতে প্রত্যেক নামাযে এই দোয়া পাঠ করবে। তাদের যারা অতীত হয়ে গেছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত যারা আগমন করবে সকলের জন্য এ দোয়াটি প্রযোজ্য। আর আমি দো’আ করি, ফেরেশতারা তার ওপর বিশ্বাস করে।

পৃষ্ঠা:১০৫

১৩৮.সর্বোত্তম মহিলার ওজর পেশ

কসমের ২৯ দিন পর রাসূল স্ত্রীদের মাঝে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বাড়িতে ফিরে আসেন এবং সে খবর তাঁর অতঃপর ফিরে এসে তিনি সর্বপ্রথম আয়েশা -এর বাড়িতে প্রবেশ করেন। ফলে আয়েশা রাসূল-কে চুম্বন করেন এবং রাসূল ও আয়েশাকে চুম্বন করেন। অতঃপর আয়েশা ওজর পেশ করে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি এমন এক বাক্য উচ্চারণ করেছিলাম, যার জন্য আপনি রেগে গিয়েছিলেন। অতঃপর রাসূল রাগান্বিত অবস্থায়ই মুচকি হাসলেন। তারপর আয়েশা (রা:) তাকে সন্তুষ্ট করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন, এক পর্যায় সন্তুষ্ট করেই ফেললেন। তারপর আয়েশা রাসূল-কে প্রশ্ন করলেন, আপনি তো এক মাসের জন্য কসম করেছিলেন। কিন্তু আপনি তো ২৯ দিনও অতিক্রম করেননি। তখন রাসূল বললেন, হে আয়েশা! নিশ্চয় মাস ৩০ দিনের। কিন্তু কখনো কখনো মাস ২৯ রাত্রিতেও পূর্ণ হয়ে যায়।

পৃষ্ঠা ১০৬ থেকে ১১৪

পৃষ্ঠা:১০৬

বললেন, তুমি কি আমার আরোহীতে এবং আমি তোমার আরোহীতে ভ্রমণ করব, এতে কি তুমি রাজি আছ? তখন আয়েশা বলেন, হ্যাঁ। অতঃপর আয়েশা হাফসা-এর উটে আরোহন করলেন এবং হাফসা (রা:) আয়েশা-এর উঠে আরোহন করলেন। আর রাসূল আয়েশার উটের কাছে আসলেন, যাতে হাফসা ছিলেন। অতঃপর রাসূল তাকে সালাম প্রদান করেন এবং অবতরণ করার পূর্ব পর্যন্ত তাঁর সাথে সফর করেন।

১৪০.নবী কর্তৃক চুম্বন

আয়েশা হায়েয অবস্থায় রাসূল এর মাথা আচড়িয়ে দিতেন। এমতাবস্থায় রাসূল মসজিদে ইতিকাফ অবস্থায় থাকতেন এবং আয়েশা -এর হুজরার মধ্যে তার মাথা বের করে দিতেন। আয়েশা থেকে আরো বর্ণিত আছে যে, একদা আয়েশাকে জিজ্ঞেস করা হলো, রাসূল কি রোযা অবস্থায় চুম্বন করতেন? তখন তিনি হাসতেন এবং বলতেন, রাসূল কিছু স্ত্রীকে রোযা অবস্থায় চুম্বন করতেন। এর দ্বারা তিনি নিজের দিকে ইশারা করতেন। আয়েশা হতে আরো বর্ণিত আছে যে, আয়েশা বলেন, রাসূল আমাকে রোযা অবস্থায় চুম্বন করতেন। আর তিনি ছিলেন অনেক ধৈর্যশীল, যে ধৈর্যের ক্ষমতা সাধারণ সাহাবীদের মধ্যে ছিল না।

১৪১.আমি তোমার জন্য আবু যারের পিতার মতো

আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এগারজন মহিলা (এক জায়গায়) বসে অঙ্গীকার করল এবং চুক্তিবদ্ধ হলো যে, তারা নিজেদের স্বামীদের কোনো কিছুই গোপন করবে না। অতঃপর প্রথম মহিলা বলল, আমার স্বামী হালকা দুর্বল উটের গোশতের ন্যায়, যা এক পাহাড়ের চূড়ায় রাখা হয়েছে এবং যেখানে উঠা সহজ নয়। আর তার

পৃষ্ঠা:১০৭

গোশতের মধ্যে তেমন কোনো চর্বিও নেই, যার কারণে কেউ সেখানে ওঠার জন্য কষ্ট স্বীকার করবে। দ্বিতীয় মহিলা বলল, আমি আমার স্বামী সম্পর্কে কিছুই বলব না। কারণ আমি ভয় করছি যে, তার ঘটনা শেষ করতে পারব না। আমি যদি তার বর্ণনা দেই, তাহলে আমি তার সকল দুর্বলতা ও খারাপ বৈশিষ্ট্যগুলো উল্লেখ করে ফেলব। তৃতীয় মহিলা বলল, আমার স্বামী দীর্ঘদেহী। আমি যদি তার বর্ণনা দেই তাহলে সে আমাকে তালাক দিবে। আর আমি যদি নীরব থাকি, তাহলে সে আমাকে তালাকও দিবে না এবং আমার সাথে স্ত্রীর মতো ব্যবহারও করবে না। চতুর্থ মহিলা বলল, আমার স্বামী তিহামার রাতের মতো মাঝামাঝি, যা না গরম না ঠাণ্ডা। আমি তার সম্পর্কে ভীত নই এবং অসন্তুষ্টও নই। পঞ্চম মহিলা বলল, যখন আমার স্বামী (ঘরে) প্রবেশ করে তখন চিতাবাঘের মতো এবং যখন বাইরে বেরোয় তখন সিংহের মতো। কিন্তু সে ঘরের কোন ব্যাপারে কোনো প্রশ্নই তোলে না। ষষ্ঠ মহিলা বলল, আমার স্বামী আহার করলে সবই শেষ করে দেয় এবং পান করলে কিছুই অবশিষ্ট রাখে না। সে যখন নিদ্রা যায় (আমাকে দূরে রেখে) একাই লেপ-কাঁথা মুড়ি দিয়ে আটিশাটি মেরে শুয়ে থাকে; এমনকি হাতও বের করে দেখে না যে, আমি কিভাবে আছি। সপ্তম মহিলা বলল, আমার স্বামী পথভ্রষ্ট অথবা দুর্বলচিত্ত এবং বোকার মতো। যত রকমের ত্রুটি থাকতে পারে সবই তার মধ্যে আছে। সে তোমার মাথায় বা শরীরে মারতে পারে অথবা উভয়ই করতে পারে। অষ্টম মহিলা বলল, আমার স্বামীর স্পর্শ হচ্ছে খরগোশের ন্যায় এবং তার (দেহের) গন্ধ হচ্ছে যারনাবের (এক প্রকার সুগন্ধিযুক্ত ঘাস) মতো। নবম মহিলা বলল, আমার স্বামী উঁচু অট্টালিকার মতো এবং তরবারি ঝুলিয়ে রাখার জন্য চামড়ার লম্বা ফালি পরিধান করে। তার ছাই-ভস্মের পরিমাণ প্রচুর, এবং তার বাড়ি হচ্ছে জনগণের নিকট, যাতে তারা সহজেই তার সঙ্গে পরামর্শ করতে পারে।

পৃষ্ঠা:১০৮

দশম মহিলা বলল, আমার স্বামীর নাম মালিক, আর মালিকের কি প্রশংসা করব? মালিক হচ্ছে এর চাইতেও অনেক উর্ধ্বে, যা তার সম্পর্কে আমি বলব। তার অধিকাংশ উটই ঘরে রাখা হয় (অর্থাৎ মেহমানদের জন্য যবেহ করার জন্য সদাপ্রস্তুত থাকে) এবং মাত্র অল্প সংখ্যক উট চড়াবার জন্য মাঠে রাখা হয়। উটগুলো যখন বাঁশি (বা তাম্বুরার) আওয়াজ শোনে তখন তারা বুঝতে পারে যে, তাদেরকে মেহমানদের জন্য যবেহ করার ব্যবস্থা হচ্ছে। একাদশতম মহিলা বলল, আমার স্বামী হচ্ছে আবূ যার’আ, তার কথা কি আর বলব? সে আমাকে এতো অধিক গহনা দিয়েছে যে, আমার কান বোঝায় ভারী হয়ে গেছে এবং আমার শরীরে মেদ জমে গেছে অর্থাৎ আমি মুটিয়ে গেছি। সে আমাকে এতো শান্তি ও এতো আনন্দ দিয়েছে যে, এ জন্যে আমি নিজেকে গর্বিত মনে করি। সে আমাকে এমন এক পরিবার থেকে আনে, যারা শুধুমাত্র কয়েকটি বকরির মালিক ছিল (খুব গরিব ছিল)। অতঃপর আমাকে এমন এক ধনী পরিবারে নিয়ে আসে, যেখানে সর্বদায় ঘোড়ার ক্রেস্বাধ্বনি, উষ্ট্রের হাওদার খটখটানী এবং শস্য মাড়াইয়ের খস্থসানি শোনা যেত। আমি যা কিছুই বলতাম, সে আমাকে ভৎর্সনা বা বিদ্রূপ করত না। আমি নিদ্রা গেলে, সকালে দেরি করে উঠতাম এবং পান করতে চাইলে খুব তৃপ্তি সহকারে পান করতাম। আর আবূ যারয়ার মা, তার কথা কি আর বলব। তার থলে ছিল সর্বদা পরিপূর্ণ এবং ঘর ছিল খুবই প্রশস্ত। আবূ যার’আর পুত্রের ব্যাপারে কি আর বলব! সেও খুব ভালো ছিল। তার শয্যা এতো সংকীর্ণ ছিল যে, মনে হতো যেন কোষমুক্ত তরবারি (ছিমছাম দেহবিশিষ্ট)। আর তার খাদ্য মাত্র (চার মাস বয়স্ক) ছাগলের একখানা পা। আর আবূ যারয়ার কন্যা সম্পর্কে বলতে হয় যে, সে স্বীয় বাপ-মায়ের সম্পূর্ণ অনুগত। সে খুবই সুঠামদেহের অধিকারিণী, যা তার সতীনদের জন্য সর্বদা হিংসার কারণ হতো। আবূ যার’আর ক্রীতদাসী, তার গুণের কথাই বা কি বলব! সে আমাদের ঘরের গোপন কথা বাইরে প্রকাশ করে না, বরং নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে। সে

পৃষ্ঠা:১০৯

আমাদের সম্পদের ঘাটতি করে না। আমাদের ঘরকে ময়লা-আবর্জনা দিয়ে ভরেও রাখে না। একদিন এক ঘটনা ঘটল। আবূ যার’আ (যখন দুধ দোহন করা হচ্ছিল) এমন সময় বাইরে বের হলো এবং সে এক মহিলাকে দেখতে পেল, যার দু’টি পুত্র রয়েছে। তারা তার মায়ের স্তন নিয়ে চিতাবাঘের মতো খেলা করছিল (দুধপান করছিল এবং খেলছিল)। অতঃপর সে ঐ মহিলাকে দেখে (তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে) সে আমাকে তালাক দিল এবং তাকে বিয়ে করল। এরপর আমি আরেক সম্মানিত ব্যক্তিকে বিয়ে করলাম, যে দ্রুতবেগে ধাবমান ঘোড়া আরোহণ করত এবং হাতে বর্শা রাখত। সে আমাকে অনেক সম্পদ দিয়েছে। সে আমাকে প্রত্যেক প্রকার গৃহপালিত পশুর এক এক জোড়া করে দিয়েছে এবং বলেছে, হে উম্মু যার’আ! তুমি (এগুলো থেকে) খাও এবং নিজ আত্মীয়-স্বজনদেরকেও খুশীমত উপহার-উপঢৌকন দাও। অতঃপর মহিলাটি বলল, কিন্তু সে আমাকে যা কিছুই দিয়েছে, আবূ যার’আর সামান্য একটি পাত্রও পূর্ণ করতে পারবে না। আয়েশা বলেন, রাসূল আমাকে বলেন, আবু যার’আ তার স্ত্রী উন্মু যার’আর প্রতি যেমন আমিও তোমার প্রতি তেমন।

১৪২.আয়েশার ঘর রাসূল-এর কাছে সবচেয়ে প্রিয়

আয়েশা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল-এর মৃত্যুর পর তার দাফন- কাফন নিয়ে ইখতিলাফ শুরু হয়। এমন সময় আবু বকর উল্ল বলেন, আমি রাসূল -কে বলতে শুনেছি যে, কোনো উত্তম জায়গায় না নেয়া পর্যন্ত কোনো নবীকে মৃত্যু দেয়া হয় না। তিনি আরো বলেন, আল্লাহ তায়ালা কোন নবীকে মৃত্যু দেন না, যতক্ষণ না তাকে দাফনের জন্য একটি পছন্দনীয় জায়গায় প্রত্যাবর্তিত না করেন। সুতরাং তোমরা তাঁকে তাঁর বিছানার জায়গায় দাফন কর। ইবনে কাসীর বলেন, এ কথা মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত আছে যে, রাসূল কে আয়েশা -এর হুজরার মধ্যে দাফন করা হয়, যা বর্তমানে মসজিদের নববীর অন্তর্ভুক্ত। আর আয়েশা -এর ঘর ছিল মসজিদের পূর্ব দিকে একটি

পৃষ্ঠা:১১০

নির্দিষ জায়গা। অতঃপর সেখানে আবু বকর ও ওমর পুত্র-কে দাফন দেয়া হয়। কাসেম গুদ্র হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আয়েশা শুল্ম-এর ঘরে প্রবেশ করলাম এবং তাকে বললাম, হে উন্মুল মুমিনীন! আমাকে রাসূল ও তাঁর সাথিওয়ের কবরের স্থানটি দেখিয়ে দিন। ফলে তিনি তিনটি কবর দেখিয়ে দিলেন, যা বেশি উঁচুও নয় এবং নিচুও নয়; বরং তা ছিল সমতল।

১৪৩.আয়েশা কর্তৃক নবী-এর গুণাগুণ বর্ণনা

আয়েশা বলেন, রাসূল ধারাবাহিকভাবে রোযা রেখে যেতে থাকতেন। এমনকি যতক্ষণ পর্যন্ত না বলতাম, এবার কি আপনি ইফতার করবেন না। আবার তিনি ধারাবাহিকভাবে রোযা ছেড়ে দিতেন। এমনকি যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা বলতাম, আপনি কি আর রোযা রাখবেন না? তুমি যদি তাকে রাত্রে দাঁড়িয়ে নামায পড়া অবস্থায় দেখতে চাও, তবে তা দেখতে পাবে। আবার তুমি যদি তাকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখতে চাও, তবে তুমি তাও দেখতে পাবে। তিনি আরো বলেন, রাসূল রাতে রমযান মাসে অথবা অন্য কোনো মাসে কখনো ১১ রাকাতের চেয়ে বেশি আদায় করেননি। তিনি প্রথমে চার রাকাত নামায আদায় করতেন। অতঃপর আয়েশা রাবীকে লক্ষ্য করে বলেন, তুমি তার সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে প্রশ্ন কর না। তারপর তিনি আবারও চার রাকাত নামায আদায় করতেন। এ ক্ষেত্রেও তুমি তাঁর সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে প্রশ্ন কর না। তারপর তিনি তিন রাকাত বিতর নামায আদায় করতেন। তিনি আরো বলেন, রাসূল তারতিল সহকারে খুব লম্বা করে কুরআন তেলাওয়াত করতেন। এমনকি তাঁর সাথে নামাযে দাঁড়িয়ে থাকাটা অসম্ভব হয়ে যেত।

পৃষ্ঠা:১১১

১৪৪.প্রিয় মানুষের গুণ বর্ণনায় আয়েশা

উরওয়া খুদ্র আয়েশা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, যখন রাসূল (সা:) বাড়িতে প্রবেশ করতেন, তখন মুখে আনন্দের ঝলক বিদ্যুতের মতো চমকাতে থাকত। উরওয়া আয়েশা হতে আরো বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আয়েশা হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূল-এর চুল আঁচড়িয়ে দিতাম এবং সিঁথি কেটে দিতাম। আর তিনি সাধারণত বাবরী চুল রাখতেন।

১৪৫.রাসূল-এর চরিত্র বর্ণনায় আয়েশা

সাঈদ ইবনে হিশাম ল্ল হতে বর্ণনা করেন। আমি আয়েশা শু-কে রাসূল (সা:)- এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বলেন, তুমি কি কুরআন পড় না। আমি বললাম, হ্যাঁ। তারপর তিনি বলেন, তাঁর চরিত্র ছিল আল কুরআন। আয়েশা বলেন, রাসূল যে কোনো দুটি বিষয়ের মধ্যে তুলনামূলক সহজটিই গ্রহণ করতেন, যদি তাতে কোনো পাপের আশঙ্কা না থাকত। আয়েশা হতে আরো বর্ণিত আছে যে, রাসূল কখনো আল্লাহর সীমালঙ্ঘনকারী ছাড়া কারো ওপর তিনি শাস্তি প্রয়োগ করতেন না। আয়েশা প্লাবলেন, রাসূল (সা:) তাঁর হাত দিয়ে কখনো কোনো মানুষ দাস বা খাদেমকে মারধর করেননি। তবে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের ক্ষেত্রে মারতেন। আবু আবদুল্লাহ আল জালি গুদ্রে একদা আয়েশা আল্ল-কে রাসূলের চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, রাসূল মানুষকে বেশি বেশি ক্ষমা করতেন।

পৃষ্ঠা:১১২

১৪৬.আয়েশা-এর বর্ণনায় রাসূল-এর কথা

আয়েশা শু তাঁর পরিবারের এক ব্যক্তিকে বলেন, অমুকের পিতা কি তোমাকে আশ্চার্যান্বিত করে না? এমতাবস্থায় ঐ ব্যক্তি আমার ঘরের পাশে বসে রাসূল (সা:) সম্পর্কে আলোচনা করছিল। আর তখন আমি নামায পড়ছিলাম। অতঃপর আমার নামায পড়া শেষ হওয়ার আগেই সে উঠে চলে গেল। তবে আমি যদি তাকে পেতাম, তাকে বলতাম, তোমরা যেভাবে তাড়াহুড়া করে কথা বল রাসূল সেভাবে তাড়াহুড়া করে কথা বলতেন না। উরওয়া প্লে হতে বর্ণিত। আয়েশা বলেন, নবী পৃথক পৃথকভাবে কথা বলতেন, যা প্রত্যেক ব্যক্তিই সহজে বুঝে নিতে পারত এবং এতে কোনো অসুবিধা হতো না।

১৪৭.নিজ বাড়িতে রাসূল।

আসওয়াদ বলেন, আমি আয়েশা -কে বললাম, রাসূল করতেন? তখন তিনি বলেন, রাসূল বাড়িতে কি বাড়ির কাজে ব্যস্ত থাকতেন। তবে যখন নামাযের সময় হতো তখন তিনি নামায আদায় করার জন্য চলে যেতেন। হিশাম ইবনে উরওয়া তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি আয়েশা-কে রাসূল এর বাড়ির কাজ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তখন আয়েশা পুরা বলেন, রাসূল তোমাদের মতো নিজের কাপড় নিজেই সেলাই করতেন। উমরাহ স্রে বলেন, আমি আয়েশা -কে বললাম, রাসূল থাকাবস্থায় কি কাজ করতেন? তখন আয়েশা বলেন, রাসূল বাড়িতে তোমাদের মতো একজন মানুষ ছিলেন। সুতরাং তিনি কাপড় সেলাই করতেন, ছাগলের দুধ দোহন করতেন এবং নিজের কাজ নিজে করতেন। আমর খুল্ল হতে আরো বর্ণিত আছে যে, আমি আয়েশা -কে জিজ্ঞেস করলাম, রাসুল তাঁর পরিবারের সাথে কিরূপ ব্যবহার করতেন? তখন আয়েশা (রা) বললেন, তিনি ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে নরম হৃদয়ের অধিকারী, মানুষের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি। আর তিনি মুচকি হাসি হাসতেন।

পৃষ্ঠা:১১৩

১৪৮.রাসূল-এর পরিত্যক্ত সম্পদ

আয়েশা বলেন, তোমরা আমাকে রাসূল-এর পরিত্যক্ত সম্পদ সম্পর্কে প্রশ্ন কর? তবে শোন, মৃত্যুর সময় তিনি কোনো দিনার, দিরহাম, দাস বা দাসী রেখে যাননি। ইবনে মাসউদ বলেন, আমি তাকে এও বলতে শুনেছি যে, তিনি কোনো ছাগল অথবা কোনো উটও রেখে যাননি। আয়েশা বলেন, রাসূল এক ইহুদীর কাছ থেকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কিছু খাদ্য ক্রয় করেন এবং তার কাছে একটি লোহার বর্ম বন্দক রাখেন। আয়েশা বলেন, যখন রাসূল মৃত্যুবরণ করেন তখন রাসূল-এর স্ত্রীগণ উসমান-কে রাসূল-এর স্ত্রীদের মিক্সসের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করার জন্য আবু বকর পুত্র-এর কাছে পাঠাতে ইচ্ছা পোষণ করেন। তখন আয়েশা বলেন, আল্লাহর রাসূল কি বলেননি যে, আমরা (নবীরা) কোনো ওয়ারিস রেখে যাই না? আর যা আমরা পরিত্যাগ করে যাই তা সদকা হয়ে যায়?

১৪৯.আয়েশা-এর পরলোক গমন

মুয়াবিয়া-এর খিলাফতকালে ৫৮হিজরী মোতাবেক ১৭ই রমযান প্রায় ৬৭ বছর বয়সে তিনি পরলোক গমন করেন। মৃত্যুকালীন অসুস্থতার সময় সাহাবীরা আয়েশা প্লা-কে বলেছিলেন যে, আমরা কি আপনাকে রাসূল-এর সাথে দাফন করব? তখন আয়েশা বলেন, তোমরা আমাকে আমার ভাইদের সাথে দাফন কর। অতঃপর তিনি নিজেকে জান্নাতুল বাকীতে দাফন করানোর জন্য ওসীয়ত করে যান। ফলে তাকে সেখানেই দাফন করা হয়। তার কবরের পাশে ছিল আরো ৫ জনের কবর। তারা হলেন, যুবাইর ইবনে আওয়ামের দুই ছেলে, আবদুল্লাহ ও উরওয়াল, আয়েশা-এর বোন আসমা আয়েশা-এর ভাই মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর এর দুই ছেলে কাশেম এবং আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর -এর ছেলে আবদুল্লাহ।

পৃষ্ঠা:১১৪

১৫০. উর্ধ্ব জগতে গমন

কায়েস থেকে বর্ণিত। আয়েশা বলেন, তিনি মনে মনে ইচ্ছা করেছিলেন যে, তাকে তার বাড়িতে দাফন করা হবে। আয়েশা বলেন, রাসূল-এর মৃত্যুর পর আমি তাঁর পাশেই শায়িত হওয়ার ইচ্ছা করেছিলাম। পরে তিনি জান্নাতুল বাকীতে শায়িত হওয়ার ইচ্ছা করেন এবং তাকে সেখানে দাফন করা হয়। ৫৮ হিজরীর রমযান মাসে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। আর তাঁর ওসীয়ত ছিল যে, তাকে যেন তার সাথি রাসূল-এর বাকি স্ত্রীদের সাথে জান্নাতুল বাকীতে দাফন করা হয়। ১৭ই রমজান রাতে তিনি পরলোক গমন করেন। যখন আয়েশা-এর মৃত্যুর খবর উম্মে সালমা-এর কাছে পৌঁছল তখন তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ! আয়েশা রাসূল-এর কাছে আবু বকর ব্যতীত সবচেয়ে বেশি প্রিয় ছিলেন। আর সে রাতেই বেতের নামাযের পরে তাকে দাফন করা হয়। আবু হুরায়রা আসলেন এবং নামাযে জানাযার এমামত করলেন। সাহাবীরা বলেন, সেদিন রাতে যত মানুষ একত্র হয়েছিল আর কোনো দিন এত মানুষ একসাথে একত্রিত হয়নি।

সমাপ্ত

হোম
ই-শো
লাইভ টিভি
নামাজ শিক্ষা
গেইমস
চাকুরি